মুখতাসার শুআবুল ইমান- ইমানের শাখা ৬ থেকে

التَّاسِعُ مِنْ شُعَبِ الْإِيمَانِ
وَهُوَ بَابٌ فِي أَنَّ دَارَ الْمُؤْمِنِينَ، وَمَآبهُمُ الْجَنَّةُ وَدَارَ الْكَافِرِينَ وَمَآبَهُمُ النَّارُ
ইমানের ৯ম শাখা
মুমীনের বাসসস্থান জান্নাত এ এবং কাফিরের বাসস্থান জাহান্নাম

আল্লাহ তাআলার বাণী
بَلَى مَنْ كَسَبَ سَيِّئَةً، وَأَحَاطَتْ بِهِ خَطِيئَتُهُ فَأُولَئِكَ أَصْحَابُ النَّارِ هُمْ فِيهَا خَالِدُونَ، وَالَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ أُولَئِكَ أَصْحَابُ الْجَنَّةِ هُمْ فِيهَا خَالِدُونَ
হাঁ, যে মন্দ উপার্জন করবে এবং তার পাপ তাকে বেষ্টন করে নেবে, তারাই জাহান্নামের অধিবাসী। তারা সেখানে হবে স্থায়ী। আর যারা ঈমান এনেছে এবং নেক আমল করেছে, তারা জান্নাতের ‎অধিবাসী। তারা সেখানে হবে স্থায়ী। ‎

হযরত জাবির (রা) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল।লাহ (সা) ইরশাদ করেন-
مَنْ لَقِيَ اللهَ وَهُوَ لَا يُشْرِكُ بِهِ شَيْئًا دَخَلَ الْجَنَّةَ، وَمَنْ لَقِيَهُ يُشْرِكُ بِهِ شَيْئًا دَخَلَ النَّارَ
যে ব্যক্তি এই অবস্থায় আল্লাহর সাক্ষাত করে যে, সে তার সাথে কাউকে শরীক করে ‎না সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। আর যে এই অবস্থায় সাক্ষাত করে যে তার সাথে শরীক করে ‎সে জাহান্নামে প্রবেশ করবে।

ইল্লিয়্যিন ও সিজ্জীন
আল্লাহ তাআলার বাণী
إِنَّ كِتَابَ الْفُجَّارِ لَفِي سِجِّينٍ وَ إِنَّ كِتَابَ الْأَبْرَارِ لَفِي عِلِّيِّينَ
নিশ্চয় পাপাচারীদের ‘আমলনামা সিজ্জীনে। আর নেককারেদের আমলনামা ইল্লিয়্যিনে।– সূরা তাতফীফ ৭-৮
এখান থেকে আমরা জানতে পারলাম যে ইল্লিয়্যীন পৃথক সিজ্জীনও পৃথক যেভাবে পাপী পৃথক এবং ‎নেককার পৃথক। আল্লাহ তাআলা দোযখের গুণ হাবিয়াহ (অধোমুখী) বলেছেন। আর জান্নাতের গুণ বলেছেন আলিয়া (উচ্চ) বলেছেন। আর হাদীসে আছে যে, মুমিনের রূহ উপরে নিয়ে যাওয়া হয় আর কাফিরের রূহ নিচে নিয়ে যাওয়া হয়।

হযরত বিশর বিন শিগাফ বলেন, আমরা আব্দুল্লাহ ইবনে সালামের সাথে বসা ছিলাম। আর তিনি ‎হাদীস আলোচনা করছিলেন। এমনকি তিনি বললেন, আল্লাহ তাআলার নিকট সমস্ত ‍সৃষ্টির মধ্যে আবুল কাসিম ‎‎(সা) অধিক প্রিয়। আর জান্নাত হলো আকাশের উপর আর জাহান্নাম হলো যমীনের উপর। কিয়ামতের দিন ‎আল্লাহ তাআলা সকল সৃষ্টিকে এক এক জামাত, এক এক উম্মত, আর এক এক নবীকে উঠাবেন। অতঃপর ‎জাহান্নামের উপর পুল দেয়া হবে। অতঃপর আহ্বানকারী এই বলে আহ্বান করবে যে, আহমদ (সা) ও তার ‎উম্মত কোথায়? তখন রাসূলুল্লাহ (সা) আসবেন আর তার পিছনে তার ভাল মন্দ উম্মত সবাই থাকবে আর ‎তারা পুলকে ধরবেন। আল্লাহ তাআলা তার দুশমনদের চোখ অন্ধ করে দিবেন। অতএব তার ডান ও বাম দিক ‎হতে তারা জাহান্নামে পতিত হবে। নবী নাজাত পাবে আর তার সাথের নেক লোকেরাও। তাদের সাথে ‎ফেরেশতাদের সাক্ষাত মিলবে। ফেশেতারা তাদেরকে তাদের জান্নাতের ঠিকানা দেখিয়ে দিয়ে বলবেন, তোমার ‎(স্থান জান্নাতের) এই ডান দিকে আর তোমার (জান্নাতের) এই বাম দিকে। অতঃপর আব্দুল্রাহ ইবনে সালাম এভাবে প্রত্যেক নবীর ‎বর্ণনা দেন।– রিওয়ায়াত ৩৬৬

শায়খ হালীমী (রহ) বলেন, পুলসিরাত জাহান্নামের পুল। হাদীস থেকে প্রতিয়মান হয় যে জান্নাত উপরে ‎এবং জাহান্না নীচে। যদি এমন না হত তবে জান্নাতীগণের জন্য পুলের প্রয়োজন হত না।

পুলসিরাত বা জাহান্নামের পুল
হযরত আনাস (রা) বর্ণনা করেন রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেন- জাহান্নামের উপর একটি পুল আছে যা চুলের থেকেও পাতলা এবং তলোয়ারের চেয়েও অধিক ধারালো। তার উপরের দিকের অংশ জান্নাতের দিকে পিছলানোর স্থান। পুলের পাশে জাহান্নামের খাঁদ। আগুনের আওয়ায আমি শুনতে পাব। আল্লাহ তাআলা তার বান্দাদে মধ্য হতে যাকে চাইবেন তাকে দৃঢ় রাখবেন। সেদিন এর উপর পিছলানো পুরুষ ও মহীলা অনেক হবে। আর উভয় দিক থেকে ফেরেশতারা দাড়িয়ে থাকবে। আর দুআর আওয়ায উচ্চ হতে থাকবে
اللهُمَّ سَلِّمْ، اللهُمَّ سَلِّمْ
হে আল্লাহ! রক্ষা করুন হে আল্লাহ! বাঁচান

যে ব্যক্তি হক নিয়ে আসবে সে পার হয়ে যাবে। আর ঐ দিন প্রত্যেককে যার যার ইমান ও আমল আনুপাতে আলো দান করা হবে। তাদের মধ্যে তো কতক এমন হবে যে, তারা বিদ্যুৎ গতিতে পার হয়ে যাবে। কতক লোক বায়ূর গতিতে পার হয়ে যাবে। আর কতক অতিক্রমারী তার মধ্যে ঘোড়ার গতিতে পার হয়ে যাবে। কতক তার মধ্যে দ্রুত পার হয়ে যাবে আর কতক লোক দৌড়ে পার হয়ে যাবে। কত লোকের আলো লাভ হবে তার কদম পর্যন্ত। কতক লোক তার টাখনু দ্বারা দৌড়াবে। তার মধ্যে কতক তার গুনাহর কারণে পাকরাও হয়ে যাবে আর তা তাদেরকে জালিয়ে (জাহান্নামে ফেলে) দিবে।

আল্লাহ যার জন্য চাইবেন তার গুনাহর অনুপাত অনুযায়ী এমনকি পুরোপুরি নাজাত দিয়ে দিবেন্ আর সর্বপ্রথম যারা নাজাত পাবে তারা হলো সত্তরহাজার ব্যক্তি। তাদের না কোন হিসাব হবে আর না কোন আযাব। তাদের চেহারা পূর্ণিমার চাদের মত চমকাতে থাকবে। আর লোকেরা তাদের নিকটবর্তী হবে তারা হবে আসমানের চমকানো তারার মত। এমনকি আল্লাহর রহমতের সাথে তারা জান্নাতে পৌঁছে যাবে।– রিওয়ায়াত ২৬৭

শায়খ হালিমী (রহ) বলেন, পুলসীরাতের উপর দিয়ে চলা কঠিন বা সহজ হওয়া আনুগত্য ও গুনাহর ভিত্তিতে হবে।

সমুদ্র জাহান্নামের অংশ
হযরত আলী (রা) এক ইহুদীকে জিজ্ঞাসা করলেন, জাহান্নাম কোথায়? সে বললো সমুদ্রের নীচে। আলী ‎‎(রা) বললেন, সে সত্য বলেছে। অতঃপর তিনি তিলাওয়াত করেন-
وَالْبَحْرِ الْمَسْجُورِ
আর শপথ! উদ্বেলিত সমুদ্রের।–সূরা তূর ৬

জাহান্নাম অতিক্রম প্রসঙ্গে
হযরত ইবনে মাসউদ (রা) বর্ণনা করেন। রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেন-
يَرِدُ النَّاسُ النَّارَ، ثُمَّ يَصْدُرُونَ بِأَعْمَالِهِمْ
লোকেরা জাহান্নামে প্রবেশ (অতিকম) করবে অতঃপর তারা তাদের আমল অনুযায়ী বের হবে।

আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেন-
لَا يَمُوتُ لِمُسْلِمٍ ثَلَاثَةٌ مِنَ الْوَلَدِ فَيَلِجَ النَّارَ إِلَّا تَحِلَّةَ الْقَسَمِ
কোন মুসলমানের তিনটি বাচ্চা মারা গেলে সে কখনও জাহান্নামে প্রবেশ করবে না, তবে শপথ পূর্ণ করার জন্য।
অতঃপর বর্ণনাকারী সুফিয়ান (রহ) এই আয়াত তিলাওয়াত করেন-
وَإِنْ مِنْكُمْ إِلَّا وَارِدُهَا
তোমাদের মাঝে এমন কেউ নেই, যে তা (জাহান্নাম) অতিক্রম করবে না।– মারইয়াম ৭১

হযরত জাবির (রা) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেন- ভাল মন্দ সবাই তার মধ্যে প্রবেশ করবে তবে মুমীনদের জন্য তা ঠান্ডা ও শান্তিদায়ক হয়ে যাবে যেভাবে ইবরাহীম (আ) এর জন্য হয়েছিল। এমনকি জাহান্নাম ঠান্ডা শ্বাস নিবে। (আল্লাহ তাআলা বলেন-)
ثُمَّ نُنَجِّي الَّذِينَ اتَّقَوْا، وَنَذَرُ الظَّالِمِينَ فِيهَا جِثِيًّا
অতঃপর আমি মুত্তাকীদেরকে নাজাত দিব আর যালিমদেরকে হামাগুড়ি দিয়ে জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত অবস্থায় রেখে দিব। – [সূরা মারিইয়াম ৭২] রিওয়ায়াত ৩৭১

হযরত জাবির (রা) বর্ণনা করেন। রাসূলুল্লাহ (সা) হাফসা (রা)-কে বলেন গাছের নিচে বায়আত ‎গ্রহণকারীগণ জাহান্নামে প্রবেশ করবে না। তিনি বললেন, হ্যাঁ, আল্লাহর রাসূল! (কেন যাবে না?) তখন তিনি (সা) তাকে নিন্দাবাদ করলেন। হাফসা (রা) বললেন, আল্লাহ তাআলা বলেছেন-
وَإِنْ مِنْكُمْ إِلَّا وَارِدُهَا
তোমাদের মাঝে এমন কেউ নেই, যে তা (জাহান্নাম) অতিক্রম করবে না।– সূরা মারইয়াম ৭১
তখন নবী (সা) বললেন, আল্লাহ তাআলা বলেছেন-
ثُمَّ نُنَجِّي الَّذِينَ اتَّقَوْا، وَنَذَرُ الظَّالِمِينَ فِيهَا جِثِيًّا
অতঃপর আমি মুত্তাকীদেরকে নাজাত দিব আর যালিমদেরকে হামাগুড়ি দিয়ে জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত অবস্থায় রেখে দিব। – [সূরা মারিইয়াম ৭২] রিওয়ায়াত ৩৭১

কাব (রা) বলেন, কিয়ামতের দিন জাহান্নামকে নিয়ে আসা হবে আর তা যেন চর্বির মত (ভূমি)। যখন তার মধ্যে সমস্ত মাখলুকের পা আটকে যাবে তখন ঘোষণাকারী বলবে, হে জাহান্নাম! তোমার অধিবাসীদের নিয়ে যাও আর আমার (জান্নাতের) অধিবাসীদের ছেড়ে দাও। কাব (রা) বলেন, অতঃপর জাহান্নামীদেরকে ধ্বসিয়ে দেয়া হবে।- রিওয়ায়াত ৩৭৩

খালেদ ইবনে মাদান বলেন, যখন জান্নাতীরা জান্নাতে পৌঁছে যাবে তখন বলবে, হে আমাদের প্রতিপালক! আপনি তো ওয়াদা করেছিলেন যে, প্রত্যেককেই জাহান্নাম অতিক্রম করতে হবে। আল্লাহ তাআলা বলবেন হ্যাঁ দিয়েছিলাম। তোমরা তা অতিক্রম করে এসেছ। তখন তা জমাটবদ্ধ স্থির ছিল।

মুজাহিদ (রহ) আল্লাহ তাআলার বাণী
وَإِنْ مِنْكُمْ إِلَّا وَارِدُهَا
তোমাদের মাঝে এমন কেউ নেই, যে তা (জাহান্নাম) অতিক্রম করবে না।– মারইয়াম ৭১
প্রসঙ্গে বলেন- মুসলমানদের মধ্যে যার জ্বর আসে, সে (যেন) জাহান্নামের উপর দণ্ডায়মান হয়ে গেল। – রিওয়ায়াত ৩৭৪

ইয়ালা ইবনে মুনাব্বিহ থেকে বর্ণিত। রাসূলু্লাহ (সা) ইরশাদ করেন-
” إِنَّ النَّارَ تَقُولُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ: يَا مُؤْمِنُ جُزْ فَقَدْ أَطْفَأَ نُورُكَ لَهَبِي ”
নিশ্চয়ই জাহান্নাম কিয়ামতের দিন বলবে, হে মুমিন! দ্রুত পার হয়ে যাও, তোমার নূর ও জ্যোতি আমার আগুনের শিখা নিভিয়ে দিচ্ছে।– রিওয়ায়াত ৩৭৫
পৃ: ৩৩২ থেকে

চলবে

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

Back to top button
error: Content is protected !!