ইমাম ইবনে আবিদ দুনইয়া (রহ) রচনাবলী

যবানের হিফাযত ও নীরবতার মাহাত্ম (১ম অংশ)

আস সুমতু ওয়া আদাবুল লিসান (as sumtu wa adab al lisan) ইমাম ইবনে আবিদ দুনইয়া রহ. (ibn abid dunya)

যবানের হিফাযত ও নীরবতার মাহাত্ম — ইসলামী আত্মশুদ্ধি ও চরিত্র গঠনের এক অনন্য নির্দেশনা।

মানুষের জিহ্বা যেমন জান্নাতের পথে নিয়ে যেতে পারে, তেমনি অসতর্ক বাক্য জাহান্নামের কারণও হতে পারে।

এই বাস্তবতা সামনে রেখে রচিত বিখ্যাত গ্রন্থ আস সুমতু ওয়া আদাবুল লিসান, যেখানে নীরবতার মর্যাদা, সংযত বাক্য, ও জিহ্বার আদব নিয়ে কুরআন–হাদীস ও সালাফদের মূল্যবান বাণী সংকলিত হয়েছে।

গ্রন্থটির রচয়িতা প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ও ইসলামি চিন্তাবিদ ইবনে আবিদ দুনিয়া—যিনি মুসলিম উম্মাহকে নৈতিক পরিশুদ্ধতার পথে আহ্বান জানাতে বহু গুরুত্বপূর্ণ কিতাব রচনা করেছেন।

এই বইয়ে আপনি জানতে পারবেন—কীভাবে কথা বলার আগে চিন্তা করা, অপ্রয়োজনীয় কথা থেকে বিরত থাকা এবং নীরবতা অবলম্বন করা একজন মুমিনের ঈমান ও আমলকে সুন্দর করে তোলে।

যারা আত্মশুদ্ধি, ইসলামী আদব-আখলাক এবং যবানের হিফাজত বিষয়ে গভীর জ্ঞান অর্জন করতে চান—তাদের জন্য এটি এক অপরিহার্য পাঠ।

ইমাম ইবনে আবিদ দুনইয়া রহ. রচিত আস সুমতু ওয়া আদাবুল লিসান গ্রন্থ থেকে অনূদিত।

Table of Contents

আমাদের অনুবাদ ও প্রকাশনা – দারুস সাআদাত 

بَابُ حِفْظِ اللِّسَانِ وَفَضْلِ الصَّمْت
যবানের হিফাজত ও নীরবতার ফযীলত

আল্লাহর প্রতি ইমান আনা ও এর উপর অবিচল থাকা

রিওয়য়য়াত: ১ হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে সুফিয়ান তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, আমি আরয করলাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমাকে ইসলামের ব্যাপারে এমন কিছু বলুন যে, এরপর আর আমাকে আর কাউকে কিছু জিজ্ঞাসা করতে না হয়।

তিনি (সা) বললেন,

قُلْ: آمَنْتُ بِاللَّهِ ثُمَّ اسْتَقِمْ

বল, আমি আল্লাহর উপর ইমান আনলাম অতঃপর এর উপর অবিচল থাক।

আমি আরয করলাম আমি কোন বিষয়ে সতর্কতা অবলম্বন করব?

فَأَوْمَأَ بِيَدِهِ

তিনি (সা) তার হাত দ্বারা যবানের দিকে ইশারা করলেন।

ফায়দা

এই হাদিসে ইসলামের দুটি মৌলিক বিষয় তুলে ধরা হয়েছে—বিশুদ্ধ ঈমান এবং তার ওপর অবিচল থাকা। পাশাপাশি রাসূলুল্লাহ (সা.) জিহ্বার দিকে ইশারা করে বুঝিয়েছেন যে, মানুষের অধিকাংশ ভুল ও গুনাহ মুখের কথার মাধ্যমেই সংঘটিত হয়। তাই মুমিনের উচিত কথাবার্তায় সতর্ক থাকা, সত্য বলা এবং মিথ্যা, গীবত ও কষ্টদায়ক কথা থেকে নিজেকে বিরত রাখা।

নাজাতের উপায়

রিওয়য়য়াত: ২ হযরত উকবাহ ইবনে আমের (রা) বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, আমি আরয করলাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! নাজাত কিসে? তিনি (সা) ইরশাদ করলেন-

«أَمْلِكْ عَلَيْكَ لِسَانَكَ، وَلْيَسَعْكَ بَيْتُكَ، وَابْكِ عَلَى خَطِيئَتِكَ»

নিজের যবানকে সংযত রাখ। তোমার ঘরকে (নেককাজের দ্বারা) প্রশস্ত রাখ এবং নিজের গুনাহর জন্য কাঁদ।

ফায়দা

এই হাদিসে নাজাতের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ উপায় উল্লেখ করা হয়েছে—জিহ্বাকে গুনাহ থেকে সংযত রাখা, অপ্রয়োজনীয় ফিতনা-ফ্যাসাদ থেকে বাঁচতে ঘরে থেকে নেক কাজে ব্যস্ত থাকা এবং নিজের গুনাহের জন্য অনুতপ্ত হয়ে আল্লাহর কাছে কান্নাকাটি করা। এসব গুণ মানুষের আত্মশুদ্ধি ও আখিরাতের সফলতার পথ সুগম করে।

যে ব্যক্তি দুটি বিষয়ের নিরাপত্তা দিবে

٣ عَنْ سَهْلِ بْنِ سَعْدٍ السَّاعِدِيِّ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ:

«مَنْ يَتَوَكَّلْ لِي بِمَا بَيْنَ لَحْيَيْهِ وَرِجْلَيْهِ أَتَوَكَّلُ لَهُ بِالْجَنَّةِ»

রিওয়ায়াত: ৩ হযরত সাহল বিন সাদ আস সায়িদী (রা) বর্ণনা করেন। রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেন-

«مَنْ يَتَوَكَّلْ لِي بِمَا بَيْنَ لَحْيَيْهِ وَرِجْلَيْهِ أَتَوَكَّلُ لَهُ بِالْجَنَّةِ

যে ব্যক্তি আমাকে তার উভয় চোয়ালের মধ্যবর্তী অঙ্গ এবং দুই পায়ের মধ্যবর্তী অঙ্গের ব্যপারে নিশ্চয়তা দিবে তবে আমি তার জন্য জান্নাতের নিশ্চয়তা দিব।

ফায়দা

এই হাদিসে জিহ্বা ও লজ্জাস্থানের হেফাজতের গুরুত্ব বর্ণিত হয়েছে। যে ব্যক্তি এ দুটি অঙ্গকে হারাম ও গুনাহ থেকে সংরক্ষণ করবে, তার জন্য রাসূলুল্লাহ (সা.) জান্নাতের সুসংবাদ দিয়েছেন।

জান্নাত অথবা জাহান্নামে বেশী যাওয়ার কারণ

রিওয়য়য়াত: ৪  হযরত আবু হুরারয়রা (রা) বর্ণনা করেন। রাসূলুল্লাহ (সা)-কে জিজ্ঞাসা করা হল কোন আমলের কারণে মানুষ বেশী জান্নাতে যাবে?

«تَقْوَى اللَّهِ، وَحُسْنُ الْخُلُقِ

তিনি (সা) বললেন, তাকওয়া (আল্লাহর আনুগত্য) এবং উত্তম চরিত্র।

এরপর জিজ্ঞাসা করা হল, কোন কাজের কারণে মানুষ বেশী জাহান্নামে যাবে?

الْأَجْوَفَانِ: الْفَمُ وَالْفَرْجُ

তিনি ইরশাদ করলেন, মধ্যবর্তী দুটি বিষয়ের কারণে- মুখ ও লজ্জাস্থান।

ফায়দা

তাকওয়া ও উত্তম চরিত্র জান্নাতের প্রধান কারণ। আর জিহ্বা ও লজ্জাস্থানের অপব্যবহার জাহান্নামের অন্যতম কারণ। তাই এ দুটির হেফাজত করা জরুরি।

হাত ও যবানের নিরাপত্তা

রিওয়ায়াত: ৫ হযরত আসওয়াদ বিন আসরাম আল মুহারিবী (রা) বর্ণনা করেন।

তিনি বলেন, আমি আরয করলাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমাকে নসীহত করুন। তিনি বললেন, তুমি কি তোমার হাতের উপর নিয়ন্ত্রণ রাখ? আমি বললাম, যদি আমি আমার হাতের উপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে না পরি তবে আর কিসের উপর নিয়ন্ত্রণ রাখব?

তিনি (সা) বললেন, তুমি কি তোমার যবানকে নিয়ন্ত্রণে রাখ? আমি বললাম, যদি আমি আমার যবানকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে না পরি তবে আর কিসের উপর নিয়ন্ত্রণ রাখব?

তিনি (সা) বললেন, (তবে) তোমার হাত ভাল কাজের দিকে বাড়িও আর তোমার যবান দ্বারা ভাল কথা ব্যতীত আর কিছু বলো না।

যবানের কারণেই মানুষ জাহান্নামে যায়

রিওয়ায়াত: ৬ হযরত মুআয ইবনে জাবাল (রা) বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, আমি আরয করলাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমরা যা কিছু বলি তার জন্যও কি আমাদেরকে পাকরাও করা হবে? তিনি (সা) বললেন,

ثَكِلَتْكَ أُمُّكَ يَا ابْنَ جَبَلٍ، وَهَلْ يَكُبُّ النَّاسَ فِي النَّارِ عَلَى مَنَاخِرِهِمْ إِلَّا حَصَائِدُ أَلْسِنَتِهِمْ

হে ইবনে জাবাল, তোমার মা তোমার জন্য ক্রন্দন করুক! মানুষ তার যবানের কারণেই তো অধোঃমুখি হয়ে জাহান্নামে প্রবেশ করবে।

হাদীসের বর্ণনাকারী হাবীব বলেন, এই হাদীসে এটাও আছে যে, আর তুমি যে কথাই বল সেটা হয়তো তোমার জন্য উপকারী হবে অথবা ক্ষতিকর।

নবী (সা) এর ভয়

রিওয়ায়াত: ৭ হযরত সুফিয়ান ইবনে আব্দুল্লাহ সাকাফী (রা) বর্ণনা করেন। আমি আরয করলাম,

ইয়া রাসূল্লাল্লাহ! আমাকে এমন কিছু আমল বলুন, যার উপর নিয়মিত আমল করতে পারি। তিনি (সা) বললেন-

قُلْ: رَبِّيَ اللَّهُ ثُمَّ اسْتَقِمْ

বল. আমার প্রতিপালক আল্লাহ এবং এর উপর দৃঢ় থাক।

আমি আরয করলাম, ইয়া রাসূল্লাহ! আমার ব্যাপারে আপনি কোন বিষয়টি বেশী ভয় করেন? নবী (সা) তার পবিত্র যবান ধরে বললেন, এটার।

কোন আমল উত্তম?

রিওয়ায়াত: ৮ হযরত ইবনে গানম (রহ) বর্ণনা করেন। হযরত মুআয ইবনে জাবাল (রা) আরয করলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সা) কোন আমল উত্তম?

তখন রাসূলুল্লাহ (সা) নিজের পবিত্র যবান বের করে এর উপর দুই আঙ্গুল রেখে দিলেন (অর্থাৎ যবানকে সংযত রাখা)।

যে পর্যন্ত যবান ঠিক না হবে

রিওয়ায়াত: ৯ হযরত আনাস (রা) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেন,

«لَا يَسْتَقِيمُ إِيمَانُ عَبْدٍ حَتَّى يَسْتَقِيمَ قَلْبُهُ، وَلَا يَسْتَقِيمُ قَلْبُهُ حَتَّى يَسْتَقِيمَ لِسَانُهُ، وَلَا يَدْخُلُ الْجَنَّةَ رَجُلٌ لَا يَأْمَنُ جَارُهُ بَوَائِقَهُ»

কোন বান্দার ইমান ঠিক হবে না, যে পর্যন্ত না তার অন্তর ঠিক হবে। তার অন্তর ঠিক হবে না যে পর্যন্ত না তার যবান ঠিক হবে। আর ঐ ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করবে না যার প্রতিবেশী তার অনিষ্ট থেকে নিরাপদ নয়।

ফায়দা

এই হাদিসে ঈমান, অন্তর ও জিহ্বার গভীর সম্পর্ক বর্ণনা করা হয়েছে। অন্তর ও জিহ্বার সংশোধন ছাড়া পূর্ণ ঈমান অর্জিত হয় না। পাশাপাশি প্রতিবেশীর প্রতি সদাচরণও মুমিনের গুরুত্বপূর্ণ গুণ; তার অনিষ্ট থেকে মানুষ নিরাপদ থাকতে হবে।

যে চুপ থাকলো

১০.হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেন,

مَنْ صَمَتَ نَجَا
যে চুপ থাকল সে সে নাজাত পেল।

ফায়দা

এই হাদিস আমাদের শেখায় যে, অপ্রয়োজনীয় ও ক্ষতিকর কথা থেকে বিরত থাকা মুমিনের অন্যতম গুণ। যে ব্যক্তি নিজের জিহ্বাকে নিয়ন্ত্রণ করে এবং মন্দ, মিথ্যা ও গীবত থেকে বেঁচে থাকে, সে দুনিয়া ও আখিরাতে কল্যাণ ও নাজাত লাভ করে।

যে ব্যক্তি নিরাপত্তা চায়

রিওয়ায়াত: ১১ হযরত আনাস (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেন,

مَنْ سَرَّهُ أَنْ يَسْلَمَ فَلْيَلْزَمِ الصَّمْتَ

যে ব্যক্তি নিরপত্তা চায় সে যেন নিরবতাকে আবশ্যক করে নেয়।

ফায়দা

এই হাদিসে নীরবতার গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে। যে ব্যক্তি অপ্রয়োজনীয় কথা, ঝগড়া-বিবাদ, গীবত ও মিথ্যা থেকে নিজেকে দূরে রাখে, সে বহু বিপদ ও গুনাহ থেকে নিরাপদ থাকে। তাই প্রয়োজন ছাড়া কথা না বলে কল্যাণকর কথা বলাই মুমিনের উত্তম চরিত্র।

যবানের নিকট অঙ্গ প্রত্যঙ্গের আরয

রিওয়ায়াত: ১২ হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়র (রহ) হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রা) থেকে বর্ণনা করেন এবং বলেন, আমার ধারণা তিনি এটা রাসূলুল্লাহ (সা) থেকে বর্ণনা করেছেন যে-

” إِذَا أَصْبَحَ ابْنُ آدَمَ أَصْبَحَتِ الْأَعْضَاءُ كُلُّهَا تُكَفِّرُ اللِّسَانَ تَقُولُ: اتَّقِ اللَّهَ فِينَا، فَإِنَّكَ إِنِ اسْتَقَمْتَ اسْتَقَمْنَا، وَإِنِ اعْوَجَجْتَ اعْوَجَجْنَا “

যখন মানুষ ভোর উঠে তখন তার সমস্ত অঙ্গ প্রত্যঙ্গ তার নিকট অনুনয় বিনয় করে বলে, আমাদের কার্যাবলীর ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় কর কেননা আমাদের কার্যাবলী তোমার সাথে সম্পৃক্ত। যদি তুমি ঠিক থাক তবে আমরাও ঠিক থাকব। আর যদি তুমি বিগড়ে যাও তবে আমরাও বিগড়ে যাব।

ফায়দা

এই বাণী জিহ্বার গুরুত্ব ও প্রভাব তুলে ধরে। মানুষের জিহ্বা সঠিক থাকলে তার আমল ও আচরণও সুন্দর হয়, আর জিহ্বা বেপরোয়া হলে অন্যান্য কাজও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই জিহ্বার হেফাজত আত্মশুদ্ধির অন্যতম চাবিকাঠি।

আবু বকর (রা) এর জিহ্বার প্রতি সতর্কতা

রিওয়ায়াত: ১৩ হযরত যায়দ বিন আসলাম তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন। হযরত উমর (রা) দেখলেন যে, হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা) তার জিহ্বা ধরে টানছেন।

তখন উমর (রা) জিজ্ঞাসা করলেন, হে আল্লাহর রাসূলের খলীফা! আপনি কি করছেন? তিনি বললেন, এই যবান আমাকে ধ্বংসের স্থানে নিয়ে পৌঁছিয়েছে।

রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেছেন-

لَيْسَ شَيْءٌ مِنَ الْجَسَدِ إِلَّا يَشْكُو إِلَى اللَّهِ اللِّسَانَ عَلَى حِدَّتِهِ

শরীরের প্রতিটি অঙ্গ যবানের তীক্ষ্ণতার ব্যাপারে অভিযোগ করে।

ফায়দা

এই ঘটনা জিহ্বার ভয়াবহতা ও এর হেফাজতের গুরুত্ব প্রকাশ করে। হযরত আবু বকর (রা.)-এর মতো মহান সাহাবিও জিহ্বা সম্পর্কে সতর্ক ছিলেন। তাই মুমিনের উচিত কথাবার্তায় সংযম অবলম্বন করা এবং কাউকে কষ্ট দেয় এমন কথা থেকে বিরত থাকা।

আদম সন্তানের প্রতিটি কথা তার জন্য ক্ষতির কারণ

রিওয়ায়াত: ১৪ মুহাম্মদ ইবনে ইয়াযিদ বিন হুনায়স বলেন, আমরা সুফিয়ান সাওরী (রহ) এর অসুস্থতায় তাকে দেখতে গেলাম। এমন সময় সাঈদ ইবনে হাসান (রহ) তার নিকট আসেন।

সুফিয়ান সাওরী (রহ) বলেন, ঐ হাদীস যা আমাকে উম্মু সালিহ সুফিয়াহ বিনতে শায়বাহর সূত্রে বর্ণনা করেছেন আর সুফিয়াহ হযরত উম্মে হাবীবা (রা) থেকে বর্ণনা করেছেন যে,

নবী (সা) ইরশাদ করেছেন-

كُلُّ كَلَامِ ابْنِ آدَمَ هُوَ عَلَيْهِ إِلَّا أَمْرًا بِمَعْرُوفٍ، أَوْ نَهْيًا عَنْ مُنْكَرٍ، أَوْ ذِكْرًا لِلَّهِ

আদম সন্তানের প্রতিটি কথা তার জন্য ক্ষতির কারণ হবে, তবে শুধুমাত্র নেক কাজের আদেশ, অসৎকাজে নিষেধ এবং আল্লাহর যিকির ব্যতীত।

এক ব্যক্তি বলল, এই হাদীস কত কঠিন। সুফিয়ান সাওরী (রহ) বললেন, এর মধ্যে কি কঠিন দেখলে? তুমি কি আল্লাহর বণী শোননি?

يَوْمَ يَقُومُ الرُّوحُ وَالْمَلَائِكَةُ صَفًّا لَا يَتَكَلَّمُونَ إِلَّا مَنْ أَذِنَ لَهُ الرَّحْمَنُ وَقَالَ صَوَابًا

সেদিন রূহ ও ফেরেশতাগণ সারবিদ্ধভাবে দাড়াবে, দয়াময় যাকে অনুমতি দিবেন সে ব্যতীত অন্যরা কথা বলবে না এবং সে যথার্থ কথা বলবে।-সূরা নাবা ৩৮

তুমি কি আরো শোননি আল্লাহর এই বানী?

لَا خَيْرَ فِي كَثِيرٍ مِنْ نَجْوَاهُمْ إِلَّا مَنْ أَمَرَ بِصَدَقَةٍ أَوْ مَعْرُوفٍ أَوْ إِصْلَاحٍ بَيْنَ النَّاسِ

তাদের অধিকাংশ গোপন পরামর্শে কোন কল্যাণ নেই। তবে কল্যাণ আছে, যে নির্দেশ দেয় সাদকার, নেককাজের অথবা মানুষের মধ্যে শান্তি স্থাপনের।– সূরা নিসা ১১৪

তুমি কি আরো শোননি আল্লাহর এই বানী?

وَلَا تَنْفَعُ الشَّفَاعَةُ عِنْدَهُ إِلَّا لِمَنْ أَذِنَ لَهُ حَتَّى إِذَا فُزِّعَ عَنْ قُلُوبِهِمْ قَالُوا مَاذَا قَالَ رَبُّكُمْ قَالُوا الْحَقَّ وَهُوَ الْعَلِيُّ الْكَبِيرُ

যাকে অনুমতি দেয়া হবে সে ব্যতীত আর কোরো সুপরিশ ফলপ্রসু হবে না।

পরে যখন তাদের অন্তর হতে ভয় বিদুরিত হবে তখন উহারা পরস্পরের মধ্যেও জিজ্ঞাসাবাদ করবে তোমাদের প্রতিপালক কি বললেন?

তার উত্তরে তারা বলবে যা সত্য তিনি তাই বলেছেন। তিনি সমুচ্চ মহান।- সূরা সাবা ২৩

সুসংবাদ তার জন্য

রিওয়ায়াত: ১৫ হযরত সালিম ইবনে আব্দুল জাদ বলেন, ইসা (আ) বলেছেন-

طُوبَى عَلَى مَنْ بَكَى عَلَى خَطِيئَتِهِ، وَخَزَنَ لِسَانَهُ، وَوَسِعَهُ بَيْتُهُ

সুসংবাদ ঔ ব্যক্তির জন্য যে তার গুনাহর জন্য কেঁদেছে, তার যবানকে সংরক্ষণ করেছে এবং তার ঘর প্রশস্ত হয়েছে।

ফায়দা

এই বাণীতে আত্মশুদ্ধির তিনটি গুরুত্বপূর্ণ গুণের কথা বলা হয়েছে—নিজের গুনাহের জন্য অনুতপ্ত হওয়া, জিহ্বাকে অন্যায় ও অপ্রয়োজনীয় কথা থেকে সংযত রাখা এবং ঘরকে ইবাদত ও নেক আমলের কেন্দ্র বানানো। যে ব্যক্তি এসব গুণ অর্জন করে, সে দুনিয়া ও আখিরাতে কল্যাণ ও সফলতার সুসংবাদ লাভ করে।

রসনা সংযম

রিওয়ায়াত: ১৬ হযরত ইবনে মাসউদ (রা) বলেন,

وَالَّذِي لَا إِلَهَ غَيْرُهُ مَا عَلَى الْأَرْضِ شَيْءٌ أَفْقَرَ

ঐ সত্তার শপথ! যিনি ব্যতীত কোন মাবুদ নেই, এই পৃথিবীতে জিহ্বার চেয়ে বেশি কারাবাসের প্রয়োজনীয় আর কিছু নেই।

অন্য বর্ণনায় এসেছে:

أَحْوَجَ – إِلَى طُولِ سِجْنٍ مِنْ لِسَانٍ

জিহ্বার চেয়ে বেশি নিয়ন্ত্রণের দরকার আর কিছুর নেই।

ফায়দা

হযরত ইবনে মাসউদ (রা.)-এর এই বাণী জিহ্বার ভয়াবহ প্রভাবের প্রতি সতর্ক করে। মানুষের অনেক গুনাহ, বিবাদ ও অনিষ্টের সূচনা হয় জিহ্বার অপব্যবহার থেকে। তাই জিহ্বাকে নিয়ন্ত্রণে রাখা, ভেবে কথা বলা এবং মিথ্যা, গীবত ও কটূক্তি থেকে বিরত থাকা একজন মুমিনের জন্য অত্যন্ত জরুরি। জিহ্বার হেফাজতই দীন ও চরিত্রের হেফাজতের অন্যতম মাধ্যম।

মানুষ যে পর্যন্ত মুত্তাকী হয় না

١٧ – عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: «لَا يَتَّقِي اللَّهَ عَزَّ وَجَلَّ رَجُلٌ أَوْ أَحَدٌ حَقَّ تُقَاتِهِ حَتَّى يَخْزِنَ مِنْ لِسَانِهِ»

১৭.হযরত আনাস (রা) বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, কোন ব্যক্তি সে পর্যন্ত প্রকৃত মুত্তাকী হয় না যে পর্যন্ত না সে তার রসনা সংযত করে।

ফায়দা

এই বাণী থেকে বোঝা যায় যে, তাকওয়া শুধু ইবাদতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং কথাবার্তার মধ্যেও তার প্রকাশ ঘটে। যে ব্যক্তি নিজের জিহ্বাকে মিথ্যা, গীবত, অপবাদ ও অশ্লীল কথা থেকে সংযত রাখতে পারে, সে-ই প্রকৃত মুত্তাকীর মর্যাদা লাভের পথে অগ্রসর হয়। জিহ্বার হেফাজত তাকওয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন।

ইবনে মাসউদ (রা) এর কর্ম

١٨ – عَنِ الْأَعْمَشِ، عَنْ شَقِيقٍ، عَنِ ابْنِ مَسْعُودٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ، أَنَّهُ كَانَ عَلَى الصَّفَا يُلَبِّي وَيَقُولُ:

يَا لِسَانُ، قُلْ خَيْرًا تَغْنَمْ، أَوْ أَنْصِتْ تَسْلَمْ، مِنْ قَبْلِ أَنْ تَنْدَمَ،

قَالُوا: يَا أَبَا عَبْدِ الرَّحْمَنِ، هَذَا شَيْءٌ تَقُولُهُ، أَوْ شَيْءٌ سَمِعْتَهُ؟

قَالَ: لَا، بَلُ سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: «إِنَّ أَكْثَرَ خَطَايَا ابْنِ آدَمَ فِي لِسَانِهِ»

১৮.হযরত শাকীক (রহ) হযরত ইবনে মাসউদ (রা) এর ব্যপারে বলেন যে, ইবনে মাসউদ (রা) সাফার উপর তালবিয়া পড়ছিলেন এবং বলছিলেন,

হে যবান ভাল কথা বল তাহলে লাভবান হবে অথবা চুপ থাক তাহলে নিরাপদ থাকবে এর পূর্বে যে, এর কারণে লজ্জিত হবে।

সাথিরা বলল, এটা কি আপনি নিজের পক্ষ থেকে বলছেন, নাকি আপনি শুনেছেন?

তিনি বলেন, না, বরং আমি রাসূলুল্লাহ (সা)-কে বলতে শুনেছি, আদম সন্তানের অধিকাংশ গুনাহ তার যবান দ্বারা হয়ে থাকে।

আবু বকর (রা) এর আমল

١٩ – عَنْ قَيْسٍ قَالَ: رَأَيْتُ أَبَا بَكْرٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ آخِذًا بِطَرَفِ لِسَانِهِ وَهُوَ يَقُولُ: «هَذَا أَوْرَدَنِي الْمَوَارِدَ»

১৯. হযরত কায়স (রহ) বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, আমি দেখলাম যে আবু বকর (রা) তার যবান ধরলেন এবং বললেন, এই যবান আমাকে ধ্বংসের স্থানে নিয়ে পৌঁছিয়েছে।

٢٠ – عَنْ زَيْدِ بْنِ أَسْلَمَ، عَنْ أَبِيهِ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمَا قَالَ: أَخَذَ أَبُو بَكْرٍ الصِّدِّيقُ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ لِسَانَهُ وَقَالَ:

قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «مَنْ وَقَاهُ اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ شَرَّ مَا بَيْنَ لَحْيَيْهِ وَمَا بَيْنَ رِجْلَيْهِ دَخَلَ الْجَنَّةَ»

২০. হযরত যায়দ ইবনে আসলাম (রহ) তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন:

আবু বকর সিদ্দীক (রা) নিজের জিহ্বা ধরে বললেন- মুহাম্মাদ ﷺ বলেছেন,

যাকে আল্লাহ তাআলা তার দুই চোয়ালের মাঝের বস্তু (জিহ্বা) এবং দুই পায়ের মাঝের বস্তু (লজ্জাস্থান)-এর অনিষ্ট থেকে রক্ষা করবেন—সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।

আল্লাহ যার দোষ ত্রুটি গোপন রাখবেন

٢١ – عَنِ ابْنِ عُمَرَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمَا قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ:

«مَنْ كَفَّ لِسَانَهُ سَتَرَ اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ عَوْرَتَهُ، وَمَنْ مَلَكَ غَضَبَهُ وَقَاهُ اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ عَذَابَهُ، وَمَنِ اعْتَذَرَ إِلَى اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ قَبِلَ عُذْرَهُ»

২১. হযরত আব্দুল্লাহ ইবন উমর (র) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেন,

যে ব্যক্তি তার যবানকে আয়ত্বে রাখবে আল্লাহ তার দোষ-ত্রুটি গোপন রাখেন।

যে তার রাগের উপর নিয়ন্ত্রণ রাখবে, আল্লাহ তাআলা তাকে তার আযাব থেকে নিরাপদ রাখবেন।

আর যে আল্লাহ তাআলার নিকট ক্ষমা চাইবে আল্লাহ তাকে ক্ষমা করবেন।

রাসূলের উপদেশ

٢٢ – عَنْ أَبِي سَلَمَةَ: أَنَّ مُعَاذَ بْنَ جَبَلٍ، رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: يَا رَسُولَ اللَّهِ، أَوْصِنِي.

قَالَ: «اعْبُدِ اللَّهَ كَأَنَّكَ تَرَاهُ، وَاعْدُدْ نَفْسَكَ فِي الْمَوْتَى، وَإِنْ شِئْتَ أَنْبَأْتُكَ بِمَا هُوَ أَمْلَكُ بِكَ مِنْ هَذَا كُلِّهِ» قَالَ: «هَذَا» وَأَتَى بِيَدِهِ إِلَى لِسَانِهِ

২২. মু‘আয ইবনে জাবাল (রা) বলেন,
আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আমাকে উপদেশ দিন।

তিনি (সা) বললেন, আল্লাহর ইবাদত কর এমনভাবে, যেন তুমি তাঁকে দেখছ।
নিজেকে মৃতদের অন্তর্ভুক্ত মনে করো।

আর চাইলে আমি তোমাকে এমন একটি বিষয় বলে দিতে পারি, যা এসব কিছুর চেয়েও তোমার উপর বেশি নিয়ন্ত্রণ রাখে।

আমি বললাম, বলুন। তখন তিনি নিজের হাত দিয়ে নিজের জিহ্বার দিকে ইশারা করে বললেন, এটি।

দীর্ঘ কারাবাস যার প্রয়োজন

٢٣ – عَنِ ابْنِ مَسْعُودٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ:

«مَا شَيْءٌ أَحَقَّ بِطُولِ سِجْنٍ مِنَ اللِّسَانِ»

২৩. আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা) বলেন, জিহ্বার মত দীর্ঘ কারাবাসের যোগ্য আর কোনো জিনিস নেই।

ফায়দা

এই উক্তির মাধ্যমে হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) জিহ্বাকে নিয়ন্ত্রণের গুরুত্ব তুলে ধরেছেন। মানুষের অধিকাংশ ভুল, গুনাহ ও অনর্থ জিহ্বার মাধ্যমেই সংঘটিত হয়।

তাই মুমিনের উচিত কথা বলার আগে চিন্তা করা এবং জিহ্বাকে মিথ্যা, গীবত, কটূক্তি ও অপ্রয়োজনীয় কথা থেকে সংযত রাখা। জিহ্বার হেফাজত দীনদারির অন্যতম লক্ষণ।

জিহ্বাকে আগলে রাখা

٢٤ – عَنْ حُمَيْدِ بْنِ هِلَالٍ، قَالَ: قَالَ عَبْدُ اللَّهِ بْنُ عَمْرٍو:

«دَعْ مَا لَسْتَ مِنْهُ فِي شَيْءٍ، وَلَا تَنْطِقْ فِيمَا لَا يَعْنِيكَ، وَاخْزِنْ لِسَانَكَ كَمَا تَخْزِنُ وَرِقَكَ»

২৪. আব্দুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস (রা) বলেন, যে বিষয়ে তোমার কোনো সম্পর্ক নেই- তা ছেড়ে দাও।

যে বিষয়ে তোমার দায়িত্ব নেই-সে বিষয়ে কথা বলো না। আর তোমার জিহ্বাকে আগলে রাখো, যেমন তুমি তোমার টাকা-পয়সা আগলে রাখো।

ফায়দা

এই বাণী আমাদের অপ্রয়োজনীয় বিষয়ে হস্তক্ষেপ ও কথাবার্তা থেকে বিরত থাকার শিক্ষা দেয়। মানুষের উচিত নিজের দায়িত্ব ও প্রয়োজনীয় কাজে মনোযোগ দেওয়া এবং জিহ্বাকে এমনভাবে সংরক্ষণ করা, যেমন সে তার মূল্যবান সম্পদ রক্ষা করে। কারণ অসতর্ক কথাবার্তা মানুষকে গুনাহ, বিবাদ ও অনুতাপের দিকে নিয়ে যেতে পারে।

প্রকৃত মুসলিম

٢٥ – عَنِ الشَّعْبِيِّ، قَالَ: قُلْتُ لِعَبْدِ اللَّهِ بْنِ عَمْرٍو: حَدِّثْنِي مَا سَمِعْتَ مِنْ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَدَعِ الْكُتُبَ؛ فَإِنِّي لَا أَعْبَأُ بِهَا شَيْئًا.

فَقَالَ: سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ:

«الْمُسْلِمُ مَنْ سَلِمَ الْمُسْلِمُونَ مِنْ لِسَانِهِ وَيَدِهِ، وَالْمُهَاجِرُ مَنْ هَجَرَ مَا كَرِهَ رَبُّهُ»

২৫. শাবী (রহ) বলেন, আমি আব্দুল্লাহ ইবনু আমর ইবনুল আস (রা.)-কে বললাম: আপনি বই বাদ দিয়ে আমাকে সরাসরি রাসূল (সা) থেকে যা শুনেছেন, তা বলুন।

তিনি বললেন—আমি রাসুলুল্লাহ (সা)-কে বলতে শুনেছি—

প্রকৃত মুসলিম সে- যার জিহ্বা ও হাত থেকে অন্য মুসলিমরা নিরাপদ থাকে।

আর প্রকৃত মুহাজির সে- যে আল্লাহ যা অপছন্দ করেন, তা ছেড়ে দেয়।

যার ক্ষতি থেকে মানুষ মুক্ত

٢٦ – عَنْ أَبِي وَائِلٍ عَنْ أَبِي سَعِيدٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ:

«مَنْ كَسَبَ طَيِّبًا، وَعَمِلَ فِي سُنَّةٍ، وَأَمِنَ النَّاسُ بَوَائِقَهُ دَخَلَ الْجَنَّةَ»

২৬. আবু সাঈদ আল-খুদরী (রা) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা) বলেছেন—

যে ব্যক্তি হালাল উপার্জন করে, সুন্নাহ অনুযায়ী জীবন যাপন করে, আর যার ক্ষতি থেকে মানুষ নিরাপদ থাকে—সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।

ফায়দা

এই হাদিসে জান্নাতে প্রবেশের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ আমলের কথা উল্লেখ করা হয়েছে—হালাল উপার্জন করা, সুন্নাহ অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করা এবং নিজের কথা ও কাজের দ্বারা মানুষকে কষ্ট না দেওয়া। যে ব্যক্তি এসব গুণ অর্জন করে, সে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও জান্নাত লাভের উপযুক্ত হয়। মানুষের নিরাপত্তা ও কল্যাণ নিশ্চিত করাও একজন মুমিনের মহান চরিত্রের পরিচয়।

সহজ ইবাদত

٢٧ – عَنْ صَفْوَانَ بْنِ سُلَيْمٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ:

” أَلَا أُخْبِرُكُمْ بِأَيْسَرِ الْعِبَادَةِ وَأَهْوَنِهَا عَلَى الْبَدَنِ: الصَّمْتُ وَحُسْنُ الْخُلُقِ ”

২৭ সাফওয়ান ইবনু সালীম (রা) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, আমি কি তোমাদের সবচেয়ে সহজ ইবাদত এবং শরীরের জন্য সবচেয়ে হালকা আমল বলে দেব?

তা হলো—চুপ থাকা (অপ্রয়োজনীয় কথা না বলা) এবং সুন্দর চরিত্র।

ফায়দা

সহজ কথায়, কম কথা বলো, ভালো ব্যবহার করো— এই দুটোই খুব বড় ইবাদত।

যার জিহ্বা ও হাত থেকে মুসলিমরা নিরাপদ

٢٨ – عَنْ أَنَسٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ، عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ:

«الْمُؤْمِنُ مَنْ أَمِنَهُ النَّاسُ، وَالْمُسْلِمُ مَنْ سَلِمَ الْمُسْلِمُونَ مِنْ لِسَانِهِ وَيَدِهِ، وَالْمُهَاجِرُ مَنْ هَجَرَ السُّوءَ،

وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ لَا يَدْخُلُ الْجَنَّةَ عَبْدٌ لَا يَأْمَنُ جَارُهُ بَوَائِقَهُ»

২৮. আনাস ইবনে মালিক (রা) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন,

মুমিন সে- যার কাছ থেকে মানুষ নিরাপদ থাকে। মুসলিম সে- যার জিহ্বা ও হাত থেকে অন্য মুসলিমরা নিরাপদ থাকে।

মুহাজির সে- যে মন্দ কাজ ছেড়ে দেয়।

আর সেই সত্তার কসম, যার হাতে আমার প্রাণ! যার প্রতিবেশী তার ক্ষতি থেকে নিরাপদ নয়, সে ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করবে না।

উত্তম ইসলাম পালনকারী

٢٩ –  عَنْ جَابِرٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ: أَنَّ رَجُلًا سَأَلَ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: أَيُّ الْإِسْلَامِ أَفْضَلُ؟

قَالَ: «مَنْ سَلِمَ الْمُسْلِمُونَ مِنْ لِسَانِهِ وَيَدِهِ»

২৯. জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ (রা) থেকে বর্ণিত— এক ব্যক্তি নবী (সা)-কে জিজ্ঞেস করল, ইসলামের কোন দিকটি সবচেয়ে উত্তম?

তিনি (সা) বললেন, যার জিহ্বা ও হাত থেকে মুসলিমরা নিরাপদ থাকে- সে-ই সবচেয়ে উত্তম ইসলাম পালনকারী।

ফায়দা

প্রকৃত মুসলিম সে-ই, যার কথা ও কাজের দ্বারা অন্য মুসলিম নিরাপদ থাকে। জিহ্বা ও হাতের অপব্যবহার থেকে বিরত থাকাই উত্তম ইসলামের অন্যতম নিদর্শন।

٣٠ – عَنِ الرَّبِيعِ بْنِ خُثَيْمٍ قَالَ: «يَا بَكْرُ بْنَ مَاعِزٍ، اخْزِنْ لِسَانَكَ إِلَّا مِمَّا لَكَ وَلَا عَلَيْكَ»

৩০ রবী ইবনে খুসাইম (রহ) বলেন,
তিনি বকর বিন মাইয-কে বললেন,

হে বকর! তোমার জিহ্বাকে সংরক্ষণ করে রাখো—শুধু সেই কথাই বলো, যা তোমার উপকারে আসে; ক্ষতির নয়।

ফায়দা

একেবারে সহজ কথা: অকারণে কথা বলো না, শুধু ভালো ও দরকারি কথাই বলো, জিহ্বা বাঁচলে, অনেক গুনাহ থেকেও বাঁচা যায়।

উপসংহার

জিহ্বা মানুষের জন্য মহান নিয়ামত, তবে এর সঠিক ব্যবহার না হলে তা ধ্বংসের কারণও হতে পারে। কুরআন, হাদিস এবং সালাফে সালেহীনের বাণীতে জিহ্বার হেফাজত ও অপ্রয়োজনীয় কথা থেকে বিরত থাকার প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। মিথ্যা, গীবত, অপবাদ ও কটূক্তি থেকে বেঁচে থেকে কল্যাণকর কথা বলা বা নীরব থাকা একজন মুমিনের বৈশিষ্ট্য।

নীরবতা মানুষকে বহু গুনাহ, অনুশোচনা ও বিপদ থেকে রক্ষা করে এবং চিন্তা, আত্মশুদ্ধি ও আল্লাহর স্মরণে সহায়তা করে। তাই আমাদের উচিত জিহ্বাকে সংযত রাখা, প্রয়োজনীয় ও উপকারী কথা বলা এবং সর্বদা আল্লাহভীতির সঙ্গে কথাবার্তা পরিচালনা করা। এভাবেই জিহ্বার হেফাজতের মাধ্যমে দুনিয়ার শান্তি ও আখিরাতের সফলতা অর্জন করা সম্ভব।

🔸🔸🔸

👉 আরও পড়ুন ইমানের হাকীকত, কানযুল উম্মাল-শায়খ আলী মুত্তাকী (রহ)

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Back to top button
error: Content is protected !!