লা তাহযান-হতাশ হবেন না ১-২১ পরিচ্ছেদ

www.hadithbd.com এর সৌজন্যে

লা ত্হযান

ড. আয়য আল কারনী

১. হে আল্লাহ!

يَسْأَلُهُ مَنْ فِي السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ كُلَّ يَوْمٍ هُوَ فِي شَأْنٍ

“আকাশসমূহ ও পৃথিবীতে যা কিছু আছে সবই তার কাছে সাহায্য প্রার্থনা করে। প্রতি মুহুর্তে তিনি কাজে রত।” (৫৫-সূরা আর রাহমান: আয়াত-২৯)

(যেমন কাউকে সম্মান দান করা, কাউকে অপমানিত করা, নবসৃষ্টির মাধ্যমে কাউকে জীবন দান করা, কাউকেবা মৃত্যু দান করা ইত্যাদি কাজে রত)।

যখন বিক্ষুব্ধ ঝঞা বায়ুতে সমুদ্র উত্তাল-তরঙ্গায়িত থাকে, তখন নৌকার আরোহীগণ আর্তনাদ করে বলে, “হে আল্লাহ!”

যখন মরুভূমিতে উট চালক ও কাফেলা পথ হারিয়ে ফেলে তখন তারা আর্তচিৎকার করে বলে, “হে আল্লাহ!”

যখন বিপর্যয় ও দুর্যোগ দেখা দেয় তখন দুর্দশাগ্রস্তরা বলে উঠে, “হে আল্লাহ!”

দরজা দিয়ে যখন কেউ প্রবেশ করতে চায় আর তার সামনেই দরজা বন্ধ করে দেয়া হয় এবং অভাবীদের সামনে যখন বাধার প্রাচীর নির্মাণ করা হয় তখন তারা চিৎকার দিয়ে বলে, “হে আল্লাহ!”

যখন সকল পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়, সকল আশা ভঙ্গ হয়ে যায় এবং পথ সংকীর্ণ হয়ে যায় তখন ডাক পড়ে, “হে আল্লাহ!”

বিশাল, বিস্তীর্ণ ও প্রশস্ত হওয়া সত্ত্বেও পৃথিবী যখন আপনার কাছে সংকীর্ণ মনে হয়, নিজেকে সংকুচিত ভাবতে পরিস্থিতি বাধ্য করে তখন আপনি ডাক দিয়ে বলুন, “হে আল্লাহ!”

সকল ভালো কথা, একান্ত অনুনয়-বিনয়, নিরপরাধীর আঁখিজল এবং বিপদগ্রস্তের সাহায্য প্রার্থনা-সবই আল্লাহর দরবারে পৌছে। অভাব-অনটন এবং বিপদাপদের সময় দু’হাত ও দু’চোখ তার দিকেই প্রসারিত হয়। জিহ্বা তার নাম সুমধুর কণ্ঠে জপে। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা কতই না উত্তম ও উৎকৃষ্ট! কতই না মহান যখন আমরা তাকে স্মরণ করি তখন হৃদয় প্রশান্তি লাভ করে, আত্মা স্থিরতা লাভ করে, স্নায়ু বিশ্রাম নেয় আর বোধশক্তি জেগে উঠে।

“আল্লাহ নাম হলো সুন্দরতম নাম, বিশুদ্ধতম বর্ণ-সংযোজন এবং সর্বাধিক মূল্যবান শব্দ।

هَلْ تَعْلَمُ لَهُ سَمِيًّا

“তুমি কি এমন কিছু জান বা চেন যা তার অনুরূপ।” (সূরা-১৯ মারইয়াম: আয়াত-৬৫)

لَيْسَ كَمِثْلِهِ شَيْءٌ وَهُوَ السَّمِيعُ الْبَصِيرُ

তার মতো কিছু নেই, আর তিনি হলেন সর্বশ্রোতা, সর্বদ্ৰষ্টা।” (৪২-সূরা-শুরা: আয়াত-১১)

যখন পরম সমৃদ্ধি, শক্তি সত্তা, মর্যাদা ও প্রজ্ঞার কথা মনে আসে তখন ‘আল্লাহ’ নাম মনে হয়।

لِمَنِ الْمُلْكُ الْيَوْمَ لِلَّهِ الْوَاحِدِ الْقَهَّارِ

আজ রাজত্ব কার? (আল্লাহ নিজেই নিজের প্রশ্নের উত্তর দিবেন)। আল্লাহর-যিনি একক, মহাপরাক্রমশালী!” (৪০-সূরা আল মু’মিন: আয়াত-১৬)

যখন দয়া, যত্ন, সাহায্য, স্নেহ-মমতা ও অনুকম্পার কথা মনে আসে তখন ‘আল্লাহ’ নাম মনে পড়ে।

وَمَا بِكُمْ مِنْ نِعْمَةٍ فَمِنَ اللَّهِ

“আর তোমাদের নিকট যত নিয়ামত রয়েছে সবই আল্লাহর পক্ষ থেকে।” – (১৬-সূরা আন নাহল: আয়াত-৫৩)

আল্লাহ হলেন মর্যাদা, মাহাত্ম্য ও শক্তিমত্তায় অধিকারী। হে আল্লাহ! আরাম-আয়েশকে দুঃখ-কষ্টের স্থান দখল করতে দিন ।

হে আল্লাহ্ ঈমানের শীতলতা দ্বারা হৃদয়ের জ্বালা নিবারণ করুন।

হে আমাদের প্রভু! বিনিদ্র রজনী যাপনকারীকে সুখনিদ্রা দান করুন এবং অসুখী আত্মাকে শান্তি প্রদান করুন।

হে আমাদের প্রতিপালক বিভ্রান্তদেরকে আপনার আলোর এবং পথভ্রষ্টদেরকে আপনার হেদায়েতের পথে পরিচালিত করুন।

হে আল্লাহ! আমাদের অন্তরসমূহ হতে কুমন্ত্রণা দূর করে দিন এবং আমাদের অন্তরসমূহকে আলো দ্বারা পরিপূর্ণ করে দিন, মিথ্যাকে সত্য দ্বারা ধ্বংস করে দিন এবং শয়তানের কুচক্রকে আপনার ফেরেশতা বাহিনী দিয়ে দুমড়ে-মুচড়ে দিন। হে আল্লাহ আমাদের থেকে দারিদ্র্যতা, ক্লেশ ও উদ্বেগ চিরতরে দূর করে দিন। আপনাকে ব্যতীত অন্যকে ভয় করা, আপনাকে ছাড়া অন্যের উপর ভরসা করা, আপনাকে বাদ দিয়ে অন্যের প্রতি আমাদের পূর্ণ আস্থা স্থাপন করা এবং আপনি ছাড়া অন্যের নিকট সাহায্য প্রার্থনা করা থেকে আমরা আপনার নিকট আশ্রয় চাই। আপনি হলেন সর্বোৎকৃষ্ট পৃষ্ঠপোষক ও পরমোৎকৃষ্ট পালনকর্তা ও রক্ষাকর্তা।

২. একটু ভেবে দেখুন এবং কৃতজ্ঞ হোন

আপনার প্রতি আল্লাহ্ তা’য়ালার অসংখ্য করুণার কথা স্মরণ করুন, কীভাবে সে করুণাসমূহ আপনাকে আপাদমস্তক বেষ্টন করে রেখেছে-আসলে সর্বদিক দিয়েই ঐ করুণাসমূহ আপনাকে ঘিরে রেখেছে।

وَإِنْ تَعُدُّوا نِعْمَتَ اللَّهِ لَا تُحْصُوهَا

“যদি তুমি আল্লাহর নিয়ামতরাজিকে গণনা করতে চাও তবে তা তুমি কখনও গণনা করে শেষ করতে পারবে না।” (১৪-সূরা ইবরাহীম: আয়াত-৩৪)

সুস্থতা, নিরাপত্তা, খাদ্য, বস্ত্র, বায়ু ও পানি ইত্যাদি সবকিছুই দুনিয়াটাকে আপনার বলে ঘোষণা দিচ্ছে-তবুও আপনি বুঝতে পারছেন না। জীবন ধারণের জন্য অপরিহার্য প্রয়োজনীয় যা কিছু থাকতে হয় তার সবকিছুই আপনার আছে- তবুও আপনি অজ্ঞই থেকে গেলেন।

وَأَسْبَغَ عَلَيْكُمْ نِعَمَهُ ظَاهِرَةً وَبَاطِنَةً

“তিনি তোমাদের উপর তার প্রকাশ্য ও গোপন নিয়ামতসমূহ পূর্ণ করে রেখেছেন।” (৩১-সূরা লুকমান: আয়াত-২০) (প্রকাশ্য নিয়ামত হল ইসলামী একত্ববাদ বা তাওহীদ এবং সুস্থতা, সৌন্দর্য ইত্যাদিসহ এ জগতের বৈধ যৌন আমোদপ্রমোদ। আর অপ্রকাশ্য বা গোপন নিয়ামত হল আল্লাহর প্রতি কারো ঈমান, আমলে সালেহ বা সৎকাজের জন্য পথনির্দেশক, কুরআনের উপর ঈমান এবং আখেরাতে বেহেশতের আনন্দ-ফুর্তি ইত্যাদির প্রতি ঈমান।)

নিজের আয়ত্তে আপনার দুটি আঁখি, একটি জিহ্বা, দুটি ঠোট, দুটি হাত আর দুটি পা আছে। (একটু ভেবে দেখুন ও কৃতজ্ঞ হোন -অনুবাদক)

فَبِأَيِّ آلَاءِ رَبِّكُمَا تُكَذِّبَانِ

“সুতরাং (হে জ্বীন ও ইনসান জাতি!) তোমরা উভয় জাতি তোমাদের প্রতিপালকের কোন কোন নিয়ামতকে অস্বীকার করবে? (৫৫-সূরা আর রাহমান: আয়াত-১৩)

পা ছাড়া হাটার কথা কল্পনা করতে পারেন কি? আপনি কি এ বিষয়টি হাল্কা করে দেখবেন যে, আপনি সুখে নিদ্রা যাচ্ছেন, অথচ দুঃখ-যাতনা, দুর্দশা ও দুরাবস্থা বহুলোকের নিদ্রার অন্তরায় হয়ে আছে। আপনি একথা কি ভুলে যাবেন যে, আপনি সুস্বাদু খাদ্য ও শীতল পানি উভয়টা দ্বারা নিজের উদর পূর্তি করছেন অথচ রোগ-বালাইয়ের কারণে কিছু লোকের পক্ষে সুখাদ্য ও সুপেয় পানীয়ের মজা উপভোগ করা অসম্ভব হয়ে আছে। আপনার শ্রবণশক্তি ও দর্শনশক্তির কথা ভেবে দেখুন! আপনার সুস্থ ত্বকের দিকে তাকান এবং আপনি যে চর্মরোগ থেকে মুক্ত আছেন এজন্য আল্লাহর কাছে শুকরিয়া জ্ঞাপন করুন। আপনার বিবেচনা শক্তির কথা গভীরভাবে ভেবে দেখুন ও যারা মানসিক রোগে ভুগছে তাদের কষ্টের কথা একটুখানি মনে করে দেখুন।

উহুদ পাহাড়সমস্বর্ণের বিনিময়ে আপনি কি আপনার শ্রম ও দর্শন ক্ষমতা বিক্রি করে দিবেন নাকি আপনার কথা বলার ক্ষমতা বিশাল বিশাল অট্টালিকার বিনিময়ে বিক্রি করে দিবেন? আপনাকে প্রচুর অনুগ্রহ দান করা হয়েছে, তবুও আপনি না জানার ভান করছেন! টাটকা খাবার, শীতল পানি, সুখপ্রদ নিদ্রা এবং সুস্বাস্থ্য সত্ত্বেও আপনি হতাশ ও বিষগ্ন থাকছেন। আপনার যা নেই তা নিয়ে ভাবছেন এবং যা আপনাকে দান করা হয়েছে তার নিমিত্তে কৃতজ্ঞ হওয়ার পরিবর্তে বরং অকৃতজ্ঞ হচ্ছেন! সম্পদের ক্ষতি নিয়ে আপনি বিব্রত, তথাপি অনেক কল্যাণের চাবিকাঠি আপনার হাতে ন্যস্ত। একটু ভেবে দেখুন এবং কৃতজ্ঞ হন।

وَفِي أَنْفُسِكُمْ أَفَلَا تُبْصِرُونَ

“এবং তোমাদের নিজেদের মধ্যেও (আমার নিদর্শন আছে), তাহলে তোমরা কি (তা) দেখতে পাও না?” (৫১-সূরা যারিয়াত: আয়াত-২১)

আপনার নিজের কথা, আপনার পরিবারের কথা, আপনার বন্ধু-বান্ধবের এবং আপনার চারপাশের গোটা দুনিয়ার কথা গভীরভাবে চিন্তা-গবেষণা করুন।

يَعْرِفُونَ نِعْمَتَ اللَّهِ ثُمَّ يُنكِرُونَهَا وَأَكْثَرُهُمُ الْكَافِرُونَ

তারা আল্লাহর নিয়ামতকে অনুধাবন করতে পারে, তবুও তা তারা অস্বীকার করে তাদের অধিকাংশই কাফের। (১৬-সূরা আন নাহল: আয়াত-৮৩)

৩. অতীত চিরদিনের মতো চলে গেছে

কোনো ব্যক্তি অতীতের দুঃখজনক ঘটনাকে কেন্দ্র করে বসে বসে চিন্তা-ভাবনা করে শুধু এক ধরনের পাগলামিই দেখাতে পারে- যে পাগলামি বর্তমান জীবন-যাপন করার বা উপস্থিত মুহুর্তে বেঁচে থাকার দৃঢ় সংকল্পকে ধ্বংস করে দেয়ার মতো এক ধরনের রোগ। যাদের দৃঢ় সংকল্প আছে তারা অতীতের ঘটনাবলিকে ধুয়ে মুছে ফেলে দিয়ে ভুলে গিয়েছে। এ ঘটনাগুলো আর কখনও সত্যের পথে বাধা হয়ে দাড়াবে না।

কেননা, সেগুলো বিস্মৃতির অতল গহ্বরে তলিয়ে গেছে। অতীতের উপাখ্যান শেষ হয়ে গেছে; দুঃখ ওগুলোর ক্ষতিপূরণ করতে পারে না, বিষন্নতা সেগুলোকে সংশোধন করতে পারে না, আর হতাশা কখনও অতীতকে পুনরুজ্জীবন দান করতে পারবে না। কেননা, অতীত চিরকাল অতীত— তা অস্তিত্বহীন। অতীতের দুঃস্বপ্ন দেখবেন না বা যা আপনি হারিয়েছেন তার মিছে আশা করবেন না। অতীতের ভূতের আবির্ভাব হতে নিজেকে রক্ষা করুন। আপনি কি মনে করেন যে, আপনি সূর্যকে তার উদয়স্থলে, শিশুকে তার মায়ের জঠরে, দুধকে পশুর ওলানে অথবা অশ্রুকে আঁখিতে ফিরিয়ে দিতে পারবেন? অতীত ও অতীতের ঘটনাবলি নিয়ে অনবরত চিন্তা-ভাবনা করে আপনি নিজেকে এক অতি ভয়ংকর ও শোচনীয় মানসিক অবস্থায় উপনীত করবেন।

অতীত নিয়ে অতিরিক্ত গবেষণা বর্তমানের অপচয় মাত্র। পূর্ববতী জাতিদের কার্যকলাপ উল্লেখপূর্বক মহান আল্লাহ তায়ালা বলেন-

تِلْكَ أُمَّةٌ قَدْ خَلَتْ

এটা ছিল এমনই এক জাতি যা অতিবাহিত হয়ে গিয়েছে। (২-সূরা বাকারা: আয়াত-১৩৪)

অতীতের দিনগুলো চলে গেছে ও শেষ হয়ে গেছে, আর ইতিহাসের চাকা উল্টোদিকে বা পিছন দিকে ঘুরিয়ে তাদের ময়না তদন্ত করে আপনার কোনো লাভ হবে না।

যে লোক অতীতের চিন্তায় বিভোর থাকে, সে তো ঐ লোকের মতো যে লোক কাঠের গুড়াকে করাত দিয়ে চেরাই করতে চায়। যে ব্যক্তি অতীত নিয়ে কান্না-কাটি, হা-হুতাশ ও দুঃখ করত এমন ব্যক্তিকে প্রাচীনকালে বলা হতো- “মৃতদেরকে তাদের কবর থেকে তুলিও না।”

আমাদের দুঃখজনক ব্যাপার এই যে, আমরা বর্তমানের সাথে সম্পর্ক রক্ষা করতে পারি না; আমাদের সুন্দর সুন্দর প্রাসাদকে অবহেলা করে আমরা ধ্বংস দালানকোঠার জন্য হাউ মাউ করে কান্না-কাটি করি। সকল জ্বীন ও ইনসান একত্রে অতীতকে ফিরিয়ে আনতে চাইলেও তারা অতি নিশ্চিতভাবেই ব্যর্থ হবে। পৃথিবীর সবকিছুই সন্মুখপানে এগিয়ে চলছে, একটি নতুন ঋতুর জন্য প্রস্তুত হচ্ছে-আপনাকেও তাই করতে হবে। (অর্থাৎ আপনাকেও একটি নতুন জীবনের জন্য প্রস্তুত হতে হবে ও সামনে এগিয়ে চলতে হবে। -অনুবাদক)

৪. মনে করুন আজই শেষ দিন

আপনি যখন প্রত্যুষে জেগে উঠবেন তখন সন্ধ্যাকে প্রত্যক্ষ করার আশা করবেন না বরং এমনভাবে জীবনযাপন করুন যেন আজই আপনার শেষ সকাল। গতকাল ভালোয় আর মন্দে কেটে গেছে, আর আগামীকালতো এখনও আসেনি। আপনার জীবনকাল মাত্র একদিন, আপনি যেন আজই জন্মগ্রহন করেছেন আর দিনের শেষ মারা যাবেন। এ মনোভাব থাকলে আপনি অতীতের সকল দুশ্চিন্তা ও ভবিষ্যতের সকল অনিশ্চিত আশার নেশায় ব্যস্ত হয়ে থাকবেন না। কেবল আজকের দিনটির জন্যই যেন বেঁচে থাকবেন; সারাটা দিন আপনার উচিত জাগ্রত হৃদয়ে প্রার্থনা করা, বুঝে-শুনে কুরআন তিলাওয়াত করা, মহান আল্লাহ্‌কে অধিক পরিমাণে স্মরণ করা। প্রতিটি দিনেই আপনার কাজকর্মে ভারসাম্যতা বজায় রাখা, তাক্বদীরের প্রতি সন্তুষ্ট থাকা এবং আপনার স্বাস্থ্য ও বাহ্যাকৃতি তথা সাজসজ্জা, রূপচর্চা, বেশভূষা, পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা ও পোশাক পরিচ্ছদ সম্বন্ধে সতর্ক থাকা উচিত।

নোটঃ যারা কুরআন তিলাওয়াত করার সময় পান না তাদের জন্য একটি পরামর্শ হচ্ছে- পুরুষগণ প্রতিদিন প্রতি ওয়াক্ত জামাতের কিছু সময় আগে মসজিদে চলে যান ও জামাতের পূর্বেকার অতিরিক্ত সময়টুকু কুরআন তিলাওয়াতে অতিবাহিত করুন আর মহিলারা প্রতিদিন প্রতি ওয়াক্ত সালাতের পর কিছু সময় সালাতের জায়গায় বসে কুরআন তিলাওয়াত করুন – মোঃ রফিকুল ইসলাম।

দিনের প্রতিটি মুহূর্তকে সঠিকভাবে পরিচালিত করুন বা যথাযথভাবে কাজে লাগান, যাতে করে আপনি কয়েক মিনিটে কয়েক বছরের ফায়দা এবং কয়েক সেকেন্ডে কয়েক মাসের ফায়দা হাসিল করতে পারেন। আপনার প্রভুর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করুন, তাঁর জিকির করুন, এ ধরাধাম (দুনিয়া) থেকে শেষ বিদায়ের জন্য প্রস্তুত থাকুন এবং অবশিষ্ট সময়টুকুতে সুখ-শান্তিতে বেঁচে থাকুন। আপনার রিযিক, আপনার স্ত্রী, আপনার সন্তানাদি, আপনার কাজ, আপনার গৃহ এবং আপনার জীবনযাপনের উপর সন্তুষ্ট থাকুন।

فَخُذْ مَا آتَيْتُكَ وَكُنْ مِنَ الشَّاكِرِينَ

আমি আপনাকে যা দান করেছি তা গ্রহণ করুন এবং কৃতজ্ঞদের অন্তর্ভুক্ত হোন। (৭-সূরা আল আ’রাফ: আয়াত-১৪৪)

আজকের দিনটি দুঃখ-বেদনা, বিরক্তি, ক্রোধ ও হিংসা-বিদ্বেষমুক্ত অবস্থায় কাটান। আপনার হৃদয়ের মণিকোঠায় একটি কথা সোনার হরফে খোদাই করে লিখে রাখুন, আর সেটা হচ্ছে- “আজই আমার একমাত্র দিন।”

আজ যদি আপনি টাটকা খাবার খেয়ে থাকেন তবে গতকালের বাসী খাবার ও আগামীকালের প্রত্যাশিত খাবারে তেমন কী আসে যায়?

আপনার নিজের উপর যদি আপনার আস্থা থেকে থাকে এবং আপনার যদি একটা দৃঢ়, বলিষ্ঠ, অনড় ও স্থির সংকল্প থেকে থাকে তবে আপনি নিজেই সন্দেহাতীতভাবে পরবর্তী কথাটির উপর দৃঢ় প্রত্যয় উৎপাদন করতে পারবেন: (কথাটি হল) “আজই আমার জীবনের শেষ দিন।”

যখন আপনি এই মনোভাব অর্জন করতে পারবেন তখন আপনি আপনার ব্যক্তিত্বকে উন্নত করে, আপনার ক্ষমতা ও দক্ষতা বাড়িয়ে এবং আপনার কাজকর্মকে পরিশুদ্ধ করে আপনার দিনের প্রতিটি মুহুর্ত হতেই মুনাফা অর্জন করতে পারবেন। তারপর আপনি মনে মনে বলুন আজ আমি আমার কথাবার্তাকে পরিশুদ্ধ করব এবং কোনোরূপ মন্দ ও অশ্লীল কথা উচ্চারণ থেকে বিরত থাকব। আমি কারো গীবতও করব না। আজ আমি ঘর ও অফিস গুছাবো। সেগুলো অগোছালো ও এলোমেলো থাকবে না, বরং গোছালো ও ফিটফাট থাকবে।

আজ আমি আমার শরীরের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও বাইরের ঠাঁট সম্বন্ধে বিশেষ যত্নবান হব। আমি আমার পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও পবিত্রতা সম্বন্ধে অতিশয় সতর্ক হব এবং আমার চলাফেরা, কথাবার্তা ও কাজকর্মে ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান বজায় রাখব।

আজ আমি আমার প্রতিপালকের প্রতি অনুগত থাকতে, সম্ভাব্য সর্বোত্তম পদ্ধতিতে সালাত আদায় করতে, অধিক নফল ইবাদত করতে, কুরআন তিলাওয়াত করতে এবং উপকারী বই-পুস্তক ও ভালো কিতাবাদি পড়তে আপ্রাণ চেষ্টা করব। আজ আমি আমার অন্তরে ভালো কাজের বীজ বপন করব এবং অহংকার, হিংসা-বিদ্বেষ, ভণ্ডামি, কপটতা ও মোনাফেকির মতো মন্দ কাজের মূলোৎপাটন করব।

আজ আমি অন্যদেরকে সাহায্য করার (তথা রোগী দেখতে যাবার, জানাযার সালাতে উপস্থিত হবার, পথহারাকে পথ দেখানোর এবং ক্ষুধার্তকে খাবার খাওয়ানোর) চেষ্টা করব। আজ আমি মজলুমের পাশে দাঁড়াব। আমি বিজ্ঞ জনকে (জ্ঞানীকে বা আলেমকে) সম্মান প্রদর্শন করব, দয়াৰ্দ্ৰ হব আর বৃদ্ধের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হব।

হে অতীত! তুমিতো বিদায় হয়ে চলে গিয়েছ, আমি তোমাকে নিয়ে কাঁদব না। তোমাকে স্মরণ করলে বা তোমার কথা মনে করলে তুমিতো আমাকে আর দেখতে আসবে না, এমননি এক মুহুর্তের জন্যও না, কেননা, তুমিতো আমাকে ছেড়ে চিরদিনের মতো বিদায় হয়ে চলে গিয়েছ।

হে ভবিষ্যৎ তুমিতো অজ্ঞাত, অজানা ও অদৃশ্য জগতে আছ, সুতরাং আমি তোমার কল্পনায় বিভোর হব না। আমি ভবিষ্যৎ নিয়ে আগেভাগেই মাথা ঘামাব না। কেননা, ভবিষ্যৎ কিছুই না এবং এমনকি তা এখনও সৃষ্টিই হয়নি।

যারা পরিপূর্ণ জাকজমক ও চমৎকারভাবে জীবনযাপন করতে চায় তাদের জন্য সুখের অভিধানে সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ কথা হল “আজই আমার শেষ দিন।”

৫. ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তা পরিহার করুন

أَتَىٰ أَمْرُ اللَّهِ فَلَا تَسْتَعْجِلُوهُ

“আল্লাহর আদেশ আসবেই, সুতরাং তোমরা এর জন্য ব্যস্ত হয়ে পড় না।” (সূরা-১৬ আন নাহল: আয়াত-১) (আল্লাহর আদেশ বলতে কিয়ামত অথবা কাফের ও মুশরিকদের শাস্তি অথবা ইসলামী আইন বুঝায়।)

যা এখনো ঘটেনি তা নিয়ে ব্যতিব্যস্ত হবেন না, আপনি কি ফল পাকার আগেই তা ছিড়ে ফেলাকে বুদ্ধিমানের কাজ মনে করেন? আজ আগামী দিনের কোনো বাস্তবতা নেই, তাই তা অস্তিত্বহীন। অতএব, আপনি তা নিয়ে ব্যস্ত হবেন কেন? ভবিষ্যৎ বিপর্যয় সম্বন্ধে কেন আপনার আশঙ্কা থাকতেই হবে? ভবিষ্যৎ দুর্বিপাকের দুর্ভাবনা নিয়ে আপনাকে কেন বিভোর থাকতেই হবে? বিশেষ করে যখন আপনি জানেন না যে, আপনি আগামী দিনের সুখটাই শুধু দেখতে পারবেন কিনা?

যে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি জানতে হবে তা এই যে, আগামী দিন অদৃশ্য জগতের এমন এক সেতু যা আমাদের সামনে না আসা পর্যন্ত আমরা তা অতিক্রম করতে পারি না। কে জানে, হয়তোবা আমরা কখনো সে সেতুর কাছে না-ও পৌছতে পারি, অথবা আমরা সেটার কাছে পৌঁছার পূর্বেই ওটা ধ্বসে যেতে পারে, অথবা আমরা হয়তো সে সেতুতে পৌছে তা নিরাপদে পার হব?

ভবিষ্যতের আশঙ্কায় বিভোর হওয়া আমাদের পক্ষে ধর্মকে অবজ্ঞা করার মতো; কেননা, ঐ আশঙ্কা এ জগতের সাথে আমাদের এক দীর্ঘকালীন সম্পর্ক থাকার কথা মনে করিয়ে দেয়, যে সম্পর্ককে একজন প্রকৃত মু’মিন পরিহার করে। এ পৃথিবীর বহু লোকই ভবিষ্যৎ দারিদ্র্য, ক্ষুধা, পীড়া ও দুর্যোগের ভয়ে অযৌক্তিকভাবে ভীত। এ ধরনের চিন্তা-ভাবনা শয়তানের ধোকা মাত্র।

الشَّيْطَانُ يَعِدُكُمُ الْفَقْرَ وَيَأْمُرُكُمْ بِالْفَحْشَاءِ وَاللَّهُ يَعِدُكُمْ مَغْفِرَةً مِنْهُ وَفَضْلًا

শয়তান তোমাদেরকে দারিদ্র্যের ভয় দেখায় ও অশ্লীল কাজ করার আদেশ করে, অথচ আল্লাহ তার পক্ষ থেকে তোমাদেরকে ক্ষমা ও দানের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন।” (২-সূরা বাকারা: আয়াত-২৬৮)

অনেকেই এমন আছে যে, তারা নিজেদেরকে আগামী দিনের বুভুক্ষু (ক্ষুধার্ত) ভেবে, একমাস পরের রোগী ভেবে অথবা একশত বছর পর পৃথিবী শেষ হয়ে যাবে এই কল্পিত ভয়ে কান্না করে। যে ব্যক্তি জানেনা কখন সে মরবে (অথচ আমাদের সবাইকে মরতে হবে), যে ব্যক্তির কাছে তার মৃত্যুর সময়ের কোনো ইঙ্গিত নেই- সে ব্যক্তির উচিৎ নয় নিজেকে এ ধরনের চিন্তা-ভাবনায় নিমগ্ন রাখা। যেহেতু আপনি আজকের কর্ম নিয়ে ব্যস্ত আছেন তাই ভবিষ্যতের দুশ্চিন্তা পরিহার করুন। এ পৃথিবীর ভাবী কল্পিতদৃশ্য নিয়ে অযৌক্তিকভাবে ব্যাপৃত (নিয়োজিত) হওয়া থেকে সাবধান হন।

৬. তীব্র নিন্দা ও অপ্রীতিকর সমালোচনা যেভাবে নিবেন

যারা অজ্ঞ ও মূর্খ তারা সকল সৃষ্টির স্রষ্টা মহান আল্লাহকেও গালি দিয়েছে, সুতরাং আমরা সাধারণ লোকজনের কাছ থেকে কী আশা করতে পারি? আমরাতো ভুল-ভ্রান্তিতে নিমজ্জিত। আপনাকে সর্বদাই এমন তীব্র সমালোচনা ও নিন্দার অসমাপনীয় ঝড়ের মুখে পড়তে হবে- যার তীব্র আক্রমণ অন্তহীন যুদ্ধের মতো।

যখন আপনি উন্নতি করবেন, নিজেকে প্রকাশিত করবেন, নিজেকে উদ্ভাসিত করবেন এবং অন্যের উপর প্রভাব বিস্তার করবেন, তখনই অগ্রাহ্য, অবজ্ঞা ও নিন্দা আপনার ভাগ্যে বরাদ্দ হবে, যে পর্যন্ত না আপনি ভূ-গর্ভস্থ সুরঙ্গ পথে বা আকাশচুম্বী মইয়ে চড়ে জনগণ থেকে পালিয়ে যাবেন, সে পর্যন্ত তারা আপনার নিন্দা ও আপনার চরিত্রে দোষ-ক্রটি খোঁজা থেকে বিরত হবে না। সে কারণেই, যতক্ষণ পর্যন্ত আপনি মর্ত্যবাসী (অর্থাৎ যতদিন আপনি এ পৃথিবীতে বেঁচে থাকবেন), ততক্ষণ পর্যন্ত আহত হওয়ার, (অর্থাৎ মানসিক আঘাত পাওয়ার) অপমানিত হওয়ার ও নিন্দিত হওয়ার প্রত্যাশা করুন। একটি বিষয় আপনাকে গভীরভাবে দেখতে হবে, আর তাহল- মাটিতে বসে আছে এমন ব্যক্তি মাটিতে পড়ে যায় না। মানুষেরা মৃত কুকুরকে লাথি মারতে যায় না।

অতএব, ধাৰ্মিকতায়, বিদ্যা-বুদ্ধিতে, আচার-আচরণে ও ধন-সম্পদে উৎকর্ষতায় আপনি তাদেরকে ছাড়িয়ে যাওয়াতেই আপনার প্রতি তাদের ক্রোধ। যদি না আপনি আপনার সকল প্রতিভাকে বিসর্জন দিয়ে এবং নিজেকে সকল প্রশংসা যোগ্য গুণ হতে বঞ্চিত করে- নির্বোধ, অথর্ব, তুচ্ছ, নগণ্য, মূল্যহীন ও তাদের নিকট নির্বিঘ্ন, অনুপকারী, অক্ষতিকর ও গোবেচারা হয়ে যান তবে তাদের দৃষ্টিতে আপনি এমন এক সীমালঙ্ঘনকারী ও পাপী -যার ভুলের ও পাপের প্রায়শ্চিত্ত করা যায় না। তারা আপনার জন্য ঠিক এ সমাধানই আকাঙ্ক্ষা করে।

তাই তাদের অপমান ও নিন্দার মুখে ধৈর্যশীল হয়ে থাকুন। যদি আপনি তাদের কথায় মর্মাহত হন এবং তাদেরকে আপনার উপর প্রভাব বিস্তার করতে সুযোগ দেন, তবে আপনার জন্য তারা কী চায় তা আপনি বুঝতে পারবেন (তাদের কথায় আপনি আহত, বিব্রত ও রাগান্বিত হলে আপনারই ক্ষতি হবে। আর তারা এটাই চায় যে, আপনি ক্রুদ্ধ, রুষ্ট ও ব্যথিত হয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হোন। -অনুবাদক) তার বদলে (রাগান্বিত না হয়ে), তাদের প্রতি সবচেয়ে সুন্দর আচরণ প্রদর্শনের মাধ্যমে আপনি তাদেরকে ক্ষমা করে দিন। তাদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিন এবং তাদের ফন্দির (চক্রান্তের) কারণে যাতনাবোধ করবেন না। আপনার প্রতি তাদের অবজ্ঞা শুধুমাত্র আপনার মূল্য ও গুণই বৃদ্ধি করে।

আপনি অবশ্যই তাদের মুখ বন্ধ করতে পারবেন না, কিন্তু তাদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে তাদের যা বলার আছে তা অগ্রাহ্য করে তাদের নিন্দা ও সমালোচনাকে আপনি কবর দিতে (স্মৃতির পাতা হতে মুছে ফেলতে বা ভুলে যেতে) পারবেন। কুরআনের ভাষায়-

قُلْ مُوتُوا بِغَيْظِكُمْ

বলুন, তোমাদের আক্রোশে তোমরাই মর। (৩-সূরা আলে ইমরান: আয়াত-১১৯)

প্রকৃতপক্ষে, আপনার গুণাবলিকে বাড়িয়ে এবং আপনার প্রতিভাকে উন্নত করে আপনি তাদের ক্রোধকে বর্ধিত করতে সক্ষম হবেন। (আপনি উন্নত হলে তারা ক্রুব্ধ হবে, ফলে তারাই ক্ষতিগ্রস্ত হবে; আর এভাবেই—নিজেকে উন্নত করে তাদেরকে ক্রুব্ধ পরিণামে ক্ষতিগ্রস্ত করে-আপনি তাদের প্রতিশোধ নিতে পারেন। -অনুবাদক) আপনি যদি সকলের নিকট গৃহীত হতে চান ও সকলের ভালোবাসা পেতে চান, তবে আপনি এমন জিনিস পেতে চান যা পাওয়া অসম্ভব। (সকলের ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা পেতে চাইলেও তা আপনি পাবেন না। -অনুবাদক)

৭. কারো ধন্যবাদ পাবার আশা করবেন না

সর্বশক্তিমান আল্লাহ্ তায়ালা তার বান্দাদেরকে তার জিকির (স্মরণ) করার জন্য সৃষ্টি করেছেন এবং তিনি তাদেরকে এজন্য রিযিক দিয়েছেন যে, তারা তার শুকরিয়া আদায় করবে। এতদসত্ত্বেও অনেকে তাকে বাদ দিয়ে অন্যের ইবাদাত করছে। অধিকাংশ লোকই তার প্রতি কৃতজ্ঞশীল নয়, কেননা, মানবজাতির মধ্যে অকৃতজ্ঞতার বৈশিষ্ট্য খুবই জোরালো। অতএব, আপনি যখন দেখবেন যে, অন্যেরা আপনার করুণাসমূহকে ভুলে যাচ্ছে ও আপনার সদয় আচরণসমূহকে অবজ্ঞা করছে তখন হতাশ হবেন না। কিছু লোকতো আপনাকে এমনকি ঘৃণার সাথেও দেখতে পারে এবং আপনি যে তাদের প্রতি দয়া দেখিয়েছেন শুধুমাত্র একারণেই আপনাকে শক্র ভাবতে পারে।

وَمَا نَقَمُوا إِلَّا أَنْ أَغْنَاهُمُ اللَّهُ وَرَسُولُهُ مِنْ فَضْلِهِ

“আল্লাহ্ ও তার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে নিজ গুণে সম্পদশালী করেছিলেন, শুধুমাত্র এ কারণ ছাড়া তারা আক্রোশ-পোষণ করার অন্য কোনো কারণ খুঁজে পায়নি।” (৯-সূরা তাওবা: আয়াত-৭৪)

ইতিহাসের পাতায় এরূপ যে ঘটনা সর্বাপেক্ষা বেশি ঘটে তা হল পিতা-পুত্রের ঘটনা। পিতা-পুত্রকে বড় করে তোলে, প্রতিষ্ঠিত করে, পুত্রের মুখে খাবার তুলে দেয়, তার পোশাক পরিচ্ছদের ব্যবস্থা করে এবং তাকে উত্তম শিক্ষা দেয়, পিতা রাতকে রাত বিনিদ্র অবস্থায় কাটায় যাতে করে তাঁর পুত্র আরামে ঘুমোতে পারে, পুত্রের খাবারের জন্য নিজে না খেয়ে থাকে এবং পুত্রের আরামের জন্য নিজে কঠোর পরিশ্রম করে। আর যখন ছেলে বড় হয় ও শক্তিশালী হয় তখন পিতাকে অবাধ্যতা, অসম্মান ও অবজ্ঞার মাধ্যমে পুরস্কৃত করে! সুতরাং আপনি যে ভালো কাজ করেছেন তার বিনিময় যদি আপনাকে অকৃতজ্ঞতার মাধ্যমে দেয়া হয় তবে আপনি শান্ত থাকুন। একথা জেনে আনন্দিত হবেন যে, যার অধিকারে সীমাহীন সম্পদ আছে তিনিই আপনাকে পুরস্কৃত করবেন।

একথা বলবেন না যে, অন্যের প্রতি দয়া প্রদর্শন করা থেকে আপনার বিরত থাকা উচিত। বরং আসল কথা হল অকৃতজ্ঞতা পাবার জন্যই দান করুন। কেননা, এ মনোভাব থাকলেই আপনি নিশ্চিতভাবে সফল হবেন। অকৃতজ্ঞ লোকেরা আসলে আপনার কোন ক্ষতি করতে পারবে না। এজন্য আপনি আল্লাহর প্রশংসা করুন যে, সে লোক সীমালংঘনকারী আর আপনি অনুগত বান্দা। একথাও মনে রাখুন যে, দান গ্রহণকারীর চেয়ে দানকারী উত্তম।

إِنَّمَا نُطْعِمُكُمْ لِوَجْهِ اللَّهِ لَا نُرِيدُ مِنْكُمْ جَزَاءً وَلَا شُكُورًا

আমরাতো শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্যই তোমাদেরকে খাদ্য খাওয়াই। আমরা তোমাদের নিকট না কোনো পুরস্কার আশা করি, আর না কোনো ধন্যবাদ।” (৭৬-সূরা আদ দাহর বা ইনসান: আয়াত-৯)

অনেকেই অন্যের অকৃতজ্ঞতায় মর্মাহত হন, যেন তারা কখনও (নিম্নোক্ত) এই আয়াত বা এমন অন্যান্য আয়াত দেখেনি, আর তা হল –

وَإِذَا مَسَّ الْإِنْسَانَ الضُّرُّ دَعَانَا لِجَنْبِهِ أَوْ قَاعِدًا أَوْ قَائِمًا فَلَمَّا كَشَفْنَا عَنْهُ ضُرَّهُ مَرَّ كَأَنْ لَمْ يَدْعُنَا إِلَىٰ ضُرٍّ مَسَّهُ

আর যখন মানুষকে কোনো মুসিবত (বিপদ) পেয়ে বসে তখন সে শুয়ে, বসে ও দাঁড়ানো অবস্থায় আমার নিকট আকুল আবেদন করে, কিন্তু আমি যখন তার থেকে মুসিবত দূর করে দিই তখন সে এমনভাবে চলে যেন সে কখনও তার উপর আপতিত মুসিবতের জন্য আমার নিকট প্রার্থনা করেনি।” (১০-সূরা ইউনুস: আয়াত-১২)

এ কারণেই, যদি আপনি কাউকে উপহারস্বরূপ একটি কলম দেন আর সে এটাকে আপনার জন্য বিদ্রুপের বিষয় বানায় অথবা আপনি যদি কাউকে ভর দিয়ে হাটার জন্য একটি লাঠি দেন আর সে এ লাঠি দিয়ে আপনাকে প্রহার করে তবে আপনি রাগাম্বিত হবেন না। অধিকাংশ মানুষই তাদের করে এটাই প্রতিপালকের প্রতিই অকৃতজ্ঞ। যেমনটি আমি পূর্বেই উল্লেখ করেছিলাম। সুতরাং আপনি ও আমি কী ধরনের আচরণ আশা করতে পারি?

৮. পরোপকারেই পরম আত্মতৃপ্তি

যে লোক কাউকে দান করে তার উপকার করে সে (দানকারী) নিজেই নিজের উপকার করে। নিজের মাঝে পরিবর্তন দেখে, নিজের আচরণে পরিবর্তন দেখে শান্তি লাভ করে এবং অন্যের মুখে হাসি দেখে পরোপকারী নিজেই আত্মতৃপ্তি লাভ করে।

যদি আপনি নিজেকে সঙ্কটাপন্ন ও দুঃখে জর্জরিত দেখতে পান তবে অন্যের প্রতি করুণা প্রদর্শন করুন; তাহলে আপনি নিজেই প্রথমে শান্ত্বনা লাভ করবেন। অভাবীকে দান করুন, মজলুমকে রক্ষা করুন, যাতনাগ্রস্তদেরকে সাহায্য করুন আর রোগী দেখতে যান, তবেই আপনি দেখতে পাবেন যে, সুখ সবদিক থেকে আপনাকে ঘিরে রেখেছে। দানকর্ম প্রসাধনীর মতো এটা ব্যবহারকারী, বিক্রেতা ও ক্রেতাকে উপকার করে। (সুগন্ধি বা আতর যেমন যার সংস্পর্শেই আসে তাকেই সুবাসিত করে। -অনুবাদক)

অধিকন্তু, অন্যেকে সাহায্য করে কেউ যদি মানসিক উপকার লাভ করে তা সত্যিই মহান। যদি আপনি বিষন্নতায় ভুগতে থাকেন তবে একটি দানকর্ম আপনার অসুস্থতার উপর সবচেয়ে ভালো ঔষুধের চেয়েও বেশি কার্যকর প্রভাব ফেলবে।

এমনকি আপনি যখন অন্যের সাথে সাক্ষাৎকালে প্রসন্ন হাসি দেন, (প্রকৃতপক্ষে) আপনি তখন দানই করেন। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: কাউকে অকিঞ্চিৎকর (নগণ্য) ভেবে কোনরূপ দানকর্ম বন্ধ করে দিও না, এমনকি তোমার ভাইয়ের সাথে হাসি মুখে সাক্ষাৎ করাও বন্ধ করিও না। কেননা, সে কাজটাও তোমার আমলনামায় নেকীর পাল্লায় খুবই ভারী হতে পারে।

অপরপক্ষে, অন্যের সাথে সাক্ষাৎকালে আপনি যখন ভ্রুকুটি করেন (ভুরু কোঁচকান) তখন আপনি শক্রতার এমন এক ধরনের চিহ্ন প্রকাশ করেন যা ভ্রাতৃত্ববোধের জন্য এতটাই ক্ষতিকর যে একমাত্র আল্লাহই জানেন যে, এর ক্ষতির পরিধি কত বেশি। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে জানিয়েছেন যে, এক বেশ্যা একবার এক কুকুরকে এক অঞ্জলি পানি পান করানোতে আল্লাহ তাকে এত বড় এক জান্নাত পুরস্কার হিসেবে দান করেন যে, তার প্রশস্ততা সমগ্র আকাশমণ্ডলী ও ভূমণ্ডলের মতো। কেননা পুরস্কারদাতা হলেন ক্ষমাশীল, ধনী ও প্রশংসাযোগ্য।

হে দুর্দশার ভয়ে ভীতরা! অন্যের উপকারার্থেই ভয় ও বিষন্নতা আপনাদেরকে পেয়ে বসে। অন্যকে দান, আতিথেয়তা সহমর্মিতা ও সমর্থন ইত্যাদি বিভিন্নভাবে সাহায্য করুন। আর এমন কাজ করেই আপনার কাঙ্ক্ষিত সকল সুখ পাবেন।

الَّذِي يُؤْتِي مَالَهُ يَتَزَكَّىٰ وَمَا لِأَحَدٍ عِنْدَهُ مِنْ نِعْمَةٍ تُجْزَىٰ إِلَّا ابْتِغَاءَ وَجْهِ رَبِّهِ الْأَعْلَىٰ إِلَّا ابْتِغَاءَ وَجْهِ رَبِّهِ الْأَعْلَىٰ

“যে পরিশুদ্ধ হওয়ার জন্য তার সম্পদ দান করে ও কারো কাছে প্রতিদান আশা করে না, শুধুমাত্র তার মহিমাময় প্রভুর সন্তুষ্টি লাভের জন্যই সে দান করে। এবং অচিরেই সে (জান্নাতে প্রবেশ করে) সন্তুষ্ট হবে।” (৯২-সূরা আল লাইল: আয়াত-১৮-২১)

৯. কাজের মাধ্যমে একঘেয়েমিজনিত বিরক্তি দূর করুন

যাদের জীবনে কোন কাজ করতে হয় না তারাই গুজব ও মিথ্যা কথা ছড়ানোর মাধ্যমে তাদের অধিকাংশ সময় নষ্ট করে। বিশেষ করে কল্যাণ-চিন্তাহীন মানসিকতার কারণেই তারা এমনটি করে থাকে।

رَضُوا بِأَنْ يَكُونُوا مَعَ الْخَوَالِفِ وَطُبِعَ عَلَىٰ قُلُوبِهِمْ فَهُمْ لَا يَفْقَهُونَ

“পেছনে পড়ে থাকা লোকদের সাথে থাকতে পারাতে তারা আনন্দিত এবং তাদের অন্তরে মোহর এঁটে দেয়া হয়েছে, তাই তারা বুঝতে পারে না।” (৯-সূরা তাওবা: আয়াত-৮৭)

যখন আপনি নিজকে অলস মনে করবেন তখন বিষন্নতা ও হতাশাবোধ করবেন। কেননা, অলসতা অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের যত সব মুসিবতের কথা ভাবার মাধ্যমই হয়। সুতরাং আপনার প্রতি আমার আন্তরিক উপদেশ এই যে, অলস না থেকে ফলপ্রসূ কাজ সম্পাদন করুন। কেননা, অলসতা হল ধীর ও ছদ্মবেশী আত্মহত্যা। অর্থাৎ অলসতার কারণে ধীরে ধীরে ও অজান্তে আত্মহত্যার ইচ্ছা মনে জাগ্রত হয়।

চীনদেশে কয়েদিদেরকে যে ধরনের ধীর অত্যাচার করা হয় বা শাস্তি দেয়া হয় অলসতা হল সে ধরনের নিপীড়ন (আর তা হল):

তাদেরকে এমন এক টেপের (পানির কলের) নিচে রাখা হয় যে টেপ থেকে এক ঘণ্টা পর পর মাত্র এক ফোটা পানি পড়ে। কয়েক ফোটা পানির জন্য যে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয় ততক্ষণে অনেকের মাথা খারাপ হয়ে যায় আর তাতে অনেকে পাগল হয়ে যায়।

অকৰ্মা হওয়া মানে নিজের দায়িত্বের অবহেলা প্রদর্শন করা। অলসতা এক দক্ষ চোর আর আপনার মন হল এর বলি বা শিকার। সুতরাং ক্ষণকাল বিলম্ব না করে এখনই উঠে পড়ুন ও প্রার্থনা করুন বা একটি ভালো বই পড়ুন, আপনার প্রভুর প্রশংসা করুন, লেখা-পড়া করুন। আপনার পাঠাগারকে সাজিয়ে-গুছিয়ে পরিপাটি করে রাখুন। আপনার বাড়িতে কোন কিছু এটে দিন, অথবা অন্যের উপকার করুন যাতে করে আপনি আপনার অকৰ্মণ্যতাকে শেষ করে দিতে পারেন বা কাটিয়ে উঠতে পারেন। আমি আন্তরিকভাবে আপনার কল্যাণ কামনা করি বিধায় আমি একথা বলছি। কাজ করে করে একঘেয়েমি জনিত বিরক্তি বিনাশ করে দিন। আপনি যখন শুধুমাত্র এ সাধারণ নীতি কথাটাই মানবেন তখন আপনি কমপক্ষে পঞ্চাশভাগ সুখের পথ পাড়ি দিলেন। কৃষক, কাঠমিস্ত্রি ও রুটি প্রস্তুতকারীকে দেখুন এবং ভালভাবে লক্ষ্য করুন তাড়া কাজের সময় কীভাবে পাখির মতো সুরেলা কণ্ঠে গান গেয়ে যায়, কারণ তারা পরিতৃপ্ত। তারপরে নিজের অবস্থা ভালোভাবে বিবেচনা করুন যে, সর্বদা নিজেকে নিপীড়ন করে, সর্বদা অত্যন্ত শোচনীয়ভাবে চোখের পানি মুছতে মুছতে কীভাবে আপনার বিছানার উপর গড়াগড়ি খাচ্ছেন।

১০. অনুকরণ পটু, নকলকারী, ভানকারী, ছলনাকারী ও কপট হবেন না

নিজেকে অন্য মানুষে রূপান্তরিত করবেন না, অন্যের অনুকরণ করবেন না। নিজেদের কন্ঠস্বর, চালচলন, আচার-আচারণ, স্বভাব ও অভ্যাসকে ভুলে যাওয়ার ভান করে। এর যে সমস্ত কুফল দেখা দেয় তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল- কৃত্রিমতা, অশান্তি ও নিজের স্বতন্ত্র সত্তার বিনাশ।

আদম (আঃ) থেকে সর্বশেষ জন্মগ্রহণকারী শিশু পর্যন্ত কোন দুটি মানুষই দেখতে হুবহু একই রকম নয়। তবে কেন তাদেরকে অভ্যাস ও রুচিতে একই রকম হতে হবে?

আপনি অনন্য বৈশিষ্ট্যপূর্ণ- অতীতে কেউই আপনার মতো হয়নি আর ভবিষ্যতেও কেউই আপনার মতো হবেন না। যদু বা মধু থেকে আপনি সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের। সুতরাং অন্যকে অনুকরণ ও নকল করার প্রবণতা নিজের উপর জোর করে চাপিয়ে দিবেন না। নিজের স্বভাব ও ঝোঁক অনুসারেই সামনে এগিয়ে চলুন। (এখানে নিজের স্বভাব ও ঝোক বলতে নিজের সৎ স্বভাব ও ভালো ঝোঁকের কথাই বলা হয়েছে। পক্ষান্তরে অনুকরণ না করা বলতে অন্যের কৃত্রিম ও কপট আচরণ তথা যেগুলো স্বভাবজাত না হওয়ার কারণে অনুকরণ করতে কষ্ট হয় সেগুলো অনুকরণ করতে নিষেধ করা হয়েছে। কেননা ইসলামের নীতি ও আদর্শের অনুকরণ ও অনুসরণ জরুরী -অনুবাদক ।)

قَدْ عَلِمَ كُلُّ أُنَاسٍ مَشْرَبَهُمْ

“প্রতিটি (দলের) লোকই নিজ নিজ পানির ঘাট চিনে নিয়েছিল”। (২-সূরা বাকারা: আয়াত-৬০)

وَلِكُلٍّ وِجْهَةٌ هُوَ مُوَلِّيهَا فَاسْتَبِقُوا الْخَيْرَاتِ

প্রত্যেক জাতিরই একটি কেবলা আছে, যে দিকে সে অভিমুখী হয়, সুতরাং সৎকাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ুন। (২-সূরা বাকারা: আয়াত ১৪৮)

আপনাকে যেভাবে সৃষ্টি করা হয়েছে সেভাবেই থাকুন এবং আপনার কণ্ঠস্বর পরিবর্তন করবেন না অথবা আপনাকে বদলাবেন না। কুরআন হাদীসে যা পাওয়া যায় তার অনুসরণ করে আপনার ব্যক্তিত্বের বিকাশ সাধন করুন।

অন্যদেরকে অনুকরণ করে ও নিজের স্বতন্ত্র অস্তিত্বের অধিকার বঞ্চিত করে নিজের অস্তিত্বকে শূন্য করে দিবেন না।

আপনার রুচি ও পছন্দ একান্ত আপনারই এবং আমরাও চাই যে আপনি যেমন আছেন তেমনই থাকুন, বিশেষ করে এজন্য যে, ওভাবেই আপনাকে সৃষ্টি করা হয়েছে এবং আমরাও আপনাকে ওরকম বলেই জানি।

নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আর তোমাদের কেউ যেন অন্যের অনুকরণকারী না হয়।

চরিত্র, ধর্ম ও গুণের সংজ্ঞায় (পরিচয় দিতে গেলে) বলতে হয় যে, মানুষেরা গাছ-পালার মতো : টক-মিষ্টি, লম্বা-খাটো ইত্যাদি।

(অথাৎ গাছ-পালা যেমন কোনটি লম্বা হয় আবার কোনটি খাট হয়, মানুষও কেউ লম্বা হয় কেউ খাট হয়। গাছপালা (এর ফল-পাতা, ছাল-বাকল বা শিকড়) যেমন কোনটি মিষ্টি আবার কোনটি টক। মানুষও কেউ মিষ্টি পছন্দ করে আবার কেউ টক পছন্দ করে। সুতরাং আপনি খাট তাই লম্বা হওয়ার চেষ্টা করা অস্বাভাবিক ও তাই কষ্টকর। অনুরূপভাবে আপনি মিষ্টি খেতে ভালোবাসেন কিন্তু অন্যের অনুকরণে টক খেতে অভ্যস্ত হতে চাওয়া অস্বাভাবিক ও আপনার জন্য কষ্টদায়ক। -অনুবাদ)

আপনার সৌন্দর্য ও ব্যঞ্জনা আপনার স্বাভাবিক অবস্থা বজায় রাখছে। (সুতরাং অন্যের অনুকরণ করে অন্যের মতো হতে চেয়ে এগুলোর বিকৃতি সাধন করে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন না। -অনুবাদক।) আমাদের বিভিন্ন বর্ণ, ভাষা, মেধা ও যোগ্যতা আমাদের শক্তিমান মহান স্রষ্টারই নিদর্শন; তাই ঐগুলোকে অস্বীকার করবেন না (অর্থাৎ ঐগুলোর স্বাভাবিকতাকে অস্বীকার করে অন্যের মতো হওয়ার জন্য অন্যের অনুকরণ করে নিজের ক্ষতি করবেন না। -অনুবাদক)

১১. তক্বদীর বা ভাগ্য

পৃথিবীতে আর তোমাদের জীবনে যে বিপদ আসে তা আমি ঘটানোর পূর্বেই লিখে রেখেছি। (৫৭-সূরা আল হাদীদ: আয়াত-২২)

কলমের কালি শুকিয়ে গেছে, পাতাগুলো আরশে টাঙিয়ে দেয়া হয়েছে, যা কিছু ঘটবে তা সবই লিপিবদ্ধ হয়ে গেছে। আল্লাহ আমাদের জন্য যা কিছু রেখেছেন তার অধিক কিছুই আমাদের নিকট পৌছবে না। যা কিছু আপনার নিকট এসেছে (অর্থাৎ আপনার তকদীরে আছে) তা আপনাকে ফসকিয়ে যাবে না, আর যা কিছু আপনাকে ফসকিয়ে গিয়েছে (আপনার তকদীরে নেই) তা আপনার নিকট আসবে না। যদি এ বিশ্বাস আপনার অন্তরে দৃঢ়ভাবে প্রোথিত হয়ে থাকে তবে সব কষ্ট ও জটিলতা সহজ ও আরাম হয়ে যাবে।

নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: আল্লাহ যার কল্যাণ চান তাকে তিনি নানান সংকট দ্বারা জর্জরিত করেন।

এ কারণেই যদি আপনি রোগাক্রান্ত, পুত্রের মৃত্যুতে শোকাহত বা সম্পদে ক্ষতিগ্রস্ত হন তবে নিজেকে সমস্যায় জর্জরিত ভাববেন না। এ সমস্ত ঘটনা ঘটার জন্য আল্লাহ হুকুম করেছেন এবং সিদ্ধান্ত তার একারই। যখন আমরা সত্যি সত্যিই এ বিশ্বাস করব তখন আমরা ভালোভাবে পুরস্কৃত হব ও আমাদের পাপের প্রায়শ্চিত্ত হবে বা আমাদের গুনাহ মাফ হবে।

সে জন্যেই যারা দুর্দশাগ্রস্ত তাদের জন্য সুসংবাদ অপেক্ষা করছে; সুতরাং আপনার প্রভুর প্রতি ধৈর্যশীল ও সন্তুষ্ট থাকুন।

لَا يُسْأَلُ عَمَّا يَفْعَلُ وَهُمْ يُسْأَلُونَ

তিনি যা করেন তা সম্বন্ধে তাকে কোন জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে না, অথচ তাদেরকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। (২১ -সূরা আল আম্বিয়া: আয়াত-২৩)

আল্লাহ যে সবকিছু পূর্বেই নির্ধারিত করে রেখেছেন একথা যদি আপনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস না করেন তবে কখনও আপনি পরিপূর্ণ শান্তি পাবেন না। কলমের কালি শুকিয়ে গেছে তার সাথে আপনার যা কিছু ঘটবে তা সবই লিখা হয়ে গেছে। তাই যা আপনার হাতে নেই তার জন্য অনুতাপ ও অনুশোচনা করবেন না। একথা ভাববেন না যে আপনি বেড়াটিকে খসে পড়া থেকে, পানিকে প্রবাহিত হওয়া থেকে বা গ্লাসটিকে ভেঙ্গে যাওয়া থেকে রক্ষা করতে পারতেন। আপনি চাইলেও এগুলোকে রক্ষা করতে পারতেন না।

যা কিছু পূর্বেই নির্ধারণ করা হয়েছে তা ঘটবেই।

فَمَنْ شَاءَ فَلْيُؤْمِنْ وَمَنْ شَاءَ فَلْيَكْفُرْ

সুতরাং যার ইচ্ছা ঈমান আনুক আর যার ইচ্ছা কুফরি অবলম্বন করুক।” (১৮-সূরা আল কাহাফ: আয়াত-২৯)

আত্মসমর্পণ করুন (ইসলাম গ্রহণ করুন বা মুসলিম হন। -অনুবাদক) ক্রোধ ও অনুশোচনার যাতনা আপনাকে পেয়ে বসার আগেই তক্বদীরে বিশ্বাস স্থাপন করুন বা তক্বদীরের প্রতি ঈমান আনুন। আপনার যতটুকু ক্ষমতা ছিল আপনি যদি তার সবটুকু করে থাকেন এবং আপনি যার বিরুদ্ধে (যা না ঘটার জন্য) আপ্রাণ চেষ্টা করতে ছিলেন যদি তাই ঘটে তবে দৃঢ় বিশ্বাস রাখুন যে এটাই ঘটার ছিল। একথা বলবেন না যে, “যদি আমি অমুক অমুক কাজ করতাম তবে অমুক অমুক ঘটনা ঘটত।” বরং বলুন, “এটাই আল্লাহর হুকুম এবং তিনি যা চান তাই করেন।”

১২. দুঃখের সাথেই রয়েছে সুখ

إِنَّ مَعَ الْعُسْرِ يُسْرًا

অবশ্যই দুঃখের সাথে সুখ আছে।” (৯৪-সূরা আল ইনশিরাহ: আয়াত ৬)

আহার করার পর পুনরায় ক্ষুধা লাগে, পান করার পর পুনরায় পিপাসা জাগে। অস্থিরতার পর ঘুম আসে। অসুস্থতার পর সুস্থতা আসে, পথ হারার পর পথ খুঁজে পাবে আর রাতের পর দিন আসবে এটাই নিয়ম।

“সম্ভবত আল্লাহ বিজয় ঘটাবেন অথবা তার ইচ্ছানুযায়ী কোন সিদ্ধান্ত নিবেন।” (সূরা-৫ মায়িদা: আয়াত-৫২)

অন্ধকার রাত্রিতে এক আলোকিত সুপ্রভাতের আগমনের সংবাদ জানাও, যে প্রভাতের আলো পাহাড় ও উপত্যকাসমূহে ছড়িয়ে পড়বে। দুঃখ-পীড়িতদেরকে এমন ত্বরিত প্রশান্তির শুভসংবাদ দাও যা নাকি তাদের কাছে আলোর গতিতে বা একপলকে পৌঁছে যাবে, যদিও বা আপনি মরুভূমিকে মাইলকে মাইল বিস্তৃত দেখছেন, তবুও জেনে রাখুন যে, এই দূরত্বের পরেও পর্যাপ্ত পরিমাণ ছায়াঘেরা অনেক সবুজ অবারিত মাঠ রয়েছে।

আপনি যদি দেখেন যে, রশি শুধু কষছে আর কষছেই তবে জেনে রাখুন যে, এটা অচিরেই পটু করে ছিড়ে যাবে। কান্নার পর হাসি, ভয়ের পর সান্ত্বনা এবং উদ্বিগ্নতার পর প্রশান্তি আসে। যখন ইব্রাহীম (আঃ)-কে আগুনে ফেলা হল তখন তার প্রভুর সাহায্য পাওয়ার কারণে তিনি আগুনের তাপ অনুভব করেননি।

قُلْنَا يَا نَارُ كُونِي بَرْدًا وَسَلَامًا عَلَىٰ إِبْرَاهِيمَ

“আমি (আল্লাহ) বললাম: হে আগুন! তুমি ইব্রাহীমের জন্য শীতলতা প্রদানকারী ও নিরাপত্তা দানকারী হয়ে যাও।” (২১-সূরা আল আম্বিয়া: আয়াত-৬৯)

সাগরতো মূসা (আঃ)-কে ডুবাতে পারেনি; কেননা, তিনি অত্যন্ত আত্মপ্রত্যয়ী দৃঢ় ও সৎভাবে বলেছিলেন-

كَلَّا إِنَّ مَعِيَ رَبِّي سَيَهْدِينِ

“কখনও নয়; নিশ্চয় আমার সাথে আমার প্রভু আছেন, তিনি আমাকে পথ দেখাবেন।” (২৬-সূরা আশ শোয়ারা: আয়াত-৬২)

নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবু বকর (রাঃ)-কে গুহাতে বলেছিলেন যে, আল্লাহ তাদের সাথে আছেন, তারপর তাদের উপর শান্তি ও প্রশান্তি অবতীর্ণ হয়েছিল।

যারা দুর্দিনের শিকার তারাতো শুধু দুর্দশা ও দুর্ভাগ্যই দেখে। এর কারণ এই যে, তারা কেবল ঘরের দেয়াল ও দরজাই দেখতে পায়, যখন নাকি তাদের সামনে যে বাধার প্রাচীরসমূহ আছে সেগুলোর বাইরে তাদের তাকানো উচিত।

অতএব, হতাশ হবেন না; অবস্থা একই রকম থাকা অসম্ভব। দিনগুলো ও বছরগুলো পালা করে ঘুরে ঘুরে আসে, ভবিষ্যৎ অদৃশ্য আর প্রতিদিনই আল্লাহ্ তায়ালার কিছু কাজ করার থাকে। আপনি তো এটা জানেন না, তবে এমনটা হতে পারে যে, আল্লাহ তায়ালা পরবর্তীতে নতুন কিছু আনবেন। আর অবশ্যই, কষ্টের সাথে আরাম আছে।

১৩. টক লেবুকে মিষ্টি শরবত বানান

একজন মেধাবী ও দক্ষ ব্যক্তি ক্ষতি (লোকসান)-কে লাভে রূপান্তরিত করে, যেখানে নাকি একজন অদক্ষ লোক প্রায়ই এক মুসিবত থেকে আরেক মুসিবত সৃষ্টি করে নিজের দুর্দশাই কেবল বৃদ্ধি করে। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কা ছাড়তে বাধ্য হলেন, কিন্তু তিনি তার দাওয়াতী কাজ বাদ না দিয়ে বরং মদীনাতে তিনি তা অনবরত চালিয়ে গেলেন। আর তাতে মদীনা বিদ্যুৎ গতিতে ইতিহাসে স্বীয় স্থান দখল করে নিল।

১. ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহঃ)-কে সাংঘাতিকভাবে অত্যাচার করা ও নিষ্পেষিত করা হয়েছে, তবুও তিনি সে অগ্নিপরীক্ষা থেকে বিজয়ী বেশে সুন্নাহের ইমাম হয়ে বেরিয়ে এলেন।

২. ইমাম ইবনে তাইমিয়াকে জেলখানায় বন্দী করা হল, পরবর্তীতে তিনি এমনকি আগের চেয়েও আর বেশি সুদক্ষ পণ্ডিত (কামেল আলেম) হয়ে গেলেন।

৩ ইমাম ছারাখছিকে বন্দী করে একটি পরিত্যক্ত কৃপের নিচে রাখা হল, সেখানে তিনি বিশ খণ্ড ইসলামী আইনশাস্ত্র প্রণয়ন করলেন।

৪. ইবনুল আছির পঙ্গু হয়ে যাওয়ার পর হাদীস শাস্ত্রের দুটি প্রসিদ্ধ কিতাব জামেউল উসূল ও নিহায়াহ লিখেছেন।

৫. ইমাম ইবনুল জাওয়ীকে বাগদাদ থেকে নির্বাসন করা হল। তারপর তার ভ্রমণকালে তিনি কুরআনের সাত কেরাআতের প্রসিদ্ধ ইমাম হয়ে গেলেন।

৬ মালেক ইবনে রাইব মৃত্যুশষ্যায় শায়িত অবস্থায় তার প্রসিদ্ধতম ও সুন্দর সুন্দর কবিতাগুলো আবৃত্তি করেছিলেন যেগুলো আজও মূল্যায়িত হয়।

৭. আবু জুয়াইব আল হাজালির ছেলেরা তার সামনেই মারা যাবার কালে তিনি তাদেরকে যে উচ্চ প্রশংসা সমৃদ্ধ কবিতা রচনা করে শুনান তা বিশ্ববাসী শুনে তার যথাযথ মূল্যায়ন করেছে।

তাই যদি আপনি দুর্ভাগ্যগ্রস্ত হন তবে আলোর দিকে তাকান। কেউ যদি আপনাকে লেবু চিপে এক গ্লাস রস দেয় তাতে আপনি এক মুঠো চিনি মিশিয়ে দিন। আর যদি কেউ আপনাকে একটি সাপ উপহার হিসেবে দেয় তবে আপনি এর দামী চামড়াটাকে রেখে বাকি অংশটুকু ফেলে দিন।

وَعَسَىٰ أَنْ تَكْرَهُوا شَيْئًا وَهُوَ خَيْرٌ لَكُمْ

“আর এটাও হতে পারে যে, যা তোমাদের জন্য কল্যাণকর তাই তোমরা অপছন্দ করছ।” (২-সূরা বাকারা: আয়াত-২১৬)

ফরাসি বিপ্লবের পূর্বে ফ্রান্স দু’জন মেধাবী কবিকে বন্দি করে: একজন আশাবাদী ও অন্যজন নিরাশাবাদী। তারা উভয়ই জেলখানার জানালার শিকের ফাক দিয়ে তাদের মাথা বের করেছিলেন। আশাবাদী কবি আকাশের তারার দিকে তাকিয়ে হেসেছিলেন, যখন কি-না নিরাশাবাদী কবি রাস্তার ময়লার দিকে তাকিয়ে কেঁদেছিলেন। বিষাদময় ঘটনার অপর দিকে তাকান (তাকিয়ে দেখুন যে,) নির্ভেজাল মন্দ-পরিবেশ টিকে না এবং সব অবস্থাতেই একজন আল্লাহর পক্ষ থেকে কল্যাণ, লাভ ও পুরস্কার পেতে পারে।

১৪. কে উত্তম?

 “(তোমার দেবতাগণ ভালো) নাকি যিনি দুর্দশাগ্রস্তের ডাকে সাড়া দেন তিনি?” (২৭-সূরা আন নামল: আয়াত-৬২)

কার কাছে দুর্বল ও অত্যাচারিতরা বিজয় কামনা করে?

কার নিকট সকলে আকুল আবেদন করে? তিনি আল্লাহ। তিনি ছাড়া অন্য কারও উপাস্য হওয়ার অধিকার নেই।

অতএব, আমার ও আপনার কর্তব্য হল স্বচ্ছল ও অস্বচ্ছল উভয় অবস্থায়ই তাকে আহবান করা, তার নিকট সাহায্য প্রার্থনা করা, দুঃসময়ে তার কাছে আশ্রয় চাওয়া, অনুতপ্ত হয়ে কেঁদে কেটে তার দরবারে আরাধনা করা; তাহলেই তার সাহায্য দ্রুত আসবে।

“(তোমার দেবতাগণ ভালো) না কি যিনি দুর্দশাগ্রস্তের ডাকে সাড়া দেন তিনি?” (২৭-সূরা আন নামল: আয়াত-৬২)

তিনি ডুবন্ত ব্যক্তিকে রক্ষা করেন, মজলুমকে বিজয় দান করেন, পথহারাকে পথ দেখান, অসুস্থকে সুস্থ করেন, আর দুর্দশাগ্রস্তদের সাহায্য যোগান।

“যখন তারা জল জাহাজে (নৌযানে) চড়ে তখন তারা (আল্লাহর) দ্বীনের (ধর্মের) একনিষ্ঠ অনুসারী হয়ে তাকে (আল্লাহকে) বিনীতভাবে ডাকে।” (২৯-সূরা আল আনকাবূতঃ আয়াত-৬৫)

মানুষেরা দুর্দশা দূর করার জন্য যেসব আবেদন করে থাকে, আমি আপনাকে তার জন্য সুন্নাহের কিতাবের কথা বলছি। সে সব কিতাবে আপনি নবী প্রদত্ত দোয়া (প্রার্থনা) দেখতে পাবেন (ও শিখে নিবেন), তা দিয়ে আপনি আল্লাহ্‌কে ডাকতে পারবেন, তাঁর নিকট আকুল আবেদন জানাতে পারবেন এবং তার সাহায্য চাইতে পারবেন এবং যদি আপনি তার প্রতি আপনার ঈমান (বিশ্বাস) হারিয়ে ফেলেন তবে আপনি সব কিছু হারালেন। তার নিকট আকুল আবেদন করে আপনি সর্বোচ্চ ইবাদত করছেন। আপনি নিয়মিতভাবে, বিরতিহীনভাবে ও একনিষ্ঠভাবে প্রার্থনা করেন তবে আপনি দুশ্চিন্তা ও উদ্বিগ্নতা থেকে মুক্তি লাভ করবেন। তারটা ছাড়া সব রশিই কাটা, তারটা ব্যতীত সকল দ্বারই রুদ্ধ। তিনি নিকটবর্তী, তিনি সবকিছুই শুনতে পান ও যারা তার নিকট আকুল আবেদন করে তিনি তাদের ডাকে সাড়া দেন।

ادْعُونِي أَسْتَجِبْ لَكُمْ

“তোমরা আমাকে ডাক (আমার নিকট আকুল আবেদন কর) তাহলেই আমি তোমাদের আবেদনে সাড়া দিব।” (৪০-সূরা আল মু’মিন: আয়াত-৬০)

যদি আপনি দুঃখ-বেদনা নিয়ে বেঁচে থাকেন তবে আল্লাহকে স্মরণ করুন, তার তাসবীহ পাঠ করুন ও তার নিকট সাহায্য প্রার্থনা করুন। সত্যিকার মুক্তি পাওয়ার জন্য সেজদাহ করে তাঁর প্রশংসা জ্ঞাপন করুন। দু’হাত তুলে নাছোড় বান্দা হয়ে তার নিকট সাহায্য প্রার্থনা করুন। তার দরজায় ধরনা ধরুন, তার সম্বন্ধে সুধারণা রাখুন এবং তার সাহায্যের জন্য অপেক্ষা করুন তাহলেই আপনি সত্যিকার সুখ ও সাফল্য লাভ করবেন।

১৫. আপনার গৃহই আপনার জন্য যথেষ্ট

নিঃসঙ্গতা ও নির্জনতা শব্দদ্বয় আমাদের জীবন বিধানে এক বিশেষ অর্থ বহন করে। আর তা হচ্ছে- কুকাজ ও বোকা লোকদের থেকে দূরে থাকা। যখন আপনি নিজেকে এভাবে নিঃসঙ্গ করে নিবেন তখন আপনি ধ্যান-ধারণা, চিন্তা-ভাবনা-গবেষণা ও শিক্ষা-সংস্কৃতির চারণভূমিতে বিচরণ করার অবাধ সুযোগ পাবেন।

যে সব বিষয় (কাজ-কর্ম, কথা-বার্তা, লোকজন ইত্যাদি) আপনাকে আল্লাহর আনুগত্য থেকে অমনোযোগী করে দেয়, আপনি যখন সেসব বিষয় থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন (পৃথক, আলাদা) করে নেন, তখন আপনি এমন এক ঔষধ সেবন করছেন- যা নাকি হার্টের ডাক্তারগণ সর্বাপেক্ষা শক্তিশালী আরোগ্যকর বলে পেয়েছেন। যখন আপনি নিজেকে নিঃসঙ্গ করে নেন তখন আপনার ব্রেন (মস্তিস্ক) কার্যক্ষম হয় বা মাথা কাজ করতে পারে। ফলে সর্বশক্তিমান, পরম করুণাময় আল্লাহ তা’আলার প্রতি বিশ্বাস (ঈমান), তার নিকট অনুশোচনা, অনুতাপ (তওবা) ও তার স্মরণ (জিকির) বৃদ্ধি পায়।

যা হোক, কতিপয় লোকসমাগম শুধু প্রস্তাবিতই নয়, অধিকন্তু প্রয়োজনীয়ও বটে। যেমন জামায়াতে সালাত, শিক্ষার পরিবেশ-পরিমণ্ডল ও সকল পুণ্যকর্মের মজলিস। যে সব আসরে ছেলেমি ও হাল্কাপনাই বেশি সেসব আসর সম্বন্ধে সতর্ক থাকুন। এ ধরনের জনসমাগম থেকে দ্রুত সরে পড়ুন, আপনার ভুল কাজের জন্য কান্নাকাটি করুন, নিজের জিহ্বাকে সংযত করুন ও আপনার গৃহের চৌহদির মাঝেই সন্তুষ্ট থাকুন।

বোকা লোকদের সাথে মিশে আপনি আপনার মানসিক ভারসাম্যতাকে বিপদগ্রস্ত করবেন না, বাছ-বিচার না করে আপনি যে লোকদের সাথে মিশবেন তারা খুব সম্ভবত সময় নষ্ট করতে পটু, মিথ্যা কথা বলতে ও গুজব ছড়াতে সিদ্ধহস্ত এবং সমস্যা ও ক্ষতি উভয়টা বিস্তৃত করতে দক্ষ।

“যদি তারা তোমাদের সাথে বের হতো, তবে তারা বিভ্রান্তিই আরো বৃদ্ধি করত আর তোমাদের মাঝে ফিতনা সৃষ্টি করার জন্য ছুটাছুটি করত।” (৯-সূরা তাওবা: আয়াত-৪৭)

আপরার নিজের উদ্দেশ্য সাধনের জন্য নিজেকে সুরক্ষিত, দুর্ভেদ্য ও শক্তিশালী করার জন্য আমি আপনাকে উপদেশ দিচ্ছি। এ উদ্দেশ্যে আপনি নিজেকে আপনার ঘরে (জনসাধারণ থেকে) আলাদা করে রাখুন। শুধুমাত্র ভালো কথা বলা ও ভালো কাজ করার জন্যই বের হবেন। যখন আপনি এ উপদেশ মান্য করবেন তখন দেখবেন যে, আপনার আত্মা আপনার মাঝে আবার ফিরে আসবে। (নব জীবন লাভ করবেন তথা শান্তির জীবন ফিরে পাবেন। -অনুবাদক) সুতরাং, আপনার সময়ের সদ্ব্যবহার করুন এবং আপনার জীবনকে ধ্বংস হওয়া থেকে রক্ষা করুন। আপনার জিহ্বাকে গীবত (সমালোচনা) করা থেকে সংযত রাখুন, আপনার মনকে দুশ্চিন্তামুক্ত রাখুন এবং আপনার কর্ণদ্বয়কে ঈশ্বর, ধর্ম ও পবিত্র বস্তুসমূহের প্রতি অবজ্ঞাপূর্ণ কথাবার্তা হতে সংরক্ষণ (হেফাজত) করুন।

 ১৬. আল্লাহর কাছে আপনার প্রাপ্তি রয়েছে

মহান আল্লাহ যখন আপনার কাছ থেকে কোন কিছু ছিনিয়ে নেন, তখন যদি আপনি শুধুমাত্র ধৈর্য ধারণ করেন এবং তার কাছ থেকে আপনার পুরস্কার প্রার্থনা করেন, তবে তিনি আপনাকে তার চেয়েও ভালো কোন কিছু দিয়ে ক্ষতিপূরণ করবেন। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ “যার দৃষ্টিশক্তি ছিনিয়ে নেয়া হয়েছে অথচ সে ধৈর্য ধরে, তাকে এর বিনিময়ে জান্নাত (বেহেশত) দিয়ে ক্ষতিপূরণ দেয়া হবে।”

অন্য হাদীসে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ “যদি কেহ এ জগত থেকে তার প্রিয় কাউকে হারিয়ে তার প্রভুর নিকট এর প্রতিদান প্রার্থনা (কামনা) করে তবে তাকে জান্নাত দিয়ে এর খেসারত দেয়া হবে।”

অতএব, কোন দুভাগ্যজনক ঘটনার জন্য অত্যন্ত দুঃখবোধ করবেন না। কারণ, যে মহান সত্তা এর হুকুম (আদেশ) দিয়েছেন তার নিকট এর ক্ষতিপূরণ ও এক মহাপুরস্কার জান্নাত রয়েছে।

যারা এ পৃথিবীতে দুর্দশা কবলিত ও আল্লাহর নৈকট্যপ্রাপ্ত তারা জান্নাতের সর্বোচ্চ স্থানে প্রশংসিত হবে।

“তোমাদের ওপর শান্তি বর্ষিত হোক; কেননা, তোমরা ধৈর্য ধারণ করেছিলে; চূড়ান্ত গৃহ কতই না চমৎকার।” (১৩-সূরা রাআদ: আয়াত-২৪)

কষ্ট সহিষ্ণুতার কারণে কেউ যে পুরস্কার পায় আমাদেরকে অবশ্যই তা গভীরভাবে ভেবে দেখতে হবে।

“তাদের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে তাদের ওপরেই কল্যাণ (অর্থাৎ তারাই ধন্য এবং তাদেরকে ক্ষমা করা হবে) ও তারাই তার অনুগ্রহ লাভ করে এবং তারাই সঠিকপথ প্রাপ্ত।” (২-সূরা বাকারা: আয়াত-১৫৭)

বাস্তবিক এ পার্থিব জীবন খুবই সংক্ষিপ্ত ও এর ধন ভাণ্ডার খুবই নগণ্য। পরকাল উত্তম ও চিরস্থায়ী এবং এ জগতে যে সমস্যা জর্জরিত পরজগতে সে তার পুরস্কার পাবে। এখানে (দুনিয়াতে) যে-ই কঠোর পরিশ্রম করবে সেখানে (আখিরাতে) সে-ই শান্তি পাবে। যারা এ জগতের প্রতি আসক্ত, যারা এর সাথে গভীর সম্পর্ক রাখে, যারা এর প্রেমে পড়েছে, তাদেরকে যে সর্বাপেক্ষা কঠিন ভোগান্তি পোহাতে হবে তা হলো- তারা এ পরকালীন সুখ-সমৃদ্ধ (শান্তি ও সম্পদ) হারাবে। তারা শুধুমাত্র ইহজীবনকেই উপভোগ করতে চায়। তাদের এ কামনার কারণেই তারা এ জগতের মুসিবতকে কঠিন ভাবে। তারা তাদের চারপাশে ইহজীবন ছাড়া আর কিছুই দেখতে পায় না। তারা দুনিয়ার অস্থায়িত্ব ও নগণ্যতা (তুচ্ছতা) দেখতে পায় না। হে দুর্দশা কবলিতরা! যদি আপনারা ধৈর্য ধারণ করেন তবে আপনারা কোন কিছু হারাবেন না; আর আপনারা বুঝতে না পারলেও এতে আপনারা লাভবান হবেন। দুর্দশাগ্রস্ত ব্যক্তির উচিত পরকালের ফলাফলকে ভেবে দেখা- যে ফলাফল ধৈর্যশীলদের জন্য নির্ধারিত।

فَضُرِبَ بَيْنَهُمْ بِسُورٍ لَهُ بَابٌ بَاطِنُهُ فِيهِ الرَّحْمَةُ وَظَاهِرُهُ مِنْ قِبَلِهِ الْعَذَابُ

“অতঃপর উভয় দলের মাঝে একটি এক দরজাওয়ালা প্রাচীর খাড়া করা হবে। এর ভিতরে রহমত থাকবে আর এর বাইরে থাকবে আযাব (শাস্তি)”। (৫৭ সূরা আল হাদীদ: আয়াত-১৩)

 ১৭. বিশ্বাসই জীবন

ঈমান বা বিশ্বাস এর ধন-ভাণ্ডার হতে যারা রিক্তহস্ত তারাই প্রকৃত অর্থে হতভাগা। তারা সর্বদাই দুর্দশাগ্রস্ত ও ক্রুদ্ধ।

وَمَنْ أَعْرَضَ عَنْ ذِكْرِي فَإِنَّ لَهُ مَعِيشَةً ضَنْكًا

যে লোক আমার স্মারক থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয় (যে এ কুরআনে বিশ্বাসও করে না এবং কুরআনের বিধানানুযায়ী আমলও করে না) তার জন্য এক কষ্টদায়ক জীবন রয়েছে আর আখিরাতে আমি তাকে অন্ধ করে তুলব। (২০-সূরা ত্বাহা: আয়াত ১২৪)

আত্মাকে পবিত্র করার, উদ্বিগ্নতা ও দুশ্চিন্তা দূর করার একমাত্র উপায় হল সমগ্র বিশ্বজগতের প্রতিপালক মহান আল্লাহর উপর পুরোপুরি ঈমান রাখা। প্রকৃতপক্ষে, যখন কারো ঈমান থাকে না তখন জীবনে কোন প্রকৃত অর্থ থাকতে পারে না।

একজন পাকা নাস্তিক যদি সে ঈমান না আনে তবে সে সর্বাপেক্ষা ভালো যে কাজটি করতে পারে তা হলো- সে আত্মহনন করতে পারে। এমনটি করে কমপক্ষে সে যে অন্ধকারাচ্ছন্ন ও হতভাগা জীবন-যাপন করছে তার থেকে সে নিজেকে মুক্ত করতে পারবে। ঈমানহীন জীবন কতই না হীন ও তুচ্ছ!

আল্লাহর সীমা লঙ্ঘনকারীদের জীবন কতইনা চিরন্তনভাবে অভিশপ্ত!

“(হেদায়েত পথ হতে) আমি তাদের মনোভাবের (তাদের দৃষ্টিভঙ্গির) তেমনি পরিবর্তন করে দিব যেমনি তারা এর প্রতি প্রথমবার বিশ্বাস স্থাপন করেনি (তথা ঈমান আনেনি) এবং আমি তাদেরকে তাদের অবাধ্যতায় উদভ্রান্তের মতো ঘুরে বেড়াতে দিব।” (৬-সূরা আল আন’আম : আয়াত-১১০)

আল্লাহ ছাড়া কারো উপাস্য হওয়ার অধিকার নেই। এ প্রশ্নাতীত ঈমান (বিশ্বাস) রাখার সময় কি পৃথিবীতে আসেনি? মূর্তিতে বিশ্বাস যে হাস্যকর, নাস্তিকতা যে অযৌক্তিক, নবীগণ যে সত্যবাদী ছিলেন এবং আকাশসমূহ ও পৃথিবীর মালিকানা যে একমাত্র আল্লাহরই শত শত বছর অভিজ্ঞতার পরেও কি মানবজাতিকে এ বাস্তবতার দিকে পরিচালিত হওয়া উচিত নয়? সকল প্রশংসা আল্লাহরই প্রাপ্য এবং তিনি সবকিছুর ওপরই ক্ষমতাবান।

আপনার ঈমানের সবলতা বা দুর্বলতা ও দৃঢ়তা বা কোমলতার স্তর অনুপাতেই আপনি সুখী হবেন।

“খাটি ঈমানদার হয়ে তোমাদের মধ্য থেকে যে পুরুষ বা নারী নেক আমল সম্পাদন করে অবশ্যই তাকে আমি একটি পবিত্র জীবন দান করব। (অর্থাৎ এ দুনিয়ার সম্মান, পরিতৃপ্তি ও হালাল রিযিক দিব) এবং তারা যে উত্তম কাজ করত তদনুপাতে আমি তাদেরকে অবশ্যই পুরস্কার দিব।” (১৬-সূরা আন নাহল: আয়াত-৯৭)

এ আয়াতে ‘পবিত্র জীবন’ বলতে আমাদের প্রতিপালকের প্রতিশ্রুতির প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস ও একটি অবিচল হৃদয় যা তাকে ভালোবাসে এর কথা বলা হচ্ছে। যে লোকেরা এ ‘পবিত্র জীবন’ যাপন করে তারা যখন সমস্যা কবলিত হয় তখন তাদের স্নায়ু (মন) শান্তও থাকে বটে। তাদের ওপর আপতিত সব কিছুর প্রতিই তারা সন্তুষ্ট থাকবে। কেননা, (তারা নিশ্চিত জানে যে) এটা তাদের জন্য (ভাগ্যে) লিখা ছিল। আরো এ কারণে যে, আল্লাহকে তারা তাদের প্রভু হিসেবে, ইসলামকে তাদের জীবন বিধান হিসেবে এবং মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে তাদের নবী ও রাসূল হিসেবে সন্তুষ্ট চিত্তে মেনে নিয়েছে।

১৮. মধু আহরণ কর কিন্তু মৌচাক ভেঙ্গ না

যাতে সৌম্যতা ও ভদ্রতা আছে তাই সুন্দর- আর যাতে তা নেই তাই খারাপ। কারো সাথে সাক্ষাৎকালে যখন আপনি সুন্দর হাসি দিবেন, একটি কোমল কথা বলবেন তখন আপনি একজন সত্যিকার সফল ব্যক্তির চরিত্র প্রদর্শন করবেন যে চরিত্র না কি একটি মৌমাছিও দেখায়।

যখন কোন মৌমাছি (ব্যবহারিক উদ্দেশ্যে অর্থাৎ প্রয়োজনে) কোন ফুলে বসে তখন সে এটাকে ধ্বংস (নষ্ট) করে না, কেননা, আল্লাহ তা’আলা কোমলতার বদৌলতে যা দান করেন কঠোরতার বিনিময়ে তা দান করেন না। কিছু লোক আছেন যাদের ব্যক্তিত্ব চুম্বকের মতো আশেপাশের লোকদেরকে আকর্ষণ করে, শুধুমাত্র এ কারণে যে, তারা তাদের কোমল ও ভদ্র কথা, তাদের ভালো ব্যবহার এবং তাদের মহৎ কাজের জন্য তারা (ঐ লোকদের) ভালোবাসার পাত্র হন।

অন্যের বন্ধুত্বকে জয় করে নেয়ার কৌশল মহান ও ধাৰ্মিকগণ জানেন; সর্বদা একদল লোক তাদেরকে ঘিরে থাকে। কোন সমাবেশে শুধুমাত্র তাদের উপস্থিতিটাই আশীর্বাদ, তারা অনুপস্থিত থাকলে তাদের অভাববোধ করা হয় এবং তাদের কথা জিজ্ঞাসা করা হয়।

এ ধন্য লোকদের একটি আচরণ সংহিতা আছে আর তা হল

ادْفَعْ بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ فَإِذَا الَّذِي بَيْنَكَ وَبَيْنَهُ عَدَاوَةٌ كَأَنَّهُ وَلِيٌّ حَمِيمٌ

“খারাপকে ভালো দিয়ে প্রতিহত কর, তাহলে তোমার আর যার মাঝে শক্ৰতা আছে সে এমন হয়ে যাবে যেন সে তোমার অন্তরঙ্গ বন্ধু।” (৪১-সূরা হা-মীম-আস-সাজদাহ: আয়াত-৩৪)

(মন্দকে ভালো দ্বারা দূর করা বলতে বুঝায় যে, আল্লাহ তা’আলা বিশ্বস্ত ঈমানদারদেরকে ক্রোধের সময় ধৈর্য ধারণ করতে এবং তাদের সাথে যারা মন্দ আচরণ করে তাদেরকে ক্ষমা করে দিতে আদেশ করেছেন।)

তারা তাদের সততা, ক্ষমা ও ভদ্রতা দিয়ে অন্যের ভিতর থেকে হিংসাকে বের করে ফেলেন। তাদের সাথে যে মন্দ আচরণ করা হয়েছে তারা তা ভুলে যান আর যে দয়া তারা পেয়েছেন তারা শুধু তাই মনে রাখেন। তাদেরকে কটু ও রুক্ষ কথা বলা হয়ে থাকতে পারে, কিন্তু তারা তা শুনেন না, বরং চিরতরে পিছনে না ফিরে তারা তাদের পথে অনবরত সামনে চলতে থাকেন। তারা শান্ত ও সৌম্য অবস্থায় থাকেন। সাধারণ জনগণ বিশেষ করে মুসলমানগণ তাদের হাত থেকে নিরাপদ থাকেন। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ

الْمُسْلِمُ مَنْ سَلِمَ الْمُسْلِمُونَ مِنْ لِسَانِهِ وَيَدِهِ ، وَالْمُؤْمِنُ : مَنْ أَمِنَهُ النَّاسُ عَلَى دِمَائِهِمْ وَأَمْوَالِهِمْ

“প্রকৃত মুসলিম সে যার জিহ্বা ও হাত থেকে অন্যান্য মুসলিমগণ নিরাপদ থাকেন। আর প্রকৃত মু’মিন সে যাকে অন্য মানুষেরা তাদের রক্ত (জীবন) ও সম্পদের ব্যাপারে বিশ্বাস করে।”

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেছেন-

إن الله أَمرني أَنْ أَصِلَ مَنْ قَطَعَنِي وَأَنْ أَعْفُوَ عَمَّنْ ظَلَمَنِي وَأَنْ أُعْطِيَ مَنْ حَرَمَنِي

“যারা আমার সাথে আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করেছে তাদের সাথে আত্মীয়তার বন্ধন রক্ষা করার জন্য, যারা আমার সাথে অন্যায় আচরণ করেছে বা আমাকে অত্যাচার করেছে তাদেরকে ক্ষমা করে দিতে এবং যারা আমাকে বঞ্চিত করেছে তাদেরকে দান করতে আল্লাহ আমাকে আদেশ করেছেন।”

“নিশ্চয় আল্লাহ সৎকর্মশীলদের ভালোবাসেন- (বিশেষত তাদেরকে) যারা ক্রোধ সংবরণ করে এবং মানুষকে ক্ষমা করে দেয়।” (৩-সূরা আলে ইমরান: আয়াত-১৩৪)

এ ধরনের লোকদেরকে এ পৃথিবীতে শান্তি ও প্রশান্তির এক আসন্ন পুরস্কারের ঘোষণা দিন। পরকালে জান্নাতে তাদের ক্ষমাশীল প্রভুর ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্যে থাকার এক মহা সুসংবাদও তাদেরকে দিন।

১৯. জেনে রাখুন! আল্লাহর জিকিরেই আত্মা শান্তি পায়

أَلَا بِذِكْرِ اللَّهِ تَطْمَئِنُّ الْقُلُوبُ

জেনে রাখ! আল্লাহর জিকির করেই হৃদয় প্রশান্তি লাভ করে। (১৩-সূরা রাআদ: আয়াত ২৮)

সততা আল্লাহর প্রিয় এবং আত্মাকে পরিষ্কার করার সাবান। আর আল্লাহর জিকির ছাড়া এমন কোন কাজ নেই যা আত্মাকে এমন শান্তি দিতে পারে যার পুরস্কার এর চেয়ে বেশি।

فَاذْكُرُونِي أَذْكُرْكُمْ

“অতএব আমাকে স্মরণ কর, আমিও তোমাদেরকে স্মরণ করব।” (২-সূরা বাকারা: আয়াত-১৫২)

আল্লাহর জিকির (স্মরণ)-ই দুনিয়াতে তার বেহেশত। আর এতে যে প্রবেশ করেনি সে আখেরাতের বেহেশতে প্রবেশ করতে পারবে না। জিকির শুধুমাত্র এ পৃথিবীর সমস্যা ও উদ্বিগ্নতা থেকে এক নিরাপদ স্বৰ্গই নয়; অধিকন্তু, চূড়ান্ত সাফল্য লাভের এক সংক্ষিপ্ত ও সহজ পথও বটে। আল্লাহর জিকির সম্বন্ধে বিভিন্ন আয়াত পড়ে দেখুন তাহলেই আপনি এর উপকারিতা বুঝতে পারবেন।

যখন আপনি আল্লাহর জিকির করবেন তখন দুশ্চিন্তা ও ভয়ের কালো মেঘ দূরীভূত হয়ে যাবে ও আপনার সমস্যার পাহাড় সরে যাবে।

যারা আল্লাহর জিকির করেন তারা শান্তিতে আছেন বা থাকেন- একথা শুনে আমাদের আশ্চর্য হওয়া উচিত নয়। যা সত্যিই আশ্চর্য তা হল অবহেলাকারীরা ও অমনোযোগীরা তাকে স্মরণ না করে কীভাবে বেঁচে থাকে।

“তারা নিষ্প্রাণ, নির্জীব আর তারা জানেনা কখন তাদেরকে পুনরুথিত করা হবে।” (১৬-সূরা আন নাহল: আয়াত-২১)

ওহে! যে নাকি বিনিদ্র রজনীর অভিযোগ করে ও তার দুর্দশার ভয়ে আতঙ্কগ্ৰস্ত, তার পবিত্র নাম ধরে ডাকুন।

هَلْ تَعْلَمُ لَهُ سَمِيًّا

“তার মতো কারো কথা কি তোমরা জান?” (১৯-সূরা মারইয়াম: আয়াত-৬৫)

لَيْسَ كَمِثْلِهِ شَيْءٌ وَهُوَ السَّمِيعُ الْبَصِيرُ

তার মতো কিছুই নেই, তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বদ্ৰষ্টা। (৪২-সূরা শুরা: আয়াত-১১)

তুমি আল্লাহকে যে পরিমাণ স্মরণ করবে, তোমার আত্মা সে পরিমাণই শান্ত ও সন্তুষ্ট হবে। তার জিকিরের অর্থই হলো তার ওপর পূর্ণ নির্ভরতা, সাহায্যের জন্য তার মুখাপেক্ষী হওয়া, তার সম্বন্ধে সুধারণা পোষণ করা এবং তার পক্ষ থেকে বিজয়ের অপেক্ষায় থাকা। সত্যিই যখন তার কাছে আবেদন করা হয় তখন তিনি নিকটেই থাকেন; যখন তাকে ডাকা হয় তিনি তখন শুনতে পান ও তার নিকট আকুল আবেদন করা হলে তিনি সাড়া দেন। তাই তার সামনে নিজেকে বিনীত কর ও একনিষ্ঠভাবে তার সাহায্য প্রার্থনা কর। বারবার তার কল্যাণময় (বরকতময়) নামের তাসবীহ পাঠ কর ও তার একমাত্র উপাস্য হওয়ার কথা উল্লেখ কর। তার প্রশংসা কর, তার নিকট কাকুতি-মিনতি করে প্রার্থনা কর ও তার নিকট ক্ষমা ভিক্ষা চাও, তাহলেই ইনশাআল্লাহ (আল্লাহ চাহে তো) তুমি সুখ, শান্তি ও অন্তরে আলোকস্ফুরণ পাবে।

فَآتَاهُمُ اللَّهُ ثَوَابَ الدُّنْيَا وَحُسْنَ ثَوَابِ الْآخِرَةِ

“তাই আল্লাহ তাদেরকে এ জগতের পুরস্কার ও পরকালের চমৎকার পুরস্কার দান করলেন।” (৩-সূরা আলে ইমরান: আয়াত ১৪৮)

২০. হিংসা হিংসুককে ধ্বংস করে

أَمْ يَحْسُدُونَ النَّاسَ عَلَىٰ مَا آتَاهُمُ اللَّهُ مِنْ فَضْلِهِ

“নাকি আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে মানুষদেরকে যা দান করেছেন সে বিষয়ে তারা তাদেরকে হিংসা করে।” (৪-সূরা আন নিসা: আয়াত-৫৪)

হিংসা এমন এক ব্যাধি যা শুধুমাত্র মনেরই নয় দেহেরও ব্যাপক ক্ষতি সাধন করে। বলা হয় যে, হিংসুক লোকের কোন বিশ্রাম (ঘুম) নেই ও সে বন্ধুর লেবাসে একজন শক্র । হিংসারোগ সম্বন্ধে ঠিকই বলা হয় যে, এটা কম পক্ষে একটা ভয়; কেননা, এটা হিংসুককেই প্রথমে হত্যা করে (অর্থাৎ হিংসা হিংসুককে তিলে তিলে ধ্বংস করে। -অনুবাদক) আমি আমাকে ও আপনাকে উভয়কেই হিংসা করতে নিষেধ করছি; কেননা অন্যদের প্রতি দয়া প্রদর্শন করার পূর্বে আমাদেরকে অবশ্যই প্রথমে নিজেদের প্রতি দয়া প্রদর্শন করতে হবে। অন্যের প্রতি হিংসা করে আমাদের রক্তে মাংসে গড়া দেহখানাকে দুর্দশাগ্রস্ত করছি ও আমাদের গভীর ঘুমকে নষ্ট করছি। হিংসুক ব্যক্তি (যেন) আগুন জ্বালিয়ে সে আগুনে নিজেই বাপ দেয়। হিংসা দুঃখ-বেদনা ও ভোগান্তি এনে এক সময়ের শান্তিপূর্ণ ও পূর্ণময় জীবনকে ধ্বংস সাধন করে।

হিংসুক ব্যক্তির অভিশাপ এই যে, সে ভাগ্যকে অস্বীকার করে এবং তার সষ্টাকে অবিবেচক মনে করে।

হিংসা কোন রোগের মতো? এটাতো অন্যান্য রোগের মতো নয়। হিংসুক ব্যক্তি এ রোগের কারণে পরকালে কোন পুরস্কার পাবে না। (অথচ অন্যান্য রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিরা তাদের রোগ ভোগ ও তাতে ধৈর্য ধরার কারণে পরকালে পুরস্কার পাবে। -অনুবাদক)

হিংসুক ব্যক্তি তার মৃত্যুর দিন পর্যন্ত বা অন্যদের সৌভাগ্য তাদের থেকে বিদায় না নেয়া পর্যন্ত প্রচণ্ড ক্রোধে জ্বলে পুড়ে শেষ হতে থাকবে। হিংসুক ব্যক্তি ছাড়া সকলের সাথেই মীমাংসা করা সম্ভব। কেননা, তার সাথে মীমাংসার জন্য যা প্রয়োজন তা হলো- আপনি আপনার থেকে আল্লাহর সব কল্যাণ ও করুণা দূর করবেন বা আপনার সকল প্রতিভা ও সদগুণ পরিত্যাগ করবেন। যদি আপনি এরূপ করেন তবে হয়তোবা সে সুখী হবে। আল্লাহর নিকট আমরা হিংসুকের ক্ষতি হতে আশ্রয় প্রার্থনা করি। হিংসুক এমন এক বিষধর কালো সাপের মতো হয়ে যায়- যে সাপ একটি নির্দোষ দেহে এর বিষ ঢেলে না দেয়া পর্যন্ত কোন বিশ্রাম পায় না।

সুতরাং হিংসা থেকে বহু দূরে থাকুন এবং হিংসুক লোক থেকে আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করুন। কেননা, সে সর্বদা আপনাকে সতর্কভাবে লক্ষ্য করছে।

২১. জীবনকে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করুন

জীবনের আনন্দ খুবই ক্ষণস্থায়ী এবং প্রায়ই তার পরে দুঃখ নেমে আসে। জীবনের অর্থই হলো দায়িত্ব, সতত পরিবর্তনশীল যাত্রা ও দুঃখ-কষ্টের অবিরাম নির্মম প্রচণ্ড আক্রমণ ।

আপনি এমন একজন পিতা, স্ত্রী বা বন্ধু পাবেন না যিনি সমস্যামুক্ত। আল্লাহ তা’আলা চেয়েছেন যে, এ পৃথিবীর দুটি করে বিপরীত জিনিস দিয়ে ভরপুর থাক। যেমন- ভালো-মন্দ, পাপ-পুণ্য, সুখ-দুঃখ। অতঃপর ভালোত্ব, সততা-সরলতা ও সুখ স্বর্গের (জান্নাতের) জন্য; মন্দকাজ, দুর্নীতি ও পাপকাজ এবং দুঃখ-দুর্দশা নরকের (জাহান্নামের) জন্য।

নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

الدُّنْيَا مَلْعُونَةٌ مَلْعُونٌ مَا فِيهَا إِلَّا ذِكْرُ اللَّهِ وَمَا وَالَاهُ وَعَالِماً و مُتَعَلِّماً

“আল্লাহর জিকির ও জিকিরের ফলে যা আসে (যেমন ভালো কাজ, আল্লাহ যা ভালোবাসেন) তা এবং আলেম ও তালেবে এলম ছাড়া গোটা দুনিয়া ও দুনিয়াতে যা কিছু আছে সবই অভিশপ্ত।”

এক নিখুঁত, আদর্শ, দুশ্চিন্তা ও কষ্টহীন কল্পিত ইহজীবনের (কল্পিত ইহকালীন স্বৰ্গরাজ্যের) আশায় বৃথা ও কষ্ট কল্পনায় সর্বদা বিভোর না থেকে আপনার যা আছে তাই নিয়েই জীবন-যাপন করুন। জীবনকে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করুন এবং তদানুপাতে সকল পরিবেশের সাথে নিজেকে খাপ খাইয়ে (মানিয়ে) নিন। (সকল পরিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে নেয়ার অর্থ সকল মতাদর্শ মেনে নেয়া ও তদানুসারে কাজ করা নয়; বরং, নিজে শান্তির ধর্ম মেনে চলা ও অন্যকে তদানুসারে চলতে বলা, যদি তারা না মানে তবে অহেতুক মর্মযাতনাবোধ না করা। -অনুবাদক) নিন। এ দুনিয়াতে আপনি নিষ্কলঙ্ক সঙ্গী ও নিখুঁত পরিস্থিতি বলে কোন জিনিস পাবেন না; কেননা, নিষ্কলঙ্কতা ও নিখুঁত অবস্থা এমন দুটি গুণের নাম যা এ জীবনে পরদেশী।

নিজেদেরকে সংশোধন করা, সহজটাকে গ্রহণ করা, কঠিনটাকে বর্জন করা এবং প্রায়ই অন্যের ভুল-ভ্রান্তিকে উপেক্ষা করা আমাদের জন্য জরুরি।

 

 

 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Back to top button
error: Content is protected !!