আল উকুবাত-ইবনে আবিদ দুনইয়া (রহ)- রিওযায়াত ১০২ থেকে

ইতপূর্বে এই গ্রন্থের ১০১ রিওযাযাত পর্ন্ত প্রকাশ করা হয়েছে। বাকী অংম থেকে নির্বাচিত

আদম (আ) এর তওবা

উবাই ইবনে কাব (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেন- নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা আদম (আ)-কে দীর্ঘকায় ব্যক্তিরুপে সৃষ্টি করেছেন। দেখতে যেন ঠিক খেজুর গাছের মত লম্বা। তার মাথার চুল অনেক বেশী ছিল। যখন তিনি (নিষিদ্ধ) গাছের ফল খেলেন তখন তার কাপড় খুলে গেল। সর্বপ্রথম তার সতর প্রকাশিত হলো। যখন তিনি তার সতরের দিকে দৃষ্টিপাত করলেন তখন তিনি দ্রুত দৌড়াতে লাগলেন। যার কারণে তার চুল জান্নাতের বৃক্ষের শাখার সাথে আটকে গেল। দয়াময় (আল্লাহ) আওয়ায দিলেন. হে আদম! তুমি কি আমার থেকে পলায়ন করছ? যখন তিনি রহমান এর কথা শুনলেন তখন আরয করলেন, হে পরওয়ারদেগার! না। বরং আমার আপনার থেকে লজ্জাবোধ হচ্ছে। আমি যদি তওবা করি এবং আপনার দিকে মনোনিবেশ করি তবে কি আমি জান্নাতের দিকে ফিরে যেতে পারব? আল্লাহ তাআলা বললেন, হ্যাঁ, হে আদম!

এটাই আল্লাহ তাআলার নিম্নের বাণীর মর্মার্থ

فَتَلَقَّى آدَمُ مِنْ رَبِّهِ كَلِمَاتٍ فَتَابَ عَلَيْهِ إِنَّهُ هُوَ التَّوَّابُ الرَّحِيمُ

অনন্তর আদম স্বীয় প্রতিপালক হতে কতিপয় বাক্য শিক্ষা করলেন। আল্লাহ তখন তার তওবা কবুল করে তাকে ক্ষমা করলেন। নিশ্চয়ই তিনি ক্ষমাশীল, করুণাময়।– (সূরা আল বাকারাহ ১৩৭)-রিওয়ায়াত ১০২

আল্লাহর প্রতিবেশীত্ব থেকে বহিষ্কার

আবু ইউসুফ এর ভাই আবু তালিব বলেন, আল্লাহ তাআলা আদম (আ)-কে আওয়ায দিলেন, হে আদম! আমি তোমার কেমন প্রতিবেশী ছিলাম? আদম (আ) বললেন, হে আমার মালিক! আপনি আমার অতি উত্তম প্রতিবেশী ছিলেন। আল্লাহ তাআলা বললেন, আমার ঘর থেকে বেরিয়ে যাও। আল্লাহ তাঅলা তার তাজ ও অলঙ্কার খুলে নিলেন।–রিওয়ায়াত ১০৩

মুজাহিদ (রহ) বলেন, আল্লাহ তাআলা দুই ফেরেশতাকে নির্দেশ দিলেন যে, আদম ও হাওয়া (আ)-কে আমার প্রতিবেশীত্ব থেকে বের করে দাও। কেননা তারা আমার আদেশের অবাধ্যতা করেছে। আদম (আ) ক্রন্দনরত অবস্থায় হাওয়া (আ) এর দিকে মনোনিবেশে করে বললেন, এটা (আমাদের) ঐ পাপের প্রথম প্রতিফল। জিবরাঈল (আ) তাদের মাথা থেকে মুকুট খুলে নিলেন এবং মিকাঈল (আ) তাদের ললাটে সজ্জিত তাজ খুলে নিলেন।–রিওয়ায়াত ১০৪

আদম (আ) এর লজ্জা ও কান্না

মুজাহিদ (রহ) বলেন, যখন আদম (আ) এর সাথে বৃক্ষের শাখা আটকে গেল তখন আদম (আ) অনুমান করলেন যে, দ্রুত তাকে শাস্তি দেয়া হবে। তখন তিনি তার মাথা ঝুঁকিয়ে দিলেন এবং ‘আমাকে ক্ষমা করুন’ ‘আমাকে ক্ষমা করুন’ বলতে লাগলেন। আল্লাহ তাআলা বললেন, হে আদম! তুমি কি আমার থেকে পলায়ন করছ? তিনি আরয করলেন, না, বরং হে আমার মালিক! আমি আপনার থেকে লজ্জা করছি।–রিওয়ায়াত ১০৫

হাসান বসরী (রহ) বলেন, যখন আদম (আ)-কে জান্নাত থেকে বের করে দেওয়া হলো তখন তিনি তিনশত বৎসর পর্যন্ত ক্রন্দন করতে থাকেন। এমনকি তার চোখ দিয়ে ঝর্ণাধারা প্রবাহিত হতে লাগল।– রিওয়ায়াত ১০৭

জীবনে ভাল মন্দ যা ঘটে তা নির্ধারিত

খালিদ আল হাযযা (রহ) বলেন, আমি ফারেস এর দিকে রওয়ানা হলাম এবং হাসন বসরী (রহ) এর খিদমতে উপস্থিত হলাম। তার উপর তাকদীর অস্বীকার করার অভিযোগ আরোপ করা হয়েছিল। আমি বললাম,, হে আবু সাঈদ! আদম (আ)-কে কি যমীনের জন্য সৃষ্টি করা হয়েছিল নাকি জান্নাতের জন্য? তিনি বললেন, হে আবু মানাযিল! এটা আপনার জিজ্ঞাসা করা বিষয় না। আমি বললাম, আমি চাই যে, আমার এই বিষযের জ্ঞান হয়ে যাক। তিনি বললেন, তাকে যমীনের জন্য সৃষ্টি করা হয়েছিল। আমি বললাম, যদি তিনি সাবধানতা অবলম্বন করতেন এবং ঐ গাছের ফল না খেতেন তবে কি ভাল হত? তিনি বললেন, ত্রটি হওয়াটা তো তার তাকদীরেই নির্ধারণ ছিল।– রিওয়ায়াত ১০৮

দুনিয়াতে স্থায়ী শান্তি সুখ নেই

ফাত্‌হ মুসিলী (রহ) বলেন, আদম (আ) তার সন্তানকে বললেন, হে বৎস! আমরা জান্নাতী লোক ছিলাম। যেভাবে এটা সৃষ্টি করা হয়েছে আমাদেরকেও এভাবে সৃষ্টি করা হয়েছে এবং আমাদেরকে জান্নাতী খাদ্য দেওয়া হয়েছে। অতঃপর আমাদের দুশমন ইবলিস (তার জাল দ্বারা) আমাদেরকে পাকরাও করেছে। এখন দুনিয়াতে দুঃখ-কষ্ট ও চিন্তা-পেরেশানী ব্যতীত কোন আরাম ও প্রশস্ততা লাভ হবে না- যে পর্যন্ত না আমরা সেখানে (জান্নাতে) পূণরায় প্রবেশ করব যেখান থেকে আমাদেরকে বের করে দেয়া হয়েছিল।–রিওযায়াতঃ১১১

গুনাহর কারণে মানুষ ফেরেশতাদের সান্নিধ্য থেকে বঞ্চিত হয়

মুহামাম্মদ ইবনে মুনকাদির (রহ) বলেন, আদম (আ) যমীনে ৪০ বৎসর এভাবে অতিবাহিত করেছেন যে, তিনি কখনও হাসেন নি আর না তার অশ্রু কখনও থেমেছে। অতঃপর হাওয়া (আ) বললেন, আমরা ফেরশতাদের আওয়ায শোনার জন্য অস্থির হয়ে আছি। আল্লাহর নিকট দুআ করুন যে, আমরা ফেরশেতদাদের অওয়ায শুনতে পারি। আদম (আ) বললেন, আমি আমার কৃতকমের্ জন্য আল্লাহর নিকট এমন লজ্জা করি যে, আকাশের দিকে মাথা উঠাতে পারিনা।- রিওয়ায়াত ১১২

ইয়াযিদ রাক্কাশী (রহ) বলেন, যখন জান্নাত থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার কারণে আদম (আ) এর কান্না দীর্ঘ হয়ে গেল তখন কেউ এর কারণ জিজ্ঞাসা করলো। তিনি বললেন, আমি এমন ঘরে প্রতিপালকের প্রতিবেশী ছিলাম যেই ঘরের মাটি পবিত্র। আর ওর মধ্যে আমি ফেরেশতদাদের আাওয়ায শুনতাম।– রিওয়ায়াতঃ১১৩

ইবলিসের মানুষের মিথ্যা কল্যাণকামী

নযর ইন ইসমাঈল বলেন, আল্লাহ তাআলা বললেন, হে আদম! তুমি আমার নাফরমানী করেছ আর ইবলীসের আনুগত্য করেছ? আদম (আ) আরয করলেন, হে পরওয়ারদেগার! সে আমার সামনে আপনার কসম খেয়েছে এবং আমার কল্যাণকামী সেজেছে। আর আমি মনে করেছি যে, কেউ আপনার নামে মিথ্যা কসম খেতে পারে না।– রিওয়ায়াতঃ ১১৪

চলবে

নূহ (আ) এর কান্না

ওহাইব (রহ) বলেন যখন আল্লাহ তাআলা নূহ (আ)-কে তার সন্তানের ব্যাপারে বলেন যে,

إِنِّي أَعِظُكَ أَنْ تَكُونَ مِنَ الْجَاهِلِينَ

আমি তোমাকে উপদেশ দিচ্ছি যে, তুমি অজ্ঞ লোকদের অন্তর্ভুক্ত হয়ো না।– সূরা হুদ ৪৬

নূহ (আ) এরপর তিনশত বছর কাঁদতে থাকেন। এমনকি কান্নার ফলে তার চোখের নিচের অংশ গর্ত হয়ে যায়।–রিওয়ায়াতঃ১১৫

হুদ (আ) এ উপদেশ

ইয়াহইয়া বিন ইয়ালা বলেন, যেই সময় সম্প্রদায়ের লোকেরা খোলখুলিভাবে মূর্তিপূজা শুরু করলো তখন হুদ (আ) তার সম্প্রদায়কে বললেন, হে আমার সম্প্রদায়! আমাকে আল্লাহ তোমাদের নবী ও দায়িত্বশীল করে পাঠিয়েছেন অতএব তোমরা আল্লাহর আনুগত্য শিরোধার্য করে নাও। আল্লাহর আনুগত্যের কারণে তার সন্তুষ্টি লাভ হয় আর তার নাফরমানীর কারণে তার অসন্তুষ্টি।

আর জেনে রাখ যে, যমীন আসমানের মুখাপেক্ষী কিন্তু আসমান যমীন থেকে অমুখাপেক্ষী। অতএব যদি তোমরা আল্লাহর আনুগত্য কর তবে তোমাদের জীবন স্বাচ্ছন্দ্যময় হয়ে উঠবে এবং পরবর্তী জীবনে নিরাপত্তা পেয়ে যাবে। আর আল্লাহ তাআলার অসন্তুষ্টির কারণের প্রশস্ত যমীনও সংকীর্ণ হয়ে যায়।– রিওয়ায়াতঃ১১৬

কওমে আদ এর শাস্তি

ইমাম মুজাহিদ (রহ) আব্দুল্লাহ ইবনে আমর (রা) থেকে বর্ণনা করেন। রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেন- আল্লাহ তাআলা যেই বায়ূ দ্বারা আদ সম্প্রদায়কে ধ্বংস করেছেন তা আল্লাহ তাআলা এক আঙ্গুলী পরিমাণ উন্মুক্ত করেছিলেন। বর্ণনাকারী বলেন, সে বায়ূখণ্ডটি উপত্যকার উপর দিয়ে বয়ে যায় এবং তাদের মাল সামান সবকিছু আসমান ও যমীনের মাঝে উড়িয়ে নিয়ে যায়। যখন কওমে আদের লোকেরা সেই বায়ূ দেখেছিল তখন বলেছিল-

هَذَا عَارِضٌ مُمْطِرُنَا

এই তো মেঘ আমাদের বৃষ্টি দিবে।– সূরা আল আহকাফ ২৪

কিন্তু বাতাস তখন উপত্যকার মানুষ ও জীব-জন্তুগুলোকে শহরবাসীর উপর ফেলে দেয়।

হাওয়া (আ) এর শাস্তি

হযরত ইবনে আব্বাস (রা) বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, আল্লাহ তাআলা আদম (আ)-কে বললেন, আমি তোমাকে যেই বৃক্ষ থেকে নিষেধ করেছি তার ফল তুমি কেন খেয়েছ? আদম (আ) বললেন, হে আমার রব! হাওয়া আমাকে ওটির প্রতি উদ্বুদ্ধ করেছিল। আল্লাহ তাআলা বললেন, আমি তাকে এই শাস্তি দিচ্ছি যে, গর্ভবতী অবস্থায় সে কষ্ট ভোগ করবে, বাচ্চা জন্ম দেওয়ার সময় কষ্ট ভোগ করবে আর প্রতি মাসে তার দুইবার রক্ত আসবে। এটা শুনে হাওয়া কাঁদতে লাগলেন। তখন বলা হলো-

عَلَيْك الرنة وعَلى بناتك

তোমার প্রতি ও তোমার কন্যাদের প্রতি আক্ষেপ।–রিওয়ায়াতঃ ১১৮

কৃষিকাজের সূচনা

সুফিয়ান ইবনে উয়াইনাহ বলেন, যখন আদম (আ)-কে যমীনে নামিয়ে দেয়া হয় তখন তিনি যমীনকে বলেন, হে যমীন আমাকে খাবার খাওয়াও। যমীন বললো, আল্লাহর শপথ! আমি তোমাকে এমন কাজ ব্যতীত তোমাকে কিছু খাওয়াব না, যার মাধ্যমে তোমার ঘাম নির্গত হয়।– রিওয়ায়াতঃ১১৯ 

ইবনে আব্বাস (রা) বলেন, আদম (আ) ক্ষেতে কাজ করছিলেন। সন্ধ্যার সময় তিনি যখন ঘরে ফিরছিলেন তখন তার পুরো শরীর ঘামে ভিজে গেছে। তিনি হাওয়া (আ)-কে বললেন, হে হাওয়া! এটা ঐ ব্যক্তির শাস্তি, যে আল্লাহর নাফরমানী করেছে।–রিওয়ায়াতঃ১২১

এক ধোপার উপস্থিত জবাব

রুকবাহ বিন মাসকালাহ (রহ) বলেন, আমি এক ধোপার নিকট দিয়ে অতিক্রম করছিলাম , যে প্রচন্ড শীতের মধ্যে কাপড় নিংড়াচ্ছিল। আমি জিজ্ঞাসা করলাম এই নিষিদ্ধ বৃক্ষ তোমার সাথে কি আচরণ করেছে? সে বলল ‘হায়! যদি এই বৃক্ষ সৃষ্টিই না করা হত।’ আমি তার মত এমন উপস্থিত উত্তর আর কাউকে দিতে দেখিনি।–রিওয়ায়াতঃ ১২২

ফল খাওয়ার পরিণতী দুনিয়ায়

আব্দুর রহমান বিন ইয়াযিদ বর্ণনা করেন যে, তালহা বিন মুসাররিফ (রহ) একবার এক দুর্দশাগ্রস্ত ব্যক্তিকে দেখে বললেন, এটা ঐ বৃক্ষের ফল খাওয়ার পরিণতী যা আদম (আ) খেয়েছিলেন।-রিওয়ায়াতঃ ১২৩

আব্দুল্লাহ ইবনে মাযরুক বলেন, ঐ বৃক্ষের ফল খাওয়ার দরুন আমাদের উপর অনেক কষ্ট আসে। অতঃপর তিনি কাঁদতে থাকেন।- রিওয়ায়াতঃ ১২৪

আমর বিন যার (রহ) বলেন, অনেক লোকমা গ্রহণকারী এমন আছে যাদেরকে দীর্ঘ ক্ষুধায় নিক্ষেপ করে। অতঃপর বলেন, আদম সন্তানের মধ্যে জাহান্নামীদের জন্য ধ্বংস। আর এটা তাদের  পিতার নিষিদ্ধ বৃক্ষের ফল খাওয়ার কারণে হয়েছে।-রিওয়ায়াতঃ ১২৫

উয়াইস কারণী (রহ) এর ঘটনা

আবু আব্দুল্লাহ (রহ) বলেন উয়াইস কারনী (রহ) একবার খুব ঠান্ডার সময় এক ধোঁপার পাশ দেয় যাচ্ছিলেন। সেই ধোপা পানির উপর দাড়িয়ে ছিল। উয়াইস কারনী (রহ) তার উপর সমবেদনা প্রকাশ করে তার হাত দিয়ে ইশারা করে বললেন, দেখ বেচারা! কি অবস্থায় আছে! ধোপা উয়াইস কারনী (রহ)-কে বললো, হে উয়াইস! যদি এই বৃক্ষ সৃষ্টিই না হত।- রিওয়ায়াতঃ ১২৬

 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Back to top button
error: Content is protected !!