
তাওয়াককুল ইমানের গুরুত্বপূর্ণ শাখা – তাওয়াককুল বা আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসা ঈমানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শাখা। একজন মুমিন বৈধ উপায়ে সর্বোচ্চ চেষ্টা করার পর ফলাফলের ব্যাপারে সম্পূর্ণরূপে আল্লাহ তাআলার ওপর নির্ভর করে।
কুরআন ও হাদিসে তাওয়াককুলের মর্যাদা, ফজিলত এবং এর বাস্তব শিক্ষা বারবার তুলে ধরা হয়েছে।
ইমাম বায়হাকী (রহ) প্রণীত শুআবুল ঈমান গ্রন্থে ঈমানের ১৩তম শাখা হিসেবে তাওয়াক্কুল বিল্লাহ আলোচনা করা হয়েছে। এ অধ্যায়ে তাওয়াককুলের প্রকৃত অর্থ, এর গুরুত্ব এবং সংশ্লিষ্ট হাদিসসমূহ থেকে প্রাপ্ত শিক্ষা সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো।
ইমাম বায়হাকী (রহ) প্রণীত ‘শুআবুল ইমান’ গ্রন্থের ইমান এর ১৩তম শাখাঃ ‘তাওয়াক্কুল বিল্লাহ-আল্লাহর উপর ভরসা করা’ থেকে সংকলিত
অনুবাদ ও সংকলন: মারূফ আর রুসাফী
আমাদের অনুবাদ ও প্রকাশনা – দারুস সাআদাত
তাওয়াককুল বিল্লাহ
তাওয়াক্কুল বিষয়ে আল্লাহ তাআলার বাণী
إِنْ يَنْصُرْكُمُ اللَّهُ فَلَا غَالِبَ لَكُمْ وَإِنْ يَخْذُلْكُمْ فَمَنْ ذَا الَّذِي يَنْصُرُكُمْ مِنْ بَعْدِهِ وَعَلَى اللَّهِ فَلْيَتَوَكَّلِ الْمُؤْمِنُونَ
যদি আল্লাহ তোমাদের সাহায্য করেন, তবে কেউই তোমাদের উপর প্রবল হতে পারবে না। আর যদি তিনি সাহায্য না করেন, তবে এমন কে আছে, যে তোমাদেরকে সাহায্য করবে? আর আল্লাহর উপরই মুসলমানদের ভরসা করা উচিত।- সূরা আলে ইমরান: ১৬০
إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ الَّذِينَ إِذَا ذُكِرَ اللَّهُ وَجِلَتْ قُلُوبُهُمْ وَإِذَا تُلِيَتْ عَلَيْهِمْ آيَاتُهُ زَادَتْهُمْ إِيمَانًا وَعَلَىٰ رَبِّهِمْ يَتَوَكَّلُونَ
নিশ্চয়ই মুমিনরা এরূপ হয় যে, যখন (তাদের সামনে) আল্লাহকে স্মরণ করা হয়, তখন তাদের অন্তরসমূহ ভীত হয়ে পড়ে। আর যখন তাদের সামনে তার আয়াতসমূহ পাঠ করা হয় তখন তাদের ইমান আরো বেড়ে যায়। আর তারা তাদের প্রতিপালকের উপর নির্ভর করে।- সূরা আনফাল: ২
وَمَنْ يَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ فَهُوَ حَسْبُهُ
আর যে ব্যক্তি আল্লাহর উপর ভরসা করে তার জন্য তিনিই যথেষ্ট। [সূরা তালাক: ৩]
এই আয়াতগুলো ব্যতীত আরো অনেক আয়াত রয়েছে, যার মধ্যে আল্লাহর উপর ভরসা করার কথা উল্লেখ হয়েছে।
তাওয়াককুলের সারকথা
ইমাম বায়হাকী (রহ) বলেন- তাওয়াক্কুলের সারকথা হলো-
تَفْوِيضُ الْأَمْرِ إِلَى اللَّهِ جَلَّ ثَنَاؤُهُ وَ الثِّقَةُ بِهِ
নিজের সব বিষয় আল্লাহর উপর সোপর্দ করা এবং তার প্রতি আস্থা ও ভরসা রাখা।
যে আল্লাহর প্রতি তাওয়াক্কুলকারী নয়
হযরত মুগীরাহ ইবনে শুবা তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন- রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেন-
لَمْ يَتَوَكَّلْ مَنِ اسْتَرْقَى أَوْ اكْتَوَى
যে দাগ দিল অথবা জাদুমন্ত্র (অবৈধ ঝাড়ফুঁক) করল। সে (আল্লাহর প্রতি) তাওয়াক্কুলকারী নয়।
এ বিষয়ে ইমাম আহমদ (রহ) এর উক্তি
ইমাম আহমদ (রহ) বলেন- এটা এজন্য যে, সে এমন ব্যবস্থা অবলম্বন করেছে, যা থেকে বাঁচা উত্তম। একারণে যে, এর মধ্যে ক্ষতি ও ভয় রয়েছে। আর ঝাড়ফুক এর কথা এজন্য উল্লেখ করা হয়েছে যে, তা আল্লাহর কালাম থেকে থেকে নেওয়া হয়েছে কিনা তা জানা যায়নি অথবা এজন্য যে, এর মধ্যে শিরক এর সংমিশ্রণ রয়েছে।
অশুভ লক্ষণ
হযরত ইবনে মাসউদ (রা) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেন, অশুভ লক্ষণ ধরা শিরক। আর আমাদের মধ্যে কেউই তা থেকে (মনের অজান্তেই এমন চিন্তা আসা থেকে) বাঁচতে পারে না। তবে আল্লাহ তাআলা তাওয়াক্কুলের (আল্লাহর উপর ভরসা) দ্বারা তা দূর করে দেন।
ব্যাখ্যা
ইমাম আহমদ (রহ) বলেন, অশুভ লক্ষণ ধরা শিরক এই প্রেক্ষিতে, যার উপর জাহিলিয়াতের লোকজন বিশ্বাস রাখত। আর এর অর্থ এই যে, প্রত্যেকের মনে অশুভ লক্ষণের ব্যাপারে কিছু না কিছু খটকা দেখা দেয় যা সাধারণ রীতি।
কিন্তু এর প্রতি আমাদের মন স্থির ও অটুট হওয়া যাবে না, বরং আমরা আমাদের বিশ্বাসকে ঠিক করে নেব। কেননা আল্লাহ ব্যতীত ভাল মন্দের কেউ মালিক নয়।
অতএব প্রত্যেক ঐ বান্দা যার মনে অশুভ লক্ষণ খটকা সৃষ্টি করে সে আল্লাহর কাছে কল্যাণ প্রার্থনা করবে, অকল্যাণ থেকে আশ্রয় চাইবে এবং নিজের কাজ ও ইচ্ছায় আল্লাহর উপর ভরসা করবে।
শুভ লক্ষণ ধরা
হযরত আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী (সা) বলেছেন, অশুভ লক্ষণ বলে কিছু নেই, শুভ লক্ষণই উত্তম। জিজ্ঞেস করা হলো ইয়া রাসূলুল্লাহ! শুভ লক্ষণ কী? তিনি বললেন– ভালো কথা, যা তোমাদের কেউ শুনে থাকে।
হযরত আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) এক ব্যক্তির নিকট থেকে একটি বাক্য শুনলেন, যা তাঁর পছন্দ হলো। তখন তিনি তাকে বললেন– তোমার মুখ থেকে বের হওয়া কথার দ্বারা আমি শুভ লক্ষণ গ্রহণ করলাম।
ফায়দা
ইসলামে অশুভ লক্ষণ বা কুসংস্কারে বিশ্বাস করা নিষিদ্ধ। কোনো ব্যক্তি, বস্তু, দিন বা ঘটনাকে অশুভ মনে করা ঠিক নয়। তবে ভালো কথা বা আশাব্যঞ্জক শব্দ শুনে আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে ভালো আশা করা (ফাল) প্রশংসনীয়। এতে মানুষের মনে আশা ও ইতিবাচক মনোভাব সৃষ্টি হয়, কিন্তু প্রকৃত কল্যাণ ও অকল্যাণ একমাত্র আল্লাহর ইচ্ছাতেই ঘটে।
অশুভ লক্ষণের খটকা হলে যে দুআ পড়বে
হযরত উরওয়া ইবনে আমির (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) এর নিকট অশুভ লক্ষণ ধরা প্রসঙ্গে আলোচনা উঠলে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন– যখন কোন বিষয়ের অশুভ লক্ষণ তোমার সামনে আসে, যা তুমি পছন্দ কর না, তখন তুমি বলো-
اللَّهُمَّ لَا يَأْتِي بِالْحَسَنَاتِ إِلَّا أَنْتَ، وَلَا يَدْفَعُ السَّيِّئَاتِ إِلَّا أَنْتَ، وَلَا حَوْلَ وَلَا قُوَّةَ إِلَّا بِكَ
হে আল্লাহ! কল্যাণ তুমিই আনয়ন করো এবং অকল্যাণকে তুমিই দফা (দূর) করো। মন্দ থেকে বাঁচার এবং নেককাজ করার শক্তি তোমার পক্ষ থেকেই।
ফায়দা
এই হাদিসে রাসূলুল্লাহ (সা) শিক্ষা দিয়েছেন যে, কোনো বিষয়কে অশুভ লক্ষণ মনে করে হতাশ বা ভীত হওয়া উচিত নয়। যদি এমন অনুভূতি আসে, তাহলে আল্লাহর কাছে দোয়া করতে হবে এবং বিশ্বাস রাখতে হবে যে কল্যাণ ও অকল্যাণের মালিক একমাত্র আল্লাহ। তাঁরই সাহায্যে মানুষ মন্দ থেকে বাঁচতে এবং ভালো কাজ করতে সক্ষম হয়।
মানুষের তিনটি দোষ এবং তা থেকে বাঁচার উপায়
হযরত আবু হুরায়রা (রা) বর্ণনা করেন। রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেন- মানুষের মধ্যে তিনটি দোষ আছে- অশুভ লক্ষণ ধরা, কুধারণা করা এবং হিংসা করা। অতএব অশুভ লক্ষণ থেকে মুক্তির উপায় হলো (অশুভ লক্ষণ মনে করেও) কাজ থেকে বিরত না থাকা। কুধারণা থেকে বাঁচার উপায় হলো কারো দুর্বলতা অনুসন্ধান না করা। আর হিংসা থেকে বাঁচার উপায় হলো দোষ অনুসন্ধান না করা।
অশুভ লক্ষণ সত্ত্বেও কাজ জারী রাখা
হযরত ইবনে আব্বাস (রা) বলেন- যদি তুমি (অশুভ লক্ষণ দেখে) নিজের ইচ্ছা ও কাজ জারি রাখ তবে তুমি আল্লাহর উপর ভরসাকারী। আর যদি তুমি প্রত্যাবর্তনকারী হও তবে তুমি অশুভ লক্ষণধারী বলে বিবেচিত হবে।
ফায়দা
অর্থাৎ অশুভ লক্ষঙ দেখা দিলে কাজ বন্ধ না করে আল্লাহর উপর ভরসা করে কাজ করে যাওয়াই ইমানের দাবি। আর অশুভ লক্ষণ ধরে কাজ বন্ধ করে দেয়া হলো শয়তানের ওয়াসওয়াসা।
যে আল্লাহর প্রকৃত বান্দা
হযরত কাব (রা) আল্লাহর উক্তি বর্ণনা করেন-
ليس من عبادي من سحر أو سحر له أو كهن أو كهن له أو تطير أو تطير له لكن من عبادي من آمن و توكل علي
ঐ ব্যক্তি আমার বান্দাদের মধ্যে নয়, যে যাদু করে ও করায় অথবা গায়েবের খবর দেয় অথবা গায়েবের খবর জিজ্ঞাসা করে অথবা ফাল ধরে ও ধরায়। তবে আমার বান্দাদের মধ্যে সে আমার বান্দা, যে আমার প্রতি ঈমান আনে এবং আমার উপরই ভরসা করে।
জান্নাতের সিড়ি যে দেখতে পাবে না
হযরত আবু দারদা (রা) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেন- যে ব্যক্তি গায়েবের সংবাদ দেয় অথবা ভাগ্যনির্ধারক তীর ছোঁড়ে অথবা অশুভ লক্ষণ ধরে। আর এই অশুভ লক্ষণ ধরে তার সফরে (বা কোথাও) যাওয়া থেকে ফিরে আসে, তবে ঐ ব্যক্তি কিয়ামতের দিন জান্নাতের সিঁড়িসমূহও দেখতে পাবে না।
ফায়দা
মানুষের উচিত ভাগ্য গণনা, গায়েবের দাবি এবং অশুভ লক্ষণের মতো কুসংস্কার থেকে নিজেকে দূরে রাখা। প্রকৃত মুমিন সব বিষয়ে আল্লাহর ওপর ভরসা করে এবং কুসংস্কারের কারণে কোনো সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে না।
নিশ্চিন্ত রিযিক যার জন্য
হযরত উমর (রা) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সা) কে বলতে শুনেছি-
لو توكلت على الله حق توكله لرزقت كما يرزق الطير تغدوا خماصا و تروح بطانا
যদি তোমরা আল্লাহর উপর এমনভাবে ভরসা করতে, যেমনভাবে ভরসা করা দরকার। তাহলে তিনি তোমাদেরকে এমনভাবে রিযিক দিতেন যেমন দিয়ে থাকেন পাখিদেরকে। ওরা সকালে খালি পেটে বেরিয়ে যায় এবং সন্ধ্যায় পেট ভর্তি করে ফিরে আসে।
জীবিকা উপার্জনের প্রমাণ
ইমাম আহমদ (রহ) বলেন- এই হাদীস একথার প্রমাণ করে না যে, জীবিকা উপার্জন ছেড়ে দিয়ে বসে যাবে, বরং এ হাদীস জীবিকা অন্বেষণ করার প্রমাণ। এজন্য যে, পাখিদের দৃষ্টান্ত পেশ করা হয়েছে যে, তারা অকর্মণ্য হয়ে ঘরে বসে থাকে না বরং তারা সকাল হতেই রিযিকের সন্ধানে ঘর থেকে বেরিয়ে যায়।
সুতরাং রাসুলুল্লাহ (সা) এর কথার উদ্দেশ্য এই যে, রিযিক অন্বেষণে যেতে-আসতে, কাজ করতে যেন আল্লাহর উপর ভরসা করা হয় এবং মনে করা হয় যে, আল্লাহই সকল কল্যাণের মালিক এবং কল্যাণ তার পক্ষ থেকেই।
অতএব যখন সে ঘরে ফিরে আসবে তখন সহিহ সালামাতে ফিরে আসবে এবং অর্থ-সম্পদ উপার্জন করে ফিরে আসবে যেমন পাখিরা সকালে খালি পেটে যায় এবং সন্ধ্যায় ভরা পেটে ফিরে আসে।
কিন্তু মানুষ বের হয়ে নিজের শক্তি-সামর্থ্যের উপর ভরসা করে এবং বাজারে গিয়ে মিথ্যা, খিয়ানত ইত্যাদি কাজ করে এবং পারস্পরিক কল্যাণ কামনা করে না। এসবকিছু তাওয়াক্কুলের খিলাফ।
রিযিক ভোগ ব্যতীত কোন প্রাণী মৃত্যুবরণ করবে না
হযরত মুত্তালিব বিন খতীব থেকে বর্ণিত হাদীসে রাসুলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেন— আমি এমন কিছু বাদ রাখিনি, যে ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা তোমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন আর আমি দেইনি।
আর আমি এমন কিছু বাদ রাখিনি যে ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা তোমাদেরকে নিষেধ করেছেন, আর আমি নিষেধ করিনি।
আর জিবরাঈল আমীন আমার অন্তরে এ কথাটি ফুঁকে দিয়েছেন যে, কখনোই কোন প্রাণী ঐ সময় পর্যন্ত মৃত্যুবরণ করবে না, যে পর্যন্ত সে তার রিযিক পূর্ণ করে না নিবে।
সুতরাং রিযিক অন্বেষণে তোমরা মধ্যম পন্থা অবলম্বন করো।
রিযিক প্রশস্ত
হযরত জাবের ইবনে আব্দুল্লাহ (রা) থেকে বর্ণিত। রাসুলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেন-
لَا تَسْتَبْطِئُوا الرِّزْقَ فَإِنَّهُ لَمْ يَكُنْ عَبْدٌ يَمُوتُ حَتَّى يَبْلُغَهُ آخِرُ رِزْقٍ هُوَ لَهُ فَاتَّقُوا اللَّهَ وَ أَجْمِلُوا فِي الطَّلَبِ مِنَ الْحَلَالِ وَ تَرْكِ الْحَرَامِ
রিযিককে সংকীর্ণ মনে করো না। এজন্য যে, কোন বান্দা ঐ সময় পর্যন্ত মৃত্যুবরণ করবে না যে পর্যন্ত সে তার রিযিকের শেষ লোকমা পর্যন্ত পৌঁছে না যাবে। সুতরাং আল্লাহকে ভয় করো এবং রিযিক অন্বেষণে উত্তম পদ্ধতি অবলম্বন করো। অর্থাৎ হালালকে অন্বেষণ করো এবং হারামকে ছেড়ে দাও।
হাদীসটির ব্যাখ্যা
(ইমাম বায়হাকী বলেন-) এই হাদীসে একথার প্রমাণ রয়েছে যে, রাসুলুল্লাহ (সা) রিযিক অন্বেষণের নির্দেশ দিয়েছেন, তবে রিযিক অন্বেষণে উত্তম ও সুন্দর পদ্ধতি অবলম্বন করতে বলেছেন। আর উত্তম ও সুন্দর পদ্ধতি হলো এই যে, আল্লাহর উপর ভরসা করে হালাল রিযিক অন্বেষণ করবে, হারাম পদ্ধতিতে অন্বেষণ করবে না।
আর রিযিক অন্বেষণে না নিজের শক্তি-সামর্থ্যের প্রতি ভরসা করবে, না নিজের কৌশল ও তদবীরের প্রতি ভরসা করবে, বরং আল্লাহর প্রতি ভরসা করবে।
বেশী চিন্তা-ভাবনা না করা
বেশী চিন্তা ভাবনা না করা
হযরত খালেদ বিন রাফে থেকে বর্ণিত। রাসুলুল্লাহ (সা) হযরত ইবনে মাসউদ (রা) কে বলেন-
لَا تُكْثِرْ هَمَّكَ مَا يُقْدَرْ يَكُنْ وَ مَا تُرْزَقْ يَأْتِكَ
তুমি বেশি চিন্তা-ভাবনা করো না। যা কিছু তাকদীরে নির্ধারণ করা হয়েছে তা বাস্তবায়িত হবেই। আর যে রিযিক তোমার ভাগ্যে রয়েছে তা আসবেই।
ব্যাখ্যা
ইমাম আহমদ (রহ) বলেন, যদি এই রিওয়ায়াত সহীহ হয় তবে রিযিক অন্বেষণে নিষেধ করা হয়নি বরং এ ব্যাপারে দুঃখ দুশ্চিন্তা করতে নিষেধ করা হয়েছে। কেননা এটা খুব লোভীদের অভ্যাস যে, তারা সর্বাত্মক চেষ্টা পরিশ্রম করার পরও পেরেশান ও অস্থির হয়ে থাকে এবং ভয় পায় যে, যা কিছু আছে তা আবার শেষ হয়ে যায় কি না। আর যা কাছে নাই তা আসার ব্যাপারে কোন কিছু প্রতিবন্ধক হয়ে যায় কি না। আর এই সবকিছু তাওয়াক্কুলের পরিপন্থী।
মানুষের রিযিক কোনভাবে পৌঁছে যায়
হযরত ইবনে উমর (রা) থেকে বর্ণিত। এক ভিক্ষুক রাসূলুল্লাহ (সা) এর কাছে কিছু চাইল। (তখন সে) দেখল যে, একটু খেঁজুর পড়ে আছে এবং সে তা উঠাতে লাগল, রাসূলুল্লাহ (সা) তখন বললেন- জেনে রাখ! যদি তুমি এর কাছে নাও আসতে, তথাপি এটা তোমার কাছে নিজে নিজেই চলে আসত।
ফায়দা
নির্ধারিত রিযিক অবশ্যই মানুষের কাছে পৌঁছবে। তাই রিযিকের জন্য অস্থিরতা, লোভ বা হারাম উপায় অবলম্বন না করে হালাল চেষ্টা ও আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসা রাখা উচিত।
রিযিক মানুষকে যেভাবে খুঁজে ফেরে
হযরত আবু দারদা (রা) থেকে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেন,
إِنَّ الرِّزْقَ يَطْلُبُ الْعَبْدَ كَمَا يَطْلُبُهُ أَجَلُهُ
নিশ্চয়ই রিযিক মানুষকে ঠিক তেমনিভাবে খুঁজে ফেরে যেমনটি তার মৃত্যু তাকে খুঁজে ফিরতে থাকে।
অপর বর্ণনায় আছে, হযরত আবু দারদা (রা) বলেন-
لو أن رجلا هرب من رزقه كهربه من الموت لأدركه رزقه كما يدركه الموت
যদি কোন ব্যক্তি তার রিযিক থেকে এভাবে পালায়, যেভাবে নিজের মৃত্যু থেকে পালায় তবে তার রিযিক তাকে এভাবে পেয়ে যাবে, যেভাবে তার মৃত্যু তাকে পেয়ে যাবে।
মানুষের তাকদীর এমনকি প্রতিটি পদক্ষেপ নির্ধারিত
হযরত উমর (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, প্রত্যেক মানুষের পায়ের কদমের চিহ্ন নির্ধারিত (রয়েছে) যেথায় যেথায় সে কদম রাখবে। তার রিযিক নির্ধারিত যা সে খাবে। তার জীবনের সীমা নির্ধারিত, যে পর্যন্ত সে পৌঁছবে এবং তার (এমন) কোন বিদ্বেষী (যদি থাকে) যে তাকে হত্যা করবে (তাও নির্ধারিত)।
এমনকি যদি কোন ব্যক্তি তার রিযিক না নিয়ে পালাতে থাকে, তবে তার রিযিক তার পিছু নেবে এবং তাকে পেয়ে যাবে। যেমনিভাবে সে তার মৃত্যু থেকে পালাতে থাকে অবশেষে তার মৃত্যু তাকে পেয়ে যায়। (অতএব) সাবধান!
فاتقوا الله و أجملوا في الطلب
আল্লাহকে ভয় কর এবং রিযিক অন্বেষণে উত্তম পন্থা অবলম্বন কর।
ফায়দা
রিযিক যেহেতু আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত, তাই হারাম বা অন্যায় পথে নয়; বরং তাকওয়া অবলম্বন করে হালাল উপায়ে চেষ্টা করা এবং সর্বাবস্থায় আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসা রাখাই একজন মুমিনের কর্তব্য।
ব্যাপক উপদেশ
হযরত আলী ইবনে আবী তালিব (রা) থেকে বর্ণিত হাদীসে নবী (সা) ইরশাদ করেন- নেকী আর ইহসান (অনুগ্রহ) করা দীনদার সত্যিকার ভদ্র লোকদের দ্বারাই হয়ে থাকে। আর দুর্বলদের জিহাদ হলো হজ করা। মহিলাদের জিহাদ হলো নিজের স্বামীর খিদমত করা।
পারস্পরিক মিল-মহব্বত অর্ধেক দীন। যে ব্যক্তি মধ্যম পন্থা অবলম্বন করে, সে কখনো অভাবী হয় না। দান সাদকাহর মাধ্যমে তোমরা তোমাদের (রিযিক) বাড়িয়ে নাও। আল্লাহ তাআলা অস্বীকার করেছেন যে, মুমিনদের রিযিক এমন স্থান থেকে দিবেন, যেখান থেকে সে ধারণা-কল্পনা করে। (বরং এমন স্থান থেকে দিবেন যেখান থেকে সে কল্পনা করে না।)।
ফায়দা
ইমাম আহমাদ (রহ) বলেন- যদি এই হাদীস সহীহ হয় তবে এর মতলব হলো, আল্লাহ তাআলা অস্বীকার করেছেন যে, মুমিনের সকল রিযিক তার কল্পনানুযায়ী দান করবেন। (বরং অনেক রিযিক আসবে এমন স্থান থেকে যা সে কল্পনা করে না।)।
কেননা অনেক ব্যবসায়ী আছে যারা তাদের ব্যবসার মধ্যে সেই রিযিক পাওয়ার কল্পনা করেন এবং তারা তাদের কল্পনানুযায়ীই রিযিক পেয়ে থাকেন।
সফরে পাথেয় সাথে নেওয়া
হযরত ইবনে আব্বাস (রা) বলেন- ইয়ামানের লোকেরা হজের সফরে বের হতো কিন্তু সফরের সামান নিত না এবং বলতো আমরা আল্লাহর উপর ভরসাকারী। পরে তারা মানুষের নিকট চেয়ে বেড়াত। অতএব আল্লাহ তাআলা আয়াত নাযীল করলেন-
وَتَزَوَّدُوا فَإِنَّ خَيْرَ الزَّادِ التَّقْوَى
আর তোমরা পাথেয় সঞ্চয় করে নাও। আর নিঃসন্দেহে সর্বোত্তম পাথেয় হলো তাকওয়া বা আত্মসংযম।
উপায় উপকরণ অবলম্বন
(ইমাম বায়হাকী [রহ] বলেন) আমরা সকল তাওয়াক্কুলকারীদের সর্দার এবং রাব্বুল আলামীনের সমস্ত রাসূলদের সর্দার রাসূলুল্লাহ (সা) থেকে বর্ণনা করেছি যে, হুযুর (সা) ‘মালে ফাই’ থেকে পরিবারের জন্য সারা বছরের খরচ রেখে দিতেন, এরপর যা অবশিষ্ট থাকত তা বায়তুল মালের প্রয়োজনীয় খরচে তা ব্যয় করতেন।
আমরা রাসূলুল্লাহ (সা) থেকে এটাও বর্ণনা করেছি যে, যুদ্ধের ময়দানে মোকাবেলার সময় যখন রাসূলুল্লাহ (সা) দুশমনের মুখোমুখি হয়েছেন, তখন তার দুই দুইটি বর্ম পরিধান করা ছিল।
আমরা এটাও বর্ণনা করেছি যে, রাসূলুল্লাহ (সা) এর হাত মচকে যাওয়ার কারণে তিনি সিঙ্গা লাগিয়ে রক্তমোক্ষণ করিয়েছেন।
রোগ-ব্যাধিতে চিকিৎসা গ্রহণ
আমরা রাসুলুল্লাহ (সা) থেকে কিছু ওষুধ বর্ণনা করেছি, যা তিনি ব্যবহার করতে আদেশ দিয়েছেন। এমনকি তিনি বলেছেন-
تَدَاوَوْا فَإِنَّ اللهَ لَمْ يَضَعْ دَاءً إِلَّا وَضَعَ لَهُ شِفَاءً إِلَّا الْهَرَمَ
চিকিৎসা করাও, নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা এমন কোন রোগ সৃষ্টি করেননি যার জন্য নিরাময় বা আরোগ্য রাখেন নি। একমাত্র বার্ধক্য ব্যতীত।
ঝাড়ফুক
অনুরূপ তিনি ঝাড়ফুক করানোরও হুকুম দিয়েছেন এবং এর অনুমতিও দান করেছেন। আর ইরশাদ করেছেন–
مَنِ اسْتَطَاعَ مِنْكُمْ أَنْ يَنْفَعَ أَخَاهُ فَلْيَنْفَعْهُ
তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি তার ভাইয়ের উপকার করার শক্তি রাখে সে যেন অবশ্যই তার ভাইয়ের উপকার করে।
উপায়-উপকরণ তাকদীরের অন্তর্ভুক্ত
হযরত আবু খুযামাহ তার পিতা থেকে রিওয়ায়াত করেন। তিনি আরয করলেন, ইয়া রাসুলুল্লাহ! আমরা রোগ মুক্তির জন্য ঔষধপত্র সেবন করি অথবা ঝাড়ফুক করি এবং কিছু সাবধানতা অবলম্বন করে থাকি। এগুলো আল্লাহর নির্ধারিত তাকদীর প্রতিরোধ করতে পারে? রাসুলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করলেন–
إِنَّهُ مِنْ قَدَرِ اللَّهِ
নিঃসন্দেহে এসবই তাকদীরের অন্তর্ভুক্ত।
বুনিয়াদি দলীল
ইমাম আহমদ (রহ) বলেন- এই হাদীস এ বিষয়ের একটি বুনিয়াদী দলীল। এর উদ্দেশ্য মানুষ ঐ সব বিষয় তার ব্যবহারে আনবে যা আল্লাহ তাআলা তাদের জন্য বর্ণনা করেছেন এবং ব্যবহারের অনুমতি প্রদান করেছেন।
আর এসব উপায়-উপকরণ ব্যবহারের সময় এই বিশ্বাস রাখবে যে, এগুলো হলো বাহ্যিক উপকরণ মাত্র প্রকৃত কর্তা হলেন আল্লাহ তাআলা। আর ব্যবহারের পর যে উপকার পৌঁছবে তা আল্লাহ তাআলার তাকদীর বা নির্ধারণ অনুযায়ী হবে।
তিনি চাইলে এসব উপকরণ ব্যবহার সত্ত্বেও তা উপকারশূন্য হতে পারে। অতএব ইয়াকীন বিশ্বাস ওষুধ-পথ্য, ঝাড়ফুক এর প্রতি হবে না, বরং তা হবে আল্লাহর প্রতি- সব উপকার প্রদানকারী উপায়-উপকরণ মজুদ থাকা সত্ত্বেও।
উপসংহার
তাওয়াক্কুল মানে কর্মবিমুখ হয়ে বসে থাকা নয়; বরং শরিয়তসম্মত উপায়ে যথাসাধ্য চেষ্টা করার পর ফলাফল আল্লাহ তাআলার হাতে সোপর্দ করা। এ গুণ মুমিনের অন্তরে প্রশান্তি, ধৈর্য ও দৃঢ় বিশ্বাস সৃষ্টি করে এবং হারাম উপায়ে রিযিক অনুসন্ধান, অস্থিরতা ও হতাশা থেকে রক্ষা করে। আল্লাহর ওপর সত্যিকার ভরসাই দুনিয়া ও আখিরাতের সফলতার অন্যতম চাবিকাঠি।
🔹🔹🔹
👉 আরও পড়ুন শুআবুল ইমান আল্লাহর প্রতি আশা ও বাসনা




