আকল ও তার মর্যাদা

ইমাম ইবনে আবিদ দুনইয়া (রহ)

الْعَاقِلُ مَصِيرُهُ إِلَى الْجَنَّةِ

আকলমন্দের ঠিকানা জান্নাতে   

রিওয়ায়াতঃ১- হযরত ইবনে আব্বাস (রা) বর্ণনা করেন। রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেন,

أَنَا الشَّاهِدُ عَلَى اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ أَنْ لَا يَعْثُرَ عَاقِلٌ إِلَّا رَفَعَهُ اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ، ثُمَّ لَا يَعْثُرَ إِلَّا رَفَعَهُ حَتَّى يَجْعَلَ مَصِيرَهُ إِلَى الْجَنَّةِ

আমি আল্লাহ ‎তাআলার নিকট সাক্ষী যে, আকলমন্দের কোন দুর্দশা পৌঁছে না, তবে এটা যে আল্লাহ তাআলা তাকে ‎আরো উন্নতী দান করেন। অতঃপর সে কোন দুর্দশার শিকার হয় না, তবে এটা যে, আল্লাহ তাআলা ‎তাকে আরো উচ্চ করেন এমনকি তার ঠিকানা জান্নাত করে দেন।

ফায়দাঃ অর্থাৎ বোধসম্পন্ন ব্যক্তিগণ বিপদাপদ ও দুঃখ-কষ্টে পতিত হলেও এর দ্বারা তাদের আরো বোধশক্তি ও যোগ্যতা অর্জন হয়।

 

الْعَاقِلُ حَازِمٌ فِي أُمُورِهِ

আকলমন্দ লোকেরা সব কাজ বুঝে-শুনে করে

রিওয়ায়াতঃ২- হযরত যিয়াদ বিন হাজ্জাজ বলেন, আমি আমার নফসের এমন কোন মুআমালা বা কার্যক্রমে প্রশংসা করিনি, যার ‎মধ্যে আমি সামান্য তদবির বা উপায়-উপকরণ দ্বারা কাজ নিয়েছি। আর না আমি আমার নফসকে এমমন কোন মুআমালার জন্য ‎তিরষ্কার করেছি, যা আমি দৃঢ়তা ও ইয়াকীনের সাথে করেছি। আর আমি আমার কোন কাজ যা আমি করতে ‎চেয়েছি, তা করার পূর্বে কখনো অন্যের সামনে আলোচনা করিনি।

ফায়দাঃ এখানে তার অনেক বিচক্ষণতার কথা বলা হয়েছে যে, তিনি কখনও কোন কাজ করে আত্মগর্বিত হননি, চাই সে কাজ সামান্য হোক অথবা বড়। আর তিনি নিজের কাজ বাস্তবায়নের পূর্বে অপর কারো সামনে আলোচনা করেননি। কারণ অনেক সময় কাজের কথা প্রকাশ পেলে তাতে অনেক বাঁধা-বিঘ্ন এসে যায়। কখনো কখনো হিংসুকদের কূদৃষ্টি লেগে যায়। যেমন হাদীসে আছে, হিংসা তাকদীরকেও পরিবর্বতন করে দেয়।

 

فَضْلُ مُجَالَسَةِ وُجُوهِ النَّاسِ

মর্যাদাসম্পন্ন লোকদের সাথে বসার ফযীলত

রিওয়ায়াতঃ০৩- হযরত মুআবিয়াহ বিন কুররাহ বলেন,

جَالِسُوا وُجُوهَ النَّاسِ فَإِنَّهُمْ أَحْلَمُ وَأَعْقَلُ مِنْ غَيْرِهِمْ

বড় আর বুঝমানদের সাথে বসো। এজন্য যে তারা ‎অন্যদের থেকে বেশী সহনশীল ও আকলমন্দ।

ফায়দাঃ অর্থাৎ এদের সংস্পর্শে গেলে সহনশীলতা ও বোধশক্তি বৃদ্ধি পাবে। কারণ তারা জীবন থেকে অনেক অভিজ্ঞতা ও বোধশক্তি অর্জন করেছেন। আর হাদীস থেকে সংস্পর্শের প্রভাবও জানা যায়। যেমন নেক লোকের সাহচর্য নেক বনিয়ে দেয় আর বদ লোকের সাহচর্য বদ বানিয়ে দেয়।

 

مُرُوءَةِ الْمُؤْمِنِ فِي عَقْلِهِ

মুমিনের মনুষত্ব তার আকলে

রিওয়ায়াতঃ০৪- আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্রাহ (সা) ইরশাদ করেন,

كَرَمُ الْمَرْءِ دِينُهُ، وَمُرُوءَتُهُ عَقْلُهُ، وَحَسَبُهُ خُلُقُهُ

মানুষের সম্মান মর্যাদা হল তার দীনে। ‎তার মনুষত্ব হল তার আকল ও বোধশক্তিতে। আর তার বংশ মর্যাদা হল তার চরিত্রে।

ফায়দাঃ অর্থাৎ ব্যক্তির দীন অনুযায়ী (আল্লাহর নিকট) তার মর্যাদা নির্ধারিত হয়। দীন যদি বেশী হয় মর্যাদাও বেশী হবে আর দীন কম হলে মর্যাদাও কম হবে। আর মানুষের আকল ও বোধশক্তি অনুযায়ী তার মনুষত্ব নির্ধারিত হয়।

আকল ও বোধশক্তি বশেী হলে তার মনুষত্বও বেশী হবে এবং অন্যের হক ও অধিকারের বিষয়ে সেই অনুযায়ী সচতেন হবে। আর বোধশক্তি কম হলে অধিকার ও দায়িত্বেও অবহেলা করবে। যদিও সে অনেক জ্ঞানী ও শিক্ষিত হয় না কেন।

আর মানুষের চরিত্রের দ্বারাই তার বংশ মর্যাদার প্রকৃত প্রকাশ ঘটে। খানদানী লোক কখনো নিম্ন চরিত্রের হয় না। তার বংশ মর্যাদা তাকে নিম্ন স্বভাব থেকে বাঁধা দেয় আর উচ্চ স্বভাব অবলম্বনের প্রতি অনুপ্রাণিত করে।

রিওয়ায়াতঃ০৫- হযরত মাসরুক বলেন, আমি উমর (রা) এর সাথে ছিলাম। তিনি বংশ মর্যাদার আলোচনা করলেন এবং ‎বললেন-

حَسَبُ الْمَرْءِ دِينُهُ، وَأَصْلُهُ عَقْلُهُ، وَمُرُوءَتُهُ خُلُقُهُ

মানুষের বংশ মর্যাদা হল তার দীন। তার মূল হল তার আকল। আর তার মনুষত্ব হল তার চরিত্র।

ফায়দাঃ পুর্বের হাদীসের সাথে এই রিওয়ায়াতের কিছু শাব্দিক অদল বদল আছে। তবে মূলভাব একই। দীন মানুষের সম্মান ও বংশ মর্যাদা বৃদ্ধি করে। আকল হল মানুষের মূল। আকলবীহীন মানুষ মূলত অমানুষ। আর একজন মানুষের চরিত্রের দ্বারাই তার মনুষত্বের প্রকাশ ঘটে।

রিওয়ায়াতঃ৬- আবু জাফর আল কুরাশি কতক কবিতা আবৃত্তি করেন

نَسَبُ ابْنِ آدَمَ فِعْلُهُ … فَانْظُرْ لِنَفْسِكَ فِي النَّسَبْ

حَسَبَ ابْنُ آدَمَ مَالُهُ … إِنْ طَابَ طَابَ لَهُ الْحَسَبْ

زَيْنُ ابْنِ آدَمَ عَقْلُهُ … وَالْعَقْلُ زِينَتُهُ الْأَدَبْ

মানুষরে বংশ মর্যাদা হল তার কর্ম, এজন্য তুমি এটা দেখ যে, তুমি বংশ মর্যাদার সাথে কি কাজ কর। আর ‎আদম সন্তানের বংশ মর্যাদা হল মাল-সম্পদ। যদি অঢেল ধন-সম্পদ থাকে তখন বংশ মর্যাদাও বেড়ে যায়। আদম সন্তানের সৌন্দর্য হল তার আকল আর আকল হল আদবের সৌন্দর্য।

 

أَصْحَابُ الْأَبْصَارِ هُمْ أَصْحَابُ الْعَقْلِ

অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন ব্যক্তিরাই আকলমন্দ ব্যক্তি

রিওয়ায়াতঃ৭- মুজাহিদ (রহ) আল্লাহ তাআলার বাণী

أُولِي الْأَيْدِي وَالْأَبْصَارِ

তারা ছিল শক্তিশালী ও সুক্ষ্মদর্শী।–সূরা সাদ ৪৫

প্রসঙ্গে বলেন যে. الْأَيْدِي এর দ্বারা শক্তি আর الْأَبْصَارُ এর দ্বারা আকল উদ্দেশ্য। ‎

ফায়দাঃ তারা অর্থাৎ নবীরা ছিল শক্তিশালী এবং সুক্ষ্মদর্শী ও অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন। শক্তি বলতে দৈহিক শক্তি এবং মনের শক্তি তথা মনের দৃঢ়তা- উভয দিক থেকেই ছিলেন শক্তিশালী। আর অন্তর্দৃষ্টি ও সুক্ষ্মদর্শীতা সব নবীরই ছিল ভূষণ।

 

هَلْ إِسْلَامُ الْمَرْءِ يَتَوَقَّفُ عَلَى عَقْلِهِ؟

ইসলাম কি আকলের উপর মাওকুফ?

রিওয়ায়াতঃ৮- হযরত ইবনে উমর (রা) থেকে বর্ণিত। রাসূলূল্লাহ (সা) ইরশাদ করেন,

لَا يُعْجِبنَّكُمْ إِسْلَامُ امْرِئٍ حَتَّى تَعْرِفُوا مَعْقُودَ عَقْلِهِ

তোমাদের কোন ব্যক্তির ‎ইসলাম ঐ পর্যন্ত বিস্ময়ে পতিত করবে না, যে পর্যন্ত না তুমি তার আকলের পরিমাণ আন্দাজ করে নাও।

 

كَيْفَ عَقْلُهُ؟

তার আকল বা বোধশক্তি কেমন?

রিওয়ায়াতঃ৯- হযরত আবু দারদা (রা) থেকে বর্ণিত। রাসূলু্লাহ (সা) এর যখন তার কোন সাহাবীর ইবাদত-‎বন্দেগীর অবগতি লাভ হত, তখন তিনি জিজ্ঞাসা করতেন তার আকল বা বোধশক্তি কেমন? যদি বলা হত যে, সে ‎আকলমন্দ। তখন তিনি বলতেন যে, সে এটার যোগ্য যে, সে তার উদ্দিষ্ট স্থানে (জান্নাতে বা আল্লাহর নৈকট্যে) পৌঁছে যাবে। ‎

النَّاسُ يَرْتَفِعُونَ عَلَى قَدْرِ عُقُولِهِمْ

মানুষ তার আকলের পরিমাপ অনুযায়ী মর্যাদা লাভ করে

রিওয়ায়াতঃ১০- হযরত আনাস (রা) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেন-

إِنَّمَا يَرْتَفِعُ النَّاسُ فِي الدَّرَجَاتِ وَيَنَالُونَ الزُّلْفَى مِنْ رَبِّهِمْ عَزَّ وَجَلَّ عَلَى قَدْرِ عُقُولِهِمْ

লোকেরা তাদের আকল-বুদ্ধি অনুযায়ী একে অপর থেকে উচ্চ হয় এবং আল্লাহর নৈকট্যের যোগ্য হয়। ‎

চলবে

 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

Back to top button
error: Content is protected !!