অন্যান্য গ্রন্থ

আসুদেগানে ঢাকা – হাকীম হাবীবুর রহমান

Asudegan e Dhaka - ঢাকার ইতিহাস ঐতিহ্য

ভূমিকা

আসুদেগানে ঢাকা – হাকীম হাবীবুর রহমান- ঢাকার ইতিহাস কেবল তার প্রাচীন স্থাপত্য, রাজপ্রাসাদ বা শাসকদের কাহিনিতে সীমাবদ্ধ নয়; এই নগরীর মাটিতে শায়িত অসংখ্য মানুষের জীবন ও স্মৃতির সঙ্গেও জড়িয়ে আছে তার বিস্মৃত ইতিহাস। ‘আসুদগানে ঢাকা’ এমনই একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক গ্রন্থ, যেখানে ঢাকা ও এর আশপাশের অঞ্চলে অবস্থিত মুসলিম কবর, মাজার এবং ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বদের সমাধিস্থলের পরিচয় অনুসন্ধান ও গবেষণার মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে।

রঈসুল আতিব্বা মাওলানা হাকিম হাবীবুর রহমান আখুনজাদা রচিত এই গ্রন্থটি প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৪৬ সালে। এতে পুরান ঢাকার বিভিন্ন ওয়ার্ড, শহরতলি এবং অন্যান্য অঞ্চলের মুসলিম মাজার ও কবরের ইতিহাস স্থান পেয়েছে। পাশাপাশি ঢাকার মুসলিম জনবসতি, পাঠান ও মুঘল আমল, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিকাশ এবং বাংলার ইতিহাসের নানা বিস্মৃত অধ্যায়ও আলোচিত হয়েছে।

‘আসুদগানে ঢাকা’ শুধু মাজার ও কবরের তালিকা নয়; বরং এটি ঢাকার ইতিহাস, মুসলিম ঐতিহ্য, পুরান ঢাকার সংস্কৃতি এবং বাংলার সামাজিক ইতিহাস অনুসন্ধানের একটি মূল্যবান দলিল। ইতিহাসপ্রেমী, গবেষক এবং ঢাকা ও বাংলার ঐতিহ্য সম্পর্কে আগ্রহী পাঠকদের জন্য গ্রন্থটি বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।

এই গ্রন্থের বাংলা অনুবাদের মাধ্যমে আমরা ঢাকার বিস্মৃত ইতিহাসের সেই মূল্যবান অধ্যায়গুলো নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরার চেষ্টা করছি।

আসুদেগানে ঢাকা

একটি দারুস সাআদাত অনুবাদ ও প্রকাশনা

উর্দু গ্রন্থের প্রকাশকাল

‘মঞ্জর প্রেস’, মাহুতটুলি, ঢাকায় মুদ্রিত এবং ‘ইমদাদিয়া লাইব্রেরি’, চকবাজার, ঢাকা থেকে প্রকাশিত।

উর্দু গ্রন্থের মুখবন্ধ

পূর্ব ভারতের সভ্যতার পীঠস্থান এবং বাংলার সংস্কৃতি ও সামাজিক জীবনের কেন্দ্র—ঢাকা ও এর সংলগ্ন অঞ্চলের মুসলিম কবরসমূহের বিবরণ

আসুদগানে ঢাকা

যে গ্রন্থে অনুসন্ধান ও গবেষণার অমূল্য ফলাফল প্রথমবারের মতো উপস্থাপন করা হয়েছে এবং বাংলার আনুষঙ্গিক ইতিহাসের ওপর এমন আলোকপাত করা হয়েছে যে, তার প্রতিটি গোপন দিক আলোকোজ্জ্বল হয়ে উঠেছে।

রচনা:
রঈসুল আতিব্বা মাওলানা হাকিম হাবীবুর রহমান আখুনজাদা

১৯৪৬ খ্রিস্টাব্দ

প্রথম সংস্করণ
প্রতি খণ্ডের মূল্য: তিন টাকা

গ্রন্থকারের মুখবন্ধ

ক্ষমাপ্রার্থনা ও কৃতজ্ঞতা

১০৩ ডিগ্রি জ্বরের মধ্যে এই গ্রন্থের ভূমিকা লেখা হয়েছে। প্রথম দিকের কয়েকটি পৃষ্ঠা যেন জ্বরের ঘোরে লেখা প্রলাপমাত্র। বানানের ভুল, ভাষাগত ত্রুটি এবং কম্পিউটারের সংশোধন এসবই ঠিক করা যেত, যদি আমার শরীর সুস্থ থাকত এবং চোখ ঠিকভাবে কাজ করত।

এত অসংখ্য সংশোধনের জন্য পৃথক একটি শুদ্ধিপত্র (Errata) সংযোজন করাকে আমি অর্থহীন মনে করেছি। কারণ আমি কখনও কাউকে শুদ্ধিপত্র মিলিয়ে বই পড়তে দেখিনি। বইটি ভালো-মন্দ যেভাবেই হোক ছাপা হয়ে যাক- এতেই আমার রুচির তৃপ্তি। প্রশংসার আকাঙ্ক্ষা নেই, পুরস্কারেরও পরোয়া নেই।

[গ্রন্থকারের ঢাকা বিষয়ক গ্রন্থসমূহ]

‘আসুদাগান-ই ঢাকা’ ঢাকা-ইতিহাস ধারাবাহিকের প্রথম খণ্ড। দ্বিতীয় খণ্ড ‘মসজিদে ঢাকা’, তৃতীয় খণ্ড ‘পঞ্চাশ বছর আগে ঢাকা’, এবং চতুর্থ খণ্ড ‘ঢাকার কবিগণ’। তবে এই ধারার সমাপ্তি হবে ‘সালাসা গাসসালা’ গ্রন্থ দিয়ে।

আমি যদি বেঁচে থাকি এবং আল্লাহ তাআলার অনুগ্রহ লাভ করি, তবে ইনশাআল্লাহ এই সব রচনাই প্রকাশিত হবে। আর যদি তা না হয়, তবে আমার উইল অনুযায়ী সমস্ত পাণ্ডুলিপি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে দান করে দেওয়া হবে। এরপর আমার অবর্তমানে যা হওয়ার, তাই হবে।

যেসব বন্ধু রৌদ্র-ছায়ার সব পরিস্থিতিতে আমার পাশে ছিলেন এবং যাঁদের অনুগ্রহ থেকে আমি উপকৃত হয়েছি- বিশেষ করে সৈয়দ বাকির আলী খান সাহেব, শাহ সৈয়দ আবদুন নঈম সাহেব এবং মাস্টার দীন মুহাম্মদ খান সাহেব- তাদের প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা আমার কর্তব্য। কেননা হাদিসে এসেছে:

من لم لَا يَشْكُرُ اللَّهَ مَنْ لَا يَشْكُرُ النَّاسَ
যে মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না, সে আল্লাহর প্রতিও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না।

শেষে মীরের একটি শের উদ্ধৃত করছি-

اب تو جاتے ہیں بتکدہ سے میر + پھر ملیں گے اگر خدا لایا
এখন তো আমরা মন্দির (প্রিয়ের আস্তানা) থেকে বিদায় নিচ্ছি;
আবার দেখা হবে, যদি আল্লাহ নিয়ে আসেন।

ওয়াসসালাম।
ঢাকা, ২৪ অক্টোবর ১৯৩৭ খ্রিস্টাব্দ
নিয়াজ কিশ
লেখক (আহসানুল্লাহ আলাইহি / আল্লাহ তাঁর প্রতি অনুগ্রহ করুন)

গ্রন্থকারের ভূমিকা

আমরা আল্লাহর প্রশংসা করি এবং তার সম্মানিত রাসূলের প্রতি দরুদ ও সালাম প্রেরণ করি।

ছোটবেলাতেই আমি উর্দু পড়তে ও লিখতে শিখে গিয়েছিলাম। সেই সময় থেকেই আমার মনে ইচ্ছা ছিল ঢাকার মসজিদ ও কবরস্থানগুলোর ইতিহাস লিখব। তখন আমার বয়স ছিল মাত্র দশ-বারো বছর। সেই বয়সেই আমি অনেক মসজিদের ইতিহাস আমার নোটবইয়ে লিখে রেখেছিলাম।

১৯০৪ খ্রিস্টাব্দে শিক্ষা সমাপ্ত করে বাড়ি ফিরে আসি। চিকিৎসা-পেশার ব্যস্ততার মধ্য দিয়ে জীবনের নতুন অধ্যায় শুরু হয়। এরপর বঙ্গভঙ্গ (Partition of Bengal) ঘটলে আমার রাজনৈতিক জীবনেরও সূচনা হয়। দিন-রাত আমার রাজনৈতিক পথপ্রদর্শক মরহুম নবাব সলিমুল্লাহ সাহেবের সঙ্গে কাজ করেই সময় কাটতে থাকে।

মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠার আগে যখন মুসলিম কনফারেন্স গঠিত হয়, তখনও আমি তাতে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করতাম। পরে সেই সংগঠনের ভিত্তিতেই যখন মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠিত হয়, তখন মরহুম নবাব সলিমুল্লাহ সাহেব সম্পাদক (Secretary) নির্বাচিত হন এবং আমাকে যুগ্ম সম্পাদক (Joint Secretary) নিযুক্ত করা হয়।

[ঢাকার প্রথম উর্দু সাময়িকী]

১৯০৬ খ্রিস্টাব্দে আমি ঢাকার প্রথম উর্দু সাময়িকী ‘আল-মাশরিক’ প্রকাশ করি। পরে সেটি সাপ্তাহিক সংবাদপত্রে রূপান্তরিত হয়; কিন্তু অল্পদিনের মধ্যেই সেটির সঙ্গে আমাকে বিচ্ছেদ বরণ করতে হয়।

ছাত্রজীবনেই আমি কয়েকটি গ্রন্থ রচনা করেছিলাম, যার মধ্যে ‘আল-ফারুক’ এবং ‘হায়াতে সক্রাত’ (সক্রেটিসের জীবন) প্রকাশিত হয়। ‘আল-ফারুক’ গ্রন্থটি দেখে আমার শ্রদ্ধেয় অভিভাবক, হাকীম হাফিজ মুহাম্মদ আজমল খান (মরহুম) ৫০ কপি ক্রয় করে আমাকে উৎসাহিত করেছিলেন।

আরবি ভাষায়ও আমি কয়েকটি পুস্তিকা রচনা করেছিলাম। আরবি ও উর্দু ভাষায় লেখা আরও কিছু রচনা প্রকাশিত হওয়ার সুযোগ পায়নি।

[শিবলী নোমানী (রহ) এর পরামর্শ]

১৯০৬ খ্রিস্টাব্দে এখানে এডুকেশনাল কনফারেন্স উপলক্ষে ইসলামের বিশিষ্ট চিন্তাবিদ আল্লামা শিবলী নোমানী (রহ.) আগমন করলে আমি তাঁর সামনে একটি প্রস্তাব পেশ করি। আমি বলি, যেমন হাজী খলিফা তাঁর ‘কাশফুয-যুনূন’ গ্রন্থে বই ও গ্রন্থকারদের পরিচয় সংকলন করেছেন, তেমনি যদি ভারতের প্রতিটি প্রদেশভিত্তিক গ্রন্থ ও গ্রন্থকারদের সংক্ষিপ্ত পরিচয় নিয়ে একটি গ্রন্থ রচিত হয়, তবে তা ভারতবর্ষের জন্য এক বিরাট জ্ঞানসেবা হবে।

আল্লামা আমার প্রস্তাবের প্রশংসা করে আমাকে নির্দেশ দিলেন, “তুমি অন্তত বাংলার অংশটি সম্পূর্ণ করো।”

গত চল্লিশ বছর ধরে আমি এ কাজ নিয়ে কমবেশি চেষ্টা করে এসেছি, যদিও ধারাবাহিকভাবে কাজ করা সম্ভব হয়নি। তবে এখন কাজটি সম্পূর্ণ হয়েছে। আশা করি সেটিও শিগগিরই প্রকাশিত হবে। এটি বঙ্গ ও আসামের জ্ঞান-সাহিত্যিক ইতিহাস এবং আমার চল্লিশ বছরের সাধনা ও পরিশ্রমের ফল।

[ঢাকার মসজিদের ইতিহাস]

‘মসজিদে ঢাকা’ নামে একটি গ্রন্থ প্রস্তুত রয়েছে। ইনশাআল্লাহ, এই গ্রন্থটির অব্যবহিত পরেই সেটি প্রকাশিত হবে। এরপর যদি জীবন ও সুস্বাস্থ্য অবশিষ্ট থাকে, তবে ‘সালাসা গাসসালা’ রচনার পালা আসতে পারে।

[ঢাকা রেডিও]

ঢাকা রেডিও এই প্রতিশ্রুতি দিয়েছে যে তারা এগুলো মুদ্রণ করবে, আমার কাছ থেকে ‘পঞ্চাশ বছর আগে ঢাকা’ শিরোনামে ১৬টি প্রবন্ধ লিখিয়ে নিয়েছিল। পরে ‘কিছু পুরনো কথা’ শিরোনামে আরও ২০টি প্রবন্ধ সম্প্রচার করায়। এরপর একই প্রতিশ্রুতিতে ঢাকার ঐতিহাসিক স্থাপনা সম্পর্কে আরও ১২টি প্রবন্ধও লিখিয়ে ও পাঠ করায়।

কিন্তু সেই প্রতিশ্রুতি পূরণ হবে- এমন আশা আর নেই। যদি তারা আমাকে অনুমতি দেয়, তবে আমি নিজেই সেগুলো প্রকাশ করব।

[ঢাকার ইতিহাসের মূল্যবান তথ্য]

এই তিনটি প্রবন্ধমালায় ঢাকার অতীত ইতিহাস সম্পর্কে এমন অনেক মূল্যবান তথ্য রয়েছে যে সেগুলোর প্রকাশ অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু যেখানে দেশের ভাগ্যনিয়ন্তা অন্যেরা, সেখানে এই ইসলামী নগরীর ইতিহাসের ওপর কতটুকু আলোকপাতের আশা করা যেতে পারে?

এখন আমার ডান চোখে ছানি (বা জল) নেমেছে। শারীরিক শক্তি অনেকটাই ক্ষীণ হয়ে গেছে। সারা জীবনের সংগ্রহে গড়ে তোলা আমার গ্রন্থাগার এলোমেলো অবস্থায় পড়ে আছে। কাজ অনেক বাকি, অথচ জীবন ফুরিয়ে আসছে।

যারা আমার সঙ্গী ছিলেন, তারা অনেকেই চলে গেছেন। আর যারা আছেন, তারাও যেন চলে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হয়ে বসে আছেন। এই বয়সে যদি আমি আমার রচিত পুস্তক ও গ্রন্থগুলো শুধু প্রকাশ করেই যেতে পারি, তবে মনে করব যে আমার জীবন বৃথা যায়নি।

আমার সাফল্য একমাত্র আল্লাহরই দান। (ওয়া মা তাওফীকী ইল্লা বিল্লাহ।)

[এই পুস্তিকা লেখার উদ্দেশ্য]

এই পুস্তিকাটি লেখার উদ্দেশ্য মূলত নিজের জ্ঞানপিপাসা ও রুচির তৃপ্তি সাধন। এর পরের উদ্দেশ্য হলো একটি মানবিক দায়িত্ব পালন করা। যাদের প্রচেষ্টায় এই অঞ্চলে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের নাম প্রচারিত হয়েছে, তাঁদের স্মরণ করা আমি অপরিহার্য মনে করি।

ইতিহাস অধ্যয়ন করলে আমরা এমন বহু ব্যক্তির নাম জানতে পারি, যাঁরা এই ভূমিতে সমাহিত আছেন; অথচ আজ তাদের কবরের অবস্থান নির্ণয় করাই প্রায় অসম্ভব।

গত চল্লিশ বছরে আমার চোখের সামনে যে পরিবর্তন ঘটেছে, এবং আমার জীবদ্দশাতেই কত নাম-নিশানা বিলীন হয়ে যেতে দেখেছি, তা প্রত্যক্ষ করে আজ এই গ্রন্থটি প্রকাশের প্রয়োজনীয়তা আরও অনেক বেশি অনুভব করছি।

উদাহরণস্বরূপ, ‘তাযকিরাতুস সালিহীন’ গ্রন্থে নির্ভরযোগ্যভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে আহমদ ইবন মুহাম্মদ, যিনি শায়খ আল-হাদ্দার নামে পরিচিত এবং ৩৪১ হিজরির ১১ মহররমে ইন্তেকাল করেন, এবং ইসমাঈল ইবন সাঈদ নিশাপুরী, যিনি ৩৬৬ হিজরির ১৭ শাবানে ইন্তেকাল করেন। এই দুই মহান ব্যক্তি ঢাকাতেই সমাহিত আছেন।

এদের বহু পরে বখতিয়ার খলজি বাংলা জয় করেন। কিন্তু এ কথা সত্য যে, ইসলাম সর্বত্র তলোয়ারের আগে ধর্মপ্রচারকদের (মুবাল্লিগদের) মাধ্যমেই পৌঁছেছে। অনেক এমন ব্যক্তির নাম আমার জানা আছে, যারা বখতিয়ার খলজির আগমনের বহু পূর্বেই বাংলায় এসেছিলেন। যাক, সে তো অনেক পুরোনো কথা।

এবার অপেক্ষাকৃত সাম্প্রতিক একটি ঘটনার কথা বলি। এই ঢাকাতেই এক সময় শাহ আকিল নামে একজন প্রসিদ্ধ ফকির ছিলেন। নবাব ইসলাম খান চিশতী যখন এখানে আসেন, তখন তিনি জীবিত ছিলেন। কিন্তু আজ কে বলতে পারবে, তিনি কোন তরিকার ফকির ছিলেন, কখন ইন্তেকাল করেছেন এবং কোথায় সমাহিত আছেন?

একইভাবে ‘তাযকিরাতুস সালিহীন’ গ্রন্থ থেকে জানা যায় যে শায়খ মুহাম্মদ হামযা ইবন শায়খ আব্বাস কাদিরী ১২৮৮ হিজরির ২৭ রবিউল আউয়ালে ইন্তেকাল করেন এবং ঢাকাতেই সমাহিত আছেন। কিন্তু আজ তাঁর মাজারের অবস্থান কেউ জানে না, অথচ এটি খুব বেশি দিনের পুরোনো ঘটনাও নয়।

[যাদের বরকতে ঢাকা সমৃদ্ধ]

আমি এটিকে এক দুর্ভাগ্য এবং জাতীয় অধঃপতনের লক্ষণ বলে মনে করি যে, আমাদের পূর্বসূরি ও বুজুর্গ ব্যক্তিরা এভাবে বিস্মৃত হয়ে যান। অথচ তাদেরই বরকতে আজও ঢাকা সমৃদ্ধ ও জনবহুল রয়েছে।

এই গ্রন্থ রচনার তৃতীয় উদ্দেশ্য হলো- আমার পরিচিত অনেকের ধারণা, আমি ইসলামের ইতিহাস, বিশেষ করে বাংলার ইসলামী ইতিহাস সম্পর্কে খুবই অভিজ্ঞ। এই পুস্তিকাটি পড়লে তাদের বিশ্বাস হবে যে, যে ব্যক্তি নিজের জন্মভূমির ইতিহাস সম্পর্কেই এত অল্প জানে, সে আবার সমগ্র বাংলার ইসলামী ইতিহাস কতটুকুই বা জানতে পারে!

এভাবে তাদের আমার সম্পর্কে যে উচ্চ ধারণা রয়েছে, তা আপনাআপনিই দূর হয়ে যাবে।

আমার দৃঢ় বিশ্বাস, অন্তত এই শেষ উদ্দেশ্যে আমি অবশ্যই সফল হয়েছি। আর নিজের ওপর আরোপিত একটি বড় অভিযোগ বা অতিরঞ্জিত ধারণা দূর করার যে চেষ্টা করেছি, তা ফলপ্রসূ হয়েছে।

আমার জানা মতে, সমগ্র বাংলার মধ্যে ঢাকাই এমন একটি জনবসতিপূর্ণ স্থান, যেখানে অসংখ্য পাকা কবর চারদিকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে দেখা যায়। শুধু শহরেই নয়, সমগ্র জেলাজুড়েই বিশেষ করে নারায়ণগঞ্জ মহকুমায়, যেখানে বাংলার প্রাচীন রাজধানী সোনারগাঁও অবস্থিত মাজারের কোনো অভাব নেই।

তবে এই পুস্তিকায় আমি কেবল একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ডে অবস্থিত মাজারগুলোরই আলোচনা করেছি। সমগ্র ঢাকা জেলার জন্যও আমার কাছে যথেষ্ট উপকরণ রয়েছে; কিন্তু এখনও আরও গবেষণা ও অনুসন্ধানের প্রয়োজন আছে।

যদি আল্লাহ তাআলা তাওফিক দান করেন, তবে আমি নিজেই দ্বিতীয় খণ্ডে সমগ্র জেলার বিবরণ লিখব। আর যদি তা না হয়, তবে ফারসি প্রবাদ অনুযায়ী-

“হয়তো অদৃশ্য জগত থেকে কোনো ব্যক্তি এসে এই কাজ সম্পন্ন করবে।”

[তৎকালীন ঢাকা তিনটি থানার অন্তর্ভুক্ত]

আমাদের এই শহর- আল্লাহ একে সর্বদা সমৃদ্ধ ও জনবহুল রাখুন- তিনটি থানার অন্তর্ভুক্ত। যথা-

১. কোতোয়ালি
২. লালবাগ
৩. সূত্রাপুর

আমার এই গ্রন্থের আলোচ্য এলাকার সীমানা হলো-

পশ্চিমে: তুরাগ নদী (পাঠে “তারাক” লেখা হলেও প্রসঙ্গ অনুযায়ী এটি তুরাগ নদী বোঝানো হয়েছে),

পূর্বে: শীতলক্ষ্যা নদী,

দক্ষিণে: বুড়িগঙ্গা নদী,

উত্তরে: টঙ্গী নদী (যা পরে শীতলক্ষ্যায় গিয়ে মিশেছে; লেখক এটিকেও “তারাক” নামে উল্লেখ করেছেন)।

এই নির্দিষ্ট এলাকার মধ্যে শহরের উল্লিখিত তিনটি থানার পাশাপাশি তেজগাঁও, ফতুল্লা এবং ফরাশগঞ্জ- এই তিনটি থানা অন্তর্ভুক্ত। অর্থাৎ মোট ছয়টি থানার অধিকাংশ মাজারের বিবরণ আমি এই গ্রন্থে সংকলন করেছি।

যদি কোনো মাজারের উল্লেখ বাদ পড়ে থাকে, তবে তা কেবল আমার অজ্ঞতার কারণেই বাদ পড়েছে। এই মাজারগুলোতে দর্শনার্থীরা সহজেই মোটরগাড়ি, মোটরসাইকেল কিংবা হেঁটেই যেতে পারে, কোথাও নৌকার প্রয়োজন হয় না।

মুঘল শাসনের শেষ যুগে এই শহরে বহু শিয়া পরিবার বসবাস করত। তাদের মধ্যে ইরান থেকে আগত লোকের সংখ্যাই ছিল সবচেয়ে বেশি। এছাড়াও অনেক ধনী জমিদার ও প্রভাবশালী অধিবাসীও ছিলেন। কিন্তু আজ তাদের সংখ্যাই সবচেয়ে কমে গেছে। এমনকি এখন হয়তো জীবিত শিয়াদের চেয়ে তাঁদের কবরের সংখ্যাই বেশি।

আমি যেহেতু এই শহরের অধিবাসী এবং এটিই আমার জন্মভূমি, তাই আমার শিয়া ভাইদের প্রতিও আমার একটি দায়িত্ব রয়েছে। সে কারণে তাঁদের কবরস্থানগুলোর বিবরণও আমি লিপিবদ্ধ করছি। এর একটি উপকার হবে- ভবিষ্যতে এ-সংক্রান্ত বহু বিভ্রান্তি ও অনিশ্চয়তা দূর হয়ে যাবে।

যদিও দুঃখের বিষয়, একটি অবক্ষয়গ্রস্ত সম্প্রদায়ের মতোই ঢাকার শিয়া সমাজের অধিকাংশ মানুষ আমাকে সন্দেহের চোখে দেখে। তবুও নিন্দুকের নিন্দার তোয়াক্কা না করে আমি এই কাজ সম্পন্ন করব।

প্রথমে আমার ইচ্ছা ছিল, যেসব মাজার কোনো মসজিদের সঙ্গে সংযুক্ত, সেগুলোর বিবরণ ‘মসজিদে ঢাকা’ গ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত করব। কারণ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সেই কবরগুলো মসজিদের প্রতিষ্ঠাতাদের। কিন্তু পরে পুনর্বিবেচনার সময় আমি সেই সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করি এবং সেসব মাজারের অধিকাংশের বিবরণও এই গ্রন্থেই সংযোজন করি।

[এই গ্রন্থের বিন্যাস]

এই গ্রন্থের বিন্যাস সম্পর্কে কয়েকটি কথা বলা প্রয়োজন, যাতে দর্শনার্থীদের সুবিধা হয়।

আমি ঢাকার পৌরসভার সাতটি ওয়ার্ডের ঐতিহাসিক বিবরণ লিপিবদ্ধ করেছি। আর মাজারগুলোর আলোচনা পূর্ব দিক থেকে শুরু করে পশ্চিম দিক পর্যন্ত ক্রমানুসারে উপস্থাপন করেছি। এরপর শহরের বাইরে আমার লেখনী এগিয়ে গেছে আশহাব থেকে জিঞ্জিরা হয়ে সিদ্দিকগঞ্জ পর্যন্ত।

যেহেতু প্রতিটি ওয়ার্ডের সীমানা প্রথমে বর্ণনা করেছি, তারপর সেখানে অবস্থিত মাজারগুলোর বিবরণ দিয়েছি, তাই এই পুস্তিকাটি এখন এক অর্থে একটি পথনির্দেশিকা (Guide Book)-তেও পরিণত হয়েছে।

আরও দুটি বিষয় উল্লেখ করতে চাই।

প্রথমত, চারটি স্থান ছাড়া কোথাও আমি অলৌকিক ঘটনা (কেরামত) বা সাধারণ নিয়মের বাইরে ঘটে যাওয়া ঘটনার বিবরণ দিইনি। কারণ আমার বিশ্বাস, শরিয়তের ওপর অবিচল থাকা (ইস্তিকামাত আলাশ-শরিয়াহ)-ই প্রকৃত কেরামত। আর মৌখিক প্রচলিত কাহিনি, খানকাহ বা পীরবংশের উত্তরাধিকারীদের বর্ণনার তুলনায় আমি ঐতিহাসিক তথ্যকেই অধিক গুরুত্ব দেওয়া সমীচীন মনে করেছি।

দ্বিতীয়ত, এই গ্রন্থে যে ভাষা ব্যবহার করেছি, তা বর্তমান যুগের প্রচলিত ভাষা ও লেখনীরীতি থেকে ভিন্ন। কারণ আমি পুরোনো শিক্ষাধারার একজন ছাত্র। বুজুর্গ ব্যক্তিদের জীবনী লেখার ক্ষেত্রে আধুনিক ভাষাশৈলী আমার পছন্দ নয়। আমার শিক্ষাদীক্ষা আমাকে শিখিয়েছে যে, সে ধরনের ভাষা তাঁদের প্রতি অসম্মান ও বেয়াদবি বলে গণ্য হয়।

আমি “রহ.” কিংবা “সা.”-এর মতো সংক্ষিপ্ত রূপ লেখা অত্যন্ত অপছন্দ করি। এর পরিবর্তে আমার কলম থেকে সর্বদাই “রহমাতুল্লাহি আলাইহি” এবং “সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম”-ই লেখা হবে। যদি কোথাও অসাবধানতাবশত এ বিষয়ে কোনো ত্রুটি হয়ে থাকে, তবে আমি সেই মহাপুরুষদের রূহের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছি।

[এই গ্রন্থের তথ্যসূত্র]

এখন আমি আমার তথ্যসূত্রগুলো উল্লেখ করতে চাই-

১. বিশ্বস্ত ও নির্ভরযোগ্য বুজুর্গ ব্যক্তিদের বর্ণনা, যা আমার কাছে তাওয়াতুর (অর্থাৎ বহু নির্ভরযোগ্য সূত্রে ধারাবাহিকভাবে প্রচলিত) পর্যায়ে পৌঁছেছে।

২. মুদ্রিত তজকিরা (স্মারকগ্রন্থ), যার একটি বড় অংশ আমার গ্রন্থাগারে সংরক্ষিত রয়েছে।

৩. অসংখ্য পুরনো নথিপত্র বা দলিলপত্র অধ্যয়ন, যা বেশিরভাগই আমার নজরে এসেছে এভাবে যে, দুর্ভাগ্যবশত এখন পুরো শহরে আমি ছাড়া এগুলো পড়ার মতো আর কেউ বেঁচে নেই।

৪. প্রচুর ইংরেজি, বাংলা, উর্দু ও ফার্সি ভাষায় মুদ্রিত ইতিহাস গ্রন্থ, আর এগুলো সংখ্যায় অসংখ্য। এরপরে রয়েছে সেইসব বিরল সংগ্রহ (নুবাদিরাত), যা আমার গ্রন্থাগারের শোভা বাড়িয়ে চলেছে। যেমন:

৫. কিবরিতে আহমার ফার্সি। হযরত শাহ নূরী (রহ.) কর্তৃক লিখিত পাণ্ডুলিপি।

৬. মজমুয়া-ই মারাছি ও আমাল, হযরত শাহ মোহাম্মদী (রহ.)-এর ফার্সি পাণ্ডুলিপি।

৭. হযরত শাহ রওশন আলী-এর পক্ষ থেকে হযরত শাহ হাসান রেজা ফতুহা (রহ.)-এর নামে পাঠানো তথ্যপত্র (ইত্তেলা নামা)।

৮.সুফি হাফেজ মগফুর-এর ফার্সি কাব্যময় শোকগাথা বা মৃত্যুসংবাদ (ওফাত নামা) পাণ্ডুলিপি।

৯. মরহুম সুফি ফজলুল হক-এর ফার্সি মসনবি শোকগাথা (ওফাত নামা) পাণ্ডুলিপি; এই দুটিই হযরত সুফি মোহাম্মদ দায়েম (কুদ্দিসা সিররুহুল আজিজ)-এর ওফাত বা ইন্তেকাল প্রসঙ্গে রচিত।

১০. সুফি সৈয়দ শাহ আব্দুল কাদীম সাহেব রিজভী-এর পারিবারিক ডায়েরি বা সংকলন (বিয়াজ-ই খানদানি)।

১১. সুফি শাহ সৈয়দ আহমদুল্লাহ এম.এ. (বর্তমান সাজ্জাদানশীন)-এর পারিবারিক ডায়েরি বা সংকলন (বিয়াজ-ই খানদানি)।

১২. প্রখ্যাত গবেষক আকা আহমদ আলী আহমদ জাহাঙ্গীরনগরী মরহুম-এর লিখিত ‘তারিখ-ই ঢাকা’ (ঢাকার ইতিহাস) পাণ্ডুলিপি।)

১৩. পরম প্রিয় মৌলভি সৈয়দ শাহ মোহাম্মদ আজম সাহেব (সাল্লামাহু)-এর পারিবারিক ডায়েরি বা সংকলন (বিয়াজ-ই খানদানি)।

[কিছু কথা]

ওয়ারিদীনদের (ঢাকায় আগতদের) অবস্থা বর্ণনা করার আগে, কয়েকটি পংক্তি (কিছু কথা) আপনাদের শোনানো অনুপযুক্ত হবে না। এর মাধ্যমে এ গ্রন্থ সম্পর্কে আরও গভীর অন্তর্দৃষ্টি লাভ করা যাবে।

বাংলায় মুসলমানরা স্থল ও জল- উভয় পথেই এসেছিলেন; তবে ঢাকার মুসলিম জনসংখ্যার অধিকাংশই স্থলপথে এখানে আগমন করেছিল। বখতিয়ার খলজির বহু আগ থেকেই মুসলমানরা এ অঞ্চলে আসতে শুরু করেছিলেন। হিন্দুরা তাদের ‘তুর্ক’ বলত এবং তাদের স্বভাব-চরিত্র, আচার-আচরণ, জীবনযাপন ও বীরোচিত ভাবভঙ্গি সম্পর্কে বেশ ভালোভাবেই পরিচিত হয়ে উঠেছিল।

তাদের মধ্যে প্রচারকদের দলই ছিল অধিক; আর কদাচিৎ ব্যবসায়ীরাও আসত। প্রচারকদের সঙ্গে তাদের মুরিদদের দলও থাকত। বখতিয়ার খলজির পর তো মুসলমানদের দলে দলে আগমন শুরু হয়ে গেল। প্রত্যেক বিজয়ীর সঙ্গে যে বিশাল সৈন্যসামন্ত ও অনুচরবর্গ আসত, তাদের অনেকেই এখানে থেকে যেত। কারণ, এই দোযখের মতো স্থানেও- যে একবার নেয়ামতের সন্ধানে আসে, সে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আর ফিরে যায় না। এভাবেই এসব বিদেশি একসময় এ দেশের মানুষে পরিণত হয়ে গেল।

তাদের একটি বড় অংশ পূর্ববঙ্গে বসতি স্থাপন করেছিল এবং এখানকার মাটির সঙ্গেই তাদের স্থায়ী বন্ধন গড়ে উঠেছিল। তাদের বংশধরেরা আজও নিজেদের বিশেষ চেহারা-সুরত ও দৈহিক গঠনের কারণে দেশীয় অধিবাসীদের মধ্যে স্বতন্ত্রভাবে চোখে পড়ে।

মুঘল আমলে তো শেষ যুগ পর্যন্ত এ নিয়ম চালু ছিল যে, আগ্রা থেকে যে গভর্নরই আসতেন, তিনি তাঁর সঙ্গে বিপুলসংখ্যক কর্মচারী, অনুচর ও সৈন্যসামন্ত নিয়ে আসতেন। নানা ধরনের পেশাজীবী ও কারিগরও তাঁদের সঙ্গে আসত। আর যখন তিনি এখান থেকে চলে যেতেন, তখন বাংলার জাদুতে মুগ্ধ ও বাধ্য হয়ে একটি বড় দল এখানেই থেকে যেত।

[ঢাকার নিজস্ব সংস্কৃতি ও সভ্যতা]

ঢাকা দীর্ঘকাল ধরে শাসকদের আবাসস্থল হিসেবে থাকা এই শহরটির নিজস্ব এক বিশেষ সংস্কৃতি ও সভ্যতা রয়েছে। শহরের বৃহৎ জনসমষ্টি, যারা সুখবাস বা খুশবাস নামে পরিচিত, তারা আজও উর্দু ভাষায় কথা বলে। তাদের মধ্যেই এখনো চারজন সৌভাগ্যবতী বৃদ্ধা রয়ে গেছেন, যারা সালামের জবাবে বলেন, “আল্লাহ হপ্ত-হাজারি করুন।” অথচ হপ্ত-হাজারি কথাটির অর্থ না তাঁরা নিজেরা জানেন, না যাঁদের উদ্দেশে বলেন তাঁরা জানেন।

কিন্তু এখন পরিবর্তন ঘটছে, এবং অত্যন্ত দ্রুতগতিতে আমাদের সভ্যতা ও সামাজিক জীবনে অবক্ষয় নেমে আসছে। তবু আমাদের ঘরবাড়িতে আজও অতি প্রাচীন উর্দু বাগ্‌ধারা শোনা যায়, তবে তা ওই বৃদ্ধাদের জীবনকাল পর্যন্তই।

শাহজাদা আজীমুশ্‌শান ও মুর্শিদ কুলি খাঁর পারস্পরিক দ্বন্দ্বের ফলে ঢাকা ধ্বংসের পথে এগোতে শুরু করে। আজীমুশ্‌শান ঢাকা থেকে গিয়ে পাটনাকে আজীমাবাদ নাম দেন। অন্যদিকে মুর্শিদ কুলি খাঁ মখসুসাবাদ-এর নাম মুর্শিদাবাদ রাখেন। এর পর থেকে আগ্রা বা দিল্লি থেকে গভর্নরদের আসাই বন্ধ হয়ে যায় এবং ঢাকায় কেবল নায়েবে নাজিম বসবাস করতে থাকেন।

এ হলো সেই ইতিহাস, যা হাজার পৃষ্ঠায়ও ধারণ করা উচিত; কিন্তু এই ক্ষুদ্র পুস্তিকার জন্য এতটুকুই অনেক বেশি হয়ে গেল।

শহরের ভূপ্রকৃতির অবস্থা স্বাভাবিকভাবেই এমন যে, চক থেকে যত পশ্চিম দিকে যেতে থাকবেন, নালা, খাল, বিল ও ঝিল ক্রমশ বিলুপ্ত হতে দেখবেন এবং পদে পদে অনুভব করবেন যে, আপনি নিম্নভূমি থেকে উঁচু ভূমির দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন। আর চক থেকে যত পূর্ব দিকে যাবেন, ততই নিচু ভূমি দেখতে পাবেন। গর্ত, খাদ, ঝিল ও নালা পদে পদে পথরোধক হয়ে দাঁড়াত এবং চারদিকে জলাভূমি ও খালের যেন এক জাল বিস্তৃত দেখা যেত। আগে এসব স্থানে বারো মাসই নৌকা চলত, আর এখন কেবল বর্ষাকালেই চলে। যদিও প্রকৃত সত্য হলো, এখন অনেক নালা বন্ধ হয়ে গেছে অথবা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

পূর্বে পানি ও আবহাওয়ার অনুকূল না হওয়ার কারণে এসব স্থানে বসতি ছিল না। আর সেখানে যেসব টিলা ছিল, মুসলমানরা সেগুলোতে নিজেদের মৃতদেহ দাফন করত। কিন্তু ১৭৭০ খ্রিস্টাব্দে বাংলায় যখন ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ দেখা দিল এবং মানুষ মানুষকে খেতে শুরু করল, তখন নসিরাবাদ (ময়মনসিংহ), কমিলা সুদারাম (নোয়াখালী) এবং জালালপুর (ফরিদপুর)-এর দরিদ্র ও অনাহারক্লিষ্ট লোকেরা শহরে এসে বসতি স্থাপন করল।

শহরে ওই নিম্নভূমিগুলো ছাড়া আর কোনো খালি জমি অবশিষ্ট ছিল না। তাই এসব লোক সেখানেই বসতি গড়ল; কারণ নিজেদের দেশেও তারা এ ধরনের জমিতেই বসবাস করত।

এই সমগ্র জনবসতি শহর থেকে নয়, গ্রামাঞ্চল থেকে এসেছিল এবং সবাই ছিল কৃষিজীবী। তবে তাদের মধ্যে মুন্সি, মিয়াঁজি, খন্দকার, ভূঁইয়া প্রভৃতি উচ্চস্তরের লোকও ছিল, যাদের জীবিকা এসব লোকের ওপরই নির্ভরশীল ছিল। তাই তারাও বাধ্য হয়ে তাদের সঙ্গে এসেছিল।

[ঢাকাইয়া কুট্টি নামটি যেভাবে এলো]

এরা কেউ ভিক্ষাবৃত্তি পছন্দ করেনি। বরং শহরের আমিরদের যে ধান খাজনার পরিবর্তে আদায় করা হতো, তা কুটে জীবিকা নির্বাহ করতে শুরু করল; কারণ নিজেদের ঘরেও তারা এই কাজই করত এবং আজও গ্রামাঞ্চলে এ কাজ করে থাকে। এ কারণেই তারা কুটি নামে পরিচিত হলো; কেননা ধান থেকে চাল বের করার জন্য ধান কোটাকে ধান কোটা বলা হয়।

এই লোকেরা নিজেদের ভাষা বাংলা বলতেই থাকল; কিন্তু কালক্রমে তাদের পুরুষেরা উর্দুর সঙ্গেও পরিচিত হয়ে গেল। অল্পদিনের মধ্যেই তারা এ পেশা ছেড়ে দিয়ে নির্মাণকাজ ও ব্যবসা-বাণিজ্যে নিযুক্ত হতে শুরু করল। এখন তাদের মধ্যে, মাশাআল্লাহ, উপাধিপ্রাপ্ত ও শিক্ষিত বহু বিশিষ্ট ব্যক্তি রয়েছেন।

এই সমগ্র বসতি আজও ঝিল ও নালার তীরে বিদ্যমান রয়েছে। আর নওয়াবগঞ্জের আশপাশ যখন জনশূন্য হয়ে পড়ল, তখন কিছু লোক সেখানে গিয়ে বসতি স্থাপন করল এবং কিছু লোক রাহমতগঞ্জ ও পশ্চাতে বসবাস করতে লাগল। তবে আফগান ও তুর্কিদের জনবসতি খুশবাসদের মধ্যে মিশে বিলীন হয়ে গেল।

[পাঠানদের শহর এবং মুঘলদের ঢাকা কোনটি?]

এখন শুধু এ কথা বলা বাকি যে, পাঠানদের শহর কোথায় ছিল এবং মুঘলদের ঢাকা কোনটি?

পাঠানদের ঢাকা প্রকৃতপক্ষে মসকদী থেকে উত্তর দিকে পান্ডু নদী পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল এবং পশ্চিমে ফুলবাড়িয়া অতিক্রম করে চাঁদনীঘাট পর্যন্ত পৌঁছেছিল।

এর অভ্যন্তরীণ সীমারেখা এভাবে বুঝতে পারেন: পূর্বে দোলাই নদী। দোলাই নদীর একটি শাখা বাংলাবাজার পর্যন্ত এসে শিরি চক-এর সেতু অতিক্রম করে চাঁদ খাঁর সেতুর সামনে দিয়ে এগিয়ে বখশীবাজার হয়ে চাঁদনীঘাটের পূর্বদিকে বুড়িগঙ্গা নদীতে গিয়ে পড়ত। আর এটিই ছিল পশ্চিম সীমান্ত।

মুঘলদের ঢাকা অর্থাৎ মুঘলরা যে নতুন জনবসতি গড়ে তুলেছিলেন তা চকের পশ্চিম দিক থেকে শুরু হয়ে সাতগম্বুজ পর্যন্ত বিস্তৃত ভূমিকে বোঝায়। যদিও অল্প সময়ের মধ্যেই তারা বুড়িগঙ্গা থেকে বেরিয়ে আসা এই ভূমিখণ্ডকেও শহরের অন্তর্ভুক্ত করে সেখানে স্থাপনা ও ভবনও নির্মাণ করেছিলেন। লোহার সেতু নির্মিত হওয়ার আগে দোলাই নদীর ওপর একটি সেতু ছিল। তবে এ বিষয়ে আমি নিশ্চিত কোনো অনুসন্ধানী তথ্য পাইনি যে, সেতুটি পাঠানরা নির্মাণ করেছিলেন, না মুঘলরা।

প্রবল ধারণা হলো, পাঠানরাই এটি নির্মাণ করেছিলেন। কারণ, এ নদীর ওপারে বুড়িগঙ্গার তীরে আলমগঞ্জে তাদের একটি চৌকি ছিল, যাকে বাহারিস্তান-ই-গায়েবী গ্রন্থে কেল্লা বেগ মুরাদ খাঁ নামে উল্লেখ করা হয়েছে।

যাই হোক, সেতুর ওপারে বড় কোনো জনবসতি ছিল কি না, তা নির্বিশেষে সেখানে মুসলমানদের কয়েকটি কবরস্থান ছিল এবং শহরের আমির-উমরাদের বাগানও ছিল। প্রাচীন বাগানগুলোর মধ্যে এখনো একটি স্থান হুক্কাবর্দারের বাগান নামে পরিচিত।

গ্রন্থটির প্রসঙ্গে ভূমিকা দীর্ঘ হয়ে গেল; কিন্তু আমি দেখছি, বলার মতো আরও অনেক কথাই রয়ে গেছে।

হাকিম হাবীবুর রহমান রোড
জাহাঙ্গীরনগর, ঢাকা, বাংলা

হাবীবুর রহমান আখুনজাদা
كان الله له

[আল্লাহ অনুগ্রহে ভূমিকা অংশটুকু সম্পন্ন হলো। গ্রন্থটির অনুবাদ চলমান রয়েছে, সম্পন্ন হলে pdf প্রকাশ করা হবে।]

🔹🔹🔹

👉 আরও পড়ুন প্রবন্ধ বিবাহের উপকারিতা

আরও পোস্ট

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Back to top button
error: Content is protected !!