
বিবাহের উপকারিতা – বিবাহ মানব জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ও ধর্মীয় বন্ধন, যা ব্যক্তি জীবনে স্থিতি, মানসিক শান্তি এবং পারিবারিক কাঠামো গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
“বিবাহের উপকারিতা ও কল্যাণ” বিষয়টি আলোচনায় আসে মূলত ব্যক্তি ও সমাজ জীবনে এর ইতিবাচক প্রভাব তুলে ধরার জন্য। বিবাহ শুধু দুইজন মানুষের সম্পর্ক নয়, বরং এটি একটি সুস্থ, সুশৃঙ্খল ও নৈতিক সমাজ গঠনের ভিত্তি।
এই প্রবন্ধে আমরা বিবাহের বিভিন্ন উপকারিতা ও এর সামাজিক, মানসিক এবং ধর্মীয় কল্যাণ সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোচনা করব, যা জীবনের ভারসাম্য ও সুখী পরিবার গঠনে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।
📖 দারুস সাআদাত প্রবন্ধ
🖋️ মারুফ আর রুসাফী
সূচনা
বিবাহ মানব জীবনে একজন নারী ও একজন পুরুষের মধ্যে শরীঅতসম্মত পবিত্রতম বন্ধন। এ প্রসঙ্গে আল-কুরআনে বলা হয়েছে-
الَّذِیۡ خَلَقَكُمۡ مِّنۡ نَّفۡسٍ وَّاحِدَۃٍ وَّ خَلَقَ مِنۡهَا زَوۡجَهَا وَ بَثَّ مِنۡهُمَا رِجَالًا كَثِیۡرًا وَّ نِسَآءً
যিনি মানব জাতিকে এক ব্যক্তি (হযরত আদম আ) থেকে সৃষ্টি করেছেন এবং যিনি তার থেকে তার সঙ্গিনীকে সৃষ্টি করেছেন; আর বিস্তার করেছেন তাদের দু’জন থেকে অগণিত পুরুষ ও নারী।-সূরা নিসা ১
গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়
বিবাহ মানব জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। সৃষ্টির সূচনালগ্নেই মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন পৃথিবীর প্রথম মানব-মানবীর মাধ্যমে বিবাহের প্রচলন করেন। যা অদ্যাবধি মানব সমাজের প্রতিটি ধর্মেই নারী-পুরুষের মিলনের গ্রহণীয় এবং প্রশংসনীয় মাধ্যম হিসেবে প্রচলিত রয়েছে।
বিবাহ নিছক একটি প্রথা (System) বা সামাজিকতা (formalities) বা জৈবিক চাহিদা পূর্ণ করার বৈধ অবলম্বন নয়, বরং এর সাথে জড়িয়ে আছে বহুবিধ উপকারিতা ও কল্যাণ- যা সমাজের চিন্তাশীল মানুষের মানসপটে (in the canvas of the mind) দিবালোকের ন্যায় সুস্পষ্ট।
মনোদৈহিক উপকারিতা
মানব জীবনে দেহ ও মনের সুস্থতার গুরুত্ব অপরিসীম। সুস্থতার জন্য একটির সাথে অপরটির নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। অর্থাৎ দেহ সুস্থ থাকলে যেমন মনও সুস্থ থাকে তেমনি মন সুস্থ থাকলে দেহও সুস্থ থাকে।
সক্রেটিস এর উক্তি
দার্শনিক সক্রেটিস অবশ্য বলেছেন, দেহ সুস্থ হলেই মনও সুস্থ হবে আমি তা মনে করি না বরং আমার মতে সুস্থ মনই দৈহিক উৎকর্ষের সহায়ক।- প্লেটোর রিপাবলিক
এ বিষয়ে হাদিস
রাসুলুল্লাহ (সা)-এর হাদীস থেকেও এ কথার প্রমাণ পাওয়া যায়। তিনি (সা) ইরশাদ করেছেন-
أَلاَ وَإِنَّ فِي الْجَسَدِ مُضْغَةً إِذَا صَلَحَتْ صَلَحَ الْجَسَدُ كُلُّهُ، وَإِذَا فَسَدَتْ فَسَدَ الْجَسَدُ كُلُّهُ. أَلاَ وَهِيَ الْقَلْبُ
মনে রেখো! মানুষের শরীরে একটি গোশতপিণ্ড রয়েছে, এটা যখন ভাল থাকে, তার গোটা শরীর ভাল থাকে, আর এটা যদি নষ্ট হয়ে যায় তাহলে তার গোটা শরীর নষ্ট হয়ে যায়। মনে রেখো! ঐ মাংসপিণ্ডটাই হল ক্বালব (হৃদয়)।- সহিহ বুখারী
মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বিবাহের মাঝে এমন কল্যাণ রেখেছেন যে, এর মাধ্যমে নারী-পুরুষের দেহ মন উভয়ই থাকে সুস্থ-সবল। নিম্নে এ বিষয়ে আলোকপাত করা হল।
মানসিক উপকারিতা
মন মানসিকতার উপর প্রভাব
বিবাহের কারণে নারী-পুরুষের মন-মানসিকতা ও আচার-আচরণের আমূল পরিবর্তন সাধিত হয়। যারা বিবাহের পূর্বে উচ্ছৃঙ্খল, দায়িত্বহীন, স্বেচ্ছাচারী ও আরামপ্রিয় জীবন যাপনে অভ্যস্ত ছিল, আর এর ফলে তাদের জীবনে অলসতা, অকর্মণ্যতা ও দারিদ্র্যের অভিশাপ নেমে এসেছিল,
বিবাহের পর তাদের মন-মানসিকতা ও আচার-আচরণের আমূল পরিবর্তন সাধিত হওয়ায় তাদের মধ্যে শিষ্টাচার, সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য, মিতব্যয়িতা, দায়িত্ব-কর্তব্যবোধ ও সুশৃঙ্খল জীবন যাপনের সু-অভ্যাস গড়ে ওঠে।
অপব্যয়, উচ্ছৃঙ্খল, অভদ্র জীবন যাপনের বদঅভ্যাস থেকে তারা পরিত্রাণ লাভ করে।- পারিবারিক সংকট নিরসনে ইসলাম
অভ্যন্তরীণ অবস্থা
এতো হল বাহ্যিক অবস্থা, আর অভ্যন্তরীণ অবস্থা হল স্বামী-স্ত্রী পরস্পর পরস্পরের নিকট শান্তি, স্বস্তি লাভ করে থাকে, ফলে মানসিক বিশ্রাম (relaxation) ও সক্রিয়তায় (activeness) পূর্ণতা আসে।
আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেন-
هُوَ الَّذِیۡ خَلَقَكُمۡ مِّنۡ نَّفۡسٍ وَّاحِدَۃٍ وَّ جَعَلَ مِنۡهَا زَوۡجَهَا لِیَسۡكُنَ اِلَیۡهَا
তিনিই সে সত্তা যিনি তোমাদিগকে সৃষ্টি করেছেন একটি মাত্র সত্তা থেকে; আর তার থেকেই তৈরি করেছেন তার জোড়া, যাতে তার কাছে স্বস্তি পেতে পারে।- সূরা আল-আরাফ : ১৮৯
নবী (সা) এর কর্ম
মহানবী (সা) যখন কাজে-কর্মে, ও নিরবচ্ছিন্ন ইবাদতের কারণে দেহ-মনে ক্লান্ত হয়ে পড়তেন,
তখন তিনি হযরত আয়েশা (রা)-এর নিকট গিয়ে তার সঙ্গে অন্তরঙ্গতা ও কথোপকথনের মাধ্যমে নিজের দেহ-মনের অবসাদ দূর করে নিতেন—
যেন একাগ্রতার সাথে তিনি তার দায়িত্ব পালন করতে পারেন।- কিমিয়া সাআদাত
আয়শা (রা) এর কর্ম
রাসূল (সা) যখন হযরত আয়েশা (রা)-এর ঘরে রাত কাটাতেন এবং শেষ রাতে এবাদতের জন্য উঠে যেতেন।
পরে হযরত আয়েশা (রা)-এর ঘুম ভেঙে গিয়ে যদি তাঁকে পাশে না পেতেন, তবে তিনি অত্যন্ত চিন্তিত হয়ে পড়তেন এবং অন্ধকারেই রাসূল (সা)-কে খুঁজতে শুরু করতেন।
যখন তাকে পেয়ে যেতেন তখন তার মনে পূর্ণ শান্তি ও স্বস্তি ফিরে আসত।- সীরাত আয়েশা (রা)
দৈহিক উপকারিতা
আল্লাহ তা’আলা নর-নারীর মধ্যে যে জৈবিক চাহিদা প্রদান করেছেন, তার যথাযথ সুস্থ প্রয়োগ ভাল স্বাস্থ্যের কারণ হয়, বহু প্রকারের রোগ থেকেও নিরাপদ থাকা যায়।
গ্যালেনের উক্তি
প্রাচীন গ্রীক চিকিৎসক হাকীম জালিনুস (Galen) বলেছেন- স্ত্রী সহবাসে স্বাস্থ্য রক্ষার বড় উপায় এবং বহু সংখ্যক রোগের প্রতিষেধক।
আল্লামা নাফীসির উক্তি
প্রখ্যাত চিকিৎসা বিজ্ঞানী আল্লামা নাফীসী বলেন, স্ত্রী সহবাস দেহের স্বাভাবিক উষ্ণতা বৃদ্ধি করে। দেহকে খাদ্য গ্রহণের উপযোগী করে তোলে, মন প্রফুল্ল করে, ক্রোধ দমন করে, কুচিন্তা দূর করে এবং দৈহিক রোগ উপশম করে।
সহবাস ত্যাগ স্বাস্থ্যের পক্ষে ক্ষতিকারক, যে ব্যক্তি স্ত্রী সহবাস করে না, বহু মারাত্মক রোগে সে আক্রান্ত হয়।
ইবনে সীনার উক্তি
এ প্রসঙ্গে বিখ্যাত দার্শনিক ও চিকিৎসা বিজ্ঞানী ইবনে সিনা বলেন, সহবাস আধিক্য যেমন ক্ষতিকর অনুরূপ সহবাস পরিত্যাগ করাও ক্ষতিকর।
সহবাস পরিত্যাগ করলে মাথা ঘোরা বা চক্কর দেওয়া, চক্ষু কালো বর্ণ ধারণ করা, শরীরে মেদ জমা, অন্ডকোষ ফুলে যাওয়া ইত্যাদি উপসর্গ দেখা দেয়। আবার সহবাস আরম্ভ করে দিলেই এসব অসুবিধা দূর হয়ে যায়।
বলা বাহুল্য
এখানে বলা বাহুল্য যে, ইসলামে বিবাহ ব্যতীত নারী-পুরুষের যৌন কামনা চরিতার্থ করার সুযোগ নেই।
ইসলামী শরীয়ত ব্যভিচারকে হারাম সাব্যস্ত করেই ক্ষান্ত হয় নি, সাথে সাথে এর ঐহিক (Worldly) ও পারত্রিক (Spiritual) ক্ষতিসমূহকেও তুলে ধরেছে—যেন মানুষ অন্তত এর ক্ষতি থেকে বাঁচার জন্য এ অশ্লীল কর্ম থেকে বিরত থাকে।
দুটি অপরাধ এমন
এক হাদীসে রাসূল (সা.) ইরশাদ করেছেন- দুটি অপরাধ এমন রয়েছে যার শাস্তি আল্লাহ তা’আলা দুনিয়াতেই দ্রুত প্রদান করে থাকেন-
(তাহলো) ব্যভিচার ও পিতা-মাতার অবাধ্যতা। – তাবারানী)
আর পরকালের কঠিন শাস্তির ঘোষণা তো রয়েছেই। ব্যভিচার দ্বারা নারী-পুরুষের মধ্যে কোন স্থায়ী ও বৈধ সম্পর্ক গড়ে উঠে না।
ভালবাসা ও প্রীতির স্থায়ী সম্পর্কের জন্য নারী-পুরুষের মধ্যে বিবাহ-বন্ধন অত্যাবশ্যক।
পারিবারিক কল্যাণ
ইসলামী আইন ও রীতি অনুযায়ী পরিবার হচ্ছে স্বামী-স্ত্রীকে নিয়ে গঠিত এক সামাজিক কোষ।
আবার একত্রে বসবাস করে এমন একটি দলকেও পরিবার বলে, যারা পরস্পর বৈবাহিক সূত্রে বা রক্ত সম্পর্কীয় আত্মীয়।-
পারিবারিক শান্তি ও শৃঙ্খলা
বিবাহের মাধ্যমে পারিবারিক জীবনে আসে শান্তি, শৃঙ্খলা। ঘর-গৃহস্থালী থেকে শুরু করে পারিবারিক সব কাজ-কর্মে পরস্পর সহযোগিতার মাধ্যমে পারিবারিক কাজ-কর্ম হয় সুশৃঙ্খল ও সহজসাধ্য।
মহানবী (সা) নিজেও পরিবারের সবার সাথে মিলেমিশে ঘরের কাজ-কর্ম করতেন।
স্বামী স্ত্রীর উপার্জন
তাছাড়া কোন কোন পরিবারে স্বামীর পাশাপাশি স্ত্রীও উপার্জনের করে পরিবারের অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে যথেষ্ট অবদান রাখছে।
এর ফলে পরিবারে কাজের হাত বৃদ্ধি পাওয়ায় উপার্জন বৃদ্ধি পেয়ে পরিবারে স্বাচ্ছন্দ্য ও আনন্দের মধুময় পরিবেশ গড়ে ওঠে।- পারিবারিক সংকট নিরসনে ইসলাম
স্ত্রীর উপার্জন
কোন কোন পরিবারের স্ত্রীগণ একাই পরিবারের হাল ধরে রেখেছেন বৈধ উপার্জনের মাধ্যমে। যদিও স্বামীর ঘরে অর্থ যোগান দানে কোন স্ত্রী (ইসলামী আইন মতে) বাধ্য নয়।
তথাপি তাদের এই উদারতা, সহমর্মিতা- স্বামী, সন্তান ও পরিবারের প্রতি ভালবাসার অপূর্ব দৃষ্টান্ত এবং আল্লাহর তরফ থেকে প্রতিদান প্রাপ্য।
ইবনে মাসউদ (রা) এর স্ত্রীর কর্ম
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা)-এর স্ত্রী ঘরে বসে শিল্প কর্ম করে তা বিক্রি করে সংসারের খরচাদি চালাতেন।
একদিন তিনি রাসূল (সা)-এর খিদমতে হাজির হয়ে বললেন, আমি শিল্প কর্মে দক্ষ একজন নারী। আমি বিভিন্ন দ্রব্যসামগ্রী তৈরি করে বিক্রি করি।
আমার স্বামী ও সন্তানদের (আয়ের কোন উৎস) কিছুই নেই। সুতরাং আমি কি তাদের জন্য ব্যয় করতে পারি?
নবী (সা) বললেন, হ্যাঁ তুমি তাদের জন্য ব্যয় করতে পার। এজন্য তুমি আল্লাহর তরফ থেকে পুরস্কার লাভ করবে।- তাবাকাতে ইবনে সাদ
পরিবার পরিজনের জন্য যা ব্যয় করা হয়
পরিবার-পরিজনের জন্য যা ব্যয় করা হয় তার সওয়াব হয় সবচেয়ে বেশি। রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেছেন- দীনার (টাকা-পয়সা অর্থে) চার প্রকার-
১. কিছু দীনার তুমি আল্লাহর পথে খরচ কর। ২. কিছু দীনার মিসকীনদের দান কর। ৩. কিছু দীনার গোলাম মুক্ত করার ক্ষেত্রে দান কর। ৪. কিছু দীনার পরিবার-পরিজনের জন্য খরচ কর।
তবে পরিবার-পরিজনের জন্য যে দীনার ব্যয় করবে, তার সওয়াব অনেক বেশি।- সহিহ মুসলিম
অর্থনৈতিক কল্যাণ
যারা মনে করে বিবাহ-শাদী, পরিবার-পরিজন ও সন্তান-সন্ততি, অভাব-অনটন, সমস্যা-সংকট ও দুর্ভাগ্যের অন্যতম কারণ, তাদের এই ভ্রান্ত ধারণা কুরআন ও হাদীসে বিবাহের উৎসাহ ও ফযীলতের বর্ণনার দ্বারা অপনোদন হয়ে যায়।
বিবাহের প্রতি আল্লাহর উৎসাহ প্রদান
আল্লাহ তা’আলা কুরআনুল কারীমে ইরশাদ করেন-
وَ اَنۡكِحُوا الۡاَیَامٰی مِنۡكُمۡ وَ الصّٰلِحِیۡنَ مِنۡ عِبَادِكُمۡ وَ اِمَآئِكُمۡ ؕ اِنۡ یَّكُوۡنُوۡا فُقَرَآءَ یُغۡنِهِمُ اللّٰهُ مِنۡ فَضۡلِهٖ ؕ وَ اللّٰهُ وَاسِعٌ عَلِیۡمٌ
তোমাদের মধ্যে যারা বিবাহহীন, তাদের বিবাহ সম্পাদন করে দাও এবং তোমাদের দাস ও দাসীদের মধ্যে যারা সৎকর্মপরায়ণ তাদেরও, তারা যদি নিঃস্ব হয়, তবে আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে তাদেরকে সচ্ছল করে দেবেন। আল্লাহ প্রাচুর্যময়, সর্বজ্ঞ।- সূরা নূর ৩২
আয়াতের ব্যাখ্যা
উল্লিখিত আয়াতে বিবাহহীন বলতে কুমার-কুমারী, বিধবা-বিপত্নীক, বিবাহ বিচ্ছেদ হয়েছে এমন নারী-পুরুষ যাদের বিবাহ বর্তমান নেই, এমন সবাইকে বোঝানো হয়েছে।
এমন নর ও নারীর বিবাহ সম্পাদনের জন্যে তাদের অভিভাবকদের আদেশ করা হয়েছে।
সাথে সাথে এ কথাও বলা হয়েছে যে, তারা যদি নিঃস্ব হয় তবে আল্লাহ স্বীয় অপার করুণায় তাদেরকে ধনাঢ্যতা দান করবেন।
সুতরাং দরিদ্র হওয়ার কারণে তাদের বিবাহ সম্পাদনে যেন প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা না হয়।- মা’আরেফুল কুরআন
আস সাবুনীর উক্তি
‘তারা যদি নিঃস্ব হয় …।’ এ আয়াত প্রসঙ্গে মুহাম্মদ আলী আস-সাবুনী বলেন,
আমি মনে করি এ আয়াতের বক্তব্যের উদ্দেশ্য হলো কোন মেয়ের অভিভাবক এর নিকট যদি মেয়ের বিবাহের ব্যাপারে একজন সচ্চরিত্রবান,
নেক আখলাক যুবক প্রস্তাব দেয়, তবে শুধুমাত্র দারিদ্র্যের কারণে তার প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যান করা তাদের উচিত হবে না।
ধন-সম্পদ ক্ষণস্থায়ী
কেননা ধন-সম্পদ নিতান্তই ক্ষণস্থায়ী বস্তু। আল্লাহ তা’আলা স্বীয় অনুগ্রহে যাকে ইচ্ছা ধনাঢ্যতা দান করতে পারেন।
এমনিভাবে শুধুমাত্র অধিক ধন-সম্পদ কিংবা সচ্ছলতার অপেক্ষায় কোন যুবকের বিবাহে বিলম্ব করা উচিত নয়; বরং স্বাবলম্বী হলেও আল্লাহ তা’আলার ওপর ভরসা করে দ্রুত বিবাহ করা উচিত, কেননা বিবাহ মানুষের কল্যাণের কারণ হয়।- রওইয়ায়ে উল বায়ান
বিবাহ রিযিক আনয়ন করে
বিবাহ মানব জীবনে বহুবিধ উপকারিতা ও কল্যাণ নিয়ে আসে, তার মধ্যে সচ্ছলতা একটি। এ জন্যই রাসূল (সা)-এর নিকট এক ব্যক্তি তার অভাব-অনটন ও দারিদ্র্যের অভিযোগ পেশ করলে তিনি তাকে বিবাহ করার পরামর্শ দেন।- রুহুল মা’আনী
বিশিষ্ট সাহাবী হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা) বলেন, তোমরা যদি ধনী হতে চাও তবে বিবাহ কর, কেননা আল্লাহ তা’আলা বলেছেন, তারা যদি নিঃস্ব হয় তবে আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে তাদেরকে সচ্ছল করে দেবেন।- ইবনে কাসীর
আন্তরিক নিয়ত
তবে বিবাহের মাধ্যমে এ বরকত লাভ করার জন্য আন্তরিক নিয়ত থাকা শর্ত। তাফসীরে মা’আরিফুল কুরআনে তাফসীরে মাযহারীর বরাতে বলা হয়েছে,
স্মর্তব্য যে, বিবাহ করার কারণে আল্লাহ তা’আলার পক্ষ থেকে ধনাঢ্যতা দান করার ওয়াদা তখন, যখন পবিত্রতা সংরক্ষণ ও সুন্নত পালনের নিয়তে বিবাহ করা হয়; অতঃপর আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল ও ভরসা করা হয়।
বিভ্রান্তির অপনোদন : প্রসঙ্গ যৌতুক
বিবাহের বরকতে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ধন-সম্পদ দানের ওয়াদা করেছেন।
এখন কোন ব্যক্তি যদি বিবাহের সময় পণ (যৌতুক) নির্ধারণকরত এ ধন-সম্পদ লাভ করার চেষ্টা করেন, আর মনে করেন এটাই আল্লাহর ওয়াদা, তবে তা হবে আল্লাহর বাণীর বিকৃত সাধনের নামান্তর।
যৌতুক গ্রহণ অবৈধ
যৌতুক গ্রহণ ইসলামের দৃষ্টিতে অবৈধ এবং তা পাত্রপক্ষের আত্মমর্যাদার পরিপন্থী চিন্তা। তবে উপহার বিনিময় বৈধ।
আর তা বিবাহের সময়ই হতে হবে এমন কোন বাধ্য-বাধকতা নেই বরং তা সাধারণ ও সবার জন্য উন্মুক্ত।
উপহার আদান প্রদান
হাদীস শরীফের ভাষা অনুযায়ী উপহার বিনিময়ে হিংসা-বিদ্বেষ, শত্রুতা দূর করে হৃদয়ে পরস্পর পরস্পরের প্রতি ভালোবাসা সৃষ্টি করে দেয়।
তাই কোন দাবী-দাওয়া ব্যতীত যদি কোন উপহার-উপঢৌকন দেওয়া হয় তবে তা গ্রহণে বাধা নেই। এক্ষেত্রে শর্ত হল, কোন ভাবেই না চাওয়া কিংবা তা পাওয়ার জন্যে মনে মনে আকাঙ্ক্ষা পোষণ না করা।
যেমন রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেন, কোন তদবীর তদারকী ছাড়া আপনা থেকে তোমার কাছে যা আসে তা নাও। তা না হলে তার পেছনে মনকে লাগিয়ে রেখো না।
পাত্রীর অগ্রাধিকার
তবে উপহার উপঢৌকন পাওয়ার ব্যাপারে পাত্রীই অগ্রাধিকারযোগ্য। হযরত আয়েশা (রা) থেকে বর্ণিত হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেন,
স্ত্রীর যৌনাঙ্গের (সঙ্গমের) বিনিময়ে যে মহর প্রদান করা হয় তা তার প্রাপ্য। আর বিবাহের আকদ (বিবাহ-বন্ধন) সম্পন্ন হওয়ার পর স্ত্রীর পিতা, ভাই কিংবা অভিভাবক সম্মান স্বরূপ যা দিয়ে থাকেন তা (বর বা কনে) যাকে দেওয়া হয় সেটা তার প্রাপ্য।
সবচেয়ে অগ্রাধিকার বিষয় হলো ব্যক্তি (অভিভাবক) তার মেয়ে বা ভগ্নিকে সম্মানিত করবে।- মুসনাদে আহমাদ
স্বামী-স্ত্রীর মহব্বত ও বন্ধুত্ব
বিবাহ আজীবনের প্রীতি বন্ধন, সাময়িক প্রেম নিবেদন নয়। প্রেমের আদান-প্রদান মানুষের স্বভাবজাত বিষয়। ভালবাসার জন্য স্বামী-স্ত্রীর চেয়ে অধিক উপযোগী আর কেউ নেই।
তাই স্বভাবধর্ম ইসলাম বিবাহের মাধ্যমে এ স্বভাবজাত বিষয়ের আদান-প্রদানের ব্যবস্থা করেছে, যা সব ধরনের পঙ্কিলতা থেকে মুক্ত এবং কল্যাণকর।
বিবাহের পর স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে পরস্পর পরস্পরের প্রতি সহানুভূতি, সহমর্মিতা ও প্রগাঢ় ভালবাসা জন্ম নেয়। আর তা হয় আল্লাহর পক্ষ থেকে।
আল্লাহর নিদর্শন
আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেন,
وَ مِنۡ اٰیٰتِهٖۤ اَنۡ خَلَقَ لَكُمۡ مِّنۡ اَنۡفُسِكُمۡ اَزۡوَاجًا لِّتَسۡكُنُوۡۤا اِلَیۡهَا وَ جَعَلَ بَیۡنَكُمۡ مَّوَدَّۃً وَّ رَحۡمَۃً ؕ اِنَّ فِیۡ ذٰلِكَ لَاٰیٰتٍ لِّقَوۡمٍ یَّتَفَكَّرُوۡنَ
(আল্লাহর নিদর্শনাবলীর মধ্যে) আর এক নিদর্শন এই যে, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য থেকে তোমাদের সঙ্গিনীদের সৃষ্টি করেছেন। নিশ্চয় এতে চিন্তাশীল লোকদের জন্য নিদর্শনাবলী রয়েছে।- সূরা রূম ২১
আর আল্লাহ প্রদত্ত এ ভালবাসার অন্যতম উপকারিতা এই যে, স্বামী-স্ত্রীর কারো মনে যদি অন্য কারো প্রতি বিবাহপূর্ব প্রণয়াসক্তি থেকে থাকে তবে তা দূর হয়ে যায়।
এ প্রসঙ্গে একটি প্রচলিত আরবী প্রবাদ হলো, (অনুবাদ) বিবাহ- পূর্ব প্রেমের ভিত্তি ধসিয়ে দেয়।
স্বামী স্ত্রীর পারস্পরিক মহব্বত
স্বামী-স্ত্রী পরস্পর যখন পরস্পরের প্রতি প্রেমপূর্ণ দৃষ্টিপাত করে, তখন তাদের প্রতি মহান আল্লাহ বিশেষ রহমতের দৃষ্টি দেন।
হাদীস শরীফে আছে, স্বামী-স্ত্রী পরস্পর যে প্রেমালাপ, হাসি-ঠাট্টা ও বৈধ ভোগ-উপভোগ করে তার জন্যও সওয়াব প্রাপ্ত হন। যা নফল ইবাদতের চেয়েও কম নয়।
দাম্পত্য সম্পর্ক সাদকা
আবু যার (রা) বর্ণিত হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেন- তোমাদের স্বামী-স্ত্রীর দাম্পত্য সম্পর্কও সাদকাস্বরুপ। সাহাবীগণ বললেন, তার যৌনমিলনও কি সাদকাস্বরূপ?
তিনি (সা) বলেন, যদি সে হারাম পথে তা চরিতার্থ করতো তবে কি তা তার জন্য পাপ হতো না? অনুরূপ সে তা হালালভাবে চরিতার্থ করলে তার জন্য সওয়াব রয়েছে।- আদাবুল মুফরাদ ২২৬
স্বামী স্ত্রীর বন্ধুত্ব
একজন আদর্শ স্বামী বা স্ত্রীকে নির্দ্বিধায় একে অপরের খাঁটি বন্ধু বলা যায়। হযরত আলী (রা) খাঁটি বা প্রকৃত বন্ধুর পরিচয় দিয়েছেন এভাবে
সে-ই তোমার প্রকৃত বন্ধু, সর্বদা যে তোমাকে ছায়ার ন্যায় অনুসরণ করে এবখ তার নিজের ক্ষতির বিনিময়ে তোমার উপকার করে থাকে। আর যখন তোমাকে বিপদ-আপদসমূহ ছিন্নভিন্ন করে ফেলে, তখন সে তোমাকে একত্রিত করার জন্য নিজেই টুকরো টুকরো হয়ে যায়।- আল মুরশিদুল আমীন
বলা বাহুল্য যে, আদর্শ স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে এ রকম খাঁটি বন্ধুত্ব পরিলক্ষিত হয়, যারা পরস্পর পরস্পরের জন্য সর্বদাই নিবেদিত প্রাণ।
বন্ধুত্বের দাবী
প্রকৃত বন্ধুত্বের দাবী হল বন্ধুকে মন্দ বিষয়সমূহ থেকে ফিরিয়ে রাখা এবং ভাল বিষয়ের দিকে উদ্বুদ্ধ করা ও ভাল কাজে সাহায্য সহযোগিতা করা।
আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেন,
تَعَاوَنُوۡا عَلَی الۡبِرِّ وَ التَّقۡوٰی ۪ وَ لَا تَعَاوَنُوۡا عَلَی الۡاِثۡمِ وَ الۡعُدۡوَانِ
সৎকর্ম ও খোদাভীতিতে (তোমরা) একে অন্যের সাহায্য কর। পাপ ও সীমালঙ্ঘনের ব্যাপারে একে অন্যের সহায়তা করো না।
রহমতের বারিধারা
স্বামী-স্ত্রী যখন পরস্পর পরস্পরকে সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজে নিষেধ করেন, তখন তাদের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহ ও রহমতের বারিধারা বর্ষিত হয়।
আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেন,
وَ الۡمُؤۡمِنُوۡنَ وَ الۡمُؤۡمِنٰتُ بَعۡضُهُمۡ اَوۡلِیَآءُ بَعۡضٍ ۘ یَاۡمُرُوۡنَ بِالۡمَعۡرُوۡفِ وَ یَنۡهَوۡنَ عَنِ الۡمُنۡكَرِ وَ یُقِیۡمُوۡنَ الصَّلٰوۃَ وَ یُؤۡتُوۡنَ الزَّكٰوۃَ وَ یُطِیۡعُوۡنَ اللّٰهَ وَ رَسُوۡلَهٗ ؕ اُولٰٓئِكَ سَیَرۡحَمُهُمُ اللّٰهُ ؕ اِنَّ اللّٰهَ عَزِیۡزٌ حَكِیۡمٌ
ঈমানদার পুরুষ ও ঈমানদার নারী একে অপরের সহায়ক (বন্ধু), তারা (পরস্পরকে) ভাল কথার শিক্ষা দেয় এবং মন্দ (মন্দ) থেকে বিরত রাখে।
নামায প্রতিষ্ঠা করে, যাকাত দেয় এবং আল্লাহ ও রাসুলের নির্দেশ অনুযায়ী জীবন যাপন করে। এদেরই উপর আল্লাহ তা’আলা দয়া করবেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ পরাক্রমশালী, সুকৌশলী।- সূরা তওবা ৭১
আল্লাহ ঐ ব্যক্তির উপর রহমত বর্ষণ করেন
রাসূল (সা) এরশাদ করেন, আল্লাহ ঐ ব্যক্তির উপর রহমত বর্ষণ করেন, যে রাতে ঘুম থেকে উঠে নামায পড়ে এবং স্ত্রীকে ঘুম থেকে জাগ্রত করে। যদি সে উঠতে না চায় তাহলে তার চেহারায় পানি ছিটা দেয়।
আল্লাহ ঐ মহিলার উপর রহমত বর্ষণ করেন, যে রাতে ঘুম থেকে উঠে নামায পড়ে এবং স্বামীকে ঘুম থেকে জাগায়। যদি সে উঠতে না চায় তাহলে তার চেহারায় পানি ছিটা দেয়।- আবু দাউদ
সন্তান-সন্ততি
সব স্বামী-স্ত্রী চায় যে তাদের কোল আলো করে একটি সন্তান আগমন করুক। স্বামী-স্ত্রীর পরস্পরের গভীর ভালবাসার আদর্শ ফসল হয়ে উঠুক সন্তান। হৃদয় ও চোখ জুড়িয়ে যাক সন্তানের দর্শনে।
চোখের শীতলতা
আল কুরআনে বিষয়টি এভাবে ব্যক্ত হয়েছে,
وَ الَّذِیۡنَ یَقُوۡلُوۡنَ رَبَّنَا هَبۡ لَنَا مِنۡ اَزۡوَاجِنَا وَ ذُرِّیّٰتِنَا قُرَّۃَ اَعۡیُنٍ وَّ اجۡعَلۡنَا لِلۡمُتَّقِیۡنَ اِمَامًا
এবং যারা বলে, হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের জন্য এমন স্ত্রী ও সন্তান-সন্ততি দান কর যারা হবে আমাদের জন্য নয়ন প্রীতিকর।- সূরা ফুরকান ৭৪
সন্তান সন্ততিতে কল্যাণ
আল্লাহ তা’আলা সন্তান-সন্ততির মাঝে অনেক কল্যাণ রেখেছেন। এক হাদীসে ইরশাদ হয়েছে,
তোমাদের দুর্বল শ্রেণীর জন্যই আল্লাহর পক্ষ থেকে তোমাদের সাহায্য করা হয় এবং তোমাদের রিযিক দেওয়া হয়।- সুনান নাসাঈ
এতে জানা গেল যে, পরিবার-পরিজনের ভরণ-পোষণকারী পিতা-মাতা যা কিছু পায়, তা দুর্বলচিত্ত নারী ও শিশু সন্তানের ওসীলাতেই পায়।
পিতা মাতার মুক্তির কারণ
পিতা-মাতার জীবদ্দশায় কোন শিশু সন্তানের মৃত্যু হলে, কিয়ামতের দিন সে সন্তান পিতা-মাতার মুক্তির কারণ হবে।
আবার পিতা-মাতার মৃত্যুর পর যখন আমলনামা বন্ধ হয়ে যায়, তখন সন্তানের দোয়া ও নেক আমলের সওয়াব তারা পেতে থাকে। যার মাধ্যমে তাদের অশেষ কল্যাণ লাভ হয়।
এছাড়া দৈনন্দিন কাজ-কর্মে, সুখে-দুঃখে, অসুখে-বিসুখে, সমস্যা-সংকটেও সন্ততি পিতা-মাতাকে সাহায্য-সহযোগিতা করে থাকে।
সন্তান হওয়া না হওয়া আল্লাহর ইচ্ছায়
অবশ্য কারো সন্তান হওয়া না হওয়া আল্লাহর ইচ্ছার উপর নির্ভর করে।
یَخۡلُقُ مَا یَشَآءُ ؕیَهَبُ لِمَنۡ یَّشَآءُ اِنَاثًا وَّ یَهَبُ لِمَنۡ یَّشَآءُ الذُّكُوۡرَ اَوۡ یُزَوِّجُهُمۡ ذُكۡرَانًا وَّ اِنَاثًا ۚ وَ یَجۡعَلُ مَنۡ یَّشَآءُ عَقِیۡمًا ؕ اِنَّهٗ عَلِیۡمٌ قَدِیۡرٌ
আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেন, তিনি যাকে ইচ্ছা কন্যা সন্তান দান করেন এবং যাকে ইচ্ছা পুত্র সন্তান দান করেন অথবা দান করেন পুত্র ও কন্যা উভয়ই এবং যাকে ইচ্ছা করে দেন বন্ধ্যা। তিনি সর্বজ্ঞ, সর্বশক্তিমান।- সূরা শূরা ৪৯-৫০
সন্তান আল্লাহর নিআমত
সন্তান-সন্ততি আল্লাহর দেওয়া বিরাট বড় নিয়ামত। আর তাই সন্তান-সন্ততিকে কুরআন ও সুন্নাহর আদর্শে গড়ে তোলা প্রত্যেক পিতা-মাতার অপরিহার্য দায়িত্ব, যেন সন্তান-সন্ততি উভয় জগতেই কল্যাণ বয়ে আনে।
সন্তান ছেলে হোক কি মেয়ে, ইসলামের দৃষ্টিতে মানুষ হিসেবে নারী-পুরুষের কোন ভেদাভেদ নেই। ইসলাম নারীকে খাটো করে পুরুষকে প্রাধান্য দেয় নি। বরং নারী ও পুরুষের ন্যায্য অধিকার সুপ্রতিষ্ঠিত করেছে।
কন্যা সন্তানের প্রতি মমতা
পিতা-মাতা সন্তান-সন্ততিকে নিজেদের সাধ্যমত ভালভাবে প্রতিপালন করলে তার জন্য উত্তম প্রতিদান পাবে। বিশেষত কন্যা সন্তানকে।
হযরত আনাস ইবনে মালিক (রা) থেকে বর্ণিত হাদীসে রাসূল (সা) ইরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি বাজার থেকে তার ছেলে সন্তানের জন্য নতুন সুস্বাদু কোন খাবার কিনে নিয়ে গেল, সে যেন সবকার কোন জিনিস নিয়ে দান করল (অর্থাৎ সদকার সওয়াব পেল)।
প্রথমে কন্যাদের খাওয়ানো উচিত। কারণ আল্লাহ তা’আলা কন্যাদের প্রতি নরম আচরণ করেন। যে ব্যক্তি কন্যাদের সাথে নরম আচরণ করল, সে যেন আল্লাহর ভয়ে কাঁদল।
আর যে আল্লাহর ভয়ে কাঁদবে আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দিবেন। যে কন্যাদের আনন্দিত করবে, আল্লাহ তাকে দুঃখের দিনে আনন্দিত করবেন।- তাম্বীহুল গাফেলীন
গোনাহ থেকে নিরাপত্তা
বিবাহের সাহায্যে মানুষ নিজের দীন-ঈমানকে হেফাজত এবং শয়তানের প্রধান অস্ত্র কাম প্রবৃত্তির উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারে।
দীনের অর্ধেক
রাসূল (সা) ইরশাদ করেন, যখন বান্দা বিয়ে করল নিশ্চয় সে তার দীনের অর্ধেক পূর্ণ করল। (এখন থেকে) বাকী অর্ধেক সম্পর্কে আল্লাহকে ভয় করবে।- বায়হাকী
একে অপরের পোষাক
আল্লাহ তা’আলা কুরআনুল কারীমে স্বামী-স্ত্রীকে এক অপরের পোশাক বলে উল্লেখ করেছেন।
অর্থাৎ পোশাক-পরিচ্ছদের মাধ্যমে যেমন অপরের দৃষ্টি থেকে নিজের সতর রক্ষা করা হয়। তেমনি স্বামী-স্ত্রীও পরস্পরের মাধ্যমে নিজেদেরকে অবৈধ ও গোনাহের কাজ থেকে বিরত রাখতে সক্ষম হয়।
অবিবাহিত ব্যক্তি দৃষ্টি নিয়ন্ত্রণে হিমশিম খায়
যে ব্যক্তি বিবাহ করেনি সে নিজেকে অপকর্ম হতে রক্ষা করতে পারলেও অধিকাংশ সময় নিজের চোখকে কূদৃষ্টি থেকে এবং অন্তরকে বাজে চিন্তা থেকে রক্ষা করতে পারে না।
আর এ থেকে বেঁচে থাকাও বিশেষ জরুরী। কারণ ব্যভিচার কেবল যৌনাঙ্গের সাথেই সংশ্লিষ্ট নয়, বরং যৌনাঙ্গ ছাড়াও কুদৃষ্টি ও অন্যান্য তৎপরতার সাথেও এর সম্পর্ক রয়েছে।
এক্ষেত্রে দৃষ্টিপাতই প্রথম ও প্রধান ভূমিকা পালন করে। ফিকাহ শাস্ত্রের বিধান মতে হারাম কাজের ভূমিকাও হারাম। সুতরাং চোখের হিফাযত করা অত্যন্ত জরুরী।
দৃষ্টি হিফাযতের নির্দেশ
আল্লাহ তা’আলা নারী-পুরুষ উভয়কেই তাদের দৃষ্টিকে সংযত করার নির্দেশ দিয়ে বলেন,
قُلۡ لِّلۡمُؤۡمِنِیۡنَ یَغُضُّوۡا مِنۡ اَبۡصَارِهِمۡ وَ یَحۡفَظُوۡا فُرُوۡجَهُمۡ ؕ ذٰلِكَ اَزۡكٰی لَهُمۡ ؕ اِنَّ اللّٰهَ خَبِیۡرٌۢ بِمَا یَصۡنَعُوۡنَ
وَ قُلۡ لِّلۡمُؤۡمِنٰتِ یَغۡضُضۡنَ مِنۡ اَبۡصَارِهِنَّ وَ یَحۡفَظۡنَ فُرُوۡجَهُنَّ وَ لَا یُبۡدِیۡنَ زِیۡنَتَهُنَّ اِلَّا مَا ظَهَرَ مِنۡهَا وَ لۡیَضۡرِبۡنَ بِخُمُرِهِنَّ عَلٰی جُیُوۡبِهِنَّ
মুমিনদেরকে বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি নত রাখে এবং তাদের যৌনাঙ্গের হিফাযত করে, এতে তাদের জন্য খুব পবিত্রতা আছে। নিশ্চয় তারা যা করে আল্লাহ তা অবহিত আছেন।
ঈমানদার নারীদেরকে বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে নত রাখে এবং তাদের যৌন অঙ্গের হিফাযত করে, তারা যেন যা সাধারণত প্রকাশমান তা ছাড়া তাদের সৌন্দর্য প্রদর্শন না করে এবং তারা যেন তাদের মাথার ওড়না বক্ষদেশে (ঢেকে) রাখে।- সূরা নূর ৩০-৩১
দৃষ্টিপাত সকল ফিতনা উৎস
আর চোখের হিফাযত করতে পারলেই মনের হিফাযত করা সহজ হয়ে যায়। কারণ দৃষ্টিপাত এমন একটি বিষয়, যা বিভিন্ন অনাকাঙ্ক্ষিত কাজে প্রেরণা ও উৎসাহ যোগায়।
ইমাম গাযালী (রহ) বলেন- দৃষ্টিপাতই সকল ফিতনা ও দুর্দশার উৎস।
সুদৃঢ় ইমান
যারা নিজেদের দৃষ্টিকে সংযত রাখবে, তাদেরকে আল্লাহ তা’আলা সুদৃঢ় ঈমান দান করবেন, রাসুলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেন,
আল্লাহ তা’আলা বলেছেন, দৃষ্টিপাত শয়তানের একটি বিষাক্ত শর (তীর)। যে ব্যক্তি মনের চাহিদা সত্ত্বেও দৃষ্টি ফিরিয়ে নেয়।
আমি তার পরিবর্তে তাকে সুদৃঢ় ঈমান দান করব, যার মিষ্টতা সে অন্তরে অনুভব করবে।- তাবরানী
দৃষ্টি সংযম
বিবাহের মাধ্যমে সহজেই দৃষ্টিকে সংযত ও লজ্জাস্থানকে হিফাযত করা যায় এবং এর ফলে অন্তরও হয় নির্মল ও পবিত্র এবং সুদৃঢ় ঈমানের অধিকারী।
রাসূল (সা) ইরশাদ করেন, হে যুব সম্প্রদায়! তোমাদের মধ্যে যারাই স্ত্রীর অধিকার আদায়ে সামর্থ্য রাখো তারা অবশ্যই বিয়ে করবে।
কেননা এর মাধ্যমে দৃষ্টিকে সংযত ও লজ্জাস্থানকে হিফাযত করা যায়।- সহিহ বুখারি
সুন্নতের অনুসরণ ও আল্লাহর সন্তুষ্টি
বিবাহের মাধ্যমে রাসূল (সা)-এর সুন্নতের অনুসরণ করা হয়। রাসূল (সা) ইরশাদ করেছেন,
যে ব্যক্তি আমার স্বভাব পছন্দ করে সে যেন আমার সুন্নত ধারণ করে, আর আমার একটি সুন্নত হলো বিবাহ।- আহকামুল-কুরআন
তাকওয়া
বিবাহের মাধ্যমে মানুষ নিজের স্বভাব-চরিত্রকে সংশোধন ও নিজেকে অনেক গুনাহ থেকে বিরত রাখতে সক্ষম হয়, ফলে তাকওয়া অর্জন হয় সহজসাধ্য।
আর মুত্তাকীদের জন্য রয়েছে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও উত্তম প্রতিদান। আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেন,
لِلَّذِیۡنَ اتَّقَوۡا عِنۡدَ رَبِّهِمۡ جَنّٰتٌ تَجۡرِیۡ مِنۡ تَحۡتِهَا الۡاَنۡهٰرُ خٰلِدِیۡنَ فِیۡهَا وَ اَزۡوَاجٌ مُّطَهَّرَۃٌ وَّ رِضۡوَانٌ مِّنَ اللّٰهِ ؕ
যারা পরহেযগার (মুত্তাকী), আল্লাহর নিকট তাদের জন্য রয়েছে বেহেশত, যার তলদেশে প্রস্রবণ প্রবাহিত, তারা সেখানে থাকবে অনন্তকাল। আর রয়েছে পরিচ্ছন্ন সঙ্গিনীগণ এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি।- সূরা আলে ইমরান ১৫
জরুরী জ্ঞাতব্য
উপরে বিবাহের যে উপকারী দিকগুলো তুলে ধরা হলো, তার অর্থ এই নয় যে,
এ আলোচনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে ও বিবাহের উপকারী দিকের প্রতি লক্ষ্য করে কোন ব্যক্তি তার ব্যক্তিগত ও পারিবারিক অবস্থা, পরিবেশের চাহিদা,
উপার্জন ক্ষমতা ইত্যাদি জরুরী বিষয়গুলোর প্রতি দৃষ্টি না দিয়েই বিবাহের জন্য প্রস্তুত হয়ে যাবে, তবে তা হবে সুস্পষ্ট বিভ্রান্তি ও নির্বুদ্ধিতার কাজ।
বিবাহের সামর্থ্য
বিবাহের জন্য প্রয়োজনীয় সামর্থ্য থাকা অপরিহার্য। যারা বিবাহে সামর্থ্য রাখে না তাদেরকে আল্লাহ তা’আলা পবিত্রতা ও ধৈর্য সহকারে অপেক্ষা করার নির্দেশ দিয়ে বলেন,
وَ لۡیَسۡتَعۡفِفِ الَّذِیۡنَ لَا یَجِدُوۡنَ نِكَاحًا حَتّٰی یُغۡنِیَهُمُ اللّٰهُ مِنۡ فَضۡلِهٖ ؕ
যারা বিবাহে সমর্থ নয় তারা যেন সংযম অবলম্বন করে যে পর্যন্ত না আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে তাদেরকে অভাবমুক্ত করে দেন।- সূরা নূর ৩৩
এ ব্যাপারে হাদীস শরীফে রোযা রাখার উপদেশ দেওয়া হয়েছে। রাসুল ইরশাদ করেন যে যুবক বিয়ে করতে অসমর্থ্য হবে তার রোজা রাখা উচিত কেননা এ রোযাই তার ঢালস্বরূপ হবে।- সহি বুখারী
রাসূল (সা) ইরশাদ করেন, আর যে যুবক বিয়ে করতে অসমর্থ হবে, তার রোযা রাখা উচিত, কেননা এ রোযাই তার ঢালস্বরূপ হবে।- সহিহ বুখারী
বিবিধ
বিবাহের হুকুম
এ পর্যায়ে বিবাহের হুকুম (ফরয-ওয়াজিব নির্ধারণ) তুলে ধরাটা প্রাসঙ্গিক হবে। ফলে একজন ব্যক্তি তার অবস্থা সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা লাভ করতে পারবে। নিম্নে বিবাহের হুকুম তুলে ধরা হলো :
অবস্থা ভেদে বিবাহের হুকুম বিভিন্ন হয়ে থাকে, কোন কোন অবস্থায় সুন্নাত, কখনও ফরয বা ওয়াজিব আবার কখনও বা তা মাকরূহ ও হারাম হয়ে থাকে।
সুন্নাত: স্বাভাবিক অবস্থায় বিবাহ করা সুন্নাত। অর্থাৎ কোন পুরুষ যখন মহর আদায়ে ও স্ত্রীর ভরণ-পোষণ খরচ নির্বাহে সক্ষম এবং যৌন মিলনে সমর্থবান হয় তখন তার জন্য বিবাহ করা সুন্নাতে মুয়াক্কাদা।
ওয়াজিব ও ফরয: যৌন আবেগ যখন প্রবল হয়ে ওঠে তখন বিবাহ করা ওয়াজিব আর দুর্দমনীয় যৌনবেগের কারণে যিনা-ব্যভিচারে লিপ্ত হওয়ার উপক্রম হলে তখন বিবাহ করা ফরয। তবে উভয় অবস্থায়ই তাকে মহর আদায় ও স্ত্রীর খোরপোষ দানে সক্ষম হতে হবে।
মাকরূহ ও হারাম: স্ত্রীর প্রতি জুলুমের আশঙ্কা দেখা দিলে অর্থাৎ তার বৈবাহিক অধিকারসমূহ পূরণে অসমর্থ হলে বিবাহ করা মাকরূহে তাহরীম আর আশঙ্কা নিশ্চিত হলে সেক্ষেত্রে বিবাহ করা হারাম।- শামী
বিবাহের নিয়ত
প্রত্যেক নেক কাজের জন্য এবং নেক কাজের সুফল লাভের জন্য বিশুদ্ধ নিয়ত থাকাটা অত্যাবশ্যক। রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেছেন,
নিশ্চয় আমলের প্রতিদান নিয়ত অনুযায়ী হয়। আর মানুষ যেমন নিয়ত করে তেমন প্রতিদানই সে পায়।-বুখারী, মুসলিম
আর বিবাহ তো একটি ইবাদত। সুতরাং বিবাহের জন্য বিশুদ্ধ নিয়ত করে নেওয়া প্রয়োজন। তবেই বিবাহের প্রভূত উপকারিতা ও কল্যাণগুলোর সুফল পুরোপুরি লাভ করা যাবে।
যে নিয়তে বিবাহ করা উচিত
বিবাহ- সংযত স্বভাব, পরহেযগারী, সুন্নাত পালন, মনোদৈহিক সুস্থতা, স্বাস্থ্য ও বংশধারা রক্ষার উদ্দেশ্যে করা উচিত। শুধুমাত্র যৌন চাহিদা পূর্ণ করাই উদ্দেশ্য হওয়া অনুচিত।- খুতবাতে হাকীমুল উম্মত
দীনদারী
ইসলামী শরীআহ পাত্র-পাত্রী নির্বাচনে যে বিষয়টিকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে, তা হল দীনদারী। দীনদার পাত্র নির্বাচন প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেন,
যদি তোমাদের কাছে এমন লোক (বিবাহের প্রস্তাব) নিয়ে আসে যার চরিত্র ও দীনদারী তোমার পছন্দনীয়, তাহলে তার কাছে মেয়ে বিয়ে দাও। তা না হলে পার্থিব জীবনে বড়ই ফিতনা ফাসাদের শিকার হবে।- তিরমিযী
দীনদার পাত্রী
অপরদিকে দীনদার পাত্রি নির্বাচন প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেন, নারীকে বিয়ে করা হয় (সাধারণত) চারটি কারণে-
(১) ধন-সম্পদ, (২) বংশ মর্যাদা, (৩) সৌন্দর্য, (৪) দীন। সুতরাং তোমরা দীনদার নারী লাভ করতে চেষ্টা করবে। অন্য কিছু চাইলে তুমি ধ্বংস হও।- বুখারী, মুসলিম
যে অন্য নিয়তে বিবাহ করে
দীনদারী ব্যতীত অপরাপর অন্যান্য বিষয়কে প্রাধান্য দেওয়ার অপকারিতা প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেন, যে পুরুষ শুধু সম্মানিতা দেখে বিয়ে করবে, তার জন্য শুধু অপমান ছাড়া আর কিছুই বৃদ্ধি পাবে না।
যে শুধু সম্পদ দেখে কোন বিত্তশালী পরিবারের মেয়ে বিয়ে করে, দারিদ্র ছাড়া তার আর কিছুই বৃদ্ধি পাবে না। যে সুনাম ও খ্যাতির লক্ষ্যে অভিজাত খান্দানের কোন মহিলাকে বিয়ে করবে তার ইজ্জত ও সুনাম হ্রাস পাওয়া ছাড়া আর কিছুই হবে না।
আর যে ব্যক্তি শুধু দৃষ্টিকে সংযত রাখতে, চরিত্রকে পাপ-পঙ্কিলতা থেকে মুক্ত ও তার যৌনেন্দ্রিয়কে নিয়ন্ত্রিত এবং আত্মীয়-স্বজনের সাথে ভদ্র ও সৌজন্যমূলক আচরণ ও আন্তরিকতার সম্পর্ক স্থাপনের লক্ষ্যে কোন মহিলাকে বিয়ে করে, আল্লাহ তা’আলা সে মহিলার মধ্যে তার জন্য বরকত বৃদ্ধি করবেন।
তার মধ্যেও মহিলার জন্য বরকত বৃদ্ধি করবেন। (অর্থাৎ এমন ধরণের দাম্পত্য বন্ধন উভয়ের জীবনে কল্যাণ বয়ে আনবে)।-তাবরানী
দীনদারীই বিবেচ্য
সুতরাং বুঝা গেল যে, পাত্র-পাত্রি নির্বাচনে দীনদারীই প্রধান বিবেচ্য বিষয়। কারণ যার ভেতর খোদাভীতি থাকে, সে এত ছোট-খাট ব্যাপারও খেয়াল রাখে যাতে করে এরূপ সন্দেহের অবকাশ থাকে না যে,
সে কারো হক বা অধিকার নষ্ট করবে কিংবা কাউকে কষ্ট দেবে অথবা অন্যের অধিকারের উপর নিজের স্বার্থকে প্রাধান্য দেবে বা কারো অমঙ্গল চাইবে অথবা কাউকে ধোকা দেবে।
যখন স্বামী স্ত্রীর মধ্যে দীনদারী থাকবে
আর যখন স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে দীনদারী থাকবে, তখন তারা নিজেদের দায়িত্ব-কর্তব্যের প্রতি সচেতন থাকবে, যার ফলে বিবাহের কল্যাণ ও বরকত আল্লাহর অনুগ্রহে স্থায়ী রূপ লাভ করবে।
ফলে গোটা দাম্পত্য জীবন, সুখ-শান্তি, স্বাচ্ছন্দ্য, সমৃদ্ধি ও কল্যাণে ভরপুর হয়ে উঠবে।
বিবাহ বর্জনের ওজর ও বিবাহের সম্ভাব্য ক্ষতি
বিভিন্ন হাদীসের মাধ্যমে প্রমাণিত হয় যে, বিবাহিত জীবন যাপন করাই উত্তম। যে ব্যক্তি সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও বিবাহে অনিহা প্রকাশ করে, রাসূলুল্লাহ (সা) তাকে স্বীয় উম্মতের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার অনুমতি দেন নি।
তিনি ইরশাদ করেন, বিবাহ আমার সুন্নত, যে ব্যক্তি এ সুন্নত থেকে বিমুখ হয় সে আমার দলভুক্ত নয়।
বিবাহ বর্জনের ওজর
এখন প্রশ্ন হল, বিবাহের প্রতি এত গুরুত্বারোপের পরও বিবাহ বর্জনের কোন ওজর আছে কি?
এ প্রসঙ্গে তাফসীরে মা’আরিফুল কুরআনে বয়ানুল কুরআনের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছে যে, যদি কারও অন্তরে পরকালের চিন্তা প্রবল হওয়ার কারণে স্ত্রীর প্রয়োজন অনুভূত না হয় এবং স্ত্রী সন্তানদের হক আদায় করার মত অবকাশ না থাকে, তবে তার বিবাহ না করাই উত্তম।
বিবাহের সামর্থ্য থাকা অপরিহার্য
কারণ যেসব হাদীসে বিবাহের ফযীলত বর্ণিত হয়েছে, তাতে এ কথাও বলা হয়েছে, যে ব্যক্তি বিবাহের সামর্থ্য রাখে এবং স্ত্রীর হক আদায় করতে পারে তার পক্ষেই বিবাহ করা উত্তম অন্যথায় নয়।
এমনকি কোন নারী যদি স্বামীর হক আদায় করতে না পারার আশঙ্কা করে এবং কোন বিধবা অথবা তালাকপ্রাপ্তা নারী পুনরায় বিবাহ করাকে সন্তানের জন্য ক্ষতিকর মনে করে, তবে তাও ওজর হিসেবে গণ্য করা হবে।
বিবাহের ক্ষতি
বিবাহের যেমন প্রভূত উপকারিতা রয়েছে তেমনি বিবাহের কারণে ক্ষতির আশঙ্কাও রয়েছে। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ ও আবু হুরায়রা (রা) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেছেন,
এমন এক যুগ আসবে যখন মানুষের ধ্বংস তার স্ত্রী, পিতা-মাতা এবং সন্তানের হাতেই হবে। তারা ঐ ব্যক্তিকে তার দারিদ্র্যতা নিয়ে লজ্জা দিবে এবং এমন কাজের আদেশ করবে যা সে সহ্য করতে না পেরে এমন কাজ করে বসবে, যাতে তার দীন বরবাদ হয়ে সে ধ্বংসপ্রাপ্ত হবে।- ইহয়াউল উলূম
ইমাম গাযালী (রহ) এর উক্তি
এ প্রসঙ্গে ইমাম গাযযালী (র) বলেন, বিবাহের ক্ষতি এই যে, মানুষের আয়-রোযগার হালাল না হওয়ার ভয় রয়েছে, ব্যয় নির্বাহ করতে হিমশিম খাবে এবং পরিবার-পরিজনের সঠিক লালন-পালনে ব্যর্থ হবে, অথচ তা ওয়াজিব।
(তাছাড়া) পরিবারের লোকদের সাথে নরম ব্যবহার করা জরুরী, এ বিষয়ে একমাত্র উন্নত ও চরিত্রবান লোকই সক্ষম হতে পারে।- আল মুরশিদুল আমীন
স্বামী স্ত্রীর দায়িত্ব কর্তব্য
তাছাড়া দাম্পত্য জীবনে স্বামী-স্ত্রীর কিছু দায়িত্ব-কর্তব্যও রয়েছে, যা সঠিকভাবে পালন করা জরুরী। কেননা এর জন্য তাদেরকে আল্লাহর নিকট জবাবদিহি করতে হবে।
রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেছেন, তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেককে তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। পুরুষ তার গৃহের পরিজনদের ওপর দায়িত্বশীল এবং স্ত্রী তার স্বামীর গৃহ ও সন্তানদের ওপর দায়িত্বশীল।
কাজেই তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেকেই তার দায়িত্ব পালন সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে।- বুখারী
বিবাহ বর্জনের শর্ত
সুতরাং কোন নারী-পুরুষ যদি ওজর-আপত্তির কারণে অথবা বিবাহে ক্ষতির আশঙ্কায় বিবাহ থেকে বিরত থাকতে চায়, তবে তার জন্য শর্ত হল, নিজ প্রবৃত্তির ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা। এমনকি চোখের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখাও শর্ত।
যদি কেউ নিজের প্রবৃত্তি ও চোখকে নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম না হয়, তবে তার জন্য বিবাহ করা ওয়াজিব।- আল মুরশিদুল আমীন
উপসংহার
এই প্রবন্ধে বিবাহের প্রভূত উপকারিতা ও কল্যাণ তুলে ধরার পাশাপাশি বিবাহের হুকুম, বিবাহের উপকারিতা ও কল্যাণের স্থায়িত্বের জন্য পাত্র-পাত্রীর দ্বীনদার হওয়া এবং পরিশেষে বিবাহ বর্জনের ওজর ও বিবাহের সম্ভাব্য ক্ষতিও তুলে ধরা হয়েছে।
যেন অবিবাহিত নারী-পুরুষ বিবাহের প্রতি উদ্বুদ্ধ হয় এবং সামগ্রিক অবস্থা বিচার-বিশ্লেষণ করে সঠিক সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারে।
ইসলামে বৈরাগ্যবাদ নেই
ইসলামে বৈরাগ্যবাদ নেই। নবী করীম (সা)-এর সুস্পষ্ট বাণী- ‘লা রাহবানিয়াতা ফিল ইসলাম’। মূলত শরীয়তের বিধান হল বিবাহ করা।
অপর দিকে মানব জীবন সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না, সফলতা ব্যর্থতা ইত্যাদি অনুকূল-প্রতিকূল অবস্থা থেকেও মুক্ত নয়।
মানব জীবনে প্রতিকূল অবস্থার আশঙ্কায় বিবাহের মত এমন কল্যাণকর বিষয় থেকে বিরত থাকা কোন মুসলমানের জন্যই উচিত নয়।
ইউসুফ আল কারযাভীর অভিমত
মিশরের প্রখ্যাত আলিম ও সুবিজ্ঞ ফকীহ আল্লামা ইউসুফ আল কারযাভী বলেন-
অভাব-অনটন, রিযিকের অপর্যাপ্ততা বা দায়িত্ব বোঝা বহনে সাহসীনতার কারণে বিবাহ করা থেকে বিরত থাকা কোন মুসলমানের পক্ষে শোভা পায় না। বরং তার উচিত হল আল্লাহর সাহায্য ও অনুগ্রহ লাভের জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করা।
কেননা যারা নিজেদের চরিত্রের পবিত্রতা রক্ষার উদ্দেশ্যে বিবাহ করবে, আল্লাহ তাদের প্রতি অনুগ্রহ ও সাহায্য-সহযোগিতা করার ওয়াদা করেছেন।
যাকে সহযোগিতা করা আল্লাহর হক
এ প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেছেন, তিন ব্যক্তিকে সহযোগিতা করা আল্লাহর হক (দায়িত্ব);
চারিত্রিক পবিত্রতার জন্য যে ব্যক্তি বিবাহ করে, পরিশোধ করার লক্ষ্য নিয়ে যে দাস অর্থ চুক্তিতে আবদ্ধ হয় এবং আল্লাহর রাহে যে ব্যক্তি জিহাদ করে।- কুরতুবী
মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন সকলের জন্য তাঁর অনুগ্রহ ও কল্যাণের দ্বার উন্মুক্ত করুন।
🔹🔹🔹
👉 আরও পড়ুন পরিবার পরিজনের উপর কৃতকর্মের প্রভাব
