আল হাদীস

আয যুহুদ – ইমাম ওকী (রহ)

দুনিয়ার প্রতি অনাসক্তি ও হৃদয় কোমলকারী হাদীস ও রিওয়ায়াত সমূহ

আয যুহুদ ইমাম ওকী ইবনুল জাররাহ (রহ)-এর অন্যতম প্রসিদ্ধ গ্রন্থ। এতে তিনি কুরআন, হাদিস, সাহাবায়ে কিরাম, তাবিয়ীন ও সালফে সালেহীনের বাণী ও ঘটনাবলির মাধ্যমে যুহুদের প্রকৃত ধারণা তুলে ধরেছেন।

গ্রন্থটির মূল উদ্দেশ্য দুনিয়ার প্রতি অতি আসক্তি থেকে মানুষকে সতর্ক করা এবং আল্লাহভীতি, তাকওয়া, ইখলাস, কনাআত ও আখিরাতমুখী জীবন গঠনে উদ্বুদ্ধ করা।

এ গ্রন্থে যুহুদ বলতে দুনিয়া ত্যাগ করে সংসারবিমুখ হওয়াকে বোঝানো হয়নি; বরং দুনিয়াকে আখিরাতের প্রস্তুতির মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করা, হারাম ও সন্দেহজনক বিষয় থেকে বেঁচে থাকা, নফসের চাহিদা নিয়ন্ত্রণ করা এবং আল্লাহর সন্তুষ্টিকে জীবনের সর্বোচ্চ লক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করার শিক্ষা দেওয়া হয়েছে।

আরও পোস্ট

ইমাম ওকী (রহ) তার নির্ভরযোগ্য সনদের মাধ্যমে অসংখ্য হাদিস, আছার ও সালাফদের উপদেশ একত্রিত করেছেন। ফলে আয-যুহুদ শুধু একটি হাদিস সংকলন নয়; এটি আত্মশুদ্ধি, তাকওয়া ও ইসলামী নৈতিকতার এক গুরুত্বপূর্ণ উৎস।

যুগে যুগে আলেমগণ এ গ্রন্থকে যুহুদ ও রাকায়েক (হৃদয় কোমলকারী বিষয়) সম্পর্কিত অন্যতম মূল্যবান রচনা হিসেবে গণ্য করেছেন।

বর্তমান বস্তুবাদী যুগেও এই গ্রন্থের শিক্ষা একজন মুসলিমকে দুনিয়ার মোহ থেকে মুক্ত থেকে আল্লাহমুখী ও ভারসাম্যপূর্ণ জীবন গড়তে অনুপ্রাণিত করে।

Table of Contents

আয যুহুদ

যাকে তিনটি গুণ দান করা হয়েছে

রিওয়য়য়াত: ১- বর্ণনাসূত্র।
রিওয়ায়ত: ২- মুহাম্মাদ ইবন কাব আল-কুরুযী থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, যখন আল্লাহ কোনো বান্দার কল্যাণ কামনা করেন, তখন তিনি তাকে দুনিয়ার প্রতি অনাসক্ত করে দেন, তাকে দ্বীনের গভীর জ্ঞান দান করেন এবং তাকে তার নিজের দোষ-ত্রুটিগুলো দেখিয়ে দেন। আর যাকে এই তিনটি গুণ দান করা হয়েছে, তাকে দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণই দান করা হয়েছে।

আখিরাতের সফলতার জন্য সবচেয়ে উত্তম

রিওয়ায়াত: ৩- আবু ওয়াকিদ আল-লাইসী (রহ) বলেন, আমরা দুনিয়ার নানা আমল ও কর্মের অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি এবং সেগুলো অনুসরণ করেছি। কিন্তু আখিরাতের জন্য এমন কোনো আমল পাইনি, যা দুনিয়ার প্রতি অনাসক্তি (যুহদ) অবলম্বনের চেয়ে অধিক ফলপ্রসূ ও কার্যকর।

রিওয়ায়াত: ৪- হযরত সুফিয়ান (রহ) বলেন-

উমর (রা) আবু মূসা (রা)-এর কাছে লিখেছিলেন, তুমি আখিরাতের আমল ও সফলতা এমন কোনো কিছুর মাধ্যমে অর্জন করতে পারবে না, যা দুনিয়ার প্রতি অনাসক্তি (যুহদ) অবলম্বনের চেয়ে অধিক উত্তম।

ব্যাখ্যা

যুহদ (الزهد) অর্থ দুনিয়ার বৈধ নিয়ামত ত্যাগ করা নয়; বরং দুনিয়াকে লক্ষ্য না বানিয়ে আখিরাতকে প্রাধান্য দেওয়া এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য জীবন পরিচালনা করা।

হযরত উমর (রা)-এর এই উপদেশের মর্মার্থ হলো, আখিরাতের সফলতার সর্বোত্তম উপায়গুলোর একটি হলো দুনিয়ার মোহ ও অতিরিক্ত আসক্তি থেকে নিজেকে মুক্ত রাখা।

উমর (রা) এর উপদেশ

রিওয়ায়াত: ৫- হযরত সুফিয়ান (রহ) বলেন, উমর (রা) আবু মূসা (রা)-এর কাছে লিখেছিলেন, নিশ্চয়ই ফিকহ (দীনের গভীর জ্ঞান) শুধু বেশি বয়সের কারণে অর্জিত হয় না; বরং তা আল্লাহর দান ও তার পক্ষ থেকে প্রদত্ত রিযিক।

তিনি আরও লিখেছিলেন, আর তুমি নিকৃষ্ট চরিত্র, চারিত্রিক অধঃপতন এবং হীন স্বভাব থেকে সতর্ক থাকবে।

মূল শিক্ষা

প্রকৃত দীনি প্রজ্ঞা কেবল বয়সের ওপর নির্ভরশীল নয়; এটি আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ। তাই জ্ঞান অর্জনের পাশাপাশি উত্তম চরিত্র গঠন এবং নিকৃষ্ট স্বভাব থেকে বেঁচে থাকাও অপরিহার্য।

কম খাওয়া কম পান করা যুহুদ নয়

রিওয়ায়াত: ৬- সুফইয়ান (রহ) বলেন, দুনিয়ার প্রতি যুহদ (অনাসক্তি) হলো দীর্ঘ আশা-আকাঙ্ক্ষা না রাখা, মোটা খাবার খাওয়া কিংবা মোটা চাদর পরিধান করা যুহদ নয়।

মূল শিক্ষা

সুফইয়ান (রহ) বোঝাতে চেয়েছেন যে যুহদের মূল বিষয় বাহ্যিক পোশাক বা খাদ্যের সরলতা নয়, বরং অন্তরের অবস্থা। প্রকৃত যুহদ হলো দুনিয়ার মোহে ডুবে না যাওয়া, দীর্ঘ দুনিয়াবি স্বপ্নে বিভোর না হয়ে আখিরাতের জন্য সর্বদা প্রস্তুত থাকা।

অধ্যায়: দুনিয়ার প্রতি অনাসক্তি (যুহদ) সম্পর্কে নবী (সা) এর উপদেশ

রিওয়ায়াত: ৭- আমর ইবনু মাইমূন আল-আওদী (রহ) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা) এক ব্যক্তিকে বললেন- পাঁচটি জিনিস আসার আগে পাঁচটি জিনিসের মূল্য দাও-

মৃত্যুর আগে তোমার জীবন,
অসুস্থ হওয়ার আগে তোমার সুস্থতা,
ব্যস্ত হয়ে পড়ার আগে তোমার অবসর,
বার্ধক্য আসার আগে তোমার যৌবন,
দারিদ্র্য আসার আগে তোমার সম্পদ।”

সংক্ষিপ্ত অর্থ

মানুষের জীবনের এই পাঁচটি নিয়ামত স্থায়ী নয়। তাই এগুলো থাকা অবস্থায় আল্লাহর ইবাদত, নেক আমল ও আখিরাতের প্রস্তুতি গ্রহণ করা উচিত।

দুটি নিআমতের নাশোকরী

রিওয়ায়াত: ৮- হযরত ইবনে আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,রাসুলুল্লাহ (সা) বলেছেন, দুটি নিয়ামতের ব্যাপারে অনেক মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়- অবসর এবং সুস্থতা।

সংক্ষিপ্ত অর্থ

অনেক মানুষ সুস্থ থাকা ও অবসর সময়ের সঠিক মূল্য দেয় না। অথচ এই দুটি নিয়ামত কাজে লাগিয়ে ইবাদত, নেক আমল ও উপকারী কাজ করা উচিত। যখন অসুস্থতা বা ব্যস্ততা আসে, তখন সেই সুযোগ আর থাকে না।

এক নারীর যুহুদ

রিওয়ায়াত: ৯- বকর ইবন আবদুল্লাহ আল-মুযানী (রহ) বলেন, ইয়েমেনে এক ইবাদতগুজার নারী ছিলেন। সন্ধ্যা হলে তিনি নিজেকে বলতেন,

হে আমার নফস! এ রাতই তোমার রাত। এর পরে আর কোনো রাত নাও পেতে পারো। তাই সর্বোচ্চ চেষ্টা করে ইবাদত কর।

আর সকাল হলে তিনি বলতেন, হে আমার নফস! এ দিনই তোমার দিন। এর পরে আর কোনো দিন নাও পেতে পারো। তাই সর্বোচ্চ চেষ্টা করে নেক আমল কর।

সংক্ষিপ্ত শিক্ষা

প্রতিটি দিন ও রাতকে জীবনের শেষ সুযোগ মনে করে আল্লাহর ইবাদত ও নেক আমলে আন্তরিকভাবে চেষ্টা করা উচিত।

কিয়ামতের দিন জিজ্ঞাসাবাদ

রিওয়ায়াত: ১০- মুআয (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা) বলেছেন, কিয়ামতের দিন কোনো বান্দার পা একচুলও নড়বে না, যতক্ষণ না তাকে চারটি বিষয় সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে-

তার জীবন কোথায় ব্যয় করেছে,
তার আমল কী করেছে,
তার সম্পদ কোথা থেকে উপার্জন করেছে এবং কোথায় ব্যয় করেছে,
এবং তার শরীর (শক্তি ও সামর্থ্য) কী কাজে ব্যবহার করেছে।

শিক্ষা

আল্লাহ তাআলা মানুষের জীবন, আমল, সম্পদ ও শারীরিক শক্তি- সবকিছুর হিসাব নেবেন। তাই এগুলো আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে ব্যবহার করা উচিত।

অধ্যায়: যারা বলেছেন- নিজেকে মৃতদের অন্তর্ভুক্ত মনে করো

রিওয়ায়াত: ১১- ইবনে উমর (রা) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা) আমার শরীরের একটি অংশ ধরে বললেন, হে আবদুল্লাহ! দুনিয়ায় এমনভাবে থাকো যেন তুমি একজন অপরিচিত ব্যক্তি বা পথিক। আর নিজেকে মৃতদের অন্তর্ভুক্ত মনে করো।

শিক্ষা

মুমিনের উচিত দুনিয়াকে স্থায়ী আবাস মনে না করা। বরং একজন পথিকের মতো আখিরাতের প্রস্তুতি নেওয়া এবং সব সময় মৃত্যুর কথা স্মরণ রেখে নেক আমল করা।

সকাল হলে সন্ধ্যার চিন্তা করো না

রিওয়ায়াত: ১২- মুজাহিদ (রহ) বলেন, ইবনে উমর (রা) আমাকে বললেন, হে মুজাহিদ! সকাল হলে সন্ধ্যা পর্যন্ত বেঁচে থাকবে- এমন আশা করো না। আর সন্ধ্যা হলে সকাল পর্যন্ত বেঁচে থাকবে এমন আশা করো না।

সুস্থ থাকা অবস্থায় অসুস্থ হওয়ার আগেই সুযোগ কাজে লাগাও। আর জীবিত থাকতেই মৃত্যুর আগেই নেক আমল করে নাও। কারণ, তুমি জানো না আগামীকাল তোমার কী অবস্থা হবে।

শিক্ষা

মৃত্যু কখন আসবে, তা কেউ জানে না। তাই ভবিষ্যতের ওপর ভরসা না করে আজই সুস্থতা ও জীবনের সুযোগ কাজে লাগিয়ে আল্লাহর ইবাদত ও নেক আমল করা উচিত।

নিজেকে মৃত মনে করা

রিওয়ায়াত:১৩- আবু দারদা (রা) বলেন, এমনভাবে আল্লাহর ইবাদত করো, যেন তোমরা তাকে দেখছ। নিজেদের মৃতদের অন্তর্ভুক্ত মনে করো। জেনে রাখো, অল্প সম্পদ যদি তোমার জন্য যথেষ্ট হয়, তবে তা সেই বেশি সম্পদের চেয়ে উত্তম, যা তোমাকে আল্লাহর স্মরণ থেকে গাফিল করে দেয়। আর জেনে রাখো, নেক কাজ কখনো নষ্ট হয় না এবং পাপ কখনো ভুলে যাওয়া হয় না।

শিক্ষা

ইখলাস ও ইহসানের সঙ্গে আল্লাহর ইবাদত করতে হবে।
সব সময় মৃত্যুর কথা স্মরণ রাখতে হবে।
দুনিয়ার প্রাচুর্যের চেয়ে আল্লাহর স্মরণে সহায়ক অল্প সম্পদ উত্তম।
প্রতিটি নেক আমল আল্লাহর কাছে সংরক্ষিত থাকে এবং প্রতিটি পাপেরও হিসাব হবে, যদি তওবা না করা হয়।

অধ্যায়: মৃত্যুর জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ

রিওয়ায়াত:১৪- একজন বনী হাশিমের ব্যক্তি বর্ণনা করেন, এক ব্যক্তি নবী (সা)-এর কাছে এসে বলল, হে আল্লাহর রাসুল! আমাকে জ্ঞানের বিরল ও বিশেষ বিষয়গুলো শিক্ষা দিন।

নবী (সা) বললেন, তুমি জ্ঞানের মূল বিষয়ের কী করেছ যে, এখন তার বিরল বিষয় জানতে চাইছ?

সে বলল, হে আল্লাহর রাসুল! জ্ঞানের মূল বিষয় কী?

তিনি (সা) বললেন, তুমি কি তোমার রবকে চিনেছ?

সে বলল, হ্যাঁ।
তিনি (সা) বললেন, তাহলে তার হক আদায়ে কী করেছ?

তারপর (সা) তিনি বললেন, তুমি কি মৃত্যুকে চিনেছ?
সে বলল, হ্যাঁ।
তিনি (সা) বললেন, তাহলে মৃত্যুর জন্য কী প্রস্তুতি নিয়েছ?
সে বলল, আল্লাহ যা চেয়েছেন।

তখন নবী (সা) বললেন, যাও, আগে জ্ঞানের মূল বিষয়টি ঠিকভাবে আয়ত্ত করো। তারপর এসো, আমি তোমাকে তার বিরল বিষয়গুলো শেখাব।

শিক্ষা

দীনের জ্ঞানের আসল ভিত্তি হলো আল্লাহকে সঠিকভাবে চেনা, তার হক আদায় করা এবং মৃত্যুর জন্য প্রস্তুতি নেওয়া। এই মৌলিক বিষয়গুলো ঠিক না করে শুধু গভীর বা বিরল জ্ঞান অর্জনই প্রকৃত উপকার বয়ে আনে না।

হৃদয়ের প্রশস্ততা

রিওয়ায়াত: ১৫- আবদুল্লাহ ইবন মিসওয়ার (রহ) থেকে বর্ণিত। নবী (সা) এই আয়াত তিলাওয়াত করলেন

أَفَمَنْ شَرَحَ اللَّهُ صَدْرَهُ لِلْإِسْلَامِ فَهُوَ عَلَى نُورٍ مِنْ رَبِّهِ

আল্লাহ যার বক্ষকে ইসলামের জন্য উন্মুক্ত করে দেন, সে তার রবের পক্ষ থেকে এক নূরের ওপর থাকে।-সূরা আয-যুমার: ২২

তারপর তিনি বললেন, যখন সেই নূর অন্তরে প্রবেশ করে, তখন অন্তর প্রশস্ত ও উন্মুক্ত হয়ে যায়।

সাহাবীরা জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসুল! এর কোনো লক্ষণ আছে কি, যা দিয়ে তা বোঝা যাবে?

তিনি (সা) বললেন, হ্যাঁ। তার লক্ষণ হলো-প্রতারণার এই দুনিয়া থেকে মন ফিরিয়ে নেওয়া, চিরস্থায়ী আখিরাতের দিকে মনোযোগী হওয়া এবং মৃত্যু আসার আগেই তার জন্য প্রস্তুতি নেওয়া।

শিক্ষা

যার অন্তরে আল্লাহর নূর প্রবেশ করে, তার জীবনে তিনটি পরিবর্তন দেখা যায়- সে দুনিয়ার মোহ কমিয়ে আনে, আখিরাতকে অগ্রাধিকার দেয় এবং মৃত্যুর আগে নেক আমলের মাধ্যমে তার প্রস্তুতি গ্রহণ করে।

পরিনাম ভেবে কাজ করা

রিওয়ায়াত: ১৬. আবদুল্লাহ ইবন মিসওয়ার আবু জাফর (রহ) বলেন, এক ব্যক্তি নবী (সা) এর কাছে এসে বলল, হে আল্লাহর রাসুল! আল্লাহ আপনার মাধ্যমে সব মুসলিমকে বরকত দান করেছেন। আপনি আমাকে বিশেষভাবে একটি উপদেশ দিন।

নবী (সা) বললেন, আমি যে উপদেশ দেব, তুমি কি তা মেনে চলবে? সে বলল, জি, অবশ্যই।

তখন তিনি (সা) বললেন, যখন কোনো কাজ করার ইচ্ছা করবে, আগে তার পরিণাম ভেবে দেখো। যদি তা কল্যাণকর হয়, তবে তা করো। আর যদি তা বিপথগামী বা ক্ষতিকর হয়, তবে তা থেকে বিরত থাকো।

শিক্ষা

কোনো কাজ করার আগে তার পরিণতি চিন্তা করা একজন মুমিনের বৈশিষ্ট্য। যে কাজ আল্লাহর সন্তুষ্টি ও কল্যাণের দিকে নিয়ে যায় তা করা উচিত, আর যে কাজ গুনাহ বা ক্ষতির কারণ হয় তা পরিহার করা উচিত।

অধ্যায়: কম হাসা

রিওয়ায়াত: ১৭- আনাস ইবন মালিক (রা) বলেন, রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, তোমরা যদি সে বিষয়গুলো জানতে, যা আমি জানি, তাহলে তোমরা খুব কম হাসতে এবং অনেক বেশি কাঁদতে।

শিক্ষা

আখিরাতের জবাবদিহি, জান্নাত-জাহান্নাম ও আল্লাহর ভয়ের বাস্তবতা গভীরভাবে উপলব্ধি করলে মানুষ দুনিয়ার আনন্দে মত্ত না হয়ে বেশি চিন্তাশীল, আল্লাহভীরু ও নেক আমলে মনোযোগী হয়। এখানে হাসি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ নয়; বরং অতিরিক্ত হাসি ও গাফিলতায় ডুবে থাকার ব্যাপারে সতর্ক করা হয়েছে।

তারা অল্প হাসুক

রিওয়ায়াত: ১৮- রবী‘ ইবন খুসাইম (রহ) বলেন, আল্লাহর এই বাণী-

فَلْيَضْحَكُوا قَلِيلًا
তারা অল্প হাসুক।-সূরা আত-তাওবা: ৮২
এর অর্থ দুনিয়ায়।

وَلْيَبْكُوا كَثِيرًا
আর বেশি কাঁদুক।-সূরা আত-তাওবা: ৮২
এর অর্থ আখিরাতে।

শিক্ষা

রবী ইবন খুসাইম (রহ) এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বুঝিয়েছেন যে, দুনিয়ার হাসি-আনন্দ ক্ষণস্থায়ী। যারা আল্লাহর অবাধ্য হয়, তারা আখিরাতে অনুশোচনা ও শাস্তির কারণে অনেক কাঁদবে। তাই মুমিনের উচিত দুনিয়ায় গাফিল না হয়ে আখিরাতের জন্য প্রস্তুতি নেওয়া।

তোমরা যদি জানতে

রিওয়ায়াত: ১৯- হযরত আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা) বলেছেন, তোমরা যদি সে বিষয়গুলো জানতে, যা আমি জানি, তাহলে তোমরা খুব কম হাসতে এবং অনেক বেশি কাঁদতে।

শিক্ষা

আখিরাতের ভয়াবহতা, হিসাব-নিকাশ এবং আল্লাহর সামনে উপস্থিত হওয়ার বাস্তবতা উপলব্ধি করলে মানুষ গাফিল হয়ে বেশি হাসি-তামাশায় মগ্ন থাকে না। বরং তাওবা, ইবাদত এবং নেক আমলে বেশি মনোযোগী হয়। এখানে হাসি নিষিদ্ধ নয়; অতিরিক্ত হাসি ও গাফিলতার বিরুদ্ধে সতর্ক করা হয়েছে।

প্রকৃত জ্ঞান

রিওয়ায়াত: ২০- আবদুল্লাহ ইবন আমর (রা) বলেন, তোমরা যদি সে বিষয়গুলো জানতে, যা আমি জানি, তাহলে তোমরা খুব কম হাসতে এবং অনেক বেশি কাঁদতে।

আর যদি তোমরা প্রকৃত জ্ঞান লাভ করতে, তবে তোমাদের কেউ এত বেশি আল্লাহর ভয়ে ক্রন্দন করত যে তার কণ্ঠস্বর বসে যেত; আর এত দীর্ঘ সিজদা করত যে তার পিঠ ক্লান্ত হয়ে যেত।

শিক্ষা

প্রকৃত দীনি জ্ঞান মানুষের অন্তরে আল্লাহর ভয়, বিনয় ও আখিরাতের চিন্তা সৃষ্টি করে। এর ফলে সে গাফিলতা ও অপ্রয়োজনীয় হাসি-তামাশা কমিয়ে ইবাদত, দোয়া ও তাওবায় বেশি মনোযোগী হয়।

অধ্যায়: কান্না প্রসঙ্গে

রিওয়ায়াত: ২১- হাসান আল-বাসরী (রহিমাহুল্লাহ) এই আয়াতটি তিলাওয়াত করলেন:

أَفَمِنْ هَذَا الْحَدِيثِ تَعْجَبُونَ وَتَضْحَكُونَ وَلَا تَبْكُونَ
তবে কি তোমরা এই বাণীতে বিস্মিত হচ্ছ, হাসছ, অথচ কাঁদছ না?- সূরা আন-নাজম: ৬০

এরপর তিনি বললেন, এ বিষয়ে সফল সে-ই, যে কাঁদে।

ফায়দা

আল্লাহর বাণী শুনে যার অন্তরে ভয়, অনুতাপ ও বিনয় সৃষ্টি হয়, সে আল্লাহর ভয়ে কাঁদে। এমন কান্না ঈমানের কোমলতা ও আল্লাহভীতির একটি লক্ষণ।

ইবনে মাসউদ (রা) এর কান্না

রিওয়ায়াত: ২২- যায়েদ ইবন ওহব (রহ) বলেন, আমি ইবন মাসউদ (রা)-কে এত বেশি কাঁদতে দেখেছি যে, তার চোখের অশ্রু মাটির নুড়ি-পাথরের ওপর পড়তে দেখেছি।

ফায়দা

আল্লাহর ভয়, আখিরাতের চিন্তা এবং নিজের আমলের হিসাবের অনুভূতি সাহাবীদের অন্তরকে এতটাই নরম করেছিল যে, তারা আন্তরিকভাবে কাঁদতেন। এটি তাঁদের গভীর ঈমান ও তাকওয়ার পরিচয় বহন করে।

যে আল্লাহর ভয়ে কাঁদে

রিওয়ায়ত: ২৩ আবু হুরাইরা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা) বলেছেন:

يَلِجَ النَّارَ مَنْ بَكَى مِنْ خَشْيَةِ اللَّهِ، حَتَّى يَعُودَ اللَّبَنُ فِي الضَّرْعِ
যে ব্যক্তি আল্লাহর ভয়ে কাঁদে, সে কখনো জাহান্নামে প্রবেশ করবে না- যেমন দুধ আর কখনো পশুর বাঁটে ফিরে যায় না।

ফায়দা

আল্লাহর ভয়ে আন্তরিকভাবে কান্না করা ঈমানের একটি মহৎ নিদর্শন। এই হাদিসে বোঝানো হয়েছে যে, এমন কান্নার মর্যাদা এত বড় যে তা জাহান্নাম থেকে মুক্তির অন্যতম কারণ। তবে এটি সেই ব্যক্তির ক্ষেত্রে, যার ঈমান, তাওবা ও আমল সত্যিকার অর্থেই আল্লাহর ভয়ে পরিচালিত হয়।

হযরত দাউদ (আ) এর কান্না

রিওয়ায়াত: ২৪ – মুজাহিদ (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, আল্লাহর নবী দাউদ (আ) তার ভুলের কারণে এত বেশি কেঁদেছিলেন যে, তার চারপাশের সবকিছু অশ্রুতে ভিজে গিয়েছিল।

ফায়দা

আল্লাহর নবীগণও আল্লাহর কাছে অত্যন্ত বিনয়ী ছিলেন। কোনো ভুল হলে তাঁরা আন্তরিকভাবে তাওবা করতেন এবং আল্লাহর ভয়ে কাঁদতেন। এটি আমাদের শেখায় যে, গুনাহ হলে দ্রুত তাওবা করা এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা উচিত।

চাঁদও আল্লাহর ভয়ে কাঁদে

রিওয়ায়াত: ২৫- ইবন আবি মুলাইকাহ (রহ) বলেন, এক ব্যক্তি আবদুল্লাহ ইবন আমর (রা)-এর পাশ দিয়ে যাচ্ছিল। তিনি তখন কাবার হাতীমে সিজদায় ছিলেন এবং কাঁদছিলেন।

লোকটি দেখে অবাক হলে তিনি বললেন, তুমি কি অবাক হচ্ছ যে আমি আল্লাহর ভয়ে কাঁদছি? অথচ এই চাঁদও আল্লাহর ভয়ে কাঁদে। এরপর তিনি অস্তমিত হওয়ার উপক্রম চাঁদের দিকে তাকালেন।

বিস্ময়কর সম্প্রদায়

রিওয়ায়াত: ২৬ আনযা গোত্রের এক ব্যক্তি বলেন, আমরা আমাদের মতো আর কোনো সম্প্রদায় দেখিনি। একেকটি গোত্র অন্য গোত্রের কাছে যেত, আর সবাই আল্লাহর ভয়ে কাঁদত।

ফায়দা

সালাফে সালেহীনদের সমাজে আল্লাহর ভয়, আখিরাতের চিন্তা এবং আন্তরিক কান্না ছিল সাধারণ বিষয়। তারা একে অপরকে দুনিয়াবি আনন্দে নয়, বরং আল্লাহর স্মরণ ও আখিরাতের প্রস্তুতিতে উদ্বুদ্ধ করতেন।

ইবনে উমর (রা) এর কান্না

রিওয়ায়াত: ২৭- কাসিম ইবন আবি বাযযাহ (রহ) বলেন, এক ব্যক্তি আমাকে বলেছেন, তিনি ইবনে উমর (রা)-কে সূরা আল-মুতাফ্ফিফীন তিলাওয়াত করতে শুনেছেন।

যখন তিনি এই আয়াতে পৌঁছলেন-

يَوْمَ يَقُومُ النَّاسُ لِرَبِّ الْعَالَمِينَ
সেদিন মানুষ সমগ্র জগতের রবের সামনে দাঁড়াবে।- সূরা আল-মুতাফ্ফিফীন: ৬

তখন তিনি এত বেশি কেঁদে ফেললেন যে, বসে পড়লেন এবং এরপর আর তিলাওয়াত চালিয়ে যেতে পারলেন না।

ফায়দা

সাহাবায়ে কিরাম কুরআনের আয়াত শুধু পড়তেন না, বরং তার অর্থ অন্তরে গভীরভাবে অনুভব করতেন। বিশেষ করে কিয়ামতের দিন আল্লাহর সামনে দাঁড়ানোর কথা স্মরণ করে তাঁরা এতটাই প্রভাবিত হতেন যে, তাঁদের চোখ অশ্রুসিক্ত হয়ে যেত।

নবী (সা) এর উপর প্রভাব

রিওয়ায়াত: ২৮- হুমরান ইবন আইয়ান (রহ) থেকে বর্ণিত। নবী (সা) এই আয়াত তিলাওয়াত করলেন,

إِنَّ لَدَيْنَا أَنْكَالًا وَجَحِيمًا وَطَعَامًا ذَا غُصَّةٍ، وَعَذَابًا أَلِيمًا

নিশ্চয়ই আমাদের কাছে রয়েছে শৃঙ্খল, জাহান্নাম, গলায় আটকে যায় এমন খাদ্য এবং যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি।- সূরা আল-মুযযাম্মিল: ১২–১৩

এটা পাঠ করে তিনি অজ্ঞান হয়ে গেলেন।

ফায়দা

জাহান্নামের শাস্তির বর্ণনা নবী (সা) এর অন্তরে গভীর প্রভাব ফেলত। এ থেকে শিক্ষা পাওয়া যায় যে, কুরআনের সতর্কবাণী মনোযোগ দিয়ে পড়া ও তা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করা মুমিনের কর্তব্য।

দ্রষ্টব্য: এই বর্ণনাটি মুরসাল (সাহাবির নাম উল্লেখ ছাড়া) সূত্রে এসেছে; তাই হাদিসের সনদের দিক থেকে এটি শক্তিশালী নয়। তবে এর শিক্ষা কুরআনের অন্যান্য আয়াত ও সহীহ হাদিসের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

আবু বকর (রা) এর উপদেশ

রিওয়ায়ত: ২৯- আরফাজাহ আস-সুলামী (রহ) বলেন, আবু বকর (রা) বলেছেন-

ابْكُوا فَإِنْ لَمْ تَبْكُوا فَتَبَاكَوْا

কাঁদো। যদি কাঁদতে না পারো, তবে কান্নার চেষ্টা করো।

ফায়দা

আল্লাহর ভয়, আখিরাতের চিন্তা এবং নিজের গুনাহর জন্য অন্তরকে কোমল করার চেষ্টা করা উচিত। যদি স্বাভাবিকভাবে চোখে অশ্রু না আসে, তবুও হৃদয়ে সেই অনুভূতি জাগানোর চেষ্টা করা প্রশংসনীয়। এখানে ‘কান্নার চেষ্টা করো’ বলতে লোক দেখানোর জন্য কৃত্রিম কান্না নয়; বরং আল্লাহর ভয় ও অনুতাপ জাগিয়ে অন্তরকে নরম করার আন্তরিক প্রচেষ্টাকে বোঝানো হয়েছে।

ইবনে মাসউদ (রা) এর উপদেশ

রিওয়ায়াত: ৩০- কাসিম ইবনে আবদুর রহমান (রহ) বলেন, আবদুল্লাহ (ইবন মাসউদ) (রা) তার ছেলেকে বলেছিলেন, হে আমার সন্তান! নিজের গুনাহের কথা স্মরণ করে কেঁদো।

ফায়দা

নিজের গুনাহ স্মরণ করলে অন্তরে অনুতাপ সৃষ্টি হয় এবং তাওবার আগ্রহ বাড়ে। আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনার উদ্দেশ্যে এমন কান্না মুমিনের জন্য অত্যন্ত প্রশংসনীয়।

উপসংহার

ইমাম ওকী (রহ)-এর আয-যুহদ গ্রন্থ ইসলামী আত্মশুদ্ধি, তাকওয়া ও আখিরাতমুখী জীবন গঠনের একটি গুরুত্বপূর্ণ রচনা।

এতে কুরআন, হাদিস এবং সালাফে সালেহীনের বাণীর আলোকে প্রকৃত যুহুদের শিক্ষা তুলে ধরা হয়েছে।

গ্রন্থটি মানুষকে দুনিয়ার প্রতি অতিরিক্ত আসক্তি পরিহার করে আল্লাহর সন্তুষ্টিকে জীবনের প্রধান লক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করতে উদ্বুদ্ধ করে।

তাই আত্মিক উন্নয়ন ও উত্তম চরিত্র গঠনের ক্ষেত্রে আয-যুহুদ আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক ও অনুপ্রেরণাদায়ক।

🔹🔹🔹

👉 আরও পড়ুন আখলাকুন নবী (সা)

আরও পোস্ট

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Back to top button
error: Content is protected !!