আল উকূবাত – শাস্তি ও বিপর্যয়

ইমাম ইবনে আবিদ দুনইয়া (রহ)

রিওয়ায়িাত ১০২ থেকে

 

قِصَّةُ آدَمَ عَلَيْهِ السَّلَامُ

আদম (আ) এর ঘটনা

 

আদম (আ) এর তওবা

রিওয়ায়াতঃ১০২- উবাই ইবনে কাব (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেন- নিশ্চয়ই আল্লাহ ‎তাআলা আদম (আ)-কে দীর্ঘকায় ব্যক্তিরুপে সৃষ্টি করেছেন। দেখতে যেন ঠিক খেজুর গাছের ‎মত লম্বা। তার মাথার চুল অনেক বেশী ছিল। যখন তিনি (নিষিদ্ধ) গাছের ফল খেলেন তখন ‎তার কাপড় খুলে গেল। সর্বপ্রথম তার সতর প্রকাশিত হলো। যখন তিনি তার সতরের দিকে ‎দৃষ্টিপাত করলেন তখন তিনি দ্রুত দৌড়াতে লাগলেন। যার কারণে তার চুল জান্নাতের বৃক্ষের ‎শাখার সাথে আটকে গেল। দয়াময় (আল্লাহ) আওয়ায দিলেন. হে আদম! তুমি কি আমার থেকে ‎পলায়ন করছ? যখন তিনি রহমান এর কথা শুনলেন তখন আরয করলেন, হে পরওয়ারদেগার! ‎না। বরং আমার আপনার থেকে লজ্জাবোধ হচ্ছে। আমি যদি তওবা করি এবং আপনার দিকে ‎মনোনিবেশ করি তবে কি আমি জান্নাতের দিকে ফিরে যেতে পারব? আল্লাহ তাআলা বললেন, ‎হ্যাঁ, হে আদম!‎

এটাই আল্লাহ তাআলার নিম্নের বাণীর মর্মার্থ

فَتَلَقَّى آدَمُ مِنْ رَبِّهِ كَلِمَاتٍ فَتَابَ عَلَيْهِ إِنَّهُ هُوَ التَّوَّابُ الرَّحِيمُ

অনন্তর আদম স্বীয় প্রতিপালক হতে কতিপয় বাক্য শিক্ষা করলেন। আল্লাহ তখন তার ‎তওবা কবুল করে তাকে ক্ষমা করলেন। নিশ্চয়ই তিনি ক্ষমাশীল, করুণাময়।– (সূরা আল ‎বাকারাহ ১৩৭)

আল্লাহর প্রতিবেশীত্ব থেকে বহিষ্কার

রিওয়ায়াতঃ১০৩- আবু ইউসুফ এর ভাই আবু তালিব বলেন, আল্লাহ তাআলা আদম (আ)-কে আওয়ায ‎দিলেন, হে আদম! আমি তোমার কেমন প্রতিবেশী ছিলাম? আদম (আ) বললেন, হে আমার ‎মালিক! আপনি আমার অতি উত্তম প্রতিবেশী ছিলেন। আল্লাহ তাআলা বললেন, আমার ঘর থেকে ‎বেরিয়ে যাও। আল্লাহ তাঅলা তার তাজ ও অলঙ্কার খুলে নিলেন।

রিওয়ায়াতঃ১০৪- মুজাহিদ (রহ) বলেন, আল্লাহ তাআলা দুই ফেরেশতাকে নির্দেশ দিলেন যে, আদম ও ‎হাওয়া (আ)-কে আমার প্রতিবেশীত্ব থেকে বের করে দাও। কেননা তারা আমার আদেশের ‎অবাধ্যতা করেছে। আদম (আ) ক্রন্দনরত অবস্থায় হাওয়া (আ) এর দিকে মনোনিবেশে করে ‎বললেন, এটা (আমাদের) ঐ পাপের প্রথম প্রতিফল। জিবরাঈল (আ) তাদের মাথা থেকে মুকুট ‎খুলে নিলেন এবং মিকাঈল (আ) তাদের ললাটে সজ্জিত তাজ খুলে নিলেন।

 

আদম (আ) এর লজ্জা ও কান্না

রিওয়ায়াতঃ১০৫- মুজাহিদ (রহ) বলেন, যখন আদম (আ) এর সাথে বৃক্ষের শাখা আটকে গেল তখন ‎আদম (আ) অনুমান করলেন যে, দ্রুত তাকে শাস্তি দেয়া হবে। তখন তিনি তার মাথা ঝুঁকিয়ে ‎দিলেন এবং ‘আমাকে ক্ষমা করুন’ ‘আমাকে ক্ষমা করুন’ বলতে লাগলেন। আল্লাহ তাআলা ‎বললেন, হে আদম! তুমি কি আমার থেকে পলায়ন করছ? তিনি আরয করলেন, না, বরং হে ‎আমার মালিক! আমি আপনার থেকে লজ্জা করছি।

রিওয়ায়াতঃ১০৬- ওয়াহাব ইবনে মুনাব্বিহ বলেন, যখন আদম (আ)-কে যমীনে নামিয়ে দেযা হল তখন ‎তার কান্না বন্ধ হচ্ছিল না। সপ্তম দিনেও আলল্লাহ তাকে দুঃখ ভরাক্রান্ত ও নতশীরে দেখে ‎ওহী প্রেরণ করলেন, হে আদম! তুমি এমন পেরেশান ও দুঃখ ক্লেশে কেন আছ? আদম (আ) ‎বললেন, আমার মুসীবত অনেক বড় হয়ে গেছে। আমার ত্রুটিসমূহ আমাকে ঘিরে ধরেছে। ‎আমাকে আমার রবের সম্মানিত স্থান হতে বের করে দেয়া হয়েছে। ইযযত ও সম্মানের ঘরের ‎পর অপমানের ঘরে এবং সৌভাগ্যের ঘরে পর পর দুর্ভাগ্যের ঘরে, শান্তি ও ‎আরামের ঘরের পর কষ্ট ক্লেশের ঘরে, নিরাপত্তার ঘরের পর মুসিবতের ঘরে, স্থিরতার ঘরের পর ‎অস্থিরতার ঘরে, স্থায়ী বাসস্থানের পর অস্থায়ী বাসস্থানে এসে পড়েছি। অতএব কেন আমি ‎আমার ত্রুটির হন্য অশ্রুপাত করব না? আমার জন্য এটা কিভাবে সম্ভব যে, এমন গুনাহ ও ত্রুটির ‎পর আমি দুঃসাহস প্রদর্শন করব? ‎

আল্লাহ তাঅলা তার প্রতি ওহী প্রেরণ করলেন যে, হে আদম! আমি কি তোমাকে ‎আমার জন্য সৃষ্টি করি নি? তোমাকে আমার ঘরে স্থান দেইনি? আমি কি তোমাকে আমার মাখলুকের ‎মধ্যে শেষ্ঠত্ব দেইনি? আমি কি তোমাকে আমার মাহাত্ম দ্বারা বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত করিনি? আমি কি ‎আমার মহব্বত তোমার প্রতি ঢেলে দেইনি এবং তোমাকে আমার গযব দ্বারা ভয় প্রদর্শন করিনি? ‎আমি কি তোমাকে নিজের হাত দ্বারা তৈরি করিনি, আমার রূহ তোমার দিকে ফুঁকে দেইনি এবং ‎আমার ফেরেশতা দ্বারা তোমাকে সিজদা করাইনি?‎

তুমি কি আমার অনুগ্রহ ও দয়ার মধ্যে ছিলে না? আমার চূড়ান্ত রহমতের মধ্যে ছিলে না? ‎অতঃপর তুমি আমার বিধানকে ভঙ্গ করলে, আমার শাস্তির নিশানা হলে এবং আমার ‎উপদেশকে নষ্ট করলে। অতএব তুমি আমার নিআমত কিভাবে অস্বীকার করতে পার? আমার ‎ইযযতের শপথ! যদিত আমি তোমার মত লোক দ্বারা পুরো দুনিয়া ভরে দেই যারা দিন রাত ‎আমার ইবাদত করবে এবং আমার সিজদা করবে এবং এই ইবাদেত মোটেও আলস্য করবে ‎না। অতঃপর আমার নাফরমানী করে, তাহলে আমি এদের সবাইকে গুনাহগার ও নাফরমানের ‎কাতারে নিক্ষেপ করব। তবে আমার রহমত যদি তাদেরকে ঘিরে নেয় তবে ভিন্ন কথা।

এটা ‎শুনে আদম (আ) জাবালে হিন্দ এ তিনশত বৎসর পর্ন্ত কাঁদতে থাকলেন। তার অশ্রু ঐ পাহাড় ও ‎উপত্যকায় বয়ে চলত। বর্ণনাকারী বলেন যে, ঐ চোখের পানি দ্বারাই তোমাদের দুনিয়ার এইসব ‎সুগন্ধি উৎপন্ন হয়েছে। ‎

রিওয়ায়াতঃ১০৭- হাসান বসরী (রহ) বলেন, যখন আদম (আ)-কে জান্নাত থেকে বের করে দেওয়া ‎হল, তখন তিনি তিনশত বৎসর পর্যন্ত ক্রন্দন করতে থাকেন। এমনকি তার চোখ দিয়ে ‎ঝর্ণাধারা প্রবাহিত হতে লাগল।

 

জীবনে ভাল মন্দ যা ঘটে তা নির্ধারিত

রিওয়ায়াতঃ১০৮- খালিদ আল হাযযা (রহ) বলেন, আমি ফারেস এর দিকে রওয়ানা হলাম এবং ‎হাসন বসরী (রহ) এর খিদমতে উপস্থিত হলাম। তার উপর তাকদীর অস্বীকার করার অভিযোগ ‎আরোপ করা হয়েছিল। আমি বললাম, হে আবু সাঈদ! আদম (আ)-কে কি যমীনের জন্য সৃষ্টি ‎করা হয়েছিল নাকি জান্নাতের জন্য? তিনি বললেন, হে আবু মানাযিল! এটা আপনার জিজ্ঞাসা ‎করার বিষয় না। আমি বললাম, আমি চাই যে, আমার এই বিষযের জ্ঞান হয়ে যাক। তিনি ‎বললেন, তাকে যমীনের জন্য সৃষ্টি করা হয়েছিল। আমি বললাম, যদি তিনি সাবধানতা অবলম্বন ‎করতেন এবং ঐ গাছের ফল না খেতেন তবে কি ভাল হত? তিনি বললেন, ত্রটি হওয়াটা তো ‎তার তাকদীরেই নির্ধারিত ছিল।

 

উমর ইবনে আব্দুল আযীয (রহ) এর ভয়

রিওয়ায়াতঃ১০৯- দাউদ ইবনে আব্দুর  রহমান বলেন, হযরত উমর ইবনে আব্দুল আযীয (রহ) এর ‎দুইজন দীনি ভাই ছিল একজনের নাম যিয়াদ আরেক জনের নাম সালিম। একদিন যিয়াদ ‎তার নিকট আসলেন তখন তার স্ত্রী ফাতিমা তার পাশে ছিলেন। তিনি উঠে পড়ছিলেন তো উমর ‎ইবনে আব্দুল আযীয (রহ) বললেন, ইনি আপনার চাচা যিয়াদ। অতঃপর তার দিকে তাকিয়ে ‎বললেন, এ হল যিয়াদ যে পশমের পোষাক পরে আছে। মুসলমানদের কোন কিছুর ব্যাপারেই ‎তার কোন (প্রশাসনিক) দায়িত্ব নেই। অতঃপর চেহারায় কাপড় দিয়ে কঁদতে লাগলেন। যিয়াদ তার স্ত্রীকে ‎জিজ্ঞাসা করলেন যে, তার কি হল? তিনি বললেন, যখন থেকে তিনি খলিফা হয়েছেন তখন থেকে ‎তার এই অবস্থা। ‎

অতঃপর তার অপর দীনি ভাই সালিম আসল। তখন উমর ইবনে আব্দুল আযীয (রহ) ‎বললেন, হে সালিম! আমি আমার ব্যাপারে (দায়িত্বে পালনের ব্যপারে) ধ্বংসের আশঙ্কা করি। সালিম বললেন, যদি আপনার ‎ধ্বংসের আশঙ্কা হয় তবে নিরাশ হবেন না। এমন বান্দা হয়ে যান যাকে আল্লাহ নিজ হাত ‎দ্বারা সৃষ্টি করেছেন এবং তাকে রূহ ফুঁকে দিয়েছেন আর ফেরেশতাদেরকে তার সামনে সিজদা ‎করিয়েছেন। জান্নাতকে তার জন্য মুবাহ করেছেন। আর একটি গুনাহর জন্যই তাকে জান্নাত থেকে ‎বের করে দিয়েছেন। ‎

রিওয়ায়াতঃ১১০- বাগদাদের প্রসিদ্ধ কবি মাহমুদ বিন হুসায়ন আল ওয়াররাক এর কতক সুন্দর ‎কবিতা আছে

হে স্বপ্ন ও উদাসিনতায় পড়ে থাকা ব্যক্তি তুমি নিজেকে আশা ও বাসনার পথ দেখিয়েছ ‎অথচ সেই পথ কষ্টহীন ও সোজা নয়। তুমি গুনাহর পর গুনাহ করে যাচ্ছ আর আশান্বিত ‎হয়ে জান্নাতের দরজা আর তার সফলতার আশা করে যাচ্ছ অথচ এটা ভুলে যাচ্ছ যে, আল্লাহ ‎তাআলা আদম (আ)-কে মাত্র একটি গুনাহর জন্য জান্নাত থেকে বের করে দুনিয়াতে পাঠিয়ে ‎দিয়েছিলেন।

 ‎

দুনিয়াতে স্থায়ী সুখ-শান্তি নেই

রিওয়ায়াতঃ১১১- ফাতাহ মুসিলী (রহ) বলেন, আদম (আ) তার সন্তানকে বললেন, হে বৎস! আমরা ‎জান্নাতী লোক ছিলাম। যেভাবে এটা সৃষ্টি করা হয়েছে আমাদেরকেও এভাবে সৃষ্টি করা হয়েছে ‎এবং আমাদেরকে জান্নাতী খাদ্য দেওয়া হয়েছে। অতঃপর আমাদের দুশমন ইবলিস (তার চক্রান্ত ও জাল ‎দ্বারা) আমাদেরকে পাকরাও করেছে। এখন দুনিয়াতে দুঃখ-কষ্ট ও চিন্তা-পেরেশানী ব্যতীত কোন ‎আরাম ও প্রশস্ততা লাভ হবে না- যে পর্যন্ত না আমরা সেখানে (জান্নাতে) পূণরায় প্রবেশ করব ‎যেখান থেকে আমাদেরকে বের করে দেয়া হয়েছিল। ‎

 

গুনাহর কারণে মানুষ ফেরেশতাদের সান্নিধ্য থেকে বঞ্চিত হয়

রিওয়ায়াতঃ১১২- মুহামাম্মদ ইবনে মুনকাদির (রহ) বলেন, আদম (আ) যমীনে ৪০ বৎসর এভাবে ‎অতিবাহিত করেছেন যে, তিনি কখনও হাসেন নি, আর না তার অশ্রু কখনও থেমেছে। অতঃপর ‎হাওয়া (আ) বললেন, আমরা ফেরশতাদের আওয়ায শোনার জন্য অস্থির হয়ে আছি। আল্লাহর ‎নিকট দুআ করুন যে, আমরা ফেরশেতাদের অওয়ায শুনতে পারি। আদম (আ) বললেন, আমি ‎আমার কৃতকমের্ জন্য আল্লাহর নিকট এমন লজ্জা করি যে, আকাশের দিকে মাথা উঠাতে ‎পারিনা। ‎

রিওয়ায়াতঃ১১৩- ইয়াযিদ রাক্কাশী (রহ) বলেন, যখন জান্নাত থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার কারণে আদম ‎‎(আ) এর কান্না দীর্ঘ হয়ে গেল তখন কেউ এর কারণ জিজ্ঞাসা করলো। তিনি বললেন, আমি ‎এমন ঘরে প্রতিপালকের প্রতিবেশী ছিলাম যেই ঘরের মাটি পবিত্র। আর ওর মধ্যে আমি ‎ফেরেশতাদের আাওয়ায শুনতাম।

 

ইবলিস মানুষের মিথ্যা কল্যাণকামী

রিওয়ায়াতঃ১১৪- নযর বিন ইসমাঈল বলেন, আল্লাহ তাআলা বললেন, হে আদম! তুমি আমার ‎নাফরমানী করেছ আর ইবলীসের আনুগত্য করেছ? আদম (আ) আরয করলেন, হে ‎পরওয়ারদেগার! সে আমার সামনে আপনার কসম খেয়েছে এবং আমার কল্যাণকামী সেজেছে। ‎আর আমি মনে করেছি যে, কেউ আপনার নামে মিথ্যা কসম খেতে পারে না।

 

نُوحٌ عَلَيْهِ السَّلَامُ

নূহ (আ)

 

নূহ (আ) এর কান্না

রিওয়ায়াতঃ১১৫- ওহাইব (রহ) বলেন যখন আল্লাহ তাআলা নূহ (আ)-কে তার সন্তানের ব্যাপারে ‎বলেন যে,‎

إِنِّي أَعِظُكَ أَنْ تَكُونَ مِنَ الْجَاهِلِينَ

আমি তোমাকে উপদেশ দিচ্ছি যে, তুমি অজ্ঞ লোকদের অন্তর্ভুক্ত হয়ো না।– সূরা হুদ ৪৬

নূহ (আ) এরপর তিনশত বছর কাঁদতে থাকেন। এমনকি কান্নার ফলে তার চোখের ‎নিচের অংশ গর্ত হয়ে যায়।

 

هُودٌ يَنْصَحُ قَوْمَهُ

হুদ (আ) এ উপদেশ

রিওয়ায়াতঃ১১৬- ইয়াহইয়া বিন ইয়ালা বলেন, যেই সময় সম্প্রদায়ের লোকেরা খোলখুলিভাবে ‎মূর্তিপূজা শুরু করলো, তখন হুদ (আ) তার সম্প্রদায়কে বললেন, হে আমার সম্প্রদায়! আমাকে ‎আল্লাহ তোমাদের নবী ও দায়িত্বশীল করে পাঠিয়েছেন অতএব তোমরা আল্লাহর আনুগত্য ‎শিরোধার্য করে নাও। আল্লাহর আনুগত্যের কারণে তার সন্তুষ্টি লাভ হয় আর তার নাফরমানীর ‎কারণে তার অসন্তুষ্টি। ‎

আর জেনে রাখ যে, যমীন আসমানের মুখাপেক্ষী কিন্তু আসমান যমীন থেকে ‎অমুখাপেক্ষী। অতএব যদি তোমরা আল্লাহর আনুগত্য কর তবে তোমাদের জীবন স্বাচ্ছন্দ্যময় ‎হয়ে উঠবে এবং পরবর্তী জীবনে নিরাপত্তা পেয়ে যাবে। আর আল্লাহ তাআলার অসন্তুষ্টির ‎কারণের প্রশস্ত যমীনও সংকীর্ণ হয়ে যায়।

 

الرِّيحُ عُقُوبَةُ عَادٍ

কওমে আদ এর শাস্তি

রিওয়ায়াতঃ১১৭- ইমাম মুজাহিদ (রহ) আব্দুল্লাহ ইবনে আমর (রা) থেকে বর্ণনা করেন। রাসূলুল্লাহ ‎‎(সা) ইরশাদ করেন- আল্লাহ তাআলা যেই বায়ূ দ্বারা আদ সম্প্রদায়কে ধ্বংস করেছেন তা আল্লাহ ‎তাআলা এক আঙ্গুলী পরিমাণ উন্মুক্ত করেছিলেন। বর্ণনাকারী বলেন, সে বায়ূখণ্ডটি উপত্যকার ‎উপর দিয়ে বয়ে যায় এবং তাদের মাল-সামান সবকিছু আসমান ও যমীনের মাঝে উড়িয়ে নিয়ে ‎যায়। যখন কওমে আদের লোকেরা সেই বায়ূ দেখেছিল তখন বলেছিল- ‎

هَذَا عَارِضٌ مُمْطِرُنَا

এই তো মেঘ আমাদের বৃষ্টি দিবে।– সূরা আল আহকাফ ২৪

কিন্তু বাতাস তখন উপত্যকার মানুষ ও জীব-জন্তুগুলোকে শহরবাসীর উপর ফেলে দেয়। ‎

 

آدَمُ عَلَيْهِ السَّلَامُ

আদম (আ)‎

হাওয়া (আ) এর শাস্তি

রিওয়ায়াতঃ১১৮- হযরত ইবনে আব্বাস (রা) বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, আল্লাহ তাআলা আদম (আ)-‎কে বললেন, আমি তোমাকে যেই বৃক্ষ থেকে নিষেধ করেছি তার ফল তুমি কেন খেয়েছ? আদম ‎‎(আ) বললেন, হে আমার রব! হাওয়া আমাকে ওটির প্রতি উদ্বুদ্ধ করেছিল। আল্লাহ তাআলা ‎বললেন, আমি তাকে এই শাস্তি দিচ্ছি যে, গর্ভবতী অবস্থায় সে কষ্ট ভোগ করবে, বাচ্চা জন্ম ‎দেওয়ার সময় কষ্ট ভোগ করবে আর প্রতি মাসে তার দুইবার রক্ত আসবে। এটা শুনে হাওয়া (আ) ‎কাঁদতে লাগলেন। তখন বলা হলো-‎

عَلَيْك الرنة وعَلى بناتك

তোমার প্রতি ও তোমার কন্যাদের প্রতি আক্ষেপ।

 

কৃষিকাজের সূচনা

রিওয়ায়াতঃ১১৯- সুফিয়ান ইবনে উয়াইনাহ বলেন, যখন আদম (আ)-কে যমীনে নামিয়ে দেয়া হয় ‎তখন তিনি যমীনকে বলেন, হে যমীন! আমাকে খাবার খাওয়াও। যমীন বললো, আল্লাহর শপথ! ‎আমি তোমাকে এমন কাজ ব্যতীত তোমাকে কিছু খাওয়াব না, যার মাধ্যমে তোমার ঘাম নির্গত ‎হয়। ‎

রিওয়ায়াতদঃ১২০- হযরত কাতাদাহ (রহ) বলেন, আদম (আ)-কে যমীনে  নামিয়ে দেযার পর আদম ‎‎(আ)-কে বলা হল, আপনি যায়তুনের সাথে রুটি কখনও খাবেন না, যে পর্যন্ত না মৃত্যুর মত ‎‎(কষ্টদায়ক) কাজ না করবেন। ‎

রিওয়া্য়াতঃ১২১- ইবনে আব্বাস (রা) বলেন, আদম (আ) ক্ষেতে কাজ করছিলেন। সন্ধ্যার সময় তিনি ‎যখন ঘরে ফিরছিলেন তখন তার পুরো শরীর ঘামে ভিজে গেছে। তিনি হাওয়া (আ)-কে বললেন, ‎হে হাওয়া! এটা ঐ ব্যক্তির শাস্তি, যে আল্লাহর নাফরমানী করেছে।

 

এক ধোপার উপস্থিত জবাব

রিওয়ায়াতঃ১২২- রুকবাহ বিন মাসকালাহ (রহ) বলেন, আমি এক ধোপার নিকট দিয়ে অতিক্রম ‎করছিলাম, যে প্রচন্ড শীতের মধ্যে কাপড় নিংড়াচ্ছিল। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, এই নিষিদ্ধ বৃক্ষ ‎তোমার সাথে কি আচরণ করেছে? সে বলল ‘হায়! যদি এই বৃক্ষ সৃষ্টিই না করা হত।’ আমি ‎তার মত এমন উপস্থিত উত্তর আর কাউকে দিতে দেখিনি।

 

ফল খাওয়ার পরিণতী দুনিয়ায়

রিওয়ায়াতঃ১২৩- আব্দুর রহমান বিন ইয়াযিদ বর্ণনা করেন যে, তালহা বিন মুসাররিফ (রহ) একবার ‎এক দুর্দশাগ্রস্ত ব্যক্তিকে দেখে বললেন, এটা ঐ বৃক্ষের ফল খাওয়ার পরিণতী, যা আদম (আ) ‎খেয়েছিলেন।

রিওয়ায়াতঃ১২৪- আব্দুল্লাহ ইবনে মাযরুক বলেন, ঐ বৃক্ষের ফল খাওয়ার দরুন আমাদের উপর ‎অনেক কষ্ট আসে। অতঃপর তিনি কাঁদতে থাকেন।‎

রিওয়ায়াতঃ১২৫- আমর বিন যার (রহ) বলেন, অনেক লোকমা গ্রহণকারী এমন আছে যাদেরকে দীর্ঘ ‎ক্ষুধায় নিক্ষেপ করে। অতঃপর বলেন, আদম সন্তানের মধ্যে জাহান্নামীদের জন্য ধ্বংস। আর ‎এটা তাদের পিতার নিষিদ্ধ বৃক্ষের ফল খাওয়ার কারণে হয়েছে।

 

উয়াইস কারণী (রহ) এর ঘটনা

রিওয়ায়াতঃ১২৬- আবু আব্দুল্লাহ (রহ) বলেন, উয়াইস কারনী (রহ) একবার খুব ঠান্ডার সময় এক ‎ধোঁপার পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। সেই ধোপা পানির উপর দাড়িয়ে ছিল। উয়াইস কারনী (রহ) তার ‎উপর সমবেদনা প্রকাশ করে তার হাত দিয়ে ইশারা করে বললেন, দেখ বেচারা! কি অবস্থায় ‎আছে! ধোপা উয়াইস কারনী (রহ)-কে বললো, হে উয়াইস! যদি এই বৃক্ষ সৃষ্টিই না হত।

চলবে

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

Back to top button
error: Content is protected !!