ইমাম ইবনে আবিদ দুনইয়া (রহ) রচনাবলী

আকলের মর্যাদা

কিতাবুল আকল (kitabul aqal) ইবনে আবিদ দুনইয়া রহ.

আকলের মর্যাদা – ইসলামে আকল (বুদ্ধি) মানুষের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নিয়ামত। আল্লাহ তাআলা মানুষকে যে বিশেষ গুণ দিয়ে অন্যান্য সৃষ্টির উপর মর্যাদা দিয়েছেন, তার অন্যতম হলো আকল।

কুরআন ও হাদিসে বারবার মানুষকে চিন্তা-ভাবনা করতে, সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য বুঝতে এবং সঠিক পথে চলতে আকল ব্যবহার করার আহ্বান জানানো হয়েছে। ইসলামী মনীষীরা তাই আকলের গুরুত্ব নিয়ে অসংখ্য আলোচনা ও মূল্যবান উক্তি রেখে গেছেন।

প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ও আলেম ইবনে আবিদ দুনইয়া রচিত কিতাবুল আকল গ্রন্থটি এই বিষয়ের উপর একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকলন।

আরও পোস্ট

এই কিতাবে আকল সম্পর্কিত কুরআনের নির্দেশনা, হাদীস, সাহাবী ও তাবেঈনদের বাণী এবং জ্ঞানীদের শিক্ষণীয় উক্তি একত্রিত করা হয়েছে।

এতে স্পষ্টভাবে বোঝানো হয়েছে যে প্রকৃত আকল মানুষকে আল্লাহভীতি, নৈতিকতা এবং সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের পথে পরিচালিত করে।

এই লেখায় কিতাবুল আকল ও ইসলামী জ্ঞানীদের আলোকে আকল সম্পর্কিত কিছু শিক্ষণীয় উক্তি তুলে ধরা হবে, যা আমাদের চিন্তা-চেতনা পরিশুদ্ধ করতে এবং জীবনে প্রজ্ঞার সাথে চলতে অনুপ্রাণিত করবে।

ইমাম ইবনে আবিদ দুনইয়া (রহ) রচিত আল আকল গ্রন্থ থেকে অনূদিত 

আমাদের অনুবাদ ও প্রকাশনা – দারুস সাআদাত 

Table of Contents

أَقْسَامُ الْعَقْلِ

আকলের প্রকারভেদ

আকল তিন ভাগে বিভক্ত

রিওয়ায়াতঃ৮৩  ইবনে জুরাইজ বলেন, আকল তিন ভাগে বিভক্ত। যার মধ্যে এই তিনটি গুণ থাকে, তার আকল পূর্ণ হয়-

قُسِّمَ الْعَقْلُ عَلَى ثَلَاثَةِ أَجْزَاءٍ فَمَنْ كُنَّ فِيهِ كَمُلَ عَقْلُهُ: حُسْنُ الْمَعْرِفَةِ بِاللَّهِ، وَحُسْنُ الطَّاعَةِ لَهُ، وَحُسْنُ الصَّبْرِ عَلَى أَمْرِهِ

আল্লাহর ব্যাপারে ভালোভাবে জ্ঞান রাখা, উত্তমভাবে তার আনুগত্য করা এবং তার নির্দেশাবলীতে ধৈর্যধারণ করা।

ফায়দাঃ এই উক্তিটি ইলম ও আত্মশুদ্ধির দৃষ্টিকোণ থেকে অত্যন্ত মূল্যবান। এতে বলা হয়েছে, প্রকৃত বুদ্ধিমানের লক্ষণ তিনটি- আল্লাহকে সঠিকভাবে জানা (তাওহীদ, গুণাবলী, ইলম), তার ইবাদতে সুন্দর আচরণ এবং তার পরীক্ষায়, বিধানে বা কষ্টে ধৈর্য ধারণ। এগুলো যার মধ্যে রয়েছে, তার বুদ্ধি পরিপূর্ণ বলে বিবেচিত।

মানুষের মধ্যে সবচেয়ে জ্ঞানী

রিওয়ায়াতঃ৮৪ ইয়াহইয়া ইবনে আবী কাসীর বলেন-

أَعْلَمُ النَّاسِ وَأَفْضَلُهُمْ أَعْقَلُهُمْ

মানুষের মধ্যে সবচেয়ে জ্ঞানী ও উত্তম ব্যক্তি হলেন তিনি, যিনি সবচেয়ে বেশি আকলমন্দ।

ফায়দাঃ অর্থাৎ, শুধুমাত্র অনেক তথ্য জানা নয়, বরং যে ব্যক্তি জ্ঞানকে সঠিকভাবে কাজে লাগিয়ে আল্লাহভীরু, ন্যায়নিষ্ঠ ও দূরদর্শীভাবে জীবন পরিচালনা করেন- তিনিই প্রকৃত অর্থে সেরা ও সবচেয়ে জ্ঞানী।

مِنْ أَقْوَالِ الْحُكَمَاءِ عَنِ الْعَقْلِ وَالْعَاقِلِ

আকল ও আকলমন্দ মানুষ সম্পর্কে জ্ঞানীদের কিছু কথা

মানুষের মেরুদণ্ড

রিওয়ায়াতঃ৮৫ ইবনে জুরাইজ বলেন-

قِوَامُ الْمَرْءِ عَقْلُهُ، وَلَا دِينَ لِمَنْ لَا عَقْلَ لَهُ

মানুষের মেরুদণ্ড হচ্ছে তার বুদ্ধি, আর যার বুদ্ধি নেই, তার কোনো দীন (ধর্ম) নেই।

ফায়দাঃ মানুষের আসল শক্তি ও ব্যক্তিত্ব দাঁড়িয়ে থাকে তার বুদ্ধিমত্তা ও বিচক্ষণতার ওপর। আর যার আকল নেই- অর্থাৎ ভালো-মন্দ বুঝতে পারে না, দায়িত্ব নিতে জানে না- সে প্রকৃতভাবে দীন বা ইসলামের দায়িত্বও বহন করতে পারে না।

গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলোকে অগ্রাধিকার দেয়া

রিওয়ায়াতঃ৮৬ একজন হাকীম (জ্ঞানী ব্যক্তি) তাঁর ভাইকে বলেছিলেন-

يَا أَخِي عَقْلُكَ لَا يَتَّسِعُ لِكُلِّ شَيْءٍ فَفَرِّغْهُ لَأَوَّلِ الْمُهِمِّ مِنْ أَمْرِكَ

হে ভাই! তোমার আকল ও বোধশক্তি সব কিছু ধারণ করতে পারবে না, তাই এটিকে তোমার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজের জন্য খালি রাখো।

وَكَرَامَتُكَ لَا تَسَعُ النَّاسَ فَخُصَّ بِهَا أَوْلَى النَّاسِ بِكَ

তোমার মর্যাদা (সম্মান) সব মানুষের জন্য যথেষ্ট নয়, তাই যারা তোমার সবচেয়ে নিকটবর্তী, তাদেরকেই এ সম্মান দাও।

وَلَيْلُكَ وَنَهَارُكَ لَا يَسْتَوْعِبَانِ حَوَائِجَكَ فَأَسْقِطْ عَنْكَ مَا لَكَ مِنْهُ بُدٌّ

তোমার দিন-রাত তোমার সব প্রয়োজন মেটানোর জন্য যথেষ্ট নয়, তাই যেগুলো ছাড়া চলা যায়, সেগুলো বাদ দাও।

وَلَيْسَ مِنَ الْعَقْلِ أَنْ تَذَرَ مِنَ الْخَيْرِ مَا لَابُدَّ مِنْهُ

এটাও বুদ্ধিমানের কাজ নয় যে, যেটা ছাড়া উপায় নেই এমন ভালো কাজকে তুমি ছেড়ে দিবে।

وَلَا تَمْدَحْ مَنْ لَمْ تُخْبَرْ إِحْسَانُهُ

আর যাকে তুমি ভালোভাবে চেনো না, তার প্রশংসা করো না।

ফায়দাঃ এই উক্তিটি সময়, সম্মান, বুদ্ধি ও কাজের অগ্রাধিকার সম্পর্কে দারুণ ভারসাম্য শেখায়। মনের ধারণক্ষমতা সীমিত, তাই অপ্রয়োজনীয় চিন্তা বাদ দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজে মনোযোগ দিতে হবে। সবাইকে খুশি করতে যেও না- যারা প্রকৃত আপন, তাদের প্রাধান্য দাও। সময় সীমিত, তাই অপ্রয়োজনীয় কাজ বাদ দিয়ে যা জরুরি তাই করো। যা ভালো, অথচ অপরিহার্য, তা বাদ দেওয়া বোকামি। না জেনে কারও প্রশংসা করো না, তা মিথ্যা হয়ে যেতে পারে।

এটি জীবন পরিচালনায় ভারসাম্য ও প্রজ্ঞার অসাধারণ উপদেশ।

আকল দুইটি বিষয়ের সমষ্টি

রিওয়ায়াতঃ৮৭ একজন জ্ঞানী মানুষকে জিজ্ঞেস করা হলো- আকল কী? তিনি বললেন-

أَمْرَانِ أَحَدُهُمَا صِحَّةُ الْفِكْرِ فِي الذَّكَاءِ وَالْفِطْنَةِ، وَالْآخَرُ حُسْنُ التَّمْيِيزِ وَكَثْرَةُ الْإِصَابَةِ

আকল দুইটি বিষয়ের সমষ্টি, সঠিকভাবে চিন্তা করার ক্ষমতা যা হয় বুদ্ধি ও তীক্ষ্ণতা দিয়ে ভালোভাবে পার্থক্য করতে পারা ও বেশি বেশি সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারা।

ফায়দাঃ আকল মানে হলো দুইটি জিনিস- চিন্তা করার ক্ষমতা। মানে, তাড়াতাড়ি বুঝতে পারা ও বুদ্ধিমান হওয়া। ভালো-মন্দ বা ঠিক-ভুল চিনে নিতে পারা এবং বারবার সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারা।

মূর্খতা কী?

রিওয়ায়াতঃ৮৮ একজন জ্ঞানী মানুষকে জিজ্ঞেস করা হলো, মূর্খতা কী? তিনি বললেন- মূর্খতা হলো-

قِلَّةُ الْإِصَابَةِ وَوَضْعُ الْكَلَامِ فِي غَيْرِ مَوْضِعِهِ وَكُلَّمَا مُدِحَ بِهِ الْعَاقِلُ كَانَ مَفْقُودًا فِي الْأَحْمَقِ

বারবার ভুল করা বা সঠিক কাজ কম হওয়া। যেখানে বলা উচিত না, সেখানে কথা বলা। আর যে সব গুণে একজন বুদ্ধিমান প্রশংসা পায়, সেগুলো মূর্খের মধ্যে থাকে না।

ফায়দাঃ মূর্খ লোক ঠিকমতো কাজ করতে পারে না, সময় অসময়ে কথা বলে আর বুদ্ধিমানদের যেসব ভালো গুণ থাকে, সেগুলোর একটাও তার মধ্যে থাকে না।

সবকিছুর সংক্ষিপ্ত সারমর্ম

রিওয়ায়াতঃ৮৯ একজন জ্ঞানীকে জিজ্ঞেস করা হলো- আমাদের এমন কোনো উপদেশ দিন যা সবকিছুর সংক্ষিপ্ত সারমর্ম হয়। তিনি বললেন, সাবধান ও সজাগ থেকো! প্রত্যেক ব্যক্তির মধ্যে দুইটি অন্তর্নিহিত বিচারক (নির্ণায়ক) থাকে- একজন হলো সতর্ক ও ন্যায্য উপদেশদাতা, আর অন্যজন ধোঁকাবাজ। সতর্ক উপদেশদাতা হলো আকল। আর ধোঁকাবাজ হলো হাওয়া (প্রবৃত্তি)। এই দুটো পরস্পর একবারে বিপরীত, তাই যেটার দিকে তুমি বেশি ঝুঁকবে, সেটাই তোমার নিয়ন্ত্রণ করবে।

ফায়দাঃ আমাদের ভেতরে দুটো শক্তি লুকিয়ে আছে- বুদ্ধি ও যুক্তি (যা সত্য এবং ভালো পথে পরিচালিত করে), প্রবৃত্তি ও ইচ্ছা (যা ভুল পথে বা প্রলোভনে নিয়ে যায়)। এই দুইয়ের মধ্যে যেটার কথায় তুমি বেশি বিশ্বাস করবে, সেটাই তোমার জীবন ও কাজ নিয়ন্ত্রণ করবে। তাই বুদ্ধির কথায় বেশি মনোযোগ দাও, হাওয়ায় (বাসনায়) নয়।

বুদ্ধিমান ও ন্যায়পরায়ণ মানুষের সঙ্গে ভদ্রতা

রিওয়ায়াতঃ৯০ আবু বকর বলেন, উবায়দুল্লাহ ইবনে মুহাম্মদ আল-কুরশী বলেন, এক লোক এক বাদশাহর সাথে কথা বলছিল, তখন সে প্রথমে নম্র আচরণ করেছিল, পরে কঠোর আচরণ করে। বাদশাহ তাকে বলল, কেন তুমি প্রথমে আমার সাথে এমন কঠোরভাবে কথা বলোনি?

সে লোক বলল, যখন আমি আপনার সঙ্গে কথা বললাম, তখন আমি ভাবলাম যে, আপনার আকল বোধ আছে, তাই বুঝলাম আপনার আকল আপনাকে কখনো অন্যায় করতে দিবে না (কিন্তু পরে দেখলাম যে আপনার আকল কম)।

ফায়দাঃ একজন ব্যক্তি রাজাকে নম্রতা ও শ্রদ্ধা দেখিয়েছিল কারণ সে বুঝতে পেরেছিল রাজা বুদ্ধিমান, ন্যায়পরায়ণ। বুদ্ধিমান মানুষ সাধারণত অন্যায় করেন না, তাই তার প্রতি ভরসা রাখা যায়। এই কারণে সে প্রথমে রাজার সাথে সম্মানের সঙ্গে কথা বলেছিল।

অর্থাৎ, বুদ্ধিমান ও ন্যায়পরায়ণ মানুষের সঙ্গে ভদ্রতা ও শ্রদ্ধার সম্পর্ক স্থাপন করাই উচিত।

দীনদারী

রিওয়ায়াতঃ৯১ হাফস ইবনে হুমায়দ বলেন-

مِنْ وَرَعِ الرَّجُلِ ألَّا يَخْدَعَ، وَمِنْ عَقْلِهِ ألَّا يُخْدَعَ

কোনো মানুষের দীনদারী হলো (কারো সাথে) প্রতারণা না করা, আর তার আকল হলো প্রতারণা থেকে বাঁচা।

ফায়দাঃ সত্যিকারের ধার্মিকতা মানে কাউকে ঠকানো বা কারো সঙ্গে প্রতারণা করা থেকে বিরত থাকা। আর বুদ্ধিমান মানুষ বুঝে যে, (অন্যের) প্রতারণা থেকে সাবধান থাকা প্রয়োজন।

অর্থাৎ, সৎ থাকা ঈমানের চিহ্ন, আর বুদ্ধি হলো সতর্ক থাকা যেন কেউ তোমার সাথে প্রতারণা করতে না পারে।

صَاحِبُ الْعَقْلِ يَنْجُو بِهِ فِي يَوْمٍ مِنَ الْأَيَّامِ

বুদ্ধিমান ব্যক্তি তার বুদ্ধির মাধ্যমে কোনো একদিন রক্ষা পায়

কিভাবে সফলতা অর্জন করা যায়?

রিওয়ায়াতঃ৯২ মুহাল্লাব ইবনে আবু সুফরাহকে জিজ্ঞেস করা হলো, আপনি যেসব সফলতা অর্জন করেছেন, তা কীভাবে অর্জন করেছেন? তিনি বললেন,

بِطَاعَةِ الْحَزْمِ وَعِصْيَانِ الْهَوَى

বিচক্ষণতার অনুসরণ (বুঝে-শুনে কাজ করা) আর নিজের খেয়াল-খুশিকে (মনের চাহিদাকে) বিসর্জনের মাধ্যমে।

ফায়দাঃ অর্থাৎ, তিনি আবেগে নয়, আকল বুদ্ধি দ্বারা কাজ করতেন, তাই তিনি সফল হয়েছেন।

আল্লাহ আকলমন্দকে রক্ষা করেন

রিওয়ায়াতঃ৯৩ হাসান (রহ) বলেন-

مَا أَوْدَعَ اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ امْرَأً عَقْلًا إِلَّا اسْتَنْقَذَهُ بِهِ يَوْمًا مَا

আল্লাহ কোনো মানুষকে যদি আকল দিয়ে থাকেন, তবে সেই আকলের মাধ্যমে একদিন না একদিন সে অবশ্যই উদ্ধার পায়।

ফায়দাঃ  অর্থাৎ, আকল থাকলে তা একদিন মানুষকে রক্ষা করবেই-  হয়তো বিপদ থেকে, নয়তো ভুল সিদ্ধান্ত থেকে।

الْقُلُوبُ تَمَلُّ كَمَا تَمَلُّ الْأَبْدَانُ

দেহ যেমন ক্লান্ত হয়ে পড়ে, তেমনি মনও ক্লান্ত হয়

মন চাঙ্গা করা উপায়

রিওয়ায়াতঃ৯৪ আলী ইবনে আবী তালিব (রা) বলেছেন-

إِنَّ هَذِهِ الْقُلُوبَ تَمَلُّ كَمَا تَمَلُّ الْأَبْدَانُ فَالْتَمِسُوا لَهَا مِنَ الْحِكْمَةِ طَرَفًا

এই হৃদয়গুলোও ক্লান্ত হয়ে পড়ে, যেমন দেহ ক্লান্ত হয়। তাই তোমরা মনকে চাঙা করতে হিকমত (জ্ঞানের কথা বা উপদেশ) থেকে কিছু কিছু গ্রহণ করো।

ফায়দাঃ মনও একঘেয়ে হয়ে যায়, শরীরের মতো। তাই মন যেন সচল ও সচেতন থাকে, এজন্য মাঝে মাঝে জ্ঞানের কথা শোনা বা পড়া দরকার।

অর্থাৎ শুধু কাজ বা ইবাদত করলেই হবে না- মনকে সতেজ রাখার জন্য জ্ঞান, হিকমত ও উপদেশ প্রয়োজন।

জ্ঞানী ও মূর্খের পার্থক্য

রিওয়ায়াতঃ৯৫ হুসায়ন ইবনে আব্দুর রহমান বলেন, একজন হাকীম (জ্ঞানী ব্যক্তি) বলেছিলেন-

لَا تَرَى الْعَاقِلَ إِلَّا خَائِفًا كَمَا أَنَّ الْجَاهِلَ لَا تَرَاهُ إِلَّا آمِنًا

তুমি জ্ঞানী ব্যক্তিকে সবসময় ভয় ও সতর্ক অবস্থায় দেখতে পাবে, আর মূর্খকে দেখবে সবসময় নিশ্চিন্ত ও নির্ভার।

এ বিষয়ে একজন কবিও বলেছেন-

لَا تَرَى الْعَاقِلَ إِلَّا خَائِفًا … حَذِرًا مِنْ يَوْمِهِ دُونَ غَدِهِ

তুমি জ্ঞানী ব্যক্তিকে সবসময় ভয়ভীত অবস্থায় দেখবে,

সে নিজের আজকের দিন নিয়েই চিন্তিত থাকে, আগামী দিনের নয়।

ফায়দাঃ বুদ্ধিমান লোক সবসময় সাবধান ও চিন্তাশীল থাকে। সে জানে যে ভুল করলে তার পরিণাম আছে। তাই সে সচেতন থাকে, নিজের কাজ ও কথার ব্যাপারে সতর্ক থাকে। আর মূর্খ মানুষ সবসময় নির্ভার, চিন্তামুক্ত- সে না ভয় পায়, না ভবিষ্যতের চিন্তা করে। এজন্যই সে ভুলও বেশি করে।

এই বাণী আমাদের শেখায়: বুদ্ধিমানের আলামত হলো ভয় ও সতর্কতা; আর মূর্খের আলামত হলো অহেতুক নিশ্চিন্ততা।

মনকে উৎসাহ দিয়ে কাজ করানো

রিওয়ায়াতঃ৯৬ ইবনে মাসউদ (রা) বলেন-

اسْتَبِقْ نَفْسَكَ وَلَا تُكْرِهَّا فَإِنَّكَ إِنْ أَكْرَهْتَ الْقَلْبَ عَلَى شَيْءٍ عَمِيَ

নিজের মনকে (সৎকর্মে) অগ্রসর কর, কিন্তু জোর করো না। কেননা তুমি যদি হৃদয়কে কোনো কিছুর জন্য জোর করো, তাহলে তা অন্ধ হয়ে যায়।

ফায়দাঃ ইবনে মাসউদ (রা) বোঝাতে চেয়েছেন, তোমার মনকে (নফসকে) ভালো কাজে উৎসাহিত করো, আগ্রহ তৈরি করো। কিন্তু যদি জোর করে কিছু করাও, মন তা মেনে নেয় না বরং উল্টো প্রতিক্রিয়া দেখায়- তখন মন অন্ধ হয়ে যায় (আগ্রহ হারিয়ে ফেলে), অর্থাৎ সত্য বোঝে না।

এটি আত্মশিক্ষা বা ইবাদতের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য- ধৈর্য ও মমতা দিয়ে মনকে গড়ে তুলতে হয়, হঠাৎ চাপ দিয়ে নয়।

مِنْ صِفَاتِ الْمُؤْمِنِ الذِّكْرُ وَالتَّفَكُّرُ

মুমিনের গুণাবলির মধ্যে রয়েছে আল্লাহর স্মরণ (যিকর) ও চিন্তা-ভাবনা (তাফাক্কুর)

মুমিন হয় চিন্তাশীল

রিওয়ায়াতঃ৯৭ ওহাব ইবনে মুনাব্বিহ বলেন, একজন মুমিন হয় চিন্তাশীল ও আল্লাহকে বেশি স্মরণকারী। যে আল্লাহকে স্মরণ করে, সে জীবনের ব্যাপারে ভাবেও। তার ভিতরে থাকে শান্তি ও নিশ্চিন্ততা। সে যেটুকু পায়, তাতেই খুশি থাকে, দুশ্চিন্তা করে না।

সে খারাপ ইচ্ছা (লোভ, কামনা) ছেড়ে দেয়- তাই সে সত্যিকার অর্থে স্বাধীন মানুষ হয়। সে হিংসা করে না— তাই মানুষ তাকে ভালোবাসে। সে দুনিয়ার সব নশ্বর জিনিস (যেমন: টাকা, সম্পদ, যশ) থেকে দূরে থাকে- ফলে তার বুদ্ধি পূর্ণ হয়। সে আখিরাতের (চিরস্থায়ী জিনিস) প্রতি আগ্রহী হয়- সত্যিকারের জ্ঞানকে উপলব্ধি করে।

ফায়দাঃ একজন ভালো মুমিন আল্লাহকে বেশি স্মরণ করে, ভাবনা-চিন্তা করে, দুনিয়ার লোভ ছাড়ে, শান্ত থাকে, হিংসা করে না— আর তাই সে প্রকৃত জ্ঞান করে ও মুক্তি পায়।

মনকে বিশ্রাম দেওয়া

রিওয়ায়াতঃ৯৮ কাসামাহ বিন যুহায়র বলেন-

رَوِّحُوا الْقُلُوبَ تَعِ الذِّكْرَ

মনকে মাঝে মাঝে বিশ্রাম দাও, তাহলে সে আল্লাহর যিকির (ইলম ও ইবাদত) ভালোভাবে করতে পারবে।

ফায়দাঃ অর্থাৎ, মনকে সবসময় কষ্ট বা কঠোরতায় রেখো না। মাঝে মাঝে বিশ্রাম বা আনন্দ দাও, যাতে হৃদয় ক্লান্ত না হয় এবং আল্লাহর যিকির (স্মরণ) ভালোভাবে করতে পারে। বেশি চাপ দিলে মন বা হৃদয় অবসন্ন হয়ে যায় এবং আল্লাহর কথা মন দিয়ে শুনতে বা বুঝতে পারে না।

الْعَاقِلُ مَنْ خَافَ اللَّهَ جَلَّ جَلَالُهُ

বুদ্ধিমান সেই, যে আল্লাহকে ভয় করে

প্রকৃত আকলমন্দ

রিওয়ায়াতঃ৯৯ ইবরাহীম বিন মূসা বলেন, একবার লুকমান (আ)-এর এক দাস তাকে বলল, আমি তো মনে করি না আপনি কখনো অসতর্ক হন বা গাফিল থাকেন! তখন লুকমান বললেন-

إِنَّمَا الْعَاقِلُ مَنْ يَخَافُ اللَّهَ عَزَّ وَجَلَّ

প্রকৃত আকলমন্দ তো সেই, যে আল্লাহ তাআলাকে ভয় করে।

ফায়দাঃ লোকটি লুকমান (আ)-কে খুব সচেতন বা ধ্যানী বলেছিল। উত্তরে লুকমান (আ) বুঝিয়ে দিলেন- সত্যিকারের সচেতনতা বা বুদ্ধিমত্তা মানে হচ্ছে আল্লাহকে ভয় করা, সবসময় তার হুকুম মানা, পাপ থেকে বাঁচা, এবং আখিরাতের চিন্তা করা।

সারকথা: বুদ্ধিমানের চিহ্ন হলো- সে আল্লাহকে ভয় করে, আর এটাই তাকে গাফিল (অসতর্ক) হওয়া থেকে রক্ষা করে।

মানুষ হলো বোকা

রিওয়ায়াতঃ১০০ সুফিয়ান আস সাওরী (রহ) বলেন-

بَلَغَنِي أَنَّ الْإِنْسَانَ خُلِقَ أَحْمَقَ وَلَوْلَا ذَلِكَ لَمْ يَهْنِهِ الْعَيْشُ

আমার কাছে এই কথা পৌঁছেছে যে, মানুষকে আহমক বা বোকা করে সৃষ্টি করা হয়েছে। যদি তা না হতো, তবে সে কখনো জীবনের স্বাদ পেত না।

ফায়দাঃ মানুষের ভেতরে কিছুটা সরলতা বা বোকামি থাকেই- সবকিছু নিয়ে বেশি চিন্তা করলে বা গভীরভাবে বিচার করলে মানুষ দুশ্চিন্তায় ভেঙে পড়ত। আল্লাহ মানুষকে এমনভাবে বানিয়েছেন যাতে সে ছোট ছোট আনন্দে সুখ পেতে পারে, সবকিছু বেশি বুঝলে জীবন অনেক কঠিন হতো।

সারকথা: সবার মধ্যে একটু না-বুঝে থাকা বা সরলতা থাকাই জীবনে শান্তি পাওয়ার উপায়। সবকিছু অতিরিক্ত বুঝলে জীবন উপভোগ করা কঠিন হয়ে যেত।

কেউ যখন নিজের কাজে গর্বিত হয়

রিওয়ায়াতঃ১০১ দাউদ ইবনু সালামা আল হারিসি বলেন, আবু হাজিম বলতেন-

عَجَبُ الْمَرْءِ بِفِعْلِهِ أَحَدُ حُسَّادِ نَفْسِهِ

কোন ব্যক্তি যখন নিজের কাজের উপর গর্বিত হয়, তখন সে নিজেরই একজন হিংসুক হয়ে ওঠে।

ফায়দাঃ এই বাণীতে বলা হচ্ছে—যখন কেউ নিজের ভালো কাজ নিয়ে অতিরিক্ত গর্ব করে, তখন সে নিজেকেই ক্ষতিগ্রস্ত করে, যেন নিজের প্রতিই সে হিংসা করছে। এটা বিনয় এবং আত্মসমালোচনার গুরুত্ব বোঝাতে বলা হয়েছে।

আকলের নিদ্রা ও জাগরণ

রিওয়ায়াতঃ১০২ আবু হাসানা আল আবিদ বলেন-

الصَّمْتُ نَوْمُ الْعَقْلِ وَالْمَنْطِقُ يَقَظَتُهُ

নীরবতা হচ্ছে আকলের নিদ্রা (বিশ্রাম), আর কথা বলা হচ্ছে তার জাগরণ।

ফায়দাঃ যখন কেউ কিছু না বলে চুপ থাকে, তখন তার আকল নিদ্রিত বা বিশ্রামে থাকে। আর কথা বললে তা জেগে উঠে। অতএব বুঝে শুনে কথা বলা উচিৎ।

مِنْ وَصِيَّةِ لُقْمَانَ لِابْنِهِ

ছেলের প্রতি লুকমান (আ) এর উপদেশ

যবানের হিফাযত

রিওয়ায়াতঃ১০৩ ওয়াহাব ইবনে মুনাব্বিহ বলেন, লুকমান হাকীম (আ)-এর জ্ঞানের মধ্যে লেখা ছিল, তিনি তার ছেলেকে বলেছিলেন-

يَا بُنَيَّ، إِنَّ اللِّسَانَ هُوَ بَابُ الْجَسَدِ، فَاحْذَرْ أَنْ يَخْرُجَ مِنْ لِسَانِكَ مَا يُهْلِكُ جَسَدَكَ وَيُسْخِطُ عَلَيْكَ رَبَّكَ عَزَّ وَجَلَّ

বৎস! জিভ হলো শরীরের দরজা। তাই সাবধান, যেন তোমার জিভ থেকে এমন কিছু না বের হয় যা তোমার শরীরকে ধ্বংস করে দেয় এবং তোমার প্রতিপালক আল্লাহকে রাগান্বিত করে তোলে।

ফায়দাঃ লোকমান (আ) তার ছেলেকে বলেছিলেন- বাবা, জিভ খুব শক্তিশালী জিনিস। তাই এমন কিছু বলো না, যা তোমার ক্ষতি করবে আর আল্লাহকে রাগান্বিত করবে।

অর্থ: কথার উপর নিয়ন্ত্রণ রাখা খুব জরুরি। কারণ ভুল কথা আমাদের দুনিয়া ও আখিরাতে ক্ষতির কারণ হতে পারে।

উপসংহার

ইমাম ইবনে আবিদ দুনইয়া (রহ) এর এই আলোচনায় স্পষ্টভাবে বোঝা যায় যে, আকল ইসলামে একটি অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ নিয়ামত, যা মানুষের ঈমান, চরিত্র ও জীবনের সঠিক পথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

আকলের সঠিক ব্যবহার মানুষকে আল্লাহর নৈকট্য অর্জনে সহায়তা করে এবং দুনিয়া ও আখিরাতে সফলতার পথ খুলে দেয়। তাই প্রত্যেক মুসলিমের উচিত আকলকে কুরআন ও সুন্নাহ অনুযায়ী ব্যবহার করা।

🔸🔸🔸

আরও পড়ুন মান আশা বাদাল মাউত (প্রথম অংশ) – ইমাম ইবনে আবিদ দুনইয়া (রহ)

 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Back to top button
error: Content is protected !!