
সহিহ হাকীম – কিতাবুল ইমান ইসলামি আকীদা ও ঈমানের মৌলিক বিষয়গুলো বোঝার একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস। বিশেষ করে হাদীস ১-৩৩ পর্যন্ত অংশে ঈমানের সংজ্ঞা, তার লক্ষণ, আমলের সাথে ঈমানের সম্পর্ক, এবং একজন মুমিনের অন্তরের অবস্থা অত্যন্ত সুন্দরভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
এই হাদীসগুলো আমাদেরকে শুধু তাত্ত্বিক জ্ঞান দেয় না, বরং দৈনন্দিন জীবনে ঈমানকে বাস্তবায়নের পথও দেখায়।
ইমাম হাকীম নিশাপুরী (রহ.) তার এই গ্রন্থে সহিহ হাদীস সংকলনের মাধ্যমে এমন সব বর্ণনা উপস্থাপন করেছেন, যা মুহাম্মদ (সা.)-এর শিক্ষাকে সুস্পষ্টভাবে প্রতিফলিত করে।
এখানে আলোচিত হাদীসগুলোতে ঈমানের পরিপূর্ণতা, অন্তরের প্রশান্তি, ভালো কাজের প্রতি আগ্রহ এবং গুনাহ থেকে বিরত থাকার গুরুত্ব বিশেষভাবে গুরুত্ব পেয়েছে।
এই আর্টিকেলে আমরা কিতাবুল ইমানের হাদীস ১-৩৩ নিয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা ও ব্যাখ্যা উপস্থাপন করবো, যা পাঠকদের জন্য হবে সহজবোধ্য এবং গবেষণামূলক একটি গাইড।
আপনি যদি ঈমানের প্রকৃত অর্থ, তার লক্ষণ এবং কিভাবে তা জীবনে বাস্তবায়ন করবেন—এসব বিষয়ে জানতে চান, তাহলে এই আলোচনা আপনার জন্য অত্যন্ত উপকারী হবে।
بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ
আল মুস্তাদরাক হাকীম-কিতাবুল ইমান
পরিপূর্ণ ইমানদার
হাদীস: ১ হযরত আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেন-
أَكْمَلُ الْمُؤْمِنِينَ إِيمَانًا أَحْسَنُهُمْ خُلُقًا
মুমিনদের মধ্যে পরিপূর্ণ ইমানদার ঐ ব্যক্তি যার চরিত্র সবচাইতে উত্তম।
হাদীস: ২ হযরত আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেন-
أَكْمَلُ الْمُؤْمِنِينَ إِيمَانًا أَحْسَنُهُمْ خُلُقًا
মুমিনদের মধ্যে পরিপূর্ণ ইমানদার ঐ ব্যক্তি যার চরিত্র সবচাইতে উত্তম।
সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা: এই হাদিসে বলা হয়েছে যে, ঈমান শুধু নামাজ-রোজা বা ইবাদতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং একজন মুমিনের প্রকৃত ঈমান তার আচরণ ও চরিত্রে প্রকাশ পায়।
যার ব্যবহার ভালো, মানুষকে কষ্ট দেয় না, সত্যবাদী, ন্যায়পরায়ণ ও দয়ালু—সেই ব্যক্তি ঈমানের দিক থেকে বেশি পরিপূর্ণ।
ইসলামে উত্তম চরিত্রকে এতটাই গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ ﷺ নিজেই বলেছেন তিনি উত্তম চরিত্র সম্পূর্ণ করার জন্য প্রেরিত হয়েছেন।
সারকথা: ভালো চরিত্র = পরিপূর্ণ ঈমানের অন্যতম প্রধান মানদণ্ড।
হুব্বে ফিল্লাহ
হাদীস: ৩ হযরত আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেন-
مَنْ سَرَّهُ أَنْ يَجِدْ حَلَاوَةَ الْإِيمَانِ، فَلْيُحِبِ الْمَرْءَ لَا يُحِبُّهُ إِلَّا لِلَّهِ
যে ব্যক্তি ইমানের স্বাদ লাভ করে আনন্দিত হতে চায়, তবে সে যেন আল্লাহর জন্যই কাউকে ভালবাসে আর আল্লাহর জন্যই কাউকে ঘৃণা করে।
সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা: এই হাদিসে বলা হয়েছে, প্রকৃত ঈমান তখনই পূর্ণতা পায় যখন মানুষের ভালোবাসা ও ঘৃণার ভিত্তি হয় দুনিয়াবি স্বার্থ নয়, বরং আল্লাহর নির্দেশ।
কাউকে ভালোবাসা হবে তার ঈমান, নেক আমল ও ভালো চরিত্রের কারণে
আর কাউকে অপছন্দ করা হবে তার পাপ ও আল্লাহবিরোধী কাজের কারণে।
এতে ব্যক্তিগত লাভ-ক্ষতি বা আবেগ নয়, বরং আল্লাহর সন্তুষ্টিই মূল মানদণ্ড হয়
এটাই হলো “হুব্বে ফিল্লাহ ও বুগদে ফিল্লাহ”—আল্লাহর জন্য ভালোবাসা ও আল্লাহর জন্য ঘৃণা।
সারকথা: যে ব্যক্তি তার অনুভূতিগুলো আল্লাহর জন্য নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, সে ঈমানের প্রকৃত স্বাদ অনুভব করে।
ইখলাস
হাদীস: ৪ হযরত যায়দ ইবনে আসলাম (রা) তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন। একবার হযরত উমর (রা) মসজিদের দিকে যাচ্ছিলেন, তখন দেখলেন, হযরত মুয়ায (রা) রাসূলূল্লাহ (সা) এর কবরের পাশে বসে কাঁদছেন।
তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, হে মুয়ায! তুমি কেন কাঁদছ? তিনি বললেন, আমাকে ঐ হাদীসটি কাঁদাচ্ছে যা আমি রাসূলুল্লাহ (সা) থেকে শুনেছি।
তিনি ইরশাদ করেছেন- সামান্য রিয়াও শির্ক। আর যে আল্লাহর কোন ওলীর সাথে শত্রুতা করে তবে সে যেন আল্লাহর সাথে যুদ্ধে নামে। আল্লাহ তাআলা এমন লোকদেরকে ভালবাসেন যারা নেক, মুত্তাকী ও নিজেকে গোপনকারী হয়।
তারা এমন যে, তারা যদি অনুপস্থিত থাকে তবে তাদেরকে পাওয়া যায়না আর উপস্থিত থাকলে চেনা যায় না। তাদের অন্তর হিদায়াতের মশাল আর তারা প্রত্যেক অপরিচ্ছন্নতা ও অন্ধকার থেকে বের হয়ে আসেন।
এই হাদিস আমাদের শেখায়—
ইখলাস (নিয়ত পবিত্র রাখা), লোক দেখানো থেকে বাঁচা, এবং আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের সম্মান করা—এগুলোই প্রকৃত ঈমানদারের বৈশিষ্ট্য।
ইমান তাজা করা
হাদীস: ৫ হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস (রা) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেন-
إِنَّ الْإِيمَانَ لَيَخْلَقُ فِي جَوْفِ أَحَدِكُمْ كَمَا يَخْلَقُ الثَّوْبُ الْخَلِقُ، فَاسْأَلُوا اللَّهَ أَنْ يُجَدِّدَ الْإِيمَانَ فِي قُلُوبِكُمْ
তোমাদের মধ্যে ইমানের দুর্বলতা এমনভাবে এসে যায়, যেমনিভাবে কাপড় পুরনো হয়ে যায়। অতএব তোমরা আল্লাহর নিকট দুআ কর, যেন তিনি তোমাদের অন্তরের ইমানকে সজিব ও তরতাজা করে দেন।
সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা এই হাদিসে বোঝানো হয়েছে— মানুষের ঈমান সবসময় একরকম থাকে না; কখনো মজবুত হয়, আবার কখনো দুর্বল হয়
দুনিয়ার ব্যস্ততা, গুনাহ, গাফেলত—এসবের কারণে ঈমান পুরনো কাপড়ের মতো জীর্ণ হয়ে পড়ে। তাই শুধু আমল নয়, দোয়ার মাধ্যমেও ঈমানকে নবায়ন করা জরুরি
করণীয় নিয়মিত দোয়া করা (যেমন: হে আল্লাহ, আমার ঈমানকে শক্তিশালী করুন) কুরআন তিলাওয়াত, জিকির, নেক আমল বৃদ্ধি করা, গুনাহ থেকে দূরে থাকা।
সারকথা ঈমানকে টিকিয়ে রাখতে হলে নিয়মিত যত্ন, আমল এবং দোয়ার মাধ্যমে তা তরতাজা করতে হবে।
অন্তরের মরিচা
হাদীস: ৬ হযরত আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেন- যখন বান্দা গুনাহ করে তখন তার হৃদয়ে একটি কাল দাগ লাগিয়ে দেয়া হয়। যদি সে তওবা করে তবে তা মিটিয়ে দেয়া হয়।
আর যদি সে আরো গুনাহ করে তবে তা আরো সম্প্রসারিত হয়, এমনকি শেষ পর্যন্ত পুরো অন্তরকে আচ্ছন্ন করে নেয়।
এটাই সেই رَانُ – মরীচা, যার ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন-
كَلَّا بَلْ رَانَ عَلَى قُلُوبِهِمْ
কখনো নয়, বরং তাদের অন্তরে মরীচা পড়ে গেছে। – সূরা তাতফীফ:১৪
ফায়দা গুনাহ হৃদয়কে ধীরে ধীরে অন্ধকার করে, আর তওবা সেই হৃদয়কে আবার আলোকিত করে। তাই দেরি না করে দ্রুত তওবা করা জরুরি।
কিয়ামত কখন হবে তা জানা জরুরী নয়
হাদীস: ৭ হযরত আয়িশা (রা) থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) আল্লাহর নিকট কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার ব্যাপারে দীর্ঘ সময় পর্যন্ত জিজ্ঞাসা করতে থাকেন। অতএব এর প্রেক্ষীতে এই আয়াত নাযিল হয়-
فِيمَ أَنْتَ مِنْ ذِكْرَاهَا إِلَى رَبِّكَ مُنْتَهَاهَا
এর আলোচনার সাথে আপনার কি সম্পর্ক? এর চূড়ান্ত জ্ঞান তো আল্লাহর নিকট রয়েছে।– সূরা নাযিআত:৪৩-৪৪
ফায়দা কিয়ামতের সময় জানা নয়, বরং কিয়ামতের জন্য প্রস্তুত হওয়াই মুমিনের আসল কাজ।
যখন বান্দা আল্লাহর একাত্মতা ঘোষণা করে
হাদীস: ৮ হযরত আবু হুরায়রা (রা) এবং হযরত আবু সাঈদ আল খুদরী (রা) থেকে বর্ণিত। তারা উভয়েই রাসূলুল্লাহ (সা) এর খিদমতে উপস্থিত ছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেন- যখন বান্দা বলে-
لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَاللَّهُ أَكْبَرُ
আল্লাহ ব্যতীত কোন মাবুদ নাই, তিনি মহান।
তখন আল্লাহ তাআলা তার সত্যায়নে বলেন- আমার এই বান্দা সত্য বলেছে, সত্যিই আমি ব্যতীত কোন মাবুদ নাই, আমি একক ও অদ্বিতীয়।
আর যখন বান্দা বলে,
لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ
আল্লাহ ব্যতীত কোন মাবুদ নাই, তিনি একক, তার কোন শরীক নাই।
তখন আল্লাহ তাআলা তার সত্যায়নে বলেন- আমার এই বান্দা সত্য বলেছে, সত্যিই আমি ব্যতীত কোন মাবুদ নাই আর আমার কোন শরীক নাই।
আবার যখন কোন বান্দা বলে,
لَا إِلَهَ أَلَا اللَّهُ لَهُ الْمُلْكُ وَلَهُ الْحَمْدُ
আল্লাহ ব্যতীত কোন মাবুদ নাই, রাজত্ব আল্লাহরই, প্রশংসা একমাত্র তারই জন্য।
তখন আল্লাহ তাআলা বলেন- আমার এই বান্দা সত্য বলেছে, সত্যিই আমি ব্যতীত কোন মাবুদ নাই, রাজত্ব আমারই এবং প্রশংসা আমারই জন্য।
আর যখন কোন বান্দা বলে,
لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَلَا حَوْلَ وَلَا قُوَّةَ إِلَّا بِاللَّهِ
আল্লাহ ব্যতীত কোন মাবুদ নাই এবং তার সাহায্য ব্যতীত কোন শক্তি নাই।
তখন আল্লাহ তাআলা বলেন- আমার এই বান্দা সত্য বলেছে, সত্যিই আমি ব্যতীত কোন মাবুদ নাই, আর আমি ব্যতীত না কারো শক্তি আছে না কারো সামর্থ্য।
ফায়দা বান্দা যখন আল্লাহর একাত্মতা ও মহত্ব বর্ণনা করে তখন আল্লাহ তার প্রতি প্রসন্ন হন।
আল্লাহর নামের মুকাবেলায় কোন জিনিসই ভারি হতে পারে না
হাদীস: ৯ হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মুয়াফিরী থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন- আমি আবদুল্লাহ ইবন আমর ইবনুল আস (রা) কে বলতে শুনেছি, রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেন-
আল্লাহ তা’আলা কিয়ামতের দিন আমার উম্মতের এক ব্যক্তিকে সমস্ত সৃষ্টির সমক্ষে আলাদা করে এনে হাযির করবেন। তার সামনে নিরানববইটি (আমলের) নিবন্ধন খাতা খুলে দিবেন, যার সব একই রকম হবে।
এরপর তিনি তাকে বলবেন, এর একটি কিছুও কি অস্বীকার করতে পার? আমার সংরক্ষণকারী লিপিকারগণ (কিরামান কাতিবীন) কি তোমার উপর কোন যুলুম করেছে?
লোকটি বলবে- না, হে আমার পরওয়ারদিগার। আল্লাহ তা’আলা বলবেন, তোমার কিছু বলার আছে কি? লোকটি বলবে- না, হে পরওয়ারদিগার।
তিনি বলবেন- হ্যাঁ, আমার কাছে তোমার একটি নেকী আছে। আজ তোমার উপর কোন যুলুম করা হবে না। তখন একটি ছোট কাগজের টুকরা বের করা হবে। এতে আছে-
أَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ، وَأَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُولُهُ
আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ব্যতীত কোন ইলাহ নেই। আরো সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মাদ (সা) তাঁর বান্দা ও রাসূল।
তখন লোকটি বলবে, হে আমার রব! এই একটি ছোট টুকরা এত বড় দফতরের সামনে কি ভূমিকা রাখে? অর্থাৎ তা তো কিছুই নয়। তখন তাকে বলা হবে, আজ তোমার উপর কোন যুলুম করা হবে না।
রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন- অনন্তর সবগুলো নিবন্ধন খাতা এক পাল্লায় রাখা হবে আর কাগজের ছোট সেই টুকরাটিকে আরেক পাল্লায় রাখা হবে।
তখন সবগুলো দপ্তর হালকা হয়ে যাবে আর কাগজের ছোট টুকরাটিই ভারি হয়ে যাবে। আল্লাহর নামের মুকাবেলায় কোন জিনিসই ভারি হতে পারে না।
ফায়দা খাঁটি তাওহীদ ও আন্তরিক ঈমান—এটাই মানুষের সবচেয়ে বড় সম্পদ, যা কিয়ামতের দিন মুক্তির কারণ হতে পারে।
দল-উপদলের নিন্দা
হাদীস: ১০ হযরত আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেন-
افْتَرَقَتِ الْيَهُودُ عَلَى إِحْدَى وَسَبْعِينَ فِرْقَةً أَوِ اثْنَتَيْنِ وَسَبْعِينَ فِرْقَةً، وَالنَّصَارَى مِثْلُ ذَلِكَ، وَتَفْتَرِقُ أُمَّتِي عَلَى ثَلَاثٍ وَسَبْعِينَ فِرْقَةً
ইহুদীরা একাত্তর অথবা বাহাত্তর দলে বিভক্ত হয়েছিল। অনুরুপ নাসারা বা খ্রিষ্টানরাও বিভক্ত হয়েছে। আর আমার উম্মত তিহাত্তর দলে বিভক্ত হবে।
ফায়দা দল-উপদল নয়, বরং কুরআন ও সুন্নাহর সঠিক পথে থাকা—এটাই মুক্তির পথ।
নামায- ইমান ও কুফর পার্থক্যকারী
হাদীস: ১১ হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে বুরায়দা (রা) তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন- রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেন-
الْعَهْدُ الَّذِي بَيْنَنَا وَبَيْنَهُمُ الصَّلَاةُ، فَمَنْ تَرَكَهَا فَقَدْ كَفَرَ
আমাদের মধ্যে ও তাদের (কাফিরদের) মধ্যে নামাযই পার্থক্যকারী। অতএব যে তা ছেড়ে দিবে, সে কাফির।
ব্যাখ্যা নামায ইসলাম ধর্মের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আমলগুলোর একটি এবং এটি মুসলমান ও অমুসলিমের মাঝে প্রধান পার্থক্য নির্ধারণ করে।
রাসূলুল্লাহ (সা) এখানে বোঝাতে চেয়েছেন—যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে নামায ছেড়ে দেয়, সে অত্যন্ত গুরুতর গুনাহে লিপ্ত হয়।
হাদীস: ১২ হযরত আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন-
كَانَ أَصْحَابُ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لَا يَرَوْنَ شَيْئًا مِنَ الْأَعْمَالِ تَرْكُهُ كُفْرًا غَيْرَ الصَّلَاةِ
সাহাবায়ে কিরাম (রা) নামায পরিত্যাগ করা ব্যতীত আর কোন আমল পরিত্যাগ করাকে কুফর মনে করতেন না।
আল্লাহ তাআলার ক্ষমা পরায়ণতা
হাদীস: ১৩ হযরত আলী ইবন আবূ তালিব (রা) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেন-
কেউ যদি গুনাহে লিপ্ত হয় এবং দুনিয়াতেই তার শাস্তি হয়ে যায় তবে আখিরাতে দ্বিতীয়বার তাঁর এই বান্দাকে শাস্তি প্রদানের বিষয়ে আল্লাহ তা’আলা তো বেশী ন্যায়নিষ্ঠ অর্থাৎ তিনি তাকে পুনরায় শাস্তি দিবেন না।
আর কেউ যদি হদযোগ্য কোন গুনাহ করে ফেলে আর আল্লাহ তা’আলা তার বিষয়টি গোপন করে রাখেন এবং মাফ করে দেন।
তবে মাফ করে দেওয়ার পর পুনরায় সেই বিষয়ে শাস্তি প্রদানের ব্যপারে আল্লাহ তা’আলা তো আরো অধিক দয়াবান। অর্থাৎ তার ক্ষমাপরায়ণতার জন্য তিনি তাকে শাস্তি দিবেন না।
সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা এই হাদীসে আল্লাহর ন্যায়বিচার ও দয়া—দুটিই সুন্দরভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
১. দুনিয়াতে শাস্তি পেলে: কোনো ব্যক্তি গুনাহ করে এবং তার শাস্তি দুনিয়াতেই (হদ বা অন্যভাবে) পেয়ে যায়, তাহলে আখিরাতে তাকে আবার একই গুনাহের জন্য শাস্তি দেওয়া হবে না। কারণ আল্লাহ তা’আলা সর্বাধিক ন্যায়পরায়ণ—এক অপরাধে দুইবার শাস্তি দেন না।
২. গুনাহ গোপন ও মাফ হলে: যদি কেউ গুনাহ করে কিন্তু আল্লাহ তা গোপন রাখেন এবং ক্ষমা করে দেন, তাহলে আখিরাতে আবার সেই গুনাহ নিয়ে তাকে শাস্তি দেবেন না। কারণ আল্লাহ সবচেয়ে দয়ালু—ক্ষমা করার পর আবার শাস্তি দেওয়া তাঁর শানের পরিপন্থী।
আল্লাহ তার প্রিয় বান্দাদেরকে হিফাযত করেন
হাদীস: ১৪ হযরত ইয়াস বিন সালামাহ (রা) বলেন। আমাকে আমার পিতা বলেছেন যে, তিনি রাসূলুল্লাহ (সা) এর সাথে ছিলেন। এমন সময় এক ব্যক্তি তার গর্ভবতী ঘোড়ীসহ আগমন করে, যার সাথে তার (অন্য) বাছুরও ছিল।
সে জিজ্ঞাসা করল, আপনি কে? তিনি (সা) বললেন, আমি আল্লাহর নবী। সে বলল, নবী কে হয়? তিনি (সা) বললেন, যিনি আল্লাহর প্রেরিত হন।
সে আবার জিজ্ঞাসা করল, কিয়ামত কবে হবে? তিনি (সা) বললেন, এটা অজানা বিষয় যা আল্লাহ ব্যতীত কেউ জানে না।
সে বলল, আমাকে আপনার তলোয়ার দেখান। নবী (সা) তার তলোয়ার তাকে দিলেন। লোকটি তা ঝাঁকিয়ে ফিরিয়ে দিল। রাসূলুল্লাহ (সা) বললেন, যা তোমার ইচ্ছা ছিল তা তুমি পুরা করতে পারবে না।
সে বলল, এটা হয়েছে তিনি বললেন, তার নিকট গিয়ে এই নিদর্শন সম্পর্কে জিজ্ঞাসা কর।
সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা:
এই হাদীসে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা একসাথে পাওয়া যায়—
১. কিয়ামতের জ্ঞান একমাত্র আল্লাহর কাছে: লোকটি যখন কিয়ামত সম্পর্কে জানতে চাইল, রাসূলুল্লাহ (সা) স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিলেন—এটি গায়েবের বিষয়, যা আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না।
শিক্ষা: গায়েবের জ্ঞান আল্লাহর জন্যই নির্দিষ্ট।
২. নবী (সা)-এর সরলতা ও ভরসা: লোকটি তলোয়ার দেখতে চাইলে তিনি তা দিয়ে দিলেন। এতে তাঁর সাহস, আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসা এবং উদারতা প্রকাশ পায়।
৩. আল্লাহর হেফাজত: লোকটির খারাপ উদ্দেশ্য থাকলেও সে তা বাস্তবায়ন করতে পারেনি। রাসূলুল্লাহ (সা) বললেন—“তুমি যা চেয়েছিলে তা পারবে না।”
শিক্ষা: আল্লাহ তাঁর প্রিয় বান্দাকে বিপদ থেকে রক্ষা করেন।
৪. মানুষের অন্তরের খবর আল্লাহ জানেন: নবী (সা) বুঝতে পেরেছিলেন লোকটির অন্তরের ইচ্ছা, যা আল্লাহর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল।
জ্যোতিষীর কথায় বিশ্বাস করা কুফর
হাদীস: ১৫ হযরত আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেন-
مَنْ أَتَى عَرَّافًا أَوْ كَاهِنًا فَصَدَّقَهُ فِيمَا يَقُولُ، فَقَدْ كَفَرَ بِمَا أُنْزِلَ عَلَى مُحَمَّدٍ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ
যে ব্যক্তি কোন জ্যোতিষী অথবা কোন ভবিষ্যদ্বক্তার কাছে গেল, আর সে যা বলে তা সত্য মনে করল, তবে সে মুহাম্মমদ (সা) এর উপর নাযিলকৃত দীনকে অস্বীকার করল।
সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা:
১. গায়েবের জ্ঞান শুধু আল্লাহর: জ্যোতিষী, গণক বা ভবিষ্যদ্বক্তারা গায়েব জানে—এটা বিশ্বাস করা ইসলামের মূল আকীদার বিরুদ্ধে। কারণ গায়েবের জ্ঞান একমাত্র আল্লাহর জন্য নির্দিষ্ট।
২. বিশ্বাস করলে কুফরের আশঙ্কা: হাদীসে বলা হয়েছে—যে ব্যক্তি তাদের কথা সত্য মনে করে, সে যেন রাসূল (সা)-এর উপর নাযিলকৃত শরীয়তকে অস্বীকার করল। কারণ কুরআন-সুন্নাহ স্পষ্টভাবে বলে—মানুষ গায়েব জানে না।
৩. শুধু যাওয়া বনাম বিশ্বাস করা: শুধু কৌতূহলবশত গেলে গুনাহ হবে। কিন্তু তাদের কথা বিশ্বাস করলে তা মারাত্মক, এমনকি কুফরের পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে
মূল শিক্ষা: জ্যোতিষ, রাশিফল, ভাগ্য গণনা—এসব থেকে দূরে থাকতে হবে। ঈমান রক্ষা করতে হলে গায়েবের জ্ঞান একমাত্র আল্লাহর—এটা দৃঢ়ভাবে মানতে হবে।
আন্তরিক ঈমানসহ মৃত্যু
হাদীস: ১৬ হযরত মুয়ায ইবন জাবাল (রা) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেন-
مَا عَلَى الْأَرْضِ نَفْسٌ تَمُوتُ لَا تُشْرِكُ بِاللَّهِ شَيْئًا تَشْهَدُ أَنِّي رَسُولُ اللَّهِ، يَرْجِعُ ذَلِكَ إِلَى قَلْبٍ مُوقِنٍ إِلَّا غَفَرَ اللَّهُ لَهَا
যে ব্যক্তি এই যমীনে শিরক না করে মৃত্যুবরণ করে, আমার ব্যাপারে এই সাক্ষ্য দেয় যে আমি [মুহাম্মদ (সা)] আল্লাহর রাসূল, আর অন্তর থেকে এর প্রতি ইয়াকীন রাখে, তবে আল্লাহ তাআলা তাকে ক্ষমা করে দিবেন।
ফায়দা: শিরকমুক্ত ও আন্তরিক ঈমানসহ মৃত্যু—এটাই চূড়ান্ত সফলতার চাবিকাঠি।
ইমানের দুটি শাখা
হাদীস: ১৭ হযরত আবু উমামা বাহিলী (রা) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেন-
الْحَيَاءُ وَالْعِيُّ شُعْبَتَانِ مِنَ الْإِيمَانِ، وَالْبَذَاءُ وَالْبَيَانُ شُعْبَتَانِ مِنَ النِّفَاقِ
লজ্জাশীলতা এবং স্বল্পভাষী হওয়া ইমানের দুটি শাখা। আর অশ্লিলতা ও বাচালতা নিফাকের দুটি শাখা।
সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা
১. লজ্জা (হায়া) ঈমানের অংশ: ভালো লজ্জা মানুষকে গুনাহ থেকে বিরত রাখে এবং শালীনতা শেখায়—এটি ঈমানের গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন।
২. ‘আয়্য’ (সংযত কথা বলা): এখানে কম কথা বলা মানে অজ্ঞতা নয়; বরং অপ্রয়োজনীয় ও ক্ষতিকর কথা থেকে নিজেকে বিরত রাখা।
৩. অশ্লীলতা (বাযা): খারাপ ভাষা, গালি, অশোভন কথা—এসব মুনাফিকের স্বভাব।
৪. ‘বায়ান’ (অতিরিক্ত বাগাড়ম্বর): এখানে উদ্দেশ্য ভালোভাবে কথা বলা নয়; বরং অহংকার, বাড়াবাড়ি ও মানুষকে প্রভাবিত করার জন্য অতিরিক্ত কথার ব্যবহার।
মূল শিক্ষা শালীনতা ও সংযম ঈমানকে শক্তিশালী করে। অশ্লীলতা ও অহংকারী কথাবার্তা থেকে দূরে থাকতে হবে
সংক্ষেপে একজন মুমিনের ভাষা ও আচরণ হয় নম্র ও সংযত, আর মুনাফিকের বৈশিষ্ট্য হয় অশ্লীল ও বাড়াবাড়ি কথাবার্তা।
অনাড়ম্বর জীবন যাপন
হাদীস: ১৮ হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আবু উমামা (রা) তার পিতা থেকে থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন- রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেছেন-
الْبَذَاذَةُ مِنَ الْإِيمَانِ، الْبَذَاذَةُ مِنَ الْإِيمَانِ
অনাড়ম্বর (সরল) জীবন যাপন ইমানের প্রতিক। অনাড়ম্বর জীবন যাপন ইমানের প্রতিক।
সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা
‘বযাযাহ’ (البذاذة) অর্থ কী? এখানে এর অর্থ হলো—অহংকারহীন, সরল ও সাধারণ জীবনযাপন; বিলাসিতা ও চাকচিক্য থেকে দূরে থাকা।
কী বোঝানো হয়েছে? রাসূলুল্লাহ (সা) শিখিয়েছেন—অতিরিক্ত বাহ্যিক চাকচিক্য, অহংকারপূর্ণ সাজসজ্জা নয়; বরং বিনয়ী, সহজ-সরল জীবনই একজন মুমিনের বৈশিষ্ট্য।
সতর্কতা এটা অগোছালো বা অপরিচ্ছন্ন থাকার কথা নয়। ইসলাম পরিচ্ছন্নতা ও পরিপাটিকেও গুরুত্ব দেয়।
উদ্দেশ্য হলো: অহংকার ত্যাগ করা, সরলতা গ্রহণ করা।
মূল শিক্ষা বিনয় ও সরলতা ঈমানকে শক্তিশালী করে, বিলাসিতা ও অহংকার থেকে দূরে থাকতে হবে।
সংক্ষেপে একজন মুমিনের জীবন হয় পরিমিত, পরিচ্ছন্ন ও অহংকারমুক্ত—এই সরলতাই ঈমানের সৌন্দর্য।
যে আমল করলে জান্নাতে যাওয়া যাবে
১৯. হযরত আবু উমামা বাহিলী (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সা) কে বিদায় হজে বলতে শুনেছি-
اعْبُدُوا رَبُّكُمْ، وَصَلُّوا خَمْسَكُمْ، وَصُومُوا شَهْرِكُمْ، وَأَدُّوا زَكَاةَ أَمْوَالِكُمْ، وَأَطِيعُوا ذَا أَمْرِكُمْ تَدْخُلُوا جَنَّةَ رَبِّكُمْ
তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের ইবাদত কর। পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আদায় কর। রমাযান মাসের রোযা রাখ। তোমাদের সম্পদের যাকাত আদায় কর। আমীরের নির্দেশ মান্য কর। তাহলে তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে।
ফায়দা তাওহীদ, সালাত, রোযা, যাকাত ও নেতৃত্বের আনুগত্য—এই পাঁচটি মূল ভিত্তি একজন মুসলমানকে জান্নাতের দিকে নিয়ে যায়।
নয়টি নিদর্শন
হাদীস: ২০ হযরত সাফওয়ান ইবন আসসাল (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক ইহুদী তার অপর আর এক সাথি ইহুদীকে বললো- আমার সাথে চল, আমরা এই নবীকে এই আয়াতের ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করব-
وَلَقَدْ آتَيْنَا مُوسَى تِسْعَ آيَاتٍ بَيِّنَاتٍ
নিশ্চয়ই আমি মূসাকে নয়টি স্পষ্ট নির্দশন প্রদান করেছিলাম।- ইসরা:১০১
সে বললো- তাকে নবী বলো না, যদি সে তোমার কথা শুনতে পায়, তবে খুশীতে আত্মহারা হয়ে যাবে।
এরপর তারা রাসুলুল্লাহ (সা) এর নিকট এসে জিজ্ঞাসা করলে রাসুলুলল্লাহ (সা) বললেন (সেগুলো হলো)-
১.আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক করো না।
২.চুরি করো না।
৩.ব্যভিচার করো না।
৪.আল্লাহ যার হত্যা হারাম করেছেন অন্যায়ভাবে তাকে হত্যা করো না।
৫.যাদু করো না।
৬.সুদ খেয়ো না।
৭.কাউকে হত্যা করার (বা শাস্তির) জন্য হাকিমের কাছে নিও না।
৮.পবিত্র নারীদেরকে ব্যভিচারের অপবাদ দিও না।
৯.আর হে ইহুদীরা! একটি আদেশ তো বিশেষভাবে তোমাদের জন্য যে, তোমরা শনিবারের ব্যাপারে সীমালংঘন করো না।
একথা শুনে উভয় ইহুদী তার হাত পায়ে চুমু খেয়ে আরয করল- আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আপনি নবী। তিনি (সা) বললেন, তাহলে মুসলমান হওয়াতে তোমাদের বাঁধা কোথায়?
তারা বললো, হযরত দাউদ (আ) দুআ করেছিলেন যে, তার বংশে যেন নবী হতে থাকে। তাই আমরা ভয় করছি (এর জন্য) ইহুদীরা আমাদেরকে হত্যা করবে।
মূল শিক্ষা ইসলামের মৌলিক শিক্ষা ন্যায়, পবিত্রতা ও তাওহীদ। সব নবীর দাওয়াত একই মূলনীতির ওপর। সত্য বুঝলেও অনেক সময় মানুষ অহংকার বা ভয় থেকে তা গ্রহণ করে না।
প্রতিবেশীকে কষ্ট না দেয়া
হাদীস: ২১ হযরত আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত। রাসুলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেন-
আল্লাহর শপথ! ঐ ব্যক্তি মুমিন নয়। আল্লাহর শপথ! ঐ ব্যক্তি মুমিন নয়। আল্লাহর শপথ! ঐ ব্যক্তি মুমিন নয়। সাহাবীগণ জিজ্ঞাসা করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! কে সে? তিনি বললেন,
جَارٌ لَا يَأْمَنُ جَارُهُ بَوَائِقَهُ
যে ব্যক্তির প্রতিবেশী তার অসদাচরণ থেকে নিরাপদ থাকে না।
জিজ্ঞাসা করা হলো, কি অসদচারণ? তিনি (সা) বললেন, তার অনিষ্ট।
(অপর সূত্রে) হযরত আবু হুরায়রা (রা) নবী (সা) থেকে বর্ণনা করেন-
لَا يَدْخُلُ الْجَنَّةَ مَنْ لَا يَأْمَنُ جَارُهُ بَوَائِقَهُ
ঐ ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করবে না, যার অনিষ্ট থেকে তার প্রতিবেশী নিরপদ নয়।
মূল শিক্ষা: প্রতিবেশীর নিরাপত্তা ও শান্তি নিশ্চিত করা ঈমানের দাবি। কারো ক্ষতি করা ঈমানের পরিপন্থী। ভালো চরিত্র ছাড়া পূর্ণ ঈমান অর্জন সম্ভব নয়।
প্রকৃত মুসলিম
হাদীস: ২২ হযরত আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত। রাসুলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেন-
الْمُسْلِمُ مَنْ سَلِمَ الْمُسْلِمُونَ مِنْ لِسَانِهِ وَيَدِهِ، وَالْمُؤْمِنُ مَنْ أَمِنَهُ النَّاسُ عَلَى دِمَائِهِمْ وَأَمْوَالِهِمْ
মুসলমান ঐ ব্যক্তি যার যবান ও হাত থেকে অপর মুসলমান নিরাপদ থাকে। আর মুমিন ঐ ব্যক্তি যার থেকে মানুষের জান ও মাল নিরাপদ থাকে।
হাদীস: ২৩ হযরত জাবির (রা) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করন-
أَكْمَلُ الْمُؤْمِنِينَ مَنْ سَلِمَ الْمُسْلِمُونَ مِنْ لِسَانِهِ وَيَدِهِ
পূর্ণ ইমানদার ঐ ব্যক্তি- যার যবান ও হাত থেকে অপর মুসলমান নিরাপদ থাকে।
মূল শিক্ষা: যবান ও হাত নিয়ন্ত্রণ করা ঈমানের গুরুত্বপূর্ণ অংশ
অন্যের জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ফরজ দায়িত্বের মতো
ভালো চরিত্র ছাড়া প্রকৃত মুসলমান/মুমিন হওয়া সম্ভব নয়।
হাদীস: ২৪ হযরত ফাযালা ইবনে উবাইদ (রা) থেকে বর্ণিত। রাসূলুলল্লাহ (সা) বিদায় হজের সময় বলেছেন- আমি কি তোমাদেরকে মুমিনের পরিচয় বলব না?
মুমিন তো ঐ ব্যক্তি- যার থেকে মানুষের জান ও মাল নিরাপদ থাকে। মুসলমান ঐ ব্যক্তি- যার যবান ও হাত থেকে অপর মুসলমান নিরাপদ থাকে।
মুজাহিদ ঐ ব্যক্তি- যে ইবাদতের জন্য নিজের নফসের সাথে জিহাদ করে। আর মুহাজির ঐ ব্যক্তি যে গুনাহ ও পাপ কাজ ছেড়ে দেয়।
ফায়দা প্রকৃত মুমিন, মুসলমান, মুজাহিদ ও মুহাজির—সবকিছুর কেন্দ্র হলো: মানুষকে কষ্ট না দেওয়া, নিজের নফসকে নিয়ন্ত্রণ করা এবং গুনাহ থেকে দূরে থাকা।
যার থেকে মানুষ নিরাপদ থাকে
হাদীস: ২৫ হযরত জাবির (রা) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেন-
الْمُؤْمِنُ مَنْ أَمِنَهُ النَّاسُ، وَالْمُسْلِمُ مَنْ سَلِمَ الْمُسْلِمُونَ مِنْ لِسَانِهِ وَيَدِهِ، وَالْمُهَاجِرُ مَنْ هَجَرَ السُّوءَ، وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ لَا يَدْخُلُ الْجَنَّةَ عَبْدٌ لَا يَأْمَنُ جَارُهُ بَوَائِقَهُ
মুমিন ঐ ব্যক্তি- যার থেকে মানুষ নিরাপদ থাকে। মুসলমান ঐ ব্যক্তি- যার যবান ও হাত থেকে অপর মুসলমান নিরাপদ থাকে। আর মুহাজির ঐ ব্যক্তি যে গুনাহ ও পাপ কাজ ছেড়ে দেয়।
আল্লাহর শপথ! যার নিয়ন্ত্রণে আমার প্রাণ! ঐ বান্দা জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না, যার অনিষ্ট থেকে তার প্রতিবেশী নিরপদ নয়।
ফায়দা: একজন সত্যিকারের মুমিন সে-ই, যার থেকে মানুষ নিরাপদ, যে গুনাহ ছেড়ে দেয় এবং যার প্রতিবেশী তার আচরণে নিশ্চিন্ত থাকে।
রাসুলুল্লাহ (সা) এর খুতবা
হাদীস ২৬ হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আমর (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) আমাদেরকে খুতবায় বলেছেন-
তোমরা যুলুম থেকে বাঁচ, কেননা যুলুম কিয়ামতের দিন অন্ধকার রূপ ধারণ করবে। তোমরা অশ্লিলতা ও বেহুদা কথাবার্তা থেকে বাঁচ।
তোমরা লোভ লালসা থেকে বাঁচ। কেননা তা তোমাদের পূর্ববর্তীদেরকে ধ্বংস করেছে। এটা মানুষকে সম্পর্ক ছিন্ন করতে উৎসাহিত করে, ফলে মানুষ সম্পর্ক ছিন্ন করে।
এটা মানুষকে কৃপণতা করতে নির্দেশ দেয়, ফলে মানুষ কৃপণতা করে। আর এটা মানুষকে গুনাহ ও পাপ কাজের দিকে ধাবিত করে, ফলে মানুষ গুনাহ ও পাপ কাজে জড়িয়ে পড়ে।
তখন দাড়ানো এক ব্যক্তি জিজ্ঞাসা করল, ইয়া রাসূলাল্লাহ! কোন ইসলাম উত্তম? তিনি বললেন, তোমার যবান ও হাত থেকে অপর মুসলমান নিরাপদ থাকা।
অপর এক ব্যক্তি জিজ্ঞাসা করল, ইয়া রাসূলাল্লাহ! কোন হিজরত উত্তম? তিনি বললেন, তুমি সেসব কিছু ছেড়ে দিবে যা তোমার প্রতিপালক অপছন্দ করে।
হিজরত দুই ধরণের। শহুরে লোকের হিজরত এবং গ্রামীণ লোকের হিজরত। গ্রামীণ লোকের হিজরত হলো এই যে, যখন তাকে আহ্বান করা হয় তখন সাড়া দেয় আর যখন আদেশ করা হয় তখন মেনে নেয়। আর শহুরে লোকের হিজরতে তার পরীক্ষাও বেশী এবং প্রতিদানও বেশী।
ফায়দা এই হাদীস মানুষকে শুদ্ধ চরিত্র, আত্মসংযম এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে চলার পূর্ণ দিকনির্দেশনা দেয়।
২৭.হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আমর (রা) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেন- তোমরা যুলুম থেকে বাঁচ। অতঃপর দীর্ঘ হাদীস বর্ণনা করেন।
তোমরা যুলুম থেকে বাঁচ
হাদীস: ২৮ হযরত আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেন- তোমরা অশ্লীলতা ও বেহুদা কথাবার্তা থেকে বাঁচ। কেননা আল্লাহ তাআলা অশ্লীলতা ও বেহুদা কথাবার্তা পছন্দ করেন না।
তোমরা যুলুম থেকে বাঁচ, কেননা যুলুম কিয়ামতের দিন অন্ধকার রূপ ধারণ করবে।
তোমরা কৃপণতা ও লোভ লালসা থেকে বাঁচ। কেননা এটা তোমাদের পূর্ববর্তীদেরকে পরস্পরের রক্তপাত ঘটাতে আহ্বান করেছে।
এটা তোমাদের পূর্ববর্তীদেরকে সম্পর্ক ছিন্ন করতে আহ্বান করেছে। এটা তোমাদের পূর্ববর্তীদেরকে হারামকৃত জিনিসকে হালাল করতে আহ্বান করেছে।
ফায়দা অশ্লীলতা, যুলুম ও লোভ—এই তিনটি বড় দোষ থেকে বাঁচলেই ব্যক্তি ও সমাজ নিরাপদ ও সুন্দর থাকে।
মুমিনের চরিত্র
হাদীস: ২৯ হযরত আবদুল্লাহ (রা) নবী (সা) থেকে বর্ণনা করেন।, তিনি বলেছেন-
لَيْسَ الْمُؤْمِنُ بِالطَّعَّانِ، وَلَا اللِّعَانِ، وَلَا الْفَاحِشِ، وَلَا الْبَذِيءِ
মু’মিন ব্যক্তি খোঁটা দানকারী, অভিসম্পাতকারী, অশ্লীল এবং অশ্লীলভাষী ও নোংড়া স্বভাব বিশিষ্ট হয় না।
মূল শিক্ষা: কটু কথা, গালি ও অপমান থেকে দূরে থাকতে হবে। ভাষা ও আচরণ সুন্দর করা ঈমানের দাবি
হাদীস: ৩০ আবদুল্লাহ (রা) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেন- মু’মিন ব্যক্তি খোঁটা দানকারী, অভিসম্পাতকারী, অশ্লীল কর্মকারী এবং অশ্লীলভাষী ও খারাপ চরিত্রের হয় না।
সংক্ষেপে একজন সত্যিকারের মুমিন কখনো খারাপ ভাষা ও অশ্লীল আচরণ করে না; তার চরিত্র হয় নম্র, শালীন ও পরিশুদ্ধ।
আঘাত দিবে না
হাদীস: ৩১ হযরত আবদুল্লাহ (রা) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেন-
الْمُؤْمِنُ لَيْسَ بِالطَّعَّانِ، وَلَا الْفَاحِشِ، وَلَا الْبَذِيءِ
মু’মিন ব্যক্তি দোষারোপকারী বা আঘাতদানকারী, অশ্লীল কর্মকারী এবং অশ্লীলভাষী ও খারাপ চরিত্রের হয় না।
ফায়দা ভালো চরিত্রই প্রকৃত ঈমানের নিদর্শন। শুধু ইবাদত নয়—ভদ্রতা, নম্রতা ও শালীনতাও ঈমানের অপরিহার্য অংশ।
ইমানদারের পরিচয়
হাদীস: ৩২ হযরত আবু মূসা আল আশআরী (রা) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেন-
مَنْ عَمِلَ سَيِّئَةً فَكَرِهَهَا حِينَ يَعْمَلُ، وَعَمِلَ حَسَنَةً فَسُرَّ بِهَا فَهُوَ مُؤْمِنٌ
যে ব্যক্তি মন্দ কাজ করার সময় তা খারাপ মনে করে, আর নেককাজ তাকে আনন্দিত করে তবে সে মুমিন।
মূল শিক্ষা: গুনাহকে খারাপ মনে করা ঈমানের চিহ্ন। নেককাজে আনন্দ পাওয়া ঈমানের শক্তির লক্ষণ। হৃদয়ের অবস্থা ঠিক রাখা জরুরি। যার অন্তর গুনাহে অশান্ত হয় এবং নেককাজে খুশি হয়—সে-ই প্রকৃত মুমিন।
নেককাজ যখন আনন্দ দেয়
হাদীস: ৩৩ হযরত আবু উমামা (রা) থেকে বর্ণিত। এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সা) কে জিজ্ঞাসা করল, ইয়া রাসূলাল্লাহ! ইমান কি? তিনি (সা) বললেন,
إِذَا سَرَّتْكَ حَسَنَتُكَ وَسَاءَتْكَ سَيِّئَتُكَ فَأَنْتَ مُؤْمِنٌ
যখন তুমি নেককাজ করার দ্বারা খুশি অনুভব কর এবং মন্দ কাজ করার দ্বারা দুঃখিত হও, তখন তুমি মুমিন।
সে জিজ্ঞাসা করল, ইয়া রাসূলাল্লাহ! গুনাহ কি? তিনি (সা) বললেন,
إِذَا حَاكَ فِي صَدْرِكَ شَيْءٌ فَدَعْهُ
যখন তোমার মনে কোন কাজের ব্যাপারে খটকা (দ্বীধা) লাগে, তবে তা গুনাহ।
ফায়দা নেককাজে খুশি হওয়া ও গুনাহে দুঃখ পাওয়া ঈমানের চিহ্ন। নিজের অন্তরকে যাচাই করার এটি একটি সহজ মাপকাঠি। অন্তরে খটকা লাগলে সে কাজ ছেড়ে দেওয়া উচিত।
🔸🔸🔸
আরও পড়ুন ইমানের হাকীকত



