
ভূমিকা
কষ্টের পর সুখ, কিতাবুল ফারয
কষ্ট, বিপদাপদ ও দুঃসময়ের পর আল্লাহ তাআলা কীভাবে বান্দার জন্য স্বস্তি ও কল্যাণের পথ খুলে দেন—ইসলামী ঐতিহ্যে এ বিষয়ে অসংখ্য হৃদয়স্পর্শী ঘটনা ও নসিহত বর্ণিত হয়েছে।
কিতাবুল ফারয গ্রন্থে ইমাম ইবনে আবিদ দুনইয়া (রহ.) এমনই বিভিন্ন বর্ণনা সংকলন করেছেন, যা মুমিনের হৃদয়ে ধৈর্য, আল্লাহর ওপর ভরসা এবং বিপদে অবিচল থাকার শিক্ষা জাগিয়ে তোলে।
এই পোস্টে কিতাবুল ফারয থেকে প্রথম কয়েকটি রিওয়ায়াত তুলে ধরা হলো। প্রতিটি বর্ণনার মধ্যেই রয়েছে দুঃসময়ে মুমিনের করণীয়, সবর ও তাওয়াক্কুলের শিক্ষা এবং আল্লাহর রহমতের প্রতি আশাবাদী হওয়ার অনুপ্রেরণা।
📖 গ্রন্থ: কিতাবুল ফারয
✍️ সংকলন: ইমাম ইবনে আবিদ দুনইয়া (রহ.)
🌴 একটি দারুস সাআদাত অনুবাদ ও প্রকাশনা
👉 pdf link কিতাবুল ফারয কষ্টের পর সুখ pdf
কিতাবুল ফারয
সুসময়ের অপেক্ষা করা ইবাদত
রিওয়ায়াতঃ১ হযরত আলী (রা) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেন-
انْتِظَارُ الْفَرَجِ مِنَ اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ عِبَادَةٌ، وَمَنْ رَضِيَ بِالْقَلِيلِ مِنَ الرِّزْقِ رَضِيَ اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ مِنْهُ بِالْقَلِيلِ مِنَ الْعَمَلِ
মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে সুসময়ের অপেক্ষা করা ইবাদত। আর যে ব্যক্তি অল্প রিযিকে তুষ্ট থাকে, আল্লাহ তাআলা তার অল্প আমলেই সন্তুষ্ট হয়ে যান।
রিওয়ায়াতঃ২ হযরত ইবনে মাসউদ (রা) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেন-
سَلُوا اللَّهَ عَزَّ وَجَلَّ مِنْ فَضْلِهِ، فَإِنَّ اللَّهَ عَزَّ وَجَلَّ يُحِبُّ أَنْ يُسْأَلَ مِنْ فَضْلِهِ، وَأَفْضَلُ الْعِبَادَةِ انْتِظَارُ الْفَرَجِ
তোমরা আল্লাহর নিকট তার অনুগ্রহ প্রার্থনা কর। কেননা তার নিকট প্রার্থনা করাকে তিনি পছন্দ করেন। আর সর্বোত্তম ইবাদত হলো স্বাচ্ছন্দ্যের প্রতিক্ষা করা।
সবর ও ধৈর্য উত্তম নিয়ামত
রিওয়ায়াতঃ৩ হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রা) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেন-
لَمْ تُعْطَوْا عَطَاءً خَيْرًا وَلَا أَوْسَعَ مِنَ الصَّبْرِ
সবর বা ধৈর্যের চেয়ে উত্তম ও প্রশস্ত কোন নিয়ামত কাউকে কখনো দেয়া হয়নি।
সকল ধরণের সংকট থেকে মুক্তির উপায়
রিওয়ায়াতঃ৪ হযরত রবী ইবনে খুসাইম (রহ) আল্লাহর বাণী-
وَمَنْ يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَلْ لَهُ مَخْرَجًا
আর যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করে আল্লাহ তার জন্য নিষ্কৃতির পথ করে দিবেন।–
সূরা তালাক:২
প্রসঙ্গে বলেন-
الْمَخْرَجُ مِنْ كُلِّ مَا ضَاقَ عَلَى النَّاسِ
অর্থাৎ মানুষের উপর আপতিত সকল ধরণের সংকট থেকে উত্তরণের পথ করে দেবন (তা যা-ই হোক না কেন)।
আল্লাহর শান
রিওয়ায়াতঃ৫ হযরত আবু দারদা (রা)-কে নিম্নের আয়াত প্রসঙ্গে জিজ্ঞাসা করা হলো-
كُلَّ يَوْمٍ هُوَ فِي شَأْنٍ
তিনি (আল্লাহ) প্রতিদিন তার শান অনুযায়ী থাকেন।– সূরা আর রহমান:২৯
তিনি বলেন-
مِنْ شَأْنِهِ أَنْ يَغْفِرَ ذَنْبًا، وَيَكْشِفَ كَرْبًا، وَيَرْفَعَ قَوْمًا، وَيَضَعَ آخَرِينَ
তার শান হলো তিনি গুনাহ ক্ষমা করেন, মুসিবত দূর করেন, একদলকে মর্যাদা দান করেন, অপর দলকে অপদস্থ করেন।
ব্যাপক উপদেশ
রিওয়ায়াতঃ৬ হযরত ইবনে আববাস (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন আমি নবী (সা) এর পিছনে আরোহী ছিলাম। তিনি বললেন-
احْفَظْ يَا غُلَامُ، احْفَظِ اللَّهَ يَحْفَظْكَ، احْفَظْهُ تَجِدْهُ تِجَاهَكَ، إِذَا سَأَلْتَ فَسَلِ اللَّهَ، وَإِذَا اسْتَعَنْتَ فَاسْتَعِنْ بِاللَّهِ، جَفَّتِ الْأَقْلَامُ، وَرُفِعَتِ الصُّحُفُ، وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ، لَوْ جَهِدَتِ الْأُمَّةُ لِتَنْفَعَكَ بِغَيْرِ مَا كَتَبَ اللَّهُ لَكَ مَا اسْتَطَاعَتْ ذَلِكَ، وَلَوْ أَرَادَتْ أَنْ تَضُرَّكَ بِغَيْرِ مَا قَدَّرَ لَكَ مَا اسْتَطَاعُوا
বৎস! সংরক্ষণ কর (এই কথাগুলো- এর দ্বারা আল্লাহ তোমার উপকার করবেন)। আল্লাহর (বিধানসমূহের) হিফাযত করবে, তাহলে তিনি তোমার হিফাযত করবেন। আল্লাহর বিধান মেনে চলবে তাহলে তাকে তোমার সামনে সদয় পাবে।
যখন কিছু চাইবে তখন আল্লাহর কাছেই চাইবে। যখন সাহায্য চাইবে তখন আল্লাহর কাছেই সাহায্য চাইবে। কলম উঠিয়ে নেওয়া হয়েছে এবং কাগজসমূহ শুকিয়ে গেছে।
কসম সেই সত্তার যার হাতে আমার প্রাণ! জেনে রাখ, সমস্ত উম্মতও যদি তোমার উপকার করতে একত্রিত হয়ে যায় তবে আল্লাহ যা তোমার তাকদীরে লিখে রেখেছেন তা ছাড়া কোন উপকার তারা তোমার করতে পারবে না।
অপরদিকে তারা যদি তোমার কোন ক্ষতি সাধন করার উদ্দেশ্যে একত্রিত হয়ে যায়, তবু তারা আল্লাহ তোমার তাকদীরে যা লিখে রেখছেন তার বাইরে কোন ক্ষতি করতে পারবে না।
অপর বর্ণনা
রিওয়ায়াতঃ৭ হযরত সাহল ইবনে সাদ আস সায়িদী (রা) বর্ণনা করেন- রাসূলুল্লাহ (সা) হযরত ইবনে আব্বাস (রা) কে বলেন-
يَا غُلَامُ، أَلَا أُعَلِّمُكَ كَلِمَاتٍ تَنْتَفِعُ بِهِنَّ؟» قَالَ: بَلِيٍّ يَا رَسُولَ اللَّهِ، قَالَ: «احْفَظِ اللَّهَ يَحْفَظْكَ، احْفَظِ اللَّهَ تَجِدْهُ أَمَامَكَ، تَعَرَّفْ إِلَى اللَّهِ فِي الرَّخَاءِ يَعْرِفْكَ فِي الشِّدَّةِ، إِذَا سَأَلْتَ فَسَلِ اللَّهَ، وَإِذَا اسْتَعَنْتَ فَاسْتَعِنْ بِاللَّهِ، جَفَّ الْقَلَمُ بِمَا هُوَ كَائِنٌ، فَلَوْ جَهَدَ الْعِبَادُ أَنْ يَنْفَعُوكَ بِشَيْءٍ لَمْ يَكْتُبْهُ اللَّهُ لَكَ لَمْ يَقْدِرُوا عَلَيْهِ، وَلَوْ جَهَدَ الْعِبَادُ عَلَى أَنْ يَضُرُّوكَ بِشَيْءٍ لَمْ يَكْتُبْهُ اللَّهُ عَلَيْكَ لَمْ يَقْدِرُوا عَلَيْهِ، فَإِنِ اسْتَطَعْتَ أَنْ تَعْمَلَ لِلَّهِ بِالصِّدْقِ فِي الْيَقِينِ فَافْعَلْ، وَإِنْ لَمْ تَسْتَطِعْ فَإِنَّ فِي الصَّبْرِ عَلَى مَا تَكْرَهُ خَيْرًا كَثِيرًا، وَاعْلَمْ أَنَّ النَّصْرَ مَعَ الصَّبْرِ، وَأَنَّ الْفَرَجَ مَعَ الْكَرْبِ، وَأَنَّ مَعَ الْعُسْرِ يُسْرًا
হে বৎস! আমি কি তোমাকে কিছু কথা বলব না, যার দ্বারা আল্লাহ তোমার উপকার করবেন। তিনি বললেন, হ্যাঁ ইয়া রাসূলাল্লাহ! রাসূলুল্লাহ (সা) বললেন- তুমি আল্লাহর বিধান মেনে চলবে, তাহলে তিনি তোমার হিফাযত করবেন। আল্লাহর বিধান মেনে চলবে তাহলে তাকে তোমার সামনে সদয় পাবে।
সুখের সময় তুমি আল্লাহকে চিনবে, তাহলে কষ্টের সময় তিনি তোমাকে চিনবেন। যখন কিছু চাইবে তখন আল্লাহর কাছেই চাইবে। যখন সাহায্য চাইবে তখন আল্লাহর কাছেই সাহায্য চাইবে। জীবনে যা ঘটবে তা লিখা হয়ে গেছে।
জেনে রাখ! সমস্ত মানুষ যদি তোমার উপকার করতে একত্রিত হয়ে যায়, তবু আল্লাহ যা তোমার তাকদীরে লিখে রেখেছেন তা ছাড়া আর কোন উপকার তারা তোমার করতে পারবে না। অপরদিকে তারা সকলে মিলে যদি তোমার কোন ক্ষতি করার ইচ্ছা করে, তবু আল্লাহ তোমার জন্য যা লিখে রেখেছেন তার বাইরে তারা তোমার কোন ক্ষতি করতে পারবে না।
অতএব ইখলাস ও একনিষ্ঠতা এবং ইয়াকীন ও দৃঢ় বিশ্বাসের সাথে আমল করে যাও। জেনে রাখ! অপছন্দনীয় বিষয়ে ধৈর্যধারণ করার মাঝে অনেক কল্যাণ রয়েছে। ধৈর্যের সাথেই রয়েছে আল্লাহর সাহায্য। বিপদের পরেই রয়েছে মুক্তি। আর কষ্টের পরই সুখ।
ইস্তিগফার বা ক্ষমা প্রার্থনার সুফল
রিওয়ায়াতঃ৮ হযরত ইবনে আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেন-
مَنْ أَكْثَرَ مِنَ الِاسْتِغْفَارِ جَعَلَ اللَّهُ لَهُ مِنْ كُلِّ هَمٍّ فَرَجًا، وَمِنْ كُلِّ ضِيقٍ مَخْرَجًا، وَرَزَقَهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ
যে ব্যক্তি অধিক পরিমাণে ইস্তিগফার করে (আল্লাহর কাছে মাফ চায়)। আল্লাহ তাকে প্রতিটি দুশ্চিন্তা হতে মুক্তি দান করেন। প্রত্যেক জটিলতা ও সংকীর্ণতা থেকে উত্তরণের পথ বের করে দেন। আর এমন স্থান হতে তাকে রিযিক দান করেন যার কল্পনাও সে করে না।
যা মানুষের জন্য যথেষ্ট
রিওয়ায়াতঃ৯ হযরত আবু যর (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, একবার রাসূলুল্লাহ (সা) এই আয়াত তিলাওয়াত করেন-
وَمَنْ يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَلْ لَهُ مَخْرَجًا، وَيَرْزُقْهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ وَمَنْ يَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ فَهُوَ حَسْبُهُ
আর যে আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য (সব সংকট থেকে নিষ্কৃতির) পথ করে দেবেন এবং তার ধারণাতীত স্থান থেকে তাকে রিযিক দান করবেন। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর উপর নির্ভর করে, তার জন্য তিনিই যথেষ্ট।– সূরা তালাক:২-৩
তারপর বলেন-
يَا أَبَا ذَرٍّ، لَوْ أَنَّ النَّاسَ كُلَّهُمْ أَخَذُوا بِهَا لَكَفَتْهُمْ
হে আবু যর! সকল মানুষ যদি এই আয়াতের উপর আমল করত, তবে সবার জন্য তা যথেষ্ট হত।
সব সমস্যা ও সংকট আল্লাহর নিকট পেশ করা
রিওয়ায়াতঃ১০ আবু উবায়দা (রা) বর্ণনা করেন, এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সা) এর কাছে এসে বলল, অমুক গোত্রের লোকেরা আমার ওপর হামলা করেছে, তারা আমার উট ও আমার সন্তানকে নিয়ে গেছে।
রাসূলুল্লাহ (সা) বললেন, আলে মুহাম্মদের (আমার পরিবারের) এমন অবস্থা যে, তাদের ঘরে এক মুদ্দ (ছোট পরিমাণ) খাবারও নেই, বা এক সা’ (আরও বড় পরিমাণ) খাবারও নেই, অতএব তুমি আল্লাহ্র কাছে চাও। সে লোকটি তার স্ত্রীর কাছে ফিরে গেল। স্ত্রী জিজ্ঞাসা করল, রাসূলুল্লাহ (সা) তোমাকে কী বললেন? লোকটি স্ত্রীকে সব কথা জানাল।
স্ত্রী বলল, তিনি তোমাকে যা বলেছেন, তা খুবই উত্তম পরামর্শ। (এরপর তারা সেই অনুযায়ী কাজ করল)। অল্প সময়ের মধ্যেই আল্লাহ তার উট এবং সন্তানকে আরও বেশি উন্নত অবস্থায় ফিরিয়ে দিলেন। তখন সে লোকটি রাসূলুল্লাহ (সা) কাছে এসে বিষয়টি জানাল।
রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মিম্বরে উঠে আল্লাহ্র প্রশংসা করলেন, তার প্রশংসাসূচক বাণী উচ্চারণ করলেন এবং লোকদেরকে আল্লাহর নিকট দুআ ও আশা করার নির্দেশ দিলেন। এরপর তিনি কুরআনের এই আয়াত তিলাওয়াত করলেন-
অতঃপর তিনি তিলাওয়াত করেন-
وَمَنْ يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَلْ لَهُ مَخْرَجًا، وَيَرْزُقْهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ
আর যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য পথ বের করে দেবেন, এবং তিনি তাকে এমন উৎস থেকে রিযিক দিবেন যা সে কল্পনাও করতে পারবে না।– [সূরা আত-তালাক: ৩]
সকল রোগ ব্যাধি ও চিন্তার নিশ্চিত ওষুধ
রিওয়ায়াতঃ১১ হযরত আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেন-
لَا حَوْلَ وَلَا قُوَّةَ إِلَّا بِاللَّهِ دَوَاءٌ مِنْ تِسْعَةٍ وَتِسْعِينَ دَاءً، أَيْسَرُهَا الْهَمُّ
লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ ৯৯ টি রোগের ওষুধ, যার মধ্যে সবচাইতে সহজটি হলো চিন্তা।
কষ্ট ও মুসিবত গুনাহর কাফফারা
রিওয়ায়াতঃ১২ হযরত হাসান থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেন-
سَاعَاتُ الْأَذَى يُذْهِبْنَ سَاعَاتِ الْخَطَايَا
কষ্টের সময়গুওলা গুনাহর সময়ের কাফফারা স্বরুপ।
অপছন্দনীয় বিষয়েও কল্যাণ থাকে
রিওয়ায়াতঃ১৩ হযরত আবী মাজলায (রহ) থেকে বর্ণিত। হযরত উমর (রা) বলেছেন-
مَا أُبَالِي عَلَى أَيِّ حَالٍ أَصْبَحْتُ، عَلَى مَا أُحِبُّ أَوْ عَلَى مَا أَكْرَهُ، وَذَلِكَ لِأَنِّي لَا أَدْرِي الْخَيْرَ فِيمَا أُحِبُّ أَوْ فِيمَا أَكْرَهُ
আমার সকাল ভাল হলো, না মন্দ হলো তা আমি জানি না। কারণ আমি জানি না, যা আমার পছন্দ তা আমার জন্য কল্যাণকর, না যা আমার অপছন্দ তা আমার জন্য কল্যাণকর।
রিওয়ায়াতঃ১৪ হযরত ইবরাহিম তাইমী (রহ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন-
إِنْ لَمْ يَكُنْ لَنَا خَيْرٌ فِيمَا نَكْرَهُ، لَمْ يَكُنْ لَنَا خَيْرٌ فِيمَا نُحِبُّ
আমাদের অপছন্দনীয় বিষয়গুলোতে যদি আমাদের জন্য কল্যাণ না থাকে, তবে আমাদের পছন্দনীয় বিষয়গুলোতেও কল্যাণ থাকতে পারে না।
বিপদ মুসিবত জীবনের নিয়তি
রিওয়ায়াতঃ১৫ হযরত মানসূর বিন আব্দুর রহমান থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন- একবার আমরা হযরত হাসান (রহ) এর মজলিসে বসা ছিলাম। এক ব্যক্তি আমাকে বলল, তাকে আল্লাহর নিম্নের বাণীর তাফসীর জিজ্ঞাসা করুন-
مَا أَصَابَ مِنْ مُصِيبَةٍ فِي الْأَرْضِ وَلَا فِي أَنْفُسِكُمْ إِلَّا فِي كِتَابٍ مِنْ قَبْلِ أَنْ نَبْرَأَهَا
পৃথিবীতে এবং ব্যক্তিগতভাবে তোমাদের যে বিপদ আসে, আমি তা সংঘটিত করার পূর্বেই তা লিপিবদ্ধ থাকে।– সূরা হাদীদ ২২
আমি জিজ্ঞাসা করলে তিনি বললেন, সুবহানাল্লাহ! এতেও কি কারো সন্দেহ আছে যে, আসমান যমীনে মানুষের উপর যেসব মুসিবত আসে তা তার সৃষ্টির পূর্বেই লিখা রয়েছে।
সবর ও ধৈর্যের মাধ্যমে মুক্তির পথ তালাশ কর
রিওয়ায়াতঃ১৬ হযরত হাসান থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেন-
أَدْخِلْ نَفْسَكَ فِي هُمُومِ الدُّنْيَا، وَاخْرُجْ مِنْهَا بِالصَّبِرِ، وَلْيَرُدَّكَ عَنِ النَّاسِ مَا تَعْلَمُ مِنْ نَفْسِكَ
তুমি নিজেকে দুনিয়ার চিন্তা-ভাবনায় জড়িত কর, তারপর তা থেকে ধৈর্যের মাধ্যমে বের হয়ে আসো। আর তুমি নিজের ব্যাপারে যা জান, তা যেন তোমাকে অন্যদের (দোষ বের করা বা অনিষ্ট করা) থেকে বিরত রাখে।
বিজয় ও শত্রুর প্রতিরোধের জন্য লা হাওলা ওয়ালা
রিওয়ায়াতঃ১৭ ইসহাক আল-গাযওয়ানী বলেন, (পারস্যের সেনাপ্রধান) আজদমাহর আমাদের বিরুদ্ধে কিরাজ নগরের নিকটে আশিটি হাতি নিয়ে অগ্রসর হলো। তখন আমাদের ঘোড়া ও সেনাদের কাতারগুলো প্রায় ছত্রভঙ্গ হয়ে যাচ্ছিল।
এতে মুহাম্মাদ ইবন কাসিম খুব চিন্তায় পড়ে গেলেন। তখন তিনি হিমসবাসীদের আমীর ইমরান ইবন নুমান এবং অন্যান্য সৈন্যবাহিনীর নেতাদের ডাক দিলেন। তারা উঠে দাঁড়ালেও কিছু করতে পারল না।
অবশেষে, যখন সকল প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলো, তখন মুহাম্মাদ ইবন কাসিম বহুবার উচ্চ স্বরে বলতে লাগলেন-
لا حول ولا قوة إلا بالله
লা হুওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ।
আল্লাহ ছাড়া কোনো শক্তি ও ক্ষমতা নেই।
তখন আল্লাহ তাআলা হাতিগুলোর ওপর নিজের কুদরতের দ্বারা তাদেরকে রুখে দিলেন এবং প্রবল গরম তাদের ওপর চাপিয়ে দিলেন। এতে তারা রীতিমতো পুড়ে উঠল। তখন তারা আতঙ্কিত হয়ে পানির দিকে দৌড়াতে লাগল। আর তাদের রাখাল বা মালিকরা কোনোভাবেই তাদের আটকাতে পারল না। ঠিক তখনই মুসলিম বাহিনীর ঘোড়াবাহিনী আক্রমণ চালাল এবং আল্লাহর ইচ্ছায় বিজয় অর্জিত হলো।
লা হাওলা বিষয়ক আরেকটি বর্ণনা
রিওয়ায়াতঃ১৮ হযরত সাফওয়ান ইবনে আমর থেকে বর্ণিত। হাবীব ইবনে মাসলামা (রহ) যুদ্ধের সময় যখন কোনো শত্রুর মুখোমুখি হতেন অথবা কোনো দুর্গ আক্রমণ করতে যেতেন, তখন তিনি লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ পাঠ করা পছন্দ করতেন।
একদিন তিনি একটি দুর্গের দিকে অগ্রসর হলে, রোমান বাহিনী পরাজিত হয়ে পালিয়ে যায় এবং তারা আরেকটি দুর্গে গিয়ে আশ্রয় নেয় যা মুসলিম বাহিনীর পক্ষে দুর্ভেদ্য হয়ে ওঠে।
তখন মুসলিমরা সবাই একত্রে বলতে লাগল, লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ। ফলে সেই দুর্গটি (আল্লাহর কুদরতে) চুর্ণ-বিচুর্ণ হয়ে গেল।
ঋণ পরিশোধ এবং সবকিছুর জন্য দুআ করা
রিওয়ায়াতঃ১৯ হযরত সুফিয়ান বিন উয়াইনাহ (রহ) বলেন, একবার ইমাম মুহাম্মাদ ইবনে আলী (রহ) মুহাম্মাদ ইবনে আল-মুনকাদির (রহ) এর পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তিনি তাকে দেখে বললেন, তোমাকে বিষণ্ন লাগছে কেন?
আবু হাযিম (তার উপনাম) বললেন, ঋণের চিন্তায় ও খুব কষ্টে আছে। তখন মুহাম্মদ ইবনে আলী বললেন, তাহলে তার জন্য দুআ করুন। আবু হাযিম বললেন, হ্যাঁ, করব।
তখন ইমাম মুহাম্মাদ ইবনে আলী বললেন, ভাগ্যবান সেই ব্যক্তি, যার কোনো প্রয়োজন হলে আল্লাহর কাছে বেশি বেশি দুআ করে- যে প্রয়োজনই হোক না কেন।
বেশী চিন্তা-ভাবনা না করা
রিওয়ায়াতঃ২০ হযরত খালেদ বিন রাফে (রহ) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সা) হযরত ইবনে মাসউদ (রা) কে বলেন-
لَا تُكْثِرْ هَمَّكَ، مَا يُقَدَّرْ يَكُنْ، وَمَا تُرْزَقْ يَأْتِكَ
তুমি বেশি চিন্তা-ভাবনা করো না। তোমার তাকদীরে যা আছে তা-ই হবে। আর তোমার রিযিক তোমার কাছে পৌছবেই।
উপসংহার
কিতাবুল ফারয-এর এই রিওয়ায়াতগুলো আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় কষ্ট ও বিপদ মুমিনের জীবনের শেষ কথা নয়। ধৈর্য, আল্লাহর ওপর ভরসা এবং তাঁর রহমতের প্রত্যাশা নিয়ে এগিয়ে চললে দুঃসময়ও কল্যাণের কারণ হতে পারে। এসব বর্ণনা শুধু পাঠের জন্য নয়; বরং জীবনের কঠিন সময়ে হৃদয়কে দৃঢ় করার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ নসিহত বহন করে।
📖 সম্পূর্ণ গ্রন্থটি পড়তে কিতাবুল ফারয-এর PDF সংগ্রহ করুন –
👉 pdf link কিতাবুল ফারয কষ্টের পর সুখ pdf




