আল হাদীস

রক্ত সম্পর্কের গুরুত্ব

আদাবুল মুফরাদ (Adab al mufrad), ইমাম বুখারী রহ. ( Imam Bukhari) - Imam Bukhari (rh)

রক্ত সম্পর্কের গুরুত্ব  – আদাবুল মুফরাদ  ইমাম বুখারী রহ. একটি প্রসিদ্ধ গ্রন্থ।

এতে তিনি সদাচরণ ও সদ্ব্যবহার, আদব কায়দা ইত্যাদি বিষয়ের হাদীসসমূহ সংকলন করেছেন।

এখানে আত্মীয় স্বজনের সাথে সদাচরণ বিষয়ক হাদীসসমূহ উল্লেখ করা হয়েছে।

আরও পোস্ট

ইমাম বুখারী রহ. রচিত আদাবুল মুফরাদ গ্রন্থ থেকে অনূদিত

আমাদের অনুবাদ ও প্রকাশনা – দারুস সাআদাত

Table of Contents

আত্মীয় সম্পর্ক রক্ষার গুরুত্ব 

অনুচ্ছেদঃ২৫ আত্মীয়তা সম্পর্ক বজায় রাখা অত্যাবশ্যক

হাদীস: ৪৭ বকর বিন হারিস আল আনমারী (রা) থেকে বর্ণিত, আর তাকে কুলায়ব বলা হত। (তিনি আরয করলেন,) হে আল্লাহর রাসূল! আমি কার সাথে সদাচরণ করব?

তিনি (সা) বললেন,

أُمَّكَ وَأَبَاكَ، وَأُخْتَكَ وَأَخَاكَ، وَمَوْلَاكَ الَّذِي يَلِي ذَاكَ، حقٌ واجبٌ ورَحمٌ موصولة

তোমার মা, বাবা, বোন, ভাই এবং নিকটাত্মীয়ের সাথে। এই হক পূরণ করা ওয়াজিব। আর আত্মীয়তা সম্পর্ক বজায় রাখবে।

নিজেদেরকে আগুন থেকে বাঁচাও

হাদীস: ৪৮ আবু হুরায়রা (রা) বর্ণনা করেন। যখন এই আয়াত নাযিল হয়-

وَأَنْذِرْ عَشِيرَتَكَ الْأَقْرَبِينَ
আপনি আপনার নিকটাত্মীয়দেরকে ভয় প্রদর্শন করুন।– সূরা শুআরা:২১৪

তখন রাসূলুল্লাহ (সা) দাড়িয়ে ডাক দিলেন, হে বনী কাব বিন লুই! তোমরা নিজেদেরকে আগুন থেকে বাঁচাও।

হে আবদে মানাফ! তোমরা নিজেদেরকে আগুন থেকে বাঁচাও।

হে বনী হাশিম, তোমরা নিজেদেরকে আগুন থেকে বাঁচাও।

হে আব্দুল মুত্তালিব! তোমরা নিজেদেরকে আগুন থেকে বাঁচাও।

হে মুহাম্মদের কন্যা ফাতিমা! তোমরা নিজেদেরকে আগুন থেকে বাঁচাও।

কেননা আমি তোমাদের কোন কিছুর মালিক নই, শুধু এতটুকু যে, তোমাদের সাথে আমার আত্মীয়তার সম্পর্ক। আর আমি আমার আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখব।

অনুচ্ছেদঃ২৬ আত্মীয়তা সম্পর্ক রক্ষা করা

হাদীস: ৪৯ আবু আইয়ুব আনসারী (রা) বর্ণনা করেন। এক গ্রাম্য ব্যক্তি সফর করে রাসূলুল্লাহ (সা) এর নিকট এসে আরয করল,

আমাকে এমন কোন আমল বলে দিন, যা আমাকে জান্নাতের নিকটবর্তী করবে এবং জাহান্নাম থেকে দূরে রাখবে।

তিনি (সা) বললেন-

تعبدُ اللَّهَ وَلَا تشركُ بِهِ شَيْئًا، وتقيمُ الصَّلَاةَ، وَتُؤْتِي الزَّكَاةَ، وتصلُ الرَّحِمَ) .

তুমি আল্লাহর ইবাদত করবে আর তার সাথে কোন কিছুর শরীক করবে না। নামায কায়েম করবে, যাকাত প্রদান করবে আর আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখবে।

রেহেমের দাবী

হাদীস: ৫০ আবূ হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেন-

আল্লাহ তা’আলা সৃষ্টিকুলকে সৃষ্টি করলেন। আর যখন তিনি তা সম্পন্ন করলেন তখন ‘রেহেম’ (রক্তসম্পর্ক) দাঁড়িয়ে গেল।

তিনি তাকে বললেন, থামো। সে বলল, আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্নকারী ব্যক্তি থেকে আশ্রয় প্রার্থনার জন্যই আমি এখানে দাঁড়িয়েছি।

আল্লাহ বললেন, তুমি কি এতে সন্তুষ্ট নও যে, যে তোমাকে সম্পৃক্ত রাখে, আমিও তাকে সম্পৃক্ত রাখব। আর যে তোমার থেকে সম্পর্ক ছিন্ন করে, আমিও তার থেকে সম্পর্ক ছিন্ন করব?

সে বলল, নিশ্চয়ই, হে আমার প্রতিপালক।

তিনি বললেন, যাও তোমার জন্য তা-ই করা হল।
অতঃপর আবূ হুরায়রা (রা) বলেন, ইচ্ছা হলে তোমরা পড়তে পার-

فَهَلْ عَسَيْتُمْ إِنْ تَوَلَّيْتُمْ أَنْ تُفْسِدُوا فِي الْأَرْضِ وَتُقَطِّعُوا أَرْحَامَكُمْ
ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হলে সম্ভবত তোমরা পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করবে এবং আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করবে।- [সূরা মুহাম্মদ:২২]

আল্লাহর শিক্ষা 

হাদীস: ৫১ ইবনে আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি আল্লাহ তাআলার এই বাণী-

وَآتِ ذَا الْقُرْبَى حَقَّهُ وَالْمِسْكِينَ وَابْنَ السَّبِيلِ
আত্মীয়-স্বজনকে দিয়ে দাও তার প্রাপ্য এবং অভাবগ্রস্ত মিসকীন ও মুসাফিরকেও। তবে কিছুতেই অপব্যয় করবে না।–ইসরা:২৬

প্রসঙ্গে বলেন- আল্লাহ তাআলা যাদের অর্থ-সম্পদ আছে তাদের জন্য এই আয়াতে তাদের কর্তব্য নির্ধারণ করে দিয়ে বলেন-

وَآتِ ذَا الْقُرْبَى حَقَّهُ وَالْمِسْكِينَ وَابْنَ السَّبِيلِ
আত্মীয়-স্বজনকে দিয়ে দাও তার প্রাপ্য এবং অভাবগ্রস্ত মিসকীন ও মুসাফিরকেও।
আর যখন তার কাছে কিছু থাকবে না তখন তার ব্যাপারে শিক্ষা দিলেন-

وَإِمَّا تُعْرِضَنَّ عَنْهُمُ ابْتِغَاءَ رَحْمَةٍ مِنْ رَبِّكَ تَرْجُوهَا فَقُلْ لَهُمْ قَوْلاً مَيْسُوراً
তাদেরকে যদি তোমার বঞ্চিত করতে হয় (এই অবস্থায় যে,) তুমি তোমার প্রতিপালকের রহমত লাভের প্রত্যাশায় (আছ), তখন তাদের সাথে নম্রভাবে কথা বল।- ইসরা:২৮

অর্থাৎ কল্যাণের প্রতিশ্রুতী দাও যেমন, [এখন একটু সমস্য আছে] এই হয়ে যাবে বা আশা করি হয়ে যাবে (দিতে পারব) ইনশাল্লাহ।

وَلَا تَجْعَلْ يَدَكَ مَغْلُولَةً إِلَى عُنُقِكَ
আর তুমি ব্যয়কুণ্ঠ হয়ো না। ইসরা:২৯
অর্থাৎ একেবারেই না দিয়ো না (কিছু না কিছু দিও)।

وَلَا تَبْسُطْهَا كُلَّ الْبَسْطِ
আর একবারেই মুক্তহস্ত হয়ো না। ইসরা:২৯
অর্থাৎ যা আছে তা সব দিয়ে দিও না।

فَتَقْعُدَ مَلُومًا
তাহলে তুমি তিরষ্কৃত হবে। ইসরা:২৯
অর্থাৎ পরে যারা আসবে তারা যেন তোমার কাছে না পেয়ে তোমাকে তিরষ্কার না করে।

مَحْسُورًا
আর তুমি নিঃস্ব ও রিক্ত হস্ত হয়ে যাবে।- ইসরা:২৯
অর্থাৎ যা দান করে দিয়েছ তার জন্য পরে যেন আক্ষেপ করতে না হয়।

অনুচ্ছেদঃ২৭ আত্মীয়তা সম্পর্ক বজায় রাখার ফযীলত

হাদীস: ৫২ আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত । তিনি বলেন, এক ব্যক্তি বলল, ইয়া রাসুলুল্লাহ (সা)! আমার আত্মীয়-পরিজন আছে।

আমি তাদের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষা করি আর তারা ছিন্ন করে। আমি তাদের উপকার করি, কিন্তু তারা আমার অপকার করে।

তারা আমার সঙ্গে মূর্খতাসূলভ আচরণ করে, আর আমি তা সহ্য করি।

তখন তিনি বললেন, তুমি যা বললে, যদি প্রকৃত অবস্থা তা-ই হয় তাহলে তুমি যেন তাদের উপর জ্বলন্ত অঙ্গার নিক্ষেপ করছ।

সর্বদা তোমার সঙ্গে আল্লাহর তরফ থেকে তাদের বিপক্ষে একজন সাহায্যকারী (ফিরিশতা) থাকবে, যতক্ষন তুমি এই অবস্থায় বহাল থাকবে।

যে আত্মীয়তা সম্পর্ক ছিন্ন করবে 

হাদীস: ৫৩ আব্দুর রহমান ইবনে আউফ (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি রাসূলুল্লাহ (সা) কে বলতে শুনেছেন যে, আল্লাহ তাআলা বলেছেন-

أَنَا الرَّحْمَنُ وَأَنَا خَلَقْتُ الرَّحِمَ واشتققتُ لَهَا مِنَ اسْمِي فَمَنْ وَصَلَهَا وصلتُهُ وَمَنْ قَطَعَهَا بتَتُّه

আমি রহমান আর আমি রেহেম (আত্মীয়তার বন্ধনকে) সৃষ্টি করেছি এবং আমার নাম থেকে তাকে নির্গত করেছি।

অতএব যে তাকে জুড়ে রাখবে আমি তাকে জুড়ে রাখব। আর যে তাকে ছিন্ন করবে, আমি তাকে ছিন্ন করব।

যে আত্মীয়তার বন্ধন জুড়ে রাখবে

হাদিস: ৫৪ আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন- নবী কারীম (সা) আমাদের দিকে তার আঙ্গুলগুলো একত্র করে বললেন-

الرَّحِمُ شَجْنَةُ مِنَ الرَّحْمَنِ مَنْ يَصِلْهَا يَصِلُه ومَنْ يَقْطَعْهَا يَقْطَعْهُ لَهَا لِسَانٌ طَلْق ذَلْقٌ يوم القيامة

রেহেম (আত্মীয়তার বন্ধন) হলো রহমান এর অংশ। যে তাকে যুক্ত রাখবে আল্লাহ তাকে যুক্ত রাখবেন।

আর যে তাকে ছিন্ন করবে, রহমান তাকে ছিন্ন করবেন। কিয়ামতের দিন (অভিযোগের জন্য) তার তীক্ষ্ণ যবান হবে।

আল্লাহ যাকে যুক্ত রাখবেন

হাদীস: ৫৫ হযরত আয়িশা (রা) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেন-

الرَّحِمُ شَجْنَةُ مِنَ اللَّهِ مَنْ وَصَلَهَا وَصَلَهُ اللَّهُ وَمَنْ قطعها قطعه الله

রেহেম- আত্মীয়তার সম্পর্ক আল্লাহর একটি অংশ। যে তাকে জুড়ে রাখবে, আল্লাহও তাকে জুড়ে রাখবেন। আর যে তাকে ছিন্ন করবে আল্লাহও তাকে ছিন্ন করবেন।

অনুচ্ছেদঃ২৮ আত্মীয়তা সম্পর্ক বজায় রাখা আয়ু বৃদ্ধি করে

হাদীস: ৫৬ আনাস (রা) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেন-

مَنْ أَحَبَّ أَنْ يُبْسَطَ لَهُ فِي رزقِهِ وَأَنْ يُنْسَأ لَهُ فِي أثَرِه فَلْيَصِلْ رَحِمَه

যে ব্যক্তি এটা পছন্দ করে যে, তার রিযিক প্রশস্ত হোক, তার পশ্চাদ্ধাবনকারী (মৃত্যু) বিলম্বিত হোক, তবে তার উচিত আত্মীয়তা সম্পর্ক বজায় রাখা।

এটা যার আনন্দ দেয়

হাদীস: ৫৭ হযরত আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সা) কে বলতে শুনেছি-

مَنْ سَرَّه أَنْ يُبْسَط لَهُ فِي رِزْقِهِ وَأَنْ يُنْسَأ لَهُ فِي أثَرِه فَلْيَصِلْ رحمه

যে ব্যক্তির এই বিষয়টি আনন্দ দেয় যে, তার রিযিক প্রশস্ত হোক, তার পশ্চাদ্ধাবনকারী (মৃত্যু) বিলম্বিত হোক, তবে তার উচিত আত্মীয়তা সম্পর্ক বজায় রাখা।

অনুচ্ছেদঃ২৯ যে আত্মীয়তা সম্পর্ক বজায় রাখে তাকে তার স্বজন-পরিজনরা পছন্দ করে

হাদীস: ৫৮ ইবনে উমর (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন-

من اتقى ربه ووصل رحمه نُسِىءَ في أجله وَثَرى ماله وأَحَبَّه أهلُهُ

যে ব্যক্তি তার প্রতিপালককে ভয় করে এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখে, তার মৃত্যু পিছিয়ে দেয়া হয়, তার সম্পদ বাড়িয়ে দেয়া হয় এবং তার পরিবার-পরিজন তাকে ভালবাসে।

যার আয়ু লম্বা করা হয়

হাদীস: ৫৯ ইবনে উমর (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন-

من اتقى ربه ووصل رحمه أنسى لَهُ فِي عُمْرِهِ وَثَرَى مَالُهُ وَأَحَبَّهُ أَهْلُهُ

যে ব্যক্তি তার প্রতিপালককে ভয় করে এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখে, তার আয়ূ লম্বা করে দেয়া হয়, তার সম্পদ বাড়িয়ে দেয়া হয় এবং তার স্বজন-পরিজনরা তাকে মহব্বত করতে থাকে।

অনুচ্ছেদঃ৩০ নিকটবর্তীতা অনুযায়ী নিকট আচরণ

হাদীস: ৬০ মিকদাম ইবনে মা’দিকারব (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি রাসূলুল্লাহ (সা)-কে বলতে শুনেছেন-

إِنَّ اللَّهَ يوصِيكم بِأُمَّهَاتِكُمْ ثُمَّ يوصِيكم بِأُمَّهَاتِكُمْ ثُمَّ يوصِيكم بِآبَائِكُمْ ثُمَّ يوصِيكم بِالْأَقْرَبِ فَالْأَقْرَبِ

নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদেরকে তোমাদের মায়েদের ব্যাপারে সদ্ব্যবহার করার উপদেশ প্রদান করছেন।

অতঃপর আল্লাহ তোমাদেরকে তোমাদের মায়েদের ব্যাপারে (আবারো) সদ্ব্যবহার করার উপদেশ প্রদান করছেন।

অতঃপর আল্লাহ তোমাদেরকে তোমাদের পিতাদের ব্যাপারে সদ্ব্যবহার করার উপদেশ প্রদান করছেন।

অতঃপর আল্লাহ তোমাদেরকে নিকটবর্তীতা অনুযায়ী নিকটাত্মীয়দের ব্যাপারে সদ্ব্যবহার করার উপদেশ প্রদান করছেন।

যাদের মাঝে আত্মীয়তা সম্পর্ক ছিন্নকারী থাকে

হাদীস: ৬১ উসমান ইবনে আফফান (রা) এর গুলাম আবু আউয়ুব সুলায়মান (রহ) বলেন।

আমাদের এখানে এক বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় জুমআ রাতে আবু হরায়রা (রা) আগমন করেন এবং এসে বললেন, আমি প্রত্যেক আত্মীয়তা সম্পর্ক ছিন্নকারীর প্রতি কঠোর হব।

যদি কোন আত্মীয়তা সম্পর্ক ছিন্নকারী এখানে থাকে, তবে সে যেন এখান থেকে উঠে যায়। এতে যখন কেউ উঠল না, তখন তিনি তিনবার এই কথা বললেন।

অতঃপর এক যুবক তখন সেখান থেকে উঠে তার ফুফুর নিকট গেল, যার সাথে সে দুই বৎসর যাবত সম্পর্ক ছিন্ন করে রেখেছিল।

যখন তিনি ফুফুর কাছে গেলেন, তখন ফুফু তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, হে ভাতিজা! তুমি কি মনে করে এখানে আসলে?

সে বলল, আবু হুরায়রা (রা) এমন এমন বললেন, তাই এসেছি। তিনি বললেন, তুমি যাও, তার নিকট গিয়ে জিজ্ঞাসা কর, কেন তিনি এমন বললেন।

(সে যাওয়ার পর) আবু হুরায়রা (রা) বললেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সা)-কে বলতে শুনেছি-

إِنَّ أَعْمَالَ بَنِي آدَمَ تُعْرَض عَلَى اللَّهِ تَبَارَكَ وَتَعَالَى عشيةَ كُلِّ خَمِيسٍ لَيْلَةَ الْجُمُعَةِ فَلَا يقبلُ عمل قاطِع رحم

আদম সন্তানের আমল প্রতি বৃহস্পতিবার জুমআ রাতে আল্লাহর দরবারে পেশ করা হয়, তখন আত্মীয়তা সম্পর্ক ছিন্নকারীর আমল কবুল হয় না।

সম্পদ যেভাবে ব্যয় করবে

হাদীস: ৬২ ইবনে উমর (রা) থেকে বর্ণিত,

مَا أنْفَق الرجلُ عَلَى نَفْسِهِ وَأَهْلِهِ يَحْتَسِبُهَا إِلَّا آجَرَهُ اللَّهُ تَعَالَى فِيهَا وابْدَأ بِمَنْ تَعُولُ فَإِنْ كَانَ فَضْلًا فَالْأَقْرَبَ الأقرب وان كان فضلا فَنَاوِل)

যে ব্যক্তি সওয়াব ও প্রতিদানের আশায় নিজের ও নিজের পরিবারে প্রতি খরচ করে, তবে আল্লাহ তাকে তার প্রতিদান দান করেন।

আর নিজের পরিবার থেকে খরচ করা শুরু কর, যারা তোমার তত্বাবধানে আছে। অতঃপর যদি অর্থ সম্পদ অবশিষ্ট থাকে তবে নিকটাত্মীয়দের প্রতি খরচ কর।

অতঃপর যদি আরো বেশী হয়, তখন যেথা ইচ্ছা (বৈধভাবে) খরচ কর।

অনুচ্ছেদঃ৩১ যে সম্প্রদায়ের মধ্যে আত্মীয়তা সম্পর্ক ছিন্নকারী থাকে তাদের প্রতি আল্লাহর রহমত বর্ষিত হয় না

হাদীস: ৬৩ আব্দুল্লাহ বিন আবি আউফা (রা) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেন-

إن َّ الرَّحْمَةَ لَا تنزلُ عَلَى قومٍ فِيهِمْ قَاطِعُ رحِم

ঐ সম্প্রদায়ের প্রতি আল্লাহর রহমত হয় না, যাদের মধ্যে আত্মীয়তা সম্পর্ক ছিন্নকারী থাকে।

অনুচ্ছেদঃ৩২ আত্মীয়তা সম্পর্ক ছিন্ন করার গুনাহ

হাদীস: ৬৪ যুবায়র বিন মুত’য়িম (রা) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেন-

لَا يدخلُ الْجَنَّةَ قاطعُ رَحِمٍ

আত্মীয়তা সম্পর্ক ছিন্নকারী বেহেশতে প্রবেশ করবে না।

রেহেম ও রহমান

হাদীসঃ৬৫. আবু হুরায়রা (রা) নবী (সা) থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন,

إِنَّ الرَّحِمَ شَجْنةٌ مِنَ الرَّحْمَنِ تَقُولُ: يَا رَبِّ إِنِّي ظُلِمتُ يَا رَبِّ إِنِّي قُطِعتُ يا رب إني إني، فَيُجِيُبها أَلَا تَرْضَيْنَ أَنْ أَقْطَعَ مَنْ قطعَك وأصل من وصلكِ؟

নিশ্চয়ই রেহেম- আত্মীয়তার মূল হলো রহমান। রেহেম বলে,

হে আমার প্রতিপালক! আমার প্রতি যুলুম করা হয়েছে। হে আমার প্রতিপালক! আমাকে ছিন্ন করা হয়েছে। হে আমার প্রতিপালক! আমি আমি। হে আমার প্রতিপালক! এমন এমন।

আল্লাহ তাআলা বলবেন, তুমি কি এতে সন্তুষ্ট নও যে যে তোমার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করবে, আমিও তার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করব। আর যে তোমাকে জুড়ে রাখবে, আমিও তাকে জুড়ে রাখব।

নির্বোধদের কর্তৃত্ব থেকে আশ্রয় চাওয়া 

হাদীস: ৬৬ সাঈদ বিন সামআন বর্ণনা করেন। তিনি বলেন- আমি আবু হুরায়রা (রা) কে বাচ্চা ও নির্বোধদের কর্তৃত্ব থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করতে শুনেছি।

সাঈদ বিন সামআন বলেন, আমাকে ইবনে হাসানাহ জুহনী বলেছেন। তিনি আবু হুরায়রা (রা) কে জিজ্ঞাসা করলেন, তার আলামত কি? বললেন,

أَنْ تُقْطَعَ الْأَرْحَامُ وَيُطَاعَ المُغْوِى ويُعْصَى الْمُرْشِدُ

তার আলামত হলো, আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করা হবে, পথভ্রষ্টদের অনুসরণ করা হবে, আর হিদায়াতপ্রাপ্তদের নাফরমানী করা হবে।

অনুচ্ছেদঃ৩৩ দুনিয়াতে আত্মীয়তা সম্পর্ক ছিন্নকারীর শাস্তি

হাদীস: ৬৭ আবু বাকরা (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেন-

مَا مِنْ ذَنْبٍ أحْرَى أَنْ يُعَجِلَ اللَّهُ لصاحِبِه الْعُقُوبَةَ فِي الدُّنْيَا مَعَ مَا يُدَّخرُ لَهُ فِي الْآخِرَةِ مِنْ قَطيعة الرَّحِمِ والبغي

যুলুম এবং আত্মীয়তা সম্পর্ক ছিন্ন করার মত এমন কোন গুনাহ নাই, যার আখিরাতের শাস্তির পাশাপাশি দুনিয়াতেও শাস্তি ভোগ করতে হয়।

অনুচ্ছেদঃ৩৪ পারস্পরিক সম্পর্কে বরাবরকারী আত্মীয়তা সম্পর্ক রক্ষাকারী নয়

হাদীস: ৬৮ আবদুল্লাহ ইবন আমর (রা) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেন-

ليس الوَاصلُ بالمُكافِىء وَلَكِنَّ الواصلَ الَّذِي إِذَا قُطِعت رَحِمُه وَصَلَهَا

সমান সমান ব্যাবহারের মনোভাব নিয়ে সম্পর্ক রক্ষাকারী আত্নীয়তার সম্পর্ক রক্ষাকারী নয়,

বরং কেউ কোন ব্যক্তির সাথে সম্পর্ক নষ্ট করলেও সে যদি তার সাথে সম্পর্ক বজায় রাখে, তবে সে-ই হচ্ছে প্রকৃত সম্পর্ক রক্ষাকারী।

অনুচ্ছেদঃ৩৫ যে যুলুমকারী আত্মীয়ের সাথে সম্পর্ক রক্ষা করে তার মর্যাদা

হাদীস: ৬৯ বারা (রা) বর্ণনা করেন। তিনি বলেন- এক গ্রাম্য ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সা) এর নিকট আগমন করে বলল, হে আল্লাহর নবী! আমাকে এমন কোন আমল বলে দিন যা আমাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবে।

রাসূলুল্লাহ (সা) বললেন, যদিও তুমি সংক্ষেপ কথা বলেছ, তথাপি তা অনেক ব্যাপক বিষয়সম্পন্ন। (তুমি) প্রাণবিশিষ্ট জান (গুলাম) আযাদ কর এবং গর্দান মুক্ত কর (মানুষের বোঝা লাঘব কর)।

সে বলল, এই দুটি কি একই বিষয় নয়। তিনি (সা) বললেন, না। প্রাণবিশিষ্ট জান (গুলাম) আযাদ করার অর্থ হলো তুমি নিজে তা মুক্ত করা। আর গর্দান মুক্ত করার অর্থ হলো তুমি তা মুক্ত করতে সহায়তা করা।

(যেমন) তোমার পছন্দনীয় কোন গৃহপালিত জন্তুকে দুধের জন্য নিজের কোন আত্মীয়কে দেয়া, তাদের প্রতি ইহসান করা।

যদি তুমি তা করতে সমর্থ না হও তবে সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজে নিষেধ করা। যদি তুমি এটাও করতে সমর্থ না হও তবে নিজের যবানকে ভাল কথা ভিন্ন বন্ধ রাখা।

অনুচ্ছেদঃ৩৬ যে জাহিলিয়াতের যুগে নেক আমল করেছে অতঃপর ইসলাম গ্রহণ করেছে

হাদীস: ৭০ হাকীম ইবনে হিযাম (রা) বর্ণনা করেন। তিনি নবী (সা) এর নিকট আরয করেন-

আমার অতিবাহিত হওয়া সময় সম্পর্কে আপনি কি বলেন, যা আমি জাহিলিয়াতের যুগে আত্মীয়দের সাথে সদ্ব্যবহার, গুলাম আযাদ করা এবং দান-সাদকা স্বরুপ করেছি- তার জন্য কোন প্রতিদান পাব কি?

রাসূলুল্লাহ (সা) বললেন, তোমার অতীতের কৃত নেক আমলের বদৌলতেই তুমি ইসলাম গ্রহণ করতে পেরেছ।

অনুচ্ছেদঃ৩৭ মুশরিক আত্মীয়ের সাথে সম্পর্ক রক্ষা করা এবং তাকে হাদিয়া প্রদান করা

হাদীস: ৭১ আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা উমর (রা) এক জোড়া রেশমী ডোরাদার কাপড় বিক্রি হতে দেখলেন। এরপর তিনি নবী (সা)-কে বললেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ আপনি এটি ক্রয় করুন, জুমআর দিন এবং আপনার কাছে যখন প্রতিনিধি দল আসে তখন আপনি তা পড়বেন। তিনি বললেন- হে উমর! এটা সে-ই পড়তে পারে, যার জন্য কল্যাণের কোন অংশ নেই।

এরপর নবী (সা)-এর নিকট কিছু কারুকার্যময় কাপড় আসে। তিনি তা থেকে এক জোড়া কাপড় উমর (রা)-এর নিকট পাঠিয়ে দেন। তখন তিনি রাসূলুল্লাহ (সা) এর নিকট এসে বললেন, আপনি আমার কাছে এটা পাঠিয়েছেন অথচ এ বিষয়ে আপনি যা বলার তা শুনেছি।

নবী (সা) বললেন, আমি তোমাকে এটি পড়ার জন্য দেইনি, বরং এই জন্যেই দিয়েছি যে, তুমি ওটা বিক্রি করে দেবে অথবা অন্যকে পরতে দেবে। তখন উমর (রা) তার এক বৈপিত্রেয় মুশরিক ভাইয়ের কাছে তা পাঠিয়ে দেন।

অনুচ্ছেদঃ৩৮ তোমাদের নিজেদের বংশ পরিচয় জেনে রাখ যেন তোমরা তাদের সাথে সুসম্পর্ক রাখতে পার

হাদীস: ৭২ যুবায়র ইবনুল মুতয়িম (রা) বর্ণনা করেন। তিনি উমর (রা)-কে মিম্বরের উপর বলতে শুনেছেন- তোমরা তোমাদের বংশ পরিচয় জেনে রাখ অতঃপর আত্মীয়দের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখ।

আল্লাহর শপথ! কখনো কোন ব্যক্তির তার (মুসলিম) ভাইয়ের সাথে কিছু একটা (রাগ-ঝগড়া) হয়ে যায় অথচ যদি সে জানত যে, তার সাথে তার আত্মীয়তার সম্পর্ক আছে, তবে সে তার সম্মানের প্রতি কখনো আঁচও আসতে দিত না।

বংশপঞ্জিকা সংরক্ষণ করা 

হাদীস: ৭৩ ইবনে অব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন- তোমরা তোমাদের বংশপঞ্জিকা সংরক্ষণ কর এবং পরস্পর আত্মীয়তা সম্পর্ক বজায় রাখ।

কেননা আত্মীয়তার জন্য কোন দূরত্ব থাকে না যখন সম্পর্ক ভাল হয়- যদিও আত্মীয় দূরের হয়। অনুরুপ আত্মীয়তার জন্য কোন নৈকট্য থাকে না যখন সম্পর্ক ভাল না হয়- যদিও আত্মীয় কাছের হয়।

আত্মীয়তা সম্পর্ক কিয়ামতের দিন আত্মীয়তার সম্পর্কের অধিকারীর নিকট আসবে এবং সে তার আত্মীয়তা সম্পর্কের সাক্ষ্য প্রদান করবে।

যদি সে সম্পর্ক রক্ষাকারী হয় তবে তার পক্ষে সাক্ষ্য প্রদান করবে। আর যদি সে সম্পর্ক ছিন্নকারী হয় তবে তার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য প্রদান করব।

অনুচ্ছেদঃ৩৯ গুলাম কি এই কথা বলবে যে আমার অমুক গোত্রের সাথে সম্পর্ক আছে?

হাদীস: ৭৪ আব্দুর রহমান ইবনে আবী হাবিব (রহ) বলেন- তুমি কোন গোত্রের লোক? আমি বললাম, তায়িম তামিম গোত্রের।

তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, তাদের মধ্য থেকে না তাদের আযাদকৃত গুলামদের মধ্য হতে? আমি বললাম তাদের মুক্তদাসদের মধ্য হতে।

তিনি বললেন, তবে বললে না কেন যে তুমি তাদের আযাকৃত গুলাম?

অনুচ্ছেদঃ৪০ গুলামও তার সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত

হাদীস: ৭৫ রিফাআ বিন রাফে (রা) বর্ণনা করেন। নবী (সা) উমর (রা)-কে বললেন- আমার জন্য তোমার সম্প্রদায়ের লোকজনকে একত্রিত কর। তখন তিনি সকলকে একত্রিত করলেন।

তারা যখন রাসূলুল্লাহ (সা) এর দরজার নিকটে একত্রিত হলো, তখন উমর (রা) রাসূলুল্লাহ (সা) এর নিকট গিয়ে আরয করলো- আমি আমার সম্প্রদায়ের লোকজনকে আপনার সামনে একত্রিত করেছি।

আনসার সাহাবীরা শুনে বলল যে, হয়তো কুরায়শদের ব্যাপারে ওহী নাযিল হয়েছে। অতএব তারা দেখতে ও শুনতে আসল যে, তাদেরকে কি বলা হয়।

অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সা) তাদের কাছে এসে তাদের মাঝে দাড়িয়ে বললেন- তোমাদের মাঝে কি তোমাদের ছাড়া আর কেউ আছে? তারা বলল, হ্যাঁ। আমাদের সাথে আমাদের মিত্রগণ, আমাদের ভগ্নিপুত্রগণ এবং আমাদের আযাদকৃত গুলামরাও রয়েছে।

নবী (সা) বললেন, আমাদের মিত্রগণ, আমাদের ভগ্নিপুত্রগণ এবং আমাদের আযাদকৃত গুলামরাও আমাদের অন্তর্ভুক্ত।

আর তোমরা জেনে রাখ! তোমাদের মধ্যে যারা মুত্তাকী তারাই আমার বন্ধু ও মিত্র। যদি তোমরা তাই হও তবে তো ঠিকই আছে। আর না হয় তোমরা দেখবে যে, কিয়ামতের দিন তোমরা তোমাদের আমল ও গুনাহর বোঝা নিয়ে আগমন করবে আর তোমাদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া হবে।

অতঃপর তিনি তাদেরকে ডেকে বললেন এবং তার দু্‌ই হাত উঁচু করে তাদের মাথার উপর রেখে বললেন-

কুরায়শরা আমানতদার! যে তাদের বিরুদ্ধাচরণ করবে- রাবী বলেন- আমার ধারণা তিনি বলেছেন- الْعَوَاثِرَ অর্থাৎ সে তার জন্য বিপদ ও জটিলতা টেনে আনবে- আল্লাহ তাআলা তাকে তার মুখের উপর উপুর করে জাহান্নামে ফেলবেন।

এ কথাটি রাসূলুল্লাহ (সা) তিনবার বললেন।

🔸🔸🔸

আরও পড়ুন পিতা-মাতার প্রতি সদ্ব্যবহার, আদাবুল মুফরাদ – ইমাম বুখারী রহ.

 

আরও পোস্ট

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Back to top button
error: Content is protected !!