ইসলামী গ্রন্থ

রিযিক বৃদ্ধির আমল – ইমাম সুয়ূতী (রহ)

রিযিক বৃদ্ধির আমল হাদীস ও রিওয়ায়াত থেকে

রিযিক বৃদ্ধির আমল – ইমাম সুয়ূতী (রহ)। রিযিক মহান আল্লাহ তাআলার অমূল্য নিআমত। প্রত্যেক মানুষই চায় তার জীবনে হালাল, বরকতময় ও প্রশস্ত রিযিক লাভ করতে।

ইসলামে রিযিক বৃদ্ধির জন্য কেবল পরিশ্রমই নয়, বরং আল্লাহর প্রতি তাওয়াক্কুল, তাকওয়া, ইস্তিগফার, দোয়া এবং কুরআন-সুন্নাহসম্মত আমলের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

তাই রিযিক বৃদ্ধির আমল সম্পর্কে সহিহ ও নির্ভরযোগ্য দিকনির্দেশনা জানা প্রতিটি মুসলিমের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

আরও পোস্ট

প্রখ্যাত ইসলামি মনীষী কুরআন, হাদিস এবং সালাফে সালেহীনের বর্ণনার আলোকে রিযিক বৃদ্ধির বিভিন্ন আমল ও দোয়া সংকলন করেছেন। তার আলোচনায় এমন কিছু আমল উঠে এসেছে, যা আল্লাহর রহমত ও বরকত লাভের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে বিবেচিত।

উদ্দেশ্য হলো কুরআন ও সহিহ সুন্নাহর আলোকে এমন আমল জানা, যা দুনিয়ার জীবনে বরকত এবং আখিরাতে কল্যাণের পথ সুগম করে।

ইমাম সুয়ূতী (রহ) রচিত রিযিক বৃদ্ধির আমল পুস্তিকা থেকে অনূদিত 

আমাদের অনুবাদ ও প্রকাশনা – দারুস সাআদাত 

গ্রন্থকারের ভূমিকা

الحمد لله وكفى وسلام علا عباده اللذين اصطفى

হামদ ও সালাতের পর গ্রন্থকার ইমাম সুয়ূতী (রহ) নিবেদন করেন যে,

আমাকে অনেক লোক নিবেদন করেছে যে, আমি ঐ সব আমল ও আযকার একটি রিসালায় একত্রিত করব যা রিযিকের প্রশস্তাবৃদ্ধি এবং দারিদ্রতা ও অনটন রোধে কার্যকর ও সুফল প্রদানকারী এবং নির্ভরযোগ্য হাদীসসমূহে বর্ণিত।

অতএব আমি এই রিসালাটি তাদের জন্য একত্রিত করেছি যা দুটি অনুচ্ছেদে বিভক্ত।

প্রথম অনুচ্ছেদঃ রিযিক বৃদ্ধির দুআ ও যিকিরসমূহ
দ্বিতীয় অনুচ্ছেদঃ রিযিক বৃদ্ধির আমল ও কর্মসমূহ

Table of Contents

রিযিক বৃদ্ধির দুআ ও যিকির

যার রিযিকের সংকট রয়েছে

ইমাম তাবারানী আউসাতে- হযরত আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণনা করেন। রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেন,

مَنْ أَلْبَسَهُ اللَّهُ نِعْمَةً فَلْيُكْثِرْ مِنَ الْحَمْدِ لِلَّهِ ، وَمَنْ كَثُرَتْ ذُنُوبُهُ فَلْيَسْتَغْفِرِ اللَّهَ ، وَمَنْ أَبْطَأَ رِزْقُهُ فَلْيُكْثِرْ مِنْ قَوْلِ: لَا حَوْلَ وَلَا قُوَّةَ إِلَّا بِاللَّهِ

যাকে আল্লাহ তাআলা কোন নিয়ামত দান করেন, তার উচিত অধিক পরিমাণে আল্লাহর শোকর আদায় করা।

আর যার গুনাহ বেশী, তার উচিত অধিক পরিমাণে ইস্তিগফার করা। আর যার রিযিকের অভাব রয়েছে, তার উচিত ‘লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ’ বেশী করে পড়া।

প্রত্যেক সংকট থেকে উত্তরণের উপায়

ইমাম আহমদ, আবু দাউদ ও ইবনে মাজাহ- হযরত ইবনে আব্বাস (রা) থেকে বর্ণনা করেন। রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেন-

مَنْ لَزِمَ الاِسْتِغْفَارَ جَعَلَ اللَّهُ لَهُ مِنْ كُلِّ ضِيقٍ مَخْرَجًا وَمِنْ كُلِّ هَمٍّ فَرَجًا وَرَزَقَهُ مِنْ حَيْثُ لاَ يَحْتَسِبُ

যে ব্যক্তি ইস্তিগফার (ক্ষমা প্রার্থনা) কাকে অপরিহার্য করে নেয়, আল্লাহ তাআলা তাকে প্রত্যেক সংকীর্ণতা থেকে মুক্তির পথ বের করে দেন এবং প্রত্যেক চিন্তা হতে তাকে মুক্তি দেন। আর এমন স্থান হতে তাকে রিযিক দান করেন যার কল্পনাও সে করে না।

ফায়দা

যে ব্যক্তি নিয়মিত ইস্তিগফার করে, আল্লাহ তাআলা তার দুশ্চিন্তা ও সংকট দূর করেন, অপ্রত্যাশিত উৎস থেকে রিযিক দান করেন এবং জীবনে বরকত ও স্বস্তি নসিব করেন।

যে কখনো উপবাস করবে না

আবু উবায়দ তার ফায়ায়িলুল কুরআনে, হারিস ইবনে উসামাহ, আবু ইয়ালা তার মুসনাদে, ইবনে মারদুবিয়াহ তার তাফসীরে এবং বায়হাকী শুআবুল ঈমানে-

হযরত ইবনে মাসউদ (রা) থেকে বর্ণনা করেন। রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেন-

مَنْ قَرَأَ سُورَةَ الْوَاقِعَةِ كُلَّ لَيْلَةٍ لَمْ تُصِبْهُ فَاقَةٌ أَبَدًا

যে ব্যক্তি প্রতিদিন সূরা ওয়াকিয়া পাঠ করবে তাকে কখনো উপবাস থাকতে হবে না।

ফায়দা

সূরা ওয়াকিয়া নিয়মিত তিলাওয়াত ঈমানকে দৃঢ় করে, আখিরাতের স্মরণ জাগ্রত করে, আল্লাহর প্রতি ভরসা বৃদ্ধি করে এবং অন্তরে প্রশান্তি এনে দেয়।

সমৃদ্ধি দানকারী সূরা

ইবনে মারদুবিয়াহ তার তাফসীরে- হযরত আনাস (রা) থেকে বর্ণনা করেন। রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেন-

سُوْرَةُ الْوَاقِعَةِ سُوْرَةُ الْغِنٰى فَاقْرَؤُوْهَا وَعَلِّمُوْهَا أَوْلَادَكُمْ

সূরা ওয়াকিয়া হলো প্রশস্ততা ও সমৃদ্ধি দানকারী সূরা। অতএব তোমরা তা পাঠ কর এবং তোমাদের সন্তান-সন্ততিদেরকেও তা শিক্ষা দাও।

জীবন-জীবিকা সংকীর্ণ হয়ে পড়লে

ইমাম ইবনুস সুন্নী- হযরত ইবনে উমর (রা) থেকে বর্ণনা করেন। রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেন- যখন তোমাদের কারো জীবন জীবিকা সংকীর্ণ হয়ে যায় তখন সে ঘর থেকে বের হওয়ার সময় এই দুআটি পাঠ করতে তাকে কিসে বাধা দেয়-

بِسْمِ اللهِ عَلَى نَفْسِي وَمَالِي وَدِينِي، اَللّٰهُمَّ رَضِّنِي بِقَضَائِكَ، وَبَارِكْ لِي فِيمَا قُدِّرَ لِي حَتَّى لَا أُحِبَّ تَعْجِيلَ مَا أَخَّرْتَ، وَلَا تَأْخِيرَ مَا عَجَّلْتَ

আমি আল্লাহর নাম নিচ্ছি আমার নিজের উপর, আমার (পরিবার) সম্পদ ও দীনের উপর। হে আল্লাহ! আমাকে তোমার সিদ্ধান্তের উপর তুষ্ট রাখ এবং তোমার নির্ধারিত তাকদীরের মধ্যে আমার জন্য বরকত দান কর।

এমনকি আমি যেন আগে না চাই, যা আমার জন্য পরে নির্ধারণ রয়েছে। আর আমি যেন পরে না চাই, যা আমার জন্য আগে নির্ধারণ রয়েছে।

হযরত আদম (আ) এর দুআ

ইমাম তাবারানী আউসাতে- হযরত আয়িশা (রা) থেকে বর্ণনা করেন। রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেন- হযরত আদম (আ) কে যখন পৃথিবীতে অবতরণ করানো হল তখন তিনি কাবার দিকে দাঁড়িয়ে দুই রাকাত নামায আদায় করেন।

তখন আল্লাহ তাআলা তার অন্তরে এই দুআ ইলহাম করেন-

اللَّهُمَّ إِنَّكَ تَعْلَمُ سَرِيرَتِي وَعَلَانِيَتِي فَاقْبَلْ مَعْذِرَتِي، وَتَعْلَمُ حَاجَتِي فَأَعْطِنِي سُؤْلِي، وَتَعْلَمُ مَا فِي نَفْسِي فَاغْفِرْ لِي ذُنُبِي،
اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ إِيمَانًا يُبَاشِرُ قَلْبِي، وَيَقِينًا صَادِقًا حَتَّى أَعْلَمَ أَنَّهُ لَا يُصِيبُنِي إِلَّا مَا كَتَبْتَ لِي، وَرَضِّنِي بِمَا قَسَمْتَ لِي

হে আল্লাহ! আপনি প্রকাশ্য ও গোপন সবকিছু জানেন, সুতরাং আমার ওযর কবুল করুন। আমার হাজত ও প্রয়োজন আপনি জানেন, সুতরাং আমার প্রার্থনা কবুল করুন। আমার মনের অবস্থাও আপনি জানেন, সুতরাং আপনি আমাকে ক্ষমা করুন।

হে আল্লাহ! আমি আপনার নিকট এমন ইমান প্রার্থনা করি, যা আমার অন্তরে বিস্তার লাভ করবে। আর এমন সত্য ইয়াকীন কামনা করি যার কারণে আমার এই অনুভূতি হয় যে, আপনি আমার তাকদীরে যা নির্ধারণ করেছেন তার বাইরে আমার কোন অনিষ্ট পৌঁছবে না। আর আপনি আমার জন্য যা নির্ধারণ করেছেন তার প্রতি আমাকে সন্তুষ্ট করে দিন।

অতঃপর আল্লাহ তাআলা তার নিকট ওহী পাঠালেন যে, হে আদম! আমি তোমার তওবা কবুল করে নিয়েছি এবং তোমার ভুল-ভ্রান্তি ক্ষমা করে দিয়েছি।

এই বাক্যে অন্য কেউ দুআ করলে তাকেও ক্ষমা করে দেব। তার সকল কাজের যিম্মাদার হয়ে যাব। সে দুনিয়া না চাইলেও দুনিয়া তার কাছে অপদস্থ হয়ে এসে পড়বে।

দারিদ্রতা এবং কবরের ভীতি ও অশান্তি থেকে যে নিরাপদ থাকবে

দায়লামী মুসনাদুল ফিরদাউসে হযরত আলী (রা) থেকে বর্ণনা করেন। রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি দৈনিক ১০০ বার পাঠ করবে-

‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহুল মালিকুল হাক্কুল মুবীন’ অর্থাৎ আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নেই তিনি সত্য সুস্পষ্ট প্রভু।

সে দারিদ্রতা থেকে মুক্তি পাবে এবং কবরের ভীতি ও অশান্তি থেকে নিরাপদ থাকবে।

সূরা ইখলাস এর বরকত

ইমাম তাবরানী হযরত ইবনে মাসউদ (রা) থেকে বর্ণনা করেন। রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেন—

مَنْ قَرَأَ: {قُلْ هُوَ اللَّهُ أَحَدٌ} [الإخلاص] حِينَ يَدْخُلُ مَنْزِلَهُ نَفَتِ الْفَقْرَ عَنْ أَهْلِ ذَلِكَ الْمَنْزِلِ وَالْجِيرَانِ

যে ব্যক্তি নিজ ঘরে প্রবেশ করার সময় ‘কুলহুআল্লাহু আহাদ’ (সূরা ইখলাস) পড়বে। তবে এই সূরা তার পরিবার ও তার প্রতিবেশীদের অভাব-অনটন দূর করে দিবে।

দুনিয়া ও আখিরাতের সকল চিন্তা-ভাবনার জন্য যা যথেষ্ট হবে

ইমাম আহমদ উত্তম সনদে- হযরত উবাই (রা) থেকে বর্ণনা করেন। এক ব্যক্তি নবী (সা) কে বললেন,

ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি যদি আমার সব দুআ-দরূদ শুধু আপনার প্রতি দরূদ পাঠের মধ্যেই নির্ধারণ করে নেই তবে তা কেমন হবে?

নবী (সা) বললেন-

إِذَنْ يَكْفِيَكَ اللَّهُ مَا هَمَّكَ مِنْ أَمْرِ دُنْيَاكَ وَآخِرَتِكَ
তাহলে আল্লাহ তোমার দুনিয়া ও আখিরাতের সকল চিন্তা-ভাবনার জন্য যথেষ্ট হয়ে যাবেন।

ফায়দা

জীবনের সর্বক্ষেত্রে দরূদ পাঠের ইতিবাচক প্রভাব রয়েছে। অতএব বেশি বেশি দরূদ পাঠ করা আবশ্যক।

বাকী জীবনের প্রশস্ত রিযিকের জন্য

ইমাম তাবরানী আউসাতে হযরত আয়িশা (রা) থেকে বর্ণনা করেন। রাসূলুল্লাহ (সা) এই দুআ করেন-

اللَّهُمَّ اجْعَلْ أَوْسَعَ رِزْقِكَ عَلَيَّ عِنْدَ كِبَرِ سِنِّي، وَانْقِطَاعِ عُمُرِي
হে আল্লাহ! আমাকে আমার বার্ধক্য ও শেষ জীবনে অধিকতর প্রশস্ত রিযিক দান করুন।

ফায়দা

মানুষের বয়স যত বাড়ে মানুষ ততই অসহায়ত্বের দিকে ধাবিত হয়। এই সময় অর্থকড়ি খুব প্রয়োজন। তাই এই দুআ করা উচিত।

যা শত্রু থেকে রক্ষা করে এবং রিযিকের প্রাচুর্য আনে

ইমাম মুস্তাগফীরী তার দুআর গ্রন্থে হযরত জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ (রা) থেকে বর্ণনা করেন। রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেন—

أَلَا أَدُلُّكُمْ عَلَى مَا يُنْجِيكُمْ مِنْ عَدُوِّكُمْ وَيُدِرُّ لَكُمْ أَرْزَاقَكُمْ؟ تَدْعُونَ اللَّهَ فِي لَيْلِكُمْ وَنَهَارِكُمْ، فَإِنَّ الدُّعَاءَ سِلَاحُ الْمُؤْمِنِ

আমি কি তোমাদেরকে এমন বিষয়ের সন্ধান দিব না, যা তোমাদেরকে শত্রু থেকে রক্ষা করবে এবং তোমাদের রিযিকের প্রাচুর্য এনে দেবে। (আর তা হলো) তোমরা তোমাদের দিনে ও রাতে (সবসময়) আল্লাহকে ডাকবে অর্থাৎ দুআ করবে। কেননা দুআই হলো মুমিনের অস্ত্র স্বরূপ।

ফায়দা

আমরা অনেক সময় দুআ কবুল হয় না বলে অভিযোগ করি। অথচ দুআ বিপদাপদ প্রতিরোধসহ জীবনে স্বচ্ছলতার পথ উন্মুক্ত করে।

ফজরের নামাযের পর রাসূলুল্লাহ (সা) এর দুআ

হযরত উম্মু সালামা (রা) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সা) ফজরের নামাযের পর পাঠ বলতেন-

اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ رِزْقًا طَيِّبًا، وَعِلْمًا نَافِعًا، وَعَمَلًا مُتَقَبَّلًا
হে আল্লাহ! আমি আপনার নিকট চাই পবিত্র রিযিক, উপকারী ইলম এবং কবুল হওয়ার মত আমল।

ফায়দা

কত সহজ আর ব্যাপক এই দুআটি। তাই সবারই এটা পাঠ্য হওয়া উচিত।

জুমআর নামাযের পর হযরত আনাস (রা) যে দুআ পড়তেন

ইমাম মুস্তাগফিরী- হযরত (আনাস) ইবনে মালিক (রা) থেকে বর্ণনা করেন। তিনি জুমআর নামায পড়ে বের হওয়ার সময় মসজিদের দরজায় দাঁড়িয়ে এই দুআ পড়তেন-

اللَّهُمَّ إِنِّي أَجَبْتُ دَعْوَتَكَ وَصَلَّيْتُ فَرِيضَتَكَ وَانْتَشَرْتُ كَمَا أَمَرْتَنِي فَارْزُقْنِي مِنْ فَضْلِكَ وَأَنْتَ خَيْرُ الرَّازِقِينَ

হে আল্লাহ! আমি আপনার ডাকে সাড়া দিয়েছি। আপনার ফরয আদায় করেছি। এখন আপনার নির্দেশ অনুযায়ী (রিযিকের জন্য) বের হচ্ছি।

অতএব আপনি নিজ অনুগ্রহে আমাকে রিযিক দান কর। কেননা আপনিই সর্বোত্তম রিযিকদাতা।

ফায়দা

সূরা জুমআয় আছে যখন নামায শেষ হবে তখন রিযিকের জন্য বের হও। তাই তিনি এর উপর আমল করেছেন।

পুত্রের প্রতি হযরত নূহ (আ) এর শেষ ওসীয়ত

ইমাম বুখারী আদাবুল মুফরাদে, বায়হাকী, হাকীম তার সহীহতে- হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা) থেকে বর্ণনা করেন। রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেন- হযরত নূহ (আ) মৃত্যুর সময় তার ছেলেকে ওসিয়ত করেছিলেন যে, আমি তোমাকে দুটি বিষয়ের নির্দেশ দিচ্ছি-

لَا إِلٰهَ إِلَّا اللهُ، وَسُبْحَانَ اللهِ وَبِحَمْدِهِ
লা ইলাহ ইল্লাল্লাহু এবং সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহী।

কেননা এ দুটি হচ্ছে সকল জিনিসের তাসবীহ এবং এরই বরকত ও কল্যাণে রিযিক দান করা হয়।

যে তাসবীহর বরকতে সৃষ্টজীবের রিযিক লাভ হয়

ইমাম মুস্তাগফিরী- হযরত জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ (রা) থেকে বর্ণনা করেন। রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেন- আমি কি তোমাদেরকে বলব না নূহ (আ) তাঁর ছেলেকে কি বলেছিলেন? তিনি বলেছেন- তুমি পড়বে-

سُبْحَانَ اللهِ وَبِحَمْدِهِ

সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহী।

কেননা সকল সৃষ্টজীব এই তাসবীহ পাঠ করে এবং আর এর জন্যই সবাইকে রিযিক দেয়া হয়।

এক ব্যক্তিকে রাসূলের উপদেশ

ইমাম মুস্তাগফিরী- হযরত ইবনে উমর (রা) থেকে বর্ণনা করেন। একদা এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সা) এর নিকট এসে অভাব-অনটনের অভিযোগ করল। রাসূলুল্লাহ (সা) বললেন, ফেরেশতাদের দুআ এবং সৃষ্ট জীবের তাসবীহ পাঠ কর না কেন?

তুমি নিম্নের কালিমা ফজরের সময় হওয়ার পর ফজরের নামাজের পূর্বে ১০০ বার পাঠ করবে। তাহলে দুনিয়া তোমার নিকট অপমানিত ও লাঞ্ছিত হয়ে চলে আসবে-

سُبْحَانَ اللهِ وَبِحَمْدِهِ سُبْحَانَ اللهِ الْعَظِيمِ أَسْتَغْفِرُ الله

সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহী সুবহানাল্লাহিল আযীমি আস্তাগফিরুল্লাহ।

হযরত উমর (রা) এর অভাব

ইমাম মুস্তাগফিরী- হযরত উরওয়া ইবনে যুবাইর (রা) থেকে বর্ণনা করেন। একদা হযরত উমর (রা) বিপদে পড়ে রাসূলুল্লাহ (সা) এর নিকট নিজের অনটনের কথা পেশ করেন এবং কিছু খেজুর প্রদানের জন্য বলেন।

তখন রাসূলুল্লাহ (সা) বললেন, তুমি যদি চাও তবে তোমাকে কিছু খেজুর প্রদানের ব্যবস্থা করে দেই। আর যদি ইচ্ছা হয় তবে কয়েকটি কালিমা শিখিয়ে দেই, যা তোমার জন্য এর চেয়ে উত্তম। তুমি বল-

اَللَّهُمَّ احْفَظْنِيْ بِالْإِسْلَامِ قَائِدًا، وَاحْفَظْنِيْ بِالْإِسْلَامِ رَاقِدًا، وَلَا تُشْمِتْ فِيَّ عَدُوًّا وَلَا حَاسِدًا وَأَعُوْذُ بِكَ مِنْ شَرِّ مَا أَنْتَ آخِذٌ بِنَاصِيَتِهِ، وَأَسْأَلُكَ مِنَ الْخَيْرِ الَّذِيْ بِيَدِكَ

হে আল্লাহ! আপনি আমাকে বসা অবস্থায় ইসলাম দ্বারা হিফাযত করুন। শায়িত অবস্থায়ও ইসলাম দ্বারা হিফাযত করুন। আর কোন হিংসুক ও শত্রুকে আমার ব্যাপারে খুশি হওয়ার সুযোগ প্রদান করবেন না।

আমি আপনার আশ্রয় চাই ঐ সমস্ত জিনিসের অনিষ্ট থেকে যা আপনি নিজের আয়ত্তে রেখেছেন। আর আপনার হাতে যে কল্যাণ রয়েছে আমি আপনার নিকট তা প্রার্থনা করছি।

ফায়দা

দুআটিতে আছে হিংসুক শত্রু যেন খুশি হতে না পারে। তার মানে জীবনে স্বাচ্ছন্দ্য আসলেই হিংসুক শত্রুরা বেজার হয়।

হযরত আলী (রা)-কে শেখানো দুআ

ইমাম মুস্তাগফিরী- হযরত আলী (রা) থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন- তোমাকে রাখালসহ পাঁচশত বকরী প্রদান করা পছন্দ করবে নাকি পাঁচটি কালিমা শিখিয়ে দেওয়া পছন্দ করবে (যার দ্বারা তোমার দ্বীন ও দুনিয়ার কল্যাণ লাভ হবে)। তুমি বল-

اَللَّهُمَّ اغْفِرْ لِيْ ذَنْبِيْ، وَطَيِّبْ لِيْ كَسْبِيْ، وَوَسِّعْ لِيْ فِيْ خُلُقِيْ، وَلَا تَمْنَعْنِيْ مِمَّا قَضَيْتَ لِيْ بِهِ وَلَا تُذْهِبْ بِنَفْسِيْ إِلَى شَيْءٍ صَرَفْتَهُ عَنِّيْ

হে আল্লাহ! আমার গুনাহ মাফ করুন। আমার উপার্জনকে পবিত্র করুন। আমার চরিত্র প্রশস্ত (উদার) করুন। আমার তাকদীরে যা নির্ধারণ করেছেন তা থেকে আমাকে বঞ্চিত করবেন না। আর যা আমার তাকদীরে নেই তার প্রতি আমার হৃদয়কে লালায়িত করবেন না।

হযরত ঈসা (আ) তার সহচরদেরকে যে দুআ শিক্ষা দিতেন

ইমাম বায়যাকী, হাকীম এবং বায়হাকী দাওয়াতুল কাবীরে- হযরত আয়েশা (রা) থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, আমাকে আমার পিতা বললেন, আমি কি তোমাকে শেখাব না যা আমাকে নবী (সা) শিখিয়েছেন এবং বলেছেন, হযরত ঈসা (আ) আপন সহচরদেরকে এই দুআ শিক্ষা দিতেন।

আর এই দুআর বৈশিষ্ট্য এই যে, তোমাদের কারো জিম্মায় যদি উহুদ পাহাড় পরিমাণ ঋণও থাকে তবুও আল্লাহ তাআলা তা পরিশোধের ব্যবস্থা করে দেবেন।

হযরত আয়িশা (রা) বলেন, আমি বললাম, অবশ্যই বলে দিন। তিনি বললেন, দুআটি হলো-

اَللّهُمَّ كَاشِفَ الْكَرْبِ، مُجِيْبَ دَعْوَةِ الْمُضْطَرِّ، رَحْمَنَ الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ، وَرَحِيْمَهُمَا، أَنْتَ تَرْحَمُنِيْ، بِرَحْمَةٍ تُغْنِيْنِيْ بِهِمَا عَنْ رَحْمَةِ مَنْ سِوَاكَ

হে আল্লাহ! বিপদ থেকে রক্ষাকারী! উদ্বিগ্ন ব্যক্তিদের আহ্বানে সাড়া প্রদানকারী! দুনিয়া ও আখিরাতে রহমান এবং উভয় জগতে রহিমও বটেন। তুমিই কেবল আমাকে দয়া করতে পার। যে দয়া আমাকে অপর সকলের অনুগ্রহ থেকে অমুখাপেক্ষী করে দেবে।

হযরত আবু বকর (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) যখন আমাকে এই দুআ শিক্ষা দিলেন তখন আমি অনেক ঋণগ্রস্ত ছিলাম এবং এই কারণে বেশ চিন্তিত ছিলাম। কিছুদিন পরেই আল্লাহ তাআলা অনেক লাভবান করলেন। যার ফলে সব ঋণ পরিশোধ হয়ে গেল।

হযরত আয়িশা (রা) বলেন- আমিও জনৈক মহিলার নিকট ঋণী ছিলাম। আর এজন্য তার নিকট লজ্জিত ছিলাম। এই দুআ পাঠ করার কিছুদিনের মধ্যেই আল্লাহ তাআলা আমাকে কোন প্রকার পরিত্যক্ত সম্পদ বা সাদকা ব্যতীতই জীবিকা দান করলেন। যার ফলে আমি ঋণ থেকে নিষ্কৃতি লাভ করি।

দুশ্চিন্তা ও ঋণ পরিশোধের কার্যকর উপায়

ইমাম আবু দাউদ এবং বায়হাকী দাওয়াতুল কাবীরে- হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রা) থেকে বর্ণনা করেন। একদা রাসূলুল্লাহ (সা) আবু উমামা (রা) কে বিষণ্ণ দেখে জিজ্ঞাসা করেন, কি ব্যাপার?

তিনি বললেন, সীমাহীন দুশ্চিন্তা ও ঋণভারে জর্জরিত হয়ে পড়েছি।

রাসূলুল্লাহ (সা) বললেন, আমি তোমাকে একটি দুআ শিখিয়ে দিচ্ছি, তুমি তা পাঠ করলে আল্লাহ তোমার সব দুশ্চিন্তা দূর করে দেবেন। তুমি বল-

اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنَ الْهَمِّ وَالْحَزَنِ، وَأَعُوذُ بِكَ مِنَ الْعَجْزِ وَالْكَسَلِ، وَأَعُوذُ بِكَ مِنَ الْجُبْنِ وَالْبُخْلِ، وَأَعُوذُ بِكَ مِنْ غَلَبَةِ الدَّيْنِ، وَقَهْرِ الرِّجَالِ

হে আল্লাহ! আমি আপনার আশ্রয় চাই চিন্তা ও দুঃখ থেকে। আপনার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করছি অক্ষমতা ও অলসতা থেকে। আপনার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করছি ভীরুতা ও কার্পণ্য থেকে এবং আপনার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করছি ঋণের চাপ থেকে আর মানুষের প্রভাব-প্রতিপত্তি থেকে।

আবু উমামা (রা) বলেন, অতঃপর আমি দুআগুলো পাঠ করা শুরু করি। যার ফলে আল্লাহ আমার যাবতীয় চিন্তা-ভাবনা দূর করেন এবং ঋণ পরিশোধের ব্যবস্থা করেন।

উহুদ পাহাড় পরিমাণ ঋণও যেভাবে পরিশোধ হবে

ইমাম বায়হাকী হযরত আলী (রা) থেকে বর্ণনা করেন। একদা তার নিকট এক মুকাতিব গুলাম (অর্থের বিনিময়ে মুক্তি লাভের চুক্তিতে আবদ্ধ) এসে বললেন, আমি একজন মুকাতিব গুলাম। আমাকে সাহায্য করুন।

তিনি বললেন, আমি কি তোমাকে এমন কতক বাক্য শিখাব না যা আমাকে রাসুলুল্লাহ (সা) শিখিয়ে দিয়েছেন? যদি তোমার প্রতি উহুদ পাহাড় পরিমাণ ঋণও চেপে থাকে আল্লাহ তোমার পক্ষ থেকে তা পরিশোধ করে দিবেন। তুমি বলবে-

اللَّهُمَّ اكْفِنِي بِحَلَالِكَ عَنْ حَرَامِكَ، وَأَغْنِنِي بِفَضْلِكَ عَمَّنْ سِوَاكَ

হে আল্লাহ! আমাকে তোমার পক্ষ থেকে হালাল রিযিক দান করে হারাম রুজি থেকে রক্ষা করো এবং তোমার মেহেরবানীর সাহায্যে আমাকে তুমি ছাড়া অন্য সবার মুখাপেক্ষীতা থেকে রক্ষা করো।

হযরত ফাতিমা (রা)-কে শিখানো দুআ

ইমাম মুস্তাগফিরী হযরত আলী (রা) থেকে বর্ণনা করেন। একবার হযরত ফাতিমা (রা) রাসুলুল্লাহ (সা) এর খিদমতে হাযির হয়ে নিবেদন করেন, হে আল্লাহর রাসূল! ফেরেশতাদের আহার তো তাসবীহ-তাহলীল পাঠ করা।

কাজেই তাদের আহার-বিহারের প্রয়োজন হয় না। কিন্তু আমাদের তো পানাহারের প্রয়োজন রয়েছে। অতএব আমাদের পানাহারের ব্যবস্থা কিভাবে হবে?

রাসুলুল্লাহ (সা) বললেন, যিনি আমাকে সত্য দীনসহ রাসূল করে পাঠিয়েছেন। ৩০ দিন যাবত মুহাম্মদ (সা) এর ঘরে আগুন জ্বলেনি অর্থাৎ কোন কিছু রান্না হয়নি।

অবশ্য আমাদের নিকট কিছু বকরী এসেছে তুমি চাইলে তা থেকে পাঁচটি বকরী দিয়ে দেই। আর ইচ্ছা করলে তোমাকে এমন পাঁচটি কালিমা শিখিয়ে দেই, যা জিবরাইল (আ) আমাকে শিখিয়েছেন। তা হলো-

يَا أَوَّلَ الْأَوَّلِينَ، يَا آخِرَ الْآخِرِينَ، وَيَا ذَا الْقُوَّةِ الْمَتِينِ، وَيَا رَاحِمَ الْمَسَاكِينِ، وَيَا أَرْحَمَ الرَّاحِمِينَ

হে প্রথমদের সর্বপ্রথম! হে শেষদের সর্বশেষ! হে মহাশক্তিমান ও অসীম ক্ষমতার অধিকারী! হে মিসকীনদের প্রতি দয়ার্দ্র! হে পরম করুণাময় ও দয়াবান (আমাদের দারিদ্রতার প্রতি দয়া কর)।

রাসূলুল্লাহ (সা) রাতে বিছানায় শুয়ে যে দুআ পড়তেন

ইমাম আবু ইয়ালা হযরত আয়েশা (রা) থেকে বর্ণনা করেন। রাসূলুল্লাহ (সা) রাতে বিছানায় গিয়ে এই দুআ পড়তেন-

اللَّهُمَّ رَبَّ السَّمَوَاتِ السَّبْعِ، وَرَبَّ الْعَرْشِ الْعَظِيمِ، إِلَهَ آدَمَ وَرَبَّ كُلِّ شَيْءٍ مُنْزِلَ التَّوْرَاةِ وَالْإِنْجِيلِ وَالْفُرْقَانِ، فَالِقَ الْحَبِّ وَالنَّوَى، أَعُوذُ بِكَ مِنْ شَرِّ كُلِّ شَيْءٍ أَنْتَ آخِذٌ بِنَاصِيَتِهِ، اللَّهُمَّ أَنْتَ الْأَوَّلُ فَلَيْسَ قَبْلَكَ شَيْءٌ، وَأَنْتَ الْآخِرُ فَلَيْسَ بَعْدَكَ شَيْءٌ، وَأَنْتَ الظَّاهِرُ فَلَيْسَ فَوْقَكَ شَيْءٌ، وَأَنْتَ الْبَاطِنُ فَلَيْسَ دُونَكَ شَيْءٌ، اقْضِ عَنِّي الدَّيْنَ، وَأَغْنِنِي مِنَ الْفَقْرِ

হে আল্লাহ! হে সপ্ত আকাশের রব। মহান ‘আরশের রব। আদম (আ) এর রব ও প্রত্যেক বস্তুর রব! হে তাওরাত, ইনজীল ও কুরআন নাযিলকারী! হে শস্য-বীজ ও আঁটি বিদীর্ণকারী! আমি প্রত্যেক এমন বস্তুর অনিষ্ট থেকে আপনার নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করি, যার (মাথার) অগ্রভাগ আপনি ধরে রেখেছেন (নিয়ন্ত্রণ করছেন)।

হে আল্লাহ! আপনিই প্রথম, আপনার পূর্বে কিছুই ছিল না। আপনি সর্বশেষ, আপনার পরে কোনো কিছু থাকবে না। আপনি সব কিছুর উপরে, আপনার উপরে কিছুই নেই। আপনি সর্বনিকটে, আপনার চেয়ে নিকটবর্তী কিছু নেই। আপনি আমাদের সমস্ত ঋণ পরিশোধ করে দিন এবং আমাদেরকে অভাবগ্রস্ততা থেকে অভাবমুক্ত করুন।

শয়নকালে দুআ ও তাসবীহে ফাতেমী পাঠ করা

ইমাম তাবরানী কাবীরে উত্তম সনদে সাহাবী কাইলাতাহ বিনতে মাখরামাহ (রা) থেকে বর্ণনা করেন। তিনি এশার পর বিছানায় শায়িত হয়ে নিম্নের দুআ পাঠ করতেন-

আমি আল্লাহ তাআলার নিকট তার পরিপূর্ণ কালিমার আশ্রয় প্রার্থনা করছি যা থেকে কোন ভাল মন্দ বেঁচে যেতে পারে না- আসমান থেকে অবতরণকারী ও আসমানে উড্ডয়নকারীর ক্ষতি হতে। যমীনের ভিতর জন্ম গ্রহণকারী ও যমীন ফেটে বহির্গমনকারীর ক্ষতি হতে। দিবসের ফিতনার অনিষ্ট থেকে এবং রাতের আগত ঘটনাবলীর অনিষ্ট থেকে তবে মঙ্গলময় ঘটনাবলী ব্যতীত।

আমি আল্লাহর উপর ইমান এনেছি। আল্লাহর আশ্রয় গ্রহণ করেছি। সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর, যার ইযযতের সামনে সবকিছু অপদস্থ। সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর যার মাহাত্ম্যের সামনে সবকিছু অবনত। সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর যার রাজ্যের সামনে সবকিছু পরাজিত ও অক্ষম।

আমি আপনার নিকট প্রার্থনা করি আপনার আরশের ইযযতের মাধ্যমে, আপনার কিতাবের চূড়ান্ত রহমতের মাধ্যমে। আপনার উচ্চ শানের মাধ্যমে এবং আপনার পরিপূর্ণ কালিমা সমূহের মাধ্যমে যা কোন সৎ ও অসৎ ব্যক্তি অতিক্রম করতে পারে না।

আপনি আমাদের প্রতি এমন রহমতের দৃষ্টি প্রদান করুন, যা আমাদের কোন গুনাহই ক্ষমা না করে, কোন অভাব দূর না করে, কোন শত্রুই ধ্বংস না হয়ে, কোন বিবস্ত্রকে পোষাক না পড়িয়ে, কোন ঋণগ্রস্থের ঋণ আদায় না করে এবং দীন ও দুনিয়ার কল্যাণ আছে এমন কোন বিষয়ই দান না করে ছাড়ে না। হে দয়াময় ও দয়ালু। আমি আপনার উপর ঈমান এনেছি এবং আপনার উপর ভরসা করেছি।

এরপর তিনি ৩৩ বার সুবহানাল্লাহ, ৩৪ বার আল্লাহু আকবার এবং ৩৩ বার আলহামদুলিল্লাহ পাঠ করতেন এবং বলতেন- একবার রাসুলুল্লাহ (সা) এর কন্যা হযরত ফাতিমা (রা) তার কাছে একজন খাদেম চাইলে তিনি বললেন, আমি তোমাকে এমন কিছু বলে দিব কি, যা খাদেমের চেয়েও উত্তম। তিনি আরয করলেন, অবশ্যই বলে দিন। তখন তিনি এই তাসবীহগুলো ইশার পর পড়ার কথা বললেন।

স্রষ্টাকে ছেড়ে সৃষ্টির সাথে আশা জুড়ে দেয়ার ফল

ইবনে আসাকীর তার ইতিহাস গ্রন্থে হিশাম ইবনে মুহাম্মদ থেকে বর্ণনা করেন। একবার হযরত হাসান ইবনে আলী (রা) অভাব ও সংকটে পড়লেন। তার জন্য হযরত আমির মুয়াবিয়া (রা) পক্ষ থেকে বাৎসরিক এক লক্ষ দিরহাম নির্ধারণ ছিল।

এক বৎসর তা না আসায় এ কারণে তিনি বেশ কঠিন সংকটের মধ্যে পড়ে গেলেন। অতঃপর নিরুপায় হয়ে আমির মুয়াবিয়াকে স্মরণ করিয়ে দেয়ার জন্য দোয়াত ও কলম হাতে নিলেন। কিন্তু পরে বিরত রইলেন, আর লিখলেন না।

সে রাতেই তিনি তার নানা নবী কারীম (সা)-কে স্বপ্নে দেখলেন। রাসুলুল্লাহ (সা) তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, তোমার কি খবর? তিনি বললেন, ভালো ইয়া রাসূলাল্লাহ! এরপর তার সংকটের কথা জানালেন।

অতঃপর নবী (সা) বললেন-

يَا بُنَيَّ هَكَذَا مَنْ رَجَا الْخَالِقَ وَلَمْ يَرْجُ الْمَخْلُوقَ
হে বৎস! স্রষ্টাকে ছেড়ে যে সৃষ্টির সাথে নিজের আশা-আকাঙ্ক্ষাকে মিলিত করে তার এই অবস্থাই হয়।

ফায়দা

মানুষের উচিত সর্বাবস্থায় আল্লাহর উপর ভরসা কাট ও তার সাথে আশয় বাসনা সম্পৃক্ত রাখা।

দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ
রিযিক বৃদ্ধির আমল ও কর্ম

আত্মীয়তা সম্পর্ক রক্ষা করা

ইমাম বুখারী হযরত আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণনা করেন। রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেন-

مَنْ سَرَّهُ أَنْ يُبْسَطَ لَهُ فِي رِزْقِهِ، وَأَنْ يُنْسَأَ لَهُ فِي أَجَلِهِ ، فَلْيَصِلْ رَحِمَهُ

যে লোক তার রিযিক প্রশস্ত করতে এবং আয়ু বৃদ্ধি করতে চায়, সে যেন তার আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করে।

ফায়দা

আত্মীয়তা সম্পর্ক রক্ষার উদ্দেশ্য হলো আত্মীয়-স্বজনদের খোঁজ-খবর নেয়া, সাহায্য সহযোগিতা ও সেবা-শুশ্রূষা করা।

খাওয়ার আগে পরে হাত ধৌত করা

ইমাম ইবনে মাজাহ হযরত আনাস (রা) থেকে বর্ণনা করেন। রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেন-

مَنْ أَحَبَّ أَنْ يُكْثِرَ اللهُ عَلَيْهِ رِزْقَهُ، فَلْيَتَوَضَّأْ إِذَا حَضَرَ غَدَاؤُهُ، وَإِذَا رُفِعَ

যে ব্যক্তি এটা পছন্দ করে যে, আল্লাহ তার রিযিক বৃদ্ধি করে দিবেন, তবে সে যেন খাবার আগে-পরে ওযু করে নেয়।

ওযুর দ্বারা উদ্দেশ্য দুই হাত ধৌত করা।

গুরুত্ব সহকারে নামায আদায় করা

ইমাম আব্দুর রাজ্জাক তার মুসান্নাফে জনৈক কুরায়শী ব্যক্তি থেকে বর্ণনা করেন। রাসূলুল্লাহ (সা) এর নিকট কেউ কাঠিন্য ও সংকীর্ণতার অভিযোগ করলে তিনি তার পরিবারের লোকদের নামায পড়ার তাকীদ করতেন। অতঃপর তিনি এই আয়াত তিলাওয়াত করতেন-

وَأْمُرْ أَهْلَكَ بِالصَّلَاةِ وَاصْطَبِرْ عَلَيْهَا لَا نَسْأَلُكَ رِزْقًا نَحْنُ نَرْزُقُكَ وَالْعَاقِبَةُ لِلتَّقْوَى
তুমি তোমার পরিবারের লোকদেরকে নামাযের নির্দেশ দাও এবং নিজেও এর উপর অবিচল থাক। আমি তোমার কাছে কোন রিযিক চাই না, আমিই তোমাকে রিযিক দান করি। শুভ পরিণাম তো মুত্তাকীদের জন্য।-(সূরা ত্বাহা:১৩২)

পরিবার-পরিজনকে নামাযের তাকীদ করা

সাঈদ ইবনে মানসূর তার সুনানে, ইবনুল মুনযির তার তাফসীরে হযরত হামযাহ ইবনে আব্দুল্লাহ বিন সালাম (রা) থেকে বর্ণনা করেন-

كَانَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِذَا نَزَلَتْ بِأَهْلِهِ شِدَّةٌ أَوْ ضِيقٌ أَمَرَهُمْ بِالصَّلَاةِ وَتَلَا
{وَأْمُرْ أَهْلَكَ بِالصَّلَاةِ} الْآيَةَ
নবী কারীম (সা) পরিবার-পরিজনদের উপর যখনই কোন সংকীর্ণতা অথবা জটিলতা দেখা দিত, তিনি তাদেরকে অধিক পরিমাণে নামায পড়ার তাকীদ করতেন এবং উক্ত আয়াত তিলাওয়াত করতেন।

ফায়দা

সমস্যা সংকটে বেশি বেশি সালাত আদায় করা নবী ও নেককারদের আমল।

যে কোন সংকটে নামাযকে আঁকড়ে ধরা

ইমাম আহমদ কিতাবুয যুহদে এবং ইমাম ইবনে আবি হাতিম তার তাফসীরে হযরত সাবিত (রা) থেকে বর্ণনা করেন- নবী (সা) যখন সংকীর্ণতার সম্মুখীন হতেন, তখন তিনি বলতেন,

يَا أَهْلَاهُ صَلُّوْا، صَلُّوْا
হে আমার পরিবারবর্গ! তোমরা নামায পড় এবং নামাযকে প্রতিষ্ঠিত রাখ।

হযরত সাবিত (রা) আরো বলেন-

وَكَانَتِ الْأَنْبِيَاءُ إِذَا نَزَلَ بِهِمْ أَمْرٌ فَزِعُوا إِلَى الصَّلَاةِ
সমস্ত নবীরই এই নীতি ছিল যে, কোন কারণে তারা হতবুদ্ধি হয়ে পড়লেই নামায শুরু করে দিতেন।

তাকওয়া অবলম্বন করা

ইমাম তাবরানী ও মিরদুহ ইয়া হযরত মুয়ায (রা) থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সা) কে বলতে শুনেছি-

يَا أَيُّهَا النَّاسُ اتَّخِذُوا تَقْوَى اللهِ تِجَارَةً يَأْتِكُمُ الرِّزْقُ بِلَا بِضَاعَةٍ وَلَا تِجَارَةٍ
হে লোক সকল! তোমরা তাকওয়াকে ব্যবসারূপে গ্রহণ করে নাও, তাহলে তোমরা ব্যবসা ও পুঁজি ছাড়াই রিযিক পাবে।

তারপর তিনি তিলাওয়াত করেন-

وَمَنْ يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَلْ لَهُ مَخْرَجًا وَيَرْزُقْهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ
আর যে আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য পথ করে দেবেন এবং তার ধারণাতীত স্থান থেকে রিযিক দান করবেন।–(সূরা তালাক:২-৩)

ফায়দা

অর্থাৎ কেউ যদি এই একটা বিষয়ের উপর আমল করে তবে তাই যথেষ্ট হবে।

সবার সব সমস্যা সমাধানে যা যথেষ্ট

ইমাম আহমাদ (তার মুসনাদে), হাকীম তার সহীহতে এবং বায়হাকী শুআবুল ঈমানে হযরত আবু যার (রা) থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, একবার রাসূলুল্লাহ (সা) এই আয়াত তিলাওয়াত করেন-

وَمَنْ يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَلْ لَهُ مَخْرَجًا وَيَرْزُقْهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ
আর যে আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য (সব সংকট থেকে উত্তরণের) পথ করে দেবেন এবং তার ধারণাতীত স্থান থেকে রিযিক দান করবেন।–সূরা তালাক:২-৩

তারপর বলেন-
يَا أَبَا ذَرٍّ، لَوْ أَنَّ النَّاسَ أَخَذُوا بِهَا لَكَفَتْهُمْ
হে আবু যার! সকল মানুষ যদি এই আয়াতের উপর আমল করত, তবে সবার জন্য তা যথেষ্ট হয়ে যেত।

যে কারণে মানুষ রিযিক থেকে বঞ্চিত হয়

ইমাম আহমাদ, নাসাঈ, ইবনে মাজাহ হযরত সাওবান (রা) থেকে বর্ণনা করেন। রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেন-

إِنَّ الرَّجُلَ لَيُحْرَمُ الرِّزْقَ بِالذَّنْبِ يُصِيبُهُ
নিশ্চয়ই মানুষ তার গুনাহের কারণে রিযিক থেকে বঞ্চিত হয়ে যায়।

ফায়দা

রিযিকের প্রশস্ততা ও জীবনে স্বাচ্ছন্দ্য আনতে অবশ্যই সকল গুনাহ থেকে বিরত হতে হবে।

যখন আল্লাহ সব কাজের যিম্মাদার হয়ে যান

ইমাম ইবনে আবী হাতিম তার তাফসীরে হযরত ইমরান ইবনে হুসাইন (রা) থেকে বর্ণনা করেন। রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেন-

مَنِ انْقَطَعَ إِلَى اللَّهِ كَفَاهُ اللَّهُ كُلَّ مُؤْنَةٍ وَرَزَقَهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ، وَمَنِ انْقَطَعَ إِلَى الدُّنْيَا وَكَلَهُ اللَّهُ إِلَيْهَا
যে ব্যক্তি সব দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে শুধুমাত্র আল্লাহর দিকে রুজু হয়, আল্লাহ তাআলা তার সকল কাজের যিম্মাদার হয়ে যান এবং তাকে এমন স্থান থেকে রিযিক দান করেন, যার কল্পনাও সে করে না। আর যে ব্যক্তি শুধু দুনিয়ার দিকে নিবিষ্ট হয়, আল্লাহ তাকে তার হাতেই সোপর্দ করেন।

ফায়দা

অতএব সর্বাবস্থায় আল্লাহর দিকে রুজু হওয়াই ইমানদারের প্রকৃত সফলতা।

উপসংহার

রিযিকের মালিক একমাত্র মহান আল্লাহ। তাই রিযিক বৃদ্ধি ও তাতে বরকত লাভের জন্য তাঁরই নির্দেশিত পথে চলা এবং কুরআন-সুন্নাহর আলোকে আমল করা একজন মুমিনের প্রধান কর্তব্য। (রহ.)-এর সংকলিত আমলগুলো আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, ইস্তিগফার, তাকওয়া, দোয়া, আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা, সদকা এবং হালাল উপার্জনের চেষ্টা—এসবই রিযিক বৃদ্ধি ও বরকতের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।

তবে মনে রাখতে হবে, প্রকৃত সফলতা শুধু অধিক সম্পদ অর্জনে নয়; বরং হালাল, পবিত্র ও বরকতময় রিযিক লাভে। আল্লাহ তাআলা যেন আমাদের সবাইকে কুরআন ও সহিহ সুন্নাহ অনুযায়ী আমল করার তাওফিক দান করেন, আমাদের রিযিকে বরকত দান করেন এবং দুনিয়া ও আখিরাতে কল্যাণ দান করেন। আমীন।

🔹🔹🔹

👉 আরও পড়ুন লা হাওলার ফযীলত ও হাদীসসমূহ

আরও পোস্ট

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Back to top button
error: Content is protected !!