সূরা আল ফাতিহা আয়াত ২ এর তাফসীর, তাফসীর আদ দুররে মানসূর-ইমাম সুয়ূতী (রহ)
Sura al fatiha 2, Tafsir ad durre mansur- Imam suyuti (rh)

সূরা আল-ফাতিহা ২ নং আয়াতের তাফসীর | আদ-দুররুল মানসূর
ইমাম সুয়ূতী রহ. রচিত তাফসীর আদ দুররে মানসূর থেকে অনূদিত
আমাদের অনুবাদ ও প্রকাশনা – দারুস সাআদাত
ভূমিকা
সূরা আল-ফাতিহার দ্বিতীয় আয়াত “আলহামদু লিল্লাহি রাব্বিল ‘আলামীন” আল্লাহ তাআলার সর্বজনীন রবুবিয়্যাত ও প্রশংসার মৌলিক শিক্ষা প্রদান করে। এই আয়াতের ব্যাখ্যায় ইমাম জালালুদ্দীন সুয়ূতী (রহ.) প্রণীত ‘তাফসীর আদ-দুররুল মানসূর’ একটি গুরুত্বপূর্ণ বর্ণনাভিত্তিক তাফসীর গ্রন্থ।
এই তাফসীরে সাহাবা, তাবেয়ী ও সালাফে সালেহীনের সূত্রে আয়াতটির অর্থ, তাৎপর্য ও ব্যাখ্যা সংকলিত হয়েছে। নিম্নে সূরা আল-ফাতিহা ২ নং আয়াতের তাফসীর আদ-দুররুল মানসূর অনুযায়ী সংক্ষিপ্ত ও প্রামাণ্য আলোচনা উপস্থাপন করা হলো।
الْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ (2)
২. সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য যিনি জগতসমূহের প্রতিপালক
হামদ বা প্রশংসা কৃতজ্ঞতার মূল
ইমাম আব্দুর রাযযাক আল মুসান্নাফে, হাকীম তিরমিযী নাওয়াদিরুল উসূলে, খাত্তাবী আল গারীবে, বায়হাকী আদাবে, দায়লামী মুসনাদ আল ফিরদাউসে এবং সালাবী- হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস (রা) থেকে আর তিনি রাসূলুল্লাহ (সা) থেকে বর্ণনা করেন-
{الْحَمْدُ} رَأْسُ الشُّكْرِ فَمَا شَكَرَ اللَّهَ عبد لَا يَحْمَدُهُ
হামদ বা প্রশংসা কৃতজ্ঞতার মূল। ঐ বান্দা (আল্লাহর) কৃতজ্ঞতা আদায় করে না, যে (তার) প্রশংসা করে না।
আলহামদুলিল্লাহ বলে শোকর আদায় করা
ইমাম তাবরানী আল আউসাতে যয়ীফ সনদে- হযরত নাওয়াস বিন সামআন (রা) থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, একবার রাসূলুল্লাহ (সা) এর উটনী চুরি হয়ে গেল। রাসূলুল্লাহ (সা) বললেন, আল্লাহ তাআলা যদি আমার উটনী ফিরিয়ে দেন তবে আমি আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করব। ঐ উটনী (ঘটনাক্রমে) আরবের এক গোত্রে চলে গেল। যার মধ্যে একজন মুসলিম মহিলাও ছিল। সে ভাবল যে, সে উটনীটিকে ভাগিয়ে নিয়ে যাবে। একদিন মহিলাটি দেখল যে, কওমের লোকেরা গাফেল রয়েছে। সে ঐ উটনীর উপর সওয়ার হয়ে তাকে ভাগিয়ে নিয়ে আসল। ভোরে সে মদীনায় এসে পৌঁছল।
সাহাবীগণ দেখে খুব খুশী হল এবং তাকে রাসূলুল্লাহ (সা) এর নিকট নিয়ে গেল। যখন রাসূলুল্লাহ (সা) তার উটনী দেখতে পেলেন তখন বললেন, আলহামদুলিল্লাহ। সাহাবায়ে কিরাম (রা) অপেক্ষা করতে লাগলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সা) শোকরানা স্বরুপ রোযা রাখেন, না নামায আদায় করেন তা দেখার জন্য। কিন্তু তিনি কোন কিছুই করলেন না। সাহাবীগণ জিজ্ঞাসা করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি বলেছিলেন যে, আল্লাহ তাআলা যদি আমার উটনী ফিরিয়ে দেন, তবে আমার প্রতিপালকের শুকরিয়া আদায় করব। রাসূলুল্লাহ (সা) বললেন, আমি কি আলহামদুলিল্লাহ বলিনি?
নেয়ামত বৃদ্ধির উপায়
ইমাম ইবনে জারীর, হাকীম তারীখে নিশাপুরে এবং দায়লামী যয়ীফ সনদে- হযরত হাকাম বিন উমায়র থেকে বর্ণনা করেন। রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেন-
إِذَا قُلْتَ {الْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينِ } فَقَدْ شَكَرْتَ اللَّهَ فَزَادَكَ
যখন তুমি বললে ‘আলহামদু লিল্লাহি রাব্বিল আলামীন’, তখন তুমি আল্লাহর কৃতজ্ঞতা আদায় করলে। অতএব আল্লাহ তাআলা তোমার প্রতি তার নিআমত আরো বৃদ্ধি করে দিবেন।
আলহামদুলিল্লাহ – কৃতজ্ঞতা প্রকাশক শব্দ
ইমাম ইবনে জারীর, ইবনুল মুনযির এবং ইবনে আবী হাতিম- হযরত ইবনে আব্বাস (রা) থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, আলহামদুলিল্লাহ কৃতজ্ঞতা প্রকাশক শব্দ। যখন বান্দা আলহামদুলিল্লাহ বলে, তখন আল্লাহ তাআলা বলেন- شكرني عَبدِي বান্দা আমার কৃতজ্ঞতা আদায় করেছে।
ইমাম ইবনে জারীর, ইবনে আবী হাতিম- হযরত ইবনে আব্বাস (রা) থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, আলহামদুলিল্লাহ কৃতজ্ঞতা প্রকাশক শব্দ এবং আল্লাহর নিআমতের পরিপূরক, তার নিআমতের স্বীকারোক্তী। তার হিদায়াত তার সূচনা ইত্যদির স্বীকারোক্তী।
হামদ ও আলহামদুলিল্লাহ
ইমাম ইবনে আবী হাতিম- হযরত ইবনে উমর (রা) থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, আমরা সুবহানাল্লাহ এবং লা ইলাহা ইল্লাহর অর্থ জেনে নিয়েছি। তবে হামদ কি? আলী (রা) বললেন, এটা ঐ কালিমা, যা আল্লাহ তাআলা নিজের জন্য পছন্দ করেছেন আর তিনি এটা বলা পছন্দ করেন।
ইমাম ইবনে জারীর, ইবনে আবী হাতিম- হযরত কাব থেকে বর্ণনা করেন যে, আলহামদুলিল্লাহ হল আল্লাহর প্রশংসা।
ইমাম ইবনে জারীর, ইবনে আবী হাতিম- যাহহাক (র) থেকে বর্ণনা করেন যে,
{الْحَمْدُ} رِدَاءُ الرَّحْمَنِ
হামদ বা প্রশংসা হল রহমানের চাদর।
ইমাম ইবনুল মুনযির, ইবনে আবী হাতিম- হযরত আবু আব্দুর রহমান আল জাবাঈ থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, নামায শোকর, রোযা শোকর, প্রত্যেক নেককাজ যা তুমি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য করে থাক তা শোকর। আর সর্বোত্তম শোকর হল আলহামদুলিল্লাহ।
ইমাম তিরমিযী আর তিনি এটিকে হাসান বলেছেন, নাসাঈ, ইবনে মাজাহ, ইবনে হিব্বান এবং বায়হাকী শুআবুল ইমানে- হযরত জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ (রা) থেকে বর্ণনা করেন। রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেন-
أَفْضَلُ الذِّكْرِ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَأَفْضَلُ الدُّعَاءِ {الحَمْدُ لِلَّهِ}
উত্তম যিকির হল লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ আর উত্তম দুআ হল আলহামদুলিল্লাহ।
আলহামদুলিল্লাহ নিআমত হতে উত্তম
ইমাম ইবনে মাজাহ এবং বায়হাকী হাসান সনদে- হযরত আনাস (রা) থেকে বর্ণনা করেন। রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেন, যে বান্দাকে আল্লাহ তাআলা কোন নিআমত দান করেছেন, আর সে আলহামদুলিল্লাহ বলেছে, তাহলে তাকে যা দেওয়া হয়েছে তা হতে উত্তম হল তার থেকে যা নেয়া হয়েছে (অর্থাৎ তার শোকর)।
ইমাম বায়হাকী শুআবুল ইমানে- হযরত জাবির (রা) থেকে বর্ণনা করেন, যে ব্যক্তি কোন নিয়ামত পেয়েছে (আর তার জন্য আলহামদুলিল্লাহ বলেছে) তবে তার নিয়ামত থেকে আলহামদু উত্তম।
ইমাম অব্দুর রাযযাক এবং বায়হাকী শুআবুল ইমানে- হযরত হাসান থেকে বর্ণনা করেন। রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেন- যখন আল্লাহ তাআলা কোন বান্দাকে কোন নিআমত প্রদান করেন আর সে এর উপর তার প্রশংসা করে, তাহলে সেই প্রশংসা ঐ নিআমত হতে উত্তম হয়ে গেছে- চাই তা যে কোন নিআমতই হোক না কেন।
ইমাম হাকীম তিরমিযী নাওয়াদিরুল উসূলে- হযরত আনাস (রা) থেকে বর্ণনা করেন। রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেন- যদি দুনিয়ার সমস্ত নিআমত, অধিক থেকে অধিকতর নিআমত আমার কোন উম্মতের এক হাতে হয় আর সে বলে আলহামদুলিল্লাহ, তবে তার এই হামদ সেই সব নিআমত হতে উত্তম।
আলহামদুলিল্লাহর ফযীলত
ইমাম আহমদ, মুসলিম, নাসাঈ- হযরত আবু মূসা আশআরী (রা) থেকে বর্ণনা করেন। রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেন, পবিত্রতা ইমানের অর্ধেক। আলহামদুলিল্লাহ মীযানকে পূর্ণ করে দেয়। সুবহানাল্লাহ যমীন আসমানকে পূর্ণ করে দেয়। নামায হল নূর, সাদকা হল প্রমাণ, ধৈর্য হল আলো, কুরআন তোমার পক্ষে অথবা বিপক্ষে দলীল। প্রত্যেক ব্যক্তি ভোরবেলা উঠে তার আত্মাকে বিক্রি করে। হয়তো সে তাকে মুক্ত করে অথবা ধ্বংস করে।
ইমাম সাঈদ ইবনে মানসূর, আহমদ, তিরমিযী এবং ইবনে মারদুবিয়াহ- বনী সালিমের এক ব্যক্তি হতে বর্ণনা করেন। রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেন. সুবহানাল্লাহ মীযানের অর্ধেক। আলহামদুল্লিাহ মীযানকে পূর্ণ করে দেয়। আল্লাহু আকবার আসমান ও যমীনকে পূর্ণ করে দেয়। পবিত্রতা মীযানের অর্ধেক আর রোযা সবরের অর্ধেক।
ইমাম তিরমিযী- হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা) থেকে বর্ণনা করেন। রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেন, সুবহানাল্লাহ মীযানের অর্ধেক। আলহামদুলিল্লাহ মীযানকে পূর্ণ করে দেয়। আর লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ এবং আল্লাহর মাঝে কোন পর্দা নেই, যে পর্যন্ত তা আল্লাহর নিকট গিয়ে পৌছে।
advertisement আরও দেখুন
আল্লাহ তার প্রশংসা পছন্দ করেন
ইমাম আহমদ, বুখারী আল আদাবুল মুফরাদে, নাসাঈ, হাকীম আর তিনি এটাকে সহিহ বলেছেন, আবু নুআইম হিলইয়াতে, বায়হাকী শুআবুল ইমানে- হযরত আল আসওয়াদ বিন সারী’ আত তামিমী (রা) থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, আমি আরয করলাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি কি আপনাকে ঐ প্রশংসাকীর্তন শোনাব না যার দ্বারা আমি আমার প্রতিপালকের প্রশংসা করেছি? তিনি (সা) বললেন, নিশ্চিত তোমার প্রতিপালক প্রশংসা কীর্তন পছন্দ করেন।
ইমাম ইবনে জারীর- হযরত আসওয়াদ বিন সারি’ থেকে বর্ণনা করেন। রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেন, কোন কিছুই আল্লাহর নিকট তার নিজের প্রশংসার চেয়ে বেশী প্রিয় নয়। তাই তো তিনি নিজের প্রশংসায় বলেছেন ‘আলহামদুলিল্লাহ’।
ইমাম বায়হাকী- হযরত আনাস (রা) থেকে বর্ণনা করেন। রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেন,
التَّأَنِّي مِنَ اللهِ، وَالْعَجَلَةُ مِنَ الشَّيْطَانِ، وَمَا شَيْءٌ أَكْثَرُ مَعَاذِيرَ مِنَ اللهِ وَمَا مِنْ شَيْءٍ أَحَبُّ إِلَى اللهِ مِنَ الْحَمْدِ
ধীরে সুস্থে কাজ করা আল্লাহর পক্ষ থেকে, আর তাড়াহুড়া করা শয়তানের পক্ষ থেকে। কোন কিছুই আল্লাহর দরবারে (বান্দার) ওযর কবুল করার চেয়ে বেশী নয়। আর আল্লাহর দরবারে তার নিজের প্রশংসার চেয়েও কোন কিছু বেশী প্রিয় নয়।
নিআমতের মূল্য
ইমাম ইবনে শাহীন তার সুন্নায় এবং দায়লামী আবান সূত্রে- হযরত আনাস (রা) থেকে বর্ণনা করেন। রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেন, তাওহীদ বা একত্ববাদ হল জান্নাতের মূল্য এবং প্রত্যেক নিয়ামতের মূল্য হল আলহামদুলিল্লাহ। আর লোকেরা তাদের আমল অনুযায়ী জান্নাতকে বন্টন করবে।
ইমাম খতীব তালী আত-তালখীসে সাবিত সূত্রে- হযরত আনাস (রা) থেকে মারফু রিওয়ায়াত বর্ণনা করেন যে,
التَّوْحِيد ثمن الْجنَّة وَالْحَمْد وَفَاء شكر كل نعْمَة
তাওহীদ হল জান্নাতের মূল্য আর শোকর হল প্রত্যেক নিআমাতের কৃতজ্ঞতা প্রকাশক শব্দ।
ইমাম আবু দাউদ, নাসাঈ, ইবনে মাজাহ, ইবনে হিব্বান এবং বায়হাকী হযরত আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণনা করেন। রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেন-
كُلُّ أَمْرٍ ذِي بَالٍ، لَا يُبْدَأُ فِيهِ بِحَمْدِ الله فَهُوَ أَقْطَعُ
প্রত্যেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ যা আল্লাহর প্রশংসা ব্যতীত শুরু করা হয় তা অপূর্ণ থেকে যায়।
হাঁচির জবাব
ইমাম বুখারী আদাবুল মুফরাদে- হযরত ইবনে আব্বাস (রা) থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, যখন তোমাদের কারো হাঁচি আসে আর সে বলে আলহামদুলিল্লাহ, তখন ফেরেশতারা বলে রাব্বিল আলামীন। যখন বান্দা বলে রাব্বিল আলামীন, তখন ফেরেশতারা বলে ইয়ারহামুকাল্লাহ।
ইমাম বুখারী আদাবুল মুফরাদে, ইবনুস সুন্নী এবং আবু নুআইম তিব্বুন নবীতে- হযরত আলী (রা ) থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন- যে ব্যক্তি প্রত্যেক হাঁচির সময় তা শুনে বলে ‘আল হামদুলিল্লাহ রাব্বিল আলামীন আলা কুল্লি হাল’ তবে কখনও তার দাঁত ও কানের অসুখ হবে না।
ইমাম হাকীম তিরিমিযী- হযরত ওয়াসিলা ইবনুল আসকা (রা) থেকে বর্ণনা করেন। রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেন- যেই হাঁচিদাতা হাঁচি দিয়ে দ্রুত আলহামদুলিল্লাহ বলবে তার (স্থায়ী) কোন পেটের অসুখ হবে না।
ইমাম হাকীম তিরমিযী- মূসা বিন তালহা থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, আল্লাহ তাআলা সুলায়মান (আ) এর নিকট ওহী প্রেরণ করেন যে, যদি হাঁচিদাতা সাত সমুদ্রের পিছনেও হাঁচি দেয় (আর তুমি তা শুনতে পাও), তাহলে আমাকে স্মরণ কর।
নবী (সা) যেভাবে আল্লাহর শোকর আদায় করেন
ইমাম বায়হাকী- হযরত আলী (রা) থেকে বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ (সা) তার খান্দানের এক ব্যক্তির মধ্য হতে এক বাহিনী প্রেরণ করেন এবং এই দুআ করেন, হে আল্লাহ! তুমি যদি তাদেরকে নিরাপদে ফিরিয়ে দাও তবে আমি তোমার এমন প্রশংসা করব, যেমন প্রশংসা তোমার যোগ্য। কিছু দিন পর সে সহিহ-সালামতে ফিরে আসে। তখন রাসূলুল্লাহ (সা) বললেন,
الْحَمْدُ لِلَّهِ عَلَى سَابِغِ نَعَمِ اللهِ
আলহামদুলিল্লাহ- সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য তার পরিপূর্ণ অনুগ্রহের উপর।
আমি আরয করলাম ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি কি বলেন নি যে, যদি আল্লাহ তাকে সহিহ সালামতে ফিরিয়ে দেন তবে আমি শুকরিয়া আদায় করব, যেমন শোকর করার হক আছে। তিনি (সা) বললেন, আমি কি এমন করিনি?
ইমাম ইবনে আবিদ দুনইয়া কিতাবুশ শোকর-এ, ইবনে মারদুবিয়াহ, বায়হাকী- সাইদ ইবনে ইসহাক ইবনে কাব বিন উজরাহ, তিনি তার পিতা হতে আর তিনি তার দাদা হতে বর্ণনা করেন। রাসূলুল্লাহ (সা) আনসারদের একটি বাহিনী প্রেরণ করেন এবং বলেন, যদি আল্লাহ তাআলা তাদেরকে সহিহ-সালামতে ফিরিয়ে আনেন এবং তাদেরকে গনীমতের মাল দান করেন তবে আমার উপর আল্লাহর শোকর ওয়াজিব। কিছু দিন পর তারা গনীমতের মাল নিয়ে সহিহ-সালামতে ফিরে আসেন। একজন সাহাবী বললেন, আমরা আপনাকে এটা বলতে শুনেছি যে, যদি তারা সহিহ-সালামতে ফিরে আসে তবে আমার উপর শোকর ওয়াজিব। তিনি (সা) বললেন, আমি শোকরিয়া আদায় করেছি। আমি বলেছিলাম-
اللهُمَّ شُكْرًا وَلَكَ الْفَضْل الْمَنُّ فَضْلًا
হে আল্লাহ! সমস্ত কৃতজ্ঞতা তোমার জন্য এবং অনুগহসহ সকল দান তোমার।
ইমাম আবু নুআইম হিলইয়াতে এবং বায়হাকী- হযরত জাফর ইবনে মুহাম্মদ (রহ) থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, আমার পিতার খচ্চর হারিয়ে গেলে তিনি বলেন, যদি আমি আমার খচ্চর ফিরে পাই তবে আমি আল্লাহর এমন প্রশংসা করব যা তিনি পছন্দ করেন। কিছুদিন পর তিনি তার খচ্চর জিন ও লাগামসহ ফেরত পেলেন। তিনি তার উপর উঠে যখন সোজা বসে গেলেন তখন আসমানের দিকে তার মাথা উঠিয়ে বললেন আলহামদুলিল্লাহ। এরচেয়ে বেশি কিছু বললেন না। তাকে এ ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন, আমি কি কোন কিছু বাদ দিয়েছি বা কম করেছি? আমি আল্লাহর পরিপূর্ণ প্রশংসা করেছি।
আলহামদুলিল্লাহ যিকির ও শোকর
ইমাম বায়হাকী- হযরত ইবরাহীম (রহ) থেকে বর্ণনা করে যে, তিনি বলেন-আলহামদুলিল্লাহ অনেক কালিমা থেকেও বেশী সওয়াব বহন করে।
ইমাম আবুশ শায়খ এবং বায়হাকী- মুহাম্মদ বিন হারব থেকে বর্ণনা করেন। হযরত সুফিয়ান সাওরী (রহ) বলেন- হামদ একই সাথে যিকির ও শোকর। এটা ব্যতীত আর কোনকিছু (একসাথে) যিকির ও শোকর নয়।
ইমাম ইবনে আবিদ দুনইয়া এবং আবু নুআইম হিলইয়াতে- হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস (রা) থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, যখন বান্দা সুবহানাল্লাহ বলে তা হল মাখলুকের সালাত। আর যখন আলহামদুলিল্লাহ বলে তা কালিমায়ে শোকর। যতক্ষণ পর্যন্ত বান্দা এই কালিমা না বলে, সে কখনো শোকর আদায়কারী হয় না। যখন লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলে, তা হল কালিমায়ে ইখলাস। যতক্ষণ পর্যন্ত বান্দা এটা না বলে ততক্ষণ আল্লাহ তার কোন আমল কবুল করেন না। যখন বান্দা বলে আল্লাহু আকবার, এটা আসমান ও যমীনকে পূর্ণ করে দেয়। যখন বলে লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ, তখন আল্লাহ বলেন, বান্দা আমার নিকট আত্মসমর্পণ করেছে এবং আমার অনুগত হয়েছে।
2 – قَوْله تَعَالَى: (الْحَمد لله) رَبِّ الْعَالَمِينَ
২.আল্লাহ তাআলার বাণী- (সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য) যিনি জগৎসমূহের প্রতিপালক
জগৎ দ্বারা কি উদ্দেশ্য?
ইমাম ফিরইয়াবী, আব্দ ইবনে হুমায়দ, ইবনে জারীর, ইবনুল মুনযির এবং ইবনে আবী হাতিম- হযরত ইবনে আব্বাস (রা) থেকে ‘রাব্বুল আলামীন-জগৎসমূহের প্রতিপালক’ প্রসঙ্গে বর্ণনা করেন যে, আলামীন বা জগৎ দ্বারা উদ্দেশ্য- الْجِنّ والإِنس জিন ও ইনসান।
ইমাম আব্দ ইনে হুমায়দ এবং ইবনে জারীর- হযরত মুজাহিদ (রহ) থেকেও এর অর্থ জিন ও ইনসান নকল করেছেন।
ইমাম ইবনে জারীর- হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়র (রহ) থেকেও অনুরুপ অর্থ বর্ণনা করেছেন।
ইমাম ইবনে জারীর এবং ইবনে আবী হাতিম- হযরত ইবনে আব্বাস (রা) থেকে ‘রাব্বুল আলামীন’ প্রসঙ্গে বর্ণনা করেন যে- তিনি সমস্ত সৃষ্টিকুলের মাবুদ। সমস্ত আসমান এবং এর মধ্যে যত সৃষ্টি আছে। সমস্ত যমীন আর এর মধ্যে যত সৃষ্টি আছে। চাই তা (কারো) জানা থাক বা না থাক।
পঙ্গপালের ঘটনা
ইমাম হাকীম তিরমিযী নাওয়াদিরুল উসূলে, আবু ইয়ালা মুসনাদে, ইবনে আদী আল কামিলে, আবুশ শায়খ আল আযমায়, বায়হাকী শুআবুল ইমানে, খতীব তার তারীখে যয়ীফ সনদে- হযরত জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ (রা) থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, হযরত উমর (রা) এর খিলাফতের সময় পঙ্গপাল কমে গেল। তিনি এ ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করলে কেউ কিছু বলতে পারল না। তিনি তখন পেরেশান হয়ে গেলেন। তিনি একজন ঘোড়সওয়ারকে কাদা (নামক স্থান) এর দিকে, একজনকে শামের দিকে, আরেকজনকে ইরাকের দিকে পাঠালেন যে, কেউ কোন পঙ্গপাল দেখেছে কি না।
ইয়েমেনের দিকে গমনকারী ঘোড়সওয়ার এক মুষ্ঠি পঙ্গপাল নিয়ে আসল এবং উমর (রা) এর সামনে পেশ করল। যখন তিনি পঙ্গপাল দেখলেন তখন উচ্চস্বরে তাকবীর পাঠ করলেন এবং বললেন, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন- আল্লাহ তাআলা এক হাজার প্রজাতি সৃষ্টি করেছেন, ছয়শত সমুদ্রে আর চারশত ভূমিতে। আর এই উম্মতের মধ্যে সর্বপ্রথম যে প্রাণীটি বিলুপ্ত হবে তা হল পঙ্গপাল। যখন একটা বিলুপ্ত হবে তখন ধারাবাহিকতা চলতে থাকবে। যেভাবে সুতায় গাঁথা কোন কিছু ছিড়ে গেলে হয় (একের পর এক পড়তে থাকে)।
রাব্বুল আলামীনের তাফসীর
ইমাম ইবনে জারীর- হযরত কাতাদাহ (রহ) থেকে ‘রাব্বুল আলামীন’ এর অর্থ বর্ণনা করেন যে-
كُلُّ صِنْفٍ عَالَمٌ
সকল ধরনের জগতের প্রতিপালক।
ইমাম ইবনে আবী হাতিম ও আবুশ শায়খ- তাতাববাআল জাহরী থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, জগৎ হল এক হাজার প্রজাতি। ছয়শত সমুদ্রে আর চারশত ভূমিতে।
ইমাম ইবনে আবী হাতিম এবং ইবনে জারীর- হযরত আবুল আলিয়া (রহ) থেকে বর্ণনা করেন যে, মানুষ এক জগৎ, জিন এক জগৎ। তাদের ব্যতীত ফেরেশতাদের আঠার হাজার জগৎ রয়েছে। আর যমীনের চারটি প্রান্ত রয়েছে। প্রত্যেক প্রান্তে তিন হাজার জগৎ রয়েছে। আর তন্মধ্যে পাঁচশত জগৎ অল্লাহ তাআলা তার ইবাদতের জন্য সৃষ্টি করেছেন।
ইমাম সালাবী- শহর বিন হাওশাব সূত্রে- হযরত উবাই ইবনে কাব থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, জগৎ দ্বারা উদ্দেশ্য ফেরেশতা। আর আঠার হাজার ফেরেশতা রয়েছে। তার মধ্যে চারশত অথবা পাঁচশত ফেরেশতা পূর্বে রয়েছে। অনুরুপ পশ্চিমে রয়েছে। অনুরুপ দুনিয়ার তৃতীয় প্রান্তে রয়েছে। অনুরুপ দুনিয়ার চতুর্থ প্রান্তে রয়েছে। আর প্রত্যেক ফেরেশতার সাথে তার সাহায্যকারী ফেরেশতা রয়েছে, যার সংখ্যা আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না।
ইমাম আবুশ শায়খ এবং আবু নুআইম হিলইয়াতে- হযরত ওয়াহাব (রহ) থেকে বর্ণনা করেন যে, মহান আল্লাহর আঠার হাজার জগৎ রয়েছে। এই দুনিয়া তার মধ্যে একটি।
🔸🔸🔸
আরও পড়ুন সূরা আল ফাতিহার ভূমিকা, তাফসীর আদ দুররে মানসূর – ইমাম সুয়ূতী (রহ)

