আল্লাহর সুন্দর নামসমূহের ব্যাখ্যা

 

islamhouse.com এর সৌজন্যে

আল্লাহর সুন্দর নামসমূহের ব্যাখ্যা

লেখক: শাইখ আব্দুর রহমান ইবন নাসের আস-সা‘দী 

সংকলন, গবেষণা ও প্রস্তুতকরণ:

ড: ‘উবাইদুল্লাহ ইবন ‘আলী আল ‘উবাইদ

সহকারী অধ্যাপক, কুরআনুল কারীম অনুষদ, মদীনা বিশ্ববিদ্যালয়

 

সূচিপত্র

ক্রম বিষয় পৃষ্ঠা
1. ভূমিকা  
2. আল্লাহর নিরানব্বই নাম সংক্রান্ত হাদীস ও এ সংক্রান্ত বিস্তারিত আলোচনা  
3. দ্বিতীয় অধ্যয়: আল্লাহর সু্ন্দর নামসমূহের ব্যাখ্যা উপস্থাপন  
4. ১- আল-ইলাহ  
5. ২- আল্লাহ  
6. ৩- আল-আহাদ (এক)  
7. – আল-‘আলা (সুমহান)  
8. ৫- আল-আউয়াল (প্রথম)  
9. ৬- আল-আখির (শেষ)  
10. ৭- আল-বারী (নির্মাণকারী, পরিকল্পনাকারী)  
11. ৮- আল-বাসিত (প্রসারণকারী)  
12. ৯- আল-বাতিন (লুকায়িত, অস্পষ্ট, অন্তরস্থ)  
13. ১০- বাদী‘উস সামাওয়াতে ওয়াল আরদি (আসমান ও জমিনের স্রষ্টা)  
14. ১১- আল-বার (কল্যাণকারী)  
15. ১২- আল-বাসীর (সর্বদ্রষ্টা)  
16. ১৩- আত-তাওয়াব (তাওবা কবুলকারী, ক্ষমাকারী)  
17. ১৪- জামি‘উন নাস (মানুষকে সমবেতকারী)  
18. ১৫- আল-জাব্বার (মহাপ্রতাপশালী, অতীব মহিমান্বিত)  
19. ১৬-  আল-জালীল (গৌরবান্বিত)  
20. ১৭- আল-জামীল (সুন্দর)  
21. ১৮-আল-জাওয়াদ (মহা দানশীল)  
22. ১৯- আল-হাসীব (মহা মীমাংসাকারী, হিসাব গ্রহণকারী)  
23. ২০- আল-হাফীয (মহা সংরক্ষণকারী)  
24. ২১- আল-হাক্ক (প্রকৃত সত্য)  
25. ২২- আল-হাকাম (মহা বিচারপতি, হুকুমদাতা)  
26. ২৩- আল-হাকীম (সুবিজ্ঞ, সুদক্ষ)  
27. ২৪- আল-হালীম (মহা সহনশীল, মহা ধৈর্যশীল, প্রশ্রয়দাতা)  
28. ২৫- আল-হামীদ (সকল প্রশংসার দাবীদার, মহা প্রশংসনীয়)  
29. ২৬- আল-হাইয়্যু (চিরঞ্জীব, যার কোন শেষ নেই)  
30. ২৭- আল-হাই (লজ্জাশীল, মহা গোপনকারী, আড়ালকারী)  
31. ২৮- আল-খাফিদ (অবিশ্বাসীদের অপমানকারী)  
32. ২৯- আল-খালিক (সৃষ্টিকর্তা, সৃষ্টিকারী)  
33. ৩০- আল-খাবীর (সম্যক অবগত, সর্বজ্ঞ)  
34. ৩১- যুল জালালি ওয়াল-ইকরাম (মহা মর্যাদাবান, মহা মহত্ত্ব ও মহা সম্মানিত)  
35. ৩২- আর-রঊফ (অত্যন্ত স্নেহশীল, সদয়, সমবেদনা প্রকাশকারী, দয়াশীল)  
36. ৩৩- আর-রাফি‘(উন্নীতকারী, উঁচুকারী)  
37. ৩৪- আর-রাব (রব, পালনকারী)  
38. ৩৫- আর-রহমান (পরম করুণাময়, সবচেয়ে দয়ালু, কল্যাণময়)  
39. ৩৬-আর-রাহীম (অতি দয়ালু)  
40. ৩৭- আর-রাযযাক (রিযিকদাতা)  
41. ৩৮- আর-রাশীদ (সঠিক পথের নির্দেশক, বিচক্ষণ, সচেতন)  
42. ৩৯- আর-রফীক (কোমল, নম্র ব্যবহারকারী)  
43. ৪০- আর-রাকীব (পর্যবেক্ষক, সদা জাগ্রত, অতন্দ্র পর্যবেক্ষণকারী)  
44. ৪১-৪২ আস-সাত্তার, আস-সাতীর (অতি গোপনকারী)  
45. ৪৩- আস-সালাম (শান্তি ও নিরাপত্তার উৎস, ত্রাণকর্তা)  
46. ৪৪- আস-সামী‘ (সর্বশ্রোতা)  
47. ৪৫-৪৬ আশ-শাকির (পুরস্কার দানকারী, শুকরিয়াকারী), আশ-শাকূর (গুণগ্রাহী, সুবিবেচক)  
48. ৪৭- আশ-শাহীদ (প্রত্যক্ষদর্শী)  
49. ৪৮- আস-সাবূর (অত্যধিক ধৈর্যধারণকারী)  
50. ৪৯- আস-সামাদ (অমুখাপেক্ষী, অবিনশ্বর, চিরন্তন, স্বয়ং সম্পূর্ণ)  
51. ৫০-৫১- আদ-দার (যন্ত্রনাদানকারী, উৎপীড়নকারী), আন-নাফি‘ (অনুগ্রাহক, হিতকারী, উপকারকারী)  
52. ৫২- আয-যাহির (সুস্পষ্ট, সুপ্রতীয়মান, বাহ্য, দৃশ্যত)  
53. ৫৩- আল-‘আদল (নিখুঁত)  
54. ৫৪- আল-আযীয (সর্বাধিক সম্মানিত, মহাসম্মানিত)  
55. ৫৫- আল-আযীম (মহা মর্যাদাপূর্ণ, অতি বিরাট)  
56. ৫৬- আল-‘আফুউ (শাস্তি মউকুফকারী, গুনাহ ক্ষমাকারী, পাপ মোচনকারী)  
57. ৫৭- আল-‘আলী (সুউচ্চ)  
58. ৫৮- আল-‘আলীম (মহাজ্ঞানী)  
59. ৫৯-৬০- আল-গাফূর (মার্জনাকারী, অতীব ক্ষমাশীল), আল-গাফফার (অতি ক্ষমাশীল, পরম ক্ষমাশীল)  
60. ৬১-৬২- আল-গানিয়ু (অমুখাপেক্ষী), আল-মুগনি (সমৃদ্ধকারী, উদ্ধারকারী)  
61. ৬৩- আল-ফাত্তাহ (শ্রেষ্ঠ ফয়সালাকারী, প্রারম্ভকারী, বিজয়দানকারী)  
62. ৬৪- ফা‘আলুল লিমা ইউরীদ (তিনি তা-ই করেন যা চান)  
63. ৬৫- আল-কাবিদ (নিয়ন্ত্রণকারী), আল-বাসিত (প্রসারণকারী)  
64. ৬৬-আল-কারীব (অতি নিকটবর্তী)  
65. ৬৭- আল-কুদ্দূস (পূত:পবিত্র, নিখুঁত)  
66. ৬৮-আল-কাদীর (মহা ক্ষমতাধর)  
67. ৬৯- আল-কাহহার (মহাপ্রতাবশালী, দমনকারী)  
68. ৭০- আল-কাবীউ (সর্বশক্তিমান, শক্তিশালী)  
69. ৭১- আল-কাইয়্যূম (চিরন্তন)  
70. ৭২-আল-কাফী (যথেষ্ট)  
71. ৭৩- আল-কাবীর (সুমহান, সবচেয়ে বড়)  
72. ৭৪- আল-কারীম (মহা সম্মানিত, মহা দয়ালু)  
73. ৭৫- আল-লাতীফ (সূক্ষ্মদর্শী, অমায়িক)  
74. ৭৬– আল-মালিক (অধিপতি, মালিক)  
75. ৭৭– আল-মানি‘ (প্রতিরোধকারী, রক্ষাকর্তা, নিষেধকারী, বারণকারী)  
76. ৭৮- আল-মুবদিয়ু (প্রথম সৃষ্টিকারী, অগ্রণী, প্রথম প্রবর্তক)  
77. ৭৯- আল-মুতাকাব্বির (সর্বশ্রেষ্ঠ, গৌরবান্বিত, অহংকারী)  
78. ৮০-আল-মাতীন (সুদৃঢ়, সুস্থির)  
79. ৮১-আল-মুজীব (সাড়া দানকারী, উত্তরদাতা, দো‘আ কবুলকারী)  
80. ৮২- আল-মাজীদ (মহিমান্বিত, সম্মানিত)  
81. ৮৩- আল-মুহীত (পরিবেষ্টনকারী, সর্ব বেষ্টনকারী)  
82. ৮৪- আল-মুযিল (সম্মান হরণকারী)  
83. ৮৫- আল-মুসাওয়ির (আকৃতিদানকারী)  
84. ৮৬- আল-মু‘ইজ (সম্মান প্রদানকারী)  
85. ৮৭-আল-মু‘তী (দানকারী)  
86. ৮৮- আল-মু‘ঈদ (পুনরুত্থানকারী, পুনরুদ্ধারকারী, পুন:প্রতিষ্ঠাকারী)  
87. ৮৯-আল-মুগনী (সমৃদ্ধকারী, উদ্ধারকারী)  
88. ৯০- আল-মুগীস (সাহায্যকারী, বিপদে রক্ষাকারী)  
89. ৯১- আল-মুকাদ্দিম (সর্বাগ্রে সহায়তা প্রদানকারী)  
90. ৯২- আল-মুকীত (সংরক্ষণকারী, লালনপালনকারী)  
91. ৯৩- আল-মালিক (অধিপতি, মালিক)  
92. ৯৪- আল-মুহাইমিন (রক্ষক, অভিভাবক, প্রতিপালনকারী)  
93. ৯৫- আল-মু’আখখির (বিলম্বকারী)  
94. ৯৬- আল-মু’মিন (নিরাপত্তাদানকারী, জামিনদার, সত্য ঘোষণাকারী)  
95. ৯৭- আন-নাফি‘ (অনুগ্রাহক, উপকারকারী, হিতকারী)  
96. ৯৮- আন-নূর (আলোক)  
97. ৯৯- আল-হাদী (হিদায়েতকারী, পথপ্রদর্শক)  
98. ১০০- আল-ওয়াহিদ (এক)  
99. ১০১- আল-ওয়াসি‘ (অসীম, ব্যাপক)  
100. ১০২- আল-ওয়াদূদ (প্রেমময়, পরম স্নেহশীল)  
101. ১০৩- আল-ওয়াকীল (তত্ত্বাবধায়ক, সহায় প্রদানকারী, আস্থাভাজন উকিল)  
102. ১০৪- আল-ওয়াহহাব (দানশীল, স্থাপনাকারী)  
103. উপসংহার  

 

 

 

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম

ভূমিকা

নিশ্চয়ই সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর। আমরা তাঁর প্রশংসা করি, তাঁর কাছেই সাহায্য কামনা করি, তাঁর নিকটই ক্ষমা প্রার্থনা করি, আমাদের নিজেদের অনিষ্ট থেকে ও আমাদের খারাপ কাজ থেকে তাঁর কাছে আশ্রয় চাই। আল্লাহ যাকে হিদায়াত দান করেন তাঁর কোন পথ ভ্রষ্টকারী নেই এবং যাকে তিনি বিপথগামী করেন তাঁর কোন পথ নির্দেশকারী নেই। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া কোন (সত্য) ইলাহ নেই, তিনি একক, তাঁর কোন শরীক নেই। আমি আরো সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর বান্দা ও রাসুল। আল্লাহর শান্তি বর্ষিত হোক তাঁর উপর এবং তাঁর পরিবার-পরিজন ও সাথীবর্গের উপর।

﴿يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ ٱتَّقُواْ ٱللَّهَ حَقَّ تُقَاتِهِۦ وَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنتُم مُّسۡلِمُونَ١٠٢﴾ [ال عمران: ١٠٢]

“হে মুমিনগণ, তোমরা যথার্যভাবে আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন করো এবং তোমরা মুসলিম (পরিপূর্ণ আত্মসমর্পণকারী) না হয়ে কোন অবস্থায় মারা যেও না।” [সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ১০২]

এ কিতাবটিতে আসমাউল্লাহিল হুসনা তথা আল্লাহর সুন্দর গুণবাচক নামসমূহের ব্যাখ্যা বিশদভাবে দলিল সহকারে আলোচনা করা হয়েছে। কিতাবটি লেখক নিম্নোক্ত পদ্ধতিতে বিভক্ত করেছেন।[1]

অভিসন্দর্ভ পরিকল্পনা:

বইটি একটি ভূমিকা ও দু’টি অধ্যায় সম্বলিত যাতে আমি উল্লেখ করেছি:

১- বিষয়বস্তুর গুরুত্ব।

২- বিষয় নির্বাচনের কারণসমূহ।

৩- গবেষণা পরিকল্পনা।

৪- গবেষণার ক্ষেত্রে আমার অবলম্বিত পদ্ধতি।

প্রথম অধ্যায়[2]: গবেষণা, যা চার ভাগে বিভক্ত:

প্রথম ভাগ: শাইখ আবদুর রাহমান আস-সা‘দী রহ. এর সংক্ষিপ্ত জীবনী।

দ্বিতীয় ভাগ: আসমাউল হুসনার ক্ষেত্রে শাইখ ইবন আস-সা‘দী রহ. এর অনুসৃত পদ্ধতি।

তৃতীয় ভাগ: আল্লাহ তা‘আলার নামসমূহ “তাওক্বীফি” তথা কুরআন ও হাদীসে যেগুলো যেভাবে এসেছে সেগুলোই সেভাবে সাব্যস্ত করা।

চতুর্থ ভাগ: “আল্লাহ তা‘আলার নিরানব্বই নাম” সংক্রান্ত হাদীস ও এই বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা।

দ্বিতীয় অধ্যায়: শাইখ আসসা‘দী রচিত “আল্লাহ তা‘আলার সুন্দর নামসমূহের ব্যাখ্যা” গ্রন্থটি সংকলন ও গবেষণার পর পরিমার্জিতরূপে পাঠকের সামনে পেশ।

বইটির ক্ষেত্রে আমার অবলম্বিত পদ্ধতি:

প্রথমত: শাইখ আবদুর রাহমান আস-সা‘দী রহ. রচিত নিম্নোক্ত গ্রন্থাবলী থেকে লেখার উপাদান সংগ্রহ:

১- তাইসিরুল কারীমির রাহমান ফি তাফসীরি কালামিল মান্নান।

২- তাইসিরুল লাত্বিফিল মান্নান ফি খুলাসাতি তাফসীরিল কুরআন, যেটিকে আমি সূত্র উল্ল্যেখ করার সময় সংক্ষেপে “আল-খুলাসাহ” নামে ইশারা করেছি।

৩- তাওদীহুল কাফিয়্যাহ আশ-শাফিয়্যাহ।

৪- আল হাক্বুল ওয়াদিহুল মুবিন ফি শারহি তাওহীদিল আম্বিয়ায়ি ওয়াল মুরসালীন মিনাল কাফিয়াতিশ শাফিয়াহ।

৫- আল মাওয়াহিবুর রাব্বানিয়্যাহ মিনাল আয়াতিল কুরআনিয়্যাহ।

৬- বাহজাতু কুলুবিল আবরার ওয়া কুররাতু ‘উয়ূনিল আখইয়ার ফি শারহি জাওয়ামিয়িল আখবার।

৭- মাজমু‘ঊল ফাওয়ায়িদ ওয়াক্বতিনাসুল আওয়াবিদ।

দ্বিতীয়ত: আল্লাহ তা‘আলার গুণবাচক নামসমূহের মাঝে প্রত্যেক নামের ব্যাপারে শাইখ আস-সা‘দী যা বলেছেন সেগুলো গভীর ভাবে বিবেচনার পর গ্রন্থায়ণ ও বিন্যাস, এবং যে সব বিষয় একাধীকবার এসেছে সেগুলো বাদ দিয়ে পরিমার্জিতরূপে সংকলন।

তৃতীয়ত: আসমা’ঊল হুসনাকে বর্ণমালার অক্ষরক্রমিকে বিন্যাস ও ক্রমানুসারে সংখ্যায়িত করে প্রত্যেক নামের ব্যাপারে শাইখ আস-সা‘দীর বক্তব্যকে উদ্ধৃতি চিহ্নের মাধ্যমে পেশ।

চতুর্থত: আসমা’ঊল হুসনার মাঝে কোনো নাম যদি শাইখ আস-সা‘দী দলিলায়ীত না করে থাকেন; সেক্ষেত্রে কুরআন ও হাদীস থেকে দলিল পাওয়া গেলে তাকে দলিল প্রমানের মাধ্যমে প্র প্রমাণিত রূপে উপস্থাপন করে তা পাদটীকায় উল্লেখ করা।

পঞ্চমত: কোথাও যদি টীকা-টিপ্পনী, মন্তব্য ইত্যাদির মাধ্যমে বাক্যকে স্পষ্ট করার প্রয়োজন পড়ে তাহলে সেখানে তা করেছি।

ষষ্ঠত:  কুরআনের আয়াতসমূহকে সূরা ও নাম্বার সহকারে উল্ল্যেখ করেছি।

সপ্তমত: গ্রন্থে উল্লিখিত হাদীসসমূহের সূত্র ইত্যাদি বর্ণনা।

অষ্টমত: গ্রন্থের শেষে আলোচনার সারনির্যাস উল্ল্যেখ করে গবেষণাকালীন সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ যে সব ফলাফলে আমি উপনীত হয়েছি তার উপসংহার টানা।

নবমত: বইয়ের আবশ্যকীয় সূচীপত্র তৈরী।

পরিশেষে, সমস্ত প্রশংসাই আল্লাহ তা‘আলার জন্য, তাঁর অনুগ্রহেই কাজটির সমাপ্তি সম্ভব হয়েছে, সর্বাবস্থাই তাঁর জন্য কৃতজ্ঞতা, এই সংকলনটির যাবতীয় কাজ ও প্রকাশ প্রক্রিয়া সহজ করে দেওয়ার জন্য আল্লাহর প্রশংসা জ্ঞাপন করছি। আশা করছি তিনি এর সংগ্রহকারী, পাঠক, ও শ্রোতা সবাইকে এর দ্বারা উপকৃত করবেন।

এমনিভাবে আমি দয়াময় আল্লাহর নিকট এই কাজ ও আমার অন্যান্য সকল কাজের কাবুলিয়্যাতের দো‘আ করছি, নিশ্চয়ই তিনি শ্রবণকারী ও সাড়াদানকারী।

আমাদের নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, তাঁর পরিবারবর্গ, ও সঙ্গী-সাথী সকলের উপর দুরুদ ও শান্তি বর্ষিত হোক।

 

 

 

 

আল্লাহর নিরানব্বই নাম সংক্রান্ত হাদীস ও

এ সংক্রান্ত বিস্তারিত আলোচনা

 

আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

«لِلَّهِ تِسْعَةٌ وَتِسْعُونَ اسْمًا، مِائَةٌ إِلَّا وَاحِدًا، لاَ يَحْفَظُهَا أَحَدٌ إِلَّا دَخَلَ الجَنَّةَ، وَهُوَ وَتْرٌ يُحِبُّ الوَتْرَ»

“আল্লাহর নিরানব্বইটি নাম রয়েছে। যে ব্যক্তি তা হিফাযত করবে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। আর আল্লাহ বেজোড়। তিনি বেজোড় পছন্দ করেন।”

وَفِي رِوَايَةِ ابْنِ أَبِي عُمَرَ: «مَنْ أَحْصَاهَا»

ইবন আবু উমর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুর বর্ণনায় (হিফাযত করে) এর স্হলে (যে গণনা করে) উল্লেখ আছে।[3]

উপরোক্ত বর্ণনাসূত্র ছাড়াও এ হাদীসের অনেক বর্ণনাসূত্র রয়েছে তাতে আল্লাহর নামসমূহ উল্লেখ আছে। হাদীসটি তিনটি সূত্রে তিরমিযীতে[4], ইবন মাজায়[5] ও মুসতাদরাক হাকেমে[6] বর্ণিত আছে[7]। এসব সূত্র সনদের দিক থেকে দুর্বল। আর মতনের দিক আলেমগণ ও মুহাক্কিকগণ তাদের মতামত পেশ করেছেন। নিচে তাদের কিছু মতামত উল্লেখ করা হলো:

  • বায়হাকী রহ. আব্দুল আযীয ইবন হুসাইন থেকে বর্ণিত হাদীসের ব্যাপারে বলেন, সম্ভবত কতিপয় বর্ণনাকারীর থেকে কিছু ব্যাখ্যা অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এমনিভাবে ওয়ালীদ ইবন মুসলিমের বর্ণনায়ও।[8]
  • শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ রহ. বলেন, হাদীস বিশরদগণ ঐক্যমত পোষণ করেছেন যে, ওয়ালীদ ইবন মুসলিমের সূত্রে তিরমিযীর বর্ণনা ও আব্দুল মালিক ইবন মুহাম্মাদের সূত্রে ইবন মাজার বর্ণনা রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণী নয়; বরং তা কতিপয় সালাফের কথা।[9]
  • তিনি আরো বলেন, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে নির্দিষ্টভাবে আল্লাহর নিরানব্বইটি নাম বর্ণনা নেই। এ ব্যাপারে মানুষের কাছে যেসব বর্ণনা পাওয়া যায় তার মধ্যে সর্বাধিক প্রসিদ্ধ হাদীস হলো ওয়ালীদ ইবন মুসলিম- শু‘আইব ইবন আবু হামযা থেকে বর্ণিত তিরমিযীতে বর্ণিত হাদীস। হাদীসের হাফিযগণ এ হাদীসের ব্যাপারে বলেছেন, হাদীসের মধ্যে এ সংযোজন বর্ণনাকারী ওয়ালীদ ইবন মুসলিম তার হাদীস বিশরদ শাইখদের থেকে সংযোজন করেছেন। এ ব্যাপারে ইবন মাজাহ বর্ণিত আরেকটি হাদীস আছে যা আরও দুর্বল। এ দু’ধরণের বর্ণনা ছাড়াও সালাফদের কেউ কেউ অন্য সূত্রে বর্ণনাকারীদের সংখ্যা উল্লেখ করেছেন।[10]
  • ইবন কাসীর রহ. বলেন, হাদীসের হাফিযগণ এ ব্যাপারে একমত যে, তিরমিযীতে ওয়ালীদ ইবন মুসলিম থেকে বর্ণিত হাদীসে উল্লিখিত আল্লাহর নামসমূহ বর্ণনাকারীদের কর্তৃক প্রবিষ্ট করা হয়েছে। মূলত ওয়ালীদ ইবন সালাম ও আব্দুল্লাহ ইবন মুহাম্মাদ আস-সান‘আনী যুহাইর ইবন মুহাম্মাদ থেকে বর্ণনা করেন যে, তার কাছে একাধিক আহলে ইলম থেকে সংবাদ পৌঁছেছে যে, তারা কুরআন থেকে এ সব নাম সংগ্রহ করে হাদীসে একত্রিত করেছেন।[11]
  • ইবন হাজার আসকালানী রহ. বলেন, তাহকীক করার পরে প্রতিয়মান হয়েছে যে, হাদীসে এসব নাম বর্ণনাকারীদের দ্বারা অন্তর্ভুক্তিকরণ হয়েছে।[12]
  • ইবন হাজার রহ. ইবন ‘আতীয়্যাহ রহ. থেকে বর্ণনা করেন, তিরমিযী রহ. বর্ণিত হাদীস মুতাওয়াতির নয় এবং এর সনদে কতিপয় বর্ণনাকারী রয়েছেন যারা শায তথা অপরিচিত।[13]

 

 

দ্বিতীয় অধ্যয়

শাইখ আস-সা‘দীর কর্তৃক প্রণীত গ্রন্থসমূহ অবলম্বনে

আল্লাহর সু্ন্দর নামসমূহের ব্যাখ্যা উপস্থাপন

 

১- আল-ইলাহ [14]:

গ্রন্থকার শাইখ আস-সা‘দী রহ. বলেছেন, ইলাহ হলেন যার মধ্যে সমস্ত পূর্ণাঙ্গ গুণাবলী ও মহান আল্লাহর সমস্ত বৈশিষ্ট্য একত্রিত হয়েছে। এ নামের মধ্যে আসমাউল হুসনার সমস্ত নাম সন্নিবেশিত হয়েছে। এ কারণেই এ কথা বলা বিশুদ্ধ যে, আল্লাহই মূলত ইলাহ। কেননা আল্লাহ এমন এক নাম যার মধ্যে সমস্ত আসমাউল হুসনা তথা আল্লাহর সুন্দরতম নামসমূহ ও সুউচ্চ গুণাবলীসমূহ একত্রিত হয়েছে। আল্লাহই সর্বাধিক জ্ঞাত।[15]

২- আল্লাহ [16] :

গ্রন্থকার রহ. বলেছেন, আল্লাহ হলেন সাধারণত যার ইবাদত করা হয়, যিনি নির্ভরশীল মা‘বূদ এবং সমস্ত সৃষ্টির উপর ইলাহ ও মা‘বূদ হওয়ার যোগ্য। তিনি ইলাহ হওয়ার সমস্ত গুণাবলীতে গুণান্বিত।[17] আল্লাহ নিজেই বলেছেন, তাঁর মধ্যে উলুহিয়্যাতের সমস্ত গুণাবলী একত্রিত হয়েছে। তিনিই সমস্ত দিক থেকে একমাত্র ইলাহ হওয়ার যোগ্য যা তাকে একমাত্র মা‘বুদ হওয়া আবশ্যক করে, তিনিই একমাত্র প্রশংসা ও শুকরিয়া পাওয়ার অধিকারী, তিনি মহান, মহাপবিত্র, মহাশক্তিধর, মহাসম্মানিত ও মহামর্যাদাবান।[18]

আল্লাহর নামের মধ্যে আসমাউল হুসনার সমস্ত নাম ও সুউচ্চ সিফাত একত্রিত হয়েছে। আল্লাহই অধিক ভালো জ্ঞাত।[19]

আল্লাহ নামটি চিন্তা-গবেষণা করলে দেখা যায়, আল্লাহ নামের মাঝেই ইলাহিয়্যাতের সব অর্থ বিদ্যমান। এ নামটি পরিপূর্ণ সিফাত ও একমাত্র তাঁরই জন্য নির্ধারিত এবং তাঁর কাজে কেউ অংশীদার নেই। কেননা অনুরক্তর (যাকে সবাই ভালোবাসে) মাঝে সমস্ত পূর্ণাঙ্গ গুণাবলী থাকার কারণেই সবাই তাকে ভালোবাসে এবং তাঁর পরিপূর্ণ গুণাবলীর কারণেই তাঁর কাছে নতজানু ও বিনয়ী হয়। পূর্ণাঙ্গ গুণাবলীর কোন গুণই সর্বদিক বিবেচনায় মহান আল্লাহর থেকে বাদ পড়ে না। অথবা তিনি তাদের উপকার করেন, তাদের দেখ-ভাল করেন ও সাহায্য-সহযোগিতা করেন তাই তারা তাঁর দিকে ঝুঁকেন বা তাঁর ইবাদত করেন। ফলে ইবাদতকারীর প্রতি কল্যাণ বর্ষিত হয় এবং তাদের থেকে অকল্যাণ ও ক্ষয়-ক্ষতি প্রতিহত হয়। এ কথা সকলেই অবগত আছে যে, নিশ্চয়ই আল্লাহ তা‘আলাই সব কিছুর মালিক। তাঁর সৃষ্টির কেউ নিজের যেমন মালিক নন তেমনি অন্যেরও মালিক নন, তারা নিজের যেমন কোন উপকার বা ক্ষতি সাধন করতে পারে না তেমনি অন্যেরও কোন উপকার বা ক্ষতি সাধন করতে পারে না। এমনিভাবে তারা নিজেদের ও অন্য কারো জীবন, মৃত্যু, পুনরুত্থান কোন কিছুই দিতে পারে না। কারো মনে যখন এ কথা গেঁথে যাবে যে, আল্লাহ তা‘আলাই একমাত্র ইলাহ ও আশ্রয়দাতা তখন বান্দার ভালোবাসা, ভয় ও প্রত্যাশা সবকিছুর তার রবের সাথে সম্পৃক্ত হওয়া অত্যাবশ্যকীয় হয়ে যাবে। সবকিছুতেই সে তাঁর কাছে ফিরে যাবে, তিনি ব্যতীত সৃষ্টিকুলের সবকিছু থেকেই চাওয়ার প্রত্যাশা বর্জন করবে, যাদের নিজেদেরই পরিপূর্ণতা নেই, তারা নিজেরা কর্ম সম্পাদনকারী নন। সুউচ্চ ও সুমহান আল্লাহ ব্যতীত কোন শক্তিদাতা ও সাহায্যকারী নেই।[20]

শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ রহ. কে আল্লাহর নামসমূহের মধ্যে ইসমে আ‘যম তথা সবচেয়ে বড় নামের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করা হলো। সবচেয়ে বড় নাম কি আল্লাহর নির্দিষ্ট ও সুপরিচিত না-কি তা অনির্দিষ্ট ও অপরিচিত?

তিনি এ প্রশ্নের উত্তরে বলেন, কিছু লোক মনে করেন যে, আসমাউল হুসনা তথা আল্লাহর সুন্দর নামসমূহের মধ্যে ইসমে আ‘যম তথা আল্লাহর সর্বাধিক মহান নামটি শুধু তিনি যাদেরকে নির্বাচিত করেন সেসব বিশেষ বান্দাগণ কারামতের মাধ্যমে জানেন, যা সাধারণ নিয়মের বহির্ভূত। মূলত এ ধারণাটি ভুল। কেননা আল্লাহ তা‘আলা তাঁর নামসমূহ ও তাঁর সিফাতসমূহ জানার জন্য আমাদেরকে উৎসাহিত করেছেন। যারা তাঁর নামসমূহ জানেন, এগুলোর ব্যাপারে গভীর জ্ঞান রাখেন, ইবাদত ও দো‘আয় এসব নামে তাঁকে ডাকেন এবং কিছু চাওয়ার ক্ষেত্রে যারা তাঁর কাছে এসব নামে চায় তাদের তিনি প্রশংসা করেছেন। নি:সন্দেহে আসমাউল হুসনার অগ্রবর্তী নামই আল্লাহর সর্বাধিক মহান নাম (ইসমে আ‘যম)। যেমন আল্লাহ তা‘আলা সর্বময় দানশীল যার বদান্যতা ও দানশীলতা শেষ হওয়ার নয়। তিনি বান্দাকে দান করতে পছন্দ করেন। তাঁর দানের মধ্যে সর্বাধিক দানপ্রাপ্ত ব্যক্তি হলেন যাকে তিনি তাঁর আসমাউল হুসনা ও তাঁর সুমহান সিফাতসমূহ জানার ও বুঝার বদান্যতা দান করেছেন। অত:এব, সঠিক কথা হলো আল্লাহর সব নামই সুন্দর এবং সবগুলোই মহান; তবে সর্বাধিক মহান নাম হলো যেসব নাম তাঁর জন্যই একক বা অন্যের সাথে মিলিত হলেও তা তাঁর সত্ত্বাগত যাবতীয় গুণাবলী বা তাঁর কর্মগত যাবতীয় গুণাবলী বা যাবতীয় গুণাবলীর উপর প্রমাণ করে। যেমন, আল্লাহ এমন একটি নামটি ইসমে জামে‘ যার মধ্যে উলুহিয়্যাত তথা ইলাহ হওয়ার যাবতীয় গুণাবলী বিদ্যমান, এ নামটিতে সমস্ত পূর্ণাঙ্গ গুণাবলী একত্রিত হয়েছে। এমনিভাবে আল-হামীদ (মহা প্রশংসিত) ও আল-মাজীদ (মহিমান্বিত, সম্মানিত)। আল-হামীদ এমন একটি নামকে বুঝায় যাতে সকল প্রশংসাকারীদের যাবতীয় প্রশংসা ও আল্লাহর পরিপূর্ণতা একত্রিত হয়েছে। আর মাজীদ বলা হয় যাতে মহান ও উচ্চ-মর্যাদাবান হওয়ার যাবতীয় গুণাবলী একত্রিত হয়েছে। এ নামের কাছাকাছি অর্থের নাম হলো আল-জালীল (মহা মহিয়ান), আল-জামীল (মহা মনোরম), আল-গানী (অমুখাপেক্ষী) এবং আল-কারীম (মহা সম্মানিত)।

যেমন আল-হাইয়্যু (চিরঞ্জীব) ও আল-কাইয়্যূম (চিরন্তন)। আল-হাইয়্যু বলা হয় যার রয়েছে মহাপরিপূর্ণ জীবন যাতে সত্ত্বার (যাতের) যাবতীয় অর্থ বিদ্যমান। আর কাইয়্যূম হলো যিনি নিজে নিজেই প্রতিষ্ঠিত, বিদ্যমান, শ্বাশত, তিনি সব সৃষ্টি থেকে মুখাপেক্ষীহীন এবং সকল সৃষ্টি তিনিই সৃষ্টি করেছেন। এটি এমন একটি নাম যাতে যাবতীয় কর্মের গুণাবলী প্রবিষ্ট হয়েছে।

আল্লাহর আরো অন্য নামের মধ্যে রয়েছে আল-‘আযীম (মহা মর্যাদাপূর্ণ, অতি বিরাট) এবং আল-কাবীর (অতি বৃহৎ, অতি মহান) যাতে তাঁর নামসমূহ ও সিফাতসমূহের যাবতীয় মহত্ব, বড়ত্ব, অহমিকা একত্রিত হয়েছে। তাঁর সকল সৃষ্টির যাবতীয় সম্মান ও মর্যাদা প্রশর্দন একমাত্র তাঁরই জন্য। যেমন তুমি বলো, ‘ইয়া যাল-জালালি ওয়াল ইকরাম’ (হে মহা মর্যাদাবান, মহা মহত্ত্ব ও মহা সম্মানিত)। কেননা আল-জালাল (মহা মহত্ত্ব) হলো বড়ত্ব, মহত্ত্ব, অহমিকা ও সর্বদিকের পরিপূর্ণতার গুণ। আর ইকরাম (মহা সম্মানিত) হলো বান্দা কর্তৃক তাঁকে মহা সম্মান প্রদর্শন ও তাঁর সম্মুখে সর্বোচ্চ অপমান ও লাঞ্ছনাবোধ বা এরূপ আরো কিছু করা।

অত:এব, উপরোক্ত আলোচনা থেকে এ কথা প্রতীয়মান হয় যে, ইসমে আ‘যম (সর্বশ্রেষ্ঠ নাম) হলো ইসমে জিনস (সমষ্টিগত নাম)। শরী‘আতের দলীল ও বুৎপত্তিগত[21] অর্থ এ মতটিই প্রমাণ করে। যেমন সুনানের কিতাবে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক ব্যক্তিকে দো‘আ করতে শুনলেন। সে বলছিল,

«اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ بِأَنِّي أَشْهَدُ أَنَّكَ أَنْتَ اللَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ الأَحَدُ الصَّمَدُ، الَّذِي لَمْ يَلِدْ وَلَمْ يُولَدْ وَلَمْ يَكُنْ لَهُ كُفُوًا أَحَدٌ» ، قَالَ: فَقَالَ: «وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ لَقَدْ سَأَلَ اللَّهَ بِاسْمِهِ الأَعْظَمِ الَّذِي إِذَا دُعِيَ بِهِ أَجَابَ، وَإِذَا سُئِلَ بِهِ أَعْطَى».

“হে আল্লাহ নিশ্চয় আমি আপনার কাছে প্রার্থনা করছি, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আপনিই একমাত্র আল্লাহ যিনি ব্যতীত কোন ইলাহ নেই, আপনি একক ও অমুখাপেক্ষী, যিনি কাউকে জন্ম দেন নি এবং কারো থেকে জন্মও নেন নি, আর তাঁর কোন সমকক্ষও নেই।” রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন বললেন, যে সত্তার হাতে আমার প্রাণ সেই সত্তার কসম! এই ব্যক্তি আল্লাহর কাছে এমন ইসমে আ‘যমের (সর্বশ্রেষ্ঠ নামের) মাধ্যমে দো‘আ করছে যার উসিলায় দো‘আ করা হলে আল্লাহ তা’আলা কবুল করেন এবং যার উসিলায় প্রার্থনা করা হলে তিনি দান করেন।[22]

তাছাড়াও অন্য হাদীসে এসেছে, এক ব্যক্তি দো‘আয় বলল,

«اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ بِأَنَّ لَكَ الْحَمْدَ لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ الْمَنَّانُ بَدِيعُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ، يَا ذَا الْجَلَالِ وَالْإِكْرَامِ، يَا حَيُّ يَا قَيُّومُ، إِنِّي أَسْأَلُكَ، فَقَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لِأَصْحَابِهِ: «تَدْرُونَ بِمَا دَعَا؟» قَالُوا: اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَعْلَمُ، قَالَ: «وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ، لَقَدْ دَعَا اللَّهَ بِاسْمِهِ الْعَظِيمِ، الَّذِي إِذَا دُعِيَ بِهِ أَجَابَ، وَإِذَا سُئِلَ بِهِ أَعْطَى».

“হে আল্লাহ নিশ্চয় আমি আপনার কাছে প্রার্থনা করছি, নিশ্চয় সমস্ত প্রশংসা আপনার, আপনি ব্যতীত কোন ইলাহ নেই, আপনি দানশীল, আসমান ও জমিনের সৃষ্টিকারী। হে মর্যাদা ও ঔদার্য প্রদানকারী, হে চিরঞ্জীব ও সুপ্রতিষ্ঠিত ধারক, আমি আপনার নামের উসিলায় আপনার কাছে প্রার্থনা করছি। তখন নবী রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর সাহাবীগণকে বললেন, তোমরা কি জান সে কিসের দ্বারা দো‘আ করল? তারা বললেন, আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলই ভালো জানেন। তখন তিনি বললেন, যার হাতে আমার প্রাণ তার শপথ, সে আল্লাহর ঐ ইসমে আযম দ্বারা দো‘আ করেছে যা দ্বারা কেউ দো‘আ করলে তিনি তা কবুল করেন, আর যা দ্বারা কিছু চাওয়া হলে তিনি তা দান করেন।”[23]

এছাড়া রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

اسْمُ اللَّهِ الْأَعْظَمُ فِي هَاتَيْنِ الْآيَتَيْنِ: ﴿وَإِلَٰهُكُمۡ إِلَٰهٞ وَٰحِدٞۖ لَّآ إِلَٰهَ إِلَّا هُوَ ٱلرَّحۡمَٰنُ ٱلرَّحِيمُ١٦٣﴾ [البقرة: ١٦٣] ، وَفَاتِحَةِ سُورَةِ آلِ عِمْرَانَ: ﴿الٓمٓ١ ٱللَّهُ لَآ إِلَٰهَ إِلَّا هُوَ ٱلۡحَيُّ ٱلۡقَيُّومُ٢﴾ [ال عمران: ١،  ٢]  .

“আল্লাহর ইসমে আ‘যম নিম্নোক্ত দুটি আয়াতে রয়েছে। আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন, “আর তোমাদের ইলাহ এক ইলাহ। তিনি ছাড়া কোন (সত্য) ইলাহ নেই। তিনি অতি দয়াময়, পরম দয়ালু।” [সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ১৬৩], সূরা আলে ইমরানের শুরুতে আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন, “আলিফ-লাম-মীম। আল্লাহ, তিনি ছাড়া কোন ইলাহ নেই, তিনি চিরঞ্জীব, চিরপ্রতিষ্ঠিত ধারক।” [সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ১-২][24] অত:এব, বান্দা অন্তরের অন্ত:স্থল থেকে বিনয়ের সাথে যখন আল্লাহকে তাঁর এসব ইসমে আ‘যমের দ্বারা ডাকে তখন তার দো‘আ ফিরিয়ে দেওয়া হয় না।[25]

 

 

 

৩- আল-আহাদ: আল-ওয়াহিদ (এক)[26] আল-আহাদ (একক, অদ্বিতীয়)[27]

গ্রন্থকার রহ. বলেন, আল্লাহ আল-ওয়াহিদ (এক), আল-আহাদ (একক, অদ্বিতীয়)। তিনি সমস্ত পূর্ণতায় একক, সব ধরণের পরিপূর্ণতা, মর্যাদা, মহত্ব, সৌন্দর্য, প্রশংসা, হিকমত, রহমত, ও অন্যান্য পূর্ণতার গুণাবলীতে এক ও অদ্বিতীয়। তাঁর কোনো উপমা ও সাদৃশ নেই, কোনো কিছুই কোনো ভাবেই তাঁর সাথে তুলনা করার উপযুক্ত নয়, তিনি তাঁর জীবন, পরিচালনা, ইলম, কুদরত, মহত্ব, বড়ত্ব, সম্মান, মর্যাদা, সৌন্দর্য, প্রশংসা, হিকমত ও অন্যান্য সব গুণাবলীতে সর্বোচ্চ পর্যায়ের একক, এসব গুণাবলীর সর্বশেষ পর্যায়ে তিনি একক ও অদ্বিতীয়। অত:এব, বান্দার উপর কর্তব্য হলো আক্বীদা, কথা ও কাজে তাঁর তাওহীদ (একত্বতা) এমন ভাবে প্রকাশ করা যে, তাঁর সর্বময় পূর্ণাঙ্গ গুণাবলী স্বীকার করা, তাওহীদে তাঁকে এক রাখা এবং সব ধরণের ইবাদতে তাঁকে এক ও অদ্বিতীয় রাখা।[28]

 

 

– আল-‘আলা: আল-আ‘লীয়ু (সুউচ্চ)[29] আল-আ‘লা (সুমহান)[30]:

গ্রন্থকার রহ. বলেছেন, আল্লাহর সুন্দর নামসমূহের মধ্যে একটি নাম হলো আল-আ‘লীয়ু আল-আ‘লা। কেননা সর্বদিক বিবেচনায় সব ধরণের বড়ত্ব, উচুঁ মর্যাদা একমাত্র আল্লাহর জন্য সাব্যস্ত, তিনি সত্ত্বাগত দিক থেকে উচুঁ[31] এবং তিনি সমস্ত সৃষ্টির উপরে তাঁর আরশে আছেন, তিনি সৃষ্টির সাদৃশ নয়; তাদের বিপরীত, এতদ্বসত্ত্বেও তিনি তাদের সব কিছু অবগত আছেন, তাদের সব কিছু দেখেন, তাদের প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য যাবতীয় কার্য পরিচালনা করেন, তিনি তাঁর তাকদীরি বিধিবিধান, মহাবিশ্বের পরিচালনা ও শর‘ঈ বিধানের ব্যাপারে কথক (কথা বলেন)।[32]

তিনি উচুঁ ক্ষমতা ও মর্যাদা গুণে গুণান্বিত। সৃষ্টির কারো গুণের সাথে তাঁর সুউচ্চ মর্যাদা ও বড়ত্বের তুলনা করা যায় না; সমস্ত সৃষ্টি তাঁর কোনো একটি গুণের সামান্য কোন দিকও বেষ্টন করতে সক্ষম হবে না। আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,

﴿وَلَا يُحِيطُونَ بِهِۦ عِلۡمٗا١١﴾ [طه: ١١٠]

“তারা (সৃষ্টিকুল) জ্ঞান দিয়ে তাঁকে বেষ্টন করতে পারবে না।” [সূরা ত্বা-হা, আয়াত: ১১০]

অত:এব, জানা গেল যে, তাঁর সমস্ত গুণাবলীতে সৃষ্টিকুল তাঁর অনুরূপ ও সমকক্ষ নয়। তাঁর রয়েছে প্রভাব ও দমনের গুণ; কেননা তিনি কাহহার তথা দমনকারী ও ও নিয়ন্ত্রণকারী, যিনি তাঁর ইজ্জত ও বড়ত্বে সমস্ত সৃষ্টিকে দমন করে রাখেন। সৃষ্টিকুলের ভাগ্য তাঁরই হাতে। তিনি যা চান তা বাঁধা দেওয়ার কেউ নেই। আর তিনি যা চান না তা কখনো হবে না; যদিও সৃষ্টিকুল একত্রিত হয়ে সেটি করতে চেষ্টা করেন আল্লাহ না চাইলে তা কখনোই হবে না। আবার তিনি তাঁর ইচ্ছায় যেটি করতে চান তা সৃষ্টিকুল সকলে মিলে বাঁধা দিলেও তা প্রতিহত করতে পারবে না। কেননা তাঁর রয়েছে পূর্ণাঙ্গ শক্তি, ইচ্ছা বাস্তবায়নের পরিপূর্ণ ক্ষমতা এবং সৃষ্টিকুল সবদিক থেকেই তাঁর প্রতি মুখাপেক্ষী। [33]

তাঁর সমস্ত বড়ত্ব, শ্রেষ্ঠত্ব, অহংকার, মর্যাদা, সৌন্দর্য ও যাবতীয় পূর্ণতার গুণাবলী সহকারে তিনি আরশে উঠেছেন এবং সমস্ত সম্রাজ্য বেষ্টন করে রেখেছেন।[34]

 

 

৫- আল-আউয়াল[35]: আল-আউয়াল (প্রথম), আল-আখির (শেষ), আয-যাহির (প্রকাশ্য), আল-বাতিন (গোপন)।

গ্রন্থকার রহ. বলেছেন, এ নামের পূর্ণাঙ্গ ও সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিম্নোক্ত হাদীসে দিয়েছেন। তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

«أَنْتَ الْأَوَّلُ فَلَيْسَ قَبْلَكَ شَيْءٌ، وَأَنْتَ الْآخِرُ فَلَيْسَ بَعْدَكَ شَيْءٌ، وَأَنْتَ الظَّاهِرُ فَلَيْسَ فَوْقَكَ شَيْءٌ، وَأَنْتَ الْبَاطِنُ فَلَيْسَ دُونَكَ شَيْءٌ».

“আপনিই প্রথম, আপনার আগে আর কিছু নেই; আপনিই শেষ, আপনার পরে আর কিছুই নেই। আপনিই প্রকাশ্য, আপনার চেয়ে প্রকাশ্য আর কিছুই নেই। আর আপনিই অপ্রকাশ্য, আপনার চাইতে গোপন আর কিছুই নেই।”[36]

রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উক্ত হাদীসে আল্লাহর নামগুলোকে তার অর্থানুযায়ী ব্যাখ্যা করেছেন এবং এসব নামের বিপরীত অর্থকে প্রত্যাখান করেছেন।[37] গনণাকারীগণ যত সময়-ই গণনা করুন, পূর্ববর্তী যত সময়-ই নির্ধারণ করুক, আল্লাহ সে সময়ের আগেই বিদ্যমান এবং পরবর্তী সময়ে যতই সময় আসুক, যতই দিন চলতে থাকুক আল্লাহ সে সময়ের পরেও বিদ্যমান। এ কারণেই ওয়াজিবুল ওয়াজুদ তথা সদা বিদ্যমান গুণটি একমাত্র তাঁর জন্যই নির্দিষ্ট। কেননা সদা বিদ্যমান গুণটি একমাত্র সে সত্ত্বার জন্য প্রযোজ্য যা পূর্ণাঙ্গ অস্তিত্বমান, সদা বিদ্যমান। অত:এব, তাঁর অস্তিত্বের সর্বদা বিরাজমানে কেউ অংশিদার নেই। তিনি সব সময়ই তাঁর পরিপূর্ণ গুণাবলী সহকারে বিদ্যমান। তিনিই সময় সৃষ্টি করেছেন। সব কিছুর অস্তিত্ব ও বিলিন হওয়া আল্লাহর উপরই নির্ভরশীল।[38]

আল-আউয়াল (প্রথম):

তিনি প্রথম। এ নাম প্রমাণ করে যে, তিনি ব্যতীত যা কিছু আছে তা সৃষ্টিশীল ও ধ্বংসশীল যা একসময় ছিল না এবং এক সময় আবার থাকবে না। বান্দার উপর কর্তব্য হলো, সে দীন ও দুনিয়া সব ব্যাপারে তার রবের নি‘আমত স্মরণ করবে ও অনুভব করবে; যেতেতু সমস্ত সবব (দুনিয়ায় আগমনের কারণ) ও মুসাব্বাব (যার কারণে সে আসতে পেরেছে) তাঁর থেকেই।

আল-আখির (শেষ):

তিনিই শেষ। এ নামের দ্বারা বুঝা যায় যে, তিনিই শেষ গন্তব্য, তিনি অমুখাপেক্ষী। কোন কিছু চাওয়া-পাওয়া, আশা-আকাঙ্ক্ষা ও যাবতীয় প্রয়োজনে সমস্ত সৃষ্টি তাঁর কাছেই মুখাপেক্ষী ও নির্ভরশীল।

আয-যাহির: তিনি প্রকাশ্য, স্পষ্ট। এ নাম দ্বারা তাঁর বড়ত্ব ও মহান গুণ বুঝায়। সৃষ্টিকুলের থেকে তাঁর যাতী ও সিফাতী মহানত্ব ও উচুঁ মর্যাদা প্রমাণ করে।

আল-বাতিন (অতি গোপন):

তিনি অপ্রকাশ্য, গোপন। এ নাম দ্বারা তাঁর গোপন রহস্য, অপ্রকাশ্য বিষয়াদি, লুকায়িত জিনিস ও সূক্ষ্ম বিষয়াদি প্রমাণ করে। এমনিভাবে এ নাম তাঁর পরিপূর্ণ নিকটবর্তীতাও বুঝা যায় এবং এটি আয-যাহির নামের বিপরীত নয়। কেননা আল্লাহ যাবতীয় গুণাবলীতে কারো সাদৃশ নয়। তিনি নিকটর্তীতার হিসেবে আল-‘আলী তথা উঁচু আবার উঁচু মর্যাদার হিসেবে তিনি আল-কারীব তথা অতি নিকটবর্তী।

আল-আখির, আল-বারী, আল-খালিক, আল-মুসাওয়ির:

৬- আল-আখির (শেষ):

৭- আল-বারী (নির্মাণকারী, পরিকল্পনাকারী): আল-খালিক (শূন্য থেকে সৃষ্টিকারী), আল-বারী (সৃষ্টিকারী), আল-মুসাওয়ির (আকৃতিদানকারী) 

গ্রন্থকার রহ. বলেছেন, আল-খালিক, আল-বারী, আল-মুসাওয়ির হলেন যিনি সমস্ত সৃষ্টিজগত সৃজন করেছেন, তিনি পূর্ব আকৃতি ব্যতীত এগুলোকে সৃষ্টি করেছেন, তাঁর হিকমত অনুসারে তিনি সেগুলোকে সুবিন্যস্ত ও সুকাঠামো গঠন করেছেন, তিনি তাঁর প্রজ্ঞা অনুসারে সৃষ্টিজগতকে আকৃতি দান করেন যখন তারা অস্তিত্বে ছিল না। তিনি এ মহান গুণে সর্বদা ছিলেন ও থাকবেন।

৮- আল-বাসিত (প্রসারণকারী):

আল-কাবিদ (নিয়ন্ত্রণকারী), আল-বাসিত (প্রসারণকারী), আল-খাফিদ (অবিশ্বাসীদের অপমানকারী), আর-রাফি‘ (উন্নীতকারী, উঁচুকারী), আল-মু‘ইয (সম্মান প্রদানকারী), আল-মুযিল্ল (সম্মান হরণকারী), আল-মানি‘ (প্রতিরোধকারী, রক্ষাকর্তা), আল-মু‘তী (দানকারী), আদ-দার (যন্ত্রণাদানকারী, উৎপীড়নকারী), আন-নাফি‘ (অনুগ্রাহক, উপকারকারী, হিতকারী)।

গ্রন্থকার রহ. বলেছেন, আল্লাহর নামসমূহের অন্যতম নাম হলো, আল-কাবিদ (নিয়ন্ত্রণকারী), আল-বাসিত (প্রসারণকারী), আল-খাফিদ (অবিশ্বাসীদের অপমানকারী), আর-রাফি‘ (উন্নীতকারী, উঁচুকারী), আল-মু‘ইয (সম্মান প্রদানকারী), আল-মুযিল্ল (সম্মান হরণকারী), আল-মানি‘ (প্রতিরোধকারী, রক্ষাকর্তা), আল-মু‘তী (দানকারী), আদ-দার (যন্ত্রণাদানকারী, উৎপীড়নকারী), আন-নাফি‘ (অনুগ্রাহক, উপকারকারী, হিতকারী)। এসব সম্মানিত নামসমূহ আসমাউল মুতাকাবিলাত তথা পরস্পর বিপরীতমুখী নাম যা একটির দ্বারা আল্লাহর প্রশংসা করলে সাথে এর বিপরীত নামের দ্বারাও প্রশংসা করা অত্যাবশ্যকীয়। কেননা এগুলোর দুটি নাম একত্রে আল্লাহর পূর্ণাঙ্গ গুণ প্রকাশ পায়। তিনি যেমন রিযিক, রূহ ও আত্মাসমূহের কাবিয তথা নিয়ন্ত্রণকারী তেমনি তিনি রিযিক, রহমত ও অন্তরসমূহের বাসিত তথা প্রসারণকারী, প্রশস্ততাকারী। তিনি যেমন ইলম ও ঈমানে বলিয়ান সম্প্রদায়ের জন্য রাফি‘ তথা উঁচু মর্যাদাদানকারী তেমনি তিনি তাঁর শত্রুর ব্যাপারে আল-খাফিদ তথা অপমানকারী। তিনি তাঁর অনুগতদের জন্য মু‘ইয তথা সম্মান প্রদানকারী। আর তাঁর দেওয়া সম্মানই প্রকৃত সম্মান। কেননা আল্লাহর অনুগতরা পরাক্রমশালী ও সম্মানীত; যদিও তারা ফকির ও অভাবী হন। অন্যদিকে তিনি তাঁর অবাধ্য, অপরাধী ও শত্রুদের জন্য দুনিয়া ও আখিরাতে আল-মুযিল্ল তথা সম্মান হরণকারী, অপমানকারী, লাঞ্ছনাকারী। আল্লাহর অবাধ্য ব্যক্তি যদিও প্রকাশ্যে সম্মান-মর্যাদা প্রদর্শন করে, কিন্তু তার অন্তর অপমান, লাঞ্ছনা ও অমর্যাদায় ভরপুর; যদিও সে প্রবৃত্তির লালসায় লিপ্ত থাকার কারণে এটি বুঝতে পারে না। কেননা আল্লাহর অনুগত্যের মধ্যেই রয়েছে সর্বপ্রকারের সম্মান আর তার অবাধ্যতায় রয়েছে সব ধরণের অপমান। আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,

﴿وَمَن يُهِنِ ٱللَّهُ فَمَا لَهُۥ مِن مُّكۡرِمٍ١٨﴾ [الحج : ١٨]

“আল্লাহ যাকে অপমানিত করেন তার সম্মানদাতা কেউ নেই।” [সূরা আল-হাজ্জ, আয়াত: ১৮]

আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেছেন,

﴿مَن كَانَ يُرِيدُ ٱلۡعِزَّةَ فَلِلَّهِ ٱلۡعِزَّةُ جَمِيعًا١٠﴾ [فاطر: ١٠]

“কেউ যদি সম্মান চায় (তবে তা যেন আল্লাহর কাছেই চায়); কেননা সকল সম্মান আল্লাহরই।” [সূরা ফাতির, আয়াত: ১০]

আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেছেন,

﴿وَلِلَّهِ ٱلۡعِزَّةُ وَلِرَسُولِهِۦ وَلِلۡمُؤۡمِنِينَ٨﴾ [المنافقون: ٨]

“কিন্তু সকল মর্যাদা তো আল্লাহর, তাঁর রাসূলের ও মুমিনদের।” [সূরা আল-মুনাফিকূন, আয়াত: ৮]

আল্লাহ তা‘আলা আল-মানি‘ তথা প্রতিরোধকারী, রক্ষাকর্তা, নিষেধকারী, বারণকারী এবং তিনি আল-মু‘তী তথা দানকারী। তিনি যাকে দান করেন তাকে কেউ বারণ করতে পারে না আবার তিনি যাকে বারণ করেন তাকে কেউ দান করতে পারে না।[39] তিনি বান্দাদের থেকে যাকে ইচ্ছা দুনিয়া ও আখিরাতের ব্যাপারে উপকার করেন, আবার কেউ ক্ষতির কাজ করলে তিনি তাকে ক্ষতি করেন। [40]

এসব কিছু মহান আল্লাহর ন্যায়পরায়নতা, হিমমত ও প্রশংসনীয় কাজের অনুগামী। কেননা কারো মর্যাদা কমানো, কাউকে অপমানিত করা ও কাউকে কিছু থেকে বঞ্চিত করতে এসব কাজে আল্লাহর হিকমত রয়েছে। তবে আল্লাহর এসব কাজের ব্যাপারে কারো কোন জবাব দিহিতার অধিকার নেই। এমনিভাবে কারো মর্যাদা বৃদ্ধি, কাউকে কিছু দান করা ও কারো কল্যাণ প্রশস্ত করার ক্ষেত্রেও মহান আল্লাহর রয়েছে সূক্ষ্ম হিকমত।

বান্দার উপর কর্তব্য হলো আল্লাহর হিকমতকে স্বীকার করা, এমনিভাবে তাঁর অনুগ্রহ ও মর্যাদা যবান, অন্তর ও কাজের মাধ্যমে স্বীকৃতি দেওয়া।

তাছাড়া এসব কাজে তিনি একক, সব কিছু তাঁরই ইচ্ছায় ঘটে থাকে। আল্লাহ কারো মর্যাদা বৃদ্ধি, সম্মান প্রদান, কিছু দান করা ও সম্মানিত করার ব্যাপারে যুক্তি সংগত কারণ রয়েছে; পক্ষান্তরে এর বিপরীত কিছু করার ক্ষেত্রেও কারণ রয়েছে। প্রত্যেকেই যার যার কর্ম অনুযায়ী প্রতিদান প্রাপ্ত হয়। সৌভাগ্যবান লোকদের জন্য ভালো কাজ সহজ করে দেওয়া হয় আর দুর্ভাগা লোকদের জন্য দুর্ভাগা লোকদের মন্দ কাজ সহজ করে দেওয়া হয়। বান্দার উপর দায়িত্ব হলো আল্লাহর তাওহীদ যথার্থভাবে কায়েম করা, তাঁর রবের উপর সর্বকাজে নির্ভরশীল হওয়া, উপকারী কাজে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা করা; কেননা এগুলো আল্লাহর হিকমতের স্থান।[41]

আল-বাতিন (লুকায়িত, অস্পষ্ট, অন্তরস্থ), বাদী‘উস সামাওয়াতে ওয়াল আরদি (আসমান ও জমিনের স্রষ্টা), আল-বার কল্যাণকারী)

৯- আল-বাতিন (লুকায়িত, অস্পষ্ট, অন্তরস্থ)।[42]  

১০- বাদী‘উস সামাওয়াতে ওয়াল আরদি (আসমান ও জমিনের স্রষ্টা)।[43]   

গ্রন্থকার ইবনুল কাইয়্যিম রহ. বলেছেন, বাদী‘উস সামাওয়াতে ওয়াল আরদি (আসমান ও জমিনের স্রষ্টা) অর্থাৎ তিনি আসমান ও জমিন সূক্ষ্মতা ও পরিপূর্ণতার সাথে পূর্ব কোন আকৃতি ব্যতীতই সৃষ্টি করেছেন।[44] সর্বোচ্চ সুন্দরতম, সুবিন্যস্ত, চমৎকার ও সুপরিকল্পিত রূপে তিনি সব কিছু সৃষ্টি করেছেন।[45]

১১- আল-বার: আল-বার (কল্যাণকারী), আল-ওয়াহহাব (দানশীল, স্থাপনাকারী), আল-কারীম (দয়ালু)।

গ্রন্থকার ইবনুল কাইয়্যিম রহ. বলেছেন, আল্লাহর নামসমূহের মধ্যে অন্যতম হলো, আল-বার (কল্যাণকারী), আল-ওয়াহহাব (দানশীল, স্থাপনাকারী), আল-কারীম (দয়ালু) যিনি সমস্ত সৃষ্টিকে তার কল্যাণ, দান ও দয়ায় বেষ্টন করে রাখেন। তিনি উত্তম মাওলা (অভিভাবক), সর্বদা দানশীল এবং প্রশস্ত দানকারী। আল্লাহর আল-বার (কল্যাণকারী) গুণবাচক নামটি ও এর প্রভাব তাঁর সমস্ত সৃষ্টির উপর প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য উভয় ভাবেই প্রযোজ্য। কোন সৃষ্টিই তাঁর ইহসান, দয়া ও দান থেকে সামান্য সময়ের জন্যও মুখাপেক্ষীহীন নয়; বরং সর্বদা তাঁর দানের মুখাপেক্ষী। এ গুণ বাচক নামটি তাঁর ব্যাপক রহমত ও দানের উপর প্রমাণ করে যা তিনি সব সৃষ্টিকে তাঁর ইচ্ছা অনুযায়ী দান করে থাকেন। তাঁর দয়া দু’ধরনের। এক প্রকারের দয়া হলো আম তথা সকলের জন্য ব্যাপক। আর আরেক ধরণের দয়া হলো খাস তথা তাঁর নির্দিষ্ট বান্দা ও সৃষ্টির জন্য প্রযোজ্য। আল্লাহ তা‘আলার সর্বসাধারণের জন্য রহমত সম্পর্কে তিনি বলেছেন,

﴿رَبَّنَا وَسِعۡتَ كُلَّ شَيۡءٖ رَّحۡمَةٗ وَعِلۡمٗا٧﴾ [غافر: ٧]

“হে আমাদের রব, আপনি রহমত ও জ্ঞান দ্বারা সব কিছুকে পরিব্যপ্ত করে রয়েছেন।” [সূরা গাফের, আয়াত: ৭]

আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,

﴿وَرَحۡمَتِي وَسِعَتۡ كُلَّ شَيۡءٖ١٥٦﴾ [الاعراف: ١٥٥]

“আর আমার রহমত সব বস্তুকে পরিব্যাপ্ত করেছে।” [সূরা আল-আ’রাফ, আয়াত: ১৫৫]

আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,

﴿وَمَا بِكُم مِّن نِّعۡمَةٖ فَمِنَ ٱللَّهِ٥٣﴾ [النحل: ٥٣]

“আর তোমাদের কাছ যে সব নি‘আমত আছে, তা আল্লাহর পক্ষ থেকে।” [সূরা আন-নাহাল, আয়াত: ৫৩]

আল্লাহর এ প্রকারের রহমত ও দয়ায় সৎ, অসৎ, আসমানের অধিবাসী ও জমিনের অধিবাসী, শরী‘আতের মুকাল্লাফ ও গাইরে মুকাল্লাফ সকলকেই অন্তর্ভুক্ত করে।

আর আল্লাহর খাস তথা বিশেষ রহমত ও নি‘আমত শুধু মুত্তাকীনদের জন্য। আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,

﴿فَسَأَكۡتُبُهَا لِلَّذِينَ يَتَّقُونَ وَيُؤۡتُونَ ٱلزَّكَوٰةَ وَٱلَّذِينَ هُم بِ‍َٔايَٰتِنَا يُؤۡمِنُونَ١٥٦ ٱلَّذِينَ يَتَّبِعُونَ ٱلرَّسُولَ ٱلنَّبِيَّ ٱلۡأُمِّيَّ١٥٧﴾ [الاعراف: ١٥٥،  ١٥٦]

“সুতরাং আমি তা লিখে দেব তাদের জন্য যারা তাকওয়া অবলম্বন করে এবং যাকাত প্রদান করে। আর যারা আমার আয়াতসমূহের প্রতি ঈমান আনে। যারা অনুসরণ করে রাসূলের, যে উম্মী নবী..।” [সূরা আল-আ’রাফ, আয়াত: ১৫৫-১৫৬]

﴿إِنَّ رَحۡمَتَ ٱللَّهِ قَرِيبٞ مِّنَ ٱلۡمُحۡسِنِينَ٥٦﴾ [الاعراف: ٥٥]

“নিশ্চয় আল্লাহর রহমত সৎকর্মশীলদের নিকটবর্তী।” [সূরা আল-আ’রাফ, আয়াত: ৫৫]

সুলাইমান আলাইহিস সালাম তাঁর দো‘আয় বলেছেন,

﴿وَأَدۡخِلۡنِي بِرَحۡمَتِكَ فِي عِبَادِكَ ٱلصَّٰلِحِينَ١٩﴾ [النمل : ١٩]

“আর তোমার অনুগ্রহে তুমি আমাকে তোমার সৎকর্মপরায়ণ বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত  কর।” [সূরা আন-নামাল, আয়াত: ১৯]

এ বিশেষ রহমত যা নবীগণ ও তাদের অনুসারীরা আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেন এগুলো ঈমান, ইলম, আমল, সর্বদা উত্তম অবস্থা, দুনিয়া ও আখিরাতের সফলতা ও কল্যাণ ইত্যাদির তাওফিক প্রার্থনা করা। আর আল্লাহর বিশেষ বান্দাহদের এগুলো অর্জনই মূল লক্ষ্য-উদ্দেশ্য।[46]

 

আল-বাসীর (সর্বদ্রষ্টা), আত-তাওয়াব (তাওবা কবুলকারী, ক্ষমাকারী)।

১২- আল-বাসীর (সর্বদ্রষ্টা)[47]:

গ্রন্থকার ইবনুল কাইয়্যিম রহ. বলেছেন, আল-বাসীর (সর্বদ্রষ্টা) হলেন যিনি আসমান ও জমিনের সবকিছুতে তাঁর দৃষ্টিশক্তিতে বেষ্টন করে রেখেছেন; এমনকি অন্ধকার রাতে নির্জন মরুভূমিতে একটি কালো পিপীলিকার সন্তর্পণে চলার আওয়াজও তিনি শুনতে পান, তাঁর কাছে সে আওয়াজটি পর্যন্ত গোপনীয় নয়। তিনি গোপন ও প্রকাশ্য সব ধরণের সব কিছুই দেখতে পান, বস্তুর সূক্ষ্ম থেকে অতি সূক্ষ্মতম চলার আওয়াজ, বৃক্ষের অভ্যন্তরে চলামান পানির আওয়াজ, এর শিকর, ছোট-বড় যাবতীয় উদ্ভিত সব কিছুই তিনি শুনতে পান ও দেখতে পান। তিনি পিপীলিকা, মৌমাছি, মশা-মাছি ও এর চেয়েও ক্ষুদ্র কীট-পতঙ্গের অভ্যন্তরের শিরা উপশিরা সব কিছুই দেখতে পান। সেই মহান আল্লাহর পবিত্রতা বর্ণনা করছি যার বড়ত্ব, মহাত্ব, সুবিস্তৃত গুণাবলী, পরিপূর্ণ আযমত (বড়ত্ব), সূক্ষ্মতা, অদৃশ্যের সংবাদ ও জ্ঞান, অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের সংবাদ ইত্যাদি বর্ণনা করা মানুষের পক্ষে অসম্ভব। তিনি মানুষের চোখের পলক, চক্ষুসমূহের খেয়ানত, অন্তরসমূহ যা গোপন রাখে ও জিহ্বার নড়াচাড়াসহ সব সূক্ষ্ম থেকে সূক্ষ্মতর জিনিস অবগত আছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,

﴿ٱلَّذِي يَرَىٰكَ حِينَ تَقُومُ٢١٨ وَتَقَلُّبَكَ فِي ٱلسَّٰجِدِينَ٢١٩ إِنَّهُۥ هُوَ ٱلسَّمِيعُ ٱلۡعَلِيمُ٢٢٠﴾ [الشعراء : ٢١٨،  ٢٢٠]

“যিনি আপনাকে দেখেন যখন আপনি দণ্ডায়মান হন এবং সিজদাকারীদের মধ্যে আপনার উঠাবসা। নিশ্চয় তিনি সর্বশ্রোতা, মহাজ্ঞানী।” [সূরা আশ-শুআ’রা, আয়াত: ২১৮-২২০]

﴿يَعۡلَمُ خَآئِنَةَ ٱلۡأَعۡيُنِ وَمَا تُخۡفِي ٱلصُّدُورُ١٩ ﴾ [غافر: ١٩]

“চক্ষুসমূহের খেয়ানত এবং অন্তরসমূহ যা গোপন রাখে তিনি তা জানেন।” [সূরা গাফের, আয়াত: ১৯]

﴿وَٱللَّهُ عَلَىٰ كُلِّ شَيۡءٖ شَهِيدٌ٩﴾ [البروج: ٩]

“আর আল্লাহ প্রতিটি বিষয়ের প্রত্যক্ষদর্শী।” [সূরা আল-বুরূজ, আয়াত: ৯]

অর্থাৎ তিনি অবগত, তাঁর ইলম ও দৃষ্টির দ্বারা সব কিছু বেষ্টন করে রেখেছেন এবং তিনি সৃষ্টিজগতের সব কিছু শুনতে পান। [48]

সপ্ত জমিনের নিচে যা কিছু আছে তা যেমন তিনি দেখতে পান তেমনি সপ্ত আসমানের উপরে যা কিছু আছে তাও তিনি দেখতে পান। এছাড়াও তিনি তাঁর হিকমত অনুসারে তাদের প্রাপ্ত কর্মফল সম্পর্কে সর্বশ্রোতা ও সর্বদ্রষ্টা। শেষ বাক্যের অর্থ: তারা তাঁর হিকমত অনুযায়ী তারা কর্মফল প্রাপ্ত হবে।

আল-কুরআনে অধিকাংশ জায়গাতেই আল্লাহ সামী‘ (সর্বশ্রোতা) ও বাসীর (সর্বদ্রষ্টা) নামদ্বয় একত্রে উল্লেখ করেছেন। যেমন আল্লাহ বলেছেন,

﴿وَكَانَ ٱللَّهُ سَمِيعَۢا بَصِيرٗا١٣٤﴾ [النساء : ١٣٤]

“আর আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা।” [সূরা আন-নিসা, আয়াত: ১৩৪] অত:এব, শ্রবণ ও দেখার মাধ্যমে তিনি সৃষ্টিজগতের প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য যাবতীয় কিছু বেষ্টন করে রেখেছেন। শ্রবণ করার যাবতীয় কিছু আস-সামী‘ তথা সর্বশ্রোতা বেষ্টন করে আছেন। ঊর্ধ্ব ও নিম্ন জগতের যত প্রকার শ্রবণ যোগ্য শব্দ আছে তিনি সে সব শব্দের গোপন ও প্রকাশ্য সব কিছুই শুনতে পান, যেন তাঁর কাছে সব কিছুই একই ধরণের আওয়াজ। তাঁর কাছে সেসব শ্রবণ যোগ্য আওয়াজ বুঝতে ভিন্নতর মনে হয় না এবং কোন কিছুই উদ্দেশ্য বুঝতে গোপন থাকে না। নিকটবর্তী ও দূরবর্তী, গোপন ও প্রকাশ্য সব কিছুই তাঁর কাছে সমান। আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,

﴿قَدۡ سَمِعَ ٱللَّهُ قَوۡلَ ٱلَّتِي تُجَٰدِلُكَ فِي زَوۡجِهَا وَتَشۡتَكِيٓ إِلَى ٱللَّهِ وَٱللَّهُ يَسۡمَعُ تَحَاوُرَكُمَآۚ إِنَّ ٱللَّهَ سَمِيعُۢ بَصِيرٌ١﴾ [المجادلة: ١]

“আল্লাহ অবশ্যই সে রমনীর কথা শুনেছেন যে তার স্বামীর ব্যাপারে তোমার সাথে বাদানুবাদ করছিল আর আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ করছিল। আল্লাহ তোমাদের কথোপকথন শোনেন। নিশ্চয় আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা।” [সূরা আল-মুজাদালা, আয়াত: ১]

আয়েশা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা বলেন,

الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي وَسِعَ سَمْعُهُ الْأَصْوَاتَ، لَقَدْ جَاءَتِ الْمُجَادِلَةُ إِلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، وَأَنَا فِي نَاحِيَةِ الْبَيْتِ، تَشْكُو زَوْجَهَا، وَمَا أَسْمَعُ مَا تَقُولُ، فَأَنْزَلَ اللَّهُ: ﴿قَدۡ سَمِعَ ٱللَّهُ قَوۡلَ ٱلَّتِي تُجَٰدِلُكَ فِي زَوۡجِهَا١﴾ [المجادلة: ١]

সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর যিনি সব রকমের ডাক শুনেন। এক মহিলা তার অভিযোগ নিয়ে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে আসেন। তখন আমি ঘরের এক কোণে অবস্থানরত ছিলাম। সে তার স্বামীর বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন; কিন্তু আমি তার বক্তব্য শুনতে পাইনি। তখন আল্লাহ এ আয়াত নাযিল করেন, “আল্লাহ অবশ্যই সে রমনীর কথা শুনেছেন যে তার স্বামীর ব্যাপারে তোমার সাথে বাদানুবাদ করছিল।” [সূরা আল-মুজাদালা, আয়াত: ১][49]

১৩- আত-তাওয়াব (তাওবা কবুলকারী, ক্ষমাকারী)[50]:

গ্রন্থকার ইবনুল কাইয়্যিম রহ. বলেছেন, তাওয়াব হলেন যিনি সর্বদা তাওবাকারীর তাওবা কবুল করেন, আল্লাহর কাছে প্রত্যাবর্তনকারীকে তিনি ক্ষমা করেন। অত:এব যারা আল্লাহর কাছে খাঁটি তাওবা করে তিনি তাদের তাওবা কবুল করেন এবং ক্ষমা করে দেন।[51]

বান্দার ব্যাপারে আল্লাহর তাওবা কবুল করা দু’ধরণের।

প্রথমত: তিনি তাঁর বান্দার অন্তরে তাঁর কাছে ফিরে আসার তাওবা ঢেলে দেন। ফলে বান্দা তাওবা ও তাওবার শর্তাবলী পালনের মাধ্যমে গুনাহের কাজ থেকে তাওবা করে, সে তার কৃতকর্মের জন্য অনুশোচনা করে, উক্ত কাজে ফিরে না যাওয়ার দৃঢ় প্রত্যয় করে এবং আল্লাহ তাকে খারাপ কাজকে ভালো কাজে পরিবর্তন করে দেন।

দ্বিতীয়ত: বান্দার তাওবা কবুল করার মাধ্যমে তিনি বান্দার তাওবা গ্রহণ করেন এবং বান্দা যদি খাঁটি তাওবা করেন তাহলে তিনি তার পূর্বের গুনাহ মাফ করে দেন। কেননা খাঁটি তাওবা পূর্বের গুনাহ মাফ হওয়া অত্যাবশ্যকীয়। [52]

জামি‘উন নাস (মানুষকে সমবেতকারী), আল-জাব্বার (মহাপ্রতাপশালী, অতীব মহিমান্বিত)

১৪- জামি‘উন নাস (মানুষকে সমবেতকারী)[53]

গ্রন্থকার রহ. বলেছেন, আল্লাহর আরেকটি নাম হলো তিনি কিয়ামতের দিন মানুষকে হাশরের ময়দানে সমবেতকারী, তিনি তাদের আমল ও রিযিক একত্রকারী। তিনি তাদের ছোট-বড় কোন কিছুই বাদ দেন না, সব কিছুই তিনি গননা করে রাখেন। আগে ও পরে যারাই মারা যাবে তিনি তাঁর পূর্ণ কুদরত, প্রশস্ত ইলমের দ্বারা তাদের সকলকে একত্রিত করবেন।[54]

১৫- আল-জাব্বার (মহাপ্রতাপশালী, অতীব মহিমান্বিত)[55]

গ্রন্থকার শাইখ আস-সা‘দী রহ. বলেছেন, আল-জাব্বার শব্দের অর্থ সমুচ্চ, মহিমান্বিত। আবার এ শব্দের অর্থ আল-কাহহার তথা মহাপ্রতাবশালী, দমনকারী। আবার জাব্বার অর্থ আর-রাঊফ তথা প্রতি স্নেহশীল, সদয় ও সমবেদনা প্রকাশকারী। তিনি ভঙ্গ হৃদয়ের অধিকারী, দুর্বল, অক্ষম, যারা তাঁর কাছে ফিরে আসে ও আশ্রয় চায় তাদের জন্য তিনি অতি স্নেহশীল ও সদয়।[56]

এ নামের তিনটি অর্থ রয়েছে। সব অর্থই তাঁর আল-জাব্বার নামের অন্তর্ভুক্ত। তিনি দুর্বল ও তাঁর জন্য নিবেদিত ভঙ্গ হৃদয়কে আশ্রয় দান করেন। ফলে তিনি দুর্বল ভঙ্গ হৃদয়ের অধিকারীকে স্নেহ ও মায়া-মমতা করেন, গরিবকে ধনী করেন, বিপদাপদে পতিত সমস্ত কঠোরতাকে তিনি সহজ করেন, তাঁর তাওফিকে বিপদে আপতিত ব্যক্তিকে স্নেহ করে সাহায্য করেন, তাকে অটল ও ধৈর্যধারণে সহযোগিতা করেন, বিপদে আপতিত ব্যক্তি যথাযথ ভাবে বিপদে ধৈর্যধারণ করলে তাকে এর চেয়েও বেশি পুরষ্কার দান করেন, তাঁর বড়ত্ব ও মহত্বের সামনে অনুগত ব্যক্তিকে তিনি মহা পুরষ্কার প্রদান করেন, তাঁকে ভালোবাসাকারী অন্তরকে তিনি নানা সম্মান, মর্যাদা ও ঈমানের বিভিন্ন অবস্থাভেদে পুরষ্কার প্রদান করে পুষিয়ে দেন। সুতরাং তাঁকে ভালোবাসা বিনীত হৃদয়ের পুরষ্কার হলো তিনি তাদের কাছেই থাকেন, তারা তাঁকে ডাকলে তিনি তাদের ডাকে সাড়া দেন। কেউ তাঁকে এভাবে ডাকলে, ‘হে আল্লাহ আপনি আমাকে স্নেহ ও মায়া প্রদান করুন।’ তিনি এ স্নেহ দ্বারা প্রকৃতপক্ষে বান্দার সংশোধন ও যাবতীয় অপছন্দনীয় কাজ থেকে তাকে রক্ষা করা উদ্দেশ্য বুঝায়।

আল-জাব্বারের দ্বিতীয় অর্থ হলো আল-কাহহার তথা মহাপ্রতাবশালী, দমনকারী। সৃষ্টিজগতের যা কিছু তাঁর নৈকট্য অর্জন করে, যা কিছু তাঁর কাছে বিনীত, নিবেদিত এবং অন্য যা কিছু যেভাবেই থাকুক তিনি সবার জন্য আল-জাব্বার তথা মহাপ্রতাবশালী, দমনকারী।

আল-জাব্বার শব্দের আরেক অর্থ সমুচ্চ, মহিমান্বিত। তিনি সব কিছুর ঊর্ধ্বে, তিনি মহিমান্বিত। অত:এব, আল-জাব্বার শব্দের অর্থ আর-রাঊফ তথা প্রতি স্নেহশীল, সদয় ও সমবেদনা প্রকাশকারী; আল-কাহহার তথা মহাপ্রতাবশালী, দমনকারী; সমুচ্চ, মহিমান্বিত। আবার কখনো আল-জাব্বারের আরেক অর্থ আল-মুতাকাব্বির তথা সর্বশ্রেষ্ঠ, গৌরবান্বিত, অহংকারী। তিনি যাবতীয় দোষ-ত্রুটি মুক্ত এবং কারো অনুরূপ হওয়া, কেউ তাঁর সমকক্ষ, বিপরীত, উচুঁ, অংশীদার ইত্যাদি বৈশিষ্ট্য থেকে তিনি মুক্ত।[57]

আল-জালীল (গৌরবান্বিত), আল-জামীল (সুন্দর)

১৬-  আল-জালীল (গৌরবান্বিত),[58] আল-কাবীর (সুমহান, সবচেয়ে বড়)[59]:

গ্রন্থকার রহ. বলেছেন, আল-জালীল (গৌরবান্বিত), আল-কাবীর (সুমহান, সবচেয়ে বড়) হলেন যার গৌরবের গুণ রয়েছে তিনি আল-জালীল ও আল-কাবীর। বড়ত্ব ও অহংকারের গুণ আল্লাহর জন্য সাব্যস্ত, তাঁর থেকে বড়ত্ব ও পূর্ণতার এ গুণ কখনো আলাদা হয় না।[60]

আল্লাহ সম্মান, মর্যাদা, অহংকার, বড়ত্ব ও গৌরব এসব গুণে গুণান্বিত। তিনি সব কিছুর থেকে বড়, সবচেয়ে মহান, সবচেয়ে বড় ও উচুঁ। তাঁর অলীদের অন্তরে তাঁর ব্যাপারে রয়েছে সর্বময় সম্মান ও মর্যাদা। তাদের অন্তর আল্লাহর সম্মান, মর্যাদা, বিনয়, অবনমিতা ও তাঁর অহংকারের কাছে অপদস্ততায় তাদের অন্তর পরিপূর্ণ থাকে। [61]

১৭- আল-জামীল (সুন্দর)[62]:

গ্রন্থকার রহ. বলেছেন, আল-জামীল হলেন যার সুন্দর ও ইহসানের গুণ রয়েছে।[63] আল্লাহ সত্ত্বগত, নামগত, গুণগত ও কর্মগত সব দিক থেকেই সুন্দর। কোন সৃষ্টির পক্ষে আল্লাহর সত্ত্বাগত সৌন্দর্যের সামান্য কিছুও বর্ণনা করা সম্ভব নয়; এমনকি জান্নাতে জান্নাতিরা সব ধরণের চিরস্থায়ী নি‘আমত, ভোগ-বিলাস, আনন্দ-খুশি পাওয়ার পরেও তারা তাদের রবকে দেখার পরে এসব নি‘আমত তাদের কাছে কিছুই মনে হবে না। তারা তাদের রবের সৌন্দর্য উপভোগ করে জান্নাতের যাবতীয় নি‘আমত ভুলে যাবে এব তাদের সব আনন্দ-খুশি বৃথা মনে হবে। তারা আশা করবে আল্লাহর দর্শনের এ নি‘আমত যদি সব সময় বজায় থাকত যাতে তারা তাঁর সৌন্দর্য ও তাঁর নূর উপভোগ করতে পারেন। তাদের অন্তর সর্বদা আল্লাহকে দেখার অপেক্ষায় অপেক্ষমাণ থাকবে। যেদিন তারা আল্লাহকে দেখবে সেদিন তাদের আনন্দ বহুগুণে হাজার গুণে বেড়ে যাবে যেন তাদের অন্তর পাখির মতো উড়ছে। এমনিভাবে তিনি নামগত দিক থেকেও সুন্দর। কেননা তাঁর সব নামই সুন্দর; বরং তাঁর সব নামই অন্য সব নামের তুলনায় অতি সুন্দর ও উত্তম। আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,

﴿وَلِلَّهِ ٱلۡأَسۡمَآءُ ٱلۡحُسۡنَىٰ فَٱدۡعُوهُ بِهَا١٨٠ ﴾ [الاعراف: ١٧٩]

“আর আল্লাহর জন্যই রয়েছে সুন্দরতম নামসমূহ। সুতরাং তোমরা তাঁকে সেসব নামেই ডাক।” [সূরা আল-আ‘রাফ, আয়াত: ১৭৯]

আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেছেন,

﴿هَلۡ تَعۡلَمُ لَهُۥ سَمِيّٗا٦٥﴾ [مريم: ٦٥]

“তুমি কি তাঁর সমতুল্য কাউকে জান?” [সূরা মারইয়াম, আয়াত: ৬৫] আল্লাহর সব নামই চূড়ান্ত প্রশংসা, সম্মান, মর্যাদা ও পরিপূর্ণতা প্রমাণ করে। তাঁর এসব নাম অন্যের জন্য পরিপূর্ণতা বুঝাতে ব্যবহার হয় না।

এমনিভাবে তিনি গুণাবলীতেও সুন্দর। কেননা তাঁর যাবতীয় গুণাবলীই পরিপূর্ণতার গুণ, প্রশংসা ও গুণকীর্তনের গুণ। তাঁর রয়েছে প্রশস্ত, ব্যাপক, সাধারণ গুণ। এসব গুণের অধিকাংশই তাঁর রহমত, দয়া, কল্যাণ, দানশীলতা ও দয়া প্রদর্শনের সাথে সম্পৃক্ত।

এমনিভাবে আল্লাহর যাবতীয় কাজ-কর্ম সুন্দর। কেননা তাঁর সব কাজই কল্যাণ ও ইহসানের মধ্যে ঘূর্ণয়মান যা প্রশংসনীয় ও শুকরিয়ার দাবীদার। আবার তাঁর কাজগুলো ন্যায় পরায়নতার সাথে সম্পৃক্ত যা তাঁর হিকমত ও প্রশংসা অনুযায়ী হয়ে থাকে। তাঁর কোন কাজই অনর্থক, বেহুদা, বোকামী ও যুলুম নয়; বরং তাঁর সব কাজই কল্যাণকর, হিদায়েতমূলক, রহমত, সুপথ প্রদর্শন ও ন্যায়পরায়ন। আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,

﴿إِنَّ رَبِّي عَلَىٰ صِرَٰطٖ مُّسۡتَقِيمٖ٥٦﴾ [هود: ٥٦]

“নিশ্চয় আমার রব সরল পথে আছেন।” [সূরা হূদ, আয়াত: ৫৬]

তাঁর পূর্ণতা এতই পরিপূর্ণ কেউ তা প্রশংসা করে ও গননা করে শেষ করতে পারবে না। তাঁর পূর্ণতার কারণে তাঁর যাবতীয় কাজও পরিপূর্ণ ও সুন্দর। ফলে তাঁর হুকুমসমূহ সবচেয়ে সুন্দরতম হুকুম, তাঁর সৃষ্টি সবচেয়ে সুন্দরতম সৃষ্টি হয়েছে। তিনি সব কিছু সুন্দরভাবে ও দৃঢ়ভাবে সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,

﴿صُنْعَ اللَّهِ الَّذِي أَتْقَنَ كُلَّ شَيْءٍ﴾

“(এটা) আল্লাহর কাজ (সৃষ্টি), যিনি সব কিছু দৃঢ়ভাবে করেছেন।” [সূরা আন-নামাল, আয়াত: ৮৮]

তিনি সবকিছু উত্তমরূপে সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,

﴿ ٱلَّذِيٓ أَحۡسَنَ كُلَّ شَيۡءٍ خَلَقَهُ٧﴾ [السجدة : ٧]

“যিনি তাঁর প্রতিটি সৃষ্টিকে সুন্দর করে সৃষ্টি করেছেন।” [সূরা আস-সাজদাহ, আয়াত: ৭]

আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেছেন,

﴿وَمَنۡ أَحۡسَنُ مِنَ ٱللَّهِ حُكۡمٗا لِّقَوۡمٖ يُوقِنُونَ٥٠﴾ [المائ‍دة: ٥٠]

“আর নিশ্চিত বিশ্বাসী জাতির জন্য বিধান প্রদানে আল্লাহর চেয়ে কে অধিক উত্তম?” [সূরা আল-মায়েদা, আয়াত: ৫০]

এরপরে গ্রস্থকার[64] আল্লাহর সৌন্দর্যের ব্যাপারে আক্বলী দলিল পেশ করেন। তিনি বলেন, সৃষ্টিজগত যেহেতু নানা সৌন্দর্যে ভরপুর, আর এসবের সৌন্দর্য আল্লাহর সৌন্দর্য থেকে এসেছে, যিনি এগুলোকে সৌন্দর্যের চাদরে ঢেকে দিয়েছেন এবং তাদেরকে সৌন্দর্য দান করেছেন। তিনি তো এসবের চেয়ে অধিক সুন্দর। কেননা কাউকে সৌন্দর্য দানকারী নিজে সৌন্দর্যের অধিক হকদার। দুনিয়া ও আখিরাতের যাবতীয় প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য সৌন্দর্য, বিশেষ করে আল্লাহ জান্নাতী পুরুষ ও নারীকে যে সৌন্দর্য দান করবেন, জান্নাতী হুর যদি দুনিয়াতে তাদের হাতের তালু প্রকাশ করে তাহলে দুনিয়ার সূর্যের আলো মলিন হয়ে যাবে যেভাবে সূর্য তারকার আলো মলিন করে দেয়। তাহলে যিনি তাদেরকে এত সৌন্দর্য দান করবেন, যিনি তাদেরকে এত উত্তমরূপ ও পূর্ণতা দান করবেন তিনি তো সৌন্দর্যের দিক থেকে অধিক সুন্দরতম হওয়া অত্যাবশ্যকীয় ও হকদার। তাঁর অনুরূপ কোন কিছুই নেই। এ মাসআলায় এটি একটি স্পষ্ট গ্রহণযোগ্য আক্বলী দলিল। আল্লাহর অন্যান্য সিফাতের ব্যাপারেও একই কথা। আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,

﴿وَلِلَّهِ ٱلۡمَثَلُ ٱلۡأَعۡلَىٰ٦٠﴾ [النحل: ٦٠]

“এবং আল্লাহর জন্য রয়েছে মহান উদাহরণ।” [সূরা আন-নাহাল, আয়াত: ৬০] মাখলুকাতের মধ্যে যেসব পূর্ণ গুণ পাওয়া যায় তা অপূর্ণ হওয়া অত্যাবশ্যকীয় নয়। কেননা এসব গুণাবলী আল্লাহ দান করেছেন। তিনি যাদেরকে দান করেছেন তাদের চেয়ে তিনি নিজে এসব গুণেআ অধিকারী হওয়া অধিক হকদার। যেহেতু সৃষ্টির সাথে তাঁর কোন তুলনা হয় না, যেমন তাঁর যাতের সাথে সৃষ্টিজগতের যাতের কোন তুলনা হয় না, তাদের গুণের সাথে আল্লাহর গুণের তুলনা হয় না। সুতরাং যিনি তাদেরকে শ্রবণশক্তি, দৃষ্টিশক্তি, জীবন, ইলম, সক্ষমতা ও সৌন্দর্য দান করেছেন তিনি এসব গুণাবলীতে বিশেষিত হওয়া তাদের চেয়ে অধিক হকদার। তাঁর সৌন্দর্য কিভাবে আমরা প্রকাশ করব? সৃষ্টিজগতের সর্বাধিক জ্ঞানী রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর সম্পর্কে বলেছেন,

«لَا أُحْصِي ثَنَاءً عَلَيْكَ أَنْتَ كَمَا أَثْنَيْتَ عَلَى نَفْسِكَ».

“আপনি নিজের প্রশংসা যেভাবে করেছেন আমি সেভাবে আপনার প্রশংসা করতে সক্ষম নই।”[65]

রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেছেন,

«حِجَابُهُ النُّورُ لَوْ كَشَفَهُ لَأَحْرَقَتْ سُبُحَاتُ وَجْهِهِ مَا انْتَهَى إِلَيْهِ بَصَرُهُ مِنْ خَلْقِهِ».

“তাঁর পর্দা হচ্ছে নূর (জ্যোতি)। তিনি তাঁর পর্দা তুলে নিলে তাঁর চেহারার জ্যোতি বা মহিমা তাঁর সৃষ্টির দৃষ্টির সীমা পর্যন্ত সব কিছু ভস্মীভূত করে দিত।”[66]

সুবহানাল্লাহ, আমরা আল্লাহর পবিত্রতা বর্ণনা করছি। যালিম ও আল্লাহর বড়ত্ব ও শ্রেষ্ঠত্ব অস্বীকারকারীগণ যা কিছু অপবাদ করে তা থেকে তিনি পবিত্র। তাদের ধ্বংস ও শাস্তির জন্য এটিই যথেষ্ট যে, তারা আল্লাহর পরিচয় ও তাঁর ভালোবাসা অর্জনে বঞ্চিত।

গ্রন্থকার রহ.[67] আল-জালীল ও আল-জামীলদ্বয়কে একত্রে উল্লেখ করেছেন। কেননা আল্লাহর পূর্ণাঙ্গ দাসত্ব (ইবাদত) এ সম্মানিত নামদ্বয়ের দ্বারা দাসত্বকে বুঝায়। আল-জালীলের ইবাদত তাঁকে সম্মান, ভয়, আতঙ্ক, শ্রেষ্ঠত্ব ও বড়ত্ব প্রকাশ বুঝায়। আর আল-জামীল নামের ইবাদত তাঁকে ভালোবাসা, তাঁর কাছে ঝুঁকে পড়া, একনিষ্ঠ ভালোবাসার সাথে বান্দা তাঁর সমীপে নত হওয়া, তাঁকে প্রকৃত ভালোবাসা; যেহেতু অন্তর তাঁর পরিচয়ের বাগানে ও তাঁর সৌন্দর্যের ময়দানে সর্বদা তাঁর তাসবীহ পাঠ করে, তাঁর সৌন্দর্য ও পূর্ণতার প্রভাবে অন্তর পরিচালিত হয়। কেননা আল্লাহ মহামর্যাদা ও মহাসম্মানের অধিকারী।[68]

আল-জাওয়াদ (মহা দানশীল), আল-হাসীব (মহা মীমাংসাকারী), আল-হাফীয (মহা সংরক্ষণকারী)।  

১৮-আল-জাওয়াদ (মহা দানশীল)[69]:

গ্রন্থকার রহ. বলেছেন, গ্রন্থকার ইবনুল কাইয়্যিম রহ. বলেছেন, আল-জাওয়াদ অর্থ আল্লাহ তা‘আলা ব্যাপক দানশীল, তাঁর বদান্যতা সমস্ত সৃষ্টির জন্য ব্যাপৃত। তাঁর দয়ায় ও দানে সবকিছু ভরপুর এবং তাঁর নি‘আমত নানা ধরণের। তাঁর দান তাঁর কাছে প্রার্থনাকারী সকল মুসলিম, অমুসলিম, সৎকর্মশীল, অসৎকর্মশীল সকলেই পেয়ে থাকেন। কেউ তাঁর কাছে চাইলে সে তাঁর দয়া ও দান সে পেয়ে থাকেন। কেননা তিনি তো দানশীল, দয়াময় ও পরম দয়ালু। আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,

﴿وَمَا بِكُم مِّن نِّعۡمَةٖ فَمِنَ ٱللَّهِۖ ثُمَّ إِذَا مَسَّكُمُ ٱلضُّرُّ فَإِلَيۡهِ تَجۡ‍َٔرُونَ٥٣﴾ [النحل: ٥٣]

“আর তোমাদের কাছ যে সব নি‘আমত আছে, তা আল্লাহর পক্ষ থেকে। অতঃপর দুঃখ-দুর্দশা যখন তোমাদের স্পর্শ করে তখন তোমরা শুধু তার কাছেই ফরিয়াদ কর।” [সূরা আন-নাহাল, আয়াত: ৫৩]

তাঁর ব্যাপক ও প্রশস্ত দান তিনি তাঁর প্রিয় বান্দাদের জন্য পরকালে জান্নাতে তৈরি করে রেখেছেন, যা কোন চক্ষু কখনও দেখে নি, কোন কর্ণ কোন দিন শুনে নি, মানুষের অন্তর কখনও সে নি‘আমতের কথা কল্পনাও করে নি।[70]

আল-জাওয়াদ তথা দানশীল আল্লাহর দান আসমান ও জমিনবাসী সকলের জন্যই ব্যাপক ভাবে বেষ্টিত। বান্দা যে নি‘আমতই লাভ করুক তা একমাত্র তাঁর থেকেই। বান্দা কোন বিপদ আপদে পতিত হলে তারা তাঁরই কাছে ফিরে যায় এবং তাঁরই কাছে বিনীতভাবে বিপদ থেকে রক্ষা পেতে প্রার্থনা করে। অত:এব, কোন সৃষ্টিই চোখের পলকের জন্যও তাঁর দান থেকে অমুখাপেক্ষী নয়। তবে আল্লাহর দান ও সম্মান প্রদানের কারণ ও হিকমত অনুসারে বান্দাদের মধ্যে এ নি‘আমত প্রাপ্তির তারতম্য ও স্তর রয়েছে। তাঁর নি‘আমত পাওয়ার সর্বাধিক উপায় হচ্ছে প্রকাশ্য, অপ্রকাশ্য কাজে-কর্মে সর্বাবস্থায় তাঁর ইবাদত করা ও চলাফেরা, উঠা-বসা সর্বক্ষেত্রে তাঁর নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অনুসরণ করা।[71]

আল-হাসীব (মহা মীমাংসাকারী), আল-হাফীয (মহা সংরক্ষণকারী), আল-হাক্ব (মহা সত্য, প্রকৃত সত্য), আল-হাকাম (মহা বিচারপতি), আল-হাকীম (সুবিজ্ঞ, সুদক্ষ)।

১৯- আল-হাসীব (মহা মীমাংসাকারী, হিসাব গ্রহণকারী)[72]:

গ্রন্থকার রহ. বলেছেন, আল-হাসীব হলেন যিনি বান্দার সবকিছু সম্পর্কে জ্ঞাত, সর্বজ্ঞানী, সর্বদর্শী, যিনি তাঁর উপর ভরসাকারীদের জণ্য যথেষ্ট, যিনি তাঁর হিকমত ও ইলম অনুযায়ী বান্দার যাবতীয় ভালো-মন্দ কাজের প্রতিদান দানকারী।[73]

আবার আল-হাসীব অর্থ আর-রাকীব তথা অতন্দ্র পর্যবেক্ষণকারী, বান্দার কর্ম অনুসারে তাঁর ন্যায় বিচার ও দয়ায় তাদের যাবতীয় কাজের হিসেব গ্রহণকারী। আবার আল-হাসীবের আরেক অর্থ আল-কাফী তথা যথেষ্ট, তিনি বান্দার দু:খ-কষ্ট, চিন্তা-ভাবনা সর্বাবস্থায় তাদের জন্য যথেষ্ট। এর চেয়েও বিশেষ অর্থ হচ্ছে, তিনি তাঁর উপর তাওয়াক্কুলকারীদের জন্য যথেষ্ট। আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,

﴿وَمَن يَتَوَكَّلۡ عَلَى ٱللَّهِ فَهُوَ حَسۡبُهُ٣﴾ [الطلاق : ٣]

“আর যে আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করে আল্লাহ তার জন্য যথেষ্ট।” [সূরা আত-তালাক, আয়াত: ৩] অর্থাৎ তিনি তাদের দুনিয়া ও আখিরাতের যাবতীয় কাজে যথেষ্ট।

আল-হাসীবের আরেক অর্থ যিনি বান্দার ভালো-মন্দ যাবতীয় কাজ হিফাযত করেন, ভালো কাজের প্রতিদান ভালো আর মন্দ কাজের প্রতিদান মন্দ দান করেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,

﴿يَٰٓأَيُّهَا ٱلنَّبِيُّ حَسۡبُكَ ٱللَّهُ وَمَنِ ٱتَّبَعَكَ مِنَ ٱلۡمُؤۡمِنِينَ٦٤﴾ [الانفال: ٦٤]

“হে নবী, তোমার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট এবং যেসব মুমিন তোমার অনুসরণ করেছে তাদের জন্যও।” [সূরা আল- আনফাল, আয়াত: ৬৪] অর্থাৎ আল্লাহ আপনার ও আপনার অনুসারীদের জন্য যথেষ্ট। অত:এব, যারা রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য সর্বাবস্থায় অনুসরণ করেন এবং আল্লাহর ইবাদত করেন তাদের জন্য আল্লাহই যথেষ্ট।[74]

২০- আল-হাফীয (মহা সংরক্ষণকারী)[75]:

গ্রন্থকার রহ. বলেছেন, আল-হাফীয হলেন যিনি সৃষ্টিজগতকে হিফাযত করেন, তাদেরকে সংরক্ষণ করেন, তিনি যা সৃষ্টি করেছেন তা তাঁর ইলম দ্বারা বেষ্টন করে রাখেন, তিনি তাঁর প্রিয় বান্দাদেরকে গুনাহ ও ধ্বংসে পতিত হওয়া থেকে হিফাযত করেন, তাদের চলা-ফেরা, কাজ-কর্মে দয়া করেন, বান্দার আমল ও প্রতিদান হিসেব করে রাখেন। আল-হাফীয নামটি দুটি অর্থ শামিল করে:

প্রথমত: বান্দার ভালো, মন্দ, আনুগত্য ও অবাধ্যতা সব ধরণের কাজ তিনি সংরক্ষণ করেন। কেননা তাঁর ইলম তাদের প্রকাশ্য ও গোপনীয় যাবতীয় কাজকে বেষ্টন করে রেখেছে। তিনি আগেই তা লাওহে মাহফুযে লিপিবদ্ধ করে রেখেছেন। তিনি কিরামান কাতেবীন ফিরিশতাদ্বয়কে তাদের আমল লিপিবদ্ধ করতে নিয়োজিত করে রেখেছেন। আল-হাফীযের এ অর্থে আল্লাহর ইলম তাদের প্রকাশ্য ও গোপন যাবতীয় আমলকে বেষ্টন করে রেখেছে বুঝায়, তাদের আমলসমূহ লাওহে মাহফুযে ও ফিরিশতাদের কিতাবে লিপিবদ্ধ করা আছে। এগুলোর পরিমাণ, পূর্ণতা, অপূর্ণতা, সাওয়াব ও শাস্তির পরিমাণ, অত:পর তাঁর দয়া ও ন্যায় বিচার অনুসারে তাদের পুরষ্কার ইত্যাদি সকল বিষয়ে তাঁর ইলম সব কিছুকে বেষ্টন করে রেখেছে প্রমাণ করে।

আল-হাফীযের দ্বিতীয় অর্থ: তাঁর সৃষ্টিকুলের যাবতীয় অপছন্দনীয় জিনিস থেকে তাদেরকে তিনি সংরক্ষণকারী। আল্লাহর হিফয দু’ধরণের। ‘আম তথা সর্ব সাধারণের জন্য হিফয এবং খাস তথা বিশেষ শ্রেণীর জন্য হিফয। তাঁর ‘আম তথা সকলের জন্য সাধারণ সংরক্ষণ বলতে বুঝায়, তিনি সৃষ্টিকুলের জন্য জীবিকা নির্বাহ, তাদের কাঠামো সংরক্ষণ, তাঁর হিদায়েতের দিকে চলা, তাঁর পথ নির্দেশনা অনুযায়ী তাদের কল্যাণের দিকে পথ চলা ইত্যাদি। তাঁর সর্বময় সাধারণ হিদায়েতের ব্যাপারে তিনি বলেছেন,

﴿أَعۡطَىٰ كُلَّ شَيۡءٍ خَلۡقَهُۥ ثُمَّ هَدَىٰ٥٠﴾ [طه: ٥٠]

“তিনি সকল বস্তুকে তার আকৃতি দান করেছেন, অতঃপর সঠিক পথ নির্দেশ করেছেন।” [সূরা ত্বা-হা, আয়াত: ৫০] অর্থাৎ তিনি প্রত্যেক মাখলুককে তাদের জন্য নির্ধারিত ও প্রয়োজনীয় সঠিক পথ নির্দেশ করেছেন। যেমন, পানাহার ও বিয়ে-শাদীর পথ নির্দেশ করেছেন এবং এসবের প্রতি চলার উপকরণ সৃষ্টি করেছেন। এমনিভাবে তাদেরকে তাদের অপছন্দনীয় ও ক্ষতিকর জিনিস প্রতিহত করার সক্ষমতা দান করেছেন। এ জাতীয় হিদায়েত সৎকার, বদকার; এমনকি সব সৃষ্টির জন্য সমভাবে প্রযোজ্য। তিনিই আসমান ও জমিনকে ধসে পড়া থেকে সংরক্ষণ করেন, তিনি তাঁর নানা নি‘আমত প্রদান করে সৃষ্টিকুলকে হিফাযত করেন, মানুষকে হিফাযতের জন্য তিনি সম্মানিত ফিরিশতা নিয়োজিত করেছেন, তারা আল্লাহর আদেশে তাদেরকে সংরক্ষণ করেন। অর্থাৎ তারা আল্লাহর আদেশে তাদের থেকে যাবতীয় ক্ষতিকর জিনিস প্রতিহত করেন। আল্লাহ যদি তাদের জন্য এ ব্যবস্থা না করতেন তাহলে সেসব জিনিস তাদেরকে ক্ষতি করত।

আল্লাহর দ্বিতীয় প্রকার বিশেষ হিফাযত হলো উপরোক্ত হিফাযত ছাড়াও তিনি তাঁর প্রিয় বান্দাদেরকে তাদের ঈমানের ক্ষতিকর জিনিস থেকে হিফাযত করেন অথবা যেসব কারণে তারা দ্বিধা-সন্দেহে, ফিতনা ও প্রবৃত্তির লালসায় পতিত হতে পারেন তিনি তাদের থেকে তা দূরীভূত করেন। ফলে তারা সেসব ক্ষতিকর জিনিস থেকে মুক্ত থাকে, তিনি তাদেরকে নিরাপদে ও সুস্থতার সাথে সেসব পথ থেকে বের করে নিয়ে আসেন। এছাড়াও তিনি তাদেরকে তাদের শত্রু জীন ও ইনসানের অনিষ্টতা থেকেও সংরক্ষণ করেন। ফলে তারা তাদের শত্রুর উপর বিজয় লাভ করেন এবং তাদের ষড়যন্ত্রের প্রতিহত করেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,

﴿إِنَّ ٱللَّهَ يُدَٰفِعُ عَنِ ٱلَّذِينَ ءَامَنُوٓاْ٣٨﴾ [الحج : ٣٨]

“নিশ্চয় আল্লাহ মুমিনদেরকে রক্ষা করেন।” [সূরা আল-হাজ্জ, আয়াত: ৩৮] এখানে মুমিনদের রক্ষাকরণ ব্যাপক অর্থে প্রযোজ্য। তিনি তাদেরকে দীন ও দুনিয়ার যাবতীয় ক্ষতিকর জিনিস থেকে তাদেরকে রক্ষা করেন। সুতরাং বান্দার ঈমানের স্তর অনুযায়ী আল্লাহর সুরক্ষা লাভ করবে। হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

«احْفَظِ اللَّهَ يَحْفَظْكَ».

“আল্লাহর (বিধানসমূহের) হিফাযত করবে, তিনি তোমার হিফাযত করবেন।”[76] অর্থাৎ তুমি আল্লাহর আদেশ পালন করা, নিষেধাজ্ঞা থেকে বিরত থাকা, তাঁর সীমারেখা অতিক্রম না করা ইত্যাদির মাধ্যমে আল্লাহর বিধান রক্ষা করো, তাহলে আল্লাহ তোমার জীবন, দীন, ধন-সম্পদ, সন্তান-সন্ততি ও তিনি তাঁর দয়ায় যা কিছু তোমাকে দান করেছেন তা সংরক্ষণ করবেন।[77]

২১- আল-হাক্ক (প্রকৃত সত্য)[78]:

গ্রন্থকার রহ. বলেছেন, তিনি যাত ও সিফাত সর্বদিক দিয়েই সত্য। তিনি ওয়াজিবুল ওয়াজুদ তথা অত্যাবশ্যকীয় ভাবে সদাবিদ্যমান, পরিপূর্ণ সিফাত ও গুণাবলীর অধিকারী, তাঁর অস্তিত্ব বিদ্যমান থাকা তাঁর যাতের অত্যাবশ্যকীয়তা। তিনি ব্যতীত কোন কিছুর অস্তিত্ব ছিল না। তিনি আযালী তথা সর্বদা ছিল ও থাকবেন, তিনি সর্বদা বড়ত্ব, সৌন্দর্য ও পূর্ণতার গুণে সর্বদা গুণান্বিত ছিল ও থাকবেন। তিনি সর্বদা ইহসানে সুপরিচিত ছিল ও থাকবেন।

তাঁর কথা সত্য, তাঁর কাজ সত্য, তাঁর দর্শন সত্য, তাঁর রাসূল সত্য, তাঁর কিতাব সত্য, তাঁর দীন সত্য, একমাত্র তাঁর ইবাদত করা ও তাঁর সাথে কাউকে শরীক না করা সত্য, সবকিছু তাঁর কাছে প্রত্যাবর্তন করবে এ কথা সত্য। আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,

﴿ذَٰلِكَ بِأَنَّ ٱللَّهَ هُوَ ٱلۡحَقُّ وَأَنَّ مَا يَدۡعُونَ مِن دُونِهِۦ هُوَ ٱلۡبَٰطِلُ وَأَنَّ ٱللَّهَ هُوَ ٱلۡعَلِيُّ ٱلۡكَبِيرُ٦٢﴾ [الحج : ٦٢]

“আর এটা এজন্য যে, নিশ্চয় আল্লাহই সত্য এবং তারা তাঁর পরিবর্তে যাকে ডাকে, অবশ্যই তা বাতিল। আর নিশ্চয় আল্লাহ তো সমুচ্চ, সুমহান।” [সূরা আল-হাজ্জ, আয়াত: ৬২]

আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেছেন,

﴿وَقُلِ ٱلۡحَقُّ مِن رَّبِّكُمۡۖ فَمَن شَآءَ فَلۡيُؤۡمِن وَمَن شَآءَ فَلۡيَكۡفُرۡ٢٩﴾ [الكهف: ٢٩]

“আর বলুন, সত্য তোমাদের রবের পক্ষ থেকে। সুতরাং যে ইচ্ছা করে সে যেন ঈমান আনে এবং যে ইচ্ছা করে সে যেন কুফরী করে।” [সূরা আল-কাহফ, আয়াত: ২৯]

আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেছেন,

﴿فَمَاذَا بَعۡدَ ٱلۡحَقِّ إِلَّا ٱلضَّلَٰلُ٣٢﴾ [يونس : ٣٢]

“অতঃপর সত্যের পর ভ্রষ্টতা ছাড়া কী থাকে?” [সূরা ইউনুস, আয়াত: ৩২]

﴿وَقُلۡ جَآءَ ٱلۡحَقُّ وَزَهَقَ ٱلۡبَٰطِلُۚ إِنَّ ٱلۡبَٰطِلَ كَانَ زَهُوقٗا٨١﴾ [الاسراء: ٨١]

“আর বলুন, হক এসেছে এবং বাতিল বিলুপ্ত হয়েছে। নিশ্চয় বাতিল বিলুপ্ত হওয়ারই ছিল।” [সূরা আল-ইসরা, আয়াত: ৮১][79]

২২- আল-হাকাম: আল-হাকাম (মহা বিচারপতি, হুকুমদাতা)[80], আল-‘আদল (ন্যায় বিচাকর)।

গ্রন্থকার শাইখ আস-সা‘দী রহ. বলেছেন, আল্লাহর নামসমূহের মধ্যে আরেকটি নাম হলো আল-হাকাম (মহা বিচারপতি, হুকুমদাতা) আল-‘আদল (ন্যায় বিচাকর)। যিনি দুনিয়া ও আখিরাতে বান্দাকে ন্যায়পরায়নতার সাথে হুকুম দেন, তাদেরকে অনু পরিমাণও যুলুম করেন না, কারো অপরাধ কারো ঘাড়ে চাপিয়ে দেন না, বান্দাকে তার অপরাধের বেশি শাস্তি দেন না, যার যার অধিকার তাকে দিয়ে দেন, কারো অধিকার ক্ষুন্ন করে না। তিনি তাঁর পরিচালনা ও বণ্টনে ন্যায়পরায়ন। আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,

﴿إِنَّ رَبِّي عَلَىٰ صِرَٰطٖ مُّسۡتَقِيمٖ٥٦﴾ [هود: ٥٦]

“নিশ্চয় আমার রব সরল পথে আছেন।” [সূরা হূদ, আয়াত: ৫৬]

আল-হাকাম ও আল-‘আদল হলেন যিনি সব কিছুর হুকুম দেন। তাই তিনি তাঁর শরী‘আতের বিধি-বিধানের হুকুম দেন, ঝগড়াটে ও আপোষকারী সব ধরণের বান্দার জন্য তিনি সব পথ বিস্তারিত ও স্পষ্ট করে বর্ণনা করেন, তাঁর পথসমূহ ন্যায়নীতিবান ও প্রজ্ঞাময়। বান্দা যেসব ব্যাপারে নিজেদের মধ্যে মতানৈক্য করেন তিনি সেসব ব্যাপারে চুড়ান্ত ফয়সালা দেন, তিনি তাদের তাকদীরের ফয়সালা করেন, তাঁর হিকমত অনুযায়ী তাদের ব্যাপারে তিনি ফয়সালা দেন, তিনি সব কিছু তার যথাযথ স্থানে স্থাপন করেন, আবার যেটি সেখান থেকে নামানো প্রয়োজন সেটিকে সেখান থেকে নামিয়ে দেন। তিনি কিয়ামত ও হিসাবের দিন তাদের মধ্যে বিচার করবেন, তখন তিনি সত্য ও ন্যায্যভাবে তাদেরকে প্রতিদান দিবেন। সৃষ্টিকুল তাঁর বিচারের প্রশংসা করবেন; এমনকি যাদের ব্যাপারে শাস্তি নির্ধারিত হবে তারাও তাঁর ন্যায়পরায়নতার সাক্ষ্য দিবে এবং তারা স্বীকার করবে যে, তারা অপরাধী ছিল। তিনি কাউকে অনু পরিমাণও যুলুম করেন না।[81]

২৩- আল-হাকীম (সুবিজ্ঞ, সুদক্ষ)[82]:

গ্রন্থকার রহ. বলেছেন, আল-হাকীম হলেন, যিনি সৃষ্টিকুলকে সুন্দর আকৃতিতে সৃষ্টি করেছেন সেসব সৃষ্টিজগত ও তাদের আদেশ-নিষেধের ব্যাপারে যার রয়েছে সুউচ্চ হিকমত। আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,

﴿وَمَنۡ أَحۡسَنُ مِنَ ٱللَّهِ حُكۡمٗا لِّقَوۡمٖ يُوقِنُونَ٥٠﴾ [المائ‍دة: ٥٠]

“আর নিশ্চিত বিশ্বাসী জাতির জন্য বিধান প্রদানে আল্লাহর চেয়ে কে অধিক উত্তম?” [সূরা আল-মায়েদা, আয়াত: ৫০]

অত:এব, তিনি কোন কিছু বৃথা সৃষ্টি করেন নি এবং কোন বিধানও তিনি অযথা শরী‘আতবদ্ধ করেন নি। সৃষ্টির শুরুতে ও শেষে সর্বাস্থায় তাঁর রয়েছে বিধান। তাঁর বিধিবদ্ধ তিনটি বিধানের ব্যাপারে কেউ অংশীদার নেই। তিনি বান্দার শরী‘আত, তাদের তাকদীর ও তাদের প্রতিদান এ তিন ব্যাপারে ফয়সালা দেন। হিকমত হলো বস্তুকে তার যথাযথ স্থানে রাখা এবং যেটিকে যেখানে নামানো প্রয়োজন সেটিকে সেখানে রাখা।[83]

আল-হাকীম পূর্ণাঙ্গ হিকমত ও সৃষ্টিকুলের মধ্যে পরিপূর্ণ হুকুম দেওয়ার গুণে গুণান্বিত। অত:এব, আল-হাকীম হলেন প্রশস্ত ব্যাপক ইলম ও সর্ববিষয়ে জ্ঞানের অধিকারী। তিনি বস্তুর মৌলিক জ্ঞান ও তাদের শেষ পরিণতি সম্পর্কে অবগত। তিনি সর্বময় প্রশংসা, পূর্ণ কুদরত ও অফুরন্ত রহমতের অধিকারী। তিনিই সব বস্তুকে তার যথাযথ স্থানে সংস্থাপন করেছেন, যাকে যে মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করা দরকার তাকে সে মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করেছেন। সুতরাং তাঁর কাজে কেউ কোন প্রশ্ন করতে পারে না এবং তাঁর হিকমতের ব্যাপারে কেউ সমালোচনাও করতে পারে না।

আল্লাহর হিকমত দু’প্রকার:

প্রথমত: সৃষ্টির ব্যাপারে তাঁর হিকমত। তিনি সৃষ্টিকুলকে যথার্যভাবে সৃষ্টি করেছেন। তাদেরকে সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত করেছেন, তাদের ব্যাপারে তাঁর লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সত্য। তিনি সৃষ্টিকুলকে উত্তম আকৃতিতে ও পূর্ণাঙ্গ সুঠাম কাঠামোতে সৃষ্টি করেছেন। প্রত্যেক সৃষ্টিকে তার উপযোগী আকৃতি দান করেছেন; বরং তিনি সব সৃষ্টিকে তার প্রয়োজনীয় যাবতীয় অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দান করেছেন। প্রত্যেক প্রাণীর প্রতিটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ তার উপযোগী করে তিনি সৃষ্টি করেছেন। সুতরাং কেউ তাঁর সৃষ্টির মধ্যে ত্রুটি, কমতি ও ছেঁড়া-ফাটা দেখতে পাবে না। সৃষ্টির শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সৃষ্টিকুলের সমস্ত জ্ঞানবানরা একত্রিত হয়ে দয়াময় আল্লাহর সৃষ্টির মতো কিছু সৃষ্টি করতে বা সৃষ্টিজগতে যেসব সুন্দর ও সুঠাম সৃষ্টি আছে তার কাছাকাছি কিছু তৈরি করতে চেষ্টা করে তাহলে তারা কেউ তা সক্ষম হবে না। কিভাবেই বা তারা এ কাজ করতে সক্ষম হবে? প্রজ্ঞাবান ও জ্ঞানীদের জন্য এটিই যথেষ্ট যে, তারা তাঁর হিকমতের অনেক কিছুই স্বীকার করে, এসবের কিছু কিছু সৌন্দর্য, সুষ্ঠ ও সুদৃঢ় সৃষ্টি সম্পর্কে তারা অবগত হয়। এ কথা সকলের কাছেই অত্যাবশ্যকীয় জ্ঞাতব্য বিষয়, যেহেতু তারা তাঁর মহত্ব ও পূর্ণাঙ্গ গুণাবলী জানে এবং সৃষ্টি ও এদের পরিচালনার ব্যাপারে তাঁর হিকমত অনুসন্ধান করে।

তিনি তাঁর বান্দাদেরকে তাঁর সৃষ্টির ব্যাপারে চ্যালেঞ্জ করেছেন, তাদেরকে তাঁর সৃষ্টিজগত দেখতে আদেশ করেছেন, বারবার দৃষ্টিপাত ও চিন্তা করতে বলেছেন। তারা কি তাঁর সৃষ্টির মাঝে ত্রুটি বা অপূর্ণতা দেখতে পায়? তাদের চক্ষুসমূহ আল্লাহর সৃষ্টিজগত সম্পর্কে সমালোচনা করতে অবশ্যই অক্ষম হবে।

দ্বিতীয় প্রকার: তাঁর শরী‘আত ও আদেশ-নিষেধের ব্যাপারে হিকমত। আল্লাহ তা‘আলা যুগে যুগে বিভিন্ন শরী‘আত বিধিবদ্ধ করেছেন, বান্দাদেরকে তাঁর পরিচয় জানাতে ও তাঁর ইবাদত করতে তিনি কিতাবসমূহ নাযিল করেছেন এবং রাসূলদেরকে প্রেরণ করেছেন। সুতরাং এর চেয়ে আর কি উত্তম হিকমত থাকতে পারে? এর চেয়ে কি উত্তম দয়া ও সম্মান হতে পারে? কেননা আল্লাহ তা‘আলার পরিচয় লাভ, একমাত্র তাঁর ইবাদত করা, তাঁর সাথে কাউকে শরীক না করা, ইখলাসের সাথে তাঁর জন্য আমল করা, তাঁর শুকরিয়া ও গুণগান করার চেয়ে বান্দার জন্য সাধারণভাবে উত্তম কাজ আর কিছু হতে পারে না।

আল্লাহ যাকে এসব নি‘আমত দান করেন সে-ই সর্বাধিক সম্মানিত, সবচেয়ে সৌভাগ্যবান, অন্তর ও রূহের দিক থেকে সে সবচেয়ে সুখী ব্যক্তি। এছাড়াও এ পথটি চিরস্থায়ী জান্নাতে যাওয়ার একমাত্র পথ।

তাঁর নির্দেশ ও শরী‘আতে যদি এসব সুউচ্চ হিকমত নাও থাকত, যার মূল হলো কল্যাণ ও পূর্ণাঙ্গ ভোগ, এ কারণেই তিনি সৃষ্টিকুলকে সৃষ্টি করেছেন, এ কারণে তারা প্রতিদান প্রাপ্ত হবে, এ কারণেই জান্নাত ও জাহান্নাম সৃষ্টি করা হয়েছে- তাহলেও তাঁর জন্য যথেষ্ট হতো।

অধিকন্তু তাঁর প্রেরিত শরী‘আত ও দীন সব ধরণের কল্যাণ শামিল করেছে। তাঁর সংবাদসমূহ ইলম, ইয়াকীন, ঈমান ও সঠিক আক্বীদার ব্যাপারে অন্তর পূর্ণ করে দেয়, হৃদয়কে বক্রতা থেকে সঠিক করে, সব ধরণের বক্রতা ও কুসংস্কার দূর করে, যাবতীয় সুন্দর, উত্তম চরিত্র, সৎ আমল, হিদায়েত ও সূক্ষ্ম বুদ্ধি ইত্যাদির ফল দেয়। তাঁর আদেশ ও নিষেধ হিকমত, দীন ও দুনিয়ার যাবতীয় কল্যাণ ও সংস্কার অন্তর্ভুক্ত করে। কেননা তিনি সৃষ্টিকুলের শুধুই কল্যাণ ব্যতীত তাদেরকে কোন কিছুর আদেশ করেন না। আবার তাদের শুধু অকল্যাণ ব্যতীত তিনি তাদেরকে সেসব বস্তু থেকে নিষেধ করেন না।

ইসলামী শরী‘আতের অন্যতম প্রধান হিকমত হলো মানুষের অন্তর, আখলাক ও আমলকে সংশোধন করা এবং ব্যক্তিকে সহজ-সরল পথে সুদৃঢ়ভাবে অটল রাখা। আর সরল সঠিক পথে অটল থাকাই দুনিয়ার সংশোধন ও কল্যাণ লাভের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য। মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আনিত সঠিক দীন ব্যতীত দুনিয়ার প্রকৃত সংশোধন ও কল্যাণ সাধিত হয় না। আর এ কথা সকল জ্ঞানীর কাছেই দৃশ্যমান ও জ্ঞাত। কেননা উম্মতে মুহাম্মাদী যখন দীনের মৌলিক বিষয়সমূহ, শাখা-প্রশাখা, সব ধরণের হিদায়েত ও নসিহত যথাযথ ভাবে পালন করেছিল ও মান্য করেছিল তখন তাদের ছিল অবিচল, সুদৃঢ় ও অটল অবস্থা এবং তারা কল্যাণে ভরপুর ছিল। কিন্তু তারা যখন দীনের পথ থেকে বিচ্যুত হলো, হিদায়েতের পথ বর্জন করল এবং দীনের সুউচ্চ শিক্ষায় তারা পথ নির্দেশনা নিতে ব্যর্থ হলো তখন তাদের দুনিয়া বিনষ্ট হলো, যেভাবে তাদের দীনও ধ্বংস হলো। পূর্ববর্তী উম্মতের দিকে তাকালে দেখা যাবে তারা শক্তি-সামর্থ্য ও সভ্যতা-সংস্কৃতিতে চরম শীর্ষে পৌঁছা সত্ত্বেও তারা যখন দীনের রূহ, রহমত ও ন্যায়-নীতি থেকে বিচ্যুত হলো তখন তাদের এসব শক্তি-সামর্থ্য ও শিক্ষা-সংস্কৃতি উপকারের চেয়ে ক্ষতিই বেশি সাধন করতে লাগল, এর কল্যাণের চেয়ে অকল্যাণই বেশি। বিজ্ঞানী, জ্ঞানী-গুণী ও তাদের নেতা-নেত্রীরা তাদের সৃষ্ট এসব অকল্যাণ ও ক্ষতিকর জিনিসের মোকাবিলা করতে অক্ষম হলো। অধিকন্তু তারা তাদের বর্তমান অবস্থায় বহাল থাকলে তারা কখনও মোকাবিলা করতে সক্ষম হবে না। এ কারণেই মহান আল্লাহর হিকমত অনুযায়ী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দীন নিয়ে আগমন করেছেন এবং কুরআন তার সত্যতা ও তিনি যা নিয়ে আগমন করেছেন সেগুলো সত্যতার সবচেয়ে বড় প্রমাণ। যেহেতু কুরআনের সবকিছুই পূর্ণ প্রজ্ঞাময়। তিনি (আল্লাহ) ব্যতীত এরূপ প্রজ্ঞাময় হতে পারে না। মোটকথা হলো, তিনি সৃষ্টিজগত ও তাদের শরী‘আত সবকিছুর ব্যাপারেই হাকীম। সবকিছুই তাঁর প্রজ্ঞা বিরাজমান। তিনি মাখলুকাতের তাকদীর, তাদের শর‘ঈ বিধান ও পুরষ্কার-শাস্তি সব ব্যাপারেই তিনি হাকীম তথা মহাবিচারক ও মহাপ্রজ্ঞাময়।

আহকামুল কদর ও আহকামুশ শর‘ঈ এর মধ্যকার পার্থক্য হলো, কদর বলতে তিনি যা কিছু সৃষ্টি করেছেন সেগুলো সম্পৃক্ত বিষয়কে বুঝায় অর্থাৎ তিনি সেগুলোকে সৃষ্টি করেছেন এবং নির্ধারিত পরিমাণে তা সৃজন করেছেন। তিনি যা কিছু চান তা হয়, আর তিনি যা চান না তা কখনও হবে না। অন্যদিকে আহকামুশ শর‘ঈ হলো তিনি যা কিছু শরী‘আতসম্মত করেছেন সেগুলো সম্পর্কিক বিষয়। বান্দা আহকামুল কাদর ও আহকামুশ শর‘ঈ এ দুটি থেকে বা যে কোন একটি থেকে মুক্ত হতে পারে না। সুতরাং যে ব্যক্তি আল্লাহ যা কিছু পছন্দ করেন ও যে কাজে তিনি সন্তুষ্ট হবেন সেসব কাজ করেন সে উভয় হুকুমই একসাথে পালন করল। আর যে আল্লাহর অপছন্দনীয় ও নিষেধ কাজ করল সে শুধু আহকামুল কদরের কাজ করল। কেননা সে যা কিছু করে থাকে তা মূলত আল্লাহর ফয়সালা ও নির্ধারণেই করে থাকে। সে কাজে হুকমুশ শর‘ঈ পাওয়া যায় না; কেননা সে আল্লাহর পছন্দনীয় ও সন্তুষ্টির কাজ বর্জন করেছে। অত:এব, কল্যাণ, অকল্যাণ, আনুগত্য ও অবাধ্যতা সবকিছুই বান্দার সম্পৃক্ত কাজ ও আহকামুল কদরীর অনুগামী। সেগুলোর মধ্যে যেসব কাজ আল্লাহ পছন্দ করেন সেগুলো আহকামুশ শর‘ঈ ও শরী‘আত সম্পৃক্ত কাজ। আল্লাহই অধিক জ্ঞাত।[84]

আল-হালীম (মহা সহনশীল, মহা ধৈর্যশীল, প্রশ্রয়দাতা), আল-হামীদ (সকল প্রশংসার দাবীদার, মহা প্রশংসনীয়), আল-হাইয়্যু (চিরঞ্জীব, যার কোন শেষ নেই), আল-হাই (মহা গোপনকারী, লজ্জাশীল)

২৪- আল-হালীম (মহা সহনশীল, মহা ধৈর্যশীল, প্রশ্রয়দাতা)[85]:

গ্রন্থকার রহ. বলেছেন, আল-হালীম (মহা সহনশীল, মহা ধৈর্যশীল, প্রশ্রয়দাতা) হলেন যার রয়েছে পূর্ণ ধৈর্য। কাফির, ফাসিক ও অবাধ্য সকলের ব্যাপারেই যিনি ধৈর্য ব্যাপক ও প্রশস্ত করে রেখেছেন এবং তিনি তাদেরকে দুনিয়াতে শাস্তি প্রদান থেকে বিরত রয়েছেন এভাবে যে, তাদের মধ্যকার অক্ষম ব্যক্তির উপর অন্যের যুলুম করা বৈধ নয়। তিনি তাদেরকে তিনি সময় ও সুযোগ দিয়েছেন যাতে তারা তাওবা করতে পারে। তবে তারা অতি বাড়াবাড়ি করলে, সীমালঙ্ঘন চালিয়ে যেতে থাকলে এবং তাঁর সমীপে ফিরে না আসলে তিনি তাদেরকে আর সুযোগ দেন না।[86]

আল-হালীম হলেন তিনি যিনি সৃষ্টিকুলের উপর তাঁর প্রকাশ্য ও অপ্রকশ্য সব ধরণের নি‘আমতের কথা অবগত থাকা সত্ত্বেও তাদের অবাধ্যতা ও অধিক ভুল-ভ্রান্তির উপর তিনি ধৈর্যধারণ করেন। ফলে তিনি তাদেরকে শাস্তি দেওয়ার পরিবর্তে তাদের গুনাহ ও অবাধ্যতার ব্যাপারে সহনশীল। তিনি তাদেরকে তিরস্কার ও সতর্ক করেন যাতে তারা তাওবা করে, তাদেরকে তিনি সুযোগ দেন যাতে তারা ফিরে আসে।[87]

আল্লাহ তা‘আলা সহনশীল ও ক্ষমাশীল। তাঁর রয়েছে পূর্ণ ধৈর্য ও সহনশীলতা এবং ব্যাপক ক্ষমাশীলতা। এ মহান গুণ দুটি গুনাহগারের গুনাহ ও যালিমের যুলুমের সাথে সম্পৃক্ত। কেননা অপরাধের শাস্তি তাৎক্ষণিক হওয়া কামনা করে, আর আল্লাহর সহনশীলতা অপরাধীকে সুযোগ দেওয়া ও তাৎক্ষণিক শাস্তি না দেওয়া কামনা করে যাতে তারা তাওবা করতে পারে। আল্লাহর ক্ষমা তাদের গুনাহকে ক্ষমা করে দেওয়া কামনা করে, বিশেষ করে যখন ইসতিগফার, তাওবা, ঈমান ও ভালো আমল ইত্যাদি ক্ষমার উপকরণ পাওয়া যায়। তাঁর ধৈর্য আসমান ও জমিন সর্বত্রে ব্যাপৃত। তাঁর ক্ষমা না থাকলে তিনি জমিনে একটি প্রাণীও ছেড়ে দিতেন না। তিনি ক্ষমাশীল, বান্দাকে ক্ষমা করতে পছন্দ করেন। তিনি তাদের থেকে সেসব কাজ পছন্দ করেন যা তাদের তাঁর ক্ষমা, সন্তুষ্টি ও ইহসান অর্জনের উপায়।

আল্লাহর পূর্ণ ক্ষমার বহি:প্রকাশ হলো যে ব্যক্তি নিজের উপর বারবার যুলুম করেছে, আল্লাহর অবাধ্যতা করেছে সে ব্যক্তি তাওবা করলে তিনি তার ছোট-বড় সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করে দেন। তিনি ইসলামকে ব্যক্তির পূর্বের সমস্ত গুনাহ মার্জনকারী করেছেন। এমনিভাবে তাওবাও পূর্বের সমস্ত গুনাহ মাফ করে দেয়।[88]

২৫- আল-হামীদ (সকল প্রশংসার দাবীদার, মহা প্রশংসনীয়)[89]:

গ্রন্থকার রহ. বলেছেন, আল্লাহ তাঁর যাতগত, নামগত, সিফাতগত ও কর্মগত সব দিক থেকেই আল-হামীদ তথা মহা প্রশংসনীয়। তাঁর রয়েছে সুন্দর সুন্দর নামসমূহ, পরিপূর্ণ সিফাতসমূহ ও পূর্ণাঙ্গ কর্মসমূহ। কেননা আল্লাহর কর্মসমূহ দয়া ও ন্যায়পরায়নতার মধ্যে ঘূর্ণায়মান।[90]

অত:এব, হামদ তথা প্রশংসা হলো অগণিত গুণাবলী ও কল্যাণের সমাহার।[91] আল্লাহ তাঁর প্রশংসনীয় গুণাবলীর কারণে হামীদ তথা মহা প্রশংসীত। তিনি দু’দিক বিবেচনায় হামীদ। তাহলো:

প্রথমত: সমস্ত সৃষ্টি তাঁর প্রশংসা ও গুণগান করে। সৃষ্টির শুরু থেকে শেষ পযর্ন্ত আকাশ ও জমিন বাসীদের সমস্ত প্রশংসা, দুনিয়া ও আখিরাতে তাদের যাবতীয় প্রশংসা, যেসব প্রশংসা এখনও তাদের দ্বারা হয় নি; বরং সময় যতোই গড়িয়ে আসুক তাদের সমস্ত আশু-প্রশংসা যা ঊর্ধ্বজগত ও নিম্নজগতের সকলের প্রশংসা, অস্তিত্বশীল ও অনস্তিত্বশীল সকলের অপরিসীম ও অগণিত প্রশংসা সবকিছু্‌ই নিম্নোক্ত কারণে একমাত্র মহান আল্লাহই প্রাপ্য ও হকদার:

১- আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে সৃষ্টি করেছেন, তিনি তাদেরকে রিযিক দান করেন, তাদেরকে তিনি দীন ও দুনিয়ার প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য নানা নি‘আমত দান করে ঢেকে রেখেছেন, তাদের থেকে তিনি শাস্তি, বালা-মুসিবত ও অপছন্দনীয় জিনিস দূর করে দেন। বান্দা যে নি‘আমতই প্রাপ্ত হোক না কেন তা সবই আল্লাহর দান। তিনি ব্যতীত কেউ তাদের অকল্যাণ দূর করতে পারেন না। অত:এব, তিনি সব সময়ই প্রতিটি শ্বাস-নিশ্বাসে তাদের অগণিত প্রশংসা পাওয়ার অধিকারী।

২- যেহেতু তাঁর রয়েছে সুন্দর নামসমূহ, সুউচ্চ পরিপূর্ণ সিফাতসমূহ, সুন্দর ও মহান প্রশংসাসমূহ। সমস্ত পূর্ণাঙ্গ গুণাবলী একমাত্র তাঁরই, আর সেসব গুণাবলী সবগুলোই পরিপূর্ণ ও মহান। অত:এব, প্রত্যেকটি গুণের জন্যই তিনি পরিপূর্ণ প্রশংসা ও গুণকীর্তনের দাবীদার। তাহলে যার রয়েছে পবিত্রতম সব গুণের সমাহার, তিনি কত প্রশংসার অধিকারী? তাঁর যাতের জন্য প্রশংসা, তাঁর সিফাতের জন্য প্রশংসা, তাঁর কর্মের জন্য প্রশংসা, কেননা তাঁর যাবতীয় কাজই দয়া, ইহসান, ন্যায়পরায়নতা ও হিকমতে ভরপূর, যা তাকে পূর্ণ প্রশংসার দাবীদার করে। তাঁর সৃষ্টি করা, বিধান দান, তাকদীর ও শর‘ঈ আহকাম নাযিল, দুনিয়া ও আখিরাতে প্রতিদান প্রদান ইত্যাদির জন্য তাঁর জন্য রয়েছে প্রশংসা। তাঁর প্রশংসার বিস্তারিত এবং তাঁর যেসব প্রশংসা করা হয় তা মানুষ গননা করতে পারবে না এবং কলমও লিপিবদ্ধ করে শেষ করতে পারবে না।[92]

২৬- আল-হাইয়্যু[93]: আল-হাইয়্যু (চিরঞ্জীব, যার কোন শেষ নেই), আল-কাইয়্যূম (চিরপ্রতিষ্ঠিত ধারক):

গ্রন্থকার রহ. বলেছেন, আল-হাইয়্যু হলেন যার রয়েছে পূর্ণ জীবন, চিরঞ্জীব, যার কোন শেষ নেই এবং আল-কাইয়্যূম হলেন যিনি নিজে প্রতিষ্ঠিত, চিরপ্রতিষ্ঠিত ধারক। তিনি আসমান ও জমিনের সব কিছুকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন, তাদের পরিচালনা, রিযিক দান এবং যাবতীয় দেখা-শুনা তিনি করে থাকেন। অত:এব, আল-হাইয়্যু হলো তাঁর যাতের গুণাবলীর সমষ্টি আর আল-কাইয়্যূম হলো তাঁর কর্মসমূহের গুণের সমষ্টি। এদুটি নাম একত্রে বিশেষ লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যে উল্লেখ করা। যেমন আল্লাহ তাঁর কিতাবের বিভিন্ন জায়গায় উক্ত নাম দুটি একত্রিত করেছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,

﴿ ٱللَّهُ لَآ إِلَٰهَ إِلَّا هُوَ ٱلۡحَيُّ ٱلۡقَيُّومُ٢٥٥﴾ [البقرة: ٢٥٥]

“আল্লাহ, তিনি ছাড়া কোন (সত্য) ইলাহ নেই, তিনি চিরঞ্জীব, সুপ্রতিষ্ঠিত ধারক।” [সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ২৫৫] এ নামদ্বয়ে সমস্ত পূর্ণতার গুণাবলী সন্নিবেশিত হয়েছে। আল-হাইয়্যু হলেন যিনি পূর্ণ জীবনের অধিকারী। এ নামে আল্লাহর সমস্ত যাতী সিফাত যেমন ইলম, ইজ্জত, কুদরত, ইচ্ছা, মহত্ব, অহংকার ইত্যাদি অন্যান্য পবিত্র যাতী সিফাতসমূহ একত্রতি হয়েছে।

আর আল-কাইয়্যূম হলেন পূর্ণ প্রতিষ্ঠিত, সুপ্রতিষ্ঠিত ধারক, যিনি নিজে নিজেই প্রতিষ্ঠিত, তাঁর সিফাতসমূহ মহান, তিনি সমস্ত সৃষ্টি থেকে অমুখাপেক্ষী, তিনি আসমান, জমিন ও এ দুয়ের মধ্যকার সব কিছু সৃষ্টি করেছেন। তিনিই এসব সৃষ্টি করেছেন, এগুলোকে বৃদ্ধি করেছেন এবং এগুলো বেঁচে থাকার জন্য তিনি সব কিছু প্রস্তুত করেছেন। তিনি সব দিক থেকে তাদের থেকে মুখাপেক্ষীহীন; কিন্তু সৃষ্টিকুল সব দিক থেকে তাঁর মুখাপেক্ষী। অত:এব,  আল-হাইয়্যু ও আল-কাইয়্যূম তিনিই যার রয়েছে পূর্ণাঙ্গ গুণ। তিনি তা-ই করেন যা চান।[94] তিনি কিছু ইচ্ছা করলে তাকে সৃষ্টি হতে বললেই হয়ে যায়। কর্মের যাবতীয় গুণাবলী, সম্মান, মর্যাদা ও বড়ত্বের গুণাবলী তাঁর আল-কাইয়্যূম নামের সাথে সম্পৃক্ত। যাবতীয় পূর্ণতার গুণাবলী এ সম্মানিত নাম দুটির দিকে ফিরে। এ কারণেই হাদীসে এসেছে, আল্লাহর ঐ ইসমে আযম দ্বারা দো‘আ করলে তিনি তা কবুল করেন, আর তা দ্বারা কিছু চাওয়া হলে তিনি তা দান করেন।”[95] আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,

﴿ ٱللَّهُ لَآ إِلَٰهَ إِلَّا هُوَ ٱلۡحَيُّ ٱلۡقَيُّومُ٢٥٥﴾ [البقرة: ٢٥٥]

“আল্লাহ, তিনি ছাড়া কোন (সত্য) ইলাহ নেই, তিনি চিরঞ্জীব, সুপ্রতিষ্ঠিত ধারক।” [সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ২৫৫] এ নামদ্বয়ে সমস্ত পূর্ণতার গুণাবলী সন্নিবেশিত হয়েছে। সুতরাং যাতী সিফাতসমূহ আল-হাইয়্যু নামের দিকে আর যাবতীয় কর্মের গুণাবলী আল-কাইয়্যূম নামের দিকে প্রত্যাবর্তীত হয়।[96]

২৭- আল-হাই (লজ্জাশীল,[97] মহা গোপনকারী, আড়ালকারী[98]):

গ্রন্থকার রহ. বলেছেন, আল্লাহর এ নামটি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিম্নোক্ত হাদীস থেকে নেওয়া হয়েছে,

«إِنَّ اللَّهَ حَيِيٌّ كَرِيمٌ يَسْتَحْيِي إِذَا رَفَعَ الرَّجُلُ إِلَيْهِ يَدَيْهِ أَنْ يَرُدَّهُمَا صِفْرًا خَائِبَتَيْنِ».

“নিশ্চয় তোমাদের রব লজ্জাশীল ও দানশীল। তাঁর কোন বান্দা নিজের দু’ হাত তুলে তাঁর নিকট দো‘আ করলে তিনি তার শূন্যহাত বা তাকে নিরাশ করে ফিরিয়ে দিতে লজ্জাবোধ করেন।”[99]

এটি মূলত মহান আল্লাহর অপার রহমত, দয়া, দানশীলতা, পূর্ণতা ও ধৈর্যশীলতা যে, বান্দা তাঁর কাছে প্রতিটি মূহুর্তে অভাবী ও মুখাপেক্ষী হওয়া সত্ত্বেও সে প্রকাশ্যে গুনাহ করে; অথচ সে তার মহান রবের অগণিত নি‘আমতের কারণে তাকওয়া অবলম্বন ব্যতীত কোন ভাবেই গুনাহ করতে পাবে না। অন্যদিকে রব সৃষ্টিকুল থেকে সম্পূর্ণ অমুখাপেক্ষী হওয়া সত্ত্বেও তাঁর দয়ার কারণে তাকে (বান্দাকে) অসম্মান, অপমান, বেইজ্জতি ও দুনিয়াতে শাস্তি প্রদানে লজ্জাবোধ করেন। তিনি তাঁর সাত্তার নামের কারণে তাদের গুনাহ গোপন রাখেন, তাদেরকে ক্ষমা করেন ও তাদেরকে মার্জনা করেন। তিনি বান্দাকে নি‘আমত প্রদান করতে ভালোবাসেন; অথচ তারা গুনাহ করে তাঁকে রাগান্বিত করেন। বান্দাদের ওপর তাঁর কল্যাণ অগণিত, অপরিসীম। তাদের অকল্যাণ ও গুনাহ তাঁর কাছে পৌঁছে যায়।

মহা সম্মানিত মালিক মহান আল্লাহ তাদের গুনাহ ও সমস্ত অন্যায় কাজ করা সত্ত্বেও যারা ইসলামে দীক্ষিত হন তাদেরকে আযাব দিতে লজ্জাবোধ করেন এবং যারা তাঁর কাছে দুহাত পেতে প্রার্থনা করেন তাদেরকে শূণ্য হাতে ফিরিয়ে দিতে লজ্জাবোধ করেন। তিনি তাঁর বান্দাকে তাঁর কাছে দো‘আ করতে আহ্বান করেন এবং তাদের দো‘আ কবুল করতে প্রস্তুত থাকেন।

তিনি লজ্জাশীল ও আড়ালকারী। লজ্জাশীল ও আড়ালকারী ব্যক্তিকে পছন্দ করেন। যে ব্যক্তি দুনিয়াতে কোন মুসলিমের দোষ-ত্রুটি গোপন রাখবে, আখিরাতে আল্লাহ তার দোষ-ত্রুটি গোপন রাখবেন। এ কারণেই বান্দা গুনাহ করলে তা প্রকাশ করতে তিনি অপছন্দ করেন; বরং বান্দা ও আল্লাহর মাঝে যা কিছু ত্রুটি হয়েছে সে জন্য তাওবা করবে এবং মানুষের কাছে প্রকাশ করবে না। আল্লাহর কাছে সবচেয়ে নিকৃষ্ট লোক সে ব্যক্তি যে গুনাহ করে রাত যাপন করে, আর আল্লাহ তার গুনাহ গোপন রেখেছেন; অথচ সকাল হয়ে সে তার গুনাহ প্রকাশ করে আল্লাহর গোপনীয়তা প্রকাশ করল।[100]

আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,

﴿إِنَّ ٱلَّذِينَ يُحِبُّونَ أَن تَشِيعَ ٱلۡفَٰحِشَةُ فِي ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ لَهُمۡ عَذَابٌ أَلِيمٞ فِي ٱلدُّنۡيَا وَٱلۡأٓخِرَةِ١٩﴾ [النور : ١٩]

“নিশ্চয় যারা এটা পছন্দ করে যে, মুমিনদের মধ্যে অশ্লীলতা ছড়িয়ে পড়ুক, তাদের জন্য দুনিয়া ও আখেরাতে রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক আযাব।” [সূরা আন-নূর, আয়াত: ১৯] এসব কিছুই হালীমের অর্থ, যিনি কাফির, ফাসিক ও অবাধ্যদের গুনাহ সত্ত্বেও তাদেরকে দুনিয়াতে দ্রুত শাস্তি না দিয়ে ধৈর্যধারণ করেন, তাদেরকে তাওবা করার সুযোগ দেন, তবে যারা বারবার অবাধ্যতা ও সীমালঙ্ঘন করে এবং তাঁর কাছে ফিরে না আসে তাদেরকে আর সুযোগ দেন না।[101]

২৮- আল-খাফিদ (অবিশ্বাসীদের অপমানকারী), আর-রাফি‘ (উন্নীতকারী)[102]:

২৯- আল-খালিক (সৃষ্টিকর্তা, সৃষ্টিকারী)[103]:

৩০- আল-খাবীর (সম্যক অবগত, সর্বজ্ঞ)[104]: (আল-‘আলীম (সর্বজ্ঞানী, সর্বদর্শী), আল-খাবীর):

গ্রন্থকার রহ. বলেছেন, আল-খাবীর, আল-‘আলীম হলেন, যিনি প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য, গোপনীয়-রহস্যময়, ঘোষিত-অঘোষিত, অত্যাবশ্যকীয়-অনত্যবশ্যকীয়, সম্ভব-অসম্ভব, ঊর্ধ্বজগত-নিম্নজগত, অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যৎ ইত্যাদি  সবকিছুই তিনি বেষ্টন করে রেখেছেন ও তিনি জ্ঞাত আছেন। তাঁর কাছে কোন কিছুই গোপন নয়।[105] তিনি মহাজ্ঞানী, সর্বজ্ঞ। তিনি তাঁর জ্ঞান দ্বারা অত্যাবশ্যকীয়, সম্ভাব্য, অসম্ভব্য সব কিছুই বেষ্টন করে রেখেছেন। তিনি তাঁর নিজের সম্পর্কে, তাঁর পবিত্রতম গুণাবলী সম্পর্কে ও তাঁর মহান সিফাত সম্পর্কে জ্ঞাত আছেন। এগুলোর অস্তিত্ব বিরাজমান থাকা হলো ওয়াজিব তথা অত্যাবশ্যকীয়। তিনি অত্যাবশ্যকীয়-না হওয়া জিনিসগুলোও অবগত। তিনি জানেন যে, এগুলো অস্তিত্বে আসলে কী হত। যেমন তিনি বলেছেন,

﴿لَوۡ كَانَ فِيهِمَآ ءَالِهَةٌ إِلَّا ٱللَّهُ لَفَسَدَتَا٢٢﴾ [الانبياء: ٢٢]

“যদি আসমান ও জমিনে আল্লাহ ছাড়া বহু ইলাহ থাকত তবে উভয়ই ধ্বংস হয়ে যেত।” [সূরা আল-আম্বিয়া, আয়াত: ২২]

﴿مَا ٱتَّخَذَ ٱللَّهُ مِن وَلَدٖ وَمَا كَانَ مَعَهُۥ مِنۡ إِلَٰهٍۚ إِذٗا لَّذَهَبَ كُلُّ إِلَٰهِۢ بِمَا خَلَقَ وَلَعَلَا بَعۡضُهُمۡ عَلَىٰ بَعۡضٖۚ سُبۡحَٰنَ ٱللَّهِ عَمَّا يَصِفُونَ ٩١ ﴾ [المؤمنون : ٩١]

“আল্লাহ কোন সন্তান গ্রহণ করেন নি, তাঁর সাথে অন্য কোন ইলাহও নেই। (যদি থাকত) তবে প্রত্যেক ইলাহ নিজের সৃষ্টিকে নিয়ে পৃথক হয়ে যেত এবং একে অন্যের উপর প্রাধান্য বিস্তার করত; তারা যা বর্ণনা করে তা থেকে আল্লাহ কত পবিত্র!” [সূরা আল-মুমিনূন, আয়াত: ৯১]

সুতরাং আয়াতে উল্লিখিত অত্যাবশ্যকীয় নিষিদ্ধ জিনিস সম্পর্কে তিনি জানেন। যদি ধরে নেওয়া হয় যে, সেগুলো অস্তিত্বে আসলে কী হতো, তিনি তাও জানেন। আল্লাহ সম্ভাব্য জিনিস সম্পর্কে জ্ঞাত আছেন। সম্ভাব্য বলতে বুঝায় যেসব জিনিসের অস্তিত্ব হওয়া ও না হওয়া উভয়টিই সম্ভব। তিনি যেগুলো অস্তিত্বে বিদ্যমান হওয়া চেয়েছেন, সেগুলো হয়েছে। আর তিনি যেগুলো অস্তিত্বে আসা চান নি, সেগুলো হয় নি। তিনি ঊর্ধ্বজগতের ও নিম্নজগতের সব কিছুই অবগত আছেন। তাঁর ইলম থেকে কোন স্থান, কাল কোন কিছুই বাদ পড়ে না। তিনি গায়েব (অদৃশ্য), উপস্থিত, বর্তমান, যাহির, বাতিন, স্পষ্ট ও অস্পষ্ট সব কিছুই জানেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,

﴿وَٱعۡلَمُوٓاْ أَنَّ ٱللَّهَ بِكُلِّ شَيۡءٍ عَلِيمٞ٢٣١﴾ [البقرة: ٢٣١]

“এবং জেনে রাখ যে, নিশ্চয় আল্লাহ সব বিষয় সম্পর্কে সুপরিজ্ঞাত।” [সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ২৩১]

আল্লাহর ইলমে সব কিছু বেষ্টন করে রাখা ও তাঁর জ্ঞানের সূক্ষ্ম ও বিস্তারিত আলোচনা সম্পর্কে অসংখ্য আয়াত ও হাদীস রয়েছে, যা গননা করা অসম্ভব। আসমান ও জামিনে তাঁর ইলমের বাইরে একটি সরিষা কণা বা তারচেয়েও ক্ষুদ্র কোন কিছু গোপন থাকে না। ছোট-বড় কোন কিছুই তাঁর অগোচরে থাকে না এবং তিনি কিছুই ভুলে যান না।[106] আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,

﴿وَمَا تَسۡقُطُ مِن وَرَقَةٍ إِلَّا يَعۡلَمُهَا وَلَا حَبَّةٖ فِي ظُلُمَٰتِ ٱلۡأَرۡضِ وَلَا رَطۡبٖ وَلَا يَابِسٍ إِلَّا فِي كِتَٰبٖ مُّبِينٖ٥٩﴾ [الانعام: ٥٩]

“আর কোন পাতা ঝরে না; কিন্তু তিনি তা জানেন এবং জমিনের অন্ধকারে কোন দানা পড়ে না, না কোন ভেজা এবং না কোন শুষ্ক কিছু; কিন্তু রয়েছে সুস্পষ্ট কিতাবে।” [সূরা আল-আন’আম, আয়াত: ৫৯]

আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,

﴿يَعۡلَمُ ٱلسِّرَّ وَأَخۡفَى٧﴾ [طه: ٧]

“তিনি গোপন ও অতি গোপন বিষয় জানেন।” [সূরা ত্বা-হা, আয়াত: ৭]

সৃষ্টিকুলের জ্ঞান এত ব্যাপক ও বিচিত্র হওয়া সত্ত্বেও আল্লাহর অপরিসীম জ্ঞনের দিকে সম্পৃক্ত করলে তা কিছুই মনে হবে না, তা নিতান্তই নগন্য, যেমনিভাবে সৃষ্টিজগতের কুদরত আল্লারহ কুরতের সাথে কোন ভাবেই সম্পৃক্ত ও তুলনা করা যায় না। তারা যা জানে ও জানে না, তারা যা কিছু করতে পারে ও পারে না তাঁর ইলম সব কিছুই অবগত আছে। এমনিভাবে তাঁর ইলম ঊর্ধ্বজগত, নিম্নজগত, এর মধ্যকার সমস্ত সৃষ্টি, এদের মূল অস্তিত্ব, গুণাবলী, কর্ম ও যাবতীয় সবকিছু তিনি তাঁর ইলমের দ্বারা বেষ্টন করে রেখেছেন। সৃষ্টিলগ্ন থেকে যা কিছু হয়েছে, সৃষ্টির শেষ পর্যন্ত যা কিছু হবে, যা কিছুর অস্তিত্ব হয় নি; যদি হতো তাহলে তা কীভাবে হতো, শরী‘আত প্রযোজ্যদের (মুকাল্লিফ) যাবতীয় অবস্থা, মৃত্যুর পরে তাদের পরিণতি, আবার তাদের পুনরায় জীবিত করার পরের অবস্থা ইত্যাদি সম্পর্কে তিনি অবগত আছেন। তাদের ভালো-মন্দ যাবতীয় কর্মসমূহ, এসব কাজের প্রতিদান, চিরস্থায়ী আবাস স্থানে[107] (জান্নাত বা জাহান্নামে) তাদের পরিণতি কী হবে তা সব কিছুই তিনি জানেন। অত:এব, নিজের কল্যাণকামী একজন মুমিনের উচিত আল্লাহর নামসূহ, সিফাতসমূহ, তাঁর মহত্ব ও পবিত্রতা জানতে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা করা। এ মাস’আলাকে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ, সর্বোচ্চ ফলপ্রসূ ও অগ্রাধিকার প্রাপ্ত মাস’আলা হিসেবে গ্রহণ করা উচিত, যাতে তারা পূর্ণরূপরে কল্যাণের অধিকারী হয়ে সফলকাম হয়।

যেমন, বান্দা আল্লাহর আল-‘আলীম নামটি নিয়ে চিন্তা-গবেষণা করলে সে জানতে পারবে যে, তার সমস্ত অস্তিত্ব জুড়ে ও সব ধরণের ব্যাপারে আল্লাহর জ্ঞান বিদ্যমান। ফলে আল্লাহ অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎতের সব ব্যাপারে জানেন, স্পষ্ট-অস্পষ্ট, নগন্য-মূল্যবান ও ছোট-বড় সবই জ্ঞাত আছেন। তিনি বস্তুর যাহির, বাতিন, দৃশ্য ও অদৃশ্য সব কিছুই জানেন। সৃষ্টিকুল যা কিছু জানে ও যা কিছু জানে না সব কিছুই তাঁর কাছে দৃশ্যমান। তিনি অত্যাবশ্যকীয় ভাবে হওয়া বা যে সব বস্তু হওয়া অসম্ভব বা যা কিছু হওয়া সম্ভব এমন যাবতীয় জিনিস তিনি জ্ঞাত আছেন। তিনি যেমন জমিনের নিচের সব কিছু জানেন তেমনি আসমানের উপরেরও সব কিছু জ্ঞাত। তিনি বস্তুর ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতর অংশ, বস্তুর অন্তর্নিহিত যাবতীয় অদৃশ্য অংশ, বিশ্বে সংঘটিত গোপনীয় জিনিস ও সংঘটিতব্য যাবতীয় জিনিস সম্পর্কে অবগত। তাঁর ইলম সব সময় সব বস্তুকে বেষ্টন করে রেখেছে। তাঁর কাছে কোন কিছুই গোপন নয় এবং তিনি কিছুই ভুলে যান না। নিম্নোক্ত আয়াতে কারীমাগুলো বারবার তিলাওয়াত করলে তাঁর জ্ঞান সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যাবে।

﴿وَٱللَّهُ بِكُلِّ شَيۡءٍ عَلِيمٞ٢٨٢﴾ [البقرة: ٢٨٢]

“আর আল্লাহ সব বিষয়ে সম্যক জ্ঞানী।” [সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ২৮২]

﴿إِنَّ ٱللَّهَ عَلِيمُۢ بِذَاتِ ٱلصُّدُورِ١١٩﴾ [ال عمران: ١١٩]

“নিশ্চয় আল্লাহ অন্তরের গোপন বিষয় সম্পর্কে পূর্ণ জ্ঞাত।” [সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ১১৯]

﴿يَعۡلَمُ مَا فِي ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَٱلۡأَرۡضِ وَيَعۡلَمُ مَا تُسِرُّونَ وَمَا تُعۡلِنُونَۚ وَٱللَّهُ عَلِيمُۢ بِذَاتِ ٱلصُّدُورِ٤﴾ [التغابن : ٤]

“আসমানসমূহ ও জমিনে যা কিছু আছে তিনি তা জানেন এবং তিনি জানেন যা তোমরা গোপন কর এবং যা তোমরা প্রকাশ কর। আল্লাহ অন্তরসমূহে যা কিছু আছে সে বিষয়ে সম্যক জ্ঞাত।” [সূরা আত-তাগাবুন, আয়াত: ৪]

﴿وَإِن تَجۡهَرۡ بِٱلۡقَوۡلِ فَإِنَّهُۥ يَعۡلَمُ ٱلسِّرَّ وَأَخۡفَى٧﴾ [طه: ٧]

“আর যদি তুমি উচ্চস্বরে কথা বল তবে তিনি গোপন ও অতি গোপন বিষয় জানেন।” [সূরা ত্বা-হা, আয়াত: ৭]

﴿سَوَآءٞ مِّنكُم مَّنۡ أَسَرَّ ٱلۡقَوۡلَ وَمَن جَهَرَ بِهِۦ وَمَنۡ هُوَ مُسۡتَخۡفِۢ بِٱلَّيۡلِ وَسَارِبُۢ بِٱلنَّهَارِ١٠﴾ [الرعد: ١٠]

“তোমাদের মধ্যে কেউ কথা গোপন রাখুক বা প্রকাশ করুক। আর রাতে লুকিয়ে করুক বা দিনে প্রকাশ্যে করুক, সবই তাঁর নিকট সমান।” [সূরা আর-রাদ, আয়াত: ১০]

﴿أَلَمۡ تَعۡلَمۡ أَنَّ ٱللَّهَ يَعۡلَمُ مَا فِي ٱلسَّمَآءِ وَٱلۡأَرۡضِۚ إِنَّ ذَٰلِكَ فِي كِتَٰبٍۚ إِنَّ ذَٰلِكَ عَلَى ٱللَّهِ يَسِيرٞ٧٠﴾ [الحج : ٧٠]

“তুমি কি জান না যে, আসমান ও জমিনে যা কিছু রয়েছে, আল্লাহ তা জানেন? নিশ্চয় তা একটি কিতাবে রয়েছে। অবশ্যই এটা আল্লাহর জন্য খুবই সহজ।” [সূরা আল-হাজ্জ, আয়াত: ৭০]

﴿إِنَّ ٱللَّهَ لَا يَخۡفَىٰ عَلَيۡهِ شَيۡءٞ فِي ٱلۡأَرۡضِ وَلَا فِي ٱلسَّمَآءِ٥ هُوَ ٱلَّذِي يُصَوِّرُكُمۡ فِي ٱلۡأَرۡحَامِ كَيۡفَ يَشَآءُۚ لَآ إِلَٰهَ إِلَّا هُوَ ٱلۡعَزِيزُ ٱلۡحَكِيمُ٦﴾ [ال عمران: ٥،  ٦]

“নিশ্চয় আল্লাহ, তাঁর নিকট গোপন থাকে না কোন কিছু জমিনে এবং না আসমানে। তিনিই মাতৃগর্ভে তোমাদেরকে আকৃতি দান করেন যেভাবে তিনি চান। তিনি ছাড়া কোন (সত্য) ইলাহ নেই; তিনি পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।” [সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ৫-৬]

﴿إِنَّ ٱللَّهَ عِندَهُۥ عِلۡمُ ٱلسَّاعَةِ وَيُنَزِّلُ ٱلۡغَيۡثَ وَيَعۡلَمُ مَا فِي ٱلۡأَرۡحَامِۖ وَمَا تَدۡرِي نَفۡسٞ مَّاذَا تَكۡسِبُ غَدٗاۖ وَمَا تَدۡرِي نَفۡسُۢ بِأَيِّ أَرۡضٖ تَمُوتُۚ إِنَّ ٱللَّهَ عَلِيمٌ خَبِيرُۢ ٣٤﴾ [لقمان: ٣٤]

“নিশ্চয় আল্লাহর নিকট কিয়ামতের জ্ঞান রয়েছে। আর তিনি বৃষ্টি বর্ষণ করেন এবং জরায়ূতে যা আছে, তা তিনি জানেন। আর কেউ জানে না আগামীকাল সে কী অর্জন করবে এবং কেউ জানে না কোন্ স্থানে সে মারা যাবে। নিশ্চয় আল্লাহ সর্বজ্ঞ, সম্যক অবহিত।” [সূরা লুকমান, আয়াত: ৩৪]

﴿وَعِندَهُۥ مَفَاتِحُ ٱلۡغَيۡبِ لَا يَعۡلَمُهَآ إِلَّا هُوَۚ وَيَعۡلَمُ مَا فِي ٱلۡبَرِّ وَٱلۡبَحۡرِۚ وَمَا تَسۡقُطُ مِن وَرَقَةٍ إِلَّا يَعۡلَمُهَا وَلَا حَبَّةٖ فِي ظُلُمَٰتِ ٱلۡأَرۡضِ وَلَا رَطۡبٖ وَلَا يَابِسٍ إِلَّا فِي كِتَٰبٖ مُّبِينٖ٥٩﴾ [الانعام: ٥٩]

“আর তাঁর কাছে রয়েছে গায়েবের চাবিসমূহ, তিনি ছাড়া এ বিষয়ে কেউ জানে না এবং তিনি অবগত রয়েছেন স্থলে ও সমুদ্রে যা কিছু আছে। আর কোন পাতা ঝরে না; কিন্তু তিনি তা জানেন এবং জমিনের অন্ধকারে কোন দানা পড়ে না, না কোন ভেজা এবং না কোন শুষ্ক কিছু; কিন্তু সব কিছু রয়েছে সুস্পষ্ট কিতাবে।” [সূরা আল-আন‘আম, আয়াত: ৫৯]

﴿أَلَمۡ تَرَ أَنَّ ٱللَّهَ أَنزَلَ مِنَ ٱلسَّمَآءِ مَآءٗ فَتُصۡبِحُ ٱلۡأَرۡضُ مُخۡضَرَّةًۚ إِنَّ ٱللَّهَ لَطِيفٌ خَبِيرٞ٦٣﴾ [الحج : ٦٣]

“তুমি কি লক্ষ্য কর না যে, আল্লাহ আকাশ থেকে পানি বর্ষণ করেন, যার ফলে জমিন সবুজ-শ্যামল হয়ে উঠে। নিশ্চয় আল্লাহ স্নেহপরায়ণ, সর্ববিষয়ে সম্যকজ্ঞাত।” [সূরা আল-হাজ্জ, আয়াত: ৬৩]

﴿عَٰلِمُ ٱلۡغَيۡبِ فَلَا يُظۡهِرُ عَلَىٰ غَيۡبِهِۦٓ أَحَدًا٢٦ إِلَّا مَنِ ٱرۡتَضَىٰ مِن رَّسُولٖ٢٧﴾ [الجن: ٢٦،  ٢٧]

“তিনি অদৃশ্যের জ্ঞানী, আর তিনি তাঁর অদৃশ্যের জ্ঞান কারো কাছে প্রকাশ করেন না। তবে তাঁর মনোনীত রাসূল ছাড়া।” [সূরা আল-জিন, আয়াত: ২৬-২৭]

আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,

﴿يَعۡلَمُ مَا يَلِجُ فِي ٱلۡأَرۡضِ وَمَا يَخۡرُجُ مِنۡهَا وَمَا يَنزِلُ مِنَ ٱلسَّمَآءِ وَمَا يَعۡرُجُ فِيهَا٢﴾ [سبا: ٢]

“তিনি জানেন জমিনে যা প্রবেশ করে এবং তা থেকে যা বের হয়; আর আসমান থেকে যা নাযিল হয় এবং তাতে যা উঠে[108]। আর তিনি পরম দয়ালু, অতিশয় ক্ষমাশীল।” [সূরা সাবা’ আয়াত: ২]

﴿وَلَوۡ أَنَّمَا فِي ٱلۡأَرۡضِ مِن شَجَرَةٍ أَقۡلَٰمٞ وَٱلۡبَحۡرُ يَمُدُّهُۥ مِنۢ بَعۡدِهِۦ سَبۡعَةُ أَبۡحُرٖ مَّا نَفِدَتۡ كَلِمَٰتُ ٱللَّهِۚ إِنَّ ٱللَّهَ عَزِيزٌ حَكِيمٞ٢٧﴾ [لقمان: ٢٧]

“আর জমিনে যত গাছ আছে তা যদি কলম হয়, আর সমুদ্র (হয় কালি), তার সাথে কালিতে পরিণত হয় আরো সাত সমুদ্র, তবুও আল্লাহর বাণীসমূহ শেষ হবে না। নিশ্চয় আল্লাহ মহাপরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।” [সূরা লুকমান, আয়াত: ২৭]

﴿وَٱللَّهُ خَبِيرُۢ بِمَا تَعۡمَلُونَ١٣﴾ [المجادلة: ١٣]

“তোমরা যা কর, আল্লাহ সে সম্পর্কে সম্যক অবগত।” [সূরা আল-মুজাদালা, আয়াত: ১৩]

﴿أَلَمۡ تَرَ أَنَّ ٱللَّهَ يَعۡلَمُ مَا فِي ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَمَا فِي ٱلۡأَرۡضِۖ مَا يَكُونُ مِن نَّجۡوَىٰ ثَلَٰثَةٍ إِلَّا هُوَ رَابِعُهُمۡ وَلَا خَمۡسَةٍ إِلَّا هُوَ سَادِسُهُمۡ وَلَآ أَدۡنَىٰ مِن ذَٰلِكَ وَلَآ أَكۡثَرَ إِلَّا هُوَ مَعَهُمۡ أَيۡنَ مَا كَانُواْۖ ثُمَّ يُنَبِّئُهُم بِمَا عَمِلُواْ يَوۡمَ ٱلۡقِيَٰمَةِۚ إِنَّ ٱللَّهَ بِكُلِّ شَيۡءٍ عَلِيمٌ٧﴾ [المجادلة: ٧]

“তুমি কি লক্ষ্য করনি যে, আসমানসমূহ ও জমিনে যা কিছু আছে নিশ্চয় আল্লাহ তা জানেন? তিন জনের কোন গোপন পরামর্শ হয় না যাতে চতুর্থজন হিসেবে আল্লাহ থাকেন না, আর পাঁচ জনেরও হয় না, যাতে ষষ্ঠজন হিসেবে তিনি থাকেন না। এর চেয়ে কম হোক কিংবা বেশি হোক, তিনি তো তাদের সঙ্গেই আছেন, তারা যেখানেই থাকুক না কেন। তারপর কিয়ামতের দিন তিনি তাদেরকে তাদের কৃতকর্ম সম্পর্কে জানিয়ে দেবেন। নিশ্চয় আল্লাহ সব বিষয়ে সম্যক অবগত।” [সূরা আল-মুজাদালা, আয়াত: ৭]

﴿فَلَا تَعۡلَمُ نَفۡسٞ مَّآ أُخۡفِيَ لَهُم مِّن قُرَّةِ أَعۡيُنٖ جَزَآءَۢ بِمَا كَانُواْ يَعۡمَلُونَ١٧﴾ [السجدة : ١٧]

“অতঃপর কোন ব্যক্তি জানে না তাদের জন্য চোখ জুড়ানো কী জিনিস লুকিয়ে রাখা হয়েছে, তারা যা করত, তার বিনিময়স্বরূপ।” [সূরা আস-সাজদাহ, আয়াত: ১৭]

উপরোক্ত আয়াতগুলো ছাড়াও আরো অনেক আয়াত রয়েছে যেগুলো আল্লাহর আল-‘আলীম তথা মহাজ্ঞানী ও সর্বজ্ঞ হওয়া প্রমাণ করে। এসব আয়াতের কিছু আয়াত নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করলেই একজন সূক্ষ্ম দৃষ্টিমান মুমিনের জন্য আল্লাহর সর্ব বিষয়ে বেষ্টিত জ্ঞান, তাঁর পূর্ণ বড়ত্ব ও সুউচ্চ কুদরত সম্পর্কে জানা যথেষ্ট। তিনিই মহান রব, মহান মালিক।[109]

 

যুল জালালি ওয়াল-ইকরাম (মহা মর্যাদাবান, মহা মহত্ত্ব ও মহা সম্মানিত), রাঊফ (অত্যন্ত স্নেহশীল, সদয়, সমবেদনা প্রকাশকারী, দয়াশীল), আর-রাফি‘(উন্নীতকারী, উঁচুকারী), আল-খাফিদ (অবিশ্বাসীদের অপমানকারী), আর-রাব (রব, পালনকারী):

৩১- যুল জালালি ওয়াল-ইকরাম (মহা মর্যাদাবান, মহা মহত্ত্ব ও মহা সম্মানিত)[110]:

গ্রন্থকার রহ. বলেছেন, যুল জালালি ওয়াল-ইকরাম অর্থ মহা মহিমাবান, গর্ব ও অহংকারের অধিকারী, দয়াবান, দানশীল, বিশেষ ও ব্যাপক ইহসান দানকারী, তাঁর প্রিয়জন ও নির্বাচিতজনের সম্মানকারী; যিনি তাদের সম্মান, মহিমা ও ভালোবাসা প্রাপ্ত।[111]

৩২- আর-রঊফ (অত্যন্ত স্নেহশীল, সদয়, সমবেদনা প্রকাশকারী, দয়াশীল)[112]:

গ্রন্থকার শাইখ আস-সা‘দী রহ. বলেছেন, আর-রাঊফ হলেন যিনি বান্দার প্রতি অত্যন্ত স্নেহশীল। বান্দার প্রতি তাঁর স্নেহ ও দয়ার কারণে তিনি তাদের প্রতি তাঁর নি‘আমত পূর্ণ করেছেন। তাঁর স্নেহশীলতার কারণে তিনি বান্দাকে তাঁর প্রতি করণীয় দায়িত্ব ও কর্তব্য (আল্লাহর হক) এবং তাদের নিজেদের প্রতি করণীয় দায়িত্ব ও কর্তব্য (বান্দার হক) পালনের তাওফিক দান করেছেন।

তাঁর স্নেহশীলতা ও রহমতের আরেকটি নমুনা হলো, তিনি বান্দাকে তাদের অপরাধ ও ফ্যাসাদ সৃষ্টি করা থেকে বিরত থাকতে ভয়-ভীতি ও ধমক প্রদান করেন। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,

﴿ذَٰلِكَ يُخَوِّفُ ٱللَّهُ بِهِۦ عِبَادَهُۥۚ يَٰعِبَادِ فَٱتَّقُونِ ١﴾ [الزمر: ١٦]

“এদ্বারা আল্লাহ তাঁর বান্দাদেরকে ভয় দেখান। হে আমার বান্দারা, তোমরা আমাকেই ভয় কর।” [সূরা আয-যুমার, আয়াত: ১৬]

অত:এব, তাঁর স্নেহ ও দয়ায় তাদের জন্য কল্যাণের পথ সহজ হয়ে যায়। তাঁর স্নেহ ও দয়া যে, তিনি বান্দাকে তাঁর অপছন্দনীয় পথ থেকে সকর্ত করেন। আমরা আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করছি তিনি যেন আমাদেরকে সিরাতুল মুস্তাকীম তথা সরল-সঠিক পথে পরিচালিত করে আমাদের উপর তাঁর ইহসান পূর্ণ করেন এবং সে পথ থেকে আমাদেরকে নিরাপদ রাখুক যে পথে চললে জাহান্নাম অবধারিত।[113]

৩৩- আর-রাফি‘(উন্নীতকারী, উঁচুকারী), আল-খাফিদ (অবিশ্বাসীদের অপমানকারী)[114]

৩৪- আর-রাব (রব, পালনকারী)[115]:

গ্রন্থকার রহ. বলেছেন, আল-কুরআনে রব নামটি অনেক আয়াতেই একাধিক বার উল্লেখ হয়েছে। রব হলেন যিনি বান্দাকে পরিচালনা, দেখা-শোনা ও যাবতীয় নি‘আমত প্রদান করে লালনপালন করেন।

উপরোক্ত অর্থ থেকে রবের আরো বিশেষ অর্থ হচ্ছে, তিনি তাঁর প্রিয় বান্দাদের কলব, রূহ ও আখলাকের ইসলাহীর মাধ্যমে তারবিয়াত তথা প্রতিপালন করেন। এ কারণেই বান্দার দো‘আয় আল্লাহর এ সম্মানিত রব নামটি বেশি উচ্চারিত হয়। কেননা তারা তাঁর কাছে বিশেষ প্রতিপালন তালাশ করে।[116]

সৃষ্টিকুলের লালনপালনের সব ধরণের দায়-দায়িত্বের কারণে তিনি তাদের ইলাহ হওয়া অধিকারী। রব নামটি পূর্ণতার সিফাত, সমস্ত প্রশংসা একমাত্র তাঁরই, দয়া ও ইহসান তাঁরই, প্রতিপালনের সব ধরণের অর্থে কেউ তাঁর সাথে অংশীদার নয়। আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,

﴿لَيۡسَ كَمِثۡلِهِۦ شَيۡءٞۖ وَهُوَ ٱلسَّمِيعُ ٱلۡبَصِيرُ١١﴾ [الشورى: ١١]

“তাঁর মতো কিছুই নেই। আর তিনি সর্বশ্রোতা ও সর্বদ্রষ্টা।” [সূরা আশ-শূরা, আয়াত: ১১]

মানুষ, ফিরিশতা কেউ তাঁর মতো নয়, বরং সবাই তাঁর গোলাম, সব ধরণের তারবিয়াতে তাদের রবের প্রতিপালিত। তারা সবাই তাঁর অধিনস্ত, তাঁর মহত্ব ও বড়ত্বের সামনে নতজানু। সুতরাং ইবাদত ও ইলাহ হওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর সমকক্ষ ও শরীক হওয়ার কারো অধিকার নেই।

আল্লাহ তা‘আলার প্রতিপালন ফিরিশতা, আম্বিয়া ও অন্যান্য সকলকে সৃষ্টি করা, রিযিক দেওয়া, পরিচালনা করা, জীবন ও মৃত্যু দেওয়া ইত্যাদিকে শামিল করে। ফলে তারা এসব নি‘আমেতর কারণে ইখলাসের সাথে একমাত্র তাঁরই শুকরিয়া আদায় করে, তাঁকে ইলাহ হিসেবে গ্রহণ করে, তিনি ব্যতীত কাউকে অলী ও শাফা‘আতকারী হিসেবে গ্রহণ করেন না। অত:এব, বান্দার প্রতিপালনের কারণে ইলাহ হওয়ার অধিকার একমাত্র আল্লাহ সুবহানাহু ওতা‘আলারই।[117]

আর-রহমান (পরম করুণাময়, সবচেয়ে দয়ালু, কল্যাণময়), আর-রাহীম (অতি দয়ালু), আর-রাযযাক (রিযিক প্রদানকারী, রিযিকদাতা), আর-রাশীদ (সঠিক পথের নির্দেশক):

৩৫- আর-রহমান (পরম করুণাময়, সবচেয়ে দয়ালু, কল্যাণময়):

৩৬-আর-রাহীম (অতি দয়ালু)[118]:

গ্রন্থকার রহ. বলেছেন, আর-রহমান ও আর-রাহীম নামদ্বয় প্রমাণ করে যে, আল্লাহ তা‘আলা পরম দয়াময়, অতি দয়ালু, প্রশস্ত রহমতের অধিকারী; যার রহমত সব কিছুকে বেষ্টন করে রেখেছে এবং সমস্ত সৃষ্টির উপর তাঁর রহমত ব্যাপক ভাবে বিস্তৃত। তাঁর নবী ও রাসূলগণের অনুসারী মুত্তাকীনদের জন্য তিনি তাঁর রহমত লিখে রেখেছেন। তাদের জন্য রয়েছে চিরস্থায়ী সুখ-শান্তির স্থানে অবস্থানের নিমিত্তে সর্বময় রহমত। তারা ব্যতীত অন্যরা চিরস্থায়ী পূর্ণ এ রহমত থেকে বঞ্চিত হবে। কেননা তিনি তাদের কাছে এ রহমত প্রেরণ করেছিলেন; কিন্তু তারা এ সংবাদ মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছিল এবং এর থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল। তাই তারা নিজেরা শুধু নিজেদেরকেই দোষারোপ করবে।

কুরআন ও সুন্নাহ-এর প্রমাণাদির ভিত্তিতে উম্মাতের সকলের কাছে ঐক্যমত্য মূলনীতি যে, আল্লাহর সমস্ত নাম, তাঁর সকল সিফাত ও সিফাতের যাবতীয় আহকামের উপর ঈমান আনা ফরয। অত:এব, মুমিনরা বিশ্বাস করে যে, আল্লাহ রহমান ও রাহীম, তিনি অসীম রহমতের অধিকারী, যা রহমত প্রাপ্তদের রহমত সম্পৃক্ত গুণাবলীতে তাঁকে গুণান্বিত করে। অত:এব, বিশ্বের যাবতীয় নি‘আমত তাঁর রহমতেরই প্রভাবে হয়ে থাকে। এমনিভাবে আল্লাহর অন্যান্য সুন্দর নামের ব্যাপারে বলা হবে।

যেমন বলা হবে, তিনি আল-‘আলীম তথা সর্বজ্ঞ, মহাজ্ঞানী: তিনি বিশাল ইলমের অধিকারী, সব কিছুই তিনি অবগত।

তিনি আল-কাদীর তথা মহা ক্ষমতাধর। সব কিছুর উপরে তাঁর রয়েছে পূর্ণ ক্ষমতা।

আল্লাহ তা‘আলা নিজেই নিজের জন্য এসব আসমাউল হুসনা (সুন্দর গুণবাচক নামসমূহ), সুউচ্চ সিফাতসমূহ ও সেসব সিফাত থেকে উৎসারিত আহকামসমূহ সাব্যস্ত করেছেন। সুতরাং যে ব্যক্তি এগুলোর কোন একটি সাব্যস্ত করল; কিন্তু অন্যটি নেতিবাচক করল তাহলে সে কুরআন ও সুন্নাহের বিরোধিতা করল এবং তার কাজটি বিরোধপূর্ণ হলো ও তা বাতিল বলে গণ্য হবে।[119]

আল্লাহর যাত (সত্ত্বা) ও সিফাতের উপর এসব নামের দালালাত (নির্দেশনা) মুতাবাকা, তাদামুন ও ইলতিযাম অনুযায়ী হয়ে থাকে। কেননা কোন শব্দ তার অর্থের প্রতি দুভাবে নির্দেশ করে। একটি হলো লাফযিয়্যাহ তথা শব্দগত এবং আরেকটি মা‘নুবিয়্যাহ আক্বলিয়্যাহ তথা বিবেক-প্রসন্ন অর্থগত। শব্দ যদি তার মধ্যকার সমস্ত অর্থ বুঝায় তাহলে তাকে দালালাতুল মুতাবিকাহ বলে অর্থাৎ শব্দটি যে উদ্দেশ্যে গঠন করা হয়েছে সেটি পুরোপুরি ভাবে সে অর্থ প্রকাশ করেছে। কেননা শব্দটি বাড়তি বা কমতি ছাড়াই হুবহু অর্থের অনুগত হয়েছে। শব্দটি যদি আংশিক অর্থ বুঝায় তাহলে তাকে দালালাতু তাদামুন বলে। কেননা উল্লিখিত আংশিক অর্থ শব্দের কিছু অংশের অর্থ এবং এটি উক্ত শব্দেরই অন্তর্গত। অন্যদিকে দালালাতুল মা‘আনাবিয়্যাহতুল আক্বলিয়্যাহ হলো সুস্থ আক্বল ও চিন্তা-ভাবনার সাথে সম্পৃক্ত। কেননা শুধু শব্দটিই কাঙ্খিত অর্থ প্রমাণ করে না; বরং বান্দা শব্দের অত্যাবশ্যকীয় অর্থের প্রতি গভীর দৃষ্টিপাত করে ও চিন্তা-গবেষণা করে, যে অর্থ ধর্তব্য বতীত শব্দটি পূর্ণ অর্থ বুঝায় না এবং যে শব্দটিতে যে শর্তসমূহ রয়েছে তা পূর্ণ হয় না। এ নিয়ম আসমাউল হুসনার সমস্ত নামের ব্যাপারেই প্রযোজ্য হবে। প্রতিটি নামই আল্লাহর যাত ও তাঁর সিফাতের উপর প্রমাণ করে। এটি শব্দটি তার অর্থের অনুমাগী। আবার নামটি শুধু তাঁর যাত অথবা শুধু সিফাতের উপর প্রমাণ করলে তা দালালাতু তাদামুন। অন্যদিকে নামটি সরাসরি তাঁর বা সিফাতের উপর প্রমাণ না করে অন্য একটি অত্যাবশ্যকীয় সিফাতের উপর প্রমাণ করলে তা দালালাতু ইলতিযাম। যেমন, আর-রহমান নামটি শুধু আল্লাহর যাতের উপর ও শুধু তাঁর রহমতের উপর প্রমাণ করলে তা দালালাতু তাদামুন। কিন্তু একত্রে যাত রহমত সিফাতের উপর প্রমাণ করলে তা দালালাতু মুতাবিক। অন্যদিকে নামটি পূর্ণাঙ্গ জীবন, সর্ব-পরিবেষ্টিত ইলম ও পূর্ণ কুদরত ইত্যাদি অত্যাবশ্যকীয় সিফাতের উপর প্রমাণ করলে তা দালালাতু ইলতিযাম। কেননা রহমাত দানকারীর জীবন, রহমত প্রাপ্তদের কাছে রহমত পৌঁছানোর ক্ষমতা, তাদের সম্পর্কে জ্ঞান ও তাদের অভাব না বুঝলে তিনি রহমত দান করতে পারবে না।[120] কেউ আল্লাহর রহমান নামটি নিয়ে গভীর চিন্তা-গবেষণা করলে দেখতে পাবে যে, তিনি ব্যাপক ও পরিপূর্ণ রহমতের অধিকারী। তাঁর রহমত ঊর্ধ্বজগত, নিম্নজগত, সমস্ত সৃষ্টিজগত, দুনিয়া ও আখিরাতে সর্বত্রই পরিপূর্ণ। উপরোক্ত অর্থের প্রতি প্রমাণকারী নিম্নোক্ত আয়াতসমূহ গভীর ভাবে চিন্তা-ভাবনা করুন। আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,

﴿قَالَ عَذَابِيٓ أُصِيبُ بِهِۦ مَنۡ أَشَآءُۖ وَرَحۡمَتِي وَسِعَتۡ كُلَّ شَيۡءٖ١٥٦﴾ [الاعراف: ١٥٥]

“তিনি বললেন, ‘আমি যাকে চাই তাকে আমার আযাব দেই। আর আমার রহমত সব বস্তুকে পরিব্যাপ্ত করেছে।” [সূরা আল-আ‘রাফ, আয়াত: ১৫৫]

আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেছেন,

﴿إِنَّ ٱللَّهَ بِٱلنَّاسِ لَرَءُوفٞ رَّحِيمٞ١٤٣﴾ [البقرة: ١٤٣]

“নিশ্চয় আল্লাহ মানুষের প্রতি অত্যন্ত স্নেহশীল, পরম দয়ালু।” [সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ২৪৩]

আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেছেন,

﴿فَٱنظُرۡ إِلَىٰٓ ءَاثَٰرِ رَحۡمَتِ ٱللَّهِ كَيۡفَ يُحۡيِ ٱلۡأَرۡضَ بَعۡدَ مَوۡتِهَآۚ إِنَّ ذَٰلِكَ لَمُحۡيِ ٱلۡمَوۡتَىٰ٥٠﴾ [الروم: ٥٠]

“অত:এব, আপনি আল্লাহর রহমতের চি‎হ্নসমূহের প্রতি দৃষ্টি দিন। কিভাবে তিনি জমিনের মৃত্যুর পর তা জীবিত করেন। নিশ্চয় এভাবেই তিনি মৃতকে জীবিত করেন।” [সূরা আর-রূম, আয়াত: ৫০]

আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেছেন,

﴿أَلَمۡ تَرَوۡاْ أَنَّ ٱللَّهَ سَخَّرَ لَكُم مَّا فِي ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَمَا فِي ٱلۡأَرۡضِ وَأَسۡبَغَ عَلَيۡكُمۡ نِعَمَهُۥ ظَٰهِرَةٗ وَبَاطِنَةٗ٢٠﴾ [لقمان: ٢٠]

“তোমরা কি দেখ না, নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের জন্য নিয়োজিত করেছেন আসমানসমূহ ও জমিনে যা কিছু আছে। আর তোমাদের প্রতি তাঁর প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য নি‘আমত ব্যাপক করে দিয়েছেন।” [সূরা লুকমান, আয়াত: ২০]

আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেছেন,

﴿وَمَا بِكُم مِّن نِّعۡمَةٖ فَمِنَ ٱللَّهِۖ ثُمَّ إِذَا مَسَّكُمُ ٱلضُّرُّ فَإِلَيۡهِ تَجۡ‍َٔرُونَ٥٣﴾ [النحل: ٥٣]

“আর তোমাদের কাছ যে সব নি‘আমত আছে, তা আল্লাহর পক্ষ থেকে। অতঃপর দুঃখ-দুর্দশা যখন তোমাদের স্পর্শ করে তখন তোমরা শুধু তার কাছেই ফরিয়াদ কর।” [সূরা আন-নাহাল, আয়াত: ৫৩]

আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেছেন,

﴿وَإِن تَعُدُّواْ نِعۡمَةَ ٱللَّهِ لَا تُحۡصُوهَآۗ إِنَّ ٱللَّهَ لَغَفُورٞ رَّحِيمٞ١٨﴾ [النحل: ١٨]

“আর যদি তোমরা আল্লাহর নি‘আমত গণনা কর, তবে তার ইয়ত্তা পাবে না। নিশ্চয় আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।” [সূরা আন-নাহাল, আয়াত: ১৮]

আল্লাহর নি‘আমতের উসূল তথা মূলনীতি ও ফুরু‘ তথা শাখা-প্রশাখা সম্পর্কিত সূরা নাহাল তিলাওয়াত করুন। এতে আল্লাহর নি‘আমতের অপরিসীম দান ও প্রভাব রয়েছে। এ কারণেই তিনি সূরার শেষে বলেছেন,

﴿كَذَٰلِكَ يُتِمُّ نِعۡمَتَهُۥ عَلَيۡكُمۡ لَعَلَّكُمۡ تُسۡلِمُونَ٨١﴾ [النحل: ٨١]

“এভাবেই তিনি তোমাদের উপর তার নি‘আমতকে পূর্ণ করবেন, যাতে তোমরা অনুগত হও।” [সূরা আন-নাহাল, আয়াত: ৮১]

অত:পর সূরা আর-রহমান আদ্যোপান্ত গভীর চিন্তা-গবেষণাসহ তিলাওয়াত করুন। এ সূরাতে তাঁর নি‘আমতের বিস্তারিত ব্যাখ্যা রয়েছে। এতে রয়েছে রহমানের রহমতের যাবতীয় উদাহরণ ও নানা ধরণের নি‘আমতের বিস্তারিত বিবরণ। এ কারণেই তিনি তাঁর অনুগত মুমিনদের জন্য জান্নাতে পূর্ণ ও চিরস্থায়ী নি‘আমতের কথা স্মরণ করে দিয়ে সূরাটি শেষ করেন। আর জান্নাতের এ চিরস্থায়ী নি‘আমত আল্লাহর নি‘আমতের অন্যতম প্রভাব। এ কারণেই আল্লাহ তা‘আলা জান্নাতকে রহমত বলেছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,

﴿وَأَمَّا ٱلَّذِينَ ٱبۡيَضَّتۡ وُجُوهُهُمۡ فَفِي رَحۡمَةِ ٱللَّهِۖ هُمۡ فِيهَا خَٰلِدُونَ١٠٧﴾ [ال عمران: ١٠٧]

“আর যাদের চেহারা সাদা হবে, তারা তো আল্লাহর রহমতে থাকবে। তারা সেখানে স্থায়ী হবে।” [সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ১০৭]

হাদীসে এসেছে, আল্লাহ তা‘আলা জান্নাতকে বলবেন,

«أَنْتِ رَحْمَتِي أَرْحَمُ بِكِ مَنْ أَشَاءُ مِنْ عِبَادِي».

“তুমি আমার রহমত, তোমার মাধ্যমে আমি আমার বান্দাদের থেকে যাকে ইচ্ছা রহমত করব।”[121] আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,

﴿وَهُوَ أَرۡحَمُ ٱلرَّٰحِمِينَ٦٤﴾ [يوسف: ٦٣]

“এবং তিনিই সর্বশ্রেষ্ঠ দয়ালু।” [সূরা ইউসুফ, আয়াত: ৬৩]

রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

«لَلَّهُ أَرْحَمُ بِعِبَادِهِ مِنْ الوالدة بِوَلَدِهَا».

“মা তার সন্তানের উপর যতটুকু দয়ালু, আল্লাহ তার বান্দার উপর তদাপেক্ষা অধিক দয়ালু।”[122]

«إِنَّ اللَّهَ كَتَبَ كِتَابًا قَبْلَ أَنْ يَخْلُقَ الخَلْقَ: إِنَّ رَحْمَتِي سَبَقَتْ غَضَبِي».

“আল্লাহ তা‘আলা সমস্ত সৃষ্টিজগতকে সৃষ্টি করার পূর্বে একটি লেখা লিপিবদ্ধ করে রেখেছেন। তা হলো “আমার ক্রোধের উপর আমার রহমত অগ্রগামী রয়েছে।”[123]

এককথায়, আল্লাহ তাঁর রহমতে সৃষ্টিকুলকে সৃষ্টি করেছেন। তাঁর অপরিসীম দয়ায় তিনি তাদের কাছে নবী-রাসূল প্রেরণ করেছেন। তাঁর রহমতের কারণেই তিনি তাদেরকে আদেশ-নিষেধ করেছেন এবং তাদের জন্য শরী‘আত বিধিবদ্ধ করেছেন। তিনি তাদের প্রতি তাঁর বাহ্যিক ও গোপনীয় নি‘আমতে পরিপূর্ণ করেছেন এবং তাদেরকে সুন্দর সূক্ষ্ম পরিচালনায় পরিচালিত করছেন। তাঁর রহমতেই তিনি তাদেরকে বিভিন্ন স্তরে পরিবর্তন করেন। তাঁর রহমত দুনিয়া ও আখিরাতে ভরপুর। অত:এব, তাঁর রহমত ব্যতীত কোন কিছুই শুভ-সুন্দর হয় না; কোন কাজই তাঁর রহমত ব্যতীত সহজ হয় না; কোন উদ্দেশ্য তাঁর রহমত ব্যতীত অর্জিত হয় না। তাঁর রহমত সব কিছু ঊর্ধ্বে, সবচেয়ে মহান ও সুউচ্চ। মুহসিন মুত্তাকিদের জন্য রয়েছে তাঁর রহমতের পূর্ণ অংশ এবং অপরিসীম কল্যাণ। আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,

﴿إِنَّ رَحۡمَتَ ٱللَّهِ قَرِيبٞ مِّنَ ٱلۡمُحۡسِنِينَ٥٦﴾ [الاعراف: ٥٥]

“নিশ্চয় আল্লাহর রহমত সৎকর্মশীলদের নিকটবর্তী।” [সূরা আল-আ’রাফ, আয়াত: ৫৫][124]

৩৭- আর-রাযযাক (রিযিকদাতা):

গ্রন্থকার রহ. বলেছেন, তিনি সমস্ত সৃষ্টির রিযিকদাতা। ঊর্ধ্বজগত ও নিম্নজগতের এমন কোন সৃষ্টি নেই যে তাঁর রিযিক ভোগ করে না। সকলেই তাঁর দয়ার সাগরে ডুবে আছে।[125]

আল্লাহর রিযিক দু’ধরণের;

আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,

﴿ إِنَّ ٱللَّهَ هُوَ ٱلرَّزَّاقُ٥٨﴾ [الذاريات: ٥٨]

“নিশ্চয় আল্লাহই রিযিকদাতা।” [সূরা আয-যারিয়াত, আয়াত: ৫৮]

আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেছেন,

﴿وَمَا مِن دَآبَّةٖ فِي ٱلۡأَرۡضِ إِلَّا عَلَى ٱللَّهِ رِزۡقُهَا٦﴾ [هود: ٦]

“আর জমিনে বিচরণকারী প্রতিটি প্রাণীর রিযিকের দায়িত্ব আল্লাহরই।” [সূরা হূদ, আয়াত: ৬][126]

প্রথমত: অর্জনকৃত উপকারী রিযিক, যা বান্দাকে সর্বোচ্চ লক্ষ্য-উদ্দেশ্যে পৌঁছায়। আর তাহলো তিনি নবী-রাসূলদের মাধ্যমে হিদায়েত ও নসীহত প্রদান করেছেন। এগুলো আবার দু’ধরণের।

প্রথম প্রকার: উপকারী ইলম ও সঠিক ঈমানের মাধ্যমে অন্তরের রিযিক। কেননা উপকারী ইলম ও সঠিক আক্বীদা অর্জন ব্যতীত ব্যক্তির অন্তর সংশোধন হয় না এবং তার সফলতাও আসে না। অত:পর উত্তম চরিত্রে চরিত্রবান হতে হয় এবং অসচ্চরিত্রের যাবতীয় দোষ মুক্ত হতে হয়। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যা নিয়ে আগমন করেছেন তা উপরোক্ত দুটি বিষয়ে পরিপূর্ণ যথার্থ। তাঁর পদ্ধতি ব্যতীত কোন পথ খোলা নেই।

দ্বিতীয় প্রকার: আল্লাহ তাঁর বান্দাকে হালাল রিযিকের দ্বারা হারাম থেকে মুক্ত রাখবেন এবং তাঁর দয়ায় তিনি ব্যতীত অন্য কারো থেকে মুখাপেক্ষীহীন রাখবেন।

প্রথম প্রকার হলো সর্বশ্রেষ্ঠ ও মহৎ উদ্দেশ্য আর দ্বিতীয় এ প্রকার প্রথম প্রকারের মাধ্যম। আল্লাহ কোন বান্দাকে উপকারী ইলম, সহীহ ঈমান, হালাল রিযিক ও আল্লাহর বণ্টনে তুষ্টতা দান করলে সে তার যাবতীয় ব্যাপার পূর্ণ করল এবং দুনিয়া ও আখিরাতের সব অবস্থা দৃঢ়তার সাথে সঠিক করল। এ প্রকারের রিযিকের ব্যাপারেই রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাদীসে প্রশংসা করেছেন এবং অনেক উপকারী দো‘আয় এ ব্যাপারে দো‘আ করা হয়েছে।

দ্বিতীয়ত: স্রষ্টা জল-স্থলের ভালো-খারাপ সব ধরণের মানুষ ও অন্যান্য সকল প্রাণীর কাছে তাদের জীবিকা নির্বাহের খাদ্য পৌঁছে দেন। তাদের সে খাবার কখনও হালাল থেকে হতে পারে আবার কখনও হারাম থেকে হতে পারে। এ কারণেই আলেমদের মধ্যে মতানৈক্য পরিলক্ষিত হয়েছে যে, হারাম খাদ্যকে রিযিক বলা হবে কি-না? এটিকে যদি প্রথম প্রকারের সাধারণ রিযিকের অন্তর্ভূক্ত করা হয়, যা এমনিতেই আসে না; বরং অর্জন করতে হয়, তাহলে এতে হারাম অন্তর্ভুক্ত হবে না। কেননা বান্দা যখন আল্লাহর কাছে রিযিকের প্রার্থনা করে তখন সে দীনের উপকারী ইলম ব্যতীত অন্য কিছু প্রার্থনা করে না। এটিই হচ্ছে প্রথম প্রকারের রিযিক। আর এখানে রিযিক দ্বারা সাধারণ রিযিক উদ্দেশ্য হলে –দ্বিতীয় প্রকারের রিযিক- এতে হারাম রিযিকও অন্তর্ভুক্ত হবে। জমিনের বুকে সকল প্রাণীর রিযিকের দায়িত্ব আল্লাহর। নি‘আমত ও রহমতের ব্যাপারেও রিযিকের অনুরূপ কথা বলা যায়।[127]

৩৮- আর-রাশীদ (সঠিক পথের নির্দেশক, বিচক্ষণ, সচেতন)[128]:

গ্রন্থকার রহ. বলেছেন, তিনি কথা ও কাজে সর্বক্ষেত্রেই সঠিক পথের নির্দেশক। তিনি বিভ্রান্ত লোকদেরকে ইন্দ্রিয়বোধগাম্য পথ এবং পথহারাকে নৈতিকতার পথ প্রদর্শন করেন। তিনি সৃষ্টিকুলের জন্য নবী-রাসূলদের মাধ্যমে পূর্ণ হিদায়েতের যে শরী‘আত প্রেরণ করেছেন সে শরী‘আতের দ্বারা তাদেরকে সঠিক পথের দিক-নির্দেশনা দেন। মুমিন বান্দা যখন কাজে-কর্মে একমাত্র তাঁরই জন্য একনিষ্ঠ হয় তখন তিনি তাদেরকে সুপথ দেখান, তাদের যাবতীয় কল্যাণের পথ নির্দেশ করেন, তাদের জন্য কাজকে সহজ করে দেন এবং কঠোরতা দূর করে দেন।[129] সঠিক পথের নির্দেশনাই তাঁকে আর-রাশীদ তথা সুপথের নির্দেশক হওয়া ও বান্দাকে তিনি দিক-নির্দেশনা দিয়ে থাকেন এটি প্রমাণ করে। অত:এব, তাঁর তাকদীর সংক্রান্ত বাণীসমূহ যা প্রতিটি জিনিসের মধ্যে বিদ্যমান এবং তিনি এর দ্বারা সবকিছু পরিচালনা করেন তা সবকিছুই সত্য; কেননা তাঁর সব কাজেই রয়েছে হিকমত, সৌন্দর্য ও নিপুণতা। তাঁর শর‘ঈ দীনি বাণীসমূহ বলতে বুঝায়, তিনি তাঁর প্রেরিত কিতাবসমূহে যেসব কথা বলেছেন এবং নবী-রাসূলগণের যবানে তিনি যা বলেছেন সেসব সংবাদের সবকিছুই পরিপূর্ণ সত্য এবং আদেশ-নিষেধে রয়েছে পূর্ণ ন্যায়-পরায়নতা। কেননা আদেশ ও নিষেধের ক্ষেত্রে আল্লাহর চেয়ে অধিক সত্য ও সুন্দর বাণী বলার কেউ নেই। আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,

﴿وَتَمَّتۡ كَلِمَتُ رَبِّكَ صِدۡقٗا وَعَدۡلٗا١١٥﴾ [الانعام: ١١٥]

“আর আপনার রবের বাণী সত্য ও ন্যায়পরায়ণতার দিক থেকে পরিপূর্ণ হয়েছে।” [সূরা আল-আন‘আম, আয়াত: ১১৫]

বনী-রাসূলদের মাধ্যমে (সৎকাজের দেওয়া ও অসৎকাজের থেকে নিষেধ করা) হিদায়েত বান্দার জন্য সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ সুপথের নির্দেশনা; বরং এক কথায় বলা যায় যে, তাদের নির্দেশিত পথ ব্যতীত যে হিদায়েত তালাশ করবে তাকে আল্লাহ গোমরাহ করবেন। যে ব্যক্তিকে হিদায়েতের পথ দেখানো হবে না সে কখনও হিদায়েত পাবে না। অত:এব, এর দ্বারা বান্দার ইলমী পথ নির্দেশনা অর্জিত হবে অর্থাৎ বস্তুর হাকীকত, উসূল, ফুরু‘ (শাখা মাস’আলা), দীনি ও দুনিয়াবী কল্যাণ ও অকল্যাণ ইত্যাদি তার কাছে স্পষ্ট হবে। আবার এ হিদায়েতের দ্বারা তার কাছে আমলী পথ নির্দেশনাও অর্জিত হবে। এ পথ নির্দেশনা অন্তরকে পরিশুদ্ধ করে, কলবকে পবিত্র করে, ভালো কাজ ও উত্তম চরিত্রের দিকে আহ্বান করে, সমস্ত সৌন্দর্যের প্রতি উৎসাহিত করে এবং যাবতীয় নিকৃষ্ট ও অসুন্দরের থেকে অনুৎসাহিত ও সতর্ক করে। সুতরাং যে ব্যক্তি আল্লাহর হিদায়েত তালাশ করবে সে হিদায়েত প্রাপ্ত হবে আর যে ব্যক্তি তাঁর পথ নির্দেশনা পাবে না সে পথ-ভ্রষ্ট ও গোমরাহ হবে। রাসূলদের প্রেরণ ও সর্বময় হিদায়েত সমৃদ্ধ আসমানী কিতাবসমূহ নাযিলের পরে কারো কোন ওযর থাকবে না। কত লোক অন্তরের অন্ত:স্থল থেকে হিদায়েত তালাশ করার পরে পথ-ভ্রষ্ট ও বিভ্রান্ত হওয়া সত্ত্বেও আল্লাহর অশেষ মেহেরবানীতে হিদায়েত পেয়েছেন। কেননা সে জানে যে, আল্লাহই একমাত্র হিদায়েত দানকারী।[130]

আর-রফীক (কোমল, নম্র ব্যবহারকারী), আস-সাত্তার (অতি গোপনকারী), আস-সাতীর, আস-সালাম (শান্তি ও নিরাপত্তার উৎস, ত্রাণকর্তা), আল-কুদ্দূস (পূত:পবিত্র, নিখুঁত), আস-সালাম (দোষমুক্ত)

৩৯- আর-রফীক (কোমল, নম্র ব্যবহারকারী):

গ্রন্থকার রহ. বলেছেন, আল্লাহর নামসমূহের মধ্যে আরেকটি নাম হলো আর-রফীক (কোমল, নম্র ব্যবহারকারী)। তিনি তাঁর কাজে-কর্মে ও শরী‘আতের বিধি-বিধান নাযিলে বান্দার উপর কোমলতা ও নম্রতা দেখিয়েছেন। আর এ নামটি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিম্নোক্ত সহীহ হাদীস থেকে নেওয়া হয়েছে।

«إِنَّ اللهَ رَفِيقٌ يُحِبُّ الرِّفْقَ، وَيُعْطِي عَلَى الرِّفْقِ مَا لَا يُعْطِي عَلَى الْعُنْفِ، وَمَا لَا يُعْطِي عَلَى مَا سِوَاهُ».

“আল্লাহ কোমল, নম্র ব্যবহারকারী। তিনি কোমলতা ও নম্রতা পছন্দ করেন। তিনি নম্রতার জন্য এমন কিছু দান করেন যা কঠোরতার জন্য দান করেন না; আর অন্য কোন কিছুর জন্যও তা দান করেন না।”[131]

আল্লাহ তা‘আলা তাঁর কাজে অত্যন্ত নম্র ও কোমল। তিনি সৃষ্টিজগতকে তাঁর হিকমত ও নম্রতা অনুসারে স্তরে স্তরে ধীরে ধীরে সৃষ্টি করেছেন; অথচ তিনি তাদেরকে একই সাথে ও একই সময়ে সৃষ্টি করতে সক্ষম।[132]

যে ব্যক্তি আল্লাহর সৃষ্টিজগত ও তাঁর শরী‘আত নিয়ে চিন্তা-গবেষণা করবে সে দেখতে পাবে কিভাবে একটির পরে আরেকটি স্তরে স্তরে আশ্চর্যান্বিতভাবে তিনি সৃষ্টি করেছেন। অত:এব, সে ব্যক্তিই ধৈর্যশীল ও বিনম্র যে সৃষ্টিকুলের ব্যাপারে আল্লাহর নিয়ম ও তাঁর রাসূলের সুন্নাতের অনুসরণে প্রতিটি কাজ কোমলতা, ধীরস্থিরতা ও প্রশান্তির সাথে সম্পাদন করে থাকে।

কোমলতা ও নম্রতা যদি কারো চলার পদ্ধতি হয় তাহলে তার জন্য যাবতীয় কাজ সহজ হয়ে যায়; বিশেষ করে দাওয়াতী কাজে মানুষকে আদেশ-নিষেধ ও উপদেশ দিতে যা কিছু প্রয়োজন হয় সেগুলো তার জন্য সহজ হয়ে যায়। কেননা মানুষ কোমলতা ও নম্রতার মুখাপেক্ষী। এমনিভাবে কেউ কথার মাধ্যমে কাউকে কষ্ট দিয়ে সে যদি তাকে গালিগালাজ না করে নিজের জিহ্বাকে হিফাযত করে এবং নম্রতা ও কোমলতার দ্বারা যদি নিজেকে সংযত রাখে, তাহলে সে উক্ত ব্যক্তির কথা ও কাজের অনুরূপ প্রতিবাদ করলে যতটা প্রতিবাদ হতো তার চেয়ে বেশি প্রতিবাদ হবে। এর সাথে সে আরাম, প্রশান্তি, গম্ভীর্যতা ও ধৈর্যশীলতা অর্জন করল।

কেউ চিন্তা-ভাবনা করলে দেখতে পাবে আল্লাহর শরী‘আতের কোমলতা, এর আহকামের স্তরে স্তরে সুবিন্যাস্ততা, প্রশস্ততা ও সহজভাবে এ শরী‘আতের বিধি-বিধান আরোপিত হওয়া, বান্দার প্রয়োজনীয়তা ও উপযোগীতা, তিনি সৃষ্টিজগতকে স্তরে স্তরে সৃষ্টি করার হিকমত, তাদেরকে এক অবস্থা থেকে অন্য অবস্থায় রূপান্তরিত করা ইত্যাদির রহস্য ও হিকমত কারো জ্ঞানে সীমাবদ্ধ করতে পারে না।

বান্দার কোমলতা তার দৃঢ়তার সাথে সাংঘর্ষিক নয়। সে কিছু ব্যাপারে কোমল ও নম্র হতে পারে; কিন্তু প্রয়োজনে সে কঠোরও হতে পারে। যখন কঠোর হওয়া দরকার তখন কঠোর হওয়া কোমলতার বিপরীত নয়।[133]

৪০- আর-রাকীব (পর্যবেক্ষক, সদা জাগ্রত, অতন্দ্র পর্যবেক্ষণকারী), আশ-শাহীদ (প্রত্যক্ষদর্শী, সাক্ষ্যদানকারী):

গ্রন্থকার শাইখ আস-সা‘দী রহ. বলেছেন, আর-রাকীব ও আশ-শাহীদ এদুটি আল্লাহর নাম। নাম দুটি সমর্থকবোধক। উভয় নাম-ই আল্লাহর সবকিছু শোনা ও দেখা এবং সৃষ্টিকুলের স্পষ্ট ও গোপনীয় যাবতীয় তথ্য অবগত হওয়া প্রমাণ করে। তাদের মনের মধ্যে যা কিছু ঘূর্ণায়মান, যা কিছু তাদের অনুভবে ঘূরপাক খাচ্ছে তিনি সব কিছুই পর্যবেক্ষণ করেন ও দেখেন। সুতরাং সৃষ্টিজগতের বাহ্যিক ও প্রকাশ্য কাজসমূহ তিনি আরও অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে পর্যবেক্ষণ করেন।[134]

আর-রাকীব তথা পর্যবেক্ষণকারী আল্লাহর তাদের অন্তরের লুকায়িত জিনিস অবগত আছেন। প্রত্যেক ব্যক্তি যা কিছু করেন তাদের সম্পর্কে তিনি জ্ঞাত। তিনিই সৃষ্টিকুলকে রক্ষণাবেক্ষণ করেন, তাদের ব্যাপারে উত্তম ও নিপুন পরিচালনা তিনি করে থাকেন।[135]

আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,

﴿إِنَّ ٱللَّهَ كَانَ عَلَيۡكُمۡ رَقِيبٗا١﴾ [النساء : ١]

“নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের উপর পর্যবেক্ষক।” [সূরা আন-নিসা, আয়াত: ১]

﴿وَٱللَّهُ عَلَىٰ كُلِّ شَيۡءٖ شَهِيدٌ٦﴾ [المجادلة: ٦]

“আর আল্লাহ প্রত্যেক বিষয়ে প্রত্যক্ষদর্শী।” [সূরা আল-মুজাদালা, আয়াত: ৬] এ কারণেই মুরাকাবা তথা পর্যবেক্ষণ করা যা মানুষের অন্তরের সর্বোচ্চ কাজ, আল্লাহর এ আর-রাকীব ও আশ-শাহীদ নামের জন্য তাঁর ইবাদত বলে গণ্য। বান্দা যখন জানবে যে, তার প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য যাবতীয় কাজ, কথাবার্তা আল্লাহর ইলম বেষ্টন করে রেখেছেন, তিনি সর্বাবস্থায়ই তা উপস্থিত করতে পারেন, তখন তার চিন্তা-ভাবনার অপ্রকাশ্য কাজগুলো সংরক্ষণ করা অত্যাবশ্যকীয় হয়ে যায়, আল্লাহ যেসব কাজে অসন্তুষ্ট হবেন সেসব কাজ থেকে সে বিরত থাকে, তার প্রকাশ্য যাবতীয় কাজ-কর্ম, কথাবর্তা যেসবে আল্লাহ রাগান্বিত হন তা সব কিছুই সে হিফাযত করে, তখন সে ইহসানের অবস্থায় তাঁর ইবাদত করবে। ফলে সে আল্লাহর ইবাদত এমনভাবে করবে যে, সে যেন তাঁকে দেখছে, যদি সে আল্লাহকে নাও দেখতে পায় তাহলে সে জান যে, আল্লাহ তাকে দেখছেন।[136]

৪১-৪২ আস-সাত্তার, আস-সাতীর (অতি গোপনকারী)।

৪৩- আস-সালাম (শান্তি ও নিরাপত্তার উৎস, ত্রাণকর্তা), আল-কুদ্দূস (পূত:পবিত্র, নিখুঁত), আস-সালাম (দোষমুক্ত)

গ্রন্থকার রহ. বলেছেন, আল্লাহর নামসমূহের মধ্যে অন্যতম হলো আল-কুদ্দূস (পূত:পবিত্র, নিখুঁত), আস-সালাম (ত্রুটিমুক্ত) অর্থাৎ সর্ব প্রকারের কমতি, দোষ-ত্রুটি ও সৃষ্টিকুলের সাদৃশ্য থেকে তিনি মহান, পুত:পবিত্র। তিনি যাবতীয় দোষমুক্ত, তাঁর পূর্ণতার সমকক্ষ হওয়ার সাদৃশ্য হওয়া থেকে তিনি পবিত্র। আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,

﴿لَيۡسَ كَمِثۡلِهِۦ شَيۡءٞ١١﴾ [الشورى: ١١]

“তাঁর মতো কিছুই নেই।” [সূরা আশ-শূরা, আয়াত: ১১] আল্লাহ তা‘আলা আরও বলেছেন,

﴿وَلَمۡ يَكُن لَّهُۥ كُفُوًا أَحَدُۢ٤﴾ [الاخلاص: ٤]

“আর তাঁর কোন সমকক্ষও নেই।” [সূরা আল-ইখলাস, আয়াত: ৪]

আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,

﴿هَلۡ تَعۡلَمُ لَهُۥ سَمِيّٗا٦٥﴾ [مريم: ٦٥]

“তুমি কি তাঁর সমতুল্য কাউকে জান?” [সূরা মারইয়াম, আয়াত: ৬৫]

﴿فَلَا تَجۡعَلُواْ لِلَّهِ أَندَادٗا٢٢﴾ [البقرة: ٢٢]

“সুতরাং তোমরা আল্লাহর জন্য সমকক্ষ নির্ধারণ করো না।” [সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ২২] অত:এব, কুদ্দূস সালামের মতোই, উভয় নামই সর্বদিক থেকে আল্লাহকে দোষ-ত্রুটিমুক্ত করে এবং সর্ব দিক থেকে সর্বময় পরিপূর্ণতা শামিল করে। কেননা যখন ত্রুটিমুক্ত হয় তখন তাতে পরিপূর্ণ পূর্ণতা সাব্যস্ত হয়।[137] তিনি মহাপবিত্র, মহান, সমস্ত দোষ-ত্রুটি মুক্ত, সৃষ্টির কারো সাথে সাদৃশ্য হওয়া থেকে মুক্ত, দোষ-ত্রুটি ও পূর্ণতার পরিপন্থী যাবতীয় অপূর্ণতা থেকে তিনি মুক্ত। এ মূলনীতি তাঁকে পবিত্র রাখে এবং সর্বদিক বিবেচনায় যত প্রকারের অপূর্ণতা ও ত্রুটি রয়েছে তা থেকে তিনি মুক্ত। তাঁর মতো বা সাদৃশ বা অনুরূপ বা সমকক্ষ বা সমতুল্য বা অংশীদার বা প্রতিপক্ষ ইত্যাদি থেকে তিনি মুক্ত, পুত:পবিত্র। যা কিছু তাঁর মহান ও প্রশস্ত গুণাবলীর কোন একটি গুণকে অপূর্ণ করে বা ত্রুটিযুক্ত করে তা থেকে তিনি সম্পূর্ণ মুক্ত, পুত:পবিত্র।

তাঁকে পূর্ণ পুত:পবিত্র ও দোষ-ত্রুটি মুক্ত রাখার আরেকটি উপায় হলো তাঁর জন্য বড়ত্ব, অহংকার ও মহত্বের গুণ সাব্যস্ত করা। কেননা আল্লাহকে দোষ-ত্রুটি মুক্ত রাখার উদ্দেশ্য হলো যাবতীয় খারাপ ধারণা থেকে যেমনটি ধারণা করা হতো জাহেলী যুগে- তাঁকে মুক্ত রাখা। যেমন, বান্দা আল্লাহর গুণ সাব্যস্ত করে বলে, সুবহানাল্লাহ (আমি আল্লাহর পবিত্রতা বর্ণনা করছি) অথবা, আল্লাহর পুত:পবিত্রতা বর্ণনা করছি অথবা আল্লাহ মহান ইত্যাদি বলে তখন এসব গুণাবলী তাঁকে যাবতীয় দোষ-ত্রুটি মুক্ত করে সব ধরণের পূর্ণতা সাব্যস্ত করে।[138]

আস-সামী‘ (সর্বশ্রোতা), আশ-শাকির (পুরস্কার দানকারী, শুকরিয়াকারী), আশ-শাকূর (গুণগ্রাহী, সুবিবেচক), আশ-শাহীদ (প্রত্যক্ষদর্শী), আস-সাবূর (অত্যধিক ধৈর্যধারণকারী):

৪৪- আস-সামী‘ (সর্বশ্রোতা):[139]

গ্রন্থকার রহ. বলেছেন, আসমাউল হুসনার আরেকটি নাম হলো, আস-সামী‘ তথা সর্বশ্রোতা, যিনি ভাষার বিভিন্নতা সত্ত্বেও সকলের ভাষা ও তাদের অভাব বুঝতে পারেন। তাঁর কাছে গোপন হলো প্রকাশ্যের মতোই, যেমনিভাবে দূরত্ব তাঁর কাছে নিকটবর্তীর মতো।[140]

আল্লাহর শ্রবণ দুধরণের:

প্রথমত: সমস্ত প্রাণীর প্রকাশ্য, গোপনীয়, স্পষ্ট, অস্পষ্ট সব ধরণের আওয়াজ তিনি শুনেন এবং সব কিছুই তিনি পরিপূর্ণভাবে বেষ্টন করে আছেন।

দ্বিতীয়ত: তাঁর কাছে প্রার্থনাকারী, দো‘আকারী ও ইবাদতকারীর প্রার্থনা তিনি শুনেন এবং তাদের ডাকে সাড়া দেন, তাদের কর্মের প্রতিদান দেন। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,

﴿إِنَّ رَبِّي لَسَمِيعُ ٱلدُّعَآءِ٣٩﴾ [ابراهيم: ٣٩]

“নিশ্চয় আমার রব দো‘আ শ্রবণকারী।” [সূরা ইবরাহীম, আয়াত: ৩৯]

রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

«سَمِعَ اللَّهُ لِمَنْ حَمِدَهُ»

“যে ব্যক্তি আল্লাহর প্রশংসা করে তিনি তার কথা শুনেন অর্থাৎ তার দো‘আ কবুল করেন।”[141] [142]

৪৫-৪৬ আশ-শাকির (পুরস্কার দানকারী, শুকরিয়াকারী)[143], আশ-শাকূর (গুণগ্রাহী, সুবিবেচক)[144]:

গ্রন্থকার রহ. বলেছেন, আল্লাহর নামসমূহের মধ্যে আশ-শাকির (পুরস্কার দানকারী, শুকরিয়াকারী) ও আশ-শাকূর (গুণগ্রাহী, সুবিবেচক)। তিনি বান্দার ইখলাসের সাথে স্বল্প আমলেরও পুরুস্কার দান করেন, বান্দার অনেক দোষ-ত্রুটি ও গুনাহ মাফ করে দেন, কেউ উত্তমরূপে সৎকাজ করলে তিনি তার কাজের প্রতিদান বিনষ্ট করেন না; বরং তিনি বহুগুণে অগণিতভাবে তার আমলের প্রতিদান বৃদ্ধি করে দেন। তাঁর পুরস্কারের ধরণ হলো, তিনি বান্দার কাজের বিনিময়ে এর সাওয়াব দশ থেকে সাতশত গুণ বরং যাকে ইচ্ছা এর চেয়েও অধিক দান করেন। তিনি বান্দাকে কখনও দুনিয়াতেও তাৎক্ষণিক পুরস্কার দান করেন। বান্দার আমলের কারণে তাদেরকে পুরস্কার দেওয়া আল্লাহর উপর অত্যাবশ্যকীয় না হওয়া সত্ত্বেও তিনি নিজের দয়া ও বদান্যতার কারণে তাদেরকে পুরস্কার দেওয়া নিজের উপর ওয়াজিব করে নিয়েছেন। কোন আমলকারী উত্তমরূপে ইখলাসের সাথে তাঁর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে আমল করলে তিনি তার আমল নষ্ট করেন না।[145]

কোন বান্দা তাঁর আদেশ মান্য করলে, তাঁর আনুগত্য করলে তিনি তাকে সে কাজে সাহায্য করেন, তিনি তার প্রশংসা করেন, গুণগান করেন, তার অন্তরে নূর, ঈমান ও প্রশস্ততা দান করেন। তার শারীরিক শক্তি সামর্থ বৃদ্ধি করে দেন, প্রতিটি কাজে তিনি বরকত ও সম্মৃদ্ধি দান করেন এবং আরো কাজ করার তাওফিক দান করেন।

এছাড়াও তিনি বান্দাকে তার কাজের বিনিময়ে পরকালীন অফুরন্ত পূর্ণ সাওয়াব দান করেন, যা কখনও শেষ হওয়ার নয়। বান্দার প্রতি আল্লাহর শুকরিয়ার আরেকটি ধরণ হলো, বান্দা আল্লাহর উদ্দেশ্যে কোন কিছু ত্যাগ করলে তিনি এর বিনিময়ে তার চেয়ে উত্তম কিছু দান করেন। বান্দা তাঁর দিকে এক বিঘত পরিমাণ এগিয়ে আসলে (নিকটবর্তী হলে) তিনি তার প্রতি এক হাত পরিমাণ এগিয়ে আসেন, বান্দা এক হাত পরিমাণ এগিয়ে আসলে তিনি তার দিকে দুহাত পরিমাণ এগিয়ে আসেন। বান্দা তাঁর দিকে হেঁটে আসলে তিনি তার দিকে দৌড়ে যান। কেউ আমল করলে তিনি তার প্রতিদান বহগুণে বৃদ্ধি করে দেন।[146]

৪৭- আশ-শাহীদ (প্রত্যক্ষদর্শী)[147] [148]:

গ্রন্থকার রহ. বলেছেন, আশ-শাহীদ (প্রত্যক্ষদর্শী) হলেন যিনি সব কিছু সম্পর্কে অবগত আছেন। সকলের স্পষ্ট অস্পষ্ট আওয়াজ শুনতে পান। তিনি যাবতীয় সূক্ষ্ম-অতিসূক্ষ্ম, ছোট-বড় সব কিছুই দেখতে পান। বান্দা যা কিছু দেখে এবং কাজ করে তিনি সব কিছুই বেষ্টন করে আছেন।[149]

৪৮- আস-সাবূর (অত্যধিক ধৈর্যধারণকারী)[150]:

গ্রন্থকার রহ. বলেছেন, আস-সাবূর (অত্যধিক ধৈর্যধারণকারী) নামটি সহীহ হাদীসে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণী থেকে নেওয়া হয়েছে। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

«لَا أَحَدَ أَصْبَرُ عَلَى أَذًى يَسْمَعُهُ مِنَ اللهِ عَزَّ وَجَلَّ، إِنَّهُ يُشْرَكُ بِهِ، وَيُجْعَلُ لَهُ الْوَلَدُ، ثُمَّ هُوَ يُعَافِيهِمْ وَيَرْزُقُهُمْ».

“কষ্টদায়ক কোন কথা শ্রবণ করার পর আল্লাহ তা‘আলা থেকে অধিক ধৈর্যশীল আর কেউ নেই। মানুষ আল্লাহর সঙ্গে শরীক করে এবং তাঁর জন্য সন্তান সাব্যস্ত করে; এরপরও তিনি তাদেরকে ক্ষমা করে দেন এবং তাদেরকে রিযিক দেন।”[151]

অন্য সহীহ হাদীসে বর্ণিত আছে, আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,

«كَذَّبَنِي ابْنُ آدَمَ وَلَمْ يَكُنْ لَهُ ذَلِكَ، وَشَتَمَنِي وَلَمْ يَكُنْ لَهُ ذَلِكَ، أَمَّا تَكْذِيبُهُ إِيَّايَ أَنْ يَقُولَ: إِنِّي لَنْ أُعِيدَهُ كَمَا بَدَأْتُهُ، وَأَمَّا شَتْمُهُ إِيَّايَ أَنْ يَقُولَ: اتَّخَذَ اللَّهُ وَلَدًا، وَأَنَا الصَّمَدُ الَّذِي لَمْ أَلِدْ وَلَمْ أُولَدْ، وَلَمْ يَكُنْ لِي كُفُؤًا أَحَدٌ».

“আদম সন্তান আমার প্রতি মিথ্যা আরোপ করেছেন; অথচ এরূপ করা তার জন্য উচিত হয় নি। সে আমাকে গালি দিয়েছে; অথচ এমন করা তার পক্ষে সমীচীন হয় নি। আমার প্রতি তার মিথ্যা আরোপ করার মানে হচ্ছে এই যে, সে বলে, আমি পুনর্জীবিত করতে সক্ষম নই যেমনিভাবে আমি তাকে প্রথমে সৃষ্টি করেছি। আমাকে তার গালি দেয়া হচ্ছে এই যে, সে বলে, আল্লাহ তা‘আলা সন্তান গ্রহণ করেছেন; অথচ আমি কারো মুখাপেক্ষী নন, সকলেই তাঁর মুখাপেক্ষী। আমি এমন এক সত্তা যে, আমি কাউকে জন্ম দেইনি, আমাকেও জন্ম দেয়নি এবং আমার সমকক্ষও কেউ নেই।”[152] আল্লাহ তা‘আলা বাধ্য ও অবাধ্য সকলকেই রিযিক দান করেন। আল্লাহর অবাধ্যরা যদিও তাঁর বিরুদ্ধে যুদ্ধে রত, তাঁকে মিথ্যারোপ করে, তাঁর রাসূলগণকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে, তাঁর দীনকে ফুৎকারে নিভিয়ে দিতে চায়; অথচ তিনি তাদের এসব অবাধ্য কথা ও কাজের উপর ধৈর্যধারণ করেন, তাদের এসব অবাধ্য কাজ সহ্য করেন। তারা অকল্যাণ কাজ একটার পরে একটা করতে থাকে; অথচ তিনি তাদেরকে তাঁর নি‘আমত ধারাবাহিক ভাবে দিতে থাকেন। তাঁর ধৈর্য পরিপূর্ণ ধৈর্য; কেননা তাঁর ধৈর্য তাঁর পূর্ণ কুদরতের ও তিনি সৃষ্টিকুল থেকে সম্পূর্ণ অমুখাপেক্ষী এবং তাঁর রহমত ও ইহসান পরিপূর্ণ। মহান দয়াময় রব যার ধৈর্যের অনুরূপ কারো ধৈর্য নেই, যিনি ধৈর্যশীলদেরকে ভালোবাসেন এবং তাদেরকে প্রত্যেক কাজে সাহায্য করেন।[153]

আস-সামাদ (অমুখাপেক্ষী, অবিনশ্বর, চিরন্তন, স্বয়ং সম্পূর্ণ), আদ-দার (যন্ত্রনাদানকারী, উৎপীড়নকারী), আয-যাহির (সুস্পষ্ট, সুপ্রতীয়মান, বাহ্য, দৃশ্যত), আল-‘আদল (নিখুঁত), আল-আযীয (সর্বশক্তিমান, সর্বাধিক সম্মানিত)

৪৯- আস-সামাদ (অমুখাপেক্ষী, অবিনশ্বর, চিরন্তন, স্বয়ং সম্পূর্ণ)[154]:

গ্রন্থকার রহ. বলেছেন, আস-সামাদ অর্থ পরিপূর্ণ রব, সাইয়্যেদ, মহান, যার এমন কোন ভালো সিফাত অবশিষ্ট নেই যা তাঁর নেই। তাঁর গুণাবলী সর্বোচ্চ পর্যায়ের, এর পূর্ণতা এতোই পরিপূর্ণ যে সৃষ্টিকুলের কেউ সে গুণের সামান্য অংশও তাদের অন্তরে বেষ্টন করতে পারে না এবং তাদের ভাষায়ও তা প্রকাশ করতে পারে না। তাঁর কাছে সবকিছু মুখাপেক্ষী, সকলের যাবতীয় প্রয়োজন, অভাব-অভিযোগ একমাত্র তাঁরই কাছে। আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,

﴿يَسۡ‍َٔلُهُۥ مَن فِي ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَٱلۡأَرۡضِۚ كُلَّ يَوۡمٍ هُوَ فِي شَأۡنٖ٢٩﴾ [الرحمن: ٢٩]

“আসমানসমূহ ও জমিনে যারা রয়েছে, সবাই তাঁর কাছে চায়। প্রতিদিন তিনি কোন না কোন কাজে রত।” [সূরা আর-রাহমান, আয়াত: ২৯]

তিনি নিজেই সত্ত্বাগতভাবে অমুখাপেক্ষী। দুনিয়াতে বিদ্যমান সমস্ত কিছু তাঁর যাতের কাছে অভাবী, মুখাপেক্ষী। তাদের সৃষ্টি, তাদের সংখ্যা, বেড়ে ওঠা ইত্যাদি সব কিছুতেই সর্বদিক থেকে তারা তাঁর মুখাপেক্ষী। কেউ-ই সামান্য অনু পরিমাণও যে কোন সময়ের বা অবস্থায়ও তাঁর থেকে মুখাপেক্ষীহীন নয়।[155]

আস-সামাদ তিনিই যার কাছে সমস্ত সৃষ্টির সর্ব মুহূর্তে সর্বাবস্থায় তাদের উদ্দেশ্য ও প্রয়োজন; যেহেতু তাঁর যাত, সিফাত, নাম ও কর্মে রয়েছে সর্বজনীন পূর্ণতা। [156]

আস-সামাদ পূর্ণাঙ্গরূপে অমুখাপেক্ষী, এতে উপরোক্ত সব ধরণের প্রয়োজন থেকে তিনি মুখাপেক্ষীহীন। তিনি স্বয়ং সম্পূর্ণ, অমুখাপেক্ষী, তাঁর কাছেই সকলের অভাব, প্রয়োজন ও মুখাপেক্ষীতা।

বিশ্বের সব কিছুই ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে তাঁর লুটে পড়ে। তিনি ইলম, হিকমত, ধৈর্য, কুদরত, মহানত্ব, রহমত ও অন্যান্য যাবতীয় গুণাবলীতে পরিপূর্ণ।[157]

৫০-৫১- আদ-দার (যন্ত্রনাদানকারী, উৎপীড়নকারী): আন-নাফি‘ (অনুগ্রাহক, হিতকারী, উপকারকারী), আদ-দার (যন্ত্রনাদানকারী, উৎপীড়নকারী)।

গ্রন্থকার রহ. বলেছেন, আল্লাহর কিছু নাম আলাদাভাবে ব্যবহৃত হয়, আবার কিছু নাম অন্য নামের সাথে মিলে একত্রে ব্যবহৃত হয়। এ ধরণের নামই বেশি। এতে প্রমাণিত হয় যে, আলাদাভাবে আল্লাহ যেমন পূর্ণাঙ্গ গুণের অধিকারী তেমনি যৌথভাবেও তিনি উভয় নামেই পরিপূর্ণ গুণের অধিকারী।

আল্লাহর কিছু নাম আছে যা তার বিপরীত নাম ব্যতীত ব্যবহৃত হয় না। কেননা প্রকৃত পূর্ণতা ও পূর্ণাঙ্গতা উভয় নাম একত্রে ব্যবহার হলেই বুঝা যায়। এ ধরণের নামের অন্তর্ভুক্ত হলো আদ-দার (যন্ত্রনাদানকারী, উৎপীড়নকারী) ও আন-নাফি‘ (অনুগ্রাহক, হিতকারী, উপকারকারী)। উভয় নামই আল্লাহর ইচ্ছাধীন বাস্তবায়িত কাজ, পূর্ণ কুদরত ও সর্বব্যাপ্তি হিকমতের সাথে সম্পৃক্ত। তিনি তাঁর বান্দাদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা দীন ও দুনিয়ার কল্যাণ দান করেন। আবার যে ব্যক্তি ক্ষতি ও অকল্যাণ প্রাপ্তির কাজ করে যা তাকে শাস্তি ভোগ করা অত্যাবশ্যকীয় করে তোলে তাকে তিনি ক্ষতি করেন ও যন্ত্রণা দেন। এ সব কিছুই তাঁর হিকমত, বৈশ্বিক নিয়ম-নীতি ও যে কারণ পাওয়া গেলে এর পরিণতি পাওয়া অত্যাবশ্যকীয় ইত্যাদি কারণে তিনি করে থাকেন। কেননা আল্লাহ সৃষ্টিকুলের জন্য সব কিছুর লক্ষ্য-উদ্দেশ্য ও দীন-দুনিয়ার ভালোবাসা ইত্যাদি উল্লেখ করে দিয়েছেন। আবার সাথে সাথে এগুলো অর্জনের উপায় ও পদ্ধতি বলে দিয়েছেন।  এ পথে চলার আদেশ দিয়েছেন, বান্দাকে এ পথে চলা সহজ করে দিয়েছেন। সুতরাং যে ব্যক্তি আল্লাহর বর্ণিত সে পথে চলবে তাকে উপকার প্রাপ্তির লক্ষ্যে পৌঁছে দিবেন আর যে তাঁর পথ সম্পূর্ণরূপে বা আংশিক ত্যাগ করবে অথবা পূর্ণতা ছুটে যাবে অথবা এর বিপরীত পথে চলবে, তাহলে তার উদ্দিষ্ট পূর্ণতা  ছুটে যাবে, তখন সে নিজেই নিজের র্ভৎসনা করবে। আল্লাহর বিরুদ্ধে তার কোন দলিল প্রমাণ থাকবে না, কোন ওযর পেশ করতে পারবে না। কেননা আল্লাহ তাকে শ্রবণশক্তি, দৃষ্টিশক্তি, অন্তর, শক্তি-সামর্থ ও কুদরত ইত্যাদি দান করেছেন। তিনি তাকে দুটি পথই বলে দিয়েছেন, এ দুপথ প্রাপ্তির উপায় বর্ণনা করেছেন, কী কারণে কোন পথের অধিকারী হবে তাও বলে দিয়েছেন। তাকে দীন ও দুনিয়ার কল্যাণ অর্জনের কোন পথ-ই তিনি বাধাগ্রস্ত করেন নি। সুতরাং সে নিজেই সুপথ থেকে বিচলিত হয়ে অসৎ পথ নির্বাচন করেছে যা তাকে ঘৃণা ও অপমান অত্যাবশ্যকীয় করে দিয়েছে।[158]

৫২- আয-যাহির (সুস্পষ্ট, সুপ্রতীয়মান, বাহ্য, দৃশ্যত)[159]

৫৩- আল-‘আদল (নিখুঁত)[160]

৫৪- আল-আযীয: আল-আযীয (সর্বাধিক সম্মানিত, মহাসম্মানিত), আল-কাবীউ (সর্বশক্তিমান, শক্তিশালী)[161], আল-মাতীন (সুদৃঢ়, সুস্থির)[162], আল-কাদীর (মহা ক্ষমতাধর)[163]

গ্রন্থকার রহ. বলেছেন, এ মহান নামগুলো অর্থ খুব কাছাকাছি। আল্লাহ তা‘আলা পূর্ণ ক্ষমতা, মহাকুদরত ও সর্বব্যাপী সম্মানের অধিকারী। আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,

﴿إِنَّ ٱلۡعِزَّةَ لِلَّهِ جَمِيعًا٦٥﴾ [يونس : ٦٥]

“নিশ্চয় সকল মর্যাদা আল্লাহর।” [সূরা ইউনুস, আয়াত: ৬৫][164]

আল-আযীয হলেন যার রয়েছে সকল মর্যাদা। ক্ষমতার মর্যাদা, বিজয়ের মর্যাদা, কোন কিছু বারণ করার মর্যাদা। সুতরাং সৃষ্টিকুলের কেউ তাঁকে ধরা ছোঁয়া অসম্ভব, কেউ তাঁর সমকক্ষ হওয়া অসম্ভব। তিনি সমস্ত অস্তিত্বশীলকে ধমক ও ক্ষমতার মধ্যে আবদ্ধ রাখেন, সৃষ্টিকুল তাঁর নৈকট্য লাভের প্রচেষ্টায় ব্যস্ত, তাঁর মহা ক্ষমতা ও বড়ত্বের কারণে সবাই তাঁর সমীপে নতশির।[165]

সুতরাং ইজ্জতের তিনটি অর্থের সবগুলোই পূর্ণরূপে মহান আল্লাহর মধ্যে বিদ্যমান। আল-আযীম তথা মহা সম্মানিত নাম তাঁর মহা শক্তির মর্যাদা প্রমাণ করে। আল্লাহর এ নামের আরেকটি অর্থ আল-কাবীউ (সর্বশক্তিমান, শক্তিশালী), আল-মাতীন (সুদৃঢ়, সুস্থির)। এটি আল্লাহর মহান সিফাত, সৃষ্টিকুলের কেউ এ শক্তির অধিকারী নয়; সে যত বড়ই হোক না কেন। আল-আযীযের আরেক অর্থ পরমুখাপেক্ষীহীনতার মর্যাদা। মহান আল্লাহ যাতীগত ভাবেই মুখাপেক্ষীহীন, কারো কাছে তাঁর কোন প্রয়োজন নেই, বান্দারা সকলে মিলে তাঁর কোন ক্ষতি করতে চাইলেও তারা তাঁর কোন ক্ষতি করতে সক্ষম হবে না, আবার তারা সবাই মিলে তাঁর কোন উপকার করতে চাইলেও তাঁর কোন উপকার করতে পারবে না; বরং তিনিই ক্ষতিকারী, উপকারকারী, দানকারী এবং তিনিই দান দেওয়া থেকে বারণকারী। তাঁর রয়েছে সমস্ত সৃষ্টির উপর ক্ষমতা, প্রভাব ও বিজয় লাভের মর্যাদা। সমস্ত সৃষ্টিই তাঁর মহত্ব ও বড়ত্বের সামনে বিনয়ী, নতশির এবং তাঁর ইচ্ছায় আনুগত্যশীল। অত:এব, সমস্ত সৃষ্টির ভাগ্য তাঁরই হাতে। তাঁর থেকে এক ইঞ্চি পরিমাণও নড়চড় করে না, তাঁর ইচ্ছা, শক্তি ও অনুমতি ব্যতীত কোন কিছুই পরিবর্তন ও নড়াচড়া করতে সক্ষম নয়। তিনি যা চান তা-ই হয়, আর তিনি যা চান না তা কখনও হবে না। তিনি ব্যতীত কারো কোন শক্তি ও সামর্থ নেই। তাঁর শক্তি ও ইচ্ছার একটি উদাহরণ হলো, তিনি মাত্র ছয় দিনে আসমান, জমিন ও এর মধ্যকার সব কিছু সৃষ্টি করেছেন। তিনি সমস্ত সৃষ্টি সৃষ্টি করেছেন, অত:পর তিনি তাদেরকে মৃত্যু দান করবেন, তিনি আবার তাদেরকে পুনরুত্থিত করবেন এবং সকলেই তাঁর কাছে প্রত্যাবর্তন করবে। আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,

﴿مَّا خَلۡقُكُمۡ وَلَا بَعۡثُكُمۡ إِلَّا كَنَفۡسٖ وَٰحِدَةٍ٢٨﴾ [لقمان: ٢٨]

“তোমাদের সৃষ্টি ও তোমাদের পুনরুত্থান কেবল একটি প্রাণের (সৃষ্টি ও পুনরুত্থানের) মতই।” [সূরা লুকমান, আয়াত: ২৮]

﴿وَهُوَ ٱلَّذِي يَبۡدَؤُاْ ٱلۡخَلۡقَ ثُمَّ يُعِيدُهُۥ وَهُوَ أَهۡوَنُ عَلَيۡهِ٢٧﴾ [الروم: ٢٧]

“আর তিনিই সৃষ্টির সূচনা করেন তারপর তিনিই এর পুনরাবৃত্তি করবেন। আর এটা তো তাঁর জন্য অধিকতর সহজ।” [সূরা আর-রূম, আয়াত: ২৭] তাঁর কদরতের অন্যতম নিদর্শন হলো, তুমি জমিনকে দেখতে পাবে শুষ্কাবস্থায়, অতঃপর যখনই তিনি তাতে পানি বর্ষণ করেন, তখন তা আন্দোলিত ও স্ফীত হয় এবং উদগত করে সকল প্রকার সুদৃশ্য উদ্ভিদ। তাঁর কুদরতের আরেকটি নিদর্শন হলো, পূর্ববর্তী মিথ্যাবাদী, কাফির ও যালিমদের উপর নানা ধরণের আযাব ও গজব পতিত হওয়া কিন্তু আল্লাহর আযাব যখন তাদের উপর এসেছে তখন তাদের কোন কৌশল, ষড়যন্ত্র, চক্রান্ত, ধন-সম্পদ, সৈন্য ও বড় বড় দুর্গ তাদের কোন কাজে আসে নি, তারা সে আযাব প্রতিরোধ করতে পারে নি। তারপর যখন রবের নির্দেশ আসল তখন তাদের এসব কোন উপকারে আসে নি এবং তারা ধ্বংস ছাড়া তাদের আর কিছুই বৃদ্ধি করে নি। বিশেষ করে সে সময় যখন তাদের শক্তি সামর্থ ছিল প্রচুর, আবিষ্কার ছিল নানা ধরণের, সে জাতির সামর্থ এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, তারা ভেবেছিল তারা আল্লাহর চেয়েও শক্তিশালী, তাঁর চেয়েও অধিক জ্ঞানী; কিন্তু তাদের কোন জ্ঞান ও শক্তিই কোন কাজে আসে নি। আল্লাহর নিদর্শনাবলীর অন্যতম হলো, সৃষ্টির শক্তি, কুদরত, আবিষ্কার কোন কিছুই আল্লাহর বালা-মুসিবত, শাস্তি ও ধ্বংস থেকে রক্ষা করতে পারবে না; যদিও তারা এর মোকবিলায় তাদের সর্বাত্মক চেষ্টা ব্যয় করে। কিন্তু আল্লাহর নির্দেশই সর্বদা বিজয় লাভ করে। তাঁর কুদরতের মধ্যে আরেকটি হলো, ঊর্ধ্ব জগত ও নিম্ন জগতের সব কিছুই তাঁর কাছে অনুগত ও নত।

তাঁর পূর্ণ ইজ্জত, কুদরত ও এ দুটি গুণ ব্যাপক হওয়ার আরেকটি প্রমাণ হলো, তিনি যেমনিভাবে বান্দাকে সৃষ্টি করেছেন, তেমনিভাবে তিনি তাদের আমল, আনুগত্য ও অবাধ্যতাও সৃষ্টি করেছেন; অথচ এগুলো বান্দারই কাজ। এগুলোকে আল্লাহর দিকে সম্পৃক্ত করা হয়ে এ হিসেবে যে, তিনি যেহেতু এগুলোর সৃষ্টিকারী ও পরিচালনাকারী। আর বান্দার দিকে বাস্তবিক ও প্রকৃতিগত ভাবে সম্বন্ধ করা হয়, যেহেতু বান্দাই কাজটি করে। এভাবে বললে বিষয়টিতে কোন বৈপরীত্য নেই। কেননা তাদের শক্তি-সামর্থ, ও ইচ্ছাশক্তির স্রষ্টা, এমনিভাবে তিনি কোন কাজে সংঘটিত হওয়ার কারণ ও ও উপকরণেরও স্রষ্টিকারী। আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,

﴿وَٱللَّهُ خَلَقَكُمۡ وَمَا تَعۡمَلُونَ٩٦﴾ [الصافات : ٩٦]

“অথচ আল্লাহই তোমাদেরকে এবং তোমরা যা কর তা সৃষ্টি করেছেন?” [সূরা আস-সাফফাত, আয়াত: ৯৬]

আল্লাহর অপরিসীম কুদরতের আরেকটি নিদর্শন হলো, তিনি তাঁর কিতাবে তাঁর প্রিয় বান্দাদেরকে যুগে যুগে শত্রুর মোকাবিলায় সাহায্য করেছেন, বিজয় দান করেছেন; যদিও শত্রুরা সংখ্যায় ছিল অনেক এবং তাদের সমর প্রস্তুতিও ছিল ব্যাকপ, আর মুমিনরা সংখ্যায় অতি নগণ্য ছিল। আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,

﴿كَم مِّن فِئَةٖ قَلِيلَةٍ غَلَبَتۡ فِئَةٗ كَثِيرَةَۢ بِإِذۡنِ ٱللَّهِ٢٤٩﴾ [البقرة: ٢٤٩]

“কত ছোট দল আল্লাহর হুকুমে বড় দলকে পরাজিত করেছে!” [সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ২৪৯]

তাঁর কুদরত ও রহমতের নিদর্শন হলো, তিনি জান্নাতীদের সুখ-শান্তি, চিরস্থায়ী অফুরন্ত নি‘আমত ও জাহান্নামীদের নানা ধরণের আযাব সম্পর্কে আগেই বর্ণনা করে দিয়েছেন। [166]

আল-আযীম (মহা মর্যাদাপূর্ণ, অতি বিরাট), আল-‘আফুয়ু (অতি ক্ষমাশীল, শাস্তি ক্ষমাকারী, গুনাহ মাফকারী), আল-গানিয়্যু (ঐশ্বর্যবান, স্বতন্ত্র, মুখাপেক্ষীহীন), আল-ফাত্তাহ (মহা উন্মোচনকারী, প্রকাশকারী)

৫৫- আল-আযীম: আল-আযীম (মহা মর্যাদাপূর্ণ, অতি বিরাট)[167], আল-কাবীর (সুমহান, অতি বিরাট)[168]:

গ্রন্থকার রহ. বলেছন, আল-আযীম: আল-আযীম (মহা মর্যাদাপূর্ণ, অতি বিরাট) নামটিতে সব ধরণের বড়ত্ব, মর্যাদা, অহংকার, সম্মান, সৌন্দর্য যা সকলের অন্তর ভালোবাসে ও রূহসমূহের সম্মান প্রদর্শন সব কিছুকেই অন্তর্ভুক্ত করে। আল্লাহর পরিচয় লাভকারী সকলেই জানেন যে, তিনি ব্যতীত অন্য জিনিসের বড়ত্ব ও মর্যাদা যতোই বেশি হোক না কেন, তাঁর বড়ত্ব, সুমহানত্ব, ও সুউচ্চতার কাছে সেগুলো অতি নগণ্য, কিছুই না।[169]

আল্লাহ তাঁর প্রতিটি গুণে ও মানে মহান। তাঁকে সম্মান করা ফরয। কোন সৃষ্টিই তাঁর যথাযথ প্রশংসা করতে সক্ষম নয়, কেউ তাঁর গুণাবলী গুণে শেষ করতে পারবে না; বরং তিনি নিজে নিজেকে যেভাবে প্রশংসা করেছেন তিনি সেরকমই, তিনি বান্দার প্রশংসার ঊর্ধ্বে।

জ্ঞাতব্য যে, আল্লাহর তা‘যীম তথা সম্মান ও মর্যাদা দুধরণের:

প্রথম প্রকার: তিনি প্রতিটি পূর্ণাঙ্গ পূর্ণতায় গুণান্বিত, সেসব পূর্ণতার সর্বোচ্চ পূর্ণতা, সর্বাধিক পূর্ণতা ও সর্ব প্রশস্ত পূর্ণতা একমাত্র তাঁরই। তাঁর রয়েছে সর্বব্যাপী পরিপূর্ণ জ্ঞান, বাস্তবায়িত কুদরত, অহংকার, বড়ত্ব ও মহত্ব। তাঁর বিরাটত্ব ও বড়ত্বের উদাহরণ হলো, ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু[170] ও অন্যদের[171] বর্ণিত হাদীস অনুসারে আসমান ও জমিন রহমানের তালুতে একটি সরিষা দানার চেয়েও ছোট। আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,

﴿وَمَا قَدَرُواْ ٱللَّهَ حَقَّ قَدۡرِهِۦ وَٱلۡأَرۡضُ جَمِيعٗا قَبۡضَتُهُۥ يَوۡمَ ٱلۡقِيَٰمَةِ وَٱلسَّمَٰوَٰتُ مَطۡوِيَّٰتُۢ بِيَمِينِهِ٦٧﴾ [الزمر: ٦٦]

“আর তারা আল্লাহকে যথাযোগ্য মর্যাদা দেয়নি। অথচ কিয়ামতের দিন গোটা পৃথিবীই থাকবে তাঁর মুষ্টিতে এবং আকাশসমূহ তাঁর ডান হাতে ভাঁজ করা থাকবে।” [সূরা আয-যুমার, আয়াত: ৬৬]

আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,

﴿إِنَّ ٱللَّهَ يُمۡسِكُ ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَٱلۡأَرۡضَ أَن تَزُولَاۚ وَلَئِن زَالَتَآ إِنۡ أَمۡسَكَهُمَا مِنۡ أَحَدٖ مِّنۢ بَعۡدِهِ٤١﴾ [فاطر: ٤١]

“নিশ্চয় আল্লাহ আসমানসমূহ ও জমিনকে ধরে রাখেন যাতে এগুলো স্থানচ্যুত না হয়। আর যদি এগুলো স্থানচ্যুত হয়, তাহলে তিনি ছাড়া আর কে আছে, যে এগুলোকে ধরে রাখবে?” [সূরা ফাতির, আয়াত: ৪১]

আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,

﴿تَكَادُ ٱلسَّمَٰوَٰتُ يَتَفَطَّرۡنَ مِن فَوۡقِهِنَّ٥﴾ [الشورى: ٥]

“উপর থেকে আসমান ফেটে পড়ার উপক্রম হয়।” [সূরা আশ-শূরা, আয়াত: ৫]

হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

قَالَ اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ: «الْكِبْرِيَاءُ رِدَائِي، وَالْعَظَمَةُ إِزَارِي، فَمَنْ نَازَعَنِي وَاحِدًا مِنْهُمَا، قَذَفْتُهُ فِي النَّارِ».

“মহান আল্লাহ বলেন, অহংকার আমার চাদর, মহানত্ব আমার লুঙ্গি। কেউ এ দু’টির কোন একটি নিয়ে আমার সাথে বিবাদ করলে, আমি তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবো।”[172] সুতরাং অহংকার ও মহানত্ব একমাত্র মহান আল্লাহর গুণ, সৃষ্টিকুলের কেউ এগুণের সমপরিমাণ বা কাছাকাছিও অর্জন করতে সক্ষম হবে না।

দ্বিতীয় প্রকার: আল্লাহর মহান সম্মান ও মর্যাদার মতো সৃষ্টিকুলের কেউ সে পরিমাণ সম্মান ও মর্যাদার অধিকারী নয়। আল্লাহ বান্দার অন্তরের দ্বারা, যবানের দ্বারা ও অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের দ্বারা সম্মান ও মর্যাদা পাওয়ার অধিকারী। আর সে সম্মান ও মর্যাদা দেওয়ার উপায় হচ্ছে তাঁকে যথার্থ রূপে চিনতে ও জানতে, ভালোবাসতে, তাঁর সমীপে বিনয়ী ও নতজানু হতে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা ব্যয় করা, তাঁর বড়ত্ব ও মহানত্বের কাছে বিনয়ী ও নত হওয়া, তাঁকে ভয় করা, যবানের দ্বারা তাঁর প্রশংসা করা, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের দ্বারা তাঁর শুকরিয়া ও ইবাদত করা। তাঁকে সম্মান প্রদর্শনের আরো উপয় হচ্ছে তাঁকে যেভাবে ভয় করা উচিত সেভাবে ভয় করা, তাঁর আনুগত্য করা, তাঁর অবাধ্যতা না করা, তাঁর যিকির করা, তাঁকে ভুলে না যাওয়া, তাঁর শুকরিয়া আদায় করা ও তাঁর নি‘আমতের অকৃতজ্ঞ না হওয়া। তাঁকে সম্মানের আরো পন্থা হলো তিনি যা কিছু হারাম করেছেন ও শরী‘আতসম্মত করেছেন সেগুলোকে সবসময়, সর্বস্থানে সম্মান করা ও মেনে চলা। আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,

﴿ذَٰلِكَۖ وَمَن يُعَظِّمۡ شَعَٰٓئِرَ ٱللَّهِ فَإِنَّهَا مِن تَقۡوَى ٱلۡقُلُوبِ٣٢﴾ [الحج : ٣٢]

“এটাই হল আল্লাহর বিধান; যে আল্লাহর নিদর্শনসমূহকে সম্মান করে, নিঃসন্দেহে তা অন্তরের তাকওয়া থেকেই।” [সূরা আল-হাজ্জ, আয়াত: ৩২]

আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,

﴿ ذَٰلِكَۖ وَمَن يُعَظِّمۡ حُرُمَٰتِ ٱللَّهِ فَهُوَ خَيۡرٞ لَّهُۥ عِندَ رَبِّهِ٣٠﴾ [الحج : ٣٠]

“এটিই বিধান আর কেউ আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত পবিত্র বিষয়সমূহকে সম্মান করলে তার রবের নিকট তা-ই তার জন্য উত্তম।” [সূরা আল-হাজ্জ, আয়াত: ৩০] তাঁকে সম্মানের আরেকটি মাধ্যম হলো তিনি যা কিছু সৃষ্টি করেছেন বা শরী‘আতে বিধিবদ্ধ করেছেন সেগুলোর বিরোধীতা না করা। [173]

৫৬- আল-‘আফুউ[174]: আল-‘আফুউ (শাস্তি মউকুফকারী, গুনাহ ক্ষমাকারী, পাপ মোচনকারী)[175], আল-গাফূর (মার্জনাকারী, অতীব ক্ষমাশীল)[176], আল-গাফফার (অতি ক্ষমাশীল, পরম ক্ষমাশীল):

গ্রন্থকার রহ. বলেছেন, আল-‘আফুউ (শাস্তি মউকুফকারী, গুনাহ ক্ষমাকারী, পাপ মোচনকারী), আল-গাফূর (মার্জনাকারী, অতীব ক্ষমাশীল), আল-গাফফার (অতি ক্ষমাশীল, পরম ক্ষমাশীল) হলেন তিনি যিনি সর্বদা ক্ষমাকারী ও গুনাহ মার্জনাকারী হিসেবে সুপরিচিত এবং বান্দা গুনাহ মাফকারী গুণে গুণান্বিত। সকলেই তাঁর ক্ষমা ও মার্জনার প্রতি মুখাপেক্ষী ও নিরুপায়; যেমনিভাবে সবাই তাঁর রহমত ও দানের প্রতি অভাবী ও নিরুপায়। যারা ক্ষমা ও মার্জনার কাজ করবে তাদেরকে তিনি ক্ষমা ও মার্জনা করবেন বলে ওয়াদা করেছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,

﴿وَإِنِّي لَغَفَّارٞ لِّمَن تَابَ وَءَامَنَ وَعَمِلَ صَٰلِحٗا ثُمَّ ٱهۡتَدَىٰ٨٢﴾ [طه: ٨٢]

“আর অবশ্যই আমি তার প্রতি ক্ষমাশীল, যে তাওবা করে, ঈমান আনে এবং সৎকর্ম করে অতঃপর সৎ পথে চলতে থাকে।” [সূরা ত্বা-হা, আয়াত: ৮২][177]

৫৭- আল-‘আলী (সুউচ্চ)[178]:

৫৮- আল-‘আলীম (মহাজ্ঞানী)[179]:

৫৯-৬০- আল-গাফূর (মার্জনাকারী, অতীব ক্ষমাশীল), আল-গাফফার (অতি ক্ষমাশীল, পরম ক্ষমাশীল):

গ্রন্থকার রহ. বলেছেন, আল-গাফূর তিনিই যিনি সর্বদা গুনাহ মাফ করেন এবং যারাই তাওবা করেন তাদের তাওবা কবুল করেন। হাদীসে এসেছে, আল্লাহ বলবেন,

«يَا ابْنَ آدَمَ إِنَّكَ لَوْ أَتَيْتَنِي بِقُرَابِ الأَرْضِ خَطَايَا ثُمَّ لَقِيتَنِي لَا تُشْرِكُ بِي شَيْئًا لَأَتَيْتُكَ بِقُرَابِهَا مَغْفِرَةً».

“হে আদম সন্তান, যদি তোমরা কেউ পৃথিবী সমপরিমাণ গুনাহ নিয়ে আমার কাছে আস অত:পর আমার সাথে কাউকে শরীক না করে মিলিত হও তাহলে আমি পৃথিবী সমপরিমাণ গুনাহও ক্ষমা করে দিব।”[180]

আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,

﴿إِنَّ رَبَّكَ وَٰسِعُ ٱلۡمَغۡفِرَةِ٣٢﴾ [النجم : ٣٢]

“নিশ্চয় তোমার রব ক্ষমার ব্যাপারে উদার।” [সূরা আন-নাজম, আয়াত: ৩২]

আল্লাহ তাওবা, ইসতিগফার, ঈমান, ভালো আমল, তাঁর ইবাদতে ইহসান, তাঁর কাছে ক্ষমা চাওয়া, তাঁর দয়া কামনায় শক্তিশালী আশা করা ও আল্লাহর ব্যাপারে ভালো ধারণা করা ইত্যাদি যেগুলোকে আল্লাহর মাগফিরাত লাভের মাধ্যম বানিয়েছেন সেগুলো মাধ্যমে তাঁর ক্ষমা পাওয়ার উপায় তিনি বর্ণনা করেছেন।[181]

৬১-৬২- আল-গানিয়ু (অমুখাপেক্ষী), আল-মুগনি (সমৃদ্ধকারী, উদ্ধারকারী)[182]:

গ্রন্থকার রহ. বলেছেন, আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,

﴿يَٰٓأَيُّهَا ٱلنَّاسُ أَنتُمُ ٱلۡفُقَرَآءُ إِلَى ٱللَّهِۖ وَٱللَّهُ هُوَ ٱلۡغَنِيُّ ٱلۡحَمِيدُ١٥﴾ [فاطر: ١٥]

“হে মানুষ, তোমরা আল্লাহর প্রতি মুখাপেক্ষী আর আল্লাহ অমুখাপেক্ষী ও প্রশংসিত।” [সূরা ফাতির, আয়াত: ১৫] অত:এব, তিনি সত্ত্বাগত ভাবেই অমুখাপেক্ষী। সর্ব দিক বিবেচনায়, সকল পূর্ণতার বিচারে তাঁর রয়েছে সর্ব সাধারণ পূর্ণাঙ্গ অমুখাপেক্ষীতা এবং পূর্ণ গুণাবলী। কোন দিক থেকেই তাঁর কোন অপূর্ণতা ও দোষ-ত্রুটি স্পর্শ করতে পারে না। আর একমাত্র গানি তথা অমুখাপেক্ষী আল্লাহ ব্যতীত কারো এ ধরণের গুণ থাকতে পারে না। কেননা তাঁর অমুখাপেক্ষীতা সত্ত্বাগত ভাবেই অত্যাবশ্যকীয়, যেমনিভাবে তিনি ব্যতীত কেউ খালিক (সৃষ্টিকারী), কাদির (সর্বসক্ষম), রাযিক (রিযিকদাতা) ও মুহসিন (ইহসানকারী) হতে পারে না। অত:এব, তিনি কারো কাছে কোন ভাবেই অভাবী ও মুখাপেক্ষী নন।

তিনি অমুখাপেক্ষী, তাঁর হাতেই রয়েছে আসমান ও জমিনের ধন-ভাণ্ডার, দুনিয়া ও আখিরাতের ভাণ্ডার সামগ্রী। তিনি সব সৃষ্টি থেকে সম্পূর্ণ অমুখাপেক্ষী, তিনি তাঁর বিশেষ বান্দা ও সৃষ্টি থেকেও সম্পূর্ণ অমুখাপেক্ষী যাদের অন্তরে তিনি রাব্বানী জ্ঞান ও ঈমানী হাকিকত দান করেন। [183]

তাঁর পূর্ণ অমুখাপেক্ষীতা ও দয়ার নিদর্শন হলো তিনি তাঁর বান্দাদেরকে তাঁর কাছে দো‘আ করতে আদেশ দিয়েছেন এবং তিনি তাদের দো‘আ কবুল করতে, তাদের সমস্ত মনবাঞ্ছনা পূরণ করতে ও তাঁর দয়ায় তিনি তাদের প্রার্থনাকৃত জিনিস ও তারা যা প্রার্থনা করে নি তাও দান করতে প্রস্তুত আছেন। তাঁর পূর্ণ অমুখাপেক্ষীতা আরেকটি নিদর্শন হলো, সৃষ্টির শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সকল সৃষ্টজীব কোন এক ময়দানে একত্রিত যদি তাঁর কাছে চাইতে থাকে এবং প্রত্যেকে যা কিছু চায় ও যেসব কিছু তাদের মনে উদয় হয় তা যদি তিনি তাদেরকে দান করেন, তাহলে তাঁর বিশাল সম্রাজ্য থেকে এক সরিষা পরিমাণও কমতি দেখা দিবে না। তাঁর পূর্ণ অমুখাপেক্ষীতা ও প্রশস্ত দানের আরো নিদর্শন হলো, তিনি তাঁর প্রিয় বান্দাদের জন্য পরকালে এমন এক চিরস্থায়ী নি‘আমতের গৃহ, আরাম-আয়েশ, ভোগ-বিলাস ও অফুরন্ত কল্যাণ তৈরি করে রেখেছেন যা কোন চক্ষু কোন দিন দেখে নি, কোন কর্ণ কোন দিন শোনে নি, এমনকি কোন মানুষের মনও এমন কিছু ভাবেনি।

তাঁর পূর্ণ অমুখাপেক্ষীতার আরেকটি নিদর্শন হলো, তিনি কোন সঙ্গী-সাথী, ছেলে-সন্তান, তাঁর সম্রাজ্যের অংশীদার ও বিপদের বন্ধু কোন কিছুই গ্রহণ করেন নি। তিনি এমনই অমুখাপেক্ষী সত্ত্বা যিনি গুণাবলীতে স্বয়ংসম্পূর্ণ, পরিপূর্ণ এবং সমস্ত সৃষ্টি থেকে তিনি অমুখাপেক্ষী।[184]

৬৩- আল-ফাত্তাহ (শ্রেষ্ঠ ফয়সালাকারী, প্রারম্ভকারী, বিজয়দানকারী)[185]:

গ্রন্থকার রহ. বলেন, আল-ফাত্তাহ হলেন যিনি তাঁর আহকামুশ শর‘ঈয়্যাহ, আহকামুল কাদরীয়্যাহ ও আহকামুল জাযায়ের দ্বারা বান্দার মাধ্যে ফয়সালা করেন, যিনি তাঁর স্নেহে ও ভালোবাসায় সাদিকীনদের চক্ষু খুলে দেন, তাঁকে চিনতে, ভালোবাসতে ও তাঁর সমীপে আকুতি-বিনয়ী হতে তাদের অন্তরসমূহ খুলে দেন, তিনি তাঁর রহমত ও নানা ধরণের রিযিকের দরজা খুলে দেন, তাদের জন্য দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ লাভের উপায়সমূহ বলে দেন।[186]

আল্লাহর ফয়সালা দুধরণের:

প্রথমত: তাঁর দীনি (শরী‘আতের বিধানের মাধ্যমে) ও জাযায়ী (প্রতিদান দানের মাধ্যমে) হুকুমে ফয়সালা করা।

দ্বিতীয়ত: তাঁর কাদরী হুকুম তথা তাকদীরে ইতিপূর্বে যা লিপিবদ্ধ করে রেখেছেন সে অনুসারে ফয়সালা করা।

তাঁর দীনি হুকুমের দ্বারা ফয়সালা বলতে বুঝায়, নবী-রাসূলদের মাধ্যমে মুকাল্লিফদের প্রয়োজনীয় যেসব বিধান শরী‘আতে বিধিবদ্ধ করেছেন সেসব বিধানে ফয়সালা এবং তারা সেসব সরল-সঠিক পথে সুদৃঢ় ভাবে চলত। আর জাযায়ী হুকুমের দ্বারা ফয়সালা বলতে বুঝায়, তাঁর নবী-রাসূল ও তাদের বিরোধীদের মধ্যে, তাঁর প্রিয়জন (অলীদের) ও তাদের শত্রুদের মধ্যে যেসব বিরোধ ছিল তিনি তাঁর নবী-রাসূল ও তাদের অনুসারীদেরকে সাহায্য করে সম্মানিত করেছেন ও বিজয় দান করেছেন; পক্ষান্তরে তাদের বিরোধী শত্রুদেরকে লাঞ্ছিত-অপমানিত ও পরাজিত করেছেন। এমনিভাবে কিয়ামতের দিনে তাঁর মহাফয়সালা এবং সে দিন সৃষ্টিকুলের প্রত্যেক আমলকারীকে তাদের আমল অনুযায়ী ফয়সালা করবেন।

অন্যদিকে তাঁর কাদরী হুকুম বলতে বুঝায়, তিনি বান্দার ভাগ্যে ভালো-মন্দ, কল্যাণ-অকল্যাণ, উপকার-ক্ষতি ও দান-বারণ যা কিছু নির্ধারণ করে রেখেছেন সে অনুসারে ফয়সালা করা। আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,

﴿مَّا يَفۡتَحِ ٱللَّهُ لِلنَّاسِ مِن رَّحۡمَةٖ فَلَا مُمۡسِكَ لَهَاۖ وَمَا يُمۡسِكۡ فَلَا مُرۡسِلَ لَهُۥ مِنۢ بَعۡدِهِۦۚ وَهُوَ ٱلۡعَزِيزُ ٱلۡحَكِيمُ٢﴾ [فاطر: ٢]

“আল্লাহ মানুষের জন্য যে রহমত উন্মুক্ত করে দেন তা আটকে রাখার কেউ নেই। আর তিনি যা আটকে রাখেন, তারপর তা ছাড়াবার কেউ নেই। আর তিনি পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।” [সূরা ফাতির, আয়াত: ২] অত:এব, রাব্বুল আলামীন হলেন শ্রেষ্ঠ ফয়সালাকারী ও সম্যক পরিজ্ঞাত। তিনি তাঁর বাধ্য বান্দাদেরকে তাঁর দান ও সম্মানের ভাণ্ডার থেকে দান করে ফয়সালা করবেন, আর তাঁর শত্রুদেরকে অপমানিত ও শাস্তি দিয়ে ফয়সালা করবেন। এটিই তাঁর দয়া ও ন্যায় পরায়নতা।[187]

ফা‘আলুল লিমা ইউরীদ (তিনি তা-ই করেন যা চান), আল-কাবিদ (নিয়ন্ত্রণকারী), আল-কারীব (অতি নিকটবর্তী), আল-কুদ্দূস (পূত:পবিত্র, নিখুঁত), আল-কাদীর (মহা ক্ষমতাধর), আল-কাহহার (মহাপ্রতাবশালী, দমনকারী)

৬৪- ফা‘আলুল লিমা ইউরীদ (তিনি তা-ই করেন যা চান)[188]:

গ্রন্থকার রহ. বলেছেন, ফা‘আলুল লিমা ইউরীদ (তিনি তা-ই করেন যা চান) এটি তাঁর পূর্ণ শক্তি ও তিনি যা চান তা বাস্তবায়ন করার ক্ষমতা এ তাঁর কুদরতের প্রমাণ। তিনি যা কিছুই ইচ্ছা করেন তা তিনি করেন, এতে কোন বাধাদানকারী ও বিরোধীতাকারী কেউ নেই। তাঁর কাজে কোন সমকক্ষ বা সাহায্যকারী নেই; বরং তিনি যখন কোন কিছু করতে ইচ্ছা করেন তাকে শুধু বলেন, হয়ে যাও, আর তা হয়ে যায়।

যদিও তিনি যা চান তা-ই করেন; তবে তাঁর ইচ্ছা তাঁর হিকমত ও প্রশংসার অনুগামী। তিনি পূর্ণ কুদরত ও ইচ্ছা বাস্তবায়নের ক্ষমতার গুণে গুণান্বিত এবং তাঁর সব কাজ তাঁর হিকমতের অন্তর্ভুক্ত। [189]

আল্লাহ ব্যতীত কেউ যা ইচ্ছা তা-ই করতে পারেন না। [190]

৬৫- আল-কাবিদ[191]: আল-কাবিদ (নিয়ন্ত্রণকারী), আল-বাসিত (প্রসারণকারী)। 

৬৬-আল-কারীব (অতি নিকটবর্তী):

গ্রন্থকার রহ. বলেছেন, আল-কারীব হলেন, যিনি সব কিছুর থেকে অতি নিকটে।

আল্লাহর নিকটত্ব দুধরণের:

সাধারণ নৈকট্য: তিনি তাঁর ইলম, জ্ঞান, মুরাকাবা (পর্যবেক্ষণ), মুশাহাদা (দেখা-শোনা) ও বেষ্টনির দ্বারা সব কিছুর সর্বাধিক নিকটবর্তী। তিনি মানুষের গলার ধমনী হতেও অধিক কাছে।

বিশেষ নৈকট্য: তিনি তাঁর ইবাদতকারী, তাঁর কাছে প্রার্থনাকারী ও তাঁকে ভালোবাসাকারীর সবচেছে নিকটে। এ নৈকট্য বলতে বুঝায়, তাদেরকে ভালোবাসা, বিজয় দান করা, সব কাজে সাহায্য করা, তাঁকে আহ্বানকারীর ডাকে সাড়া দেওয়া, তাদের দো‘আ কবুল করা ও তাদেরকে পুরস্কৃত করা। আর এ কথাই আল্লাহ তা‘আলার নিম্নোক্ত বাণীতে উল্লেখ করা হয়েছে। আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,

﴿وَٱسۡجُدۡۤ وَٱقۡتَرِب١٩﴾ [العلق: ١٩]

“আর সিজদা কর এবং নৈকট্য লাভ কর।” [সূরা আল-আলাক, আয়াত: ১৯]

﴿إِنَّ رَبِّي قَرِيبٞ مُّجِيبٞ٦١﴾ [هود: ٦١]

“নিশ্চয় আমার রব নিকটে, সাড়াদানকারী।” [সূরা হূদ, আয়াত: ৬১]

﴿وَإِذَا سَأَلَكَ عِبَادِي عَنِّي فَإِنِّي قَرِيبٌۖ أُجِيبُ دَعۡوَةَ ٱلدَّاعِ إِذَا دَعَانِ١٨٦﴾ [البقرة: ١٨٦]

“আর যখন আমার বান্দাগণ তোমাকে আমার সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করবে, আমি তো নিশ্চয় নিকটবর্তী। আমি আহ্বানকারীর ডাকে সাড়া দেই, যখন সে আমাকে ডাকে।” [সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ১৮৬] এ প্রকারের নিকটত্বের চাহিদা হচ্ছে আল্লাহর অনুগ্রহ, তাদের আহ্বানে সাড়া দেওয়া ও তাদের চাহিদা পূরণ করা। এ কারণেই আল্লাহর আল-কারীব নামের সাথে আল-মুজীব নাম একত্রিত হয়েছে। এ প্রকারের নৈকট্যের হাকীকত জানা সম্ভব নয়, শুধু দূর থেকে এর প্রভাব জানা যায়, তাঁর সাহায্য, রক্ষণাবেক্ষণ, তাওফিক ও ভুল-ভ্রান্তি থেকে বেঁচে রাখা ইত্যাদি জানা যায়। এ ধরণের নিকটত্বের আরো প্রভাব হলো, তিনি তাঁকে আহ্বানকারীর ডাকে সাড়া দেন ও তাঁর ইবাদতকারীকে সাওয়াব দান করেন।[192]

৬৭- আল-কুদ্দূস (পূত:পবিত্র, নিখুঁত)[193]:

৬৮-আল-কাদীর (মহা ক্ষমতাধর)[194]:

গ্রন্থকার রহ. বলেছেন, আল-কাদীর হলেন যিনি পূর্ণ ক্ষমতার অধিকারী, তাঁর কুদরতে তিনি সমস্ত সৃষ্টিজগত সৃষ্টি করেছেন, তাঁর কুদরতে তিনি এগুলো পরিচালনা করেন, তাঁর কুদরতেই তিনি এগুলো সুঠাম করেছেন, তাঁর কুদরতে তিনি তাদেরকে জীবিত করেন ও মৃত্যু দান করেন, বান্দাকে কিয়ামতের দিনে পুরস্কার দেওয়ার জন্য পুনরায় জীবিত করবেন, তাঁর ইহসানে তিনি সৎকর্মশীলকে পুরস্কার দিবেন এবং অসৎকর্মশীলকে শাস্তি দিবেন। তিনি এমন সত্ত্বা যিনি যা ইচ্ছা করেন তাকে শুধু বলেন, হয়ে যাও, ফলে তা হয়ে যায়। তাঁর কুদরতেই তিনি অন্তরসমূহকে পরিবর্তন করেন এবং তিনি যাকে যেভাবে চান সেভাবে পরিবর্তন করেন।[195]

৬৯- আল-কাহহার (মহাপ্রতাবশালী, দমনকারী)[196]:

গ্রন্থকার রহ. বলেছেন, আল-কাহহার হলেন যিনি ঊর্ধ্বজগত ও নিম্নজগতের সব কিছুর উপর মহাপ্রতাবশালী ও দমনকারী। তিনি সব মাখলুকের উপর প্রতাভশালী, সকলেই তাঁর মহা সম্মান, মহা শক্তি ও পূর্ণ ক্ষমতার কাছে নতশির।[197]

তিনি সৃষ্টিকুলকে দমন করে রাখেন, সকলে তাঁর কাছে বিনয়ী-বিনম্র অথবা তাঁর কুদরত ও ইচ্ছার কাছে বিনীত। ঊর্ধ্ব ও নিম্নজগতের সকল জীব ও সব উপাদান তাঁরই কাছে নতজানু। সুতরাং কোন কিছুর তাঁর এ সম্রাজ্যে তাঁর অনুমতি ব্যতীত বসবাস করতে পারে না। তিনি যা চান তা হয়ে যায়, আর তিনি যা চান না তা কখনো-ই হবে না। সসম্ত সৃষ্টি তাঁর কাছে অভাবী, মুখাপেক্ষী, তারা সকলেই অক্ষম, নিজেরা নিজেদের উপকার-ক্ষতি, কল্যাণ-অকল্যাণ কিছুই করতে পারে না। অত:পর তাঁর প্রতাবশালীতা তাঁর জীবন, ইজ্জত ও কুদরতকে অত্যাবশ্যকীয় করে; কেননা কারো পরিপূর্ণ জীবন, পূর্ণ শক্তি ও ক্ষমতা না থাকলে সে সত্ত্বা সৃষ্টকুলের উপর প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয় না।[198]

আল-কাবীউ (সর্বশক্তিমান, শক্তিশালী), আল-কাইয়্যূম (চিরন্তন), আল-কাফী (যথেষ্ট), আল-কাবীর (সুমহান, সবচেয়ে বড়), আল-কারীম (মহা সম্মানিত, মহা দয়ালু), আল-লাতীফ (সূক্ষ্মদর্শী, অমায়িক)

৭০- আল-কাবীউ (সর্বশক্তিমান, শক্তিশালী)[199]:

৭১- আল-কাইয়্যূম (চিরন্তন)[200]:

৭২-আল-কাফী (যথেষ্ট)[201]:

গ্রন্থকার রহ. বলেছেন, আল-কাফী হলেন, তিনি বান্দার সমস্ত প্রয়োজন ও অভাব পূরণে যথেষ্ট। আর যারা তাঁর প্রতি ঈমান আনে, তাঁর উপর তাওয়াক্কুল করে তিনি তাদের জন্য বিশেষভাবে যথেষ্ট। তারা তাঁর (আল্লাহর) থেকে তাদের দুনিয়া ও আখিরাতের যাবতীয় প্রয়োজন পূরণে সাহায্য গ্রহণ করেন।[202]

৭৩- আল-কাবীর (সুমহান, সবচেয়ে বড়)[203]:

গ্রন্থকার রহ. বলেছেন, আল-কাবীর (সুমহান, সবচেয়ে বড়)[204] হলেন যার রয়েছে সত্ত্বাগত ও সিফাতগত বড়ত্ব ও মহানত্ব। আসমান ও জমিনবাসীর অন্তরে রয়েছে তাঁর বড়ত্ব ও সুমহানত্ব।[205]

৭৪- আল-কারীম (মহা সম্মানিত, মহা দয়ালু)[206]:

গ্রন্থকার রহ. বলেছেন, আল-কারীম[207] হলেন, যার রয়েছে ব্যাপক কল্যাণ। তাঁর শুকরিয়া আদায়কারী ও অস্বীকারকারী সকলের জন্যই তাঁর নি‘আমত ব্যাপক ভাবে বিস্তৃত; তবে যে তাঁর শুকরিয়া করে তিনি তাকে নি‘আমত বাড়িয়ে দেন আর যে তাঁর নি‘আমতের অকৃতজ্ঞতা করবে তিনি তার থেকে নি‘আমত উঠিয়ে নিবেন।[208]

৭৫- আল-লাতীফ (সূক্ষ্মদর্শী, অমায়িক)[209]:

গ্রন্থকার রহ. বলেছেন, আল্লাহর নামসমূহের মধ্যে আরেকটি নাম হলো আল-লাতীফ তথা সূক্ষ্মদর্শী, অমায়িক। যিনি তাঁর ইলমে অত্যন্ত সূক্ষ্মদর্শী; এমনকি ক্ষুদ্র থেকে অতি ক্ষুদ্রতর ও লুকায়িত জিনিস সম্পর্কেও অবগত। মানুষের অন্তরে যা কিছু রয়েছে, জমিনের অভ্যন্তরে যে সব শস্য-দানা লুকায়িত রয়েছে সব কিছু সম্পর্কে তিনি জানেন। তিনি তাঁর প্রিয় ও নির্বাচিত বান্দাদের সাথে অমায়িক ও দয়ালু ব্যবহার করে থাকেন। ফলে তাদেরকে তিনি সহজ পথ দেখান এবং কঠোরতা থেকে দূরে রাখেন। তাঁর সন্তুষ্টি ও দয়া পেতে তিনি তাদের জন্য সমস্ত পথ সহজ করে দেন এবং তাঁর অসন্তুষ্টি থেকে বেঁচে থাকতে যেসব পথ তারা জানে ও যা তারা জানে না সব ধরণের পথ থেকে তিনি তাদেরকে সংরক্ষণ করেন। তাঁর ভালোবাসা পেতে কষ্টকর কাজ করতে তারা যা অপছন্দ করেন তিনি তাদেরকে সে কাজগুলো করতে সক্ষমতা দান করেন। ফলে তিনি তাদেরকে দয়া করেন, তাদেরকে সুন্দর পরিণাম ও উত্তম পুরস্কার দান করেন। যে কাজে তাদের জন্য কল্যাণ, সংশোধন ও সফলতা রয়েছে সেগুলো তাদের সক্ষমতার বাহিরে থাকলেও তিনি তাদেরকে সাহায্য করে দয়া করেন। অত;এব, আল-লাতীফের সমর্থক অর্থ হলো আল-খাবীর (সম্যক অবগত, সর্বজ্ঞ), আর-রাঊফ (অত্যন্ত স্নেহশীল, সদয়, সমবেদনা প্রকাশকারী, দয়াশীল) ও আল-কারীম (মহা সম্মানিত, মহা দয়ালু)।[210]

তাঁর বান্দা ও অলীর প্রতি তাঁর বিশেষ অনুগ্রহ যে, তিনি যাকে তাঁর ইহসান পূর্ণ করতে চান, তাঁর দয়ায় যাকে শামিল করতে চান এবং তাকে সর্বোচ্চ সুমাহান স্থান তথা জান্নাতে পৌঁছাতে চান তাকে তিনি চলার পথ সহজ করে দেন, কঠিন পথ থেকে তাকে দূরে রাখেন, তার অপছন্দনীয় নানা ধরণের পরীক্ষায় ফেলে কষ্ট দেন; যদিও তার জন্য এতে রয়েছে কল্যাণ, সৌভাগ্যের পথ, যেমনিভাবে তিনি আম্বিয়াদেরকে তাদের জাতির দ্বারা ও তাঁর পথে জিহাদের মাধ্যমে নানা কষ্ট দিয়েছেন। যেমন আল্লাহ ইউসূফ আলাইহিস সালামের ঘটনা উল্লেখ করেছেন। আল্লাহর অনুগ্রহে কীভাবে তাঁর অবস্থা উন্নতি হয়েছিল। আল্লাহ তার জন্য যে অবস্থা নির্ধারিত করেছিলেন তাতে ছিল তার দুনিয়া ও আখিরাতের উত্তম পরিণতি। এমনিভাবে আল্লাহ তাঁর প্রিয় বান্দাহদেরকে তাদের অপছন্দনীয় জিনিস দ্বারা পরীক্ষা করেন, যাতে তারা তাদের পছন্দনীয় জিনিস অর্জন করে। বান্দার উপর আল্লাহর কত অনুগ্রহ ও দয়া রয়েছে যা বিবেক বুঝতেও পারে না এবং কল্পনা শক্তিও তা কল্পনা করতে পারে না। কত বান্দা দুনিয়ার কর্তৃত্ব, নেতৃত্ব বা অন্য কোন প্রিয় জিনিস অর্জনের চেষ্টা করে; কিন্তু আল্লাহ তার উপর রহমত করে সে জিনিস থেকে তাকে দূরে রাখেন যাতে তা তার দীনের ব্যাপারে ক্ষতি করতে না পারে। ফলে বান্দা অজ্ঞতা ও তার রবের সম্পর্কে না জানার কারণে চিন্তিত হয়ে পড়ে। কিন্তু গায়েবে আল্লাহ তার জন্য কী গচ্ছিত করে রেখেছেন সে যদি তা জানত তাহলে অবশ্যই সে এ ব্যাপারে আল্লাহ হামদ ও শুকর আদায় করত। কেননা আল্লাহ তাঁর বান্দার ব্যাপারে অত্যন্ত স্নেহশীল ও দয়ালু এবং তাঁর অলীদের ব্যাপারে অত্যন্ত অনুগ্রহশীল।

হাদীসে দো‘আয় এসেছে,

«اللَّهُمَّ ارْزُقْنِي حُبَّكَ وَحُبَّ مَنْ يَنْفَعُنِي حُبُّهُ عِنْدَكَ، اللَّهُمَّ مَا رَزَقْتَنِي مِمَّا أُحِبُّ فَاجْعَلْهُ قُوَّةً لِي فِيمَا تُحِبُّ، اللَّهُمَّ وَمَا زَوَيْتَ عَنِّي مِمَّا أُحِبُّ فَاجْعَلْهُ فَرَاغًا لِي فِيمَا تُحِبُّ».

“হে আল্লাহ! আমাকে দান করুন আপনার ভালোবাসা এবং তাদের ভালোবাসা যাদের ভালোবাসা আমার উপকারে আসবে যা আপনার কাছে প্রিয়। হে আল্লাহ! আমি যা পছন্দ করি তার যা কিছু আপনি আমাকে দিয়েছেন, তার আপনি যা কিছু পছন্দ করেন তা আমাকে ব্যবহারের শক্তি দিন। আর আমার পছন্দনীয় যা আপনি আমার থেকে সরিয়ে রেখেছেন, এ সরিয়ে রাখাকে আপনি যা ভালোবাসেন তাতে নিয়োজিত থাকার অবকাশ স্বরূপ বানিয়ে দাও।”[211]

হে আল্লাহ আপনার ফয়সালার ব্যাপারে আমাদের উপর অনুগ্রহ করুন, আমাদের জন্য আপনার কুদরতের ব্যাপারে বরকত দান করুন, যাতে আমরা সে সব বিষয় পছন্দ না করি যা আপনি আমাদের ব্যাপারে বিলম্বে লিপিবদ্ধ করেছেন এবং আপনি যা দ্রুত লিখে রেখেছেন তা যেন আমরা বিলম্বে পছন্দ না করি।[212]

জেনে রাখুন, বান্দা তার যবানের দ্বারা ও যবানের অবস্থার দ্বারা আল্লাহর কাছে যে অনুগ্রহ প্রার্থনা করে তা হলো রহমত; বরং তাঁর বিশেষ রহমত কামনা করে। বান্দা অজানা বা উপকরণ জানা ব্যতীত যেসব রহমত প্রাপ্ত হয় তা হলো তাঁর (আল্লাহর) অনুগ্রহ ও দয়া। বান্দা যখন বলে, হে লাতীফ, আমাকে অনুগ্রহ করুন অথবা আপনার লুফত তথা অনুগ্রহ প্রার্থনা করছি তখন এর অর্থ হলো, আমাকে আপনার বিশেষ হিফাযতে রক্ষণাবেক্ষণ করুন যাতে আমার বাহ্যিক ও গোপনীয় সব অবস্থা কল্যাণকর হয়, যাতে আমার বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ সকল ব্যাপারে অকল্যাণকর ও অপছন্দনীয় বিষয় থেকে আমাকে দূরে রাখুন। অত:এব, বান্দার অভ্যন্তরীণ ব্যাপার গুলো তার উপর আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ এবং বাহ্যিক বিষয়গুলোও বান্দার জন্য আল্লাহর অনুগ্রহ। সুতরাং আল্লাহ যখন তাঁর বান্দার উপর সহজ করতে চান, তখন কল্যাণের পথ তার জন্য সহজ করে দেন এবং সে পথে চলতে তাকে সাহায্য করেন। তখন বলা হয় তিনি তাঁর উপর অনুগ্রহ করেছেন। আবার তিনি যখন সে পথে চলার বাহ্যিক উপকরণ নির্দিষ্ট করে দেন যা বান্দার শক্তি ও সামর্থ্যের মধ্যে তখন বুঝবে তিনি তার (বান্দার) উপর অনুগ্রহ করেছেন। এ কারণেই যখন ইউসুফ আলাহিস সালামের শৈশবের সে অবস্থা পরিবর্তন হয়েছিল, তার স্বপ্নে দেখা অবস্থা অনুসারে তার অবস্থা একে একে পরিবর্তন হতেছিল, তার ভাইয়েরা তার সাথে হিংসা করেছিল, তারা তাকে দূরে সরিয়ে দেওয়ার ইচ্ছা করেছিল, বাবার সাথে তাদের বাদানুবাদ, অত:পর (মিসরের) নারীদের দ্বারা তাকে পরীক্ষায় পতিত হওয়া, অত:পর জেলখানায় যাওয়া, অত:পর বাদশার স্বপ্নের ব্যাখ্যা দান করার কারণে সেখান থেকে মুক্তি পাওয়া, তিনি (আল্লাহ) যেভাবে ইচ্ছা করেছেন সেভাবে তাকে জমিনের নেতৃত্ব প্রদান, তার ভাইদের সাথে যেসব পরীক্ষা ও বালা-মুসিবত সংঘটিত হয়েছিল, অত:পর পুনরায় তাদের আনন্দময় একত্রিত হওয়া, তাদের পূর্বের দু:খ-কষ্ট দূরীভূত হওয়া, সকলের সংশোধন হয়ে যাওয়া এবং ইউসুফ আলাইহিস সালামকে আল্লাহ নির্বাচিত করা ইত্যাদি ঘটনার মাধ্যমে আল্লাহর নবী আলাইহিস সালাম বুঝতে পেরেছেন যে, এ সব কিছুই তার জন্য আল্লাহর অনুগ্রহ ও দয়া। তাই তিনি আল্লাহর এ নি‘আমতের কথা স্বীকার করে বললেন,

﴿إِنَّ رَبِّي لَطِيفٞ لِّمَا يَشَآءُۚ إِنَّهُۥ هُوَ ٱلۡعَلِيمُ ٱلۡحَكِيمُ١٠٠﴾ [يوسف: ٩٩]

“নিশ্চয় আমার রব যা ইচ্ছা করেন, তা বাস্তবায়নে তিনি সূক্ষ্মদর্শী। নিশ্চয় তিনি সম্যক জ্ঞানী, প্রজ্ঞাময়।” [সূরা ইউসুফ, আয়াত: ৯৯] অর্থাৎ আল্লাহর অনুগ্রহ তাঁর সেসব বান্দার জন্য খাস যাদেরকে তিনি এ অনুগ্রহ করতে ইচ্ছা করেন, আল্লাহ যাদেরকে এ অনুগ্রহের যোগ্য মনে করেন তাদেরকেই তিনি এ অনুগ্রহ দান করেন। তিনি যোগ্য পাত্র ব্যতীত তাঁর বিশেষ অনুগ্রহ দান করেন না। আল্লাহই অধিক জ্ঞাত কোথায় তাঁর দয়া দান করা দরকার। যখন দেখবে আল্লাহ কোন বান্দার কাজকে সহজ করে দিয়েছেন, তার জন্য কল্যাণের পথ সহজ করে দিয়েছেন, কঠিনতাকে তার অধীনস্ত ও আয়ত্ব করে দিয়েছেন, তার জন্য তাঁর রহমতের দরজা খুলে দিয়েছেন, তার জন্য তাঁর (আল্লাহর) পথ খুলে দিয়েছেন, সে পথে চলার উপকরণ প্রস্তুত করে দিয়েছেন এবং যাবতীয় কঠোরতা ও বাঁধা দূর করে দিয়েছেন তখন বুঝবে যে, তিনি (আল্লাহ) উক্ত বান্দার উপর বিশেষ অনুগ্রহ করেছেন।

মুমিন বান্দার প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহের নিদর্শন যে, তিনি তাঁর অনুগ্রহে তাদের দায়িত্বভার গ্রহণ করেছেন, ফলে তাদেরকে গোমরাহীর অন্ধকার থেকে হিদায়েতের আলোতে নিয়ে এসেছেন, অজ্ঞতা, কুফুরী, বিদ‘আত ও গুনাহের অন্ধকার থেকে ইলম, ঈমা ও আনুগত্যের আলোতে নিয়ে এসেছেন। মুমিনের প্রতি আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ যে, তিনি তাদেরকে নফসে আম্মারার দ্বারা তাদেরকে নিজেদের স্বভাব থেকে ভালো কাজের নির্দেশ দেয় এবং খারাপ কাজ থেকে বিরত রাখতে নির্দেশ দেয়। ফলে তিনি তাদেরকে অন্যায় ও অশ্লীল কাজ থেকে বিরত রাখেন। বান্দা নিজের মনে ফিতনার উপকরণ, গুনাহের দিকে আকর্ষণ ও অন্যায় কাজে প্রবৃত্তির লালসা অনুভব করলে আল্লাহ তাঁর দয়ায় এ সবের বিরুদ্ধে দলিল প্রেরণ করেন, তিনি তাদের অন্তরে ঈমানের নূর প্রজ্বলিত করে দেন, তিনি তাদের প্রতি অনুগ্রহ করেন, ফলে বান্দা এসব খারাপ কাজ সেচ্ছায় প্রশান্তি চিত্তে ছেড়ে দেয়; কেননা তার অন্তর এগুলো ছেড়ে দিতে খুলে যায়।

বান্দার প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহ যে, তিনি তাদেরকে তাঁর ইলম অনুযায়ী তাদের কল্যাণে রিযিক নির্ধারণ করেন, বান্দার ইচ্ছা অনুযায়ী তিনি তাদেরকে রিযিক দান করেন না। কেননা বান্দা হয়ত এমন সব জিনিস কামনা করবে; অথচ অন্যটি এর চেয়েও কল্যাণকর ও তার জন্য অধিক উপকারী। তাই আল্লাহ বান্দার জন্য যেটি বেশি উপকারী ও দরকারী সেটিই নির্ধারণ করেন; যদিও বান্দা তা অপছন্দ করেন। আর এটি বান্দার প্রতি আল্লাহ বিশেষ অনুগ্রহ, দয়া ও ইহসান। আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,

﴿ ٱللَّهُ لَطِيفُۢ بِعِبَادِهِۦ يَرۡزُقُ مَن يَشَآءُۖ وَهُوَ ٱلۡقَوِيُّ ٱلۡعَزِيزُ ١٩ ﴾ [الشورى: ١٩]

“আল্লাহ তাঁর বান্দাদের প্রতি অতি দয়ালু। তিনি যাকে ইচ্ছা রিযিক দান করেন। আর তিনি মহাশক্তিধর, মহাপরাক্রমশালী।” [সূরা আশ-শূরা, আয়াত: ১৯]

﴿وَلَوۡ بَسَطَ ٱللَّهُ ٱلرِّزۡقَ لِعِبَادِهِۦ لَبَغَوۡاْ فِي ٱلۡأَرۡضِ وَلَٰكِن يُنَزِّلُ بِقَدَرٖ مَّا يَشَآءُۚ إِنَّهُۥ بِعِبَادِهِۦ خَبِيرُۢ بَصِيرٞ٢٧﴾ [الشورى: ٢٧]

“আর আল্লাহ যদি তার বান্দাদের জন্য রিযিক প্রশস্ত করে দিতেন, তাহলে তারা জমিনে অবশ্যই বিদ্রোহ করত। কিন্তু তিনি নির্দিষ্ট পরিমাণে যা ইচ্ছা নাযিল করেন। নিশ্চয় তিনি তাঁর বান্দাদের ব্যাপারে পূর্ণ অবগত, সম্যক দ্রষ্টা।” [সূরা আশ-শূরা, আয়াত: ২৭]

আল্লাহর পরম অনুগ্রহের মধ্যে অন্যতম অনুগ্রহ হলো আল্লাহ তার বান্দাদেরকে আদেশ নিষেধের পালনের দ্বারা নানা ধরণের বালা-মুসিবত, পরীক্ষা ও কষ্ট-ক্লেশে পতিত করান, এটি তাদের প্রতি রহমত ও অনুগ্রহ স্বরূপ, তাদেরকে পূর্ণতা ও পরিপূর্ণ নি‘আমত অর্জনের দিকে নিয়ে যায়। আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,

﴿وَعَسَىٰٓ أَن تَكۡرَهُواْ شَيۡ‍ٔٗا وَهُوَ خَيۡرٞ لَّكُمۡۖ وَعَسَىٰٓ أَن تُحِبُّواْ شَيۡ‍ٔٗا وَهُوَ شَرّٞ لَّكُمۡۚ وَٱللَّهُ يَعۡلَمُ وَأَنتُمۡ لَا تَعۡلَمُونَ٢١٦﴾ [البقرة: ٢١٦]

“এবং হতে পারে কোন বিষয় তোমরা অপছন্দ করছ অথচ তা তোমাদের জন্য কল্যাণকর। আর হতে পারে কোন বিষয় তোমরা পছন্দ করছ অথচ তা তোমাদের জন্য অকল্যাণকর। আর আল্লাহ জানেন এবং তোমরা জান না।” [সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ২১৬]

বান্দার ওপর আল্লাহ অনুগ্রহ যে, তিনি তাদেরকে উচ্চ মর্যাদাবান ও উচ্চ স্থানের অধিকারী করেছেন, যা বড় কোন উপকরণ দ্বারা লাভ করা সম্ভব নয়, আর এ স্থান শুধু উচু হিম্মত ও দৃঢ় প্রত্যয়ের অধিকারীগণ লাভ করবে। তিনি শুরু থেকেই তাদের জন্য সম্ভাব্য উপকরণ নির্ধারণ করে দেন যা তাদেরকে ধীরে ধীরে নিম্ন মর্যাদা থেকে উঁচু মর্যাদার অধিকারী করে, তারা সে মর্যাদা লাভের অনুশীলন করতে থাকে এবং সে জাতিয় মর্যাদা লাভের যোগ্যতা অর্জনে সক্ষম হয়। যেমনিভাবে আল্লাহ মূসা, মুহাম্মাদ ও অন্যান্য নবীদেরকে শুরুতে মেষ চড়ানো নির্ধারণ করেন যাতে তারা অবোধ পশু পালন করে ধীরে ধীরে বনী আদমের লালন পালন, তাদেরকে দাওয়াত ও সংশোধন করা ইত্যাদি শিক্ষা লাভ করতে পারেন। এমনিভাবে তিনি তাঁর কতিপয় বান্দাদেরকে কিছু কিছু ইবাদতের স্বাদ আস্বাদন করান, ফলে তারা সে ইবাদত করতে আকর্ষিত ও উৎসাহিত হয়, এরপরে তাদের এমন কিছু যোগ্যতা অর্জিত হয় যা দ্বারা তারা আরো অধিক বড় ও উত্তম ইবাদত ও আনুগত্যের কাজ করতে সক্ষম হয়। তাদের পূর্বের ইচ্ছা দ্বারা এ যোগ্যতা অর্জন হয় নি; বরং আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহে তারা এ ইচ্ছাশক্তি ও পূর্ণ উৎসাহ অর্জনে সক্ষম হয়েছে।

বান্দার ওপর আল্লাহর আরো অনুগ্রহ যে, তিনি বান্দার অভিভাবকত্বের জন্য সংশোধনকারী, জ্ঞানী, ঈমানদার ও কল্যাণের অধিকারী কাউকে নিয়োগ করেন যাতে সে তাদের থেকে আদব-কায়েদা শিক্ষা লাভ করতে পারে, তাদের যোগ্যতা ও সংস্কারে বেড়ে ওঠতে পারে, যেমন আল্লাহ মারইয়াম আলাইহাস সালামকে পরীক্ষা করেছিলেন। আল্লাহ বলেছেন,

﴿فَتَقَبَّلَهَا رَبُّهَا بِقَبُولٍ حَسَنٖ وَأَنۢبَتَهَا نَبَاتًا حَسَنٗا وَكَفَّلَهَا زَكَرِيَّاۖ كُلَّمَا دَخَلَ عَلَيۡهَا زَكَرِيَّا ٱلۡمِحۡرَابَ وَجَدَ عِندَهَا رِزۡقٗا٣٧﴾ [ال عمران: ٣٧]

“অতঃপর তার রব তাকে উত্তমভাবে কবুল করলেন এবং তাকে উত্তমভাবে গড়ে তুললেন। আর তাকে যাকারিয়্যার দায়িত্বে দিলেন। যখনই যাকারিয়্যা তার কাছে তার কক্ষে প্রবেশ করত, তখনই তার নিকট খাদ্যসামগ্রী পেত।” [সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ৩৭] এ ঘটনার শেষ পর্যন্ত…..। এ ধরণের বিশেষ অনুগ্রহের অন্তর্ভুক্ত হলো, কেউ সৎ পিতা-মাতার থেকে জন্ম গ্রহণ করে বেড়ে উঠা বা মুত্তাকী আত্মীয়-স্বজনের কাছে বড় হওয়া বা কল্যাণকর রাষ্ট্রে বড় হওয়া বা সৎলোকের সান্নিধ্য লাভ ও তাদের সংস্পর্শে থাকতে আল্লাহর তাওফিক লাভ করা বা আল্লাহ ওয়ালা আলেমের তারবিয়্যাতে বড় হওয়া ইত্যাদি বান্দার প্রতি মহান আল্লাহর বিশেষ দয়া ও অনুগ্রহ। কেননা বান্দার কল্যাণ ও ভালো কাজ নির্ভর করে অনেক উপকরণের উপর, এসবের মধ্যে অন্যতম; বরং বলতে গেলে এসবে মধ্যে সর্বাধিক উত্তম ও উপকারী উপায় হচ্ছে উপরোক্ত উপায়সমূহ। আল্লাহর এ ধরণের অনুগ্রহের মধ্যে আরো অনুগ্রহ হচ্ছে, কেউ আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা‘আতের মাযহাবের এলাকায় বড় হওয়া। এটি আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ। এমনিভাবে আল্লাহর অনুগ্রহ যে, তিনি যদি তাকে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা‘আত ও মুত্তাকি এমন উস্তাদের ভাগ্যবান করেন যাদের দ্বারা পৃথিবীর জীবিত ও মৃত সব ধরণের মানুষ উপকৃত হয় তাহলে তা আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ। শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ রহ. কে এ উম্মাতের এ শতাব্দিতে পাওয়া, তার ও তার ছাত্রদের দ্বারা উম্মাত অনেক কল্যাণ লাভ, সুদৃঢ় ইলম অর্জন, বিদ‘আতী, শির্ক ও কুফুরীর বিরুদ্ধে জিহাদ, অত:পর তার কিতাবসমূহ সে সময় ছড়িয়ে পড়া ইত্যাদির দ্বারা যারা উপকৃত হয়েছেন তাদের জন্য এটি নিঃসন্দেহে আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ। এগুলো বর্তমানে বিদ্যমান থাকা অনেক কল্যাণকর। তাই সমস্ত প্রশংসা, অনুগ্রহ ও দয়া মহান আল্লাহর।

বান্দার জন্য হালাল রিযিকের ব্যবস্থা ও এতে সন্তুষ্টি থাকা মহান আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ। এতে তার জীবন নির্বাহের উদ্দেশ্য সাধিত হয়ে যায় এবং ইবাদত, ইলম ও আমল ইত্যাদি উদ্দেশ্যে তাকে যে সৃষ্টি করা হয়েছে তাতে বাধা সৃষ্টি করে না; বরং হালাল রিযিক ও স্বল্পে তুষ্টি তাকে এসব কাজে সাহায্য করে, দুনিয়াবী নানা ঝামেলা থেকে তাকে মুক্ত রাখে, তার অন্তরের নানা জল্পনা-কল্পনাতে প্রশান্তি দেয় ও শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সুস্থ থাকে। এটি আল্লাহর অনুগ্রহ যে, বান্দা হয়ত দুনিয়াবী কোন কারণে উচ্চাকাঙ্খা পোষণ করে, সে হয়ত ভাবে এতে তার লক্ষ্য অর্জন হবে; কিন্তু আল্লাহ জানেন যে, এতে তার জন্য রয়েছে ক্ষতি ও অপকারীতা। ফলে তিনি তাকে ও সে জিনিস থেকে আড়াল করে রাখেন, তখন যদিও বান্দা অজ্ঞতা বশত কাজটি অপছন্দ করে; অথচ তার রব তার ওপর অনুগ্রহ করেছেন, যেহেতু তার জন্য অধিক উপকারী নি‘আমতটি অবশিষ্ট রয়েছে এবং আল্লাহ তার থেকে ক্ষতিকর বিষয়টি দূর করে দিয়েছেন। এ কারণেই এ ধরণের ব্যাপারে আল্লাহর ফয়সালায় সন্তুষ্ট থাকা সর্বোচ্চ পর্যায়ের মর্যাদা।

আল্লাহর অনুগ্রহের মধ্যে আরেকটি অনুগ্রহ যে, তিনি যখন কাউকে বড় কোন আনুগত্যের তাওফিক দান করেন- যা সাহায্যকারী ব্যতীত সফল হওয়া যায় না- তখন তিনি তাকে সাহায্যকারীও দান করেন। যেমন মূসা আলাইহিস সালাম বলেছিলেন,

﴿وَٱجۡعَل لِّي وَزِيرٗا مِّنۡ أَهۡلِي ٢٩ هَٰرُونَ أَخِي ٣٠ ٱشۡدُدۡ بِهِۦٓ أَزۡرِي ٣١ وَأَشۡرِكۡهُ فِيٓ أَمۡرِي ٣٢ كَيۡ نُسَبِّحَكَ كَثِيرٗا٣٣﴾ [طه: ٢٩،  ٣٣]

“আর আমার পরিবার থেকে আমার জন্য একজন সাহায্যকারী নির্ধারণ করে দিন। আমার ভাই হারূনকে। তার দ্বারা আমার শক্তি সুদৃঢ় করুন। এবং তাকে আমার কাজে শরীক করুন। যাতে আমরা বেশী করে আপনার তাসবীহ পাঠ করতে পারি।” [সূরা ত্বা-হা, আয়াত: ২৯-৩৩]

এমনিভাবে আল্লাহ ‘ঈসা আলাইহিস সালামকেও সাহায্য করেছিলেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,

﴿وَإِذۡ أَوۡحَيۡتُ إِلَى ٱلۡحَوَارِيِّ‍ۧنَ أَنۡ ءَامِنُواْ بِي وَبِرَسُولِي قَالُوٓاْ ءَامَنَّا وَٱشۡهَدۡ بِأَنَّنَا مُسۡلِمُونَ١١١﴾ [المائ‍دة: ١١١]

“আর যখন আমি হাওয়ারীগণকে এ আদেশ দিয়েছিলাম যে, আমার প্রতি তোমরা ঈমান আন ও আমার রাসূলের প্রতি। তারা বলেছিল, আমরা ঈমান আনলাম এবং আপনি সাক্ষী থাকুন যে, আমরা অবশ্যই মুসলিম।” [সূরা আল-মায়েদা, আয়াত: ১১১]

তিনি সৃষ্টিকুলের সরদার মুহাম্মাদ রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকেও সাহায্য করেছিলেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,

﴿هُوَ ٱلَّذِيٓ أَيَّدَكَ بِنَصۡرِهِۦ وَبِٱلۡمُؤۡمِنِينَ٦٢﴾ [الانفال: ٦٢]

“তিনিই তোমাকে শক্তিশালী করেছেন তাঁর সাহায্য ও মুমিনদের দ্বারা।” [সূরা আল- আনফাল, আয়াত: ৬২] এটি আল্লাহর অনুগ্রহ যা বান্দার শক্তি-সামর্থ্যের বাইরে। আল্লাহর এ ধরণের অনুগ্রহের মধ্যে আরেকটি অনুগ্রহ তার হিদায়েত প্রাপ্ত বান্দাদের প্রতি হিদায়েত দান করা। যেহেতু তিনি যাকে হিদায়েত দান করতে চান তাকে তিনি তা দান করেন এবং তার থেকে তা কবুল করেন। ফলে তার আমলসমূহ বহুগুণে বৃদ্ধি পায়, যা বান্দা শুধু কাজের দ্বারা অর্জন করা সম্ভব নয়; বরং এটির শর্তই হচ্ছে এটি তাদের সাধ্যের বাহিরের বিষয়।

বান্দার ওপর আল্লাহর অনুগ্রহ যে, তিনি তাদেরকে সন্তান-সন্তুতি, ধন-সম্পদ ও স্ত্রী দান করেন, যা দ্বারা সে দুনিয়ায় চক্ষু শীতল করে ও আনন্দ লাভ করে। অত:পর তিনি এসবের কিছু দ্বারা বান্দাকে পরীক্ষা করেন, কিছু তিনি নিয়ে নেন। এ কষ্টে ধৈর্যধারণ করলে এর বিনিময়ে তিনি মহা প্রতিদান দান করেন। বান্দাকে যা দান করা হয়েছে তা তার কাছে অবশিষ্ট থাকার চেয়ে তার থেকে তা নিয়ে যাওয়ার (এতে ধৈর্যধারণ করলে) সাওয়াব অধিক। এ কল্যাণ ও পুরস্কার বান্দার সাধ্যের বাইরে; বরং এটি আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ যে, তিনি এর জন্য উপকরণ নির্ধারিত করে দিয়েছেন এবং এর বিনিময়ে অপরিসীম সাওয়াব ও উত্তম পুরস্কার দান করেন। আল্লাহর অনুগ্রহের আরেকটি হলো, তিনি বান্দাকে বালা-মুসিবত দিয়ে পরীক্ষা করেন এবং তাকে ধৈর্যধারণের শক্তি দিয়ে সাহায্য করেন। ফলে সে ধৈর্যধারণ করতে পারলে এমন সুউচ্চ মর্যাদা লাভ করে যা সে আমলের দ্বারা অর্জন করতে সক্ষম ছিল না। তিনি কারো প্রতি এ পরীক্ষার মাত্রা অধিক দিয়ে থাকেন, যেমন তিনি আইয়ূব আলাইহিস সালামের সাথে করেছেন। তিনি আবার তাকে প্রত্যাশা, রহমত ও মুসিবত দূরীকরণের স্বাদ আস্বাদনের মতো অন্তর দান করেছেন। ফলে তার কষ্ট হালকা হয়েছিল এবং অন্তর শক্তিশালী ছিল। এ কারণেই মুমিনের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহ যে, তিনি তাদের অন্তরে প্রতিদান প্রাপ্তির ধৈর্য দান করেন। ফলে তারা মুসিবতে কষ্ট হালকা অনুভব করেন এবং তারা যে দু:খ-কষ্ট পেয়ে থাকেন তা তাদের রবের সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে হালকা মনে করেন।

বান্দার প্রতি আল্লাহ আরো অনুগ্রহ যে, তিনি দুর্বল মুমিন বান্দাকে নানা বালা-মুসিবতের উপকরণ দিয়ে শাস্তি দান করেন যা তাদের ঈমানকে বৃদ্ধি করে এবং গুনাহ মাফ করে দেয়। এমনিভাবে শক্তিশালী ঈমানদারের ওপর আল্লাহর অনুগ্রহ এভাবে যে, তিনি তাদেরকে নানা বালা-মুসিবত ও পরীক্ষার সম্মুখীন করান এবং সেগুলোর উপর ধৈর্যধারণ করতে ও ও সে কষ্ট সহ্য করতে সাহায্য করেন। এতে তাদের ঈমান বৃদ্ধি পায়, সাওয়াব বহুগুণে বেড়ে যায়। অত:এব, সমস্ত প্রশংসা ও পবিত্রতা সে মহান অনুগ্রহশীল আল্লাহর যিনি বালা-মুসিবত, শাস্তি, দান ও দান করা থেকে বিরত রাখা ইত্যাদির দ্বারা বান্দার প্রতি অনুগ্রহ করেন।

বান্দার ওপর আল্লাহর আরেক ধরণের অনুগ্রহ, তিনি বান্দার ব্যক্তি সত্ত্বাকে সহজ পদ্ধতিতে পূর্ণতায় পৌঁছাতে সাহায্য করেন; কেননা যদি এর বিপরীত সত্ত্বার অস্তিত্ব বিদ্যমান থাকে তাহলে তা তাকে পূর্ণতার সে পথ থেকে দূরে সরিয়ে রাখে। ফলে আল্লাহ বান্দাকে তাঁর কিতাব কুরআন মাজীদ শিক্ষা করতে সহজ করে দেন অথবা এমন একজন শিক্ষক নির্ধারিত করে দের যার দ্বারা তার লক্ষ্যে পৌঁছতে (কুরআন শিখতে) অতি কম সময় লাগে ও সহজেই সেখানে পৌঁছতে পারে। এমনিভাবে তাঁর অনুগ্রহ যে, তিনি বান্দাকে তাঁর ইবাদত করতে সহজ করে দেন এবং প্রতিবন্ধকতা দূর করে দেন।

বান্দার ওপর আল্লাহর আরো অনুগ্রহ যে, তিনি তাদের ওপর অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক নানা ধরণের কাজ-কর্ম, দায়িত্ব, ব্যস্ততা, পরিচালনা ও এর আনুষঙ্গিকতা নির্ধারণ করে করে দিয়েছেন। সেসব দায়িত্ব যদি কিছু সংখ্যক মানুষকে দেওয়া হতো তাহলে তারা উত্তম চরিত্রে, প্রশস্ত হৃদয়ে ও বড় মনে তা পরিচালনা করতে অক্ষম হতো। তিনি তাকে তীক্ষ্মদৃষ্টি ও পূর্ণ পরিচালনা শক্তি দান করেছেন, সে কাজের এতো পরিমাণ ও ধরণ হওয়া সত্ত্বেও বিরক্ত ও অধৈর্য হয় না। বরং আল্লাহ তাকে  সেসব কাজ করতে সাহায্য করেন ও তার প্রতি অনুগ্রহ করেন। তিনি অনুগ্রহ করে তাকে সে কাজগুলো সহজভাবে আঞ্জাম দিতে তার জন্য সহজ উপকরণ ও পদ্ধতি দান করেন। আপনি এ বিষয়টি বিস্তারিতভাবে জানতে চাইলে আমাদের নবী মুহাম্মাদ মুস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দিকে তাকান, তাকে আল্লাহ দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ, সৌভাগ্য ও সফলতার জন্য প্রেরণ করেছেন, তিনি তাকে নিজের পূর্ণতা ও সর্বশ্রেষ্ঠ এ উম্মাতের পরিপূর্ণতার নিমিত্তে প্রেরণ করেছেন। এতদসত্ত্বেও আল্লাহ তাকে তার মহিমান্বিত জীবনের কিছু সময়ে- প্রায় এক তৃতীয়াংশেই তার সে মহান দায়িত্ব পালনের সক্ষমতা দান করেছেন; যদিও তার কাজ ছিল অনেক, ধরণ ছিল নানাবিধ। তিনি এত অল্প সময়ে উম্মাতকে দীন শিক্ষা, দীনের যাবতীয় উসূল ও ফুরু‘ শিক্ষা দেওয়া, উম্মাতের এক বিরাট অংশকে অন্ধকার থেকে আলোর মিছিলে আনতে সক্ষম হওয়া, এতে উম্মাতের সাধারণ ও বিশেষ সকলের জন্য উভয় জাহানের কল্যাণ, উপকার ও সৌভাগ্য অর্জিত হয়েছে, যা উম্মাতের কেউ করতে সক্ষম হবে না।

বান্দার ওপর আল্লাহ আরেকটি অনুগ্রহ যে, তিনি বান্দাকে গুনাহের যেসব কিছু দ্বারা পরীক্ষা করেন তা তিনি তার জন্য রহমত লাভে অসীলা বানান। সুতরাং বান্দা গুনাহে পতিত হলে তিনি তার জন্য তাওবা, তাঁর সমীপে আকুতি-মিনতি, প্রার্থনা, নিজের হীনাতা ও নিচুতা প্রকাশ, নিজের মধ্য থেকে অহংকার দূর করে তাঁর সমীপে ফিরে আসার দরজা খুলে দেন, যা অনেক সময় আনুগত্যের সাওয়াবের চেয়েও উত্তম হয়ে থাকে।

আল্লাহর প্রিয় বান্দার প্রতি তাঁর অনুগ্রহের অন্যতম হচ্ছে, তার অন্তর যখন খারাপ প্রবৃত্তির লালাসায় ঝুঁকে পড়ে তখন তিনি তার অন্তরে আমলনামা বিনষ্ট হয়ে যাওয়ার ভয় সৃষ্টি করে দেন, ফলে সে সম্পূর্ণ ভাবে ক্ষতিকর কাজে ঝুঁকে পড়ে না। এমনিভাবে বান্দার প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহ যে, তিনি তাদের অন্তরে তাঁর নৈকট্যের স্বাদ ও তাঁর আনুগত্যের মধুরতা ঢেলে দিয়েছেন যাতে তারা সম্পূর্ণ ভাবে এ সব কাজে ঝুঁকে পড়ে।

বান্দার ওপর আল-লাতীফ তথা সূক্ষ্মদর্শী, অমায়িক আল্লাহর অনুগ্রহ যে, সে যেসব আমল করে নি; বরং শুধু দৃঢ় নিয়াত করেছিল, সেসব নিয়াতের জন্যও তিনি সাওয়াব দান করেন। বান্দা তাঁর নৈকট্য লাভের জন্য কোন কাজের দৃঢ় নিয়াত করেছিল, কিন্তু কোন কারণে সে কাজটি করতে সক্ষম হয় নি, ফলে আল্লাহ তার নিয়াতের বদৌলতে সে কাজের সাওয়াব দান করেন। সুতরাং লক্ষ্য করুন, বান্দার প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহ কত? তিনিই কাজটি বান্দার অন্তরে ঢেলে দেন, তিনিই তার অন্তরে কাজটি ঘুরিয়ে দেন; অথচ তিনি জানেন যে, বান্দা কাজটি করতে পারবে না। বান্দার প্রতি সকল পন্থায় তাঁর ইহসান পৌঁছাতে তিনি এমনটি করে থাকেন।

বান্দার প্রতি এরচেয়েও বেশি অনুগ্রহ যে, তিনি বান্দার জন্য পূর্বের দৃঢ় নিয়াতকৃত কাজটি ব্যতীত আরেকটি আনুগত্যের কাজ নির্ধারিত করে দেন, যা তার জন্য আরো অধিক সাওয়াবের। ফলে বান্দা পূর্বের আনুগত্যের কাজটি ছেড়ে আরো অধিক আনুগত্যের কাজটি করে যাতে রয়েছে আল্লাহর অধিক সন্তুষ্ট। ফলে তার বর্তমান কাজ ও পূর্বের কাজের নিয়াতের কারণে উভয় সাওয়াব অর্জিত হয়। যেমন, কোন ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের দিকে হিজরত করতে রওয়ানা দিলো, অত:পর মাঝপথে মৃত্যু এসে গেলো, তখন তার হিজরতের সাওয়াব আল্লাহ দান করে দেন; যদিও মাঝপথে মৃত্যু তার (বান্দার) ইখতিয়ারে ছিলো না। এমনিভাবে যে ব্যক্তি আনুগত্যের মর্যাদাপূর্ণ দৃঢ় নিয়াত করে, সে কাজটি করার পরিপক্ক নিয়াত করেছিল, কখনো কখনো আল্লাহ বান্দার অন্তরে নানা ধরণের আনুগত্যের কাজ করার ইচ্ছা ঢেলে দেন। বান্দার পূর্ণ ইচ্ছা রয়েছে যে, সে আলাদা আলাদা ভাবে সেসব ভালো কাজগুলো সম্পন্ন করবে; কিন্তু একত্রে সব কাজ করা তার জন্য সম্ভব হয় না, ফলে আল্লাহ সেসব কাজের মধ্যে তুলনা করার তাওফিক দান করেন যে, কোনটি অধিক উত্তম ও সাওয়াবে। ফলে সে অধিক উত্তম ও সাওয়াবের কাজটি করতে পছন্দ করে; যদিও তার সব কাজ করার দৃঢ় নিয়াত ছিল।

বান্দার প্রতি আল্লাহর এরচেয়েও আরো অধিক দয়া যে, তিনি তাকে গুনাহের নানা উপকরণ দিয়ে সেসব গুনাহর কাজ করতে সক্ষমতা দান করেন, তাকে উক্ত গুনাহের কাজটি করতে পর্যাপ্ত উপায়-উপকরণ দিয়ে থাকেন; অথচ তিনি জানেন যে, বান্দা কাজটি করবে না। তথাপিও উপায়-উপকরণ বিদ্যমান থাকার পরে গুনাহের সে কাজটি ত্যাগ করা অধিক আনুগত্য ও সাওয়াবের কাজ। যেমন তিনি ইউসুফ আলাইহিস সালামের প্রতি নারীর (মিসরের বাদশার স্ত্রীর) কুপ্ররোচনায় দয়া করেছিলেন। কিয়ামতের দিনে যে সাত ধরণের লোক আল্লাহর আরশের ছায়ায় আশ্রয় পাবেন তাদের মধ্যে সে ব্যক্তি যাকে প্রভাবশালী ও সুন্দরী অন্যায় কাজ করতে কুপ্ররোচনা করেছিল; কিন্তু সে তার আহ্বানের জবাবে বলেছিল, আমি রাব্বুল আলামীনকে ভয় করি।[213]

বান্দার প্রতি আল্লাহর দয়া যে, তিনি তাঁর বান্দার থেকে কল্যাণ ও ইহসান নির্ধারণ করে তা অন্য বান্দার দ্বারা সম্পন্ন করান এবং তাকে প্রথম ব্যক্তির জন্য মাধ্যম হিসেবে নির্ধারণ করেন। ফলে সে কল্যাণকর কাজের সাওয়াব প্রথম ও দ্বিতীয় উভয় বান্দাই পেয়ে থাকেন। বান্দার প্রতি আরো অনুগ্রহ যে, তিনি তাদের সম্পদে দ্বারা অন্যের উপকার ও কল্যাণ সাধিত করান। ফলে সে অগণিত হারে সাওয়াব পেতে থাকে। যেমন কেউ তার সম্পদ থেকে বীজ বপন করলে বা চারা রোপন করলে সে খাদ্য থেকে কোন প্রাণী ভক্ষণ করলে আল্লাহ উক্ত সম্পদের মালিককে সাওয়াব দান করেন; যদিও সে তা জানে না। বিশেষ করে সে যদি ভালো নিয়াত করে এবং আল্লাহর সাথে চুক্তিবদ্ধ হয় যে, তার সম্পদ ভালো যে কোন কাজেই ব্যয় হোক সে এর বিনিময়ে সাওয়াব ও তাঁর নৈকট্য তালাশ করে। এমনিভাবে তার যদি পশু থাকে এবং এর দ্বারা আরোহণ, বোঝা বহন ইত্যাদি উপকারী কাজে ব্যবহৃত হয় অথবা ঘর থাকলে তাতে কেউ ক্ষণিকের জন্য হলেও বসবাস করলে অথবা পাত্রের দ্বারা উপকৃত হলে অথবা ঝর্ণা থেকে পানি পান করলে ইত্যাদি, এ ছাড়াও কিতাব দ্বারা শিক্ষা লাভ করে উপকৃত হলে অথবা কুরআন দ্বারা তিলাওয়াত করলে উক্ত জিনিসের মালিক সাওয়াবের অধিকারী হবে। আল্লাহ অতি দয়ালু, মহান।

বান্দার ওপর আল্লাহর আরেকটি বিশেষ দয়া যে, তিনি তার জন্য কল্যাণের এমন সব দরজা খুলে দেন যা সে কল্পনাও করে নি। যদিও এটি তার কম আগ্রহের কারণে নয়; বরং এটি তার অসচেতনতা ও ভুলে যাওয়ার কারণে হয়ে থাকে। তার অন্তরে এ কাজটি করার চাহিদা উদায় হওয়া ব্যতীত সে এটি অনুভব করতে পারে না। সুতরাং তার অন্তরে সে কাজটি করার চাহিদা অনুভব হলে সে আনন্দিত হয় এবং বুঝতে পারে যে, এটি তার মহা মালিক মহান আল্লাহর অনুগ্রহ, তিনিই তাকে এ কাজটি করতে নড়া দিয়েছেন, ফলে তার অন্তর এ দিকে ঝুকেছে, তার চিন্তাশক্তি এ কাজটি করতে স্থির করেছে এবং আল্লাহ যা চান তা বুঝতে পারেন।[214]

আল-মালিক (অধিপতি, মালিক), আল-মানি‘ (প্রতিরোধকারী, রক্ষাকর্তা, নিষেধকারী, বারণকারী), আল-মুবদিয়ু (প্রথম সৃষ্টিকারী, অগ্রণী, প্রথম প্রবর্তক), আল-মুতাকাব্বির (সর্বশ্রেষ্ঠ, গৌরবান্বিত, অহংকারী), আল-মাতীন (সুদৃঢ়, সুস্থির), আল-মুজীব (সাড়া দানকারী, উত্তরদাতা, দো‘আ কবুলকারী)

৭৬– আল-মালিক (অধিপতি, মালিক) [215]: আল-মালিক (الملك)[216], আল-মালিক (المالك)

গ্রন্থকার রহ. বলেছেন, আল-মালিক (الملك), আল-মালিক (المالك): যার রাজত্ব রয়েছে তিনি মালিক তথা অধিপতি গুণে গুণান্বিত। এটি বড়ত্ব, অহংকার, ক্ষমতা, পরিচালনা ইত্যাদি গুণাবলী। সৃষ্টি, আদেশ-নিদেশ ও প্রতিদান প্রদান যার একচ্ছত্র মালিকানা রয়েছে তিনিই আল-মালিক।[217]

ঊর্ধ্বজগত ও নিম্নজগতের সব কিছুর ওপর তাঁর রয়েছে একচ্ছত্র মালিকানা, সবাই তাঁর দাস-দাসী ও তাঁর কাছেই অভাবী ও মুখাপেক্ষী।[218] তিনি আদেশদাতা, নিষেধকারী, সম্মানদানকারী, সম্মান হরণকারী, তিনি যেভাবে ইচ্ছা সেভাবে বান্দার সব কিছু পরিচালনা করেন, তিনি যেভাবে চান সেভাবে তাদের কার্য পরিবর্তন করেন, আসমাউল হুসনার অন্যান্য নামের যে অর্থ রয়েছে তার সবগুলো আল-মালিকের মধ্যে বিদ্যমান, যেমন, আল-আযীয (সর্বশক্তিমান, সর্বাধিক সম্মানিত), আল-জাব্বার (মহাপ্রতাপশালী, অতীব মহিমান্বিত), আল-মুতাকাব্বির (সর্বশ্রেষ্ঠ, গৌরবান্বিত, অহংকারী), আল-হাকাম (মহা বিচারপতি), আল-আদল (ন্যায় বিচাকর), আল-খাফিদ (অবিশ্বাসীদের অপমানকারী), আর-রাফি‘(উন্নীতকারী, উঁচুকারী), আল-মু‘ইয (সম্মান প্রদানকারী), আল-মুযিল (সম্মান হরণকারী), আল-আযীম (মহা মর্যাদাপূর্ণ, অতি বিরাট), আল-জালীল (গৌরবান্বিত), আল-কাবীর (সুমহান, সবচেয়ে বড়), আল-হাসীব (মহা মীমাংসাকারী), আল-মাজীদ (মহিমান্বিত, সম্মানিত), আল-ওয়ালী (সুরক্ষাকারী বন্ধু, অনুগ্রহকারী, অভিভাবক), আল-মুতা‘আলী (সর্বোচ্চ মহিমান্বিত, সুউচ্চ), মালিকুল মুকল (সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী), আল-মুতাসাল্লিত (পরিচালক, শাসক, কর্তৃত্বকারী), আল-জামে‘ (একত্রকারী, ঐক্য সাধনকারী) সহ আসমাউল হুসনার অন্যান্য নামসমূহ আল-মালিকের অন্তর্ভুক্ত।[219]

৭৭– আল-মানি‘ (প্রতিরোধকারী, রক্ষাকর্তা, নিষেধকারী, বারণকারী)[220]: আল-মু‘তী, আল-মানি‘:

গ্রন্থকার রহ. বলেছেন, আল-মু‘তী (দানকারী) ও আল-মানি‘ (প্রতিরোধকারী, রক্ষাকর্তা) পরস্পর বিপরীত অর্থ সম্পন্ন নাম, যার একটির দ্বারা আল্লাহর প্রশংসা করলে অন্যটির দ্বারাও প্রশংসা করা অত্যাবশ্যকীয় হয়ে যায়। কেননা উভয় নাম একত্রে পরিপূর্ণ পূর্ণতা বুঝায়।[221]

অত:এব, তিনি দানকারী আবার তিনি প্রতিরোধকারী ও দান করা থেকে বারণকারী, তিনি যাকে দান করেন তাকে বাধা দেওয়ার কেউ নেই, আবার তিনি যাকে দান করা থেকে বিরত থাকেন তাকে কেউ দান করতে পারে না। অত:এব, সমস্ত কল্যাণ ও উপকারীতা একমাত্র তাঁরই থেকে, তাঁর কাছেই কল্যাণ প্রত্যাশা করা হয়, তিনি তাঁর হিকমত ও রহমত অনুসারে যাকে ইচ্ছা দান করেন আবার যাকে ইচ্ছা দান করা থেকে বারণ করেন।[222]

৭৮- আল-মুবদিয়ু (প্রথম সৃষ্টিকারী, অগ্রণী, প্রথম প্রবর্তক): আল-মুবদিয়ু- আল-মু‘ঈদ (পুনরুত্থানকারী, পুনরুদ্ধারকারী, পুন:প্রতিষ্ঠাকারী)[223]

গ্রন্থকার রহ. বলেছেন, যুজাজ (পৃ. ৫৫), খাত্তাবী তার শানুদ দো‘আয় (পৃ. ৭৯), বায়হাকী তার আসমা ওয়াস সিফাত (পৃ. ৯৫) কিতাবে এবং গাজ্জালী তার আল-মাকসাদুল আসনা শরহি আসমাউল্লাহিল হুসনা (পৃ. ৬৩) কিতাবে এ নামদ্বয় আসমাউল হুসনার অন্তর্ভুক্ত করেছেন। আল-মু‘ঈদ (পুনরুত্থানকারী, পুনরুদ্ধারকারী, পুন:প্রতিষ্ঠাকারী) সম্পর্কে আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,

﴿ وَهُوَ ٱلَّذِي يَبۡدَؤُاْ ٱلۡخَلۡقَ ثُمَّ يُعِيدُهُ٢٧﴾ [الروم: ٢٧]

“আর তিনিই সৃষ্টির সূচনা করেন তারপর তিনিই এর পুনরাবৃত্তি করবেন।” [সূরা আর-রূম, আয়াত: ২৭] তিনিই সৃষ্টির সূচনা করেছেন তাদেরকে পরীক্ষা করার জন্য যাতে তিনি দেখতে পান কারা ভালো কাজ করেন, অত:পর তিনি তাদেরকে পুনরায় সৃষ্টি করবেন যাতে ভালো কাজের উত্তম প্রতিদান এবং খারাপ কাজের নিকৃষ্ট শাস্তি দান করতে পারেন। এমনিভাবে তিনি মাখলুকাতকে স্তরে স্তরে সৃষ্টি করেন অত:পর সর্বদা তাদেরকে পুনরাবৃত্তি করেন।[224]

৭৯- আল-মুতাকাব্বির (সর্বশ্রেষ্ঠ, গৌরবান্বিত, অহংকারী)[225]:

গ্রন্থকার রহ. বলেছেন, আল-মুতাকাব্বির হলেন, যিনি তাঁর সর্বশ্রেষ্ঠত্ব, গৌরব ও অহংকারের কারণে যাবতীয় দোষ-ত্রুটি, কমতি ও ভুল-ভ্রান্তি ইত্যাদি থেকে মুক্ত।[226]

৮০-আল-মাতীন (সুদৃঢ়, সুস্থির)[227]:

৮১-আল-মুজীব (সাড়া দানকারী, উত্তরদাতা, দো‘আ কবুলকারী)[228]:

গ্রন্থকার রহ. বলেছেন, আল্লাহন সুন্দরতম নামসমূহের মধ্যে আরেকটি নাম হলো আল-মুজীব তথা তাঁকে আহ্বানকারীর ডাকে সাড়া দানকারী, তাঁর কাছে প্রার্থনাকারী প্রার্থনা কবুলকারী এবং তাঁর বান্দার ইবাদত কবুলকারী। আল্লাহর সাড়াদান করা দুধরণের:

সাধারণ দো‘আ কবুল করা: তাঁকে যে কেহ ডাকে; ইবাদতে বা প্রার্থনায়- তিনি প্রত্যেকের দো‘আ কবুল করেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,

﴿وَقَالَ رَبُّكُمُ ٱدۡعُونِيٓ أَسۡتَجِبۡ لَكُمۡ٦٠ ﴾ [غافر: ٦٠]

“আর তোমাদের রব বলেছেন, ‘তোমরা আমাকে ডাক, আমি তোমাদের জন্য সাড়া দেব।” [সূরা গাফের, আয়াত: ৬০] অত:এব, বান্দার কোন কিছু চাওয়ার দো‘আ হলো, হে আল্লাহ আমাকে অমুক জিনিসটি দান করুন অথবা হে আল্লাহ আমার থেকে অমুক বিপদ দূর করুন। এ ধরণের দো‘আ আল্লাহর বাধ্য ও অবাধ্য সকল বান্দার থেকেই হয়ে থাকে এবং তিনি তাদের চাহিদা মোতাবেক ও তাঁর হিকমত অনুসারে সকলের দো‘আ কবুল করেন। এভাবে দো‘আ কবুল করা পাপী ও  পূণ্যবান সকলের জন্য আল্লাহর ব্যাপক দয়া ও সর্বব্যাপ্তি ইহসানের প্রমাণ। শুধু দো‘আকারী উত্তম অবস্থার উপর ভিত্তি করে দো‘আ কবুল হওয়া প্রমাণ করে না; বরং দো‘আটি ব্যক্তির সত্যতা ও সত্যকাজে সহায়ক হওয়া অত্যাবশ্যকীয়। যেমন আল্লাহ নবীদের দো‘আ, তাদের জাতির জন্য দো‘আ ও জাতির বিরুদ্ধে বদদো‘আ কবুল করেছেন। কেননা এতে তাদের আনিত যাবতীয় সংবাদের সত্যতা ও তাদের বরের কাছে তাদের সম্মান-মর্যাদা প্রমাণ করে। এ কারণেই রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে সব দো‘আ করেছেন তা মুসলিমগণ ও অন্যরা কবুল হওয়া প্রত্যক্ষ করেছেন। আর এটি তার নবুওয়াত ও তার সত্যতার প্রমাণ। এছাড়া অনেক অলীদের দো‘আ কবুল হওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়ে থাকে, এটি তাদের কারামত।

আর বিশেষ দো‘আ কবুল[229] হওয়ার জন্য রয়েছে বেশ কিছু উপায়। সেগুলোর মধ্য অন্যতম হলো, একান্ত অসহয় অভাবী মানুষের দো‘আ যখন সে কঠিন বিপদ ও বালা-মুসিবতে পতিত হয়, তখন সে দো‘আ করলে আল্লাহ তা কবুল করেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,

﴿أَمَّنْ يُجِيبُ الْمُضْطَرَّ إِذَا دَعَاهُ ﴾ [النمل: 62]

“বরং তিনি, যিনি নিরুপায়ের আহ্বানে সাড়া দেন।” [সূরা আন-নামাল, আয়াত: ৬২] এ ধরণের লোকদের দো‘আ কবুল হওয়ার কারণ হলো আল্লাহর কাছে তাদের অসহয়ত্ব, নিরুপায়ত্ব, তাঁর কাছে ভেঙ্গে পড়া ও  সৃষ্টিকুলের সাথে সম্পর্কচ্ছেদ করে তাঁর কাছেই চাওয়া ইত্যাদি। যেহেতু সৃষ্টিকুলের প্রতি তাদের অভাব অনুযায়ী আল্লাহর রহমত ব্যাপক, তাহলে যে ব্যক্তি তাঁর কাছে নিরুপায় হয়ে দো‘আ করে তার অবস্থা কেমন হবে? (অর্থাৎ তার দো‘আ কবুল হওয়া অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত)। দো‘আ কবুলের আরো কারণ হচ্ছে, দীর্ঘ সফল করা, আল্লাহর প্রিয় নামসমূহ, সিফাতসমূহ ও তাঁর গুণাবলীর উসিলায় তাঁর কাছে দো‘আ করা। এমনিভাবে অসুস্থ ব্যক্তির দো‘আ, মাযলুমের দো‘আ, সায়িমের দো‘আ, সন্তানের জন্য পিতামাতার দো‘আ অথবা দো‘আ কবুল হওয়ার আরো কিছু নির্দিষ্ট সময় ও অবস্থা রয়েছে, যে সময় ও অবস্থায় দো‘আ করলে আল্লাহ তাদের দো‘আ কবুল করেন।[230]

আল-মাজীদ (মহিমান্বিত, সম্মানিত), আল-মুহীত (পরিবেষ্টনকারী, সর্ব বেষ্টনকারী), আল-মুযিল (সম্মান হরণকারী), আল-মুসাওয়ির (আকৃতিদানকারী), আল-মু‘ইজ (সম্মান প্রদানকারী), আল-মু‘তী (দানকারী), আল-মু‘ঈদ (পুনরুত্থানকারী, পুনরুদ্ধারকারী, পুন:প্রতিষ্ঠাকারী), আল-মুগনী (সমৃদ্ধকারী, উদ্ধারকারী), আল-মুগীস (সাহায্যকারী)

৮২- আল-মাজীদ (মহিমান্বিত, সম্মানিত)[231]:

গ্রন্থকার রহ. বলেছেন, যার রয়েছে মহা সম্মান ও মর্যাদা তিনি আল-মাজীদ। এটি আল্লাহর মহাগুণ। তাঁর সবগুণই মহান। যেমন তিনি আল-আলীম অর্থাৎ তাঁর রয়েছে পূর্ণ ইলম। আবার তিনি আর-রাহীম, তাঁর রহমত সব কিছুতে ব্যাপ্ত। তিনি আল-কাদীর, কেউ তাঁকে অক্ষম করতে পারে না। তিনি আল-হালীম, তাঁর রয়েছে পরিপূর্ণ ধৈর্য। তিনি আল-হাকীম, তিনি তাঁর হিকমতে পরিপূর্ণ হাকীম। এভাবে তাঁর প্রতিটি নাম-ই পরিপূর্ণ মহান গুণ।[232]

৮৩- আল-মুহীত (পরিবেষ্টনকারী, সর্ব বেষ্টনকারী)[233]:

গ্রন্থকার রহ. বলেছেন, আল-মুহীত তথা তিনি ইলম, কুদরত, রহমত ও ক্ষমতায় সব কিছু পরিবেষ্টনকারী।[234]

৮৪- আল-মুযিল (সম্মান হরণকারী)[235]: আল-মু‘ইজ (সম্মান প্রদানকারী), আল-মুযিল (সম্মান হরণকারী)।

৮৫- আল-মুসাওয়ির (আকৃতিদানকারী)[236]:

৮৬- আল-মু‘ইজ (সম্মান প্রদানকারী)[237]: আল-মুযিল (সম্মান হরণকারী), আল-মু‘ইজ (সম্মান প্রদানকারী)।

৮৭-আল-মু‘তী (দানকারী)[238]:

৮৮- আল-মু‘ঈদ (পুনরুত্থানকারী, পুনরুদ্ধারকারী, পুন:প্রতিষ্ঠাকারী)[239]:

৮৯-আল-মুগনী (সমৃদ্ধকারী, উদ্ধারকারী)[240]:

৯০- আল-মুগীস (সাহায্যকারী, বিপদে রক্ষাকারী)[241]:

গ্রন্থকার রহ. বলেছেন, আল্লাহর নামসমূহের মধ্যে আরেকটি নাম হলো, আল-মুগীস (সাহায্যকারী), তিনি কঠিন বিপদাপদ ও বালা-মুসিবত থেকে রক্ষা করেন, সাহায্য করেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,

﴿قُلۡ مَن يُنَجِّيكُم مِّن ظُلُمَٰتِ ٱلۡبَرِّ وَٱلۡبَحۡر٦٣﴾ [الانعام: ٦٣]

“বলুন, কে তোমাদেরকে নাজাত দেন স্থল ও সমুদ্রের যাবতীয় অন্ধকার থেকে?” [সূরা আল-আন‘আম, আয়াত: ৬৩][242] অত:এব, আল-মুগীস কঠিন বিপদাপদ ও বালা-মুসিবতের সাথে সম্পৃক্ত। তিনি সমস্ত সৃষ্টিকে বালা-মুসিবত ও কঠিন সময়ে সাহায্যকারী এবং তাদেরকে সে বিপদ থেকে উদ্ধারকারী। তিনি ক্ষুধার্তকে খাদ্য দেন, বস্ত্রহীনকে বস্ত্র দেন, মুসিবতে পতিত ব্যক্তিকে রক্ষা করেন, প্রয়োজন ও অভাবের সময় তাদের প্রতি সাহায্য প্রেরণ করেন। এমনিভাবে তিনি অসহয়, কঠিন অবস্থা ও নিরুপয়ের ডাকে সাড়া দেন। কেউ তাঁর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করলে তিনি তাকে সাহায্য করেন। কুরআন ও হাদীসে বিপদ আপদে সম্মুখীন, বালা-মুসিবত দূর করা ও কঠিনতাকে সহজ করার ব্যাপারে অসংখ্য আয়াত ও হাদীস বর্ণিত আছে। [243]

আল-মুকাদ্দিম (সর্বাগ্রে সহায়তা প্রদানকারী), আল-মুকীত (সংরক্ষণকারী, লালনপালনকারী), আল-মালিক (অধিপতি, মালিক), আল-মুহাইমিন (রক্ষক, অভিভাবক, প্রতিপালনকারী), আল-মু’আখখির (বিলম্বকারী), আল-মু’মিন (নিরাপত্তাদানকারী, জামিনদার, সত্য ঘোষণাকারী)

৯১- আল-মুকাদ্দিম: আল-মুকাদ্দিম (সর্বাগ্রে সহায়তা প্রদানকারী), আল-মু’আখখির (বিলম্বকারী)[244]

গ্রন্থকার রহ. বলেছেন, আল-মুকাদ্দিম (সর্বাগ্রে সহায়তা প্রদানকারী) ও আল-মু’আখখির (বিলম্বকারী) আল্লাহ তা‘আলার পরস্পর বিপরীত অর্থবোধক জোড়া নাম, যা আলাদাভাবে একটি ব্যবহার করা যায় না; বরং একটি বললে আরেকটিও উল্লেখ করা অত্যাবশ্যকীয়। কেননা উভয় নাম একত্রে উল্লেখ করার মধ্যেই পূর্ণতা রয়েছে। তিনি তাঁর হিকমত অনুসারে কাউকে আগে সহায়তা দান করেন আবার কাউকে বিলম্বে সাহায্য দান করেন।

এভাবে বিশ্ব পরিচালনার ব্যাপারে অগ্র ও পশ্চাত হতে পারে। যেমন মাখলুকাতের কাউকে অন্যের আগে পৃথিবীতে প্রেরণ করা, আসবাব তথা কারণসমূহকে মুসাববাব তথা কারণকৃতের আগে, শর্তকে তার মাশরূত তথা শর্তকৃতের আগের সংঘটিত করা ইত্যাদি।

সৃষ্টিজগতের মধ্যে অগ্র ও পশ্চাতের (মর্যাদার) প্রকারভেদ বহুরূপ, সীমাহীন। এ মর্যাদা শর‘ঈ ব্যাপারে হতে পারে, যেমন নবীদেরকে সৃষ্টিকুলের উপরে মর্যদা দেওয়া, তাদের কাউকে আবার অন্য নবীদের উপর মর্যাদাবান করা, তাঁর কিছু বান্দাকে অন্য বান্দার উপর মর্যাদাবান করা, ইলম, ঈমান, আমল, আখলাক ও অন্যান্য গুণাবলী সম্পন্নকে অন্যের উপরে মর্যাদা দেওয়া। তিনি যাকে ইচ্ছা তাকে মর্যাদায় পিছিয়ে রেখেছেন। এসব কিছুই তাঁর হিকমত অনুসারে হয়ে থাকে। এগুণ দুটি ও এ ধরণের অন্যান্য গুণাবলী তাঁর (আল্লাহর) যাতী গুণ; কেননা এ ধরণের গুণ সর্বদা তাঁর রয়েছে, তিনি এ গুণে গুণান্বিত। এটি তাঁর কর্মের সিফাতও; কেননা শ্রেষ্ঠত্ব ও মর্যাদায় আগে পরে করা সৃষ্টিকুলের যাত, কর্ম, অর্থ ও গুণাবলীর সাথে সম্পৃক্ত। এগুলো আল্লাহর ইচ্ছা ও কুদরতে সৃষ্ট হয়। এটি আল্লাহর গুণাবলীর সহীহ প্রকারভেদ। কেননা যাতী সিফাত যাতের সাথে সম্পৃক্ত এবং কর্মের সিফাত কর্মের সাথে সম্পৃক্ত।[245]

৯২- আল-মুকীত (সংরক্ষণকারী, লালনপালনকারী)[246]:

গ্রন্থকার শাইখ আস-সা‘দী রহ. বলেছেন, আল-মুকীত হলেন, যিনি সমস্ত সৃষ্টিজীবের জীবন নির্বাহের জীবিকা (আহার) পৌঁছে দেন, তাদের কাছে রিযিক পৌঁছে দেন এবং তাঁর হিকমত ও প্রশংসা অনুযায়ী যেভাবে ইচ্ছা সেভাবে তা পরিবর্তন করেন।[247]

৯৩- আল-মালিক (অধিপতি, মালিক)[248]:

৯৪- আল-মুহাইমিন (রক্ষক, অভিভাবক, প্রতিপালনকারী)[249]:

গ্রন্থকার রহ. বলেছেন, আল-মুহাইমিন হলেন, যিনি যাবতীয় ক্ষুদ্রতম বিষয় ও অন্তরের সব কিছু অবগত, তিনি তাঁর ইলমের দ্বারা সব কিছু বেষ্টন করে রেখেছেন।[250]

৯৫- আল-মু’আখখির: আল-মুকাদ্দিম (সর্বাগ্রে সহায়তা প্রদানকারী), আল-মু’আখখির (বিলম্বকারী)।[251]

৯৬- আল-মু’মিন (নিরাপত্তাদানকারী, জামিনদার, সত্য ঘোষণাকারী)[252]:

গ্রন্থকার রহ. বলেছেন, আল-মু’মিন হলেন, যিনি তাঁর নিজের পরিপূর্ণ সিফাতের, পূর্নঙ্গ ক্ষমতা ও সৌন্দর্যের প্রশংসা করেছেন, যিনি তাঁর রাসূলগণকে ও তাঁর কিতাবসমূহকে নিদর্শন, দলিল-প্রমাণ ও রাসূলদের সত্যতার প্রমাণস্বরূপ প্রেরণ করেছেন, যা তাদের সত্যতা ও তাদের আনিত কিতাবের বিশুদ্ধতা প্রমাণ করে।[253]

আন-নাফি‘ (অনুগ্রাহক, উপকারকারী, হিতকারী), আন-নূর (আলোক), আল-হাদী (হিদায়েতকারী, পথপ্রদর্শক), আল-ওয়াহিদ (এক), আল-ওয়াসি‘ (অসীম, ব্যাপক), আল-ওয়াদূদ (প্রেমময়, পরম স্নেহশীল)

৯৭- আন-নাফি‘[254]:

আন-নাফি‘ (অনুগ্রাহক, উপকারকারী, হিতকারী), আদ-দার (যন্ত্রণাদানকারী, উৎপীড়নকারী)।

৯৮- আন-নূর (আলোক)[255]:

গ্রন্থকার রহ. বলেছেন, আল্লাহর সুন্দর নামসমূহের মধ্যে আরেকটি নাম হলো আন-নূর। এ নামটি আল্লাহর বড় গুণ, সুন্দরতম নাম ও পরিপূর্ণ সিফাত। আল্লাহর রহমত, হামদ ও হিকমতের পূর্ণ গুণ রয়েছে। তিনি আসমান ও জমিনের নূর[256], যিনি আরেফীনদের (তাঁর পরিচয় লাভকারী) অন্তর তাঁর পরিচয় ও ঈমানের দ্বারা আলোকিত করেন। তিনি তাদের অন্তরসমূহকে হিদায়েতের দ্বারা আলোকিত করেন। তিনি আসমান ও জমিনকে স্থাপিত আলোর দ্বারা আলোকিত করেন। তাঁর হিজাব তথা পর্দা নূর, যদি তা প্রকাশ পায় তাহলে দৃষ্টি সীমার যতদূর তাঁর দৃষ্টি যায় ততদূর তাঁর নূরে জ্বলে-পুড়ে যাবে। [257] তাঁর নূরের দ্বারাই জান্নাতুন না‘ঈম আলোকিত হয়েছে। তাঁর সিফাতের নূর হলো তাঁর অনেক বড় গুণ। অন্যদিকে সৃষ্টিকুলের মধ্যকার নূর দু প্রকার:

প্রথমত: বাহ্যিক নূর, যেমন সূর্য, চাঁদ, তারকারাজি ও অন্যান্য সৃষ্টিজগতের দৃষ্টির অনুভূত নূর।

দ্বিতীয়ত: অপ্রকাশ্য বা উহ্য নূর। আর তা হলো জ্ঞান, ঈমান ও আনুগত্যের নূর। আল্লাহর প্রকৃত পরিচয় লাভ, ঈমানের বিশুদ্ধতা, আনুগত্যের স্বাদ ও ভালোবাসার আনন্দের মাত্রা অনুযায়ী মুমিনের অন্তরে রয়েছে নূর। এ ধরণের নূর ব্যক্তিকে গুনাহের কাজ থেকে বিরত রাখে, কল্যাণের কাজে আকর্ষিত করে এবং আল্লাহর পূর্ণ ইখলাসের দিকে আহ্বান করে। এ কারণেই রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দো‘আ ছিল:

«اللهُمَّ اجْعَلْ فِي قَلْبِي نُورًا، وَفِي سَمْعِي نُورًا، وَفِي بَصَرِي نُورًا، وَعَنْ يَمِينِي نُورًا، وَعَنْ شِمَالِي نُورًا، وَأَمَامِي نُورًا، وَخَلْفِي نُورًا، وَفَوْقِي نُورًا، وَتَحْتِي نُورًا، وَاجْعَلْ لِي نُورًا» ، أَوْ قَالَ: «وَاجْعَلْنِي نُورًا».

“হে আল্লাহ, আমার ক্বলবে (অন্তরে) নূর দান করুন, আমার আমার কানে নূর, আমার চোখে নূর, আমার ডানে নূর, আমার বামে নূর, আমার সামনে নূর, আমার পিছনে নূর, আমার উপরে নূর, আমার নিচে নূর দান করুন। আমাকে নূর দান করুন। অথবা তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, হে আল্লাহ, আমাকে নূর দিয়ে দিন।”[258]

আল্লাহ প্রদত্ত বান্দাকে দেওয়া এ নূর তাঁর পক্ষ থেকে অনেক বড় অনুগ্রহ ও কল্যাণ। এ নূর যতোই শক্তিশালী হোক তা আল্লাহর সৃষ্টি। অত:এব, সাবধান! আপনার দূরদৃষ্টি যেন দুর্বল না হয়, সত্য-মিথ্যার পার্থক্য ও ইলমের স্বল্পতা যেন আপনাকে দুর্বল না করে যে, এ নূর স্বয়ং নূর ও অন্তরে আল্লাহর যাতের নূরের মুশাহাদা; বরং এ নূর হলো জ্ঞানের নূর, ঈমানের নূর। কিছু সুফী এখানে পরীক্ষায় পতিত হয়ে যায়, নূরের ব্যাপারে তাদের মধ্যে এমন কিছু ভ্রান্ত ধারণা জন্ম নেয় যা ইলম ও ঈমানের সাথে সাংঘর্ষিক, বিপরীত। যেমন শুষ্ক স্বভাবের লোকদের গোমরাহীর অন্ধকার ও অসচেতনতা এতোই বেশি যে, তারা এ নূর থেকে কিছুই পায় না; বরং কখনো কখনো তাদের বোকামী ও অজ্ঞতার কারণে তাদের এ ধরণের অবস্থা ও যুহুদ আরো বৃদ্ধি পায়। অত:এব, কুরআন, সুন্নাহ ও আল্লাহর নামসমূহ ও তাঁর সিফাতসমূহের সঠিক জ্ঞানের দ্বারা আল্লাহ যখন কোন বান্দাকে দয়া ও অনুগ্রহ করেন, এর দ্বারা সে আল্লাহর ইবাদত করে, ইহসানের দরজার পৌঁছতে সে প্রচেষ্টা করে, তখন সে আল্লাহর ইবাদত এমনভাবে করে যে, সে যেন তাঁকে দেখছে, আর যদি সে তাঁকে (আল্লাহ) নাও দেখতে পায় তাহলে তিনি তাকে (বান্দাকে) দেখছেন। সে সর্বদা আল্লাহর যিকিরে জিহ্বা ভিজে রাখে, তার অন্তর আলোকিত হয়, জ্ঞানের স্বাদ অর্জিত হয়, ঈমানের স্বাদ সবচেয়ে উত্তম স্বাদ যা সে পেয়ে থাকে। এটি আল্লাহর অনুগ্রহ, তিনি যাকে ইচ্ছা তাকে দান করেন। তিনি অনুগ্রহশীল ও মহান।[259]

মুমিন যখন ঈমানে পরিপূর্ণ হয় তখন আল্লাহ তার অন্তরকে আলোকিত করে দেন, তখন তার কাছে সব কিছুর হাকীকত স্পষ্ট হয়ে যায়, সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য তার কাছে স্পষ্ট হয়ে যায়, এ নূর তখন তার জীবনের উপাদান হয়ে, ইলম ও আমলের সমন্বয়ে কল্যাণের উপর তাকে শক্তিশালী করে তোলে। ইলম ও ইয়াকীন এবং গাফেলাতি ও অন্ধকারের দ্বিধা-সংশয় তার কাছে স্পষ্ট হয়ে যায়। তখন তার অন্তরে থাকে নূর, তার কথায় নূর, তার ইলমে নূর, তার চারিদিকে শুধু নূর আর নূর।

কাফির বা মুনাফিক বা বিরোধকারী বা বিরোধকারী গাফিল সকলেই অন্ধকারে হাবুডুবু খায়, তাদের কাছে অন্ধকারের যত উপকরণ থাকবে তাতে তত হাবুডুবু খাবে। একমাত্র আল্লাহই তাওফিকদাতা।[260]

৯৯- আল-হাদী (হিদায়েতকারী, পথপ্রদর্শক)[261]:

গ্রন্থকার রহ. বলেছেন, আল-হাদী হলেন, যিনি বান্দাকে যাবতীয় কল্যাণের দিকে ও ক্ষতিকর জিনিস থেকে বিরত রাখতে হিদায়েত ও পথপ্রদর্শন করেন, তারা যা জানে না তা তাদেরকে শিক্ষা দেন, তাওফিক ও ভুল-ভ্রান্তি থেকে বেঁচে থাকতে পথপ্রদর্শন করেন, তাদেরকে তাকওয়া ইলহাম করেন এবং তাদের অন্তরকে তাঁর দিকে ঝুঁকতে ও তাঁর আদেশ মান্য করতে হিদায়েত দান করেন।[262]

১০০- আল-ওয়াহিদ (এক)[263]:

১০১- আল-ওয়াসি‘ (অসীম, ব্যাপক)[264]:

গ্রন্থকার রহ. বলেছেন, আল-ওয়াসি‘ হলেন, যিনি সিফাত, গুণাবলী ও এর সম্পৃক্ত সবকিছুতে এতোই প্রশস্ত ও ব্যাপক যে, কেউ তার প্রশংসা গণনা করতে সক্ষম হবে না; বরং তিনি নিজের প্রশংসা নিজে যেভাবে করেছেন তিনি সে রকমই, তিনি বড়ত্বে, ক্ষমতায়, মালিকানায়, দয়া, ইহসানে অসীম,  প্রশস্ত। তিনি দয়া ও দানশীলতায় মহান।[265]

 

১০২- আল-ওয়াদূদ (প্রেমময়, পরম স্নেহশীল)[266]:

গ্রন্থকার রহ. বলেছেন, আল-ওয়াদূদ হলেন ভালোবাসাকারী ও ভালোবাসিত অর্থাৎ প্রেমকারী, প্রেমময় ও প্রেমকৃত।[267] তিনি তাঁর নবী, রাসূল ও তাদের অনুসারীদেরকে ভালোবাসেন, আবার তারাও তাঁকে ভালোবাসেন। তিনি তাদের কাছে সর্বাধিক প্রিয়। তাদের অন্তরসমূহ তাঁর ভালোবাসায় পূর্ণ, তাদের যবান তাঁর প্রশংসায় মত্ত, সব দিক থেকে তাঁর ভালোবাসা পাওয়া, ইখলাস ও নৈকট্য লাভে তাদের অন্তর সর্বদা আকর্ষণ করে।[268] আল্লাহর নির্বাচিত প্রিয় বান্দাদের তাঁর প্রতি ভালোবাসা অন্যের ভালোবাসার সাথে বাস্তবতা, ধরণগত ও এর সম্পৃক্ততার দিক থেকে কোন ভাবেই তুলনা করা চলে না। আল্লাহর ভালোবাসা বান্দার অন্তরে থাকা ফরজ, তাঁর ভালোবাসা সব কিছুর ঊর্ধ্বে ও অগ্রগণ্য এবং অন্যদের ভালোবাসা তাঁর ভালোবাসার অনুগামী হতে হবে।

আল্লাহর ভালোবাসা সমস্ত কাজের মূল, সব বাহ্যিক ও গোপন ইবাদত তাঁর ভালোবাসা থেকেই উৎপত্তি। রবের প্রতি বান্দার ভালোবাসা তার রবের অশেষ দয়া ও ইহসান, যা বান্দার সাধ্যে ও শক্তির বাইরে। তিনিই বান্দাকে তাঁকে ভালোবাসতে তাওফিক দেন, ফলে তিনি বান্দার অন্তরে ভালোবাসা ঢেলে দেন, অত:পর বান্দা যখন তাঁর তাওফিকে তাঁকে ভালোবাসেন তখন তিনি তাদেরকে আরেকটি ভালোবাসার পুরস্কার দান করেন। এটি প্রকৃতপক্ষে বান্দার প্রতি আল্লাহর একান্ত ইহসান। কেননা তাঁর থেকেই ভালোবাসার কারণ এবং তাঁর থেকেই ভালোবাসার উপাদান। এখানে আরেকটি ভালোবাসা তাঁর ভালোবাসার সাথে সাংঘর্ষিক নয়; বরং এটি তাঁর শুকরকারী বান্দাদের শুকরিয়ার কারণে তাদের প্রতি তাঁর ভালোবাসা। অত:এব, যাবতীয় কল্যাণ বান্দার দিকেই ফিরে। আল্লাহ মুমিনের অন্তরে ভালোবাসা ঢেলে দেন, অত:পর তিনিই তা তাদের অন্তরে লালনপালন করে বৃদ্ধি করেন, এমনকি তা তাঁর নির্বাচিত প্রিয় বান্দাদের অন্তরে এমন এক অবস্থার সৃষ্টি করে যে, তাদের কাছে তিনি ব্যতীত অন্যের ভালোবাসা ক্রমশ: কমতে থাকে, প্রিয়জনদের থেকে শান্তনা পায়, তাদের কাছে দুনিয়ার যাবতীয় বালা-মুসিবত তুচ্ছ মনে হয়, আনুগত্য ও ইবাদতের কষ্ট তাদের কাছে সুখকর মনে হয়, তাদের নানা ধরণের কারামত দেখা যায়, এর সর্বোচ্চ কারামত হলো আল্লাহর ভালোবাসা অর্জন, তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনে সফলতা এবং তাঁর  নৈকট্য লাভে তাঁর কোমলতা অর্জন। অত:এব, বান্দা তার রবকে ভালোবাসলে সে তার রবের দুটি ভালোবাসায় সিক্ত হয়। তার রবের ভালোবাসা তাকে তার রবের প্রিয়জন বানায় এবং আল্লাহর ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে তাঁর শুকরিয়া স্বরূপ তাঁকে ভালোবাসলে তখন সে তাঁর নির্বাচিত মুখলিস বান্দা হয়ে যায়। বান্দা তার রবের ভালোবাসা অর্জনের সর্বোত্তম পন্থা হলো, বেশি পরিমাণে তাঁর যিকির করা, তাঁর প্রশংসা করা, তাঁর কাছে বেশি বেশি ফিরে আসা, প্রার্থনা করা, তাঁর উপর তাওয়াক্কুল করা, ফরয ও নফলের মাধ্যমে তাঁর নৈকট্য লাভ করা, কথা ও কাজে তাঁর ইখলাস অর্জন করা এবং প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য সর্বাবস্থায় রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অনুসরণ করা। আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,

﴿قُلۡ إِن كُنتُمۡ تُحِبُّونَ ٱللَّهَ فَٱتَّبِعُونِي يُحۡبِبۡكُمُ ٱللَّهُ٣١﴾ [ال عمران: ٣١]

“বলুন, যদি তোমরা আল্লাহকে ভালোবাস, তাহলে আমার অনুসরণ কর, আল্লাহ তোমাদেরকে ভালবাসবেন।” [সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ৩১] [269]

 

আল-ওয়াকীল (তত্ত্বাবধায়ক), আল-ওয়াহহাব (দানশীল, স্থাপনাকারী)

১০৩- আল-ওয়াকীল (তত্ত্বাবধায়ক, সহায় প্রদানকারী, আস্থাভাজন উকিল)[270]:

গ্রন্থকার রহ. বলেছেন, আল-ওয়াকিল হলেন যিনি সৃষ্টিকুলকে তাঁর ইলম, পূর্ণ কুদরত ও ব্যাপক হিকমত অনুসারে পরিচালনা করেন ও তত্ত্বাবধায়ন করেন। তিনি তাঁর প্রিয় বান্দাদের অভিভাবক, তাদেরকে তিনি সহজ করেন, কঠোরতা পরিহার করেন এবং তিনি তাদের জন্য সব কাজে যথেষ্ট। সুতরাং যে ব্যক্তি আল্লাহকে অভিভাবক বানাবে তার জন্য তিনিই যথেষ্ট। আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,

﴿ ٱللَّهُ وَلِيُّ ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ يُخۡرِجُهُم مِّنَ ٱلظُّلُمَٰتِ إِلَى ٱلنُّورِ٢٥٧﴾ [البقرة: ٢٥٧]

“যারা ঈমান এনেছে আল্লাহ তাদের অভিভাবক, তিনি তাদেরকে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে বের করে আনেন।” [সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ২৫৭]

১০৪- আল-ওয়াহহাব (দানশীল, স্থাপনাকারী)[271]:

 

 

 

উপসংহার

সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর যার প্রশংসায় যাবতীয় ভালো কাজ সম্পন্ন হয়। তাঁর তাওফিকের জন্য প্রশংসা করছি, তাঁর জন্য সমস্ত উত্তম প্রশংসা যার প্রশংসা গুণে শেষ করা যাবে না, তিনি তো তেমনই যেমনি ভাবে তিনি নিজের প্রশংসা নিজে করেছেন। নবী ও রাসূলদের মধ্যে সর্বোত্তম, আমাদের নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, তাঁর পরিবারবর্গ ও সকল সাহাবীদের প্রতি দরুদ ও সালাম।

অত:পর,

এ গবেষণা বইটি –আমার সাধ্যানুযায়ী- স্পষ্ট ও সহজ ভাষায় লেখার আপ্রাণ চেষ্টা করেছি। এতে আল্লাহর সুন্দর নামসমূহের ব্যাখ্যায় শাইখ আব্দুর রহমান আস-সা‘দী রহ. এর অবদান গুরুত্বের সাথে উল্লেখ করার চেষ্টা করেছি। আমার কাছে মনে হচ্ছে, তিনি আল্লাহর নামসমূহ ও সিফাতসমূহর বর্ণনায় সৎপূর্বসূরীদের আক্বীদা অনুসরণ করেছেন। শাইখ রহ. আল্লাহর সুন্দর নামসমূহের ব্যাখ্যায় কুরআন ও সুন্নাহ এর দলিলের ভিত্তিতে সৎপূর্বসূরীদের পদ্ধতি অবলম্বন করেছেন। এ গবেষণার সারাংশ নিম্নে আলোচনা করা হলো:

১- কুরআর ও হাদীসে আল্লাহর যে সব নাম, সিফাত ও কাজ সাব্যস্ত আছে তার সব কিছুই তিনি স্বীকার করেন এবং বিশ্বাস করেন।

২- আল্লাহ নিজে নিজের জন্য এবং তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর জন্য যে সমস্ত পূর্ণ সিফাত ও মহান গুণাবলী সাব্যস্ত করেছেন তিনি তার সব কিছুই সাব্যস্ত করেছেন।

৩- আল্লাহ নিজের ব্যাপারে ও তাঁর নবী তাঁর থেকে যেসব অস্পূর্ণতা ও দোষ-ত্রুটি কোন রূপ পরিবর্তন, বাতিল, অবস্থা ও উপমা দেওয়া ব্যতীত অপসরণ করেছেন তিনিও সেগুলো একইভাবে বাদ দিয়েছেন।

৪- শাইখ রহ. এ ব্যাপারে মূলনীতি ও নিয়মকানুনের প্রতি খুব গুরুত্ব দিয়েছেন, যা তালিবে ইলমদের এ অধ্যয়ের গুরুত্বপূর্ণ মাস’আলাসমূহ বুঝতে সহায়ক হয়।

৫- আসমাউল হুসনা হলো তাওকীফিয়্যাহ তথা কুরআন ও হাদীসে যেভাবে এসেছে ও যেগুলো এসেছে সেগুলোই সাব্যস্ত করা। শরী‘আতের স্বীকৃত দলিল ব্যতীত অন্য নাম গ্রহণ না করা।

৬- আল্লাহর সুন্দর নামসমূহের ব্যাখ্যায় শাইখ আব্দুর রহমান আস-সা‘দী রহ. ইসম তথা নামের অর্থ, আল্লাহর বড়ত্ব ও ঈমানের উপর এ নামের প্রভাব স্পষ্ট করতে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন।

৭- আসমাউল হুসনা সংখ্যায় সীমাবদ্ধ নয়, নির্দিষ্ট সংখ্যা সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত নয়।

৮- তবে হাদীসে ইহসা «أَحْصَاهَا» তথা গণনা করা বলতে তিনটি বিষয়কে একত্রে বুঝানো হয়েছে:

ক- শব্দসমূহ পরিসংখ্যান করা ও গণনা করা।

খ- শাব্দিক অর্থ ও মর্মাথ বুঝা।

গ- আল্লাহকে এ সব নামে ডাকা।

পরিশেষে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করছি তিনি যেন আমার এ কাজকে তাঁর সন্তুষ্টির জন্য একনিষ্ঠতার সাথে কবুল করেন, এতে বরকত দান করেন, এর সংকলন, গবেষণা, প্রস্তুতকরণ, লেখা, পড়া ও শ্রবণ সব কিছু দ্বারা উপকৃত করুন। তিনিই এ কাজের একমাত্র অভিভাবক ও ক্ষমতাশীল।

দরুদ ও সালাম বর্ষিত হোক আমাদের নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, তার পরিবার-পরিজন ও সমস্ত সাহাবীদের ওপর।

 

[1] এখানে মুহাক্কিক মূল লেখক আব্দুর রহমান আস-সা‘দীর বিস্তারিত ভূমিকা উল্লেখ করেননি। শুধু কিতাবের বিন্যাস পদ্ধতি উল্লেখ করে সরাসরি মূল ব্যাখ্যা তথা আল্লাহর সুন্দর নামের আলোচনা করা হয়েছে। -অনুবাদক।

[2] বইটিতে প্রথম অধ্যয়ে শাইখ আবদুর রাহমান আস-সা‘দী রহ. এর সংক্ষিপ্ত জীবনী ও অন্যান্য বিষয় আলোচনা না করে শুধু “আল্লাহ তা‘আলার নিরানব্বই নাম” সংক্রান্ত হাদীস ও এই বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করে সরাসরি দ্বিতীয় অধ্যয় আলোচনা করা হয়েছে। -অনুবাদক।

 

[3] মুত্তাফাকুন ‘আলাইহি। সহীহ বুখারী, কিতাবুদ দাওয়াদ, পরিচ্ছেদ: মহান আল্লাহর নিরানব্বইটি নাম রয়েছে, হাদীস নং ৬৪১০; সহীহ মুসলিম, কিতাবুয যিকর, পরিচ্ছেদ: আল্লাহ তা‘আলার নামসমূহ ও যে ব্যক্তি এগুলো গণনা করবে তার মর্যাদা, হাদীস নং ২৬৭৭।

[4] তিরমিযী, হাদীস নং ৩৫৭৪।

[5] ইবন মাজাহ, হাদীস নং ৩৮৬১।

[6] মুসতাদরাক হাকিম, ১/১৭।

[7] শাইখ মুহাম্মাদ ইবন হামদুল হামূদ তার ‘আন-নাহজুল আসমা ফি শরহে আসমাউল্লাহিল হুসনা’ কিতাবে (১/৫০) এবং শাইখ আব্দুল্লাহ ইবন সালিহ আল-গুসন তার ‘আসমাউল্লাহিল হুসনা’ কিতাবে (পৃ. ১৫৫) এ সব বর্ণনার সূত্র ও এ সংক্রান্ত আলেমদের মতামত বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করেছেন।

[8] আসমা ওয়াস-সিফাত, বায়হাকী, ১/৩২।

[9] মাজমূ‘উ ফাতাওয়া শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ, ৬/৩৭৯।

[10] প্রাগুক্ত।

[11] তাফসীরুল কুরআনিল আযীম, ৩/২৫৭।

[12] বুলূগুল মারাম, পৃ. ৩৪৬, হাদীস নং ১৩৯৬।

[13] তালখীসুল হাবীর, ৪/১৯০।

[14] আল্লাহর এ নামের দলীল হলো তাঁর নিম্নোক্ত বাণী,

﴿إِنَّمَا ٱللَّهُ إِلَٰهٞ وَٰحِدٞۖ سُبۡحَٰنَهُۥٓ أَن يَكُونَ لَهُۥ وَلَدٞۘ لَّهُۥ مَا فِي ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَمَا فِي ٱلۡأَرۡضِۗ وَكَفَىٰ بِٱللَّهِ وَكِيلٗا١٧١﴾ [النساء : ١٧١]

“আল্লাহই কেবল এক ইলাহ, তিনি পবিত্র মহান এ থেকে যে, তাঁর কোন সন্তান হবে। আসমানসমূহে যা রয়েছে এবং যা রয়েছে জমিনে, তা আল্লাহরই। আর কর্মবিধায়ক হিসেবে আল্লাহই যথেষ্ট।” [সূরা আন-নিসা, আয়াত: ১৭১]

[15] আল-হাক্কুল ওয়াদিহ আল-মুবীন, পৃ. ১০৪।

[16] এ নামের দলীল হলো, আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,

﴿ٱللَّهُ لَآ إِلَٰهَ إِلَّا هُوَ ٱلۡحَيُّ ٱلۡقَيُّومُ٢٥٥﴾ [البقرة: ٢٥٥]

“আল্লাহ, তিনি ছাড়া কোন (সত্য) ইলাহ নেই, তিনি চিরঞ্জীব, সুপ্রতিষ্ঠিত ধারক।” [সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ২৫৫]

[17] আত-তাফসীর, ৫/৬২০।

[18] প্রাগুক্ত, ১/৩৩; আল-খুলাসা, পৃ. ৮-৯; বাহজাতু কুলুবুল আবরার, পৃ. ১৬৫।

[19] আল-হাক্কুল ওয়াদিহ আল-মুবীন, পৃ. ১০৪।

[20] আল-মাওয়াহিব আর-রাব্বানিয়্যাহ মিনাল আয়াতিল কুরআনিয়্যাহ, পৃ. ৬২।

[21] আল্লাহর সর্বাধিক মহান নামের অর্থ বর্ণনার ব্যাপারে এ মতের উপরই যাবতীয় দলীল একত্রিত হয়।

[22] তিরমিযী, হাদীস নং ৩৪৭৫, ইমাম তিরমিযী হাদীসটিকে হাসান গরীব বলেছেন। আলবানী রহ. হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন; আবু দাউদ, হাদীস নং ১৪৯৩।

[23] নাসায়ী, হাদীস নং ১৩০০; তিরমিযী, হাদীস নং ৩৫৪৪; মুসনাদ আহমাদ, হাদীস নং ১২২০৫; আবু দাউদ, হাদীস নং ১৪৯৫; ইবন মাজাহ, হাদীস নং ৩৮৫৮; হাকিম, ১/৫০৪। আলবানী রহ. হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন।

[24] মুসনাদ আহমাদ, ৬/৪৬১; তিরমিযী, হাদীস নং ৩৪৭৮, তিনি হাদীসটিকে হাসান সহীহ বলেছেন; আবু দাউদ, হাদীস নং ১৪৯৬; আলবানী রহ. হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন; ইবন মাজাহ, হাদীস নং ৩১০৯।

[25] দেখুন, মাজমু‘উল ফাওয়ায়েদ ওয়া ইকতিনাসুল আওয়াবিদ, পৃ. ২৫০-২৫২।

[26] এ নামের দলিল হলো আল্লাহ তা‘আলার নিম্নোক্ত বাণী,

﴿قُلِ ٱللَّهُ خَٰلِقُ كُلِّ شَيۡءٖ وَهُوَ ٱلۡوَٰحِدُ ٱلۡقَهَّٰرُ١٦﴾ [الرعد: ١٦]

“বলুন, ‘আল্লাহই সবকিছুর সৃষ্টিকর্তা এবং তিনি  এক, একচ্ছত্র ক্ষমতাধর’। [সূরা আর-রাদ, আয়াত” ১৬]

[27] এ নামের দলিল হলো আল্লাহ তা‘আলার নিম্নোক্ত বাণী,

﴿ قُلۡ هُوَ ٱللَّهُ أَحَدٌ ١ ﴾ [الاخلاص: ١]

“বলুন, তিনিই আল্লাহ, এক-অদ্বিতীয়।” [সূরা আল-ইখলাস, আয়াত: ১]

[28] আত-তাফসীর, ৫/৬২০-৬২১; দেখুন, বাহজাতু কুলুবিল আবরার ওয়া কুররাতু উয়ুনিল আখয়ার ফি শারহি জাওয়ামিয়িল আখবার, পৃ. ১৬৫।

[29] এ নামের দলিল হলো আল্লাহ তা‘আলার নিম্নোক্ত বাণী,

﴿وَلَا يَ‍ُٔودُهُۥ حِفۡظُهُمَاۚ وَهُوَ ٱلۡعَلِيُّ ٱلۡعَظِيمُ٢٥٥﴾ [البقرة: ٢٥٥]

“এবং এ দু’টোর (আসমানসমূহ ও জমিন) সংরক্ষণ তাঁর জন্য বোঝা হয় না। আর তিনি সুউচ্চ, মহান।” [সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ২৫৫]

[30] এ নামের দলিল হলো আল্লাহ তা‘আলার নিম্নোক্ত বাণী,

﴿سَبِّحِ ٱسۡمَ رَبِّكَ ٱلۡأَعۡلَى١﴾ [الاعلى: ١]

“আপনি আপনার সুমহান রবের নামের তাসবীহ পাঠ করুন।” [সূরা আল-আ‘লা, আয়াত: ১]

[31] আল-হাক্কুল ওয়াদিহ আল-মুবীন, পৃ. ২৬।

[32] তাওদীহুল কাফিয়া আশ-শাফিয়া, পৃ. ১১৬।

[33] আল-হাক্কুল ওয়াদিহ আল-মুবীন, পৃ. ২৬, ২৭।

[34] আত-তাফসীর, ৫/৬২৩-৬২৪; আল-খুলাসা, পৃ. ১৮৭।

[35] এ নামের দলিল হলো আল্লাহর নিম্নোক্ত আয়াত:

﴿هُوَ ٱلۡأَوَّلُ وَٱلۡأٓخِرُ وَٱلظَّٰهِرُ وَٱلۡبَاطِنُۖ وَهُوَ بِكُلِّ شَيۡءٍ عَلِيمٌ٣﴾ [الحديد: ٣]

“তিনিই প্রথম ও শেষ এবং প্রকাশ্য ও গোপন।” [সূরা আল-হাদীদ, আয়াত: ৩]

[36] সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২৭১৩।

[37] আল-হাক্কুল ওয়াদিহ আল-মুবীন, পৃ. ২৫।

[38] তাওদীহুল কাফিয়া আশ-শাফিয়া, পৃ. ১১৬ ও ১১৭।

[39] আল-হাক্কুল ওয়াদিহ আল-মুবীন, পৃ. ৮৯।

[40] তাওদিহুল কাফিয়া আশ-শাফিয়াহ, পৃ. ১৩১।

[41] আল-হাক্কুল ওয়াদিহ আল-মুবীন, পৃ. ৮৯ ও ৯০।

[42] এ নামের ব্যাখ্যা ‘আল-আউয়াল’ নামের সাথে আলোচনা করা হয়েছে।

[43] এ নামটি আল্লাহর সম্বন্ধ যুক্ত নামের অন্তর্ভুক্ত, এটি আসমাউল হুসনার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হবে না।

[44] আত-তাফসীর, ১/১৩০।

[45] আত-তাফসীর, ৫/৬২৮।

[46] আল-হাক্কুল ওয়াদিহ আল-মুবীন, পৃ. ৮২-৮৩; আত-তাফসীর, ৫/৬২১।

[47] এ নামের দলিল হলো আল্লাহর নিম্নোক্ত বাণী,

﴿هُوَ ٱلسَّمِيعُ ٱلۡبَصِيرُ١﴾ [الاسراء: ١]

“তিনিই সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা।” [সূরা আল-ইসরা, আয়াত: ১]

[48] [48] আল-হাক্কুল ওয়াদিহ আল-মুবীন, পৃ. ৩৫-৩৬।

[49] ইবন মাজাহ, হাদীস নং ১৮৮; আলবানী রহ. হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন।

[50] এ নামের দলিল হলো, আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,

﴿إِنَّهُۥ هُوَ ٱلتَّوَّابُ ٱلرَّحِيمُ٣٧﴾ [البقرة: ٣٧]

“নিশ্চয় তিনি তাওবা কবূলকারী, অতি দয়ালু।” [সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ৩৭]

[51] আত-তাফসীর, ৫/৬২৩।

[52] আল-হাক্কুল ওয়াদিহ আল-মুবীন, পৃ. ৭৩; তাওদিহুল কাফিয়া আশ-শাফিয়া, পৃ. ১২৬।

[53] গ্রন্থকার ইবনুল কাইয়্যিম রহ. এ নামটিকে আসমাউল হুসনার অন্তর্ভুক্ত করেছেন। আসলে এটি আল্লাহর কাজের দিকে সম্বন্ধযুক্ত করা নাম। কর্ম বাচক শব্দ থেকে আল্লাহর নাম উৎসারিত হয় না এবং সম্বন্ধযুক্ত নামসমূহ আসমাউল হুসনাও নয়। আল্লাহই অধিক জ্ঞাত।

[54] আত-তাফসীর, ৫/৬২৭।

[55] এ নামের দলিল হলো, আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,

﴿هُوَ ٱللَّهُ ٱلَّذِي لَآ إِلَٰهَ إِلَّا هُوَ ٱلۡمَلِكُ ٱلۡقُدُّوسُ ٱلسَّلَٰمُ ٱلۡمُؤۡمِنُ ٱلۡمُهَيۡمِنُ ٱلۡعَزِيزُ ٱلۡجَبَّارُ ٢٣ ﴾ [الحشر: ٢٣]

“তিনিই আল্লাহ; যিনি ছাড়া কোন ইলাহ নেই, তিনিই বাদশাহ, মহাপবিত্র, ত্রুটিমুক্ত, নিরাপত্তাদানকারী, রক্ষক, মহাপরাক্রমশালী, মহাপ্রতাপশালী, অতীব মহিমান্বিত।” [সূরা আল-হাশর, আয়াত: ২৩]

[56] আত-তাফসীর, ৫/৬২৪।

[57] আল-হাক্কুল ওয়াদিহ আল-মুবীন, পৃ. ৭৭; তাওদীহুল কাফিয়া আশ-শাফিয়া, পৃ. ১২৬।

[58] গ্রন্থকার ইবনুল কাইয়্যিম রহ. আল-জালীল নামটি আসমাউল হুসনার অন্তর্ভুক্ত করেছেন; কিন্তু এ নামটি আল্লাহর জন্য সাব্যস্ত নেই। আল্লাহই অধিক জ্ঞাত।

[59] আল-কাবীর নামের দলিল হলো আল্লাহ তা‘আলার বাণী,

﴿وَهُوَ ٱلۡعَلِيُّ ٱلۡكَبِيرُ ٢﴾ [سبا: ٢٣]

“এবং তিনি সুমহান ও সবচেয়ে বড়।” [সূরা সাবা’, আয়াত : ২৩]

[60] আল-হাক্কুল ওয়াদিহ আল-মুবীন, পৃ. ২৯।

[61] আত-তাফসীর, ৫/৬২২; আল-কাফিয়া আশ-শাফিয়া, পৃ. ১১৭।

[62] সহীহ মুসলিমে ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে এ নামটি সাব্যস্ত আছে। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

«إِنَّ اللهَ جَمِيلٌ يُحِبُّ الْجَمَالَ».

“নিশ্চয় আল্লাহ সুন্দর, তিনি সৌন্দর্যকে পছন্দ করেন।” সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৯১।

[63] তাওদীহুল কাফিয়া আশ-শাফিয়া, পৃ. ১১৭।

[64] এখানে গ্রন্থকার বলতে ইবনুল কাইয়্যিম রহ. কে বুঝানো হয়েছে। তিনি তার কাসীদাতুন নুনিয়্যাহতে এ কথা বলেছেন।

[65] সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৪৮৬।

[66] সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১৭৯।

[67] ইবনুল কাইয়্যিম রহ. তার কাসীদাতুন নুনিয়্যাহতে বলেছেন।

[68] আল-হাক্কুল ওয়াদিহ আল-মুবীন, পৃ. ২৯-৩২।

[69] রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

«إِنَّ اللَّهَ جَوَادٌ يُحِبُّ الجُودَ»

“নিশ্চয় আল্লাহ তা‘আলা দানশীল, তিনি দানশীলতা ভালবাসেন।” হিলইয়াতুল আউলিয়া, আবু নু‘আইম, ৫/২৯; সহীহুল জামে‘, আলবানী, ১১/১০৫।

[70] আল-হাক্কুল ওয়াদিহ আল-মুবীন, পৃ. ৬৬-৬৭।

[71] তাওদীহুল কাফিয়া আশ-শাফিয়া, পৃ. ১২৪।

[72] এ নামের দলিল আল্লাহর নিম্নোক্ত বাণী,

﴿وَكَفَىٰ بِٱللَّهِ حَسِيبٗا٦﴾ [النساء : ٦]

“আর হিসাব গ্রহণকারী হিসেবে আল্লাহ যথেষ্ট।” [সূরা আন-নিসা, আয়াত: ৬]

[73] আত-তাফসীর, ৫/৬২৫।

[74] আল-হাক্কুল ওয়াদিহ আল-মুবীন, পৃ. ৭৮।

[75] এ নামটি আসমাউল হুসনা হওয়ার ব্যাপারে দলিল পাওয়া যায় না। তবে সিফাতের সিগাহয় আল-কুরআনে এভাবে এসেছে,

﴿وَرَبُّكَ عَلَىٰ كُلِّ شَيۡءٍ حَفِيظٞ٢١﴾ [سبا: ٢١]

“আর তোমার রব সকল কিছুর হিফাযতকারী।” [সূরা সাবা’, আয়াত : ২১]

 

[76] মুসনাদ আহমাদ, ১/২৬৩; তিরমিযী, কিতাব সিফাতুল কিয়ামাহ, ৪/৬৬৭, হাদীস নং ২৫১৬, তিনি হাদীসটিকে হাসান সহীহ বলেছেন; আহমাদ শাকির মুসনাদের তাহকীকে (৩/২৬৭১) হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন; আলবানী রহ. মিশকাতের তাখরীজে (৩/১৪৫৯) হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন।

[77] আল-হাক্কুল ওয়াদিহ আল-মুবীন, পৃ. ৫৯-৬১; তাওদীহুল কাফিয়া আশ-শাফিয়া, পৃ. ১২২।

[78] এ নামের দলিল হলো আল্লাহ তা‘আলার বাণী,

﴿ذَٰلِكَ بِأَنَّ ٱللَّهَ هُوَ ٱلۡحَقُّ وَأَنَّ مَا يَدۡعُونَ مِن دُونِهِۦ هُوَ ٱلۡبَٰطِلُ وَأَنَّ ٱللَّهَ هُوَ ٱلۡعَلِيُّ ٱلۡكَبِيرُ٦٢﴾ [الحج : ٦٢]

“আর এটা এজন্য যে, নিশ্চয় আল্লাহই সত্য এবং তারা তাঁর পরিবর্তে যাকে ডাকে, অবশ্যই তা বাতিল। আর নিশ্চয় আল্লাহ তো সমুচ্চ, সুমহান।” [সূরা আল-হাজ্জ, আয়াত: ৬২]

[79] আত-তাফসীর, ৫/৬৩১-৬৩২।

[80] এ নামের দলিল হলো রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণী,

«إِنَّ اللَّهَ هُوَ الْحَكَمُ، وَإِلَيْهِ الْحُكْمُ».

“আল্লাহ হলেন হাকাম (হুকুমদাতা), আর হুকুম তো তাঁরই।” আবু দাউদ, ৫/২৪০, হাদীস নং ৪৯৫৫, কিতাবুল আদাব, বাবু ফি তাগয়ীরিল ইসমিল কাবীহ; নাসায়ী, কিতাবুল কাদা, হাদীস নং ৫৩৮৯, বাবু ইযা হাকামু রজুলান ফাকাদা বাইনাহুম; আলবানী রহ. হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন।

[81] তাওদীহুল কাফিয়া আশ-শাফিয়া, পৃ. ১২৭; আল-হাক্কুল ওয়াদিহ আল-মুবীন, পৃ. ৮০।

[82] এ নামের দলিল হলো আল্লাহ তা‘আলার বাণী,

﴿إِنَّ ٱللَّهَ عَلِيمٌ حَكِيمٞ٢٨﴾ [التوبة: ٢٨]

“নিশ্চয়ই আল্লাহ মহাজ্ঞানী, প্রজ্ঞাময়।” [সূরা আত-তাওবা, আয়াত: ২৮]

[83] আত-তাফসীর, ৫/৬২১।

[84] আল-হাক্কুল ওয়াদিহ আল-মুবীন, পৃ. ৫০-৫৪; তাওদীহুল কাফিয়া আশ-শাফিয়া, পৃ. ১১৯।

[85] এ নামের দলিল আল্লাহর বাণী,

﴿وَٱعۡلَمُوٓاْ أَنَّ ٱللَّهَ يَعۡلَمُ مَا فِيٓ أَنفُسِكُمۡ فَٱحۡذَرُوهُۚ وَٱعۡلَمُوٓاْ أَنَّ ٱللَّهَ غَفُورٌ حَلِيمٞ٢٣٥﴾ [البقرة: ٢٣٥]

“আর জেনে রাখ, নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের অন্তরে যা রয়েছে তা জানেন। সুতরাং তোমরা তাকে ভয় কর এবং জেনে রাখ, নিশ্চয় আল্লাহ ক্ষমাশীল, সহনশীল।” [সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ২৩৫]

[86] আল-হাক্কুল ওয়াদিহ আল-মুবীন, পৃ. ৫৫-৫৬।

[87] আত-তাফসীর, পৃ. ৫/৬৩০।

[88] আল-হাক্কুল ওয়াদিহ আল-মুবীন, পৃ. ৫৬।

[89] এ নামের দলিল হলো আল্লাহর নিম্নোক্ত বাণী,

﴿يَٰٓأَيُّهَا ٱلنَّاسُ أَنتُمُ ٱلۡفُقَرَآءُ إِلَى ٱللَّهِۖ وَٱللَّهُ هُوَ ٱلۡغَنِيُّ ٱلۡحَمِيدُ١٥﴾ [فاطر: ١٥]

“হে মানুষ, তোমরা আল্লাহর প্রতি মুখাপেক্ষী আর আল্লাহ অমুখাপেক্ষী ও প্রশংসিত।” [সূরা ফাতির, আয়াত: ১৫]

[90] আত-তাফসীর, পৃ. ৫/৬২৪।

[91] তাওদীহুল কাফিয়া আশ-শাফিয়া, পৃ. ১১৮।

[92] তাওদীহুল ওয়াদিহুল মুবীন, পৃ. ৩৯-৪০।

[93] আল্লাহর এ নামের দলিল হলো নিম্নোক্ত আয়াত:

﴿ ٱللَّهُ لَآ إِلَٰهَ إِلَّا هُوَ ٱلۡحَيُّ ٱلۡقَيُّومُ٢٥٥﴾ [البقرة: ٢٥٥]

“আল্লাহ, তিনি ছাড়া কোন (সত্য) ইলাহ নেই, তিনি চিরঞ্জীব, সুপ্রতিষ্ঠিত ধারক।” [সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ২৫৫]

[94] আল-হাক্কুল ওয়াদিহ আল-মুবীন, পৃ. ৮৭-৮৮।

[95] আবু দাউদ, কিতাব: সালাত, বাব: আদ-দো‘আ, হাদীস নং ১৪৯৫; তিরমিযী, কিতাব: দাওয়াত, হাদীস নং ৩৫৪৪, ইমাম তিরমিযী হাদীসটিকে হাসান সহীহ বলেছেন; নাসায়ী, হাদীস নং ১৩০০; মুসনাদ আহমাদ, হাদীস নং ১২২০৫; ইবন মাজাহ, হাদীস নং ৩৮৫৮; হাকিম, ১/৫০৪। আলবানী রহ. হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন।

[96] তাওদীহুল কাফিয়া আশ-শাফিয়া, পৃ. ২৯।

[97] রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

«إِنَّ اللَّهَ عَزَّ وَجَلَّ حَلِيمٌ حَيِيٌّ سِتِّيرٌ يُحِبُّ الْحَيَاءَ وَالسَّتْرَ فَإِذَا اغْتَسَلَ أَحَدُكُمْ فَلْيَسْتَتِرْ».

“আল্লাহ তা‘আলা ধৈর্যশীল, লজ্জাশীল, (মানুষের পাপ) আড়ালকারী। তিনি লজ্জাশীলতাকে এবং পর্দা করাকে পছন্দ করেন। অত:এব, তোমাদের কেউ যখন গোসল করবে, সে যেন পর্দা করে।” আবু দাউদ, ৪/৩০২, কিতাব, আল-হাম্মাম, বাব, উলঙ্গ হতে নিষেধাজ্ঞা; নাসায়ী, ১/২০০, কিতাব, গোসল ও তায়াম্মুল, বাব, গোসলের সময় পর্দা করা; মুসনাদ আহমাদ, ৪/২২৪; বায়হাকী, ১/১৯৮, কিতাব, তাহারাত, বাব, গোসলের সময় মানুষের উপস্থিতিতে ঢাকা, হাদীসটি ই‘আলা ইবন উমাইয়্যাহ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত; আলবানী রহ. হাদীসটিকে ইরওয়াউল গালীলে (৭/৩৬৭) সহীহ বলেছেন।

[98] শাইখ আস-সা‘দী রহ. এখানে আস-সাত্তারকে আল্লাহর নাম হিসেবে উল্লেখ করেছেন; কিন্তু এটি আল্লাহর নাম হওয়ার ব্যাপারে কোন দলিল পাওয়া যায় না, তবে মানুষের কাছে এটি আল্লাহর একটি নাম হিসেবে বহুল প্রচলিত।

[99] আবু দাউদ, ২/১৬৫, হাদীস নং ১৪৮৮, কিতাব, সালাত, বাব, দু‘আ; তিরমিযী, ৫/৫৫৭, হাদীস নং ৩৫৫৬, কিতাব, দাওয়াত; ইবন মাজাহ, ২/১২৭১, হাদীস নং ৩৮৬৫, কিতাব, দু‘আ, বাব, রাফ‘উল ইয়াদাইন ফিদ-দু‘আ, সালমান আল-ফারেসী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত; আলবানী রহ. হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন। দেখুন, সহীহুত তিরমিযী, ৩/১৭৯, হাদীস নং ৩৮০৯।

[100] সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হাদীস এ কথার অনুরূপ। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

«كُلُّ أُمَّتِي مُعَافَاةٌ، إِلَّا الْمُجَاهِرِينَ، وَإِنَّ مِنَ الْإِجْهَارِ أَنْ يَعْمَلَ الْعَبْدُ بِاللَّيْلِ عَمَلًا، ثُمَّ يُصْبِحُ قَدْ سَتَرَهُ رَبُّهُ، فَيَقُولُ: يَا فُلَانُ قَدْ عَمِلْتُ الْبَارِحَةَ كَذَا وَكَذَا، وَقَدْ بَاتَ يَسْتُرُهُ رَبُّهُ، فَيَبِيتُ يَسْتُرُهُ رَبُّهُ، وَيُصْبِحُ يَكْشِفُ سِتْرَ اللهِ عَنْهُ».

“নিজের পাপাচার প্রকাশকারী ব্যতীত আমার সকল উম্মাতের গুনাহই ক্ষমার যোগ্য। নিজের গুনাহ প্রকাশ করার অর্থই এই যে, কোন বান্দা রাতের বেলা কোন পাপ কাজ করে, অতঃপর দিন হলে তার প্রভু তার পাপকে গোপন রাখেন; কিন্তু বান্দা কাউকে ডেকে প্রকাশ করে দেয় যে, আমি গত রাত এই এই পাপ করেছি; অথচ বান্দা গুনাহ করার পর রাতে তার প্রভু তা গোপন রেখেছিলেন। ভোর হলে আল্লাহ যে পাপ গোপন রেখেছেন, সে তা মানুষের কাছে প্রকাশ করে দিল।” সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২৯৯০, কিতাব, যুহুদ, বাব, নাহি ‘আন হাতকিল ইনসান সাতরা নাফসিহি, হাদীসটি আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত।

[101] আল-হাক্কুল ওয়াদিহ আল-মুবীন, পৃ. ৫৪-৫৫; তাওদীহুল কাফিয়া আশ-শাফিয়া, পৃ. ১২১।

[102] ‘আল-বাসীত’ নামের সাথে এ নামদ্বয়ের আলোচনা ইতিপূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে।

[103] ‘আল-বারী’ নামের সাথে এ নামের আলোচনা ইতিপূর্বে আলোচনা করা হয়েছে।

[104] এ নামের দলিল হচ্ছে আল্লাহর নিম্নোক্ত বাণী,

﴿إِنَّ ٱللَّهَ عَلِيمٌ خَبِيرُۢ٣٤﴾ [لقمان: ٣٤]

“নিশ্চয় আল্লাহ সর্বজ্ঞ, সম্যক অবহিত।” [সূরা লুকমান, আয়াত: ৩৪]

[105] আত-তাফসীর, ৫/৬২১।

[106] আল-হাক্কুল ওয়াদিহ আল-মুবীন, পৃ. ৩৬-৩৭।

[107] আল-হাক্কুল ওয়াদিহ আল-মুবীন, পৃ. ৩৭-৩৮।

[108] জমিনে যা প্রবেশ করে তন্মধ্যে রয়েছে বৃষ্টির পানি, বীজ ইত্যাদি। আর তা থেকে বের হয় অঙ্কুর, উদ্ভিদ ইত্যাদি। আসমান থেকে নাযিল হয় রিযক ও তাকদীর এবং আসমানে উঠে ফেরেশতা, রূহ প্রভৃতি। – অনুবাদক।

[109] আল-মাওয়াহিবুর রাব্বানিয়্যাহ মিনাল আয়াতিল কুরআনিয়্যাহ, পৃ. ৬৩-৬৪।

[110] এটি আল্লাহর সম্বন্ধযুক্ত নাম। এ ব্যাপারে ইতিপূর্বে আলোচনা করা হয়েছে যে, এ ধরণের নাম আসমাউল্লাহিল হুসনার অন্তর্ভুক্ত হয় না।

[111] আত-তাফসীর, ৫/৬২৬।

[112] এ নামের দলিল আল্লাহর নিম্নোক্ত বাণী,

﴿وَيُحَذِّرُكُمُ ٱللَّهُ نَفۡسَهُۥۗ وَٱللَّهُ رَءُوفُۢ بِٱلۡعِبَادِ٣٠﴾ [ال عمران: ٣٠]

“আর আল্লাহ তোমাদেরকে তার নিজের ব্যাপারে সাবধান করছেন এবং আল্লাহ বান্দাদের প্রতি অত্যন্ত স্নেহশীল।” [সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ৩০]

[113] আত-তাফসীর, ১/১৬২ ও ৭/৩৩৭।

[114] এ নামদ্বয়ের আলোচনা আল-বাসিত নামের আলোচনার সাথে উল্লেখ করা হয়েছে।

[115] এ নামের দলিল আল্লাহর নিম্নোক্ত বাণী,

﴿قُلۡ أَغَيۡرَ ٱللَّهِ أَبۡغِي رَبّٗا وَهُوَ رَبُّ كُلِّ شَيۡءٖ١٦٤﴾ [الانعام: ١٦٤]

“বলুন, আমি কি আল্লাহ ছাড়া অন্য কোন রব অনুসন্ধান করব ; অথচ তিনি সব কিছুর রব?” [সূরা আল-আন‘আম, আয়াত: ১৬৪]

[116] আত-তাফসীর, ৫/৬২০।

[117] আল-খুলাসা, পৃ. ১৭।

[118] এ নামদ্বয়ের দলিল হলো নিম্নোক্ত আল্লাহর বাণী,

﴿ٱلرَّحۡمَٰنِ ٱلرَّحِيمِ٣﴾ [الفاتحة: ٣]

“দয়াময়, পরম দয়ালু, পরম করুণাময়, অতি দয়ালু।” [সূরা আল-ফাতিহা, আয়াত: ৩]

[119] আল-খুলাসা দিমনাল মাজমূ‘আতিল কামিলা লি মুয়াল্লাফাতিস সা‘দী, ১/১৭৯; আত-তাফসীর, ১/৩৩।

[120] আল-হাক্বকুল ওয়াদিহ আল-মুবীন, পৃ. ১০৬-১০৭।

[121] সহীহ বুখারী, কিতাবুত তাফসীর, বাব, কাওলুহু ‘ওয়াতাকূলু হাল মিম মাযীদ’ ৬/৪৮, হাদীস নং ৪৮৫০; সহীহ মুসলিম, কিতাবুল জান্নাহ, বাব, আন-নারু ইয়াদখুলুহাল জাব্বারূন ওয়াল জান্নাতু ইয়াদখুলুহাদ দু‘আফা, ৪/২১৮৬, হাদীস নং ২৮৪৬, এটি আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত হাদীসের অংশ বিশেষ।

[122] সহীহ বুখারী, ৭/৭৫, কিতাবুল আদাব, বাব, রহমাতুল ওয়ালাদি ওয়াতাকবীলিহি ওয়া মু‘আনাকাতিহি, হাদীস নং ৫৯৯৯; সহীহ মুসলিম, ৪/২১০৯, কিতাবুত তাওবা, বাব, ফি সি‘আতি রহমাতিল্লাহি তা‘আলা, হাদীস নং ২৭৫৪। হাদীসটি উমার রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত।

[123] সহীহ বুখারী, ৮/১৭৬, কিতাবুত তাওহীদ, বাব, ওয়াকানা ‘আরশুহু ‘আলাল মাই, হাদীস নং ৭৫৫৪; সহীহ মুসলিম, ৪/২১০৭, কিতাবুত তাওবা, বাব, ফি সি‘আতি রহমাতিল্লাহি তা‘আলা, হাদীস নং ২৭৫১।

[124] আল-মাওয়াহিবুর রাব্বানিয়্যাহ মিনাল আয়াতিল কুরআনিয়্যাহ, পৃ. ৬৪।

[125] তাওদীহুল কাফিয়া আশ-শাফিয়া, পৃ. ১২৮।

[126] আল-হাক্বুল ওয়াদিহ আল-মুবীন, পৃ. ৮৫।

[127] তাওদীহুল কাফিয়া আশ-শাফিয়া, পৃ. ১২৮-১২৯; আল-হাক্কুল ওয়াদিহ আল-মুবীন, পৃ. ৮৫; আত-তাফসীর, ৫/৬২৬।

[128] গ্রন্থকার এ নামটিকে আসমাউল হুসনা হিসেবে উল্লেখ করেছেন; কিন্তু এটি আল্লাহর নাম হতে হলে দলিল থাকতে হবে।

[129] তাওদীহুল কাফিয়া আশ-শাফিয়া, পৃ. ১২৭।

[130] আল-হাক্কুল ওয়াদিহ আল-মুবীন, পৃ. ৭৮-৭৯; আত-তাফসীর, ৫/৬৩১।

[131] সহীহ মুসলিম, ৪/২০০৩-২০০৪, কিতাবুল বির ওয়াস সিলাহ, বাব, ফাদলুর রিফক, হাদীস নং ২৫৯৩, আয়েশা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা থেকে হাদীসটি বর্ণিত।

[132] আল-হাক্কুল ওয়াদিহ আল-মুবীন, পৃ. ৬৩।

[133] তাওদীদুল কাফিয়া আশ-শাফিয়া, পৃ. ১২৩।

[134] আল-হাক্বুল ওয়াদিহ আল-মুবীন, পৃ. ৫৮।

[135] আত-তাফসীর, ৫/৬২৫।

[136] আল-হাক্বুল ওয়াদিহ আল-মুবীন, পৃ. ৫৮-৫৯; তাওদীদুল কাফিয়া আশ-শাফিয়া, পৃ. ১২২।

[137] আত-তাফসীর, ৫/৬২৩।

[138] আল-হাক্কুল ওয়াদিহ আল-মুবীন, পৃ. ৮১-৮২; তাওদীহুল কাফিয়া আশ-শাফিয়া, পৃ. ১২৭।

[139] ‘আল-বাসীর’ নামের সাথে এ নামের বিস্তারিত ব্যাখা ইতিপূর্বে আলোচনা করা হয়েছে।

[140] তাওদীহুল কাফিয়া আশ-শাফিয়া, পৃ. ১১৮।

[141] সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৬৮৯; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৩৯১।

[142] আল-হাক্কুল ওয়াদিহ আল-মুবীন, পৃ. ২৫; আত-তাফসীর, ৫/৬২২।

[143] এ নামের দলিল হলো আল্লাহর নিম্নোক্ত বাণী,

﴿وَكَانَ ٱللَّهُ شَاكِرًا عَلِيمٗا ١٤﴾ [النساء : ١٤٧]

“আল্লাহ পুরস্কার দানকারী, সর্বজ্ঞ।” [সূরা আন-নিসা, আয়াত: ১৪৭]

[144] এ নামের দলিল হলো আল্লাহর নিম্নোক্ত বাণী,

﴿إِن تُقۡرِضُواْ ٱللَّهَ قَرۡضًا حَسَنٗا يُضَٰعِفۡهُ لَكُمۡ وَيَغۡفِرۡ لَكُمۡۚ وَٱللَّهُ شَكُورٌ حَلِيمٌ١﴾ [التغابن : ١٧]

“যদি তোমরা আল্লাহকে উত্তম ঋণ দাও, তিনি তা তোমাদের জন্য দ্বিগুন করে দিবেন এবং তোমাদের ক্ষমা করে দিবেন। আল্লাহ গুণগ্রাহী, পরম ধৈর্যশীল।”  [সূরা আত-তাগাবুন, আয়াত: ১৭]

[145] তাওদীহুল কাফিয়া আশ-শাফিয়া, পৃ. ১২৫-১২৬; আল-হাক্কুল ওয়াদিহ আল-মুবীন পৃ. ৭০।

[146] আত-তাফসীর, ১/১৮৫ ও ৫/৬৩০।

[147] এ নামের দলিল আল্লাহর নিম্নোক্ত বাণী,

﴿وَٱللَّهُ عَلَىٰ كُلِّ شَيۡءٖ شَهِيدٌ٦﴾ [المجادلة: ٦]

“আর আল্লাহ প্রত্যেক বিষয়ে প্রত্যক্ষদর্শী।” [সূরা আল-মুজাদালা, আয়াত: ৬

[148] এ নামের সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা ‘আল-কারীব’ নামের সাথে ইতিপূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে।

[149] আত-তাফসীর, ৫/৬২৮; আল-হাক্কুল ওয়াদিহ আল-মুবীন, পৃ. ৫৮; তাওদীহুল কাফিয়া আশ-শাফিয়া, পৃ. ১২২।

[150] ধৈর্যশীলতা আল্লাহর গুণ। আবু মূসা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত হাদীস এ নামের প্রমাণ। সামনে এ হাদীসের বিস্তারিত ব্যাখ্যা আসছে।

[151] সহীহ মুসলিম, ৪/২১৬০, কিতাবু সিফাতিল মুনাফিকীন, বাব, কষ্টদায়ক কোন কথা শ্রবণ করার পর আল্লাহ তা‘আলা থেকে অধিক ধৈর্যশীল আর কেউ নেই। হাদীস নং ২৮০৪, আবু মূসা আশ‘আরী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত হাদীস।

[152] সহীহ বুখারী, ৪/৭৩, হাদীস নং ৪৯৭৫, কিতাবু বাদইল খালক, বাব, আল্লাহ তা‘আলার বাণী,

﴿ وَهُوَ ٱلَّذِي يَبۡدَؤُاْ ٱلۡخَلۡقَ ثُمَّ يُعِيدُهُۥ وَهُوَ أَهۡوَنُ عَلَيۡهِ٢٧ ﴾ [الروم: ٢٧]

“আর তিনিই সৃষ্টির সূচনা করেন তারপর তিনিই এর পুনরাবৃত্তি করবেন। আর এটা তো তাঁর জন্য অধিকতর সহজ।” [সূরা আর-রূম, আয়াত: ২৭]

 

[153] আল-হাক্কুল ওয়াদিহ আল-মুবীন, পৃ. ৫৭-৫৮; তাওদীহুল কাফিয়া আশ-শাফিয়া, পৃ. ১২১; ফাতাওয়া আস-সা‘দিয়্যাহ, পৃ. ২৯।

[154] এ নামের দলিল আল্লাহর নিম্নোক্ত বাণী,

﴿قُلۡ هُوَ ٱللَّهُ أَحَدٌ ١ ٱللَّهُ ٱلصَّمَدُ٢﴾ [الاخلاص: ١،  ٢]

“বলুন, তিনিই আল্লাহ, এক-অদ্বিতীয়। আল্লাহ কারো মুখাপেক্ষী নন, সকলেই তাঁর মুখাপেক্ষী।” [সূরা আল-ইখলাস, আয়াত: ১-২]

[155] বাহজাতুল কুলুবুল আবরার ওয়া কুররাতু ‘উয়ূনিল আখইয়ার ফি শরহে জাওয়ামি‘ইল আখবার, পৃ. ১৬৫-১৬৫।

[156] আত-তাফসীর, ৫/৬২১।

[157] আল-হাক্কুল ওয়াদিহ আল-মুবীন, পৃ. ৭৫; আত-তাফসীর, ৭/৬৮৪; তাওদীহুল কাফিয়া, পৃ. ১২৬।

[158] তাওদীহুল কাফিয়া আশ-শাফিয়া, পৃ. ১৩০-১৩১।

[159] ‘আল-আউয়াল’ নামের সাথে এ নামের আলোচনা ইতিপূর্বে আলোচনা করা হয়েছে।

[160] ‘আল-হাকাম’ নামের সাথে এ নামের আলোচনা ইতিপূর্বে আলোচনা করা হয়েছে।

[161] আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,

﴿إِنَّ رَبَّكَ هُوَ ٱلۡقَوِيُّ ٱلۡعَزِيزُ٦٦﴾ [هود: ٦٦]

“নিশ্চয় আপনার রব, তিনি শক্তিশালী, পরাক্রমশালী।” [সূরা হূদ, আয়াত: ৬৬]

[162] আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,

﴿إِنَّ ٱللَّهَ هُوَ ٱلرَّزَّاقُ ذُو ٱلۡقُوَّةِ ٱلۡمَتِينُ٥٨﴾ [الذاريات: ٥٨]

“নিশ্চয় আল্লাহই রিযিকদাতা, তিনি শক্তিধর, পরাক্রমশালী।” [সূরা আয-যারিয়াত, আয়াত: ৫৮]

[163] আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,

﴿وَٱللَّهُ قَدِيرٞۚ وَٱللَّهُ غَفُورٞ رَّحِيمٞ٧﴾ [الممتحنة : ٧]

“আর আল্লাহ সর্ব শক্তিমান এবং আল্লাহ অতিশয় ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।” [সূরা আল-মুমতাহিনা, আয়াত: ৭]

[164] আল-হাক্কুল ওয়াদিহ আল-মুবীন, পৃ. ৪৪; তাওদীহুল কাফিয়া আশ-শাফিয়া, পৃ. ১১৯।

[165] আত-তাফসীর, ৫/৬২৪।

[166] আল-হাক্কুল ওয়াদিহ আল-মুবীন, পৃ. ৪৪-৪৬; আত-তাফসীর, ১/৩৫৬ ও ৫/৫৬৩।

[167] এ নামের দলিল আল্লাহর নিম্নোক্ত বাণী,

﴿وَلَا يَ‍ُٔودُهُۥ حِفۡظُهُمَاۚ وَهُوَ ٱلۡعَلِيُّ ٱلۡعَظِيمُ٢٥٥﴾ [البقرة: ٢٥٥]

“এবং এ দু’টোর (আসমানসমূহ ও জমিন) সংরক্ষণ তাঁর জন্য বোঝা হয় না। আর তিনি সুউচ্চ, মহান।” [সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ২৫৫]

[168] এ নামের দলিল আল্লাহর নিম্নোক্ত বাণী,

﴿ذَٰلِكُم بِأَنَّهُۥٓ إِذَا دُعِيَ ٱللَّهُ وَحۡدَهُۥ كَفَرۡتُمۡ وَإِن يُشۡرَكۡ بِهِۦ تُؤۡمِنُواْۚ فَٱلۡحُكۡمُ لِلَّهِ ٱلۡعَلِيِّ ٱلۡكَبِيرِ١٢﴾ [غافر: ١٢]

“[তাদেরকে বলা হবে] এটা তো এজন্য যে, যখন আল্লাহকে এককভাবে ডাকা হত তখন তোমরা তাঁকে অস্বীকার করতে আর যখন তাঁর সাথে শরীক করা হত তখন তোমরা বিশ্বাস করতে। সুতরাং যাবতীয় কর্তৃত্ব সমুচ্চ, মহান আল্লাহর।” [সূরা গাফের, আয়াত: ১২]

[169] আত-তাফসীর, ১/৩১৫।

[170] আল-‘আযামাহ, আবু শাইখ, ২/৪৪৫; আদ-দুররুল মানসূর, সুয়ূতী, ৭/২৪৮, তিনি হাদীসটিকে আবদ ইবন হুমাইদ, ইবান আবু হাতিম ও আবু শাইখের দিকে সনদের নিসবত করেছেন।

[171] এ হাদীসটি আবু যার রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, দেখুন, কিতাবুল ‘আযামাহ, ২/৬৩৫-৬৩৬।

[172] সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২৬২০; ইবন মাজাহ, হাদীস নং ৪১৭৪।

[173] আল-হাক্কুল ওয়াদিহ আল-মুবীন, পৃ. ২৭-২৮; আল-কাফিয়া আশ-শাফিয়া, পৃ. ১১৭।

[174] আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,

﴿إِنَّ ٱللَّهَ لَعَفُوٌّ غَفُورٞ٦٠﴾ [الحج : ٦٠]

“নিশ্চয় আল্লাহ পাপ মোচনকারী, অতীব ক্ষমাশীল।” [সূরা আল-হাজ্জ, আয়াত: ৬০]

[175] এ নামের বিস্তারিত আলোচনা ‘আল-হালীম’ নামের সাথে আলোচনা করা হয়েছে।

[176] ‘আল-গাফূর’ নামের আলোচনায় এ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হবে।

[177] আত-তাফসীর, ৫/৬২৩।

[178] এ নামের ব্যাখ্যা ‘আল-‘আলা’ নামের সাথে আলোচনা করা হয়েছে।

[179] এ নামের ব্যাখ্যা ‘আল-খাবীর’ নামের সাথে আলোচনা করা হয়েছে।

[180] মুসনাদ আহমাদ, ৫/১৪৭; তিরমিযী, ৫/৫৪৮, কিতাব, দাওয়াত, বাব, তাওবা ও ইসতিগফারের ফযিলত, হাদীস নং ৩৫৪০; ইবন মাজাহ, ২/১২৫৫, কিতাবুল আদাব, বাব, ফদলিল আমাল; দারামী, ২/২৩০, কিতাবুর রিকাক, বাব, ইযা তাকাররাবাল আবদু ইলাল্লাহ, আনাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত হাদীস। ইমাম তিরমিযী রহ. বলেছেন, হাদীসটি গরীব, এ সনদ ব্যতীত এর অন্য কোন সনদ জানা নেই। আলবানী রহ. হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন, দেখুন, সিলসিলাতুল সহীহাহ, ১/২০০।

[181] আল-হাক্কুল ওয়াদিহ আল-মুবীন, পৃ. ৭৩-৭৪।

[182] এ নামের দলিল আল্লাহর নিম্নোক্ত বাণী,

﴿وَوَجَدَكَ عَآئِلٗا فَأَغۡنَىٰ٨﴾ [الضحى: ٨]

“তিনি তোমাকে পেয়েছেন নি:স্ব। অতঃপর তিনি সমৃদ্ধ করেছেন।” [সূরা আদ-দুহা, আয়াত: ৮]

[183] আত-তাফসীর, ৫/৬২৯।

[184] আল-হাক্কুল ওয়াদিহ আল-মুবীন, পৃ. ৪৭-৪৮।

[185] এ নামের দলিল হলো আল্লাহর নিম্নোক্ত বাণী,

﴿قُلۡ يَجۡمَعُ بَيۡنَنَا رَبُّنَا ثُمَّ يَفۡتَحُ بَيۡنَنَا بِٱلۡحَقِّ وَهُوَ ٱلۡفَتَّاحُ ٱلۡعَلِيمُ٢٦﴾ [سبا: ٢٦]

“বলুন, আমাদের রব আমাদেরকে একত্র করবেন। তারপর তিনি আমাদের মধ্যে সঠিকভাবে ফয়সালা করবেন। আর তিনিই শ্রেষ্ঠ ফয়সালাকারী ও সম্যক পরিজ্ঞাত।” [সূরা সাবা’, আয়াত : ২৬]

[186] আত-তাফসীর, ৫/৬২৬।

[187] আল-হাক্কুল ওয়াদিহ আল-মুবীন, পৃ. ৮৪।

[188] এটি আল্লাহর নাম হওয়ার দলিল পাইনি। শাইখ সুলাইমান ইবন আব্দুল্লাহ তাইসীরুল আযীযিল হামীদ (পৃ. ৬৪৪) কিতাবে বলেছেন, ‘আল্লাহকে ফা‘আলুল লিমা ইউরীদ (তিনি তা-ই করেন যা চান), আল-ফালিক (বীজ থেকে অংকুর নির্গতকারী) ও আল-মুখরিজ (বেরকারী) নামকরণ করা সহীহ নয়…. তাছাড়া এ ব্যাপারে সহীহ হাদীসেও কিছু আসে নি।’

[189] আত-তাফসীর, ৫/৬২৯।

[190] আত-তাফসীর, ৫/৬০৫।

[191] ‘আল-বাসিত’ নামের সাথে এ নামের আলোচনা ইতিপূর্বে আলোচনা করা হয়েছে।

[192] আল-হাক্কুল ওয়াদিহ আল-মুবীন, পৃ. ৬৪০; আত-তাফসীর, ১/২২৪, ৩/৪৩৭ ও ৫/৬৩০।

[193] ‘আস-সালাম’ নামের সাথে এ নামের আলোচনা ইতিপূর্বে করা হয়েছে।

[194] আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,

﴿وَٱللَّهُ قَدِيرٞۚ وَٱللَّهُ غَفُورٞ رَّحِيمٞ٧﴾ [الممتحنة : ٧]

“আর আল্লাহ সর্ব শক্তিমান এবং আল্লাহ অতিশয় ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।” [সূরা আল-মুমতাহিনা, আয়াত: ৭]

[195] আত-তাফসীর, ৫/৬২৪-৬২৫।

[196] আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,

﴿قُلِ ٱللَّهُ خَٰلِقُ كُلِّ شَيۡءٖ وَهُوَ ٱلۡوَٰحِدُ ٱلۡقَهَّٰرُ١٦﴾ [الرعد: ١٦]

“বলুন, ‘আল্লাহই সবকিছুর সৃষ্টিকর্তা এবং তিনি  এক, একচ্ছত্র ক্ষমতাধর’। [সূরা আর-রাদ, আয়াত” ১৬]

[197] আত-তাফসীর, ৫/৬২৪ ও ৬/৪৪৮।

[198] আল-হাক্কুল ওয়াদিহ আল-মুবীন, পৃ. ৭৬; তাওদীহুল কাফিয়া, পৃ. ১২৬।

[199] ‘আল-আযীয’ নামের সাথে এ নামের আলোচনা করা হয়েছে।

[200] ‘আলা-হাই’ নামের সাথে এ নামের আলোচনা করা হয়েছে।

[201] আল-কাফী আল্লাহর নাম হওয়ার ব্যাপারে আমি কোন দলিল পাই নি।

[202] আত-তাফসীর, ৫/৬৩১।

[203] আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,

﴿عَٰلِمُ ٱلۡغَيۡبِ وَٱلشَّهَٰدَةِ ٱلۡكَبِيرُ ٱلۡمُتَعَالِ٩﴾ [الرعد: ٩]

“তিনি গায়েব ও প্রকাশ্যের জ্ঞানী, মহান, সর্বোচ্চ।” [সূরা আর-রাদ, আয়াত: ৯]

[204] এ নামের সর্ম্পকে বিস্তারিত আলোচনা ‘আল-জালীল’ নামের সাথে আলোচনা করা হয়েছে।

[205] আত-তাফসীর, ৬/১৭১ ও ৫/৬২২।

[206] আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,

﴿وَمَنْ شَكَرَ فَإِنَّمَا يَشْكُرُ لِنَفْسِهِ وَمَنْ كَفَرَ فَإِنَّ رَبِّي غَنِيٌّ كَرِيمٌ﴾ [النمل: 40]

“আর যে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে সে তো তার নিজের কল্যাণেই তা করে, আর যে কেউ অকৃতজ্ঞ হবে, তবে নিশ্চয় আমার রব অভাবমুক্ত, অধিক দাতা।” [সূরা আন-নামাল, আয়াত: ৪০]

[207] ‘আল-বার’ নামের সাথে এ নামের বিস্তারিত আলোচনা ইতিপূর্বে হয়েছে।

[208] আত-তাফসীর, ৫/৫৮০ ও ৫/৬২২।

[209] আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,

﴿لَّا تُدۡرِكُهُ ٱلۡأَبۡصَٰرُ وَهُوَ يُدۡرِكُ ٱلۡأَبۡصَٰرَۖ وَهُوَ ٱللَّطِيفُ ٱلۡخَبِيرُ١٠٣﴾ [الانعام: ١٠٣]

“চক্ষুসমূহ তাকে আয়ত্ব করতে পারে না। আর তিনি চক্ষুসমূহকে আয়ত্ব করেন। আর তিনি সূক্ষ্মদর্শী, সম্যক অবহিত।” [সূরা আল-আন‘আম, আয়াত: ১০৩]

[210] তাওদীহুল কাফিয়া আশ-শাফিয়া, পৃ. ১২৩; আত-তাফসীর, ৫/৬২৫।

[211] তিরমিযী, ৫/৫২৩, কিতাব দাওয়াত, হাদীস নং ৩৪৯১, ইমাম তিরমিযী রহ. হাদীসটিকে হাসান গরীব বলেছেন। আব্দুল কাদির আরনাঊত বলেছেন, ইমাম তিরমিযী হাদীসটিকে হাসান বলেছেন, দেখুন জামু‘উল উসূল, ৫/৩৪১; আলবানী রহ. হাদীসটিকে দ‘ঈফ বলেছেন, দেখুন, দ‘ঈফুল জামে‘, পৃ. ৪৫৩-৪৫৪।

[212] আল-হাক্কুল ওয়াদিহ আল-মুবীন, পৃ. ৬১-৬২।

[213] এটি আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত হাদীসের অর্থ বিশেষ। হাদীসটি বুখারী ৮/২০, কিতাবুল হুদুদ, বাব, ফাহিশা কাজ ত্যাগের ফযিলত এবং মুসলিম ২/৭১৫, কিতাবুদ দো‘আ, বাব, গোপনে সাদকা করার ফযিলত পরিচ্ছেদে বর্ণিত আছে।

[214] আল-মাওয়াহিবুর রাব্বানিয়্যাহ মিনাল আয়াতিল কুরআনিয়্যাহ, পৃ. ৭১-৭৬।

[215] আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,

﴿مَٰلِكِ يَوۡمِ ٱلدِّينِ٤﴾ [الفاتحة: ٤]

“বিচার দিবসের মালিক।” [সূরা আল-ফাতিহা, আয়াত: ৪]

[216] আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,

﴿فَتَعَٰلَى ٱللَّهُ ٱلۡمَلِكُ ٱلۡحَقُّۖ لَآ إِلَٰهَ إِلَّا هُوَ رَبُّ ٱلۡعَرۡشِ ٱلۡكَرِيمِ١١٦﴾ [المؤمنون : ١١٦]

“সুতরাং সত্যিকারের মালিক আল্লাহ মহিমান্বিত, তিনি ছাড়া কোন (সত্য) ইলাহ নেই; তিনি সম্মানিত ‘আরশের রব।” [সূরা আল-মুমিনূন, আয়াত: ১১৬]

[217] আত-তাফসীর, ৫/৬২০।

[218] আত-তাফসীর, ৫/৬২০।

[219] আল-হাক্কুল ওয়াদিহ আল-মুবীন, পৃ. ১০৪।

[220] এ নামের সমার্থক ‘আল-বাসিত’ নামের সাথে এ নামের বিস্তারিত আলোচনা উল্লেখ করা হয়েছে।

[221] আল-হাক্কুল ওয়াদিহ আল-মুবীন, পৃ. ৮৯।

[222] আত-তাফসীর, ৫/৬২৮।

[223] এ নাম দুটি আসমাউল হুসনা হওয়ার কোন সহীহ দলিল আমি পাইনি।

[224] আত-তাফসীর, ৫/৬২৮-৬২৯।

[225] আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,

﴿هُوَ ٱللَّهُ ٱلَّذِي لَآ إِلَٰهَ إِلَّا هُوَ ٱلۡمَلِكُ ٱلۡقُدُّوسُ ٱلسَّلَٰمُ ٱلۡمُؤۡمِنُ ٱلۡمُهَيۡمِنُ ٱلۡعَزِيزُ ٱلۡجَبَّارُ ٱلۡمُتَكَبِّرُۚ سُبۡحَٰنَ ٱللَّهِ عَمَّا يُشۡرِكُونَ٢٣﴾ [الحشر: ٢٣]

“তিনিই আল্লাহ; যিনি ছাড়া কোন ইলাহ নেই, তিনিই বাদশাহ, মহাপবিত্র, ত্রুটিমুক্ত, নিরাপত্তাদানকারী, রক্ষক, মহাপরাক্রমশালী, মহাপ্রতাপশালী, অতীব মহিমান্বিত, তারা যা শরীক করে তা হতে পবিত্র মহান।” [সূরা আল-হাশর, আয়াত: ২৩]

[226] আত-তাফসীর, পৃ. ৬২৪।

[227] আল্লাহর আরেক নাম আল-আযীযের ব্যাখায় এ নামের ব্যাখ্যা আলোচনা করা হয়েছে।

[228] আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,

﴿إِنَّ رَبِّي قَرِيبٞ مُّجِيبٞ٦١﴾ [هود: ٦١]

“নিশ্চয় আমার রব নিকটে, সাড়াদানকারী।” [সূরা হূদ, আয়াত: ৬১]

[229] এটি দ্বিতীয় প্রকারের দো‘আ কবুল হওয়া, যা গ্রন্থকার তার কিতাবে উল্লেখ করেছেন।

[230] আল-হাক্কুল ওয়াদিহ আল-মুবীন, পৃ. ৬৫-৬৬; তাওদীহুল কাফিয়া আশ-শাফিয়া, পৃ. ১২৪; আত-তাফসীর, ৩/৪৩৭ ও ৫/৬৩০।

[231] আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,

﴿رَحۡمَتُ ٱللَّهِ وَبَرَكَٰتُهُۥ عَلَيۡكُمۡ أَهۡلَ ٱلۡبَيۡتِۚ إِنَّهُۥ حَمِيدٞ مَّجِيدٞ٧٣﴾ [هود: ٧٣]

“হে নবী পরিবার, আপনাদের ওপর আল্লাহর রহমত ও তাঁর বরকত। নিশ্চয় তিনি প্রশংসিত সম্মানিত।” [সূরা হূদ, আয়াত: ৭৩]

[232] আল-হাক্কুল ওয়াদিহ আল-মুবীন, পৃ. ৩৩; আত-তাফসীর, ৫/৬২২; তাওদীহুল কাফিয়া আশ-শাফিয়া, পৃ. ১৮৮।

[233] আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,

﴿وَكَانَ ٱللَّهُ بِكُلِّ شَيۡءٖ مُّحِيطٗا١٢٦﴾ [النساء : ١٢٦]

“আর আল্লাহ সবকিছুকে পরিবেষ্টনকারী।” [সূরা আন-নিসা, আয়াত: ১২৬]

[234] আত-তাফসীর, ৫/৬২৫।

[235] ‘আল-বাসীত’ নামের সাথে এ নামদ্বয়ের আলোচনা করা হয়েছে।

[236] ‘আল-বারী’ নামের সাথে এ নামের আলোচনা করা হয়েছে।

[237] ‘আল-বাসীত’ নামের সাথে এ নামদ্বয়ের আলোচনা করা হয়েছে।

[238] ‘আল-মানি‘’ নামের সাথে এ নামের আলোচনা করা হয়েছে।

[239] ‘আল-মুবদীয়ু’ নামের সাথে এ নামের আলোচনা করা হয়েছে।

[240] ‘আল-গানীয়ু’ নামের সাথে এ নামের আলোচনা করা হয়েছে।

[241] এটি আল্লাহর নাম হওয়ার ব্যাপারে সহীহ কোন প্রমাণ আমি পাই নি।

[242] তাওদীহুল কাফিয়া আশ-শাফিয়া, পৃ. ১২৪।

[243] আল-হাক্কুল ওয়াদিহ আল-মুবীন, পৃ. ৬৭।

[244] রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাশাহুদ ও সালামের মাঝে সর্বশেষ এ দু‘আ পাঠ করতেন:

«اللهُمَّ اغْفِرْ لِي مَا قَدَّمْتُ وَمَا أَخَّرْتُ، وَمَا أَسْرَرْتُ وَمَا أَعْلَنْتُ، وَمَا أَسْرَفْتُ، وَمَا أَنْتَ أَعْلَمُ بِهِ مِنِّي، أَنْتَ الْمُقَدِّمُ وَأَنْتَ الْمُؤَخِّرُ، لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ».

“হে আল্লাহ! ক্ষমা করুন আমার পূর্ববর্তী ও পরবর্তী গুনাহ, যা আমি গোপন করেছি ও যা আমি প্রকাশ্যে করেছি, যা আমি সীমালঙ্ঘন করেছি এবং সে সকল অপরাধ যা আপনি আমার চেয়ে অধিক অবগত। আপনি সর্বাগ্রে সহায়তা প্রদানকারী ও বিলম্বে সহায়তাকারী (এ বিষয়ে এগিয়ে দেওয়ার ও পিছিয়ে দেওয়ার মালিক)। আপনি ব্যতীত কোন (সত্য) ইলাহ নেই। সহীহ মুসলিম, ১/৫৩৫, কিতাব, মুসাফিরের সালাত, বাব, রাতের সালাতের দো‘আ, হাদীস নং ৭৭১, হাদীসটি আলী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত।

[245] আল-হাক্কুল ওয়াদিহ আল-মুবীন, পৃ. ১০০-১০১।

[246] এ নামের দলিল হলো আল্লাহর নিম্নোক্ত বাণী,

﴿وَكَانَ ٱللَّهُ عَلَىٰ كُلِّ شَيۡءٖ مُّقِيتٗا٨٥﴾ [النساء : ٨٥]

“আর আল্লাহ প্রতিটি বিষয়ের সংরক্ষণকারী।” [সূরা আন-নিসা, আয়াত: ৮৫]

[247] আত-তাফসীর, ৫/৬২৫।

[248] ‘আল-মালিক’ (المالك) নামের সাথে এ নামের বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।

[249] এ নামের দলিল আল্লাহ তা‘আলার নিম্নোক্ত বাণী,

﴿هُوَ ٱللَّهُ ٱلَّذِي لَآ إِلَٰهَ إِلَّا هُوَ ٱلۡمَلِكُ ٱلۡقُدُّوسُ ٱلسَّلَٰمُ ٱلۡمُؤۡمِنُ ٱلۡمُهَيۡمِنُ ٱلۡعَزِيزُ ٱلۡجَبَّارُ ٢٣ ﴾ [الحشر: ٢٣]

“তিনিই আল্লাহ; যিনি ছাড়া কোন ইলাহ নেই, তিনিই বাদশাহ, মহাপবিত্র, ত্রুটিমুক্ত, নিরাপত্তাদানকারী, রক্ষক, মহাপরাক্রমশালী, মহাপ্রতাপশালী, অতীব মহিমান্বিত।” [সূরা আল-হাশর, আয়াত: ২৩]

[250] আত-তাফসীর, ৫/৬২৪।

[251] ‘আল-মুকাদ্দিম’ নামের সাথে এ নামের আলোচনা করা হয়েছে।

[252] এ নামের দলিল আল্লাহ তা‘আলার নিম্নোক্ত বাণী,

﴿هُوَ ٱللَّهُ ٱلَّذِي لَآ إِلَٰهَ إِلَّا هُوَ ٱلۡمَلِكُ ٱلۡقُدُّوسُ ٱلسَّلَٰمُ ٱلۡمُؤۡمِنُ ٱلۡمُهَيۡمِنُ ٱلۡعَزِيزُ ٱلۡجَبَّارُ ٢٣ ﴾ [الحشر: ٢٣]

“তিনিই আল্লাহ; যিনি ছাড়া কোন ইলাহ নেই, তিনিই বাদশাহ, মহাপবিত্র, ত্রুটিমুক্ত, নিরাপত্তাদানকারী, রক্ষক, মহাপরাক্রমশালী, মহাপ্রতাপশালী, অতীব মহিমান্বিত।” [সূরা আল-হাশর, আয়াত: ২৩]

[253] আত-তাফসীর, ৫/৬২৪।

[254] ‘আল-বাসিত’ নামের সাথে এ নামের আলোচনা করা হয়েছে।

[255] এ নামের দলিল আল্লাহর নিম্নোক্ত বাণী,

﴿ٱللَّهُ نُورُ ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَٱلۡأَرۡضِ٣٥﴾ [النور : ٣٥]

“আল্লাহ আসমানসমূহ ও জমিনের নূর।” [সূরা আন-নূর, আয়াত: ৩৫]

[256] তাওদীহুল কাফিয়া আশ-শাফিয়া, পৃ. ১২৫।

[257] আত-তাফসীর, ৫/৬২৮।

[258] সহীহ মুসলিম, ১/৫২৯, কিতাব, মুসাফিরদের সালাত ও কসর, বাব, সালাতে দো‘আ, হাদীস নং ৭৬৩, হাদীসটি ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত।

[259] তাওদীহুল কাফিয়া আশ-শাফিয়া, পৃ. ১২৯-১৩০।

[260] আল-হাক্কুল ওয়াদিহ আল-মুবীন, পৃ. ৯৪-৯৫।

[261] এ নামটি আসমাউল হুসনা হওয়ার ব্যাপারে কোন সহীহ দলিল আমি পাই নি; তবে এটি সিফাতের শব্দে আল-কুরআনে উল্লেখ আছে। যেমন, আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,

﴿وَكَفَىٰ بِرَبِّكَ هَادِيٗا وَنَصِيرٗا٣١﴾ [الفرقان: ٣١]

“আর পথপ্রদর্শক ও সাহায্যকারী হিসেবে তোমার রবই যথেষ্ট।” [সূরা আল-ফুরকান, আয়াত: ৩১]

[262] আত-তাফসীর, ৫/৬৩১।

[263] ‘আল-আহাদ’ নামের সাথে এ নামের আলোচনা করা হয়েছে।

[264] এ নামের দলিল হলো আল্লাহর নিম্নোক্ত বাণী,

﴿وَٱللَّهُ يَعِدُكُم مَّغۡفِرَةٗ مِّنۡهُ وَفَضۡلٗاۗ وَٱللَّهُ وَٰسِعٌ عَلِيمٞ٢٦٨﴾ [البقرة: ٢٦٨]

“আর আল্লাহ তোমাদেরকে তার পক্ষ থেকে ক্ষমা ও অনুগ্রহের প্রতিশ্রুতি দেন। আর আল্লাহ প্রাচুর্যময়, সর্বজ্ঞ।” [সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ২৬৮]

[265] আত-তাফসীর, ৫/৬৩১।

[266] এ নামের দলিল হলো আল্লাহর নিম্নোক্ত বাণী,

﴿وَهُوَ ٱلۡغَفُورُ ٱلۡوَدُودُ١٤﴾ [البروج: ١٤]

আর তিনি অত্যন্ত ক্ষমাশীল, প্রেমময়। [সূরা আল-বুরূজ, আয়াত: ১৪]

[267] আল-হাক্কুল ওয়াদিহ আল-মুবীন, পৃ. ৬৯।

[268] আত-তাফসীর, ৫/৬২৬।

[269] আল-হাক্কুল ওয়াদিহ আল-মুবীন, পৃ. ৬৯-৭০; তাওদীহুল কাফিয়া আশ-শাফিয়া, পৃ. ১২৪-১২৫।

[270] এ নামের দলিল হলো আল্লাহর নিম্নোক্ত বাণী,

﴿ٱللَّهُ خَٰلِقُ كُلِّ شَيۡءٖۖ وَهُوَ عَلَىٰ كُلِّ شَيۡءٖ وَكِيلٞ٦٢﴾ [الزمر: ٦١]

“আল্লাহ সব কিছুর স্রষ্টা এবং তিনি সব কিছুর তত্ত্বাবধায়ক।” [সূরা আয-যুমার, আয়াত: ৬১]

[271] ‘আল-বার’ নামের সাথে এ নামের বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

Back to top button
error: Content is protected !!