
সূরা আল-ফাতিহা আমীন এর তাফসীর – সূরা আল ফাতিহা কুরআনুল কারীমের সূচনা সূরা এবং ইসলামের ইবাদত ব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দু। প্রতিটি সালাতে এই সূরা পাঠ করা ফরজ হওয়ায় এটি মুসলিম জীবনে সর্বাধিক পঠিত সূরা।
সূরা আল-ফাতিহা পাঠ শেষে উচ্চারিত “আমীন” শব্দটি সাধারণ কোনো বাক্য নয়; বরং এটি একটি গভীর দো‘আ, যার মাধ্যমে বান্দা আল্লাহ তাআলার নিকট তাঁর প্রার্থনার কবুলিয়াত কামনা করে।
কুরআন ও হাদীসের আলোকে “আমীন” বলার গুরুত্ব, ফজিলত ও এর প্রেক্ষাপট অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
বিশেষ করে প্রামাণ্য তাফসীর গ্রন্থ তাফসীর আদ-দুররে মানসূর-এ সূরা আল-ফাতিহার “আমীন” প্রসঙ্গে সাহাবায়ে কেরাম, তাবেঈন ও সালাফে সালেহীনদের বহু মূল্যবান বর্ণনা সংকলিত হয়েছে, যা এই বিষয়ের গুরুত্ব আরও সুস্পষ্ট করে তোলে।
ইমাম সুয়ূতী রহ. রচিত তাফসীর আদ দুররে মানসূর থেকে অনূদিত।
আমাদের অনুবাদ ও প্রকাশনা – দারুস সাআদাত
আমীন প্রসঙ্গ
জিবরাঈল (আ) নবী (সা)-কে আমীন শিক্ষা দিলেন
ইমাম ওকী এবং ইবনে আবী শায়বাহ- হযরত আবু মাইসারাহ (রহ) থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, জিবরাঈল (আ) রাসূলুল্লাহ (সা)-কে সূরা ফাতিহা পড়ান। অতঃপর যখন وَلَا الضَّالّين পর্যন্ত পৌঁছেন তখন বলেন- বলুন আমীন। তখন রাসূলুল্লাহ (সা) বললেন, আমীন।
সূরা আল ফাতিহার শেষে নবী (সা) এর আমীন পাঠ
ইমাম ওকী, ইবনে আবী শায়বাহ, আহমদ, আবু দাউদ, তিরমিযী আর তিনি এটাকে হাসান বলেছেন, নাসাঈ, ইবনে মাজাহ, হাকীম আর তিনি এটাকে সহিহ বলেছেন এবং বায়হাকী তার সুনানে- হযরত ওয়ায়েল ইবনে হুজর আল হাযরামী থেকে বর্ণনা করেন।
তিনি বলেন, আমি রাসূলুলল্লাহ (সা) থেকে শুনেছি, তিনি غَيْرِ الْمَغْضُوبِ عَلَيْهِمْ وَلَا الضَّالِّينَ পাঠ করার পর আমীন বলেছেন আর এর সাথে তিনি তার আওয়াযকে দীর্ঘ করেছেন।
নবী (সা) কিভাবে আমীন বলতেন?
ইমাম তাবরানী এবং বায়হাকী- হযরত ওয়াইল ইবনে হুজর (রা) থেকে বর্ণনা করেন। তিনি রাসূলুল্লাহ (সা) থেকে শুনেছেন।
রাসূলুল্লাহ (সা) যখন غَيْرِ الْمَغْضُوبِ عَلَيْهِمْ وَلَا الضَّالِّينَ বলতেন তখন বলতেন-
رَبِّ اغْفِرْ لِي {آمِينْ}
রাব্বিগফিরলী, আমীন। অর্থাৎ হে আমার প্রতিপালক! আমাকে ক্ষমা করুন। আমীন।
সূরা ফাতিহা শেষ করে তিনবার আমীন বলা
ইমাম তাবরানী- ওয়ায়েল ইবনে হুজর (রা) থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সা)-কে দেখেছি যে, তিনি নামাযে দাখিল হয়েছেন অতঃপর যখন সূরা আল ফাতিহা পাঠ করা শেষ করেছেন, তখন তিনবার আমীন বলেছেন।
ওয়ালাদদাললীন এর পর আমীন বলা
ইমাম ইবনে মাজাহ- হযরত আলী (রা) থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, আমি শুনেছি, রাসূলুল্লাহ (সা) যখন বলেছেন- وَلَا الضَّالّين তখন আমীন বলেছেন।
আমীন দুআ কবুল করে
ইমাম মুসলিম. আবু দাউদ, নাসাঈ, ইবনে মাজাহ এবং এবং ইবনে আবী শায়বাহ- হযরত আবু মূসা আল আশআরী (রা) থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেন-
যখন ইমাম غَيْرِ الْمَغْضُوبِ عَلَيْهِمْ وَلَا الضَّالِّينَবলে, তখন তুমি আমীন বল, তাহলে তোমাদের দুআ কবুল করা হবে।
ইমাম মালিক, শাফিয়ী, ইবনে আবী শায়বাহ, আহমদ, বুখারী, মুসলিম, আবু দাউদ, তিরমিযী, নাসাঈ, ইবনে মাজাহ এবং বায়হাকী- হযরত আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেন-
إِذَا أَمَّنَ الْإِمَامُ فَأَمِّنُوا فَإِنَّهُ مَنْ وَافَقَ تَأْمِينَ الْمَلَائِكَةِ غُفِرَ لَهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهِ
যখন ইমাম আমীন বলে, তখন তোমরাও আমীন বল। কেননা যার আমীন বলা ফেরশেতাদের আমীন বলার সাথে মিলে যাবে, তার পূর্বের সব গুনাহ মাফ করে দেওয়া হবে।
যে আমীন বলে তার দৃষ্টান্ত
ইমাম আবু ইয়ালা তার মুসনাদে এবং ইবনে মারদুবিয়াহ উত্তম সনদে- হযরত আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণনা করেন। রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেন,
যখন ইমাম غَيْرِ الْمَغْضُوبِ عَلَيْهِمْ وَلَا الضَّالِّينَ বলে, আর তার মুক্তাদীগণ আমীন বলে তখন আসমান ও যমীনের অধিবাসীরা মনোযোগী হয়।
আর যে ব্যক্তি আমীন বলে না, তার দৃষ্টান্ত ঐ ব্যক্তির মত, যে ব্যক্তি কোন কওমের সাথে যুদ্ধে যায় আর তারা (গনীমত থেকে) নিজেদের অংশ নিয়ে নেয়, কিন্তু তার অংশ বের করে না। সে বলে আমার অংশ কেন বের করলে না? তারা বলে, তুমি আমীন বল নি।
আমীন বলে দুআ শেষ করা
ইমাম আবু দাউদ হাসান সনদে- হযরত আবু যুহাইর আন নুমাইরী (রা) থেকে বর্ণনা করেন, আর তিনি রাসূলুল্লাহ (সা) এর একজন সাহাবী ছিলেন। তিনি বলেন, যখন তোমাদের কেউ দুআ করে তার উচিত আমীন বলে দুআ শেষ করা। কেননা আমীন শব্দটি ঐশী গ্রন্থের মোহর বা সিলস্বরূপ।
অতঃপর বললেন, এ প্রসঙ্গে আমি তোমাদের কাছে একটি ঘটনা বলছি- এক রাতে আমরা রাসূলুল্লাহ (সা) এর সাথে বাইরে গমন করি। এ সময় আমরা এমন এক ব্যক্তির নিকট উপস্থিত হই, যিনি অনেক অনুনয়-বিনয় সহকারে দুআ করছিলেন।
নবী করীম (সা) তার কথা শ্রবণের জন্য সেখানে দণ্ডায়মান হন। তখন নবী করীম (সা) বলেন, যদি সে দুআতে মোহর লাগায় তবে তার দুআ কবুল করা হবে। এক ব্যক্তি বলল, সে কিসের দ্বারা মোহর লাগাবে? তিনি বললেন, আমীন দ্বারা। কেননা যদি সে আমীনের উপর তার দুআ সমাপ্ত করে, তবে তার দুআ কবুল হবে।
ইহুদীদের হিংসা
ইমাম আহমদ, ইবনে মাজাহ, এবং বায়হাকী তার সুনানে- হযরত আয়শা (রা) থেকে বর্ণনা করেন। রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেন-
مَا حَسَدَتْكُمُ الْيَهُودُ عَلَى شَيْءٍ، مَا حَسَدَتْكُمْ عَلَى التَّأْمِين
ইহুদীরা তোমাদের কোন কিছুর জন্য এতটা হিংসা পোষণ করে না, যতটা না হিংসা করে ‘আমীন’ এর জন্য।
ইমাম ইবনে মাজাহ যয়ীফ সনদে হযরত ইবনে আব্বাস (রা) থেকে বর্ণনা করেন। রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেন-
مَا حَسَدَتْكُمُ الْيَهُودُ عَلَى شَيْءٍ، مَا حَسَدَتْكُمْ عَلَى آمِينَ، فَأَكْثِرُوا مِنْ قَوْلِ {آمِينَ}
ইহুদীরা কোন ব্যাপারে তোমাদের প্রতি এতটা হিংসা পোষণ করে না যতটা না হিংসা করে আমীন এর ব্যাপারে। অতএব তোমরা আমীন বেশী করে বল।
ইহুদিরা হিংসুক জাতি
ইমাম ইবনে আদী আল কামীলে- হযরত আয়শা (রা) থেকে বর্ণনা করেন। রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেন,
إِن الْيَهُود قوم حسد حسدوكم على ثَلَاثَة أَشْيَاء إفشاء السَّلَام واقامة الصَّفّ وآمين
ইহুদীরা হিংসুক জাতি। তারা তোমাদের তিনটি বিষয়ের প্রতি হিংসা পোষণ করে থাকে। সালামের প্রসারের জন্য। কাতার সোজা রাখার জন্য এবং আমীন এর জন্য।
ইহুদীরা মুসলমানদের তিনটি বিষয়ে হিংসা করে
ইমাম তাবরানী আল আউসাতে- হযরত মুআয বিন জাবাল (রা) থেকে বর্ণনা করেন। নবী কারীম (সা) ইরশাদ করেন, ইহুদীরা হিংসুক জাতি। তারা মুসলমানদের তিনটি বিষয়ে খুব বেশী হিংসা পোষণ করে- সালামের উত্তর প্রদানের জন্য। কাতার সোজা রাখার জন্য এবং ফরয নামাযে ইমামের পিছনে আমীন এর জন্য।
নবী (সা) এর তিনটি বৈশিষ্ট্য
ইমাম আল হার্স বিন উসামাহ তার মুসনাদে, হাকীম তিরমিযী নাওয়াদিরুল উসূলে এবং ইবনে মারদুবিয়াহ- হযরত আনাস (রা) থেকে বর্ণনা করেন। রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেন,
আমাকে তিনটি বৈশিষ্ট্য দান করা হয়েছে। আমাকে নামায কাতারসহ দান করা হয়েছে। আমাকে সালাম দান করা হয়েছে যা জান্নাতীদের অভিবাদন। আমাকে আমীন দান করা হয়েছে যা তোমাদের পূর্বে কাউকে দান করা হয়নি। তবে হারূন (আ)-কে দেওয়া হয়েছিল। কেননা মূসা (আ) দুআ করতেন আর হারূন (আ) আমীন বলতেন।
হাকীম তিরমিযীর শব্দ হল, আল্লাহ তাআলা আমার উম্মতকে তিনটি জিনিস দান করেছেন, যা তাদের পূর্বে আর কাউকে দান করেননি। সালাম আর এটা হল জান্নাতবাসীদের অভিবাদন। ফেরেশতাদের মত কাতারবন্দী হওয়া আর আমীন বলা। তবে মূসা ও হারূন (আ)-কে আমীন বলার সৌভাগ্য প্রদান করা হয়েছিল।
আমীন হলো মোহর
ইমাম তাবরানী কিতাবুদ দুআয়, ইবনে আদী এবং ইবনে মারদুবিয়াহ যয়ীফ সনদে- হযরত আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণনা করেন। রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেন-
آمِينَ خَاتَمُ رَبِّ الْعَالَمِينَ عَلَى لِسَانِ عِبَادِهِ الْمُؤْمِنِينَ
‘আমীন’ মুমিন বান্দার যবানে আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের মোহর।
আমীন অর্থ কি?
ইমাম জুওয়াবির তার তাফসীরে- যাহহাক সূত্রে হযরত ইবনে আব্বাস (রা) থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, আমি আরয করলাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমীন এর মানে কি? তিনি (সা) বললেন, হে আমার রব! কবুল করুন।
ইমাম সালাবী হযরত ইবনে আব্বাস(রা) থেকে অনুরুপ বর্ণনা করেছেন।
আমীন আল্লাহর নামসমূহের একটি নাম
ইমাম ওকী এবং ইবনে আবি শায়বাহ তার মুসান্নাফে- হিলাল বিন ইয়াসাফ এবং মুজাহিদ থেকে বর্ণনা করেন যে-
{آمِينَ} اسْمٌ مِنْ أَسْمَاءِ اللَّهِ
আমীন আল্লাহর নামসমূহের একটি নাম।
ইমাম ইবনে আবী শায়বাহ- হাকীম বিন জুবায়র থেকে অনুরুপ বর্ণনা করেছেন।
আল্লাহুম্মাগফিরলী, আমীন কখন বলেব?
ইমাম যখন আমীন বলে তখন কি দুআ করবে?
ইমাম ইবনে আবী শায়বাহ- ইবরাহীম নাখয়ী (রহ) থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন-
মুস্তাহাব হল, ইমাম যখন غَيْرِ الْمَغْضُوبِ عَلَيْهِمْ وَلَا الضَّالِّينَবলবে, তখন এই দুআ বলা-
اللَّهُمَّ اغْفِرْ لِي {آمِينَ}
আল্লাহুম্মাগফিরলী, আমীন। অর্থাৎ হে আল্লাহ! আমাকে ক্ষমা করুন, আমীন।
জান্নাত প্রার্থণা
ইমাম ইবনে আবী শায়বাহ- হযরত মুজাহিদ থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন-
যখন ইমাম غَيْرِ الْمَغْضُوبِ عَلَيْهِمْ وَلَا الضَّالِّينَ বলবে তখন এই দুআ পাঠ কর-
اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ الْجَنَّةَ، وَأَعُوذُ بِكَ مِنَ النَّارِ
হে আল্লাহ! আমি তোমার নিকট জান্নাত প্রার্থনা করি এবং জাহান্নাম থেকে পানাহ চাই।
নিজ ইচ্ছামত দুআ করা
ইমাম ইবনে আবী শায়বাহ- হযরত রবী বিন খুসাইম (রহ) থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন-
যখন ইমাম غَيْرِ الْمَغْضُوبِ عَلَيْهِمْ وَلَا الضَّالِّينَবলবে, তখন তোমার ইচ্ছামত দুআর দ্বারা আল্লাহর কাছে সাহায্য চাও।
আমীন এর তাফসীর
ইমাম ইবনে শাহীন আস সুন্নায়- ইসমাঈল বিন মুসলিম থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, হযরত উবাই ইবনে কাব (রা) এর মাসহাফে ছিল-
غير المغضوب عَلَيْهِم وَغير الضَّالّين آمين بِسم الله
ইসমাঈল বলেন, হাসান (রহ)-কে যখন আমীনের ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করা হল যে, তার তাফসীর কি? তিনি বললেন
اللَّهُمَّ اسْتَجِبْ
হে আল্লাহ! কবুল করুন।
ফেরেশতারা আমীন পাঠকারীর জন্য দুআ করে
ইমাম দায়লামী হযরত আনাস (রা) থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেন,
من قَرَأَ {بِسم الله الرَّحْمَن الرَّحِيم} ثمَّ قَرَأَ فَاتِحَة الْكتاب ثمَّ قَالَ آمين لم يبْق فِي السَّمَاء ملك مقرب إِلَّا اسْتغْفر لَهُ
যে বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম পাঠ করল, অতঃপর ফাতিহাতুল কিতাব পাঠ করল অতঃপর আমীন বলল, তাহলে আসমানের প্রত্যেক নৈকট্যপ্রাপ্ত ফেরেশতা তার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে।
🔸🔸🔸
👉 আরও পড়ুন সূরা আল ফাতিহার ভূমিকা, তাফসীর আদ দুররে মানসূর – ইমাম সুয়ূতী (রহ)

