
আহার করানোর ফযীলত – ইসলামে উত্তম চরিত্র অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। এর অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রকাশ হলো খাবার খাওয়ানো।
ক্ষুধার্তকে আহার করানো, মেহমানকে আপ্যায়ন করা এবং আল্লাহর বান্দাদের প্রয়োজন পূরণ করা—এসব আমল কেবল সামাজিক সৌহার্দ্যই সৃষ্টি করে না, বরং আখিরাতে বড় সওয়াবের কারণ হয়।
রাসূলুল্লাহ ﷺ নিজে এ বিষয়ে বিশেষ উৎসাহ দিয়েছেন এবং সাহাবায়ে কেরামও এ আমলে অগ্রগামী ছিলেন।
মুহাদ্দিসে কাবীর ইমাম তাবরানী রহিমাহুল্লাহ তাঁর হাদিস সংকলনে খাবার খাওয়ানোর মর্যাদা, ফজিলত এবং এর মাধ্যমে ঈমানী চরিত্র গঠনের গুরুত্ব তুলে ধরেছেন।
ইমাম তাবরানী (রহ) রচিত মাকারিমুল আখলাক গ্রন্থ থেকে অনূদিত।
দারুস সাআদাত অনুবাদ ও প্রকাশনা
بَابُ فَضْلِ إِطْعَامِ الطَّعَامِ
পরিচ্ছেদঃ খাবার খাওয়ানোর ফযীলত
রাসুলুল্লাহ (সা) এর উপদেশ
রিওয়ায়াত :১৫৩ হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে সালাম (রা) বলেন, যখন রাসূলুল্লাহ (সা) মদীনায় তাশরীফ আনেন, তখন লোকেরা দ্রুত তাকে দেখতে গমন করেন।
যখন আমি নবী (সা) এর চেহারা দেখলাম, তখন দেখেই বুঝে ফেললাম যে এটা কোন মিথ্যাবাদীর চেহারা নয়। সর্বপ্রথম কথা যা আমি তার থেকে শুনেছি তা হল-
أَطْعِمُوا الطَّعَامَ، وَأَفْشُوا السَّلَامَ، وَصِلُوا الْأَرْحَامَ، وَصَلُّوا وَالنَّاسُ نِيَامٌ، تَدْخُلُوا الْجَنَّةَ بِسَلَامٍ
হে লোক সকল! খাবার খাওয়াও, সালামের প্রসার কর এবং নিজেরে আত্মীয়-স্বজনের সাথে উত্তম আচরণ কর। আর যখন মানুষ ঘুমিয়ে থাকে তখন নামায পড়। তাহলে নিরাপদে বেহেশতে চলে যাবে।
সহজ আমল
রিওয়ায়াত :১৫৪ হযরত উবাদাহ ইবনে সামিত (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সা) এর দরবারে উপস্থিত হয়ে আরয করল, (ইয়া রাসূলাল্লাহ!) উত্তম ইমান কোনটি?
রাসূলুল্লাহ (সা) বললেন,
إِيمَانٌ بِاللَّهِ، وَتَصْدِيقٌ بِهِ، وَجِهَادٌ فِي سَبِيلِهِ، وَحَجٌّ مَبْرُورٌ» ، فَلَمَّا وَلَّى دَعَاهُ، فَقَالَ: «وَأَهْوَنُ مِنْ ذَلِكَ إِطْعَامُ الطَّعَامِ، وَلِينُ الْكَلَامِ
আল্লাহর উপর ইমান আনা, তার সত্যায়ন করা, আল্লাহর পথে জিহাদ করা আর মকবুল হজ। যখন সে চলে যেতে লাগল তখন তিনি তাকে ডেকে বললেন, এরচেয়ে বেশী সহজ হল, খাবার খাওয়ানো এবং নম্র কথা বলা।
ফায়দা
এই হাদীস থেকে বোঝা যায়, বড় বড় ইবাদতের পাশাপাশি সহজ আমলও আল্লাহর নিকট অত্যন্ত মূল্যবান।
মানুষকে খাবার খাওয়ানো এবং কোমল ও নম্রভাবে কথা বলা এমন আমল, যা সহজ হলেও মানুষের হৃদয় জয় করে এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের মাধ্যম হয়।
ইসলাম কি?
রিওয়ায়াত : ১৫৫ হযরত আমর ইবনে আবাসাহ আস সুলামী (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সা) এর নিকট জিজ্ঞাসা করলাম, ইসলাম কি? তিনি বললেন-
إِطْعَامُ الطَّعَامِ، وَلِينُ الْكَلَامِ
খাবার খাওয়ানো ও নম্র কথা বলা।
আমি আরয করলাম ইমান কি?
তিনি (সা) বললেন,
الصَّبْرُ وَالسَّمَاحَةُ
ধৈর্য ও সহৃদয়তা।
ফায়দা
এই হাদীস আমাদের শিক্ষা দেয় যে, ইসলামের সৌন্দর্য মানুষের উপকার করা ও সুন্দর আচরণে প্রকাশ পায়।
ক্ষুধার্তকে খাবার খাওয়ানো এবং সবার সাথে নম্রভাবে কথা বলা একজন মুসলিমের উত্তম গুণ। আর প্রকৃত ঈমানের নিদর্শন হলো বিপদে ধৈর্য ধারণ করা এবং মানুষের প্রতি উদার ও ক্ষমাশীল হওয়া।
যে আহার করায় সে উত্তম
রিওয়ায়াত: ১৫৬ হযরত সুহায়ব বিন সিনান (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সা)-কে বলতে শুনেছি-
خِيَارُكُمْ مَنْ أَطْعَمَ الطَّعَامَ
তোমাদের মধ্যে উত্তম সে, যে খাবার খাওয়ায়।
ফায়দা
এই হাদীস থেকে বোঝা যায়, মানুষের উপকার করা এবং ক্ষুধার্তকে খাবার খাওয়ানো মহান আমল। যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য মানুষকে আহার করায়, সে মানুষের কাছে প্রিয় হয় এবং আল্লাহর কাছেও উত্তম বান্দা হিসেবে গণ্য হয়।
আল্লাহর ক্ষমা লাভের উপায়
রিওয়ায়াত : ১৫৭ হযরত জাবির (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেন-
مِنْ مُوجِبَاتِ الْمَغْفِرَةِ: إِطْعَامُ الْمُسْلِمِ السَّغْبَانِ
মাগফিরাতের উপায়সমূহের একটি উপায় হল, ক্ষুধার্থ মুসলমানকে খাবার খাওয়ানো।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন-
فِي يَوْمٍ ذِي مَسْغَبَةٍ
অথবা দুর্ভিক্ষের দিনে আহার্য দান।– [সূরা আল বালাদ ১৪]
অপর বর্ণনা
রিওয়ায়াত : ১৫৮ হযরত মিকদাম ইবনে শুরায়হ (রহ) তার পিতা থেকে, আর তিনি তার দাদা থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেন,
إِنَّ مِنْ مُوجِبَاتِ الْمَغْفِرَةِ: إِطْعَامَ الطَّعَامِ وَبَذْلَ السَّلَامِ
মাগফিরাতের উপায়সমূহের মধ্যে রয়েছে- খাবার খাওয়ানো এবং সালামের প্রসার করা।
ফায়দা
এই হাদীস ও আয়াত থেকে জানা যায়, ক্ষুধার্ত মানুষকে খাবার খাওয়ানো আল্লাহর নিকট অত্যন্ত প্রিয় আমল এবং গুনাহ মাফের একটি মাধ্যম।
বিশেষ করে অভাব ও দুর্ভিক্ষের সময়ে মানুষের পাশে দাঁড়ানো বড় নেক কাজ। তাই সামর্থ্য অনুযায়ী ক্ষুধার্তদের সাহায্য করা একজন মুমিনের দায়িত্ব।
জাহান্নাম থেকে মুক্তি
রিওয়ায়াত : ১৫৯ হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আমর (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেন- যে ব্যক্তি তার মুসলমান ভাইকে খাবার খাওয়ায় এবং সে পরিতৃপ্ত হয়, পানি পান করায় এবং সে পরিতৃপ্ত হয়,তবে আল্লাহ তাআলা খাবার খাওয়ানেওয়ালাকে জাহান্নাম থেকে সাত খন্দক দূরত্ব তৈরি করবেন। আর প্রত্যেক খন্দকের মাঝে ১০০ বছরের দূরত্ব রয়েছে।
যে পর্যন্ত দস্তরখান বিছানো থাকে
রিওয়ায়াত: ১৬০ হযরত আয়িশা (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেন-
«لَا تَزَالُ الْمَلَائِكَةُ تُصَلِّي عَلَى الرَّجُلِ مَا دَامَتْ مَائِدَتُهُ مَوْضُوعَةً»
যে পর্যন্ত বান্দার দস্তরখান বিছানো থাকে, সে পর্যন্ত ফেরেশতারা তার জন্য মাগফিরাতের দুআ করতে থাকে।
ফায়দা
এই হাদীস মেহমানদারি ও মানুষকে খাবার খাওয়ানোর ফযীলত বর্ণনা করে। যে ব্যক্তি অন্যদের জন্য খাবারের ব্যবস্থা করে, তার জন্য ফেরেশতারা দোয়া করতে থাকেন। তাই মানুষকে আপ্যায়ন করা ও খাবারে শরিক করা বরকত ও রহমতের কাজ।
আল্লাহর নিকট সবচেয়ে পছন্দনীয় খাবার
রিওয়ায়াত: ১৬১ হযরত জাবির (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেন-
أَحَبُّ الطَّعَامِ إِلَى اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ مَا كَثُرَتْ عَلَيْهِ الْأَيْدِي
আল্লাহর নিকট সবচেয়ে পছন্দনীয় খাবার হল যার মধ্যে আহারকারী বেশী হয়।
ফায়দা
এই হাদীস আমাদেরকে মিলেমিশে খাওয়া ও অন্যকে খাবারে শরিক করার শিক্ষা দেয়। যে খাবারে বেশি মানুষ অংশ নেয়, তাতে ভালোবাসা, ভ্রাতৃত্ব ও বরকত বৃদ্ধি পায়। তাই একা না খেয়ে পরিবার, আত্মীয় ও অভাবীদের সাথে খাবার ভাগাভাগি করা উত্তম আমল।
মেহমানের বরকত
রিওয়ায়াত: ১৬২ হযরত আয়িশা (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেন-
الْخَيْرُ أَسْرَعُ إِلَى الْبَيْتِ الَّذِي يُغْشَى مِنَ الشَّفْرَةِ إِلَى سَنَامِ الْبَعِيرِ
যেই ঘরে মেহমান হয়, ঐ ঘরে- উটের কুঁজের দিকে দ্রুত ধাবমান ছুরির চেয়েও দ্রুত কল্যাণ প্রবেশ করে।
ফায়দা
এই হাদীস মেহমানদারির গুরুত্ব ও ফযীলত বর্ণনা করে। যে ঘরে মেহমানের আপ্যায়ন করা হয়, সেখানে দ্রুত রহমত, বরকত ও কল্যাণ নাযিল হয়। তাই আন্তরিকতার সাথে মেহমানকে সম্মান ও আপ্যায়ন করা ইসলামের সুন্দর শিক্ষা।
যে তার মুসলিম ভাইয়ের ক্ষুধা নিবারণ করে
রিওয়ায়াত: ১৬৩ হযরত আনাস (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেন-
مَنِ اهْتَمَّ لِجَوْعَةِ أَخِيهِ الْمُسْلِمِ فَأَطْعَمَهُ حَتَّى يَشْبَعَ غُفِرَ لَهُ
যে ব্যক্তি তার মুসলমান ভাইয়ের ক্ষুধা নিবারণের ব্যবস্থা করে এবং তাকে আহার করায়, এমনকি সে পরিতৃপ্ত হয়ে যায়, তাহলে আল্লাহ তাআলা তাকে ক্ষমা করে দেন।
যে ক্ষুধার্তকে খাবার খাওয়ায়
রিওয়ায়াত:১৬৪ হযরত জাবির বিন আব্দুল্লাহ (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেন-
مَنْ أَطْعَمَ الْجَائِعَ أَظَلَّهُ اللَّهُ فِي ظِلِّ عَرْشِهِ
যে ব্যক্তি ক্ষুধার্তকে খাবার খাওয়ায়, আল্লাহ তাআলা তাকে আরশের ছায়ায় স্থান দিবেন।
ফায়দা
এই হাদীস থেকে বোঝা যায়, ক্ষুধার্তকে খাবার খাওয়ানো অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ আমল। যারা মানুষের কষ্ট দূর করে এবং অভাবীদের সাহায্য করে, আল্লাহ তাআলা কিয়ামতের কঠিন দিনে তাদের বিশেষ রহমত ও নিরাপত্তা দান করবেন।
আল্লাহ তাআলা ক্ষুধার্ত আত্মা শীতলকারীকে ভালবাসেন
রিওয়ায়াত: ১৬৫ হযরত যারবী আবু ইয়াহয়া বলেন, আমি হযরত আনাস (রা)-কে বলতে শুনেছি, রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেছেন,
إِنَّ اللَّهَ عَزَّ وَجَلَّ يُحِبُّ عَبْدًا بَرَّدَ كَبِدًا جَائِعَةً
আল্লাহ তাআলা ক্ষুধার্ত আত্মা শীতলকারীকে ভালবাসেন।
ফায়দা
এই হাদীস আমাদের শেখায়, ক্ষুধার্ত মানুষকে খাবার দিয়ে তার কষ্ট দূর করা আল্লাহর নিকট অত্যন্ত প্রিয় কাজ। যে ব্যক্তি মানুষের অভাব লাঘব করে এবং তাদের শান্তি দেয়, আল্লাহ তাআলা তাকে ভালোবাসেন।
মিষ্টান্ন খাওয়ানো
রিওয়ায়াত: ১৬৬ হযরত আনাস (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেন-
مَنْ لَقَّمَ أَخَاهُ لُقْمَةً حُلْوًا صَرْفَ اللَّهُ عَنْهُ مَرَارَةَ الْمَوْقِفِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ
যে ব্যক্তি তার মুসলমান ভাইকে কোন মিষ্টি বস্তু খাওয়াবে, আল্লাহ তাআলা তার থেকে হাশরের কষ্ট দূর করে দিবেন।
ফায়দা
এখানে বিশেষভাবে মিষ্টি বস্তু (حُلْوًا) এর কথা বলা হয়েছে। কারণ মিষ্টি খাবার সাধারণত আনন্দ, ভালোবাসা ও আপ্যায়নের প্রতীক।
হাদীসের উদ্দেশ্য হলো— কাউকে খুশি করা, আন্তরিকতার সাথে আপ্যায়ন করা এবং ভালোবাসা বৃদ্ধি করা। তাই সামান্য মিষ্টি কিছু খাওয়ালেও এর সওয়াব ও ফযীলত অনেক।
জান্নাতের স্বচ্ছ বালাখানা যার জন্য
রিওয়ায়াত: ১৬৭ হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আমর (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেন-
إِنَّ فِي الْجَنَّةِ غُرُفًا يُرَى ظَاهِرُهَا مِنْ بَاطِنِهَا، وَبَاطِنُهَا مِنْ ظَاهِرِهَا
নিশ্চয়ই জান্নাতে এমন বালাখানা রয়েছে যার ভিতরের দৃশ্য বাহির থেকে এবং বাহিরে দৃশ্য ভিতর থেকে দেখা যায়।
সাহাবীগণ আরয করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! এটা কার জন্য? তিনি (সা) বললেন,
لِمَنْ أَطَابَ الْكَلَامَ، وَأَطْعَمَ الطَّعَامَ، وَبَاتَ قَائِمًا وَالنَّاسُ نِيَامٌ
এটা তার জন্য- যে ভাল কথা বলে, খাবার খাওয়ায় এবং রাতে যখন সবাই ঘুমিয়ে থাকে তখন দাঁড়িয়ে নামায পড়ে।
হজের মত আমল
রিওয়ায়াত: ১৬৮ হযরত জাবির (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা) এর দরবারে আরয করা হল, হজের (মত) কি নেকী রয়েছে?
রাসূলুল্লাহ (সা) বললেন,
إِطْعَامُ الطَّعَامِ، وَلِينُ الْكَلَامِ
খাবার খাওয়ানো ও নম্রভাবে কথা বলা।
সাদকার চেয়ে উত্তম আমল
রিওয়ায়াত: ১৬৯ হযরত বুদায়ল (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেন-
أَنْ أَطْعِمَ أَخَا لِي فِي اللَّهِ لُقْمَةً أَحَبُّ إِلَيَّ مِنْ أَنْ أَتَصَدَّقَ بِعَشَرَةِ دَرَاهِمَ، وَلَأَنْ أُعْطِيَهُ عَشَرَةَ دَرَاهِمَ أَحَبُّ إِلَيَّ مِنْ أَنْ أَعْتِقَ رَقَبَةً
নিশ্চয়ই আমার নিকট আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নিজের (মুসলিম) ভাইকে এক লোকমা খাবার খাওয়ানো, দশ দিরহাম সাদকা করার চেয়ে উত্তম। আর দশ দিরহাম সাদকা করা, আমার নিকট গুলাম আযাদ করার চেয়ে বেশী পছন্দনীয়।
যেভাবে আল্লাহকে পাওয়া যায়
রিওয়ায়াত: ১৭০ হযরত আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেন- আল্লাহ তাআলা কিয়ামতের দিন বলবেন,
হে আদম সন্তান আমি অসুস্থ হয়েছিলাম; কিন্তু তুমি আমার সেবা করনি। সে বলবে, হে পরওয়ারদিগার! আমি কী করে তোমার সেবা করব, অথচ তুমি সারা জাহানের প্রতিপালক।
আল্লাহ বলবেন, তুমি কি জানতে না যে, আমার অমুক বান্দা অসুস্থ হয়েছিল, আর তুমি তার সেবা করনি। যদি তুমি তার সেবা করতে তাহলে অবশ্যই আমাকে সেখানে পেতে।
হে আদম সন্তান আমি তোমার কাছে খাবার চেয়েছিলাম; কিন্তু তুমি আমাকে খেতে দাওনি। সে বলবে, হে আমার পরওয়ারদিগার! আমি কী করে তোমাকে আহার করাতে পারি? তুমি তো সারা জাহানের প্রতিপালক।
আল্লাহ বলবেন, আমার অমুক বান্দা তোমার কাছে আহার চেয়েছিল, কিন্তু তুমি তাকে খেতে দাওনি। যদি তুমি তাকে আহার করাতে তাহলে তা (তার প্রতিদান) অবশ্যই আমার কাছে পেতে।
অতঃপর আল্লাহ তাআলা বলবেন, হে আদম সন্তান! আমি তোমার কাছে পানীয় চেয়েছিলাম; কিন্তু তুমি আমাকে পানি পান করাওনি। সে বলবে, হে আমার পরওয়ারদিগার! আমি কী করে তোমাকে পান করাব, অথচ তুমি সারা জাহানের প্রতিপালক।
আল্লাহ বলবেন, আমার অমুক বান্দা তোমার কাছে পানীয় চেয়েছিল, তুমি তাকে পান করাওনি। যদি তুমি তাকে পান করাতে, তবে তা (তার প্রতিদান) আমার কাছে পেয়ে যেতে।
ফায়দা
এই হাদীস আমাদেরকে মানুষের সেবা ও সাহায্যের গুরুত্ব শিক্ষা দেয়। অসুস্থের সেবা করা, ক্ষুধার্তকে খাবার খাওয়ানো এবং পিপাসার্তকে পানি পান করানো আল্লাহর নিকট অত্যন্ত প্রিয় আমল। যে ব্যক্তি মানুষের প্রয়োজনের সময় পাশে দাঁড়ায়, সে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও মহান প্রতিদান লাভ করে।
আলী (রা) এর পছন্দনীয় আমল
রিওয়ায়াত: ১৭১ হযরত আলী (রা) বলেন, আমার সঙ্গীদেরকে এক সা (পরিমাণ) খাবার খাওয়ানো, আমার নিকট তার থেকে বেশী প্রিয় যে, আমি বাজারে যাব আর একজন দাসী ক্রয় করে তাকে আযাদ করে দিব।
মিসকীনদের প্রতি হুসায়ন (রা) এর মমতা
রিওয়ায়াত: ১৭২ হযরত ইউনূস ইবনে আমর তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, হযরত হুসায়ন (রা) এর স্ত্রী তার নিকট সংবাদ পাঠালেন যে, আমি আপনার জন্য সুস্বাদু খাবার এবং সুগন্ধী প্রস্তুত করেছি।
আপনি আপনার সমজাতীয় লোকদের অনুসন্ধান করে তাদেরকে সাথে করে নিয়ে আসুন। হুসায়ন (রা) মসজিদে গেলেন এবং সেখানে যে মিসকীন ও যাচ্ঞাকারীরা ছিল তাদেরকে সাথে করে নিয়ে ঘরে আসেন।
প্রতিবেশী স্ত্রীলোকেরা তার স্ত্রীর নিকট এসে বলতে লাগল, আল্লাহর শপথ! আপনাদের ঘরে তো মিসকীনরা ভরে গেছে।
হুসায়ন (রা) তার স্ত্রীর নিকট গিয়ে বললেন, আমি তোমাকে ঐ অধিকারের কসম দিয়ে বলছি, তোমার প্রতি আমার যে অধিকার আছে যে, তুমি খাবার ও সুগন্ধী বাঁচিয়ে রাখবে না।
তার স্ত্রী তা-ই করলেন। হুসায়ন (রা) প্রথমে মিসকীনদের খাবার খাওয়ালেন, কাপড় পরিধান করালেন অতঃপর সুগন্ধী লাগিয়ে দিলেন।
ফায়দা
এই ঘটনা থেকে জানা যায়, নেককার ব্যক্তিরা গরিব ও মিসকীনদের প্রতি অত্যন্ত দয়াশীল ছিলেন। তারা শুধু খাবারই খাওয়াতেন না; বরং সম্মান, সুন্দর পোশাক ও সুগন্ধীর মাধ্যমেও তাদের মর্যাদা দিতেন।
এতে শিক্ষা পাওয়া যায়, অভাবীদের সাথে ভালোবাসা ও সম্মানের আচরণ করা উত্তম আমল।
আলী ইবনুল হুসায়ন (রা) এর বিনয় ও উদারতা
রিওয়ায়াত: ১৭৩ হযরত ইসমাঈল ইবনে আবু খালেদ বলেন, হযরত আলী ইবনে হুসায়ন (রহ) সওয়ারীর উপর সওয়ার হয়ে মিসকীনদের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন, যারা বেঁচে যাওয়া উচ্ছিষ্ট খাবার খাচ্ছিল।
তিনি তাদেরকে সালাম করলেন। তারা তাকে খাওয়ার জন্য আমন্ত্রণ করলেন। তিনি এই আয়াত তিলাওয়াত করলেন-
لِلَّذِينَ لَا يُرِيدُونَ عُلُوًّا فِي الْأَرْضِ وَلَا فَسَادًا
দুনিয়াতে যারা উচ্চ হতে ও বিপর্যয় সৃষ্টি করতে চায় না।– সূরা আল কাসাস ৮৩
অতঃপর বাহন থেকে নেমে তাদের সাথে খাবার খেলেন। অতঃপর বললেন, আমি তোমাদের দাওয়াত কবুল করেছি এখন তোমরা আমার দাওয়াত কবুল কর।
অতঃপর তিনি তাদেরকে তার ঘরে নিয়ে গেলেন, খাবার খাওয়ালেন এবং কাপড় ও দিরহাম দান করলেন।
ফায়দা
এই ঘটনা থেকে শিক্ষা পাওয়া যায়, সত্যিকারের নেককার মানুষ অহংকারমুক্ত হন এবং গরিব-মিসকীনদের অবহেলা করেন না।
হযরত আলী ইবনে হুসায়ন (রা) বিনয়ের সাথে মিসকীনদের দাওয়াত গ্রহণ করেছেন, তাদের সাথে বসে খাবার খেয়েছেন এবং পরে তাদের সাহায্যও করেছেন।
এতে বোঝা যায়, বিনয়, মানবতা ও অভাবীদের সম্মান করা ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।
দস্তরখান প্রশস্ত হওয়া এবং কথাবার্তা সুন্দর হওয়া
রিওয়ায়াত: ১৭৪ হযরত আমর ইবনে দীনার বলেন,
كَانَ ابْنُ عَبَّاسٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ ضَخْمَ الْقِطْعَةِ، حَسَنَ الْحَدِيثِ
হযরত ইবনে আব্বাস (রা) এর দস্তরখান হত প্রশস্ত এবং তার কথাবার্তা হত সুন্দর।
ফায়দা
এই বর্ণনা থেকে জানা যায়, হযরত ইবনে আব্বাস (রা) ছিলেন অত্যন্ত অতিথিপরায়ণ ও সুন্দর আচরণের অধিকারী। তিনি মানুষকে উদারভাবে খাবার খাওয়াতেন এবং সবার সাথে উত্তম ভাষায় কথা বলতেন। এতে শিক্ষা পাওয়া যায় যে, উদারতা ও সুন্দর ব্যবহার মানুষের মর্যাদা বৃদ্ধি করে।
মিছরীর টুকরা
রিওয়ায়াত: ১৭৫ হযরত উমর ইবনে আবু বকর কারশী বর্ণনা করেন যে, হাজীদের জন্য বিরাট বড় এক মিছরির (চিনি/মিছরী) টুকরা তৈরী করা হল। যেটা কোন চতুষ্পদ জন্তুর (বাহনের) উপরেও উঠানো গেল না।
অতঃপর তা একটা ছকড়া (ঘোড়ায় টানা গাড়ী) দ্বারা খলিফা আব্দুল মালিকের নিকট নিয়ে আসা হল। তিনি বাইরে বেরিয়ে আসলেন এবং তার আয়তন দেখে বিস্মিত হলেন।
কিন্তু তিনি বুঝতে পারছিলেন না যে, তিনি কি করবেন। কিছু সময় ভেবে তিনি তার গুলামকে ডেকে বলনে, এটা হযরত জাফরের নিকট নিয়ে যাও।
তখন তিনি খলিফার ওখানেই ছিলেন। যখন মিছরির টুকরাটি তার নিকট নিয়ে যাওয়া হল তখন তিনি বিস্মিত হলেন, আর লোকেরাও তা দেখার জন্য জমা হয়ে গেলেন।
তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, এটা কি? আরয করা হল এটা মিছরির একটি টুকরা যা খলিফা আপনার নিকট পাঠিয়েছেন।
তিনি বাইরে বেরিয়ে এমন জিনিস দেখলেন যার অনুরুপ কেউ কখনো দেখেনি। তিনি কিছু সময় ভেবে গুলামকে বললেন, চামড়ার বিছানা এবং কুড়াল নিয়ে আস। তা ভাঙার জন্য কুঠাড়ী আনা হল এবং চামড়ার বিছানা বিছিয়ে দেয়া হল।
জাফর (রহ) বললেন, (এটা ভাঙার পর) যে যেটা পাবে সেটা তার। অতঃপর তিনি সেখানে দাড়িয়ে রইলেন এবং ঐ টুকরার সব ভেঙে ফেলা হল (এবং বন্টন করে দেয়া হল)।
যখন এই সংবাদ খলিফার নিকট পৌঁছল তখন তিনি এটা শুনে বিস্মিত হলেন এবং বললেন, সে এই ব্যাপারে আমাদের থেকে ভাল জানেন।
ফায়দা
এই ঘটনা থেকে শিক্ষা পাওয়া যায়, নেককার ও জ্ঞানী ব্যক্তিরা দুনিয়ার মূল্যবান বস্তু নিজের জন্য জমা না রেখে মানুষের উপকারে ব্যয় করতেন।
হযরত জাফর (রহ) বড় মিছরির টুকরাটি নিজের কাছে না রেখে সবার মাঝে বণ্টন করে দিয়েছেন। এতে উদারতা, দানশীলতা ও মানুষের সাথে নেয়ামত ভাগাভাগি করার সুন্দর শিক্ষা পাওয়া যায়।
যে ব্যক্তি গোশত খেতে চায়
রিওয়ায়াত: ১৭৬ হযরত হিশাম ইবনে উরওয়াহ (রহ) তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, আমি হযরত সাদ ইবনে উবাদা (রা) এর সাক্ষাতে গেলাম।
সেখানে একজন ঘোষণাকারী লোকদের মাঝে এই ঘোষণা করছিলেন যে, যে ব্যক্তি গোশত ও চর্বি খেতে চায়, সে যেন সাদ ইবনে উবাদার ঘরে আসে।
অতঃপর আমার সাক্ষাৎ তার ছেলে কায়সের সাথে হল। তিনিও এই ঘোষণা করছিলেন।
হযরত সাদ ইবনে উবাদাহ (পূর্ব থেকে নিয়মিত এই) দুআ করেন-
اللَّهُمَّ هَبْ لِي حَمْدًا، وَهَبْ لِي مَجْدًا، لَا مَجْدَ إِلَّا بِفِعَالٍ، وَلَا فِعَالَ إِلَّا بِمَالٍ، اللَّهُمَّ إِنَّهُ لَا يَصْلُحُ لِي الْقَلِيلُ، وَلَا أَصْلُحُ عَلَيْهِ
হে আল্লাহ! আমাকে প্রশংসা ও আভিজাত্য দান কর। আভিজাত্য তো কেবল নেক আমল দ্বারাই লাভ করা যায়। আর নেক আমল সম্পদ দ্বারা।
হে আল্লাহ! অল্প সম্পদ আমার (ভাল কাজের জন্য) জন্য যথেষ্ট নয়, আর না তা আমার সব (কাজ) ঠিক করতে পারে।
ফায়দা
এই ঘটনা থেকে বোঝা যায়, সাহাবায়ে কেরাম মানুষের আপ্যায়ন ও দানশীলতাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিতেন। মানুষের জন্য খাবারের ব্যবস্থা করতেন এবং আল্লাহর কাছে এমন সম্পদ চাইতেন, যা নেক কাজ ও মানুষের উপকারে ব্যয় করা যায়।
এতে শিক্ষা পাওয়া যায়, সম্পদের প্রকৃত মর্যাদা হলো তা আল্লাহর পথে ও মানুষের কল্যাণে ব্যবহার করা।
ইবনে উমর (রা) এর ভিক্ষুককে দান করা
রিওয়ায়াত: ১৭৭ হযরত নাফে (রহ) বলেন, হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা) রোযা রাখতেন আর হযরত সুফিয়া বিনতে উবায়দ তার ইফতারির জন্য কিছু বানিয়ে দিতেন।
একদিন তার নিকট খুব উন্নত মানের আনার আনা হল। তখন দরজার নিকট একজন ভিক্ষুক এসে কিছু চাইলো। ইবনে উমর (রা) বললেন, এটা তাকে দিয়ে দাও।
কিন্তু হযরত সুফিয়া বললেন, তার জন্য এর চেয়ে উত্তম আছে। অতঃপর হযরত সুফিয়া আমাকে বললেন, তাকে অমুক বস্তুটি দিয়ে দাও। অতঃপর যখন ঐ আনার ইবনে উমর (রা) এর নিকট পূণরায় আনা হল তখন তিনি বললেন এটা অপর কোন ভিক্ষুককে দিয়ে দাও। আমি এটার জন্য সাদকার নিয়ত করেছি।
ফায়দা
এই ঘটনা থেকে শিক্ষা পাওয়া যায়, আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য উত্তম জিনিস দান করা নেককারদের গুণ। নিজের পছন্দের ভালো খাবারও গরিবকে দান করে দিতেন। এতে বোঝা যায়, প্রকৃত দান হলো আল্লাহর জন্য আন্তরিকভাবে প্রিয় বস্তু ত্যাগ করা।
ইবনে উমর (রা) এর আঙ্গুর দান করা
রিওয়ায়াত: ১৭৮ হযরত নাফে (রহ) বলেন, হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা) একবার অসুস্থ হলে আমি তার জন্য এক দিরহামের আঙ্গুর ক্রয় করলাম। যখন সেই আঙ্গুর তার সামনে পেশ করা হল তখন একজন ভিক্ষুক এসে কিছু চাইলো।
ইবনে উমর (রা) বললেন, এগুলো তাকে দিয়ে দাও। অতঃপর আমি ভিক্ষুকের পিছনে একজনকে পাঠালাম, যেন সে ঐ ভিক্ষুক থেকে আঙ্গুরগুলো কিনে নেয় আর ইবনে উমর (রা) তা জানতে না পারেন।
যখন দ্বীতিয়বার তার সামনে আঙ্গুর পেশ করা হল তখন ঐ ভিক্ষুক পূণরায় তার সামনে এসে গেল। ইবনে উমর (রা) বললেন, এগুলা তাকে দিয়ে দাও। এমন তিনবার হল। আর প্রত্যেকবার ভিক্ষুক থেকে আঙ্গুর ক্রয় করে তাকে দেয়া হল।
কিন্তু তিনি প্রত্যেকবারই ভিক্ষুককে তা দিয়ে দেওয়ার জন্য বললেন। এমনকি পরিশেষে লোকেরা ভিক্ষুককে এমনভাবে বাঁধা দিলেন যে, যাতে ইবনে উমর (রা) তা জানতে না পারেন।
ঈসা (আ) এর খাদ্য দান করা
রিওয়ায়াত: ১৭৯ হযরত খায়সামা (রহ) বলেন, হযরত ঈসা (আ) তার হাওয়ারীদের মধ্য হতে কয়েকজনকে ডাকলেন, তাদেরকে খাবার খাওয়ালেন এবং বললেন,
দরবেশদের সাথে (নেককার লোকদের সাথে) এমন আচরনই করো।
মেহমানকে আপ্যায়ন করা ও এর জন্য খাদ্য মজুত রাখা
রিওয়ায়াত: ১৮০ হযরত আবু কাবিসা বলেন, হযরত খায়সামা (রহ) সবসময় তার খাটের নিচে খাবীস (খেজুর ও ঘী দ্বারা তৈরি হালুয়া) এর টুকরী রাখতেন।
যখন কোন কিরাআ (কুরআনের পাঠক) তার কাছে আসতেন তখন তিনি তা থেকে তাদেরকে আপ্যায়ন করাতেন।
ইবনে সীরিন (রহ) এর মেহমানদারি
রিওয়ায়াত: ১৮১ হযরত ইবনে আউন (রহ) বলেন, যখন আমরা হযরত সিরীন (রহ) এর নিকট যেতাম, তখন তিন আমাদেরকে খাবীস ও ফালুদা খেতে দিতেন।
মধু পান করানো
রিওয়ায়াত : ১৮২ হযরত আবু খালদাহ বলেন, আমরা হযরত সিরীন (রহ) এর নিকট গেলাম। তিনি বললেন, আমি বুঝতে পারছিনা যে তোমাদের সামনে কি পেশ করব? রুটি ও গোশত তো তোমাদের সবার ঘরেই আছে।
অতঃপর তিনি তার দাসীকে আওয়ায দিলেন এবং মধু আনতে বললেন। অতঃপর তিনি নিজেই আমাদেরকে মধু ঢেলে দিচ্ছিলেন।
উম্মু দারদা (রা) এর মেহমানদারি
রিওয়ায়াত : ১৮৩ হযরত ইবরাহিম বিন আবী আবলাহ বলেন, আমরা বায়তুল মুকাদ্দাসের বাবুল আসবাতে হযরত উম্মু দারদা (রা) এর নিকট উপস্থিত হতাম আর তিনি আমাদেরকে হাদীস বর্ণনা করতেন।
আর যখন আমরা তার থেকে উঠার ইচ্ছা করতাম তখন তিনি আমাদের জন্য হালুয়া ও বিভিন্ন প্রকার খাবার আনাতেন।
মিষ্টান্ন দ্রব্য
রিওয়ায়াত : ১৮৪ হযরত আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেন-
إِذَا عُرِضَتْ عَلَى أَحَدِكُمُ الْحَلْوَاءُ فَلْيُصِبْ مِنْهَا، وَإِذَا عُرِضَ عَلَيْهِ الطِّيبُ فَلْيُصِبْ مِنْهِ
যখন তোমাদের সামনে মিষ্টান্ন বস্তু পেশ করা হয়, তখন তা থেকে অবশ্যই কিছু গ্রহণ কর। আর যখন তোমাদেরকে সুগন্ধী পেশ করা হয়, তখন তা থেকেও অবশ্যই কিছু গ্রহণ কর।
ফায়দা
এই হাদীস আমাদেরকে সৌজন্য ও ভদ্রতার শিক্ষা দেয়। কেউ ভালোবাসা দিয়ে মিষ্টি বা সুগন্ধি পেশ করলে তা গ্রহণ করা উচিত। এতে পারস্পরিক ভালোবাসা, সম্মান ও হৃদ্যতা বৃদ্ধি পায়।
আব্বাস (রা) এর ঘরের অবস্থা
রিওয়ায়াত : ১৮৫ হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে ইবরাহিম আল জুমাহী বলেন তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, একজন গ্রাম্য ব্যক্তি হযরত আব্বাস ইবনে আব্দুল মুত্তালিব (রা) এর ঘরে প্রবেশ করলেন।
তার ঘরের এক পাশে হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা) ফাতওয়া প্রদান করতেন। তার নিকট যা-ই জিজ্ঞাসা করা হত তিনি তার জবাব দিতেন।
আর অপর পাশে (তার ভাই) হযরত উবায়দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা) প্রত্যেক আগন্তুককে খাবার খাওয়াতেন।
এটা দেখে ঐ গ্রাম্য ব্যক্তি বলল, যে ব্যক্তি দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যান দেখতে চায় তবে সে যেন আব্বাস (রা) এর ঘরে অবশ্যই আসে।
কেননা তারা ফাতওয়া তথা বিভিন্ন জিজ্ঞাসার জবাব ও সমস্যার সমাধান দেয়, লোকদেরকে ফিক্হ তথা দীনের জ্ঞান শিক্ষা দেয় আর খাবারও খাওয়ায়।
উবায়দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা) এর দানশীলতা
রিওয়ায়াত : ১৭৪ হযরত যুবায়র (রা) বলেন, হযরত উবায়দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা) কুরবানীর পশু যবেহ এর স্থানে পশু যবেহ করে ওখানেই লোকদের মধ্যে বন্টন করে দিতেন।
একারণেই মক্কা মুকাররমার বাজারের ঐ স্থান ‘ইবনে আব্বাস (রা) এর কুরবানীর পশু যবেহ এর স্থান’ নামে প্রসিদ্ধ হয়ে গেছে।
প্রতিদিন উট যবেহ করা
রিওয়ায়াত : ১৮৭ হযরত আলী ইবনে মুহাম্মদ আল মদায়েনী বলেন, হযরত উবায়দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা) এর জন্য প্রত্যেকদিন একটি উট অথবা তার (গোশত) সমান কতকগুলো বকরী যবেহ করা হত।
ফায়দা
এই বর্ণনা থেকে বোঝা যায়, ছিলেন অত্যন্ত উদার ও মেহমানদার ব্যক্তি। তিনি মানুষের আপ্যায়ন ও খাবারের ব্যবস্থায় প্রচুর ব্যয় করতেন। এতে শিক্ষা পাওয়া যায়, আল্লাহর দেওয়া নেয়ামত মানুষের উপকারে ব্যয় করা উত্তম চরিত্রের পরিচয়।
উবায়দুল্লাহ (রা) এর উদারতা
রিওয়ায়াত : ১৮৮ হযরত আবান ইবনে উসমান (রহ) বলেন, এক ব্যক্তি হযরত উবায়দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা)-কে অপমান করার ইচ্ছা করল।
সে লোকদের সামনে গিয়ে বলল, উবায়দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা) আজ তোমাদেরকে নিমন্ত্রণ করে বলেছেন যে, আজ দুপরের খাবার আমার এখানে খাও।
এটা শুনে লোকেরা অত্যন্ত আগ্রহ নিয়ে তার এখানে আসা শুরু করল, এমনকি তার ঘর ভরে গেল।
হযরত উবায়দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা) বললেন, লোকদের কি হল? আরয করা হল, হযরত! আপনার পাঠানো লোক এসেছিল (আর সে এমন বলেছে)। তিনি সব বুঝে গেলেন এবং বললেন, দরজা বন্ধ কর।
অতঃপর তার খাদেমকে বললেন, বাজার থেকে সব ফল নিয়ে আস। লোকেরা ফল মধু দিয়ে খেল।
তিনি পূণরায় কতক খাদিমকে বললেন, ভুনা গোশত ও রুটি নিয়ে আস।
খাদিমরা রুটি (ও গোশত) নিয়ে আসলে লোকদেরকে তা দেওয়া হল। যখন লোকদের আহার সমাপ্ত হল তখন তিনি বললেন, আমি যেই বিষয়ের ইচ্ছা করেছি তা কি পূর্ণ করেছি?
লোকেরা বলল, জি হ্যাঁ। অতঃপর তিনি বললেন, যদি আরো লোক আসে তবু আমার কোন পরোয়া নেই।
ধার করা পাত্র পূর্ণ করে ফেরত দেয়া
রিওয়ায়াত : ১৮৯ হযরত শাবী (রহ) বলেন, হযরত আশআস বিন কায়স এক ব্যক্তিকে হযরত আদী ইবনে হাতিম (রা) এর নিকট পাতিল ধার নেয়ার জন্য পাঠালেন।
তখন আদী ইবনে হাতিম (খাদিমকে) বললেন, পাতিল ভরে দাও। অতঃপর তা আশআস ইবনে কায়স (রহ) এর নিকট প্রেরণ করা হল।
হযরত আশআস ইবন কায়স তা ফেরত পাঠিয়ে দিয়ে বললেন, আমি তো খালি পাতিল চেয়েছিলাম।
হযরত আদী ইবনে হাতিম (রা) এটা বলে পুনরায় পাতিল পাঠিয়ে দিলেন যে, আমি খালি পাতিল দেই না।
তিনজন লোক এমন
রিওয়ায়াত : ১৯০ হযরত ইবনে আব্বাস (রা) বলেন, তিনজন লোক এমন যাদের ঋণ আমি শোধ করতে পারব না। আর চতুর্থ ঐ ব্যক্তি যার প্রয়োজন পূরণ আল্লাহ তাআলা আমার দ্বারা করতে পারেন।
প্রথম ঐ ব্যক্তি, যে মজলিসে আমার জন্য স্থান প্রশস্ত করে দেয়।
২য় ঐ ব্যক্তি, যে কঠিন পিপাসার সময় আমাকে পানি পান করায়।
৩য় ঐ ব্যক্তি, যার কদম আমার দরজার উপর (আমার ঘরে) আসা যাওয়ার দ্বারা ধূলিময় হয়।
৪র্থ ঐ ব্যক্তি যার সাহায্য আল্লাহ আমার দ্বারা করাতে পারেন।
সে ঐ ব্যক্তি যার কোন প্রয়োজন দেখা দেয়, আর সে সারা রাত এই চিন্তায় অতিবাহিত করে যে, আমার প্রয়োজন পূর্ণ করবে কে?
অতঃপর যখন ভোর হয় তখন সে আমাকে তার প্রয়োজন পূরণকারী হিসাবে পায়। এটাই ঐ ব্যক্তি যার সাহায্য আল্লাহ আমার দ্বারা করাতে পারেন।
আর আমার এই ব্যাপারে লজ্জাবোধ হয় যে, কেউ তিনবার আমার ঘরে (কোন প্রয়োজনের জন্য) আসবে আর আমি তার সাহায্য করব না।
উপসংহার
আহার করানো ইসলামের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি নেক আমল। কুরআন ও হাদীসে ক্ষুধার্তকে খাবার খাওয়ানো, মেহমানদারি করা, গরিব-মিসকীনদের আপ্যায়ন করা এবং মানুষের সাথে কোমল আচরণ করার প্রতি বারবার উৎসাহ দেওয়া হয়েছে।
নবী করীম ﷺ, সাহাবায়ে কেরাম ও বুযুর্গদের জীবনে আমরা দেখি— তারা নিজের প্রয়োজনের উপর অন্যের প্রয়োজনকে প্রাধান্য দিতেন এবং আন্তরিকতার সাথে মানুষকে খাবার খাওয়াতেন।
আহার করানোর মাধ্যমে আল্লাহর ভালোবাসা, গুনাহের মাগফিরাত, জান্নাতের সুসংবাদ এবং কিয়ামতের নিরাপত্তা লাভ হয়। এতে মানুষের মাঝে ভালোবাসা, ভ্রাতৃত্ব, দয়া ও সৌহার্দ্য বৃদ্ধি পায়।
তাই প্রত্যেক মুসলমানের উচিত সামর্থ্য অনুযায়ী ক্ষুধার্ত, মেহমান, আত্মীয় ও অভাবীদের খাবার খাওয়ানো এবং এটাকে মহান ইবাদত হিসেবে গ্রহণ করা।
🔸🔸🔸
👉 আরও পড়ুন মাকারিমুল আখলাক ১ম ভাগ, ইমাম তাবরানী রহ.




