প্রবন্ধ

মানুষের মনের উপর উৎসাহ ও তিরস্কারের প্রভাব

উৎসাহ ও তিরস্কারের মানসিক ও ইসলামী প্রভাব

মানুষের মনের উপর উৎসাহ ও তিরস্কারের প্রভাব – মানুষের জীবন গঠন, ব্যক্তিত্ব বিকাশ এবং সফলতার পেছনে উৎসাহ ও তিরস্কারের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।

একটি উৎসাহব্যঞ্জক বাক্য যেমন মানুষের আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি করে তাকে উন্নতি ও অগ্রগতির পথে এগিয়ে নিতে পারে, তেমনি অবিবেচনাপ্রসূত তিরস্কার তার মনোবল ভেঙে দিতে পারে।

বিশেষ করে শিশু-কিশোরদের ক্ষেত্রে উৎসাহ ও তিরস্কারের প্রভাব অত্যন্ত গভীর। তাদের কোমল মন প্রশংসা ও স্বীকৃতিতে বিকশিত হয়, আর অবমূল্যায়ন ও কটূক্তিতে সংকুচিত হয়ে পড়ে।

ইসলাম মানুষের মনস্তত্ত্বের এ বাস্তবতাকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করেছে। পবিত্র কুরআন ও হাদীসে মানুষকে উৎসাহ প্রদান, সুসংবাদ দেওয়া এবং প্রজ্ঞাপূর্ণ উপদেশের প্রতি গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।

একই সঙ্গে অযথা কঠোরতা, নিরুৎসাহ ও মনোবল ভেঙে দেয় এমন আচরণ থেকে সতর্ক করা হয়েছে। নবী-রাসূলদের জীবন, সাহাবায়ে কেরামের আদর্শ এবং ইসলামী শিক্ষার আলোকে উৎসাহ ও তিরস্কারের প্রভাব বিশ্লেষণ করলে ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজ গঠনে এর গুরুত্ব সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে।

এ প্রবন্ধে মানুষের মনের ওপর উৎসাহ ও তিরস্কারের প্রভাব, সন্তান প্রতিপালনে এর ভূমিকা এবং ইসলাম এ বিষয়ে কী দিকনির্দেশনা দিয়েছে তা আলোচনা করা হবে।

🌴 দারুস সাআদাত প্রবন্ধ
🖌️ মারূফ আর রুসাফী

Table of Contents

মনের উপর উৎসাহ ও তিরষ্কারের প্রভাব

শিশু থেকে শুরু করে আবালবৃদ্ধবনিতা—সকল মানুষের মনেই উৎসাহ ও তিরস্কারের গভীর প্রভাব পড়ে। উৎসাহ মানুষকে উদ্দীপ্ত ও কর্মপ্রাণ করে তোলে, আর তিরস্কার তাকে হতোদ্যম ও নিরুৎসাহিত করে। দৃঢ়চিত্ত কিংবা দুর্বলচিত্ত- প্রায় প্রত্যেক মানুষই এর প্রভাব অনুভব করে।

নবীদের অবস্থা

আল্লাহর সৃষ্টির মধ্যে নবীগণই ছিলেন সর্বাধিক দৃঢ়চিত্ত ও অবিচল ব্যক্তিত্বের অধিকারী। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে তাদেরকে ‘উলুল আযম’ (أولو العزم) বা দৃঢ়প্রত্যয়ী ও অটল সংকল্পের অধিকারী বলে উল্লেখ করেছেন।

হযরত ইবনে আব্বাস (রা) বলেন, ‘উলুল আযম’ বলতে ধৈর্যশীল ও দৃঢ়প্রতিজ্ঞ নবীদের বোঝানো হয়েছে। আল্লাহ তাআলা নবী-রাসূলগণকে এমন অদম্য মনোবল ও দৃঢ়তার অধিকারী করেছিলেন যে, কোনো বাধা-বিপত্তি, যুলুম-নির্যাতন কিংবা প্রতিকূলতা তাদের দাওয়াত ও সত্য প্রতিষ্ঠার পথকে রুদ্ধ করতে পারেনি।

মানুষ সাধারণত প্রশংসা ও উৎসাহে অনুপ্রাণিত হয়, আর তিরস্কার ও বিরোধিতায় দুর্বল হয়ে পড়ে। কিন্তু নবী-রাসূলগণ ছিলেন এর ব্যতিক্রম। তারা আল্লাহর পক্ষ থেকে এমন দৃঢ়তা, ধৈর্য ও অটলতা লাভ করেছিলেন যে, মানুষের বিরোধিতা, উপহাস, নির্যাতন, বয়কট কিংবা প্রাণনাশের হুমকিও তাদেরকে সত্যের পথ থেকে বিচ্যুত করতে পারেনি।

উলুল আযম এর পরিচয়

‘উলুল আযম’ বলা হয় সেইসব নবীকে, যারা বিশেষভাবে দৃঢ়সংকল্প, ধৈর্য ও অধ্যবসায়ের পরিচয় দিয়েছেন। তাদের জীবন থেকে জানা যায়, সত্য প্রতিষ্ঠার পথে যত বড় বাধাই আসুক না কেন, আল্লাহর উপর ভরসা রেখে অবিচল থাকা সম্ভব। তাই নবী-রাসূলদের দৃঢ়তা মুমিনদের জন্য ধৈর্য, সাহস ও অধ্যবসায়ের সর্বোত্তম আদর্শ।

নবীরাও নেতিবাচক কথায় ব্যথিত হতেন

তা সত্বেও বিরুদ্ধবাদীরা যখন তাদের ব্যাপারে কোন ‎নেতিবাচক কথা বলত, তখন তাদের মন দুঃখিত হত ও মনে হতোদ্যম সৃষ্টি হত। কিন্তু আল্লাহ ও তার নেক ‎বান্দাদের পক্ষ থেকে সান্তনা ও উৎসাহ তাদের মনে পুনরায় শক্তি সঞ্চার করত।

যেমন আল্লাহ তাআলা বলেন-‎

وَلَا يَحْزُنْكَ قَوْلُهُمْ إِنَّ الْعِزَّةَ لِلَّهِ جَمِيعًا هُوَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ
আপনি তাদের কথায় বিষণ্ন হবেন না। জেনে রাখুন যে, সকল সম্মান আল্লাহরই হাতে। তিনি সব শুনেন ‎ও জানেন–সূরা ইউনূস ৬৫

অন্যত্র ইরশাদ করেন,‎

وَدَعْ أَذَاهُمْ وَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ وَكَفَى بِاللَّهِ وَكِيلًا
আপনি তাদের দেওয়া কষ্ট উপেক্ষা করুন ও আল্লাহর উপর ভরসা করুন। অভিভাবক হিসাবে আল্লাহই ‎যথেষ্ট।– সূরা আহযাব ৪

মন দুই রকম

হাদীস শরীফে আছে যে, এক প্রকার অন্তর হয় মর্মর পাথরের মত শ্বেত ও দৃঢ়। যাকে কিয়ামত পর্যন্ত ‎কোন ফিতনা ও অনিষ্ট ক্ষতিগ্রস্থ করতে পারে না। আরেক প্রকারের অন্তর হল এর বিপরীত। যা সহজেই অনিষ্ট ‎আক্রান্ত ও ক্ষতিগ্রস্থ হয়ে যায়।- মিশকাত ৫৩৮০

হাদীসের ব্যাখ্যা

এ হাদিসে মানুষের অন্তরের দৃঢ়তা ও দুর্বলতার পার্থক্য বর্ণনা করা হয়েছে। কিছু মানুষের অন্তর ঈমান, তাকওয়া ও আল্লাহর প্রতি দৃঢ় বিশ্বাসের কারণে এতটাই মজবুত হয়ে যায় যে, তা মসৃণ সাদা পাথরের ন্যায় অটল থাকে। বিভিন্ন ফিতনা, বিভ্রান্তি, গুনাহের আহ্বান কিংবা সন্দেহ-সংশয়ের ঝড় তাদের ঈমানকে নষ্ট করতে পারে না। তারা সত্যকে চিনতে পারে এবং তার উপর অবিচল থাকে।

অন্যদিকে কিছু অন্তর দুর্বল ও অস্থির হয়। ঈমানের দৃঢ়তা ও সঠিক জ্ঞানের অভাবে তারা সহজেই প্রবৃত্তি, কুপ্রবৃত্তি, ভ্রান্ত চিন্তা ও নানা ফিতনার দ্বারা প্রভাবিত হয়। ফলে ধীরে ধীরে তাদের হৃদয় সত্য গ্রহণের ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে এবং অনিষ্টের শিকার হয়।

হাদিসটি আমাদের শিক্ষা দেয় যে, অন্তরের দৃঢ়তা জন্মগত নয়, বরং ঈমান, ইলম, আমল, যিকির ও আল্লাহর আনুগত্যের মাধ্যমে তা অর্জিত হয়। তাই একজন মুমিনের উচিত নিজের হৃদয়কে ঈমান ও তাকওয়ার মাধ্যমে শক্তিশালী করা, যাতে কোনো ফিতনা বা প্রলোভন তাকে সত্যের পথ থেকে বিচ্যুত করতে না পারে।

শব্দের প্রভাব

অন্তর দৃঢ়চিত্ত হোক কিংবা দুর্বলচিত্ত- সব মনের উপরই ভাল মন্দ কথার প্রতিক্রিয়া হয়। কেননা ‎শব্দেরও প্রতিক্রিয়া রয়েছে।

ভাল কথা, আশামূলক কথা, আনন্দদায়ক কথা অন্তরে ইতিবাচক প্রভাব সৃষ্টি করে। আর বাজে কথা, হতাশামূলক কথা, বেদনাদায়ক কথা অন্তরে নেতিবাচক প্রভাব সৃষ্টি করে।

অনেক সময় এমন হয় যে, কেউ মুখ দিয়ে একটি কথা বলে ফেলে আর পরে তা বাস্তব ‎হয়ে যায়। আবার অনেক মানুষও এমন আছে যে, তারা কোন কথা বললে তা বাস্তবে পরিণত হয়ে যায়। এ জন্যই হাদীসে জিহ্বাকে সংযত রাখার ব্যাপারে খুব তাকীদ করা হয়েছে।

নবী (সা) সতর্ক করলেন

রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেন,

لَا تَدْعُوا عَلَى أَنْفُسِكُمْ، وَلَا تَدْعُوا عَلَى أَوْلَادِكُمْ، وَلَا تَدْعُوا عَلَى خَدَمِكُمْ، وَلَا تَدْعُوا عَلَى أَمْوَالِكُمْ، لَا تُوَافِقُوا مِنَ اللَّهِ تَبَارَكَ وَتَعَالَى سَاعَةَ نَيْلٍ فِيهَا عَطَاءٌ، فَيَسْتَجِيبَ لَكُمْ
তোমরা তোমাদের নিজেদের প্রতি বদ দুআ করো না। তোমাদের সন্তান-সন্ততীর প্রতি বদ দুআ করো না। তোমাদের খাদিম বা অধীনস্থদের প্রতি বদ দুআ করো না। তোমাদের ধন-সম্পদের প্রতি বদ দুআ করো না। কেননা ঐ সময়টি আল্লাহর পক্ষ হতে দুআ কবুলের মুহুর্তও হতে পারে, ফলে তা কবুল হয়ে যাবে।-সুনান আবু দাউদ ১৫৩২

আলোচ্য হাদীস প্রসঙ্গে যাকারিয়া (রহ)এর উক্তি

শায়খ যাকারিয়া (রহ) বলেন, কতক মহীলা আছে যারা তার সন্তানের উপর রাগ করে বলে, তুই মরে যা ইত্যাদি। পরে যখন বাস্তবে কিছু হয়ে যায় তখন আর অনুতাপের শেষ থাকে না।

কাবার সমসাময়িক ইমামের ঘটনা

কাবা শরীফের খণ্ডকালীন ইমাম শায়খ আদেল আল কালবানীর ঘটনা প্রসিদ্ধ হয়েছে যে, তিনি ছোটবেলায় খুব দুষ্ট ছিলেন। যখন তার মা তার উপর রেগে যেত তখন তার মা তার রাগটা এভাবে বিপরীতমুখীভাবে প্রকাশ করতেন যে, তিনি বলতেন যে, আল্লাহ যেন তোকে কাবার ইমাম বানিয়ে দেন। আর তার এই দুআর বদৌলতেই তিনি কাবার ইমাম হতে পেরেছিলেন বলে উল্লেখ করেছেন।

মনের উপর তিরস্কারের প্রভাব

তিরস্কার মানুষের মনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। বারবার ভর্ৎসনা, অপমান বা কঠোর সমালোচনা মানুষের আত্মবিশ্বাসকে দুর্বল করে দেয় এবং তার কর্মস্পৃহা কমিয়ে দেয়। বিশেষত যখন তিরস্কার সংশোধনের উদ্দেশ্যে না হয়ে অবমূল্যায়ন বা অপমানের রূপ ধারণ করে, তখন তা মানুষের মনে হতাশা, ভয় ও হীনম্মন্যতার জন্ম দেয়।

শিশুদের ক্ষেত্রে এর প্রভাব আরও গভীর। অতিরিক্ত তিরস্কার তাদের স্বাভাবিক বিকাশ, সৃজনশীলতা ও আত্মপ্রত্যয়কে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। তারা ভুল সংশোধনের পরিবর্তে ব্যর্থতার ভয়ে নতুন কাজ থেকে পিছিয়ে যেতে শুরু করে। একইভাবে প্রাপ্তবয়স্করাও অবিরাম নিন্দা ও তুচ্ছতাচ্ছিল্যের শিকার হলে মানসিকভাবে ভেঙে পড়তে পারে এবং তাদের কর্মক্ষমতা হ্রাস পেতে পারে।

তবে গঠনমূলক উপদেশ ও সংশোধনমূলক সমালোচনা ভিন্ন বিষয়। ইসলাম অন্যায়ের প্রতিবাদ ও ভুলের সংশোধনকে উৎসাহিত করেছে, কিন্তু তা হতে হবে প্রজ্ঞা, কোমলতা ও কল্যাণকামিতার সঙ্গে। কারণ কঠোর তিরস্কার অনেক সময় যে সংশোধন করতে পারে না, আন্তরিক উপদেশ ও উৎসাহ তা সহজেই করতে সক্ষম হয়।

এ কারণে একজন মুমিনের উচিত মানুষের ভুল সংশোধনের সময় অপমান ও তিরস্কারের পরিবর্তে এমন ভাষা ও পদ্ধতি অবলম্বন করা, যা তাদের মনে আশা, সচেতনতা ও সংশোধনের আগ্রহ সৃষ্টি করে।

তিরস্কারের বাস্তব প্রভাব

আপনি যদি কখনো ফুরফুরে মেজাজে থাকেন আর সেই সময় আপনাকে কেউ বলে যে, আপনাকে কেমন ‎যেন রোগা দেখাচ্ছে। দেখবেন যে আপনার মনটা কেমন চুপসে যাবে।

আবার যদি আপনি কোন বড় কাজ বা কোন একটা ভালো কাজ করেন ‎আর আপনার কোন বিরুদ্ধবাদী আপনার সমালোচনা করে, দেখবেন যে, আপনার মনে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া হবে। এটাই হলো তিরষ্কারের প্রতিক্রিয়া, তা ব্যক্তির মনোবল নষ্ট করে দেয়।

এক ব্যবসায়ীর ঘটনা ‎

ইবনে হাযম (রহ) মুসলিম স্পেনের এক ধনাঢ্য ব্যবসায়ীর কথা উল্লেখ করেছেন, যার অপর চারজন ‎ব্যবসায়ীর সাথে তুমুল প্রতিযোগিতা ও বিদ্বেষ ছিল। একবার তারা সেই ব্যবসায়ীকে শিক্ষা দেয়ার পরিকল্লনা করল। একদিন সকালে সেই ব্যবসায়ী তার দোকানের উদ্দেশ্য ঘর থেকে বের হল। তার পরনে ছিল সাদা জোব্বা আর ‎মাথায় সাদা পাগড়ি।

পথিমধ্যে তাদের একজন তার সাথে সাক্ষাৎ করে সালাম বিনিময় করে বলল, আপনার হলুদ ‎পাগড়িটি বেশ সুন্দর। ব্যবসায়ী বলল, তুমি ভুল করছ, পাগড়ি তো সাদা। লোকটি বলল, আপনি কি অন্ধ? পাগড়িটি ‎হলুদ। তবে হলুদ হলেও সুন্দর। ব্যবসায়ী তার সাথে কথা না বাড়িয়ে সামনে চলতে লাগল। ‎

কিছুদূর যাওয়ার পর আরেকজন এসে সাক্ষাৎ করে সালাম বিনিময়ের পর বলল, আজ আপনি চমৎকার ‎পোষাক পড়েছেন। বিশেষ করে এই সবুজ পাগড়িতে আপনাকে বেশ সুন্দর মানিয়েছে। ব্যবসায়ী বলল, আপনি ভুল ‎করছেন। আমার পাগড়ি সাদা। এরপর সে দোকানে গিয়ে বসল।

তখন তৃতীয় ব্যক্তি এসে কথাবার্তা বলার পর ‎বলল, আপনার নীল পাগড়িটি সুন্দর। ব্যবসায়ী চিৎকার করে বলল, আমার পাগড়ি সাদা। সঙ্গে সঙ্গে সেই লোক ‎জোর গলায় বলল, না আপনার পাগড়ি নীল। তবে চিন্তা করেবেন না, এতে আপনাকে সুন্দর মানিয়েছে। বলে ‎লোকটি চলে গেল।

ব্যবসায়ী নিজে বলতে লাগল আমার পাগড়ি সাদা, আমার পাগড়ি সাদা। আর নেড়েচেড়ে দেখতে ‎লাগল।

এরপর চতুর্থ ব্যক্তি এসে কথা বলে বলল, মাশাআল্লাহ! এই লাল পাগড়িটি আপনি কোত্থেকে কিনেছেন? ‎ব্যবসায়ী বলল, কি বলছেন, এটাতো সাদা পাগড়ি। লোকটি বলল, না এটাতো লাল। ‎

ব্যবসায়ী তখন চিৎকার করে কাঁদতে শুরু করল। আর বলতে লাগল, আমার পাগড়ি সাদা। না, আমার ‎পাগড়ি লাল। না, আমার পাগড়ি সবুজ। না, আমার পাগড়ি নীল। হাঁ নীল। এরপর সে হাসতে লাগল। তারপর বলল, ‎না আমার পাগড়ি কালো। না এটাতো হলুদ। না বরং এটা সাদা পাগড়ি। এরপর সে হঠাৎ লম্ফঝম্ফ শুরু করে ‎দিল এবং পাগলের মত হাসতে লাগল। ‎

ইবনে হাযম (রহ) বলেন, আমি এই ব্যবসায়ীকে স্পেনের অলিতে গলিতে পাগল হয়ে ঘুরতে দেখেছি। ‎আর ছোট বাচ্চারা তাকে পাথর মারছিল।

কেউ কেউ উপদেশ দিতে গিয়ে মনোবল নষ্ট করে

উপদেশের উদ্দেশ্য হলো সংশোধন, নিরুৎসাহিত করা নয়। কিন্তু অনেক সময় দেখা যায়, কেউ কেউ ভুল ধরিয়ে দিতে গিয়ে এমন কঠোর, তিরস্কারমূলক বা অবমাননাকর ভাষা ব্যবহার করেন, যা মানুষের সংশোধনের পরিবর্তে তার মনোবল ভেঙে দেয়।

ফলে উপদেশপ্রাপ্ত ব্যক্তি নিজের ভুল শোধরানোর আগ্রহ হারিয়ে ফেলে এবং হতাশা, সংকোচ বা হীনম্মন্যতায় আক্রান্ত হয়।

এই যেমন ধরুন আপনি বেকার বা কোন দীর্ঘদিন ধরে চেষ্টা করেও কিছু করতে পারছেন না। তখন কেউ কেউ আপনাকে বলবে, তরকারী বিক্রি করো, মাটি কাটো। এগুলোই হলো উপদেশের আড়ালে হেয় করার প্রবণতা যা ব্যক্তির মনোবল আরো নষ্ট করে দেয়।

কিছু লোক উচ্চ কথা বলেও মনোবল নষ্ট করে

একটি হাদীসে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সা) নারীদেরকে উদ্দেশ্য করে বলেছেন, হে নারীদের দল! তোমরা ‎সাদকা কর আর বেশী করে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাও। কেননা আমি তোমাদের অধিকাংশদেরই জাহান্নামে ‎দেখেছি।– সহিহ মুসলিম

হযরত মাওলানা অশরাফ আলী থানভী (রহ) এই হাদীস প্রসঙ্গে বলেন যে, কতক মৌলভী আছে তারা ‎নারীদের থেকে দান লাভের জন্য অথবা এমনি স্বভাবসিদ্ধভাবে এই হাদীসেরই ওয়ায করে থাকে, বা শুধু এই ‎হাদীসই বলে থাকে। এর ফলে নারীদের মনে হতোদ্যম সৃষ্টি হয়। তারা ভাবে আর বলে যে, ‘আমরা তো জাহান্নামীই- ‎অতএব নামায পড়ে আর কি হবে, আর আমল করেই বা কি হবে।’

এটা একেবারেই অনুচিত কাজ। কুরআন ও হাদীসে ‎অসংখ্য আয়াত ও হাদীস আছে তাদের নেক আমলের প্রতিদান ও উৎসাহের জন্য। সেগুলোর ব্যপারে সেসব ‎মৌলভীরা একেবারেই নীরব থাকে।–খুতবাতে হাকীমুল উম্মত

যে চেষ্টা করবে তার প্রতিদান

আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,

مَنْ عَمِلَ صَالِحًا مِنْ ذَكَرٍ أَوْ أُنْثَى وَهُوَ مُؤْمِنٌ فَلَنُحْيِيَنَّهُ حَيَاةً طَيِّبَةً وَلَنَجْزِيَنَّهُمْ أَجْرَهُمْ بِأَحْسَنِ مَا كَانُوا يَعْمَلُونَ
মুমীন হয়ে পুরুষ ও নারীর মধ্যে যে কেউ সৎকর্ম করবে, তাকে আমি নিশ্চয়ই স্বাচ্ছন্দ্যের জীবন দান ‎করব এবং তাদরেকে তাদের কর্মের শ্রেষ্ঠ পুরষ্কার দান করব।– সূরা নাহল ৯৭

হযরত আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেন, যে নারী পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আদায় করে, তার সতীত্ব রক্ষা করে এবং তার স্বামীর আনুগত্য করে, সে জান্নাতের যে কোন দরজা দিয়ে ইচ্ছা প্রবেশ করবে।– আত তারগীব

এজন্যই আল্লাহ তাআলা উপদেশ প্রদান ও মানুষকে তাঁর পথে আহ্বান করার ক্ষেত্রে প্রজ্ঞা, উত্তম উপদেশ এবং সুন্দর পদ্ধতি অবলম্বনের নির্দেশ দিয়েছেন। যেন সংশোধনের চেষ্টা করতে গিয়ে পরিস্থিতি আরও খারাপ না হয়ে যায়।

হিকমত ও প্রজ্ঞা

কারণ সব সত্য কথা সব সময় একইভাবে বলা যায় না; বরং ব্যক্তি, অবস্থা ও সময় বিবেচনা করে এমনভাবে কথা বলতে হয়, যাতে মানুষের অন্তরে গ্রহণযোগ্যতা সৃষ্টি হয়।

অনেক সময় কঠোরতা ও রূঢ় আচরণ মানুষকে সংশোধনের পরিবর্তে আরও দূরে সরিয়ে দেয়। তাই কল্যাণকামিতা, কোমলতা ও প্রজ্ঞার সঙ্গে উপদেশ প্রদানই ইসলামের শিক্ষা।

ادْعُ إِلَى سَبِيلِ رَبِّكَ بِالْحِكْمَةِ وَالْمَوْعِظَةِ الْحَسَنَةِ
তুমি তোমার প্রতিপালকের পথে আহ্বান কর হিকমত ও প্রজ্ঞার সাথে এবং উত্তমরুপে উপদেশ শুনিয়ে। –সূরা আন নাহল ১২৫

এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, দাওয়াত ও উপদেশের লক্ষ্য শুধু ভুল ধরিয়ে দেওয়া নয়; বরং মানুষকে সত্যের দিকে আকৃষ্ট করা এবং তার অন্তরে সংশোধনের আগ্রহ সৃষ্টি করা।

সন্তানের মনোবল নষ্ট করা

এমনিভাবে অনেক অভিভাবক ও পিতা-মাতা আছেন, যারা অজান্তেই শৈশব ও কৈশোর থেকেই সন্তানের মনোবল ভেঙে দেন। তারা সন্তানের ভুল-ত্রুটি, দুর্বলতা বা ব্যর্থতার প্রতি ধৈর্যশীল না হয়ে অহরহ তিরস্কার করতে থাকেন।

যেমন পড়ালেখায় খারাপ ফল করলে, কোনো কাজে অদক্ষতা দেখালে বা প্রত্যাশা পূরণ করতে না পারলে বলে থাকেন, তোমার দ্বারা কিছু হবে না, তুমি নির্বোধ, তুমি কোনো কাজের না ইত্যাদি।

এ ধরনের কথাবার্তা সন্তানের ব্যক্তিত্ব ও আত্মবিশ্বাসের ওপর গভীর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। মনোবিজ্ঞানীদের মতে, শিশু-কিশোরদের মন অত্যন্ত কোমল ও গ্রহণশীল।

তারা বড়দের কথাকে সহজেই সত্য বলে বিশ্বাস করে। ফলে বারবার নেতিবাচক মন্তব্য শুনতে শুনতে তারা নিজের সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা গড়ে তোলে এবং একসময় সত্যিই নিজেকে অযোগ্য ও অক্ষম মনে করতে শুরু করে।

এর ফলস্বরূপ তাদের আত্মবিশ্বাস হ্রাস পায়, উদ্যোগ ও কর্মস্পৃহা কমে যায় এবং নতুন কিছু করার সাহসও দুর্বল হয়ে পড়ে। অনেক ক্ষেত্রে তারা ব্যর্থতার ভয়ে চেষ্টা করাই ছেড়ে দেয়। অথচ সামান্য উৎসাহ, প্রশংসা ও আন্তরিক দিকনির্দেশনা তাদের মধ্যে আত্মপ্রত্যয় সৃষ্টি করতে পারে এবং উন্নতির পথে এগিয়ে যেতে সহায়তা করতে পারে।

সুতরাং সন্তানের ভুলের জন্য তাকে অপমান বা নিরুৎসাহিত না করে, ভালোবাসা, ধৈর্য ও প্রজ্ঞার সঙ্গে সংশোধন করা উচিত। কারণ একটি উৎসাহব্যঞ্জক বাক্য যেখানে একটি শিশুর ভবিষ্যৎ গড়ে দিতে পারে, সেখানে একটি তিরস্কারমূলক বাক্য তার মনোবল ও সম্ভাবনাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।

ইবনে আব্বাস (রা) এর উক্তি

হযরত ইবনে আব্বাস (রা) বলেন, তোমরা তোমাদের সন্তানদের প্রতি সদয় হও এবং তাদেরকে উত্তম শিষ্টাচার শিক্ষা দাও।– আত তারগীব

হযরত ইবনে আব্বাস (রা)-এর এ বাণীতে সন্তান প্রতিপালনের দুটি মৌলিক নীতির প্রতি গুরুত্বারোপ করা হয়েছে—স্নেহ ও শিক্ষা। সন্তানদের প্রতি কঠোরতা, অবহেলা বা রূঢ় আচরণের পরিবর্তে তাদের সঙ্গে সদয় ও মমতাপূর্ণ আচরণ করতে হবে।

পাশাপাশি তাদেরকে উত্তম আখলাক, আদব-কায়দা ও ইসলামী মূল্যবোধ শিক্ষা দিতে হবে। কেননা স্নেহ সন্তানদের হৃদয়ে ভালোবাসা ও আত্মবিশ্বাস সৃষ্টি করে, আর উত্তম শিষ্টাচার তাদেরকে আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলে।

সহজ করা

হযরত আনাস (রা) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেন,

يَسِّرُوا وَلَا تُعَسِّرُوا، وَسَكِّنُوا وَلَا تُنَفِّرُوا
সহজ কর, কঠিন করো না। সান্তনা প্রদান কর, ঘৃণা বিরক্তির উদ্রেক করো না।– আদাবুল মুফরাদ

হাদিসটিতে রাসূলুল্লাহ (সা) মানুষের সঙ্গে আচরণ, দাওয়াত ও শিক্ষা প্রদানের একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিমালা শিক্ষা দিয়েছেন। তিনি নির্দেশ দিয়েছেন, মানুষের জন্য বিষয়গুলো সহজ করে দিতে এবং অযথা কঠোরতা ও জটিলতা সৃষ্টি না করতে। একইভাবে এমন কথা ও আচরণ করতে বলেছেন, যা মানুষের মনে প্রশান্তি, আশা ও উৎসাহ সৃষ্টি করে; এমন কিছু নয়, যা তাদের মধ্যে বিরক্তি, ঘৃণা বা ধর্ম থেকে দূরে সরে যাওয়ার প্রবণতা তৈরি করে।

এই শিক্ষা বিশেষভাবে পিতা-মাতা, শিক্ষক, দাঈ ও সমাজনেতাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ কোমলতা, উৎসাহ ও সদাচরণ মানুষের হৃদয় জয় করে, পক্ষান্তরে অতিরিক্ত কঠোরতা ও তিরস্কার অনেক সময় মানুষকে নিরুৎসাহিত ও বিমুখ করে তোলে। তাই ইসলামের দাওয়াত, শিক্ষা ও সংশোধনের ক্ষেত্রে সহজতা, প্রজ্ঞা এবং স্নেহপূর্ণ আচরণ অবলম্বন করা সুন্নাহসম্মত পন্থা।

আনাস (রা) এর ঘটনা

হযরত আনাস ইবনে মালিক (রা) বলেন

خَدَمْتُ النَّبِيَّ ﷺ عَشْرَ سِنِينَ، فَمَا قَالَ لِي أُفٍّ قَطُّ، وَلَا قَالَ لِشَيْءٍ فَعَلْتُهُ: لِمَ فَعَلْتَهُ؟ وَلَا لِشَيْءٍ لَمْ أَفْعَلْهُ: أَلَا فَعَلْتَهُ؟

আমি দশ বছর রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর খিদমত করেছি। তিনি কখনো আমাকে ‘উফ’ পর্যন্ত বলেননি। আমি কোনো কাজ করলে কখনো বলেননি, এটা কেন করলে? আর কোনো কাজ না করলে কখনো বলেননি, এটা কেন করলে না?
— সহীহ আল-বুখারী, সহীহ মুসলিম

হাদীসের ব্যাখ্যা

এই হাদিসে রাসূলুল্লাহ (সা)-এর অতুলনীয় চরিত্র, কোমলতা ও মানবিক আচরণের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত ফুটে উঠেছে। হযরত আনাস (রা) শৈশব থেকেই দীর্ঘ দশ বছর নবীজি (সা)-এর সেবায় নিয়োজিত ছিলেন। এ দীর্ঘ সময়ে স্বাভাবিকভাবেই তাঁর দ্বারা ভুল-ত্রুটি সংঘটিত হওয়ার কথা। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (সা.) কখনো তাকে অপমান, তিরস্কার বা কঠোর ভর্ৎসনা করেননি।

এ থেকে বোঝা যায়, মানুষের ভুল সংশোধনের সর্বোত্তম পদ্ধতি হলো ধৈর্য, সহনশীলতা ও সুন্দর আচরণ। বিশেষ করে শিশু, কিশোর এবং অধীনস্থদের সঙ্গে রূঢ়তা নয়; বরং স্নেহ ও প্রজ্ঞার সঙ্গে আচরণ করা উচিত। কারণ অতিরিক্ত তিরস্কার মানুষের আত্মবিশ্বাস নষ্ট করে, কিন্তু ভালোবাসা ও উৎসাহ তার হৃদয়ে দায়িত্ববোধ ও উন্নতির আগ্রহ সৃষ্টি করে।

সন্তান প্রতিপালন ও শিক্ষাদানের ক্ষেত্রেও এই হাদিস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনেক পিতা-মাতা সামান্য ভুলেই সন্তানকে ভর্ৎসনা করেন, অথচ নবীজি (সা)-এর আদর্শ হলো ধৈর্য, ক্ষমাশীলতা ও কোমলতা। তাই সন্তানের ভুল সংশোধন করতে হবে, কিন্তু এমনভাবে নয় যাতে তার আত্মমর্যাদা ও মনোবল ভেঙে যায়। নবীজি (সা.)-এর এ মহান চরিত্র আমাদের শেখায় যে, মানুষের হৃদয় জয় করা যায় কঠোরতা দিয়ে নয়; বরং দয়া, ভালোবাসা ও উত্তম আচরণের মাধ্যমে।

তিরস্কারের ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া

তবে সব সময় তিরস্কারের ফল নেতিবাচক হয় না। কিছু কিছু ক্ষেত্রে তিরস্কার, অবহেলা বা কটূক্তি মানুষের মধ্যে আত্মপ্রতিষ্ঠার প্রবল আকাঙ্ক্ষা সৃষ্টি করতে পারে। অপমান ও অবমূল্যায়নের জবাব দেওয়ার জন্য তারা নিজেদের যোগ্যতা প্রমাণে দৃঢ়সংকল্প হয়ে ওঠে এবং কঠোর পরিশ্রমে আত্মনিয়োগ করে।

ইমাম শারানী (রহ) এর উক্তি 

ইমাম শারানী (রহ) বলেন, সাধারণ মানুষের অনেক সন্তানই ছোটবেলা থেকে মানুষের চাপ, তিরস্কার ও কটূক্তির মুখোমুখি হয়। এসব কারণে তাদের অন্তরে এক ধরনের কষ্ট ও বেদনার সৃষ্টি হয়। এই অবস্থা থেকে উত্তরণের আকাঙ্ক্ষা তাদেরকে জ্ঞানার্জন, অধ্যবসায় ও আত্মোন্নয়নের পথে পরিচালিত করে।

আল্লাহ তাআলা তাদের অন্তরে এমন অদম্য আগ্রহ ও উদ্যম সৃষ্টি করেন যে, তারা পড়াশোনা ও সাধনায় আত্মনিয়োগ করে। এরপর ধীরে ধীরে তারা জ্ঞান, মর্যাদা ও নেতৃত্বের উচ্চ আসনে অধিষ্ঠিত হয়। একসময় মানুষই তাদের সম্মান করতে শুরু করে এবং সেই সম্মান তাদেরকে আরও বেশি পরিশ্রম ও উন্নতির জন্য অনুপ্রাণিত করে।

তবে এ বিষয়টিও মনে রাখতে হবে যে, এটি সবার ক্ষেত্রে ঘটে না। অনেকেই তিরস্কারে ভেঙে পড়ে, আবার কেউ কেউ তা থেকে শক্তি সঞ্চয় করে সামনে এগিয়ে যায়। তাই মানুষের উন্নতির জন্য তিরস্কারের ওপর নির্ভর না করে উৎসাহ, সঠিক দিকনির্দেশনা ও ইতিবাচক প্রেরণা প্রদান করাই অধিক ফলপ্রসূ ও নিরাপদ পদ্ধতি। কারণ উৎসাহ অধিকাংশ মানুষের মধ্যে উন্নতির আগ্রহ সৃষ্টি করে, পক্ষান্তরে তিরস্কার কেবল কিছু মানুষের মধ্যেই ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়।

দাবাড়ূ থেকে ডাক্তার

মধ্যযুগের ইশবিলিয়া শহরের প্রসিদ্ধ ডাক্তার কাযী আবু বকর প্রথম জীবনে খুব দাবা খেলার পাগল ‎ছিলেন। দাবা খেলায় অধিক ঝোঁকের কারণে তার নাম পড়ে যায় দাবাড়ু। এই্ অপমানকর উপাধিটি তার মনে খুব ‎কষ্ট দিত। অবশেষে তার আত্মমর্যাদাবোধ তাকে পরামর্শ দিল যে, তোমাকে এমন বিদ্যায় পারদর্শিতা অর্জন ‎করতে হবে, যার মাধ্যমে তোমার এই উপাধি তার নীচে চাপা পড়ে যাবে। তিনি ডাক্তারী বিদ্যা বেছে নিলেন এবং ‎কালের অভিজ্ঞ ও বিচক্ষণ ডাক্তার হওয়ার খ্যাতি অর্জন করলেন। ‎

মনের উপর উৎসাহের প্রভাব

উৎসাহ মানুষের মনকে প্রাণবন্ত ও কর্মমুখর করে তোলে। মানুষ যখন প্রশংসা, স্বীকৃতি বা অনুপ্রেরণামূলক কথা শুনে, তখন তার আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি পায় এবং কাজের প্রতি আগ্রহ ও উদ্দীপনা সৃষ্টি হয়। কঠিন কাজও তখন সহজ মনে হয় এবং বাধা-বিপত্তি অতিক্রম করার শক্তি জাগে।

বিশেষ করে শিশু-কিশোরদের ক্ষেত্রে উৎসাহের প্রভাব অত্যন্ত গভীর। সামান্য প্রশংসাও তাদের মধ্যে শেখার আগ্রহ, ভালো কাজের প্রতি ঝোঁক এবং আত্মমর্যাদাবোধ বৃদ্ধি করে। একইভাবে প্রাপ্তবয়স্করাও উৎসাহ পেলে দায়িত্ব পালনে অধিক যত্নশীল ও আন্তরিক হয়ে ওঠে।

ইসলামও মানুষের মধ্যে আশা, সুসংবাদ ও উৎসাহ সৃষ্টির প্রতি গুরুত্ব দিয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সা.) মানুষের ভালো কাজের প্রশংসা করতেন, তাদেরকে উৎসাহিত করতেন এবং এমন কথা বলতেন, যা তাদের মনোবল বৃদ্ধি করত। কারণ উৎসাহ মানুষের সুপ্ত শক্তিকে জাগ্রত করে, আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি করে এবং তাকে উন্নতি ও সফলতার পথে এগিয়ে যেতে সহায়তা করে।

রোগী দেখতে গিয়ে নবী (সা) যা বলতেন

রাসূলুল্লাহ (সা) যখন কোন রোগী দেখতে যেতেন তখন তাকে বলতেন,

لَا بَأْسَ طَهُورٌ إِنْ شَاءَ اللَّهُ
কোন ভয় নেই, পবিত্র (ভাল) হয়ে যাবে ইনশাআল্লাহ।

একবার তিনি এক বেদুইন রোগীকে দেখে এমন বললেন, তখন বেদুইন বলল, না এটা আমাকে কবরে নিয়েই ছাড়বে। নবী (সা) কথাটি অপছন্দ করলেন এবং বললেন, (তুমি যদি তেমন মনে কর ) তবে তেমনই হবে।

খাদিজা (রা) এর অনুপ্রেরণা

রাসূলুল্লাহ (সা) খাদিজা (রা) এর মৃত্যুর পর তার কথা খুব স্মরণ করতেন। একদিন আয়িশা (রা) ‎অভিমান স্বরুপ বলেছিলেন যে, আপনি ঐ বৃদ্ধাটির মধ্যে কি পেয়েছেন যে, তার কথাই আপনি বেশী করে বলেন। নবী ‎‎(সা) বললেন, এমন বলো না। যখন সারা দুনিয়ার মানুষ আমার বিরুদ্ধে ছিল তখন-সে-ই ছিল আমার সাহায্য ‎সহেযোগিতাকারী। আমি যখন ভেঙ্গে পড়তাম সেই আমাকে অনুপ্রেরণা জাগাত। তার ঋণ শোধ হবার নয়। ‎

রাসূলুল্লাহ (সা) এর উপর যখন প্রথমবার জিবরাইল (আ) আগমন করেন তখন তিনি ভয় পেয়ে বিমর্ষ হয়ে ‎যান। তিনি ঘরে গিয়ে চাদড় মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়েন। রাসূলুল্লাহ (সা) কিছুটা স্বাভাবিক হলে বলেন, আমি নিজের ‎ব্যাপারে শঙ্কা করছি।

খাদিজা (রা) তাকে এভাবে সান্তনা দেন- আল্লাহর কসম কখনই নয়। আল্লাহ আপনাকে ‎কখনও লাঞ্ছিত করবেন না। আপনি তো আত্মীয় স্বজনের সাথে সদাচরণ করেন, অসহায় দুঃস্থদের দায়িত্ব ‎বহন করেন, নিঃস্বকে সহযোগিতা করেন, মেহমানের আপ্যায়ন করেন এবং দুর্দাশগস্থকে সাহায্য করেন। সহিহ বুখারী ‎

বিজ্ঞানী এডিসনের ঘটনা

বিজ্ঞানী এডিসনের ঘটনায় আছে যে, তার মেধা খারাপ হওয়ার কারণে স্কুল থেকে তাকে বহিষ্কার পত্র ‎দিয়ে তার মার কাছে পাঠিয়ে দেয়া হয়। মা চিঠি পড়ে কেঁদে ফেললেন। এডিসন জিজ্ঞাসা করলেন, কি লিখেছে? মা ‎তাকে কোনরুপ তিরষ্কার করার পরিবর্তে বললেন যে, স্কুল কর্তৃপক্ষ বলেছে যে, তোমার মেধা এত ভাল যে, এই স্কুল তোমার ‎মেধার তুলনায় অনুপযুক্ত। তোমাকে আরো ভাল কোন স্কুলে পড়াতে।

আজ থেকে আমিই তোমাকে পড়াব। ‎অতঃপর দীর্ঘ অনেক বছর পর যখন সে বিজ্ঞানী হয়ে প্রতিষ্ঠি আর তার মা-ও মৃত্যুবরণ করেছে তখন তিনি তার ঐ ‎গ্রামের বাড়িতে যান এবং গিয়ে তিনি ঐ চিঠিটি পরিত্যক্ত অবস্থায় পান এবং পড়ে আসল অবস্থা জানতে পারেন। ‎

ইমাম আহমদ (রহ) এর ঘটনা

ইমাম আহমদ (রহ) এর যুগে নতুন একটি মতবাদ ও ফিতনা সৃষ্টি হয় যে, কুরআন আল্লাহর কালাম ‎নয় বরং অনান্য সৃষ্টির মত একটি সৃষ্টি। এতে ঐ সময়ে আহলে হক আলিমগণ এর বিরোধিতা করে বলেন যে, ‎কুরআন মাখলুক নয় বরং আল্লাহর কালাম আর এটাই সঠিক। তৎকালীন খলিফাও এই মতবাদে বিশ্বাসী হয়ে ‎পড়ে। তিনি আহমদ (রহ)-কে বাধ্য করে এই মত গ্রহণ করার জন্য । তিনি অস্বীকার করেন। ফলে তাকে জেলে ‎পাঠানো হয়।

জেলে থাকাবস্থায় দূর গ্রাম থেকে এক ব্যক্তি আহমদ (রহ) এর সাথে দেখা করতে আসেন। এসে তাকে বলেন, ‎আপনি এমন এক স্থানে দাড়িয়ে আছেন যে, যদি আপনি সত্যের পথে অবিচল থাকেন তবে হয়তো তারা আপনাকে ‎হত্যা করবে কিন্তু মৃতুর সাথে সাথেই আপনি জান্নাতে চলে যাবেন।

আর যদি আপনি সত্য ত্যাগ করেন তবে হয়তো ‎দুনিয়াতে আপনি মুক্তি পাবেন কিন্ত পরকালে আপনি আল্লাহর কাছে পাকরাও হয়ে যাবেন। এখন আপনার সিদ্ধান্ত। ‎

ইমাম আহমদ (রহ) বললেন, আমি দ্বিধান্বিত ছিলাম। কি করব বুঝতে পারছিলাম না। আল্লাহ তোমাকে উত্তম ‎বিনিময় দান করুন। তুমি আমার মনোবল অনেক বাড়িয়ে দিয়েছ। ‎

শায়খ সালিহ আল মুনাজ্জিদ এর উক্তি

শায়খ সালিহ আল মুনাজ্জিদ বলেন, বন্ধু! তুমিও তোমার জন্য এমন একজন বন্ধু নির্বাচন করে নাও, যে তোমাকে ‎সত্যের প্রতি অবিচল থাকতে এবং উন্নতী অগ্রগতী লাভে অনুপ্রাণিত করবে।

শায়খ সালিহ আল-মুনাজ্জিদ হাফিযাহুল্লাহর এ কথার মাধ্যমে সৎ সঙ্গীর গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে। মানুষ স্বভাবতই তার বন্ধু-বান্ধবের দ্বারা প্রভাবিত হয়। তাই এমন বন্ধুকে সঙ্গী হিসেবে গ্রহণ করা উচিত, যে সত্য ও ন্যায়ের পথে চলতে উৎসাহ দেয়, ভুল হলে সংশোধন করে এবং কল্যাণকর কাজে সহযোগিতা করে।

একজন উত্তম বন্ধু হতাশার সময়ে সাহস জোগায়, দুর্বলতার সময়ে শক্তি দেয় এবং দ্বীনি ও দুনিয়াবি উভয় ক্ষেত্রেই উন্নতি ও অগ্রগতির জন্য অনুপ্রাণিত করে। পক্ষান্তরে অসৎ সঙ্গ মানুষকে আলস্য, গাফেলতি ও পথভ্রষ্টতার দিকে ঠেলে দিতে পারে। এজন্য ইসলাম সৎ সঙ্গ গ্রহণ এবং নেককারদের সাহচর্যে থাকার প্রতি বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছে।

সুতরাং প্রকৃত বন্ধু সে-ই, যে কেবল সুখ-দুঃখের সঙ্গী নয়; বরং তোমাকে আল্লাহর আনুগত্য, সত্যের প্রতি অবিচলতা এবং জীবনের কল্যাণকর লক্ষ্য অর্জনের পথে উৎসাহ ও সহযোগিতা প্রদান করে।

বলা হয়ে থাকে যে, প্রত্যেক সফল পুরুষের পিছনে একজন নারীর হাত থাকে। এটা আর কিছু নয় বরং ‎তার অনুপ্রেরণা, উৎসাহ উদ্দীপনার কারণেই এ কথা বলা হয়ে থাকে। ‎

প্রত্যেক সফল পুরুষের পিছনে একজন নারীর হাত থাকে- এ কথাটি মূলত একজন স্ত্রী, মা, বোন বা অন্য কোনো শুভাকাঙ্ক্ষী নারীর মানসিক সমর্থন, উৎসাহ ও অনুপ্রেরণার গুরুত্ব বোঝাতে বলা হয়। সফলতার পেছনে কেবল একজন নারীর অবদানই থাকে- এমন দাবি নয়, বরং এটি একটি রূপক বক্তব্য, যা উৎসাহ ও সহযোগিতার শক্তিকে তুলে ধরে।

বাস্তবে মানুষ যখন কাছের মানুষের সমর্থন, প্রশংসা ও প্রেরণা লাভ করে, তখন তার আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি পায়, কর্মস্পৃহা জাগ্রত হয় এবং কঠিন পরিস্থিতি মোকাবিলা করা সহজ হয়। একজন সহধর্মিণী বা মায়ের আন্তরিক উৎসাহ অনেক সময় একজন মানুষকে বড় লক্ষ্য অর্জনের পথে এগিয়ে যেতে সাহায্য করে।

সুতরাং এ কথার মূল শিক্ষা হলো- সৎ উৎসাহ, আন্তরিক সহযোগিতা ও মানসিক সমর্থন মানুষের উন্নতি ও সফলতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।

উপসংহার

মানুষের মন গঠনে উৎসাহ ও তিরস্কার উভয়েরই প্রভাব রয়েছে। উৎসাহ মানুষের আত্মবিশ্বাস, কর্মস্পৃহা ও উন্নতির আকাঙ্ক্ষা বৃদ্ধি করে; পক্ষান্তরে তিরস্কার অনেক সময় মনোবল ভেঙে দেয় এবং হতাশার জন্ম দেয়।

যদিও কিছু ক্ষেত্রে তিরস্কার মানুষকে আত্মপ্রতিষ্ঠার প্রেরণা জোগাতে পারে, তবুও এটি ব্যতিক্রম; সাধারণভাবে উৎসাহ, স্নেহ ও প্রজ্ঞাপূর্ণ উপদেশই মানুষের বিকাশে অধিক কার্যকর ভূমিকা পালন করে।

এ কারণেই ইসলাম মানুষকে সংশোধন, শিক্ষা ও দাওয়াতের ক্ষেত্রে কোমলতা, প্রজ্ঞা এবং উত্তম আচরণের নির্দেশ দিয়েছে। নবী করীম (সা)-এর জীবনেও আমরা এর উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত দেখতে পাই।

তাই পরিবার, সমাজ ও শিক্ষাঙ্গনে এমন পরিবেশ গড়ে তোলা উচিত, যেখানে মানুষ অপমান ও নিরুৎসাহ নয়; বরং উৎসাহ, সহমর্মিতা ও কল্যাণকামী দিকনির্দেশনা লাভ করবে। কেননা একটি উৎসাহব্যঞ্জক বাক্য যেমন একটি জীবনকে বদলে দিতে পারে, তেমনি একটি অবিবেচনাপ্রসূত তিরস্কার একটি সম্ভাবনাময় জীবনকে পিছিয়েও দিতে পারে।

🔹🔹🔹

👉 আরও পড়ুন উন্নতি ও সফলতার মূলতত্ত্ব

 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Back to top button
error: Content is protected !!