বিবাহের উপকারিতা ও কল্যাণ

মানব জীবনে বিবাহের উপকারিতা ও কল্যাণঃএকটি সমীক্ষা
ইসলামিক ফাউন্ডেশন পত্রিকা (ত্রৈমাসিক),
৪৬ বর্ষ ৩য় সংখ্যা, জানুয়ারী-মার্চ ২০০৭ ইং
[প্রবন্ধের ফুটনোট এ উল্লিখিত বিস্তারিত রেফারেন্সগুলো এখানে দেয়া হয়নি। তবে কিছু কিছু রেফারেন্স প্রবন্ধের সাথে উল্লেখ করা হয়েছে]

সূচনা
বিবাহ মানব জীবনে একজন নারী ও পুরুষের মধ্যে শরীঅতসম্মত পবিত্রতম বন্ধন। এ প্রসেঙ্গ আল কুরআনে বলা হয়েছে-
الَّذِي خَلَقَكُمْ مِنْ نَفْسٍ وَاحِدَةٍ وَخَلَقَ مِنْهَا زَوْجَهَا وَبَثَّ مِنْهُمَا رِجَالًا كَثِيرًا وَنِسَاءً
যিনি মানবজাতিকে এক ব্যক্তি (হযরত আদম) থেকে সৃষ্টি করেছেন; আর বিস্তার করেছেন তাদের থেকে অগণিত পুরুষ ও নারী।–সূরা নিসা ১
বিবাহ মানবজীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। সৃষ্টির সূচনালগ্নেই মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন পৃথিবীর প্রথম মানব মানবীর মাধ্যমে বিবাহের প্রচলন করেন। যা অদ্যাবধি মানব সমাজের প্রতিটি ধর্মেই নারী-পুরুষের মিলনের গ্রহণীয় এবং প্রশংসনীয় মাধ্যম হিসাবে প্রচলিত রয়েছে।–ড.ময়নুল হক, যৌতুক সমস্য ও তার সমাধান, ইফা পত্রিকা
বিবাহ নিছক একটি প্রথা (system), সামাজিকতা (formalities) বা জৈবিক চাহিদা পূর্ণ করার বৈধ অবলম্বন নয়, বরং এর সাথে জড়িয়ে আছে বহুবিধ উপকারিতা ও কল্যাণ- যা সমাজের চিন্তাশীল মানুষের মানসপটে (in the canvas of the mind) দিবালোকের ন্যায় সুস্পষ্ট।

মনোদৈহিক উপকারিতা
মানবজীবনে দেহ ও মনের সুস্থতার গুরুত্ব অপরিসীম। সুস্থতার জন্য একটির সাথে অপরটির নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। অর্থাৎ দেহ সুস্থ থাকলে যেমন মন সুস্থ থাকে তেমনি মন সুস্থ থাকলেও দেহ সুস্থ থাকে। দার্শনিক সক্রেটিস অবশ্য বলেছেন- দেহ সুস্থ হলেই মনও সুস্থ হবে আমি তা মনে করিনা, বরং আমার মতে সুস্থ মনই দৈহিক উৎকর্ষের সহায়ক।–প্লেটোর রিপাবলিক
রাসূলুল্লাহ (সা) এর হাদীস থেকেও এ কথার প্রমাণ পাওয়া যায়। তিনি ইরশাদ করেন- মনে রেখো! মানুষের শরীরে একটি গোশতপিণ্ড রয়েছে। এটি যখন ভাল থাকে তার গোটা শরীর ভাল থাকে আর এটা যদি নষ্ট হয়ে যায় তাহলে তার গোটা শরীর নষ্ট হয়ে যায়। মনে রেখো! ঐ মাংসপিণ্ডটাই হলো ক্বালব (হৃদয়)।- বুখারী
মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বিবাহের মাঝে এমন কল্যাণ রেখেছেন যে, এর মাধ্যমে নারী-পুরুষের দেহ-মন উভয়ই থাকে সুস্থ সবল। নিম্নে এ বিষয়ে আলোকপাত করা হলো-

মানসিক উপকারিতা
বিবাহের কারণে নারী ‍পুরুষের মন-মানসিকতা ও আচার-আচরণে আমূল পরিবর্তন সাধিত হয়। যারা বিবাহের পূর্বে উচ্ছৃঙ্খল, দায়িত্বহীন, স্বেচ্ছাচারী ও আরামপ্রিয় জীবন যাপনে অভ্যস্ত ছিল, এর ফলে তাদের জীবনে অলসতা, অকর্মণ্যতা ও দারিদ্রের অভিশাপ নেমে এসেছিল। বিবাহের পর তাদের মন-মানসিকতা ও আচার-আচরণের পরিবর্তন সাধিত হওয়ায় তাদের মধ্যে শিষ্টাচার, সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য, মিতব্যয়িতা, দায়িত্ব-কর্তব্যবোধ ও সুশৃঙ্খল জীবনযাপনের সু-অভ্যাস গড়ে উঠে। অপব্যায়, উচ্ছৃঙ্খল, অভদ্র জীবন যাপনের বদভ্যাস থেকে তারা পরিত্রাণ লাভ করে।–পারিবারিক সংকট নিরসনে ইসলাম
এতো হলো বাহ্যিক অবস্থা; আর অভ্যন্তরীন অবস্থা হল স্বামী-স্ত্রী পরস্পর পরস্পরের নিকট শান্তি স্বস্তি লাভ করে থাকে, ফলে মানসিক বিশ্রাম (relaxation) ও সক্রিয়তায় (activeness) পূর্ণতা আসে। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন-
هُوَ الَّذِي خَلَقَكُمْ مِنْ نَفْسٍ وَاحِدَةٍ وَجَعَلَ مِنْهَا زَوْجَهَا لِيَسْكُنَ إِلَيْهَا
তিনিই সে সত্তা যিনি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন একটিমাত্র সত্তা হতে। আর তার থেকেই তিনি তৈরি করেছেন তার জোড়া যাতে তার কাছে স্বস্তি পেতে পারে।–সূরা আরাফ ১৮৯
মহানবী (সা) যখন কাজ-কর্মে ও নিরবচ্ছিন্ন ইবাদতের কারণে দেহ-মনে ক্লান্ত হয়ে পড়তেন তখন তিনি হযরত আয়েশা (রা) এর নিকট গিয়ে তার সঙ্গে অন্তরঙ্গতায় ও কথোপকথনের মাধ্যমে নিজের দেহ-মনের অবসাদ দূর করে নিতেন- যেন একাগ্রতার সাথে তিনি তার দায়িত্ব পালন করতে পারেন।– কিমিয়ায়ে সাআদাত
রাসূল (সা) যখন হযরত আয়িশা (রা) এর ঘরে রাত কাটাতেন এবং শেষ রাতে ইবাদতের জন্য উঠে যেতেন। পরে হযরত আয়েশা (রা) এর ঘুম ভেঙ্গে গিয়ে যদি তাকে পাশে না পেতেন, তবে তিনি অত্যন্ত বিচলিত হয়ে পড়তেন এবং অন্ধকারেই রাসূল (সা)-কে খুঁজতে শুরু করতেন। যখন তাকে পেয়ে যেতেন তখন তার মনে পূর্ণ শান্তি ও স্বস্তি ফিরে আসত।-এ. এফ. এম আব্দুল মজীদ রুশদী, হযরত আয়েশা (রা)

দৈহিক উপকারিতা
আল্লাহ তাআলা নর নারীর মধ্যে যে জৈবিক চাহিদা প্রদান করেছেন তার যথাযথ সুস্থ প্রয়োগ ভাল স্বান্থের কারণ হয়, বহু প্রকারের রোগ থেকেও নিরাপদ থাকা যায়। প্রাচীন গ্রীক চিকিৎসক হাকীম জালিনূস বলেছেন- স্ত্রী-সহবাস স্বাস্থ রক্ষার এক বড় উপায় এবং বহু সংখ্যক রোগের প্রতিষেধক।– পরিবার ও পারিবারিক জীবন
প্রখ্যাত চিকিৎসা বিজ্ঞানী আল্লামা নাফিসী বলেন- স্ত্রী-সহবাস দেহের স্বাভাবিক উষ্ণতা বৃদ্ধি করে। দেহকে খাদ্য গ্রহণের উপযোগী করে, মনকে প্রফুল্ল করে, ক্রোধ দমন করে, কুচিন্তা দূর করে এবং শ্লৈষ্মিক রোগ উপশম করে। সহবাসত্যাগ স্বাস্থ্যের পক্ষে ক্ষতিকারক, যে ব্যক্তি স্ত্রী-সহবাস করেনা, বহু মারাত্মক রোগে সে আক্রান্ত হয়।– ইসলামের যৌন বিধান
এ প্রসঙ্গে বিখ্যাত দার্শনিক ও চিকিৎসা বিজ্ঞানী ইবনে সীনা বলেন- সহবাসআধিক্য* যেমন ক্ষতিকর অনুরুপ সহবাস পরিত্যাগ করাও ক্ষতিকর। সহবাস পরিত্যাগ করলে মাথা ঘোরা বা চক্কর দেয়া, চক্ষু কালবর্ণ ধারণ করা, শরীরে মেদ জমা, অন্ডকোষ ফুলে যাওয়া ইত্যাকার উপসর্গ দেখা দেয়।–আদাবে মুয়াশারাত
আবার সহবাস আরম্ভ করে দিলেই এসব অসুবিধা দূর হয়ে যায়।– ইউনানী চিকিৎসা বিজ্ঞানের মূলনীতি
*[অথিক সহবাস স্বাস্থ্যের পক্ষে ক্ষতিকর, অতিরিক্ত রতিক্রিয়া শক্তি ক্ষয় করে, স্নায়ুর ক্ষতি করে, ফলে হাত-পা কাঁপুনি, অর্ধাঙ্গ ও খিঁচুনি রোগ সৃষ্টি হয় এবং দৃষ্টিশক্তি হ্রাস পায়।–(আল্লামা নাফিসী)- ইসলামের যৌন বিধান]
এখানে বলা বাহুল্য যে, ইসলামে বিবাহ ব্যতীত নারী-পুরুষের যৌন কামনা চরিতার্থ করার কোন সুযোগ নেই। ইসলামী শরীআত ব্যভিচারকে হারাম সাব্যস্ত করেই ক্ষান্ত হয়নি বরং এর ঐহিক (worldly) ও পারত্রিক (spiritual) ক্ষতিসমূহকেও তুলে ধরেছে- যেন মানুষ অন্তত এর ক্ষতি থেকে বাঁচার জন্য এই অশ্লিল কর্ম থেকে বিরত থাকে।
এক হাদীসে রাসূল (সা) ইরশাদ করেছেন- দুটি অপরাধ এমন রয়েছে যার শাস্তি আল্লাহপাক দুনিয়াতেই দ্রুত প্র্রদান করে থাকেন (তাহল) ব্যভিচার ও পিতা-মাতার অবাধ্যতা।– তাবরানী
আর পরকালে কঠিন শাস্তির ঘোষণাতো রয়েছেই। ব্যভিচার দ্বারা নারী-পুরষের মধ্যে কোন স্থায়ী সম্পর্ক গড়ে উঠেনা। ভালবাসা ও প্রীতির সম্পর্কের জন্য বিবাহবন্ধন অবশ্যম্ভাবী।– ইসলামের দৃষ্টিতে অপরাধ

পারিবারিক কল্যাণ
ইসলামী আইন ও রীতি অনুযায়ী পরিবার হচ্ছে স্বামী-স্ত্রীকে নিয়ে গঠিত এক সামাজিক কোষ। আবার একত্রে বসবাস করে এমন একটি দলকেও পরিবার বলে, যারা পরস্পর বৈবাহিক সূত্রে বা রক্তসম্পর্কিয় আত্মীয়।– ইসলাম ও মানবাধিকার
বিবাহের মাধ্যমে পারিবারিক জীবনে আসে শান্তি, শৃঙ্খলা। ঘর-গৃহস্থালী থেকে শুরু করে পারিবারিক সব কাজ-কর্মে পরস্পর সহযোগিতার মাধ্যমে পারিবারিক কাজ–কর্ম হয় সৃশৃঙ্খল ও সহজসাধ্য। মহানবী (সা) নিজেও পরিবারের সবার সাথে মিলেমিশে ঘরের কাজ-কর্ম করতেন। তাছাড়া কোন কোন পরিবারে স্বামীর পাশাপাশি স্ত্রীও উপার্জন করে পরিবারের অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে যথেষ্ট অবদান রাখছে। এর ফলে পরিবারে কাজের হাত বৃদ্ধি পাওয়ায় উপার্জন বৃদ্ধি পেয়ে পরিবারে স্বাচ্ছন্দ্য ও আনন্দের মধুময় পরিবেশ গড়ে উঠে।– পারিবারিক সংকট নিরসনে ইসলাম
কোন কোন পরিবারের স্ত্রীগণ একাই পরিবারের হাল ধরে রেখেছেন বৈধ উপার্জনের মাধ্যমে। যদিও স্বামীর ঘরে অর্থ যোগানদানে কোন স্ত্রী (ইসলামী আইনমতে) বাধ্য নয়, তথাপি তাদের এই উদারতা, সহমর্মিতা, স্বামী, সন্তান ও পরিবারের প্রতি ভালবাসার অপূর্ব দৃষ্টান্ত এবং আল্লাহর তরফ থেকে প্রতিদান প্রাপ্য।- পরিবার ও পারিবারিক জীবন
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা) এর স্ত্রী ঘরে বসে শিল্প কর্ম করে তা বিক্রি সংসারে খরচাদি চালাতেন। একদিন তিনি রাসূল (সা) এর খিদমতে হাযির হয়ে বললেন, আমি শিল্পকর্মে দক্ষ একজন নারী। আমি বিভিন্ন দ্রব্যসামগ্রী তৈরি করে বিক্রি করি। আমার স্বামী ও সন্তানদের (আয়ের কোন উৎস) কিছুই নেই। সুতরাং আমি কি তাদের জন্য ব্যয় করতে পারি? নবী (সা) বললেন, হ্যাঁ তুমি তাদের জন্য ব্যয় করতে পার। এজন্য তুমি আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রতিদান লাভ করবে।–তাবাকাত ইবনে সাদ
পরিবার-পরিজনের জন্য যা ব্যয় করা হয় তার সওয়াব হয় সবচেয়ে বেশী। রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেন- দীনার (টাকা-পয়সা অর্থে) চার প্রকার- ১.কিছু দীনার তুমি আল্লাহর পথে খরচ কর। ২. কিছু দীনার মিসকীনদের দান কর। ৩.কিছু দীনার গোলাম মুক্ত করার ক্ষেত্রে দান কর। ৪.কিছু দীনার পরিবার-পরিজনের জন্য খরচ কর। তবে পরিবার-পরজিনের জন্য যে দীনার ব্যয় করবে, তার সওয়াব অনেক বেশী।- মুসলিম

অর্থনৈতিক কল্যাণ
যারা মনে করে বিবাহ-শাদী, পরিবার-পরিজন ও সন্তান-সন্ততি- অভাব-অনটন, সমস্য-সংকট ও দুর্ভাগ্যের অন্যতম কারণ, তাদের এই ভ্রান্ত ধারণা কুরআন ও হাদীসে বিবাহের উৎসাহ ও ফযীলতের বর্ণনা দ্বারা অপনোদন হয়ে যায়।–পারিবারিক সংকট নিরসনে ইসলাম
আল্লাহ তাআলা কুরআনুল কারীমে ইরশাদ করেন-
وَأَنْكِحُوا الْأَيَامَى مِنْكُمْ وَالصَّالِحِينَ مِنْ عِبَادِكُمْ وَإِمَائِكُمْ إِنْ يَكُونُوا فُقَرَاءَ يُغْنِهِمُ اللَّهُ مِنْ فَضْلِهِ وَاللَّهُ وَاسِعٌ عَلِيمٌ
তোমাদের মধ্যে যারা বিবাহহীন, তাদের বিবাবহ সম্পাদন করে দাও এবং তোমাদের দাস ও দাসীদের মধ্যে যারা সৎকর্মপরায়ণ তাদেরও, তারা যদি নিঃস্ব হয় তবে আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে তাদেরকে সচ্ছল করে দিবেন। আল্লাহ প্রাচুর্যময় সর্বজ্ঞ।–সূরা নূর৩২
উল্লিখিত আয়াতে বিবাহহীন বলতে কুমার-কুমারী, বিধবা-বিপত্নিক, বিবাহ-বিচ্ছেদ হয়েছে এমন নারী পুরুষ যাদের বিবাহ বর্তমান নেই, এমন সবাইকে বোঝানো হয়েছে। এমন নর ও নারীর বিবাহ সম্পাদনের জন্য তাদের অভিভাবকদের আদেশ করা হয়েছে।–মাআরেফুল কুরআন
সাথে সাথে এ কথাও বলা হয়েছে যে, তারা যদি নিঃস্ব হয় তবে আল্লাহ স্বীয় অপার করুণায় তাদেরকে ধনাঢ্যতা দান করবেন। সুতরাং দরিদ্র হওয়ার কারণে তাদের বিবাহ সম্পাদনে যেন কোন প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা না হয়।–ড. গোলাম মওলা, বিবাহে উদ্বুদ্ধুকরণ… ইফা পত্রিকা
তারা যদি নিঃস্ব হয় .. এ আয়াত প্রসঙ্গে মুহাম্মদ আলী আস-সাবুনী বলেন- আমি মনে করি এ আয়াতের বক্তব্যের উদ্দেশ্য হলো কোন মেয়ের অভিভাবক-এর নিকট যদি মেয়ের বিবাহের ব্যাপারে একজন সচ্চরিত্রবান, নেক আখলাক যুবক প্রস্তাব দেয়, তবে শুধুমাত্র দারিদ্রতার কারণে তার প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যান করা তাদের উচিত হবে না।*
*(এ প্রসঙ্গে হাদীস শরীফে ইরশাদ হয়েছে- যখন তোমাদের নিকট এমন লোক বিবাহের প্রস্তাব দেয় যার দীনদারী ও চরিত্র তোমরা পছন্দ কর তখন তার সাথে বিবাহ দাও। যদি তা না কর তবে পৃথিবীতে ব্যাপক বিপর্যয় সৃষ্টি হবে।–তিরমিযী)
কেননা ধন-সম্পদ নিতান্তই ক্ষণস্থাযী বস্তু। আল্লাহ তাআলা স্বীয় অনুগ্রহে যাকে ইচ্ছা ধনাঢ্যতা দান করতে পারেন। এমনিভাবে শুধুমাত্র অধিক ধন-সম্পদ কিংবা সচ্ছলতার অপেক্ষায় কোন যুবকের বিবাহে বিলম্ব করা উচিত নয়; বরং স্বল্পরুযী হলেও আল্লাহ তাআলার উপর ভরসা করে দ্রুত বিবাহ করা উচিত। কেননা বিবাহ মানুষের কল্যাণের কারণ হয়ে থাকে।–রওয়াইউল বয়ান
বিবাহ মানব জীবনে বহুবিধ উপকারিতা ও কল্যাণ নিয়ে আসে, তার মধ্যে সচ্ছলতা একটি। এ জন্যই রাসূল (সা) এর নিকট এক ব্যক্তি তার অভাব-অনটন ও দারিদ্রতার অভিযোগ পেশ করলে তিনি তাকে বিবাহ করার পরামর্শ দেন।–রূহুল মাআনী
বিশিষ্ট সাহাবী হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা) বলেন- তোমরা যদি ধনী হতে চাও তবে বিবাহ কর, কেননা আল্লাহ তাআলা বলেছেন- ‘তারা যদি নিঃস্ব হয় তবে আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে তাদেরকে সচ্ছল করে দেবেন।’–ইবনে কাসীর
তবে বিবোহের মাধ্যমে এ বরকত লাভ করার জন্য আন্তরিক নিয়ত থাকা শর্ত। তাফসীরে মাআরিফুল কুরআনে তাফসীরে মাযহারীর বরাতে বলা হয়েছে যে, স্মর্তব্য যে, বিবাহের কারণে আল্লাহ তাআলা পক্ষ থেকে দনাঢ্যতা দান করার ওয়াদা তখন, যখন পবিত্রতা সংরক্ষণ ও সুন্নত পালনের নিয়তে বিবাহ করা হয় অতঃপর আল্লাহর উপর তাওয়াকুকুল ও ভরসা করা হয়।–মাআরিফুল কুরআন

বিভ্রান্তির অপনোদন: প্রসঙ্গ যৌতুক
বিবাহের বরকতে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ধন-সম্পদ দানের ওয়াদা করেছেন। এখন কোন ব্যক্তি যদি বিবাহের সময় পণ (যৌতুক) নির্ধারণকরত এ ধন-সম্পদ লাভ করার চেষ্টা করেন, আর মনে করেন এটাই আল্লাহর ওয়াদা, তবে তা হবে আল্লাহর বাণীর বিকৃতি সাধনের নামান্তর। যৌতুক গ্রহণ ইসলামের দৃষ্টিতে অবৈধ এবং তা পাত্রপক্ষের আত্মমর্যাদার পরিপন্থী চিন্তা।– যৌতুক সমস্যা ও তার সমাধান এবং পথহারা উম্মতের পথনির্দেশ
তবে উপহার বিনিময় বৈধ। আর তা বিবাহের সময়ই হতে হবে এমন কোন বাধ্য-বাধকতা নেই বরং তা সাধারণ ও সবার জন্য উন্মুক্ত। হাদীস শরীফের ভাষ্য অনুযায়ী উপহার বিনিময় হিংসা-বিদ্বেষ, শত্রুতা দূর করে হৃদয়ে পরস্পর পরস্পরের প্রতি ভালবাসা সৃষ্টি করে দেয়।
তাই কোন দাবী দাওয়া ব্যতীত স্বেচ্ছায় যদি কোন উপহার উপঢৌকন দেওয়া হয় তবে তা গ্রহণে বাধা নেই। এক্ষত্রে শর্ত হল কোনভাবেই না চাওয়া কিংবা তা পাওয়ার জন্য মনে মনে আকাঙ্ক্ষা পোষণ না করা। যেমন রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেন-‘কোন তদবীর তদারকী ছাড়া আপনা থেকে তোমার কাছে যা আসে তা নাও। তা না হলে তার পেছনে মনকে লাগিয়ে রেখ না।’– পথহারা উম্মতের পথনির্দেশ
তবে উপহার উপঢৌকন পাওয়ার ব্যাপারে পাত্রিই অগ্রাধিকারযোগ্য। হযরত আয়েশা (রা) থেকে বর্ণিত হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেন- স্ত্রীর যৌনাঙ্গের (সম্মানের) বিনিময়ে যে মহর প্রদান করা হয় তা তার প্রাপ্য। আর বিবাহের আকদ (বিবাহ-বন্ধন) সম্পন্ন হওয়ার পর স্ত্রীর পিতা, ভাই কিংবা অভিভাবক সম্মান স্বরুপ যা দিয়ে থাকেন তা (বর বা কনে) যাকে দেওয়া হয় সেটা তার প্রাপ্য। সবচেয়ে অগ্রাধিকার বিষয় হলো ব্যক্তি (অভিভাবক) তার মেয়ে বা ভগ্নিকে সম্মানিত করবে।–মুসনাদ আহমদ

স্বামী-স্ত্রীর মহব্বত ও বন্ধুত্ব
বিবাহ আজীবনের প্রীতিবন্ধন, সাময়িক প্রেম নিবেদন নয়। প্রেমের আদান-প্রদান মানুষের স্বভাবজাত বিষয়। ভালবাসার জন্য স্বামী-স্ত্রীর চেয়ে অধিক উপযোগী আর কেউ নেই। তাই স্বভাবধর্ম ইসলাম বিবাহের মাধ্যমে এস্বভাবজাত বিষয়ের আদান-প্রদানের ব্যবস্থা করেছে, যা সবধরণের পঙ্কিলতা থেকে মুক্ত এবং কল্যাণকর। বিবাহের পর স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে পরস্পর পরস্পরের প্রতি সহানুভূতি, সহমর্মিতা ও প্রগাঢ় ভালবাসা জন্ম নেয়। আর তা হয় আল্লাহর পক্ষ থেকে।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন-
وَمِنْ آَيَاتِهِ أَنْ خَلَقَ لَكُمْ مِنْ أَنْفُسِكُمْ أَزْوَاجًا لِتَسْكُنُوا إِلَيْهَا وَجَعَلَ بَيْنَكُمْ مَوَدَّةً وَرَحْمَةً إِنَّ فِي ذَلِكَ لَآَيَاتٍ لِقَوْمٍ يَتَفَكَّرُونَ
(আল্লাহর নিদর্শনাবলীর মধ্যে) আর এক নিদর্শন এই যে, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য থেকে তোমাদের সঙ্গীনিদের সৃষ্টি করেছেন। যাতে তোমরা তাদের কাছে শান্তিতে থাক এবং তিনি তোমাদের পারস্পরিক সম্প্রীতি ও দয়া সৃষ্টি করেছেন। নিশ্চয়ই এতে চিন্তাশীল লোকদের জন্য নিদর্শনাবলী রয়েছে। – সূরা রূম ২১
আর আল্লাহপ্রদত্ত এ ভালবাসার অন্যতম উপকারিতা এই যে, স্বামী-স্ত্রীর কারো মনে যদি অন্য কারো প্রতি বিবাহ পূর্ব প্রণয়াসক্তি থেকে থাকে তবে তার দূর হয়ে যায়। এ প্রসঙ্গে একটি প্রচলিত আরবী প্রবাদ হলো-
“বিবাহ পূর্ব-প্রেমের ভিত্তি ধসিয়ে দেয়।”- ইসলামের যৌন বিধান
স্বামী-স্ত্রী পরস্পর যখন পরস্পরের প্রতি প্রেমপূর্ণ দৃষ্টিপাত করে, তখন তাদের প্রতি মহান আল্লাহ বিশেষ রহমতের দৃষ্টি দেন। হাদীস শরীফে আছে- স্বামী-স্ত্রী পরস্পর যে প্রেমালাপ, হাসি-ঠাট্টা ও বৈধ ভোগ-উপভোগ করে তার জন্যও তারা সওয়াব প্রাপ্ত হন। যা নফল ইবাদতে রচেয়েও কম নয়।–বেহশতী জেওর
একজন আদর্শ স্বামী বা স্ত্রীকে নির্দ্বিধায় একজন খাটি বন্ধু বলা যায়। হযরত আলী (রা) খাটি বা প্রকৃত বন্ধুর পরিচয় দিয়েছেন এভাবেঃ
“সে-ই তোমার প্রকৃত বন্ধু, যে সর্বদা তোমাকে ছায়ার ন্যায় অনুসরণ করে
এবং তার নিজের ক্ষতির বিনিময়ে তোমার উপকার করিয়া থাকে,
আর যখন তোমাকে বিপদ-আপদসমূহ ছিন্ন ভিন্ন করিয়া ফেলে,
তখন সে তোমাকে একত্রিত করার জন্য নিজেই টুকরা টুকরা হইয়া হইয়া যায়।”–
ইমাম গাযালী (রহ),আল মুরশিদুল আমীন
বলা বাহুল্য যে, আদর্শ স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে এরকম খাটি বন্ধুত্ব পরিলক্ষতি হয়, যারা পরস্পর পরস্পরের প্রতি সর্বদাই নিবেদিত প্রাণ। প্রকৃত বন্ধুত্বের দাবী হলো বন্ধুকে মন্দ বিষয়সমূহ থেকে ফিরিয়ে রাখা এবং ভাল বিষয়ের দিকে উদ্বুদ্ধ করা ও ভালকাজে সাহায্য সহযোগিতা করা।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন-
وَتَعَاوَنُوا عَلَى الْبِرِّ وَالتَّقْوَى وَلَا تَعَاوَنُوا عَلَى الْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ
সৎকর্ম ও খোদাভীতিতে (তামরা) একে অন্যের সাহায্য কর। পাপ ও সীমালঙ্ঘনের ব্যাপারে একে অন্যের সহায়তা করোনা।–সূরা মায়িদা ২
স্বামী স্ত্রী যখন পরস্পর পরস্পরকে সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজে নিষেধ করেন, তখন তাদের প্রতি আল্লাহর রহমতের বারিধারা বর্ষিত হয়। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন-
وَالْمُؤْمِنُونَ وَالْمُؤْمِنَاتُ بَعْضُهُمْ أَوْلِيَاءُ بَعْضٍ يَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَيَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنْكَرِ وَيُقِيمُونَ الصَّلَاةَ وَيُؤْتُونَ الزَّكَاةَ وَيُطِيعُونَ اللَّهَ وَرَسُولَهُ أُولَئِكَ سَيَرْحَمُهُمُ اللَّهُ إِنَّ اللَّهَ عَزِيزٌ حَكِيمٌ
ইমানদার পুরুষ ও ইমানদার নারী একে অপরের সহাযক (বন্ধু), তারা (পরস্পরকে) ভাল কথার শিক্ষা দেয় এবং মন্দ (বিষয়) থেকে বিরত রাখে। নামায প্রতিষ্ঠা করে, যাকাত দেয় এবং আল্লাহ ও রাসূলের নির্দেশ অনুযায়ী জীবন যাপন করে। এদরই উপর আল্লাহ তাআলা দয়া করবেন। নিশ্চয়ই আল্লহ পরাক্রমশালী, সুকৌশলী।– সূরা তাওবা ৭১
রাসূল (সা) ইরশাদ করেন- আল্লাহ ঐব্যক্তির উপর রহমত বর্ষণ করেন, যে রাত্রে ঘুম থেকে উঠে নামায পড়ে এবং স্ত্রীকে ঘুম থেকে জাগ্রত করে। যদি সে উঠতে না চায় তাহলে তার চেহারায় পানি ছিটা দেয়। আল্লাহ ঐ মহীলার উপর রহমত বর্ষণ করেন, যে রাত্রে ঘুম থেকে উঠে নামায পড়ে এবং তার স্বামীকে ঘুম থেকে জাগায়। যদি সে উঠতে না চায় তাহলে তার চেহারায় পানি ছিটা দেয়।– আবু দাউদ

সন্তান-সন্ততি
সব স্বামী-স্ত্রীই চায় যে তাদের কোল আলো করে একটি সন্তান আগমন করুক। স্বামী-স্ত্রীর পরস্পরের গভীর ভালবাসার আদর্শ ফসল হয়ে উঠুক সন্তান। হৃদয় ও চোখ জুড়িয়ে যাক সন্তানের দর্শনে। আল কুরআনে বিষয়টি এভাবে ব্যক্ত হয়েছে
وَالَّذِينَ يَقُولُونَ رَبَّنَا هَبْ لَنَا مِنْ أَزْوَاجِنَا وَذُرِّيَّاتِنَا قُرَّةَ أَعْيُنٍ وَاجْعَلْنَا لِلْمُتَّقِينَ إِمَامًا
এবং যারা বলে, হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের জন্য এমন স্ত্রী ও সন্তান-সন্ততি দান কর যারা হবে আমাদের জন্য নয়ন প্রীতিকর।–সূরা ফুরকান ৭৪
আল্লাহ তাআলা সন্তান-সন্ততির মাঝে অনেক কল্যাণ রেখেছেন। এক হাদীসে ইরশাদ হয়েছে- ‘তোমাদের দুর্বল শ্রেণীর জন্যেই আল্লাহর পক্ষ থেকে তোমাদেরকে সাহায্য করা হয় এবং তোমাদের রিযিক দেওয়া হয়।‘ এতে জানা গেল যে, পরিবার-পরিজনের ভরণ-পোষণকারী পিতা-মাতা যা কিছু পায়, তা দুর্বলচিত্ত নারী ও শিশু সন্তানের ওসীলাতেই পায়।–মাআরেফুল কুরআন
পিতা-মাতার জীবদ্দশায় কোন শিশু সন্তানের মৃত্যু হলে, কিয়ামতের দিন সে সন্তান পিতা-মাতার মুক্তির কারণ হবে। আবার পিতা-মাতার মৃত্যুর পর যখন আমলনামা বন্ধ হয়ে যায়, তখন সন্তানের দোয়া ও নেক আমলের সওয়াব তারা পেতে থাকে। যার মাধ্যমে তাদের অশেষ কল্যাণ লাভ হয়।
এছাড়া দৈনন্দিন কাজ-কর্মে, সুখে-দুঃখে, অসুখে-বিসুখে, সমস্যা-সংকটেও সন্তান-সন্ততি পিতা-মাতাকে সাহায্য-সহযোগিতা করে থাকে। অবশ্য কারো সন্তান হওয়া না হওয়া আল্লাহর ইচ্ছার উপর নির্ভর করে। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন-
يَهَبُ لِمَنْ يَشَاءُ إِنَاثًا وَيَهَبُ لِمَنْ يَشَاءُ الذُّكُورَ أَوْ يُزَوِّجُهُمْ ذُكْرَانًا وَإِنَاثًا وَيَجْعَلُ مَنْ يَشَاءُ عَقِيمًا إِنَّهُ عَلِيمٌ قَدِيرٌ
তিনি যাকে ইচ্ছা কন্যা সন্তান দান করেন এবং যাকে ইচ্ছা পুত্র সন্তান দান করেন অথবা দান করেন পুত্র ও কণ্যা উভয়ই এবং যাকে ইচ্ছা করে দেন বন্ধ্যা। তিনি সর্বজ্ঞ সর্বশক্তিমান।–সূরা শূরা ৪৯-৫০
সন্তান-সন্ততি আল্লাহর দেওয়া বিরাট বড় নিয়ামত। আর তাই সন্তান-সন্ততিকে কুরআন ও সুন্নাহর আদর্শে গড়ে তোলা প্রত্যেক পিতা-মাতার অপরিহার্য দায়িত্ব, যেন সন্তান-সন্ততি উভয় জগতেই কল্যাণ বয়ে আনে। সন্তান ছেলে হোক কি মেয়ে, ইসলামের দৃষ্টিতে মানুষ হিসেবে নারী-পুরুষের কোন ভেদাভেদ নেই। ইসলাম নারীকে খাটো করে পুরুষকে প্রাধান্য দেয়নি। বরং নারী ও পুরুষের ন্যায্য অধিকার সুপ্রতিষ্ঠিত করেছে।–ইসলামে নারী পুরুষের সমঅধিকার
পিতা-মাতা সন্তান-সন্ততিকে নিজেদের সাধ্যমত ভালভাবে প্রতিপালন করলে তার জন্য উত্তম প্রতিদান পাবে। বিশেষত কন্যা সন্তানকে। হযরত আনাস ইবনে মালিক (রা) থেকে বর্ণিত হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি বাজার থেকে তার ছেলে সন্তানের জন্য নতুন সুস্বাদু কোন খাবার কিনে নিয়ে গেল, সে যেন সদকার কোন জিনিস নিয়ে দান করল (অর্থাৎ সদকার সওয়াব পেল)। প্রথমে কন্যাদের খাওয়ানো উচিত। কারণ আল্লাহ তাআলা কন্যাদের প্রতি নরম আচরণ করেন। যেব্যক্তি কন্যাদের সাথে নরম আচরণ করল, সে যেন আল্লাহর ভয়ে কাঁদল। আর যে আল্লাহর ভয়ে কাঁদবে আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দিবেন। যে কন্যাদের আনন্দিত করবে, আল্লাহ তাকে দুঃখের দিন আনন্দিত করবেন।–তাম্বীহুল গাফিলীন

গোনাহ থেকে নিরাপত্তা
বিবাহের সাহায্যে মানুষ নিজের দীন-ইমানকে হেফাযত এবং শয়তানের প্রধান অস্ত্র কাম প্রবৃত্তির উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারে। রাসূল (সা) ইরশাদ করেন, যখন বান্দা বিয়ে করল নিশ্চয়ই সে তার দীনের অর্ধেক পূর্ণ করল। (এখন থেকে) বাকী অর্ধেক সম্পর্কে আল্লাহকে ভয় করবে।– বায়হাকী
আল্লাহ তাআলা কুরআনুল কারীমে স্বামী-স্ত্রীকে এক অপরের পোষাক বলে উল্লেখ করেছেন।-(সূরা বাকারা ১৮৭) অর্থাৎ পোষাক-পরিচ্ছদের মাধ্যমে যেমন অপরের দৃষ্টি থেকে নিজের সতর রক্ষা করা হয় তেমনি স্বামী-স্ত্রীও পরস্পরের মাধ্যমে নিজেদেরকে অবৈধ ও গোনাহর কাজ থেকে বিরত রাখতে সক্ষম হয়।
যে ব্যক্তি বিবাহ করেনি সে নিজেকে অপকর্ম হতে রক্ষা করতে পারলেও অধিকাংশ সময় নিজের চোখকে কুদৃষ্টি থেকে এবং অন্তরকে বাজে চিন্তা থেকে রক্ষা করতে পারেনা।–কিমিয়া সাআদাত
আর এ থেকেও বেঁচে থাকা বিশেষ জরুরী। কারণ ব্যভিচার কেবল যৌনাঙ্গের সাথেই সংশ্লিষ্ট নয়, বরং যৌনাঙ্গ ছাড়াও কুদৃষ্টি ও অন্যান্য তৎপড়তার সাথেও এর সম্পর্ক রয়েছে। এক্ষেত্রে দৃষ্টিপাতই প্রথম ও প্রধান ভূমিকা পালন করে। ফিকাহ শাস্ত্রের বিধানমতে হারাম কাজের ভূমিকাও হারাম। সুতরাং চোখের হিফাযত করা অত্যন্ত জরুরী।–পথহারা উম্মতরে পথনির্দেশ
আল্লাহ তাঅঅলা নারী পুরুষ উভয়কেই তাদের দৃষ্টি সংযত রাখার নির্দেশ দিয়ে বলেন,
قُلْ لِلْمُؤْمِنِينَ يَغُضُّوا مِنْ أَبْصَارِهِمْ وَيَحْفَظُوا فُرُوجَهُمْ ذَلِكَ أَزْكَى لَهُمْ إِنَّ اللَّهَ خَبِيرٌ بِمَا يَصْنَعُونَ وَقُلْ لِلْمُؤْمِنَاتِ يَغْضُضْنَ مِنْ أَبْصَارِهِنَّ وَيَحْفَظْنَ فُرُوجَهُنَّ وَلَا يُبْدِينَ زِينَتَهُنَّ إِلَّا مَا ظَهَرَ مِنْهَا وَلْيَضْرِبْنَ بِخُمُرِهِنَّ عَلَى جُيُوبِهِنَّ
মুমিনদেরকে বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি নত রাখে এবং তাদের যৌনাঙ্গের হিফাযত করে, এত তাদের জন্য খুব পবিত্রতা আছে। নিশ্চয়ই তারা যা করে আল্লাহ তা অবহিত আছেন। ইমানদার নারীদেরকে বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে নত রাখে এবং তাদের যৌন অঙ্গের হিফাযত করে, তারা যেন যা সাধারণত প্রকাশমান তা ছাড়া তাদরে সৌন্দর্য প্রদর্শন না করে এব তারা যেন তাদের ওড়না বক্ষদেশে ফেলে (ঢেকে) রাখে। – ‍সূরা নূর ৩০-৩১
আর চোখের হিফাযত করতে পারলেই মনের হিফাযত করা সহজ হয়ে যায়। কারণ দৃষ্টিপাত এমন একটি বিষয় যা বিভিন্ন অনাকাঙ্ক্ষিত কাজে প্রেরণা ও উৎসাহ যুগায়। দৃষ্টিপাতই সকল ফিতনা ও দুর্দশার উৎস।–নারী-পুরষ পরস্পরের প্রতি দৃষ্টিপাতের ইসলামী বিধান, ইফা পত্রিকা; মিনহাজুল আবিদীন, ইমাম গাযালী (রহ)
যারা নিজেদের দৃষ্টিকে সংযত রাখবে তাদেরকে আল্লাহ তাআলা সুদৃঢ় ইমান দান করবেন। রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেন- আল্লাহ তাআলা বলেছেন, দৃষ্টিপাত শয়তানে একটি বিষাক্ত শর (তীর)। যে ব্যক্তি মনের চাহিদা সত্বেও দৃষ্টি ফিরিয়ে নেয় আমি তার পরিবর্তে তাকে সুদৃঢ় ইমান দান করব, যার মিষ্টতা সে অন্তরে অনুভব করবে। -তাবরানী
বিবাহের মাধ্যমে সহজেই দৃষ্টিকে সংযত ও লজ্জাস্থানকে হিফাযত করা যায় এবং এর ফলে অন্তরও হয় নির্মল ও পবিত্র এবং সুদৃঢ় ইমানের অধিকারী। রাসূল (সা) ইরশাদ করেন- হে যুব সম্প্রদায়! তোমাদের মধ্যে যারাই স্ত্রীর অধিকার আদায়ে সমর্থ রাখো। তারা অবশ্যই বিয়ে করবে। কেননা এর মাধ্যমে দৃষ্টিকে সংযত ও লজ্জাস্থানকে হিফাযত করা যায়। – বুখারী

সুন্নতের অনুসরণ ও আল্লাহর সন্তুষ্টি
বিবাহের মাধ্যমে রাসূল (সা) এর সুন্নতের অনুসরণ করা হয়। রাসূল (সা) ইরশাদ করেছেন- যে ব্যক্তি আমার স্বভাব পছন্দ করে সে যেন আমার সুন্নত ধারণ করে আর আমার একটি সুন্নত হলো বিবাহ। -আহকামুল কুরআন আল জাসসাস
বিবাহের মাধ্যমে মানুষ নিজের স্বাভাব চরিত্রকে সংশোধন ও নিজেকে অনেক গুনাহ থেকে বিরত রাখতে সক্ষম হয়, ফলে তাকওয়া অর্জন হয় সহজসাধ্য। আর মুত্তাকীদের জন্য রয়েছে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও উত্তম প্রতিদান। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন-
لِلَّذِينَ اتَّقَوْا عِنْدَ رَبِّهِمْ جَنَّاتٌ تَجْرِي مِنْ تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ خَالِدِينَ فِيهَا وَأَزْوَاجٌ مُطَهَّرَةٌ وَرِضْوَانٌ مِنَ اللَّهِ
যারা পরহেযগার (মুত্তাকী), আল্লাহর নিকট তার জন্য রয়েছে বেহেশত। যার তলদেশে প্রস্রবণ প্রবাহিত, তারা সেখানে থাকবে অনন্তকাল। আর রয়েছে পরিচ্ছন্ন সঙ্গীনিগণ এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি।–সূরা আল ইমরান ১৫
জরুরী জ্ঞাতব্য
উপরে বিবাহের যে উপকারী দিকগুলো তুলে ধরা হলো, তার অর্থ এই নয় যে, এ আলোচনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে ও বিবাহের উপকারী দিকের প্রতি লক্ষ্য করে কোন ব্যক্তি তার ব্যক্তিগত ও পারিবারিক অবস্থা, পরিবেশের চাহিদা, উপার্জন ক্ষমতা ইত্যাদি জরুরী বিষয়গুলোর প্রতি দৃষ্টি না দিয়েই বিবাহের জন্য প্রস্তুত হয়ে যাবে, তবে তা হবে সুস্পষ্ট বিভ্রান্তি ও নির্বুদ্ধিতার কাজ।– পারিবারিক সংকট নিরসনে ইসলাম
বিবাহের জন্য প্রয়োজনীয় সামর্থ্য থাকা অপরিহার্য। যারা বিবাহের সামর্থ্য রাখেনা তাদেরকে আল্লাহ তাআলা পবিত্রতা ও ধৈর্য সহকারে অপেক্ষা করার নির্দেশ দিয়ে বলেন,
وَلْيَسْتَعْفِفِ الَّذِينَ لَا يَجِدُونَ نِكَاحًا حَتَّى يُغْنِيَهُمُ اللَّهُ مِنْ فَضْلِهِ
যারা বিবাহে সমর্থ নয় তারা যেন সংযম অবলম্বন করে, যে পর্যন্ত না আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে তাদেরকে অভাবমুক্ত করে দেন।– সূরানূর৩৩
এ ব্যাপারে হাদীস শরীফে রোযা রাখার উপশে দেওয়া হয়েছে। রাসূল (সা) ইরশাদ করেন- আর যে যুবক বিয়ে করতে অসমর্থ হবে, তার রোযা রাখা উচিত, কেননা এ রোযাই তার ঢাল স্বরুপ হবে। – বুখারী

বিবাহের হুকুম
এ পর্যায়ে বিবাহের হুকুম (ফরয ওয়াজীব নির্ধারণ) তুলে ধরাটা প্রাসঙ্গিক হবে। ফলে একজন ব্যক্তি তার অবস্থা সম্পর্কে সুসস্পষ্ট ধারণা লাভ করতে পারবে। নিম্নে বিবাহের হুকুকম তুলে ধরা হলো-
অবস্থাভেদে বিবাহের হুকুম বিভিন্ন হয়ে থাকে, কোন কোন অবস্থায় সুন্নাত, কখনও ফরয বা ওয়াজিব আবার কখনও বা তা মাকরুহ ও হারাম হয়ে থাকে।
সুন্নাত : স্বাভাবিক অবস্থায় বিবাহ করা সুন্নাত। অর্থাৎ কোন পুরষ যখন মহর আদায়ে ও স্ত্রীর ভরণ-পোষণ খরচ নির্বাহ করতে সক্ষম এবং যৌনমিলনে সমর্থবান হয় তথন তার জন্য বিবাহ করা সুন্নতে মুয়াক্কাদা।
ওয়াজিব ও ফরয : যৌন আবেগ প্রবল হয়ে উঠলে তখন বিবাহ করা ওয়াজিব আর দুর্দমনীয় যৌনাবেগের কারণে যিনা ব্যভিচারে লিপ্ত হওয়ার উপক্রম হলে তখন বিবাহ করা ফরয। তবে উভয় অবস্থায়ই তাকে মহর আদায় ও স্ত্রীর খোরপোষদানে সক্ষম হতে হবে।
মাকরূহ ও হারাম : স্ত্রীর প্রতি যুলুমের আশঙ্কা দেখা দিলে অর্থাৎ তার বৈবাহিক অধিকারসমূহ পূরণে অসমর্থ হলে বিবাহ করা মাকরূহ তাহরীম আর আশঙ্কা নিশ্চিত হলে সে ক্ষেত্রে বিবাহ করো হারাম।– শামী

বিবাহের নিয়ত
প্রত্যেক নেককাজের জন্য এবং নেককাজের সুফল লাভের জন্য বিশুদ্ধ নিয়ত থাকাটা অত্যাবশ্যক। রাসূলুলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেন- নিশ্চয়ই আমলের প্রতিদান নিয়ত অনুযায়ী হয় আর মানুষ যেমন নিয়ত করে তেমন প্রতিদানই সে পায়।–বুখারী মুসলিম
আর বিবাহতো একটি ইবাদত। সুতরাং বিবাহের জন্য বিশুদ্ধ নিয়ত করে নেওয়া প্রয়োজন। তবেই বিবাহের প্রভূত উপকারিতা ও কল্যাণগুলোর সুফল পুরোপুরি লাভ করা যাবে। বিবাহ সংযত স্বভাব, পরহেযগারী, সুন্নতপালন, মনোদৈহিক সুস্থতা, স্বাস্থ্য ও বংশধারা রক্ষার উদ্দেশ্যে করা উচিত। শুধুমাত্র যৌনচাহিদা পূর্ণ করাই উদ্দেশ্য হওয়া অনুচিত। – মাওলান থানবী (রহ), বিবাহ জীবনের সৌভাগ্যের সিঁড়ি, মাসিক পাথেয়

দীনদারী
ইসলামী শরীআহ পাত্র-পাত্রি নির্বাচনে যে বিষয়টিকে সবচেয়ে বেশী গুরুত্ব দিয়েছে, তা হল দীনদারী। দীনদার পাত্র নির্বাচন প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেন- যদি তোমাদের কাছে এমন কোন লোক বিবাহের প্রস্তাব নিয়ে আসে যার চরিত্র ও দীনদারী তোমার পছন্দনীয়, তাহলে তার কাছে মেয়ে বিয়ে দাও। তা না হলে পার্থিব জীবনে বড়ই ফিতনা ফাসাদের শিকার হবে।-তিরমিযী
অপরদিকে দীনদার পাত্রি নির্বাচন প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেন- নারীকে বিয়ে করা হয় (সাধারণত) চারটি কারণে- (১) ধন-সম্পদ, (২) বংশমর্যাদা, (৩), সৌন্দর্য, (৪) দীন। সুতরাং তোমরা দীনদার নারী লাভ করতে চেষ্টা করবে। অন্যকিছু চাইলে তুমি ধ্বংস হও।-বুখারী-মুসলিম
দীনদারী ব্যতীত অপরাপর অন্যন্য বিষয় প্রাধান্য দেওয়ার অপকারিতা প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেন- যে পুরুষ শুধু সম্মানিতা দেখে বিয়ে করবে তার জন্য শুধু অপমান ছাড়া আর কিছুই বৃদ্ধি পাবেনা। যে শুধু সম্পদ দেখে কোন বিত্তশালী পরিবারের মেয়ে বিয়ে করে, দারিদ্র ছাড়া তার আর কিছুই বৃদ্ধি পাবেনা। যে সুনাম ও খ্যাতির লক্ষ্যে অভিজাত খান্দানের কোন মহীলাকে বিয়ে করবে তার ইজ্জত ও সুনাম হ্রাস পাওয়া ছাড়া আর কিছুই হবে না। আর যে ব্যক্তি শুধু দৃষ্টিকে সংযত রাখতে, চরিত্রকে পাপ-পঙ্কিলতা থেকে মুক্ত ও তার যৌনেন্দ্রীয়কে নিয়ন্ত্রিত এবং আত্মীয়-স্বজনের সাথে ভদ্র ও সৌজন্যমূলক আচরণ ও আন্তরিকতার সম্পর্ক স্থাপনের লক্ষ্যে কোন মহীলাকে বিয়ে করে, আল্লাহ তাআলা সে মহীলার মধ্যে তার জন্য বরকত বৃদ্ধি করবেন। তার মধ্যেও মহীলার জন্য বরকত বৃদ্ধি করবেন। (অর্থাৎ এমনি ধরণের দাম্পত্য বন্ধন উভয়ের জীবনে কল্যাণ বয়ে আনবে)।–তাবরানী
সুতরাং বোঝা গেল যে, পাত্র পাত্রি নির্বাচনে দীনদারীই প্রধান বিবেচ্য বিষয়। কারণ যার ভেতর খোদাভীতি থাকে, সে এত ছোটখাট ব্যাপারও খেয়াল রাখে যাতে করে এরুপ সন্দেহের কোন অবকাশ থাকেনা যে, সে কারো হক বা অধিকার নষ্ট করবে কিংবা কাউকে কষ্ট দেবে অথবা অন্যের অধিকারের উপর নিজের স্বার্থকে প্রাধান্য দেবে বা কারো অমঙ্গল চাইবে অথবা কাউকে ধোঁকা দেবে।–পথহারা উম্মতরে পথনির্দশ
আর যখন স্বামী স্ত্রীর মধ্যে দীনদারী থাকবে, তখন তারা নিজেদের দায়িত্ব-কর্তব্যের প্রতি সচেতন থাকবে, যার ফলে বিবাহের কল্যাণ ও বরকত আল্লাহর অনুগ্রহে স্থায়ীরুপ লাভ করবে। ফলে গোটা দাম্পত্যজীবন, সুখ-শান্তি, স্বাচ্ছন্দ্য, সমৃদ্ধি ও কল্যাণে ভরপুর হয়ে উঠবে।

বিবাহ বর্জনের ওজর ও বিবাহের সম্ভাব্য ক্ষতি
বিভিন্ন হাদীসের মাধ্যমে প্রমাণিত হয় যে, বিবাহিত জীবন যাপন করাই উত্তম। যে ব্যক্তি সামর্থ্য থাকা সত্বেও বিবাহে অনিহা প্রকাশ করে, রাসূলুল্লাহ (সা) তাকে স্বীয় উম্মতের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার অনুমতি দেননি। তিনি ইরশাদ করেন- বিবাহ আমার সুন্নত, যে ব্যক্তি এ সুন্নত থেকে বিমুখ হয় সে আমার দলভুক্ত নয়।– মাআরেফুল কোরআন
এখন প্রশ্ন হল, বিবাহের প্রতি এত গুরুত্বারোপের পরও বিবাহ বর্জনের কোন ওজর আছে কি? এ প্রসঙ্গে তাফসীরে মা’আরিফুল কুরআন এ বয়ানুল কুরআনের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছে যে, যদি কারও অন্তরে পরকালের চিন্তা প্রবল হওয়ার কারণে স্ত্রীর প্রয়োজন অনুভূত না হয় এবং স্ত্রী সন্তানদের হক আদায় করার মত অবকাশ না থাকে, তবে তার বিবাহ না করাই উত্তম। কারণ যেসব হাদীসে বিবাহের ফযীলত বর্ণিত হয়েছে, তাতে একথাও বলা হয়েছে, যে ব্যক্তি বিবাহের সামর্থ্য রাখে এবং স্ত্রীর হক আদায় করতে পারে তার পক্ষেই বিবাহ করা উত্তম- অন্যথায় নয়। মাআরেফুল কোরআন
এমনিভাবে কোন নারী যদি স্বামীর হক আদায় করতে না পারার আশঙ্কা করে এবং কোন বিধবা অথবা তালাকপ্রাপ্তা নারী পূণরায় বিবাহ করাকে সন্তানের জন্য ক্ষতিকর মনে করে, তবে তাও ওজর হিসাবে গণ্য করা হবে।–বিয়ে জীবনে সৌভাগ্যের সিঁড়ি
বিবাহের যেমন প্রভূত উপকারিতা রয়েছে তেমনি বিবাহের কারণে ক্ষতির আশঙ্কাও রয়েছে। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ ও আবুহুরায়রা (রা) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেছেন- “এমন এক যুগ আসিবে যখন মানুষের ধ্বংস তার স্ত্রী, পিতা-মাতা এবং সন্তানের হাতেই হইবে। তাহারা ঐ ব্যক্তিকে তাহার দারিদ্রতা লইয়া লজ্জা দিবে এবং এমন কাজের আদেশ করিবে যাহা সে সহ্য করিতে না পারিয়া এমন কাজ করিয়া বসিবে, যাহাতে তাহার দীন বরবাদ হইয়া সে দ্বংসপ্রাপ্ত হইবে।”-আল মুরশিদুল আমিন, ইমাম গাযালী (রহ)
এ প্রসঙ্গে ইমাম গাযযালী (রহ) বলেন- বিবাহের ক্ষতি এই যে, মানুষের আয়-রোযগার হালাল না হওযার ভয় রহিয়াছে, ব্যয় নির্বাহ করিতে হিমশিম খাইবে এবং পরিবার-পরিজেনের সঠিক লালন পালনে ব্যর্থ হইবে, অথচ তাহা ওয়াজিব। (তাছাড়া) পরিবারের লোকজনের সাথে নরম ব্যবহার করা জরুরী, এ বিষয়ে একমাত্র উন্নত ও চরিত্রবান লোকই সক্ষম হইতে পারে। -ঐ
তাছাড়া দাম্পত্য জীবনে স্বামী-স্ত্রীর কিছু দায়িত্ব-কর্তব্য রয়েছ, যা সঠিকভাবে পালন করা জরুরী। কেননা এর জন্য তাদেরকে আল্লাহর নিকট জবাবদিহি করতে হবে। রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেছেন– তোমাদের প্রত্যেকে দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেককে তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। পুরুষ তার গৃহের পরিজনদের উপর দায়িত্বশীল এবং স্ত্রী তার স্বামীর গৃহ ও সন্তানদের ওপর দায়িত্বশীল। কোজেই তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশী আর প্রত্যেকেই তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে।-বুখারী
সুতরাং কোন নারী পুরুষ যদি ওজর-আপত্তির কারণে অথবা বিবাহে ক্ষতির আশংকায় বিবাহ থেকে বিরত থাকতে চায়, তবে তার জন্য শর্ত হল, নিজ প্রবৃত্তির উপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা। এমনকি চোখের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাথাও শর্ত। যদি কেউ নিজ প্রবৃত্তি ও চোখকে নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম না হয় তবে তার জন্য বিবাহ করা ওয়াজীব।–পথহারা উম্মতের পথনির্দেশ; আলমুরশিদুল আমীন

উপসংহার
এই প্রবন্ধে বিবাহের প্রভুত উপকারিতা ও কল্যাণ তুলে ধরার পাশাপাশি বিবাহের হুকুম, বিবাহের উপকারিতা ও কল্যাণের স্থায়িত্বের জন্য পাত্র-পাত্রির দীনদার হওয়া এবং পরিশেষে বিবাহ বর্জনের ওজর ও বিবাহের সম্ভাব্য ক্ষতির দিকটিও তুলে ধরা হয়েছে। যেন অবিবাহিত নারী-পুরুষ বিবাহের প্রতি উদ্বুদ্ধ হয় এবং সামগ্রিক অবস্থা বিচার-বিশ্লেষণ করে সঠিক সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারে।
ইসলামে বৈরাগ্যবাদ নেই। নবী করীম (সা) এর সুস্পষ্ট বাণী- ‘লা রাহবানিয়াতা ফিল ইসলাম।’ মূলত শরীয়তের বিধান হল বিবাহ করা। অপরদিকে মানবজীবন সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না, সফলতা ব্যর্থতা, ইত্যাদি অনুকূল-প্রতিকূল অবস্থা থেকেও মুক্ত নয়। মানব-জীবনে প্রতিকুল অবস্থার আশঙ্কায় বিবাহের মত এমন কল্যাণকর বিষয় থেকে বিরত থাকা কোন মুসলমানের জন্যই উচিত নয়।
মিশরের প্রখ্যাত আলিম ও সুবিজ্ঞ ফকীহ আল্লামা ইউসুফ আল কারযাভী বলেন, অভাব-অনটন, রিযিকের অপর্যাপ্ততা বা দায়িত্ব বোঝা বহনে সাহসহীনতার কারণে বিবাহ করা থেকে বিরত থাকা কোন মুসলমানের পক্ষে শোভা পায়না। বরং তার উচিত হলো আল্লাহর সাহায্য ও অনুগ্রহলাভের জন্য প্রাণপন চেষ্টা করা। কেননা যারা নিজেদের চরিত্রের পবিত্রতা রক্ষার উদ্দেশ্যে বিবাহ করবে, আল্লাহ তাদের প্রতি অনুগ্রহ ও সাহায্য-সহযোগিতা করার ওয়াদা করেছেন।–ইসলামে হালার হারামের বিধান
এ প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেছেন- তিন ব্যক্তিকে সহযোগিতা করা আল্লাহর হক (দায়িত্ব); চারিত্রিক পবিত্রতার জন্য যে ব্যক্তি বিবাহ করে, পরিশোধ করার লক্ষ্য নিয়ে যে দাস অর্থচুক্তিতে আবদ্ধহয় এবং আল্লাহর রাহে যে ব্যক্তি জিহাদ করে।–কুরতুবী
মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন সকলের জন্য তার অনুগ্রহ ও কল্যাণের দ্বার উন্মুক্ত করুন। [আমীন]

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

Back to top button
error: Content is protected !!