হারাম দৃষ্টির ক্ষতি ও এর প্রতিকার
মানব জীবনে অবৈধ দৃষ্টির ক্ষতি ও এর প্রতিকার। জ্ঞানগর্ভ ও উপকারী আলোআনা।

হারাম দৃষ্টির ক্ষতি ও এর প্রতিকার – হারাম দৃষ্টি ইসলামে এমন একটি গুনাহ, যা দেখতে ছোট মনে হলেও এর পরিণতি অত্যন্ত ভয়াবহ। অধিকাংশ নৈতিক অবক্ষয়, অবৈধ সম্পর্ক, ব্যভিচার এবং হৃদয়ের পবিত্রতা নষ্ট হওয়ার সূচনা হয় একটি অসংযত দৃষ্টি থেকেই।
তাই পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা সর্বপ্রথম নারী-পুরুষ উভয়কেই নিজেদের দৃষ্টি সংযত রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। দৃষ্টি সংযত রাখা শুধু একটি ইবাদত নয়; বরং এটি ঈমান, চরিত্র, লজ্জাশীলতা এবং তাকওয়া রক্ষার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।
এই নিবন্ধে হারাম দৃষ্টির ক্ষতি, এর ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক কুফল, কুরআন ও সহিহ হাদিসের আলোকে দৃষ্টি সংযত রাখার গুরুত্ব, হারাম দৃষ্টি থেকে বেঁচে থাকার কার্যকর উপায় এবং তওবা ও আত্মশুদ্ধির ইসলামি নির্দেশনা বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হবে।
আপনি যদি হারাম দৃষ্টির ভয়াবহতা উপলব্ধি করে নিজের দৃষ্টি ও হৃদয়কে পবিত্র রাখতে চান, তবে এই লেখাটি আপনার জন্য একটি নির্ভরযোগ্য ও উপকারী দিকনির্দেশনা হবে।
উল্লেখ্য যে, অনেকেই হারাম দৃষ্টিকে কুদৃষ্টি বলে থাকেন। এটাও সঠিক। তবে কুদৃষ্টি বলতে বদনযরও বোঝায়। আর হারাম দৃষ্টি বা কুনযর হলো কামনার দৃষ্টি যা হারাম। এখানে আমরা সেই কামনার কুদৃষ্টি বা হারাম দৃষ্টিপাত বিষয়ে আলোচনা করবো।
কুদৃষ্টির ক্ষতিসমূহ
চোখের অনেক গুনাহ রয়েছে। তার মধ্যে একটি বিশেষ গুনাহ হলো কুদৃষ্টি বা অবৈধ দৃষ্টিপাত। অনেক মানুষ এটাকে গুনাহই মনে করে না। আশ্চর্য ব্যাপার হলো অন্তরে এ রোগ থাকা সত্ত্বেও অনেক ব্যক্তি নিজেকে পরহেযগার ও মুত্তাকী ভাবে।- আল এলমু ওয়াল উলামা
আল্লাহ তাআলা কুরআনুল কারীমে ইরশাদ করেন-
يَعْلَمُ خَائِنَةَ الْأَعْيُنِ وَمَا تُخْفِي الصُّدُورُ
চক্ষুর খিয়ানত এবং অন্তরে যা গোপন আছে সে সম্পর্কে তিনি (আল্লাহ) অবহিত। -সূরা মুমিন:১৯
চোখের খিয়ানত এর ব্যাখ্যা
চোখের খিয়ানত বা অপব্যবহারের অর্থ হলো গোপন দৃষ্টি। যেমন কেউ কোন মহিলা বা নারীর প্রতি তার অগোচরে অথবা মানুষের অজান্তে দৃষ্টিপাত করতে থাকে। যখন সে নারী অথবা কোন মানুষ টের পায় তখন দৃষ্টি ফিরিয়ে নেয়। আবার যখন সুযোগ পায় তখন দেখতে থাকে।
সুফিয়ান (রহ) এর উক্তি
হযরত সুফিয়ান (রহ) বলেন, কোন ব্যক্তি যখন কোন মজলিসে বসে আর রাস্তা দিয়ে কোন নারীকে অতিক্রম করতে দেখলে সে গোপনে তার দিকে তাকায়। যখন লোকেরা দেখে যে লোকটি মহিলার দিকে তাকাচ্ছে, তখন সে চোখ সরিয়ে ফেলে। আর যখন লোকেরা গাফেল হয়, তখন সে আবার তাকায়। একে বলা হয় চোখের খিয়ানত।- ইবনে কাসীর
অন্তরে অন্ধকার সৃষ্টি হওয়া
কাশফের অধিকারী বুযুর্গগণ লিখেছেন, কুদৃষ্টির ফলে চোখে এমন এক অন্ধকার সৃষ্টি হয় যা সামান্য অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন বুযুর্গরাও দেখে বুঝে ফেলেন যে, লোকটির চোখ পবিত্র নয়।- আল এলমু ওয়াল উলামা
উসমান (রা) এর অন্তর্দৃষ্টি
হযরত উসমান (রা) এর দরবারে এক ব্যক্তি আগমন করলেন, যিনি কুদৃষ্টিতে আক্রান্ত। হযরত উসমান (রা) তাকে কিছু বললেন না বরং সকলকে লক্ষ্য করে বললেন, মানুষের কি অবস্থা, তাদের চোখ থেকে যিনা টপকে পড়ছে।- কিতাবুর রূহ
দাজ্জালের সংগী
হযরত মাওলানা আশরাফ আলী থানভী (রহ) বলেন, আমি একবার স্বপ্নে দাজ্জালকে দেখতে পাই। তার সাথে অনেক মহিলা, গায়ক-গায়িকা ও বাদ্যযন্ত্র রয়েছে। এজন্য আমি তাকে খুব ভয় পাচ্ছিলাম। যাদের মাঝে সৌন্দর্যপূজা ও কুদৃষ্টির রোগ রয়েছে তারা দাজ্জালের সঙ্গী হবে।- আল এলমু ওয়াল উলামা
শায়খ যাকারিয়া (রহ) এর অভিজ্ঞতা
হযরত শায়খ যাকারিয়া (রহ) বলেন, কুদৃষ্টি একটি মারাত্মক রোগ। আমার নিজেরই এ ব্যাপারে অনেক অভিজ্ঞতা হয়েছে যে, মুরিদরা প্রথম প্রথম যিকির শোগলে অত্যন্ত মজা অনুভব করে। ইবাদতে স্বাদ পায়। কিন্তু কুদৃষ্টির কারণে ধীরে ধীরে সেই মজা বিদায় নিতে থাকে ও ইবাদত ছুটে যাওয়ার উপক্রম হয়।- আপবীতি
এক বুযুর্গের ঘটনা
একজন বুযুর্গ সম্পর্কে বর্ণিত আছে যে, তিনি খানায়ে কাবার তাওয়াফ করছিলেন আর তার এক চোখ ছিল কানা। তিনি তাওয়াফের মধ্যে বারবার বলছিলেন, হে আল্লাহ! আমি আপনার ক্রোধ থেকে পানাহ চাই।
কেউ জিজ্ঞেস করলো, এত ভয় পাওয়ার কারণ কি? তিনি বললেন, আমি একটি বালককে খারাপ নজরে দেখেছিলাম, তখন অদৃশ্য থেকে আমার চোখে একটা থাপ্পড় লাগল আর চোখটি কানা হয়ে গেল। এ জন্য আমি সবসময় ভয়ে তটস্থ থাকি না জানি আবার এরকম হয়ে যায়।- আপবীতি
কালিমা নসীব না হওয়া
এক ব্যক্তির মৃত্যুর সময় লোকেরা তাকে কালিমার তালকীন করলে সে বলতে লাগল, আমার মুখে কালিমা আসে না। লোকেরা জিজ্ঞাসা করলো, কারণ কি? সে বলল, এক মহিলা আমার নিকট তোয়ালে
বিক্রি করার জন্য এসেছিল। তার চেহারা ছিল অসম্ভব সুন্দর। তাই তাকে বারবার দেখছিলাম। এজন্যই আমার মুখে কালেমা আসে না।- আপবীতি
সব অন্যায়ের মূল
আল্লামা ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম (রহ) বলেন- মানুষ যত ধরণের অন্যায়, যিনা, ব্যভিচার ও অপরাধ করে থাকে, সবকিছুর মূল কারণ হলো মানুষের দৃষ্টি।
ইমাম গাযালী (রহ) বলেন- দৃষ্টিপাতই সকল ফিতনা ও দুর্দশার উৎস।- মিনহাজুল আবেদীন
দৃষ্টি একটি তীর
আল্লামা ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম (রহ) আরো বলেন- দৃষ্টি একটি তীর- তা যার দিকে নিক্ষেপ করা হয় তাকে হত্যা করার আগে নিক্ষেপকারীকেই হত্যা করে দেয়। কেননা একবার দেখলে আবার দেখতে মন চায়। এতে তৃপ্তি তো হয়ই না বরং অশান্তি আরো বেড়ে যায়।
বস্তুত এটি একটি বড় আযাব। তুমি একটি বিষয় হাসিল করতে চাইলে, তা না পাওয়ার কষ্টের উপর ধৈর্য ধারণ করতে পারলে না। আবার তা লাভ করার ক্ষমতাও তুমি রাখ না। এর চেয়ে বড় আযাব আর কি হতে পারে?
সব ধরণের অপকর্মের মূলে
এ কারণেই কোন এক কবি বলেন-
كُلُّ الْحَوَادِثِ مَبْدَاهَا مِنَ النَّظَرِ
وَمَعْظَمُ النَّارِ مِنْ مُسْتَصْغَرِ الشَّرَرِ
كَمْ نَظْرَةٍ بَلَغَتْ فِي قَلْبِ صَاحِبِهَا
وَالْوَتَرُ الْقَوْسِ بَيْنَ السَّهْمِ كَمُبْلَغِ
সব ধরণের অপকর্মের মূলে কারণ হলো দৃষ্টি। বড় বড় আগুনের মূল হচ্ছে কোন অগ্নিস্ফুলিঙ্গকে ছোট মনে করা।
এমন বহু দৃষ্টি রয়েছে, যা সে দৃষ্টি প্রদানকারীর অন্তরে এমনভাবে নাড়া দেয়, যেমন কোন তীর তার বাঁকা ধনুক ও সূতার মাঝে নাড়া দেয়।
ইবনুল জাওযী (রহ) এর উপদেশ
আল্লামা ইবনুল জাওযী (রহ) বলেন- হে বন্ধু! আল্লাহ তোমাকে তাওফীক দান করুন- তুমি দৃষ্টির অনিষ্টতা থেকে নিজেকে বাঁচাও! এ দৃষ্টি বহু ইবাদতকারীকেই ধ্বংস করেছে। কত পরহেযগার মুত্তাকীকে দ্বীন থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে।
তুমি দৃষ্টির হিফাযত কর, কারণ দৃষ্টিই হলো সব বিপদের মূল কারণ। তবে শুরুতে তার চিকিৎসা করা সহজ। কিন্তু যদি তা বারবার হয়ে থাকে, তখন তা শক্তিশালী ব্যাধিতে পরিণত হয়। তার চিকিৎসা আর সহজ হয় না, তখন তার চিকিৎসা খুবই কষ্টকর।- যাম্মুল হাওয়া
কুদৃষ্টির চিকিৎসা
কুদৃষ্টির চিকিৎসা কঠিন হলেও অসম্ভব নয়। এর প্রতিকারের জন্য কর্তব্য হলো- তওবা করা, বেশী বেশী ইস্তিগফার করা, আল্লাহর কাছে এই রোগ দূর হওয়ার জন্য দুআ করা, নেক সংসর্গ অবলম্বন করা, খারাপ সংসর্গ থেকে বাঁচা, বিবাহ করা, কুদৃষ্টির ক্ষতি এবং দৃষ্টির হিফাযতের উপকার ও প্রতিদান সম্পর্কে চিন্তা করা। গুনাহ থেকে বাঁচার উপায়সমূহ অবলম্বন করা।
দৃষ্টির হিফাযতের উপকারিতা
আল্লামা ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম (রহ) দৃষ্টির হিফাযতের দশটি মৌলিক উপকারিতা উল্লেখ করেছেন। এই দশটির সাথে জড়িয়ে রয়েছে আরো অসংখ্য উপকারিতা ও কল্যাণ।
তিনি বলেন- চোখ ও দৃষ্টি হলো শায়তানের বিষমিশ্রিত তীর। যার দৃষ্টি ও চোখ স্বাধীন, তার দুঃখ-দুর্দশা চিরস্থায়ী। এ জন্যই চোখ সংযত রাখার মধ্যে অনেক উপকার ও কল্যাণ নিহিত। যেমন-
১. আল্লাহর নির্দেশের আনুগত্য
এর দ্বারা আল্লাহর নির্দেশের আনুগত্য হয়। আল্লাহর নির্দেশাবলীর আনুগত্য দুনিয়া ও আখিরাতের আসল সফলতা।
এর চেয়ে কল্যাণকর কোন জিনিস নেই। যে ব্যক্তিই দুনিয়া ও আখিরাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, আল্লাহর হুকুমের বিপরীত চলার কারণেই হয়েছে।
২. অন্তরের প্রশান্তি
চোখ হেফাযতের মাধ্যমে অন্তরে আল্লাহর প্রতি ভালবাসা জন্ম নেয়। অন্তরে পরিপূর্ণ প্রশান্তি আসে। আর চোখ হেফাযত না করলে অন্তর অস্থির ও ব্যাকুল হয়ে যায়। আর এ অবস্থা বান্দাকে আল্লাহ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়।
৩.অন্তরের সুরক্ষা
দৃষ্টির যে বিষমিশ্রিত তীর অন্তরে বিদ্ধ হয়ে মানুষকে ধ্বংস করে দেয়, দৃষ্টি হেফাযত করলে সেই তীর অন্তর পর্যন্ত পৌঁছতে পারে না।
৪.অন্তরেরর দৃঢ়তা
চোখের হিফাযতের দ্বারা মানুষের অন্তর দৃঢ় ও মজবুত থাকে এবং সর্বদা খুশি ও আনন্দময় থাকে। অন্যথায় প্রতি মুহূর্তে অন্তর অস্থির, দুর্বল ও চিন্তান্বিত হয়ে থাকে।
৫.অন্তরে নূর সৃষ্টি হওয়া
চোখ হিফাযত করার দ্বারা অন্তরে নূর সৃষ্টি হয়। আল্লাহ তায়ালা চোখের হেফাযতের ব্যাপারে বলেছেন-
قُلْ لِلْمُؤْمِنِينَ يَغُضُّوا مِنْ أَبْصَارِهِمْ وَيَحْفَظُوا فُرُوجَهُمْ
আপনি মুমিনদেরকে বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি নত রাখে এবং তাদের যৌনাঙ্গ হেফাযত করে।-সূরা নূর:৩০
এরপরই আল্লাহ তায়ালা বলেছেন-
اللَّهُ نُورُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ مَثَلُ نُورِهِ كَمِشْكَاةٍ فِيهَا مِصْبَاحٌ
আল্লাহ নভোমন্ডল ও ভূমন্ডলের জ্যোতি। তার জ্যোতি বা নূরের উদাহরণ যেন একটি কুলঙ্গি, যাতে আছে একটি প্রদীপ।-সূরা নূর:৩৫
৬. অন্তর্দৃষ্টি সৃষ্টি হওয়া
দৃষ্টির হিফাযত দ্বারা বান্দার মধ্যে সঠিক ও বিশুদ্ধ বিচক্ষণতা সৃষ্টি হয়, ফলে বান্দা সত্য-মিথ্যা, হক ও বাতিলের মধ্যে পার্থক্য করতে পারে।
হযরত শাহ সুজা কিরমানী (রহ) বলেন, যে ব্যক্তি ইত্তিবায়ে সুন্নত ও মুরাকাবার মাধ্যমে তার ভিতর-বাহির নির্মাণ করে, হারাম জিনিস সমূহ থেকে দৃষ্টি সংযত রাখে, কামভাব ও কুপ্রবৃত্তি থেকে নিজেকে হিফাযত করে, হালাল খাবারে অভ্যস্ত হয়, তার বিবেক-বুদ্ধি কখনো ভুল করে না।
স্বয়ং শাহ সুজা (রহ) এর অবস্থা এমন ছিল যে, তার বিচক্ষণতা কখনও তার সাথে প্রতারণা করেনি।
আল্লাহ পাকের সাধারণ নিয়ম হলো, তিনি আমলের বদলা প্রত্যক্ষভাবেই দেন। যে ব্যক্তি আল্লাহর রেযামন্দির কোন জিনিস পরিত্যাগ করে, আল্লাহ এর চেয়েও ভাল জিনিস তাকে প্রদান করেন।
অতএব আল্লাহর সন্তুষ্টির লক্ষ্যে যে ব্যক্তি তার দৃষ্টি সংযত রাখে, আল্লাহ তাকে অন্তর্দৃষ্টি দান করেন। তার ইলম, ঈমান, মারিফাত ও বিচক্ষণতায় বরকত দান করেন। আর যে ব্যক্তির বিচক্ষণতা নষ্ট হয়ে যায়। তার অন্তর মাতালের মত হয়ে যায়।
৭. মনের সাহস বৃদ্ধি পাওয়া
দৃষ্টি সংযত রাখার মাধ্যমে অন্তরে দৃঢ়তা, স্থিরতা, শক্তি-সাহস ও বীরত্ব সৃষ্টি হয়। কুপ্রবৃত্তির অনুসারী নিজের আত্মাকে দুর্বল ও অপমানিত করে।
আল্লাহ তাআলা আনুগত্য ও ইবাদতের সঙ্গে সম্মান ও মর্যাদাকে সম্পর্কিত করেছেন আর অবাধ্যতা ও গুনাহর সাথে সম্পর্কিত করেছেন যিল্লতি ও অপমানকে।
ইরশাদ হয়েছে—
وَلِلّٰهِ الْعِزَّةُ وَلِرَسُوْلِهٖ وَلِلْمُؤْمِنِيْنَ
সম্মান তো আল্লাহ, তার রাসূল ও মুমিনদের জন্যই। [মুনাফিকুন: ৮]
৮. শয়তানের পথ সংকীর্ণ হওয়া
চোখ ও দৃষ্টি সংযত রাখার দ্বারা শয়তানের জন্য মানুষের অন্তরে পৌঁছার রাস্তা বন্ধ হয়ে যায়। কেননা এই পথেই সে মানুষের অন্তরে প্রবেশ করে।
৯. অন্তরের একাগ্রতা ও মনোযোগ বৃদ্ধি পাওয়া
দৃষ্টি সংযত রাখার মাধ্যমে অন্তরে এমন স্থিরতা ও প্রশান্তি অর্জিত হয়, যার ফলে বান্দা তার কল্যাণকর বিষয়ে পরিপূর্ণ মনোযোগ সহকারে চিন্তা-ভাবনা করতে পারে। এ জন্যই আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন-
وَلَا تُطِعْ مَنْ اَغْفَلْنَا قَلْبَهٗ عَنْ ذِكْرِنَا وَاتَّبَعَ هَوٰىهُ وَكَانَ اَمْرُهٗ فُرُطًا
তুমি ঐ ব্যক্তির অনুসরণ করো না, যার অন্তরকে আমি আমার যিকির থেকে গাফিল করে দিয়েছি। আর সে তার কুপ্রবৃত্তির অনুসরণ করে এবং যার কাজই হচ্ছে সীমালংঘন করা। [-সূরা কাহাফ: ২৮]
১০. অন্তরে আল্লাহর নূর সৃষ্টি হওয়া
চোখ ও অন্তরের মধ্যে এমন একটি সম্পর্ক বিদ্যমান যে, যে কাজে চোখ মশগুল হয়, সেই কাজে অন্তরও মশগুল হয়ে যায়। আর যে কাজে অন্তর নিয়োজিত হয়, সে কাজে চোখও নিয়োজিত হয়ে যায়।
একটার সংশোধনের দ্বারা অপরটির সংশোধন এবং একটার নষ্ট হওয়ার দ্বারা অপরটি নষ্ট হওয়া অপরিহার্য।
নষ্ট হয়ে যাওয়া অন্তরের উদাহরণ, যেন একটি ডাস্টবিন, যেখানে ময়লা আবর্জনা ফেলা হয়। এ ধরনের অন্তরে আল্লাহর নূর ও নৈকট্য কিভাবে প্রবেশ করবে?
হাকীমুল উম্মত (রহ) নসীহত ও অভিমত
হাকীমুল উম্মত হযরত মাওলানা আশরাফ আলী থানভী (রহ) ছাত্রদেরকে নসীহত প্রসঙ্গে বলেন, নিজের অন্তর ও চোখের হিফাযত করবে। মনে কুচিন্তা করবে না এবং চোখ দ্বারা অন্যায়ভাবে কোন দিকে তাকাবে না।
তবেই তুমি একজন বড় ওলী (আল্লাহর নৈকট্যভাজন) হতে পারবে ইনশাআল্লাহ। অন্য কেউ বিশ্বাস করুক আর না করুক, এমন ছাত্র ওলী হওয়ার ব্যাপারে আমি সম্পূর্ণ আশাবাদী।
হঠাৎ দৃষ্টি
জারীর ইবন আব্দুল্লাহ হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূল (সা) কে হঠাৎ দৃষ্টি পড়া সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে, তিনি আমাকে নির্দেশ দেন যে, আমি যেন আমার দৃষ্টিকে ফিরিয়ে রাখি।
হঠাৎ দৃষ্টির অর্থ হল, অনিচ্ছায় বা হঠাৎ কোন অপরিচিত নারীর উপর দৃষ্টি পড়া। এ ধরনের দৃষ্টির বিধান হল, প্রথমবার এতে কোন গুনাহ নাই।
তবে শর্ত হল, সাথে সাথে চক্ষুকে ফিরিয়ে নিতে হবে। আর যদি সে তার দৃষ্টিকে দীর্ঘায়িত করে, তখন তার উপর গুনাহ অবশ্যই বর্তাবে।
নবী (সা) এর নির্দেশ
ইবনে বুরাইদা রাদিয়াল্লাহু আনহু তার পিতা হতে বর্ণনা করেন, রাসূল (সা) আলী (রা) কে বলেন—
يَا عَلِيُّ، لَا تُتْبِعِ النَّظْرَةَ النَّظْرَةَ؛ فَإِنَّ لَكَ الْأُولَى وَلَيْسَتْ لَكَ الْآخِرَةُ
হে আলী! তুমি প্রথম দৃষ্টির পর দ্বিতীয় বার দেখবে না। কারণ, তোমার জন্য প্রথম দৃষ্টি (ক্ষমাযোগ্য), আর পরবর্তী দৃষ্টি তোমার জন্য (ক্ষমাযোগ্য) নয়।
অর্থাৎ প্রথম দৃষ্টির পর আবার দেখো না এবং একবার তাকানোর পর দ্বিতীয়বার তাকাবে না। অনিচ্ছাকৃত প্রথম দৃষ্টির কারণে তোমার কোন গুনাহ হবে না।
কিন্তু তোমার জন্য দ্বিতীয়বার তাকানোর কোন অনুমতি নাই। কারণ, এতে তোমার ইচ্ছা যুক্ত হওয়ার কারণে তোমার গুনাহ হবে।
যে সব লোক মশকরা করে বলে, প্রথমবার দেখে যদি কোন ব্যক্তি চোখ বন্ধ করা পর্যন্ত দীর্ঘ সময় তাকিয়ে থাকে তার কোন গুনাহ হবে না, তাদের কথা যে ভ্রান্ত তা এ ব্যাখ্যার দ্বারা স্পষ্ট প্রমাণিত হল।
কারণ, এখানে বলা হয়েছে ইচ্ছা করে তাকানো অপরাধ। চাই প্রথমবার হোক অথবা দ্বিতীয় বার।
দৃষ্টিশক্তি আল্লাহর নিআমত
মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-
قُلْ أَرَأَيْتُمْ إِنْ أَخَذَ اللَّهُ سَمْعَكُمْ وَأَبْصَارَكُمْ وَخَتَمَ عَلَىٰ قُلُوبِكُم مَّنْ إِلَٰهٌ غَيْرُ اللَّهِ يَأْتِيكُم بِهِ ۗ انظُرْ كَيْفَ نُصَرِّفُ الْآيَاتِ ثُمَّ هُمْ يَصْدِفُونَ
বলুন, ‘তোমরা কি ভেবে দেখেছ, আল্লাহ যদি তোমাদের শ্রবণশক্তি ও দৃষ্টিশক্তি কেড়ে নেন এবং তোমাদের হৃদয়ে মোহর করে দেন তবে আল্লাহ ছাড়া আর কোন প্রকৃত ইলাহ্ আছে যে তোমাদের এগুলো ফিরিয়ে দেবে?’ দেখুন, আমরা কিরূপে আয়াতসমূহ বিশদভাবে বর্ণনা করি এরপরও তারা মুখ ফিরিয়ে নেয়।- সূরা আল-আন’আম: ৪৬
চক্ষু হল, আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের পক্ষ হতে বড় নেয়ামত। গুনাহের কারণে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন যাতে চক্ষু না নিয়ে যায় সে জন্য আল্লাহকে ভয় করতে হবে।
হযরত আবু উমামা (রা) থেকে বর্ণিত হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেন—
لتغضن ابصاركم ولتحفظن فروجكم او ليكسفن الله وجوهكم
তোমাদের চোখ অবশ্যই নিম্নগামী করবে এবং তোমাদের গুপ্তাঙ্গ সংরক্ষণ করবে। তা না হলে আল্লাহ তাআলা তোমাদের চেহারা বিনষ্ট করে দেবেন।
পুরুষ ও বালকদের প্রতি দৃষ্টিপাত
উল্লেখ্য যে দৃষ্টি হিফাযতের বিধান পুরুষের পাশাপাশি নারীদের জন্যও প্রযোজ্য। কেননা আল্লাহ তাআলা পুরুষের সাথে সাথে নারীদেরকেও দৃষ্টি সংরক্ষণের নির্দেশ প্রদান করেছেন। কেননা নারীদের দেহ-মনেও কামনা-বাসনা রয়েছে। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন—
وَقُل لِّلْمُؤْمِنَاتِ يَغْضُضْنَ مِنْ أَبْصَارِهِنَّ وَيَحْفَظْنَ فُرُوجَهُنَّ
আপনি মুমিন নারীদেরকে বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি নত রাখে এবং তাদের যৌনাঙ্গ হেফাযত করে।- সূরা নূর: ৩০
অন্ধ সাহাবীর ঘটনা
একবার রাসূলুল্লাহ (সা) এর নিকট তার স্ত্রী উম্মু সালামা (রা) ও মায়মূনা (রা) বসা ছিলেন। এমন সময় অন্ধ সাহাবী উম্মে মাকতূম (রা) আগমন করেন। ঘটনাটি ছিল পর্দার নির্দেশ নাযীল হওয়ার পর। তখন নবী (সা) তাদেরকে বলেন, তোমরা তার থেকে পর্দা কর।
তখন উম্মু সালামা (রা) বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! ইনি কি অন্ধ নন? তিনি তো আমাদের দেখতে পাচ্ছেন না, চিনতেও পারছেন না। তখন রাসূলুল্লাহ (সা) বললেন, তোমরা দুজন কি অন্ধ হয়ে গেছ? তোমরা কি তাকে দেখছ না?
বালকদের প্রতি দৃষ্টিপাত
সালফে সালেহীন ও আকাবির মনিষীরা পরনারীর দিকে দৃষ্টিপাতকে যতটা ভয় পেতেন, ঠিক তেমনি দাড়ি বিহীন বালকদেরকে তারচেয়ে বেশি ভয় পেতেন!
কারণ পরনারীর সঙ্গ পাওয়া যতটা কঠিন, দাড়িহীন বালকদের কাছাকাছি হওয়া ততটাই সহজ। নারীর নিকটবর্তী হতে বাঁধা পেরোতে হয়, আর বালকদের ক্ষেত্রে সে বাধা নেই।
ইমাম শাফেয়ী (রহ) এর উক্তি
ইমাম শাফেয়ী (রহ) পরিষ্কার ভাষায় সতর্ক করে বলেছিলেন, তোমরা দাড়িবিহীন বালকদের সাথে ওঠা-বসা করো না। কারণ নারীদের চেয়েও এদের দ্বারা সৃষ্টি হওয়া ফিতনা অনেক সময় বেশি মারাত্মক হয়।
ইমাম আহমদ (রহ) এর ঘটনা
বর্ণিত আছে, এক সফরে ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বল (রহ.) একটি স্থানে অবস্থান করার সময় সেখানে একজন দাড়িবিহীন বালককে দেখে অন্যত্র চলে যান। তিনি তার সঙ্গীকে বলেন, এর সাথে একই ঘরে বা এক ছাদের নিচে থাকা নিরাপদ নয়।
হযরত কাসিম নানুতুবী (রহ) এর ঘটনা
তেমনি দারুল উলুম দেওবন্দের প্রতিষ্ঠাতা মুফতি মুহাম্মদ কাসেম নানুতবী (রহ)-এর সম্পর্কেও বর্ণিত আছে, একবার একজন সুদর্শন দাড়িবিহীন যুবক তার মজলিসে এলে তিনি নিজের দৃষ্টি নিচু করে ফেলেন এবং পরে খাদেমদের বলেন, ভবিষ্যতে এমন যুবকদের তার খুব কাছাকাছি না বসাতে।
তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, শয়তান মানুষের দুর্বলতার সুযোগ নেয়, তাই নিজের নফসকে কখনো নিরাপদ মনে করা উচিত নয়।
ইমাম নববী (রহ) এর উক্তি
ইমাম নববী (রহ) লিখেছেন, আলিমগণ বলেছেন, কোনো নারীর দিকে তাকানো যেমনিভাবে হারাম, তেমনি সুন্দর দাড়িবিহীন বালকের দিকে কামনার নজরে তাকানোও হারাম- বরং অনেক ক্ষেত্রে এটি আরও কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।- শরহে মুসলিম
ইমাম আহমদ (রহ) বক্তব্য
ইমাম আহমদ ইবন হাম্বল (রহ.) বলেন,
“إذا رأيتَ الرجلَ مع الأمرد، فاتهمه.”
তুমি যদি কোনো ব্যক্তিকে দাড়িবিহীন কিশোরের সঙ্গে (সন্দেহজনকভাবে) দেখ, তবে তার ব্যাপারে সন্দেহ কর।- আল-আদাব আশ-শারইয়্যাহ।
আরো কতক উক্তি
ইমাম ইবনুল জাওযী (রহ) বলেন, দাড়িবিহীন কিশোরের দিকে কামনার দৃষ্টিতে তাকানো সর্বসম্মতিক্রমে হারাম।- যাম্মুল হাওয়া
শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ (রহ.) বলেন, কামনার সঙ্গে দাড়িবিহীন কিশোরের মুখের দিকে তাকানো, পরনারীর দিকে তাকানোর মতো হারাম; বরং কোনো কোনো ক্ষেত্রে তার দ্বারা ফিতনা আরও বড় হতে পারে।- মাজমূ‘ আল-ফাতাওয়া
ইমাম যাহাবী (রহ) বলেন:
দাড়িবিহীন কিশোরদের দিকে (কামনাপূর্ণ) দৃষ্টি ইবলিসের তীরসমূহের একটি। আল-কাবায়ির
প্রয়োজন ও স্বাভাবিক সম্পর্ক
তবে তারা প্রয়োজন, শিক্ষা, চিকিৎসা, আত্মীয়তা বা স্বাভাবিক সামাজিক লেনদেনের জন্য তাকানোকে নিষিদ্ধ বলেননি, যতক্ষণ না সেখানে কামনা বা ফিতনার আশঙ্কা থাকে। কুরআনের নির্দেশও হলো-মুমিনদের বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে সংযত রাখে।-
সূরা আন-নূর ২৪:৩০
উপসংহার
হারাম দৃষ্টি একটি নীরব গুনাহ, যার ক্ষতি শুধু চোখে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং তা হৃদয়, ঈমান, চরিত্র, পরিবার এবং সমাজের ওপর গভীর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
তাই একজন মুমিনের কর্তব্য হলো আল্লাহর নির্দেশ মেনে নিজের দৃষ্টি সংযত রাখা, হারাম থেকে দূরে থাকা এবং ভুল হয়ে গেলে আন্তরিকভাবে তওবা করা। দৃষ্টি সংযত রাখা মানুষের অন্তরকে পবিত্র করে, ঈমানকে শক্তিশালী করে এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের পথ সুগম করে।
আসুন, আমরা সবাই কুরআন ও সুন্নাহর নির্দেশনা অনুসরণ করে হারাম দৃষ্টি থেকে নিজেদের রক্ষা করি, তাকওয়া ও লজ্জাশীলতাকে জীবনের অলংকার হিসেবে গ্রহণ করি এবং আল্লাহ তাআলার কাছে সর্বদা পবিত্র দৃষ্টি ও পবিত্র অন্তরের জন্য দোয়া করি।
আল্লাহ আমাদের সবাইকে হারাম দৃষ্টি থেকে হেফাজত করুন এবং তাঁর সন্তুষ্টির পথে অটল থাকার তাওফিক দান করুন। আমীন।
দুআ
اللَّهُمَّ طَهِّرْ قَلْبِي مِنَ النِّفَاقِ، وَعَمَلِي مِنَ الرِّيَاءِ، وَلِسَانِي مِنَ الْكَذِبِ، وَعَيْنِي مِنَ الْخِيَانَةِ، فَإِنَّكَ تَعْلَمُ خَائنَةَ الْأَعْيُنِ وَمَا تُخْفِي الصُّدُورُ
হে আল্লাহ! পবিত্র কর আমার হৃদয়কে মুনাফিকী থেকে। আমার আমলকে রিয়া থেকে। আমার যবানকে মিথ্যা থেকে। আমার চক্ষুকে খিয়ানত থেকে। নিশ্চয়ই তুমি চক্ষুর অপব্যবহার এবং অন্তরে যা গোপন আছে সে সম্পর্কে অবগত আছ।- মিশকাতুল মাসাবীহ
اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ إِيمَانًا لَا يَبِيدُ، وَنَعِيمًا لَا يَنْفَدُ، وَقُرَّةَ عَيْنٍ لَا تَنْقَطِعُ، وَمُرَافَقَةَ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي أَعْلَى جَنَّةِ الْخُلْدِ
হে আল্লাহ! আমি তোমার নিকট এমন ঈমান চাই, যা কখনো ফিরে যাবে না। এমন নিয়ামত চাই যা কখনো শেষ হবে না। চোখের এমন শীতলতা চাই যা কখনো আমা হতে বিচ্ছিন্ন হবে না। আর আমি চিরস্থায়ী জান্নাতের সর্বোচ্চ মর্যাদায় তোমার নবীর সঙ্গে বন্ধুত্ব (সান্নিধ্য) প্রার্থনা করছি।
🔹🔹🔹
👉 আরও পড়ুন উত্তম চরিত্র বিষয়ক হাদীস গ্রন্থ মাকারিমুল আখলাক।



