মৃত্যুর পর জীবন

রিওয়ায়াত ৫১ থেকে

 

বিসমিল্লাহির রহমানির রহীম

বনী ইসরাঈলের ঘটনা
৫১.হিলাল বিন ইয়াসাফ আল্লাহ তাআলার নিম্নের ফরমান প্রসঙ্গে বলেন,
أَلَمْ تَرَ إِلَى الَّذِينَ خَرَجُوا مِنْ دِيَارِهِمْ وَهُمْ أُلُوفٌ حَذَرَ الْمَوْتِ
তুমি কি তাদেরকে দেখনি যারা মৃত্যুভয়ে হাজারে হাজারে নিজেদের আবাসভূমী পরিত্যাগ করেছিল?- সূরা বাকারা ২৪৩
বনী ইসরাঈলের কিছু লোক ছিল। যখন তাদের মধ্যে প্লেগ রোগ বিস্তার লাভ করল তখন তাদের মালদার ও জমিদাররা বের হয়ে গেলেন এবং গরীব ও নিঃস্ব লোকেরা সেখানে রয়ে গেলেন। যারা রয়ে গিয়েছিল তাদের কতক মারা গেল। আর যারা চলে গিয়েছিল তাদের কারো কিছু হয়নি। অতঃপর এক বছর তারা বলল, যদি আমরা থেকে যেতাম তবে তাদের মত আমরাও ধ্বংস হয়ে যেতাম। আর অপর দল বলল, যদি আমরা তাদের মত বেরিয়ে যেতাম তবে আমরাও নাজাত পেয়ে যেতাম।
ঐ বছর তাদের মধ্যে এ সিদ্ধান্ত হল যে, তারাও এই স্থান ছেঁড়ে চলে যাবে। তারা তা করল। আল্লাহ তাদেরকে যেখানে পৌঁছার সেখানে পৌঁছে দিলেন। আল্লাহ তাদের উপর মৃত্যু প্রবল করে দিলেন আর তাদের হাড়গুলো অবশিষ্ট রইলো। নিকটবর্তী গ্রামের লোকেরা আসল এবং হাড়গুলো একত্রিত করে রেখে দিল। অতঃপর তাদের পাশ দিয়ে তাদের নবী অতিক্রম করেন। তিনি আরয করেন, ইয়া রব! যদি আপনি চান তবে তাদেরকে জীবিত করে দিন যাতে তারা আপনার শহর আবাদ করবে এবং আপনার ইবাদত করবে।

আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করলেন, এই এই কালিমা পাঠ কর। তিনি তা পাঠ করলেন। তিনি দেখলেন হাড়গুলো একত্রিত হয়ে জোড়া লাগছে। আবার পাঠ করলেন। দেখলেন যেন তাতে গোশত লেগে যাচ্ছে। আবার পাঠ করার পর দেখলেন যে, তারা বসে তাসবীহ পাঠ করছে। তাদের অবয়ব ফিরে আসল। তারা তাকবীর, তাসবীহ ও তাহলীল পাঠ করতে লাগল। এরপর আল্লাহ তাআলা যতদিন চাইলেন ততদিন তারা জীবিত রইলেন এবং জীবন যাপন করতে লাগলেন।

উযায়র (আ) এর ঘটনা
৫২.হযম বিন আবু হযম বলেন, আমি হাসান (রা)-কে এই আয়াত
أَوْ كَالَّذِي مَرَّ عَلَى قَرْيَةٍ وَهِيَ خَاوِيَةٌ عَلَى عُرُوشِهَا قَالَ أَنَّى يُحْيِي هَذِهِ اللَّهُ بَعْدَ مَوْتِهَا فَأَمَاتَهُ اللَّهُ مِائَةَ عَامٍ ثُمَّ بَعَثَهُ
তুমি কি সেই ব্যক্তিকে দেখনি, যে এমন এক নগরে উপনীত হয়েছিল, যা ধ্বংসস্তুপে পরিণত হয়েছিল?- সূরা আল বাকারা ১৫৯
এর ব্যাপারে বলতে শুনেছি যে, তিনি বলেনে, আমাদের নিকট বর্ণনা করা হয়েছে যে, আল্লাহ তাআলা যখন হযরত উযায়র (আ)-কে মৃত্যু দিয়েছেন তখন ভোরের সময় ছিল। আর যখন জীবিত করেছেন তখন সূর্য ডুবছিল।
قَالَ كَمْ لَبِثْتَ قَالَ لَبِثْتُ يَوْمًا أَوْ بَعْضَ يَوْمٍ قَالَ بَلْ لَبِثْتَ مِائَةَ عَامٍ فَانْظُرْ إِلَى طَعَامِكَ وَشَرَابِكَ لَمْ يَتَسَنَّهْ وَانْظُرْ إِلَى حِمَارِكَ وَلِنَجْعَلَكَ آيَةً لِلنَّاسِ
আল্লাহ তাআলা তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, কতদিন পর্যন্ত নিদ্রিত ছিল? তিনি বললেন, একদিন অথবা একদিনের কিছু অংশ। আল্লাহ তাআলা বললেন, তুমি শত বছর ঘুমিয়ে ছিলে। লক্ষ্য কর তোমার খাবার দাবারে প্রতি তা এখনও নষ্ট হয়নি। আর দেখ তোমার গাধার প্রতি (তার হাড়গুলো অবশিষ্ট্য রয়েছে)। আমি তোমাকে লোকদের জন্য নিদর্শন করব।

হাসান বলেন আল্লাহ তাআলা তার গাধাকে জীবিত করে দেন। আর তার খাবার দাবার জন্তু জানোয়ার থেকে সুরিক্ষত রাখেন।
আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَانْظُرْ إِلَى الْعِظَامِ كَيْفَ نُنْشِزُهَا ثُمَّ نَكْسُوهَا لَحْمًا
দেখ (তোমার গাধার) হাড়গুলোর প্রতি। কিভাবে সেগুলোকে সংযোজিত করি এবং গোশত লাগিয়ে দেই।– সূরা বাকারা ১৫৯
হাসান বলেন, আমার নিকট বর্ণনা করা হয়েছে যে, সর্বপ্রথম আল্লাহ তাআলা উযায়র (আ) এর চোখ জীবিত করেন ফলে সে দেখতে থাকে যে, জোড়াগুলো তার যথাস্থানে কিভাবে প্রতিস্থাপিত হয়। যখন তার বিষয়টা পরিষ্কার হয়ে গেল তখন তিনি বললেন যে,
أَعْلَمُ أَنَّ اللَّهَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ
আমি জেনে নিয়েছি যে, আল্লাহ তাআলা সবকিছুর উপর ক্ষমতাবান। – সূরা বাকারা ১৫৯

৫৩. আমাশ (রহ) এই আয়াত
وَلِنَجْعَلَكِ آيَةً لِلنَّاسِ
আমি তোমাকে লোকদের জন্য নিদর্শন করব।
প্রসঙ্গে বলেন, যখন উযায়র (আ) তার পরিবারের নিকট ফিরে আসেন তখন তিনি যুবক ছিলেন আর তার সন্তানগণ বৃদ্ধ হয়ে গিয়েছিল।

বনী ইসরাঈলের অপর একটি ঘটনা
৫৪.হযরত ইবনে আব্বাস (রা) বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, বনী ইসরাইলদের দুটি শহর ছিল। একটা ছিল الحصينة আর তার কয়েকটা দরজা ছিল। আর অপরটা ছিল خربة। الحصينة এর অধিবাসীরা সন্ধ্যায় তাদের শহরের দরজা বন্ধ করে দিত। যখন ভোর হত তখন শহরের দরজায় দাড়িয়ে দেখত যে, শহরের আশপাশে কোন ঘটনা বা বিপর্যয় ঘটেছে কি না। একদিন সকালে তারা দেখল যে, শহরের দরজার সামনে এক নিহত ব্যক্তি পড়ে রয়েছে। خربة শহরের অধিবাসীরা তাদের নিকট এসে বলল যে, তোমরা আমাদের লোককে হত্যা করেছ আর তার ভাইয়ের যুবক ছেলে (তার ভাতিজা) তার জন্য কেঁদে চলেছে আর বলছে তোমরা আমার চাচাকে হত্যা করেছ। তার বলল, আল্লাহর শপথ! সন্ধ্যায় যখন আমরা দরজা বন্ধ করেছি তখন থেকে নিয়ে ভোর পর্যন্ত আমরা দরজা খুলিনি। তোমাদের এই সাথীর হত্যার বিষয়ে আমাদের কোন দায় নেই। তারা মূসা (আ) এর নিকট আসল এবং মূসা (আ) তাদেরকে আল্লাহর নিম্নের ফরমান শুনিয়ে দিলেন
{إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُكُمْ أَنْ تَذْبَحُوا بَقَرَةً قَالُوا أَتَتَّخِذُنَا هُزُوًا قَالَ أَعُوذُ بِاللَّهِ أَنْ أَكُونَ مِنَ الْجَاهِلِينَ، قَالُوا ادْعُ لَنَا رَبَّكَ يُبَيِّنْ لَنَا مَا هِيَ} [البقرة: 68] حَتَّى بَلَغَ {فَذَبَحُوهَا وَمَا كَادُوا يَفْعَلُونَ} [البقرة: 71]
তারা বলল, আমাদের জন্য তোমার প্রতিপালককে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিতে বলো যে, তা কিরুপ? মূসা বলল, আল্লাহ বলেছেন, উহা এমন গাভী যা বৃদ্ধও নয় আবার অল্প বয়স্কও নয়- মধ্যবয়সী। সুতরাং তোমরা যার নির্দেশ পেয়েছ তা সম্পাদন কর।
তারা (আবার) বলল, আমাদের জন্য তোমার প্রতিপালককে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিতে বল যে, তার রং কি? মূসা বলল, আল্লাহ বলেছেন, উহা হলুদ বর্ণের গাভী যার রং এমন গাঢ় উজ্বল যে, তা দর্শকদের চক্ষু জুড়িয়ে দেয়।
তারা (আবার) বলল, আমাদের জন্য তোমার প্রতিপালককে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিতে বল যে, তা কোনটি? আমরা গাভীটির ব্যাপারে সন্দেহে পতিত হয়েছি। আর আল্লাহ ইচ্ছা করলে নিশ্চয়ই আমরা সঠিক দিশা পাব।
মূসা বলল, আল্লাহ বলেছেন, উহা এমন সুস্থ ও নিখুঁত গাভী যা জমি চাষে ও ক্ষেতে পানি সেচের জন্য ব্যবহৃত হয় নাই। তারা বলল, এখন তুমি সত্য এনেছ। যদিও তারা যবেহ করতে উদ্যত ছিল না তথাপি তারা তা যবেহ করল।– সূরা বাকারা ৬৮-৭১

বনী ইসরাইলের এক যুবক ছিল, যে তার দোকান চালাত আর তার পিতা ছিল বৃদ্ধ। একবার অন্য এক শহর থেকে একটি লোক তার থেকে জিনিসপত্র নিতে আসল আর তাকে জিনিসপত্রের মূল্য পরিশোধ করল। যুবক তাকে নিয়ে চলল যাতে দোকান খুলে তার মালালমাল বুঝিয়ে দিবেন। দোকানের চাবি ছিল তার বৃদ্ধ পিতার কাছে, যে তখন দোকানের ছায়ায় শুয়ে ঘুমিয়ে ছিল। লোকটি বলল, তোমার পিতাকে জাগ্রত কর। যুবক বলল, বাবা ঘুমাচ্ছেন, অতএব তাকে এখন জাগানো আমি পছন্দ করি না। তারা উভয়ে ফিরে চলল। তখন লোকটি যুবককে বলল, তোমাকে দ্বিগুণ মূল্য দিব, তোমার বাবাকে জাগাও (আর আমাকে মালামাল দিয়ে দাও আমার তাড়া আছে)। যুবক রাজি হলো না। তখন লোকটি চলে গেল।

বৃদ্ধ পিতা জাগ্রত হওয়ার পর যুবক বলল যে, একটি লোক এসেছিল আর আল্লাহর শপথ! এত এত মালামাল ক্রয় করতে এসেছিল আর এত টাকা দিয়েছিল। তবে যেহেতু আপনি ঘুমিয়ে ছিলেন তাই আপনাকে জাগ্রত করা পছন্দ করিনি। বাবা তাকে তিরষ্কার করলেন। কিন্তু আল্লাহ তাআলা পিতার সাথে সদাচরন করার কারণে তাকে ঐ বাছুরটি দান করেছিলেন যা বনী ইসরাইলের লোকেরা খুঁজছিল। বনী ইসরাইল তার কাছে এসে বলল, এ বাছুর আমাদের নিকট বিক্রি করে দাও। সে বলল, না আমি বিক্রি করব না। লোকেরা বলল, আমরা তোমার থেকে নিয়েই ছাড়ব। লোকেরা মূসা (আ) এর কাছে আসল। মূসা (আ) বললেন, কিছু মাল সম্পদের বিনিময়ের সাথে তাকে রাজি কর। লোকেরা যুবককে বলল, এ ব্যাপারে তোমার অভিমত কি? সে বলল, আমার ইচ্ছা হলো তোমরা দাড়ি পাল্লা নিয়ে আস। এক পাল্লায় বাছুর আর আরেক পাল্লায় সোনা রাখবে। যখন স্বর্ণের পাল্লা ঝুলে পড়বে তখন সোনা দানা আমি নিয়ে নিব আর বাছুর তোমাদেরকে দিয়ে দিব। লোকেরা তাই করল।
অতঃপর ঐ গাভী নিয়ে তারা মৃত ব্যক্তির কবরের নিকট গেল। উভয় শহরের লোক একত্রিত হলো। গাভী যবেহ করলো আর তার কিছু অংশ কবরে ছুঁড়ে মারল। তখন ঐ মৃত ব্যক্তি মাথা ঝাড়তে ঝাড়তে কবর হতে উঠে দাড়াল এবং বলল, আমাকে আমার ভাতিজা হত্যা করেছে। তার উপর আমার জীবনের সময়গুলো দীর্ঘ হয়ে গিয়েছিল আর সে আমার সম্পদ হস্তগত করতে চাইছিল। এটা বলার পর সে মরে গেল।

মেহমানদারী না করানোর ফল
৫৫.হুয়াইরিস বিন রিআব বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, একবার আমি আসাসাহ নামক স্থান দিয়ে যাচ্ছিলাম। এমন সময় একটি কবর থেকে এক ব্যক্তি বের হলো যার মাথা ও চোখ থেকে আগুনের হালকা বের হচ্ছিল। আর তার পরনে ছিল লোহার পোষাক। সে বলছিল আমাকে পানি দাও, পানি করাও। আর অপর এক ব্যক্তি তার পিছনেই বের হলো, যে বলছিল কাফিরকে পানি পান করাবে না, কাফিরকে পানি পান করাবে না। সে তার জিঞ্জিরের এক পাশ ধরে টান দিয়ে তাকে আবার কবরে নিয়ে গেল।
হুয়াইরিস বলেন, এটা দেখে আমার উট এমনভাবে পালাতে লাগল যে, আমি তাকে কাবু করতে পারছিলাম না। এমনকি আরকুয যাবইয়াহ নামক স্থানে পৌছে গেল এবং সেখানে গিয়ে শান্ত হলো। আমি ওখানে অবতরন করে মাগরিব ও ইশার নামায আদায় করলাম অতঃপর যাত্রা শুরু করলাম এবং পরিশেষে মদীনায় পৌঁছলাম। অতঃপর আমি উমর (রা) এর নিকট সমস্ত ঘটনা বর্ণনা করলাম। উমর (রা) বললেন, হুয়ায়রিস! আমি তোমার উপর মিথ্যার অভিযোগ আনব না তবে তুমি বড়ই আশ্চর্য ঘটনা শুনিয়েছ। উমর (রা) এলাকার প্রবীনদের ডাকলেন যারা জাহিলী যুগ পেয়েছিলেন। অতঃপর হুয়াইরিসকে ডাকলেন। উমর (রা) বললেন, সে আমাকে একটি ঘটনা শুনিয়য়েছে। আমি তাকে মিথার দায়ে অভিযুক্ত করি না (তবে ঘটনা আশ্চর্যজনক)। অতঃপর হুয়াইরিসকে বললেন, তাদেরকে ঐ ঘটনা শোনাও। হূয়াইরিস (তার অবয়ব ও দৈহিক গঠনসহ) সমস্ত ঘটনা বর্ণনা করলে তারা বলেন, আমরা তাকে চিনতে পেরেছি। ঐ ব্যক্তি ছিল বনী গিফার গোত্রের আর সে জাহিলী যুগে মারা গিয়েছিল। তখন উমর (রা) আল্লাহর শোকরিয়া আদায় করলেন। যখন তারা বলল যে, এই লোক জাহলী যুগে মারা গেছে তখন উমর (রা) খুশি হলেন। তার ব্যাপারে তিনি আরো জিজ্ঞাসা করলে তারা বলেন, জাহিলিয়াতের যুগে সে এমন ছিল যে, সে মেহমানদারী করত না।

চলবে

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

Back to top button
error: Content is protected !!