
পরিবার পরিজনের উপর কৃতকর্মের প্রভাব – পরিবার ও পরিজন মানুষের জীবনের সবচেয়ে কাছের সম্পর্কের বন্ধন। একজন ব্যক্তির ভালো-মন্দ আচরণ, তার গুনাহ ও নেক আমল শুধু তার নিজের জীবনেই সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং তা পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের উপরও গভীর প্রভাব ফেলে।
ইসলামের দৃষ্টিতে একজন মুমিনের প্রতিটি কাজ তার পরিবেশ, পরিবার এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য দিকনির্দেশনা হয়ে দাঁড়ায়।
নেক আমল যেমন পরিবারে শান্তি, বরকত ও ভালোবাসা বৃদ্ধি করে, তেমনি গুনাহ ও পাপাচার পারিবারিক অশান্তি, অস্থিরতা এবং আল্লাহর রহমত থেকে দূরে সরে যাওয়ার কারণ হতে পারে।
তাই একজন মানুষের ব্যক্তিগত আমল তার পুরো পরিবারের ভাগ্য গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
📖 দারুস সাআদাত প্রবন্ধ
🖋️ মারূফ আর রুসাফী
👉 আরও পড়ুন – উত্তম চরিত্র বিষয়ক হাদীস সংকলন মাকারিমুল আখলাক, ইমাম তাবরানী (রহ)
পরিবার পরিজনের উপর গুনাহর প্রভাব
গুনাহর কারণে পরিবার-পরিজন ও সন্তান-সন্ততি অবাধ্য হয়ে পড়ে, তাদের নিরাপত্তা ও কল্যাণ বিঘ্নিত হয় এবং ভবিষ্যৎ বংশধরদের ওপরও এর কুপ্রভাব পড়ে।
স্ত্রী সন্তান কখন অবাধ্য হয়?
পূর্ববর্তী কোন কোন বুযুর্গ বলেন, আমার থেকে যখন আল্লাহর নাফরমানী হয়ে যায় তখন আমি আমার স্ত্রী (সন্তান), খাদেম ও আরোহণের জন্তুর মধ্যেও এর প্রভাব অনুভব করি। তারা তখন আমার অবাধ্যতা করতে শুরু করে।- আল জাওয়াবুল কাফী
কথাটির সহজ ব্যাখ্যা
বুযুর্গদের অভিজ্ঞতা ছিল: যখন মানুষ গুনাহ করে (আল্লাহর নাফরমানী করে), তখন তার প্রভাব শুধু তার নিজের উপরই নয়, আশেপাশের জিনিস ও সম্পর্কের উপরও পড়ে।
কীভাবে?
পরিবারে প্রভাব: স্ত্রী বা সন্তান হঠাৎ অবাধ্য হয়ে যায়। সম্পর্কের মধ্যে অশান্তি বাড়ে।
অধীনস্থদের আচরণ: খাদেম/কর্মচারী কথা শোনে না, সম্মান কমে যায়।
দৈনন্দিন কাজে সমস্যা: যাতায়াত, কাজকর্ম, জীবনে বাধা আসে। আগের মতো স্বাচ্ছন্দ্য থাকে না।
আসল শিক্ষা কী?
এই বক্তব্যের মূল কথা হলো: গুনাহ মানুষের জীবন থেকে বরকত কমিয়ে দেয়। আনুগত্য (তাকওয়া) জীবনে শৃঙ্খলা ও শান্তি আনে।
যে যেমন তার সঙ্গীও তেমন
হযরত আনাস (রা) থেকে বর্ণিত হাদীসে নবী কারীম (সা) ইরশাদ করেন- যে ব্যক্তি সম্মান লাভের আশায় কোন মহিলাকে বিয়ে করবে আল্লাহ তাকে অসম্মানিত করবেন।
যে ব্যক্তি সম্পদ লাভের আশায় কোন মহিলাকে বিয়ে করবে আল্লাহ তাকে দারিদ্র দান করবেন। যে ব্যক্তি বংশ মর্যাদা ও কৌলিন্যের জন্য কোন মহিলাকে বিয়ে করবে আল্লাহ তার বংশ মর্যাদা বিনষ্ট করবেন।
আর যে ব্যক্তি কোন মহিলাকে তার দৃষ্টিশক্তি অবনমিত করার এবং গুপ্তাঙ্গ হিফাযত করার উদ্দেশ্যে বিয়ে করবে অথবা তিনি বলেছেন, আত্মীয়তার সম্পর্ক অটুট রাখবে, আল্লাহ তাদের উভয়ের মাঝে বরকত দান করবেন।- আত তারগীব
হাদীসের ব্যাখ্যা
দুনিয়াবি উদ্দেশ্যে বিয়ে করলে: যদি কেউ শুধু সম্মান পাওয়ার জন্য, ধনী হওয়ার জন্য বা বংশ-মর্যাদা বাড়ানোর জন্য বিয়ে করে, তাহলে আল্লাহ সেই উদ্দেশ্যে বরকত দেন না; বরং উল্টো ফলও হতে পারে।
কেন? কারণ নিয়ত (উদ্দেশ্য) ভুল হলে কাজের প্রকৃত কল্যাণ নষ্ট হয়ে যায়।
সঠিক নিয়তে বিয়ে করলে: যদি কেউ বিয়ে করে দৃষ্টি সংযত রাখার জন্য, নিজের পবিত্রতা রক্ষার জন্য এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখার জন্য। তাহলে আল্লাহ সেই দাম্পত্য জীবনে বরকত দান করেন।
শুধু সৌন্দর্য দেখে বিবাহ না করা
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রা) থেকে বর্ণিত হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেন-
তোমরা কেবল মহিলাদের সৌন্দর্য দেখে বিয়ে করবে না, তাহলে অচিরেই তারা তোমাদের ধ্বংসের নিপতিত করবে।
তোমরা মহিলাদের ধন সম্পদের আশায় বিয়ে করবে না, তাহলে অচিরেই তারা তোমাদের প্রতি বেপরোয়া হয়ে উঠবে।
তোমরা তাদের দীনের বিচারে বিয়ে করবে, যদিও তারা হয় কৃষ্ণকায়, ছেঁড়া কান বিশিষ্ট দাসী অথচ দীনের বিচারে উত্তম।- আত তারগীব
হাদিসের মূল শিক্ষা
শুধু সৌন্দর্য দেখে বিয়ে না করা: বাহ্যিক সৌন্দর্য ক্ষণস্থায়ী। শুধুমাত্র রূপের ভিত্তিতে বিয়ে করলে চরিত্র, দ্বীন, মানসিকতা উপেক্ষিত হয়, ফলে দাম্পত্যে সমস্যা তৈরি হতে পারে।
শুধু সম্পদের জন্য বিয়ে না করা: অর্থের উপর ভিত্তি করে সম্পর্ক হলে ভালোবাসা দুর্বল হয়, সম্পদ থাকলে অহংকার বা দূরত্ব তৈরি হতে পারে। এতে সম্পর্কের ভারসাম্য নষ্ট হয়।
দ্বীনকে প্রাধান্য দেওয়া: দ্বীনদার ব্যক্তি দায়িত্বশীল, ধৈর্যশীল ও নৈতিক হয়, আল্লাহভীতি থাকলে সংসার টিকে থাকে।
তাই হাদিসে বলা হয়েছে— যদিও বাহ্যিকভাবে কম আকর্ষণীয় (যেমন কৃষ্ণকায় বা দাসী), কিন্তু দ্বীন ভালো—তাকেই প্রাধান্য দাও।
প্রকৃতির বিধান
আল্লাহ তাআলা কুরআনুল কারীমে ইরশাদ করেন-
اَلْخَبِيْثٰتُ لِلْخَبِيْثِيْنَ وَ الْخَبِيْثُوْنَ لِلْخَبِيْثٰتِ وَالطَّيِّبٰتُ لِلطَّيِّبِيْنَ وَالطَّيِّبُوْنَ لِلطَّيِّبٰتِ
দুশ্চরিত্র নারী দুশ্চরিত্র পুরুষের জন্য। দুশ্চরিত্র পুরুষ দুশ্চরিত্র নারীর জন্য। আর সচ্চরিত্র নারী সচ্চরিত্র পুরুষের জন্য। সচ্চরিত্র পুরুষ সচ্চরিত্র নারীর জন্য। (সূরা নূর: ২৬)
মুফতী মোহাম্মদ শফী (রহ) এর উক্তি
এই আয়াত প্রসঙ্গে মুফতী মো: শফী (রহ) তাফসীরে মাআরেফুল কুরআনে বলেন, এই আয়াতে সাধারণ একটি বিধি বর্ণিত হয়েছে যে, আল্লাহ তাআলা মানবচরিত্রে স্বাভাবিক যোগসূত্র রেখেছেন।
দুশ্চরিত্র নারীরা দুশ্চরিত্র পুরুষের প্রতি এবং দুশ্চরিত্র পুরুষ দুশ্চরিত্র নারীদের প্রতি আকৃষ্ট হয়।
এমনিভাবে সচ্চরিত্র নারীদের আগ্রহ সচ্চরিত্র পুরুষদের প্রতি এবং সচ্চরিত্র পুরুষদের আগ্রহ সচ্চরিত্র নারীদের প্রতি হয়ে থাকে।
প্রত্যেকেই নিজ নিজ আগ্রহ অনুযায়ী জীবনসঙ্গী খোঁজ করে নেয় এবং প্রকৃতির বিধান অনুযায়ী সে সেরূপই পায়।- মাআরেফুল কুরআন
এক ভিস্তিওয়ালার ঘটনা
এক স্বর্ণকারের বাড়িতে এক ভিস্তি ত্রিশ বৎসর যাবত পানি সরবরাহ করত। স্বর্ণকারের স্ত্রী ছিল খুব সুন্দর, রূপবতী ও দানশীল। ভিস্তি প্রতিদিন দরজায় পানি রেখে চলে যেত।
একদিন ভিস্তি দেখল যে, স্বর্ণকারের স্ত্রী ঘরের আঙিনায় শুয়ে আছে। সে তার নিকটবর্তী হয়ে তার হাত ধরে কিছুক্ষণ টিপাটিপি করে চলে গেল।
যখন স্বর্ণকার ঘরে আসল, তখন স্ত্রী জানতে চাইল যে, আজ বাজারে আপনি কি অপরাধ করেছেন যে, এর কারণে আল্লাহ্ তাআলা অসন্তুষ্ট হয়েছেন?
সে বলল, আমি তো কিছুই করিনি। স্ত্রী বললো, সত্য কথা না বললে আমি ঘর থেকে চলে যাব।
তখন স্বর্ণকার বললো, আজ আমার দোকানে এক মহিলা ক্রেতা এসেছিল তার জন্য বালা তৈরী করা হয়েছিল। তার হাত ছিল খুব সুন্দর। তাকে বালা পরানোর সময় আমি তার হাত ধরে টিপাটিপি করলাম।
স্ত্রী বললো, আফসোস, তুমি এমন করলে কেন? (যার পরিণতিতে ঘরেও তেমন ঘটেছে)। তখন স্বামী স্ত্রীর নিকট ক্ষমা চাইল। পরদিন ভিত্তিওয়ালাও এসে ক্ষমা প্রার্থনা করল। — আত তিবরুল মাসবুক
গল্প থেকে শিক্ষা
এই গল্প থেকে আমরা শিখি: ছোট গুনাহও বড় প্রভাব ফেলতে পারে। স্বর্ণকার শুধু “হালকা দৃষ্টিভঙ্গি ও স্পর্শ” করেছে, ভিস্তিও একইভাবে ভুল করেছে।
বার্তা: ছোট গুনাহও আল্লাহর দৃষ্টিতে গুরুত্বহীন নয়—এর প্রভাব জীবনে প্রতিফলিত হতে পারে।
কর্মের প্রতিফল ধারণা: গল্পে দেখানো হয়েছে— একজন যা করে, তার ফল কোনো না কোনোভাবে ফিরে আসে।
অন্তরের সংবেদনশীলতা: স্ত্রী বুঝতে পেরেছে স্বামীর আচরণ পরিবর্তন হয়েছে।
শিক্ষা: ঈমানদার মানুষের অন্তর সংবেদনশীল হয়, সে নিজের কাজের প্রভাব বুঝতে চেষ্টা করে।
যে নিজ পরিবারের অশ্লীলতার প্রসারে বাঁধা দেয় না
হযরত ইবনে উমর (রা) থেকে বর্ণিত হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেন—
ثلاثة قد حرم الله تبارك وتعالى عليهم الجنة : مدمن الخمر والعاق والديوث الذي يقر في أهله الخبث
তিন ব্যক্তি এমন যে, তাদের উপর আল্লাহ্ জান্নাত হারাম করে দিয়েছেন-
এক: সেই ব্যক্তি যে সর্বদা মদ্যপানে লিপ্ত থাকে। দুই: সেই ব্যক্তি যে পিতামাতার অবাধ্যতা করে। তিন: দায়্যূস, যে নিজ পরিবার-পরিজনদের মধ্যে অশ্লীল কাজ সংঘটিত হওয়ার সুযোগ প্রদান করে। মুসনাদ আহমদ
দাইয়ুস কাকে বলে
দাইয়ূস বলতে এমন ব্যক্তিকে বোঝানো হয়— যে নিজের পরিবারে (স্ত্রী, মেয়ে ইত্যাদি) অশ্লীলতা বা হারাম কাজ হতে দেয় এবং এতে তার কোনো লজ্জা বা প্রতিবাদ থাকে না।
অর্থাৎ যে ব্যক্তি নিজের দায়িত্ব (পরিবার রক্ষা) পালন করে না, বরং খারাপ কাজকে প্রশ্রয় দেয়।
পরিবারের উপর সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজে নিষেধ পরিত্যাগের প্রভাব
হযরত উমরী যাহেদ (রহ) বলেন— যে ব্যক্তি লোকভয়ে সবকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধ পরিত্যাগ করে তার থেকে (আল্লাহ্র) আনুগত্য লাভের তাওফীক বিলুপ্ত করে দেয়া হয়।
ফলে তার সন্তান সন্ততি তার পিতৃত্ব আর তার অধিনস্থ ও খাদেমরা তার মালিকানার অধিকারের প্রতি লক্ষ্য রাখে না, গুরুত্ব দেয় না।- আল জাওয়াবুল কাফী
কথাটার মানে কি?
তিনি বলতে চেয়েছেন—
যে ব্যক্তি: আমর বিল-মা‘রূফ ও নাহি আনিল মুনকার (ভাল কাজের নির্দেশ ও খারাপ কাজ থেকে নিষেধ) শুধু লোকের ভয় বা দুনিয়ার স্বার্থে পরিত্যাগ করে।তার উপর আল্লাহ কিছু শাস্তি চাপিয়ে দেন।
যেমন; নেক কাজের তাওফীক কমে যায়। তার ব্যক্তিত্ব ও প্রভাব দুর্বল হয়ে পড়ে। পরিবার ও অধীনস্থরা তার প্রতি শ্রদ্ধা হারায়।
গুনাহ ও নেক আমলের প্রভাব কয়েক বংশ পর্যন্ত স্থায়ী হয়
হযরত ওয়াহাব (রহ) বলেন— বনী ইসরাইলকে আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীন বলেছিলেন, আমার আনুগত্য ও অনুসরণ করলে আমি খুশি হই বরকত দান করি। আমার বরকত অসীম।
আর যখন আমার নাফরমানী করা হয় তখন আমার গযব অবতীর্ণ হয়। আমার গযব যখন অবতীর্ণ হয় তখন আমার লা’নত সাত পুরুষ পর্যন্ত পৌঁছে।- আল জাওয়াবুল কাফী
হাদীসের মূল বক্তব্য
বর্ণনাটির মূল বক্তব্য হলো: নেককার মানুষের কারণে বরকত বিস্তৃত হয়। একজন মুমিন যখন: আল্লাহভীরু হয়, নেক আমল করে, গুনাহ থেকে দূরে থাকে আল্লাহ তার কারণে তার পরিবারকে হেফাজত করেন।
সন্তান ও বংশধর হেফাজত: এর অর্থ এখানে ৮০ বছর বা ৭ বংশধর বলতে আক্ষরিক সংখ্যা বোঝানো হয়নি বরং বোঝায়: দীর্ঘ সময় পর্যন্ত বরকত থাকা। বহু প্রজন্ম পর্যন্ত ভালো প্রভাব থাকা। পরিবারে বিপদ-আপদ কম আসা।
পিতা মাতার উপর সন্তান কখন চরাও হয়
হযরত মালেক ইবনে দীনার (রহ) বলেন— আল্লাহ যখন কোন সম্প্রদায়ের উপর অসন্তুষ্ট হন তখন তিনি তাদের উপর তাদের সন্তানদের চড়াও করে দেন।- আল উকূবাত
সহজভাবে ব্যাখ্যা: যখন কোনো সমাজ আল্লাহর নির্দেশনা থেকে দূরে সরে যায়—অন্যায়, জুলুম, অবিচার, পাপাচার বাড়ে—তখন সেই সমাজের ভেতরেই সমস্যা সৃষ্টি হয়।
এর একটি রূপ হলো: নতুন প্রজন্ম (সন্তানরা) বেয়াদব, অবাধ্য বা নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে ওঠে। তারা বড়দের সম্মান করে না। পরিবার ও সমাজে অস্থিরতা তৈরি করে।
সন্তানদের চড়াও করে দেন— এর অর্থ কী?
এটা প্রতীকী ভাষা। এর মানে: আল্লাহ এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি করেন, যেখানে সন্তানরা বাবা-মা বা বড়দের জন্য কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
অর্থাৎ, যে সমাজ নিজের দায়িত্ব ঠিকভাবে পালন করে না, তারা নিজেদেরই তৈরি করা প্রজন্মের মাধ্যমে পরীক্ষায় পড়ে।
যেমন কর্ম তেমন ফল
হযরত সাবিত বুনানী (রহ) বলেন— তিনি এক ব্যক্তিকে দেখলেন, সে তার পিতাকে একস্থানে নিয়ে গিয়ে প্রহার করছে।
তখন সেই ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসা করা হলো, ব্যাপার কি? এখানে এনে তোমাকে প্রহার করছে কেন?
তখন পিতা বললো, তাকে ছেড়ে দাও। কারণ আমি আমার পিতাকে এই স্থানে মেরেছিলাম।
সুতরাং তার প্রতিফল হিসেবে ছেলে আমাকে ঠিক ঐ স্থানেই মারছে। তার কোন দোষ নেই।- তাম্বীহুল গাফিলীন
কাহিনির মূল শিক্ষা
যেমন কর্ম, তেমন ফল: পিতা নিজেই স্বীকার করছে— সে তার বাবার সাথে যে আচরণ করেছিল, আজ তার সন্তান সেই একই আচরণ তার সাথে করছে।
অর্থাৎ মানুষ নিজের কাজের ফল দুনিয়াতেই পেতে পারে। অন্যায় আচরণ এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে ছড়িয়ে যায়।
সন্তানরা শিখে অনুকরণ করে: সন্তানরা যা দেখে, তাই শিখে। যদি বাবা-মা নিজেদের পিতা-মাতার সাথে খারাপ ব্যবহার করে, সন্তানও সেটাকেই স্বাভাবিক মনে করে।
বাস্তব অর্থে কী বোঝায়? এটা এমন না যে—ঠিক একই জায়গায়, একইভাবে শাস্তি হবেই বরং বোঝায়: অন্যায়ের প্রভাব ঘুরে ফিরে নিজের জীবনেই আসে। পরিবারে আচরণের ধরণ প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে চলে যায়।
গুরুত্বপূর্ণ ভারসাম্য
ইসলামের মূল নীতি: কেউ অন্যের গুনাহ বহন করে না। কিন্তু: খারাপ কাজের প্রভাব (impact) পরিবেশ ও পরিবারে ছড়িয়ে পড়ে।
সারসংক্ষেপ
এই কাহিনি আমাদের শেখায়— পিতা-মাতার সাথে ভালো ব্যবহার করা শুধু কর্তব্য না, ভবিষ্যতের জন্য বিনিয়োগ।
আজ আমরা যেমন আচরণ করি, আগামী প্রজন্ম তা-ই অনুসরণ করবে।
অর্থাৎ তুমি আজ তোমার বাবা-মার সাথে যেমন আচরণ করো, কাল তোমার সন্তানও তোমার সাথে তেমন আচরণ করতে পারে।
গর্ভাবস্থায় সন্তানের উপর প্রভাব
জনৈক বুযুর্গের সন্তান খুব দুষ্ট হয়েছিল। তাকে বলা হলো আপনার ন্যায় একজন বুযুর্গ ব্যক্তির সন্তান এমন দুষ্ট হতে পারে— ভাবলেও অবাক লাগে। তখন বুযুর্গ ব্যক্তি বললেন, একদিন আমি এক ধনী ব্যক্তির বাড়িতে পানাহার করেছিলাম।
এতে আমার মনে খুব উত্তেজনা দেখা দেয়। এই সময় আমি তার মায়ের সাথে মিলনে প্রবৃত্ত হই। ফলে সে গর্ভবতী হয় এবং এই সন্তান জন্মগ্রহণ করে। সুতরাং এই সন্তান হচ্ছে সেই সন্দেহভাজন খাদ্যের ফল।
এই ঘটনা দ্বারা প্রতিয়মাণ হয় যে, স্ত্রী গর্ভবতী হওয়াকালে স্বামী স্ত্রীর মধ্যে যে স্বাভাবিক অবস্থা বিরাজ করে উহার প্রভাবক্রিয়া সন্তানের মধ্যেও বিরাজ করে।- খুতবাতে হাকীমুল উম্মত
ঘটনার সারমর্ম
কাহিনিতে বোঝাতে চাওয়া হয়েছে— হারাম/সন্দেহযুক্ত (শুবহা) খাবার বা আয় মানুষের অন্তরকে প্রভাবিত করে।
সেই প্রভাব পরিবার ও সন্তানের ওপরও পড়তে পারে। বিশেষ করে গর্ভধারণের সময় পিতা-মাতার অবস্থা (ইমান, আচরণ, মানসিকতা) গুরুত্বপূর্ণ।
পিতা মাতার কৃতকর্মের ফল কি সন্তান ভোগ করে?
হযরত আবুল বিলাদ (রহ) হযরত আলা ইবনে বদর (রহ) কে জিজ্ঞাসা করলেন, কুরআনুল কারীমে এই আয়াতটি রয়েছে
وَمَا أَصَابَكُم مِّن مُّصِيبَةٍ فَبِمَا كَسَبَتْ أَيْدِيكُمْ وَيَعْفُو عَن كَثِيرٍ
তোমাদের উপর যে বিপদ-মুসীবত আসে তা তোমাদের কৃতকর্মের ফল। আর তিনি অনেক গুনাহই ক্ষমা করে দেন। [সূরা শূরা: ৩০]
আর আমি তো অপ্রাপ্ত বয়স্ক, তবু কেন অন্ধ হয়ে গেলাম। তিনি বললেন, এটা তোমার পিতামাতার কৃতকর্মের ফল।- তাফসীর ইবনে কাসীর
এতে বোঝা গেল যে, সন্তানদের জীবনে পিতা মাতার কুকর্মের প্রভাব পড়ে।
পরিবার পরিজনের উপর নেক আমলের প্রভাব
অপরদিকে তাকওয়া ও নেক আমলের কারণে পরিবার পরিজন বাধ্য অনুগত ও নেক হয়, পরিবার ও সমাজে শান্তি সুখ বিরাজ করে এবং ভবিষ্যৎ বংশধরগণও এর সুফল ভোগ করে।
নিজে সৎ থাকলে পরিবার পরিজনও সৎ থাকে
হযরত আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেন—
عفوا عن نساء الناس تعف نساؤكم وبروا آباءكم تبركم أبناؤكم
তোমরা পূত পবিত্র থাক, তাহলে তোমাদের স্ত্রীরাও পূত পবিত্র থাকবে। পিতা মাতার সাথে সদ্ব্যবহার কর, তাহলে তোমাদের সন্তানরাও তোমাদের সাথে সদ্ব্যবহার করবে।- তাফসীর আদ দুররে মানসূর
এর অর্থ হলো: চোখ, চিন্তা ও আচরণে সংযম রাখা। হারাম সম্পর্ক ও অশ্লীলতা থেকে দূরে থাকা। নৈতিকভাবে শুদ্ধ থাকা।
উদ্দেশ্য: ব্যক্তি যদি নিজে চরিত্রবান হয়, তার পরিবারেও তার প্রভাব পড়ে।
নেককার পিতার বরকত
কুরআনুল কারীমে অতীতকালের ঘটনা প্রসঙ্গে ইরশাদ হয়েছে—
وَأَمَّا الْجِدَارُ فَكَانَ لِغُلَامَيْنِ يَتِيمَيْنِ فِي الْمَدِينَةِ وَكَانَ تَحْتَهُ كَنزٌ لَّهُمَا وَكَانَ أَبُوهُمَا صَالِحًا
আর ঐ প্রাচীরটি ওটা ছিল নগরবাসী দুই পিতৃহীন কিশোরের। এর নিম্নদেশে আছে তাদের গুপ্তধন এবং তাদের পিতা ছিল সৎকর্মপরায়ণ। [সূরা কাহাফ: ৮২]
তাফসীরে ইবনে কাসীরে উক্ত আয়াতের ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে আল্লামা ইমাম ইবনে কাসীর (রহ) বলেন—
এই আয়াত দ্বারা এটাও সাব্যস্ত হয় যে, মানুষের পুণ্যের কারণে তার সন্তান-সন্ততিরাও দুনিয়া ও আখিরাতে আল্লাহর মেহেরবানী লাভ করে থাকে। এটা কুরআন ও হাদীসে পরিষ্কারভাবে বর্ণিত আছে।
দেখা যায় যে, এই আয়াতে ঐ ইয়াতীম ছেলে দুটির কোন প্রশংসা বর্ণনা করা নাই, বরং তাদের পিতার সততা ও সৎকর্মশীলতার বর্ণনা দেয়া হয়েছে।
তাদেরকে (এবং তাদের সম্পদকে) তাদের পিতার বরকতের কারণে হিফাযত করা হয়েছিল।- তাফসীর ইবনে কাসীর
নেককার ব্যক্তির বরকত
হযরত ইবনে আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেন-
إن الله تعالى يصلح بصلاح الرجل ولده وولد ولده ويحفظه في دويرته ودويرات حوله، فما يزالون في ستر من الله وعافية
আল্লাহ তাআলা একজন নেককার ও পুণ্যবান লোকের কারণে তার সন্তান, তার সন্তানদের সন্তান এবং তাদের সন্তানদের অবস্থা ঠিক করে দেন।
তার সন্তান এবং তার আশ-পাশের ঘরকে হেফাজত করেন। তার সন্তান সব সময় আল্লাহর তত্ত্বাবধান ও হেফাজতে থাকে। —তাফসীর দুররে মানসুর
ব্যাখ্যা
যখন একজন মানুষ: আল্লাহভীরু হয়, নেক আমল করে, হারাম থেকে দূরে থাকে।
তার এই নেককারীর প্রভাব শুধু তার নিজের উপরই সীমাবদ্ধ থাকে না বরং: সন্তানদের জীবনে বরকত আসে।
পরিবারের উপর আল্লাহর রহমত নেমে আসে। আশেপাশের মানুষও উপকৃত হয়।
সাত বংশধর পর্যন্ত হিফাযত
হযরত কাব (রা) থেকে বর্ণিত আছে যে, আল্লাহ তাআলা মুমিন বান্দার পক্ষ থেকে তার সন্তানের আশি বৎসর পর্যন্ত তত্ত্বাবধান করেন।
অপর বর্ণনায় আছে যে, তাওরাতে আছে— আল্লাহ তাআলা নেককার মুমিনের উসিলায় তার সাত বংশধর পর্যন্ত হিফাযত করেন। —তাফসীর দুররে মানসুর
৭ বংশধর দ্বারা কি উদ্দেশ্য
এখানে ৮০ বছর বা ৭ বংশধর বলতে আক্ষরিক সংখ্যা বোঝানো হয়নি বরং বোঝায়: দীর্ঘ সময় পর্যন্ত বরকত থাকা। বহু প্রজন্ম পর্যন্ত ভালো প্রভাব থাকা। পরিবারে বিপদ-আপদ কম আসা।
সুসংবাদ তার জন্য
হযরত ঈসা (আ) বলেন—
طُوبَى لِلْمُؤْمِنِ كَيْفَ يُحْفَظُ فِي ذُرِّيَّتِهِ مِنْ بَعْدِهِ
সুসংবাদ মুমিনের জন্য। কিভাবে মুমিন ব্যক্তির তিরোধানের পরও তার সন্তানদের হিফাযত করা হয়।
অতঃপর বর্ণনাকারী খায়সামা (রহ) তিলাওয়াত করেন— وَكَانَ أَبُوهُمَا صَالِحًا “তাদের পিতা ছিল সৎকর্মপরায়ণ।” —মুসান্নাফ ইবনে আবী শাইবা
যখন একজন মানুষ: আল্লাহভীরু জীবন যাপন করে, হালাল-হারাম মেনে চলে, নেক আমল করে, তার দুনিয়াবি জীবন শেষ হলেও তার আমলের বরকত পরিবারে থেকে যায়।
সন্তানদের হেফাজত মানে কী?
এটা আক্ষরিক অলৌকিকভাবে সব সন্তান রক্ষা পাবে এমন নয়। বরং বোঝায়: সন্তানদের জন্য ভালো পরিবেশ তৈরি হয়।
আল্লাহ তাদের বিপদ থেকে অনেক ক্ষেত্রে রক্ষা করেন। দোয়া ও নেক আমলের প্রভাব পরিবারে ছড়িয়ে পড়ে।
তবে আল্লাহ চাইলে অলৌকিক ভাবেও রক্ষা করেন। যেমন এ বিষয়ে অনেক বাস্তব ঘটনাবলী আমাদের সামনে বিদ্যমান আছে।
পিতা মাতার অতীতের সৎকর্মের ফল
হযরত সুলায়মান ইবনে আমের (রা) রাসূলুল্লাহ (সা) কে জিজ্ঞাসা করলেন, আমার পিতা আত্মীয়দের সাথে সু-সম্পর্ক বজায় রাখতেন, প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করতেন, মেহমানদের সেবা-যত্ন করতেন। (এ কারণে কি তিনি উপকৃত হবেন?)
রাসূলুল্লাহ (সা) জিজ্ঞাসা করলেন, তিনি কি ইসলামের পূর্বে মারা গেছেন? তিনি বললেন, হ্যাঁ ইয়া রাসূলাল্লাহ। হুজুর (সা) বললেন, তিনি এ দ্বারা উপকৃত হবেন না।
তবে তার সন্তানরা এর কারণে উপকৃত হবে। তোমরা হেয় হবে না, লাঞ্ছিত হবে না এবং দরিদ্রও হবে না। – আল এতেদাল
মূল শিক্ষা
ঈমান ছাড়া আমল আখিরাতে গ্রহণযোগ্য নয়। তবে ভালো চরিত্রের দুনিয়াবি প্রভাব থাকে। নেক কাজ পরিবারের সম্মান ও বরকত আনতে পারে। সন্তানরা অনেক সময় পিতার ভালো চরিত্রের ফল ভোগ করে।
নেককার পিতার বরকতে
হযরত আনাস (রা) বর্ণনা করেন- হযরত আউফ বিন আফরা (রা) এর কন্যা (মহিলা সাহাবী) একবার নিজের বিছানায় ঘুমিয়েছিলেন।
তখন তার অজ্ঞাতসারে কালো রঙের এক কদাকার ব্যক্তি (জিনরূপী মানুষ) তার বুকের উপর চড়ে বসে এবং তার গলায় হাত দেয়।
হঠাৎ একটি হলুদ রঙের কাগজের টুকরো উপর থেকে নেমে এসে হযরত আউফ (রা) এর কন্যার মাথার ওপর পড়ে।
সেই ব্যক্তি (জিন) কাগজটা তুলে নিয়ে পড়ে তাতে লিখা ছিল—
مِنْ رَبِّ لَكِيْنٍ إِلَى لَكِيْنٍ إِجْتَنِبِ ابْنَةَ الْعَبْدِ الصَّالِحِ فَإِنَّهُ لَا سَبِيْلَ لَكَ عَلَيْهَا
লাকিন এর প্রভুর পক্ষ থেকে লাকীনের উদ্দেশ্যে— সৎমানুষের কন্যা থেকে দূরে থাক। এর উপর তোমার কোন পাঁয়তারা চলবে না।
হযরত আনাস (রা) বলেন— আল্লাহ তাআলা ওকে ওর পিতার কারণে হিফাযত করেছেন। কেননা তিনি বদর যুদ্ধে শহীদ হয়েছিলেন।
👉 আরও পড়ুন জিন ও শয়তান বিষয়ক গ্রন্থ শয়তানের কৌশল – মাকায়িদুশ শয়তান
কাহিনির মূল বক্তব্য
এই গল্পে বোঝাতে চাওয়া হয়েছে: একজন নেককার (শহীদ) পিতার কারণে তার সন্তান আল্লাহর হিফাজতে থাকে।
জিন বা অদৃশ্য ক্ষতিকর শক্তিও আল্লাহর অনুমতি ছাড়া ক্ষতি করতে পারে না। আল্লাহ নেককারদের পরিবারকে বিশেষভাবে রক্ষা করেন।
উমর ইবনে আব্দুল আযীয (রহ) এর ছেলেদের ভবিষ্যৎ
বর্ণিত আছে যে, একদা আব্বাসী শাসক খলিফা মনসুর হযরত আব্দুর রহমানের কাছে বলেন যে আমাকে নসীহত করুন।
আব্দুর রহমান তখন বলেন যে, হযরত উমর ইবনে আব্দুল আযীয ইন্তেকালের সময় ১১ ছেলে রেখে যান।
তার পরিত্যক্ত সম্পত্তি ছিল ৭০ দিনার যার মধ্যে ৫ দিনার কাফনের জন্য এবং ২ দিনার কবরের জায়গা ক্রয় করার জন্য ব্যয় হয়।
অবশিষ্ট দিনার ছেলেদের মধ্যে বণ্টন করা হয়। প্রত্যেক ছেলের ভাগে ১৯ দিরহাম পড়ে।
অপরদিকে হিশাম ইবনে আব্দুল মালিকও তার ইন্তেকালের সময় ১১ ছেলে রেখে যান। তাদের পিতার পরিত্যক্ত সম্পদের মধ্যে প্রত্যেকেই ১০ লক্ষ দিরহাম করে ভাগে পান।
তারপরে আমি হযরত উমর ইবনে আব্দুল আযীযের এক ছেলেকে দেখলাম যে তিনি আল্লাহর রাস্তায় জিহাদের জন্য ১০০ ঘোড়া প্রেরণ করেন। তখন হিশামের এক ছেলেকে দেখলাম যে সে ভিক্ষা করতেছে।- হায়াতুল হায়াওয়ান
মূল শিক্ষা
ন্যায়পরায়ণতা ও তাকওয়া সম্পদের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। বরকতই আসল সম্পদ। সন্তানদের ভবিষ্যৎ শুধু সম্পদের উপর নয়, পিতার আমলের উপরও নির্ভর করে। অন্যায় সম্পদ অনেক সময় স্থায়ী কল্যাণ আনে না।
দামিরী (রহ) এর বক্তব্য
আল্লামা দামিরী (রহ) বলেন— উল্লিখিত ঘটনাটি কোন আশ্চর্যের বিষয় নয়। কেননা হযরত উমর ইবনে আব্দুল আযীয (রহ) তার সন্তানদেরকে আল্লাহর সোপর্দ করেছিলেন।
তাই আল্লাহই তাদের জন্য যথেষ্ট হয়ে যান এবং তাদেরকে সম্পদশালী করে দেন। আর হিশাম এর বিপরীত।
তার সন্তানগণকে জাগতিক সম্পদের ওপর সোপর্দ করেছিলেন তাই এর ফল হলো আল্লাহ তাআলা তাদেরকে নিঃস্ব করে দেন।
আল্লাহর উপর সোপর্দ করা
একবার হযরত উমর (রা) এর দরবারে একলোক তার সন্তানসহ আগমন করলে হযরত উমর (রা) তার সন্তানের প্রতি লক্ষ্য করেন।
তখন বাচ্চার বাবা বলেন— হে আমিরুল মুমিনীন! এই বাচ্চার এক কাহিনী আছে। এই বাচ্চা গর্ভে থাকাকালে আমি সফরে বের হওয়ার ইচ্ছা করি।
তার মা তখন বলে, তুমি আমাদেরকে এই অবস্থায় রেখে যাচ্ছ? তখন আমি বললাম, আমি তোমার গর্ভের সন্তানকে আল্লাহর ওপর সোপর্দ করে গেলাম। এরপর সফরে চলে গেলাম।
সফর থেকে ফিরে জানতে পারলাম বাচ্চার মা গর্ভাবস্থায়ই মৃত্যুবরণ করেছে। তবে তার কবরে প্রতি রাতে আগুনের মত কিছু জ্বলে ওঠে জ্বলে ওঠে। আমি কবর খুড়ে দেখলাম একটি প্রদীপ জ্বলছে এবং এই ছেলেটি প্রদীপ নিয়ে খেলা করছে।
তখন আমি একটি বানী শুনতে পেলাম যে- ওহে! তুমি এই ছেলেটিকে আমার উপর পর্দা করেছিলে এখন আমি তাকে তোমার নিকট সোপর্দ ল করে দিলাম। যদি তুমি তোমার স্ত্রীকেও আমার নিকট সোপোর্দ করতে তবে তাকেও আমি তোমার নিকট ফিরিয়ে দিতাম।- কিমিয়া সাআদাত
আল্লাহর ওপর সোপর্দ করা (তাওয়াক্কুল)
এখানে পিতা তার সন্তানকে আল্লাহর কাছে সোপর্দ করেছে।
এর অর্থ: অন্তর থেকে আল্লাহর উপর ভরসা করা
তিনিই প্রকৃত রক্ষাকারী—এই বিশ্বাস রাখা
আসল শিক্ষা
এই গল্পের মূল লক্ষ্য: আল্লাহর উপর ভরসা করা। দোয়া ও নিয়তের গুরুত্ব বোঝানো। আল্লাহ বান্দার প্রতি দয়ালু—এই বিশ্বাস তৈরি করা।
দরূদ শরীফের ফায়দা
অধিক পরিমাণে দরূদ শরীফ পাঠ করা মানুষের ব্যক্তিজীবন, পারিবারিক জীবনসহ জীবনের সামগ্রীক দিকে ব্যাপক ইতিবাচক প্রভাব পড়ে।
এ প্রসঙ্গে হযরত শায়খ আবুল হক মুহাদ্দিস (রহ) তার মাদারিদজুন নুবুওয়াত গ্রন্থে দরুদ শরীফের ফযীলত প্রসঙ্গে বলেন—
দুঃখ-কষ্ট দূরীকরণে, রোগ মুক্তির ব্যাপারে, ভয়-ভীতি ও ক্ষুধা নিবারণে, অপবাদ হতে মুক্ত থাকার ব্যাপারে, শত্রুদের উপর জয়লাভের ব্যাপারে, আল্লাহর সন্তুষ্টি ও ভালবাসা অর্জনের ব্যাপারে।
আল্লাহর দরূদ ও সালাম ফেরেশতাদের দরূদ ও সালামের সাথে মিলিত হওয়ার ব্যাপারে, অর্থ-সম্পদ বৃদ্ধি ও পবিত্রকরণের ব্যাপারে।
দেহ-মনের পবিত্রতা অর্জনের ব্যাপারে, সকল কাজ-কর্মে স্বাচ্ছন্দ্য ও বরকত অর্জনের ব্যাপারে নবী (সা) এর প্রতি প্রেরিত দরূদ ও সালামের বিশেষ ভূমিকা থাকে।
অর্থ-সম্পদ, সন্তান-সন্ততির মধ্যে এমনকি চারটি বংশধারা পর্যন্ত এর বরকত অব্যাহত থাকে।
উপসংহার
পরিবার ও পরিজনের উপর মানুষের গুনাহ ও নেক আমলের প্রভাব অত্যন্ত গভীর ও বিস্তৃত। এ
কজন ব্যক্তির ভালো কাজ যেমন পরিবারের মধ্যে শান্তি, ভালোবাসা ও বরকত বয়ে আনে, তেমনি তার পাপাচার ও গুনাহ পারিবারিক জীবনে অশান্তি, সংকট ও আল্লাহর রহমত থেকে বঞ্চিত হওয়ার কারণ হতে পারে।
তাই প্রতিটি মানুষের উচিত নিজের আমল ও আচরণের প্রতি সচেতন থাকা, কারণ তার প্রতিটি কাজ শুধু তার নিজের জন্য নয়, বরং পুরো পরিবার ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও প্রভাব বিস্তার করে।
শেষ পর্যন্ত বলা যায়, একজন মুমিনের ব্যক্তিগত নেক আমলই একটি আদর্শ, শান্তিপূর্ণ ও বরকতময় পরিবার গঠনের মূল ভিত্তি।
🔹🔹🔹
👉আরও পড়ুন সন্তান লালন পালন – হাদীসসমূহ