প্রবন্ধ

প্রাচীন ইসলামি শিক্ষা পদ্ধতি

আল্লামা শিবলী নোমানী- মাকালাতে শিবলী

মাকালাতে শিবলী থেকে নির্বাচিত ও অনূদিত 

একটি দারুস সাআদাত অনুবাদ ও প্রকাশনা

প্রাচীন ইসলামী শিক্ষা

১৩৫ হিজরি পর্যন্ত শিক্ষা, শিক্ষার বিস্তৃতি ও এর কারণসমূহ, শিক্ষাপদ্ধতি, পরিবর্তন, বিভিন্ন দেশের বৈশিষ্ট্য এবং শিক্ষার ধর্মীয় ও সভ্যতাগত প্রভাব

১৩৫ হিজরি পর্যন্ত—অর্থাৎ যখন গ্রন্থ রচনা ও সংকলনের কাজ শুরু হয়নি—তখন যে জ্ঞান ও শিক্ষা প্রচলিত ছিল, তা আরবদের সরল ও স্বাভাবিক জীবনযাত্রার উপযোগী ছিল। সেসব জ্ঞান ছিল মূলত স্মৃতিনির্ভর। আলোচনা ও অনুসন্ধানের বিষয়গুলোও সাধারণ বোধশক্তির নাগালের বাইরে ছিল না। শিক্ষাপদ্ধতিও ছিল সম্পূর্ণ সেই একই—অর্থাৎ শ্রবণ ও বর্ণনার মাধ্যমে জ্ঞান গ্রহণ—যা প্রাচীনকাল থেকেই তাদের মধ্যে প্রচলিত ছিল।

কিন্তু কয়েক বছরের মধ্যেই সভ্যতা ও জীবনযাত্রার অনেক উন্নতি সাধিত হয়। সেই অনুপাতে শিক্ষাও আরও ব্যাপক, সুসংগঠিত ও নিয়মতান্ত্রিক হয়ে ওঠে। এ যুগে যেসব জ্ঞান ও শাস্ত্র ব্যাপকভাবে প্রচলিত ছিল, সেগুলো হলো—নাহু, মা‘আনী, লুগাত, ফিকহ, উসূলুল ফিকহ, হাদিস, ইতিহাস, আসমাউর রিজাল, তাবাকাত এবং এসবের সংশ্লিষ্ট বিষয়াদি।

যদিও বুদ্ধিবৃত্তিক জ্ঞানের ভাণ্ডার অনেকটাই সঞ্চিত হয়ে গিয়েছিল, তবুও তা সাধারণভাবে প্রচলন লাভ করতে পারেনি। এর কারণ ছিল, রাষ্ট্র এর প্রচার ও প্রসারের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেয়নি। আর সাধারণ মানুষের মধ্যে কিছুটা অপরিচিতি এবং কিছুটা ধর্মীয় ভুল ধারণার কারণে দর্শন ও যুক্তিবিদ্যার প্রতি তেমন সহানুভূতি ছিল না।

শিক্ষার ২য় যুগ

শিক্ষার এই দ্বিতীয় যুগটি বিচিত্র ও আকর্ষণীয় ঘটনায় পরিপূর্ণ। দেখা যাবে, সিন্ধু নদের তীর পর্যন্ত ইসলাম শাসন প্রতিষ্ঠা করেছে। হিজাজ থেকে পরিচালিত বিজয়ের প্লাবন এখন ধীরে ধীরে থেমে আসছে। বিজিত দেশসমূহে শান্তি ও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার কাজ চলতে থাকে।

শত শত গোত্র আরবের মরুভূমি থেকে বের হয়ে সুদূর বিভিন্ন দেশে গিয়ে বসতি স্থাপন করে। বহু নতুন জাতি আন্তরিক আগ্রহের সঙ্গে ইসলামের পরিমণ্ডলে প্রবেশ করতে থাকে। কিন্তু এত বিশাল পৃথিবীতে তখনও রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে কোনো শিক্ষাবিভাগ ছিল না, কোনো বিশ্ববিদ্যালয় ছিল না, কোনো মাদরাসাও ছিল না।

বনু উমাইয়ার বংশধররা শাসক ছিলেন, কিন্তু সরকার এমন অনাসক্ত ও উদাসীন ছিল যে, দেশের সাধারণ নৈতিকতা, সামাজিক জীবন ও সভ্যতার ওপর বিজয়ী জাতির সংস্কৃতির বিশেষ কোনো প্রভাব পড়তে পারেনি। সমস্ত জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্র ছিল কেবল আরবি ভাষার অধীন।

এসব পরিস্থিতির মধ্যেও লক্ষ করুন, কী দ্রুততা ও ব্যাপকতার সঙ্গে জ্ঞান-বিজ্ঞান ও শিল্পকলার প্রসার ঘটতে থাকে। মারভ, হেরাত, নিশাপুর, বুখারা, পারস্য, বাগদাদ, মিসর, শাম ও আন্দালুসের প্রতিটি শহর—বরং প্রতিটি গ্রাম পর্যন্ত—জ্ঞানচর্চার ধ্বনিতে মুখরিত হয়ে ওঠে।

মক্তব শিক্ষা 

শিক্ষাজগতের জন্য হাজার হাজার মক্তব প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, যাতে রাষ্ট্রের কোনো অংশগ্রহণই ছিল না। অথচ সেগুলো বর্তমান যুগের বিস্তারিত মাদরাসাগুলোর চেয়েও অধিক উপকারী ও উদার ছিল।

মধ্যম পর্যায়ের উচ্চশিক্ষার জন্য ব্যবহৃত হতো মসজিদের প্রাঙ্গণ, খানকাহর কক্ষ এবং আলিমদের ব্যক্তিগত বাসভবন। কিন্তু এসব সহজ-সরল ও অনাড়ম্বর স্থাপনায় যে ব্যাপকতা ও উদারতার সঙ্গে জ্ঞানের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ চলছিল, পঞ্চম শতাব্দীর সূচনালগ্নে একই উদ্দেশ্যে নির্মিত বিশাল ও জাঁকজমকপূর্ণ প্রাসাদসম ভবনগুলোতেও এর চেয়ে বেশি কিছু করা সম্ভব হয়নি।

যদিও সে যুগের এমন কোনো নিবন্ধনপত্র আজ আমাদের কাছে নেই, যার সাহায্যে আমরা হিসাব করতে পারি যে, শতকরা কতজন মানুষ শিক্ষিত ছিলেন; তথাপি তাযকিরা, জীবনীগ্রন্থ, আসমাউর রিজাল ও তাবাকাত-সংক্রান্ত শত শত, হাজার হাজার গ্রন্থ বিদ্যমান রয়েছে, যেগুলোর মাধ্যমে আমরা বাস্তব অবস্থার কাছাকাছি একটি ধারণায় পৌঁছাতে পারি।

যদিও ধারাবাহিক বিপর্যয়, যুদ্ধক্ষেত্রের ধ্বংসযজ্ঞ, স্পেনের ধ্বংস এবং তাতারিদের ব্যাপক লুণ্ঠনের পর আমাদের কাছে যা অবশিষ্ট রয়েছে, তা হাজারের এক অংশও নয়। ফলে হাজার হাজার, লক্ষ লক্ষ খ্যাতিমান ব্যক্তির পরিচয় কালের অন্ধকারে হারিয়ে গেছে। তা সত্ত্বেও জ্ঞানের প্রতিটি শাখায় শত শত বিশেষজ্ঞ ও মুজতাহিদের সন্ধান পাওয়া যায়।

কৃতি ব্যক্তিদের তালিকা

শুধু একই যুগের এবং একই দেশের কৃতী ব্যক্তিদের একটি তালিকা প্রস্তুত করা হলেও বহু খণ্ডের গ্রন্থ রচিত হতে পারে। ডক্টর স্প্রেংগার সাহেব অনুমান করেছেন—সম্ভবত এটি অতিরঞ্জিত আশাবাদ—যে মুসলমানদের আসমাউর রিজালের গ্রন্থসমূহে পাঁচ লক্ষ প্রসিদ্ধ আলিমের সন্ধান পাওয়া যেতে পারে।

এখন যদি এ অনুমান করা যায় যে, শিক্ষিত সমাজের মধ্যে কী অনুপাতে একজন অসাধারণ কৃতী ব্যক্তি জন্মগ্রহণ করতেন, তাহলে সাধারণ শিক্ষার বিস্তৃতি সম্পর্কে একটি যুক্তিসংগত ধারণা করা সম্ভব।

প্রসিদ্ধ আলিমদের শিক্ষাজীবনের বিবরণ পড়লে দেখা যায়, একজন একজন শিক্ষকের পাঠচক্রে শত শত, বরং হাজার হাজার শিক্ষার্থী পাঠে নিয়োজিত থাকতেন।

আল্লামা যাহাবি তাঁর তাবাকাত-এ ৩৫১ হিজরিতে মৃত্যুবরণকারী আবুত্-তাকীর জীবনী উল্লেখ করার পর লিখেছেন যে, সে যুগে কোনো কোনো পাঠচক্রে তিন শতাধিক দোয়াত রাখা হতো এবং লোকেরা নবীজি ﷺ-এর হাদিস লিপিবদ্ধ করতেন।

সেই বিশাল সমাবেশে এমন একশজন ইমাম উপস্থিত থাকতেন, যাঁরা ইজতিহাদ ও ফতোয়া প্রদানের পূর্ণ যোগ্যতা রাখতেন।

বাগদাদের ইতিহাসবিদ খতিব নিজে আল্লামা আবু হামিদ ইসফারায়িনির পাঠচক্রে অংশগ্রহণ করেছিলেন। তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী, সেখানে সাতশ আলিম পাঠে উপস্থিত থাকতেন।

নাহুবিদ ফাররা যখন কিতাবুল মুলূক-এর পাঠদান করতেন যাকে আরবি ভাষায় ইমলা বলা হয়, তখন উপস্থিতদের মধ্যে শুধু কাজিই ছিলেন ৮০ জন।

রযিউদ্দীন নিশাপুরির পাঠচক্রে চারশজন শিক্ষাসমাপ্ত আলিম উপস্থিত থাকতেন।

ইমাম বুখারী (রহ) এর মজলিস 

বসরার জামে মসজিদে ইমাম বুখারি রহ. যখন ইমলার মজলিস আয়োজন করেছিলেন, তখন প্রায় এক হাজার মুহাদ্দিস, সমালোচক ও বিতর্কশাস্ত্রে পারদর্শী ব্যক্তি তাতে অংশগ্রহণ করেছিলেন।

ইমাম বুখারি রহ.-এর কাছ থেকে যাঁরা সহিহ বুখারির সনদ লাভ করেছিলেন, তাঁদের সংখ্যা প্রায় নব্বই হাজার। এ ধরনের শত শত উদাহরণ রয়েছে, যেগুলোর সংক্ষিপ্ত বিবরণ আমরা উপস্থাপন করতে পারি।

শিক্ষার ব্যাপকতা

প্রত্যেক জাতি, প্রত্যেক সম্প্রদায় এবং সমাজের প্রতিটি শ্রেণির মধ্যেই ব্যাপকভাবে শিক্ষার প্রচলন ছিল। লেখক ও বিভিন্ন শাস্ত্রে পারদর্শী ব্যক্তিদের জীবনী পড়লে শত শত, হাজার হাজার কৃতী ব্যক্তির সন্ধান পাওয়া যায়, যাঁদের পিতা-পিতামহ ছিলেন দর্জি, মুচি, তাঁতি, মিষ্টান্ন প্রস্তুতকারক, রাঁধুনি, কামার প্রভৃতি পেশার সঙ্গে যুক্ত।

উচ্চপদস্থ লোকদের জীবনেও শিক্ষার প্রাচুর্য ছিল।

ইবনুল মু‘তায আল-আব্বাসি, যিনি ২৯৬ হিজরিতে মৃত্যুবরণ করেন, ইলমুল বাদী‘-এর উদ্ভাবক ছিলেন এবং কবিতায় আবু নুওয়াস ও বাশ্শারের সমকক্ষ ছিলেন।

সেই আবু ফিরাস, যার মাধ্যমে আরব কবিতার সমাপ্তি ঘটেছিল; তিনি রাজ্যের শাসক ছিলেন। আর দার্শনিক আবু আলি ইবনে সিনা ও গবেষক তুসি মন্ত্রীদের উচ্চপদে বিশেষ মর্যাদা লাভ করেছিলেন।

প্রাচীন শিক্ষাপদ্ধতি

এই যুগে শিক্ষার প্রামাণ্য পদ্ধতি ছিল মূলত সেই একই, যা আজ সভ্য দেশগুলোতে প্রচলিত- অর্থাৎ ইমলা, যাকে উর্দুতে লেকচার দেওয়া বলা হয়।

শিক্ষক কোনো উঁচু স্থানে, যেমন চেয়ার বা মিম্বরে বসতেন এবং কোনো শাস্ত্রের বিভিন্ন বিষয় নিজের ভাষায় ব্যাখ্যা করতে শুরু করতেন। শিক্ষার্থীরা, যারা সর্বদা দোয়াত ও কলম নিয়ে বসত, শিক্ষকের গবেষণা ও আলোচনা তাঁর বিশেষ শব্দ ও ভাষারীতিসহ লিখে নিত।

এভাবে ধীরে ধীরে একটি স্বতন্ত্র গ্রন্থ প্রস্তুত হয়ে যেত, যা আমালি নামে পরিচিত ছিল। আমালি ইবনে দুরাইদ ও সা‘লাব-এর আমালি ইত্যাদি এ ধরনেরই রচনা।

যখন স্বাভাবিকের তুলনায় অধিকসংখ্যক শিক্ষার্থী পাঠচক্রে সমবেত হতো, তখন শিক্ষকের সামনে কয়েকজন জ্ঞানী ও যোগ্য ব্যক্তি উচ্চস্বরে বক্তব্য পুনরাবৃত্তি করার জন্য দাঁড়িয়ে থাকতেন, যারা দূরে অবস্থানকারী শিক্ষার্থীদের কাছে শিক্ষকের নির্দিষ্ট শব্দগুলো পৌঁছে দিতেন। এঁদের মুস্তামলি বলা হতো।

এই শিক্ষাপদ্ধতি কেবল বর্ণনানির্ভর শাস্ত্রের সঙ্গেই সীমাবদ্ধ ছিল না। অধিকাংশ প্রাচীন পণ্ডিত অ্যারিস্টটলের যুক্তিবিদ্যার গ্রন্থের পাঠদান করতেন। তাঁর বক্তৃতায় শত শত শিক্ষার্থী অংশগ্রহণ করত, যাদের মধ্যে ফারাবিও ছিলেন। তিনি নিজ হাতে কয়েক শত পৃষ্ঠা নকল করেছিলেন।

উচ্চশিক্ষার জন্য সফর

উচ্চশিক্ষার জন্য দূর-দূরান্তের পথ পাড়ি দেওয়া এবং জ্ঞানী ও কৃতী ব্যক্তিদের সান্নিধ্যে পৌঁছে তাঁদের কাছ থেকে উপকৃত হওয়াকে অত্যন্ত জরুরি মনে করা হতো।

তৎকালীন শিল্প ও জ্ঞানচর্চায় পারদর্শী ব্যক্তিদের তালিকা খুঁজে দেখুন—এমন একজনও পাওয়া যাবে না, যিনি শিক্ষা পূর্ণ করার জন্য দুই-চারশ মাইল পথ অতিক্রম করেননি।

সে যুগে এমন কোনো প্রসিদ্ধ পণ্ডিত, যিনি সফরের কষ্ট স্বীকার না করেই নিজের শাস্ত্রে খ্যাতি অর্জন করেছিলেন, তাঁকে সমসাময়িক লোকেরা বিস্ময়ের চোখে দেখত।

বাগদাদ, নিশাপুর ও কর্ডোভা প্রভৃতি শহরে জ্ঞান ও শিল্পের অমূল্য রত্নসম কৃতী ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন; কিন্তু এসব শহরের অধিবাসীরাও পূর্ব ও পশ্চিমের নানা প্রান্তে ঘুরে বেড়ানো ছাড়া থাকতেন না।

আল্লামা মাক্কারির ইতিহাসগ্রন্থের একটি বড় অংশই এমন সব আলিমের জীবনী নিয়ে রচিত, যারা স্পেন থেকে মিসর, শাম ও বাগদাদে গিয়েছিলেন অথবা এসব স্থান থেকে যাত্রা করে স্পেনে প্রবেশ করেছিলেন।

শিক্ষা অর্জনের জন্য মুসলমানরা যে বিপুলতা, উদ্দীপনা ও কর্মতৎপরতার সঙ্গে সর্বদা সফর করে বেড়িয়েছেন, পৃথিবীর ইতিহাসে তার কোনো দৃষ্টান্ত নেই।

বিতর্ক ও আলোচনা সভা

উচ্চশিক্ষার জন্য আরেকটি বিষয় প্রায় অপরিহার্য বলে বিবেচিত হতো- বিতর্ক ও আলোচনা সভায় অংশগ্রহণ করা।

বড় বড় শহরে আলোচনা ও বিতর্কের জন্য বিশেষ সময় ও স্থান নির্ধারিত ছিল। কোনো কোনো আমির এ ধরনের সভা নিজেদের গৃহেও আয়োজন করতেন।

ফিকহ, সাহিত্য, নাহু ইত্যাদি প্রত্যেক শাস্ত্রের জন্য পৃথক পৃথক সভা ছিল। এসব সভায় আলিম ও শিক্ষার্থী-উভয়েই অংশগ্রহণ করতেন। আর বিতর্কিত কোনো বিষয়ের মীমাংসার জন্য একজনকে বিচারক বা সিদ্ধান্তদাতা হিসেবে নির্বাচিত করা হতো।

এসব সভায় তুলনামূলকভাবে ন্যায়বিচার ও সত্যনিষ্ঠার চর্চা অধিক হতো। সাধারণ শিক্ষাক্রম সম্পন্ন করার তুলনায় এগুলো ছিল অনেক বেশি উপকারী ও কার্যকর।

শিক্ষা সমাপ্ত করার পর শিক্ষক শিক্ষার্থীকে একটি লিখিত সনদ প্রদান করতেন। তাতে তার শিক্ষালাভের সংক্ষিপ্ত বিবরণ এবং পাঠদান করার অনুমতি লিপিবদ্ধ থাকত। এই সনদে তিনি তাইলাসান পরিধানের অনুমতিও দিতেন, যা ছিল আলিমদের বিশেষ পোশাক।

শিক্ষার ব্যাপকতার কারণ

শিক্ষার এত ব্যাপক বিস্তারের বহু কারণ ছিল।

১. শিক্ষা ধর্মের অপরিহার্য অংশ হয়ে উঠেছিল

শিক্ষা ধর্মের একটি অপরিহার্য অংশে পরিণত হয়েছিল। কুরআন ও হাদিস যা প্রকৃতপক্ষে ধর্মের মূল ভিত্তি, আরবি ভাষার সঙ্গে বিশেষভাবে সম্পর্কিত। ফলে এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নাহু, সরফ, লুগাত, মা‘আনী এবং আসমাউর রিজালও যেন ধর্মীয় শিক্ষার অপরিহার্য অঙ্গ হয়ে উঠেছিল।

দর্শনও ইলমুল কালামের রূপ ধারণ করে ধর্মীয় জ্ঞান হিসেবে স্বীকৃতি ও মর্যাদা লাভ করেছিল। এ ধারা ক্রমে বিস্তৃত হতে হতে প্রায় প্রত্যেক জ্ঞান ও শিল্পকে নিজের পরিসরের অন্তর্ভুক্ত করে নেয়।

আল্লামা ইবনে খাল্লিকান লিখেছেন, আলিমদের জন্য সর্বপ্রথম যিনি বিশেষ পোশাক নির্ধারণ করেছিলেন, তিনি ছিলেন কাজি আবু ইউসুফ। আলিমদের সেই পোশাকের রীতি এখনো প্রচলিত রয়েছে। তাইলাসান ছাড়াও এ পোশাকের সঙ্গে একটি জুব্বা থাকত, যা বর্তমান যুগের সম্মানিত ব্যক্তিদের পোশাকের সঙ্গে অনেকটা সাদৃশ্যপূর্ণ ছিল। এতে একটি হুডও লাগানো থাকত।

(দেখুন: হাসনুল মুহাদারা, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ২২৬, মিসর মুদ্রণ।)

এখন চিন্তা করুন, এমন একটি জাতি যাদের মধ্যে ইসলামের উদ্দীপনা তখনো নবীন; যাদের শিরায় বনু আদির রক্ত প্রবাহিত; যাদের সাহস ছিল উচ্চ, সংকল্প ছিল দৃঢ়, মনোবল ছিল ব্যাপক, বুদ্ধি ছিল তীক্ষ্ণ এবং উপলব্ধিশক্তি ছিল প্রখর; আর যাদের সাফল্য তাদের উদ্দীপনাকে আরও তীব্র করে তুলেছিল, তারা যখন কোনো কাজে পূর্ণ মনোযোগ ও একাগ্রতার সঙ্গে আত্মনিয়োগ করবে, তখন সেই কাজে তারা কত দূর পর্যন্ত পৌঁছতে পারে?

আরব ছাড়া অন্যান্য যেসব জাতি ইসলাম গ্রহণ করেছিল, ধর্ম তাদের মধ্যেও সেই সক্রিয় আবেগ ও উদ্দীপনা সৃষ্টি করেছিল, যা আরবদের স্বভাবগত বৈশিষ্ট্য ছিল। উপরন্তু, তারা দীর্ঘকাল ধরে সভ্যতা ও সামাজিক জীবনের বিকাশমান পরিবেশে বসবাস করে আসছিল। ফলে শিক্ষার ক্ষেত্রে তারা তাদের শিক্ষক অর্থাৎ আরবদের চেয়েও অধিক অবদান রেখেছিল।

এ কারণেই নাহু, লুগাত, হাদিস, উসূল, ফিকহ ও দর্শনের ইমাম ও অগ্রপথিকদের প্রায় সকলেই ছিলেন অনারব।

আল্লামা ইবনে খালদুন তাঁর মুকাদ্দিমা-য় এ বিষয়ে একটি স্বতন্ত্র আলোচনা লিখেছেন, যার শিরোনাম—

«حَمَلَةُ العِلْمِ فِي الإِسْلَامِ أَكْثَرُهُمْ العَجَمُ»

অর্থাৎ, “ইসলামে জ্ঞানের ধারক-বাহকদের অধিকাংশই অনারব।”

আমাদের অধিকাংশ ভাই, যাঁরা আরব বংশোদ্ভূত, এ কথা হয়তো ঈর্ষা ও বিস্ময়ের সঙ্গে শুনবেন; তবে তাঁদের মুশাহাদা-এ-ওয়াসিতির মতো ধৈর্য ধারণ করা উচিত।

পাদটীকা

হিশাম ইবনে উরওয়ার—বরং স্বয়ং ইবনে কিনাসির—একজন বর্ণনাকারী বলেন, হিশাম আমাকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, “বর্তমান যুগে জ্ঞানের শ্রেষ্ঠ নেতা কে?”

আমি বললাম, “আতা।”

হিশাম জিজ্ঞাসা করলেন, “তিনি কি আরব বংশোদ্ভূত?”

আমি বললাম, “না।”

একইভাবে তিনি শাম, মিসর, জাজিরা, খোরাসান ও বসরার প্রসঙ্গে জিজ্ঞাসা করলেন। আমি মাকহুল, ইয়াজিদ, মাইমুন ও দাহহাকের নাম উল্লেখ করলাম।

হিশাম প্রতিবারই জিজ্ঞাসা করতেন, “তিনি কি আরব বংশোদ্ভূত?” আর আমার মুখ থেকে “না” শব্দটি শুনে তিনি অস্বস্তি ও ব্যাকুলতা প্রকাশ করতেন।

সবশেষে আমি বললাম, “ইবরাহিম নাখয়ি, যিনি কুফার ইমাম, তিনি আরব বংশোদ্ভূত।”

এ কথা শুনে তিনি একটি দীর্ঘ শ্বাস ফেলে বললেন, “আচ্ছা, এতে কিছুটা সান্ত্বনা হলো।”

(ফাতহুল মুগীস, পৃষ্ঠা ৯০।)

ঈসার সম্পর্কেও অনুরূপ ধরনের আরেকটি ঘটনা বর্ণিত হয়েছে।

২. শিক্ষা শুধু মসজিদ ও মাদরাসায় সীমাবদ্ধ ছিল না

শিক্ষা কেবল মসজিদ ও আলিমদের বিশেষ পাঠশালার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। মন্ত্রী, শাসক, সামরিক কর্মকর্তা, উচ্চপদস্থ কর্মচারী- সমাজের প্রত্যেক শ্রেণির মানুষই পড়াশোনা করতেন এবং শিক্ষা দিতেন।

এমনকি মন্ত্রণালয়ের অত্যন্ত ব্যস্ত সময়েও বু আলি ইবনে সিনার কাছে নির্ভরযোগ্য শিক্ষার্থীদের একটি দল উপস্থিত থাকত।

৩. শিক্ষায় স্বাধীনতা

শিক্ষার ক্ষেত্রে ছিল অত্যন্ত স্বাধীনতা। কোনো নির্ধারিত পাঠ্যক্রম মেনে চলা বাধ্যতামূলক ছিল না। একজন ব্যক্তি যে বিশেষ শাস্ত্র বা বিদ্যা অর্জন করতে চাইতেন, তা-ই অধ্যয়ন করতে পারতেন।

কৃতী ও বিদ্বানদের মধ্যে এমন শত শত ব্যক্তি অতিবাহিত হয়েছেন, যারা একটি মাত্র শাস্ত্রে ইমামের মর্যাদায় অধিষ্ঠিত ছিলেন, অথচ অন্যান্য শাস্ত্রে সাধারণ একজন শিক্ষার্থীর পর্যায়েও ছিলেন না।

৪. আমির ও উচ্চপদস্থ ব্যক্তিদের পৃষ্ঠপোষকতা

আমির ও উচ্চপদস্থ ব্যক্তিদের যে শ্রেণি জ্ঞানানুরাগীদের পৃষ্ঠপোষকতা করত, তারা সাধারণত শিক্ষিত ও নির্মল চরিত্রের অধিকারী ছিল। শিক্ষার ব্যাপক প্রসারের এটি ছিল একটি অত্যন্ত বড় কারণ।

সুলতান ও মন্ত্রীদের কথা তো বাদই দিলাম, সামান্যতম কোনো ধনী ও প্রভাবশালী ব্যক্তির দরবারেও শত শত সাহিত্যিক ও বিদ্বান উপস্থিত থাকতেন।

আর যেহেতু তাঁদের বেতন কোনো নির্দিষ্ট কাজের বিনিময়ে দেওয়া হতো না, বরং কেবল তাঁদের ব্যক্তিগত যোগ্যতা ও সর্বজনস্বীকৃত খ্যাতির মূল্য দেওয়া হতো, তাই সমগ্র দেশে যোগ্যতা অর্জন ও খ্যাতি লাভের এক সাধারণ উদ্দীপনা ছড়িয়ে পড়েছিল।

গ্রন্থ রচনার ক্ষেত্রেও স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিভার প্রকাশের পাশাপাশি গবেষণা ও সতর্কতার প্রতি অধিক গুরুত্ব দিতে হতো। কারণ, যাঁদের সামনে এসব রচনা পেশ করা হতো, তাঁরা নিজেরাই ছিলেন চিন্তাশীল ও সূক্ষ্ম সমালোচক।

মাদরাসা প্রতিষ্ঠার পর শিক্ষাব্যবস্থার পরিবর্তন

মাদরাসা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার ফলে হঠাৎ করে শিক্ষাব্যবস্থায় কোনো মৌলিক পরিবর্তন সৃষ্টি হয়নি। শিক্ষার পাঠ্যক্রম প্রায় আগের মতোই ছিল। ব্যক্তিগত শিক্ষার ব্যবস্থাও সাধারণভাবে বহাল ছিল।

এমনকি যতদিন পর্যন্ত এসব প্রতিষ্ঠানের ওপর কোনো অবক্ষয় আসেনি, ততদিন শিক্ষায়ও ব্যাপকতা বজায় ছিল। কিন্তু ধীরে ধীরে এসব মাদরাসায় বিশেষ বিশেষ নিয়মকানুনের অনুসরণ শুরু হয়।

আর উসমানি সাম্রাজ্যের যুগে যেন শিক্ষার জন্য একটি পৃথক আইনই প্রণীত হয়েছিল।

দ্বাদশ শতাব্দীর পূর্বেই শিক্ষা সমাপ্তির জন্য একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারিত হয়ে গিয়েছিল, যা বিভিন্ন দেশের ক্ষেত্রে ভিন্ন ছিল। যেমন মাগরিবে (মরক্কো প্রভৃতি অঞ্চলে) একজন শিক্ষার্থীর জন্য ১৬ বছর শিক্ষা গ্রহণ বাধ্যতামূলক ছিল এবং তিউনিসে ছিল ৫ বছর।

ইমলার পদ্ধতিও ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হয়ে যায়। অষ্টম শতাব্দীতে হাফিজ জয়নুদ্দীন ইরাকি যিনি হাফিজ ইবনে হাজারের শিক্ষক ছিলেন- এই পদ্ধতিকে পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা করেছিলেন এবং প্রায় চারশত মজলিসে এ পদ্ধতিতে পাঠদানও করেছিলেন।

হাফেজ ইবনে হাজার এবং সাখাভী-ও তাঁকে অনুসরণ করেছিলেন, কিন্তু এই বুজুর্গদের (মনীষীদের) সাথেই এর সমাপ্তি ঘটেছিল।

সুয়ূতি এ পদ্ধতিকে পুনরুজ্জীবিত করার ইচ্ছা করেছিলেন; কিন্তু মানুষের অনাগ্রহ দেখে তিনি নিজেই সে ইচ্ছা থেকে বিরত থাকেন।

মাদরাসা ও মাযহাবি প্রভাব

এসব মাদরাসা অধিকাংশই ছিল ধর্মীয় এবং কোনো একটি নির্দিষ্ট মাযহাবের সঙ্গে বিশেষভাবে সম্পর্কিত ছিল।

দারুল উলূম নিজামিয়া কেবল শাফেয়িদের জন্য ছিল। মুস্তানসিরিয়া প্রভৃতি প্রতিষ্ঠানে চার মাযহাবেরই পাঠদান হতো; কিন্তু শিক্ষক ও শিক্ষাক্রম ছিল সম্পূর্ণ পৃথক।

এই বিশেষীকরণ মাযহাবের ওপর একটি সুস্পষ্ট প্রভাব ফেলেছিল। ষষ্ঠ হিজরি শতাব্দীতেই বরং তারও আগে মাযহাবি তাকলিদের ভিত্তি স্থাপিত হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু এসব মাদরাসা যেহেতু তাকে একটি দৃশ্যমান ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছিল, তাই জাতির মধ্যে এর ব্যাপক প্রচলন ঘটে এবং তা অত্যন্ত কঠোরতার সঙ্গে প্রতিষ্ঠিত হয়।

শাহ ওয়ালিউল্লাহ সাহেব ব্যক্তিগত তাকলিদের সূচনা চতুর্থ হিজরি শতাব্দীর পর থেকে বলে উল্লেখ করেছেন। যে কেউ এ সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারেন যে, এসব মাদরাসা- যেগুলো ব্যক্তিগত তাকলিদের সহায়ক ও অনুরূপ ছিল হয় নিজেরাই তাকলিদের জন্ম দিয়েছিল, অথবা অন্তত এর বিকাশ ও দৃঢ় প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল।

মাদরাসাগুলোর প্রাথমিক যুগে এমন আলিমের সংখ্যা প্রচুর ছিল, যাঁরা ইজতিহাদের যোগ্যতা রাখতেন। কিন্তু ধীরে ধীরে তাকলিদের ব্যাপক প্রচলন জ্ঞানচর্চা ও নতুন কিছু উদ্ভাবনের শক্তিকে এতটাই দুর্বল করে দেয় যে, মনে হতে লাগল জাতির মধ্য থেকে ইজতিহাদের যোগ্যতাই বিলুপ্ত হয়ে গেছে।

শাহ ওয়ালিউল্লাহ সাহেব কিতাবুল ইনসাফ-এ অত্যন্ত যথার্থভাবেই লিখেছেন যে, সে যুগে অর্থাৎ পঞ্চম ও ষষ্ঠ হিজরি শতাব্দীতে তাকলিদই অপরিহার্য হয়ে উঠেছিল।

তৃতীয় যুগে শিক্ষার অবনতি

তৃতীয় যুগে আরেকটি বিষয় শিক্ষাব্যবস্থাকে অত্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত করেছিল। যেসব শাস্ত্র মূল উদ্দেশ্য ছিল না, যেমন- নাহু, সরফ, মানতিক এবং এজাতীয় অন্যান্য বিষয়- সেগুলোর শিক্ষায় এমন ব্যাপক আয়োজন ও সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম আলোচনা শুরু হয়ে গেল যে, জীবনের একটি বড় অংশ কেবল এগুলোর পেছনেই ব্যয় হয়ে যেত।

ফলে যেসব জ্ঞানের পূর্ণতা অর্জনই ছিল শিক্ষার মূল লক্ষ্য, সেগুলোর প্রতি যথাযথ মনোযোগ দেওয়ার মতো সময় আর অবশিষ্ট থাকত না।

গ্রন্থ রচনার আধিক্য এবং সেসব গ্রন্থকে পাঠ্যক্রমের অন্তর্ভুক্ত করাও শিক্ষার ক্ষেত্রে অত্যন্ত ক্ষতিকর প্রভাব ফেলেছিল।

প্রথম ও দ্বিতীয় যুগে মূলত বিষয় ও শাস্ত্রের শিক্ষা দেওয়া হতো; কিন্তু তৃতীয় যুগে গ্রন্থকেন্দ্রিক শিক্ষাব্যবস্থার ভিত্তি স্থাপিত হয়।

এতে জ্ঞানগত বিষয় ও সমস্যার চেয়ে গ্রন্থের عبارت এবং তার সংশ্লিষ্ট বিষয়াদি নিয়েই বেশি আলোচনা করা হতো।

আমাদের ভারতবর্ষে তো আরও এমন অবস্থা ছিল যে, শিক্ষাগত মর্যাদা, তাকলিদ এবং ব্যক্তি ও যুগবিশেষের অনুসরণের সংকীর্ণ গণ্ডি থেকে শুধু শিক্ষার্থীরাই নয়, অধিকাংশ আলিমও কখনো বের হতে পারেননি।

দর্শন ও যুক্তিবিদ্যার প্রতি অনীহা

এসব মাদরাসায়- তুর্কি মাদরাসাগুলো ব্যতীত দর্শন ও যুক্তিবিদ্যার শিক্ষার প্রতি খুব কম গুরুত্ব দেওয়া হতো। অধিকাংশ মাদরাসায় জ্ঞানের বিভিন্ন শাখার মধ্যে ভারসাম্যও প্রতিষ্ঠিত হতে পারেনি।

তবে এর দায় কেবল এসব মাদরাসার ওপর আরোপ করা যায় না; বরং জাতির সেই ধর্মীয় নেতৃবর্গের ওপরও বর্তায়, যাঁরা ধর্মীয় বা পার্থিব উভয় দিক থেকেই জাতির নেতৃত্বে ছিলেন।

আমরা পূর্বেই লিখেছি যে, মুসলমানদের মধ্যে জ্ঞানচর্চার ভিত্তি ধর্মের বুনিয়াদের ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এর অনিবার্য ফল ছিল এই যে, ধর্মীয় নেতৃবর্গের ইজতিহাদি মতামত যেদিকে মোড় নিত, জ্ঞানচর্চাও সেদিকেই অগ্রসর হতো।

এ কারণেই ইসলামী সাম্রাজ্যের প্রতিটি অঞ্চলে সময়ে সময়ে দর্শনকে নানা আঘাত সহ্য করতে হয়েছে।

দর্শন চর্চায় নিষেধাজ্ঞা 

আব্বাসি খলিফা আল-মুকতাদির বিল্লাহ, যিনি ২৯৬ হিজরিতে সিংহাসনে আরোহণ করেন, তিনি প্রথম বছরেই একটি ফরমান জারি করেন যে, বই বিক্রেতারা যেন দর্শনের বই বিক্রি না করে।

ইবনে রুশদকেও তাঁর দার্শনিক রচনাসমূহ থেকে নিজেকে অস্বীকার করতে বাধ্য হতে হয়েছিল; কারণ আল-মুওয়াহহিদ শাসকবংশ মরক্কোর সুলতানদের সেই রাজবংশ- এই অপরাধে তাঁকে কারারুদ্ধ করেছিল।

এই একই বংশের আরেক শাসক, যার নাম ছিল মামুন, হাকিম ইবনে হাবীবকে হত্যা করিয়েছিল।

উসমানি সাম্রাজ্যেও একজন মুফতি সাহেব দর্শনের পাঠদান বন্ধ করিয়ে দিয়েছিলেন।

যুক্তিবিদ্যার নিষেধাজ্ঞা 

হাফিজ জালালুদ্দীন সুয়ূতি যুক্তিবিদ্যা চর্চার অবৈধতা প্রমাণে একটি স্বতন্ত্র গ্রন্থই রচনা করেছিলেন, যার নাম-

«القول المشرق في تحريم الاشتغال بالمنطق»

আল্লামা ইবনুস সালাহও এ বিষয়ে একটি ফতোয়া লিখেছিলেন।

আল্লামা ইবনে তাইমিয়্যা হারুনুর রশিদের প্রতি সর্বদা করুণা প্রকাশ করতেন। তিনি বলতেন, এই অপরাধের কারণে অর্থাৎ দর্শনের প্রচলন ঘটানোর অপরাধে আল্লাহ তাঁর কাছে কী জবাবদিহি চাইবেন?

স্পেনে আমির ও অভিজাত শ্রেণি দর্শনের সমর্থক ছিল; কিন্তু সাধারণ মানুষের ক্ষোভের ভয়ে এ জ্ঞানকে কখনো পূর্ণ স্বাধীনতা দেওয়া হয়নি।

তবু আমাকে স্বীকার করতেই হবে যে, দর্শনের সমর্থকদের সংখ্যা, সাধারণ জনগণের কথা বাদ দিলেও এর বিরোধীদের চেয়ে বেশি ছিল।

ধর্মীয় শিক্ষার প্রভাব ও প্রাচীন আরবির সংরক্ষণ

ধর্মীয় শিক্ষার একটি প্রভাব, যা সর্বযুগে প্রকাশিত হয়েছে, তা হলো, প্রাচীন আরবি ভাষা অত্যন্ত যত্নের সঙ্গে সংরক্ষিত থেকেছে।

অথচ বহুদিন ধরেই প্রাচীন আরবি কোনো দেশের সাধারণ ভাষা ছিল না, সরকার বা রাষ্ট্রের ভাষাও ছিল না। পারস্য ও খোরাসানের সাধারণ ভাষা ছিল ফারসি।

বাগদাদে খলিফা নামে পরিচিত আব্বাসিদের জাঁকজমক ও কর্তৃত্ব বাগদাদ নগরের প্রাচীর পর্যন্তই সীমাবদ্ধ ছিল। শাসনক্ষমতা ছিল দাইলামি বা সেলজুকিদের হাতে, যারা ভাষা ও বংশ- উভয় দিক থেকেই অনারব ছিল।

মিসর ও শাম দীর্ঘকাল আইয়ুবি, নূরিয়া ও চেরকেসদের শাসনাধীন ছিল, আর এরা সকলেই ছিল অনারব।

পশ্চিমাঞ্চলীয় দেশগুলোতে যেমন মরক্কো, তিউনিস প্রভৃতিতে বারবার ও বারাতা গোত্রের শাসন ছিল।

এমনকি স্বয়ং আরবেও প্রাচীন আরবির প্রচলন আর অবশিষ্ট ছিল না।

এই ভাষা ও সাহিত্যরীতির জীবিত থাকার কোনো বাহ্যিক অবলম্বন ছিল না। কিন্তু কেবল এ কারণে যে, পবিত্র কুরআন ও হাদিস এই ভাষায় ছিল, প্রাচীন এই ভাষাকে তেরো শতাব্দীর দীর্ঘ জীবন দান করেছে। আর আল্লাহর কাছে আশা করি, তিনি কিয়ামত পর্যন্ত একে সংরক্ষিত রাখবেন।

এ বিষয়ে নিঃসন্দেহে দুঃখের কথা হলো, এই একমুখী মনোযোগ আমাদের বর্তমান আরবি ভাষা থেকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত রেখেছে।

আজ প্রায় ছয়শ বছর ধরে আরবদের ভাষা সম্পূর্ণরূপে পরিবর্তিত হয়ে গেছে। শত শত নতুন শব্দের অন্তর্ভুক্তি, বিভিন্ন পারিভাষিক পরিবর্তন ও রূপান্তর, নতুন নতুন বাগ্‌ধারার ব্যবহার- এসব তো এক দিকেই থাক; এমনকি ই‘রাব ও বাক্যগঠনের সেই পুরোনো অবস্থাও আর অবশিষ্ট নেই।

বর্তমান কথ্যভাষা যেন স্বপ্নেও বিবেচনার বিষয় হয়ে ওঠেনি। প্রায় পাঁচশ বছর ধরে আরবরা এই নতুন ভাষাতেই কবিতা ও কাসিদা রচনা করে আসছে। তাদের ফসিহ ও বালিগ ভাষণেরও সন্ধান এ ভাষাতেই পাওয়া যায়।

লোকেরা শুনে বিস্মিত হবে যে, এসব কাসিদা যদি ই‘রাবসহ পড়া হয়, তাহলে সেগুলো আর ছন্দোবদ্ধ থাকে না।

দুঃখের বিষয়, এই স্বতন্ত্র আধুনিক ভাষাটির প্রতি কেউ মনোযোগ দেয়নি। ফলে এসব কবিতা ও ভাষণ বোঝার জন্য আমাদের কাছে কোনো অভিধানও বিদ্যমান নেই।

কতই না দুঃখ ও লজ্জার বিষয় যে, আধুনিক আরবি ভাষার এসব অভিধানের জন্য আমাদের খ্রিস্টান পণ্ডিতদের দ্বারস্থ হতে হয়।

যেমন পিটার ভেটার্স, যিনি অত্যন্ত গবেষণার সঙ্গে আল-মুহীতুল মুহীত রচনা করেছেন; এবং ইংরেজ লেন সাহেব, যার আল-কামুস-এর খণ্ডগুলো লন্ডনে মুদ্রিত হয়েছে।

ইসলামী বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বৈশিষ্ট্য

ইসলাম যে বিশাল পৃথিবীর ওপর শাসন প্রতিষ্ঠা করেছিল, তার মধ্যে ভৌগোলিকভাবে নানা দেশ অন্তর্ভুক্ত ছিল এবং বহু জাতি সেখানে বসবাস করত।

ইসলামী সাম্রাজ্য যদিও প্রতিটি অঞ্চলে প্রায় সমানভাবে জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দিয়েছিল, তথাপি দেশ ও জাতির স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য জ্ঞানচর্চায় বিভিন্ন রূপ সৃষ্টি করেছিল।

ইরান

ইরান বর্ণনানির্ভর শাস্ত্রের পাশাপাশি বুদ্ধিবৃত্তিক ও যুক্তিবিষয়ক জ্ঞানকে উৎকর্ষের চরম শিখরে পৌঁছে দিয়েছিল।

মিসর ও শাম

মিসর ও শামে ফিকহ, হাদিস এবং আসমাউর রিজালের প্রতি অধিক মনোযোগ দেওয়া হতো।

হাফিজ জালালুদ্দীন সুয়ূতি সেখানে দর্শনের প্রভাব প্রবল না থাকাকে জ্ঞানগত উৎকর্ষের একটি বড় কারণ বলে মনে করেছেন।

স্পেন

স্পেনে সাহিত্য, কবিতা ও ইতিহাসের অধিক বিকাশ ঘটেছিল। এমনকি ছেলেদের কুরআন পড়ার সময়ই কবিতা ও প্রবাদ-প্রবচন মুখস্থ করানো হতো।

পক্ষান্তরে, এসব আঞ্চলিক বৈশিষ্ট্যের পেছনে সংশ্লিষ্ট জাতিগুলোর স্বভাবগত বৈশিষ্ট্যেরও প্রভাব ছিল।

ইরানিদের মস্তিষ্কের সূক্ষ্মতা, বিশ্লেষণক্ষমতা ও গভীর বিষয় অনুধাবনের দক্ষতা দর্শন ও যুক্তিবিদ্যার জন্য অত্যন্ত উপযোগী ছিল।

মিসর ও শাম হাদিসের ঐতিহ্য ও পরিবেশের অধীন ছিল। এ কারণে তাদের শক্তিশালী স্মৃতিশক্তি এবং মধ্যম ধরনের বুদ্ধিবৃত্তিক প্রবণতা হাদিস ও আসমাউর রিজালকে অধিক গ্রহণ করেছিল।

স্পেন আরবীয় বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে মিসর ও শামের সমপর্যায়ের ছিল। কিন্তু সেখানে দীর্ঘকাল আরব বংশের শাসন অব্যাহত থাকার কারণে যারা কবিতা ও কাব্যচর্চাকে অত্যন্ত ভালোবাসত- স্পেনে সাহিত্য ও কবিতা বিশেষভাবে বিকশিত ও উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল।

শামেও আল-ই-হামদানের যুগে যাঁরা সাধারণভাবে খ্যাতিমান ছিলেন- কবিতার মান অত্যন্ত উচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছিল।

রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রভাব

ইসলামী দেশসমূহে ঘন ঘন যে রাজনৈতিক পরিবর্তন ও শাসন-পরিবর্তন ঘটত, তা উচ্চতর উদ্দেশ্য ও জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রে প্রায়ই উপকারী প্রমাণিত হতো।

ইবনে খালদুন তাঁর মুকাদ্দিমায় এ আলোচনার ওপর একাধিক স্বতন্ত্র প্রবন্ধ লিখেছেন।

তিনি এ নতুন ভাষায় রচিত বহু কবিতাও উদ্ধৃত করেছেন, যেগুলো কবিরা রচনা করেছিলেন এবং যাতে ই‘রাবের কোনো চিহ্নই নেই।

একটি শাসকবংশ সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস হয়ে গেলেও তাদের রেখে যাওয়া জ্ঞানচর্চার নিদর্শনগুলো অনেক সময় সংরক্ষিত থাকত।

যেসব স্থান ও অঞ্চল পূর্ব থেকেই মাদরাসার জন্য ওয়াক্‌ফ করা ছিল, পরবর্তী নতুন সরকার সেগুলো দখল করতে পারত না।

হালাকু খান শুধু বাগদাদ ধ্বংস করেননি; তিনি বহু বছর ধরে সমগ্র ইসলামী দেশগুলোকে যেন জ্ঞানের আলোহীন করে দিয়েছিলেন। তথাপি তিনি ওয়াক্‌ফসম্পত্তিতে বিশেষ হস্তক্ষেপ করতে পারেননি।

তিনি বাগদাদ প্রভৃতির সমস্ত ওয়াক্‌ফের দায়িত্ব গবেষক তুসির হাতে অর্পণ করেছিলেন। এর একটি বিরাট অংশ উক্ত গবেষক মানমন্দির নির্মাণে ব্যয় করেছিলেন।

ইসলামী দেশসমূহে যখনই কোনো নতুন সরকার প্রতিষ্ঠিত হতো, তখন নিজের শাসনকে সুদৃঢ় করা এবং মর্যাদা ও প্রতিপত্তি প্রতিষ্ঠার জন্য তাদের পক্ষে মাদরাসা নির্মাণ ও জ্ঞানের প্রসারে পূর্ববর্তী সরকারের তুলনায় অধিক উদারতা প্রদর্শন করা প্রায় অপরিহার্য হয়ে পড়ত।

ব্যবহারিক শিক্ষার অভাব

এ বিষয়টি একই সঙ্গে বিস্ময়কর ও দুঃখজনক যে, সেই প্রাচীন শিক্ষাব্যবস্থা যার প্রভাব আজও ভারতবর্ষে বিদ্যমান- ব্যবহারিক শিক্ষা থেকে সম্পূর্ণ শূন্য ছিল।

শিক্ষাক্রমে ব্যবহারিক শিক্ষাসংক্রান্ত কোনো গ্রন্থ অন্তর্ভুক্ত ছিল না। ইতিহাসের গ্রন্থ পড়ানো হলেও তা ইতিহাস হিসেবে নয়; বরং ইনশা বা রচনাশৈলী শেখানোর দৃষ্টিকোণ থেকে পড়ানো হতো।

শিক্ষার্থীদের সরল ও আন্তরিক জীবনযাপন, পার্থিব আকাঙ্ক্ষা থেকে মুক্ত থাকা এবং নিঃস্বার্থ জ্ঞানানুরাগ- যেমন জ্ঞানগত উৎকর্ষ অর্জনের জন্য অত্যন্ত উপকারী ছিল, তেমনি তাদের রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক বিষয়াবলি থেকে দূরে সরিয়ে রাখত।

আমাদের পক্ষে এমন কথা বলার সাহস হয় না; কিন্তু আল্লামা ইবনে খালদুন বলেন, সম্ভবত কারণ ব্যাখ্যায় আমরা ভুল করছি-

«إِنَّ الْعُلَمَاءَ مِنْ بَيْنِ الْبَشَرِ أَبْعَدُ النَّاسِ عَنِ السِّيَاسَةِ»

অর্থাৎ, “মানুষের মধ্যে আলিমগণই রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনা থেকে সবচেয়ে দূরে থাকেন।”

মাদরাসার বাইরেও ইসলামী জ্ঞানচর্চা

আমরা এই সংক্ষিপ্ত আলোচনায় মাদরাসাগুলোর অবস্থা সম্পর্কে কিছু বিবরণ দিয়েছি; তবে আমরা স্পষ্ট করে দিতে চাই যে, ইসলামী শিক্ষার প্রকৃত ব্যাপ্তি নির্ণয়ের জন্য এটি অত্যন্ত ক্ষুদ্র একটি মাপকাঠি।

আমাদের জ্ঞানগত উদারতা ও উদ্ভাবনকে কেবল মাদরাসার প্রাচীরের মধ্যে সীমাবদ্ধ রেখে খুঁজলে চলবে না; বরং তার সন্ধান করতে হবে মাদরাসার গণ্ডির বাইরেও।

মাদরাসার সংখ্যা বিপুল ছিল বটে, কিন্তু আলমগীরের যুগেও হাজার হাজার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা প্রকৃত জ্ঞানচর্চার ব্যাপকতা বোঝানোর জন্য যথেষ্ট নয়।

৫৭৩ হিজরিতে, যখন মিসর মাদরাসা ও দারুল উলূমে পরিপূর্ণ ছিল, তখন স্বয়ং মিসরের একটি জামে মসজিদে চল্লিশটিরও অধিক পাঠচক্র ছিল, যেখানে সব ধরনের জ্ঞান ও শিল্পকলা শিক্ষা দেওয়া হতো।

লেখকের মন্তব্য

আমি এই প্রবন্ধে ইচ্ছাকৃতভাবেই পূর্বসূরিদের কীর্তি ও অবদান অত্যধিক জাঁকজমকের সঙ্গে বর্ণনা করা থেকে বিরত থেকেছি।

আজ জাতির অবস্থা এমন যে, যতটুকু লেখা হয়েছে, তাও তাদের চেহারায় কোনো উজ্জ্বলতা এনে দেয় না। পূর্বসূরিদের গৌরবগাথা আমরা আর কতটুকুই বা উল্লেখ করতে পারি?

আমরা নিজেরা যখন কিছুই করতে পারিনি, তখন পূর্বসূরিরা অনেক কিছু করেছিলেন- এ কথা বলেই বা কী লাভ?

«گرفتم کہ حرفیاں بیش یا کم میتوان گفت
ز وسعت با چه آمد آخر نمی توان گفت»
ধরে নিলাম, কিছু কথা কমবেশি বলা যেতে পারে; কিন্তু তার ব্যাপকতার পূর্ণ বিবরণ শেষ পর্যন্ত ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়।

🔹🔹🔹

👉 আরও পড়ুন উন্নতি ও সফলতার মূলতত্ত্ব

আরও পোস্ট

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Back to top button
error: Content is protected !!