মুখতাসার শুআবুল ইমান- ইমানের শাখা ৬ থেকে

السَّادِسُ مِنْ شُعَبِ الْإِيمَانِ

وَهُوَ بَابٌ فِي الْإِيمَانِ بِالْيَوْمِ الْآخِرِ

ইমানের ৬ষ্ট শাখা

আখিরাতের প্রতি ইমান

শায়খ হালিমী (রহ) বলেন- আখিরাতের দিনের প্রতি ইমান আনার অর্থ হলো এই কথার সত্যায়ন করা যে, এই দুনিয়ার দিনের শেষ ও চূড়ান্ত সীমা রয়েছে। অর্থাৎ এই দুনিয়া একদিন টুকরো টুকরো হয়ে ধ্বংস হয়ে যাবে।

আখিরাতের উপর ইমান আনার ব্যাপারে শরহে সদর বা প্রশান্ত চিত্ত হওয়ার জন্য যে বিষয়টি প্রযোজ্য, তা হলো আল্লাহর ভয় বিদ্যমান থাকা। আর এর আলামত হলো দুনিয়ার সাথে সম্পৃক্ততা কম থাকা। দুনিয়ার কষ্ট ও মুসিবতে হতাশ না হওয়া এবং র্ধৈয ধরা। খাহিশাত বা আসক্তির চাহিদার ব্যাপারে র্ধৈয ধারণ করা। আর আল্লাহ তাআলার নিকট যে প্রতিদান ও সওয়াব রয়েছে তার প্রতি ইয়াকীন রাখা।

আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন-

وَمِنَ النَّاسِ مَنْ يَقُولُ آَمَنَّا بِاللَّهِ وَبِالْيَوْمِ الْآَخِرِ وَمَا هُمْ بِمُؤْمِنِينَ

আর মানুষের মধ্যে কিছু লোক এমন রয়েছে যারা বলে, আমরা আল্লাহ ও পরকালের প্রতি ইমান এনেছি অথচ আদৌ তারা ইমানদার নয়।– সূরা বাকারা ৮

আমরা বর্ণনা করেছি হযরত উমর (রা) সূত্রে নবী (সা) থেকে। যখন তাকে ইমানের ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করা হলো। তিনি বললেন,

أَنْ تُؤْمِنَ بِاللهِ، وَمَلَائِكَتِهِ، وَكُتُبِهِ وَرُسُلِهِ، وَالْيَوْمِ الْآخِرِ، وَالْقَدَرِ خَيْرِهِ وَشَرِّهِ

তুমি ইমান আনবে আল্লাহর প্রতি, তার ফেরেশতাদের প্রতি, তার কিতাবসমূহের প্রতি, তার রাসূলগেণের প্রতি, আখিরাত বা শেষ দিবসের প্রতি এবং তাকদীর বা ভাগ্যের ভাল মন্দের প্রতি। 

নবী (সা) ইরশাদ করেন-

بُعِثْتُ أَنَا وَالسَّاعَةُ كَهَاتَيْنِ

আমার প্রেরণ এবং কিয়ামত- এই দুটি আঙ্গুলের মত নিকটর্বতী।[1]

এই হাদীসের অর্থ হলো- আমি শেষ নবী। আমার পর আর কোন নবী আসবে না। তবে কিয়ামত বা পরকাল আসবে। যা আমার পরে খুবই নিকটর্বতী।

কিয়ামত যেভাবে সংঘটিত হবে

হযরত আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেন-

وَالَّذِي نَفْسُ مُحَمَّدٍ بِيَدِهِ، لَتَقُومَنَّ السَّاعَةُ، وَقَدْ نَشَرَ الرَّجُلَانِ ثَوْبًا بَيْنَهُمَا لَا يَتَبَايَعَانِهِ وَلَا يَطْوِيَانِهِ، وَلَتَقُومَنَّ السَّاعَةُ، وَهُوَ يَلِيطُ حَوْضَهُ لَا يَسْقِيهِ، وَلَتَقُومَنَّ السَّاعَةُ وَقَدِ انْصَرَفَ الرَّجُلُ بِلَبَنِ لِقْحَتِهِ مِنْ تَحْتِهَا لَا يَطْعَمُهَا، وَقَدْ رَفَعَ أُكْلَتَهُ إِلَى فِيهِ فَلَا يَطْعَمُهَا

কসম সেই সত্তার  যার হাতে মুহাম্মদের প্রাণ! কিয়ামত অবশ্যই সংঘটিত হবে। এমনককি দুই ব্যক্তি ক্রয়-বিক্রয়েরে জন্য কাপড়ের থান মেলে ধরবে আর তার সওদা করার পূর্বেই কিয়ামত সংঘটিত হয়ে যাবে। এক ব্যক্তি তার উটনীর দুধ দোহন করে তা পান করার পূর্বেই কিয়ামত সংঘটিত হয়ে যাবে। পানাহারে বসা ব্যক্তি তার লোকমা গ্রহণ করার পূবেই কিয়ামত সংঘটিত হয়ে যাবে।[2] – রিওয়ায়াত ২৫৫

السابع من شعب الإيمان

وهو باب في الإيمان بالبعث والنشور بعد الموت

ইমানের ৭ম শাখা

মৃত্যুর পর পূণরুত্থানেরর উপর ইমান

আল্লাহ তাআলার বাণী-

زَعَمَ الَّذِينَ كَفَرُوا أَنْ لَنْ يُبْعَثُوا

যারা কাফির তার এই বিশ্বাস রাখে যে, মৃত্যুর পর তাদের কখনও জীবিত করা হবে না।- সূরা  তাগাবুন ৭

قُلِ اللَّهُ يُحْيِيكُمْ ثُمَّ يُمِيتُكُمْ

বলে দিন আল্লাহ তাআলা তোমাদেরতে জীবনদান করেছেন অত:পর তিনিই তোমাদের মৃত্যু দান করবেন।– সূরা জাসিয়া ২৬

আমরা বর্ণনা করেছি হযরত উমর (রা) থেকে। রাসূলুল্লাহ (সা) কে জিজ্ঞাসা করা হলো, ইমান কি? তিনি বললেন-

الإيمان أن تؤمن بالله وملائكته وكتبه ورسله وبالبعث من بعد الموت وبالقدر كله

তুমি ইমান আনবে আল্লাহর প্রতি, তার ফেরেশতাদের প্রতি, তার কিতাবসমূহের প্রতি, তার রাসূলগেণের প্রতি, মৃত্যুর পর পূণরায় জীবিত হওয়ার প্রতি এবং পুরো তাকদীরের প্রতি।– রিওয়ায়াত ২৫৬

মৃত্যুর পর জীবিত হওয়ার অসংখ্য প্রমাণ এই দুনিয়ার জীবনেই আল্লাহ তাআলা প্রদান করেছেন। যেমন- ইবরাহিম (আ) এর জন্য মৃত পাখিকে জীবিত করা, হযরত উযায়র (আ) এর মৃত্যুর পর জীবিত হওয়ার ঘটনা, আমালেকা সম্প্রদায় এর ঘটনা, আসহাবে কাহফের ঘটনা ইত্যদি।

الثامن من شعب الإيمان

وهو باب في حشر الناس بعد ما يبعثون من قبورهم إلى الموقف الذي بين لهم من الأرض

ইমানের ৮ম শাখা

মৃত্যুর পর পূণরুত্থানের প্রতি ইমান

আল্লাহ তাআলা যে পর্যন্ত চাইবেন মানুষ হাশরের ময়দানে দাড়িয়ে থাকবেন। যখন সেই সময় আসবে, যখন আল্লাহ তাদের থেকে হিসাব নেওয়ার ইচ্ছা করবেন, তখন আল্লাহ তাআলা নির্দেশ দিবেন আর সমস্ত আমলনামা নিয়ে আসা হবে, যা কিরামান কাতিবীন ফেরেশতাদ্বয় লোকদের কার্যকলাপ লিপিবদ্ধ করেছিল।

আর তা মানুষদেরকে এভাবে দেয়া হবে যে, কারো আমলনামা সোজা হাতে, কারো আমলনামা উল্টা হাতে আবার করো আমলনামা তার পিছন দিক হতে দেয়া হবে। যাদের আমলনামা সোজা হাতে দেয়া হবে তারা হবে সৌভাগ্যবান। আর যাদের আমলনামা বিপরীত দিক হতে দেয়া হবে তারা হবে হতভাগ্য।

আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন-

ألا يظن أولئك أنهم مبعوثون ليوم عظيم يوم يقوم الناس لرب العالمين

তারা কি চিন্তা করে না যে, উহারা পুণরুত্থিত হবে, মহাদিবসে? যেদিন সমস্ত মানুষ দণ্ডায়মান হবে তার প্রতিপালকের সম্মুখে।– সূরা তাতফীফ ৪-৬

আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা) বর্ণনা করেন। রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেন-

يقوم الناس يوم القيامة لرب العالمين حتى يغيب أحدهم في رشحه إلى أنصاف أذنيه

কিয়ামতের দিন মানুষ আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের সামনে দন্ডায়মান হবে। এমনকি তারা তাদের কানের লতি পর্যন্ত ঘাম দ্বারা ডুবে যাবে।-রিওয়ায়ায়াত ২৫৭

হযরত মিকদাদ ইবনুল আসওয়াদ (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সা) কে বলতে শুনেছি-

تدني الشمس يوم القيامة من الخلق حتى تكون منهم كمقدار ميل

কিয়ামতের দিন মানুষকে সূর্যের নিকটবর্তী করে দেয়া হবে। এমনকি তা মানুষের এক মাইলের নিকটবর্তী হয়ে যাবে।

বর্ণনাকারী সুলায়মান ইবনে আমির (রহ) বলেন-  আল্লাহর শপথ! আমি জানি না, (ميل) মাইল দ্বারা কি বুঝানো হয়েছে, জমীনের দূরত্ব নাকি না (ميل নামক) ঐ শলাকা যা চোখে সুরমা দেয়ার কাজে ব্যবহৃত হয়।

মানুষ তাদের আমল অনুসারে ঘামের মাঝে ডুবে থাকেবে। তাদের কারো ঘাম পায়ের গোড়ালি পর্যন্ত হবে, কেউ হাটু পর্যন্ত ঘামের মধ্যে থাকবে, কেউ কোমর পর্যন্ত আর কারো মুখ পর্যন্ত ঘামে ডুবে যাবে।  

বর্ণনাকারী বলেন, এ সময় রাসূলুল্লাহ (সা) নিজ মুখের প্রতি ইঙ্গিত করলেন।–রিওয়ায়াত ২৫৮

আমলনামা সবার গলায় ঝুলিয়ে দেয়া হবে

আল্লাহ তাআলার বাণী

وَكُلَّ إِنْسَانٍ أَلْزَمْنَاهُ طَائِرَهُ فِي عُنُقِهِ وَنُخْرِجُ لَهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ كِتَابًا يَلْقَاهُ مَنْشُورًا (13) اقْرَأْ كِتَابَكَ كَفَى بِنَفْسِكَ الْيَوْمَ عَلَيْكَ حَسِيبًا (14)

আমি প্রত্যেক মানুষের কর্মকে তার গ্রীবালগ্ন করেছি। আর কিয়ামতের দিন আমি তার জন্য বের করব এক কিতাব যা সে খোলা অবস্থায় পাবে। (আর বলা হবে) পাঠ কর তুমি তোমার কিতাব। আজ তোমার হিসাব গ্রহণের জন্য তুমি নিজেই যথেষ্ট।– সূরা ইসরা ১৩-১৪

আমলনামা লিখার জন্য ফেরেশতা নির্ধারিত

وَإِنَّ عَلَيْكُمْ لَحَافِظِينَ (10) كِرَامًا كَاتِبِينَ (11) يَعْلَمُونَ مَا تَفْعَلُونَ (12)

অবশ্যই তোমাদের উপর তত্বাবধায়ক নিযুক্ত আছে। সম্মানিত আমল লেখকবৃন্দ। তারা জানে তোমরা যা কর।– সূরা ইনফিতার-১০-১১

 

প্রত্যেকটি বিষয়ই লিখা হয়

عَنِ الْيَمِينِ وَعَنِ الشِّمَالِ قَعِيدٌ (17) مَا يَلْفِظُ مِنْ قَوْلٍ إِلَّا لَدَيْهِ رَقِيبٌ عَتِيدٌ (18)

ফেরেশতা ডানে ও বামে বসে তার আমল গ্রহণ করে। সে যে কথাই উচ্চারণ করে, তাই গ্রহণ করার জন্য তার কাছে সদা প্রস্তুত প্রহরী রয়েছে।– সূরা ক্বাফ:১৭-১৮

 

আমলনামায় ছোট বড় সব কৃতকর্ম লিখা থাকবে

مَالِ هَذَا الْكِتَابِ لَا يُغَادِرُ صَغِيرَةً وَلَا كَبِيرَةً إِلَّا أَحْصَاهَا

(তারা বলবে, হায়!) এ কেমন কিতাব (আমলনামা)। এ যে ছোট কড় কোন কিছুই বাদ দেয়নি- সবই এতে রয়েছে।– সূরা আল কাহফ ৪৯

 

আমলনামায় ডান হাতে আসলে হিসাব সহজ হবে আর না হয় কঠিন হবে

) فَأَمَّا مَنْ أُوتِيَ كِتَابَهُ بِيَمِينِهِ (7) فَسَوْفَ يُحَاسَبُ حِسَابًا يَسِيرًا (8) وَيَنْقَلِبُ إِلَى أَهْلِهِ مَسْرُورًا (9) وَأَمَّا مَنْ أُوتِيَ كِتَابَهُ وَرَاءَ ظَهْرِهِ (10) فَسَوْفَ يَدْعُو ثُبُورًا (11)

আর যাকে তার আমলনামা তার সোজা হাতে দেওয়া হবে তার হিসাব-নিকাশ সহজেই নেয়া হবে। আর সে তার স্বজনদের নিকট প্রফুল্লচিত্তে ফিরে যাবে। আর যাকে তার আমলনামা পিছন দিক হতে দেয়া হবে, সে (নিজেই) তার নিজের ধ্বংস চাইবে এবং জ্বলন্ত অগ্নিতে প্রবেশ করবে।– সূরা ইনশিকাক ৭-১২

 

হিসাবের সময় আল্লাহ বান্দার মাঝে কোন পর্দা থাকবে না

আদি ইবনে হাতিম (রা) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেন-

مَا مِنْكُمْ مِنْ أَحَدٍ إِلَّا سَيُكَلِّمُهُ رَبُّهُ لَيْسَ بَيْنَهُ وَبَيْنَهُ حَاجِبٌ وَلَا تُرْجُمَانٌ، فَيَنْظُرُ أَيْمَنَ مِنْهُ فَلَا يَرَى شَيْئًا إِلَّا شَيْئًا قَدَّمَهُ، وَيَنْظُرُ أَشْأَمَ مِنْهُ فَلَا يَرَى إِلَّا شَيْئًا قَدَّمَهُ، وَيَنْظُرُ أَمَامَهُ فَلَا يَرَى إِلَّا النَّارَ فَاتَّقُوا النَّارَ وَلَوْ بِشِقِّ تَمْرَةٍ

কিয়ামতের দিন তোমাদের প্রত্যেকের সাথে আল্লাহ তাআলা কথা বলবেন। আর সেদিন আল্লাহ ও বান্দার মাঝে কোন পর্দা থাকবে না, কোন দোভাষীও থাকবে না। মানুষ তার ডান দিকে দেখবে তো কিছুই দেখতে পাবে না- সেসব আমল ও কার্যকলাপ ব্যতীত যা সে আগে পাঠিয়েছে। বাম দিকেও দেখবে, তবে কিছুই দেখতে পাবে না- সেসব আমল ও কার্যকলাপ ব্যতীত যা সে আগে পাঠিয়েছে। অতএব তোমরা জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচ অর্থেক খেজুর দান করে হলেও।– রিওয়ায়াত ২৫৯

 

কে হিসাব নিবেন?

কেউ কেউ বলেন যে, আল্লাহ তাআলা সকলকে একত্রিত করে সবার হিসাব একসাথে নিবেন। আবার কেউ বলেন যে, আল্লাহ তাআলা ফেরেশতাদেরকে হিসাব নেয়ার হুকুম দিবেন। আবার কেউ বলেন যে, আল্লাহ তাআলা মুমিনদের হিসাব নিজ দায়িত্বে নিবেন আর আর কাফিরদের হিসাব ফেরেশতাদের দায়িত্বে দিবেন। যখন হিসাব-কিতাব শেষ হবে তখন আমল ওজন করা হবে, কেননা ওজন করার উদ্দেশ্য প্রতিদান প্রদান করার জন্য।

আবু সাইফ আয যাহিদ (রহ) বলেন-

مَا أُحِبُّ أَنْ يَلِيَ حِسَابَنَا غَيْرُ اللهِ عَزَّ وَجَلَّ لِأَنَّ الْكَرِيمَ يَتَجَاوَزُ

আমি চাই না যে আমার হিসাব আল্লাহ ছাড়া অপর কেউ নেয়। এজন্য যে, দয়াময় সত্বাই ক্ষমা করে থাকেন।- রিওয়ায়াত ২৬০

সুফিয়ান সাওরী (রহ) বলেন-

مَا أُحِبُّ أَنَّ حِسَابِي جُعِلَ إِلَى وَالِدِي رَبِّي خَيْرٌ لِي مِنْ وَالِدِي

আমি চাই না যে, আমার হিসাব আমার পিতা মাতা নেন, কেননা আল্লাহ তাআলা পিতামাতার চেয়েও উত্তম।– রিওয়ায়াত ২৬১

 

রাসূলুল্লাহ (সা) এর উম্মত অন্য উম্মতদের উপর সাক্ষী

আবূ সাঈদ (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, (হাশরের দিন) নূহ এবং তাঁর উম্মত (আল্লাহর দরবারে) হাযির হবেন । তখন আল্লাহ তাকে জিজ্ঞাসা করবেন, নূহ কি তোমাদের কাছে আমার বাণী পৌছিয়েছেন। তারা বলবে- না, আমাদের কাছে কোন নবীই আসেন নি । তখন আল্লাহ  নূহ (আ) কে বলবেন, তোমার পক্ষে সাক্ষ্য দিবে কে? তিনি বলবেন, মুহাম্মদ (সা) এবং তাঁর উম্মত। [রাসূলুল্লাহ (সা) বললেন] তখন আমরা সাক্ষ্য দিব। নিশ্চয়ই তিনি আল্লাহ্‌র বাণী পৌছিয়েছেন । আর এটিই হল আল্লাহ্‌র বাণীঃ

وَكَذَلِكَ جَعَلْنَاكُمْ أُمَّةً وَسَطًا لِتَكُونُوا شُهَدَاءَ عَلَى النَّاسِ، وَيَكُونَ الرَّسُولُ عَلَيْكُمْ شَهِيدًا

আর এভাবেই আমি তোমাদেরকে মধ্যমপন্থী উম্মত বানিয়েছে, যেন তোমরা মানব জাতির উপর সাক্ষী হও।–[সূরা বাকারা ১৪৩]- রিওয়ায়াত ২৬৪

আবূ সাঈদ (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন- (কিয়ামতের দিন) একজন নবী আসবেন, তাঁর সাথে থাকবে একজন মাত্র অনুসারী। আবার কোন নবীর সাথে থাকবে দু’জন অনুসারী। আবার কোন নবীর সাথে থাকবে তিনজন বা তার কম-বেশী অনুসারী। তাকে বলা হবে, তুমি কি তোমার জাতির নিকট আল্লাহর বাণী পৌঁছিয়েছিলে? তিনি বলবেনঃ হা। তার জাতিকে ডাকা হবে এবং বলা হবে, তিনি কি তোমাদের নিকট আল্লাহর বাণী পৌঁছিয়েছিলেন? তারা বলবে, না। তাঁকে বলা হবে, তোমার সাক্ষী কারা? তিনি বলবেনঃ মুহাম্মাদ (সা) ও তার উম্মাত।

তখন মুহাম্মাদ (সা) এর উম্মাতকে ডাকা হবে এবং জিজ্ঞেস করা হবে, নবী কি (তার উম্মাতের নিকট আল্লাহর বাণী) পৌঁছিয়েছিলেন? তারা বলবে, হা। তাদের আবার জিজ্ঞেস করা হবে, তোমরা তা জানলে কিভাবে? তারা বলবে, আমাদের নবী (সা) আমাদের অবহিত করেছিলেন যে, নিশ্চয় রাসূলগণ আল্লাহর বাণী পৌঁছে দিয়েছেন। আমরা তার কথা সত্য বলে স্বীকার করেছি।

তোমাদের জন্য এ কথার প্রমাণ হলো মহান আল্লাহর বাণী-

وَكَذَلِكَ جَعَلْنَاكُمْ أُمَّةً وَسَطًا لِتَكُونُوا شُهَدَاءَ عَلَى النَّاسِ، وَيَكُونَ الرَّسُولُ عَلَيْكُمْ شَهِيدًا

আর এভাবেই আমি তোমাদেরকে মধ্যমপন্থী উম্মত বানিয়েছে, যেন তোমরা মানব জাতির উপর সাক্ষী হও।–[সূরা বাকারা ১৪৩]- রিওয়ায়াত ২৬৫

 

মানুষের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ তার বিরুদ্ধ সাক্ষ্য দিবে

আল্লাহ তাআলার বাণী-

يَوْمَ تَشْهَدُ عَلَيْهِمْ أَلْسِنَتُهُمْ وَأَيْدِيهِمْ وَأَرْجُلُهُمْ بِمَا كَانُوا يَعْمَلُونَ (24)

যেদিন তাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিবে তাদের জিহ্বা, তাদের হাত ও তাদের পা তাদের কৃতকর্ম সম্বন্ধে।– সূরা নূর ২৪

وَقَالُوا لِجُلُودِهِمْ لِمَ شَهِدْتُمْ عَلَيْنَا قَالُوا أَنْطَقَنَا اللَّهُ الَّذِي أَنْطَقَ كُلَّ شَيْءٍ وَهُوَ خَلَقَكُمْ أَوَّلَ مَرَّةٍ وَإِلَيْهِ تُرْجَعُونَ (21)

জাহান্নামীরা উহাদের ত্বককে জিজ্ঞাসা করবে, তোমরা আমাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতেছ কেন? তারা উত্তরে বলবে, আল্লাহ- যিনি আমাদেরকে বাকশক্তি দিয়েছেন, তিনি সমস্ত কিছুকে বাকশক্তি দিয়েছেন। তিনি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন প্রথমবার এবং তারই নিকট তোমরা প্রত্যাবর্তিত হবে। – সূরা হামিম সাজদা ২১

الْيَوْمَ نَخْتِمُ عَلَى أَفْوَاهِهِمْ وَتُكَلِّمُنَا أَيْدِيهِمْ وَتَشْهَدُ أَرْجُلُهُمْ بِمَا كَانُوا يَكْسِبُونَ (65)

আজ আমি তাদের মুখে মোহর করে দিবে, তাদের হাত কথা বলবে আমার সাথে আর তাদের পা সাক্ষ্য দিবে তাদের কৃতকর্মের।– সূরা ইয়াসীন ৬৫

আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা আমরা রাসুলুল্লাহ (সা) এর নিকট ছিলাম। এ সময় তিনি হেসে বললেন, তোমরা কি জান, আমি কেন হাসছি? আমরা বললাম, এ সম্পর্কে আল্লাহ ও তার রাসুলই ভাল জানেন। অতঃপর তিনি বললেনঃ  বান্দা তার প্রতিপালকের সাথে যে কথা বলবে, এ জন্য হাসছি।

তখন বান্দা বলবে, হে আমার প্রতিপালক! তুমি কি আশ্রয় দাওনি আমাকে যুলম হতে? রাসুলুল্লাহ (সা) বলেনঃ আল্লাহ তাআলা বলবেন, হাঁ আমি কারো প্রতি যূলূম করি না। অতঃপর বান্দা বলবে, আমি আমার ব্যাপারে নিজের সাক্ষ্য ব্যতীত অন্য কারো সাক্ষী হওয়াকে জায়িয মনে করি না । তখন আল্লাহ তা’আলা বলবেন, আজ তুমি নিজেই তোমার সাক্ষী হওয়ার জন্য যথেষ্ট এবং সম্মানিত লিপিকার বৃন্দও।

 অতঃপর বান্দার মূখের উপর মোহর লাগিয়ে দেয়া হবে এবং তার অঙ্গ প্রত্যঙ্গকে হুকুম করা হবে যে, তোমরা বল। তারা তার আমল সম্পর্কে বলবে। এরপর বান্দাকে কথা বলার অনুমতি দেয়া হবে। তখন বান্দা তার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে লক্ষ্য করে বলবে, অভিশাপ তোমাদের প্রতি, তোমরা দূর হয়ে যাও। আমি তো তোমাদের জন্যই ঝগড়া করছিলাম।- রিওয়ায়াত ২৬৬

নিয়ামত সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ

আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, সাহাবীগন প্রশ্ন করলেন, হে আল্লাহর রাসুল! কিয়ামতের দিন আমরা কি আমাদের প্রতিপালককে দেখতে পাব? উত্তরে তিনি বললেন, আকাশে মেঘ না থাকা অবস্হায় দ্বিপ্রহরের সময় সূর্য দেখতে তোমাদের কোন কষ্ট হয় কি? সাহাবীগণ বললেন, জী না। অতঃপর তিনি বললেন, আকাশে মেঘ না থাকা অবস্হায়–পূর্ণিমার চাদ দেখতে তোমাদের কোন কষ্ট হয় কি? সাহাবীগণ বললেন, জি না।

       এরপর তিনি বললেন, কসম ঐ সত্তার! যার হাতে আমার প্রাণ! চন্দ্র সূর্যের কোন একটি দেখতে তোমাদের যেরুপ কোন কষ্ট হয় না, তদ্রুপ তোমাদের প্রতিপালককেও দেখতে তোমাদের কোন কষ্ট হবে না। আল্লাহর সাথে বান্দার সাক্ষাত হবে ।

তখন তিনি বলবেন, হে অমুক! আমি কি তোমাকে ইযযত দান করিনি, নেতৃত্ব দান করিনি, জোড়া মিলিয়ে দেইনি, ঘোড়া, উট তোমার অনুগত করে দেইনি এবং প্রাচুর্যের মাঝে তোমার পানাহারের ব্যবস্হা করিনি? জবাবে বান্দা বলবে- হ্যা, হে আমার প্রতিপালক! অতঃপর তিনি বলবেন, তুমি কি মনে করতে যে, তুমি আমার সাথে সাক্ষাৎ করবে? সে বলবে, না। তখন আল্লাহ বলবেন, তুমি যেমনিভাবে আমাকে ভূলে গিয়েছিলে অনুরুপভাবে আমিও তোমাকে ভুলে যাব।

অতঃপর দ্বিতীয় অপর এক ব্যক্তির আল্লাহর সাথে সাক্ষাত হবে। তখন তিনি তাকেও বলবেন, হে অমুক! আমি কি তোমাকে সম্মান দান করিনি, নেতৃত্ব দেই নি, তোমার জোড়া মিলিয়ে দেইনি, উট-ঘোড়া তোমার অনুগত করে দেইনি এবং সূখ-সাচ্ছন্দ্যে পানাহারের জন্য তোমাকে কি সুযোগ করে দেই নি! সে বলবে, হাঁ করেছেন, হে আমার প্রতিপালক! তখন আল্লাহ তা’আলা বলবেন, আমার সাথে তোমার সাক্ষাৎ হবে এ কথা কি তুমি মনে করতে? সে বলবে, না। তখন আল্লাহ তাআলা বলবেন, তুমি যেমন আমাকে ভুলে গিয়েছিলে অনুরুপভাবে আমিও তোমাকে ভুলে যাব।

অতঃপর  অপর এক ব্যক্তির আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ হবে। অতঃপর পূর্বের অনুরুপ বলবেন। তখন লোকটি বলবে, হে আমার প্রতিপালক! আমি আপনার প্রতি এবং কিতাব ও রাসুলগণের প্রতি ঈমান আনয়ন করেছি। আমি সালাত আদায় করেছি, সাওম পালন করেছি এবং সাদাকা করেছি। এমনিভাবে সে যথাসম্ভব নিজের প্রশংসা করবে। এমতাবস্হায় আল্লাহ তাআলা বলবেন, এখনই তোমার মিথ্যা প্রকাশিত হয়ে যাবে।

রাসুলুল্লাহ (সা) বলেন, এরপর তাকে বলা হবে, এখনই আমি তোমার উপর আমার সাক্ষী কায়িম করব। তখন বান্দা মনে মনে চিন্তা করতে থাকবে যে, কে তার বিরুদ্ধে সাক্ষী দিবে? তখন তার মুখে মোহর মেরে দেয়া হবে । এবং তার উরু, গোশত ও হাড্ডিকে বলা হবে, তোমরা কথা বল । ফলে তার উরু, গোশত ও হাড় তার আমল সম্পর্কে বলতে থাকবে।

এ ব্যবস্হা এ জন্য করা হবে যেন, আত্মপক্ষ সমর্থন করার কোন অবকাশ তার আর বাকী না থাকে। এই ব্যক্তি হচ্ছে মুনাফিক। তার প্রতি আল্লাহ তাআলা অন্তুষ্ট হবেন।-রিওয়ায়াত ২৬৭

গুনাহগারদের বিরুদ্ধে যমীন সাক্ষ্য দিবে

আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন-

يَوْمَئِذٍ تُحَدِّثُ أَخْبَارَهَا

সেদিন পৃথিবী তার সব বৃত্তান্ত বর্ণনা করবে।-সূরা যিলযাল ৪

আমরা হযরত আবু হুরায়রা (রা) থেকে মারফু রিওয়ায়াত বর্ণনা করেছি যে, তাকে এই আয়াতের ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন,

أن تشهد على كل عبد وأمة بما عملوا على ظهرها فتقول عمل كذا وكذا في يوم كذا وكذا فذلك أخبارها ودلت الأخبار

প্রত্যেক নারী-পুরুষের ব্যাপারে এই যমীন ঐ সব কার্যকলাপের সাক্ষ্য দেবে, যা তারা তার পিঠের উপর করেছে। অতএব সে বলবে যে, অমুক- ঐ দিন ঐ দিন, এই এই কাজ করেছে। এটাই হচ্ছে তার সংবাদ দেয়ার বর্ণনা যা কুরআনে উল্লেখ করা হয়েছে।

হিসাব-কিতাবের ভিন্নতা

রাসূলুল্লাহ (সা) এর বহু সংখ্যক হাদীস এমন যা এই বিষয়ের প্রমাণ করে যে, ইমানদারদের অনেক সংখ্যক বিনা হিসাবে জান্নাতে যাবে। অনেক সংখ্যক মানুষের সহজ হিসাব নেয়া হবে আর অনেক সংখ্যক মানুষ কঠিন হিসাবের শিকার হবে।

৭০ হাজার লোক বিনা হিসাবে জান্নাতে যাবে

হযরত ইবনে আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেন-

يدخل الجنة من أمتي سبعون ألفا بغير حساب

 আমার উম্মাতের সত্তর হাজারেএর একটি দল বিনা হিসাবে জান্নাতে প্রবেশ করবে।

এ কথা বলে তিনি ঘরে চলে গেলেন আর এ বিষয়ে কিছু বললেন না। লোকেরা নিজেদের মতামত ব্যক্ত করতে লাগল। তারা বলাবলি করল যে, আমরা আল্লাহর উপর ইমান এনেছি, আল্লাহর রাসূলের অনুসরণ করেছি। ঐ সকল লোক হয় আমাদের মধ্য হতে হবে অথবা আমাদের সন্তানদের মধ্য হতে যারা ইসলামের উপর জন্ম নিয়েছে। আমরা তো অন্ধকার যুগে জন্ম নিয়েছি।

এ কথাগুলো রাসূলুল্লাহ (সা) এর নিকট পৌছলে তিনি বললেন-

هم الذين لا يكتوون ولا يسترقون ولا يتطيرون وعلى ربهم يتوكلون

ঐ সকল লোক হবে তারা যারা কখনো (চিকিৎসার জন্য) দাগ লাগায় নি, জাদু-মন্ত্র করেনি, কখনো ফাল বা কূলক্ষণ ধরেনি, বরং (সর্বাবস্থায়) আল্লাহর উপর ভরসা করেছে।

(এটা শুনে)  উককাশা ইবনে মিহসান বললো, হে আল্লাহর রাসূল! আমি কি তাদের মধ্যে গণ্য হব? রাসূলুল্লাহ (সা) বললেন, হ্যা তুমি তাদের অন্তর্ভুক্ত হবে। তখন আরেক ব্যক্তি দাড়িয়ে বলল, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমিও কি তাদের অন্তর্ভুক্ত হব? রাসূলুল্লাহ (সা) বললেন, এ ব্যাপারে উক্কাশা তোমার অগ্রবর্তী হয়ে গেছে।– রিওয়ায়াত ২৬৮

অপর বর্ণনায় আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সা) ঘরে গিয়ে তিনদিন পর্যন্ত আল্লাহর কাছে নিবেদন করতে থাকেন এই সংখ্যা আরো বাড়িয়ে দেয়ার জন্য। আল্লাহ তাআলা তার দুআ কবুল করেন এবং সত্তর হাজারের প্রত্যেক ব্যক্তির সাথে আরো সত্তর হাজার করে অন্তুর্ভুক্ত করে দেন।

যার হিসাব নেয়া হবে সে ধ্বংস হয়ে যাবে

হযরত আয়িশা (রা) থেকে বর্ণিত। রাসূলু্ল্লাহ (সা) ইরশাদ করেন-

من حوسب عذب

যার হিসাব নেয়া হবে তাকে আযাব দেয়া হবে।

তখন আয়িশা (রা) বললেন, তাহলে এই আয়াতের অর্থ কি?

فَأَمَّا مَنْ أُوتِيَ كِتَابَهُ بِيَمِينِهِ فَسَوْفَ يُحَاسَبُ حِسَابًا يَسِيرًا

আর যাকে তার আমলনামা তার সোজা হাতে দেওয়া হবে তার হিসাব-নিকাশ সহজেই নেয়া হবে।– সূরা ইনশিকাক ৭-১২

রাসূলুল্লাহ (সা) বললেন, সহজ হিসাব দ্বারা উদ্দেশ্য নামমাত্র হিসাব নেওয়া। কিন্তু যার সাথে কঠোরতা করা হবে সে ধ্বংস হয়ে যাবে।– রিওয়ায়াত ২৬৯

হযরত আয়িশা (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন-  রাসূলু্ল্লাহ (সা) কতক নামাযের পর এই দুআ করতেন-

اللهم حاسبني حسابا يسيرا

হে আল্লাহ! আমার হিসাব সহজ করে দিন।

যখন তিনি নামায শেষ করলেন, আমি জিজ্ঞাসা করলাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! সহজ হিসাব কি? রাসূলুল্লাহ (সা) বললেন, কোন ব্যক্তির আমলনামা দেখে (কিছু না বলে) ক্ষমা করে দেয়া । আর যাকে জিজ্ঞাসা করা হবে- কেন? সে ধ্বংস হয়ে যাবে। আর জেনে রাখ যে, প্রত্যেক ঐ কষ্ট যা কোন মুমিন বান্দার পৌছে, তা তারজন্য কাফফারা স্বরুপ করে দেয়া হয় এমনকি যে কাটা তার পায়ে বিদ্ধ হয়।– রিওয়ায়াত: ২৭০

দুনিয়াতে আল্লাহ যার গুনাহ গোপন রাখবেন

সাফওয়ান ইবন মুহরিয (র) থেকে বর্ণিত । তিনি বলেন, এক ব্যক্তি ইবন উমার (রা)-কে জিজ্ঞাসা করলেন, নাজওয়া (আল্লাহ ও বান্দার গোপন কথা) সম্পর্কে আপনি  রাসুলুল্লাহ (সা) থেকে কিরুপ শুনেছেন? তিনি বললেন, আমি রাসুলুল্লাহ (সা)-কে এ কথা বলতে শুনেছি, কিয়ামত দিবসে মুমিনদের তাদের রবের নিকটবর্তী করা হবে। এমনকি আল্লাহ তা’আলা তার উপর পর্দা ঢেলে দিবেন। অত:পর জিজ্ঞাসা করবেন, তুমি কি তোমার অমুক অমুক গুনাহর কথা জান? সে বলবে, আমি জানি আমার রব!

যখন তার গুনাহর স্বীকারোক্তি শেষ হয়ে যাবে তখন সে ভাববে, আজ আমি শেষ। তখন আল্লাহ তাআলা বলবেন, দুনিয়াতে আমি তোমার এই গুনাহগুলো গোপন রেখেছিলাম। আজ তোমার এ গুনাহ গুলোকে আমি ক্ষমা করে দিলাম। তারপর তার নেকীর আমলনামা তার নিকট দেওয়া হবে। এরপর কাফির ও মুনাফিক লোকদেরকে উপস্থিত সমস্ত মানুষের সামনে ডেকে ঘোষণা দেওয়া হবে-

هؤلاء الذين كذبوا على ربهم الا لعنة الله على الظالمين

এরাই তারা যারা আল্লাহ তাআলার উপর মিথ্যা আরোপ করেছে। জেনে রাখ যে যালিমদের প্রতি আল্লাহর লানত। – রিওয়য়াত:২৬৭

আল্লাহ তাআলা ক্ষমাশীল

শহর বিন আতিয়া আল্লাহ তাআলার নিম্নের বাণী প্রসঙ্গে বলেন-

إن ربنا لغفور شكور

নিশ্চয়ই আমাদের প্রতিপালক ক্ষমাশীল গুণগ্রাহী।– সূরা ফাতির ৩৪

আল্লাহ তাআলা তাদের কৃত গুনাহসমূহ মাফ করবেন। তাদের নেক ও কল্যাণকর কর্মসমূহ কবুল করবেন যা তাদেরকে করতে বলা হয়েছিল। আর আল্লাহ তাআলা তাদের কর্মের উত্তম বিনিময় দান করবেন।– রিওয়ায়াত ২৭২

প্রত্যেক মানুষ গুনাহগার

হযরত ইবনে উমর (রা) বলেন-

كل بن آدم خطاء إلا ما رحم الله

প্রত্যেক আদম সন্তান গুনাহগার। তবে যার প্রতি আল্লাহ রহম করবেন (শুধু সে-ই মুক্তি পাবে)।– রিওয়ায়াত ২৭৩

অনুচ্ছেদঃ আমল ওজন করা

যখন হিসাব-কিতাব শেষ হয়ে যাবে তখন আমল সমূহ ওজন করা হবে এক বিশেষ পদ্ধতীতে। এই মাপ ও ওজন প্রতিদান দেওয়ার জন্য জরুরী। এজন্য এটাই উচিত যে, হিসাব-কিতাবের পর আমল ওজন করা হবে, কেননা হিসাব তো আমল প্রমাণ করার জন্য আর ওজন তার পরিমাণ নির্ধারণ করার জন্য যাতে করে প্রতিদান এর অনুপাতে হয়।

আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন-

وَنَضَعُ الْمَوَازِينَ الْقِسْطَ لِيَوْمِ الْقِيَامَةِ فَلَا تُظْلَمُ نَفْسٌ شَيْئًا

আর কিয়ামতের দিন আমি স্থাপন করব ন্যায় বিচারের মানদণ্ড, অতএব কারো প্রতি কোন যুলুম করা হবে না- সূরা আম্বিয়াঃ ৪৭

وَالْوَزْنُ يَوْمَئِذٍ الْحَقُّ فَمَنْ ثَقُلَتْ مَوَازِينُهُ فَأُولَئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ (8) وَمَنْ خَفَّتْ مَوَازِينُهُ فَأُولَئِكَ الَّذِينَ خَسِرُوا أَنْفُسَهُمْ بِمَا كَانُوا بِآَيَاتِنَا يَظْلِمُونَ (9)

আর কিয়ামতের দিন (আমল) এর ওজন হক ও সত্য। সুতরাং যাদের পাল্লা ভারী হবে, তারা হবে সফলকাম। আর যাদের পাল্লা হালকা হবে তারা হবে সেসব লোক যারা নিজেদের ধ্বংস ও ক্ষতি নিজেরাই করেছে। কেননা তারা আমার নিদর্শনসমূহকে অস্বীকার করত।– সূরা আরাফঃ ৮-৯

হযরত উমর (রা) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সা)-কে ইমানের ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন-

الإيمان أن تؤمن بالله وملائكته وكتبه ورسله وتؤمن بالجنة والنار والميزان وتؤمن بالبعث بعد الموت وتؤمن بالقدر خيره وشره

ইমান হলো এই যে, তুমি বিশ্বাস স্থাপন করবে আল্লাহর প্রতি, তার ফেরেশতাদের প্রতি, তার কিতাব সমূহের প্রতি, তার রাসূলদের প্রতি। তুমি বিশ্বাস স্থপন করবে জান্নাত ও জাহান্নামের প্রতি, মীযান এর প্রতি, মৃত্যুর পর পূণরুত্থানের প্রতি এবং তুমি ইমান আনবে তাকদীরের ভাল-মন্দের প্রতি। প্রশ্নকারী জিজ্ঞাসা করলো, যদি আমি এগুলো করি তাহলে কি আমি মুমিন? রাসূলুল্লাহ (সা) বললেন, হ্যা। প্রশ্নকারী বলল, আপনি ঠিক বলেছেন।–রিওয়ায়াতঃ ২৭৮

রাসূলুল্লাহ (সা) এর চাচা আবু তালিবের শাস্তি

হযরত আব্বাস ইবনে আব্দুল মুত্তালিব (রা) থেকে বর্ণিত। একদিন তিনি রাসূলুল্লাহ (সা) কে জিজ্ঞাসা করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি কি আবু তালেবের কোন উপকার করতে পেরেছেন? তিনি তো আপনার হিফাযত করতেন, আপনার পক্ষ হয়ে (অন্যের প্রতি) ক্রোধান্বিত হতেন। রাসূলুল্লাহ (সা) বললেন,

نعم هو في ضحضاح من النار ولولا أنا لكان في الدرك الأسفل من النار

 হ্যা, তিনি কেবল পায়ের টাখনু হর্যন্ত জাহান্নামের আগুনে থাকবেন, আর যদি আমি না হতাম তাহলো জাহান্নামের অতল তলেই তাকে অবস্থান করতে হত।-রিওয়ায়াতঃ২৭৯

মুমিন ব্যক্তি ভাল কাজের প্রতিদান উভয় জগতে পায় আর কাফির শুধু দুনিয়াতে পায়

হযরত আনাস (রা) থেকে বর্ণিত। রাসূলু্ল্লাহ (সা) ইরশাদ করেন-

إن الله لا يظلم المؤمن حسنة يثاب عليها في الدنيا ويجزئ بها في الأخرة وأما الكافر فيعطى بحسناته في الدنيا حتى إذا افضى إلى الآخرة لم يكن له حسنة يعطى بها خيرا

নিঃসেন্দহে আল্লাহ তাআলা ইমানদারের উপর কোন যুলুম করেন না বরং তার নেকির প্রতিদান দুনিয়াতেও দেন এবং অখিরাতেও দিবেন। আর কাফিরকে তার ভাল কাজের প্রতিদান দুনিয়াতেই দিয়ে দেন, যখন সে আখিরাতের দিকে প্রত্যাবর্তন করে তখন তার কিছুই বাকী থাকে না, যার জন্য তাকে কিছু দেওয়া যেতে পারে।- রিওয়ায়াত ২৮০

নেককাজের কারণে কাফিরের আযাব কম হওয়া

হযরত ইবনে মাসউদ (রা) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেন-

ما أحسن من محسن كافر أو مسلم إلا أثابه الله عز وجل

ইমানদার অথবা কাফির যে-ই নেক কাজ করুক না কেন আল্লাহ তার প্রতিদান দেন।

আমরা জিজ্ঞাসা করলাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! কাফিরকে সওয়াব ও প্রতিদান দেওয়া কেমন? রাসূলুল্লাহ (সা) বললেন, যদি সে আত্মীয়তা সম্পর্ক রক্ষা করে, দান সাদকা করে অথবা কোন ভাল কাজ করে, তবে আল্লাহ তাআলা তাকে তার প্রতিদান দেন। যেমন তাকে ধন-সম্পদ, সন্তান-সন্ততী, সুস্থতা ও সুস্বাস্থ্য দান করেন অনুরুপ আরো কিছু। আমরা জিজ্ঞাসা করলাম, কাফিরকে আখিরাতে কিভাবে প্রতিদান দেয়া হবে? রাসূলুল্লাহ (সা) বললেন, বেশী শাস্তির তুলনায় কম শাস্তি দেয়া হবে। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সা) তিলাওয়াত করেন-

أَدْخِلُوا آَلَ فِرْعَوْنَ أَشَدَّ الْعَذَابِ

ফিরআউনকে কঠিনতর আযাবে নিপতিত কর।– সূরা মুমিন ৪৬

আল্লাহর নামের মুকাবিলায় কিছুই ভারী হতে পারে না

আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেনঃ কিয়ামতের দিন সমস্ত সৃষ্টির সামনে আমার এক উম্মাতকে ডাকা হবে, অতঃপর তার সামনে নিরানববইটি দফতর পেশ করা হবে। প্রতিটি দফতর দৃষ্টিসীমা পর্যন্ত দীর্ঘ হবে। মহান আল্লাহ বলবেন, তুমি কি এর কোন কিছু অস্বীকার করো? সে বলবে, না, হে আমার প্রভু! আল্লাহ বলবেন, তোমার উপর আমলনামা লেখক আমার ফেরেশতাগণ কি জুলুম করেছে? সে বলবে, না হে আমার রব! অতঃপর তিনি জিজ্ঞাসা করবেন, তোমার নিকট কি কোন নেকী আছে? সে বলবে, না হে আমার রব!  

তখন আল্লাহ বলবেন, হাঁ, আমার নিকট তোমার কিছু নেকী জমা আছে। আজ তোমার উপর জুলুম করা হবে না। অতঃপর তার সামনে একটি চিরকুট তুলে ধরা হবে, যাতে লিপিবদ্ধ থাকবেঃ

أشهد أن لا إله إلا الله وأشهد أن محمدا عبده ورسوله

‘‘আমি সাক্ষ্য দেই যে, আল্লাহ ব্যতীত কোন ইলাহ নেই এবং মুহাম্মাদ (সা) তাঁর বান্দাহ ও রাসূল।

তখন সে বলবে হে আমার রব! এতো বৃহৎ দফতরসমূহের তুলনায় এই ক্ষুদ্র চিরকুট আর কী উপকারে আসবে! তিনি বলবেন, তোমার প্রতি অন্যায় করা হবে না।

রাসূলুল্লাহ (সা) বললেন, অতঃপর সেই বৃহদাকার দফতরসমূহ এক পাল্লায় এবং সেই ক্ষুদ্র চিরকুটটি আরেক পাল্লায় রাখা হবে। এতে বৃহদাকার দফতরসমূহের পাল্লা হালকা হয়ে উপরে উঠে যাবে এবং ক্ষুদ্র চিরকুটের পাল্লা ভারী হয়ে যাবে। আল্লাহর নামের মুকাবিলায় কোন কিছুই ভারী হতে পারে না।– রিওয়ায়াত ২৮২

অনুচ্ছেদঃ আমল ওজন করা

যখন হিসাব-কিতাব শেষ হয়ে যাবে তখন আমল সমূহ ওজন করা হবে এক বিশেষ পদ্ধতিতে। এই মাপ ও ওজন প্রতিদান দেওয়ার জন্য জরুরী। এজন্য এটাই উচিত যে, হিসাব-কিতাবের পর আমল ওজন করা হবে, কেননা হিসাব তো আমল প্রমাণ করার জন্য আর ওজন তার পরিমাণ নির্ধারণ করার জন্য যাতে করে প্রতিদান এর অনুপাতে হয়।

আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন-

وَنَضَعُ الْمَوَازِينَ الْقِسْطَ لِيَوْمِ الْقِيَامَةِ فَلَا تُظْلَمُ نَفْسٌ شَيْئًا

আর কিয়ামতের দিন আমি স্থাপন করব ন্যায় বিচারের মানদণ্ড, অতএব কারো প্রতি কোন যুলুম করা হবে না- সূরা আম্বিয়াঃ ৪৭

وَالْوَزْنُ يَوْمَئِذٍ الْحَقُّ فَمَنْ ثَقُلَتْ مَوَازِينُهُ فَأُولَئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ (8) وَمَنْ خَفَّتْ مَوَازِينُهُ فَأُولَئِكَ الَّذِينَ خَسِرُوا أَنْفُسَهُمْ بِمَا كَانُوا بِآَيَاتِنَا يَظْلِمُونَ (9)

আর কিয়ামতের দিন (আমল) এর ওজন হক ও সত্য। সুতরাং যাদের পাল্লা ভারী হবে, তারা হবে সফলকাম। আর যাদের পাল্লা হালকা হবে তারা হবে সেসব লোক যারা নিজেদের ধ্বংস ও ক্ষতি নিজেরাই করেছে। কেননা তারা আমার নিদর্শনসমূহকে অস্বীকার করত।– সূরা আরাফঃ ৮-৯

হযরত উমর (রা) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সা)-কে ইমানের ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন-

الإيمان أن تؤمن بالله وملائكته وكتبه ورسله وتؤمن بالجنة والنار والميزان وتؤمن بالبعث بعد الموت وتؤمن بالقدر خيره وشره

ইমান হলো এই যে, তুমি বিশ্বাস স্থাপন করবে আল্লাহর প্রতি, তার ফেরেশতাদের প্রতি, তার কিতাবসমূহের প্রতি, তার রাসূলদের প্রতি। তুমি বিশ্বাস স্থপন করবে জান্নাত ও জাহান্নামের প্রতি, মীযান এর প্রতি, মৃত্যুর পর পূণরুত্থানের প্রতি এবং তুমি ইমান আনবে তাকদীরের ভাল-মন্দের প্রতি। প্রশ্নকারী জিজ্ঞাসা করলো, যদি আমি এগুলো করি তাহলে কি আমি মুমিন? রাসূলুল্লাহ (সা) বললেন, হ্যা। প্রশ্নকারী বলল, আপনি ঠিক বলেছেন।–রিওয়ায়াতঃ ২৭৮

রাসূলুল্লাহ (সা) এর চাচা আবু তালিবের শাস্তি

হযরত আব্বাস ইবনে আব্দুল মুত্তালিব (রা) থেকে বর্ণিত। একদিন তিনি রাসূলুল্লাহ (সা) কে জিজ্ঞাসা করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি কি আবু তালিবের কোন উপকার করতে পেরেছেন? তিনি তো আপনার হিফাযত করতেন, আপনার পক্ষ হয়ে (অন্যের প্রতি) ক্রোধান্বিত হতেন। রাসূলুল্লাহ (সা) বললেন,

نعم هو في ضحضاح من النار ولولا أنا لكان في الدرك الأسفل من النار

 হ্যা, তিনি কেবল পায়ের টাখনু পর্যন্ত জাহান্নামের আগুনে থাকবেন, আর যদি আমি না হতাম তাহলো জাহান্নামের অতল তলেই তাকে অবস্থান করতে হত।-রিওয়ায়াতঃ২৭৯

মুমিন ব্যক্তি ভাল কাজের প্রতিদান উভয় জগতে পায় আর কাফির শুধু দুনিয়াতেই পায়

হযরত আনাস (রা) থেকে বর্ণিত। রাসূলু্ল্লাহ (সা) ইরশাদ করেন-

إن الله لا يظلم المؤمن حسنة يثاب عليها في الدنيا ويجزئ بها في الأخرة وأما الكافر فيعطى بحسناته في الدنيا حتى إذا افضى إلى الآخرة لم يكن له حسنة يعطى بها خيرا

নিঃসেন্দহে আল্লাহ তাআলা ইমানদারের উপর কোন যুলুম করেন না বরং তার নেক ও ভাল কাজের প্রতিদান দুনিয়াতেও দেন এবং অখিরাতেও দিবেন। আর কাফিরকে তার ভাল কাজের প্রতিদান দুনিয়াতেই দিয়ে দেন, যখন সে আখিরাতের দিকে প্রত্যাবর্তন করে তখন তার কিছুই বাকি থাকে না, যার জন্য তাকে কিছু দেওয়া যেতে পারে।- রিওয়ায়াত ২৮০

নেককাজের কারণে কাফিরের আযাব কম হওয়া

হযরত ইবনে মাসউদ (রা) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেন-

ما أحسن من محسن كافر أو مسلم إلا أثابه الله عز وجل

ইমানদার অথবা কাফির যে-ই নেক কাজ করুক না কেন আল্লাহ তার প্রতিদান দেন।

আমরা জিজ্ঞাসা করলাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! কাফিরকে সওয়াব ও প্রতিদান দেওয়া কেমন? রাসূলুল্লাহ (সা) বললেন, যদি সে আত্মীয়তা সম্পর্ক রক্ষা করে, দান সাদকা করে অথবা কোন ভাল কাজ করে, তবে আল্লাহ তাআলা তাকে তার প্রতিদান দেন। যেমন তাকে ধন-সম্পদ, সন্তান-সন্ততী, সুস্থতা ও সুস্বাস্থ্য দান করেন অনুরুপ আরো কিছু। আমরা জিজ্ঞাসা করলাম, কাফিরকে আখিরাতে কিভাবে প্রতিদান দেয়া হবে? রাসূলুল্লাহ (সা) বললেন, বেশী শাস্তির তুলনায় কম শাস্তি দেয়া হবে। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সা) তিলাওয়াত করেন-

أَدْخِلُوا آَلَ فِرْعَوْنَ أَشَدَّ الْعَذَابِ

ফিরআউনকে কঠিনতর আযাবে নিপতিত কর।– সূরা মুমিন ৪৬

বেতাকার হাদীস- আল্লাহর নামের মুকাবিলায় কিছুই ভারী হতে পারে না

আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেনঃ কিয়ামতের দিন সমস্ত সৃষ্টির সামনে আমার এক উম্মতকে ডাকা হবে, অতঃপর তার সামনে নিরানববইটি দফতর পেশ করা হবে। প্রতিটি দফতর দৃষ্টিসীমা পর্যন্ত দীর্ঘ হবে। মহান আল্লাহ বলবেন, তুমি কি এর কোন কিছু অস্বীকার করো? সে বলবে- না, হে আমার প্রভু! আল্লাহ বলবেন, তোমার উপর আমলনামা লেখক আমার ফেরেশতাগণ কি জুলুম করেছে? সে বলবে- না, হে আমার রব! অতঃপর তিনি জিজ্ঞাসা করবেন, তোমার নিকট কি কোন নেকী আছে? সে বলবে- না, হে আমার রব!  

তখন আল্লাহ বলবেন, হ্যাঁ, আমার নিকট তোমার কিছু নেকী জমা আছে। আজ তোমার উপর জুলুম করা হবে না। অতঃপর তার সামনে একটি চিরকুট তুলে ধরা হবে, যাতে লিপিবদ্ধ থাকবেঃ

أشهد أن لا إله إلا الله وأشهد أن محمدا عبده ورسوله

‘‘আমি সাক্ষ্য দেই যে, আল্লাহ ব্যতীত কোন ইলাহ নেই এবং মুহাম্মাদ (সা) তাঁর বান্দাহ ও রাসূল।

তখন সে বলবে হে আমার রব! এতো বৃহৎ দফতরসমূহের তুলনায় এই ক্ষুদ্র চিরকুট আর কী উপকারে আসবে! তিনি বলবেন, তোমার প্রতি অন্যায় করা হবে না।

রাসূলুল্লাহ (সা) বললেন, অতঃপর সেই বৃহদাকার দফতরসমূহ এক পাল্লায় এবং সেই ক্ষুদ্র চিরকুটটি আরেক পাল্লায় রাখা হবে। এতে বৃহদাকার দফতরসমূহের পাল্লা হালকা হয়ে উপরে উঠে যাবে এবং ক্ষুদ্র চিরকুটের পাল্লা ভারী হয়ে যাবে। আল্লাহর নামের মুকাবিলায় কোন কিছুই ভারী হতে পারে না।– রিওয়ায়াত ২৮২

অনুচ্ছেদঃ কবিরা ও সগিরা গুনাহ এবং ফাহিশা বা গুনাহর ব্যাপারে সীমালঙ্ঘন

আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন-

قُلْ إِنَّمَا حَرَّمَ رَبِّيَ الْفَوَاحِشَ مَا ظَهَرَ مِنْهَا وَمَا بَطَنَ

আপনি বলে দিন আমার প্রতিপালক প্রকাশ্য ও গোপন অশ্লিলতা হারাম করেরছেন।– সূরা আরাফ ৩২

إِنْ تَجْتَنِبُوا كَبَائِرَ مَا تُنْهَوْنَ عَنْهُ نُكَفِّرْ عَنْكُمْ سَيِّئَاتِكُمْ

তোমরা যদি কবিরা গুনাহ থেকে বিরত থাক যা হতে তোমাদেরকে নিষেধ করা হয়েছে, তাহলে তিনি তোমাদের ছোট গুনাহগুলো ক্ষমা করে দিবেন।-নিসা৩১

সাতটি ধ্বংসকারী গুনাহ

হযরত আবু হুরায়রা (রা) বর্ণনা করেন। রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেন-

أجتنبوا السبع الموبقات قالوا يا رسول الله وما هن قال الشرك بالله والسحر وقتل النفس التي حرم الله إلا بالحق وأكل الربا وأكل مال اليتيم والتولي يوم الزحف وقذف المحصنات المؤمنات الغافلات

 সাতটি ধ্বংসকারী গুনাহ থেকে বেঁচে থাক। লোকেরা জিজ্ঞাসা করল, ইয়া রাসূলাল্লাহ! ঐ সাতটি ধ্বংসকারী গুনাহ কি কি? তিনি বললেন, আল্লাহর সাথে শরীক করা, যাদু করা, আল্লাহ যার হত্যা নিষিদ্ধ করেছেন তাকে ন্যায়ভাবে ছাড়া অন্যায়ভাবে হত্যা করা, সুদ খাওয়া, ইয়াতিমের সম্পদ ভোগ করা, জিহাদের ময়দান থেকে পালিয়ে যাওয়া, সতী-সাদ্ধী নারীর প্রতি ব্যভিচারের অপবাদ আরোপ করা ।- রিওয়ায়াতঃ২৮৪

ইমাম আহমদ (রহ) বলেন, কবিরা গুনাহকে সাতটি সংখ্যায় সীমাবদ্ধ করা হাদীসের উদ্দেশ্য নয়। বরং এর থেকে বেঁচে থাকাটা উদ্দেশ্য।

অপর বর্ণনায় সাতটির স্থলে নয়টি উল্লেখ আছে। অপর দুটি হলো- পিতা মাতার অবাধ্যতা এবং কাবা ঘরের সীমানায় হারাম কাজ করা।

মিথা কথা ও কাজ এবং মিথ্য সাক্ষ্য দেয়া

হযরত আনাস (রা) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সা)-কে কবীরা গুনাহর ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করা হলো, রাসূলুল্লাহ (সা) বললেন,

الشرك بالله وقتل النفس وعقوق الوالدين وقال ألا أنبئكم بأكبر الكبائر قوله الزور أو قال شهادة الزور بدل قول الزور

আল্লাহর সাথে শরীক করা, কাউকে হত্যা করা, পিতামাতার অবাধ্যতা করা। আর আমি কি তোমাদেরকে সবচেয়ে বড় কবিরা গুনার ব্যাপারে বলব না? তা হলো মিথ্যা কখা অথবা বলছেন মিথ্যা সাক্ষ্য দেয়া ।

পিতা-মাতাকে গালি দেয়া

সাবিত (রা) এর বর্ণনায় হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা) নবী (সা) থেকে বর্ণনা করেন। রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেন- কবীরা গুনাহ হলো কোন ব্যক্তির তার পিতা মাতাকে গালি দেয়া। লোকেরা বলল, হে আল্লাহর রাসূল! কোন ব্যক্তি কি তার নিজ পিতা মাতাকে গালি দিতে পারে? তিনি বললেন,

نعم يسب أبا الرجل فيسب أباه ويسب أمه فيسب أمه

হ্যাঁ দিতে পারে। তা এভাবে যে, কোন ব্যক্তি অপরের বাবাকে তুলে গালি দেয় আর সে প্রতিউত্তরে তারা বাবাকে তুলে গালি দেয়। অথবা কেউ কারো মাকে তুলে গালি দেয় প্রতিউত্তরে তার মাকে তুলে গালি দেয়।

প্রতিবেশীর স্ত্রীর সাথে ব্যভিচার করা

হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন,

قلت يا رسول الله أي الذنب أعظم عند الله عز وجل قال أن تجعل لله ندا وهو خلقك قلت ثم ماذا قال أن تقتل ولدك خشية أن يطعم قلت ثم ماذا قال أن تزاني حليلة جارك

আমি রাসূলুল্লাহ (সা)-কে জিজ্ঞাসা করলাম, সবচেয়ে বড় কবীরা গুনাহ কি? তিনি বললেন, আল্লাহর সাথে শরীক করা এমনকি তিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন। অতঃপর আমি জিজ্ঞাসা করলাম তারপর কোন গুনাহ বড়? তিনি বললেন, সন্তান হত্যা করা এই কারণে যে, সে তোমারটা খাবে। আমি জিজ্ঞাসা করলাম তারপর কোনটি? তিনি বললেন, প্রতিবেশীর স্ত্রীর সাথে ব্যভীচার করা।

গুনাহ থেকে বিরত থাকার বায়আত বা অঙ্গীকার গ্রহণ

হযরত উবাদা ইবনুস সামিত (রা) থেকে বর্ণিত। যখন রাসূলুল্লাহ (সা) এর আশপাশে সাহাবাগণ বসা ছিলেন। তিনি বললেন,

بايعوني على أن لا تشركوا بالله شيئا ولا تسرقوا ولا تزنوا ولا تقتلوا أولادكم ولا تأتوا ببهتان ولا تعصوا في معروف

তোমরা আমার হাতে হাত রেখে এই মর্মে অঙ্গীকার কর যে, আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক করবে না। চুরি করবে না। ব্যভিচার করবে না। নিজ সন্তানকে হত্যা করবে না। কাউকে অপবাদ দিবে না এবং ভাল কাজে অবাধ্যতা করবে না।

নামায পরিত্যাগ করা

হযরত জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ (রা) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেন-

ليس بين العبد وبين الشرك إلا ترك الصلاة

বান্দার মাঝে ও শিরকের মাঝে পার্থক্য হলো নামায পরিত্যাগ করা।

ফাহিশা বা গুনাহর ব্যাপারে সীমালঙ্ঘনের কিছু দৃষ্টান্ত

  • অন্যায়ভাবে কাউকে হত্যা করা কবীরা গুনাহ। তবে নিহত ব্যক্তি যদি পিতা বা পুত্র বা নিকটাত্মীয় ইত্যাদি হয় তবে তা সীমালঙ্ঘন।
  • ব্যভিচার করা কবীরা গুনাহ। তবে তা যদি প্রতিবেশী স্ত্রীর সাথে হয় অথবা সম্মানিতা বা মাহরাম কারো সাথে হয় বা মক্কা-মদীনায় হয় অথবা রমজান মাসে হয় তবে তা অরো কঠিন গুনাহ ও সীমালঙ্ঘন।

আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,

وَمَنْ يُرِدْ فِيهِ بِإِلْحَادٍ بِظُلْمٍ نُذِقْهُ مِنْ عَذَابٍ أَلِيمٍ

  • যে ব্যক্তি এখানে (হারাম সীমায়, মক্কায়) কোন পাপ কাজের ইচ্ছা করে সীমালঙ্ঘন করে, তাকে আমি আস্বাদন করাবো যন্ত্রনাদায়ক শাস্তি।– সূরা হাজঃ২৫
  • কোন সতী নারীর প্রতি ব্যভিচারের অপবাদ আরেপ করা কবীরা গুনাহ। তবে তা যদি নিজের মা, বোন বা স্ত্রী হয় তবে তা সীমালঙ্ঘন।
  • পিতা-মাতার অবাধ্যতা কবীরা গুনাহ। তবে এর সাথে যদি গালি-গালাজ বা মারধর করা হয় তবে তা আরো কঠিন গুনাহ।
  • চুরি করা কবীরা গুনাহ আর চুরির সাথে যদি ডাকাতি করে তবে তা সীমালঙ্ঘন। এজন্যই চোরের জন্য হাত কাটা আর ডাকাতের জন্য বিপরীত দিক থেকে হাত পা কেটে দেয়া হয়।
  • এমনিভাবে ডাকাতীর সাথে হত্যা করাও সীমালঙ্গন।
  • বেকার এবং অপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র চুরি করা সগীরা গুনাহ। যার জিনিস চুরি করা হয় সে যদি গরীব হয় আর তার প্রয়োজন থাকে তবে তা কবীরা গুনাহ।
  • মানুষের সম্পদ অন্যায়ভাবে নেয় কবীরা গুনাহ। আর যদি সেই সম্পদ মালিকের প্রয়োজন ও অপরাগতা হয়, বা সম্পদ পিতা বা মাতার হয় অথবা জোড়-জবরদস্তী করে নেয় তবে তা সীমালঙ্ঘন।
  • মদ পান করা কবীরা গুনাহ। তবে যদি বেশী পান করে আর নেশা হয়ে যায় তবে তা ফাহিশা বা সীমালঙ্ঘন।
  • নামায ছেড়ে দেয়া কবীরা গুনাহ। তবে যদি তা অভ্যাসে পরিণত হয়ে যায় অথবা তা খুশু-খুযু বা একাগ্রতার সাথে আদায় না করে এবং নামাযে নাড়াচড়া বা অহেতুক কর্মকাণ্ড করে তবে তা ফাহিশা বা সীমালঙ্ঘন।
  • জামাআত তরক করা সগীরা গুনাহ। তবে যদি তা অভ্যাসে পরিণত করে যার ফলে সে জামাআত থেকে দূরে সরে পড়ে আর মনে মনে এর থেকে দূরে থাকার বা পৃথক থাকার ইচ্ছা করে তবে তা কবীরা গুনাহ। আর যদি মহল্লা বা শহরের সব লোক এ ব্যাপারে একমত হয়ে যায় তবে তা ফাহিশা বা সীমালঙ্ঘন।

ছোট গুনাগ থেকেও অত্মরক্ষা করা

হযরত ইবনে মাসউদ (রা) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেন-

إياكم ومحقرات الأعمال إنهن ليجتمعن على الرجل حتى يهلكنه وأن رسول الله  صلى الله عليه وسلم  ضرب لهن مثلا كمثل قوم نزلوا بأرض فلاة فحضر صنيع القوم فجعل الرجل يجيء بالعود والرجل يجيء بالعويد حتى جمعوا من ذلك سوادا ثم أججوا نارا فأنضجت ما قذف فيها

তোমরা নিজেদের আমল নষ্ট করা থেকে আত্মরক্ষা কর। কেননা তা (ছোট বড় গুনাহ) একত্রিত হয়ে ব্যক্তিকে ধ্বংস করে দেয়। রাসূলুল্লাহ (সা) এর একটি উপমা এভাবে দিয়েছেন। একদল লোক মাঠে অবতরণ করল এরপর একটি বিরাট কাজ তাদের সামনে এল। তারা নিজ নিজ পথে চলে গেল। এবং তাদের প্রত্যেকে একটি করে লাকড়ী নিয়ে উপস্থিত হলো। এমনকি তারা লাকড়ীর একটা বিরাট স্তুপ গেড়ে তুললো। তারপর আগুন জালালো আর (ছোট বড়) জমাকৃত লাকড়ি তার মধ্যে ফেলে দিল আর আগুন সব জালিয়ে ফেলল।– রিওয়ায়াতঃ২৮৫

ছোট-বড় গুনাহর ব্যাপারে এই দৃষ্টিভঙ্গী

হযরত বিলাল ইবনে সাদ বলেন,

لا تنظر إلى صغر الخطيئة ولكن انظر من عصيت

তোমরা গুনাহ ছোট ও হাল্কা হওয়ার দিকে দেখো না বরং তোমরা দেখ তোমরা নাফরমানী করছ কত বড় সত্তার।– রিওয়ায়াতঃ২৮৬

আল্লাহ তাআলা ছোট গুনাহর জন্যও পাকরাও করতে পারেন

হযরত সুফিয়ান সাওরী (রহ) আল্লাহ তাআলারবাণী

فيغفر لمن يشاء ويعذب من يشاء

তিনি যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করবেন আর যাকে ইচ্ছা শাস্তি দিবেন।– সূরা বাকারাঃ২৮৪

এই প্রসঙ্গে বলেন-

يغفر لمن يشاء العظيم ويعذب من يشاء على الصغير

আল্লাহ তাআলা যাকে চাইবেন তাকে বড় গুনাহর জন্যও মাফ করে দিবেন। আবার যাকে চাইবেন তাকে ছোট গুনাহর জন্যও শান্তি দিবেন।–রিওয়ায়াতঃ২৮৯

হযরত ইবনে আব্বাস (রা) আাল্লাহ তাআলার বাণী

إِنْ تَجْتَنِبُوا كَبَائِرَ مَا تُنْهَوْنَ عَنْهُ

তোমরা যদি কবিরা গুনাহ থেকে বিরত থাক যা হতে তোমাদেরকে নিষেধ করা হয়েছে।–সূরা নিসাঃ৩১

এ প্রসঙ্গে বলেন,

الكبائر كل ذنب ختمه الله بنار أو غضب أو عذاب أو لعنة

কবীরা গুনাহ হলো সেগুলো, যেগুলোর জন্য আল্লাহ তাআলা জাহান্নামের শাস্তির কথা অথবা আযাব ও গযবের কথা বলেছেন।–রিওয়ায়াতঃ২৯০

শিরক সবচেয়ে বড় কবীরা গুনাহ

ইবনে আব্বাস (রা) বলেন, সকল কবীরা গুনাহর মধ্যে আল্লাহর সাথে শিরক করা সবচেয়ে বড় কবীরা গুনাহ। কেননা আল্লাহ তাআলা বলেন, –

إِنَّهُ مَنْ يُشْرِكْ بِاللَّهِ فَقَدْ حَرَّمَ اللَّهُ عَلَيْهِ الْجَنَّةَ

নিশ্চয়ই যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে শিরক করবে আল্লাহ তার জন্য জান্নাত হারাম করে দিবেন।– সূরা মায়িদাহ ৭২

আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হওয়া কবীরা গুনাহ

 কেননা আল্লাহ তাআলা বলেছেন-

لَا يَيْئَسُ مِنْ رَوْحِ اللَّهِ إِلَّا الْقَوْمُ الْكَافِرُونَ

কাফিরগণ ব্যতীত আল্লাহর রহমত থেকে কেউ নিরাশ হয় না।-ইউসুফ ৮৭

আল্লাহর পাকরাও থেকে নিশ্চিন্ত হওয়া কবীরা গুনাহ

কেননা আল্লাহ তাআলা বলেছেন-

فَلَا يَأْمَنُ مَكْرَ اللَّهِ إِلَّا الْقَوْمُ الْخَاسِرُونَ

ক্ষতিগ্রস্ত সম্প্রদায় ছাড়া আর কেউ আল্লাহর পাকরাও থেকে নিশ্চিন্ত হয় না।- সূরা আরাফ ৯৯

ফরয যাকাত আদায় না করা কবীরা গুনাহ

কেননা আল্লাহ তাআলা বলেছেন-

فَتُكْوَى بِهَا جِبَاهُهُمْ

তার দ্বারা (জমাকৃত উত্তপ্ত সম্পদ দ্বারা) তাদের কপালে দাগ দেয়া হবে। সূরা তওবঃ৩৫

ইচ্ছাকৃতভাবে নামায ছেড়ে দেয়া

মদ পান করা কবীরা গুনাহ। নামায ছেড়ে দেয়া কবীরা গুনাহ।

ومن ترك الصلاة متعمدا فقد برئ من ذمة الله ورسوله

যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে নামায পরিত্যাগ করবে সে আল্লাহ ও তার রাসূলের দায়িত্ব থেকে মুক্ত।

অঙ্গীকার ভঙ্গ করা এবং আত্মীয়তা সম্পর্ক ছিন্ন করা কবীরা গুনাহ

 কেননা আল্লাহ তাআলা বলেন-

لَهُمُ اللَّعْنَةُ وَلَهُمْ سُوءُ الدَّارِ

তাদের জন্য অভিসম্পাত আর তাদের তাদের জন্য রয়েছে নিকৃষ্ট বাসস্থান।- সূরা রাদঃ ২৫

আল্লাহর নিষেধকৃত বা হারামকৃত সব কাজ কবীরা গুনাহ

ইবনে আব্বাস (রা) বলেন,

كل ما نهى الله عنه كبيرة

প্রত্যেক ঐ কাজ যা আল্লাহ তাআলা নিষেধ করেছেন, তা কবীরা গুনাহ।- রিওয়ায়াতঃ২৯২

কবীরা গুনাহ ৭০ টির কাছাকাছি

হযরত ইবনে আব্বাস (রা)-কে জিজ্ঞাসা করা হলো কবীরা গুনাহ কি সাতটি? তিনি বললেন,

هي إلى السبعين أقرب

না, বরং ৭০ টির কাছাকাছি।– রিওয়ায়াতঃ২৯৪

[ইমাম আযযাহাবী (রহ) রচিত ৭০ টি কবীরা গুনাহর বিস্তারিত বিবরণ সম্বলিত প্রসিদ্ধ গ্রন্থ হলো কিতাবুল কাবায়ের। গ্রন্থটি অতি উৎকৃষ্ট এবং উপকারী। ইসলামিক ফাউন্ডেশন থেওেক অনূদিত হয়েছে।) কাবায়ের গ্রন্থটি এ বিষয়ের জন্য খুব প্রসিদ্ধ।]

فصل في أصحاب الكبائر من أهل القبلة إذا وافوا القيامة بلا توبة

কিবলার অনুসারী মুসলমান যারা বড় বড় গুনাহ করে বিনা তওবায় আসবে তাদের প্রসঙ্গে

কিবলার অনুসারী কবীরা গুনাহকারীগণ কিয়ামতের দিন যারা বিনা তওবায় আসবে তাদের হিসাব-কিতাব আল্লাহর হাওয়ালা। আল্লাহ চাইলে তাদেকরকে সূচনাতেই মাফ করে দিবেন অথবা চাইলে তাদের পক্ষে তাদের নবীদের সুপারিশ কবুল করবেন অথবা চাইলে তাদেরকে জাহান্নামে প্রবেশ করানোর নির্দেশ দিবেন। অতঃপর তারা একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত জাহান্নামের আযাবে নিপতিত থাকবে। অতঃপর তাদেরকে জাহান্নাম থেকে জান্নাতে নিয়ে যাওয়ার হুকুম দেওয়া হবে কারো শাফাআত বা সুপারিশের মাধ্যমে অথবা শাফাআত ব্যতীত। আর শুধুমাত্র কাফিরগণই জাহান্নামে চিরস্থায়ী হবে।

বায়আতের হাদীস

উবাদা ইবন সামিত (রা) বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেছেন- আমরা কোন এক বৈঠকে রাসুলুল্লাহ (সা) এর সঙ্গে বসা ছিলাম। তখন তিনি বললেন যে, তোমরা আমার কাছে এ বলে বায়আত গ্রহণ কর যে, তোমরা আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক করবে না, চুরি করবেনা। অর্থাৎ (কুরআনে উল্লিখিত) বায়আত সম্পর্কিত আয়াতের বিষয়বস্তু উল্লেখ করলেন। অতএব, তোমাদের মধ্য থেকে যে কেউ তা পূর্ণ করবে, সে তার প্রতিদান আল্লাহর কাছে পাবে। আর যদি কেউ উল্লিখিত অপরাধের কোন একটিতে পতিত হয়ে শাস্তি ভোগ করে, তবে তাই তার জন্য কাফফারা (বদলা) হয়ে যাবে। আর যদি কোন ব্যক্তি উল্লিখিত অপরাধের কোন একটিতে পতিত হয় অতঃপর আল্লাহ তা’আলা তা গোপন রাখেন, তবে বিষয়টি মহান আল্লাহর ইচ্ছাধীন। আল্লাহ ইচ্ছা করলে তাকে ক্ষমা করে দিতে পারেন এবং ইচ্ছা করলে তাকে শাস্তিও দিতে পারেন।– রিওয়ায়াত ২৯৫

উক্ত হাদীসে এই আয়াতের দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে-

يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ إِذَا جَاءَكَ الْمُؤْمِنَاتُ يُبَايِعْنَكَ عَلَى أَنْ لَا يُشْرِكْنَ بِاللَّهِ شَيْئًا وَلَا يَسْرِقْنَ وَلَا يَزْنِينَ وَلَا يَقْتُلْنَ أَوْلَادَهُنَّ وَلَا يَأْتِينَ بِبُهْتَانٍ يَفْتَرِينَهُ بَيْنَ أَيْدِيهِنَّ وَأَرْجُلِهِنَّ وَلَا يَعْصِينَكَ فِي مَعْرُوفٍ فَبَايِعْهُنَّ وَاسْتَغْفِرْ لَهُنَّ اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَحِيمٌ

হে নবী! মুমিন নারীরা যখন আপনার নিকট এসে বায়আত করে এই মর্মে যে, তারা আল্লাহর সাথে কোন শরীক স্থাপন করবে না, চুরি করবে না, ব্যভিচার করবে না, নিজেদের সন্তানদেরকে হত্যা করবে না, তারা সজ্ঞানে কোন অপবাদ রচনা করে রটাবে না এবং সৎকর্মে তোমাকে অমান্য করবে না, তখন তাদের বায়আত গ্রহণ কর এবং তাদের জন্য আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা কর। আল্লাহ তো ক্ষমাশীল পরম দয়ালু।– সূরা মুমতাহিনা ১২

মাকামে মাহমুদ

হযরত আবু হুরায়রা (রা) বর্ণনা করেন। রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেন-

المقام المحمود الشفاعة

মাকামে মাহমুদ হলো শাফাআত।-রিওয়ায়াত ২৯৯

অপর বর্ণনায় আছে, মুহাম্মদ ইবনে উবায়দ রাসূলুল্লাহ (সা)-কে এই عسى أن يبعثك ربك مقاما محمودا আয়াতের ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করলেন। তিনি বললেন, তা হলো মাকাম যার দ্বারা নবী (সা) তার উম্মতের জন্য শাফাআত করবেন।

আবু হুরায়রা (রা) রাসূলুল্লাহ (সা) থেকে বর্ণনা করেন যে,

عَسَى أَنْ يَبْعَثَكَ رَبُّكَ مَقَامًا مَحْمُودًا

আশা করা যায় যে, আপনার প্রতিপালক আপনাকে অধিষ্টিত করবেন মাকামে মাহমুদ বা প্রশংসিত স্থানে।– সূরা ইসরা ৭৯

এর অর্থ হলো শাফাআত।– রিওয়ায়াত ৩০০

আল্লাহ তাআলার বাণী

وَلَسَوْفَ يُعْطِيكَ رَبُّكَ فَتَرْضَى

অচীরেই আপনার প্রতিপালক আপনাকে এত দান করবেন যে, আপনি সন্তুষ্ট হয়ে যাবেন।–সূরা দুহা:৫

এই আয়াতেও শাফাআতের দিকে ইঙ্গিত আছে।

উম্মতের জন্য রাসূলুল্লাহ (সা) এর চিন্তা এবং আল্লাহর সান্তনা

আমরা বর্ণনা করেছি আবদুল্লাহ আবনে আমর ইবনুল আস (রা) থেকে। নবী (সা) এই আয়াত পাঠ করলেন [যাতে ইবরাহিম (আ) এর কথা উল্লেখ আছে]-

رَبِّ إِنَّهُنَّ أَضْلَلْنَ كَثِيرًا مِنَ النَّاسِ فَمَنْ تَبِعَنِي فَإِنَّهُ مِنِّي وَمَنْ عَصَانِي فَإِنَّكَ غَفُورٌ رَحِيمٌ

হে আমার প্রতিপালক, এসব প্রতিমা বহু মানুষকে বিভ্রান্ত ও বিপথগামী করেছে, সুতরাং যে আমার অনুসরণ করবে সে আমার দলভুক্ত, তবে কেউ আমার অবাধ্য হলে তুমি তো ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।-সূরা ইবরাহীমঃ৩৬

এবং ঈসা (আ) (তার উম্মাত সম্বন্ধে) বলেছেন-

إِنْ تُعَذِّبْهُمْ فَإِنَّهُمْ عِبَادُكَ وَإِنْ تَغْفِرْ لَهُمْ فَإِنَّكَ أَنْتَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ

যদি তুমি তাদেরকে শান্তি দাও তবে তারা তো তোমারই বান্দা আর যদি তাদেরকে ক্ষমা করো তাহলে তুমি পরাক্রমশালী প্রজ্ঞাময়।-সূরা মায়িদাঃ১১৮

এ আয়াত দুটি পাঠ করে নবী (সা) নিজের দুই হাত তুলে বললেন-

اللهم أمتي أمتي

হে আল্লাহ, আমার উম্মত! আমার উম্মত।

এ বলে তিনি কেঁদে দিলেন। অতঃপর মহান আল্লাহ বললেন, হে জিবরাইল, মুহাম্মাদ (সা) এর কাছে যাও এবং বলো যে, আমরাতো অচিরেই আপনার উম্মতের ব্যাপারে আপনাকে সন্তুষ্ট করবো এবং আপনাকে কোন কষ্ট দিব না।– রিওয়ায়াত ৩০৩-৩০৪

নবীদের বিশেষ দুআ

হযরত আনাস (রা) বলেছেন, নবী (সা) বলেন,

إن لكل نبي دعوة قد دعا بها في أمته وإني اختبأت دعوتي شفاعة لأمتي

প্রত্যেক নবীর একটি বিশেষ দুআর ইখতিয়ার আছে, তা তারা তাদের নিজ নিজ উম্মাতের কল্যাণে করেছেন। আর আমি আমার দুআটি কিয়ামতের দিন আমার উম্মতের শাফাআতের উদ্দেশ্যে মুলতবী রেখেছি।– রিওয়ায়াত ৩০৬

সর্বপ্রথম শাফাআতকারী

আনাস ইবনে মালিক (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন,

أنا أكثر الأنبياء يوم القيامة تبعا يجيء النبي وليس معه مصدق غير رجل واحد وأنا أول شافع وأول مشفع

কিয়ামাতের দিন সমস্ত নবীদের অনুসারীর তুলনায় আমার অনুসারীর সংখ্যা হবে অধিক। কোন নবী এমনও আসবেন যার সত্যায়নকারী একজন ব্যতীত আর কেউ থাকবে না। আর আমিই হবো সর্বপ্রথম শাফাআতকারী যার শাফাআত কবুল করা হবে।– রিওয়ায়াত ৩০৭

কবীরা গুনাহকারীদের জন্যই শাফাআত

হযরত আনাস (রা) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেন-

شفاعتي لأهل الكبائر من أمتي

আমার শাফাআত আমার উম্মতের কবীরা গুনাহগারদের জন্য হবে।- রিওয়ায়াত ৩১০

যে শিরক করা থেকে বেঁচে থাকবে

আবু হুরাইরা (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ  (সা) বলেছেন,

لكل نبي دعوة مستجابة فتعجل كل نبي دعوته وإني اختبأت دعوتي شفاعة لأمتي يوم القيامة فهي نائلة إن شاء الله تعالى من مات من أمتي لا يشرك بالله شيئا

প্রত্যেক নবীর বিশেষ একটি দুআর অধিকার আছে যা কবুল করা হবে। প্রত্যেক নবীই তার সে দুআ পূর্বেই (দুনিয়াতে) করে ফেলেছেন। আর আমি আমার সে দুআ কিয়ামতের দিন আমার উম্মতের শাফাআতের জন্য (দুনিয়াতে) মুলতবী রেখেছি। আমার উম্মাতের যে কেউ শিরক না করে মৃত্যূবরণ করবে, ইনশাআল্লাহ সে তা লাভ করবে।– রিওয়ায়াত ৩১১

যার অন্তরে বিন্দু পরিমান ইমান থাকবে

আবূ সাঈদ খুদরী (রা) থেকে বর্ণিত । নবী (সা) বলেছেন,

إذا دخل أهل الجنة الجنة وأهل النار النار يقول الله عز وجل من كان في قلبه مثقال حبة خردل من خير فأخرجوه فيخرجون قد امتحشوا وعادوا حمما قال فيلقون في نهر يقال له نهر الحياة قال فينبتون فيه كما الحية في حميل

জান্নাতীগণ যখন জান্নাতে আর জাহান্নামীরা জাহান্নামে প্রবেশ করবে তখন আল্লাহ তাআলা বলবেন, যার অন্তকরণে সরিষার দানা পরিমাণ ঈমান রয়েছে তাকে বের কর। কয়লার মত হয়ে তারা জাহান্নাম থেকে ফিরে আসবে । এরপর নহরে হায়াত (সঞ্জীবনী প্রস্রবণ) এর মাঝে তাদেরকে অবগাহিত করা হবে, এতে তারা এমন সজীব হয়ে উঠবে যেমন নদী তীরে জমাট আবর্জনায় সজীব উদ্ভিত গজিয়ে ওঠে। নবী (সা) আরও বললেনঃ তোমরা কি দেখ নাই বীজকাটা উদ্ভিদ কি সুন্দর হলুদ বর্ণের হয়ে থাকে ।- রিওয়ায়াত ৩১

জাহান্নামীদেরকে আগুন যেভাবে গ্রাস করবে

হযরত সামুরা (রা) থেকে বর্ণিত । তিনি নবী (সা) -কে এ কথা বলতে শুনেছেন যে,

إن منهم من تأخذه النار إلى كعبيه ومنهم من تأخذه إلى حجزته ومنهم من تأخذه إلى ترقوته

জাহান্নামীদের কাউকে তো অগ্নি তার উভয় টাখনূ পর্যন্ত গ্রাস করে নিবে; আবার কাউকে তার কোমর পর্যন্ত গ্রাস করে নিবে এবং কাউকে তার গর্দান পর্যন্ত গ্রাস করে নিবে ।

সর্বশেষ জান্নাতীর জন্য যা বরাদ্দ হবে

আবদুল্লাহ্ (রা) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেছেন,

إني لأعلم آخر أهل الجنة دخولا وآخر أهل النار خروجا من النار رجل يخرج حبوا فيقول له ربه ادخل الجنة فيقول أرى الجنة ملأى فيقول له ذلك ثلاث مرات كل ذلك يعيد الجنة ملأى فيقول إن لك مثل الدنيا عشر مرات

নিঃসন্দেহে আমি চিনি সর্বশেষে জান্নাতে প্রবেশকারী এবং জাহান্নাম থেকে সর্বশেষ পরিত্রাণ লাভকারী ব্যক্তিটিকে। সে জাহান্নাম থেকে হামাগুড়ি দিয়ে বের হয়ে আসবে। তার প্রতিপালক তাকে বলবেন, তুমি জান্নাতে প্রবেশ কর। সে বলবে, হে আমার প্রতিপালক! জান্নাত তো পরিপূর্ণ। আল্লাহ এভাবে তাকে তিনবার বলবেন। প্রত্যেকবারই সে উত্তর দেবে, জান্নাত তো পরিপূর্ণ। পরিশেষে আল্লাহ্ তাকে বলবেন, তোমার জন্য রয়েছে এ পৃথিবীর ন্যায় দশ গুণ।– রিওয়ায়াত ৩১৯

জাহান্নামে হাজার বছর ধরে যে আল্লাহকে ডাকবে

হযরত আনাস (রা) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেন- এক ব্যক্তি জাহান্নামের আগুনের মধ্যে হাজার বৎসর ধরে (আল্লাহর নাম নিয়ে) ডাকতে থাকবে, ইয়া হান্নান ইয়া মান্নান- হে দয়াময় হে অনুগ্রহকারী। আল্লাহ তাআলা জিবরাইল (আ) কে বলবেন, হে জিবরাইল! যাও আমার বান্দাকে আমার সামনে পেশ কর। জিবরাইল (আ) সেখানে গিয়ে দেখবেন যে, জাহান্নামীরা অত্যন্ত আক্ষেপের সাথে কাঁদছে। জিবরাইল (আ) আল্লাহর নিকট গিয়ে এই সংবাদ প্রদান করবেন। আল্লাহ তাআলা বলবেন, যাও আমার (ঐ) বান্দাকে নিয়ে আস। তার অমুক অমুক মর্যাদাও রয়েছে। জিবরাইল (আ) গিয়ে তাকে নিয়ে আসবেন।

আল্লাহ তাআলা জিজ্ঞাসা করবেন, হে আমার বান্দা! তুমি তোমার বাসস্থান ও বিশ্রামস্থল কেমন পেয়েছ? সে বলবে, হে আমার রব! অত্যন্ত নিকৃষ্ট স্থান ও বিশ্রামস্থল। আল্লাহ তাআলা বলবেন, তাকে ফিরিয়ে নিয়ে যাও যেখান থেকে তাকে আনা হয়েছে। তখন সে বলবে, ইয়া রব! আপনার ব্যাপারে আমি এমন ধারণা করি নাই। আমি ধারণা করেছি যে, আপনি আমাকে যে জাহান্নাম থেকে বের করেছেন তার মধ্যে আর ফিরিয়ে দিবেন না। তখন আল্লাহ তাআলা ফেরেশতাদেরকে বলবেন, ছেড়ে দাও আমার বান্দাকে।- রিওয়ায়াত ৩২০

জাহান্নামে জ্বলে যাওয়া একিটি দলকে মুক্তি

হযরত জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ (রা) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেন-

يخرج قوم من النار بعد ما امتحشوا فيدخلون الجنة

একটি দলকে আগুন থেকে বের করা হবে যার হাহান্নামের আগুনে সম্পূর্ণ জ্বলে গিয়েছিল। অতঃপর তাদেরকে জান্নাতে প্রবেশ করানো হবে।– রিওয়ায়াত ৩২৪

فصل فيما يجاوز الله عن عباده ولا يؤاخذهم به فضلا منه ورحمة

অনুচ্ছেদঃ ঐ সব বিষয় যেগুলোর জন্য আল্লাহ তাআলা বান্দাকে পাকরাও করবেন না, বরং নিজের ফযল ও করমে ক্ষমা করে দিবেন

হযরত ইবনে আব্বাস (রা) বর্ণনা করেন। যখন এই আয়াত নাযিল হয়

وَإِنْ تُبْدُوا مَا فِي أَنْفُسِكُمْ أَوْ تُخْفُوهُ

তোমাদের অন্তরে যা রয়েছে তা প্রকাশ কর বা গোপন রাখ (আল্লাহ তার হিসাব) নিবেন।– সূরা আল বাকারাঃ ২৮৪

তখন সাহাবীদের নিকট এটা খুব ভারী মনে হলো। তারা তাদের চিন্তার বিষয়টি রাসূলুল্লাহ (সা) এর নিকট পেশ করলেন। তখন আল্লাহ তাআলা তার মেহেরবানী দ্বারা সহজ করে দিলেন এবং সহজ বিধান দান করলেন। ইরশাদ করলেন-

لَا يُكَلِّفُ اللهُ نَفْسًا إِلَّا وُسْعَهَا لَهَا مَا كَسَبَتْ وَعَلَيْهَا مَا اكْتَسَبَتْ

আল্লাহ কারো উপর তার সাধ্যাতীত ভার অর্পন করেন না। সে ভাল যা উপার্জন করবে তার প্রতিদাস তারই আর মন্দ যা উপার্জন করবে তার প্রতিফল তারই।-(সূরা আল বাকারা ২৮৬) রিওয়ায়াতঃ ৩২৮

হযরত মারওয়ার াাল আসফার নবী (সা) এর সাহাবীদের কোন একজন থেকে বর্ননা করেন। আর তিনি ধারণা করেন যে তিনি ইবনে উমর (রা)। তিনি বলেছেন এই وَإِنْ تُبْدُوا مَا فِي أَنْفُسِكُمْ أَوْ تُخْفُوهُ আয়াতটি পরবর্তী আয়াত দ্বারা মানসূখ হয়ে গেছে।

আবু হুরায়রা (রা) বর্ণনা করেন। রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেন-

تُجُوِّزَ لِأُمَّتِي عَمَّا وَسْوَسَتْ بِهِ أَنْفُسَهَا أَوْ حَدَّثَتْ بِهِ أَنْفُسَهَا مَا لَمْ تَكَلَّمْ بِهِ أَوْ تَعْمَلْ بِهِ

নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা আমার উম্মতের মনের ওয়াসওয়াসা ও মন্দ কথা ক্ষমা করে দিয়েছেন, যে পর্যন্ত না সে তা কথায় প্রকাশ করে কাজে পরিণত করে।-রিওয়ায়াতঃ ৩৩১

আবু হুরায়রা (রা) বর্ণনা করেন। রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেন-

إِنَّ اللهَ تَجَاوَزَ لِأُمَّتِي عَمَّا حَدَّثَتْ بِهِ أَنْفُسَهَا مَا لَمْ يَتَكَلَّمُوا بِهِ أَوْ يَعْمَلُوا

নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা আমার উম্মতকে ক্ষামা করে দিয়েছে তার মনের (মন্দ) কথা অথবা খেয়াল এর জন্য, যে পর্যন্ত না সে তা কথায় প্রকাশ করে কাজে পরিণত করে। রিওয়ায়াতঃ ৩৩২

হযরত ইবনে আব্বাস (রা) বর্ণনা করেন। রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেন।

إِنَّ اللهَ كَتَبَ الْحَسَنَاتِ وَالسَّيِّئَاتِ، ثُمَّ بَيَّنَ ذَلِكَ فَمَنْ هَمَّ بِالْحَسَنَةِ فَلَمْ يَعْمَلْهَا كَتَبهاَ اللهُ لَهُ حَسَنَةً، وَمَنْ عَمِلَهَا كَتَبَ اللهُ لَهُ بِهَا عَشْرًا إِلَى سَبْعِ مِائَةِ ضِعْفٍ وَأَضْعَافٍ كَثِيرَةٍ، وَمَنْ هَمَّ بِسَيِّئَةٍ وَلَمْ يَعْمَلْهَا كَتَبَ اللهُ لَهُ بِهَا حَسَنَةً كَامِلَةً، وَمَنْ هَمَّ بِهَا فَعَمِلَهَا كَتَبَ اللهُ عَلَيْهِ سَيِّئَةً وَاحِدَةً

 নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা নেক কাজ ও মন্দ কাজ লিপিবদ্ধ করেন। অতঃপর বলে দিয়েছেন যে, যে ব্যক্তি কোন নেক কাজ করার ইচ্ছা করে কিন্তু করতে পারে না তার জন্য একটি নেকী লিখে দেওয়া হয়। আর যে তা কাজে পরিণত করে তার জন্য দশটি নেকী লিখে দেয়া হয়। এমনকি তা সাতশতগুণ বা সাতশতগুণের চেয়েও বেশী বৃদ্ধি করে দেয়া হয়। আর যে ব্যক্তি কোন মন্দ কাজ করার ইচ্ছা করে কিন্তু করতে পারে না তার জন্য এক নেকী লিখে দেয়া হয়। আর যে তা কাজে পরিণত করে তার জন্য একটি গুনাহই লিখে দেয়া হয়।-রিওয়ায়াতঃ ৩৩৩

হযরত ইবনে আব্বাস (রা) বর্ণনা করেন। রাসূলুল্লাহ (সা) তার প্রতিপালকের পক্ষ থেকে বর্ননা করেন যে,

إِنَّ رَبَّكُمْ رَحِيمٌ فَمَنْ هَمَّ بِحَسَنَةٍ فَلَمْ يَعْمَلْهَا كُتِبَتْ لَهُ حَسَنَةً، وَإِنْ عَمِلَهَا كُتِبَتْ لَهُ عَشْرَ أَمْثَالِهَا إِلَى سَبْعِمِائَةٍ إِلَى أَضْعَافٍ كَثِيرَةٍ، وَمَنْ هَمَّ بِسَيِّئَةٍ فَلَمْ يَعْمَلْهَا كُتِبَتْ لَهُ حَسَنَةً، وَإِنْ عَمِلَهَا كُتِبَتْ عَلَيْهِ وَاحِدَةً أَوْ يَمْحُوهَا اللهُ وَلَا يَهْلِكُ عَلَى اللهِ إِلَّا هَالِكٌ

নিশ্চয়ই তোমাদের প্রতিপালক দয়ালু ও ক্ষমাশীল। যে ব্যক্তি কোন নেক কাজ করার ইচ্ছা করে কিন্তু করতে পারে না তার জন্য একটি নেকী লিখে দেওয়া হয়। আর যে তা কাজে পরিণত করে তার জন্য দশ থেকে সাতশত গুণ বা অগণিত নেকী লিখে দেয়া হয়। এমনকি তা সাতশতগুণ বা সাতশতগুণের চেয়েও বেশী বৃদ্ধি করে দেয়া হয়। আর যে ব্যক্তি কোন মন্দ কাজ করার ইচ্ছা করে কিন্তু করতে পারে না তার জন্য এক নেকী লিখে দেয়া হয়। আর যে তা কাজে পরিণত করে তার জন্য একটি গুনাহই লিখে দেয়া হয় অথবা তাও মিটিয়ে দেয়া হয়। অতএব কেউ আল্লাহর পক্ষ থেকে ধ্বংস হয় না নিজে ধ্বংস হওয়া ছাড়া।-রিওয়ায়াতঃ ৩৩৪

 

আবু হুরায়রা (রা) বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেন, এক ব্যক্তি নবী করীম (সা)-এর নিকট এসে বলল, ইয়া রাসূলাল্লাহ! কখনও কখনও আমার অন্তরে এমন কিছু কথা উদয় হয়, যা প্রকাশ করার চেয়ে আসমান থেকে নিচে পড়ে যাওয়াও আমার নিকট সহজ মনে হয়। রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বললেনঃ

ذَلِكَ صَرِيحُ الْإِيمَانِ

এটিই স্পষ্ট ঈমান।– রিওয়ায়াত ৩৩৭

অপর বর্ণনায় আছে- আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেন, কিছু লোক নবী করীম (সা)-এর  নিকট এসে বললেন, আমাদের অন্তরে এমন কিছু কথা উদয় হয়, যা আমরা মুখে উচ্চালর করা পছন্দ করি না। রাসুলুল্লাহ (সা) উত্তরে বললেনঃ সত্যই তোমাদের তা হয় ? তারা জবাব দিলেন, জ্বী, হ্যা । রাসুলুল্লাহ (সা) বললেনঃ

ذَلِكَ صَرِيحُ الْإِيمَانِ

এটিই স্পষ্ট ঈমান।– রিওয়ায়াত ৩৩৭

ইবন আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত । তিনি বলেন, একবার একব্যক্তি নবী (সা)-এর কাছে এসে বললো, , ইয়া রাসূলাল্লাহ (সা) ! আমার অন্তর আমার প্রতিপালকরে ব্যাপারে এমন কথা বলে, যা বর্ণনা করার চাইতে জ্বলে-পুড়ে কয়লা হয়ে যাওয়া উত্তম মনে হয় । তখন তিনি বলেনঃ

الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي لَمْ يُقَدِّرْ منكُمْ إِلَّا عَلَى الْوَسْوَسَةِ

 সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর যিনি (শয়তানকে) ক্ষমতা দেননি তোমার উপর শুধুমাত্র ওয়াসওয়াসা ব্যতীত।– রিওয়ায়াতঃ ৩৪০

 

ইবন আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত । তিনি বলেন, একবার একব্যক্তি নবী (সা)-এর কাছে এসে জিজ্ঞাসা করে, ইয়া রাসূলাল্লাহ (সা) ! আমার অন্তরে এমন ধরণের কথা আসে (ওয়াসওয়াসা-কুমন্ত্রণা আসে) যা বর্ণনা করার চাইতে জ্বলে-পুড়ে কয়লা হয়ে যাওয়া উত্তম মনে হয় । তখন তিনি বলেনঃ

الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي رَدَّ أَمْرَهُ إِلَى الْوَسْوَسَةِ

সমস্ত প্রশংসা সে আল্লাহর যিনি শয়তানের ধোঁকাকে সন্দেহে পরিণত করেছেন।– রিওয়ায়াতঃ ৩৪১

ইয়াহইয়া বিন উমারাহ বিন আবু হাসান মাযানী বর্ণনা করেন। তার নিকট সংবাদ পৌঁছেছে যে, আসহাবে রাসূলের কয়েবজন যুবক রাসূলুল্লাহ (সা) এর নিকট ওয়াসওয়াসার ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করল যে, শয়তান তাদের অন্তরে কুমন্ত্রণা প্রদান করে। তারা বলল যে, েইয়া রাসূলাল্লাহ! াামাদের অন্তরে এমন এমন কথা আসে যে, যা প্রকাশ করার চাইতে পতিত হয়ে যাওয়াও আমাদের নিকট সহজ মনে হগয়। রাসূলুল্লাহ (সা) বললেন,

أَوَجَدْتُمْ ذَلِكَ؟ ذَلكَ صَرِيحُ الْإِيمَانِ إِنَّ الشَّيْطَانَ يُرِيدُ أَنْ يُوقِعَ الْعَبْدَ فِيمَا دُونَ ذَلِكَ، فَإِذَا عُصِمْتُمْ مِنْهُ وَقَعَ فِيمَا هُنَاكَ

 আসলেই তোমাদের এমন হয়? এটাই তো স্পষ্ট ইমান। নিশ্চযই ময়তান চায় যে, সে বান্দাকে এমন এমন মন্দ কাজে জড়িত করে দিবে। কিন্তু যখন বান্দা এমন মন্দ কাজ থেকে নিরাপদ থাকে তখন সে তাদেরকে মন্দ খেয়াল ও কুমন্ত্রণায় লিপ্ত করে দেয়।– রিওয়ায়াতঃ ৩৪৩

ইমাম বায়হাকী (রহ) বলেন- মানুষের মন মন্দ খেয়াল বা কুমন্ত্রনায় নিপতিত হয়ে যায় যা মানুষের ইচ্ছাধীন নয় আর প্রতিরোধ করতেও সক্ষম নয়। এ কুমন্ত্রণাকে অপছন্দ করা এবং ভয় করা মূলত আল্লাহর মহব্বত আর প্রকৃতপক্ষে আল্লাহর পক্ষ থেকেই হিফাযত হয়ে থাকে।

যুলুমের বদলা

আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত। রাসুলুল্লাহ (সা) বলেছেন-

قَالَ أَتَدْرُونَ مَنِ الْمُفْلِسُ؟ ” قَالُوا: الْمُفْلِسُ مَنْ لَا دِرْهَمَ لَهُ وَلَا مَتَاعَ، فَقَالَ: ” إِنَّ الْمُفْلِسَ مِنْ أُمَّتِي يَأْتِي يَوْمَ الْقِيَامَةِ بِصَلَاةٍ وَصِيَامٍ وَزَكَاةٍ، وَيَأْتِي قَدْ شَتَمَ هَذَا وَقَذَفَ هَذَا، وَأَكَلَ مَالَ هَذَا، وَسَفَكَ دَمَ هَذَا، وَضَرَبَ هَذَا فَيُعْطَى هَذَا مِنْ حَسَنَاتِهِ، وَهَذَا مِنْ حَسَنَاتِهِ، فَإِنْ فَنِيَتْ حَسَنَاتُهُ قَبْلَ أَنْ يُقْضَى مَا عَلَيْهِ أُخِذَ مِنْ خَطَايَاهُمْ فَطُرِحَتْ عَلَيْهِ، ثُمَّ طُرِحَ فِي النَّارِ

তোমরা কি বলতে পার, গরীব কে? তারা বললেন, আমাদের মধ্যে যার দিরহাম (টাকা কড়ি) ও ধন-সম্পদ নেই সেই তো গরীব । তখন তিনি বললেন, আমার উম্মাতের মধ্যে সেই প্রকৃত গরীব, যে ব্যক্তি কিয়ামতের দিন সালাত, সাওম ও যাকাত নিয়ে আসবে; অথচ সে এই অবস্হায় আসবে যে, কাউকে গালি দিয়েছে- কাউকে অপবাদ দিয়েছে, (অন্যায়ভাবে) কারো সম্পদ ভোগ করেছে, কাউকে হত্যা করেছে ও কাউকে মেরেছে। এরপর একে তার নেক আমল থেকে দেওয়া হবে, একে নেক আমল থেকে দেওয়া হবে । এরপর পাওনাদারের হক তার নেক আমল থেকে পূরণ করা না গেলে ঋণের বিনিময়ে তাদের পাপের একাংশ তার প্রতি নিক্ষেপ করা হবে । এরপর সে জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবে।-রিওয়ায়াত ৩৪৪

 

হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রা) নিম্নের আয়ত প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ (সা) থেকে বর্ণনা করেন-

وَنَزَعْنَا مَا فِي صُدُورِهِمْ مِنْ غِلٍّ إِخْوَانًا عَلَى سُرَرٍ مُتَقَابِلِينَ

আমি তাদের অন্তর হতে বিদ্বেস দূর করেব। তারা ভাই ভাই হয়ে পরস্পর মুখোমুকি হয়ে আসন গ্রহন করবে।– সূরা আল হিজর ৪৭

 রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেন-

يَخْلُصُ الْمُؤْمِنُونَ عَلَى الصِّرَاطِ فَيُحْبَسُونَ عَلَى قَنْطَرَةٍ بَيْنَ الْجَنَّةِ وَالنَّارِ، فَيُقْتَصُّ  لِبَعْضِهِمْ مِنْ بَعْضٍ مَظَالِمَ كَانَتْ بَيْنَهُمْ فِي الدُّنْيَا، حَتَّى إِذَا هُذِّبُوا وَنُقُّوا أُذِنَ لَهُمْ فِي دُخُولِ الْجَنَّةِ، فَوَاللهِ إِنَّ أَحَدَهُمْ لَأَهْدَى لِمَنْزِلِهِ فِي الْجَنَّةِ مِنْ مَنْزِلِهِ فِي الدُّنْيَا

মুমিন ব্যক্তি জান্নাতের পথে যাওয়ার সময় জান্নাত ও জাহান্নামের মধ্যবর্তী পথ- পুলসিরাতের উপর বাধাপ্রাপ্ত হবে। অতঃপর দুনিয়ায় যারা এক অন্যের প্রতি যুলুম ও বাড়াবাড়ি করেছিল তাদের প্রতিশেোধ গ্রহন করা হবে। যখন তারা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন হয়ে যাবে তখন তাদেরকে বেহেশতে প্রবেশ করা অনুমতি প্রদান করা হবে। আল।লাহর শপথ! প্রত্রেকে জান্নাতে নিজের ঠিকানা এমনভাবে চিনবে যেভাবে নিজের দুনিয়ার ঘরকে চিনত।– রিওয়ায়াত ৩৪৫

হযরত ইবনে আব্বাস (রা) বর্ণনা করেন। রাসূলুল্লাহ (সা) আরাফার সন্ধ্যায় তার উম্মাতের জন্য মাগফিরাত ও রহমতের দুআ করেন এবং বেশী করে করেন।  আল্লাহ তাআলা ওহীর মাধ্যমে তাকে জানান যে, আপনার সব দুআ কবুল করা হয়েছে শুধুমাত্র পারস্পরিক যুলম ও বাড়াবাড়ি ব্যতীত। এছাড়া তাদের গুনাহ- তা হলো আমার ও বান্দার মধ্যস্থিত বিষয়, আমি তা ক্ষমা করে দিলাম। রাসূলুল্লাহ (সা) আবার দুআ করলেন, হে আল্লাহ! আপনি এ ব্যাপারে সক্ষম যে, নির্যাতিতকে সওয়াব ও বিমনময় দান করবেন আর অথ্যাচারীকে ক্ষমা করে দিবেন। আল্লাহ তাআলা তার এই দুআ ঐ সন্ধ্যায় কবুল করেন নি। অতঃপর যখন মুযদালিফায় ভোর হয় তখন তিনি আবার দুআ করেন। তখন আল্লাহ তাআলা তার দুআ কবুল করেন এবং বলেন, যাও আমি তাদেরকেও ক্ষমা করে দিলাম। রাসূলুল্লাহ (সা) মুচকি হসলেন। তার কতক সাহাবী তাকে জিজ্ঞাসা করলেন যে, আপনি ঐ সময় হাসি দিলেন আমরা যার কোন কারণ দেখতে পাই না। রাসূলুল্লাহ (সা) বললেন, আমি আল্লাহর দুশমন ইবলিসের অবস্থা দেখে হেসেছি। যখন আল্লাহ আমার দুআ কবুল করলেন, তখন ইবলিস গড়াগড়ি খেয়ে ধ্বংস কামনা করছিল আর নিজের মাথায় মাটি ছিটাচ্ছিল। – রিওয়ায়াতঃ ৩৪৬

হযম বিন আবু হাযম দুআ করেন-

اللهُمَّ مَنْ ظَلَمْنَاهُ بِمَظْلَمَةٍ فَأَثِبْهُ مِنْ مَظْلَمَتِنَا خَيْرًا وَاغْفِرْهَا لَنَا، وَمَنْ ظَلَمَنَا بِمَظْلَمَةٍ فَأَثِبْنَا مِنْ مَظْلَمَتِهِ وَاغْفِرْهَا لَهُ

হে আল্লাহ আমি যার উপর যুলম ও বাড়াবাড়ি করেছি, তাকে আমার যুলুম ও বাড়াবাড়ির বদলে সওয়াব ও প্রতিদান দান করুন। আর আমার ঐ যুলমকে ক্ষমা করুন। আর যে আমার প্রতি যুলুম করেছে তার তার যুলুম ও বাড়াবাড়ির বদলে আমাকে সওয়াব ও প্রতিদান দান করুন আর তার যুলুম ক্ষমা করুন।-রিওয়ায়াতঃ ৩৪৮

হযরত রাবেয়া বসরী (রহ) এই দুআ করতেন-

اللهُمَّ، وَهَبْتُ لَكَ مَنْ ظَلَمَنِي فَاسْتَوْهِبْنِي مِمَّنْ ظَلَمْتُ

হে আল্লাহ! যে আমার উপর বাড়াবাড়ি করেছে তাকে আমি ক্ষমা করেছি। অতএব আমি যার উপর বাড়াবাড়ি করেছি তার থেকে আমাকে ক্ষমা করিয়ে দাও।- রিওয়ায়াতঃ৩৪৯

চলবে

فَصْلٌ فِي كَيْفِيَّةِ انْتِهَاءِ الْحَيَاةِ الْأُولَى، وَابْتِدَاءِ الْحَيَاةِ الْأُخْرَى، وَصِفَةِ يَوْمِ الْقِيَامَةِ

অনুচ্ছেদঃ দুনিয়ার শেষ জীবন এবং আখিরাতের শুরু জীবনের অবস্থা এবং কিয়ামতের নিদর্শন

ইমাম বায়হাকী (রহ) বলেন, কিয়ামতের আলামত হলো-

১.দাজ্জাল বের হওয়া।

২.ইসা (আ) এর অবতরণ।

৩.দাজ্জালের নিহত হওয়া।

৪.ইয়াজুজ মাজুজের বের হওয়া।

৫. দাব্বাতুলর আরদ বের হওয়া।

৬. সূর্য পশ্চিম দিকে উদিত হওয়া।

এগুলো হলো কিয়ামতের বড় বড় আলামত। আর যেসব আলামত এর পূর্বে প্রকাশিত হবে সেগুলো হলো-

১. ইলম উঠে যাওয়া।

২. মূর্খতার প্রসার হওয়া।

৩. জ্ঞানীদের মধ্যে অহঙ্কার ও উচ্চ হওয়ার ভাব প্রকাশ পাওয়া।

৪. ইলম ও হিকমত বিক্রয় হওয়া।

৫. গান বাজনার প্রসার হওয়া।

৬. মদ্যপান ও নেশাকর দ্রব্য সাধারণ হওয়া।

৭. নারীরা নারীদের দ্বারা দৈহিক তৃপ্তি লাভ করা

৮. পুরুষরা পুরষদের দ্বারা দৈহিক তৃপ্তি লাভ করা। 

৯. বড় বড় দালান নির্মাণ করা।

১০. বালকদের (অপরিপক্ক লোকদের) রাজত্ব করা।

১১. এই উম্মেতের পরবর্তী লোকেরা পূর্ববর্তীদের লানত করা।

১২. হত্যা ব্যাপক হয়ে যাওয়া ইত্যাদি।

এসবকিছু্ হাদীস শরীফে এসেছে এবং এসবকিছু প্রকাশিত হয়ে যাওয়ার পর এসব ব্যাপারে হুশিয়ারীমূলক হাদীসগুলো উল্লেখ করা অপ্রয়োজনীয়। আর কিয়ামতের যেসব বড় নিদর্শন রয়েছে এগুলো আমি ’কিতাবুল বা’স ওয়ান নুশুরে’ আলোচনা করেছি। এখানে পূণরায় উল্লেখ করা অপ্রয়োজনীয় মনে করছি।  তাওফীক একমাত্র আল্লাহর পক্ষ থেকেই ।

শিঙ্গা কি?

হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (সা)-কে শিঙ্গার ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করা হলো। নবী (সা) বললেন,

قَرْنٌ يُنْفَخُ فِيهِ

ওটা একটি শিং যার মধ্যে ফুঁক দেয়া হবে।– রিওয়ায়াত ৩৫০

দাজ্জাল বের হওয়া এবং তার ৪০ দিন অবস্থান করা

হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেন- আমার উম্মতের মধ্যে দাজ্জাল বের হবে আর সে ৪০ পর্যন্ত থাকবে। আমি জানি  না যে, তা দিন, মাস অথবা বছর। অতঃপর ইসা ইবনে মারইয়াম (আ) বের হবেন। তিনি উরওয়া ইবনে মাসউদ সাকাফীর মত দেখতে হবেন। তিনি এসে দাজ্জালকে অনুসন্ধান করবেন এবং তাকে হত্যা করবেন। অতঃপর সাত বছর পর্যন্ত মানুষ এভাবে থাকবে যে, দুজন ব্যক্তির মধ্যে কারো সাথে কারো ঝগড়া হবে না। অতঃপর আল্লাহ তাআলা শাম এর দিক থেকে ঠান্ডা বায়ূ প্রেরণ করবেন যার দ্বারা প্রত্যেক ঐ ব্যক্তি মৃত্যুবরণ করবে যার মধ্যে সামান্যতম পরিমাণ ইমান আছে। এমনকি কোন ব্যক্তি যদি কোন পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থান করে তবে তাও সেখানে পৌঁছে যাবে। আমর ইবনুল আস (রা) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সা) থেকে এ কথা শুনেছি, আর নিকৃষ্ট লোকেরা জীবিত থেকে যাবে।- রিওয়ায়াতঃ৩৫১

হাসবুনাল্লাহু ওয়া নি’মাল ওয়াকীল

হযরত আবু সাইদ খুদরী (রা) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেন। কেমন লাগছে এই সব নিআমত যেখানে শিঙ্গা ফুঁকদানকারী মুখে শিঙ্গা নিয়ে নির্দেশের জন্য কান লাগিয়ে ঘাড় ঝুকিয়ে অপেক্ষা করছে যে, কখন হুকুম হবে এবং শিঙ্গায় ফুঁক দেয়া হবে। লোকেরা বলল, ইয়া রাসূলাল্লাহ! তাহলে আমরা কি করব? তিনি (সা) বললেন, তোমরা বলবে-

حَسْبُنَا اللهُ وَنِعْمَ الْوَكِيلُ عَلَى اللهِ تَوَكَّلْنَا

আল্লাহই আমাদের জন্য যথেষ্ট, তিনিই উত্তম অভিভাবক। আমরা তারই উপর নির্ভর করি।– রিওয়ায়াতঃ ৩৫২

ইমাম বায়হাকী (রহ) বলেন, যখন শিঙ্গায় ফুৎকার দেয়া হবে তখন আসমান যমীনের সবাই বেহুশ হয়ে যাবে। আল্লাহ তাআলার বাণী-

وَنُفِخَ فِي الصُّورِ فَصَعِقَ مَنْ فِي السَّمَوَاتِ، وَمَنْ فِي الْأَرْضِ إِلَّا مَنْ شَاءَ اللهُ

আর (যখন) শিঙ্গায ফুৎকার দেয়া হবে তখন আসমানসমূহ ও যমীনের সবাই বেহুশ হযে যাবে তবে আল্লাহ যাকে চাইবেন তারা ব্যতীত।– সূরা আয যুমার ৬৮

শিঙ্গায় ফুৎকারের সময় কার হুশ থাকবে?

এ বিষয়টি নিয়ে মতভেদ আছে যে, শিঙ্গায় ফুৎকারের সময় কারা জীবিত থাকবেন। হযরত জাবির (রা) থেকে বর্ণিত আছে যে, এদের মধ্যে একজন মূসা (আ)-ও হবেন। তিনি একবার তূর পাহাড়ে আল্লাহর তাজাল্লী দেখে বেহুশ হয়ে গিয়েছিলেন। হযরত আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত হাদীসে আছে- এক মুসলমান এক ইহুদীকে চড় মেরেছিলেন। যখন সে বলেছিল সেই সত্তার কসম, যে মূসা (আ)-কে মানব জাতির উপর মর্যাদা দান করেছেন। তখন নবী (সা) বলেছিলেন- আল্লাহর নবীগণের মধ্যে কাউকে কারো উপর মর্যাদা দান করো না। কেননা কিয়ামতের দিন যখন শিংগায় ফুঁক দেয়া হবে, তখন আল্লাহ্ যাকে চাইবেন সে ছাড়া আসমান ও যমীনের বাকী সবাই বেহুশ হয়ে যাবে। অতঃপর দ্বিতীয়বার তাতে ফুঁক দেয়া হবে। তখন সর্বপ্রথম আমাকেই উঠানো হবে। তখনই আমি দেখতে পাব মূসা (আ) আরশ ধরে রয়েছেন। আমি জানি না, তূর পর্বতের ঘটনার দিন তিনি যে বেহুশ হয়েছিলেন, এটা কি তারই বিনিময়, না আমার আগেই তাঁকে বেহুশি থেকে উঠানো হয়েছে?

শহীদগণ

আর আমরা সাঈদ ইবনে জুবায়র থেকে বর্ণনা করেছি যে, তিনি বলেন,

هُمُ الشُّهَدَاءُ ثَنِيَّةُ اللهِ عَزَّ وَجَلَّ مُقَلَّدِي السُّيُوفِ حَوْلَ الْعَرْشِ

যাদেরকে আল্লাহ তাআলা বেহুশী থেকে নিরাপদ রাখবেন তারা হলো শহীদগণ। তারা আরশের পাশে তাদের তলোয়ারের ছায়ায় দাড়িয়ে থাকবেন।

এ বিষযে মারফু হাদীস বর্ণিত আছে। হযরত আবু হুরায়রা (রা) বর্ণনা করেন। রাসুলুল্লাহ (সা) হযরত জিবরাইল (আ)-কে এই আয়াত এর ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করেন যে, এর দ্বারা কারা উদ্দেশ্য? জিবরাইল (আ) বলেন-

هُمْ شُهَدَاءُ اللهِ عَزَّ وَجَلَّ

তারা হলো আল্লাহর শহীদগণ।

আল্লাহ তাআলা তার কিতাবে বলেছেন-

أَحْيَاءٌ عِنْدَ رَبِّهِمْ يُرْزَقُونَ

তারা জীবিত তাদেরকে তাদের রবের নিকট থেকে রিযিক দেয়া হয়।– সূরা আল ইমরান ১৬৯

বিশিষ্ট ফেরশেতাগণ

আর আমরা যায়দ বিন আসলাম থেকে বর্ণনা করেছি যে, তিনি বলেন, শিঙ্গায় ফুৎকারের সময যারা জীবিত থাকবে তারা বারজন। জিবরাইল (আ), মিকাইল (আ), ইসরাফিল (আ), মালাকুল মউত। আর আটজন আরশ বহনকারী ফেরশেতা।

অবশ্য কতিপয় আসার এ আছে যে, আল্লাহ তাআলা আরশ বহনকারী ফেরেশতাদেরকে এবং জিবরাইল (আ) মিকাইল (আ), ইসরাফিল (আ), মালাকুল মউতকেও মৃত্যু দিয়ে বলবেন-

لِمَنِ الْمُلْكُ الْيَوْمَ؟

আজ বাদশাহী কার?

এর জওয়াব কেউ দিবে না। অতএব আল্লাহ তাআলাই জবাব দিবেন।

لِلَّهِ الْوَاحِدِ الْقَهَّارِ

প্রবল পরাক্রমশালী আল্লাহর।– সূরা মুমিন ৪০

একটি প্রশ্ন

তাছাড় যদি বলা হয় যে,

كُلُّ نَفْسٍ ذَائِقَةُ الْمَوْتِ

প্রত্যেক প্রাণী মৃত্যুর স্বাদ আস্বাদন করবে।– সূরা আল ইমরান ১৮৫

অথবা বলা হয় যে,

كُلُّ شَيْءٍ هَالِكٌ إِلَّا وَجْهَهُ

প্রত্যেক বস্তুই ধ্বংশশীল-একমাত্র আল্লাহর সত্তা ব্যতীত।– সূরা আল কাসাস ৮৮

শায়খ হালিমী (রহ) এর জওয়াব দিয়েছেন যে, এর এই অর্থ নেওয়া যায় যে, প্রত্যেক বস্তু মৃত্যু অথবা ধ্বংসের উপযুক্ত। (একমাত্র আল্লাহর সত্তা ব্যতীত)। অতএব যখন মৃত্যু ও ধ্বংসের উপযুক্ত তখন আল্লাহ তাআলা যদি ইচ্ছা করেন তবে মৃত্যু ও ধ্বংস হবে (অন্যথায় নয়)।

দুইবার মিঙ্গায় ফুৎকারের মাঝে ৪০ এর ব্যবধান

হযরত আবূ হুরাইরাহ (রা) বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, নবী (সা) বলেছেন, দু’বার ফুঁৎকারের মাঝে ব্যবধান চল্লিশ। লোকেরা জিজ্ঞেস করল, হে আবূ হুরাইরাহ! চল্লিশ দিন? তিনি বললেন, আমার জানা নেই। তারপর তারা জিজ্ঞেস করল, চল্লিশ বছর? তিনি বললেন, আমার জানা নেই। এরপর তাঁরা আবার জিজ্ঞেস করলেন, তাহলে কি চল্লিশ মাস। তিনি বললেন, আমার জানা নেই এবং বললেন, শিরদাঁড়ার হাড় বাদে মানুষের সবকিছুই ধ্বংস হয়ে যাবে। এ দ্বারাই সৃষ্টি জগত আবার সৃষ্টি করা হবে।–রিওয়ায়াত ৩৫৪

হাশরে যেভাবে মানুষকে একত্রিত করা হবে

আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন-

يَوْمَ نَحْشُرُ الْمُتَّقِينَ إِلَى الرَّحْمَنِ وَفْدًا وَنَسُوقُ الْمُجْرِمِينَ إِلَى جَهَنَّمَ وِرْدًا

সেদিন আমি দয়াময়ের নিকট মুত্তাকীদেরকে সম্মানিত মেহমানরুপে সমবেত করব এবং অপরাধীদেরকে পিপাসার্ত অবস্থায় জাহান্নামের দিকে তাড়িয়ে নিয়ে যাব। – সূরা মারইয়াম ৮৫-৮৬

আবূ হুরাইরাহ (রা) সূত্রে নবী (সা) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, কিয়ামতের দিন মানুষকে একত্রিত করা হবে তিন প্রকারে। একদল হবে আল্লাহর প্রতি আসক্ত ও দুনিয়ার প্রতি অনাসক্ত। দ্বিতীয় দল হবে দু’জন, তিনজন, চারজন বা দশজন এক উটের ওপর আরোহণকারী। আর অবশিষ্ট যারা থাকবে অগ্নি তাদেরকে তাড়িয়ে নিয়ে যাবে। যেখানে তারা থামবে আগুনও তাদের সঙ্গে সেখানে থামবে। তারা যেখানে রাত্রি কাটাবে আগুনও সেখানে তাদের সঙ্গে রাত্রি কাটাবে। তারা যেখানে সকাল করবে আগুনও সেখানে তাদের সঙ্গে সকাল করবে। যেখানে তাদের সন্ধ্যা হবে আগুন সেখানেও তাদের সাথে অবস্থান করবে।–রিওয়ায়াত ৩৫৯

শায়খ হালিমী (রহ) বলেন- অনুমান করা যায় যে, এই হাদীসের অর্থ হলো মানুষকে তিন প্রকারে একত্রিত করা হবে। নেককার, ভাল ও মন্দ মিশ্রিত এবং কাফির।

কতককে অধঃমুখে উত্থিত করা হবে

আবূ হুরাইরা (রা) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, কিয়ামতের দিন লোকদেরকে তিন শ্রেণীতে ভাগ করে উঠানো হবে। একদল লোক পায়ে হেটে, দ্বিতীয় দল সাওয়ারী অবস্থায় এবং তৃতীয় দল অধঃমুখে (এবং পা উপরে তুলে) হাযির হবে। প্রশ্ন করা হল, হে আল্লাহর রাসূল! এরা মুখমণ্ডলে ভর করে চলবে কিভাবে? তিনি বললেন, যে মহান সত্তা তাদেরকে পায়ের সাহায্যে হাটিয়ে ছিলেন, তিনি তাদেরকে মুখমণ্ডলে ভর করে হাটাতেও সক্ষম। এরা নিজেদের মুখের দ্বারা প্রতিটি উচু-নীচু ও কাটা উপেক্ষা করে রাস্তা পার হবে।

যেমন আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন-

يَوْمَ يُسْحَبُونَ فِي النَّارِ عَلَى وُجُوهِهِمْ

যেদিন তাদেরকে উপুড় করে টেনে নিয়ে যাওয়া হবে জাহান্নামের দিকে।– সূরা আল কামার ৪৮

الَّذِينَ يُحْشَرُونَ عَلَى وُجُوهِهِمْ إِلَى جَهَنَّمَ أُولَئِكَ شَرٌّ مَكَانًا وَأَضَلُّ سَبِيلًا

যাদেরকে মুখ ভর দিয়ে চলা অবস্থায় জাহান্নামের দিকে একত্রিত করা হবে। তাদরই স্থান হবে অতি নিকৃষ্ট এবং তারাই সর্ভাধিক পখভ্রষ্ট।– সূরা আল ফুরকান ৩৪

কাফিরদেরকে অন্ধ ও বধরি অবস্থায় উত্থিত করা হবে

আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন-

وَنَحْشُرُهُمْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ عَلَى وُجُوهِهِمْ عُمْيًا وَبُكْمًا وَصُمًّا مَأْوَاهُمْ جَهَنَّمُ

কিয়ামতের দিন আমি তাদেরকে সমবেত করব তাদের মুখে ভর দিয়ে চলা অবস্থায়, অন্ধ, বোবা ও বধির করে। তাদের আবাসস্থল জাহান্নাম।– সূরা ইসরা ৯৭

নগ্ন দেহে মানুষের হাশর হবে

হযরত ইবনে আব্বাস (রা) হতে বর্ণিত। নবী (সা) বলেন,

أَيُّهَا النَّاسُ إِنَّكُمْ تُحْشَرُونَ إِلَى اللهِ حُفَاةً عُرَاةً غُرْلًا

হে লোক সকল! নিশ্চয়ই তোমাদেরকে হাশর ময়দানে খালি পা, বস্ত্রহীন এবং খাতনাবিহীন অবস্থায় উপস্থিত করা হবে।

অতঃপর তিনি পবিত্র কুরআনের আয়াতটি তিলাওয়াত করলেনঃ

كَمَا بَدَأْنَا أَوَّلَ خَلْقٍ نُعِيدُهُ

যেভাবে আমি প্রথমে সৃষ্টির সূচনা করেছিলাম, সেভাবে পুনরায় সৃষ্টি করব।– সূরা আম্বিয়াঃ ১০৪

আর কিয়ামতের দিন সবার আগে যাকে কাপড় পরানো হবে তিনি হবেন ইবরাহীম (আ)। 

আয়িশাহ্ সিদ্দীকা (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সা) কে বলতে শুনেছি যে,

تُحْشَرُونَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ حُفَاةً عُرَاةً غُرْلًا

 কিয়ামতের মাঠে সকল মানুষকে একত্রিত করা হবে খালি পা, উলঙ্গ দেহ এবং খাতনাবিহীন অবস্থায়।

এ কথা শুনে আমি বললাম, হে আল্লাহর রসূল! পুরুষ এবং মহিলা এক সঙ্গেই উত্থিত হবে আর তারা পরস্পর একে অপরের প্রতি তাকাবে? তিনি বললেন, হে ‘আয়িশাহ! তখনকার প্রেক্ষাপট এতো কঠিন ও ভয়ঙ্ককর হবে যে, একে অপরের প্রতি তাকানোর কল্পনারও উদ্রেক হবে না।

হাশরের ময়দানে কাফনের কাপড় থাকবে কি না?

হযরত আবু সাঈদ আল খুদরী (রা) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেন-

يُبْعَثُ الْمَيِّتُ فِي ثِيَابِهِ الَّتِي يَمُوتُ فِيهَا

মৃত ব্যক্তিকে সেই কাপড়েই উত্থিত করা হবে যে কাপড়ে তাকে দাফন করা হয়েছে।

এখানে ধারণা করা হয় যে এখানে কাপড় দ্বারা আমল উদ্দেশ্য। অর্থাৎ ভাল অথবা মন্দ যেই আমলের উপর মৃত্যুবরণ করেছে সেই আমলের উপর জীবিত হবে। যেমন হযরত জাবির (রা) থেকে বর্ণিত হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেন-

يُبْعَثُ كُلُّ عَبْدٍ عَلَى مَا مَاتَ عَلَيْهِ

প্রত্যেক ব্যক্তিকে ঐ অপবস্থার উপর উঠানো হবে যেই অবস্থার উপর তার মৃত্যু হবে।

অথবা এখানে কাপড়ই উদ্দেশ্য। যে কাপড়ে সে মৃত্যুবরণ করেছে সে কাপড়েই উত্থিত হবে। অতঃপর তা ঝড়ে যাবে এবং নগ্ন অবস্থায় হাশর হবে। জান্নাতী হলে জান্নাতের কাপড় পরিধান করানো হবে। আল্লাহই ভাল জানেন।

অনুচ্ছেদঃ

হাউজ

হযরত সাহল বিন সাদ বর্ণনা করেন। রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেন-

إِنِّي فَرَطُكُمْ عَلَى الْحَوْضِ مَنْ مَرَّ عَلَيَّ شَرِبَ، وَمَنْ شَرِبَ لَمْ يَظْمَأْ أَبَدًا

নিশ্চয়ই আমি হাউজে তোমাদের সবার আগে পৌঁছব। যে ব্যক্তিই আমার নিকট আসবে সে তা পান করবে। আর যে তার পান করবে সে কখনো পিপাসার্ত হবে না।  অতঃপর পূর্ণ হাদীস বর্ননা করেন।– রিওয়ায়াত ৩৬০

অনুচ্ছেদঃ

এই উম্মতের কতজন জান্নাতী হবে ?

আবূ সাঈদ (রা) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, মহামহিম আল্লাহ (কিয়ামত দিবসে) আহবান করবে, হে আদম! তিনি উত্তরে বলবেন, আমি আপনার সামনে উপস্থিত, আপনার কাছে শুভ কামনা করি এবং সকল কল্যাণ আপনারই হাতে। মহান আল্লাহ বলবেন, জাহান্নামী দলকে বের কর। আদম (আ) জিজ্ঞেস করবেন, জাহান্নামী দল কতজনে? মহান আল্লাহ বলবেন, প্রতি হাজার থেকে নয়শত নিরানব্বই। রাসূলুল্লাহ (সা) বললেন, এটা সে মুহুর্ত যখন বালক হয়ে যাবে বৃদ্ধ, সকল গর্ভবতী তাদের গর্ভপাত করে ফেলবে আর মানুষকে দেখবে মাতাল সদৃশ যদিও তারা নেশাগ্রস্ত নয়, বস্তুতঃ আল্লাহর আযাব বড়ই কঠিন।

লোকেরা বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমাদের মধ্যে কে হবে সে ব্যক্তি জান্নাতের জন্য একজন? তিনি (সা) বললেন, আনন্দিত হও। ইয়াজু্য ও মাজুযের সংখ্যা এক হাজার হলে তোমাদের সংখ্যা হবে একজন। লোকেরা এটা শুনে বললো আল্লাহু আকবার।

তারপর রাসূলুল্লাহ (সা) বললেন, অবশ্যই আমি আশা রাখি যে, তোমরা জান্নাতীদের এক চতুর্থাংশ হবে। তারপর আবার তিনি বললেন, আল্লাহ করেন আমি আশা রাখি, জান্নাতীদের মধ্যে তোমরা তাদের এক তৃতীয়াংশ হবে। তারপর আবার তিনি (সা) বললেন, আল্লাহ করেন তোমরা জান্নাতীদের অর্ধেক হবে। এটা শুনে লোকেরা বললো আল্লাহু আকবার।

অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সা) বললেন, তোমরা ঐ দিন এমন হবে যেমন কাল শরীরে উপর একটি সাদা পশম অথবা সাদা একটি ষাড়ের মধ্যে একটি কাল পশম (যেভাবে উজ্জল দেখা যায়।)।

কিয়ামতের দিনের দীর্ঘ সময়কে আল্লাহ কারো কারো জন্য সহজ করে দিবেন

হযরত আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত। রাসূলূল্লাহ (সা) ইরশাদ করেন-

إِنَّ اللهَ يُخَفِّفُ عَلَى مَنْ يَشَاءُ مِنْ عِبَادِهِ طُولَ يَوْمِ الْقِيَامَةِ كَوَقْتِ صَلَاةٍ مَكْتُوبَةٍ

নিম্চয়ই আল্লাহ তাআলা যার জন্য চান তার জন্য কিয়ামতের দিনের দীর্ঘ সময়কে ফরয নামাযের মত সহজ করে দিবেন।- রিওযায়াত ৩৬২

ইমানের ৮ম শাখা সমাপ্ত

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Back to top button
error: Content is protected !!