তাতারীদের সংক্ষিপ্ত বিবরণ

facebook group ‘ইসলামের হারিয়ে যাওয়া ইতিহা ’ page থেকে
পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে নিষ্ঠুর, বর্বর, নির্দয় জাতি বলা যায় তাতারীদের।বলা যায় পৃথিবীর ইতিহাসের সবচেয়ে কঠিন সময় ছিল তখন। তাতারীদের ইতিহাস ছিল এক বিস্ময়কর ইতিহাস। তারা একটি দুর্বল জাতি থেকে হয়ে ওঠে পৃথিবীর অন্যতম পরাশক্তিতে।
★চলুন জেনে আসি তাতারীদের উত্থান সম্পর্কে-
আনুমানিক ৬০৩ হিজরীতে তাতারী সাম্রাজ্যের উত্থান ঘটে। সর্বপ্রথম তাদের উত্থান ঘটে চীনের উত্তরে অবস্থিত মঙ্গোলিয়া দেশে। তাদের প্রধান নেতা হলো চেঙ্গিস খান। মঙ্গলিয়ান ভাষায় চেঙ্গিস খান অর্থ শক্তিধর, শাসনকর্তা, রাজাধিরাজ। সে ছিল মানুষ হত্যাকারী শক্তিধর সেনাপতি। দিনে দিনে তার রাজ্য বিস্তৃত হতে থাকে। একসময় তার রাজ্যের সীমানা পূর্বে কোরিয়া থেকে পশ্চিমে খাওয়ারেজ পর্যন্ত এবং উত্তরের সাহেবেরিয়া থেকে দক্ষিণের চীন সমুদ্র পর্যন্ত সম্প্রসারিত হয়। অর্থাৎ বর্তমান বিশ্বের চীন, মঙ্গোলিয়া, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড, সাইবেরিয়ার কিছু অংশ থেকে মায়ানমার, নেপাল, ভুটান পর্যন্ত তার সম্রাজ্য বিস্তৃত ছিল।
চীনের উত্তরে অবস্থিত জুবি উপত্যকার অধিবাসীদের তাতার বলা হয়। তাতারীরা এই অঞ্চলের মূল অধিবাসী। পরবর্তীতে তাতারীদের বহু শাখাগোত্র প্রকাশ পায়।যেমন মোগল, তুর্কি, সেলজুকি ইত্যাদি।
মোগল গোত্র যখন এ অঞ্চলে প্রভাব বিস্তার করে তখন থেকে এসব গোত্রগুলোর উপর মোঘল শব্দের প্রয়োগ শুরু হয়। চেঙ্গিস খান মোঘল গোত্রেরই সন্তান।
তাতারীদের ধর্ম ছিল বিভিন্ন ধর্মের সংমিশ্রণে সৃষ্ট এক নবধর্ম। চেঙ্গিস খান ইসলাম ধর্ম, খ্রিষ্ট ধর্ম ও বৌদ্ধধর্মের কতিপয় বিধান একত্রিত করে এবং নিজের পক্ষ থেকে কতিপয় বিধান সংযোজন করে তাতারীদের জন্য একটি ধর্মীয় গ্রন্থ প্রণয়ন করেন। তার প্রণোদিত গ্রন্থটিকে ইয়াসিক, ইয়াসাহ অথবা ইয়াসিক্ব বলা হয়।
★তাতারীদের নৃশংসতাঃ
তাতারীরা কোনো শহরে প্রবেশ করলে গোটা শহর ধ্বংসের পাশাপাশি সকল অধিবাসীদের হত্যা করত। তারা পুরুষ-মহিলা, যুবক-বৃদ্ধ, ছোট- বড়, শহুরে ও বিদ্রোহীদের সামান্যতম দয়া দেখাতো না। তারা চতুষ্পদ প্রাণীর চেয়েও বেশি রক্তক্ষয়ী, বীভৎস ও নিষ্ঠুর ছিল। যেমনটি মুওয়াফফিক আব্দুল লতিফ তাদের ইতিহাস বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন- “যেন গোটা বিশ্ব ও বিশ্ব মানবতাকে ধ্বংস করা তাদের মূল লক্ষ্য ছিল; রাজত্ব ও সম্পদ তাদের লক্ষ্য ছিল না।”
তাদের মূল লক্ষ্য ছিল পুরো পৃথিবীতে একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা। তাদের আনুগত্যদের ব্যতিরিকে সবাইকে হত্যা করা। তারা কারও প্রতি দয়া দেখাতো না। তাদের সবচেয়ে বড় শত্রু ছিল মুসলিমরা ও মুসলিম সাম্রাজ্যগুলি।
ঐতিহাসিক ইবনে আছীর (রহ) তাতারী হামলার ইতিহাস লিখতে গিয়ে তার মনোবেদনা ও হৃদয় যন্ত্রণা চেপে রাখতে পারেননি। তিনি বলেনঃ
“এই ঘটনা এমনই লোহমর্ষক ও হৃদয়বিদারক যে, কয়েক বছর আমি লিখব কি লিখব না এই দ্বন্দেই ছিলাম। একবার ভাবি লিখব, আরেকবার ভাবি না,লিখব না। আসলে ইসলামের দুর্দশা এবং মুসলিম উম্মার সর্বনাশের কাহিনী লিখতে পারে এমন কলিজা কারই বা আছে।
হাই! যদি আমার জন্মই না হতো, কিংবা এর আগেই আমি মরে যেতাম এবং আমার অস্তিত্ব বিস্মৃত হয়ে যেত। কিন্তু কিছু বন্ধুর দাবি, এ ঘটনা আমি যেন ইতিহাসের পাতায় সংরক্ষণ করি। তবু দ্বিধাদ্বন্দ্বেই ছিলাম। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ভেবে দেখলাম, না লেখার মধ্যেও কোন ফায়দা নেই।
এ ছিল এমন বিপদ ও দুর্যোগ যার দৃষ্টান্ত পৃথিবীর ইতিহাসে আর নেই। যদিও এর প্রধান শিখার ছিল মুসলিম জাতি তবুও এর বিস্তার ছিল অন্যান্য জাতি পর্যন্ত। কেউ যদি দাবী করে যে, আদম (আ) থেকে আজ পর্যন্ত দুনিয়ায় এমন ঘটনা আর ঘটেনি তাহলে তার দাবি মিথ্যা হবে না।
কারণ, এর ধারে-কাছের ঘটনাও ইতিহাসের পাতায় নেই এবং কেয়ামত পর্যন্ত সম্ভবত দুনিয়ায় এমন ঘটনা আর দেখবেনা ইয়াজুজ-মাজুজের ঘটনা ছাড়া। নারী-পুরুষ, শিশু-বৃদ্ধ কারো প্রতি এই পশুরা কোন দয়া করে নি। যাকে পেয়েছে তাকেই খুন করেছে, পেট ফেড়ে গর্ভের সন্তান পর্যন্ত। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। লা হাওলা ওয়াকুওয়াতা ইল্লাবিল্লাহিল আলিইয়িল আজীম। এই ফেতনা ছিল বিশ্বব্যাপী ও সর্বগ্রাসী। যা এক ভয়ঙ্কর তুফানের মত ধেয়ে এসেছিল এবং সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়েছিল।” (ইবনে আছীর রচিত আল কামিল:১৩/২০১-২০৩)
★চলুন ঐতিহাসিকগণেদের লেখা থেকে তাতারীদের কিছু পৈশাচিক আক্রমণ এর বিবরণ দেয়া যাক-
তাতারীদের বুখারা আক্রমণের পরিস্থিতি সম্পর্কে আল্লামা ইবনে কাসীর (রহ) আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া গ্রন্থে বলেনঃ
“তারা এত বিপুলসংখ্যক মানুষ হত্যা করেছে যার সঠিক সংখ্যা আল্লাহ ব্যতীত কেউ জানে না। তারা শিশু ও নারীদের বন্দী করেছে। নারীদের সঙ্গে তাদের পরিবার-পরিজনের উপস্থিতিতে অশ্লীল কর্ম সাধন করেছে! (পিতার উপস্থিতিতে মেয়ের সঙ্গে স্বামীর উপস্থিতিতে স্ত্রীর সঙ্গে অপকর্ম করেছে!!) যারা নিজেদের আত্মমর্যাদা রক্ষার জন্য লড়াই করছে তাদের তারা নির্বিচারে হত্যা করেছে। বন্দীদের বিভিন্ন ধরনের শাস্তি প্রদান করেছে শহরের আকাশ বাতাস নারী-পুরুষ ও শিশু- কিশোরদের আর্তনাদে কেঁপে উঠেছে। এরপর তারা বুখারার মাদ্রাসা ও মসজিদ গুলোতে আগুন লাগিয়ে দেয়। শহরে পুড়ে ভস্ম হয়ে বিরাণভূমিতে পরিণত হয়।”
তাতারীরা মুসলমানদের প্রাণ কেন্দ্র বাগদাদ ধ্বংস্তূপে পরিণত করে। সুবিশাল বাগদাদ পাঠাগার ধ্বংস করে। নারী-পুরুষ, শিশু-কিশোর, বৃদ্ধ এবংকি দুগ্ধপোষ্য শিশুকেও নৃশংস ভাবে হত্যা করে।
ইবনে কাছীর (রহ) বলেন-
“চল্লিশ দিন পর্যন্ত বাগদাদে গণহত্যা ও লুটতরাজ অব্যাহত ছিল। হাট-বাজারে, অলিতে-গলিতে লাশের স্তূপ পড়ে ছিল। লাশপচা গন্ধে সারা শহরে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছিল। অসংখ্য মানুষ এই মহামারিতে মারা যায়।” (আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া)
এরকমভাবে তাতারীরা সমকান্দ,পারস্য,কাযবিন, আর্মেনিয়া,জুজিয়া,খোরাসন,নিশাপুর,মারওয়ান,তালিকান,হেরাত,খাওয়ারেজমসহ অসংখ্য শহর ধ্বংস্তূপে পরিণত করে। মানুষদের নৃশংস ভাবে হত্যা করে।
★এবার সে সময়কার মানুষের মনে কিরকম তাতারীত্রাস ছিল তার কিছু বর্ণনা দেয়া যাক-
সে সময়কার মানুষের মনে তাতারীত্রাস এমন ছিল যে তারা ভাবতো তাতারীরা অপরাজেয়। তাতারীরা যেখানে যায় সেখানের সব মানুষকে হত্যা করে। তাই তাদের সামনে যদি কোনো তাতারী চলে আসে তারা ভাবতো আর বাঁচার কোনো উপায় নাই।
ইবনে আছীর (রহ) কামেল ফিত তারীখ গ্রন্থে ৬২৮ হিজরীর ঘটনাবলি বর্ণনা করতে গিয়ে এমন কিছু চিত্র ফুটিয়ে তোলেন, যা তিনি তাতারী হামলা থেকে রক্ষাপ্রাপ্ত কতিপয় ব্যক্তিবর্গের কাছ থেকে নিজ কানে শুনেছেন। তিনি বলেনঃ
*একজন তাতারী মহিলা ঘরে প্রবেশ করে একদল মুসলমানকে হত্যা করে!! তিনি আরও বলেছেন যে, স্বয়ং আমি জনৈক মারাগাবাসীর কাছে শুনেছি, একজন তাতারী সৈন্য একটি গলিতে প্রবেশ করে। সেখানে ১০০ জন মুসলমান পুরুষ ছিল। সে এক এক করে ১০০ জনকে হত্যা করে। কিন্তু তারা তার সামনে প্রতিরোধের হাত বাড়ায়নি, পাল্টা আক্রমণ করেনি। মুসলমানদের উপর লাঞ্ছনা নেমে এসেছিল। ফলে তারা সংখ্যায় কম হোক বা বেশি, কোন অবস্থাতেই নিজেদের রক্ষা করতে পারেননি।
*এক একজন তাতারী সৈন্য এক এক গ্রামে প্রবেশ করত এরপর এক এক করে গ্রামবাসী সবাইকে হত্যা করতো। অথচ গ্রামবাসী সংখ্যা অনেক হওয়া সত্ত্বেও একজনও প্রতিরক্ষা কিংবা আত্মরক্ষার জন্য হাত তুলতো না।
*জৈনিক তাতারী একজন মুসলমানকে ধরল। তার সঙ্গে হত্যা করার মতো কোনো অস্ত্র ছিল না। সে মুসলমান ব্যক্তি কে বললো, মাথা জমিনে ঠেকিয়ে রাখো। কোথাও যাবে না। মুসলমান ব্যক্তিটি জমিনে মাথা ঠেকিয়ে রাখল। এরপর তাতারী সেনাটি তলোয়ার ব্যবস্থা করে এনে তাকে হত্যা করল।
*এক ব্যক্তি ইবনুল আছীর (রহ) কে বর্ণনা করে বলেন, আমি ও আমার সঙ্গে ১৭ জন রাস্তা দিয়ে হাঁটছিলাম। একজন তাতারী সেনা এল। আমাদের নির্দেশ দিল, যেন আমরা পরস্পর নিজেদের বন্দী করি। আমার সাথীরা তার হুকুম মতো কাজ শুরু করল। আমি তাদের বললাম, সে তো একা। আমরা কেন তাকে হত্যা করব না? তারা বলল আমরা ভয় পাই। আমি বললাম, সে তোমাদের হত্যা করতে চায়। চলো উল্টো আমরা তাকেই হত্যা করি। নিশ্চয়ই আল্লাহ আমাদের রক্ষা করবেন। আল্লাহর শপথ কেউ একাজ করার দুঃসাহস দেখায়নি। ফলে বাধ্য হয়ে আমিই তলোয়ার হাতে নিয়ে তাকে হত্যা করলাম। এরপর সে অঞ্চল ছেড়ে পলায়ন করলাম এবং রক্ষা পেলাম। এ জাতীয় বহু ঘটনা রয়েছে।
*তাতারী বাহিনী বর্তমান তুরস্কের দক্ষিণে অবস্থিত ‘বাদলিস’ শহরে প্রবেশ করল। এটি একটি সুরক্ষিত শহর। পাহাড় এর একটি সংকীর্ণ গিরিপথ ছাড়া শহরে প্রবেশ করার কোনো রাস্তা নেই। একজন শহরবাসীর বক্তব্য, আমাদের পাঁচশো সৈন্য থাকলেও একজন তাতারীও রক্ষা পেত না। কারণ, পথ ছিল সংকীর্ণ। আর একথা বাস্তব যে, সংখ্যালঘুরা সংখ্যাগরিষ্ঠদের পরাজিত করতে পারে। কিন্তু সুবহানাল্লাহ! শহরবাসী তাতারীদের হাতে শহর ছেড়ে দিয়ে পাহাড়ের দিকে পলায়ন করে। এরপর তাতারীরা বাদলিস শহর ধ্বংসস্তূপে পরিণত করে।
*তাতারীদের হাতে নিহত হওয়ার পূর্বে প্রত্যেক মুসলমান আল্লাহর ওয়াস্তে নিজের জান ভিক্ষা চেয়ে বলত, আমাকে হত্যা করো না। তাতারীরা মুসলমানদের এই আত্মরক্ষামূলক বাণী ‘আল্লাহর ওয়াস্তে আমাকে হত্যা করো না’ শুনতে শুনতে তারা এই বাক্যটিকে গানের সুরে গাইত ‘লা বিল্লাহ’। জনৈক মুসলমান একটি পরিত্যক্ত বাড়িতে লুকিয়ে ছিল। তাতারীরা টের পায়নি। তার বক্তব্য, আমি জানালার ফাঁক দিয়ে তাতারীদের দেখছিলাম। তারা নারী-পুরুষদের হত্যা করার পর বীরবেশে ঘোড়ার পিঠে আরোহন করে হাঁসতে হাঁসতে গান গাইছিল- ‘লা বিল্লাহি,লা বিল্লাহি’।
ইবনুল আছীর (রহ) এর বক্তব্য অনুযায়ী এটি ছিল মহাবিপর্যয় ও তীব্র সংকট। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাহি রাজিউন।
– এই হলো সংক্ষেপে রক্তপিপাসু, বর্বর,নির্দয় তাতারীদের ইতিহাস।
-এই হলো সংক্ষেপে তখনকার সময়ের অবস্থা।
-এই হলো তখনকার সময়ের তাতারীত্রাসের চিত্র।
======তথ্যসূত্রঃ
………….১/ ড. রাগেব সারজানি ; তাতারীদের ইতিহাস।
………….২/ ইবনে কাসীর (রহ) ; আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া।
………….৩/ইবনে আছীর (রহ) ; কামিল ফিত তারিখ।
………….৪/উইকিপিডিয়া।
————-
————-
~আল মাহমুদ বিজয়

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Back to top button
error: Content is protected !!