ইমাম ইবনে আবিদ দুনইয়া (রহ) রচনাবলী

অদৃশ্যের আওয়াজ

আল হাওয়াতিফ - ইমাম ইবনে আবিদ দুনইয়া (রহ)

অদৃশ্যের আওয়াজ বা আল হাওয়াতিফ- ইসলামি আধ্যাত্মিকতা ও হৃদয়স্পর্শী উপদেশভিত্তিক সাহিত্যের এক অনন্য সংকলন হলো আল হাওয়াতিফ।

প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ও আলেম ইবনে আবিদ দুনইয়া (রহ) রচিত এই গ্রন্থে সংকলিত হয়েছে এমন সব রহস্যময় ও শিক্ষণীয় রিওয়ায়াত, যেখানে অদৃশ্য জগতের আহ্বান, আল্লাহভীতি, তাওবা, এবং নৈতিক পরিশুদ্ধতার গভীর বার্তা ফুটে ওঠে।

এই পোস্টে উপস্থাপিত ১–১৫ নম্বর রিওয়ায়াত পাঠকের অন্তরে আল্লাহর স্মরণ জাগ্রত করে এবং দুনিয়াবিমুখতা ও আখিরাতমুখী জীবনের প্রতি উৎসাহিত করে।

আরও পোস্ট

প্রতিটি রিওয়ায়াতে রয়েছে শিক্ষণীয় ঘটনা, যা আমাদের আমল সংশোধন, আত্মসমালোচনা এবং তাকওয়া অর্জনের পথে পরিচালিত করে।

যারা ইসলামি আখলাক, যুহদ (দুনিয়াবিমুখতা) এবং আত্মশুদ্ধির বিষয়ে গভীরভাবে জানতে চান, তাদের জন্য আল হাওয়াতিফ একটি মূল্যবান গ্রন্থ।

কেন পড়বেন এই রিওয়ায়াতগুলো?

ঈমান শক্তিশালী করতে। গুনাহ থেকে ফিরে আসার প্রেরণা পেতে। আখিরাতের প্রস্তুতি সম্পর্কে সচেতন হতে। আত্মশুদ্ধি ও তাকওয়া অর্জনের পথ জানতে।

এই সংকলনটি কেবল গল্প নয়; বরং প্রতিটি রিওয়ায়াত আমাদের জীবনের জন্য একেকটি আয়না, যা আমাদের আমল ও অবস্থার প্রতিফলন দেখায়।

তাই মনোযোগ দিয়ে পড়ুন, উপলব্ধি করুন এবং জীবনে বাস্তবায়নের চেষ্টা করুন।

ইমাম ইবনে আবেদ দুনইয়া (রহ) রচিত আল হাওয়াতিফ গ্রন্থ থেকে অনূদিত

আমাদের অনুবাদ ও প্রকাশনা – দারুস সাআদাত

Table of Contents

আল হাওয়াতিফ

ওহী নাযিলের প্রাক্কালে

রিওয়ায়াত: ১ জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে বলতে শুনেছি:

একদিন আমি হাঁটছিলাম, হঠাৎ আকাশে একটি শব্দ শুনতে পেলাম। আমি দৃষ্টি তুলে তাকালাম, তখন দেখলাম যে ফেরেশতা, যিনি হিরায় আমার কাছে এসেছিলেন, তিনি আকাশ ও পৃথিবীর মাঝখানে একটি আসনের ওপর বসে আছেন।

আমি তাকে দেখে ভীষণ ভীত হয়ে পড়লাম। তখন আমি ফিরে এলাম এবং বললাম: আমাকে চাদর দিয়ে ঢেকে দাও, আমাকে চাদর দিয়ে ঢেকে দাও। এরপর আমাকে ঢেকে দেওয়া হলো।

তখন আল্লাহ তা‘আলা নাযিল করলেন-

يَـٰٓأَيُّهَا ٱلْمُدَّثِّرُ * قُمْ فَأَنذِرْ * وَرَبَّكَ فَكَبِّرْ * وَثِيَابَكَ فَطَهِّرْ * وَٱلرُّجْزَ فَٱهْجُرْ

হে বস্ত্রাবৃত! উঠ, (লোকজনকে) সতর্ক কর। আর তোমার রবের শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা কর। তোমার পরিচ্ছদ পরিস্কার রাখ। অপবিত্রতা হতে দূরে থাক।- সূরা মুদ্দাসিসর ১-৫

হাদীস থেকে শিক্ষা

ওহি ও নবুয়ত ছিল বাস্তব এবং অত্যন্ত শক্তিশালী অভিজ্ঞতা। নবীজি ছিলেন মানুষ; তাই ভয় পাওয়া তার মানবীয় স্বভাবের প্রমাণ। ইসলামের দাওয়াত শুরু হয়েছে আল্লাহর নির্দেশে। দীনের কাজের জন্য আত্মিক ও চারিত্রিক পবিত্রতা অপরিহার্য।

তায়েফের ঘটনা

রিওয়ায়াত: ২ উরওয়া ইবনে যুবায়ের (রহ) বর্ণনা করেন যে, আয়শা বিনতে আবু বকর (রা) রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে জিজ্ঞেস করলেন:

হে আল্লাহর রাসূল! আপনার উপর কি উহুদের দিনের চেয়েও কঠিন কোনো দিন এসেছে?

তিনি (সা) বললেন: আমি তোমার কওম (কুরাইশ) থেকে অনেক কষ্ট পেয়েছি। তাদের পক্ষ থেকে আমি যে সবচেয়ে কঠিন কষ্ট পেয়েছি, তা ছিল ‘ইয়াওমুল আকাবা’ (তায়েফের দিন)।

যখন আমি নিজেকে (ইসলামের দাওয়াত) পেশ করেছিলাম আব্দ ইয়ালিল ইবনে আব্দুল কুলাই এর কাছে, কিন্তু সে আমার কথা গ্রহণ করেনি।

আমি সেখান থেকে গভীর দুঃখে চলতে লাগলাম। এভাবে চলতে চলতে যখন একটি স্থানে পৌঁছালাম, তখন মাথা তুলে দেখি একটি মেঘ আমাকে ছায়া দিচ্ছে। আমি তাকিয়ে দেখি, তাতে জিবরাঈল (আ) আছেন।

তিনি আমাকে ডাক দিয়ে বললেন, নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমার কওমের কথা এবং তারা তোমার প্রতি যা জবাব দিয়েছে তা শুনেছেন। আর তিনি তোমার কাছে পাহাড়ের ফেরেশতাকে পাঠিয়েছেন, যাতে তুমি তাদের ব্যাপারে যা ইচ্ছা আদেশ করতে পারো।

পাহাড়ের ফেরেশতার আরয

তখন পাহাড়ের ফেরেশতা আমাকে ডাকলেন, সালাম দিলেন এবং বললেন: হে মুহাম্মদ! আল্লাহ আপনার কওমের কথা শুনেছেন। আমি পাহাড়ের ফেরেশতা। আপনার প্রতিপালক আমাকে আপনার কাছে পাঠিয়েছেন, যাতে আপনি যা চান আমি তাই করি। আপনি চাইলে আমি তাদের উপর দুই পাহাড় (আখশাবাইন) চাপিয়ে দিতে পারি।

তখন রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন, বরং আমি আশা করি, আল্লাহ তাদের বংশধরদের মধ্য থেকে এমন লোক বের করবেন, যারা এক আল্লাহর ইবাদত করবে এবং তাঁর সাথে কাউকে শরিক করবে না।

📝 সংক্ষিপ্ত শিক্ষা

নবী ﷺ চরম নির্যাতনের মুখেও ধৈর্য ও দয়া দেখিয়েছেন। প্রতিশোধের সুযোগ থাকা সত্ত্বেও মানবতার কল্যাণ কামনা করেছেন। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের হিদায়াতের জন্য আশা রাখা—এটাই নববী চরিত্র।

নবী (সা) এর বক্ষ বিদীর্নের একটি বর্ণনা

রিওয়ায়াত: ৩ আবু যর গিফারি (রা) বলেন, আমি বললাম: হে আল্লাহর রাসূল! আপনি কীভাবে জানলেন যে আপনি নবী? এবং কীভাবে আপনি এ ব্যাপারে নিশ্চিত হলেন?

তিনি  (সা) বললেন, হে আবু যর! আমি যখন মক্কার বাতহা (খোলা ময়দান)-এ ছিলাম, তখন আমার কাছে দু’জন ফেরেশতা এলেন। তাদের একজন মাটিতে নামলেন, আর অন্যজন আকাশ ও পৃথিবীর মাঝখানে ছিলেন।

তাদের একজন অন্যজনকে বললেন: এ কি সেই ব্যক্তি? সে বলল- হ্যাঁ, এই সেই ব্যক্তি।

তারপর সে বলল- তাকে একজন মানুষের সাথে ওজন করো। তখন আমাকে একজনের সাথে ওজন করা হলো, আর আমি তার চেয়ে ভারী হলাম।

নবী (সা) এর মর্যাদা

তারপর বলল- তাকে দশজনের সাথে ওজন করো। তখন আমাকে দশজনের সাথে ওজন করা হলো, আমি তাদের চেয়েও ভারী হলাম।

এরপর বলল- তাকে একশ জনের সাথে ওজন করো। তখন আমাকে একশ জনের সাথে ওজন করা হলো, আমি তাদের চেয়েও ভারী হলাম। এমনকি তারা পাল্লা থেকে ছিটকে পড়তে লাগল।

তারপর তাদের একজন বলল, তার বক্ষ বিদীর্ণ করো। তখন আমার বক্ষ বিদীর্ণ করা হলো। আমার হৃদয় বের করা হলো। সেখান থেকে শয়তানের অংশ ও জমাট রক্ত বের করে ফেলে দেওয়া হলো।

নবী (সা) এর বক্ষ ধৌতকরণ 

তারপর একজন বলল, তার বক্ষকে ধৌত করো পাত্র ধোয়ার মতো, আর তার হৃদয়কে ধৌত করো উত্তমভাবে।

এরপর বলল, তার বক্ষ সেলাই করে দাও। তখন আমার বক্ষ সেলাই করে দেওয়া হলো এবং আমার দুই কাঁধের মাঝখানে মোহর (নবুওয়াতের সীল) স্থাপন করা হলো—যা এখনো রয়েছে।

তারপর তারা চলে গেলেন। আর আমি যেন সবকিছু চোখের সামনে প্রত্যক্ষ করছিলাম।

📝 সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা

এতে নবী ﷺ-এর শক্কে সাদর (বক্ষ বিদীর্ণ) ঘটনার একটি বর্ণনা এসেছে। এটি নবুওয়াতের প্রস্তুতি ও পবিত্রতার একটি নিদর্শন হিসেবে বিবেচিত। ওজন করা অংশটি নবী ﷺ-এর মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব বোঝাতে এসেছে

বদর যুদ্ধের দিনের চাক্ষুষ ঘটনা

রিওয়ায়াত: ৪ ইবনে আব্বাস (রা) বলেন, আমাকে বনু গিফারের এক ব্যক্তি বর্ণনা করেছেন:

সে বলল, আমি এবং আমার এক চাচাতো ভাই রওনা হলাম। আমরা বদরের উপর নজর রাখা যায় এমন একটি পাহাড়ে উঠলাম। তখন আমরা মুশরিক ছিলাম।

আমরা দেখতে চাচ্ছিলাম- কোন পক্ষ বিজয়ী হয়, যেন আমরা বিজয়ীদের সঙ্গে মিলে লুটপাট করতে পারি।

আমরা পাহাড়ে থাকা অবস্থায় হঠাৎ একটি মেঘের মতো কিছু কাছে নেমে এলো। আমরা তার মধ্যে ঘোড়ার হ্রেষাধ্বনির মতো শব্দ শুনতে পেলাম।

আমি একজনকে বলতে শুনলাম- আগাও, হায়যূম (হে হায়যূম)!

আমার চাচাতো ভাইয়ের হৃদয়ের পর্দা খুলে গেল (অর্থাৎ সে ভয়ে স্তব্ধ হয়ে পড়ল) এবং সে মারা গেল। আর আমি নিজেও প্রায় ধ্বংস হয়ে যাচ্ছিলাম, পরে কোনোরকমে নিজেকে সামলে নিলাম।

সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা

এটি বদর যুদ্ধের সময় ফেরেশতাদের আগমনের একটি ইঙ্গিত।

حَيْزُوم (হায়যূম) কিছু বর্ণনায় এটি এক ফেরেশতার ঘোড়ার নাম হিসেবে উল্লেখ আছে।

মূল শিক্ষা

বদর যুদ্ধে মুসলমানদের সাহায্যে ফেরেশতারা বাস্তবেই অংশ নিয়েছিলেন। অদৃশ্য জগতের কিছু ঘটনা মানুষ কখনও কখনও অনুভব করতে পারে।আল্লাহর সাহায্য কখন, কীভাবে আসে, তা মানুষের ধারণার বাইরে।

বদর যুদ্ধে রিদওয়ান ফেরেশতার আহ্বান

রিওয়ায়াত: ৫ আবু জাফর (রহ) বলেন: বদরের দিন ‘রিদওয়ান’ নামে একজন আহ্বানকারী ঘোষণা করেছিল-যুলফিকার ছাড়া কোনো তরবারি নেই, আর আলী ছাড়া কোনো বীর নেই।

ফায়দা

রিদওয়ান ইসলামী বিশ্বাস অনুযায়ী একজন সম্মানিত ফেরেশতা, যিনি জান্নাতের প্রধান রক্ষক (দারোয়ান) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

এটি আসমানী (ঐশী) পক্ষ থেকে এক ধরনের সম্মানসূচক ঘোষণা।

আল্লাহর অনুমতিতে ফেরেশতা যুদ্ধের ময়দানে মুসলমানদের মনোবল বাড়ানোর জন্য এই ঘোষণা দিয়েছেন।

রাসূল ﷺ-এর মর্যাদা প্রকাশ

রিওয়ায়াত: ৬ আলী ইবনে আবী তালিব (রা) বলেন: আমি রাসূলুল্লাহ ﷺ এর সাথে মক্কায় ছিলাম। আমরা মক্কার কিছু পাহাড়ি ও গাছপালায় ভরা এলাকায় বের হলাম।

আমরা যখনই কোনো গাছ বা পাহাড়ের পাশ দিয়ে যেতাম, তখন তা বলত-

السَّلَامُ عَلَيْكَ يَا رَسُولَ اللَّهِ

আপনার প্রতি সালাম হে আল্লাহর রাসূল!

ফায়দা

রাসূল ﷺ আল্লাহর কাছে এত সম্মানিত যে, এমনকি জড় প্রকৃতিও তার সম্মান স্বীকার করছে (প্রতীকীভাবে)।

নবী (সা) এর মৃত্যুর পর তার গোসলের ব্যাপারে অদৃশ্য আওয়ায

রিওয়ায়াত: ৭ আয়িশা (রা) বলেন, যখন রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে গোসল দেওয়ার (দাফনের আগে) সময় এলো, তখন সাহাবাদের মধ্যে মতভেদ হলো।

আমি বললাম- আল্লাহর কসম! আমরা কি রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর কাপড় খুলে তাকে সম্পূর্ণ বিবস্ত্র অবস্থায় গোসল দেব, নাকি তার কাপড় পরা অবস্থাতেই গোসল দেব- এ নিয়ে আমরা জানতাম না।

তখন তারা মতভেদ করছিল, এমন সময় আল্লাহ তাদের ওপর ঘুম নাযিল করলেন। ফলে তাদের কেউই এমন ছিল না যার চিবুক বুকের সাথে লেগে যায় (ঘুমে মাথা নুয়ে পড়ে যায়)।

ফেরেশতার আহ্বান 

তারপর ঘরের এক দিক থেকে একজন (ফেরেশতা) বলল, নবী ﷺ-কে তার কাপড়সহই গোসল দাও।

তখন তারা উঠে রাসূল ﷺ-কে তার জামা পরা অবস্থায় গোসল দিলেন। তারা কাপড়ের ওপর দিয়ে পানি ঢালছিলেন এবং কাপড়ের নিচ দিয়ে শরীর ধুচ্ছিলেন।

আয়িশা (রা) বলতেন, আমি যদি আগেই জানতাম যা পরে বুঝেছি, তাহলে তাকে তার স্ত্রীগণই গোসল দিতেন।

📝 ব্যাখ্যা

ঘটনা কী নিয়ে? এটি রাসূল ﷺ-এর ইন্তেকালের পর দাফনের আগে গোসল (গাসল) দেওয়ার ঘটনা।

সাহাবারা চিন্তায় পড়েছিলেন শরীরের কাপড় খুলে গোসল দেবেন? নাকি কাপড় পরা অবস্থায়ই?

ঘুম নেমে আসা: এর অর্থ বর্ণনায় বলা হয়েছে আল্লাহ তাদের ওপর ঘুম নাজিল করলেন। এর অর্থ তন্দ্রাচ্ছন্ন হওয়া। যাতে মন শান্ত হয় এবং ফেরেশতার আহ্বান হৃদয়ঙ্গম করতে সহজ হয়।

কাপড়সহ গোসল কেন? সিদ্ধান্ত ছিল রাসূল ﷺ-এর শরীরকে সম্মান রেখে তাঁর কাপড় না খুলেই গোসল দেওয়া। এটা তাঁর প্রতি সর্বোচ্চ আদব ও সম্মানের প্রকাশ।

আয়িশা (রা.)-এর মন্তব্য: তিনি বলছেন, যদি আগে জানতেন, তাহলে তাঁর স্ত্রীগণই গোসল দিতেন। অর্থাৎ কাজটা আরও ঘনিষ্ঠভাবে পরিবারই করতে পারত, তবে সাহাবাদের সম্মিলিত সিদ্ধান্তে অন্যভাবে হয়েছে।

নবী (সা) এর মৃত্যুর পর অদৃশ্য সান্তনা

রিওয়ায়াত: ৮ হযরত আলী ইবনু আবি তালিব (রা) বলেন- যখন রাসূলুল্লাহ ﷺ ইন্তেকাল করলেন, তখন একজন আগন্তুক এলো— তার শব্দ শোনা যাচ্ছিল, কিন্তু তাকে দেখা যাচ্ছিল না।

সে বলল,  তোমাদের ওপর শান্তি, আল্লাহর রহমত ও বরকত বর্ষিত হোক। নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে  আছে প্রতিটি বিপদের প্রতিদান, প্রতিটি বিনষ্ট জিনিসের বিকল্প এবং যা হারিয়েছে তার প্রতিপূরণ।

অতএব তোমরা আল্লাহর ওপরই ভরসা করো এবং তাঁর কাছেই আশা রাখো।নিশ্চয়ই বঞ্চিত সেই ব্যক্তি, যে সওয়াব থেকে বঞ্চিত হয়। তোমাদের ওপর শান্তি।

ব্যাখ্যা

ঘটনাটির অর্থ: এটি রাসূল ﷺ-এর ইন্তেকালের পরের সময়ের একটি বর্ণনা, যেখানে সাহাবারা গভীর শোকের মধ্যে ছিলেন। তখন এক অদৃশ্য কণ্ঠ তাদেরকে সান্ত্বনা দেয়।

শোনা গেল, দেখা গেল না— এর ব্যাখ্যা: এখানে বলা হয়েছে: শব্দ শোনা যাচ্ছিল কিন্তু কাউকে দেখা যাচ্ছিল না।

এর ব্যাখ্যা কয়েকভাবে করা হয়: এটি ফেরেশতার কণ্ঠ হতে পারে অথবা আল্লাহর পক্ষ থেকে অদৃশ্যভাবে সান্ত্বনা পৌঁছানো।

কথাগুলোর মূল বার্তা

এই কথাগুলো মূলত সান্ত্বনা ও শিক্ষা: সব ক্ষতির বদলা আল্লাহ দেন। যা হারিয়েছে, আল্লাহ তার উত্তম বিকল্প দেন।

আল্লাহর ওপর ভরসা রাখতে হবে। আসল ক্ষতিগ্রস্ত সে, যে সওয়াব (আখিরাতের পুরস্কার) হারায়।

অর্থাৎ, দুনিয়ার ক্ষতির চেয়ে আখিরাতের ক্ষতি বড়।

অনুরূপ ঘটনা

রিওয়ায়ত: ৯ হযরত আলী ইবনে আবি তালিব (রা) বলেন- যখন নবী ﷺ ইন্তেকাল করলেন এবং তাকে একটি কাপড়ে ঢেকে রাখা হলো, তখন ঘরের এক দিক থেকে একজন আহ্বানকারী ডাক দিল। তারা শব্দ শুনছিল, কিন্তু কাউকে দেখতে পাচ্ছিল না।

সে সালাম দিল: তোমাদের ওপর শান্তি, আল্লাহর রহমত ও বরকত বর্ষিত হোক। তোমাদের ওপর শান্তি হে নবী পরিবার!

তখন তারা এর জবাব দিল।

এরপর সে বলল:

كُلُّ نَفْسٍ ذَائِقَةُ الْمَوْتِ

প্রত্যেক প্রাণ মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে।- সূরা,আনকাবূত

এবং বলল, নিশ্চয়ই আল্লাহর নিকট রয়েছে প্রতিটি ধ্বংসের বদলা, প্রতিটি বিপদের সান্ত্বনা, এবং যা হারিয়েছে তার প্রতিপূরণ।

তোমরা আল্লাহর ওপর ভরসা করো এবং তার কাছেই আশা রাখো। নিশ্চয়ই প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত সে, যে সওয়াব থেকে বঞ্চিত হয়।

ফায়দা

সবাইকে মৃত্যু বরণ করতে হবে। আল্লাহই আসল আশ্রয় ও সান্ত্বনা। দুনিয়ার ক্ষতির চেয়ে আখিরাতের সওয়াব বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

আল্লাহর কাছে আছে প্রতিটি বিপদের প্রতিদান

রিওয়ায়াত: ১০ আবু হাজিম মাদানি (রহ) বলেন- যখন রাসূলুল্লাহ ﷺ ইন্তেকাল করলেন, তখন মুহাজিররা দলে দলে প্রবেশ করছিল, নামাজ (জানাজা) আদায় করে বের হয়ে যাচ্ছিল।

তারপর আনসাররা দলে দলে এসে নামাজ পড়ে বের হয়ে গেল। এরপর তাঁর পরিবারের লোকজন প্রবেশ করল।

পুরুষদের কাজ শেষ হলে নারীরা প্রবেশ করল। তাদের মধ্যে কান্না ও শোকের শব্দ ছিল- যেমন সাধারণত হয়ে থাকে। হঠাৎ তারা ঘরের ভিতরে একটি শব্দ শুনল, ফলে তারা চুপ হয়ে গেল।

এরপর তারা একজনের কথা শুনল, কিন্তু কাউকে দেখতে পেল না।

সে বলল, নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে আছে প্রতিটি মৃত্যুর সান্ত্বনা, প্রতিটি বিপদের প্রতিদান এবং যা হারিয়েছে তার পরিবর্তে বিকল্প।

সৌভাগ্যবান সেই ব্যক্তি, যে সওয়াব দ্বারা আনন্দিত হয়,আর প্রকৃত বিপদগ্রস্ত সে, যে সওয়াব থেকে বঞ্চিত হয়।

ফায়দা

আল্লাহই সব কষ্টের আসল সান্ত্বনা। যা হারিয়েছে, আল্লাহ তার উত্তম প্রতিদান দিতে পারেন। দুনিয়ার শোকের চেয়ে আখিরাতের সওয়াব বেশি গুরুত্বপূর্ণ।অর্থাৎ, ধৈর্য ধরলে আখিরাতে পুরস্কার আছে।

জাফর (রা) এর বেহেশতে বেড়ানো

রিওয়ায়াত: ১১ আব্দুল্লাহ ইবনে মুখতার (রহ) থেকে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

আজ রাতে (জান্নাতে) জাফর (রা) আমার পাশ দিয়ে গেলেন— তিনি ফেরেশতাদের সাথে উড়ছিলেন। তাঁর দুটি ডানা ছিল। তাঁর ডানার সামনের অংশ সাদা ছিল এবং তা রক্তে রঞ্জিত ছিল।

আর একটি বর্ণনায় এসেছে- ফেরেশতারা তার পরিবারের লোকদের বৃষ্টির সুসংবাদ দিচ্ছিল।

ব্যাখ্যা

জাফর (রা.) কে ছিলেন? এখানে যিনি উল্লেখিত হয়েছেন তিনি হলেন জাফর ইবনে আবী তালিব (রা)। তিনি ছিলেন রাসূল ﷺ-এর চাচাতো ভাই। একজন সাহসী সাহাবী, মুতা যুদ্ধের শহীদ।

দুটি ডানা নিয়ে উড়া: এর অর্থ বর্ণনায় বলা হয়েছে তিনি ফেরেশতাদের সাথে উড়ছেন এবং তার ডানা আছে। এটি তার শাহাদাতের মর্যাদা বোঝানোর জন্য এসেছে। ইসলামী বিশ্বাস অনুযায়ী শহীদদের বিশেষ মর্যাদা থাকে। কুরআনে বলা হয়েছে শহীদরা “মৃত নয়, বরং জীবিত”

রক্তে রঞ্জিত ডানা মানে কী?

এটি বোঝায়: তিনি যুদ্ধের সময় শহীদ হয়েছেন। তার কুরবানির চিহ্ন এখনো বিদ্যমান। এটি তাঁর ত্যাগ ও রক্তের সাক্ষ্য

বৃষ্টির সুসংবাদ: এই অংশে বলা হয়েছে: ফেরেশতারা তার পরিবারের জন্য বৃষ্টির সুসংবাদ দিচ্ছে। বৃষ্টি সাধারণত রহমত ও বরকতের প্রতীক। শহীদের পরিবারের প্রতি আল্লাহর বিশেষ দয়া বোঝানো হয়েছে।

অদৃশ্য আহ্বানে অনুপ্রাণিত হয়ে রোযার আমল

রিওয়ায়াত: ১২ হযরত আবু মূসা (রা) বলেন—

আমরা সমুদ্রে জিহাদের উদ্দেশ্যে বের হয়েছিলাম। তখন বাতাস অনুকূলে ছিল এবং আমাদের পাল উঁচু করা ছিল। হঠাৎ আমরা একজন ঘোষণাকারীর আওয়াজ শুনলাম—

হে নৌকার লোকেরা! থামো, আমি তোমাদের কিছু জানাবো। সে এভাবে সাতবার ডাক দিল। তখন আবু মূসা (রা.) নৌকার সামনে দাঁড়িয়ে বললেন,

তুমি কে? কোথায় আছো? তুমি কি দেখছো না আমরা কোথায় আছি? আমরা কি থামতে পারি?’

আল্লাহ যা নিজের উপর নির্ধারণ করেছেন

তখন সেই কণ্ঠ উত্তর দিল, আমি কি তোমাদের এমন একটি বিষয় জানাবো, যা আল্লাহ নিজের ওপর নির্ধারণ করেছেন?’

তিনি বললেন: হ্যাঁ, বলো।

সে বলল: নিশ্চয়ই আল্লাহ নিজের ওপর নির্ধারণ করেছেন যে, যে ব্যক্তি আল্লাহর জন্য গরমের দিনে নিজের তৃষ্ণা সহ্য করবে (রোজা রাখবে), আল্লাহ কিয়ামতের দিনে তাকে তৃপ্ত করবেন।

এরপর আবু মূসা (রা) এমন গরম দিন খুঁজে নিতেন, যেদিন প্রচণ্ড গরমে মানুষ কষ্ট পায়, আর সে দিন তিনি রোজা রাখতেন।

📝 ব্যাখ্যা

এটি সমুদ্রযাত্রার একটি ঘটনা, যেখানে সাহাবারা জিহাদের উদ্দেশ্যে যাচ্ছিলেন।হঠাৎ তারা একটি অদৃশ্য কণ্ঠ শুনতে পান।

“অদৃশ্য কণ্ঠ” বিষয়টি: এখানেও বলা হয়েছে- শব্দ শোনা গেছে কিন্তু কাউকে দেখা যায়নি। এই ধরনের বর্ণনাকে বলা হয় হাওয়াতিফ (অদৃশ্য আহ্বান)

ব্যাখ্যা হিসেবে বলা হয়: এটি ফেরেশতার কণ্ঠ হতে পারে অথবা শিক্ষা দেওয়ার জন্য একটি বর্ণনা।

এই হাদিসের আসল শিক্ষা হলো: গরমে রোজা রাখার ফজিলত। যে ব্যক্তি আল্লাহর জন্য কষ্ট সহ্য করে (তৃষ্ণা) আল্লাহ তাকে কিয়ামতের দিন বিশেষ পুরস্কার দেবেন (তৃপ্তি)

আবু মূসা (রা)-এর আমল: এই কথা শোনার পর তিনি ইচ্ছা করে গরম দিনে রোজা রাখতেন। অর্থাৎ তিনি এই শিক্ষাকে বাস্তবে প্রয়োগ করতেন।

ফেরেশতার সাহায্য

রিওয়ায়ত: ১৩ হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) বলেন, রাসূল ﷺ এর একজন সাহাবী ছিলেন, যার উপনাম ছিল আবু মিলাক।

তিনি একজন ব্যবসায়ী ছিলেন- নিজের ও অন্যের সম্পদ নিয়ে ব্যবসা করতেন এবং খুব সততা ও তাকওয়ার সাথে লেনদেন করতেন।

একবার সফরে বের হলে, একজন অস্ত্রধারী ডাকাত তাকে আটকায় এবং বলে, তোমার যা আছে দিয়ে দাও, আমি তোমাকে হত্যা করব।

তিনি বললেন, তুমি আমার রক্ত কেন চাও? মাল নিয়ে নাও। ডাকাত বলল,আমি তোমার রক্তই চাই।

তখন তিনি বললেন, তাহলে আমাকে চার রাকাত নামায পড়তে দাও। ডাকাত অনুমতি দিল। তিনি ওযু করে চার রাকাত নামাজ পড়লেন। শেষ সিজদায় দুআ করলেন-

হে পরম দয়ালু! হে মহিমান্বিত আরশের অধিপতি! হে যা ইচ্ছা তাই করেন! আপনার সেই সম্মান ও ক্ষমতার দোহাই দিয়ে বলছি- এই ডাকাতের অনিষ্ট থেকে আমাকে রক্ষা করুন। হে সাহায্যকারী! আমাকে সাহায্য করুন। (তিনবার)

অদৃশ্য সাহায্য 

তখন হঠাৎ এক ঘোড়সওয়ার এল, হাতে বর্শা। সে এসে ডাকাতকে আঘাত করে হত্যা করল। এরপর সে বলল, উঠুন।

লোকটি বলল, আপনি কে? আজ আল্লাহ আপনাকে দিয়ে আমাকে সাহায্য করেছেন। সে বলল: আমি আসমানের চতুর্থ স্তরের একজন ফেরেশতা।

তুমি প্রথমবার দুআ করলে আসমানের দরজায় শব্দ হলো। দ্বিতীয়বার করলে আসমানের লোকদের মধ্যে আলোড়ন হলো। তৃতীয়বার করলে বলা হলো-এটি এক বিপদগ্রস্ত মানুষের দুআ।

তখন আমি আল্লাহর কাছে চাইলাম যেন আমাকে তাকে সাহায্য করার দায়িত্ব দেওয়া হয়।

আনাস (রা) বলেন- জেনে রাখো, যে ব্যক্তি ওযু করে চার রাকাত নামায পড়ে এই দুআ করবে, সে বিপদে থাকুক বা না থাকুক, তার দুআ কবুল হবে।

ঘটনার শিক্ষা

এই কাহিনীতে কয়েকটি বড় শিক্ষা আছে: বিপদের সময় নামায ও দুআর দিকে ফিরে যাওয়া। আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসা রাখা। আন্তরিক দুআ করলে আল্লাহ সাহায্য করেন।

ফেরেশতার সাহায্য: এখানে বলা হয়েছে, এক ফেরেশতা এসে তাকে রক্ষা করেছে। ইসলামে বিশ্বাস আছে যে, আল্লাহ চাইলে ফেরেশতার মাধ্যমে সাহায্য পাঠাতে পারেন (যেমন বদরের যুদ্ধে ফেরেশতা সাহায্য করেছিলেন)।

সম্পদের সুষম বন্টন ও বরকত

রিওয়ায়াত: ১৪ মাসরূক (রহ) বলেন, আবদুল্লাহ (রা) বলেছেন- তোমাদের আগের যুগের এক ব্যক্তি তার জমিতে কাজ করছিল।

এমন সময় একটি মেঘ তার ওপর দিয়ে গেল। সে সেই মেঘের ভেতর থেকে একটি আওয়াজ শুনল: অমুক ব্যক্তির জমিতে গিয়ে পানি দাও।

তখন সে লোকটি সেই মেঘের ছায়া অনুসরণ করতে লাগল। অবশেষে সে দেখল- একজন লোক তার জমিতে পানি দিচ্ছে এবং জমির চারদিকে পানি প্রবাহিত হচ্ছে।

সে তাকে জিজ্ঞেস করল: তুমি তোমার জমিতে কী করো (কীভাবে পরিচালনা করো)?

লোকটি বলল, যখন ফসল হয়, আমি তা তিন ভাগ করি- এক ভাগ আবার জমিতে লাগাই, এক ভাগ সদকা করি, আর এক ভাগ আমার পরিবারের জন্য রাখি।

মাসরূক বলেন: এরপর আবদুল্লাহ (রা) আমাকে প্রতি বছর তার জমিতে পাঠাতেন, যেন আমি একইভাবে কাজ করি।

ব্যাখ্যা

ঘটনার মূল অর্থ এটি একটি শিক্ষামূলক ঘটনা, যেখানে দেখানো হয়েছে- আল্লাহ কিভাবে একজন সৎ মানুষের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা করেন (এমনকি মেঘকেও নির্দেশ দেন)।

মেঘের নির্দেশের অর্থ: মেঘের ভেতর থেকে বলা হলো, অমুকের জমিতে পানি দাও। অর্থ: আল্লাহ সেই ব্যক্তির কাজের কারণে তাকে বিশেষ রিযিক দিচ্ছেন। তার জমি আলাদা করে বরকতপূর্ণ করা হচ্ছে।

লোকটির কাজ: লোকটি তার ফসল তিন ভাগ করত: এক অংশ আবার জমিতে বিনিয়োগ করতো। এক অংশ আল্লাহর পথে দান (সদকা) করতো আর এক অংশ পরিবারের জন্য ব্যয় করতো।

এই ভারসাম্যই তার বরকতের কারণ।

মূল শিক্ষা

দান করলে সম্পদ কমে না, বরং বরকত বাড়ে।আল্লাহ সৎ মানুষের জন্য অদৃশ্যভাবে সাহায্য করেন।উপার্জনে ভারসাম্য রাখা (নিজে, পরিবার, দান) গুরুত্বপূর্ণ।

সারসংক্ষেপ: একজন সৎ কৃষকের দানের কারণে আল্লাহ তার জমিতে বিশেষ বরকত দিতেন- এটাই এই হাদিসের মূল শিক্ষা।

উমর (রা) এর ইস্তিসকার সালাত আদায়

রিওয়ায়াত: ১৫ উমারী (রহ) থেকে বর্ণিত, খাওয়াত ইবনে জুবাইর (রা) বলেন:

হযরত উমর ইবনে খাত্তাব (রা)-এর শাসনামলে মানুষের উপর কঠিন দুর্ভিক্ষ নেমে আসে। তখন উমর (রা) মানুষদের নিয়ে বের হয়ে তাদের সঙ্গে দুই রাকাত নামাজ আদায় করেন (ইস্তিসকার নামাজ)।

তিনি তার চাদরের দুই প্রান্ত উল্টে দেন—ডান দিকটি বাম দিকে এবং বাম দিকটি ডান দিকে করেন। এরপর তিনি হাত প্রসারিত করে দোয়া করেন:

হে আল্লাহ! আমরা আপনার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছি এবং আপনার নিকট বৃষ্টি প্রার্থনা করছি।

বর্ণনাকারী বলেন: তিনি তার স্থান থেকে সরে যাওয়ার আগেই বৃষ্টি নেমে আসে।

এমন সময় কিছু বেদুঈন (গ্রাম্য আরব) মদিনায় এসে উমর ইবনে খাত্তাব (রা)-এর কাছে উপস্থিত হয়ে বলল:

হে আমীরুল মুমিনীন! আমরা আমাদের উপত্যকায় অমুক দিন অবস্থান করছিলাম, তখন আমাদের উপর একটি মেঘ ছায়া ফেলে এবং আমরা সেই মেঘের ভিতর থেকে একটি আওয়াজ শুনতে পাই, যা বলছিল:

হে আবু হাফস! (উমর [রা] এর উপনাম) তোমার কাছে সাহায্য এসে গেছে! হে আবু হাফস! তোমার কাছে সাহায্য এসে গেছে!

📝 হাদীসের শিক্ষা ও ব্যাখ্যা

বিপদের সময় সম্মিলিতভাবে আল্লাহর দিকে ফিরে আসা

দুর্ভিক্ষের মতো কঠিন পরিস্থিতিতে হযরত উমর (রা) একা দোয়া না করে পুরো মুসলিম সমাজকে নিয়ে নামাজ ও দোয়ার আয়োজন করেছেন। এতে বোঝা যায়, সামষ্টিক ইবাদতের গুরুত্ব অনেক বেশি।

ইস্তিসকার নামাজের সুন্নাহ পদ্ধতি

দুই রাকাত নামাজ আদায় করা এবং চাদর উল্টানো (রিদা পরিবর্তন করা) — এগুলো রাসূল ﷺ থেকে প্রমাণিত সুন্নাহ। এর মাধ্যমে দারিদ্র্য ও কষ্টের অবস্থা পরিবর্তনের প্রতীক প্রকাশ করা হয়।

ইস্তিগফারের গুরুত্ব

দোয়ার মধ্যে “আমরা আপনার কাছে ক্ষমা চাই” — এই অংশটি দেখায়, বৃষ্টির জন্য শুধু প্রার্থনা নয়, বরং গুনাহ থেকে তাওবা করাও জরুরি। কুরআনেও এসেছে, ইস্তিগফার রিজিক ও বৃষ্টির কারণ হতে পারে।

আল্লাহর তাৎক্ষণিক সাড়া

উমর (রা) দোয়া শেষ করার আগেই বৃষ্টি নেমে আসে—এটি আল্লাহর কুদরত ও বান্দার দোয়া কবুল হওয়ার বাস্তব উদাহরণ।

গায়েবি সাহায্যের ইঙ্গিত

বেদুঈনদের শোনা আওয়াজ—“হে আবু হাফস! তোমার কাছে সাহায্য এসেছে”—এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে সাহায্য আগমনের একটি নিদর্শন, যা উমর (রাঃ)-এর মর্যাদা ও দোয়ার কবুল হওয়ার প্রমাণ বহন করে।

নেতৃত্বের দায়িত্ববোধ

একজন ন্যায়পরায়ণ শাসক হিসেবে উমর (রাঃ) নিজে সামনে থেকে মানুষকে নিয়ে আল্লাহর কাছে সাহায্য চেয়েছেন। এতে নেতৃত্বের প্রকৃত দায়িত্ববোধ ফুটে ওঠে।

এই ঘটনা আমাদের শেখায়—বিপদে হতাশ না হয়ে আল্লাহর দিকে ফিরে আসা, তাওবা করা এবং সম্মিলিতভাবে দোয়া করা অত্যন্ত কার্যকর। আন্তরিক দোয়া ও ইস্তিগফার আল্লাহর রহমত লাভের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।

উপসংহার

ইবনে আবিদ দুনইয়া (রহ.) রচিত আল হাওয়াতিফ গ্রন্থের এই অংশগুলো আমাদের সামনে এক গভীর আধ্যাত্মিক শিক্ষা তুলে ধরে।

অদৃশ্য জগতের এই আহ্বানসমূহ মূলত মানুষের অন্তরকে জাগ্রত করার জন্যই বর্ণিত হয়েছে, যাতে বান্দা গাফেলতা থেকে ফিরে এসে আল্লাহর স্মরণ ও আখিরাতমুখী জীবনের দিকে অগ্রসর হয়।

এই রিওয়ায়াতগুলো থেকে স্পষ্টভাবে বুঝা যায়, দুনিয়ার জীবন ক্ষণস্থায়ী, আর প্রকৃত সফলতা হলো তাকওয়া, ইবাদত এবং আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে পরকালীন জীবনের প্রস্তুতি গ্রহণ করা।

আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে এই শিক্ষাগুলো বুঝার, গ্রহণ করার এবং জীবনে বাস্তবায়ন করার তাওফিক দান করুন। আমিন।

🔹🔹🔹

👉 আরও পড়ুন জিন ও শয়তানের কৌশল

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Back to top button
error: Content is protected !!