ইস্তিনাউল মারূফ সৎকাজ ও মানবকল্যাণ
ইমাম ইবনে আবিদ দুনইয়া (রহ) রচিত সৎকাজ ও মানব কল্যাণ বিষয়ক রিওয়ায়াত সমূহ

ইস্তিনাউল মারূফ সৎকাজ ও মানবকল্যাণ – ইস্তিনাউল মারূফ (اصطناع المعروف) অর্থ মানুষের উপকার করা, কল্যাণমূলক কাজ করা এবং সমাজে সৎকাজের প্রসার ঘটানো। ইসলাম মানুষের প্রতি দয়া, সহযোগিতা ও মানবকল্যাণকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে।
এ বিষয়েই ইমাম ইবন আবিদ দুনইয়া (রহ) তার “ইস্তিনাউল মারূফ” গ্রন্থে মানুষের উপকার, দান-সদকা এবং নেক আমলের ফজিলত সম্পর্কিত হাদিসসমূহ সংকলন করেছেন।
এই সংকলনে হাদিসগুলোর বাংলা অনুবাদ, সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা উল্লেখ করা হয়েছে, যাতে পাঠক সহজে বিষয়বস্তু অনুধাবন করে জীবনে তা বাস্তবায়ন করতে পারেন।
ইমাম ইবনে আবিদ দুনইয়া (রহ) রচিত ইস্তিনাউল মারূফ গ্রন্থ থেকে অনূদিত
আমাদের অনুবাদ ও প্রকাশনা – দারুস সাআদাত
بَابُ فَضْلِ اصْطِنَاعِ الْمَعْرُوفِ
ভালো ও কল্যাণমূলক কাজ করার ফযীলত
সৎকাজ সত্তর প্রকার বিপদ প্রতিরোধ করে
১. বিলাল (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন,
প্রত্যেক সৎকাজই সাদকা। সৎকাজ সত্তর প্রকারের বিপদ-আপদ থেকে রক্ষা করে এবং মন্দ মৃত্যুর (খারাপ পরিণতির) হাত থেকেও রক্ষা করে। কিয়ামতের দিন সৎকাজ ও অসৎকাজ উভয়কেই মানুষের সামনে জীবন্ত রূপে উপস্থিত করা হবে।
সৎকাজ তার অনুসারীদের সঙ্গে লেগে থাকবে এবং তাদেরকে নেতৃত্ব দিয়ে জান্নাতের দিকে নিয়ে যাবে। আর অসৎকাজও তার অনুসারীদের সঙ্গে লেগে থাকবে এবং তাদেরকে নেতৃত্ব দিয়ে জাহান্নামের দিকে নিয়ে যাবে।
সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা
“প্রতিটি সৎকাজ সাদাকাহ” অর্থাৎ মানুষের উপকারে আসে বা শরিয়তসম্মত প্রতিটি ভালো কাজই সদকার অন্তর্ভুক্ত।
“সত্তর প্রকারের বিপদ” দ্বারা নির্দিষ্ট সংখ্যা নয়। আরবিতে এটি বহু ধরনের বিপদ-আপদের ইঙ্গিত হিসেবেও ব্যবহৃত হয়।
কিয়ামতের দিন ভালো ও মন্দ কাজকে দৃশ্যমান রূপ দেওয়া হবে। এটি মানুষের আমলের পরিণতি বোঝানোর একটি বর্ণনা।
যে আল্লাহর প্রিয় বান্দা
২. আবু সাঈদ আল খুদরী (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন,
إِنَّ أَحَبَّ عِبَادِ اللَّهِ إِلَى اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ مَنْ حُبِّبَ إِلَيْهِ الْمَعْرُوفُ وَحُبِّبَ إليه فعاله
নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলার কাছে তার বান্দাদের মধ্যে সবচেয়ে প্রিয় সে ব্যক্তি, যার কাছে সৎকাজ প্রিয় করে দেওয়া হয়েছে এবং যাকে সৎকাজ করার তাওফিক দেওয়া হয়েছে।
অর্থাৎ, আল্লাহর সবচেয়ে প্রিয় বান্দা সেই ব্যক্তি, যিনি নিজে ভালো কাজকে ভালোবাসেন এবং আন্তরিকতার সঙ্গে তা নিয়মিত করে থাকেন।
নেককাজ মন্দ মৃত্যু রোধ করে
৩. আবু সাঈদ আল খুদরী (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন-
فِعْلُ المعروف يقي مصارع السوء
সৎকাজ (মানুষের উপকার ও নেক আমল) অকল্যাণকর পরিণতি বা মন্দ মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করে।
ব্যাখ্যা
এই হাদিসে রাসূলুল্লাহ (সা) সৎকাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপকারিতা বর্ণনা করেছেন। “মা‘রূফ” বলতে এমন সব ভালো কাজকে বোঝায় যা ইসলাম অনুমোদন করে এবং যা মানুষের উপকারে আসে।
যেমন দান-সাদকা করা, আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করা, অসুস্থের খোঁজ নেওয়া, বিপদগ্রস্তকে সাহায্য করা, ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানো এবং মানুষের সঙ্গে উত্তম আচরণ করা।
“মাসারি‘আস-সু'” (مصارع السوء) অর্থ হলো অকল্যাণকর পরিণতি বা মন্দ মৃত্যু। এর মধ্যে এমন মৃত্যু বা পরিণতি বোঝায় যা লাঞ্ছনাকর, পাপের মধ্যে মৃত্যু, অথবা এমন বিপদ যা মানুষের জন্য অত্যন্ত কষ্টকর ও অপমানজনক।
হাদীসের শিক্ষা
হাদিসের শিক্ষা হলো, সৎকাজ আল্লাহর রহমত লাভের একটি মাধ্যম। আল্লাহ তাআলা অনেক সময় বান্দার নেক আমলের বরকতে তাকে নানা বিপদ-আপদ থেকে রক্ষা করেন এবং তার জীবনের পরিণতি কল্যাণময় করে দেন।
তবে এর অর্থ এই নয় যে, সৎকাজ করলেই কোনো মুমিন কখনো বিপদে পড়বেন না। বরং বিপদও আল্লাহর পরীক্ষা হতে পারে। হাদিসের উদ্দেশ্য হলো সৎকাজ আল্লাহর হিফাযত ও রহমত লাভের একটি বড় কারণ।
আল্লাহর কিছু বান্দা যেমন
৪. আবু সাঈদ আল খুদরী (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা তার সৃষ্টির মধ্যে কিছু মানুষকে সৎকাজ (মানুষের উপকার) করার জন্য নির্বাচন করেছেন।
তিনি তাদের কাছে সৎকাজকে প্রিয় করে দিয়েছেন, সৎকাজ করাকেও তাদের কাছে প্রিয় করে দিয়েছেন এবং যারা উপকারের প্রত্যাশী, তাদেরকে সেই লোকদের কাছেই পরিচালিত করেন।
তিনি তাদের জন্য উপকার করা সহজ করে দেন; যেমন তিনি অনাবৃষ্টিপীড়িত শুষ্ক ভূমিতে বৃষ্টি পৌঁছে দেন, যাতে সেই ভূমি সজীব হয় এবং তার অধিবাসীরাও উপকৃত হয়।
আবার আল্লাহ তার সৃষ্টির মধ্যে এমন কিছু লোকও রেখেছেন, যারা সৎকাজের শত্রু। তিনি তাদের কাছে সৎকাজকে অপছন্দনীয় করে দিয়েছেন, সৎকাজ করাকেও অপছন্দনীয় করে দিয়েছেন এবং মানুষের উপকার করতে তাদেরকে বিরত রেখেছেন।
যেমন তিনি শুষ্ক ভূমি থেকে বৃষ্টি আটকে দেন, ফলে ভূমি ধ্বংস হয় এবং তার অধিবাসীরাও ধ্বংস হয়। অথচ আল্লাহ আরও অনেক কিছু ক্ষমা করে দেন।
ব্যাখ্যা
এই হাদীসে মানুষের দুই ধরনের চরিত্রের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।
১. কল্যাণের চাবিকাঠি মানুষ
আল্লাহ কিছু বান্দাকে এমন তাওফিক দেন যে তারা মানুষের উপকার করতে ভালোবাসে। দরিদ্রকে সাহায্য করা, অসুস্থের সেবা করা, জ্ঞান শিক্ষা দেওয়া, দান করা, মানুষের সমস্যা সমাধান করা- এসব কাজ তাদের কাছে আনন্দের বিষয় হয়ে ওঠে। শুধু তাই নয়, যাদের সাহায্য প্রয়োজন, আল্লাহ তাদেরকেও এসব নেক মানুষের কাছে পৌঁছে দেন।
এরা সমাজের জন্য ঠিক বৃষ্টির মতো। যেমন বৃষ্টি মৃত জমিকে জীবিত করে তোলে, তেমনি তাদের উপকারে মানুষের জীবন সুন্দর ও সমৃদ্ধ হয়।
২. কল্যাণের বিরোধী মানুষ
অন্যদিকে কিছু মানুষ আছে যারা ভালো কাজ করতে চায় না, অন্যের উপকার করতেও কৃপণতা করে। তারা মানুষের প্রয়োজন পূরণে বাধা সৃষ্টি করে। তাদের দ্বারা সমাজ উপকৃত হয় না।
তাদের দৃষ্টান্ত সেই জমির মতো, যেখানে বৃষ্টি পৌঁছায় না। ফলে জমি অনুর্বর থাকে এবং তার অধিবাসীরাও কষ্টে থাকে।
হাদীসের শিক্ষা
মানুষের উপকার করা আল্লাহর বিশেষ নেয়ামত।
যে ব্যক্তি মানুষের জন্য উপকারী হয়, সে আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার আশা করতে পারে।
নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী মানুষের উপকার করা উচিত।
যদি ভালো কাজ করার সুযোগ আসে, সেটিকে আল্লাহর পক্ষ থেকে দেওয়া তাওফিক হিসেবে গণ্য করা উচিত এবং এর জন্য কৃতজ্ঞ থাকা উচিত।
আল্লাহর নিআমত মানুষের উপকারের জন্য
৫. হযরত ইবনে উমর (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলার এমন কিছু বান্দা আছেন, যাদের তিনি মানুষের উপকারের জন্য বিশেষ কিছু নিয়ামত দান করেন।
যতদিন তারা সেই নিয়ামত মানুষের কল্যাণে ব্যয় করে, ততদিন আল্লাহ তা তাদের কাছেই বহাল রাখেন। কিন্তু যখন তারা তা (মানুষের জন্য) বন্ধ করে দেয় বা কৃপণতা করে, তখন আল্লাহ সেই নিয়ামত তাদের কাছ থেকে কেড়ে নিয়ে অন্যদের কাছে অর্পণ করেন।
ব্যাখ্যা
এই হাদীসে আল্লাহপ্রদত্ত নিয়ামতের প্রকৃত উদ্দেশ্য তুলে ধরা হয়েছে। আল্লাহ মানুষকে যে সম্পদ, জ্ঞান, ক্ষমতা, পদমর্যাদা, প্রভাব, দক্ষতা বা সুযোগ দেন, সেগুলো শুধু নিজের ভোগের জন্য নয়; বরং মানুষের উপকারে লাগানোর জন্যও।
যে ব্যক্তি আল্লাহর দেওয়া নেয়ামত মানুষের কল্যাণে ব্যয় করে যেমন দরিদ্রকে সাহায্য করে, জ্ঞান ছড়ায়, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করে, মানুষের প্রয়োজন পূরণ করে- আল্লাহ সাধারণত তার সেই নিয়ামত স্থায়ী রাখেন এবং তাতে বরকত দান করেন।
কিন্তু যদি কেউ অহংকার, কৃপণতা বা স্বার্থপরতার কারণে আল্লাহর দেওয়া নিয়ামত মানুষের উপকারে ব্যবহার না করে, তবে আল্লাহ সেই নেয়ামত তার কাছ থেকে কেড়ে নিয়ে এমন ব্যক্তির হাতে দিতে পারেন, যে তা মানুষের কল্যাণে ব্যবহার করবে।
শিক্ষা
আল্লাহর দেওয়া প্রতিটি নেয়ামত একটি আমানত।সম্পদ, জ্ঞান ও ক্ষমতা মানুষের কল্যাণে ব্যবহার করা উচিত।
কৃপণতা ও স্বার্থপরতা নেয়ামত হারানোর কারণ হতে পারে।
নেয়ামতের শোকর আদায়ের অন্যতম উপায় হলো তা দিয়ে মানুষের উপকার করা।
নেককাজ করা আবশ্যক করে নাও
৬. হযরত ইবনে আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেন, তোমরা মানুষের উপকার ও সৎকাজ করাকে আবশ্যক করে নাও। কেননা, তা মন্দ মৃত্যু থেকে রক্ষা করে।
আর তোমরা গোপনে সাদকা করার অভ্যাস গড়ে তোলো। কারণ, গোপন সাদকা মহান আল্লাহর ক্রোধকে প্রশমিত করে।
ব্যাখ্যা
এই হাদিসে রাসূলুল্লাহ (সা) দুটি গুরুত্বপূর্ণ আমলের প্রতি উৎসাহ দিয়েছেন।
১. اصطناع المعروف (মানুষের উপকার ও সৎকাজ করা)
এখানে “মা‘রূফ” বলতে মানুষের কল্যাণে আসে এমন সব কাজ বোঝানো হয়েছে। যেমন- অভাবগ্রস্তকে সাহায্য করা, ক্ষুধার্তকে খাবার দেওয়া, অসুস্থের সেবা করা, বিপদগ্রস্তকে সহযোগিতা করা, মানুষের কষ্ট দূর করা, উত্তম পরামর্শ দেওয়া।
হাদিসে বলা হয়েছে, এসব নেক কাজ ‘মাসারিআস-সু’ অর্থাৎ অকল্যাণকর পরিণতি বা মন্দ মৃত্যুর কারণ থেকে রক্ষার একটি মাধ্যম। অর্থাৎ আল্লাহ এসব আমলের বরকতে বান্দাকে নানা বিপদ ও লাঞ্ছনাকর পরিণতি থেকে হিফাযত করতে পারেন।
২. صدقة السر (গোপনে সদকা করা)
গোপনে দান করার বিশেষ মর্যাদা রয়েছে। এতে রিয়া (লোক দেখানো) থেকে বাঁচা যায় এবং ইখলাস বৃদ্ধি পায়। তাই গোপন সাদকাকে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের অন্যতম উত্তম মাধ্যম বলা হয়েছে।
“আল্লাহর ক্রোধকে প্রশমিত করে” অর্থ হলো- গোপন সাদকা আল্লাহর রহমত লাভ এবং তার শাস্তি থেকে বাঁচার একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ।
এ কথার সমর্থনে একটি সহিহ হাদিসে এসেছে, গোপন সাদকা রবের ক্রোধকে নিভিয়ে দেয়।
শিক্ষা
মানুষের উপকার করাকে জীবনের নিয়মে পরিণত করা উচিত।
সুযোগ পেলে গোপনে দান করা উত্তম।
নেক আমল শুধু পরকালের জন্য নয়; দুনিয়াতেও আল্লাহর হিফাযত ও বরকতের কারণ হতে পারে।
ইখলাসের সঙ্গে করা ছোট ছোট ভালো কাজও আল্লাহর কাছে অত্যন্ত মূল্যবান।
বাংলা অনুবাদ
প্রতিটি নেককাজ সাদকা
৭. হযরত হুযায়ফা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, প্রতিটি সৎকাজই সাদকা।
৮. জাবির ইবন আবদুল্লাহ (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন:
প্রতিটি সৎকাজই সাদকা।
(বর্ণনাকারী বলেন: “হ্যাঁ।” অর্থাৎ, প্রত্যেক সৎকাজই সদকার অন্তর্ভুক্ত।)
ব্যাখ্যা
এই হাদীসটি ইসলামের একটি মৌলিক শিক্ষা তুলে ধরে। এখানে মা‘রূফ (المعروف) বলতে শরিয়তসম্মত প্রত্যেক ভালো ও কল্যাণকর কাজকে বোঝানো হয়েছে। আর সাদকা বলতে শুধু অর্থ দান নয়; বরং আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে করা প্রতিটি কল্যাণকর কাজও সাদকার অন্তর্ভুক্ত।
অর্থাৎ, সাদকার পরিধি খুবই বিস্তৃত। এটি কেবল ধন-সম্পদ দানেই সীমাবদ্ধ নয়।
প্রত্যেক সৎকাজ বলতে কী বোঝায়?
এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত-
ক্ষুধার্তকে খাবার দেওয়া।
তৃষ্ণার্তকে পানি পান করানো।
দরিদ্র ও অসহায়কে সাহায্য করা।
মানুষের কষ্ট দূর করা।
ভালো পরামর্শ দেওয়া।
সালাম দেওয়া ও হাসিমুখে কথা বলা।
রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরিয়ে দেওয়া।
সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজ থেকে বিরত থাকতে উৎসাহিত করা।
এসব কাজের জন্যও আল্লাহ তাআলা সাদকার সওয়াব দান করেন।
শিক্ষা
ভালো কাজকে ছোট মনে করা উচিত নয়।
যার অর্থ নেই, সেও অসংখ্য উপায়ে সাদকার সওয়াব অর্জন করতে পারে।
প্রতিদিন মানুষের উপকার করার সুযোগ খুঁজে নেওয়া একজন মুমিনের বৈশিষ্ট্য।
নিজের পরিবারের জন্য যা ব্যয় করা হয় তা সাদকা
৮. জাবির ইবন আবদুল্লাহ (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, প্রত্যেক সৎকাজই সাদকা। একজন ব্যক্তি নিজের ও তার পরিবারের জন্য যা কিছু ব্যয় করে, তা তার জন্য সাদকা হিসেবে লিখে দেওয়া হয়।
আর যে ব্যয়ের মাধ্যমে সে নিজের সম্মান-সম্ভ্রম রক্ষা করে, সেটিও তার জন্য সাদকা হিসেবে লিখে দেওয়া হয়।
বর্ণনাকারী বলেন, আমি মুহাম্মাদ (একজন বর্ণনাকারী)-কে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘মানুষ নিজের সম্মান রক্ষার জন্য যে ব্যয় করে’ এর অর্থ কী?
তিনি বললেন, এটি সেই বস্তু, যা সে কোনো কবি বা কটুভাষী ব্যক্তিকে দেয়, যাতে তারা তার বিরুদ্ধে কুৎসা বা অপবাদ রটনা থেকে বিরত থাকে।
ব্যাখ্যা
এই হাদিসে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরা হয়েছে।
১. প্রত্যেক সৎকাজই সদকা
যে কোনো বৈধ ও কল্যাণকর কাজ, যা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য করা হয়, তা সাদকার অন্তর্ভুক্ত। সাদকা শুধু অর্থ দানেই সীমাবদ্ধ নয়।
২. নিজের ও পরিবারের জন্য ব্যয়ও ইবাদত
ইসলামে পরিবারের ভরণপোষণ একটি দায়িত্ব। কেউ যদি আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে হালাল উপার্জন থেকে নিজের ও পরিবারের জন্য ব্যয় করে, তবে সেটিও সদকার সওয়াব লাভের কারণ হয়।
এ অর্থকে সমর্থন করে সহিহ হাদিসে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, তুমি আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে যা-ই ব্যয় করো, তার প্রতিদান পাবে; এমনকি তোমার স্ত্রীর মুখে যে লোকমা তুলে দাও, তারও। (সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম)
৩. সম্মান রক্ষার জন্য বৈধ ব্যয়
“وما وقى به عرضه” অর্থ হলো—কোনো ব্যক্তি যদি বৈধ উপায়ে এমন কিছু ব্যয় করে, যার মাধ্যমে অন্যায় অপবাদ, কুৎসা বা ক্ষতিকর আক্রমণ থেকে নিজের সম্মান রক্ষা হয়, তবে সেই ব্যয়ও নেকির কাজ হিসেবে গণ্য হতে পারে।
বর্ণনাকারীর ব্যাখ্যায় এসেছে, আরব সমাজে কোনো কোনো কবি বা কটুভাষী ব্যক্তি ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ বা কুৎসা ছড়াত। কখনো তাদেরকে বৈধভাবে কিছু দিয়ে সেই অন্যায় থেকে বিরত রাখা হতো। এই প্রেক্ষাপটেই কথাটি বলা হয়েছে। এটি ঘুষকে বৈধ করা নয়; বরং অন্যায় ক্ষতি থেকে নিজেকে রক্ষা করার একটি বিশেষ পরিস্থিতির উদাহরণ।
শিক্ষা
প্রতিটি নেক কাজই আল্লাহর কাছে মূল্যবান।
পরিবারের জন্য হালাল উপার্জন ও ব্যয়ও ইবাদত।
নিজের সম্মান রক্ষার জন্য বৈধ ও ন্যায়সঙ্গত উপায় অবলম্বন করা জায়েজ।
দৈনন্দিন জীবনের সাধারণ কাজও সৎ নিয়তের মাধ্যমে ইবাদতে পরিণত হতে পারে।
প্রতিটি ভালো কাজ সাদকা
১০. জাবির ইবন আবদুল্লাহ (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন:
প্রতিটি সৎকাজই সাদকা।
আল্লাহ যার সাহায্যে রত থাকেন
১১. আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, যে ব্যক্তি তার কোনো মুসলিম ভাইয়ের একটি দুনিয়াবি দুঃখ-কষ্ট দূর করে দেয়, আল্লাহ তাআলা তার দুনিয়া ও আখিরাতের দুঃখ-কষ্টসমূহের মধ্য থেকে একটি কষ্ট দূর করে দেবেন।
যে ব্যক্তি তার মুসলিম ভাইয়ের দোষ-ত্রুটি (যা গোপন রাখা উচিত) গোপন রাখে, আল্লাহ দুনিয়া ও আখিরাতে তার দোষ-ত্রুটি গোপন রাখবেন। আর বান্দা যতক্ষণ তার ভাইয়ের সাহায্যে নিয়োজিত থাকে, আল্লাহও ততক্ষণ তার সাহায্যে থাকেন।
ব্যাখ্যা
এই হাদীসটি ইসলামে মানুষের উপকার, সহানুভূতি এবং পারস্পরিক সহযোগিতার গুরুত্ব অত্যন্ত সুন্দরভাবে তুলে ধরেছে।
১. মানুষের দুঃখ-কষ্ট দূর করার ফযীলত
কোনো মানুষের ঋণের বোঝা লাঘব করা, ক্ষুধার্তকে খাদ্য দেওয়া, অসুস্থের চিকিৎসায় সাহায্য করা, বিপদে পাশে দাঁড়ানো বা মানসিক কষ্টে সান্ত্বনা দেওয়া- এসবই একজন মুসলিমের কষ্ট দূর করার অন্তর্ভুক্ত।
এর প্রতিদান হিসেবে আল্লাহ দুনিয়া ও আখিরাতে তার নিজের কষ্ট দূর করে দেবেন। এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে এক মহান প্রতিশ্রুতি।
২. অন্যের দোষ গোপন রাখা
এখানে এমন দোষ বোঝানো হয়েছে, যা প্রকাশ করলে অযথা অপমান বা ক্ষতি হবে এবং যার প্রকাশে কোনো শরয়ী কল্যাণ নেই।
অর্থাৎ, কারও ব্যক্তিগত ভুল বা গোপন বিষয় নিয়ে মানুষের সামনে অপদস্থ করা ইসলামের শিক্ষা নয়। বরং তাকে গোপনে সংশোধনের চেষ্টা করা উচিত।
তবে যদি কারও অপরাধ অন্যের অধিকার নষ্ট করে, মানুষের নিরাপত্তা বিপন্ন করে বা আইনি ব্যবস্থা নেওয়া জরুরী হয়, তাহলে তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো এই হাদীসের পরিপন্থী নয়।
৩. মানুষের সাহায্য করলে আল্লাহ সাহায্য করেন
হাদিসের শেষ অংশটি অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক। যে ব্যক্তি আন্তরিকভাবে মানুষের কল্যাণে কাজ করে, আল্লাহ তার কাজে সাহায্য করেন, তার সমস্যার সমাধান সহজ করে দেন এবং তাকে নিজের রহমতের ছায়ায় রাখেন।
শিক্ষা
বিপদগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানো একজন মুমিনের দায়িত্ব।
অন্যের দোষ খুঁজে বেড়ানো বা প্রচার করা থেকে বিরত থাকা উচিত।
মানুষের উপকার করা আল্লাহর সাহায্য লাভের অন্যতম মাধ্যম।
সমাজে পারস্পরিক সহযোগিতা, দয়া ও গোপনীয়তা রক্ষা ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ নীতি।
ধনী দরিদ্র সবার সাথেই নেককাজ সাদকা
১২. আবদুল্লাহ (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, প্রত্যেক সৎকাজই সাদকা। তা ধনী ব্যক্তির প্রতি করা হোক বা দরিদ্র ব্যক্তির প্রতি- সেটি সাদকা হিসেবেই গণ্য হবে।
ব্যাখ্যা
এই হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা) সাদকার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরেছেন। সাধারণভাবে মনে করা হয়, সদকা শুধু গরিবের জন্য। কিন্তু এই হাদিস জানিয়ে দেয় যে, সৎকাজের পরিধি এর চেয়ে অনেক বিস্তৃত।
হাদীসে বলা হয়েছে, ভালো কাজের প্রতিদান পাওয়ার জন্য অপর ব্যক্তি দরিদ্র হওয়া শর্ত নয়। ধনী ব্যক্তিকেও যদি আন্তরিকভাবে কোনো উপকার করা হয়- যেমন সঠিক পরামর্শ দেওয়া, প্রয়োজনের সময় সহযোগিতা করা, তার কোনো সমস্যা সমাধানে সাহায্য করা- তবুও তা সদকা হিসেবে গণ্য হবে।
অবশ্য আর্থিক সদকা (যাকাত বা দান) সাধারণত দরিদ্র ও অভাবীদের জন্য। কিন্তু সৎকাজ হিসেবে সদকা ধনী-গরিব নির্বিশেষে সবার প্রতি করা যায়।
শিক্ষা
ভালো কাজ করার ক্ষেত্রে মানুষের আর্থিক অবস্থার ভিত্তিতে বৈষম্য করা উচিত নয়।
মানুষের উপকার করাই ইসলামের অন্যতম শিক্ষা।
প্রতিটি আন্তরিক কল্যাণকর কাজ আল্লাহর কাছে সদকা হিসেবে গণ্য হয়।
সমাজের সব মানুষের সঙ্গে সদাচরণ করা একজন মুমিনের বৈশিষ্ট্য।
উপসংহার
ইস্তিনাউল মারূফ (اصطناع المعروف) আমাদের শিক্ষা দেয় যে, মানুষের উপকার করা ইসলামের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নেক আমল।
দান, সহযোগিতা, সহমর্মিতা ও উত্তম আচরণের মাধ্যমে ব্যক্তি ও সমাজে কল্যাণ প্রতিষ্ঠিত হয় এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জিত হয়।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে আন্তরিকতার সঙ্গে সৎকাজ করার এবং মানুষের কল্যাণে আত্মনিয়োগ করার তাওফিক দান করুন। আমীন।
🔹🔹🔹
👉 আরও পড়ুন ইমাম ইবনে আবিদ দুনইয়ার (রহ) এর আকলের মর্যাদা



