আল-কুরআন/আত-তাফসীর

সূরা আল ফাতিহা, আয়াত ৩-৫ এর তাফসীর, তাফসীর আদ দুররে মানসূর – ইমাম সুয়ূতী রহ.

Sura al fatiha 3-5, Tafsir ad durre manthur - Imam suyuti rh.

সূর আল ফাতিহা আয়াত ৩-৫ এর তাফসীর, তাফসীর আদ দুররে মানসূর থেকে অনূদিত।

আমাদের অনুবাদ ও প্রকাশনা – দারুস সাআদাত

ভূমিকা

সূরা আল-ফাতিহা পবিত্র কুরআনের সর্বশ্রেষ্ঠ সূরা, যা প্রতিটি রাকাআতে পাঠ করা ফরজ। এই সূরার ৩–৫ নং আয়াত আল্লাহ তাআলার গুণাবলি, বিচার দিবসের মালিকানা এবং বান্দার পূর্ণ আত্মসমর্পণের গভীর শিক্ষা প্রদান করে। বিশেষভাবে, তাফসীর আদ-দুররুল মানসূর গ্রন্থে এসব আয়াতের ব্যাখ্যায় সাহাবায়ে কেরাম ও তাবেঈনদের বর্ণিত হাদিস ও আছারের আলোকে আয়াতগুলোর তাৎপর্য স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে।

الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ (3)

৩. যিনি পরম করুণাময় অতি দয়ালু

ইমাম আব্দ ইবনে হুমায়দ মাতারুল ওয়ারাক সূত্রে- কাতাদাহ (রহ) থেকে সূরা আল ফাতিহার তাফসীর বর্ণনা করেন যে-

الْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ

হল ঐ কওল আর হামদ যা মাখলুকের কেউ তার বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করতে পারে না।

الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ

তিনি নিজে তার প্রশংসা করেছেন।

مَالِكِ يَوْمِ الدِّينِ

দীন দ্বারা উদ্দেশ্য ঐ দীন যার মধ্যে প্রতিদান দেওয়া হবে।

অতঃপর বললেন, তোমরা এভাবে বল إِيَّاكَ نَعْبُدُ وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ

বললেন, নিজের সত্তাকে প্রকাশ করেছেন।

اهْدِنَا الصِّرَاطَ الْمُسْتَقِيمَ

সীরাতে মুস্তাকীম দ্বারা উদ্দেশ্য

صِرَاطَ الَّذِينَ أَنْعَمْتَ عَلَيْهِمْ

আর তা হল নবীদের পথ।

غَيْرِ الْمَغْضُوبِ عَلَيْهِمْ

দ্বারা উদ্দেশ্য ইহুদী আর

وَلَا الضَّالِّينَ

দ্বারা উদ্দেশ্য নাসারা।

ইমাম দারকুতনী, হাকীম এবং বায়হাকী হযরত উম্মু সালামা (রা) থেকে বর্ণনা ‎করেন। রাসূলুল্লাহ (সা) সালাতে ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম’ পাঠ করেন এবং একে এক ‎আয়াত গণ্য করেন। ‘আলহামদুল্লিাহি রাব্বিল আলামীন’-কে দ্বিতীয়, ‘আররাহমানির রাহিম’-কে ‎তৃতীয়, ‘মালিকি ইয়াওমিদদীন’-কে চতুর্থ আয়াত গণ্য করেন। এমনীভাবে ‘ইয়্যাকানবুদু ওয়া ‎ইয়্যাকানাস্তায়ীন’ এবং নিজের পাঁচ আঙ্গুল একত্রিত করেন। ‎

□ □ □ □

مَالِكِ يَوْمِ الدِّينِ (4)

৪. বিচার‏ ‏দিবসের‏ ‏মালিক

মালিকি ইয়াওমিদ্দীন এর বিভিন্ন পাঠ

ইমাম তিরমিযী, ইবনুল আম্বারী এবং ইবনে আবিদ দুনইয়া কিতাবুল মাসাহিফে- হযরত উম্মে সালামা (রা) থেকে বর্ণনা করেন, নবী (সা) مَلك يَوْم الدّين আলিফ ব্যতীত (’মা’ না টেনে) পাঠ করতেন।

ইমাম ইবনুল আম্বারী- হযরত আনাস (রা) থেকে বর্ণনা করেন। রাসূলুল্লাহ (সা), আবু বকর, উমর, তালহা, যুবায়র, আব্দুর রহমান ইবনে আউফ এবং মুআয ইবনে জাবাল (রা) مَلك يَوْم الدّين আলিফ ব্যতীত পাঠ করতেন।

ইমাম আহমদ আয যুহদে, তিরমিযী, ইবনে আবু দাউদ এবং ইবনুল আম্বারী হযরত আনাস (রা) থেকে বর্ণনা করেন যে, নবী কারীম (সা), আবু বকর এবং উসমান (রা) مَالك يَوْم الدّين আলিফসহ (’মা’ টেনে) পাঠ করতেন।

ইমাম সাঈদ ইবনে মানসূর এবং ইবনে আবী দাউদ মাসাহিফে- সালিম এবং তিনি তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন যে, নবী কারীম (সা), আবু বকর এবং উসমান (রা) مَالك يَوْم الدّين পাঠ করতেন।

ইমাম ওকী তার তাফসীরে, আব্দ ইবনে হুমায়দ, আবু দাউদ এবং ইবনে আবু দাউদ- যুহরী (রহ) থেকে বর্ণনা করেন। রাসূলুল্লাহ (সা), আবু বকর এবং উমর (রা) مَالك يَوْم الدّين (আলিফসহ) পাঠ করতেন। সর্বপ্রথম যিনি مَلك আলিফ ব্যতীত পাঠ করেছেন সে হল মারওয়ান।

ইমাম ইবনে আবী দাউদ এবং খতীব শিহাব সূত্রে সাঈদ ইবনুল মুসায়িব এবং বারা ইবনে আজীব (রা) থেকে বর্ণনা করেন। তারা বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা), আবু বকর এবং উমর مَلك يَوْم الدّين (আলিফ ব্যতীত) পাঠ করতেন।

ইমাম ইবনে আবু দাউদ- ইবনে শিহাব থেকে বর্ণনা করেন। তার নিকট সংবাদ পৌঁছেছে যে, নবী কারীম (সা), আবু বকর, উমর, উসমান, মুআবিয়াহ এবং তার ছেলে ইয়াযিদ সবাই مَالك يَوْم الدّين (আলিফসহ) পাঠ করতেন। ইবনে শিহাব বলেন, মারওয়ান সর্বপ্রথম مَلك আলিফ ব্যতীত পাঠ করেন।

ইমাম ইবনে আবু দাউদ, ইবনুল আম্বারী- যুহরী থেকে বর্ণনা করেন। নবী কারীম (সা), আবু বকর, উমর, উসমান, তালহা, যুবায়র, ইবনে মাসউদ এবং মুআয ইবনে জাবাল مَلك يَوْم الدّين (আলিফ ব্যতীত) পাঠ করতেন।

ইমাম ইবনে আবী দাউদ, ইবনুল আম্বারী- হযরত আনাস (রা) থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, আমি নবী কারীম (সা), আবু বকর, উসমান এবং আলী (রা) এর পিছনে নামায পড়েছি। তারা সবাই পাঠ করতেন مَلك يَوْم الدّين (আলিফ ব্যতীত)।

ইমাম ইবনে আবু দাউদ এবং ইবনে আবী মুলায়কাহ- নবী কারীম (সা) এর একজন স্ত্রী থেকে বর্ণনা করেন যে, নবী কারীম (সা) مَالك يَوْم الدّين (আলিফসহ) পাঠ করেছেন।

ইমাম ইবনে আবী দাউদ, ইবনুল আম্বারী এবং দারাকুতনী আল আফরাদে, ইবনে জামী তার মুজামে- হযরত আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণনা করেন। রাসূলুল্লাহ (সা)مَلك يَوْم الدّين (আলিফ ব্যতীত) পাঠ করতেন।

ইমাম হাকীম আর তিনি এটাকে সহিহ বলেছেন- হযরত আবু হুরায়রা (রা) বর্ণনা করেন, নবী কারীম (সা) مَالك يَوْم الدّين (আলিফসহ) পাঠ করতেন।

ইমাম তাবরানী তার মুজামে- হযরত ইবনে মাসউদ (রা) থেকে বর্ণনা করেন। রাসূলুল্লাহ (সা) আলিফসহ مَالك يَوْم الدّين পাঠ করেছেন। আর غير المغضوب عَلَيْهِم যেরের সাথে পাঠ করতেন।

ইমাম ওকী, আল ফিরইয়াবী, আবু উবায়দ, সাঈদ ইবনে মানসূর, আব্দ ইবনে হুমায়দ, এবং ইবনুল মুনযির- হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব (রা) থেকে বর্ণনা করেন। তিনি আলিফসহ مَالك يَوْم الدّين পাঠ করতেন।

ইমাম ওকী এবং সাইদ ইবনে মনসূর- হযরত আবু কিলাবাহ (রহ) থেকে বর্ণনা করেন। হযরত উবাই ইবনে কাব مَالك يَوْم الدّين পাঠ করতেন।

ইমাম ওকী, ফিরইয়াবী, আব্দ ইবন হুমায়দ এবং ইবনে আবু দাউদ- হযরত আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণনা করেন। তিনি আলিফসহ مَالك يَوْم الدّين পাঠ করতেন।

ইমাম আব্দ ইবনে হুমায়দ- আবু উবায়দাহ থেকে বর্ণনা করেন যে, হযরত আব্দুল্লাহ (রা) مَالك يَوْم الدّين পাঠ করতেন।

মালিকি ইয়াওমিদ্দীন দ্বারা কি উদ্দেশ্য?

ইমাম ইবনে জারীর এবং হাকীম আর তিনি এটাকে সহিহ বলেছেন- ইবনে মাসউদ এবং ‎আরো অসংখ্য সাহাবী থেকে বর্ণনা করেন যে مَالِكِ يَوْمِ الدِّينِ দ্বারা উদ্দেশ্য হল হিসাবের দিন।

ইমাম ইবনে জারীর এবং ইবনে আবী হাতিম- হযরত ইবনে আব্বাস (রা) থেকে مَالك يَوْم الدّين এর ‎অর্থ বর্ণনা করেন যে-‎ ‎ঐ দিন তার সাথে হুকুমের আর কেউ মালিক হবে না, যেমন দুনিয়াতে মালিক ‎হয়ে থাকে। আর يَوْم الدّين দ্বারা উদ্দেশ্য মাখলুকের হিসাবের দিন। তা হল কিয়ামতের দিন। তিনি লোকদেরকে তাদের আমলের প্রতিদান দিবেন। যদি আমল ভালো হয় তবে প্রতিদান ভালো হবে আর যদি আমল খারাপ হয় তবে প্রতিদানও মন্দ হবে, তবে আল্লাহ যদি মাফ করে দেন।

ইমাম আব্দুর রাযযাক এবং আব্দ ইবনে হুমায়দ হযরত কাতাদাহ থেকে مَالك يَوْم الدّين এর ‎তাফসীর বর্ণনা করেছেন যে, যেদিন আল্লাহ তাআলা তার বান্দাদেরকে আমল অনুযায়ী প্রতিদান দিবেন। ‎

বৃষ্টি প্রার্থনার নামায ও দুআ

ইমাম আবু দাউদ, হাকীম আর তিনি এটাকে সহিহ বলেছেন এবং বায়হাকী হযরত আয়শা (রা) থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, লোকেরা রাসূলুল্লাহ (সা) এর নিকট বৃষ্টি কম হওয়ার অভিযোগ করল। রাসূলুল্লাহ (সা) মিম্বর আনার নির্দেশ দিলেন আর তা ঈদগাহে রাখার জন্য বললেন। আর লোকদের জন্য একটা দিন নির্ধারণ করলেন, সেখানে উপস্থিত হওয়ার জন্য। রাসূলুল্লাহ (সা) তাশরীফ আনলেন যখন সূর্য উদিত হচ্ছিল। রাসূলুল্লাহ (সা) মিম্বরে আরোহন করে তাকবীর পাঠ করলেন এবং আল্লাহর প্রশংসা করলেন। অতঃপর বললেন, তোমরা অনাবৃষ্টির অভযোগ করেছ। অথচ আল্লাহ্‌ রাব্বুল আলামীন ঘোষণা দিয়েছেন- ‘যদি তোমরা তাঁর নিকট দু’আ কর, তবে তিনি তা কবুল করবেন’।

অতঃপর তিনি এই দুআ করেন-

الْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ مَلِكِ يَوْمِ الدِّينِ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ، يَفْعَلُ مَا يُرِيدُ اللَّهُمَّ أَنْتَ، لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ الْغَنِيُّ وَنَحْنُ الْفُقَرَاءُ أَنْزِلْ عَلَيْنَا الْغَيْثَ، وَاجْعَلْ مَا أَنْزَلْتَ لَنَا قُوَّةً وَبَلَاغًا إِلَى حِينٍ

সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ্‌র জন্য, যিনি বিশ্বজগতের রব। তিনি পরম দাতা মেহেরবান, কিয়ামতের দিনের একচ্ছত্র অধিপতি। তিনি ছাড়া আর কোন ইলাহ নাই। তিনি যা ইচ্ছা তাই করেন। হে আল্লাহ্‌! তুমিই আল্লাহ্‌। তুমি ছাড়া আর কেউ স্বয়ংসম্পূর্ণ নয় এবং আমরা ফকীর। তুমি আমাদের উপর বৃষ্টি বর্ষণ কর এবং তার দ্বারা সবসময় খাদ্যশস্য উৎপাদনের ব্যবস্থা কর।

ইমাম আবু দাউদ বলেন, হাদীসটি গরীব তথাপি তার সনদ উত্তম। (ইমাম সুয়ূতী বলেন,) আহলে মদীনাহ ملك يَوْم الدّين (আলিফ ব্যতীত) পড়েন এই হাদীস তার প্রমাণ।

□ □ □ □

إِيَّاكَ نَعْبُدُ وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ (5)

৫. আমরা তোমারই ইবাদত করি এবং তোমার কাছেই সাহায্য ‎চাই

ইয়্যাকানাবুদু এর তাফসীর

ইমাম ইবনে জারীর ইবনে আবী হাতিম- ইবনে আব্বাস (রা) থেকে إِيَّاكَ نَعْبُدُ এর তাফসীর বর্ণনা করেন যে, আমরা তোমাকে এক মানি আর তোমাকে ভয় করি, আর তোমার প্রতি আশা রাখি, তুমি আমাদের রব, তুমি ব্যতীত আমাদের আর কোন রব নেই। আর আমরা তোমার আনুগত্যের ব্যাপারে এবং আমাদের সকল কাজের ব্যাপারে তোমার সাহায্য প্রার্থনা করি।

ইয়্যাকয়নাবুদু এর বিভিন্ন পাঠ

ইমাম ওকী এবং ফিরইয়াবী- হযরত আবু রাযীন থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, আমি আলী (রা)-কে এই শব্দাবলী পাঠ করতে শুনেছি আর তিনি একজন আরব কুরায়শী বাগ্মী ছিলেন। اهْدِنَا إِيَّاكَ نَعْبُدُ وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ তিনি উভয় আয়াতকে এভাবে একত্রিত করে পাঠ করেন।

ইমাম খতীব তার তারীখে- হযরত আবু রাযীন থেকে বর্ণনা করেন। আলী (রা) إِيَّاكَ نَعْبُدُ وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ পাঠ করার সময় প্রথমে হামযাহ, অতঃপর মদ অতঃপর শাদ পাঠ করেছেন।

আল্লাহর সাহায্য চাওয়া

ইমাম আবুল কাসিম আল বাগাবী এবং মারওয়ার্দী মারিফাতুস সাহাবায়, তাবরানী আউসাতে ‎এবং আবু নুআইম দালায়িলে- হযরত আনাস (রা) থেকে আর তিনি হযরত আবু তালহা (রা) থেকে ‎রিওয়ায়াত করেন। তিনি বলেন- আমাদের এক গাযওয়ায় রাসূলু্লাহ (সা) এর সাথে দুশমনদের মুকাবিলা ‎হয়। আমি রাসূলুল্লাহ (সা) কে পাঠ করতে শুনলাম-‎

يَا {مَالِكِ يَوْمِ الدِّينِ إِيَّاكَ نَعْبُدُ وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ}‏

হে বিচার বিচার দিবসের মালিক। আমরা তোমারই ইবাদত করি এবং তোমার ‎কাছেই সাহায্য চাই।

এরপর আমি দেখলাম যে, তারা পড়ে যাচ্ছে। ফেরেশতারা তাদের সামনে ও পিছন ‎থেকে মারছে। ‎

□ □ □ □

👉 আরও পড়ুন সূরা আল ফাতিহা আয়াত ২ এর তাফসীর, তাফসীর আদ দুররে মানসূর-ইমাম সুয়ূতী (রহ)

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Back to top button
error: Content is protected !!