আকায়েদ ফিকহ ও মাসায়েল

ইসমে আযম দুআ কবুলের গোপন রহস্য

ইসমে আযম - ইমাম সুয়ূতী (রহ)

ইসমে আযম দুআ কবুলের গোপন রহস্য – ইসলামের আধ্যাত্মিক জগতে “ইসমে আযম” এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও রহস্যময় বিষয়। বহু আলেম ও সুফী-সাধক এই মহান নামের ফজিলত ও প্রভাব নিয়ে আলোচনা করেছেন।

প্রখ্যাত মুফাসসির ও মুহাদ্দিস ইমাম সুয়ূতী (রহ.) তাঁর অনন্য গ্রন্থে ইসমে আযমের তাৎপর্য, প্রমাণ এবং এর আমল সম্পর্কে বিস্তারিত আলোকপাত করেছেন।

যারা দোয়া কবুল হওয়ার বিশেষ উপায় খুঁজছেন কিংবা আল্লাহর নৈকট্য অর্জনে আগ্রহী, তাদের জন্য এই পুস্তিকাটি হতে পারে এক অমূল্য সম্পদ।

আরও পোস্ট

আমাদের অনুবাদ ও প্রকাশনা – দারুস সাআদাত 

👉 আরও পড়ুন সকাল সন্ধ্যার দুআ ১ম ভাগ

Table of Contents

ইসমে আযম

بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ

গ্রন্থকারের ভূমিকা

الحمد لله الذي له الأسماء الحسنى والصفات العلى والصلاة والسلام على سيدنا محمد
المخصوص بالشفاعة العظمى وعلى آله وصحبه ذوي المقام الأسنى وبعد

হামদ ও সালাতের পর ইমাম সুয়ূতী (রহ) বলেন— আমাকে ইসমে আযম এবং এর বিষয়ে যা কিছু বর্ণিত আছে সে বিষয়ে প্রশ্ন করা হয়েছে।

অতএব আমি ইচ্ছা করেছি যে, এ ব্যাপারে যেসব হাদীস, আসার ও উক্তিসমূহ রয়েছে তা একত্রিত করব।

আমি বলি যে, এ ব্যাপারে অনেকগুলো উক্তি রয়েছে।

১ম উক্তি: এর কোন ভিত্তি নেই

প্রথম উক্তি হলো এই যে, এর কোন ভিত্তি নেই। কেননা আল্লাহ তাআলার প্রতিটি নামই ইসমে আযমের গুণসম্পন্ন। কতককে কতকের উপর প্রাধান্য দেয়া বৈধ নয়।

এই মতের প্রবক্তারা হলেন— ইমাম আবু জাফর তাবারী (রহ), আবুল হাসান আশআরী (রহ), আবু হাতিম ইবনে হিব্বান (রহ), কাজী আবু বকর বাকিল্লানী (রহ) প্রমুখ।

এমনিভাবে ইমাম মালিক (রহ) এরও উক্তি আছে যে, আল্লাহর কতক নামকে কতক নামের উপর ফযীলত দেয়া বৈধ নয়।

২য় উক্তি: এর জ্ঞান শুধু আল্লাহরই রয়েছে

দ্বিতীয় উক্তি হলো এই যে, এর জ্ঞান শুধু আল্লাহরই রয়েছে। তার কোন মাখলুককে তিনি তা জানাননি।
যেমন লায়লাতুল কদরের জ্ঞান, দুআ কবুলের মুহূর্ত এবং সালাতুল উসতা বা মধ্যবর্তী নামাযের বিষয়।

৩য় উক্তি: লফয হুআ

তৃতীয় উক্তি লফজ هو (তিনি [আল্লাহ]) হলো ইসমে আযম। ইমাম ফখরুদ্দীন রাযী (রহ) কতক কাশফের অধিকারী ব্যক্তিদের থেকে এটা বর্ণনা করেছেন।

৪র্থ উক্তি: আল্লাহ শব্দটি ইসমে আযম

চতুর্থ উক্তি হলো— “الله” শব্দটাই ইসমে আযম। কারণ এটি এমন নাম যার সম্পৃক্ততা আল্লাহ ব্যতীত আর কারো সাথে নেই।

আরো এজন্য যে, আসমায়ে হুসনা বা আল্লাহর সুন্দর নামসমূহের মধ্যে এই নামটিই প্রধান৷ এজন্য এর দিকে এর সম্পর্ক ও সংযোগ করা হয়েছে।

ইমাম ইবনে আবী হাতিম তার তাফসীরে উল্লেখ করেছেন যে, হযরত জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ (রা) থেকে বর্ণিত আছে যে, তিনি বলেছেন-

اسم الله الأعظم هو الله، ألم تسمع أنه يقول:

আল্লাহ তাআলার ইসমে আযম হল আল্লাহ শব্দটি। তুমি কি শোন নাই যে, আল্লাহ তাআলা বলেছেন-

هُوَ اللَّهُ الَّذِي لَا إِلَٰهَ إِلَّا هُوَ عَالِمُ الْغَيْبِ وَالشَّهَادَةِ هُوَ الرَّحْمَٰنُ الرَّحِيمُ

তিনিই আল্লাহ যিনি ব্যতীত কোন উপাস্য নাই। তিনি দৃশ্য ও অদৃশ্যকে জানেন। তিনি পরম দয়ালু অসীম দাতা।- সূরা আল হাশর ২২

৫ম উক্তি: والله الرَّحْمَٰنُ الرَّحِيمُ ইসমে আযম

পঞ্চম উক্তি ইসমে আযম হলো والله الرَّحْمَٰنُ الرَّحِيمُ হাফিজ ইবনে হাজার শরহে বুখারির মধ্যে বলেন, এর প্রমাণ হলো সেই হাদীস যা ইমাম ইবনে মাজাহ হযরত আয়শা (রা) থেকে বর্ণনা করেছেন যে,

হযরত আয়শা (রা) নবী (সা) এর নিকট আরয করেন, আমাকে ইসমে আযম শিখিয়ে দিন। কিন্তু তিনি তাকে শিখাননি।

অতঃপর আয়শা (রা) নামায পড়ে এই দুআ করেন –

اللَّهُمَّ إِنِّي أَدْعُوكَ اللَّهَ، وَأَدْعُوكَ الرَّحْمَنَ، وَأَدْعُوكَ الْبَرَّ الرَّحِيمَ، وَأَدْعُوكَ بِأَسْمَائِكَ الْحُسْنَى كُلِّهَا مَا عَلِمْتُ مِنْهَا وَمَا لَمْ أَعْلَمْ

হে আল্লাহ!
আমি আপনাকে আল্লাহ বলে ডাকছি,
আমি আপনাকে রহমান বলে ডাকছি,
আমি আপনাকে রাহীম বলে ডাকছি,
আমি আপনাকে আপনার সব সুন্দর নাম সমূহ দ্বারা ডাকছি— যা আমি জানি আর যা জানি না।

অতঃপর রাসুলুল্লাহ (সা) তাকে বললেন, আল্লাহর ইসমে আযম এই নামগুলোর মধ্যেই আছে যেই নামগুলো দ্বারা তুমি দুআ করেছো।

এই হাদিসের সনদ দুর্বল। আমি বলি এর চেয়ে সনদের দিক থেকে শক্তিশালী হলো সেই হাদিস যা হাকীম তার মুস্তাদরাকে উল্লেখ করেছেন।

হযরত ইবনে আব্বাস (রা) বলেন, হযরত উসমান (রা) হযরত রাসুলুল্লাহ এর নিকট বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম এর ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করেন।

তখন রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেন-

هو اسم من اسماء الله وما بينه وبين اسم الله الاكبر إلا كما بين سؤاد العين وبياضها من القرب
এটা আল্লাহর নামসমূহের মধ্যে একটি নাম। আর এর সাথে আল্লাহর ইসমে আযমের এতটা নৈকট্য, যেমন চোখের কালো অংশের সাথে সাদা অংশের নিকটবর্তীতা রয়েছে।

মুসনাদুল ফিরদাউসে দায়লামী (রহ) হযরত ইবনে আব্বাস থেকে মারফু হাদিস নকল করেছেন যে,

اسم الله الأعظم في ست آيات من آخر سورة الحشر

আল্লাহ তাআলার ইসমে আযম সূরা হাশরের শেষ ছয় আয়াতের মধ্যে রয়েছে।

৬ষ্ঠ উক্তি: الرَّحْمَٰنُ الرَّحِيمُ এবং الحَيُّ القَيُّومُ

ষষ্ঠ উক্তি ইসমে আযম হলো-

الرَّحْمَٰنُ الرَّحِيمُ এবং الحَيُّ القَيُّومُ

জামে তিরমিযীতে হযরত আসমা বিনতে ইয়াযীদ থেকে বর্ণিত রয়েছে।

রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেন, ইসমে আযম এই দুই আয়াতের মধ্যে রয়েছে-

وَإِلَٰهُكُمْ إِلَٰهٌ وَاحِدٌ لَا إِلَٰهَ إِلَّا هُوَ الرَّحْمَٰنُ الرَّحِيمُ

ওয়া ইলাহুকুম ইলাহু ওয়াহিদ লা ইলাহা ইল্লা হুয়ার রাহমানুর রাহীম।- সূরা বাকারা ১৬৩

এবং সূরা আলে ইমরানের শুরুর আয়াতে-

اللّٰهُ لَاۤ اِلٰهَ اِلَّا هُوَ ۙ الۡحَیُّ الۡقَیُّوۡمُ ؕ

আলিফ লাম মিম আল্লাহু লা ইলাহা ইল্লা হুয়াল হাইয়ুল কাইয়ুম।- সূরা আলে ইমরান ১-২

৭ম উক্তি: আল হাইয়ুল কাইয়ুম 

সপ্তম উক্তি ইসমে আযম হলো— الحَيُّ القَيُّومُ আল হাইয়ুল কাইয়ুম। ইমাম ইবনে মাজাহ এবং হাকিম হযরত আবু উমামা থেকে বর্ণনা করেছেন-

ইসমে আজম তিনটি সূরার মধ্যে রয়েছে। সূরা বাকারাহ, সূরা আলে ইমরান এবং সূরা ত্বহার মধ্যে।

এই হাদিসের একজন বর্ণনাকারী হযরত কাসিম (রহ) বলেন,

আমি এই তিন সূরায় ইসমে আযম তালাশ করেছি। তখন আমি অবগতি লাভ করলাম যে তা হল الحَيُّ القَيُّومُ আলহাইয়ুল কাইয়ুম।

৮ম উক্তি: اَلْحَنَّانُ الْمَنَّانُ

অষ্টম উক্তি ইসমে আযম হলো-

اَلْحَنَّانُ الْمَنَّانُ، بَدِيعُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ، يَا ذَا الْجَلَالِ وَالْإِكْرَامِ

ইমাম আহমদ, আবু দাউদ, ইবনে হিব্বান এবং হাকীম হযরত আনাস (রা) থেকে বর্ণনা করেন। তিনি একবার রাসূলুল্লাহ (সা) এর মজলিসে বসা ছিলেন। এক ব্যক্তি নামায পড়লো এবং নামাযের পর দুআ করলো-

اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ بِأَنَّ لَكَ الْحَمْدَ، لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ الحَنَّانُ المَنَّانُ، بَدِيْعُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ، يَا ذَا الْجَلَالِ وَالْإِكْرَامِ، يَا حَيُّ يَا قَيُّومُ

হে আল্লাহ! আমি তোমার কাছে প্রার্থনা করছি। কারণ তুমিই প্রশংসার যোগ্য। তুমি ছাড়া কোন ইলাহ নেই। তুমি হান্নান ও মান্নান। তুমিই আসমান-যমীনের স্রষ্টা। হে শ্রেষ্ঠত্ব ও বদান্যতার অধিকারী। হে চিরঞ্জীব। হে বিশ্ব জাহানের ব্যবস্থাপক।

এই দুআ শুনে রাসূলুল্লাহ (সা) বললেন, এই ব্যক্তি আল্লাহ তাআলার ইসমে আযমের মাধ্যমে দুআ করেছে। যার দ্বারা দুআ করলে কবুল করা হয় এবং কিছু প্রার্থনা করলে তা প্রদান করা হয়।

৯ম উক্তি: ইয়া বাদিআস সামাওয়াতি ওয়াল আরদি

নবম উক্তি ইসমে আযম হলো-

يَا بَدِيعَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ يَا ذَا الْجَلَالِ وَالْإِكْرَامِ

ইয়া বাদিআস সামাওয়াতি ওয়াল আরদি ইয়া যালযালালী ওয়াল ইকরাম।

আবু ইয়ালা সিররী বিন ইয়াহইয়া সূত্রে তার গোত্রের জনৈক ব্যক্তি থেকে বর্ণনা করেন এবং তার প্রশংসা করেন। তিনি বলেন— আমি মহান আল্লাহর নিকট আমাকে ঐ নামটি দেখানোর জন্য প্রার্থনা করতাম, যে নামে দুআ করলে তিনি কবুল করেন। তারপর আমি আকাশের নক্ষত্রপুঞ্জে লিখা দেখতাম-

يَا بَدِيعَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ يَا ذَا الْجَلَالِ وَالْإِكْرَامِ

হে আসমান যমীনের স্রষ্টা, হে মহিমাময় মহানুভব।

উচ্চারণ: ইয়া বাদিউস সামাওয়াতি ওয়াল আরদ্বি ইয়া যাল জালালি ওয়াল ইকরাম।

১০ম উক্তি: ইয়া যালজালালি ওয়াল ইকরাম

দশম উক্তি ইসমে আযম হলো এই কালিমাগুলো-

يَا ذَا الْجَلَالِ وَالْإِكْرَامِ

ইয়া যালজালালি ওয়াল ইকরাম।

তিরমিযীতে হযরত মুয়ায (রা) থেকে বর্ণিত হাদীস আছে। রাসূলুল্লাহ (সা) জনৈক ব্যক্তিকে বলতে শুনলেন,

ইয়া যাল জালালি ওয়াল ইকরাম- হে পরাক্রমশালী ও মহাসম্মানের অধিকারী।

তিনি বললেন, তোমার দুআ কবুল করা হবে। অতএব, তুমি প্রার্থনা কর।

আল্লামা ইবনে জারির (রহ) সূরা নমলের তাফসীরে হযরত মুজাহিদ (রহ) থেকে বর্ণনা করেন।

তিনি বলেন- ঐ নাম যার দ্বারা দুআ করলে কবুল করা হয়, তা হলো- ইয়া যাল জালালি ওয়াল ইকরাম।

১১ তম উক্তি

এগারতম উক্তি ইসমে আযম হলো-

اللَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ الْأَحَدُ الصَّمَدُ الَّذِي لَمْ يَلِدْ وَلَمْ يُولَدْ وَلَمْ يَكُنْ لَهُ كُفُوًا أَحَدٌ

আবু দাউদ, তিরমিযী, ইবনে হিব্বান ও হাকীম হযরত বুরাইদা (রা) থেকে হাদীস বর্ণনা করেন। রাসূলুল্লাহ (সা) এক ব্যক্তিকে এই দুআ করতে শুনলেন-

اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ بِأَنِّي أَشْهَدُ أَنَّكَ أَنْتَ اللَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ الْأَحَدُ الصَّمَدُ الَّذِي لَمْ يَلِدْ وَلَمْ يُولَدْ وَلَمْ يَكُنْ لَهُ كُفُوًا أَحَدٌ

হে আল্লাহ! আমি তোমার কাছে প্রার্থনা করছি। কারণ আমি সুদৃঢ় বিশ্বাস পোষণ করি যে, তুমিই আল্লাহ। তুমি ছাড়া আর কোন ইলাহ নেই।

তুমি এক, অমুখাপেক্ষী। যার কোন সন্তান নেই, তিনিও কারো সন্তান নন এবং তার সমকক্ষ কেউ নেই।

তার এই দুআ শুনে রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করলেন-

لَقَدْ سَأَلْتَ اللَّهَ بِالِاسْمِ الَّذِي إِذَا سُئِلَ بِهِ أَعْطَى وَإِذَا دُعِيَ بِهِ أَجَابَ

এই ব্যক্তি আল্লাহ তাআলার ঐ নামের মাধ্যমে দুআ করেছে, যার উসীলায় কিছু প্রার্থনা করলে আল্লাহ তাআলা দিয়ে থাকেন আর কোন দুআ করলে তা কবুল করেন।

আবু দাউদের শব্দ-

لَقَدْ سَأَلَ اللَّهَ بِاسْمِهِ الْأَعْظَمِ

তুমি আল্লাহ তাআলার ইসমে আযমের দ্বারা দুআ করেছ।

১২ তম উক্তি: রব! রব!

বারতম উক্তি رَبِّ رَبِّ ! রব! রব! শব্দ দুটি ইসমে আযম। ইমাম হাকীম আবু দারদা এবং হযরত ইবনে আব্বাস (রা) থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন-

اسْمُ اللَّهِ الْأَكْبَرُ رَبِّ رَبِّ

আল্লাহ তাআলার ইসমে আযম হলো রব রব।

ইমাম ইবনে আবিদ দুনইয়া (রহ) হযরত আয়িশা (রা) থেকে মারফু ও মাওকুফভাবে বর্ণনা করেন যে, বান্দা যখন বলে- يَا رَبِّ يَا رَبِّ ইয়া রব ইয়া রব!

তখন আল্লাহ তাআলা বলেন-

لَبَّيْكَ عَبْدِي سَلْ تُعْطَ

হে আমার বান্দা! আমি উপস্থিত আছি। তুমি চাও তোমাকে দেয়া হবে।

১৩ তম উক্তি: মালিকুল মুলক

তেরতম উক্তি ইসমে আযম হলো الْمَلِكُ الْمُلْكُ আল মালিকুল মুলক।

ইমাম তাবারানী আল মুজামুল কাবীরে হযরত ইবনে আব্বাস (রা) থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন-

اسْمُ اللَّهِ الْأَعْظَمُ الَّذِي إِذَا دُعِيَ بِهِ أَجَابَ فِي هَذِهِ الْآيَةِ مِنْ آلِ عِمْرَانَ

আল্লাহ তাআলার ইসমে আযম যার মাধ্যমে দুআ কবুল হয় তা সূরা আল ইমরানের এই আয়াতে রয়েছে-

قُلِ اللَّهُمَّ مَالِكَ الْمُلْكِ تُؤْتِي الْمُلْكَ مَنْ تَشَاءُ وَتَنْزِعُ الْمُلْكَ مِمَّنْ تَشَاءُ وَتُعِزُّ مَنْ تَشَاءُ وَتُذِلُّ مَنْ تَشَاءُ بِيَدِكَ الْخَيْرُ إِنَّكَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ ۞ تُولِجُ اللَّيْلَ فِي النَّهَارِ وَتُولِجُ النَّهَارَ فِي اللَّيْلِ وَتُخْرِجُ الْحَيَّ مِنَ الْمَيِّتِ وَتُخْرِجُ الْمَيِّتَ مِنَ الْحَيِّ وَتَرْزُقُ مَنْ تَشَاءُ بِغَيْرِ حِسَابٍ

বল, হে আল্লাহ! তুমিই সার্বভৌম শক্তির অধিকারী। তুমি যাকে ইচ্ছা রাজ্য দান কর এবং যার কাছ থেকে ইচ্ছা রাজ্য ছিনিয়ে নাও এবং যাকে ইচ্ছা সম্মান দান কর আর যাকে ইচ্ছা অপমানে পতিত কর। তোমারই হাতে রয়েছে সকল কল্যাণ। নিশ্চয়ই তুমি সবকিছুর উপর ক্ষমতাবান।

তুমি রাতকে দিনের ভেতরে প্রবেশ করাও এবং দিনকে রাতের ভেতরে প্রবেশ করাও। আর তুমিই জীবিতকে মৃতের ভেতর থেকে বের করে আন এবং মৃতকে জীবিতের ভেতর থেকে বের কর। আর তুমি যাকে ইচ্ছা বে-হিসাব রিযিক দান কর।

১৪ তম উক্তি: দুআ ইউনুস

চৌদ্দ তম উক্তি ইসমে আযম হলো- যুননূন অর্থাৎ হযরত ইউনুস (আ) এর দুআ।

নাসাঈ ও হাকীম হযরত ফাযালা ইবনে উবায়দ (রা) থেকে মারফুরূপে বর্ণনা করেন যে, হযরত ইউনুস (আ) মাছের পেটে এই দুআ করেন-

لَا إِلٰهَ إِلَّا أَنْتَ سُبْحَانَكَ إِنِّي كُنْتُ مِنَ الظَّالِمِينَ

(লা ইলাহা ইল্লা আনতা সুবহানাকা ইন্নি কুনতু মিনায যালিমীন।) —সূরা আম্বিয়া: ৮৭

কোন মুসলমান এই দুআর দ্বারা আল্লাহর কাছে কিছু প্রার্থনা করলে আল্লাহ তা কবুল করেন।

আল্লাহ তাআলা বলেন:

وَنَجَّيْنَاهُ مِنَ الْغَمِّ وَكَذَلِكَ نُنجِي الْمُؤْمِنِينَ

“এরপর তাকে আমি উদ্ধার করলাম দুঃখ-দুশ্চিন্তা হতে। এমনিভাবে আমি মুমিনদেরকে উদ্ধার করে থাকি।” [সূরা আম্বিয়া: ৮৮]

১৫ তম উক্তি: কালিমা তাওহীদ

১৫ তম উক্তি ইসমে আযম হলো কালিমা তাওহীদ। এটি কাযী আয়ায হযরত রাসূলুল্লাহ (সা) থেকে নকল করেছেন।

হযরত ইয়াকুব ইবনে আসিম (রহ) সূত্রে দুজন সাহাবী থেকে বর্ণিত। তারা নবী (সা)-কে বলতে শুনেছেন- যে ব্যক্তি নিম্নের (কালিমা তাওহীদ) দুআটি পবিত্র আত্মায় ও আন্তরিক বিশ্বাসে মুখে উচ্চারণ করবে, মহান আল্লাহ তার প্রতি দৃষ্টিপাত করবেন।

لَا إِلٰهَ إِلَّا اللهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيکَ لَهُ، لَهُ الْمُلْکُ وَلَهُ الْحَمْدُ، وَهُوَ عَلٰی کُلِّ شَيْءٍ قَدِیرٌ

লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারিকা লাহু, লাহুল মুলকু ওয়া লাহুল হামদু, ওয়া হুয়া আলা কুল্লি শাইয়িন কাদির।

অর্থ: আল্লাহ ছাড়া কোন মাবুদ নেই। তিনি একক তাঁর কোন শরীক নেই। তাঁর জন্যই রাজত্ব এবং তাঁর জন্যই সকল প্রশংসা আর তিনি সবকিছুর উপর পূর্ণ ক্ষমতাবান।

১৬ তম উক্তি

ষোলতম উক্তি: ইমাম ফখরুদ্দীন রাযী (রহ) ইমাম যায়নুল আবিদীন থেকে বর্ণনা করেন। তিনি স্বপ্নে দেখলেন যে, ইসমে আযম হলো এই কালিমগুলো-

هُوَ اللهُ اللهُ اللهُ الَّذِي لَا إِلٰهَ إِلَّا هُوَ رَبُّ الْعَرْشِ الْعَظِيمِ

হুয়াল্লাহু আল্লাহু আল্লাহুল্লাযী লা ইলাহা ইল্লা হুয়া রাব্বুল আরশিল আযীম।

১৭ তম উক্তি: ইসমে আযম গোপন আছে

সতরতম উক্তি হলো— ইসমে আযম আসমাউল হুসনা বা আল্লাহর সুন্দর নামসমূহের মধ্যে গোপন আছে। এর সমর্থনে হযরত আয়িশা (রা) থেকে বর্ণিত হাদীস পূর্বে গত হয়েছে।

যখন তিনি কতক আসমায়ে হুসনার সাথে দুআ করলেন, তখন রাসূলুল্লাহ (সা) বললেন, নিঃসন্দেহে এই নামগুলোর মধ্যেই (ইসমে আযম আছে) যার দ্বারা তুমি দুআ করেছ।—[দ্র: ৫ ম উক্তি]

১৮ তম উক্তি: আল্লাহর প্রতিটি নাম ইসমে আযম

আঠারতম উক্তি হলো আল্লাহর নামসমূহের প্রত্যেকটি নামই ইসমে আযম। যখন বান্দা কায়মনোবাক্যে আল্লাহকে এমনভাবে ডাকে যে, তার সামনে আল্লাহ ব্যতীত আর কেউ থাকে না। যখন বান্দা এই অবস্থায় আল্লাহকে ডাকে তবে তা দুআ কবুলের নিকটবর্তী হয়ে থাকে।

হযরত বায়েজিদ বুস্তামী (রহ) এর উক্তি

ইমাম আবু নুআইম আল ইস্পাহানী (রহ) হিলইয়াতুল আউলিয়ায় হযরত বায়েজিদ বুস্তামী থেকে বর্ণনা করেন। তাকে এক ব্যক্তি ইসমে আযমের ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করেন। তখন তিনি বলেন যে,

لَيْسَ لَهُ حَدٌّ مَحْدُودٌ إِنَّمَا هُوَ فَرَاغُ قَلْبِكَ لِوَحْدَانِيَّتِهِ، فَإِذَا كُنْتَ كَذَلِكَ فَارْفَعْ إِلَيَّ أَيُّ اسْمٍ شِئْتَ فَإِنَّكَ تَصِيْرُ بِهِ إِلَى الْمَشْرِقِ وَالْمَغْرِبِ

এর বিশেষ কোন বৈশিষ্ট্য নেই। এর মূল বিষয় হলো আল্লাহর একত্ববাদকে নিজের অন্তরে বদ্ধমূল করে দেয়া। যখন তুমি এই অবস্থায় পৌঁছে যাবে তখন তুমি নিঃসন্দেহে (মুহূর্তে পৃথিবীর) পূর্ব ও পশ্চিমে ভ্রমণ করে ফেলবে।

কতক মাশায়েখের উক্তি

ইমাম আবু নুআইম আল ইস্পাহানী (রহ) হযরত আবু সুলায়মান দারানী (রহ) থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, আমি কতক মাশায়েখকে ইসমে আযমের ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করলে বলেন— তুমি তোমার অন্তরকে চিন ও বুঝ? আমি বললাম, হ্যাঁ। বললেন-

فَإِذَا رَأَيْتَهُ رَقَّ وَأَقْبَلَ فَسَلِ الله حَاجَتَكَ فَذَلِكَ اسْمُ الله الْأَعْظَمُ

তুমি যখন দেখবে তোমার অন্তরে একাগ্রতা ও নম্রতা সৃষ্টি হয়েছে তখন আল্লাহর কাছে নিজের প্রয়োজন প্রার্থনা কর। আর এটাই হলো ইসমে আযম।

ইবনু রা’বী (রহ) এর উক্তি

ইমাম আবু নুআইম আল ইস্পাহানী (রহ) ইবনু রাবি’ থেকে বর্ণনা করেন যে, এক ব্যক্তি তাকে বলেন, আমাকে ইসমে আযম শিখান। তিনি বললেন, লিখে নাও, বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম—

اطِعِ الله يعطِكَ كل شيء

অর্থাৎ তুমি আল্লাহর আনুগত্য কর তাহলে সবকিছু তোমার আনুগত্য করবে।

১৯ তম উক্তি: আল্লাহুম্মা

উনিশতম উক্তি ইসমে আযম হলো- اللّٰهُمَّ হে আল্লাহ! হযরত হাসান বসরী (রহ) বলেন- اللّٰهُمَّ হলো-

مجمع الدعا

দুআর মিলনকেন্দ্র।

হযরত নযর বিন শামায়েল বলেন, যে- اللّٰهُمَّ বলল, সে আল্লাহকে তার সব নাম ধরেই ডাকল।

২০ তম উক্তি: আলিফ লাম মীম

২০ তম উক্তি ইসমে আযম হলো الم ‘আলিফ লাম মিম’। আল্লামা ইবনে জারির হযরত ইবনে মাসউদ (রা) থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেছেন-

هو اسم الله الأعظم

আলিফ লাম মিম আল্লাহ তাআলার ইসমে আযম।২১

ইমাম ইবনে আবী হাতিম হযরত ইবনে আব্বাস (রা) থেকে রিওয়ায়াত করেন যে-

الم اسم من أسماء الله الأعظم

الم আল্লাহ তাআলার নামসমূহের মধ্যে ইসমে আযম।

ইমাম ইবনে আবী হাতিম এবং ইবনে জারির হযরত ইবনে আব্বাস (রা) থেকে রিওয়ায়াত করেন যে-

هو قسم أقسم الله به، وهو من أسماء الله

الم হলো শপথ। আল্লাহ তাআলা এর দ্বারা শপথ করেছেন। আর এটা আল্লাহর নামসমূহের মধ্য থেকে (একটি নাম ও ইসমে আযম)।

উপসংহার

ইসমে আযমের জ্ঞান শুধু একটি তাত্ত্বিক বিষয় নয়, বরং এটি একজন মুমিনের আত্মিক উন্নয়ন ও দোয়া কবুলের শক্তিশালী মাধ্যম।

ইমাম সুয়ূতী (রহ.)-এর এই পুস্তিকা আমাদেরকে সেই মহিমান্বিত নামের গুরুত্ব ও ব্যবহার সম্পর্কে সচেতন করে।

আসুন, আমরা এই জ্ঞানকে জীবনে প্রয়োগ করি এবং আল্লাহর নিকট আরও বেশি করে দুআ ও ইবাদতে মনোনিবেশ করি— যাতে আমাদের দুনিয়া ও আখিরাত উভয়ই কল্যাণময় হয়।

🔹🔹🔹

👉 আরও পড়ুন আমল ও তদবীর

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Back to top button
error: Content is protected !!