ইযহারুল হক- সত্যের প্রকাশ – ইসলাম ও খৃষ্টান ধর্মতত্ত ১

islamhouse.com এর সৌজন্যে

ইসলাম ও খৃস্টধর্মের তুলনামূলক আলোচনায় আল্লামা রাহমাতুল্লাহ কিরানবীর কালজয়ী গ্রন্থ ইযহারুল হক্ক-এর সার-সংক্ষেপ

সংক্ষেপিত ইযহারুল হক

ড. মুহাম্মাদ আহমাদ আবদুল কাদের মালকাবী

 অনুবাদ : ড. খন্দকার আ.ন.ম আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর

সম্পাদনা : ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া

সূচীপত্র

সংক্ষেপকের পূর্বকথন

ভূমিকা: কতিপয় জরুরী জ্ঞাতব্য

প্রথম অধ্যায়: বাইবেল পরিচিতি

প্রথম পরিচ্ছেদ: বাইবেলের পুস্তকগুলির নাম ও সংখ্যা

১. ১. ১. পুরাতন নিয়মের গ্রন্থাবলি

১. ১. ২. নতুন নিয়মের গ্রন্থাবলি

১. ১. ৩. গ্রন্থগুলির সংখ্যায় হেরফেরের ইতিহাস

দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ: বাইবেলের পুস্তকগুলির অপ্রামাণ্যতা

১. ২. ১. তোরাহ বা তাওরাতের অবস্থা

১. ২. ২. যিহোশূয়ের পুস্তকের অবস্থা

১. ২. ৩. ইঞ্জিল বা সুসমাচারগুলির সূত্র পর্যালোচনা

১. ২. ৩. ১. মথিলিখিত সুসমাচার

১. ২. ৩. ২. মার্কলিখিত সুসমাচার

১. ২. ৩. ৩. যোহনলিখিত সুসমাচার

১. ২. ৪. পবিত্র বাইবেলের পুস্তকগুলি ঐশী নয়

১. ২. ৫. পবিত্র বাইবেল বিষয়ে মুসলিম বিশ্বাস

তৃতীয় পরিচ্ছেদ: বাইবেলের বৈপরীত্য, ভুলভ্রান্তি ও বিকৃতি

১. ৩. ১. বৈপরীত্য ও পরস্পর বিরোধিতা

১. ৩. ২. ভুলভ্রান্তি

১. ৩. ৩. বাইবেলের বিকৃতির আলোচনা

১. ৩. ৪. বিকৃতি বিষয়ে পাদরিগণের বিভ্রান্তিকর প্রচারণা

১. ৩. ৪. ১. শুধু মুসলিমরাই বিকৃতির কথা বলে

১. ৩. ৪. ২. বিকৃতি বিষয়ে অমুসলিমগণের সাক্ষ্য

১. ৩. ৪. ৩. বাইবেলের বিকৃতির কারণাদি

১. ৩. ৪. ৪. যীশু খৃস্টের সাক্ষ্য

১. ৩. ৪. ৫. যীশুর বক্তব্য বনাম বাইবেলের প্রামাণ্যতা

১. ৩. ৪. ৬. বাইবেলের বিকৃতি কি অসম্ভব ছিল

১. ৩. ৪. ৭. বাইবেলের ইতিহাস ও বিকৃতির প্রেক্ষাপট

চতুর্থ পরিচ্ছেদ: নতুন ও পুরাতন নিয়মে রহিত বিধান

১. ৪. ১. ইসলামী পরিভাষায় রহিতকরণ

১. ৪. ১. ১. নাসখ বা রহিতকরণের অর্থ

১. ৪. ১. ২. ইসলামী পরিভাষায় রহিতকরণের ক্ষেত্র

১. ৪. ১. ৩. রহিতকরণ বনাম মত-পাল্টানো

১. ৪. ১. ৪. কাহিনী ও ঐতিহাসিক বিবরণ রহিত হয় না

১. ৪. ১. ৫. যাবূর দ্বারা তাওরাত ও ইঞ্জিল দ্বারা যাবূর রহিত হয় নি

১. ৪. ২. বাইবেলের পরিবর্তিত ও অপরিবর্তিত বিধানাদি

১. ৪. ৩. বাইবেলে বিদ্যমান রহিতকরণের প্রকারভেদ

১. ৪. ৩. ১. পরবর্তী ব্যবস্থায় পূর্ববর্তী ব্যবস্থার রহিতকরণ

১. ৪. ৩. ২. একই ভাববাদীর ব্যবস্থায় রহিতকরণ

দ্বিতীয় অধ্যায়:ত্রিত্ববাদ খণ্ডন

ভূমিকা: কতিপয় প্রয়োজনীয় মূলনীতি ও তথ্য

প্রথম পরিচ্ছেদ: বুদ্ধিবৃত্তিক প্রমাণাদি দ্বারা ত্রিত্ববাদ খণ্ডন

দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ: যীশুর বক্তব্য দ্বারা ত্রিত্ববাদ খণ্ডন

তৃতীয় পরিচ্ছেদ: যীশুর ঈশ্বরত্বের প্রমাণাদির অসারতা

তৃতীয় অধ্যায়: আল-কুরআন ও আল-হাদীস

প্রথম পরিচ্ছেদ: আল-কুরআনের অলৌকিকত্ব

৩. ১. ১. আল কুরআনের অলৌকিকত্ব

৩. ১. ১. ১. অলৌকিক ভাষাশৈলী

৩. ১. ১. ২. অত্যাশ্চার্য কাব্যিক গদ্য ও বিন্যাস

৩. ১. ১. ৩. ভবিষ্যতের সংবাদ

৩. ১. ১. ৪. অতীতের সংবাদ

৩. ১. ১. ৫. মুনাফিকদের গোপন খবর

৩. ১. ১. ৬. জ্ঞান-বিজ্ঞানের অজানা তথ্য

৩. ১. ১. ৭. বৈপরীত্য ও স্ববিরোধিতা বিমুক্তি

৩. ১. ১. ৮. চিরন্তন অলৌকিকত্ব

৩. ১. ১. ৯. ক্লান্তিহীন প্রেমের স্থায়ী উৎস

৩. ১. ১. ১০. হৃদয়ঙ্গম ও মুখস্ত করা সহজ

৩. ১. ২. কুরআন বিষয়ক তিনটি প্রশ্ন

৩. ১. ২. ১. সাহিত্যিক অলৌকিকত্ব

৩. ১. ২. ২. ক্রমান্বয়ে অবতরণ

৩. ১. ২. ৩. বিষবস্তুর পুনরাবৃত্তি

৩. ১. ৩. কুরআন প্রসঙ্গে পাদরিগণের দুটি আপত্তি

৩. ১. ৩. ১. ভাষার উচ্চাঙ্গতা অলৌকিকত্বের অকাট্য প্রমাণ নয়

৩. ১. ৩. ২. বাইবেল ও কুরআনের বৈপরীত্য

দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ: হাদীস বিষয়ে পাদরিগণের আপত্তি পর্যালোচনা

৩. ২. ১. হাদীস বর্ণনাকারীগণ সম্পর্কে বিভ্রান্তি

৩. ২. ১. ১. হাদীসের বর্ণনাকারীগণ বনাম ইঞ্জিলের বর্ণনাকারীগণ

৩. ২. ১. ২. শিয়াগণের বিভ্রান্তি বনাম খৃস্টীয় বিভ্রান্ত সম্প্রদায়

৩. ২. ১. ৩. সাহাবীগণের বিষয়ে কুরআনের সাক্ষ্য

৩. ২. ১. ৪. সাহাবীগণের বিষয়ে শিয়া ইমামগণের বক্তব্য

৩. ২. ২. হাদীস সংকলন সম্পর্কে বিভ্রান্তি

৩. ২. ২. ১. ইয়াহূদী ধর্মে হাদীস বা মৌখিক বর্ণনা

৩. ২. ২. ২. খৃস্টধর্মে হাদীস বা মৌখিক বর্ণনা

৩. ২. ২. ৩. ইসলামী শরীয়তে হাদীস

চতুর্থ অধ্যায়: মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নুবুওয়াত

প্রথম পরিচ্ছেদ: মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নুবুওয়াতের প্রমাণ

৪. ১. ১. মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অলৌকিক চিহ্ন-কার্য

৪. ১. ১. ১. অতীত ও ভবিষ্যতের অজানা সংবাদ

৪. ১. ১. ২. মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম দ্বারা সম্পাদিত অলৌকিক কর্মসমূহ

৪. ১. ২. ব্যক্তিত্ব, বিধান ও মানবতার প্রয়োজন

৪. ১. ২. ১. তাঁর মহোত্তম চরিত্র ও আচরণ

৪. ১. ২. ২. তাঁর ধর্মব্যবস্থার বৈশিষ্ট্য

৪. ১. ২. ৩. তাঁর আগমন ও বিজয়ের অবস্থা

৪. ১. ২. ৪. মানবতার প্রয়োজনের সময়েই তাঁর আগমন

দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ: পূর্ববর্তী নবীগণের ভবিষ্যদ্বাণী

৪. ২. ১. বাইবেলীয় ভবিষ্যদ্বাণীর প্রকৃতি

৪. ২. ১. ১. ভবিষ্যদ্বাণীর বিদ্যমানতা

৪. ২. ১. ২. ভবিষ্যদ্বাণীর অস্পষ্টতা

৪. ২. ১. ৩. ভাববাদীর অপেক্ষায় ইস্রায়েলীয় জাতি

৪. ২. ১. ৪. বাইবেলীয় নামসূহের অনুবাদ, সংযোজন ও পরিবর্তন

৪. ২. ২. বাইবেলের চারটি ভবিষ্যদ্বাণী

৪. ২. ২. ১. মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিষয়ক প্রথম ভবিষ্যদ্বাণী

৪. ২. ২. ২. মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিষয়ক দ্বিতীয় ভবিষ্যদ্বাণী

৪. ২. ২. ৩. মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিষয়ক তৃতীয় ভবিষ্যদ্বাণী

৪. ২. ২. ৪. মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিষয়ক চতুর্থ ভবিষ্যদ্বাণী

উপসংহার

সংক্ষেপকের পূর্বকথন

প্রশংসা আল্লাহর নিমিত্ত। আর সালাত ও সালাম উম্মী নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উপর এবং তাঁর পরিবার-অনুসারী ও সহচরগণের উপর।

মহান আল্লাহর তাওফীকে আমি আল্লামা শাইখ রাহমাতুল্লাহ ইবনু খালীলুর রাহমান কিরানবী উসমানী হিন্দী রচিত ‘ইযহারুল হক্ক’ গ্রন্থটি সম্পাদনা করি। সম্পাদনার ক্ষেত্রে আমি গ্রন্থকারের নিজের হস্তলিখিত ও তাঁর সামনে পঠিত দুটি সুবর্ণ পাণ্ডুলিপির উপর নির্ভর করি। আমার সম্পাদিত ইযহারুল হক্ক গ্রন্থটি চার খণ্ডে প্রথম প্রকাশিত হয় ১৪১০ হিজরী অব্দে /১৯৮৯ খৃস্টাব্দে। সৌদী সরকারের রিয়াদস্থ ইলমী গবেষণা, ফাতওয়া, দাওয়াত ও ইরশাদ বিষয়ক কেন্দ্রীয় কার্যালয় তা প্রকাশ করে।

অনেক সহকর্মী আমাকে উদ্বুদ্ধ করেন যে, আমি যেন ‘‘ইযহারুল হক্ক’’ গ্রন্থটিকে সহজবোধ্য সরল ভাষায় সংক্ষেপ করে এক খণ্ডে প্রকাশ করি; যাতে গ্রন্থটি অন্যান্য ভাষায় অনুবাদ করা সহজ হয়। বিশ্বব্যাপী খৃস্টান মিশনারি ও প্রচারকগণ ইসলামের বিরুদ্ধে যে সকল অপপ্রচার চালাচ্ছেন তার প্রতিরোধে সংক্ষেপিত গ্রন্থটি কার্যকর ভূমিকা পালন করবে বলে তারা আশা করেন। কিন্তু আমার কয়েকটি গ্রন্থ মুদ্রণের বিষয়ে আমার ব্যস্ততা তাদের এ অনুরোধ বাস্তবায়নের পথে বাঁধা হয়ে দাঁড়ায়।

এমতাবস্থায় সৌদি সরকারের ইসলামী কর্মকান্ড, ওয়াক্ফ, দাওয়া ও ইরশাদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মুদ্রণ ও প্রকাশনা বিভাগের উপ-সচিব ড. আব্দুল্লাহ ইবনু আহমদ আল-যাইদ-এর পরামর্শ ও নির্দেশনা আমার সহকর্মীদের অনুপ্রেরণার সাথে সংযুক্ত হয়ে একে গতিশীল করে। তিনি আমাকে এ কর্মটি দ্রুত সম্পাদনের গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতন করেন। বিশেষত নতুন পরিস্থিতিতে ক্রুসেডারগণ বিশ্বব্যপী ইসলামের বিরুদ্ধে বৈরিতার প্রকাশ্য ঘোষণা দিচ্ছে এবং স্বল্প সময়ের মধ্যে মুসলিম বিশ্বকে ধর্মান্তরিত করে খৃস্টান বানানোর বিষয়ে তাদের আগ্রহ সগৌরবে প্রকাশ করছে।

এ প্রেক্ষাপটে আমি এ সংক্ষেপিত গ্রন্থটি প্রকাশের জন্য সক্রিয় হই। যদি কেউ এ গ্রন্থটি অন্য কোনো ভাষায় অনুবাদ করতে চান তবে তার জন্য আমার অনুরোধ যে, বাইবেলের নতুন ও পুরাতন নিয়মের যে সকল উদ্ধৃতি এ গ্রন্থে প্রদান করা হয়েছে সেগুলি যেন তিনি তার নিজের মত করে অনুবাদ না করেন; বরং তার ভাষায় প্রচারিত ‘‘বাইবেল’’ থেকে উদ্ধৃত করেন।

এ সংক্ষেপিত গ্রন্থের মধ্যে আমি মূল গ্রন্থের বক্তব্য সুস্পষ্ট করার জন্য অতিরিক্ত কিছু তথ্য সংযোজন করেছি। যেমন, কোনো কোনো ঘটনার সন-তারিখ, কোনো কোনো ব্যক্তির মৃত্যু-সন উল্লেখ করেছি। যদি কোনো নাম দুভাবে লেখার প্রচলন থাকে বা কোনো শহরের প্রাচীন ও আধুনিক দুটি নাম থাকে তাহলে আমি দুটি নামই লিখেছি। যেক্ষেত্রে একই নামে দুটি শহর বিদ্যমান সেক্ষেত্রে উদ্দিষ্ট শহরকে চিহ্নিত করেছি। কিছু পরিভাষা ব্যাখ্যা করেছি। বিষয়বস্তুর সহজবোধ্যতার জন্য খৃস্টীয় ও ইসলামী ঐতিহাসিক কিছু ঘটনার ক্ষেত্রে কিছু তথ্য সংযোজন করেছি। অস্পষ্টতা দূর করে বিশুদ্ধ উচ্চারণ নিশ্চিত করতে কিছু শব্দে হরকত বা জের-জবর-পেশ ব্যবহার করেছি। মূল গ্রন্থে লেখকের নাম উল্লেখ না করে কিছু গ্রন্থের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। আমি এ সকল গ্রন্থের লেখকদের নাম ও তাদের মৃত্যু তারিখ উল্লেখ করেছি। বাইবেলের পুরাতন ও নতুন নিয়মের কিছু উদ্ধৃতির ক্ষেত্রে আমি বিভিন্ন সংস্করণের ভাষ্য উল্লেখ করেছি। এছাড়া মূল গ্রন্থের কিছু তথ্য আমি আগে পিছে করে নতুন করে সাজিয়েছি; যেন পাঠকের জন্য অধিক সহজ ও উপযোগী হয় এবং তার চিন্তাধারা বিক্ষিপ্ত না হয়।

মূল ‘‘ইযহারুল হক্ক’’ গ্রন্থের প্রথম তিনটি অধ্যায় আমি একটি অধ্যায়ের মধ্যে সন্নিবেশিত করেছি। ফলে অধ্যায়টি ইয়াহূদী-খৃস্টানদের ধর্মগ্রন্থগুলির পরিচয়ে একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ অধ্যায়ে পরিণত হয়েছে। এর মধ্যে তাদের গ্রন্থগুলির নাম, বিকৃতি ও রহিত হওয়া বিষয়ক বর্ণনা রয়েছে। আমার উদ্দেশ্য, যেন এ সংক্ষেপিত গ্রন্থটি মূল গ্রন্থের বিষয়বস্তু অক্ষুণ্ণ রাখার পাশাপাশি পাঠকের জন্য সর্বোচ্চ কল্যাণ বয়ে আনে।

সবশেষে মহান আল্লাহর তাওফীকের উপর নির্ভর করে বলছি, আল্লামা শাইখ রাহমাতুল্লাহ ইবনু খালীলুর রাহমান কীরানবী তাঁর মহামূল্যবান গ্রন্থ ‘‘ইযহারুল হক্ক’’ একটি ভূমিকা ও ছয়টি অধ্যায়ে বিন্যস্ত করেছেন। নিম্নে এ গ্রন্থের সার-সংক্ষেপ প্রদত্ত হলো।

 

ড. মুহাম্মাদ আহমদ আব্দুল কাদির মালকাবী

সহকারী অধ্যাপক

কিং সাউদ বিশ্ববিদ্যালয়, রিয়াদ

০১/০১/১৪১৫ হি./ ১০/০৬/১৯৯৪ খৃ.

 

ভূমিকা

কতিপয় জরুরী জ্ঞাতব্য

(১) প্রটেস্টান্ট[1] পণ্ডিতগণের গ্রন্থ থেকে যে সকল উদ্ধৃতি প্রদান করা হয়েছে তা অনেক ক্ষেত্রে শুধু তাদের কথা দ্বারা তাদের বিভ্রান্তি প্রমাণের জন্য, আমাদের বিশ্বাস প্রকাশের জন্য নয়।

(২) প্রটেস্টান্ট পণ্ডিতগণ সর্বদা তাদের লিখিত গ্রন্থগুলি বিষয়বস্তু পরিবর্তন, পরিবর্ধন, সংযোজন, বিয়োজন ইত্যাদির মাধ্যমে পাল্টে ফেলেন। ফলে আগের সংস্করণ ও পরের সংস্করণের মধ্যে অনেক পার্থক্য দেখা যায়। পাঠককে এ বিষয়ে সতর্ক হতে হবে।

(৩) ‘‘বাইবেল’’-এর মধ্যে বিদ্যমান বিভিন্ন কাহিনীকে মিথ্যা বা ভুল বলায় কোনো অসুবিধা নেই। কারণ এগুলি নবীগণের নামে বানানো জাল ও ভিত্তিহীন গল্প এবং আসমানী কিতাবের বিকৃতির অংশ। এ সকল কাহিনী কোনোটিই আল্লাহর কালাম নয়। আর এ সকল জাল কাহিনীকে মিথ্যা বা ভুল বললে ‘‘আসমানী কিতাবের’’ প্রতি বে-আদবী হয় না। বরং এ সকল আসমানী গ্রন্থে যে সকল বিকৃতি ও মিথ্যার অনুপ্রবেশ ঘটেছে সেগুলি প্রকাশ করা ও সেগুলির নিন্দা করা মুসলিমের আবশ্যকীয় দায়িত্ব।

(৪) খৃস্টান পণ্ডিতগণের রীতি ও অভ্যাস হলো, তারা মুসলিম আলিমগণের লিখনির মধ্যে বিদ্যমান সামান্য দু-একটি দুর্বল বক্তব্য খুঁজে বের করে তাদের গ্রন্থে সেগুলির উল্লেখ করেন এবং সেগুলির প্রতিবাদ করেন। এভাবে তারা পাঠককে বুঝাতে চান যে, মুসলিম পণ্ডিতদের বইগুলি এরূপ দুর্বল কথায় ভরা। আর প্রকৃত বিষয় হলো, মুসলিম আলিমগণের গ্রন্থের মধ্যে বিদ্যমান অগণিত শক্তিশালী বক্তব্যগুলি তারা এড়িয়ে যান এবং সেগুলির কোনোরূপ উল্লেখ তারা করেন না। যদি কখনো এরূপ কোনো বক্তব্য তারা উল্লেখ করেন তবে পরিপূর্ণ অবিশ্বস্ততার সাথে বাড়িয়ে কমিয়ে বা বিকৃত করে সে বক্তব্য উপস্থাপন করেন। এ তাদের সবচেয়ে নিন্দনীয় অভ্যাসগুলির অন্যতম। জ্ঞানবৃত্তিক বিতর্কের মূলনীতি হলো প্রতিপক্ষের বক্তব্য পরিপূর্ণ বিশ্বস্ততার সাথে বিশুদ্ধভাবে উপস্থাপন করা; কিন্তু তারা এ মূলনীতি লঙ্ঘন করেন। পাদরি কার্ল গোটালেব ফান্ডার (Carl Gottaleb Pfander) এরূপ করেছেন আল্লামা রাহমাতুল্লাহ কিরানবীর সাথে তার প্রকাশ্য বিতর্কের বিবরণে। ১২৭০ হি,/১৮৫৪ খৃ ভারতের আগ্রায় তাদের মধ্যে এ বিতর্ক অনুষ্ঠিত হয়। মি. ফান্ডার এ বিতর্কের বিবরণ সম্পূর্ণ বিকৃতভাবে ইংরেজি ভাষায় প্রকাশ করেন। এতে তিনি প্রকৃত ঘটনা সম্পূর্ণ বিকৃত করে উভয়পক্ষের বক্তব্য বিকৃতভাবে উপস্থাপন করেন। মি. ফান্ডার তার বিভিন্ন পুস্তকে কুরআন কারীমের বিভিন্ন শ্লোক নিজের মনমর্জি মত অনুবাদ ও ব্যাখ্যা করতেন। এরপর দাবি করতেন যে, তার অনুবাদ ও ব্যাখ্যায় সঠিক এবং মুসলিম মুফাস্‌সিরগণের ব্যাখ্যা ভুল। অথচ প্রকৃত ও প্রমাণিত বিষয় যে, তিনি আরবী ভাষায় অত্যন্ত দুর্বল ছিলেন। এছাড়া কুরআন বিষয়ক প্রাসঙ্গিক জ্ঞানও তার ছিল না। এরপরও তিনি দাবি করতেন তার ভাষাজ্ঞান-বিহীন অশুদ্ধ অনুবাদ ও ব্যাখ্যাকে সঠিক বলে মানতে হবে এবং মুসলিম উম্মাহর সকল মুফাস্‌সিরের ব্যাখ্যাকে ভুল বলতে হবে!

হে আল্লাহ, আমাদেরকে সত্যকে সত্যরূপে বুঝার এবং তার অনুসরণের তাওফীক দান করুন। আর বাতিল ও অসত্যের অসারত্ব আমাদের সামনে প্রতিভাত করুন এবং তা পরিহার করার তাওফীক আমাদেরকে দান করুন।

 

প্রথম অধ্যায়

বাইবেল পরিচিতি

 

নতুন ও পুরাতন নিয়মের গ্রন্থাবলির বর্ণনা ও

সেগুলির বিকৃতি ও রহিত হওয়ার প্রমাণ

 

 

এই অধ্যায়টি চারটি পরিচ্ছেদে বিভক্ত:

 

প্রথম পরিচ্ছেদ: বাইবেলের পুস্তকগুলির নাম ও পরিচয়

দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ: বাইবেলের পুস্তকগুলির সনদ-হীনতা

তৃতীয় পরিচ্ছেদ: বাইবেলের  অগণিত বৈপরীত্য ও ভুলভ্রান্তি

চতুর্থ পরিচ্ছেদ: বাইবেলের রহিত হওয়ার প্রমাণ

 

 

 

প্রথম পরিচ্ছেদ:

বাইবেলের পুস্তকগুলির নাম ও সংখ্যা

খৃস্টানগণ তাঁদের ধর্মীয় গ্রন্থগুলিকে দুভাগে ভাগ করেন। প্রথমভাগের গ্রন্থাবলি সম্পর্কে তারা দাবি করেন যে, যীশুর (ঈসা আ) পূর্বে আগত নবীগণের মাধ্যমে সেগুলি তাদের নিকট পৌঁছেছে। দ্বিতীয় ভাগের গ্রন্থগুলির বিষয়ে তারা দাবি করেন যে, যীশুর (ঈসা আ.) -এর পরে ঐশ্বরিক অনুপ্রেরণা (Divine Inspiration)-এর মাধ্যমে সেগুলি লিখিত হয়েছে। প্রথমভাগের গ্রন্থগুলির সমষ্টিকে পুরাতন নিয়মএবং দ্বিতীয়ভাগের গ্রন্থগুলির সমষ্টিকে নতুন নিয়মবলে অভিহিত করা হয়। উভয় নিয়মের সমষ্টিকে বলা হয় বাইবেল। এটি একটি গ্রীক শব্দ। এর অর্থ গ্রন্থ। পুরাতন ও নতুন নিয়ম একত্রে ছাপানো বইটির উপরে লেখা হয়: ‘‘পবিত্র বাইবেল’’

১. ১. ১. পুরাতন নিয়মের গ্রন্থাবলি

প্রটেস্টান্ট খৃস্টানগণের নিকট স্বীকৃত ‘‘প্রটেস্টান্ট বাইবেল’’ বা কিং জেমস ভার্সন অনুসারে পবিত্র বাইবেলের প্রথম অংশ বা পুরাতন নিয়মের মধ্যে বর্তমানে ৩৯টি পুস্তক বিদ্যমান[2]। সেগুলির বিবরণ নিম্নরূপ:

  1. আদি পুস্তক (Genesis)
  2. যাত্রা পুস্তক (Exodus)
  3. লেবীয় পুস্তক (Leviticus)
  4. গণনা পুস্তক (Numbers)
  5. দ্বিতীয় বিবরণ (Deuteronomy)

এ পাঁচটি গ্রন্থ একত্রে তাওরাহ’ (Torah or Pentateuch) নামে অভিহিত। তাওরাহএকটি হিব্রু শব্দ। এর অর্থ শিক্ষা ও বিধিবিধান। কখনো কখনো রূপকভাবে পুরাতন নিয়মের সকল গ্রন্থের সমষ্টিকে, অর্থাৎ উপর্যুক্ত ৫টি গ্রন্থ ও নিম্নের ৩৪টি গ্রন্থের সমষ্টিকে তাওরাতবা তোরাহবলে অভিহিত করা হয়:

  1. যিহোশূয়ের পুস্তক (The Book of Joshua)[3]
  2. বিচারকর্ত্তৃগণের বিবরণ (The Book of Judges)
  3. রূতের বিবরণ (The Book of Ruth)
  4. শমুয়েলের প্রথম পুস্তক (The First Book of Samuel)
  5. শমুয়েলের দ্বিতীয় পুস্তক (The Second Book of Samuel)
  6. রাজাবলির প্রথম খণ্ড (The First Book of Kings)
  7. রাজাবলির দ্বিতীয় খণ্ড (The Second Book of Kings)
  8. বংশাবলির প্রথম খণ্ড (The First Book of The Chronicles)
  9. বংশাবলির দ্বিতীয় খণ্ড (The Second Book of The Chronicles)
  10. ইয্রার পুস্তক (The Book of Ezra)
  11. নহিমিয়ের পুস্তক (ইয্রার দ্বিতীয় পুস্তক) (The Book of Nehemiah)
  12. ইস্টেরের বিবরণ (The Book of Esther)
  13. ইয়োবের[4] বিবরণ (The Book of Job)
  14. গীতসংহিতা (যাবূর) (The Book of Psalms)
  15. হিতোপদেশ (সুলাইমানের প্রবাদাবলী) (The Proverbs)
  16. উপদেশক (Ecclesiastes or, the Preacher)
  17. শলোমনের পরমগীত (The Song of Solomon)
  18. যিশাইয় ভাববাদীর পুস্তক (The Book of The Prophet Isaiah)
  19. যিরমিয় ভাববাদীর পুস্তক (The Book of The Prophet Jeremiah)
  20. যিরমিয়ের বিলাপ (The Lamentations of Jeremiah)
  21. যিহিষ্কেল ভাববাদীর পুস্তক (The Book of The Prophet Ezekiel)
  22. দানিয়েলের পুস্তক (The Book of Daniel)
  23. হোশেয় ভাববাদীর পুস্তক (Hosea)
  24. যোয়েল ভাববাদীর পুস্তক (Joel)
  25. আমোষ ভাববাদীর পুস্তক (Amos)
  26. ওবদিয় ভাববাদীর পুস্তক (Obadiah)
  27. যোনা[5] ভাববাদীর পুস্তক (Jonah)
  28. মীখা ভাববাদীর পুস্তক (Micah)
  29. নহূম ভাববাদীর পুস্তক (Nahum)
  30. হবক্কূক ভাববাদীর পুস্তক (Habakkuk)
  31. সফনিয় ভাববাদীর পুস্তক (Zephaniah)
  32. হগয় ভাববাদীর পুস্তক (Haggai)
  33. সখরিয়[6] ভাববাদীর পুস্তক (Zechariah)
  34. মালাখি ভাববাদীর পুস্তক (Malachi)

ঈসা-মসীহ আলাইহিস সালাম এর জন্মের প্রায় ২৪০ বৎসর পূর্বে মালাখি নবী হিসেবে[7] ইহুদীদের মধ্যে বিরাজমান ছিলেন।

শমরীয় (Samaritans) ইয়াহূদীগণ এগুলির মধ্য থেকে শুধু প্রথম সাতটি গ্রন্থ বিশুদ্ধ ও পালনীয় বলে স্বীকার করে, মূসা আলাইহিস সালাম এর গ্রন্থ বলে কথিত ৫ টি গ্রন্থ, যিহোশূয়ের পুস্তক (The Book of Joshua) ও বিচারকর্ত্তৃগণের বিবরণ (The Book of Judges)। শমরীয়দের মধ্যে প্রচলিত তাওরাত’-এর এ ৭টি পুস্তকের বক্তব্য সাধারণ ইয়াহূদীদের মধ্যে প্রচলিত তাওরতের এ ৭টি পুস্তকের বক্তব্য থেকে ভিন্ন। আবার তাওরাতের শমরীয় সংস্করণ ও হিব্রু সংস্করনের সাথে এর গ্রীক সংস্করণের বক্তব্যের অনেক পার্থক্য রয়েছে। তাওরাতের গ্রীক সংস্করণের মধ্যে উপর্যুক্ত ৩৯টি পুস্তক ছাড়াও অতিরিক্ত ৭টি পুস্তক রয়েছে, যেগুলিকে প্রটেস্টান্টগণ জাল বা সন্দেহজনক পুস্তক (Apocrypha) বলে আখ্যায়িত করেন।[8] এ সাতটি গ্রন্থের নাম:

  1. বারুখের পুস্তক (The Book of Baruch)
  2. তোবিয়াসের পুস্তক (The Book of Tobias/Tobit)
  3. যুডিথের পুস্তক (The Book of Judith)
  4. উইসডম বা জ্ঞান পুস্তক (The Book of Wisdom/Wisdom of Solomon)
  5. যাজকগণ বা Ecclesiasticus (The Wisdom of Jesus the Son of Sirach)
  6. মাকাবিজের প্রথম পুস্তক (The First Book of Maccabees)
  7. মাকাবিজের দ্বিতীয় পুস্তক (The Second Book of Maccabees)

এভাবে আমরা দেখছি যে, গ্রীক তাওরাত বা ক্যাথলিক তাওরাতের পুস্তক সংখ্যা ৪৬।

১. ১. ২. নতুন নিয়মের গ্রন্থাবলি

আমরা বলেছি যে, খৃস্টধর্মের ধর্মগ্রন্থ পবিত্র বাইবেলের দ্বিতীয় অংশকে ‘‘নতুন নিয়ম’’ বলে আখ্যায়িত করা হয়। বর্তমানে এ অংশের মধ্যে নিম্নের ২৭টি পুস্তক বিদ্যমান:

  1. মথি লিখিত সুসমাচার[9] (The Gospel According To St. Matthew)
  2. মার্ক লিখিত সুসমাচার (The Gospel According To St. Mark)
  3. লূক লিখিত সুসমাচার (The Gospel According To St. Luke)
  4. যোহন লিখিত সুসমাচার (The Gospel According To St. John)

এই চারটি গ্রন্থকে ইঞ্জিল চতুষ্ঠয়বলা হয়। ইঞ্জিলশব্দটি এই চারটি গ্রন্থের জন্য শুধু প্রযোজ্য। ইঞ্জিল শব্দটি মূলত গ্রীক ভাষা থেকে আরবীকৃত শব্দ। গ্রীক (eu) অর্থ ভাল (good) এবং (aggelein) অর্থ ঘোষণা (announce), একত্রে (euaggelos) অর্থ সুসংবাদ ঘোষণা (bringing good news)। গ্রীক (euaggelion) শব্দের অর্থ (good news)। এ শব্দটি থেকে আরবী ইঞ্জিল শব্দ এবং ইংরেজী ইভাঞ্জেল (evangel ) শব্দটির উৎপত্তি। আর ইঞ্জিল বা ইভাঞ্জেল (evangel) বলতে এ চারটি পুস্তক বুঝানো হয়। তবে অনেক সময় রূপকভাবে নতুন নিয়মের সকল গ্রন্থকে একত্রে ইঞ্জিলবলা হয়। অর্থাৎ এ চারটি পুস্তক ও নিম্নের ২৩টি পুস্তকের সমষ্টিকে রূপকভাবে ইঞ্জিল বলা হয়:

  1. প্রেরিতদের কার্য্য-বিবরণ (The Acts of the Apostles)
  2. রোমীয়দের প্রতি প্রেরিত পৌলের পত্র (The Letter of Paul to the Romans/ The Epistle of Paul The Apostle to the Romans)
  3. করিন্থীয়দের প্রতি প্রেরিত পৌলের প্রথম পত্র (The First Epistle of Paul The Apostle to the Corinthians)
  4. করিন্থীয়দের প্রতি প্রেরিত পৌলের দ্বিতীয় পত্র (The Second Epistle of Paul The Apostle to the Corinthians)
  5. গালাতীয়দের প্রতি প্রেরিত পৌলের পত্র (The Epistle of Paul The Apostle to the Galatians)
  6. ইফিযীয়দের প্রতি প্রেরিত পৌলের পত্র (The Epistle of Paul The Apostle to the Ephesians)
  7. ফিলিপীয়দের প্রতি প্রেরিত পৌলের পত্র (The Epistle of Paul The Apostle to the Philippians)
  8. কলসীয়দের প্রতি প্রেরিত পৌলের পত্র (The Epistle of Paul The Apostle to the Colossians)
  9. থিষলনীকীয়দের প্রতি প্রেরিত পৌলের প্রথম পত্র (The First Epistle of Paul The Apostle to the Thessalonians)
  10. থিষলনীকীয়দের প্রতি প্রেরিত পৌলের দ্বিতীয় পত্র (The Second Epistle of Paul The Apostle to the Thessalonians)
  11. তীমথিয়ের প্রতি প্রেরিত পৌলের প্রথম পত্র (The First Epistle of Paul The Apostle to the Timothy)
  12. তীমথিয়ের প্রতি প্রেরিত পৌলের দ্বিতীয় পত্র (The Second Epistle of Paul The Apostle to Timothy)
  13. তীতের প্রতি প্রেরিত পৌলের পত্র (The Epistle of Paul to Titus)
  14. ফিলীমনের প্রতি প্রেরিত পৌলের পত্র (The Epistle of Paul to Philemon)
  15. ইব্রীয়দের প্রতি পৌলের পত্র (The Letter of Paul to the Hebrews) পত্রটি পৌলের লিখিত বলে কথিত।
  16. যাকোবের পত্র (The Letter of James/The General Epistle of James)
  17. পিতরের প্রথম পত্র (The First Epistle General of Peter)
  18. পিতরের দ্বিতীয় পত্র (The Second Epistle General of Peter)
  19. যোহনের প্রথম পত্র (The First Epistle General of John)
  20. যোহনের দ্বিতীয় পত্র (The Second Epistle General of John)
  21. যোহনের তৃতীয় পত্র (The Third Epistle of John)
  22. যিহূদার পত্র (The General Epistle of Jude)
  23. যোহনের নিকট প্রকাশিত বাক্য (The Revelation of St. John The Divine)[10]

এভাবে আমরা দেখছি যে, পুরাতন নিয়মের হিব্রু সংস্করণ বা প্রটেস্টান্ট বাইবেল (AV: Authorised Version/ KJV: King James Version) অনুসারে পবিত্র বাইবেলের পুস্তক সংখ্যা ৩৯+২৭= ৬৬। আর পুরাতন নিয়মের গ্রীক সংস্করণ বা রোমান ক্যাথলিক বাইবেল (RCV: Roman Catholic Version/ Douay) অনুসারে পবিত্র বাইবেলের পুস্তক সংখ্যা ৪৬+২৭=৭৩।

 

 

১. ১. ৩. গ্রন্থগুলির সংখ্যায় হেরফেরের ইতিহাস

৩২৫ খৃস্টাব্দে রোমান সাম্রাজ্যের পৌত্তলিক সম্রাট কন্সটান্টাইনের[11] (রাজত্ব: ৩২৩-৩৩৭ খৃ) সময়ে নিকীয়া (Nicaea) শহরে খৃস্টান বিশপ-যাজকদের প্রথম সাধারণ মহা-সম্মেলন (ecumenical council) অনুষ্ঠিত হয়। এ সম্মেলনের অন্যতম আলোচ্য বিষয় ছিল বাইবেলের সন্দেহভাজন গ্রন্থাবলি বা বাইবেল নামে প্রচলিত ‘‘জাল’’ পুস্তকগুলি সম্পর্কে পরামর্শ, মতবিনিময়, গবেষণা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা। সম্মেলনে উপস্থিত (তিনশতাধিক) বিশপ ও মহাযাজকগণ এ সকল গ্রন্থের বিষয়ে গবেষণা, আলোচনা ও বিশ্লেষণের পরে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন যে, ‘যুডিথের পুস্তক’ (The Book of Judith) বিশুদ্ধ গ্রন্থ হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। আর নিম্নের ১৪টি গ্রন্থ জাল বা সন্দেহজনক (Apocrypha) বলে বিবেচিত হবে, যেগুলিকে বাইবেলের পুস্তক বা ঐশী পুস্তক বলে কোনো অবস্থাতেই গ্রহণ করা যাবে না। এ জাল বা সন্দেহজনক পুস্তকগুলি নিম্নরূপ:

  1. ইস্টেরের বিবরণ (The Book of Esther)
  2. যাকোবের পত্র (The Letter of Jame)
  3. পিতরের দ্বিতীয় পত্র (The Second Epistle General of Peter)
  4. যোহনের দ্বিতীয় পত্র (The Second Epistle General of John)
  5. যোহনের তৃতীয় পত্র (The Third Epistle of John)
  6. যিহূদার পত্র (The General Epistle of Jude)
  7. ইব্রীয়দের প্রতি পত্র (The Letter of Paul to the Hebrews)
  8. উইসডম বা জ্ঞান পুস্তক (The Book of Wisdom/Wisdom of Solomon)
  9. তোবিয়াসের পুস্তক (The Book of Tobias/Tobit)
  10. বারুখের পুস্তক (The Book of Baruch)
  11. যাজকগণ বা Ecclesiasticus (The Wisdom of Jesus the Son of Sirach)
  12. মাকাবিজের প্রথম পুস্তক (The First Book of Maccabees)
  13. মাকাবিজের দ্বিতীয় পুস্তক (The Second Book of Maccabees)
  14. যোহনের নিকট প্রকাশিত বাক্য (The Revelation of St. John The Divine)

যুডিথের পুস্তক’ (The Book of Judith)-এর ভূমিকায় সেন্ট জীরোম (St. Jerome: ৩৪২-৪২০ খৃ)এর বক্তব্য থেকে অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে বিষয়টি জানা যায়।

এর মাত্র ৩৯ বৎসর পরে ৩৬৪ খৃস্টাব্দে লোডেসিয়ায় আরেকটি সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এই সম্মেলনে উপস্থিত ধর্মগুরুগণ উপর্যুক্ত ১৪টি জালপুস্তকের মধ্যে প্রথম ৭টিকে (১-৭ নং) বিশুদ্ধ বলে গ্রহণ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন, যেগুলিকে নিকীয় মহাসম্মেলনে জালবলে ঘোষণা করা হয়েছিল। এ সম্মেলনে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যে এগুলি জাল নয়, বরং বিশুদ্ধ। অবশিষ্ট ৭টি পুস্তককে (৮-১৪ নং) এ সম্মেলনেও জাল ও বাতিল বলে ঘোষণা করা হয়। তারা এ সিদ্ধান্ত একটি সাধারণ পত্রের মাধ্যমে প্রজ্ঞাপন করেন।

এর ৩৩ বৎসর পর ৩৯৭ খৃস্টাব্দে আরেকটি সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এই সম্মেলন কার্থেজসম্মেলন নামে পরিচিত। উপরের উভয় সম্মেলনে যে ৭টি পুস্তককে (৮-১৪ নং) জাল ও সন্দেহজনক বলে গণ্য করা হয় এ সম্মেলনে উপস্থিত ধর্মগুরুগণ সেগুলিকেও আইনসম্মত ও গ্রহণযোগ্য বলে গণ্য করেন। এভাবে উপরের ১৪টি জাল পুস্তকের সবগুলিকেই তারা বিশুদ্ধ ও নির্ভরযোগ্য ঐশ্বরিক গ্রন্থ এবং খৃস্টানদের জন্য অবশ্য মান্য ও পালনীয় বলে ঘোষণা করেন।

এভাবে এ ১৪টি পুস্তক সহ মোট ৭৩টি গ্রন্থ ‘‘পবিত্র বাইবেলের’’ অবিচ্ছেদ্য অংশ, ঐশ্বরিক ও অবশ্য পালনীয় ও অবশ্য মান্য ধর্মগ্রন্থ হিসেবে বিবেচিত হয় সুদীর্ঘ প্রায় ১২০০ বৎসর যাবত।[12]

এরপর খৃস্টীয় ১৬শ শতকের মাঝামাঝি প্রটেস্টান্ট সম্প্রদায়ের উদ্ভব ঘটে। তারা নিম্নের গ্রন্থগুলিকে বাতিল বলে প্রত্যাখ্যান করেন:

  1. বারুখের পুস্তক (The Book of Baruch)
  2. তোবিয়াসের পুস্তক (The Book of Tobias)
  3. যুডিথের পুস্তক (The Book of Judith)
  4. উইসডম বা জ্ঞান পুস্তক (The Book of Wisdom)
  5. যাজকগণ বা Ecclesiasticus (The Wisdom of Jesus the Son of Sirach)
  6. মাকাবিজের প্রথম পুস্তক (The First Book of Maccabees)
  7. মাকাবিজের দ্বিতীয় পুস্তক (The Second Book of Maccabees)

তারা বলেন যে, এই গ্রন্থগুলি জাল, অগ্রহণযোগ্য এবং বাতিল। এগুলিকে কোনোভাবেই বাইবেলের অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া যায় না। এছাড়া তারা ইস্টেরের বিবরণ’ (The Book of Esther)-এর কিছু অংশ বাতিল বলে গণ্য করেন এবং কিছু অংশ গ্রহণ করেন। এই গ্রন্থে ১৬টি অধ্যায় ছিল। তারা বলেন যে, প্রথম ৯ টি অধ্যায় এবং দশম অধ্যায়ের তিনটি শ্লোক সঠিক বলে স্বীকৃত। দশম অধ্যায়ের অবশিষ্ট ১০ শ্লোক ও বাকী ৬টি অধ্যায় বাতিল হিসেবে প্রত্যাখ্যাত। উপরের গ্রন্থগুলি বাতিল ও বানোয়াট বলে গণ্য করার ক্ষেত্রে তারা ৬ প্রকারের যুক্তি পেশ করেন:

  1. এই গ্রন্থগুলি মূলত হিব্রু, ক্যালিডিয় ইত্যাদি ভাষায় লেখা ছিল। সেসব ভাষায় লিখিত এ সকল গ্রন্থের মূল উৎসগুলি হারিয়ে গিয়েছে।
  2. ইয়াহূদীগণ এ সকল গ্রন্থকে ঐশী বা ঐশ্বরিক বলে মানেন না।
  3. সকল খৃস্টান গ্রন্থগুলি মেনে নেন নি।
  4. জীরোম ( Jerome) বলেছেন যে, ধর্মের বিধিবিধান বর্ণনা ও প্রমাণ করার জন্য এই গ্রন্থগুলি যথেষ্ট নয়।
  5. ক্লাউস বলেছেন যে, এ গ্রন্থগুলি সর্বত্র পঠিত হয় না।
  6. ৩য়-৪র্থ শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ খৃস্টান বিশপ ও ঐতিহাসিক ইউসেবিয়াস (Eusebius Pamphilus) তার Ecclesisatical History গ্রন্থে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে, এই গ্রন্থগুলি, বিশেষ করে মাকাবিজের দ্বিতীয় পুস্তক বিকৃত ও পরিবর্তিত হয়েছে।

এখানে লক্ষ্য করুন। তারা নিজেরাই নিজেদের ধর্মের পূর্ববর্তী প্রজন্মদের অধার্মিকতার স্বীকৃতি প্রদান করছে। তারা নিজেরাই স্বীকার করছে যে, যে সকল গ্রন্থের মূল উৎস হারিয়ে গিয়েছে এবং শুধু অনুবাদগুলি রয়েছে, যেগুলিকে ইয়াহূদীগণ তাদের ধর্মগ্রন্থ হিসেবে মানেন না, যেগুলির ঐশ্বরিক বা প্রেরণালব্ধ হওয়ার কোনো প্রমাণ নেই এবং এ সকল কারণে যে সকল পুস্তককে প্রথম প্রজন্মের খৃস্টানগণ জাল বা সন্দেহজনক বলে ঘোষণা করেছেন, সেগুলিকেই আবার পরবর্তী প্রজন্মের খৃস্টানগণ ঐশী বা আসমানী গ্রন্থ হিসেবে অবশ্য মান্য ও অবশ্য পালনীয় বলে ঘোষণা করেছেন। ক্যাথলিকগণ কার্থেজ সম্মেলনের সিদ্ধান্ত অনুসারে এখন পর্যন্ত এই গ্রন্থগুলিকে ঐশী ও ঐশ্বরিক হিসেবে মেনে থাকেন; যেগুলির মধ্যে পুরাতন নিয়মের ও নতুন নিয়মের জাল বা সন্দেহজনক পুস্তকগুলি রয়েছে।

যে পুস্তককে পূর্ববর্তীরা জাল বলেছেন তার গ্রহণযোগ্যতার বিষয়ে পরবর্তীদের সিদ্ধান্তের কীই বা মূল্য থাকতে পারে? বরং এ সকল সম্মেলনের সিদ্ধান্ত প্রমাণ করে যে, খৃস্টানদের ধর্মগ্রন্থগুলির অশুদ্ধতা ও অনির্ভরযোগ্যতার বিষয়ে বিরুদ্ধবাদিদের মতামতই সঠিক।

 

দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ

বাইবেলের পুস্তকগুলির অপ্রামাণ্যতা

পুরাতন এবং নতুন নিয়মের কোনো একটি গ্রন্থেরও অবিচ্ছিন্ন সূত্র (chain of authorities) ইয়াহূদী ও খৃস্টানগণের নিকট সংরক্ষিত নেই। আর এ সকল পুস্তক ঐশ্বরিক প্রেরণা বা প্রত্যাদেশ দ্বারা লিখিত হয়েছে বলে দাবি করার কোনো সুযোগ ইয়াহূদী-খৃস্টানগণের নেই।

কোনো গ্রন্থকে ওহী (Divine Inspiration)-এর মাধ্যমে প্রাপ্ত ঐশী, ঐশ্বরিক বা আসমানী গ্রন্থ হিসেবে স্বীকার করার পূর্ব শর্ত হলো:

প্রথমত, সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হতে হবে যে, গ্রন্থটি অমুক নবী বা ভাববাদীর মাধ্যমে লিখিত হয়েছে।

দ্বিতীয়ত, সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হতে হবে যে, উক্ত নবী যেভাবে গ্রন্থটি রেখে গিয়েছেন হুবহু সেভাবে কোনোরূপ পরিবর্তন, পরিবর্ধন বা বিকৃতি ব্যতীরেকেই অবিচ্ছিন্ন সূত্রে[13] গ্রন্থটি আমাদের নিকট পৌঁছেছে।

শুধু ধারণা বা অনুমানের উপর নির্ভর করে কোনো গ্রন্থকে কোনো ওহী বা প্রেরণা (Inspiration)-প্রাপ্ত ব্যক্তির নামে চালানো হলে বা লিখে দিলেই তা সে ব্যক্তির লেখা গ্রন্থ বলে প্রমাণিত বা স্বীকৃত হতে পারে না। অনুরূপভাবে কোনো এক বা একাধিক সম্প্রদায় বা গোষ্ঠি একটি গ্রন্থকে এরূপ কোনো নবী বা ভাববাদীর লেখা গ্রন্থ বলে দাবি করলেই তা তার লেখা বলে প্রমাণিত হয় না।

এরূপ অনেক গ্রন্থই অনেক নবীর নামে প্রচারিত, যেগুলি ইয়াহূদী খৃস্টানগণও সে সকল নবীর গ্রন্থ বলে স্বীকার করেন না। মূসা আলাইহিস সালাম, ইয্রা, যিশাইয়, যিরমিয়, হবক্কুক, সুলাইমান আলাইহিস সালাম প্রমুখ নবীর নামে অনেক পুস্তক পুরাতন নিয়মের অংশ হিসেবে লিখিত ও প্রচলিত হয়েছে যেগুলিকে ইয়াহূদী ও খৃস্টানগণ এ সকল নবীর লেখা পুস্তক বলে স্বীকার করেন না; কারণ এগুলির কোনো অবিচ্ছিন্ন সনদ নেই এবং কোনোভাবে প্রমাণিত হয় নি যে, এগুলি এ সকল নবীর লেখা। ইয়াহূদী-খৃস্টানগণই এগুলিকে জাল (Pseudepigrapha) বলে গণ্য করেন।

নতুন নিয়মের উপর্যুক্ত ২৭টি গ্রন্থ ছাড়াও ৭০টির অধিক গ্রন্থ খৃস্টানদের মধ্যে প্রচলিত ছিল, যেগুলি যীশু, মেরি, শিষ্যগণ বা তাদের শিষ্যদের নামে প্রচারিত ও প্রচলিত ছিল। আজকাল সকল খৃস্টান সম্প্রদায় একমত যে, এগুলি সবই বানোয়াট ও জাল (Pseudepigrapha/ Apocrypha)।

পাঠক দেখেছেন যে, ‘সন্দেহজনক’ (Apocrypha) গ্রন্থগুলি ক্যাথলিকদের নিকট অবশ্য মান্য ধর্মগ্রন্থ, কিন্তু ইয়াহূদী ও প্রটেস্টান্টদের নিকট অবশ্য পরিত্যাজ্য জালগ্রন্থ।

অবস্থা যখন এরূপ তখন কোনো একটি গ্রন্থকে কোনো একজন নবী বা শিষ্যের নামে প্রচার করলেই আমরা গ্রন্থটিকে সেই নবী বা শিষ্যের লেখা বা সংকলিত গ্রন্থ বলে মেনে নিতে পারি না। শুধু এইরূপ দাবির ভিত্তিতে কোনো গ্রন্থকে ঐশী বা ঐশ্বরিক বলে স্বীকার করা যায় না।

এজন্য গ্রন্থকার আল্লামা শাইখ রাহমাতুল্লাহ কিরানবী খৃস্টান সম্প্রদায়ের প্রাজ্ঞ জাঁদরেল পণ্ডিতদের নিকট বারংবার দাবি করেছেন যে, বাইবেলের যে কোনো একটি গ্রন্থের অবিচ্ছিন্ন সনদ বা সূত্র পেশ করুন। তারা সূত্র উল্লেখ করতে ব্যর্থ হয়েছেন। পাদরিগণের কেউ কেউ একথা বলে ওজরখাহি পেশ করেন যে, এ সকল গ্রন্থের সূত্র বা সনদ আমরা হারিয়ে ফেলেছি। খৃস্টধর্মের শুরু থেকে ৩১৩ বৎসর পর্যন্ত আমাদের উপর যে জুলুম-অত্যাচার হয়েছিল তার ফলে এই গ্রন্থগুলির সনদ বা সূত্র পরম্পরার বিবরণ আমাদের নিকট থেকে হারিয়ে গিয়েছে।

এভাবে প্রমাণিত যে, খৃস্টান পণ্ডিতগণ তাদের ধর্মীয় পুস্তকগুলির সনদ বা উৎস ও সূত্র বিষয়ে যা কিছু বলেন সবই ধারণা ও অনুমান মাত্র। এ  ছাড়া তাদের কোনো প্রকার সূত্র (chain of authorities) নেই। এভাবে নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত যে, তাদের গ্রন্থগুলির কোনো অবিচ্ছিন্ন সনদ তাদের নেই। এখানে তাদের কয়েকটি বইয়ের অবস্থা আলোচনা করছি।

১. ২. ১. তোরাহ বা তাওরাত (Torah or Pentateuch)

মোশি (মূসা আ.)-এর নামে প্রচারিত তাওরাহ বা তোরাহ-এর গ্রন্থগুলি মোশির নিজের লিখিত বা সংকলিত নয়। নিম্নের বিষয়গুলি তা প্রমাণ করে:

প্রথম বিষয়: দাউদ বংশের শাসক যোশিয়া বিন আমোন (Josiah, son of Amon) খৃস্টপূর্ব ৬৪১ সালের কাছাকাছি সময়ে ইয়াহূদী রাজ্যের (যুডাহ প্রদেশের) শাসনভার গ্রহণ করেন। তার রাজত্ব গ্রহণের পূর্বেই তাওরাত বিলীন ও বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল। তাওরাতের কোনোরূপ ব্যবহার বা প্রচলন ছিল না। তার রাজত্বের প্রথম ১৭ বৎসরে কেউ মোশির তোরাহ-এর কোনো পাণ্ডুলিপির চিহ্ন দেখেন নি বা এর কোনো কথাও কেউ শুনেন নি। তার সিংহাসনে আরোহণের ১৮ বৎসর পরে তাওরাতের যে কপিটি পাওয়া গিয়েছিল তা মোটেও নির্ভরযোগ্য ছিল না। যোশিয় রাজার রাজত্বের ১৮শ বৎসরে (খৃ. পূ. ৬২০/৬২১ সালে) হিল্কিয় মহাযাজক (Hilki’ah the high priest) দাবি করেন যে, তিনি সদাপ্রভুর গৃহে’, অর্থাৎ যিরূশালেমের ধর্মধাম বা শলোমনের মন্দিরের মধ্যে মোশির তোরাহ বা ব্যবস্থাপুস্তকখানি (the book of the law) পেয়েছেন। এ সকল বিষয় ২ রাজাবলির ২২ অধ্যায়ে এবং ২ বংশাবলির ৩৪ অধ্যায়ে বিস্তারিত বর্ণনা করা হয়েছে।[14]

তোরাহ বা ব্যবস্থা পুস্তকবলে কথিত এ পাণ্ডুলিপিটির নির্ভরযোগ্যতা ও বিশুদ্ধতা স্বীকৃত নয়। যাজক হিল্কিয়ের দাবিও গ্রহণযোগ্য নয়। বরং সামগ্রিক বিচারে সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত যে, এ পুস্তকটি বা তোরাহ’-এর এই পাণ্ডুলিপিটি পুরোটিই হিল্কিয় মহাযাজকের উদ্ভাবনা ও রচনা ছাড়া কিছুই নয়। এই প্রকৃত সত্যটিকে পাশ কাটিয়ে আমরা যদি ধরে নিই যে, হিল্কিয়ের এ পাণ্ডুলিপিটি সত্যই তাওরাতই ছিল তাহলেও কয়েক বছর পরে খৃস্টপূর্ব ৫৮৮ বা ৫৮৬ অব্দে[15] যখন ব্যবিলন সম্রাট নেবুকাদনেজার (Nebuchadnezzar) বা বখত নসর যেরুযালেম নগরী ও ইয়াহূদী রাজ্য ধ্বংস করে সকল ইয়াহূদীকে বন্দী করে ব্যবিলনে নিয়ে যান তখন এই অনির্ভরযোগ্য ও সূত্রবিহীন কপিটির প্রায় পুরোটুকুই হারিয়ে যায়। নেবুকাদনেজারের এ ঘটনার মধ্য দিয়ে তোরাহ ও পুরাতন নিয়মের পূর্বেকার সকল গ্রন্থ ভূপৃষ্ঠ থেকে একেবারেই বিলীন হয়ে যায়।

ইয়াহূদীরা দাবি করেন যে, প্রায় এক শতাব্দী পরে ইয্রা পুনরায় পুরাতন নিয়মের এ সকল গ্রন্থ নিজের পক্ষ থেকে লিখেন। প্রায় ৩০০ বৎসর পরে সিরিয়ার গ্রীক শাসক চতুর্থ এন্টিয়ক (Antiochus Epiphanes)-এর আক্রমনের সময় ইয্রার লেখা এ পাণ্ডুলিপিও বিনষ্ট হয়ে যায়।

চতুর্থ এন্টিয়ক খৃ. পূ. ১৭৫-১৬৩ সালের মধ্যে সিরিয়ার শাসক ছিলেন। তিনি ইয়াহূদী ধর্ম সম্পূর্ণ নির্মূল ও উচ্ছেদ করে ফিলিস্তিনে গ্রীক হেলেনীয় ধর্ম প্রতিষ্ঠা করার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি অর্থের বিনিময়ে ইয়াহূদী ধর্মযাজকদের পদ ক্রয় করে নেন। তিনি প্রায় ৮০ হাজার ইয়াহূদী হত্যা করেন, যেরুজালেম ধর্মালয়ের সকল সম্পদ লুণ্ঠন করেন এবং ইয়াহূদীদের বেদিতে শূকর জবাই করেন। তিনি ২০ হাজার সৈন্যকে যেরুজালেম অবরোধ করতে নির্দেশ দেন। শনিবার ইয়াহূদীরা যখন ধর্মালয়ে প্রার্থনার জন্য জমায়েত হয় তখন তার সৈন্যরা তাদের উপর আক্রমন চালায়, নারী, পুরুষ, শিশু নির্বিশেষে সকলকে হত্যা করে, সকল বাড়িঘর ধ্বংস করে অগ্নিসংযোগ করে। পাহাড়ে-গুহায় পলাতক কিছু ইয়াহূদী ছাড়া কেউই এ হত্যাযজ্ঞ থেকে রক্ষা পায় না। (এ গ্রন্থের —- পৃষ্ঠায় (খ) বিষয়টি দেখুন।)

দ্বিতীয় বিষয়: ইয়াহূদী ও খৃস্টান সম্প্রদায়ের প্রায় সকলেই বলেন যে, ইয্রা হগয় ভাববাদী ও ইদ্দোর পুত্র সখরিয়, এই দুইজন ভাবাবদীর সহায়তায় বংশাবলির প্রথম খণ্ড’ (The First Book of The Chronicles) ও বংশাবলির দ্বিতীয় খণ্ড’ (The Second Book of The Chronicles) গ্রন্থদ্বয় রচনা করেন। এই গ্রন্থদ্বয় মূলত এ তিন ভাববাদীর লেখা। অথচ এ দুই গ্রন্থের সাথে তোরাহ-এর বিবরণের ব্যাপক বৈপরীত্য রয়েছে। ইয়াহূদী-খৃস্টান পণ্ডিতগণ একমত যে, ইয্রা তাওরাতের অসম্পূর্ণ ও আংশিক কাগজপত্রের উপর নির্ভর করেছিলেন এজন্য পুত্র ও পৌত্রের মধ্যে পার্থক্য করতে পারেন নি। একথা তো স্পষ্ট যে, এই তিনজন ভাববাদী তাদের নিকট প্রচলিত তোরাহএর বর্ণনা অনুসরণ করে তাদের গ্রন্থ রচনা করেছিলেন। যদি মোশির (মূসা আ. এর) যে তোরাহ-এর উপর তাঁরা নির্ভর করেছিলেন আজকের প্রচলিত তোরাহ যদি সেই মোশির ‘তোরাহ’ই হতো, তাহলে কোনো মতেই এ তিন ভাববাদীর বর্ণনার সাথে তোরাহ-এর বর্ণনার বৈপরীত্য দেখা দিত না বা তারা কোনোভাবেই তোরাহ-এর বিরোধিতা করতেন না। আর যদি ইয্রার সময়ে মোশির তোরাহ-এর কোনো অস্তিত্ব থাকত তাহলে তিনি কখনোই তোরাহ বাদ দিয়ে অসম্পূর্ণ বংশতালিকার উপর নির্ভর করতেন না।

ইয়াহূদী-খৃস্টানগণ দাবি করেন যে, ইয্রা ওহী বা ইলহামের (Divine Inspiration) মাধ্যমে তোরাহ নতুন করে লিখেছিলেন। যদি বর্তমান প্রচলিত তোরাহ-ই ইয্রা লিখিত তোরাহ হতো তাহলে কখনোই ইয্রার লিখিত বিবরণের সাথে তোরাহ-এর বিবরণে বৈপরীত্য থাকতো না।

উপরের আলোচনা থেকে প্রমাণিত হলো যে, বর্তমানে বাইবেলের অন্তর্ভুক্ত তোরাহ (পুরাতন নিয়মের প্রথম ৫টি গ্রন্থ) মোশি বা মূসা আলাইহিস সালাম প্রদত্ত তোরাহ নয় এবং তা ইয্রা লিখিত তোরাহ-ও নয়। সত্য কথা হলো, তোরাহ (Torah or Pentateuch) নামে প্রচলিত এই গ্রন্থগুলি তৎকালে প্রচলিত বিভিন্ন গল্প, কাহিনী, বর্ণনা ইত্যাদির সংকলন মাত্র। ইয়াহূদী ধর্মগুরুগণ এ সকল প্রচলিত গল্প কাহিনী ইত্যাদি কোনো রকম বাছবিচার ও বাছাই ছাড়াই সংকলন করেছেন এবং ‘‘পুরাতন নিয়ম’’ নামক পুস্তক সংকলনের মধ্যে তা সংকলন করেছেন। তাওরাত ও পুরাতন নিয়মের বিষয়ে এ মতটি ইউরোপে এবং বিশেষত জার্মান পণ্ডিতদের মধ্যে অত্যন্ত প্রসিদ্ধ।

তৃতীয় বিষয়: যদি কেউ যিহিষ্কেল ভাববাদীর পুস্তকের ৪৫শ ও ৪৬শ অধ্যায়দ্বয়ের সাথে গণনা পুস্তকের ২৮শ ও ২৯শ অধ্যায়দ্বয়ের তুলনা করেন তাহলে দেখতে পাবেন যে, উভয়ের মধ্যে ঐশ্বরিক বিধানাদি বর্ণনার ক্ষেত্রে স্পষ্ট বৈপরীত্য রয়েছে। একথা স্পষ্ট যে, যিহিষ্কেল ভাববাদী নিজ গ্রন্থে লিখিত ঐশ্বরিক বিধানাদি বর্ণনার ক্ষেত্রে তার যুগে প্রচলিত তোরাহ’-এর উপর নির্ভর করেছিলেন। যদি বর্তমান যুগে প্রচলিত তোরাহ-ই তার যুগের তোরাহ হতো তাহলে কখনোই তিনি ঐশ্বরিক বিধানের বর্ণনায় তোরাহ-এর বিরোধিতা করতেন না।

চতুর্থ বিষয়: প্রচলিত তোরাহবা তাওরাতের একটি স্থান থেকেও বুঝা যায় না যে মোশি (মূসা) নিজে এই গ্রন্থের কথাগুলি লিখেছেন। বরং তোরাহ-এর ভাষা ও ভাব স্পষ্টরূপে প্রমাণিত করে যে, ‘অন্য কোনো ব্যক্তি এই গ্রন্থগুলি প্রণয়ন করেছেন। এই অন্যব্যক্তিইয়াহূদীদের মধ্যে প্রচলিত বিভিন্ন গল্প-কাহিনী ও বর্ণনাগুলি সংকলন করেছেন। সংকলক যে কথাটিকে ঈশ্বরের কথাবলে মনে করেছেন সে কথার বিষয়ে বলেছেন ঈশ্বর/ সদাপ্রভু বলেন। আর যে কথাকে মোশির কথা বলে মনে করেছেন সে কথার বিষয়ে বলেছেন: মোশি বলেন। সকল ক্ষেত্রে মোশিরজন্য নাম পুরুষবা তৃতীয় পুরুষব্যবহার করেছেন। যদি এ সকল গ্রন্থ মোশির নিজের প্রণীত হতো তাহলে তিনি তার নিজের ক্ষেত্রে উত্তম পুরুষব্যবহার করতেন। কিছু না হলেও অন্তত একটি স্থানে নিজের জন্য উত্তম পুরুষব্যবহার করতেন। কারণ উত্তম পুরুষব্যবহার পাঠক বা শ্রোতার অতিরিক্ত মনোযোগ আকর্ষণ করে।

এভাবে তোরাহ-এর গ্রন্থাবলী থেকে এ কথাটিই স্পষ্ট যে, এগুলি মোশি কতৃক সংকলিত বা প্রদত্ত নয়; বরং পরবর্তী যুগের কেউ এগুলি সংকলন করেছেন। এর বিপরীতে কোনো শক্তিশালী প্রমাণ উপস্থাপিত না হওয়া পর্যন্ত এই কথাটিই স্বীকৃত সত্য বলে গৃহীত হবে। কেউ যদি এর বিপরীত কোনো দাবি করেন তাহলে তাকে তার দাবি প্রমাণ করতে হবে।

পঞ্চম বিষয়: প্রখ্যাত নির্ভরযোগ্য খৃস্টান পণ্ডিত আলেকজান্ডার কীথ নতুন বাইবেলের ভূমিকায় লিখেছেন: ‘‘বিভিন্ন প্রমাণের মাধ্যমে তিনটি বিষয় নিশ্চিতরূপে প্রমাণিত হয়েছে:

(ক) প্রচলিত তোরাহ মোশির রচিত নয়।

(খ) তোরাহ-এর গ্রন্থগুলি ইয়াহূদীদের কেনানে (সিরিয়ায়) আগমনের পরে বা যেরুজালেমে আগমণের পরে লেখা হয়েছে। অর্থাৎ মোশির সময়ে, যখন ইস্রাঈল সন্তানগণ মরুভূমিতে অবস্থান করছিলেন তখন লেখা হয়নি।

(গ) প্রচলিত তাওরাত সুলাইমান আলাইহিস সালাম-এর যুগে, অর্থাৎ খৃ. পূ. ১০ শতাব্দীতে, অথবা এর পরে খৃস্টপূর্ব অষ্টম শতাব্দীর দিকে লিখিত হয়েছে। মূল কথা হলো, প্রচলিত তোরাহ-এর গ্রন্থগুলি মোশির মৃত্যুর ৫০০ বৎসরেরও বেশি পরে লেখা হয়েছে।

ষষ্ঠ বিষয়: বাস্তব অভিজ্ঞতার আলোকে এ কথা অবিসংবাদিত সত্য যে, একই ভাষার শব্দভাণ্ডার ও বাচনভঙ্গিতে যুগের আবর্তনে পরিবর্তন ঘটে। ৪০০ বৎসর আগের ইংরেজির সাথে বর্তমান সময়ের ইংরেজির তুলনা করলেই উভয় ইংরেজির মধ্যে ব্যাপক পার্থক্য ধরা পড়বে। এ বিষয়ে প্রসিদ্ধ খৃস্টান পণ্ডিত নর্টন বলেন: ‘‘তোরাহ বা পুরাতন নিয়মের প্রথম পাঁচটি গ্রন্থের ভাষার ব্যবহার বা বাচনভঙ্গি এবং পুরাতন নিয়মের অবশিষ্ট গ্রন্থগুলি, যেগুলি ইস্রাঈল সন্তানদের ব্যবিলনের বন্দিদশা থেকে মুক্তির পরে লেখা সেগুলির ভাষার ব্যবহার বা বাচনভঙ্গির মধ্যে কোনো গ্রহণযোগ্য পার্থক্য নেই। অথচ মোশির যুগ এবং মুক্তি পরবর্তী যুগ এই দুই যুগের মধ্যে ৯০০ বৎসরের ব্যবধান। যেহেতু তোরাহ-এর ভাষা ও পরবর্তী গ্রন্থগুলির ভাষার মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই সেহেতু হিব্রু ভাষায় পরিপূর্ণ বুৎপত্তি সম্পন্ন শ্রদ্ধেয় পণ্ডিত লিউসডিন মনে করেন যে, এ সকল গ্রন্থ সবই একই যুগে লেখা হয়েছে।

সপ্তম বিষয়: দ্বিতীয় বিবরণের ২৭ অধ্যায়ের ৫, ৮ শ্লোকে বলা হয়েছে: ‘‘৫ আর সে স্থানে তুমি আপন ঈশ্বর সদাপ্রভুর উদ্দেশ্যে এক যজ্ঞবেদি, প্রস্তরের এক বেদি গাঁথিবে, তাহার উপরে লৌহাস্ত্র তুলিবে না।… ৮ আর সেই প্রস্তরের উপরে এই ব্যবস্থার সমস্ত বাক্য অতি স্পষ্টরূপে লিখিবে।’’

যিহোশূয়ের পুস্তকের অষ্টম অধ্যায়ের ৩০, ৩৩ শ্লোকে বলা হয়েছে যে, মোশি যেভাবে আদেশ করেছিলেন সেভাবে যিহোশূয় যজ্ঞবেদি নির্মাণ করেন এবং সেই বেদির উপরে তাওরাত লিখে রাখেন: ‘‘তৎকালে যিহোশূয় এবল পর্বতে ইস্রায়েলের ঈশ্বর সদাপ্রভুর উদ্দেশ্যে এক যজ্ঞবেদি নির্মাণ করিলেন। সদাপ্রভুর দাস মোশি ইস্রায়েল-সন্তানদেরকে যেমন আজ্ঞা করিয়াছিলেন, তেমনি তাহারা মোশির ব্যবস্থাগ্রন্থে লিখিত আদেশানুসারে অতক্ষিত প্রস্তরে, যাহার উপরে কেহ লৌহ উঠায় নাই, এমন প্রস্তরে ঐ যজ্ঞবেদি নির্মাণ করিল।…। আর তথায় প্রস্তরগুলির উপরে ইস্রায়েল-সন্তানগণের সম্মুখে তিনি মোশির লিখিত ব্যবস্থার এক অনুলিপি লিখিলেন।’’[16]

উপরের বিবরণ থেকে জানা গেল যে, মোশির উপর অবতীর্ণ বা মোশি লিখিত তাওরাত বা তোরাহ-এর আকৃতি ও পরিমাণ এমন ছিল যে, একটি যজ্ঞবেদির পাথরে তা পুরোপুরি লিখে রাখা যেত। তোরাহ বলতে যদি বর্তমানে প্রচলিত বিশালাকৃতির ৫টি গ্রন্থ বুঝানো হতো তাহলে কোনো অবস্থাতেই তা সম্ভব হতো না।

অষ্টম বিষয়: প্রচলিত তোরাহ-এর মধ্যে অনেক ভুল রয়েছে। আবার তোরাহ-এর পুস্তকগুলির একটির সাথে আরেকটির বর্ণনার বৈপরীত্য রয়েছে। এদ্বারা প্রমাণিত হয় যে, এগুলি কখনোই মূসা আলাইহিস সালাম-এর তাওরাত নয়। ওহীর মাধ্যমে পাওয়া মোশির (মূসা আ.) কথায় এই ধরনের ভুল থাকতে পারে না।

১. ২. ২. যিহোশূয়ের পুস্তক (The Book of Joshua)

উপরের আলোচনা থেকে পাঠক ইস্রায়েলী ধর্মের মূল ভিত্তি তাওরাত (Torah or Pentateuch) -এর অবস্থা জানতে পারলেন। এখন আমরা তাওরাতের পরেই যে গ্রন্থের স্থান সেই যিহোশূয়ের পুস্তক’-এর অবস্থা আলোচনা করব। প্রথমেই যে কথা উল্লেখ করা দরকার তা হলো, এখন পর্যন্ত ইয়াহূদী-খৃস্টানগণ নিশ্চিতরূপে জানেন না যে, গ্রন্থটির লেখক কে এবং কোন্ যুগে তা লেখা হয়েছে। এই গ্রন্থটির বিষয়ে তাদের পাঁচটি মত রয়েছে:

  1. কেউ কেউ বলেন, গ্রন্থটি (মোশির শিষ্য) যিহোশূয়ের লিখিত।
  2. কেউ কেউ বলেন, গ্রন্থটি (হারোণের পৌত্র) পীনহস কর্তৃক লিখিত।
  3. কেউ কেউ বলেন, গ্রন্থটি (হারোণের পুত্র, পীনহসের পিতা) ইলিয়াসর কর্তৃক প্রণীত।[17]
  4. কেউ কেউ বলেন, গ্রন্থটি শমূয়েল কর্তৃক রচিত।
  5. কেউ কেউ বলেন, গ্রন্থটি যিরমিয় কর্তৃক রচিত।

উল্লেখ্য যে, যিহোশূয় এবং যিরমিয়র মধ্যে সময়ের ব্যবধান হলো কমবেশি প্রায় ৮৫০ বৎসর।[18] তাদের নিজেদের ধর্মের মূল ধর্মগ্রন্থের লেখকের বিষয়ে এ ব্যাপক মতভেদ পূর্ণরূপে প্রমাণ করে যে, গ্রন্থটির লেখক সম্পর্কে তাদের নিকট কোনো সূত্র নেই। প্রত্যেক গবেষক তার নিজের ধারণা ও অনুমানের উপর নির্ভর করে মতামত প্রকাশ করেছেন। প্রত্যেকে পারিপার্শ্বিক কিছু নির্দেশনার উপর নির্ভর করে সম্পূর্ণ আন্দাজে ঢিল ছুড়ে বলেছেন যে, অমুকই বোধহয় এই গ্রন্থের লেখক। এ আন্দাজই তাদের একমাত্র সনদ বা সূত্র।

যিহোশূয়ের পুস্তকের মধ্যে কিছু শ্লোক ও অনুচ্ছেদ রয়েছে যেগুলি কখনোই যিহোশূয়ের বক্তব্য বা তাঁর নিজের লেখা হতে পারে না। অনুরূপভাবে এ পুস্তকের মধ্যে এমন কিছু অনুচ্ছেদ বিদ্যমান যেগুলি দাউদ আলাইহিস সালাম-এর সমসাময়িক কোনো ব্যক্তির লেখা বলে প্রমাণিত। এ সকল অনুচ্ছেদ সুনিশ্চিতভাবে প্রমাণ করে যে, এ গ্রন্থটি কখনোই যিহোশূয়ের লেখা নয়।

প্রচলিত তাওরাতের কিছু বর্ণনা ও বিধানের সাথে যিহোশূয়ের পুস্তকের কিছু বর্ণনা ও বিধানের সুস্পষ্ট বৈপরীত্য ও সংঘর্ষ রয়েছে। ইয়াহূদী-খৃস্টানদের দাবি অনুসারে যদি প্রচলিত তোরাহ মোশির রচিত হতো অথবা যিহোশূয়ের পুস্তকটি তার নিজের রচনা হতো তাহলে কখনোই মোশির শিষ্য যিহোশূয় মোশির তাওরাতের বিরোধিতা করতেন না এবং তার নিজের উপস্থিতিতে মোশি যে সিদ্ধান্ত প্রদান করেছেন তা পাল্টে দিতেন না।

উপরের আলোচনা থেকে পাঠক পুরাতন নিয়মের মূল ৬টি গ্রন্থ- তাওরাত ও যিহোশূয়ের পু্স্তকের অবস্থা জানতে পেরেছেন। পুরাতন নিয়মের অবশিষ্ট ৩৩টি বা ৪০টি পুস্তকের অবস্থা এ ছয়টি পুস্তকের চেয়ে মোটেও ভাল নয়। এগুলির লেখকদের নাম, পরিচয় ও সংকলনের সময়কালের বিষয়ে ইয়াহূদী-খৃস্টান গবেষকদের মতভেদ আরো বেশি ব্যাপক। অনেক গবেষক পুরাতন নিয়মের অনেকগুলি পুস্তক পুরাতন নিয়মের অংশ নয় বলে উল্লেখ করেছেন এবং এগুলিকে একেবারেই বাতিল ও কল্পকাহিনী বলে গণ্য করেছেন। তারা দাবি করেছেন যে, প্রাচীন ইয়াহূদীগণ অনেক জাল কাহিনী ও জাল পুস্তক ধর্মগ্রন্থের মধ্যে সংযুক্ত করেছেন, যেগুলি মূলত বাতিল ও প্রত্যাখ্যাত।

এগুলি সবই সুনিশ্চিতভাবে প্রমাণ করে যে, ইয়াহূদী-খৃস্টানগণের নিকট বাইবেলের কোনো গ্রন্থেরই অবিচ্ছিন্ন সূত্র পরম্পরা নেই। তারা যা কিছু বলেন সবই আন্দাজ ও কল্পনা মাত্র। আর কোনো গ্রন্থকে কোনো নবী, ভাববাদী বা ইলহামপ্রাপ্ত ব্যক্তির নামে প্রচার করলেই তা ঐশ্বরিক বা ঐশী গ্রন্থরূপে স্বীকৃত হয় না, বরং গ্রন্থটি সত্যই উক্ত ব্যক্তি লিখেছেন বলে সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে হয়।

১. ২. ৩. ইঞ্জিল বা সুসমাচারগুলির সূত্র পর্যালোচনা

১. ২. ৩. ১. মথিলিখিত সুসমাচার

সকল প্রাচীন খৃস্টান ধর্মবেত্তা পণ্ডিত ও অগণিত আধুনিক খৃস্টান পণ্ডিত একমত যে, মথিলিখিত সুসমাচারটি মূলত হিব্রু ভাষায় লেখা ছিল। খৃস্টান সম্প্রদায়গুলির বিকৃতির কারণে এবং প্রথম তিন শতাব্দীর সমস্যাদির কারণে মূল হিব্রু গ্রন্থটি হারিয়ে গিয়েছে। বর্তমানে প্রচলিত হিব্রু সংস্করণ গ্রন্থটির গ্রীক অনুবাদের অনুবাদ। বস্তুত সুসমাচারটির গ্রীক অনুবাদই গ্রন্থটির প্রাচীনতম সূত্র হিসেবে বিদ্যমান। এই গ্রীক অনুবাদটিরও কোনো সূত্র পরম্পরা তাদের নিকট নেই। এমনকি, এখন পর্যন্ত নিশ্চিতরূপে জানা যায়নি যে, এই গ্রীক অনুবাদটির অনুবাদক কে? প্রাচীন খৃস্টান ধর্মবেত্তা পণ্ডিত জীরোম (St. Jerome: ৩৪২-৪২০ খৃ) তা স্বীকার করেছেন। অনুবাদকের নামই যখন জানা যায়নি, তখন অনুবাদকের সততা, বিশ্বস্ততা ইত্যাদি অবস্থা জানার আর সুযোগ কোথায়!?

খৃস্টান ধর্মগুরু পণ্ডিতগণ সম্পূর্ণ আন্দাজে ঢিল ছুড়ে বলেন যে, সম্ভবত অমুক বা তমুক হয়ত অনুবাদ করেছিলেন। এরূপ প্রমাণবিহীন আন্দাজ ও অনুমানের উপর নির্ভর করে কোনো পুস্তকের লেখকের নামও নির্ধারণ করা যায় না।

মথির নামে প্রচলিত ইঞ্জিলই প্রথম এবং প্রাচীনতন ইঞ্জিল। এ ইঞ্জিলটির বিষয়ে পঞ্চাশেরও অধিক খৃস্টান গবেষক পণ্ডিত সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে, যীশুর শিষ্য মথি এর লেখক নন। নতুন নিয়মের সকল পুস্তক ও পত্র গ্রীক ভাষায় লেখা হয়েছে। কেবলমাত্র মথির ইঞ্জিল ও ইব্রীয়দের প্রতি পত্র। অগণিত অকাট্য ও দ্ব্যর্থহীন প্রমাণের আলোকে সুনিশ্চিতভাবে প্রমাণিত যে এ দুটি পুস্তক হিব্রু ভাষায় লেখা হয়েছে। সুসমাচার লেখকগণের মধ্যে একমাত্র মথিই তার সুসমাচার হিব্রু ভাষায় লিখেন। ফিলিস্তিনের হিব্রুভাষী ইয়াহূদীদের উদ্দেশ্যে এ সুসমাচারটি লেখা হয়, যারা ইব্রাহীম ও দাউদের বংশের একজন ত্রানকর্তার অপেক্ষা করছিলেন। এরপর বিভিন্ন অনুবাদক প্রত্যেকে নিজ নিজ বুঝ ও সাধ্য অনুসারের সুসমাচারটি অনুবাদ করেন। মথি নিজে তার সুসমাচারটি গ্রীক ভাষায় অনুবাদ করেন নি। প্রচলিত গ্রীক সুসমাচারটির অনুবাদক কে বা তার পরিচয় কি তা কেউই জানেন না। অন্যান্য সুসমাচার গ্রীক ভাষায় লেখা হয়েছে। কেউ যদি বলেন যে, মথি তার সুসমাচারটি গ্রীক ভাষায় লিখেছিলেন তাহলে তিনি ভুল ও অসত্য বলবেন।

পণ্ডিত ও গবেষক নর্টন একটি বৃহদাকার পুস্তক রচনা করেছেন। এ পুস্তকে তিনি প্রমাণ করেছেন যে, প্রচলিত তোরাহ নিঃসন্দেহে ও নিশ্চিতরূপে জাল ও বানোয়াট। এগুলি কখনোই মোশির রচনা নয়। তিনি নতুন নিয়ম বা সুসমাচারের পুস্তকগুলির মূল অস্তিত্ব স্বীকার করেছেন। তবে সেগুলির মধ্যে অনেক বিকৃতি রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেছেন।

তিনি এ পুস্তকে লিখেছেন, তিনি বিশ্বাস করেন যে, মথি তাঁর সুসমাচারটি হিব্রু ভাষায় লিখেছিলেন। কারণ প্রাচীন যে সকল পণ্ডিত বিষয়টি আলোচনা করেছেন তাঁদের সকলেই ঐকমত্যের সাথে এই একই কথা বলেছেন। সকলেই একবাক্যে স্বীকার করেছেন যে, মথি হিব্রু ভাষায় সুসমাচার লিখেন। কেনো একজন প্রাচীন পণ্ডিতও তাঁদের বিপরীত কিছু বলেন নি। তাঁদের এ সাক্ষ্যের বিপরীতে একটি আপত্তিও পাওয়া যায় নি যে কারণে এ বিষয়ে কোনো গবেষণা বা পর্যালোচনার প্রয়োজন হতে পারে। এটি অত্যন্ত বড় সাক্ষ্য ও শক্তিশালী প্রমাণ। উপরন্তু প্রাচীন ধর্মগুরু ও পণ্ডিতগণ সাক্ষ্য দিয়েছেন যে, সেন্ট জিরোমের যুগ পর্যন্ত (মৃত্যু ৪২০ খৃ) মথির লিখিত হিব্রু সুসমাচারটি ইব্রীয় খৃস্টান বা ইয়াহূদী ধর্ম থেকে আগত খৃস্টানদের মধ্যে প্রচলিত ছিল। প্রচলিত মথিলিখিত সুসমাচারটি হারিয়ে যাওয়া মূল হিব্রু সুসমাচারটির অনুবাদ, তবে অনুবাদকের নাম, পরিচয় বা অন্য কোনো কিছুই নিশ্চিতভাবে জানা যায় না।

প্রচলিত মথিলিখিত সুসমাচারের বর্ণনাভঙ্গি ও উপস্থাপনা প্রাচীন পণ্ডিতগণের বক্তব্য প্রমাণ করে। পুস্তকটির উপস্থাপনা ও বর্ণনা পদ্ধতি থেকে বুঝা যায় যে, পুস্তকটি মথির নিজের রচিত নয়। কারণ মথি যীশুর প্রেরিত ১২ শিষ্যের একজন ছিলেন। খৃস্টের অধিকাংশ অবস্থা ও ঘটনা তিনি নিজে প্রত্যক্ষ করেছেন। তিনি নিজে যদি এই সুসমাচারটি লিখতেন তবে পুস্তকটির কোথাও না কোথাও তাঁর উপস্থাপনা থেকে প্রকাশ পেত যে, তিনি তাঁর নিজে দেখা ঘটনাগুলি লিখছেন। এছাড়া তিনি নিজের কথা বলতে অবশ্যই উত্তম পুরুষের সর্বনাম ব্যবহার করতেন। প্রাচীন যুগ থেকে আজ পর্যন্ত লেখকগণ এভাবেই লিখেন। এভাবে প্রচলিত মথিলিখিত সুসমাচারের ভাষা ও বর্ণনাভঙ্গি নিশ্চিতরূপে প্রমাণ করে যে, গ্রন্থটি মথির নিজের লেখা নয়।

মানিকীয (Manichees) সম্প্রদায়ের চতুর্থ শতাব্দীর অস্ট্রীয় পণ্ডিত ফাস্টিস বলেন, মথির নামে প্রচলিত সুসমাচারটি তাঁর রচিত নয়।

মারসিওনের (Marcion) অনুসারিগণ এবং এবোনাইট (Ebionites) সম্প্রদায়ের মতে প্রচলিত গ্রন্থটির প্রথম দুটি অধ্যায় জাল ও সংযোজিত। ইউনিট্যারিয়ান (একত্ববাদী) খৃস্টান সম্প্রদায় এবং পাদ্রী উইলিয়ামসও অধ্যায় দুটি প্রত্যাখ্যান করেছেন। নর্টন এ দুটি অধ্যায় এবং এ সুসমাচারের অধিকাংশ বক্তব্য অনির্ভরযোগ্য বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন।

১. ২. ৩. ২. মার্কলিখিত সুসমাচার

৪র্থ-৫ম শতাব্দীর প্রসিদ্ধতম খৃস্টান পণ্ডিত সেন্ট জীরোম লিখেছেন যে, কোনো কোনো প্রাচীন ধর্মগুরু পণ্ডিত মার্কলিখিত সুসমাচারের শেষ অধ্যায়ের (১৬ অধ্যায়ের) বিষয়ে সন্দেহ পোষণ করতেন। কোনো কোনো প্রাচীন পণ্ডিত ধর্মগুরু লূকলিখিত সুসমাচারের ২২ অধ্যায়ের কিছু শ্লোকের ব্যাপারে সন্দেহ পোষণ করতেন। কতিপয় প্রাচীন ধর্মগুরু পণ্ডিত এই সুসমাচারের প্রথম দুইটি অধ্যায়ের বিষয়ে সন্দেহ পোষণ করতেন। মারসিওনীয় সম্প্রদায়ের খৃস্টানগণের নিকট সংরক্ষিত বাইবেলে লুকলিখিত সুসমাচারে এই অধ্যায় দুটি নেই।

গবেষক পণ্ডিত নর্টন মার্কলিখিত সুসমাচারের বিষয়ে লিখেছেন যে, এ সুসমাচারের ১৬শ অধ্যায়ের ৯ শ্লোক থেকে শেষ (২০ শ্লোক) পর্যন্ত অংশটুকু জাল ও পরবর্তীকালে সংযোজিত।[19] তিনি আরো উল্লেখ করেছেন যে, বাইবেল লেখক ও লিপিকারগণ কোনো কথাকে গ্রন্থ থেকে বের করার চেয়ে ভিতরে ঢুকিয়ে দিতেই বেশি পারঙ্গম ও অধিক আগ্রহী ছিলেন।

১. ২. ৩. ৩. যোহনলিখিত সুসমাচার

কোনো পূর্ণ সূত্র পরম্পরার মাধ্যমে প্রমাণিত হয়নি যে, এই সুসমাচারটি যীশুর শিষ্য যোহন কর্তৃক রচিত। বরং বিভিন্ন বিষয় প্রমাণ করে যে, এ সুসমাচারটি যীশুর শিষ্য যোহনের লেখা নয়:

প্রথম বিষয়: যোহনলিখিত সুসমাচার পাঠ করে মোটেও বুঝা যায় না যে যীশুর শিষ্য যোহন নিজের চোখে দেখে সে সকল বিষয় লিখছেন। বরং বাহ্যত বুঝা যায় যে, পরবর্তী কোনো ব্যক্তি এগুলির বর্ণনা করছেন। উপরন্তু এ সুসমাচারের বক্তব্য প্রমাণ করে যে, গ্রন্থটি নিঃসন্দেহে অন্য কেউ, যীশু শিষ্য যোহন নন। যোহনলিখিত সুসমাচারের শেষে, ২১ অধ্যায়ের ২৪ শ্লোকটি নিম্নরূপ: ‘‘সেই শিষ্যই এই সকল বিষয়ে সাক্ষ্য দিতেছেন এবং এই সকল বিষয় লিখিয়াছেন; আর আমরা জানি, তাঁহার সাক্ষ্য সত্য।’’

এখানে আমরা দেখছি যে, সুসমাচারের লেখক শিষ্য যোহনের বিষয়ে বলছেন: সেই শিষ্যই এই সকল বিষয়ে সাক্ষ্য দিতেছেন’, ‘তাঁহার সাক্ষ্য’, ইত্যাদি। এভাবে তিনি যোহনের জন্য নাম পুরুষে সর্বনাম ব্যবহার করছেন। পক্ষান্তরে লেখক তার নিজের জন্য উত্তম পুরুষের সর্বনাম ব্যবহার করে বলছেন: আমরা জানি[20]। এথেকে স্পষ্টতই জানা যায় যে, এই সুসমাচারের লেখক যোহন ছাড়া অন্য কেউ।

দ্বিতীয় বিষয়: দ্বিতীয় খৃস্টীয় শতকে অনেকেই এই সুসমাচারটিকেঅস্বীকার করেন এবং বলেন যে, এটি যোহনের লিখিত নয়। এ সময়ে আরিনূস (১৩০-২০০খৃ)[21] জীবিত ছিলেন। আরিনূস ছিলেন পোলিকার্পের (St. Polycarp, Bishop of Smyrna c. 69-155) শিষ্য। আর পোলিকার্প ছিলেন যীশু-শিষ্য যোহনের শিষ্য। যখন মানুষেরা যোহনের নামে প্রচারিত এই সুসমাচারটি অস্বীকার করছিলেন তখন তিনি একটিবারের জন্যও বলেন নি যে, আমি আমার গুরু পোলিকার্পকে বলতে শুনেছি যে, এই সুসমাচারটি তার গুরু যোহনের রচিত।

একথা নিঃসন্দেহে বলা যায় যে, যীশু শিষ্য যোহন যদি কোনো সুসমাচারলিখে থাকতেন তাহলে তার শিষ্য পোলিকার্প তা জানতেন এবং আরিনূসকে বলতেন।

আরিনূস মৌখিক বর্ণনা মুখস্থ করতে অতীব আগ্রহী ছিলেন। তিনি পোলিকার্প থেকে অনেক গুরুত্বহীন বিষয় মুখস্ত ও বর্ণনা করেছেন। একথা কল্পনা করা যায় না যে, আরিনূস তার গুরু পোলিকার্প থেকে বিভিন্ন অতি সাধারণ বিষয় বারংবার শুনবেন এবং উদ্ধৃত করবেন, অথচ সুসমাচার-এর মত এত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় একটিবারও শুনবেন না বা শুনলেও তা বলবেন না, এমনকি বিতর্ক ও সংঘাতের মধ্যেও সে বিষয়ে কিছু বলবেন না।

সর্বোপরি আরিনূসই সর্বপ্রথম ২০০ খৃস্টাব্দের দিকে প্রথম তিনটি সুসমাচার: মথি, মার্ক ও লূকের সুসমাচারের কথা উল্লেখ করেন। তার বক্তব্য থেকেই সর্বপ্রথম এ তিনটি পুস্তকের অস্তিত্বের কথা জানা যায়। কিন্তু তিনি যোহনের সুসমাচারের কথা উল্লেখ করেন নি। এরপর ২১৬ খৃস্টাব্দে ক্লিমেন্ট ইসকাদ্রিয়ানূস (Clement of Alexandira) এ তিনটি গসপেলের কথা উল্লেখ করেছেন। তিনিই প্রথম যোহন লিখিত সুসমাচারের কথা উল্লেখ করেন। যারা বিশ্বাস বা দাবি করেন যে, এ গ্রন্থটি যীশু শিষ্য যোহনের লেখা তারা তাদের মতের পক্ষে একটিও প্রমাণ পেশ করতে পারেন নি, এমনকি আরিনূসের বক্তব্যে তাদের মতের সমর্থন পাওয়া যায় নি।

তৃতীয় বিষয়: শুধু মুসলিম পণ্ডিতগণই নয়, প্রাচীনকাল থেকেই অনেক খৃস্টান ও অখৃস্টান পণ্ডিত বলেছেন যে, এ সুসমাচারটি যোহনের লিখিত নয়। কয়েকটি নমুনা দেখুন:

(১) দ্বিতীয় খৃস্টীয় শতকের একজন প্রসিদ্ধ পৌত্তলিক পণ্ডিত ছিলেন সেলসাস (Celsus)।[22] তিনি সেই সময়েই চিৎকার করে বলতেন যে, খৃস্টানগণ তাদের ইঞ্জিলগুলি তিনবার বা চারবার বা তারও বেশিবার কঠিনভাবে পরিবর্তন করেছে, এমনকি সেগুলির বিষয়বস্তুও পরিবর্তিত হয়ে গিয়েছে।

(২) মানীকীয’ (Manichees/Manichaeism) সম্প্রদায়ের অস্ট্রীয় পণ্ডিত ফাস্টিস চতুর্থ শতকে চিৎকার করে ঘোষণা করেছেন: ‘‘একথা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত যে, নতুন নিয়ম যীশু খৃস্ট লিখেন নি এবং তার শিষ্যগণও লিখেন নি। বরং কোনো অজ্ঞাতনামা ব্যক্তি তা লিখেছে এবং সেগুলিকে যীশুর শিষ্যগণ এবং তাদের সহচরদের নামে চালিয়েছে। কারণ সে ভয় পেয়েছিল যে, যেহেতু যীশু সময়কালীন যে সকল ঘটনা সে লিখেছে সেগুলি সে প্রত্যক্ষ করেনি এজন্য মানুষেরা তার লেখা গ্রন্থ গ্রহণ করবে না। এই জালিয়াতি কর্মের মাধ্যমে সে যীশুর অনুসারীদেরকে অত্যন্ত কঠিনভাবে কষ্ট দিয়েছে। কারণ সে অগণিত ভুল ও বৈপরীত্যে ভরা কিছু বই লিখেছে।’’

(৩) ইস্টাডলিন লিখেছেন যে, ‘‘এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, আলেকজেন্দ্রীয় স্কুলের একজন ছাত্র যোহনলিখিত সুসমাচারটি লিখেছে।’’

(৪) পণ্ডিত ব্রিটিশনিডার বলেছেন: ‘‘এই সুসমাচারটির কোনো কিছু এবং যোহনের নামে প্রচলিত পত্রগুলি যোহনের নিজের রচিত নয়; বরং দ্বিতীয় শতকের শুরুতে কোনো একজন তা রচনা করেছে।’’

(৫) প্রসিদ্ধ পণ্ডিত ক্রোটিস বলেছেন: ‘‘এই সুসমাচারটি ছিল ২০ অধ্যায়। যোহনের মৃত্যুর পরে অফসিস চার্চের পক্ষ থেকে এতে ২১ অধ্যায়টি সংযুক্ত করা হয়।’’

(৬) দ্বিতীয় শতকে বিদ্যমান এ্যলোগিননামক খৃস্টীয় সম্প্রদায় এই সুসমাচারটি এবং যোহনের নামে প্রচালিত পত্রগুলি মানতেন না এবং এগুলিকে বাইবেলের অংশ মনে করতেন না।

বাইবেল বিশেষজ্ঞ পণ্ডিত হর্ণ-এর বক্তব্য দিয়ে এ আলোচনা শেষ করছি। তিনি তার রচিত বাইবেলের ব্যাখ্যাগ্রন্থে লিখেছেন যে, প্রাচীন চার্চের বা খৃস্টধর্মের ঐতিহাসিকগণের পক্ষ থেকে সুসমাচারগুলির রচনার সময় ও অবস্থা সম্পর্কে সে সকল তথ্য আমরা পেয়েছি সেগুলি অনির্ধারিত ও অসম্পূর্ণ। এ সকল মতামত ও বক্তব্য আমাদেরকে কোনো একটি নির্ধারিত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে দেয় না। প্রথম যুগের ধর্মগুরু পণ্ডিতগণ বানোয়াট, বাতুল বা দুর্বল বর্ণনাগুলিকেই সত্য বলে গ্রহণ করেছেন এবং লিখে রেখেছেন। তাদের পরে যারা এসেছেন তারা পূর্ববর্তীদের প্রতি ভক্তির কারণে এসকল বাতুল বিবরণগুলিকেই সত্য বলে মেনে নিয়েছেন। এ সকল সত্য ও মিথ্যা বিবরণ এক লেখক থেকে অন্য লেখক গ্রহণ করেছেন। এখন বর্তমান যুগে এগুলির মধ্য থেকে সঠিক তথ্য বাছাই করার কোনো সুযোগ আর নেই।

অতঃপর হর্ন উল্লেখ করেছেন যে, সুসমাচারগুলির প্রণয়নের সময়কাল সম্পর্কে নিম্নরূপ মতভেদ উল্লেখ করেছেন:

ক. মথিলিখিত সুসমাচার। এ পুস্তকটি ৩৭ অথবা ৩৮ অথবা ৪১ অথবা ৪৩ অথবা ৪৮ অথবা ৬১ অথবা ৬২ অথবা ৬৩ অথবা ৬৪ খৃস্টাব্দে রচিত হয়েছে।

খ. মার্কলিখিত সুসমাচার। এ পুস্তকটি ৫৬ অথবা তার পরে ৬৫ খৃস্টাব্দের মধ্যে কোনো সময়ে রচিত হয়েছে। যতদূর মনে হয়, গ্রন্থটি ৬০ খৃস্টাব্দে অথবা ৬৩ খৃস্টাব্দে রচনা করা হয়েছে।

গ. লূকলিখিত সুসমাচার। এ পুস্তকটি ৫৩ অথবা ৬৩ অথবা ৬৪ খৃস্টাব্দে রচিত হয়েছে।

ঘ. যোহনলিখিত সুসমাচার। এটি ৬৮ অথবা ৬৯ অথবা ৭০ অথবা ৯৭ অথবা ৯৮ খৃস্টাব্দে রচিত হয়েছে।

উপরের আলোচনা থেকে পাঠক খৃস্টধর্মের মূল চারটি ইঞ্জিলবা সুসমাচারের অবস্থা জানতে পেরেছেন। নতুন নিয়মের অবশিষ্ট পুস্তক বা পত্রগুলির অবস্থার এগুলির চেয়ে মোটেও ভাল নয়।

১. ২. ৪. পবিত্র বাইবেলের পুস্তকগুলি ঐশী নয়

উপরের আলোচনা থেকে জ্ঞানী পাঠকের নিকট এ কথা স্পষ্ট হয়েছে যে, খৃস্টানগণের নিকট বাইবেলের পুরাতন নিয়ম ও নতুন নিয়মের গ্রন্থগুলির কোনোটিরই কোনো মূল উৎস বা সূত্র পরম্পরা সংরক্ষিত নেই। এজন্য ইয়াহূদী-খৃস্টানগণের এ কথা দাবি করার সুযোগ নেই যে, ‘‘পবিত্র বাইবেল’’ নামে প্রচারিত পুস্তকসংকলনের পু্স্তকগুলি আসমানী, ঐশ্বরিক বা ঐশী পুস্তক বা ওহী, ইলহাম বা ঐশ্বরিক প্রেরণার (Divine Inspiration, Revelation) ভিত্তিতে লেখা পুস্তক। যদি কেউ তা দাবি করেন তবে তা ভিত্তিহীন ও বাতিল বলে প্রমাণিত হবে। উপরের আলোচনার পাশাপাশি নিম্নের বিষয়গুলি লক্ষ্য করুন:

(১) নতুন ও পুরাতন নিয়মের পুস্তকগুলিতে উল্লিখিত তথ্য ও বিবরণের মধ্যে অগণিত অর্থগত বৈপরীত্য রয়েছে। ইয়াহূদী-খৃস্টান গবেষক, পণ্ডিত ও ভাষ্যকারগণ এ সকল বৈপরীত্যের কোনো কোনোটির ক্ষেত্রে স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছেন যে, দুই বা ততোধিক পরস্পর-বিরোধী বিবরণের একটি সত্য ও অন্যটি বা অন্যগুলি মিথ্যা ও জাল। ইচ্ছাকৃত বিকৃতি অথবা অনিচ্ছাকৃত ভুলের কারণে এই মিথ্যা তথ্যটি পরিবেশিত হয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তারা এ সকল বৈপরীত্য ও পরস্পরবিরোধিতা সমন্বয়ের জন্য এমন অবাস্তব ও ফালতু কথা বলেছেন যা কোনো স্বাভাবিক বিচারবুদ্ধি সম্পন্ন বিবেক গ্রহণ করতে পারে না। ঐশ্বরিক প্রেরণাবা প্রত্যাদেশ (Divine Inspiration/ Revelation)-লব্ধ কথায় কখনো এরূপ অর্থগত বৈপরীত্য ও ভুল থাকতে পারে না। ঐশী কথা ভুলের শত যোজন দূরে থাকবে।

বাইবেল ভাষ্যকার হর্ন তার বাইবেলের ব্যাখ্যাগ্রন্থে লিখেছেন যে, বাইবেলের লেখকগণ বা বাইবেলের বিভিন্ন পুস্তকের রচয়িতাদের প্রক্যেকের নিজ নিজ প্রকৃতি, অভ্যাস ও জ্ঞানবুদ্ধি অনুসারে লিখার অনুমতি ছিল। ঐশ্বরিক প্রত্যাদেশের মাধ্যমে প্রাপ্ত জ্ঞানকে তারা প্রচলিত জ্ঞানের ন্যায় ব্যবহার করতেন। একথা কল্পনা করা যায় না যে, তারা যে সকল বিষয় লিখেছেন বা যে সকল বিধিবিধান প্রদান করেছেন সেগুলি সবই তারা ঐশ্বরিক প্রত্যাদেশ বা প্রেরণার মাধ্যমে লাভ করেছিলেন।

হেনরী ও স্কট-এর ব্যাখ্যাগ্রন্থের সংকলকগণ লিখেছেন যে, এ কথা মোটেও জরুরী নয় যে, একজন ভাববাদী (তার পুস্তকে) যা কিছু লিখেছেন তা সবই ঐশী প্রেরণা বা প্রত্যাদেশ হবে বা বাইবেলের (canonical text) অংশ হবে।

এনসাইক্লোপীডিয়া ব্রিটানিকা’-য় উল্লেখ করা হয়েছে যে, অনেক খৃস্টান পণ্ডিতই মনে করেন, বাইবেলের পুস্তকাবলির সকল কথা এবং সকল বর্ণনা  ইলহাম বা  ঐশ্বরিক প্রেরণা (Inspiration)-লব্ধ নয়। যারা বলেন যে, বাইবেলের পুস্তকাবলির মধ্যে উল্লিখিত সকল কথাই ঐশ্বরিক প্রেরণালব্ধ, তাদের জন্য এ দাবি প্রমাণ করা সহজ হবে না।

আব্রাহাম রীস (Abraham Rees) অনেক গবেষক পণ্ডিতের সমন্বয়ে দীর্ঘদিনের গবেষণায় (১৮০২-১৮২০ সালে) ৪৫ খণ্ডে একটি বিশ্বকোষ প্রকাশ করেন, যা রীস এনসাইক্লোপীডিয়া (New Cyclopaedia; or, Universal Dictionary of Arts and Sciences) নামে পরিচিত। এ বিশ্বকোষে লেখা হয়েছে:

বাইবেলের এ সকল পুস্তকের রচয়িতাদের কর্মে ও কথায় অনেক ভুলভ্রান্তি ও বৈপরীত্য রয়েছে। প্রাচীন খৃস্টানগণ প্রেরিতদেরকে ভুলভ্রান্তির ঊর্ধ্বে বা ঐশ্বরিক প্রেরণায় ভুলভ্রান্তি থেকে সংরক্ষিত বলে বিশ্বাস করতেন না; কারণ, কখনো কখনো তারা তাদের কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করেছেন।

অনুরূপভাবে মার্ক, লূক ও অনুরূপ ব্যক্তিবর্গ, যারা যীশুর প্রেরিত শিষ্যগণের শিষ্য ছিলেন, তাদের রচিত পু্স্তকগুলির বিষয়েও অনেকেই মত প্রকাশ করেছেন যে, এগুলি ঐশ্বরিক প্রেরণা বা ইলহাম দ্বারা লিখিত পুস্তক নয়, এগুলি নিতান্তই মানবিক রচনা। এজন্য প্রটেস্ট্যন্ট সম্প্রদায়ের প্রসিদ্ধ ধর্মগুরুগণ মার্ক ও লূকের লেখা ইঞ্জিল ও লূকের লেখা প্রেরিতগণের কার্যবিবরণকে ইলহাম বা ঐশ্বরিক প্রেরণানির্ভর নয় বরং মানবীয় কর্ম বলে গণ্য করেছেন।

(২) প্রসিদ্ধ বাইবেল বিশারদ ও খৃস্টধর্ম গবেষক খৃস্টান পণ্ডিত মহাত্মা নরটন পণ্ডিত একহার্ন থেকে উদ্ধৃত করেছেন: খৃস্টান ধর্মের প্রথম অবস্থায় যীশুর অবস্থাদি বর্ণনার জন্য একটি সংক্ষিপ্ত পুস্তিকা ছিল। একথা বলা যায় যে, এই পুস্তিকাটিই ছিল মূল সুসমাচার। যে সকল নতুন খৃস্টান খৃস্টের কথাবার্তা নিজের কানে শুনেন নি এবং তাঁর অবস্থাদি স্বচক্ষে দেখেন নি, সম্ভবত তাদের জন্য এই পুস্তিকাটি রচনা করা হয়েছিল। এই সুসমাচারটি একটি অতি সাধারণ সংকলনের আকৃতিতে ছিল। এতে যীশুর ঘটনাবলি সুশৃঙ্খল পরম্পরায় লিখিত ছিল না।[23]

এ সুসমাচারটিই ছিল প্রথম ও দ্বিতীয় শতাব্দীতে প্রচলিত সকল সুসমাচারেরমূল উৎস। মথি, মার্ক ও লূকের উৎসও ছিল এই সুসমাচারটি। এ তিনটি ছাড়া আরো অনেক সুসমাচার এ সময়ে লেখা হয়। এ সকল সুসমাচার পরবর্তী মানুষদের হাতে পড়ে। তারা এগুলির মধ্যে অপূর্ণতা অনুভব করেন এবং বিভিন্ন সংযোজন ও বিয়োজনের মাধ্যমে অপূর্ণতা পূর্ণ করতে থাকেন। এভাবে সংযোজন ও সংমিশ্রণের ফলে সুসমাচারগুলিতে সত্য এবং মিথ্যা সংমিশ্রিত হয়ে গিয়েছে। অনুরূপভাবে সত্য ঘটনার সাথে দীর্ঘ বানোয়াট কাহিনীগুলি সংমিশ্রিত হয়ে একটি অত্যন্ত কদর্য চিত্র ফুটিয়ে তুলেছে। এই কাহিনীগুলি যতবারই এক মুখ থেকে অন্য মুখে গিয়েছে, ততবারই তাতে নতুন অপছন্দনীয় সংযোজন যুক্ত হয়েছে। আবর্তনের পরিমাণে অসংলগ্ন সংযোজন বেড়েছে।

একারণে দ্বিতীয় শতাব্দীর শেষে অথবা তৃতীয় শতাব্দীর শুরুতে খৃস্টীয় চার্চ সত্য সুসমাচার সংরক্ষণের জন্য সচেষ্ট হয়। সে সময়ে প্রচলিত ৭০টিরও অধিক ইঞ্জিল বা সুসমাচারের মধ্য থকে এ চারটি ইঞ্জিল বাছাই করে। খৃস্টীয় চার্চ চায় যে, মানুষেরা অন্য সকল প্রচলিত সুসমাচার বাদ দিয়ে শুধু এই চারটিই মেনে চলে। প্রাচীন প্রচারকদের প্রচারকার্যের সত্যতা প্রমাণের জন্য যে মূল সুসমাচারটি সংকলন করা হয়েছিল, যদি চার্চ সেই মূল সুসমাচারটি সকল সংযোজন ও বৃদ্ধি থেকে মুক্ত করে প্রকাশ করত তবে পরবর্তী প্রজন্মগুলি তাদের প্রতি অত্যন্ত কৃতজ্ঞ থাকতো। কিন্তু এ কাজটি তাদের জন্য কঠিন ছিল। কারণ ইঞ্জিলের পাণ্ডুলিপিগুলির মধ্যে এরূপ সংযোজন ছিল খুবই বেশি এবং একটি পাণ্ডুলিপিও এইরূপ বৃদ্ধি ও সংযোজন থেকে মুক্ত ছিল না। ফলে সংযোজন থেকে মূল বক্তব্য পৃথক করা তাদের জন্য অসম্ভব হয়ে যায়।

প্রাচীন যুগের অধিকাংশ ধর্মবেত্তা পণ্ডিতই প্রচলিত এ সুসমাচারগুলির অনেক অংশ সম্পর্কে সন্দিহান ছিলেন। কিন্তু তারা তা বর্ণনা ও ব্যাখ্যা করতে পারেন নি। সে যুগে প্রেস বা মুদ্রণ-যন্ত্র ছিল না। একটি পাণ্ডুলিপি একজন মানুষের মালিকানাধীন। প্রত্যেক মালিক তার পাণ্ডুলিপিটির মধ্যে তার নিজের পক্ষ থেকে ইচ্ছামত কিছু বক্তব্য বা গল্পকাহিনী সংযোজন করতেন বা পুস্তকের মূল পাঠের নীচে বা পার্শ্বে লিখে রাখতেন। এরপর যখন এ পাণ্ডুলিপি থেকে অনেক কপি করা হতো, তখন এ কপিগুলি শুধু মূল লেখকের কথাই কপি করছে, না সংযোজিত বাক্যগুলিও কপি করছে তা খুব গুরুত্ব দিয়ে দেখা হতো না। অনেক ধর্মগুরু পণ্ডিত কঠিনভাবে অভিযোগ করেছেন যে, তাদের লেখা বইগুলি কিছুদিনের মধ্যেই লিপিকার ও পাণ্ডুলিপির মালিকেরা বিকৃত করে ফেলেছে। তারা অভিযোগ করতেন যে, শয়তানের শিষ্যরা এগুলির মধ্যে অপবিত্র কথা সংযোজন করেছে, কিছু বিষয় বের করে দিয়েছে এবং তাদের নিজেদের পক্ষ থেকে  কিছু বিষয় সংযোজন করে। এভাবে পবিত্র পুস্তকগুলির মূল রূপও সংরক্ষিত থাকে নি। ফলে এগুলি ‘‘ঐশ্বরিক’’, ‘‘ঐশী’’ বা ঐশ্বরিক প্রেরণাভিত্তিক গ্রন্থ বলে গণ্য হওয়ার যোগ্যতা হারায়।

তৎকালীন মানুষদের মধ্যে এরূপ সংযোজনের অভ্যাসের বড় প্রমাণ যে, সে যুগের খৃস্টান লেখকগণের রীতি ছিল, তাদের লিখনির মধ্যে কেউ যেন কোনো বিকৃতি না করে সে বিষয়ে তারা কঠিন প্রতিজ্ঞা ও অভিশাপের ঘোষণা দিতেন।

যীশুর ইতিহাসের ক্ষেত্রেও এ বিষয়ই ঘটেছে। এ বিকৃতি ও সংযোজন এরূপ প্রসিদ্ধি লাভ করে যে, রোমান পণ্ডিত সিলসূস অভিযোগ করেন, তারা তিনবার বা চারবার বা তার বেশি বার তাদের সুসমাচারগুলিকে পরিবর্তন করেছে।

এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। তৎকালীন মানুষদের গবেষণা ও চুলচেরা বিশ্লেষণের কোনো আগ্রহ ও মানসিকতা ছিল না। খৃস্টীয় ইতিহাসের শুরু থেকেই মানুষেরা তাদের কাছে সংরক্ষিত ওয়াজ-উপদেশের বাক্যাবলি এবং যীশুর বিভিন্ন ঘটনাবলি নিজেদের জ্ঞানানুসারে পরিবর্তন পরিবর্ধন করতেন। প্রথম প্রজন্মের খৃস্টানগণই এ অভ্যাস চালু করেন। দ্বিতীয় ও তৃতীয় প্রজন্মেও তা অব্যাহত থাকে। দ্বিতীয় শতাব্দীতে এই অভ্যাস অত্যন্ত প্রসিদ্ধ ছিল। ফলে খৃস্টধর্মের বিরোধীরাও বিষয়টি অবগত ছিলেন। দ্বিতীয় শতকের শেষে ক্লীমেন্স (Clement of Alexandira)  উল্লেখ করেছেন যে, কিছু মানুষের কর্মই ছিল সুসমাচারগুলি বিকৃত করা।

একহার্নের বক্ত্যবের উপর মন্তব্য করে নর্টন বলেন: কেউ যেন মনে না করে যে, এ মতটি একহার্নের একার মত। অনেক সমসাময়িক জার্মান গবেষকই একহার্নের সাথে একমত। এ সাতটি স্থান সংযোজিত ও ঐশ্বরিক প্রেরণা-লব্ধ নয় বলে তিনি উল্লেখ করেছেন।

এছাড়া তিনি উল্লেখ করেছেন যে, যীশুর অলৌকিক চিহ্নসমূহ উল্লেখ করার ক্ষেত্রে মিথ্যা কথা সংযোজন করা হয়েছে। তিনি আরো বলেন যে, সত্যকে মিথ্যা থেকে বাছাই করা বর্তমান যুগে খুবই কঠিন।

প্রিয় পাঠক, যে পুস্তকের মধ্যে সত্যের সাথে মিথ্যা মিশ্রিত হয়ে গিয়েছে তাকে কি ঐশ্বরিকবা ইলহাম-প্রাপ্ত পু্স্তক (Divine Scripture) বলা যায়? ইয়াহূদী-খৃস্টান কারো কি এ অধিকার আছে যে, বাইবেলের সকল পুস্তককে ঐশ্বরিক, ইলহাম-প্রাপ্ত বা আসমানী কিতাব বলে দাবি করবেন? অথবা এ সকল পুস্তকের সকল তথ্য ও বর্ণনাকে আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রাপ্ত বলে দাবি করবেন?[24]

১. ২. ৫. পবিত্র বাইবেল বিষয়ে মুসলিম বিশ্বাস

ক. মূল তাওরাত ও ইঞ্জিল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পূর্বেই হারিয়ে গিয়েছে।

আমরা মুসলিমগণ বিশ্বাস করি যে, মূসা আলাইহিস সালাম-এর উপর অবতীর্ণ মূল তাওরাত এবং ঈসা আলাইহিস সালাম-এর উপর অবতীর্ণ মূল ইঞ্জিল মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আগমনের পূর্বেই হারিয়ে গিয়েছে। বর্তমানে বাইবেলের পুরাতন ও নতুন নিয়মের নামে প্রচলিত বই দুইটি মূলত কোনো আল্লাহপ্রদত্ত গ্রন্থ নয়। বরং এই বই দুইটি হচ্ছে জীবনী ও ইতিহাসমূলক দুইটি সংকলন, যাতে সত্য ও মিথ্য সকল প্রকার কথা ও কাহিনী সংকলন করা হয়েছে।

আমরা কখনোই বলি না যে, আমাদের নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর যুগে তাওরাত ও ইঞ্জিল সঠিকরূপে বিদ্যমান ছিল এবং তারপরে তা বিকৃত করা হয়েছে। আমরা কখনোই তা বলি না। কোনো একজন মুসলিমও এরূপ কথা বলেন না বা বিশ্বাস করেন না।

খ. পৌল ভাক্ত বা ভন্ড ভাববাদী, তার বক্তব্য গ্রহণযোগ্য নয়

পৌলের বিষয়ে আমাদের বিশ্বাস যে, খৃস্টান ধর্মের প্রথম প্রজন্মে খৃস্টধর্মকে বিকৃত ও নষ্ট করতে যে সকল মিথ্যাবাদী ভাক্ত ভাববাদীর আবির্ভাব ঘটেছিল, পৌল ছিলেন তাদের অন্যতম। কাজেই নতুন নিয়মে সংকলিত পৌলের পত্রাবলি ও বক্তব্যসমূহ যদি প্রকৃতপক্ষে তার বলে প্রমাণিত হয় তাহলেও আমাদের নিকট সেগুলির কোনো গ্রহণযোগ্যতা নেই।

গ. প্রেরিতগণ সৎ ও ধার্মিক ছিলেন, ভাববাদী ছিলেন না

যীশুখৃস্টের প্রেরিত শিষ্যগণের সম্পর্কে আমাদের বিশ্বাস হলো যে, তারা যীশুর ঊর্ধ্বারোহণের পরে সততা ও ধার্মিকতার মধ্যে জীবন কাটিয়েছেন। তবে আমরা তাদেরকে ভাববাদী বা নবী বলে বিশ্বাস করি না। আমাদের দৃষ্টিতে তাদের বক্তব্য ও মতামত অন্যান্য সাধারণ সৎ ও ধার্মিক ধর্মবিদ পণ্ডিতের মতামতের মতই, ভুলের ঊর্ধ্বে নয়।

যীশু ও তার শিষ্যদের যুগ থেকে শুরু করে দ্বিতীয় শতাব্দীর শেষ পর্যন্ত নতুন নিয়মের কোনো পুস্তক বা পত্রের কোনো অবিচ্ছিন্ন সূত্র পরম্পরা পাওয়া যায় না। মূল ইঞ্জিলও হারিয়ে গিয়েছে। একারণে নতুন নিয়মের মধ্যে বিদ্যমান যীশুশিষ্য মথি ও যোহনের সুসমাচারদ্বয় এবং অন্যান্য প্রেরিতের পত্রগুলির বক্তব্য আসলেই তাদের কিনা সে বিষয়ে নিশ্চিত জানার কোনো উপায় নেই। সর্বোপরি প্রচলিত নতুন নিয়মের বিভিন্ন বক্তব্য থেকে নিশ্চিতরূপে প্রমাণিত যে, প্রেরিতগণ, যীশুর শিষ্যগণ বা প্রথম যুগের খৃস্টানগণ যীশুর কথার মর্মও সঠিকভাবে বুঝতে পারতেন না। অপরদিকে মার্ক ও লূক যীশুর শিষ্য ছিলেন না। তারা ইলহাম বা ঐশ্বরিক প্রেরণাপ্রাপ্ত ছিলেন বলে কোনোভাবেই প্রমাণিত নয়। উপরন্তু তারা জীবনে একটিবারও যীশুকে দেখার সৌভাগ্য লাভ করেন নি।

ঘ. মুসলিম বিশ্বাসে তাওরাত ও ইঞ্জিল

আমাদের বিশ্বাস অনুসারে মূসা আলাইহিস সালাম-কে প্রত্যাদেশ বা ওহীর (Revelation) মাধ্যমে যা প্রদান করা হয়েছে তাই তাওরাত। আর ঈসা আলাইহিস সালাম প্রত্যাদেশের মাধ্যমে যা প্রদান করা হয়েছে তাই হলো ইঞ্জিল। এর মধ্যে যা ছিল সবই আল্লাহর পক্ষ থেকে ওহী বা প্রত্যাদেশ। এগুলির মধ্যে সংযোজন, বিয়োজন, পরিবর্ত বা সম্পাদনের মাধ্যমে সামান্যতম পরিবর্তন বা বিকৃতিও বৈধ নয়।

সূলা বাকারা-৮৭, সূরা হূদ-১১০, সূরা মুমিনূন-৪৯, সূরা ফুরকান-৩৫, সূরা কাসাস-৪৩, সূরা সাজদা-২৩, সূরা ফুসসিলাত-৪৫ আয়াতে আল্লাহ বলেন: ‘‘এবং আমি মূসাকে গ্রন্থ প্রদান করেছি।’’ সূরা মায়িদার-৪৬ ও সূরা হাদীদ-২৭ আয়াতে ঈসা আ. (যীশু) সম্পর্কে আল্লাহ বলেছেন: ‘‘এবং আমি তাকে ইঞ্জিল প্রদান করেছি’’। সূরা মরিয়ম-৩০ আয়াতে ঈসা আলাইহিস সালাম-এর জবানীতে বলা হয়েছে: ‘‘আমাকে তিনি গ্রন্থ প্রদান করেছেন।’’ সূরা বাকারা-২৩৬ এবং সূরা আল-এমরান-৮৪ আয়াতে বলা হয়েছে: ‘‘এবং মূসা ও ঈসাকে যা প্রদান করা হয়েছে।’’, অর্থাৎ তাওরাত ও ইঞ্জিল।

কাজেই ‘‘পবিত্র বাইবেল’’ নামে প্রচারিত পুস্তক সংকলনের মধ্যে নতুন ও পুরাতন নিয়মের অন্তর্ভুক্ত এ সকল ঐতিহাসিক পুস্তকাদি এবং পত্রাবলি কুরআনে উল্লিখিত তাওরাত ও ইঞ্জিল নয়। কাজেই এগুলি বিশ্বাস বা মান্য করা জরুরী নয়। এ সকল পুস্তক, পত্রাবলি এবং নতুন ও পুরাতন নিয়মের সকল পুস্তকের ক্ষেত্রে মুসলিম বিশ্বাস নিম্নরূপ:

এ সকল পুস্তকের যে সকল কথা ও কাহিনীকে কুরআন সত্য বলেছে সেগুলি সন্দেহাতীতভাবে গ্রহণযোগ্য। আমরা কোনো দ্বিধা ও আপত্তি ছাড়া সেগুলিকে সত্য বলে গ্রহণ করি। যেগুলিকে কুরআন মিথ্যা বলে ঘোষণা করেছে সেগুলি নিঃসন্দেহে মিথ্যা ও প্রত্যাখ্যাত। আমরা কোনো দ্বিধা ছাড়াই সেগুলিকে মিথ্যা বলে ঘোষণা করি। আর যেগুলি বিষয়ে কুরআন সত্য ও মিথ্যা কোনো প্রকারের কিছু না বলে চুপ থেকেছে, সেগুলির বিষয়ে আমরাও চুপ থাকি। আমরা সেগুলিকে সত্য বলেও গ্রহণ করি না, আবার সরাসরি মিথ্যাও বলি না।

মহান আল্লাহ সূরা মায়েদার ৪৮ আয়াতে বলেন: ‘‘এবং আপনার উপর সত্যসহ গ্রন্থ অবতীর্ণ করেছি, তার পূর্বে অবতীর্ণ গ্রন্থসমূহের সমর্থক ও সংরক্ষক-নিয়ন্ত্রক রূপে।’’

আল-কুরআনুল কারীমই পূর্ববর্তী গ্রন্থসমূহের নিয়ন্ত্রক, সংরক্ষক বা বিশুদ্ধতা ও অশুদ্ধতার মাপকাঠি। কুরআন পূর্ববর্তী গ্রন্থগুলির মধ্যে যা কিছু সত্য রয়েছে তা প্রকাশ ও সমর্থন করে এবং এগুলির মধ্যে বিদ্যমান মিথ্যা প্রকাশ করে দেয় এবং তার প্রতিবাদ করে।

যে সকল মুসলিম আলিম প্রচলিত তাওরাত ও ইঞ্জিলের বিরুদ্ধে গ্রন্থ রচনা করেছেন এবং এগুলির মধ্যে বিদ্যমান মিথ্যা ও বিকৃতি প্রকাশ করেছেন, তারা আল্লাহর পক্ষ থেকে মূসা আলাইহিস সালাম ও ঈসা আলাইহিস সালাম-এর উপর অবতীর্ণ তাওরাত ও ইঞ্জিলের বিরুদ্ধে কলম ধরেন নি বা সেগুলিকে উদ্দেশ্য করে গ্রন্থ রচনা করেন নি। বরং তারা ‘‘পবিত্র বাইবেলের’’ পুরাতন ও নতুন নিয়মের মধ্যে বিদ্যমান এ সকল ঐতিহাসিক ও জীবনীমূলক পুস্তকগুলির বিরুদ্ধে কলম ধরেছেন, যেগুলি কয়েক শতাব্দী ধরে লেখা ও সংকলন করা হয়েছে এবং এরপর দাবি করা হয়েছে যে, এগুলি ওহী বা ইলহামের মাধ্যমে বা  আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রাপ্ত পুস্তক। এগুলির বিষয়েই আল্লাহ সূরা বাকারার ৭৮৯ আয়াতে/ শ্লোকে বলেছেন: ‘‘দুর্ভোগ তাদের জন্য যারা নিজ হাতে গ্রন্থ রচনা করে এবং এরপর বলে: এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে; যেন তারা এগুলির দ্বারা  সামান্য বিনিময়মূল্য লাভ করতে পারে। কাজেই যা তাদের হাতগুলি লিখেছে তার জন্য তাদের দুর্ভোগ এবং যা তারা উপার্জন করে তার জন্যও তাদের দুর্ভোগ।”

মুসলিম উম্মাহর সকলেই একমত যে, আল্লাহর নিকট থেকে ওহীর মাধ্যমে গ্রহণ করে মূসা আলাইহিস সালাম যা মুখে উচ্চারণ করেছিলেন তাই প্রকৃত তাওরাহ। আর আল্লাহর নিকট থেকে ওহীর মাধ্যমে গ্রহণ করে ঈসা আলাইহিস সালাম যা মুখে উচ্চারণ করেছিলেন তাই প্রকৃত ইঞ্জিল। আর ‘‘পবিত্র বাইবেল’’-এর পুরাতন ও নতুন নিয়ম বা ‘‘তাওরাত শরীফ’’, ‘‘ইঞ্জিল শরীফ’’ বা ‘‘যাবূর শরীফ’’ নামে প্রচলিত পুস্তকগুলি কখনোই সেই তাওরাত, ইঞ্জিল বা যাবূর নয়।

ইয়াহূদী-খৃস্টানগণের নিকট সংরক্ষিত তাওরাতের মূল তিনটি সংস্করণ রয়েছে বা তিন প্রকারের ‘‘তাওরাত’’ রয়েছে। আর ‘‘ইঞ্জিল’’ বা সুসমাচার রয়েছে চারটি। এগুলির মধ্যে রয়েছে বৈপরীত্য ও সংঘাত। অথচ মূসা আলাইহিস সালাম-এর উপর একটিই তাওরাত নাযিল হয়েছিল এবং ঈসা আলাইহিস সালাম একটিই ইঞ্জিল পেয়েছিলেন।

কুরআনে উল্লিখিত মূসা আলাইহিস সালাম ও ঈসা আলাইহিস সালাম-এর উপর অবতীর্ণ মূল তাওরাত ও ইঞ্জিল যদি কেউ অস্বীকার করেন তবে তার ঈমান নষ্ট হবে। আর ‘‘পবিত্র বাইবেল’’ নামে বা তাওরাত বা ইঞ্জিল নামে বর্তমানে প্রচলিত, আল্লাহর বাণী নাম দিয়ে বা নবী-রাসূলগণের লেখা বলে প্রচারিত জাল ও মিথ্যা এ সকল মিথ্যা গল্প, কাহিনী ও বিবরণ অস্বীকার করলে ঈমান নষ্ট হওয়া তো দূরের কথা, বরং তাতে ঈমানী দায়িত্ব পালিত হবে। কারণ মহান আল্লাহর মর্যাদার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় এবং নবী-রাসূলগণের পবিত্রতা ও নিষ্পাপত্বের সাথে সাংঘর্ষিক এ সকল মিথ্যা ও জাল গল্প, কাহিনী ও বিবরণগুলির মিথ্যাচার ও জালিয়াতি প্রকাশ করা মুমিনের ঈমানী দায়িত্ব।

তাওরাতের প্রচলিত তিনটি সংস্করণ বা ভার্সনের মধ্যে রয়েছে পারস্পরিক বৈপরীত্য। এগুলিতে রয়েছে অনেক ভুল ও পরস্পর বিরোধী বক্তব্য। এতে মূসা আলাইহিস সালাম-এর মৃত্যু এবং মাওআব অঞ্চলে তার কবর দেওয়ার বিবরণ। আমরা নিশ্চিত যে, এগুলি কখনোই মূসা আলাইহিস সালাম-এর উপর অবতীর্ণ বিশুদ্ধ তাওরাত নয়।

প্রচলিত চারটি ইঞ্জিল বা সুসমাচারের মধ্যেও রয়েছে পরস্পর বিরোধী বক্তব্য। এগুলির মধ্যে অনেক ভুল-ভ্রান্তি, বৈপরীত্য ও পরস্পর সাংঘর্ষিক বক্তব্য রয়েছে। এতে যীশুর ক্রুশারোহণ (খৃস্টানগণের বিশ্বাস অনুসারে), ক্রুশে মৃত্যু, তার কবরস্থ করণ ইত্যাদি বিবরণ রয়েছে। আমরা সুনিশ্চিত যে, এগুলি কখনোই ঈসা আলাইহিস সালাম-এর উপর অবতীর্ণ ইঞ্জিল নয়।

 

তৃতীয় পরিচ্ছেদ

বাইবেলের বৈপরীত্য, ভুলভ্রান্তি ও বিকৃতি

পবিত্র বাইবেল নামে প্রচলিত এ গ্রন্থ-সংকলনের পুস্তকগুলি অগণিত বৈপরীত্য, ভুলভ্রান্তি[25] ও বিকৃতিতে ভরা। এ পরিচ্ছেদে আমরা তার সামান্য কিছু নমুনা আলোচনা করব।

১. ৩. ১. বৈপরীত্য ও পরস্পর বিরোধিতা

১- বিন্যামীনের সন্তানদের নাম ও সংখ্যায় বৈপরীত্য:

১ বংশাবলির (বংশাবলি ১ম খণ্ড) ৭ম অধ্যায়ের ৬ শ্লোকে বলা হয়েছে: ‘‘বিন্যামীনের সন্তান- বেলা, বেখর ও যিদীয়েল, তিন জন।’’

পক্ষান্তরে ১ বংশাবলিরই ৮ম অধ্যায়ের ১ শ্লোকে বলা হয়েছে: ‘‘বিন্যামীনের জ্যেষ্ঠ পুত্র বেলা, দ্বিতীয় অস্বেল, তৃতীয় অহর্হ, চতুর্থ নোহা ও পঞ্চম রাফা।’’

কিন্তু আদিপুস্তক ৪৬ অধ্যায়ের ২১ শ্লোকে বলা হয়েছে: ‘‘বিন্যামীনের পুত্র বেলা, বেখর, অস্বেল, গেরা, নামন, এহী, রোশ, মুপ্পীম, হুপ্পীম ও অর্দ।’’

তাহলে বিন্যামিনের সন্তান সংখ্যা প্রথম বক্তব্যে তিন জন এবং দ্বিতীয় বক্তব্যে ৫ জন। তাদের নামের বর্ণনাও পরস্পর বিরোধী, শুধু বেলার নামটি উভয় শ্লোকে উল্লেখ করা হয়েছে, বাকিদের নাম সম্পূর্ণ ভিন্ন। আর তৃতীয় শ্লোকে বিন্যামীনের সন্তান সংখ্যা ১০ জন। নামগুলিও আলাদা। তৃতীয় শ্লোকের নামগুলির সাথে প্রথম শ্লোকের সাথে দুজনের নামের এবং দ্বিতীয় শ্লোকের দুজনের নামের মিল আছে। আর তিনটি শ্লোকের মিল আছে একমাত্র ‘‘বেলা’’ নামটি উল্লেখের ক্ষেত্রে।

প্রথম ও দ্বিতীয় শ্লোকদ্বয় একই পুস্তকের। উভয় পুস্তকের লেখক ইয্রা ভাববাদী। এভাবে একই লেখকের লেখা একই পুস্তকের দুটি বক্তব্য পরস্পর বিরোধী বলে প্রমাণিত হলো। আবার তাওরাতের আদিপুস্তকের বক্তব্যের সাথে ইয্রার দুটি বক্তব্যের বৈপরীত্য প্রমাণিত হলো।

এ সুস্পষ্ট পরস্পর বিরোধী বক্তব্য ইয়াহূদী ও খৃস্টান পণ্ডিতগণকে হতবাক করে দিয়েছে। তারা স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছেন যে, ইয্রাই ভুল করেছেন। এ ভুলের কারণ হিসেবে তার উল্লেখ করেন যে, ইয্রা পুত্র ও পৌত্রের মধ্যে পার্থক্য করতে পারেন নি এবং যে বংশতালিকা দেখে তিনি বংশাবলীর এই তালিকা লিখেছিলেন সেই মূল বংশতালিকাটি ছিল অসম্পূর্ণ।

২- ইস্রায়েল ও যিহূদা রাজ্যের সৈনিকদের সংখ্যার বৈপরীত্য

শমূয়েলের দ্বিতীয় পুস্তকের ২৪ অধ্যায়ের ৯ম শ্লোকটি নিম্নরূপ: ‘‘পরে যোয়াব গণিত লোকদের সংখ্যা রাজার কাছে দিলেন; ইস্রায়েলে খড়্গ-ধারী আট লক্ষ বলবান লোক ছিল; আর যিহূদার পাঁচ লক্ষ লোক ছিল।’’[26]

অপর দিকে বংশাবলি প্রথম খণ্ডের ২১ অধ্যায়ের ৫ম শ্লোক নিম্নরূপ: ‘‘আর যোয়াব গণিত লোকদের সংখ্যা দায়ূদের কাছে দিলেন। সমস্ত ইস্রায়েলের এগার লক্ষ খড়্গধারী লোক, ও যিহূদার চারি লক্ষ সত্তর সহস্র খড়্গধারী লোক ছিল।’’

তাহলে প্রথম বর্ণনামতে ইস্রায়েলের যোদ্ধাসংখ্যা ৮,০০,০০০ এবং যিহূদার ৫,০০,০০০। আর দ্বিতীয় বর্ণনামতে তাদের সংখ্যা: ১১,০০,০০০ ও ৪,৭০,০০০। উভয় বর্ণনার মধ্যে বৈপরীত্যের পরিমাণ দেখুন! ইস্রায়েলের জনসংখ্যা বর্ণনায় ৩ লক্ষের কমবেশি এবং যিহূদার জনসংখ্যার বর্ণনায় ত্রিশ হাজারের কমবেশি।

বাইবেল ভাষ্যকার আদম ক্লার্ক তার ব্যাখ্যাগ্রন্থে স্বীকার করেছেন যে, পরস্পর বিরোধী বক্তব্যের মধ্যে কোনটি সঠিক তা নির্ণয় করা খুবই কঠিন। বস্তুত বাইবেলের ইতিহাস বিষয়ক পুস্তকগুলিতে ব্যাপক বিকৃতি ঘটেছে এবং এবিষয়ে সমন্বয়ের চেষ্টা অবান্তর। বিকৃতি মেনে নেওয়াই উত্তম; কারণ তা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই এবং বাইবেলের বর্ণনাকারী ও লিপিকারগণ ইলহাম-প্রাপ্ত বা ঐশী প্রেরণা প্রাপ্ত ছিলেন না।

৩. গাদ দর্শকের সংবাদের বৈপরীত্য

শমূয়েলের দ্বিতীয় পুস্তকের ২৪ অধ্যায়ের ১৩ শ্লোকটি নিম্নরূপ: ‘‘পরে গাদ দায়ূদের নিকটে আসিয়া তাঁহাকে জ্ঞাত করিলেন, কহিলেন, আপনার দেশে সাত বৎসর ব্যপিয়া কি দুর্ভিক্ষ হইবে? না আপনার বিপক্ষগণ যাবৎ আপনার পশ্চাতে পশ্চাতে তাড়া করে, তাবৎ আপনি তিন মাস পর্যন্ত তাহাদের অগ্রে অগ্রে পলায়ন করিবেন?…’’

অপর দিকে বংশাবলি প্রথম খণ্ডের ২১ অধ্যায়ের ১২ শ্লোক নিম্নরূপ: পরে গাদ দায়ূদের নিকটে আসি তাঁহাকে বলিলেন, সদাপ্রভু এই কথা কহেন, তুমি যেটা ইচ্ছা, গ্রহণ কর: হয় তিন বৎসর দুর্ভিক্ষ, নয় তিন মাস পর্যন্ত শত্রুদের খড়্গ তোমাকে পাইয়া বসিলে তোমার বিপক্ষ লোকদের সম্মুখে সংহার…।’’

উভয় বক্তব্যের মধ্যে দুর্ভিক্ষের সময় বর্ণনায় বৈপরীত্য রয়েছে। প্রথম শ্লোকে ৭ বৎসর ও দ্বিতীয় শ্লোকে ৩ বৎসর! বাইবেলের ব্যাখ্যাকারগণ স্বীকার করেছেন যে, প্রথম শ্লোকের তথ্য ভুল। আদম ক্লার্ক বলেন: নিঃসন্দেহে বংশাবলির বক্তব্যই সঠিক, গ্রীক বাইবেলের ভাষ্যের সাথে তা সামঞ্জস্যপূর্ণ।

৪- অহসিয় রাজার রাজ্যগ্রহণকালীন বয়স বর্ণনায় বৈপরীত্য:

রাজাবলি দ্বিতীয় খণ্ডের ৮ম অধ্যায়ের ২৬ শ্লোক নিম্নরূপ: ‘‘অহসিয় বাইশ বৎসর বয়সে রাজত্ব করিতে আরম্ভ করিয়া যিরুশালেমে এক বৎসর রাজত্ব করিলেন।’’

আর বংশাবলি দ্বিতীয় খণ্ডের ২২ অধ্যায়ের দ্বিতীয় শ্লোক নিম্নরূপ: ‘‘অহসিয় বেয়াল্লিশ বৎসর বয়সে রাজত্ব করিতে আরম্ভ করেন এবং যিরূশালেমে এক বৎসরকাল রাজত্ব করেন।’’

উভয় বর্ণনার মধ্যে মাত্র ২০ বৎসরের বৈপরীত্য! দ্বিতীয় তথ্যটি সন্দেহাতীত-ভাবে ভুল; কারণ, বংশাবলি দ্বিতীয় খণ্ডের ২১ অধ্যায়ের ২০ শ্লোক এবং ২২ অধ্যায়ের ১-২ শ্লোকে উল্লেখ করা হয়েছে যে, অহসিয়ের পিতা যিহোরাম ৪০ বৎসর বয়সে মৃত্যু বরণ করেন এবং তার মৃত্যুর পরপরই অহসিয় রাজ-সিংহাসনে বসেন। এখন যদি দ্বিতীয় তথ্যটি যদি নির্ভুল হয় তাহলে প্রমাণিত হয় যে, অহসিয় তার পিতার চেয়েও দুই বছরের বড় ছিলেন!! আর এ যে অসম্ভব তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এজন্য আদম ক্লার্ক, হর্ন, হেনরি ও স্কট তাদের ব্যাখ্যাগ্রন্থসমূহে স্বীকার করেছেন যে, বাইবেল লেখকের ভুলের কারণে এ বৈপরীত্য দেখা দিয়েছে।

৫- যিহোয়াখীনের রাজত্ব গ্রহণকালীন বয়সের বর্ণনায় বৈপরীত্য:

২ রাজাবলীর ২৪ অধ্যায়ের ৮-৯ শ্লোক নিম্নরূপ: ‘‘(৮) যিহোয়াখীন আঠার বৎসর বয়সে রাজত্ব করিতে আরম্ভ করেন, এবং যিরূশালেমে তিন মাস রাজত্ব করেন… (৯) সদাপ্রভুর দৃষ্টিতে যাহা মন্দ তাহাই করিতেন।’’

২ বংশাবলির ৩৬ অধ্যায়ের ৯ম শ্লোক নিম্নরূপ: ‘‘যিহোয়াখীন আট বৎসর বয়সে রাজত্ব করিতে আরম্ভ করেন এবং যিরূশালেমে তিন মাস দশ দিন রাজত্ব করেন; সদাপ্রভুর দৃষ্টিতে যাহা মন্দ তাহাই তিনি করিতেন।’’

উভয় তথ্যের মধ্যে দশ বৎসরের বৈপরীত্য। ইয়াহূদী-খৃস্টান ভাষ্যকারগণ স্বীকার করেছেন যে, দ্বিতীয় শ্লোকটি নিঃসন্দেহে ভুল। কারণ বাইবেলের বর্ণনা অনুসারে যিহোয়াখীন মাত্র তিন মাস রাজত্ব করেন। এরপর ব্যাবিলনে বন্দিরূপে নীত হন। বন্দিত্বের সময়ে তার সাথে তার স্ত্রীগণও ছিলেন। স্বভাবতই ৮ বা ৯ বৎসরের কোনো মানুষের অনেকগুলি স্ত্রী থাকে না। আর এরূপ ৮ বা ৯ বৎসরের একজন শিশুর ক্ষেত্রে একথাও বলা হয় না যে, সে ঈশ্বরের দৃষ্টিতে যা মন্দ ও পাপ তা করেছিল। এজন্য বাইবেল বিশেষজ্ঞ আদম ক্লার্ক বলেন, এ পুস্তকের এ স্থানটি বিকৃত।

৬- দায়ূদ আলাইহিস সালামের যোদ্ধা কর্তৃক নিহতগণের সংখ্যায় বৈপরীত্য:

২ শমূয়েল ২৩ অধ্যায়ের ৮ শ্লোকে দায়ূদের বীর যোদ্ধাগণের বর্ণনায় বলা হয়েছে: ‘‘তিনি আটশতের বিরুদ্ধে তার বর্শা উঠান, যাদেরকে তিনি এককালে বধ করিয়াছিলেন (he lift up his spear against eight hundred, whom he slew at one time)[27]

কিন্তু ১ বংশাবলি ১১ অধ্যায়ের ১১ পঙক্তি নিম্নরূপ: ‘‘তিনি তিনশতের বিরুদ্ধে তার বর্শা উঠান, যাদেরকে তিনি এককালে বধ করিয়াছিলেন (he lifted up his spear against three hundred slain by him at one time)।[28]

উভয় বক্তব্যের মধ্যে তিন শতের বৈপরীত্য! আদম ক্লার্ক ও ড. কেনিকট (Benjamin Kennicott) উল্লেখ করেছেন যে, এ শ্লোকটিতে তিনটি মারাত্মক বিকৃতি রয়েছে।

৭- নূহের আলাইহিস সালাম নৌকায় উঠানো প্রাণীদের বর্ণনায় বৈপরীত্য:

আদিপুস্তকের ৬ষ্ঠ অধ্যায়ের ১৯-২০ পঙ্ক্তি নিম্নরূপ: (১৯) আর মাংসবিশিষ্ট সমস্ত জীব-জন্তুর স্ত্রীপুরুষ জোড়া জোড়া লইয়া তাহাদের প্রাণরক্ষার্থে আপনার সহিত সেই জাহাজে প্রবেশ করাইবে; (২০) সর্বজাতীয় পক্ষী ও সর্বজাতীয় পশু ও সর্বজাতীয় ভূচর সরীসৃপ জোড়া জোড়া প্রাণরক্ষার্থে তোমার নিকটে প্রবেশ করিবে।’’

এ পুস্তকের ৭ম অধ্যায়ের ৮-৯ পঙক্তি নিম্নরূপ: ‘‘(৮) নোহের প্রতি ঈশ্বরের আজ্ঞানুসারে শুচি অশুচি পশুর, এবং পক্ষীর ও ভূমিতে গমনশীল যাবতীয় জীবের (৯) স্ত্রীপুরুষ জোড়া জোড়া জাহাজে নোহের নিকট প্রবেশ করিল।’’

এ পুস্তকেরই ৭ম অধ্যায়ের ২-৩ পঙক্তি নিম্নরূপ: ‘‘তুমি শুচি (পবিত্র) পশুর স্ত্রীপুরুষ লইয়া প্রত্যেক জাতির সাত সাত জোড়া এবং অশুচি (অপবিত্র) পশুর স্ত্রীপুরুষ লইয়া প্রত্যেক জাতির এক এক জোড়া এবং আকাশের পক্ষীদিগেরও স্ত্রীপুরুষ লইয়া প্রত্যেক জাতির সাত সাত জোড়া সমস্ত ভূমন্ডলে তাহাদের বংশ রক্ষার্থে আপনার সঙ্গে রাখ।’’

এগুলি একই পুস্তকের তিনটি বক্তব্য। প্রথম ও দ্বিতীয় বক্তব্য থেকে জানা যায় যে, আল্লাহ নূহকে নির্দেশ দেন, সর্বজাতীয় পশু, সর্বজাতীয় পক্ষী ও সর্বজাতীয় ভূচর সরীসৃপ স্ত্রীপুরুষ জোড়া জোড়া সাথে নিতে এবং নূহ এ নির্দেশ এভাবে পালন করেছিলেন।

কিন্তু তৃতীয় বক্তব্য থেকে জানা যায়, তিনি তাকে সকল পবিত্র পশু এবং সকল পাখি সাত জোড়া করে সাথে নিতে নির্দেশ দেন। আর অপবিত্র পশু জোড়া জোড়া করে সাথে নিতে নির্দেশ দেন। প্রথম দুই বক্তব্যে ‘‘সাত জোড়ার’’ কোনোরূপ উল্লেখ নেই; বরং পবিত্র ও অপবিত্র সকল পশু ও পাখী এক জোড়া করে নেওয়ার নির্দেশ রয়েছে। পক্ষান্তরে তৃতীয় বক্তব্যে শুধু অপবিত্র পশু এক জোড়া করে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এভাবে এখানে উভয় বক্তব্যের মধ্যে বড় রকমের বৈপরীত্য বিদ্যমান।

৮- দায়ূদ আলাইহিস সালাম-এর বন্দীদের সংখ্যা বর্ণনায় বৈপরীত্য

২ শমূয়েলের ৮ অধ্যায়ের ৪ পঙ্ক্তি নিম্নরূপ: ‘‘দায়ূদ তাঁহার নিকট হইতে সতের শত অশ্বারোহী ও বিশ সহস্র পদাতিক সৈন্য হস্তগত করিলেন।’’

একই ঘটনার বর্ণনায় ১ বংশাবলির ১৮ অধ্যায়ের ৪ পঙক্তিতে বলা হয়েছে: ‘‘দায়ূদ তাহার নিকট হইতে এক সহস্র রথ, সাত সহস্র অশ্বারোহী ও বিশ সহস্র পদাতিক সৈন্য হস্তগত করিলেন।’’

এখানে একই ঘটনার বর্ণনায় উভয় বক্তব্যের মধ্যে বৈপরীত্য সুস্পষ্ট। দ্বিতীয় শ্লোকে ১,০০০ রথ এবং ৫,৩০০ পদাতিক সৈন্যের কথা বেশি বলা হয়েছে।

৯- দায়ূদ কর্তৃক নিহত অরামীয় সৈন্যদের সংখ্যা বর্ণনায় বৈপরীত্য:

২ শমূয়েল ১০ অধ্যায়ের ১৮ পঙক্তি নিম্নরূপ: ‘‘আর দায়ূদ অরামীয়দের সাত শত রথারোহী ও চল্লিশ সহস্র অশ্বারোহী সৈন্য বধ করিলেন।’’

পক্ষান্তরে ১ বংশাবলি ১৯ অধ্যায়ের ১৮ পঙক্তি নিম্নরূপ: ‘‘আর দায়ূদ অরামীয়দের সাত সহস্র রথারোহী ও চল্লিশ সহস্র পদাতিক সৈন্য বধ করিলেন।’’

এখানে রথারোহীদের বর্ণনায় ৬,৩০০ জনের পার্থক্য। অবশিষ্ট ৪০ হাজার নিহত সৈন্য পদাতিক না অশ্বারোহী সে বিষয়েও বৈপরীত্য রয়েছে।

১০- সুলাইমান আলাইহিস সালাম-এর অশ্বশালার সংখ্যা বর্ণনায় বৈপরীত্য:

১ রাজাবলির ৪র্থ অধ্যায়ের ২৬ শ্লোকটি নিম্নরূপ: ‘‘শলোমনের রথের নিমিত্ত চল্লিশ সহস্র অশ্বশালা ও বারো সহস্র অশ্বারোহী ছিল। (And Solomon had forty thousand stalls of horses for his chariots, and twelve thousand horsemen)’’

২ বংশাবলির ৯ম অধ্যায়ের ২৫ শ্লোকটি নিম্নরূপ: ‘‘শলোমনের চারি সহস্র অশ্বশালা[29] ও দ্বাদশ সহস্র অশ্বারোহী ছিল। (And Solomon had four thousand stalls for horses and chariots, and twelve thousand horsemen)’’

এখানে উভয় বক্তব্যের মধ্যে বৈপরীত্য সুস্পষ্ট। প্রথম শ্লোকে দ্বিতীয় শ্লোকের চেয়ে ৩৬,০০০ বেশি অশ্বশালার কথা বলা হয়েছে।

বাইবেল ভাষ্যকার আদম ক্লার্ক বলেন: সংখ্যাটির উল্লেখের ক্ষেত্রে বিকৃতি ঘটেছে বলে স্বীকার করে নেওয়াই আমাদের জন্য উত্তম।

১১- যীশুর বংশাবলি বর্ণনায় বৈপরীত্য:

যদি কেউ মথিলিখিত সুসমাচারের ১ম অধ্যায়ের ১-১৭ পঙক্তিতে  প্রদত্ত যীশুখৃস্টের বংশতালিকা বা বংশাবলি-পত্রের সাথে লূকলিখিত সুসমাচারের ৩য় অধ্যায়ের ২৩-৩৮ পঙক্তিতে উল্লিখিত যীশু খৃস্টের বংশাবলি-পত্রের তুলনা করেন তাহলে উভয়ের মধ্যে নিম্নরূপ ৬টি মারাত্মক বৈপরীত্য দেখতে পাবেন:

  1. মথি থেকে জানা যায় যে, মরিয়মের স্বামী যোশেফ-এর পিতার নাম যাকোব। আর লূক থেকে জানা যায় যে, যোশেফ-এর পিতা এলি।
  2. মথি থেকে জানা যায় যে, যীশু দায়ূদের পুত্র শলোমনের বংশধর। লূক থেকে জানা যায় যে, যীশু দায়ূদের পুত্র নাথন-এর বংশধর।
  3. মথি থেকে জানা যায় যে, দায়ূদ থেকে ব্যবিলনের নির্বাসন পর্যন্ত যীশুর পূর্বপুরুষগণ সকলেই সুপ্রসিদ্ধ রাজা ছিলেন। লূক থেকে জানা যায় যে, দায়ূদ ও নাথন বাদে যীশুর পুর্বপুরুষগণের মধ্যে কেউই রাজা ছিলেন না বা কোনো প্রসিদ্ধ ব্যক্তি ছিলেন না।
  4. মথি থেকে জানা যায় যে, শল্টীয়েল-এর পিতার নাম যিকিনিয়। আর লূক থেকে জানা যায় যে, শল্টীয়েলের[30] পিতার নাম নেরি।
  5. মথি থেকে জানা যায় যে, সরুববাবিলের পুত্রের নাম অবীহূদ। আর লূক থেকে জানা যায় যে, সরুববাবিলের পুত্রের নাম রীষা। মজার কথা হলো, ১ বংশাবলির ৩য় অধ্যায়ে সরুববাবিলের সন্তানগণের নাম লেখা আছে, সেখানে অবীহূদ বা রীষা কোনো নামই লেখা নেই। এজন্য প্রকৃত সত্য কথা হলো মথি ও লূক উভয়ের বর্ণনায় ভুল।
  6. মথির বিবরণ অনুযায়ী দায়ূদ থেকে যীশু পর্যন্ত উভয়ের মাঝে ২৬ প্রজন্ম। আর লূকের বর্ণনা অনুযায়ী উভয়ের মাঝে ৪১ প্রজন্ম। দায়ূদ ও যীশুর মধ্যে ১০০০ বৎসরের ব্যবধান। এতে প্রত্যেক প্রজন্মের সময়কাল মথির বিবরণ অনুসারে ৪০ বৎসর এবং লূকের বর্ণনা অনুসারে ২৫ বৎসর।

তৃতীয় শতাব্দীতে সুসমাচার দুটির প্রসিদ্ধি লাভের যুগ থেকে আজ পর্যন্ত সকল যুগের খৃস্টান ধর্মগুরু ও পণ্ডিতগণ এ মারাত্মক বৈপরীত্য ও সাংঘর্ষিক বর্ণনার কারণে বিব্রত ও বিমূঢ় হয়েছেন। বিভিন্ন অপ্রাসঙ্গিক ব্যাখ্যার মাধ্যমে এর সমন্বয়ের চেষ্টা করেছেন যা সবই ব্যর্থ চেষ্টা। তারা আশা করেছেন, যুগের আবর্তনে এ বৈপরীত্যের সমাধান প্রকাশিত হবে, কিন্তু তাদের আশা নিরাশায় পর্যবসিত হয়েছে। এ দুই বংশতালিকার বৈপরীত্য অতীতের মত একই ভাবে বর্তমান যুগের পণ্ডিতদেরকে হতবাক করছে।

১২- যীশু কর্তৃক আরোগ্যকৃতদের বর্ণনায় বৈপরীত্য:

মথির সুসমাচারের ২০ অধ্যায়ের ২৯-৩৪ শ্লোকে দুই অন্ধ ব্যক্তির কাহিনী বর্ণিত হয়েছে। তাতে বলা হয়েছে: ‘‘(২৯) পরে যিরীহো হইতে তাঁহাদের বাহির হইবার সময়ে বিস্তর লোক তাঁহার পশ্চাৎ পশ্চাৎ গমন করিল। (৩০) আর দেখ, দুই জন অন্ধ পথের পাশে বসিয়াছিল। …. (৩৪) তখন যীশু করুণাবিষ্ট হইয়া তাহাদের চক্ষু স্পর্শ করিলেন, আর তখনই তাহারা দেখিতে পাইল ও তাহার পশ্চাৎ পশ্চাৎ চলিল।’’

মথির সুসমাচারের ৮ অধ্যায়ের ২৮-৩৪ শ্লোকে দুজন ভুত-গ্রস্ত লোকের গল্প বলা হয়েছে। এখানে বলা হয়েছে: ‘‘পরে তিনি পরপারে গাদারীয়দের দেশে গেলে দুই জন ভূতগ্রস্ত লোক কবরস্থান হইতে বাহির হইয়া তাঁহার সম্মুখে উপস্থিত হইল; তাহারা এত বড় দুর্দান্ত ছিল যে, ঐ পথ দিয়া কেহই যাইতে পরিত না।…’’

দুটি ঘটনাই মার্ক উল্লেখ করেছেন। প্রথম ঘটনা মার্কের সুসমাচারের ১০ অধ্যায়ের ৪৬-৫২ শ্লোকে উল্লেখ করা হয়েছে। এখানে উল্লেখ করা হয়েছে যে, যিরীহো হতে বের হওয়ার পরে যীশু পথে তিময়ের পুত্র বরতিময়নামক একজন অন্ধকে দেখতে পান এবং তাকে সুস্থ করেন। অর্থাৎ মার্কের বর্ণনানুসারে যীশু মাত্র একজন অন্ধকে দেখতে পান ও সুস্থ করেন। আর মথির বর্ণনানুসারে তিনি দুজন অন্ধকে দেখেন ও সুস্থ করেন।

দ্বিতীয় ঘটনা মার্কের ৫ অধ্যায়ের ১-২০ শ্লোকে উল্লেখ করা হয়েছে। এখানে মাত্র একজন ভূতগ্রস্তের কথা বলা হয়েছে। তাহলে মথির বর্ণনা অনুসারে যীশু দুজন পাগলকে দেখেন ও সুস্থ করেন। আর মার্কের বর্ণনা অনুসারে তিনি মাত্র একজন পাগলকে দেখেন ও সুস্থ করেন।

১৩- প্রেরিতদের প্রতি যীশুর আজ্ঞায় লাঠির উল্লেখে বৈপরীত্য:

যীশু তাঁর ১২ জন শিষ্যকে প্রেরণ করার সময় যে আজ্ঞা প্রদান করেন তা মথি, মার্ক ও লূক উল্লেখ করেছেন। কিন্তু তাদের বর্ণনার মধ্যে কিছু কিছু বৈপরীত্য রয়েছে। সেগুলির মধ্যে একটি প্রেরিতদের সাথে যষ্ঠি বা লাঠি রাখার বিষয়। মথির ১০ অধ্যায়ের ৯-১০ পঙক্তিতে প্রেরিতদেরকে সাথে লাঠি রাখতে নিষেধ করেন। তিনি বলেন: ‘‘(৯)  তোমাদের গেঁজিয়ায় স্বর্ণ কি রৌপ্য কি পিত্তল,  (১০) এবং যাত্রার জন্য থলি কি দুইটি আঙ্রাখা কি পাদুকা কি যষ্ঠি, এ সকলের আয়োজন করিও না।’’

লূকের বর্ণনাতেও দেখা যায় যে, যীশু লাঠি সাথে রাখতে নিষেধ করেছেন। লূকের ৯ অধ্যায়ের ৩ পঙক্তি নিম্নরূপ: ‘‘তিনি তাহাদিগকে কহিলেন, পথের জন্য কিছুই লইও না, যষ্ঠিও না…।’’

কিন্তু মার্কের বর্ণনা থেকে জানা যায় যে, তিনি প্রেরিতদেরকে লাঠি সাথে রাখার নির্দেশ দেন। মার্কলিখিত সুসমাচারের ৬ষ্ঠ অধ্যায়ের ৮-৯ পঙক্তি নিম্নরূপ: ‘‘(৮) আর আজ্ঞা করিলেন, তোমরা যাত্রার জন্য এক এক যষ্ঠি ব্যতিরেকে আর কিছু লইও না।, রুটীও না, ঝুলিও না, গেঁজিয়ায় পয়সাও না; (৯) কিন্তু পায়ে পাদুকা দেও, আর দুইটা আঙরাখা পরিও না।’’

এভাবে আমরা দেখছি যে, যীশুর আজ্ঞা বর্ণনায় সুসমাচারত্রয়ের বর্ণনার মধ্যে সুস্পষ্ট বৈপরীত্য বিদ্যমান। প্রথম বক্তব্যদ্বয় অনুসারে যীশু প্রেরিতদেরকে লাঠি নিতে নিষেধ করেন। কিন্তু তৃতীয় বক্তব্য অনুসারে তিনি তাদেরকে লাঠি নিতে আদেশ করেন।

১৪- নিজের বিষয়ে যীশুর সাক্ষ্যের সত্যতার বিষয়ে বৈপরীত্য:

যোহনলিখিত সুসমাচারের ৫ম অধ্যায়ের ৩১ শ্লোকে যীশু বলেন: ‘‘আমি যদি আপনার বিষয়ে আপনি (নিজের বিষয়ে নিজে) সাক্ষ্য দিই তবে আমার সাক্ষ্য সত্য নয়।’’

আর এ পুস্তকেরই ৮ম অধ্যায়ের ১৪ শ্লোকে যীশু বলেন: ‘‘যদিও আমি আপনার বিষয়ে আপনি (নিজের বিষয়ে নিজে) সাক্ষ্য দিই তথাপি আমার সাক্ষ্য সত্য।’’

প্রথম বক্তব্য অনুসারে যীশুর নিজের বিষয়ে প্রদত্ত তার নিজের সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য নয়। কিন্তু দ্বিতীয় বক্তব্য অনুসারে তা গ্রহণযোগ্য।

১৫- বধ্যভূমিতে যীশুর ক্রুশবহনকারীর বর্ণনায় বৈপরীত্য

ক্রুশে চড়ানোর জন্য যীশুকে বধ্যভূমিতে নিয়ে যাওয়ার বর্ণনায় মথি ২৭/৩২ এর বক্তব্য: ‘‘আর বাহির হইয়া তাহারা শিমোন নামে এক জন কুরীণীয় লোকের দেখা পাইল; তাহাকেই তাঁহার ক্রুশ বহন করিবার জন্য বেগার ধরিল (তাকে যীশুর ক্রুশটি বহন করতে বাধ্য করল: him they compelled to bear his cross)।’’

লূকলিখিত সুসমাচারের ২৩ অধ্যায়ের ২৬ শ্লোকে বলা হয়েছে: ‘‘পরে তাহারা তাঁহাকে লইয়া যাইতেছে, ইতিমধ্যে শিমোন নামে এক জন কুরীণীয় লোক পল্লীগ্রাম হইতে আসিতেছিল, তাহারা তাহাকে ধরিয়া তাহার স্কন্ধে ক্রুশ রখিল, যেন সে যীশুর পশ্চাৎ পশ্চাৎ তাহা বহন করে।’’[31]

পক্ষান্তরে এ বিষয়ে যোহনলিখিত সুসমাচারের ১৯ অধ্যায়ের ১৭ শ্লোকে বলা হয়েছে: ‘‘তখন তাহারা যীশুকে লইল; এবং তিনি আপনি ক্রুশ বহন করিতে করিতে বাহির হইয়া মাথার খুলির স্থান নামক স্থানে গেলেন।’’

এখানে একই ঘটনার বর্ণনায় সুসমাচারত্রয়ের মধ্যে বৈপরীত্য সুস্পষ্ট। মথি ও লূকের বর্ণনা অনুসারে যীশুর ক্রুশটি বহন করেন শিমোন নামের এ কুরীণীয় লোক। আর যোহনের বর্ণনা অনুসারে ক্রুশটি বহন করেন যীশু নিজেই।

১৬- যীশু আগমন শান্তি না অশান্তির জন্য?

মথি ৫/৯ নিম্নরূপ: ‘‘ধন্য যাহারা মিলন করিয়া দেয় (Blessed are the peacemakers), কারণ তাহারা ঈশ্বরের পুত্র বলিয়া আখ্যাত হইবে।’’

লূক ৯/৫৬ নিম্নরূপ: ‘‘কারণ মনুষ্যপুত্র মনুষ্যদের প্রাণনাশ করিতে আইসেন নাই; কিন্তু রক্ষা করিতে আসিয়াছেন।’’

মথি ১০/৩৪ নিম্নরূপ: ‘‘মনে করিও না যে, আমি পৃথিবীতে শান্তি দিতে আসিয়াছি; শান্তি দিতে আসি নাই, কিন্তু খড়গ দিতে আসিয়াছি।’’

লূক ১২/৪৯ ও ৫১ নিম্নরূপ: ‘‘(৪৯) আমি পৃথিবীতে অগ্নি নিক্ষেপ করিতে আসিয়াছি; আর এখন যদি তাহা প্রজ্বলিত হইয়া থাকে, তবে আর চাই কি? … (৫১) তোমরা কি মনে করিতেছ, আমি পৃথিবীতে শান্তি দিতে আসিয়াছি? তোমাদিগকে বলিতেছি, তাহা নয়, বরং বিভেদ।’’

উপরের বক্তব্যগুলির মধ্যে বৈপরীত্য সুস্পষ্ট। প্রথম দুটি বক্তব্যে শান্তি, ঐক্য ও মিলন সৃষ্টিকারীদের প্রশংসা করা হয়েছে এবং বলা হয়েছে যে, যীশু নিজেও ধ্বংস নয়, বরং রক্ষা করতে আগমন করেন। কিন্তু শেষ দুটি বক্তব্যে সম্পূর্ণ বিপরীত কথা বলা হয়েছে। এখানে বলা হয়েছে যে, তিনি খড়্গ, হানাহানি, ধ্বংস ও বিভেদ সৃষ্টির জন্য আগমন করেন। এ থেকে বুঝা যায় যে, তিনি মুক্তি, শান্তি, মিলন ও রক্ষার জন্য আগমন করেন নি; কাজেই যাদেরকে ধন্য বলা হবে এবং ঈশ্বরের পুত্র বলা হবে তিনি তাদের অন্তর্ভুক্ত নন।

১. ৩. ২. ভুলভ্রান্তি

পূর্বোক্ত বৈপরীত্য ও অনুরূপ অগণিত বৈপরীত্য ছাড়াও বাইবেলের পুস্তকগুলির মধ্যে রয়েছে অগণিত ভুলভ্রান্তি। বৈপরীত্য ও ভুলভ্রান্তির মধ্যে পার্থক্য হলো, বাইবেলের বিভিন্ন পুস্তক, পাণ্ডুলিপি বা সংস্করণের মধ্যে তুলনা করে বৈপরীত্য জানা যায়। আর ভুল জানা যায় জ্ঞান, বুদ্ধি, বিবেক, মানবীয় রীতি, ঐতিহাসিক তথ্য, গণিত বিদ্যা বা অন্য কোনো জ্ঞানের আলোকে বাইবেলের তথ্য বিচার করার মাধ্যমে। গবেষক পণ্ডিতগণ বাইবেলের মধ্যে এরূপ অনেক ভুলভ্রান্তির কথা উল্লেখ করেছেন। এখানে অল্প কয়েকটি দেখুন:

১- ইস্রায়েল সন্তানদের মিসরে অবস্থানকার সম্পর্কে ভুল তথ্য:

যাত্রাপুস্তকের ১২ অধ্যায়ের ৪০ শ্লোকে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ‘ইস্রায়েল-সন্তানেরা চারি শত ত্রিশ বৎসর কাল মিসরে প্রবাস করিয়াছিল।

এ তথ্যটি ভুল। ইস্রায়েল-সন্তানগণ ৪৩০ বৎসর নয়, বরং ২১৫ বৎসরকাল মিশরে অবস্থান করেছিল। তবে কনান দেশে ও মিসরে উভয় স্থানে ইস্রায়েল সন্তানগণের পূর্বপুরুষ ও তাদের মোট অবস্থানকাল ছিল ৪৩০ বৎসর। কারণ ইবরাহীম আলাইহিস সালাম-এর কনান দেশে প্রবেশ থেকে তাঁর পুত্র ইসহাক আলাইহিস সালাম-এর জন্ম পর্যন্ত ২৫ বৎসর। ইসহাকের জন্ম থেকে ইয়াকূব আলাইহিস সালাম বা ইস্রায়েল-এর জন্ম পর্যন্ত ৬০ বৎসর। ইয়াকূব আলাইহিস সালাম-এর অপর নাম বা প্রসিদ্ধ উপাধি ‘‘ইস্রায়েল’’ এবং তাঁর বংশধররাই বনী ইসরাঈল বা ইস্রায়েল সন্তানগণ বলে পরিচিত।

ইয়াকূব বা ইস্রায়েল আলাইহিস সালাম যখন তাঁর বংশধরদের নিয়ে মিসরে প্রবেশ করেন তখন তাঁর বয়স ছিল ১৩০ বৎসর। এভাবে আমরা দেখছি যে, ইব্রাহীমের আলাইহিস সালাম মিসরে প্রবেশ থেকে তাঁর পৌত্র ইয়াকূব (ইস্রায়েল)-এর মিসরে প্রবেশ পর্যন্ত সময়কাল (২৫+৬০+১৩০=) ২১৫।

ইস্রায়েল আলাইহিস সালাম-এর মিসরে প্রবেশ থেকে মূসা আলাইহিস সালাম-এর সাথে তাঁর বংশধরদের মিসর ত্যাগ পর্যন্ত সময়কাল ২১৫ বৎসর। এভাবে কানানে ও মিসরে তাদের মোট অবস্থানকাল (২১৫+২১৫=) ৪৩০ বৎসর।

ইয়াহূদী-খৃস্টান পণ্ডিতগণ একবাক্যে স্বীকার করেছেন যে, হিব্রু বাইবেলের এ তথ্যটি ভুল। তারা বলেন: শমরীয় তাওরাতে এখানে উভয় স্থানের অবস্থান একত্রে বলা হয়েছে এবং এখানে শমরীয় তাওরাতের বক্তব্যই সঠিক।

শমরীয় তাওরাত বা তাওরাতের শমরীয় সংস্করণ অনুসারে যাত্রাপুস্তকের ১২ অধ্যায়ের ৪০ পঙক্তি নিম্নরূপ: ‘‘ইস্রায়েল-সন্তানেরা ও তাদের পিতৃগণ কনান দেশে ও মিসরে চারি শত ত্রিশ বৎসর কাল অবস্থান করিয়াছিল।

এখানে গ্রীক তাওরাত বা তাওরাতে গ্রীক সংস্করণের ভাষ্য নিম্নরূপ: ‘‘কনান দেশে ও মিসরে ইস্রায়েল-সন্তানগণ ও তাদের পিতা-পিতামহগণের মোট অবস্থানকাল চারি শত ত্রিশ বৎসর।’’

খৃস্টান গবেষক ও পণ্ডিতগণের নিকট নির্ভরযোগ্য পুস্তক ‘‘মুরশিদুত তালিবীন ইলাল কিতাবিল মুকাদ্দাসিস সামীন’’ (মহামূল্য পবিত্র বাইবেলের ছাত্রগণের পথ নির্দেশক) নামক গ্রন্থে এভাবেই ইস্রায়েল সন্তানগণের ইতিহাস উল্লেখ করা হয়েছে। এ গ্রন্থের লেখক উল্লেখ করেছেন যে, ইয়াকূব আলাইহিস সালাম-এর মিসরে আগমন থেকে ঈসা আলাইহিস সালাম-এর জন্ম পর্যন্ত সময়কাল ১৭০৬ বৎসর। আর ইস্রায়েল সন্তানদের মিসর পরিত্যাগ ও ফিরাউনের সলিল সমাধি থেকে ইসা আলাইহিস সালাম-এর জন্ম পর্যন্ত সময়কাল ১৪৯১ বৎসর। ১৭০৬ থেকে ১৪০৯ বাদ দিলে ২১৫ বৎসর থাকে, এটিই হলো ইয়াকূব আলাইহিস সালাম-এর মিসর আগমন থেকে ইস্রায়েল সন্তানদের মিসর পরিত্যাগ পর্যন্ত সময়।

এখানে অন্য একটি বিষয় এ সময়কাল নিশ্চিত করে। মূসা আলাইহিস সালাম ছিলেন ইয়াকূব (ইস্রায়েল আ.)-এর অধস্তন ৪র্থ পুরুষ। ইয়াকূবের পুত্র লেবি, তার পুত্র কহাৎ, তার পুত্র অম্রাম (Amram: ইমরান), তার পুত্র মূসা আলাইহিস সালাম। এতে বুঝা যায় যে, মিসরে ইস্রায়েল সন্তানগণের অবস্থান ২১৫ বৎসরের বেশি হওয়া অসম্ভব। আর ইয়াহূদী-খৃস্টান ঐতিহাসিক, ব্যাখ্যাকার ও গবেষকগণ একমত পোষণ করেছেন যে, ইস্রায়েলীয়গণ ২১৫ বৎসর মিসরে অবস্থান করেন। তাদের মিসরে ৪৩০ বৎসর অবস্থানের যে তথ্য বাইবেলের হিব্রু সংস্করণে দেওয়া হয়েছে তা ভুল বলে তারা একমত হয়েছেন। এজন্য আদম ক্লার্ক বলেন, ‘‘সকলেই একমত যে, হিব্রু সংস্করণে যা বলা হয়েছে তার অর্থ অত্যন্ত সমস্যাসঙ্কুল। আর মূসা আলাইহিস সালাম-এর পাঁচ পুস্তক বা তোরাহ-এর বিষয়ে শমরীয় সংস্করণ অন্যান্য সংস্করণ থেকে অধিকতর বিশুদ্ধ। আর ইতিহাস শমরীয় তাওরাতের বক্তব্য সঠিক বলে প্রমাণ করে।

হেনরি ও স্কটের ব্যাখ্যাগ্রন্থের সংকলকগণ বলেন: শমরীয় তোরাহ-এর এই বক্তব্যই সত্য। এর দ্বারা হিব্রু তোরাহ-এর পাঠে যে সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে তা দূরীভুত হয়।

এ থেকে জানা গেল যে, হিব্রু বাইবেলে যাত্রাপুস্তকের ১২/৪০-এ যে তথ্য দেওয়া হয়েছে তা ভুল বলে স্বীকার করা ছাড়া ইয়াহূদী-খৃস্টান পণ্ডিতদের কোনো উপায় নেই।

২- মিসর পরিত্যাগের সময় ইস্রায়েলীয়দের সংখ্যা বর্ণনায় ভুল:

গণনাপুস্তকের প্রথম অধ্যায়ের ৪৪-৪৭ শ্লোকে উল্লেখ করা হয়েছে: ‘‘(৪৪) এই সকল লোক মোশি ও হারোণ … কর্তৃক গণিত হইল। (৪৫) স্ব স্ব পিতৃকুলানুসারে ইস্রায়েল-সন্তানগণ, অর্থাৎ বিংশতি বৎসর ও ততোধিক বয়স্ক ইস্রায়েলের মধ্যে যুদ্ধে গমনযোগ্য (৪৬) সমস্ত পুরুষ গণিত হইলে গণিত লোকদের সংখ্যা ছয় লক্ষ তিন সহস্র পাঁচ শত পঞ্চাশ হইল। (৪৭) আর লেবীয়েরা আপন পিতৃবংশানুসারে তাহাদিগের মধ্যে গণিত হইল না।’’[32]

এ শ্লোকগুলি থেকে জানা যায় যে, ইস্রায়েল-সন্তানগণ যখন মোশির সাথে মিশর ত্যাগ করে তখন তাদের ২০ বৎসরের অধিক বয়সের যুদ্ধেসক্ষম পুরুষদের সংখ্যা ছিল ছয় লক্ষের অধিক (৬,০৩,৫৫০)। লেবীর বংশের সকল নারী, লেবীয় বংশের সকল পুরুষ, অন্যান্য সকল বংশের সকল নারী এবং সকল বংশের ২০ বৎসরের কম বয়স্ক সকল যুবক ও কিশোর পুরুষ বাদ দিয়েই ছিল এই সংখ্যা।

চার শ্রেণীর মানুষ এই গণনা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে: ১. লেবীর বংশের সকল নারী, ২. লেবীয় বংশের সকল পুরুষ, ৩. অন্যান্য সকল বংশের সকল নারী এবং ৪. সকল বংশের ২০ বৎসরের কম বয়স্ক সকল যুবক ও কিশোর পুরুষ বাদ দিয়েই ছিল এই সংখ্যা।

তাহলে যদি এই চার প্রকারের নারী, পুরুষ ও যুবক-কিশোরদের গণনায় ধরা হয় তাহলে মিশর ত্যাগকালে তাদের সংখ্যা দাঁড়াবে কমপক্ষে ২৫ লক্ষ। আর এই তথ্য কেনোমতেই সঠিক হতে পারে না। কারণ:

প্রথমত, আদিপুস্তক ৪৬/২৭, যাত্রাপুস্তক ১/৫, দ্বিতীয় বিবরণ ১০/২২ -এ স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ইস্রায়েল-সন্তানগণ যখন মিশরে প্রবেশ করে তখন তাদের সংখ্যা ছিল ৭০ জন।

দ্বিতীয়ত, ইস্রা্য়েল-সন্তানগণ মিশরে অবস্থান করেছিলেন সর্বমোট ২১৫ বৎসর। এর বেশি তারা অবস্থান করেন নি।

তৃতীয়ত, যাত্রাপুস্তকের প্রথম অধ্যায়ের ১৫-২২ শ্লোকে উল্লেখ করা হয়েছে যে, তাদের মিশর ত্যাগের ৮০ বৎসর পূর্ব থেকে তাদের সকল পুত্র সন্তানকে হত্যা করা হত থাকে এবং কন্যা সন্তানদেরকে জীবিত রাখা হত।

এ তিনটি বিষয়ের আলোকে যে কোনো সাধারণ জ্ঞান সম্পন্ন মানুষ নিশ্চিত হবেন যে, মিসর ত্যাগের সময় ইস্রায়েল সন্তানদের যে সংখ্যা (৬,০৩,৫৫০) উল্লেখ করা হয়েছে তা নিঃসন্দেহে ভুল।

আমরা যদি পুত্র সন্তান হত্যার বিষয়টি একেবারে বাদ দিই এবং মনে করি যে, ইস্রায়েল সন্তানগণ মিশরে অবস্থানকালে তাদের জনসংখ্যা এত বেশি বৃদ্ধি পেত যে, প্রতি ২৫ বৎসরে তাদের সংখ্যা দ্বিগুণ হয়ে যেত, তাহলেও তাদের সর্বমোট জনসংখ্যা ২১৫ বৎসরে ৭০ থেকে ৩৬০০০ (ছত্রিশ হাজার)-ও হতে পারে না। তাহলে সর্বমোট জনসংখ্যা ২৫ লক্ষ হওয়া বা লেবীয়গণ বাদে মোট পুরুষ যোদ্ধার সংখ্যা ছয় লক্ষ হওয়া কিভাবে সম্ভব! এর সাথে যদি শেষ ৮০ বছরের পুরুষ সন্তান হত্যার বিষয় যোগ করা হয় তাহলে বিষয়টি আরো অসম্ভব ও অযৌক্তিক বলে প্রমাণিত হয়।

প্রসিদ্ধ ঐতিহাসিক ও সমাজবিজ্ঞানী ইবনু খলদূন (৮০৮ হি/১৪০৫খৃ) তার ইতিহাসের ভূমিকায় বাইবেলে উল্লেখিত এ সংখ্যা অবাস্তব বলে মতপ্রকাশ করেছেন। কারণ মূসা ও ইস্রায়েল (ইয়াকূব)-এর মধ্যে মাত্র তিনটি স্তর বা চারটি প্রজন্ম। যাত্রাপুস্তক ৬/১৬-২০, গণনাপুস্তক ৩/১৭-১৯ ও ১ বংশাবলী ৬/১৮-এর বর্ণনা অনুসারে: মোশির পিতা অম্রাম (ইমরান), তার পিতা কহাৎ, তার পিতা লেবি, তার পিতা যাকোব। যাকোব ও মোশির মধ্যে তিন পুরুষ মাত্র। আর মানবীয় জ্ঞান ও বুদ্ধি-বিবেক কখনোই মানতে পারে না যে, মাত্র চার পুরুষে ৭০ জনের বংশধর ২০-২৫ লক্ষ হতে পারে।

নিম্নের বিষয়দুটি এ ভুলকে আরো নিশ্চিত করে:

(১) যাত্রাপুস্তকের ১২ অধ্যায়ের ৩৮-৪২ শ্লোক থেকে জানা যায় যে, ইস্রায়েল-সন্তানগণ যখন মিশর পরিত্যাগ করে তখন তাদের সাথে ছিল গৃহপালিত পশুর বিশাল বাহিনী। সকল মানুষ ও পশু একরাতের মধ্যে সমূদ্র পার হয়েছিলেন। তারা প্রতিদিন পথ চলতেন এবং তাদের যাত্রার জন্য মোশির নিজের মুখের সরাসরি নির্দেশই যথেষ্ট ছিল। তারা সমূদ্র অতিক্রম করার পরে সিনাই পর্বতের পার্শে ১২টি ঝর্ণার পার্শ্বে অবস্থান গ্রহণ করেন। যদি ইস্রায়েল সন্তানগণের সংখ্যা এ সময়ে ২০/২৫ লক্ষই হতো তাহলে কখনোই একরাতে তারা সকল মানুষ ও পশুর বিশাল বাহিনী সমূদ্র অতিক্রম করতে পারতেন না, প্রতিদিন পথ চলতে পারতেন না, মূসা আলাইহিস সালাম-এর মুখের কথা শুনেই সকলে যাত্রা শুরু করতে পারতেন না এবং সিনাই প্রান্তরের সীমিত স্থানে মাত্র ১২টি ঝর্ণায় তাদের এত মানুষ ও পশুর বিশাল বাহিনীর স্থান সংকুলান হতো না।

(২) যাত্রাপুস্তকের প্রথম অধ্যায়ের ১৫-২২ শ্লোকে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ইস্রায়েল সন্তানদের মধ্যে মাত্র দুজন ধাত্রী ছিল: একজনের নাম শিফ্রা ও অন্যজনের নাম পূয়া। মিশরের রাজা ফরৌণ এ দুই ইব্রীয়া ধাত্রীকে নির্দেশ প্রদান করেন যে, তোমরা ইব্রীয় (ইস্রায়েলী) মহিলাদের সন্তান প্রসব করানোর সময় তাদের পুত্র সন্তান হলে হত্যা করবে এবং কন্যা সন্তান হলে তাকে জীবিত রাখবে। যদি ইস্রায়েলীগণের সংখ্যা এত বেশি হতো তাহলে কোনো অবস্থাতেই মাত্র দুইজন ধাত্রী তাদের সকলের জন্য ধাত্রীকর্ম করতে পারতো না। বরং তাদের মধ্যে শতশত ধাত্রী থাকতো।

উপরের আলোচনা থেকে এথা স্পষ্ট যে, মিশর ত্যাগের সময় ইস্রায়েল-সন্তানদের সংখ্যা ছিল, ৭০ জন থেকে স্বাভাবিক জনসংখ্যা বৃদ্ধিতে ২১৫ বৎসরে যেমন হতে পরে, যাদের মহিলাদের ধাত্রী-কর্ম করার জন্য দুইজন ধাত্রীই যথেষ্ট ছিল, একটি রাতই যাদের সমূদ্র পারাপারের জন্য যথেষ্ট ছিল, একদিনে মৌখিক আদেশ প্রদান করেই মোশি যাদেরকে নিয়ে সমূদ্র পার হতে পেরেছেন, সিনাই পর্বতের পাদদেশে এবং ইলমের সংকীর্ণ স্থানে সাথের গৃহপালিত পশু সহ যাদের স্থান সংকুলান হয়েছিল। সামান্যতম সন্দেহ ছাড়াই আমরা সুনিশ্চিত যে মিসর ত্যাগের সময় ইস্রায়েলীয়দের সংখ্যার বিষয়ে যাত্রাপুস্তকের ১/৪৪-৪৭-এর বর্ণনা ভুল ও অসত্য।

৩- যে ভুলের জন্য দায়ূদ আলাইহিস সালামের নুবুওয়াত বাতিল হয়!

দ্বিতীয় বিববরণ ২৩/২: ‘‘জারজ ব্যক্তি সদাপ্রভুর সমাজে প্রবেশ করিবে না; তাহার দশম পুরুষ পর্যন্তও সদাপ্রভুর সমাজে প্রবেশ করিতে পারিবে না।’’ এ বক্তব্যটি ভুল। কারণ এটি সত্য হলে দায়ূদ আলাইহিস সালাম সদাপ্রভুর সমাজে প্রবেশ করতে পারবেন না; নবী বা ভাববাদী হওয়া তো দূরের কথা। কারণ দায়ূদের দশম পূর্বপুরুষ পেরস তারা দাদা যিহূদার জারজ সন্তান ছিলেন।[33] যিহূদা তার পুত্রবধু -মৃতপুত্রের স্ত্রী- তামরের সাথে ব্যভিচারে লিপ্ত হন এবং এ ব্যভিচারের ফলে পেরসের জন্ম হয়। আদিপুস্তকের ৩৮/১২-৩০ শ্লোকে তা সুস্পষ্টত বর্ণিত হয়েছে।

পেরস থেকে শুরু করলে দায়ূদ দশম পুরুষ হন। মথিলিখিত সুসমাচারের ১/১-৬ এবং লূকলিখিত সুসমাচারের ৩/৩১-৩৩-এ বর্ণিত দায়ূদের বংশতালিকা নিম্নরূপ: (১) দায়ূদ বিন (২) যিশয় বিন (৩) ওবেদ বিন (৪) বোয়স বিন (৫) সল্মোন বিন (৬) নহশোন বিন (৭) অম্মীনাদব বিন (৮) রাম বিন (৯) হিষ্রোন বিন (১০) পেরস। মথি ১/৩-৬: ‘‘যিহূদার পুত্র পেরস… পেরসের পুত্র হিয্রোন, হিয্রোণের পুত্র রাম, রামের পুত্র অম্মীনাদব, অম্মীনাদবের পুত্র সলমোন, সলমোনের পুত্র বোয়স … বোয়সের পুত্র ওবেদ … ওবেদের পুত্র যিশয়, যিশয়ের পুত্র দায়ূদ।’’

দ্বিতীয় বিবরণের ৩২ অধ্যায়ের দ্বিতীয় শ্লোক সঠিক হলে দায়ূদ কখনোই নবী হতে পারেন না। অথচ দায়ূদ আলাইহিস সালাম- সদাপ্রভুর সমাজের নেতা ও গৌরব। তারই পরিচয়ে যীশুখৃস্টের পরিচয়।

গীতসংহিতার ৮৯ গীতের ২৬-২৭ শ্লোকের বর্ণনা অনুসারে তিনি সদাপ্রভুর প্রথমজাত (firstborn) সন্তান বা জ্যৈষ্ঠ পুত্র এবং সকল রাজার সেরা ও সর্বোচ্চ রাজা। কাজেই দ্বিতীয় বিবরণের এ শ্লোকটি নিঃসন্দেহে ভুল ও অসত্য।

এখানে একটি জালিয়াতির অবস্থা দেখুন। লন্ডনে ১৮২৫ সালে মুদ্রিত রজার্ড ওয়াটস-এর বাইবেলে এবং ১৮২৬ সালে কলকাতায় মুদ্রিত বাইবেলে (উইলিয়াম কেরির বঙ্গানুবাদ বাইবেলে) লূকলিখিত সুসমাচারের তৃতীয় অধ্যায়ে যীশুর বংশতালিকায় দায়ূদের অষ্টম পূর্বপুরুষ ‘‘রাম’’ ও নবম পূর্বপুরুষ ‘‘হিয্রোন’’-এর মধ্যে ‘‘অর্নি’’ নামটি সংযোজন করে বলা হয়েছে ‘‘রাম বিন অর্ণি বিন হিয্রোন বিন পেরস’’ (কেরির বাংলা বাইবেলে: ইনি অদমানের পুত্র, ইনি অর্নির পুত্র, ইনি হিয্রোনের পুত্র, ইনি পেরসের পুত্র)।

এ সংযোজনের উদ্দেশ্য দায়ূদকে বাঁচানো, যেন তিনি পেরসের দশম পুরুষ না হয়ে একাদশ পুরুষ হন। কিন্তু বিকৃতিকারীগণ এখানে সংযোজনের সময় মথির লেখা বংশতালিকায় ‘‘অর্নি’’ নামটি সংযোজন করতে ভুলে গিয়েছেন। ফলে উক্ত দুটি সংস্করণেই মথির বংশতালিকা অনুসারে দায়ূদ পেরসের দশম পুরুষই রয়ে গিয়েছেন। ফলে তাদের সংস্করণেই মথির বক্তব্যের সাথে লূকের বক্তব্যের বৈপরীত্য দেখা দিয়েছে এবং তাদের জালিয়াতি ধরা পড়ে গিয়েছে। আর সর্বাবস্থায় দায়ূদের জারজ সন্তানের দশম পুরুষ হওয়ার বিষয়টি থেকেই যাচ্ছে।

অনুরূপভাবে ১৮৪৪ সালের সংস্করণে ও ১৮৬৫ সালের সংস্করণেও ‘‘অর্নি’’ নামটি সংযোজন করা হয় নি, মথিতেও না, লূকেও না, বরং উভয় সুসমাচারেই ‘‘রাম বিন হিষ্রোন’’ লেখা হয়েছে।[34]

প্রকৃত সত্য কথা হলো, আদিপুস্তকের ৩৮ অধ্যায়ের ১২-৩০ শ্লোকে পুত্রবধু তামরের সাথে যিহূদার ব্যভিচারের যে ঘৃণ্য কাহিনী লেখা হয়েছে তা সম্পূর্ণ জাল ও বানোয়াট কাহিনী। পাশাপাশি দ্বিতীয় বিবরণের ২৩ অধ্যায়ের ২ শ্লোকটি (জারজ সন্তানের দশম পুরুষ পর্যন্ত জান্নাতে যাবে না) ভুল। কারণ এরূপ বিধান কখনো আল্লাহর পক্ষ থেকে আসতে পারে না। মূসা আলাইহিস সালাম কখনো এরূপ কথা লিখতে পারেন না। কারণ একের পাপের ভার অন্যে বহন করবে তা হতে পারে না। এজন্য বাইবেল ভাষ্যকার হার্সলি বলেন: ‘‘(দশম পরুষ পর্যন্ত সদাপ্রভুর সমাজে {জান্নাতে} প্রবেশ করতে পারবে না) কথাটি সংযোজিত (জাল ও বানোয়াট)।’’

৪- বৈত-শেমস গ্রামের নিহতদের সংখ্যা বর্ণনায় ভুল

১ শমূয়েল-এর ৬ অধ্যায়ের ১৯ শ্লোকে বলা হয়েছে: ‘‘পঞ্চাশ সহস্র জনকে’’[35]। এই কথাটি নির্ভেজাল ভুল ও অসত্য। দ্বিতীয় অধ্যায়ের দ্বিতীয় আলোচ্যে পাঠক তা বিস্তারিত জানতে পারবেন।

শমূয়েল ভাববাদীর ১ম পুস্তকের ৪-৬ অধ্যায়ে ইস্রায়েল সন্তানদের নিয়ম-সিন্দুক বা ঈশ্বরীয় সিন্দুক পলেষ্টীয়দের হস্তগত হওয়া ও তা পুনরুদ্ধারের ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। সদাপ্রভুর-সিন্দুক ফেরত আনার সময়ে বৈৎ-শেমশ গ্রামের বাসিন্দারা মাঠে গম কাটছিল। তাঁরা চোখ তুলে সিন্দুকটি দেখতে পান এবং আনন্দিত হন। এজন্য সদাপ্রভু ঈশ্বর তাদেরকে শাস্তি প্রদান করেন। শাস্তির বিবরণে ১ শমূয়েলের ৬ অধ্যায়ের ১৩ ও ১৯ শ্লোকে বলা হয়েছে: ‘‘(১৩) ঐ সময়ে বৈৎ-শেমন নিবাসীরা তলভূমিতে গোম কাটিতেছিল; তাহারা চুক্ষু তুলিয়া সিন্দুকটা দেখিল, দেখিয়া আহ্লাদিত হইল। … (১৯) পরে তিনি বৈৎ-শেমশের লোকদের মধ্যে কাহাকে কাহাকে আঘাত করিলেন, কারণ তাহারা সদাপ্রভুর সিন্দুকে দৃষ্টিপাত করিয়াছিল, ফলত তিনি লোকদের মধ্যে সত্তর জনকে এবং পঞ্চাশ সহস্র জনকে আঘাত করিলেন (he smote of the people fifty thousand and threescore and ten men)। তাহাতে লোকের বিলাপ করিল, কেননা সদাপ্রভু মহা আঘাতে লোকদিগকে আঘাত করিয়াছেন।’’

এ কথাটি নিঃসন্দেহে ভুল ও বিকৃত। আদম ক্লার্ক তাঁর ব্যখ্যাগ্রন্থের এ কথাগুলির ত্রুটি বর্ণনা করার পরে বলেন: বাহ্যত বুঝা যায় যে, হিব্রু পাঠ এখানে বিকৃত। সম্ভবত এখানে মূল পাঠ থেকে কিছু শব্দ ছুটে গিয়েছে, অথবা অজ্ঞতার কারণে বা ইচ্ছাকৃতভাবে এর মধ্যে কিছু শব্দ বৃদ্ধি করা হয়েছে। কারণ, একথা জ্ঞানত অসম্ভব যে, সেই ছোট্ট একটি গ্রামে এত পরিমাণ মানুষ বসবাস করবে অথবা এত অধিক সংখ্যক মানুষ একত্রে মাঠের মধ্যে গম কাটায় রত থাকবে। সবচেয়ে অসম্ভব বিষয় হলো, যে উটের পিঠে রাখা একটি ছোট্ট সিন্দকের দিকে বা মধ্যে পঞ্চাশ হাজার সত্তর জন মানুষ একত্রে বা একসাথে দৃষ্টিপাত করবেন বা দেখতে পাবেন।

অতঃপর তিনি বলেন: ‘‘ল্যাটিন অনুবাদে রয়েছে: সত্তর জন নেতা ও ৫০ হাজার সাধারণ মানুষ’, সিরীয় অনুবাদে রয়েছে: পাঁচ হাজার ৭০ জন মানুষ’, অনুরূপভাবে প্রাচীন আরবী অনুবাদে রয়েছে: পাঁচ হাজার ৭০ জন মানুষ। ঐতিহাসিক জোসেফাস (Flavius Josephus) শুধু ৭০ জন মানুষলিখেছেন। ইয়াহূদী পণ্ডিত শলোমন গার্গি ও অন্যান্য রাব্বি বিভিন্ন সংখ্যা লিখেছেন। এ সকল পরস্পরবিরোধী তথ্য এবং বাইবেলের পাঠে উল্লিখিত সংখ্যার অবাস্তবতার ভিত্তিতে আমরা নিশ্চিত যে, নিঃসন্দেহে এ স্থানে বিকৃতি সাধিত হয়েছে। হয়তবা কিছু কথা বৃদ্ধি করা হয়েছে অথবা কিছু কথা পড়ে গিয়েছে।’’

হেনরি ও স্কটের ব্যাখ্যাগ্রন্থে বলা হয়েছে: মূল হিব্রু বাইবেলে নিহতদের সংখ্যা (৫০,০৭০) বলা হয়েছে উল্টাভাবে (৭০ ও ৫০ হাজার)। এ ছাড়াও একটি ছোট্ট গ্রামের মধ্যে এত অধিক সংখ্যক মানুষের পাপে লিপ্ত হওয়া ও নিহত হওয়ার বিষয়টি অস্বাভাবিক ও অবিশ্বাস্য। কাজেই এই ঘটনার সত্যতার বিষয়ে সন্দেহ রয়েছে। জোসেফাস নিহতদের সংখ্যা শুধু ৭০লিখেছেন।

তাহলে দেখুন, কিভাবে এ সকল পণ্ডিত এ ঘটনা অবাস্তব বলে উড়িয়ে দিলেন, এ বর্ণনাকে মিথ্যা বলে প্রত্যাখ্যান করলেন এবং এখানে ইচ্ছাকৃত বিকৃতি ঘটেছে বলে স্বীকার করলেন।

৫- সুলাইমান আলাইহিস সালাম-এর বারান্ডার উচ্চতা বর্ণনায় ভুল

২ বংশাবলির ৩য় অধ্যায়ের ৪র্থ শ্লোকে সুলাইমান আলাইহিস সালাম এর মসজিদ বা আল-মাসজিদুল আকসার (বাইবেলের ভাষায়: শলোমনের মন্দিরের) বর্ণনায় বলা হয়েছে: ‘‘আর গৃহের সম্মুখস্থ বারান্ডা গৃহের প্রস্থানুসারে বিংশতি হস্ত দীর্ঘ ও এক শত বিংশতি হস্ত উচ্চ হইল।’’

‘‘১২০ হাত উচ্চ’’ কথাটি নিখাদ ভুল। ১ রাজাবলির ৬ অধ্যায়ের ২  শ্লোকে স্পষ্ট উল্লেখ করা হয়েছে যে, শলোমনের নির্মিত মন্দিরটির উচ্চতা ছিল ত্রিশ হস্ত। তাহলে বারান্ডা কিভাবে ১২০ হাত উচু হবে?

আদম ক্লার্ক তার ভাষ্যগ্রন্থে ২ বংশাবলির ৩য় অধ্যায়ের ৪র্থ শ্লোকের ভুল স্বীকার করেছেন। এজন্য সিরিয় (সুরিয়ানী) ভাষায় ও আরবী ভাষায় অনুবাদে অনুবাদকগণ ১২০ সংখ্যাকে বিকৃত করেছেন। তারা ‘‘এক শত’’ কথাটি ফেলে দিয়ে বলেছেন: ‘‘বিশ হাত উচ্চ’’

১৮৪৪ সালের আরবী অনুবাদে মূল হিব্রু বাইবেলের এ ভুল ‘‘সংশোধন’’ (!) করে লেখা হয়েছে: ‘‘আর গৃহের সম্মুখস্থ বারান্ডা গৃহের প্রস্থানুসারে বিংশতি হস্ত দীর্ঘ ও বিংশতি হস্ত উচ্চ হইল।’’

৬- অবিয় ও যারবিয়ামের সৈন্যসংখ্যা বর্ণনায় ভুল

২ বংশাবলির ১৩ অধ্যায়ে ৩ ও ১৭ শ্লোকে বলা হয়েছে: ‘‘(৩) অবিয় চারি লক্ষ মনোনিত যুদ্ধবীরের সহিত যুদ্ধে গমন করিলেন, এবং যারবিয়াম আট লক্ষ মনোনীত বলবান বীরের সহিত তাঁহার বিরুদ্ধে সৈন্য রচনা করিলেন। … (১৭) আর অবিয় ও তাঁহার লোকেরা মহাসংহারে উহাদিগকে সংহার করিলেন; বস্তুত ইস্রায়েলের পাঁচ লক্ষ মনোনীত লোক মারা পড়িল।’’

উপরের শ্লোকদ্বয়ে উল্লিখিত সংখ্যাগুলি সবই ভুল। বাইবেল ব্যাখাকারগণ তা স্বীকার করেছেন। সে যুগের ছোট্ট দুটি গোত্র রাজ্যযিহূদা ও ইস্রায়েরের জন্য উপরের সংখ্যাগুলি অস্বাভাবিক ও অবাস্তব। এ কারণে ল্যাটিন অনুবাদের অধিকাংশ কপিতে লক্ষ’-কে হাজারে নামিয়ে আনা হয়েছে, অর্থাৎ প্রথম স্থানে চারি লক্ষপাল্টিয়ে চল্লিশ হাজার’, দ্বিতীয় স্থানে আট লক্ষপাল্টিয়ে আশি হাজারও তৃতীয় স্থানে পাঁচ লক্ষপাল্টিয়ে ৫০ হাজারকরা হয়েছে। বাইবেলের ব্যাখ্যাকারগণ এই বিকৃতি ও পরিবর্তনকে মেনে নিয়েছেন। হর্ন ও আদম ক্লার্ক এ ‘‘সংশোধন’’ (!) সমর্থন করেছেন। আদম ক্লার্ক অনেক স্থানেই বারংবার সুস্পষ্টত উল্লেখ করেছেন এবং ঘোষণা করেছেন যে, বাইবেলের ইতিহাস বিষয়ক পুস্তগুলিতে বিকৃতি সাধিত হয়েছে।

৭- ফল ভোজন ও মানুষের আয়ু বিষয়ক ভুল

আদিপুস্তকের ২য় অধ্যায়ের ১৭ শ্লোকটি নিম্নরূপ: ‘‘কিন্তু সদসদ্-জ্ঞানদায়ক যে বৃক্ষ, তাহার ফল ভোজন করিও না, কেননা যে দিন তাহার ফল খাইবে, সেই দিন মরিবেই মরিবে (for in the day that thou eatest thereof thou shalt surely die)।’’

এ কথাটি ভুল। কারণ আদম আলাইহিস সালাম এই বৃক্ষের ফল ভোজন করেছেন এবং যে দিন এই বৃক্ষের ফল ভোজন করেছেন, সে দিন তিনি মরেন নি। বরং এর পরেও ৯০০ বৎসরেরও বেশি সময় তিনি জীবিত ছিলেন।

আদিপুস্তকের ৬ অধ্যায়ের ৩ শ্লোকটি নিম্নরূপ: ‘‘তাহাতে সদাপ্রভু কহিলেন, আমার আত্মা মানুষের মধ্যে সর্বদা অবস্থান করিবে না; কারণ সেও তো মাংসমাত্র; পরন্তু তার সময় এক শত বিংশতি বৎসর হইবে।’’[36]

‘‘মানুষের আয়ু ১২০ বৎসর হবে’’ এই কথাটি ভুল। কারণ পূর্ববর্তী যুগের মানুষদের বয়স আরো অনেক দীর্ঘ ছিল। আদিপুস্তকের ৫ অধ্যায়ের ১-৩১ শ্লোকের বর্ণনা অনুসারে আদম ৯৩০ বৎসর জীবিত ছিলেন। অনুরূপভাবে শিস (শেথ)  ৯১২ বৎসর, ইনোশ ৯০৫ বৎসর, কৈনন ৯১০ বৎসর, মহললেল ৮৯৫ বৎসর, যেরদ ৯৬২, হানোক (ইদরীস আ.) ৩৬৫ বৎসর, মথূশেলহ ৯৬৯ বৎসর, লেমক ৭৭৭ বৎসর পৃথিবীতে জীবিত ছিলেন। নোহ (নূহ) ৯৫০ বৎসর জীবিত ছিলেন।[37] শেম (সাম) ৬০০ বৎসর জীবিত ছিলেন।[38] অর্ফক্ষদ ৩৩৮ বৎসর আয়ু লাভ করেন।[39] এভাবে অন্যান্যরা দীর্ঘ জীবন লাভ করেছিলেন। আর বর্তমান যুগে ৭০ বা ৮০ বৎসর আয়ু পাওয়ার ঘটনাও কম ঘটে। এভাবে প্রমাণিত যে, মানুষের আয়ু ১২০ বৎসর বলে নির্ধারণ করা ভুল।

৮- যীশুর বংশতালিকায় পুরুষ গণনায় ভুল

মথিলিখিত সুসমাচারের ১ম অধ্যায়ের ১-১৭ শ্লোকে যীশুর বংশতালিকা বর্ণনা করা হয়েছে। ১৭ শ্লোকটি নিম্নরূপ: ‘‘এইরূপে আব্রাহাম অবধি দায়ূদ পর্যন্ত সর্বশুদ্ধ চৌদ্দ পুরুষ; দায়ূদ অবধি বাবিলে নির্বাসন পর্যন্ত চৌদ্দ পুরুষ; এবং বাবিলে নির্বাসন অবধি খ্রীষ্ট পর্যন্ত চৌদ্দ পুরুষ।’’

এখানে স্পষ্টত বলা হয়েছে যে, যীশুর বংশতালিকা তিন অংশে বিভক্ত, প্রত্যেক অংশে ১৪ পুরুষ রয়েছে এবং যীশু থেকে আব্রাহাম পর্যন্ত ৪২ পুরুষ। এ কথাটি সুস্পষ্ট ভুল। মথির ১/১-১৭-র বংশ তালিকায় যীশু থেকে আবরাহাম পর্যন্ত ৪২ পুরুষ নয়, বরং ৪১ পুরুষের উল্লেখ রয়েছে। প্রথম অংশ: ইবরাহীম আলাইহিস সালাম থেকে দায়ূদ আলাইহিস সালাম পর্যন্ত ১৪ পুরুষ, দ্বিতীয় অংশ সুলাইমান আলাইহিস সালাম থেকে যিকনিয় পর্যন্ত চৌদ্দ পুরুষ এবং তৃতীয় অংশ শল্টীয়েল থেকে এবং যীশু পর্যন্ত মাত্র ১৩ পুরুষ রয়েছেন।

তৃতীয় খৃস্টীয় শতকে বোরফেরী এই বিষয়টি সম্পর্কে আপত্তি উত্থাপন করেন, কিন্তু এর কোনো সঠিক সমাধান কেউ দিতে পারেন নি।[40]

৯- দায়ূদ কর্তৃক মহাযাজকের রুটি খাওয়ার বর্ণনায় ভুল

মথিলিখিত সুসমাচারের ১২ অধ্যায়ের ৩-৪ শ্লোক নিম্নরূপ: ‘‘(৩) তিনি (যীশু) তাহাদিগকে (ইয়াহূদী ফরীশীগণকে) কহিলেন, দায়ূদ ও তাঁহার সঙ্গীরা ক্ষধিত হইলে তিনি যাহা করিয়াছিলেন, তাহা কি তোমরা পাঠ কর নাই? (৪) তিনি ত ঈশ্বরে গৃহে প্রবেশ করিলেন, এবং তাঁহার দর্শন-রুটী ভোজন করিলেন, যাহা তাঁহার ও তাঁহার সঙ্গীদের ভোজন করা বিধেয় ছিল না, কেবল যাজকবর্গেরই বিধেয় ছিল।’’

মার্কলিখিত সুসমাচারের ২ অধ্যায়ের ২৫-২৬ শ্লোক নিম্নরূপ: ‘‘(২৫) তিনি তাহাদিগকে কহিলেন, দায়ূদ ও তাঁহার সঙ্গীরা খাদ্যের অভাবে ক্ষুধিত হইলে তিনি যাহা করিয়াছিলেন, তাহা কি তোমরা কখনো পাঠ কর নাই? (২৬) তিনি  ত অবিয়াথর মহাযাজকের সময়ে ঈশ্বরের গৃহে প্রবেশ করিয়া, যে দর্শন-রুটী যাজকবর্গ ব্যতিরেকে আর কাহারও ভোজন করা বিধেয় নয়, তাহাই ভোজন করিয়াছিলেন, এবং সঙ্গিগণকেও দিয়াছিলেন।’’

এখানে ও তাঁহার সঙ্গীরা’, ‘তাঁহার সঙ্গীদেরএবং ‘‘সঙ্গীদেরকেও দিয়াছিলেন’’ কথাগুলি সবই ভুল। কারণ দর্শন-রুটীভোজন করার সময় দায়ূদ একাছিলেন, তাঁর সাথে অন্য কেউ ছিল না।

এছাড়া তিনি  ত অবিয়াথর মহাযাজকের সময়ে ঈশ্বরের গৃহে প্রবেশ করিয়াকথাগুলিও ভুল। কারণ এ ঘটনার সাথে সংশ্লিষ্ট মহাযাজকের নাম ছিল অহীমেলকঅবিয়াথরএ সময়ে যাজক ছিলেন না। অবিয়াথর ছিলেন অহীমেলকের পুত্র। এ কথাগুলি যে ভুল তা ১ শমূয়েল-এর ২১ অধ্যায়ের ১-৯ শ্লোক ও ২২ অধ্যায়ের ৯-২৩ শ্লোকে মূল ঘটনা পাঠ করলেই জানা যায়। মি. জুয়েল তার গ্রন্থে লিখেছেন যে, এ কথাগুলি ভুল। অন্যান্য অনেক পণ্ডিত তা স্বীকার করেছেন। তাদের মতে এ কথাগুলি পরবর্তীকালে সংযোজন করা হয়েছে, যা ইচ্ছাকৃত বিকৃতির প্রমাণ।

১০- ক্রুশের ঘটনার বর্ণনায় ভুল

মথিলিখিত সুসমাচারের ২৭ অধ্যায়ের ৫০-৫৩ শ্লোক নিম্নরূপ: ‘‘(৫০) পরে যীশু উচ্চ রবে চিৎকার করিয়া নিজ আত্মা সমর্পন করিলেন। (৫১) আর দেখ, মন্দিরের তিরস্করিণী (veil) উপর হইতে নীচ পর্যন্ত চিরিয়া দুইখান হইল, ভূমিকম্প হইল, ও শৈল সকল বিদীর্ণ হইল, (৫২) এবং কবর সকল খুলিয়া গেল, আর অনেক নিদ্রাগত পবিত্র লোকের দেহ উত্থাপিত হইল; (৫৩) এবং তাঁহার পুনরুত্থানের পর তাঁহারা কবর হইতে বাহির হইয়া পবিত্র নগরে প্রবেশ করিলেন, আর অনেক লোককে দেখা দিলেন।’’

মন্দিরের তিরস্করিণী (পর্দা) বিদীর্ণ হওয়ার কথা মার্কের ১৫/৩৮ ও লূকের ২৩/৪৫-এ উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু বাকি বিষয়গুলি, অর্থাৎ পাথরগুলি ফেটে যাওয়া, কবরগুলি খুলে যাওয়া, মৃত লাশগুলির বেরিয়ে আসা, যেরুশালেমে প্রবেশ করা, তথাকার অধিবাসীদের সাথে মৃতলাশগুলির দেখা-সাক্ষাত হওয়া ইত্যাদি বিষয় তারা উল্লেখ করেন নি।

এগুলি অত্যন্ত বড় বিষয়। মথির দাবি অনুসারে এ বিষয়গুলি প্রকাশ্যে সকলেই অবলোকন করেছিলেন। অথচ একমাত্র মথি ছাড়া সে সময়ের অন্য কোনো ঐতিহাসিক এই ঘটনাগুলি লিখলেন না! এমনকি এর পরের যুগের কোনো ঐতিহাসিকও এ বিষয়ে কিছু লিখেন নি। তারা ভুলে গিয়েছিলেন বলে দবি করার কোনো সুযোগ নেই; কারণ মানুষ সব কিছু ভুললেও এরূপ অস্বাভাবিক অত্যাশ্চর্য ঘটনা কখনো ভুলতে পারে না। বিশেষত লূক ছিলেন আশ্চর্য ও অলৌকিক ঘটনাবলির সংকলনে অত্যন্ত আগ্রহী। এ কথা কিভাবে কল্পনা করা যায় যে, সুসমাচার লেখকগণ সকলেই অথবা অধিকাংশই সাধারণ লৌকিক ঘটনা ও অবস্থাদি লিখবেন, অথচ মথি ছাড়া কেউই এই অসাধারণ অলৌকিক ঘটনাগুলি লিখবেন না?

এ কাহিনীটি মিথ্যা। পণ্ডিত নর্টন পবিত্র বাইবেলের বিশুদ্ধতা প্রমাণের জন্য সদা সচেষ্ট ছিলেন। কিন্তু তিনিও তার পুস্তকে এ কাহিনীটি মিথ্যা বলে বিভিন্ন প্রমাণ পেশ করেছেন। এরপর তিনি বলেন, এই কাহিনীটি মিথ্যা। সম্ভবত যিরূশালেমের ধ্বংসের পর থেকে এই ধরনের কিছু গল্প-কাহিনী ইয়াহূদীদের মধ্যে প্রচলিত ছিল। সম্ভবত কেউ একজন মথিলিখিত সুসমাচারের হিব্রু পাণ্ডুলিপির টীকায় তা লিখেছিলেন এবং অনুলিপি লেখক (copier) লেখার সময় তা মূল পাঠের মধ্যে ঢুকিয়ে দিয়েছেন। এরপর সেই কপিটিই অনুবাদকের হাতে পড়ে এবং সেভাবেই তিনি অনুবাদ করেন।

পণ্ডিত নর্টনের বক্তব্য থেকে জানা যায় যে, মথির সুসমাচারের (মূল হিব্রু থেকে প্রথম গ্রীক) অনুবাদক ছিলেন রাতের আঁধারে কাঠ-সংগ্রহকারীর মতবিবেচনা ও বিচার শক্তিবিহীন। শুখনো ও ভিজের মধ্যে পার্থক্য করার ক্ষমতা তার ছিল না। এ গ্রন্থের মধ্যে শুদ্ধ ও অশুদ্ধ যা কিছু পেয়েছেন সবই অনুবাদ করেছেন। এইরূপ একজনের অনুবাদ ও সম্পাদনার উপরে কি নির্ভর করা যায়? কখনোই না।

১১- শেলহের পিতার নাম বর্ণনায় ভুল:

লূক তার সুসমাচারের ৩য় অধ্যায়ে লিখেছেন: ‘‘ইনি শেলহের পুত্র, ইনি কৈননের পুত্র, ইনি অর্ফকষদের পুত্র’’[41]

এ কথাটি ভুল। কারণ, শেলহ নিজেই অর্ফকষদের পুত্র ছিলেন, তিনি অর্ফকষদের পৌত্র ছিলেন না। আদিপুস্তক ১০/২৪ নিম্নরূপ: ‘‘আর অর্ফক্ষদ শেলহের জন্ম দিলেন।’’ আদিপুস্তক ১/১২-১৩ নিম্নরূপ: ‘‘অর্ফক্ষদ পঁয়ত্রিশ বৎসর বয়সে শেলহের জন্ম দিলেন। শেলহের জন্ম দিলে পর অর্ফক্ষদ চারি শত তিন বৎসর জীবৎ থাকিয়া আরও পুত্রকন্যার জন্ম দিলেন।’’ হিব্রু তাওরাত ও শমরীয় তাওরাত উভয়ই সুস্পষ্টভাবে এ সকল স্থানে উল্লেখ করেছে যে, অর্ফক্ষদ শেলহের পিতা এবং শেলহ অর্ফক্ষদের ঔরষজাত সন্তান। ১ বংশাবলি ১/১৮-তেও এ কথা সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। কোথাও অর্ফকষদ ও শেলহের মধ্যে কৈননের নাম উল্লেখ করা হয় নি। এতে প্রমাণিত হয় যে, লূকের সুসমাচারের উপর্যু&ক্ত কথাটি ভুল। এখানে উল্লেখ্য যে তাওরাতের গ্রীক অনুবাদের (the Septuagint: LXX) শেলহের পিতা হিসেবে ‘‘কৈননের’’ নাম উল্লেখ করা হয়েছে। বাহ্যত খৃস্টানগণ নিজেদের সুসমাচারের বর্ণনাকে সঠিক বলে প্রমাণ করার জন্য অনুবাদের মধ্যে বিকৃতির আশ্রয় নিয়েছেন।

১. ৩. ৩. বাইবেলের বিকৃতির আলোচনা

এ অনুচ্ছেদে আমরা শব্দ বা বাক্যের পরিবর্তন, সংযোজন বা বিয়োজনের মাধ্যমে বাইবেলে মধ্যে যে সকল বিকৃতি সাধন করা হয়েছে তার সামান্য কিছু নমুনা আলোচনা করতে চাই।

১- প্লাবন পূর্ব মহাপুরুষদের বয়স বর্ণনায় বিকৃতি:

আদিপুস্তকের ৫ম অধ্যায়ের ১-৩২ শ্লোকে আদমের আলাইহিস সালাম সৃষ্টি থেকে নূহ আলাইহিস সালাম-এর প্লাবন পর্যন্ত সময়কাল বর্ণনা করা হয়েছে। এখানে আদম আলাইহিস সালাম থেকে নূহ আলাইহিস সালাম পর্যন্ত মহাপুরুষদের বয়সকালও উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু বাইবেলের তিন সংস্করণে[42] এ সময়কার তিন প্রকার লেখা হয়েছে।

শমরীয় সংস্করণ অনুসারে আদম থেকে প্লাবন পর্যন্ত সময়কাল এক  হাজার তিনশত সাত (১৩০৭) বৎসর। হিব্রু সংস্করণে এ সময় এক হাজার ছয়শত ছাপ্পান্ন (১৬৫৬) বছর। গ্রীক সংস্করণ অনুসারে এ সময় দুই হাজার দুই শত বাষট্টি (২২৬২) বছর। এভাবে আমরা দেখছি যে, তিনটি সংস্করণের মধ্যে সময়ের বিবরণে বিরাট পার্থক্য ও বিশ্রী বৈপরীত্য রয়েছে। এ বৈপরীত্য ও পার্থক্য সমন্বয় করা সম্ভব নয়। (নিঃসন্দেহে দুটি বা সবগুলি সংস্করণে পরিবর্তনের মাধ্যমে বিকৃতি সাধন করা হয়েছে।)

তিনটি সংস্করণই একমত যে, আদম আলাইহিস সালামের মৃত্যুর সময় তাঁর বয়স ছিল ৯৩০ বৎসর (আদিপুস্তক ৫/৫) এবং তিন সংস্করণই একমত যে, প্লাবনের সময় নূহ আলাইহিস সালাম-এর বয়স ছিল ৬০০ বৎসর (আদিপুস্তক ৭/৬)।

এতে শমরীয় সংস্করণের বর্ণনা অনুসারে প্লাবনের মাত্র ৩৭৭ বৎসর পূর্বে (১৩০৭-৯৩০) আদমের মৃত্যু হয়। আর যেহেতু প্লাবনের ৬০০ বৎসর পূর্বে নূহ আলাইহিস সালামের জন্ম, সেহেতু আদমের মৃত্যুর সময় নোহের বয়স ছিল  ২২৩ বৎসর (৬০০-৩৭৭)। ঐতিহাসিকগণ একমত যে বিষয়টি বাতিল। হিব্রু ও গ্রীক বাইবেল তা মিথ্যা প্রমাণ করে। আদমের বয়স ও প্লাবনের সময় নূহের বয়সের সমষ্টি (৯৩০+৬০০=) ১৫৩০ বৎসর। হিব্রু বাইবেলের তথ্য অনুযায়ী (১৬৫৬-১৫৩০) আদমের মৃত্যুর ১২৬ বৎসর পরে  নোহের জন্ম। আর গ্রীক বাইবেলের তথ্য অনুসারে (২২৬২-১৫৩০) আদমের মৃত্যুর ৭৩২ বৎসর পরে নোহের জন্ম।

প্রথম খৃস্টীয় শতাব্দীর প্রসিদ্ধতম ইয়াহূদী ঐতিহাসিক জোসেফাস (Flavius Josephus) খৃস্টানদের নিকটও নির্ভরযোগ্য বলে গণ্য। এই বিশ্রী বৈপরীত্য ও পার্থক্যের কারণে তিনি পুরাতন নিয়মেরএই তিন সংস্করণের কোনোটির বিবরণই গ্রহণ করেন নি। তিনি লিখেছেন যে, আদমের সৃষ্টি থেকে নোহের প্লাবন পর্যন্ত সময়কাল ছিল দুই হাজার দুইশত ছাপ্পান্ন (২২৫৬) বৎসর।

২- প্লাবন পরবর্তী মহাপুরুষদের বয়স বর্ণনায় বিকৃতি:

আদিপুস্তকের ১১ অধ্যায়ের ১০-২৬ শ্লোকে নূহ আলাইহিস সালাম-এর প্লাবন থেকে ইবরাহীম আলাইহিস সালাম পর্যন্ত সময়কাল বর্ণনা করা হয়েছে। এখানে নূহ আলাইহিস সালাম থেকে ইবরাহীম আলাইহিস সালাম পর্যন্ত মহাপুরুষদের বয়সকালও উল্লেখ করা হয়েছে। বাইবেলের তিন সংস্করণে এ সময়কার তিন প্রকার লেখা হয়েছে।

নূহের প্লাবন থেকে ইবরাহীম আলাইহিস সালাম-এর জন্ম পর্যন্ত সময়কাল হিব্রু সংস্করণ অনুসারে দুইশত বিরানববই (২৯২) বৎসর, শমরীয় সংস্করণ অনুসারে নয়শত বিয়াল্লিশ (৯৪২) বৎসর এবং গ্রীক সংস্করণ অনুসারে একহাজার বাহাত্তর (১০৭২) বৎসর। এখানেও তিন সংস্করণের মধ্যে বিশ্রী রকমের বৈপরীত্য রয়েছে, যার মধ্যে সমন্বয় সম্ভব নয়। যা সবগুলি বা দুটি সংস্করণে পরিবর্তন ও বিকৃতি প্রমাণ করে।

তিন সংস্করণই একমত যে, প্লাবনের পরে নূহ আলাইহিস সালাম ৩৫০ বৎসর জীবিত ছিলেন (আদিপুস্তক ৯/২৮)। ৩৫০ থেকে ২৯২ বৎসর বাদ দিলে ৫৮ বৎসর থাকে। এতে হিব্রু বাইবেল অনুসারে প্রমাণিত হয় যে, নোহের মৃত্যুর সময় অবরাহামের বয়স ছিল ৫৮ বৎসর। ঐতিহাসিকগণ একমত যে কথাটি বাতিল। গ্রীক ও শমরীয় সংস্করণও তা মিথ্যা প্রমাণ করে। শমরীয় সংস্করণের ভাষ্য অনুযায়ী ইবরাহীমের আলাইহিস সালাম জন্ম নূহের আলাইহিস সালাম মৃত্যুর পাঁচশত বিরানববই (৫৯২) বৎসর পরে (৯৪২-৩৫০=৫৯২)। আর গ্রীক সংস্করণের ভাষ্য অনুযায়ী তাঁর জন্ম নূহের আলাইহিস সালাম মৃত্যুর সাতশত বাইশ (৭২২) বৎসর পরে (১০৭২-৩৫০=৭২২)।

বাইবেলের তিন সংস্করণের মধ্যকার এই বিরাট ও বিশ্রী বৈপরীত্যের কারণে খৃস্টানগণ নিজেদের মধ্যে মতভেদ করেছেন। ঐতিহাসিকগণ এই তিন বিবরণই বাতিল করে দিয়ে বলেছেন, নূহ আলাইহিস সালাম থেকে ইবরাহীম আলাইহিস সালাম-এর জন্ম পর্যন্ত সময় হলো তিনশত বাহান্ন (৩৫২) বৎসর।

১ম খৃস্টীয় শতকের প্রসিদ্ধ ইয়াহূদী ঐতিহাসিক জোসেফাস (Flavius Josephus) এ সকল বিবরণের কোনোটিই গ্রহণ করেন নি; বরং তিনি বলেছেন: এই সময়কাল ছিল নয়শত তিরানববই (৯৯৩) বৎসর। হেনরী ও স্কটের ব্যাখ্যাগ্রন্থে জোসেফাসের মতটি উদ্ধৃত করা হয়েছে।

হেনরী ও স্কটের ব্যাখ্যাগ্রন্থে তারা চতুর্থ শতকের শ্রেষ্ঠ খৃস্টান পণ্ডিত ও ধর্মগুরু (যাজক) সেন্ট অগাস্টিন (St. Augustine, Bishop of Hippo: 354–430)-এর মতামত উল্লেখ করেছেন যে, প্লাবনের আগের ও পরের যুগের মানুষদের বর্ণনার ক্ষেত্রে ইয়াহূদীরা হিব্রু সংস্করণ বিকৃত করেছে। গ্রীক সংস্করণ যাতে অনির্ভরযোগ্য বলে প্রমাণিত হয় সেজন্য এবং খৃস্টধর্মের বিরোধিতার জন্য তারা এই বিকৃতি করেছে। ১৩০ খৃস্টাব্দে ইয়াহূদীরা এই বিকৃতি সাধন করে। হর্ন তাঁর ব্যাখ্যাগ্রন্থে বলেছেন, গবেষক হেলস শক্তিশালী প্রমাণাদির দ্বারা প্রমাণ করেছেন যে, ইয়াহূদীরা তাদের ধর্মগ্রন্থ বিকৃত করেছিল। প্রসিদ্ধ পণ্ডিত কেনিকটও প্রমাণ করেছেন যে, ইয়াহূদীরা ইচ্ছাকৃতভাবে পুরাতন নিয়মের হিব্রু সংস্করণ বিকৃত করে।

বিবেকবান পাঠক নিশ্চয় লক্ষ্য করছেন যে, এ সকল খৃস্টান গবেষক পণ্ডিত ও ব্যাখ্যাকারগণের শেষ গতি বিকৃতির কথা স্বীকার করা। তারা স্বীকার করছেন যে, ধর্মীয় বিদ্বেষ ও শত্রুতার কারণে তারা ইচ্ছাকৃতভাবে কমবেশি করে তাদের ঐতিহাসিক বিবরণগুলি বিকৃত করেছেন।

৩-প্রস্তর স্থাপনের জন্য নির্ধারিত পর্বতের নামে বিকৃতি:

দ্বিতীয় বিবরণ পুস্তকের ২৭ অধ্যায়ের ৪র্থ শ্লোকটি নিম্নরূপ: ‘‘আর আমি অদ্য যে প্রস্তরগুলির বিষয়ে তোমাদিগকে আদেশ করিলাম, তোমরা যর্দন পার হইলে পর এবল পর্বতে সেই সকল প্রস্তর স্থাপন করিবে, ও তাহা চুন দিয়া লেপন করিবে।’’

এ শ্লোকটি শমরীয় সংস্করণে নিম্নরূপ: ‘‘আর আমি অদ্য যে প্রস্তরগুলির বিষয়ে তোমাদিগকে আদেশ করিলাম…. গরিষীম পর্বতে সেই সকল প্রস্তর স্থাপন করিবে, ও তাহা চুন দিয়া লেপন করিবে।’’

দ্বিতীয় বিবরণের ২৭/১২-১৩ এবং এ পুস্তকের ১১/২৯ শ্লোক থেকে জানা যায় যে, এবল ও গরিষীম(Mount Ebal & Mount Ger’izim) ফিলিস্তিনের নাবলুস শহরের দক্ষিণ প্রান্তে অবস্থিত দুটি পাশাপাশি পাহাড়। দ্বিতীয় বিবরণ ১১/২৯ শ্লোকটি নিম্নরূপ: ‘‘আর তুমি যে দেশ অধিকার করিতে যাইতেছ, সেই দেশে তোমার ঈশ্বর সদাপ্রভু যখন তোমাকে প্রবেশ করাইবেন, তখন তুমি গরিষীম পর্বতে ঐ আশীর্বাদ, এবং এবল পর্বতে ঐ অভিশাপ স্থাপন করিবে।’’

হিব্রু সংস্করণ থেকে জানা যায় যে, মোশি এবল পাহাড়ে ধর্মধাম বা মসজিদ নির্মাণের নির্দেশ দেন। আর শমরীয় সংস্করণ থেকে জানা যায় যে, মোশি গরিষীম পাহাড়ে ধর্মধাম নির্মাণের নির্দেশ দেন। প্রাচীন কাল থেকে আজ পর্যন্ত ইয়াহূদী ও শমরীয়দের মধ্যে এ বিষয়ে বির্তক খুবই প্রসিদ্ধ। প্রত্যেক সম্প্রদায় দাবি করেন যে, অন্য সম্প্রদায় এস্থলে তোরাহের বক্তব্য বিকৃত করেছে। প্রটেস্টান্ট পণ্ডিতগণের মধ্যেও এ বিষয়ে মতভেদ রয়েছে। কেউ হিব্রু সংস্করণের বিশুদ্ধতা দাবি করেছেন এবং কেউ শমরীয় সংস্করণের বিশুদ্ধতা দাবি করেছেন। প্রসিদ্ধ বাইবেল ব্যাখ্যাকার আদম ক্লার্ক, প্রসিদ্ধ গবেষক কেনিকট (Benjamin Kennicott) ও অন্যান্য পণ্ডিত শমরীয় সংস্করণের বিশুদ্ধতার পক্ষে মত প্রকাশ করেছেন। তারা প্রমাণ করেন যেশমরীয়দের সাথে শত্রুতার কারণে ইয়াহূদীরা এখানে তোরাহ-এর বক্তব্য বিকৃত করেছে। আর একথা তো সকলেই জানেন যে, গরিষীম পাহাড়টি অনেক ঝর্ণা, বাগিচা, বৃক্ষলতায় পরিপূর্ণ। পক্ষান্তরে এবল একটি শুষ্ক পাহাড়। তাতে এসব কিছুই নেই। এমতাবস্থায় স্বভাবতই প্রথম পাহাড়টি দোয়া ও বরকতের জন্য এবং দ্বিতীয় পাহাড়টি অভিশাপ প্রদানের জন্য শোভনীয়।

এভাবে আমরা দেখছি যে, খৃস্টান সম্প্রদায়ের প্রসিদ্ধ পণ্ডিতগণ এখানে হিব্রু বাইবেলের বিকৃতির কথা স্বীকার করছেন।

৪- রাজ্যের নামে বিকৃতি:

হিব্রু বাইবেলে ২ বংশাবলির ২৮ অধ্যায়ের ১৯ শ্লোকে বলা হয়েছে: ‘‘কেননা ইস্রায়েল রাজ আহসের জন্য সদাপ্রভু যিহূদাকে নত করিলেন…।’’

এখানে ইস্রায়েলকথাটি নিশ্চিতরূপে বিকৃত ও ভুল; কারণ আহস কখনোই ইস্রায়েলরাজ্যের রাজা ছিলেন না, তিনি ছিলেন যিহূদারাজ্যের রাজা।[43] গ্রীক ও ল্যাটিন অনুবাদে যিহূদাশব্দ রয়েছে। কাজেই বিকৃতিটি ঘটেছে হিব্রু সংস্করণের মধ্যে।

৫- না বনাম হ্যাঁ:

গীতসংহিতার ১০৫ নং গীতের ২৮ শ্লোকে হিব্রু সংস্করণে বলা হয়েছে: ‘‘তাঁহারা তাঁহার বাক্যের বিরুদ্ধাচরণ করিলেন না।’’ এখানে গ্রীক সংস্করণে বলা হয়েছে: ‘‘তাঁহারা তাঁহার বাক্যের বিরুদ্ধাচরণ করিলেন।’’

হিব্রু বাইবেলে বাক্যটি না-বাচক কিন্তু গ্রীক বাইবেলে বাক্যটি হাঁ-বাচক। দুটি বাক্যের একটি নিঃসন্দেহে বিকৃত ও ভুল।

এখানেও খৃস্টান পণ্ডিতগণ দ্বিধাগ্রস্থ হয়েছেন। হেনরী ও স্কটের ব্যাখ্যাগ্রন্থে বলা হয়েছে, এ দুই সংস্করণের মধ্যে বিরাজমান এ পার্থক্যের কারণে অনেক দীর্ঘ আলোচনা ও বিতর্ক হয়েছে। বাহ্যত কোনো একটি সংস্করণে নাকথাটি বাদ দেওয়া হয়েছে, অথবা বাড়ানো হয়েছে। এভাবে তারা এখানে বিকৃতির কথা স্বীকার করলেন, কিন্তু তারা কোন সংস্করণে বিকৃতিটি ঘটেছে তা নির্ধারণ করতে পারলেন না।

৬. প্রচলিত তাওরাত মূসা আলাইহিস সালাম-এর পরে লেখা হয়েছে:

আদিপুস্তক ৩৬/৩১ শ্লোকটি নিম্নরূপ: ‘‘ইস্রায়েল-সন্তানদের উপরে কোন রাজা রাজত্ব করিবার পূর্বে ইঁহারা ইদোম দেশের রাজা ছিলেন।’’ এরপর পরবর্তী শ্লোকগুলিতে ইস্রায়েল-সন্তানদের প্রথম রাজা তালূত (শৌল)-এর রাজত্ব লাভের পূর্ব পর্যন্ত ইদোমের রাজাদের নাম-পরিচয় উল্লেখ করা হয়েছে।[44] তালূতের পরে ইস্রায়েলীয়দের রাজা হন দায়ূদ আলাইহিস সালাম। তাঁদের পূর্বে ইস্রায়েলীয়গণ বিচারকগণ কর্তৃক শাসিত ও পরিচালিত হতেন।

এখানে আরো উল্লেখ্য যে, আদিপুস্তকের ৩৬ অধ্যায়ের ৩১-৩৯ শ্লোকগুলি অবিকল ১ বংশাবলির ১ম অধ্যায়ের ৪৩-৫০ শ্লোক। রাজাবলির মধ্যে এ বিষয়গুলি আলোচিত হওয়া খুবই স্বাভাবিক; এ শ্লোকগুলি নিশ্চিত প্রমাণ করে যে, এগুলির লেখক মূসা আলাইহিস সালাম-এর মৃত্যুর ৩৫৬ বৎসর পরে তালূত (শৌল)-এর রাজ্যভার গ্রহণের মাধ্যমে ফিলিস্তিনে বণী ইস্রায়েল বা ইস্রায়েল-সন্তানদের রাজত্ব প্রতিষ্ঠা হওয়ার পরের যুগের মানুষ। আর বংশাবলি তালূদের যুগের অনেক পরে লেখা সে বিষয়ে মতভেদ নেই।

তবে আদিপুস্তক’-এ কথাগুলির থাকার কোনোরূপ কোনো ব্যাখ্যা নেই। যে পুস্তক তালুতের যুগের সাড়ে তিন শত বৎসর পূর্বে মূসা আলাইহিস সালাম-এর লেখা তাওরাতের প্রথম পুস্তক তার মধ্যে এ কথা কিভাবে লেখা হলো?

আদম ক্লার্ক তাঁর ব্যাখ্যাগ্রন্থে লিখেছেন, আমার দৃঢ় ধারণা হলো এ শ্লোকগুলি কখনোই মোশি লিখেন নি। বরং এগুলি সম্ভবত আদিপুস্তকের কোনো পাণ্ডুলিপির টীকায় লেখা ছিল। অনুলিপিকার একে মূল পাঠের অংশ মনে করে মূল পাঠের মধ্যে ঢুকিয়ে দেন।

এভাবে এ ব্যাখ্যাকার বাইবেলের মধ্যে বিকৃতি ও সংযোজনের কথা স্বীকার করলেন। তাঁর স্বীকারোক্তি থেকে বুঝা যায় যে, তাঁদের ধর্মগ্রন্থগুলি বিকৃতি যোগ্য ও বিকৃতির উর্ধ্বে নয়। কারণ এ নয়টি শ্লোক তোরাহ-এর অংশ না হওয়া সত্ত্বেও তা তোরাহের মধ্যে প্রবেশ করেছে এবং এরপর সকল পাণ্ডুলিপিতে তা প্রচারিত হয়েছে।

৭- ‘‘অদ্য পর্যন্ত’’ সংযোজনের বিকৃতি:

দ্বিতীয় বিবরণের তৃতীয় অধ্যায়ের ১৪ শ্লোকটি নিম্নরূপ: ‘‘মনঃশির সন্তান যায়ীর গশূরীয়দের ও মাখাথীয়দের সীমা পর্যন্ত অর্গোবের সমস্ত অঞ্চল লইয়া আপন নামানুসারে বাশন দেশের সেই সকল স্থানের নাম হবেবাৎ-যায়ীর রাখিল; অদ্য পর্যন্ত (সেই নাম চলিত আছে)।’’

মূসা আলাইহিস সালাম-এর লিখিত বলে প্রচারিত তাওরাতের ৫ম পুস্তক দ্বিতীয় বিবরণের’-এর এ কথাটি কখনোই মোশির কথা হতে পারে না (যদিও তা মোশির বক্তব্যের মধ্যেই উল্লেখ করা হয়েছে)। উপরের শ্লোকটিতে অদ্য পর্যন্তকথাটি থেকে অত্যন্ত স্পষ্ট যে, এ কথাটি যিনি বলেছেন বা লিখেছেন তিনি অবশ্যই মনঃশির সন্তান যায়ীরের যুগের অনেক পরের মানুষ। ইয়াহূদী-খৃস্টান পণ্ডিতগণ বিস্তারিত গবেষণা করে দেখিয়েছেন যে, অনেক পরের মানুষেরা ছাড়া কেউ এই প্রকারের শব্দাবলি ব্যবহার করে না।

৬ নং বিকৃতি ও ৭ নং বিকৃতির বিষয়ে প্রসিদ্ধ গবেষক পণ্ডিত হর্ন তাঁর ব্যাখ্যাগ্রন্থে বলেন: এ দুইটি বক্তব্য বা অনুচ্ছেদ কোনো প্রকারেই মোশির কথা হতে পারে না। কারণ প্রথম বক্তব্য প্রমাণ করে যে, এ পুস্তকের লেখক ইস্রায়েল-সন্তানগণের রাজত্ব প্রতিষ্ঠার পরের যুগের মানুষ ছিলেন। আর দ্বিতীয় বক্তব্য প্রমাণ করে যে, এ পুস্তকের লেখক ইয়াহূদীদের প্যালেস্টাইনে বসতি স্থাপনের পরের যুগের মানুষ ছিলেন। এ দুটি অনুচ্ছেদ শুধু অর্থহীনই নয়; বরং মুল পাঠের মধ্যে বিরক্তিকর সংযোজন বলে গণ্য। বিশেষত দ্বিতীয় অনুচ্ছেদটি। কারণ এটি মোশিই লিখুন আর অন্য যেই লিখুন তিনি অদ্য পর্যন্তকথাটি বলবেন না। এজন্য যতদূর মনে হয়, এ কথাটি ছিল নিম্নরূপ: ‘‘মনঃশির সন্তান যায়ীর গশূরীয়দের ও মাখাথীয়দের সীমা পর্যন্ত অর্গোবের সমস্ত অঞ্চল লইয়া আপন নামানুসারে বাশন দেশের সেই সকল স্থানের নাম হবেবাৎ-যায়ীর রাখিল।’’ এরপর অনেক শতাব্দী পরে অদ্য পর্যন্তকথাটি পাদটীকায় লেখা হয়, যেন জানা যায় যে যায়ীর যে নাম রেখেছিলেন তা অদ্যাবধি চালু রয়েছে। এরপর এই কথাটি পরবর্তী কপিগুলিতে পাদটীকা থেকে মূল বক্তব্যের মধ্যে স্থানান্তরিত হয়। যদি কারো এ বিষয়ে সন্দেহ হয় তবে গ্রীক কপিগুলি দেখতে পারেন। তিনি দেখবেন যে, কোনো কোনো পাণ্ডুলিপিতে কিছু কথা মূল পাঠের মধ্যে সংযোজিত রয়েছে; আর কোনো কোনো পাণ্ডুলিপিতে তা পাদটীকায় রয়েছে।

তাঁর এ কথা প্রমাণ করে যে, এ পবিত্র ও ঐশ্বরিক পুস্তকগুলি লিখিত হওয়ার শত শত বৎসর পরেও এগুলিতে সংযোজন, বিয়োজন বা বিকৃতির সুযোগ ও সম্ভাবনা ছিল। কারণ তিনি নিজেই স্বীকার করেছেন যে, পুস্তকটি লিখিত হওয়ার অনেক শতাব্দী পরে এ কথাটিকে সংযোজন করা হয়েছে। এত পরে সংযোজিত কথাটিও পবিত্র পুস্তকের অংশে পরিণত হয়েছে এবং পরবর্তী সকল কপি ও সংস্করণে প্রচারিত হয়েছে!

উপরের শ্লোকটির মতই আরেকটি শ্লোক গণনাপুস্তকের ৩২ অধ্যায়ের ৪১ শ্লোক (কোনো কোনো মুদ্রণে ৪০ শ্লোক) নিম্নরূপ: ‘‘আর মনঃশির সন্তান যায়ীর গিয়া তথাকার গ্রাম সকল হস্তগত করিল, এবং তাহাদের নাম হবেবাৎ-যায়ীর (যায়ীরের গ্রামসমূহ) রাখিল।’’

এখানে আরো একটি ভুল রয়েছে। এখানে বলা হয়েছে যে, ‘মনঃশির সন্তান যায়ীর। কথাটি ভুল। যায়ীরের পিতার নাম সগূব। ১ বংশাবলির ২য় অধ্যায়ের ২২ শ্লোক নিম্নরূপ: ‘‘সগুবের পুত্র যায়ীর, গিলিয়দ দেশে তাঁহার তেইশটি নগর ছিল।’’[45]

এভাবে আমরা দেখছি যে, দ্বিতীয় বিবরণ ও গণনা পুস্তকের মধ্যে পরবর্তী যুগের সংযোজন প্রমাণিত হয়েছে এবং ভুল তথ্য সংযোজনও প্রমাণিত হয়েছে। আর বংশাবলির মধ্যেও পিতার নাম ভুল লেখা হয়েছে বলে প্রমাণিত হয়েছে।

বাইবেল ডিক্সনারীগ্রন্থটি আমেরিকা, ইংল্যাণ্ড ও ভারতে মুদ্রিত হয়েছে। এ গ্রন্থের লেখকগণ বলেন: মোশির পুস্তকে এমন কিছু কথা পাওয়া যায় যা স্পষ্টত প্রমাণ করে যে, তা মোশির কথা নয়। অনুরূপভাবে কিছু কিছু বক্তব্য থেকে দেখা যায় যে, সেগুলি মোশির বাচনভঙ্গির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। কোন্ ব্যক্তি এই সকল বাক্য ও অনুচ্ছেদ সংযোজন করেছেন তা আমরা নিশ্চিতরূপে বলতে পারি না।

হেনরি ও স্কটের ব্যাখ্যাগ্রন্থের সংকলকগণ বলেন: অদ্যাপি’, ‘অদ্য পর্যন্ত’ (unto this day) জাতীয় বাক্যাংশ পুরাতন নিয়মের অধিকাংশ স্থানে ব্যবহৃত হয়েছে। যতদূর বুঝা যায়, এগুলি পরবর্তীকালে সংযোজিত। তাঁদের স্বীকৃতি অনুসারে শুধু যিহোশূয়ের পুস্তকেরমধ্যেই আরো ৮টি স্থানে পরবর্তী যুগে এইরূপ বাক্যাদি সংযোজনের মাধ্যমে বিকৃতি ঘটানো হয়েছে। যদি পুরাতন নিয়মের অন্যান্য স্থানে এইরূপ সংযোজন ও বিকৃতির কথা উল্লেখ করি তাহলে তালিকা অত্যন্ত লম্বা হয়ে যাবে।

৮- বিভিন্ন পুস্তকে ভূমিকা ও অধ্যায় সংযোজন:

দ্বিতীয় বিবরণের প্রথম অধ্যায়ের ১-৫ শ্লোক পাঠ করলে পাঠক নিশ্চিত হবেন যে, এগুলি কখনোই মূসা আলাইহিস সালাম-এর কথা নয়। এখানে লেখক মূসা আলাইহিস সালাম সম্পর্কে নাম পুরুষ (3rd person) ব্যবহার করে বলেছেন: ‘‘(১) যর্দনের পুর্বপারস্থিত প্রান্তরে …. মোশি সমস্ত ইস্রায়েলকে এই সকল কথা কহিলেন। … (৩) সদাপ্রভু যে যে কথা ইস্রায়েল-সন্তানগণকে বলিতে মোশিকে আজ্ঞা দিয়াছিলেন, তদনুসারে মোশি চল্লিশ বৎসরের একাদশ মাসে, মাসের প্রথম দিনে তাহাদিগকে কহিতে লাগিলেন। …. (৫) যর্দনের পূর্বপারে মোয়াব দেশে মোশি এই ব্যবস্থা ব্যাখ্যা করিতে লাগিলেন…।’’

বাইবেল ভাষ্যকার আদম ক্লার্ক তাঁর ব্যাখ্যাগ্রন্থে দ্বিতীয় বিবরণের প্রথম অধ্যায়ের ব্যাখ্যার শুরুতে বলেন: এ অধ্যায়ের শুরুতে প্রথম ৫টি শ্লোক এ পুস্তকের ভূমিকাস্বরূপ। এই শ্লোকগুলি মোশির কথা নয়। তিনি আরো বলেন যে, এ পুস্তকের (দ্বিতীয় বিবরণের) ৩৪ অধ্যায়টিও মোশির কথা নয়। মোশির বক্তব্য পূর্ববর্তী (৩৩) অধ্যায়ের সমাপ্তির সাথে সাথে শেষ হয়েছে। এ কথা বলা সম্ভব নয় যে, মোশি ঈশ্বরের অনুপ্রেরণা লাভ করে এই অধ্যায়টিও লিখেছেন। কারণ এ সম্ভাবনা সত্যতা ও গ্রহণযোগ্যতা থেকে অনেক দূরে।[46] আদম ক্লার্ক দাবি করেছেন যে, এ অধ্যায়টি যিহোশূয়ের পুস্তকের প্রথম অধ্যায় ছিল। পক্ষান্তরে অনেক ব্যাখ্যাকার দাবি করেছেন যে, মোশির মৃত্যুর অনেক পরে ৭০ গোত্রপতি[47] এই ৩৪ অধ্যায়টি রচনা করেন। তখন এ অধ্যায়টি যিহোশূয়ের পুস্তকের প্রথম অধ্যায় ছিল।[48] কিন্তু তা স্থানান্তরিত হয়ে এ স্থানে চলে এসেছে।[49]

এভাবে তারা সকলেই একবাক্যে স্বীকার করছেন যে, মূসার তাওরাতের এ সকল কথা মূসার কথা নয়। এরপর দাবি করলেন যে, ৭০ গোত্রপতি তা রচনা করেছেন। তাদের এ দাবি একেবারেই প্রমাণবিহীন আন্দায দাবি। এর বড় প্রমাণ হলো, এ বিষয়ে তাদের নানামুনির নানা মত। হেনরী ও স্কটের ব্যাখ্যাগ্রন্থের সংকলকগণ বলেন, মোশির কথা পূর্ববর্তী অধ্যায়েই শেষ হয়েছে। এ অধ্যায়টি পরবর্তীকালে সংযোজিত। সংযোজনকারী সম্ভবত যিহোশূয় অথবা শমূয়েল অথবা ইয্রা অথবা তাঁদের পরের যুগের অন্য কোনো ভাববাদী (নবী)।[50] এ বিষয়ে নিশ্চিতরূপে কিছুই জানা যায় না। শেষ শ্লোকগুলি সম্ভবত ইস্রায়েল-সন্তানদের ব্যাবিলনের বন্দিদশা থেকে মুক্তি পাওয়ার পরে সংযোজন করা হয়েছে।’’

পাঠক এখানে এ সকল পণ্ডিতের কথাগুলি একটু চিন্তা করুন! তাঁরা বললেন: ‘‘সংযোজনকারী সম্ভবত যিহোশূয়, অথবা … অথবা … অথবা … অথবা তাঁদের পরের যুগের অন্য কোনো ভাববদী। সবই ভিত্তিহীন প্রমাণবিহীন কাল্পনিক দাবি মাত্র।[51]

এখানে দ্বিতীয় বিবরণের ৩৪ অধ্যায়ের কয়েকটি শ্লোক উল্লেখ করছি, যেন পাঠক অবস্থা ভালভাবে অনুধাবন করতে পারেন:

‘‘(১) পরে মোশি মোয়াবের তলভূমি হইতে নবো পর্বতে.. উঠিলেন। আর সদাপ্রভু তাঁহাকে সমস্ত দেশ, দান পর্যন্ত গিলিয়দ… দেখাইলেন (৪) আর সদাপ্রভু তাঁহাকে কাহিলেন…. (৫) তখন সদাপ্রভুর দাস মোসি সদাপ্রভুর বাক্যানুসারে সেই স্থানে মোয়াব দেশে মরিলেন। (৬) আর তিনি মোয়াব দেশে বৈৎপিয়োরের সম্মুখস্থ উপত্যাকাতে তাঁহাকে কবর দিলেন; কিন্তু তাঁহার কবরস্থান অদ্যাপি কেহ জানে না। (৭) মরণকালে মোশির বয়স এক শত বিংশতি বৎসর হইয়াছিল….। (৮)  পরে ইস্রায়েল সন্তানগণ মোশির নিমিত্ত মোয়াবের তলভূমিতে ত্রিশ দিন রোদন করিল। … (১০) মোশির তুল্য কোন ভাববাদী ইস্রায়েলের মধ্যে আর উৎপন্ন হয় নাই।’’

মূসা আলাইহিস সালাম-এর উপর অবর্তীর্ণ কিতাবে কি মূসার মৃত্যু, শেষকৃত্য, কবর, অনুসারীদের কান্নাকাটি, তার কবর নিশ্চিহ্ন হওয়া, তাঁর পরে তাঁর মত আর কোনো নবীর আবির্ভাব না হওয়া ইত্যাদি বিষয় বর্ণিত থাকবে?

আমরা মুসলিমগণ নিশ্চিতরূপে বিশ্বাস করি যে, মূসার তাওরাত বলে কাথিত ৫ পুস্তকের সর্বশেষ অধ্যায়, দ্বিতীয় বিবরণের ৩৪ অধ্যায়টি মূসা আলাইহিস সালাম-এর রচিত নয়। শুধু তাই নয়, আমরা আরো বিশ্বাস করি যে, মূসা আলাইহিস সালাম-এর নামে প্রচলিত এ পাঁচটি পুস্তক কখনোই তাঁর লেখা নয়। এগুলিকে তার লেখা বা তার প্রদত্ত তাওরাত বলে দাবি করা বৈধ নয়। এগুলির মধ্যে বিদ্যমান অগণিত বিকৃতি, সংযোজন, ভুলভ্রান্তি আমাদের এ বিশ্বাসের অকাট্য প্রমাণ। কোনো নবীর উপরে ওহীর মাধ্যমে অবতীর্ণ কোনো আসমানী গ্রন্থে এরূপ কোনো ভুলভ্রান্তি থাকতে পারে না। এরূপ ভুলভ্রান্তিময় একটি গ্রন্থকে কোনো নবীর নামে চালানোর অর্থ উক্ত নবীকে অপবাদ দেওয়া। অনেক ইয়াহূদী-খৃস্টান পণ্ডিতও অবিকল মুসলিমদের মতই এ সকল প্রমাণাদির ভিত্তিতে দাবি করেছেন যে, এ সকল পুস্তকের কোনোটিই মোশির লেখা বা মোশির দেওয়া তাওরাত নয়।

৯- ত্রিত্ববাদ প্রতিষ্ঠার জন্য ইঞ্জিলের বিকৃতি:

যোহনের প্রথম পত্রের ৫ম অধ্যায়ের ৭-৮ শ্লোক নিম্নরূপ: ‘‘(৭) কারণ স্বর্গে তিন জন রহিয়াছেন যাঁহারা সাক্ষ্য সংরক্ষণ করেন: পিতা, বাক্য ও পবিত্র আত্মা; এবং তাঁহারা তিন একই। ৮. এবং পৃথিবীতে তিন জন রহিয়াছেন যাঁহার সাক্ষ্য প্রদান করেন: আত্মা, জল ও রক্ত, এবং সেই তিনের সাক্ষ্য একই। (For there are three that bear record in heaven, the Father, the Word, and the Holy Ghost; and the three are one. 8. And there are three that bear witness in earth, the spirit, and the water, and the blood: and these three agree in one.)[52]’’

খৃস্টান পণ্ডিতগণ উল্লেখ করেছেন যে, উপরের শ্লোকদ্বয়ের এতসব কথার মধ্যে মূল বাক্যগুলি ছিল নিম্নরূপ: ‘‘বস্তুত তিনে সাক্ষ্য দিতেছেন, আত্মা, ও জল, ও রক্ত, এবং সেই তিনের সাক্ষ্য একই।’’[53]

এরপর ত্রিত্বে বিশ্বাসিগণ মূল পাঠের মধ্যে অতিরিক্ত সংযোজন করেন: ‘‘স্বর্গে তিন জন রহিয়াছেন যাঁহারা সাক্ষ্য সংরক্ষণ করেন: পিতা, বাক্য ও পবিত্র আত্মা; এবং তাঁহারা তিন একই। ৮. এবং পৃথিবীতে তিন জন রহিয়াছেন…।’’ ত্রিত্ববাদী খৃস্টানদের ত্রিত্ববাদ প্রমাণের জন্য একথাগুলিই মূল দলিল। আর এগুলি যে জাল ও অতিরিক্ত সংযোজন সে বিষয়ে কোনোরূপ সন্দেহ নেই। ত্রিত্ববাদী গোঁড়া খৃস্টান পণ্ডিতগণও স্বীকার করেছেন যে, এ বাক্যগুলি অতিরিক্ত সংযোজন এবং এগুলিকে মুছে দেওয়া আবশ্যক। হেনরি ও স্কটের ব্যাখ্যাগ্রন্থের সংকলকগণ হর্নের এই কথাকে সঠিক বলে গ্রহণ করেছেন। আদম ক্লার্কও এই বাক্যগুলিকে সংযোজিত বলে গণ্য করার পক্ষে মতপ্রকাশ করেছেন। ক্রীসবাখ ও শোলয্, হর্ন, আদম ক্লাক, হেনরি ও স্কটের ব্যাখ্যাগ্রন্থের সংকলকগণ ও আরো অনেকেই এ বাক্যগুলিকে জাল বলে এগুলি বাইবেল থেকে বাদ দেওয়ার দাবি করেছেন।

চতুর্থ-পঞ্চম খৃস্টীয় শতাব্দীর ত্রিত্ববাদী খৃস্টানগণের মধ্যে সবেচেয়ে বেশি অভিজ্ঞ ও প্রাজ্ঞ পণ্ডিত ছিলেন সেন্ট অগাস্টাইন (St. Augustine)। এখন পর্যন্ত ত্রিত্ববাদী খৃস্টানগণ তাঁর মতের উপরেই নির্ভর করেন। তিনি যোহনের এ পত্রটির আলোচনায় দশটি পত্র লিখেছেন। এ দশটি পত্রের একটি পত্রেও তিনি এ বাক্যগুলির কথা উল্লেখ করেন নি। তিনি ছিলেন ত্রিত্বে বিশ্বাসী। আলেকজেন্দ্রিয়ার প্রসিদ্ধ খৃস্টান ধর্মগুরু আরিয়াসের (Arius) অনুসারিগণ যাঁরা ত্রিত্বে বিশ্বাস করতেন না বা একেশ্বরবাদী ছিলেন তাঁদের বিরুদ্ধে অগাস্টাইন বিতর্ক করতেন। তাঁর সময়ে যদি উপরের এই শ্লোকদ্বয় এভাবে যোহনের পত্রের মধ্যে থাকত তবে নিশ্চয় ত্রিত্ববাদ (trinity) প্রমাণ করার জন্য তিনি সেগুলির উদ্ধৃতি দিতেন ও সেগুলিকে প্রমাণ হিসেবে পেশ করতেন।

শুধু তাই নয়, অগাস্টাইন ত্রিত্ববাদ প্রমাণ করার জন্য উপরে উল্লিখিত ৮ম শ্লোকটি: ‘‘বস্তুতঃ তিনে সাক্ষ্য দিতেছেন, আত্মা, ও জল, ও রক্ত, এবং সেই তিনের সাক্ষ্য একই’’ এই কথাটির অদ্ভুত একটি ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন: এখানে জল দ্বারা পিতাকে বুঝানো হয়েছে, রক্ত দ্বারা পুত্রকে বুঝানো হয়েছে এবং আত্মা দ্বারা পবিত্র-আত্মাকে বুঝানো হয়েছে। এই ব্যাখ্যাটি খুবই দুর্বল ও অবাস্তব ব্যাখ্যা। একথা স্পষ্ট যে, উপরে উল্লিখিত ৭ম শ্লোকটি যদি যোহনের পত্রে সত্যিই থাকত তাহলে তিনি এইরূপ অবাস্তব ও দুর্বল ব্যাখ্যার স্মরণাপন্ন হতেন না। আমার মনে হয়, যখন ত্রিত্ববাদীরা দেখলেন যে, এই ব্যাখ্যাটি অত্যন্ত দুর্বল- যা দিয়ে ত্রিত্ববাদ প্রমাণ করা কঠিন- তখন তারা উপরের বাক্যগুলি তৈরি করে সেগুলিকে এই পত্রের মধ্যে সংযোজন করে দেন, যাতে সেগুলি দিয়ে তাঁদের ত্রিত্ব প্রমাণ করা সহজ হয়।

১২৭০ হিজরী সালে (১৮৫৪ খৃস্টাব্দে) ইযহারুল হক্কের প্রণেতা আল্লামা শাইখ রাহমাতুল্লাহর সাথে ড. ফান্ডার (Carl Gottaleb Pfander) ও তার সহযোগী পাদ্রী মি. ফ্রেঞ্চ (T. V. French)-এর যে  প্রকাশ্য বিতর্ক অনুষ্ঠিত হয়, সে বিতর্কের সময় উপস্থিত সকল মানুষের সামনে পাদ্রীদ্বয় স্বীকার করেন যে, এই বাক্যগুলি বিকৃত। তাঁরা আরো স্বীকার করেন যে, বাইবেলের মধ্যে ৭/৮ স্থানে বিকৃতি ঘটেছে।

এই বাক্যটির আলোচনায় পণ্ডিত হর্ন ১২ পৃষ্ঠা লিখেছেন। হেনরি ও স্কটের ব্যাখ্যাগ্রন্থের সংকলক হর্নের সার-সংক্ষেপকে সংক্ষেপে উল্লেখ করেছেন। আমি এখানে তাঁদের সার-সংক্ষেপের সার-সংক্ষেপ উদ্ধৃত করছি। হেনরি ও স্কটের পুস্তকের সংকলকগণ বলেন:

‘‘হর্ন উভয় পক্ষের দলিল প্রমাণাদি আলোচনা করেছেন। এরপর তিনি পুনরায় তার আলোচনার সার-সংক্ষেপ উল্লেখ করেছেন। তার আলোচনার সার-সংক্ষেপ থেকে জানা যায় যে, যারা এই বাক্যগুলিকে মিথ্যা ও জাল বলে প্রমাণ করেন তাঁরা নিম্নের বিষয়গুলির উপর নির্ভর করেন:

(১)  ১৬শ শতাব্দীর পূর্বে লিখিত কোনো গ্রীক পাণ্ডুলিপিতে এই বাক্যগুলির অস্তিত্ব নেই।

(২) প্রথম যুগে পরিপূর্ণ যত্ন ও গবেষণা সহকারে যে সকল বাইবেল মুদ্রণ করা হয়েছে সেগুলিতেও এই বাক্যগুলির অস্তিত্ব নেই।

(৩) একমাত্র ল্যাটিন অনুবাদ ছাড়া অন্য কোনো প্রাচীন অনুবাদে এই বাক্যগুলির অস্তিত্ব নেই।

(৪)  অধিকাংশ প্রাচীন ল্যাটিন পাণ্ডুলিপিতেও এই কথাগুলি নেই।

(৫)  কোনো প্রাচীন খৃস্টান পণ্ডিত বা চার্চের ঐতিহাসিক এই কথাগুলিকে প্রমাণ হিসেবে উদ্ধৃত করেন নি।

(৭)  প্রটেস্টান্ট সম্প্রদায়ের নেতাগণ ও ধর্মের সংস্কারকগণ এই কথাগুলিকে ফেলে দিয়েছেন অথবা তার উপরে সন্দেহের চিহ্ন দিয়ে রেখেছেন।

এভাবে আমরা দেখছি যে, খৃস্টানগণ যখনই প্রয়োজন মনে করতেন তখনই তাদের ধর্মগ্রন্থের মধ্যে সংযোজন-বিয়োজন করে বিকৃতি সাধন করতেন। মুদ্রণ-যন্ত্র আবিষ্কৃত হওয়ার পূর্বে বাইবেলের মধ্যে বিকৃতির দরজা ছিল উন্মুক্ত। লিপিকারগণ ও বিভিন্ন দল-উপদলের খৃস্টানগণ অতি সহজেই সংযোজন, বিয়োজন বা পরিবর্তন করতে পারতেন। মজার কথা হলো মুদ্রণযন্ত্র আবিষ্কার হওয়ার পরেও এ বিকৃতির ধারা থামে নি।

প্রটেস্টান্ট সম্প্রদায়ের প্রথম গুরু ও খৃস্টধর্ম সংস্কারের মূল নেতা মি. লুথার যখন এ ধর্মের সংস্কারের জন্য প্রচেষ্টা শুরু করলেন, তখন তিনি জার্মান ভাষায় বাইবেলের অনুবাদ করেন যেন তাঁর অনুসারিগণ তা থেকে উপকৃত হতে পারেন। তিনি তাঁর অনূদিত বাইবেলের মধ্যে যোহনের পত্রের এ বাক্যগুলি উল্লেখ করেন নি। তাঁর জীবদ্দশাতেই কয়েকবার তাঁর অনুবাদ মুদ্রিত হয়। যখন তিনি বৃদ্ধ হলেন এবং বুঝতে পারলেন যে তাঁর আয়ূ শেষ হয়ে আসছে, তখন তিনি ১৫৪৬ সালে পুনরায় অনুবাদটির মুদ্রণ শুরু করেন। ধর্মগ্রন্থের বিকৃতির বিষয়ে ইয়াহূদী-খৃস্টানগণের অভ্যাস, বিশেষত খৃস্টানগণের অভ্যাসের সাথে তিনি পরিচিত ছিলেন। এজন্য তিনি এই অনুবাদের ভূমিকায় তাঁর অন্তিম নির্দেশনা প্রদান করেন: ‘‘কেউ যেন আমার এই অনুবাদটি বিকৃত না করেন।’’

কিন্তু এ অন্তিম নির্দেশনাটি ছিল খৃস্টান সম্প্রদায়ের চিরাচরিত অভ্যাসের বিপরীত, এজন্য তাঁরা তা রক্ষা করেন নি; বরং লুথারের মৃত্যুর পরে ত্রিশ বৎসর পার না হতেই তাঁরা এই জাল ও বানোয়াট বাক্যটিকে তাঁর অনুবাদের মধ্যে ঢুকিয়ে দেন। লূথারের অনুবাদের এই বিকৃতি সর্বপ্রথম সাধিত হয় ফ্রাঙ্কফুর্টবাসীদের দ্বারা। ১৫৭৪ সালে যখন তাঁরা এই অনুবাদটি মুদ্রণ করেন তখন তাঁরা এই জাল বাক্যটিকে তার মধ্যে ঢুকিয়ে দেন। কিন্তু এরপর তাঁরা আবার মানুষের নিন্দার ভয়ে পরবর্তী মুদ্রণগুলিতে এ বাক্যগুলি ফেলে দেন।

ত্রিত্ববাদীরের জন্য এই বাক্যগুলি বাদ দেওয়া খুবই কঠিন ছিল। এজন্য ওটিনবুর্গের বাসিন্দারা ১৫৯৬ ও ১৫৯৯ সালে মুদ্রিত লুথারের এই অনুবাদের মধ্যে এই বাক্যগুলি ঢুকিয়ে দেন। অনুরূপভাবে হামবুর্গবাসিগণ ১৫৯৬ সালে একই কাজ করেন। এরপর ওটিনবুর্গবাসিগণ ফ্রাঙ্কফুর্টবাসিগণের মত মানুষের নিন্দার ভয় পান। ফলে পরবর্তী মুদ্রণের সময় বাক্যগুলি ফেলে দেন।

লূথারের অনুসারী ত্রিত্ববাদী প্রটেস্টান্ট খৃস্টানগণের জন্য এই বাক্যটিকে বাদ দেওয়া কষ্টকর হয়ে দাঁড়ায়। তখন লূথারের নিজের অন্তিম নির্দেশনা লঙ্ঘন করে অধিকাংশ ক্ষেত্রে তাঁর অনুবাদের মধ্যে এ বাক্যটি উল্লেখ করা হয়।

এ যদি হয় আধুনিক যুগের অবস্থা, তাহলে মুদ্রণযন্ত্র আবিষ্কৃত হওয়ার পূর্বে, যখন বাইবেলের কপি ও পাণ্ডুলিপির সংখ্যা ছিল খুবই কম[54], তখন তাঁরা কি করেছেন তা সহজেই অনুমেয়।

প্রসিদ্ধ দার্শনিক আইজ্যাক নিউটন ৫০ পৃষ্ঠার একটি পুস্তিকা লিখেছেন। এই পুস্তিকাতে তিনি প্রমাণ করেছেন যে, যোহনের পত্রের উপরের বাক্যগুলি বিকৃত ও সংযোজিত।

এখানে উল্লেখ্য যে, আধুনিক অনেক সংস্করণে উপর্যুক্ত জাল বাক্যগুলি বাদ দেওয়া হয়েছে। বাংলা বাইবেলগুলিতেও এ বাক্যগুলি বাদ দেওয়া হয়েছে। বা টীকায় উল্লেখ করা হয়েছে।

১০- যীশুকে ঈশ্বরের পুত্র বানানোর জন্য বিকৃতি:

প্রেরিতগণের কার্যবিবরণের ৮ম অধ্যায়ের ৩৭ শ্লোকটি নিম্নরূপ: ‘‘ফিলিপ কহিলেন, সমস্ত অন্তঃকরণের সহিত যদি বিশ্বাস করেন, তবে হইতে পারেন। তাহাতে তিনি উত্তর করিয়া কহিলেন, যীশু খৃস্ট যে ঈশ্বরের পুত্র ইহা আমি বিশ্বাস করিতেছি (I believe that Jesus Christ is the Son of God)।’’[55]

এ বাক্যগুলি পরবর্তীকালে সংযোজিত। কোনো একজন ত্রিত্ববাদী যীশু খৃস্ট যে ঈশ্বরের পুত্র ইহা আমি বিশ্বাস করিতেছিএ কথার দ্বারা খৃস্টের ঈশ্বরত্ব প্রমাণ করার জন্য এই বাক্যটি বাইবেলের মধ্যে সংযোজন করেছেন। ক্রীসবাখ ও শোলয একমত যে, বাক্যটি পরবর্তী সংযোজন। লক্ষণীয় যে, ইংরেজি রিভাইয্ড স্টান্ডার্ড ভার্সন (Revised Standard Version: RVS)-এ এ শ্লোকটি মূল পাঠ থেকে ফেলে দেওয়া হয়েছে এবং টীকায় মন্তব্য করা হয়েছে। উইলিয়াম কেরি অনূদিত বাংলা বাইবেলেও এভাবে ৩৭ শ্লোকটি বাদ দেওয়া হয়েছে এবং টীকায় বলা হয়েছে: ‘‘কোনো কোনো প্রাচীন অনুলিপিতে এখানে এই কথাগুলি পাওয়া যায়’’ … এ কথা বলে উপরের জাল শ্লোকটি উল্লেখ করা হয়েছে।

১১-যাকোবের পুত্র রুবেনের ব্যভিচারের কাহিনীতে বিকৃতি:

আদিপুস্তকের ৩৫ অধ্যায়ের ২২ শ্লোকটি হিব্রু সংস্করণে নিম্নরূপ: ‘‘সেই দেশে ইস্রায়েলের (যাকোবের) অবস্থিতি কালে রূবেন (যাকোবের প্রথম পুত্র)  গিয়া আপন পিতার বিল্হা নাম্মী উপপত্নীর সহিত শয়ন করিল, এবং ইস্রায়েল (যাকোব) তাহা শুনিতে পাইলেন।’’

এখানে কিছু কথা বিয়োজনের মাধ্যমে বিকৃতি সাধান করা হয়েছে। হেনরি ও স্কটের ভাষ্যগ্রন্থের সংকলকগণ বলেন: ইয়াহূদীগণ স্বীকার করেন যে, এ শ্লোক থেকে কিছু কথা বাদ পড়ে গিয়েছে। গ্রীক অনুবাদে এ অপূর্ণতা নিম্নরূপে পুরণ করা হয়েছে: ‘‘এবং তাঁহার দৃষ্টিতে তা অন্যায় হইল।’’

তাহলে ইয়াহূদীরাও স্বীকার করে নিচ্ছেন যে, কিছু কথা বাদ পড়েছে। হিব্রু তোরাহ থেকে একটি পুর্ণ বাক্য বাদ পড়ে যাওয়া বা বিলুপ্ত হয়ে যাওয়াও ইয়াহূদী-খৃস্টানগণের নিকট কোনো আশ্চর্যের বিষয় নয়। তাহলে দুই একটি শব্দের বিষয়ে আর কি কথা থাকতে পারে। আর যেহেতু ‘‘ঈশ্বরের গ্রন্থের মধ্যে’’ এরূপ রদবদল তাদের কাছে খুবই স্বাভাবিক কাজেই কেন তারা এখানে এরূপ বিয়োজন করলেন তা প্রশ্ন করে আর কী লাভ?

১২- ইউসূফ-ভাতৃগণের চুরির ঘটনা বর্ণনায় বিয়োজন:

ইউসূফ আলাইহিস সালাম-এর ভাইয়ের ছালার মধ্যে তাঁর বাটি রাখা ও পরে তা বের করা ঘটনার বর্ণনায় আদিপুস্তকের ৪৪ অধ্যায়ের ৫ম শ্লোক নিম্নরূপ: ‘‘আমার প্রভু যাহাতে পান করেন ও যদ্বারা গণনা করেন, এ কি সেই বাটি নয়? এ কর্ম করায় তোমরা দোষ করিয়াছ।’’

এখানে কিছু কথা বিয়োজন করা হয়েছে বা বাদ পড়ে গিয়েছে। বাইবেল ব্যাখ্যাকার হার্সলি বলেন: ‘‘এ শ্লোকের শুরুতে নিম্নের বাক্যটি সংযোজিত করতে হবে: ‘‘তোমরা কেন আমার বাটি চুরি করিলে?’’ গ্রীক অনুবাদ থেকে এই বাক্যটি নিয়ে হিব্রু পাঠে যোগ করতে হবে।’’

১৩- মূসা আলাইহিস সালাম-এর মাতা ও ভগ্নির নাম-পরিচয় বিকৃতি:

যাত্রাপুস্তকের ৬ অধ্যায়ের ২০ শ্লোকে রয়েছে: ‘‘অম্রম (Amram) আপন পিসি যোকেবদকে বিবাহ করিলেন, আর ইনি তাঁহার জন্য  হারোণকে ও মোশিকে প্রসব করিলেন।’’

নিঃসন্দেহে এখানে বিয়োজন-জনিত বিকৃতি ঘটেছে। এ ক্ষেত্রে পুরাতন নিয়মের নিয়ম সকল সন্তানের নাম উল্লেখ করা। এ শ্লোক থেকে বুঝা যায় যে, অম্রমের মাত্র দুটি পুত্রসন্তানই ছিল; অথচ প্রকৃতপক্ষে তাদের একজন কন্যাসন্তানও ছিল। শমরীয় সংস্করণ থেকে এ বিকৃতি বুঝা যায়। শমরীয় সংস্করণে এবং গ্রীক অনুবাদে রয়েছে: ‘‘আর ইনি তাঁহার জন্য  হারোণকে, মোশিকে ও তাঁহাদের ভগিনী মরিয়মকে প্রসব করিলেন।’’

তাহলে ‘‘ও তাঁহাদের ভগিনী মরিয়মকে’’ কথাগুলি হিব্রু তোরাহ থেকে বাদ পড়ে গিয়েছে। আদম ক্লার্ক শমরীয় ও গ্রীক সংস্করণ থেকে উপর্যুক্ত কথাগুলি উদ্ধৃত করার পরে বলেন: ‘‘কোনো কোনো শীর্ষস্থানীয় গবেষক পণ্ডিত মনে করেন যে, হিব্রু পাঠেও এই কথাগুলি ছিল।’’

এ থেকে প্রমাণিত হলো যে, ইয়াহূদীগণ একান্তই ধর্মীয় বিদ্বেষের কারণে তাদের তাওরাত থেকে কয়েকটি শব্দ বাদ দিয়েছেন। শমরীয়দের তাওরাতের বিকৃতি প্রমাণ করতে অথবা খৃস্টানদের গ্রীক অনুবাদের বিকৃতি প্রমাণ করতে তারা এরূপ করেছেন।

এখানে আরো একটি বিষয় লক্ষণীয়। এ শ্লোক থেকে নিশ্চিত জানা যায় যে, মূসা আলাইহিস সালামের পিতা আপন ফুফুকে বিবাহ করেছিলেন। মূসার পিতা অম্রম (ইমরান)। অম্রমের পিতা কহাৎ। কহাতের পিতা লেবী। আর মূসার পিতা অম্রম বিবাহ করেন তার পিতা কহাতের ভগ্নি যোকাবেদ বিনত লেবীকে। উপরের শ্লোকে তা সুস্পষ্টত বলা হয়েছে।[56] এ শ্লোকের ইংরেজি, আরবী, ফারসী, উর্দু, বাংলা বিভিন্ন ভাষার অনুবাদেও স্পষ্টত তা উল্লেখ করা হয়েছে।

মূসা আলাইহিস সালাম-এর শরীয়ত বা ব্যবস্থা মতে ফুফুকে বিবাহ করা নিষিদ্ধ। লেবীয় পুস্তকের ১৮/১২ ও ২০/১৯ শ্লোকে তা বলা হয়েছে। এজন্য খৃস্টানগণ এ পরিচয় গোপন করতে বিকৃতির আশ্রয় নেন। ভ্যাটিকানের পোপ অষ্টম উর্বান (Urban)[57]-এর সময়ে অত্যন্ত যত্ন সহকারে বাইবেলের যে আরবী সংস্করণটির অনুবাদ ও সম্পাদনা করা হয় এবং ১৬২৫ খৃস্টাব্দে মুদ্রিত ও প্রকাশিত হয় সে সংস্করণে এ শ্লোকটি নিম্নরূপ লেখা হয়েছে: ‘‘অম্রম আপন পিসির কন্যা যোকেবদকে বিবাহ করিলেন।’’

এখানে ‘‘পিসি’’ বা ‘‘ফুফু’’ শব্দটিকে বিকৃত করে ‘‘পিসির কন্যা’’ (ফুফাতো বোন) বানানো হয়েছে। পরবর্তী বিভিন্ন আরবী সংস্করণে এরূপ পিসির বদলে পিসির কন্যা লেখা হয়েছে। এভাবে তারা নিজেদের মনমর্জি মত কিছু রদবদল বা পরিবর্তনের মাধ্যমে কোনো কোনো সংস্করণ বিকৃত করেছেন।

১৪- গীতসংহিতায় বিয়োজন বা সংযোজন করে বিকৃতি:

গীতসংহিতার ১৪ গীতের ৩য় শ্লোকের পরে- ৩ ও ৪ শ্লোকের মাঝখানে- ল্যাটিন, ইথিওপিয়, আরবী অনুবাদে এবং গ্রীক অনুবাদের ভ্যাটিকানের পাণ্ডুলিপিতে নিম্নের বাক্যগুলি রয়েছে: ‘‘তাহাদের কণ্ঠ অনাবৃত কবরস্বরূপ; তাহারা জিহবাতে ছলনা করিতেছে; তাহাদের ওষ্ঠাধরের নিম্নে কালসর্পেব বিষ থাকে; তাহাদের মুখ অভিশাপ ও কটুকাটব্যে পূর্ণ; তাহাদের চরণ রক্তপাতের জন্য ত্বরান্বিত। তাহাদের পথে পথে ধ্বংস ও বিনাশ; এবং শান্তির পথ তাহারা জানে নাই; ঈশ্বর-ভয় তাহাদের চক্ষুর অগোচর।’’

এ বাক্যগুলি হিব্রু বাইবেলে নেই। কিন্তু এ কথাগুলি রোমীয়দের প্রতি প্রেরিত পৌলের পত্রের ৩/১৩-১৮ শ্লোকে রয়েছে। পৌল পুরাতন নিয়মের বক্তব্য হিসেবে এ কথাগুলিকে উদ্ধৃত করেছেন। এখানে দুটি বিষয়ের একটি অবশ্যই ঘটেছে। হয়তবা ইয়াহূদীরা মূল হিব্রু বাইবেল থেকে এ শ্লোকগুলি ফেলে দিয়েছেন। নতুবা খৃস্টানগণ তাঁদের মহাপুরুষ পৌলের বক্তব্যকে প্রমাণিত করার জন্য তাঁদের অনুবাদের মধ্যে এই কথাগুলি সংযোজন করেছেন। প্রথম সম্ভাবনা স্বীকার করলে বাইবেলে বিয়োজনের মাধ্যমে বিকৃতি প্রমাণিত হয়। আর দ্বিতীয় সম্ভাবনা স্বীকার করলে বাইবেলে সংযোজন ও বৃদ্ধির মাধ্যমে জালিয়াতি প্রমাণিত হয়। সর্বাবস্থায় এখানে দু প্রকারের জালিয়াতির এক প্রকার মানতেই হবে।

১৫- লূকলিখিত সুসমাচারে বিয়োজন-জনিত বিকৃতি

যীশু খৃস্ট তার শিষ্যদেরকে কিয়ামত বা মহাপ্রলয়ের আগমন সম্পর্কে ও সেজন্য প্রস্তুতি গ্রহণ সম্পর্কে কিছু উপদেশ প্রদান করেন বলে মথি, মার্ক ও লূক উল্লেখ করেছেন। লূকের বর্ণনায় কিছু কথা বাদ দেওয়া হয়েছে। লূকলিখিত সুসমাচারের ২১/৩২-৩৪ শ্লোক নিম্নরূপ: ‘‘(৩২) আমি তোমাদেরকে সত্য বলিতেছি, যে পর্যন্ত সমস্ত সিদ্ধ না হইবে সেই পর্যন্ত এই কালের লোকদের লোপ হইবে না। (৩৩) আকাশের ও পৃথিবীর লোপ হইবে, কিন্তু আমার বাক্যের লোপ কখনও হইবে না। (৩৪) কিন্তু আপনাদের বিষয়ে সাবধান থাকিও, পাছে ভোগপীড়ায় ও মত্ততায় এবং জীবিকার চিন্তায় তোমাদের হৃদয় ভারগ্রস্ত হয়, আর সেই দিন হঠাৎ ফাঁদের ন্যায় তোমাদের উপর আসিয় পড়ে।’’

হর্ন তাঁর ব্যাখ্যাগ্রন্থে বলেন: ‘‘লূকলিখিত সুসমচারের ২১ অধ্যায়ের ৩৩ ও ৩৪ শ্লোকের মাঝখানে একটি পূর্ণ শ্লোক পড়ে গিয়েছে। মথিলিখিত সুসমাচারের ২৪ অধ্যায়ের ৩৬ শ্লোক অথবা মার্ক লিখিত সুসমাচারের ১৩ অধ্যায়ের ৩২ শ্লোক থেকে কথাটি নিয়ে লূকের সুসমাচরের উপর্যুক্ত শ্লোকদ্বয়ের মাঝে সংযোজন করতে হবে।’’

এরপর টীকায় বলেন: ‘‘এখানে যে বড় রকমের বিয়োজন ও বিকৃতি ঘটেছে সে বিষয়টি সকল গবেষক ও ব্যাখ্যাকার এড়িয়ে গিয়েছেন। সর্বপ্রথম হেলস-ই বিষয়টির প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।’’

এ ঘটনা বর্ণনায় মথির বিবরণ (মথি ২৪/৩৪-৩৬) নিম্নরূপ: ‘‘(৩৪) আমি তোমাদিগকে সত্য কহিতেছি, এই কালের লোকদের লোপ হইবে না, যে পর্যন্ত না এ সমস্ত সিদ্ধ হয়। (৩৫) আকাশের ও পৃথিবীর লোপ হইবে, কিন্তু আমার বাক্যের লোপ কখনও হইব না। (৩৬) কিন্তু সেই দিনের ও সেই দন্ডের কথা কেহই জানে না, স্বর্গের দূতগণও জানেন না, পুত্রও জানেন না, কেবল পিতা জানেন।’’

একই ঘটনা বর্ণনায় মার্ক বলেন (মার্ক ১৩/৩০-৩২): ‘‘(৩০) আমি তোমাদিগকে সত্য কহিতেছি, যে পর্যন্ত এ সমস্ত সিদ্ধ না হইবে, সে পর্যন্ত এ কালের লোকদের লোপ হইবে না। (৩১) আকাশের ও পৃথিবীর লোপ হইবে, কিন্তু আমার বাক্যের লোপ কখনও হইবে না। (৩২) কিন্তু সেই দিনের বা সেই দন্ডের তত্ত্ব কেহই জানে না, স্বর্গস্থ দূতগণও জানেন না, পুত্রও জানেন না, কেবল পিতা জানেন।’’

তাহলে হর্ন-এর স্বীকৃতি অনুযায়ী লূকের সুসমাচার থেকে একটি পূর্ণ শ্লোক বাদ পড়ে গিয়েছে, যে শ্লোকটি পুনঃসংযোজন অত্যাবশ্যক। আর সে শ্লোকটি হলো: ‘‘কিন্তু সেই দিনের বা সেই দন্ডের তত্ত্ব কেহই জানে না, স্বর্গস্থ দূতগণও জানেন না, পুত্রও জানেন না, কেবল পিতা জানেন।’’[58]

১৬- ইয়াহূদী ও খৃস্টানগণের বিদ্বেষপ্রসূত বিকৃতি:

মথিলিখিত সুসমাচারের ২য় অধ্যায়ের ২৩ শ্লোকটি নিম্নরূপ: ‘‘এবং নাসরৎ নামক নগরে গিয়া বসতি করিলেন; যেন ভাববদিগণের দ্বারা কথিত এই বচন পূর্ণ হয় যে, তিনি নসরতীয় বলিয়া আখ্যাত হইবেন।’’

‘‘যেন ভাববাদিগণের দ্বারা কথিত এই বচন পূর্ণ হয় যে, তিনি নসরতীয় বলিয়া আখ্যাত হইবেন’’- এই কথাগুলি মথির সুসমাচারের অন্যতম ভুল। কারণ ভাববাদিগণের নামে প্রচলিত ও পরিচিত পুরাতন নিয়মের কোনো পুস্তকেই এ কথাটি নেই। এখানে দুটি বিষয়ের একটি স্বীকার করতেই হবে। হয় খৃস্টানগণ ইয়াহূদীদের প্রতি বিরোধিতা ও বিদ্বেষের কারণে এ বাক্যগুলি তাদের সুসমাচারের মধ্যে সংযোজন করেছেন ইয়াহূদীদের বিকৃতি প্রমাণ করতে। তাহলে তা সংযোজনজনিত বিকৃতি বলে গণ্য হবে।  অথবা ইয়াহূদীগণ তাদের ভাববাদিগণের পুস্তক থেকে এ কথাগুলি মুছে দিয়েছেন খৃস্টানদেরকে বিভ্রান্ত প্রমাণ করতে। এক্ষেত্রে তা বিয়োজন জনিত বিকৃতি বলে গণ্য হবে।

এখানে প্রাচীন খৃস্টান ধর্মগুরু ও পণ্ডিত ‘‘ক্রীযস্টম (John Chrysostom: 347–407) ও অন্যান্য খৃস্টান পণ্ডিতগণ দাবি করেছেন যে, মথির উদ্ধৃত এ কথাটি যে সকল পুস্তকে বিদ্যমান ছিল সে সকল পুস্তক সব বিনষ্ট হয়ে গিয়েছে। ভাববাদিগণের অনেক পুস্তক হারিয়ে ও বিনষ্ট হয়ে গিয়েছে। কারণ, ইয়াহূদীগণ তাঁদের অবহেলার কারণে- বরং তাঁদের ধর্মহীনতা ও অসততার কারণে- অনেক পুস্তক হারিয়ে ফেলেছে। কিছু পুস্তক তাঁরা ছিড়ে ফেলেছে এবং কিছু পুস্তক তাঁরা পুড়িয়ে ফেলেছে। তাঁরা যখন দেখলেন যে, যীশুর প্রেরিত শিষ্যগণ এ সকল পুস্তকের কথা দিয়ে খৃস্টধর্মের বিভিন্ন বিষয় প্রমাণ করছেন, তখন তাঁরা যীশুর পক্ষের প্রমাণ বিনষ্ট করতে এ কাজ করেন। এ থেকে জানা যায় যে, মথি যে সকল পুস্তক থেকে এ কথাটি উদ্ধৃত করেছেন ইয়াহূদীরা সে পুস্তকগুলি বিনষ্ট করে ফেলেছে।

‘‘এজন্য ট্রিফোনের (Tryphon) সাথে বিতর্কের সময় জাস্টিন (Justin)[59] বলেন: ইয়াহূদীরা পুরাতন নিয়ম থেকে অনেক পুস্তক বাদ দিয়েছে, যেন প্রকাশ পায় যে, নতুন নিয়মের কথাবার্তা পুরাতন নিয়মের সাথে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

খৃস্টান গবেষকগণের এ সকল বক্তব্য থেকে জানা যায় যে, এরূপ বিকৃতি সেযুগে খুবই সহজ ছিল। শুধু ধর্মীয় শত্রুতা ও মতপার্থক্যের কারণে কিভাবে ইয়াহূদীরা এ সকল ধর্মগ্রন্থ ছিড়ে, পুড়িয়ে বা নষ্ট করে ফেলল এবং পুস্তকগুলিকে বিনষ্ট করার ফলে কিভাবে সেগুলি পৃথিবীর বুক থেকে চিরতরে হারিয়ে গেল! বিয়োজনের মাধ্যমে বিকৃতির এর চেয়ে বড় উদাহরণ আর কী হতে পারে? একটি ধর্মীয় সম্প্রদায় তাঁদের প্রবৃত্তির তাড়নায় অথবা অন্য একটি ধর্মের বিরোধিতার জন্য ঈশ্বরের বাণী ও ঐশ্বরিক প্রেরণা-লব্ধ কিছু পুস্তক একেবারে গুম করে দিলেন! এত বড় বিকৃতি কি আর হতে পারে?

ইয়াহূদীরা যদি খৃস্টধর্মের অসারতা প্রমাণের জন্য নিজেদের ধর্মগ্রন্থ বিকৃতি করতে বা গুম করে দিতে পারে এবং খৃস্টানরা যদি ইয়াহূদীদের বিরোধিতার জন্য নিজেদের ধর্মগ্রন্থে বিকৃতি করতে পারে তাহলে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নুবুওয়াত বিষয়ক ভবিষ্যদ্বাণীগুলি বিনষ্ট বা বিকৃত করা কি তাদের জন্য অসম্ভব বিষয়? বরং ইসলাম, মুসলিম ও মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বিরোধিতায় তাদের যে উগ্রতা তাতে আমরা জোর দিয়েই দাবি করতে পারি যে, মুসলিমদের পক্ষে যে সকল পুস্তক বা কথাবার্তা ছিল সেগুলিও তাঁরা এভাবে বিনষ্ট বা বিকৃত করেছেন। কোনো যুক্তি, বিবেক বা লিখিত প্রমাণ কি এ দাবির বিরোধিতায় পেশ করা যাবে??

১. ৩. ৪. বিকৃতি বিষয়ে পাদরিগণের বিভ্রান্তিকর প্রচারণা

খৃস্টান প্রচারকগণ বাইবেলের মধ্যে বিদ্যমান বৈপরীত্য, ভুলভ্রান্তি ও বিকৃতির কথা এড়িয়ে বিভিন্ন কথা বলে সাধারণ মুসলিমদেরকে বুঝাতে চান যে, বাইবেলের মধ্যে কোনোরূপ বিকৃতি নেই। তাদের এ জাতীয় কয়েকটি বিভ্রান্তিকর অপপ্রচার আমরা এখানে আলোচনা করতে চাই।

১. ৩. ৪. ১. শুধু মুসলিমরাই বিকৃতির কথা বলে

প্রটেস্টান্ট পণ্ডিতগণের লেখনি বা আলোচনা থেকে অনেক সময় প্রকাশ পায় যে, একমাত্র মুসলিমরাই বাইবেলের মধ্যে বিকৃতি ঘটেছে বলে দাবি করেন। তাদের আগে কেউ এরূপ দাবি করেন নি। সাধারণ মুসলিম, বিশেষত খৃস্টান পণ্ডিতদের বইপুস্তক যারা পাঠ করেন নি তাদেরকে বিভ্রান্ত করার জন্য তাঁরা এ সব কথা বলেন। প্রকৃত সত্য কথা হলো, অ-খৃস্টান পণ্ডিতগণ, ভিন্নমতাবলম্বী খৃস্টানগণ এবং ধার্মিক খৃস্টানগণ সকলেই প্রাচীন যুগ থেকে বাইবেলের বিকৃতির কথা বলে আসছেন। নিম্নে আমরা তাদের কিছু মতামত উল্লেখ করছি:

১. ৩. ৪. ২. বিকৃতি বিষয়ে অমুসলিমগণের সাক্ষ্য

প্রথমত: অ-খৃস্টানগণের মতামত

(১) ২য় শতাব্দীর রোমান পণ্ডিত সেলসাসের মত

দ্বিতীয় খৃস্টীয় শতকের একজন পৌত্তলিক পণ্ডিত ছিলেন সেলসাস (Celsus Epicurean)। তিনি খৃস্টধর্মের প্রতিবাদে একটি গ্রন্থ রচনা করেন। প্রসিদ্ধ জার্মান খৃস্টান-পণ্ডিত একহর্ন এ পৌত্তলিক পণ্ডিতের পুস্তক থেকে তাঁর নিম্নের বক্তব্যটি উদ্ধৃত করেছেন: ‘‘খৃস্টানগণ তাদের সুসমাচারগুলি তিনবার বা চারবার বা তারও বেশিবার কঠিনভাবে পরিবর্তন করেছে, এমনকি সেগুলির বিষয়বস্তুও পরিবর্তিত হয়ে গিয়েছে।’’

সম্মানিত পাঠক, তাহলে লক্ষ্য করুন, এই পৌত্তলিক পণ্ডিত জানাচ্ছেন যে, তাঁর যুগেই খৃস্টানগণ চার বারেরও বেশি বিকৃত করেছেন তাঁদের সুসমাচারগুলিকে।

(২) আধুনিক পণ্ডিত পার্কারের মত:

ঊনবিংশ শতকের প্রসিদ্ধ আমেরিকান সংস্কারক ও পাদরী থিয়োডোর পার্কার (Theodore Parker: ১৮৬০)। চার্চ নিয়ন্ত্রিত খৃস্টানদের দৃষ্টিতে তিনি ধর্মদ্রোহী (Heretic)। তিনি বলেন: ‘‘বাইবেলের মধ্যে বিদ্যমান ভুল ও বিকৃতি- যাকে খৃস্টান পণ্ডিতগণ ভুল, পাঠের বিভিন্নতা (erratum, Various readings/Variety of reading) ইত্যাদি বলে অভিহিত করেন- এরূপ ভুলের সংখ্যা মিলের হিসাব অনুযায়ী ত্রিশ হাজার।

(৩) প্রায় একশত জাল ইঞ্জিল

একজন চার্চবিরোধী খৃস্টান পণ্ডিত বাইবেলের নতুন নিয়মের অন্তর্ভুক্ত পুস্তক ও পত্রাবলি ছাড়াও প্রাচীন খৃস্টান ধর্মগুরুগণ যীশুখৃস্ট, তাঁর মাতা মেরি বা তাঁর প্রেরিত শিষ্যগণ বা তাদের অনুসারিগণের নামে প্রচারিত পুস্তক ও পত্রের নাম উল্লেখ করে তালিকা তৈরি করেন। তাতে তিনি এরূপ ৭৪টি জাল ইঞ্জিল বা পত্রের নাম উল্লেখ করেছেন।

এরপর তিনি বলেন, এভাবে আমরা  সুসমাচার’, ‘প্রকাশিত বাক্যও পত্রাবলির এক সুবিশাল ভান্ডার দেখতে পাচ্ছি। এখন পর্যন্ত অধিকাংশ খৃস্টান মনে করেন যে, এ সকল পুস্তকের অধিকাংশই সত্যিকারেই উল্লিখিত লেখকদের রচনা। তাহলে প্রটেস্টান্ট সম্প্রদায় যে পুস্তক বা পত্রগুলিকে মেনে নিয়েছেন সেগুলিই যে সত্যিকারের ঐশ্বরিক প্রেরণালব্ধ পুস্তক তা আমরা কিভাবে জানব? এছাড়া আমার জানি যে মুদ্রণযন্ত্র আবিষ্কৃত হওয়ার আগে এ সকল স্বীকৃতপুস্তকও বিকৃতি, পরিবর্তন ও সংযোজনের জন্য উন্মুক্ত ছিল। এতে সমস্যা আরো ঘনীভুত হয়।

দ্বিতীয়ত: অ-গোঁড়া (heretic) খৃস্টানগণের মতামত

(১). প্রথম শতাব্দী থেকে এবোনাইট খৃস্টানগণের মত

প্রথম যুগের অত্যন্ত প্রসিদ্ধ খৃস্টান সম্প্রদায় এবোনাইট সম্প্রদায় (Ebionites)। তাঁর পৌলের সমসাময়িক ছিলেন এবং পৌলের ঘোর বিরোধী ছিলেন। তাঁরা বলতেন যে, পৌল ধর্মত্যাগী।[60] এই সম্প্রদায়ের খৃস্টানগণ মথির সুসমাচারটি বিশ্বাস করতেন। কিন্তু তাঁদের নিকট সংরক্ষিত মথিলিখিত সুসমাচারটির সাথে বর্তমানে পৌলের অনুসারী খৃস্টানগণের নিকট প্রচলিত মথিলিখিত সুসমাচারেরঅনেক স্থানেই মিল নেই। প্রচলিত মথি’-র প্রথম ও দ্বিতীয় অধ্যায়দ্বয় তাঁদের মথির মধ্যে ছিল না। এবোনাইটদের মতে এ দু অধ্যায় ও অন্যান্য অনেক স্থানে অনেক কথা জাল ও বানোয়াট। তারা যীশুর ঈশ্বরত্বে বিশ্বাস করত না; বরং তাঁকে মানুষ ও রাসূল বলে বিশ্বাস করত।

(২). দ্বিতীয় শতাব্দী থেকে মারসিওনীয় খৃস্টানগণের মত

দ্বিতীয় খৃস্টীয় শতকের প্রসিদ্ধ আধ্যাত্মবাদী (Gnostic) খৃস্টান সম্প্রদায় মারসিওনীয় সম্প্রদায়[61]। তাঁরা পুরাতন নিয়মের কোনো পুস্তকই মানতেন না। তাঁরা বলতেন যে, এগুলি কোনোটিই ঐশ্বরিক প্রেরণা-লব্ধ পুস্তক নয়। অনুরূপভাবে তাঁরা নতুন নিয়মের সকল পুস্তক অস্বীকার করতেন। কেবল লূকলিখিত সুসমাচার এবং পৌলের পত্রাবলি থেকে ১০টি পত্র তাঁরা ঐশ্বরিক বলে মানতেন। আর তাঁদের স্বীকৃত এ সুসমাচার ও পত্রাবলিও বর্তমানে প্রচলিত সুসমাচার ও পত্রাবলি থেকে ভিন্ন। লূকের সুসমাচারের প্রথম দুটি অধ্যায়কে তারা জাল বলে গণ্য করত। এছাড়াও এ সুসমাচারের আরো অনেক বিষয় তারা অস্বীকার করত। লার্ডনার তাঁর ব্যাখ্যাগ্রন্থে এরূপ ১৪টি স্থানের কথা উল্লেখ করেছেন। বেল উল্লেখ করেছেন যে, এ খৃস্টান সম্প্রদায় দুটি ঈশ্বরে বিশ্বাস করত: একজন মঙ্গলের ঈশ্বর ও অন্যজন অমঙ্গলের ঈশ্বর। তারা বিশ্বাস করত যেতাওরাত ও পুরাতন নিয়মের সকল পুস্তক অমঙ্গলের ঈশ্বরের প্রদত্ত; কারণ তা নতুন নিয়মের বিপরীত।

(৩) তৃতীয়-চতুর্থ শতাব্দী থেকে মানিকীয সম্প্রদায়ের মত

তৃতীয় খৃস্টীয় শতকের প্রসিদ্ধ ধর্ম প্রচারক মানী (Manes/Mani) ও তাঁর অনুসারী মানিকীয সম্প্রদায় (Manichees/ Manichaen/ Manichean) নিজেদেরকে খৃস্টের অনুসারী ও খৃস্টান বলে দাবি করতেন। এ সম্প্রদায়ের একজন প্রসিদ্ধ অস্ট্রীয় পণ্ডিত ফাস্টিস। তিনি চতুর্থ শতাব্দীর মানুষ। তিনি ইঞ্জিলগুলির বিকৃতির বিষয়ে সোচ্চার ছিলেন। লার্ডনার তাঁর ব্যাখ্যাগ্রন্থে চতুর্থ শতকের প্রসিদ্ধতম খৃস্টান পণ্ডিত সেন্ট অগাস্টাইনের উদ্ধৃতি দিয়ে লিখেছেন, ফাস্টিস বলেন: আপনাদের পিতা ও পিতামহগণ ষড়যন্ত্র করে নতুন নিয়মের পুস্তকাবলির মধ্যে যে সকল বিষয় সংযোজন করেছেন আমি সেগুলির নিন্দা করি ও প্রত্যাখ্যান করি। এরূপ জালিয়াতির মাধ্যমে তাঁরা নতুন নিয়মের সুন্দর অবস্থাকে দুষিত ও ত্রুটিময় করেছেন এবং তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব নষ্ট করেছেন। আর এ কথা তো সুনিশ্চিত যে, খৃস্ট বা তাঁর প্রেরিত শিষ্যগণের কেউই নতুন নিয়ম রচনা করেন নি বরং একজন অজ্ঞাতনামা ব্যক্তি তা রচনা করে প্রেরিতগণ ও প্রেরিতগণের সঙ্গীদের নামে চালিয়েছে। কারণ এই অজ্ঞাতনামা লেখক ভয় পেয়েছিল যে, সাধারণ মানুষেরা তাঁর লেখা পুস্তক গ্রহণ করবেন না। তারা ভাববেন যে, এ লেখক যীশুর যে সকল বিবরণ লিখেছেন সেগুলি প্রত্যক্ষ করে বা ভালভাবে জেনে লিখে নি। এ ভয়ে সে বইগুলি লিখে প্রেরিতগণ বা তাঁদের শিষ্যগণের নামে চালিয়েছে। এ অপকর্মের মাধ্যমে লোকটি যীশুর অনুসারী ও প্রেমিকগণকে অত্যন্ত কঠিন কষ্ট দিয়েছে। কারণ সে অগণিত ভুল ও বৈপরীত্যে ভরা কিছু বই লিখেছে।

এ হলো নতুন নিয়ম সম্পর্কে এই সম্প্রদায়ের বিশ্বাস। তাঁদের এই পণ্ডিত যে বিষয়গুলি উল্লেখ করেছেন সেগুলির অন্যতম:

(১) ত্রিত্ববাদী খৃস্টানগণ নতুন নিয়মের মধ্যে অনেক কিছু সংযোজন ও জালিয়াতি করেছেন।

(২) এ পুস্তকগুলি প্রেরিতগণ বা তাদের সঙ্গীদের রচিত নয় বরং একজন অজ্ঞাতনামা ব্যক্তি সেগুলি রচনা করেছেন।

(৩) এগুলি অগণিত ভুল ও বৈপরীত্যে পূর্ণ।

লার্ডনার তার বাইবেল-ব্যাখ্যাগ্রন্থে লিখেছেন যে, ঐতিহাসিকগণ একমত যে, মানিকীয সম্প্রদায় পুরাতন নিয়মের কোনো পুস্তককেই স্বীকার করত না; উপরন্তু তারা বিশ্বাস করত যে, শয়তান মূসা আলাইহিস সালাম-এর সাথে কথা বলেছিল এবং ইয়াহূদী নবীগণকে প্রবঞ্চনা করেছিল। তারা ইয়াহূদী নবীগণকে চোর ও দস্যু বলে আখ্যায়িত করত।[62]

উপরের দুইটি অনুচ্ছেদ থেকে একথা প্রমাণিত হলো যে, অ-খৃস্টানগণ এবং এবং খৃস্টানগণের মধ্যে অনেক সম্প্রদায়, যাদেরকে গোঁড়া খৃস্টানগণ অ-ধার্মিক বা বিভ্রান্ত বলে মনে করেন তাঁরা সেই প্রথম শতাব্দী থেকে আজ পর্যন্ত উচ্চরবে ঘোষণা দিচ্ছেন যে, বাইবেলের মধ্যে বিকৃতি ও জালিয়াতি ঘটেছে।

তৃতীয়ত: প্রসিদ্ধ গোঁড়া খৃস্টানগণের মতামত

তৃতীয় পর্যায়ে আমরা বাইবেলের বিকৃতির বিষয়ে মূলধারার গোঁড়া খৃস্টান সম্প্রদায়ের নিকট গ্রহণযোগ্য ও প্রসিদ্ধ বাইবেল ব্যাখ্যাকার ও ঐতিহাসিকদের বক্তব্য উদ্ধৃত করব। বস্তুত বাইবেলের বিকৃতির বিষয়ে প্রায় সকল খৃস্টান গবেষকই একমত। কিন্তু খৃস্টধর্ম প্রচারকগণ এগুলি গোপন করার চেষ্টা করেন। এখানে সামান্য কয়েকটি নমুনা উল্লেখ করা হচ্ছে:

(ক) আদম ক্লার্ক তাঁর ব্যাখ্যাগ্রন্থের ৫ম খণ্ডের ৩৬৯ পৃষ্ঠায় বলেন: ‘‘প্রাচীন কাল থেকেই প্রচলিত রীতি হলো, অনেকেই মহান ব্যক্তিদের ইতিহাস রচনা করেন। প্রভু যীশুর ক্ষেত্রেও একই অবস্থা ছিল (অনেকেই তাঁর ইতিহাস রচনা করেছেন।) কিন্তু তাঁদের অধিকাংশ বর্ণনা ছিল অসত্য। অনেক বিষয় যা কখনোই ঘটেনি সেগুলি নিশ্চিত ঘটেছে বলে তাঁরা উল্লেখ করেছেন। অন্য অনেক ঘটনা ও অবস্থার বর্ণনায় তাঁরা ইচ্ছাকৃতভাবে বা অনিচ্ছাকৃতভাবে ভুল করেছেন। এ কথা সুপ্রমাণিত ও সুনিশ্চিত যে, প্রথম খৃস্টীয় শতাব্দীতে অনেক মিথ্যা সুসমাচার প্রচলিত ছিল। সত্তরেরও বেশি এরূপ মিথ্যা সুসমাচারের উল্লেখ পাওয়া যায়। এ সকল সুসমাচারের অনেক অংশ এখনো অবশিষ্ট রয়েছে। ফ্যাবারিসিয়াস এসকল মিথ্যা সুসমাচার একত্রে সংকলন করে তিন খণ্ডে মুদ্রণ করেছেন।

(খ) পুরাতন নিয়মের প্রথম পাঁচটি পুস্তক মোশির রচিত বলে বর্তমানে প্রসিদ্ধ। এছাড়াও আরো ছয়টি পুস্তক তাঁর রচিত বলে প্রচারিত ও পরিচিত ছিল। পুস্তকগুলির নাম নিম্নরূপ:

  1. মোশির নিকট প্রকাশিত বাক্য।
  2. ক্ষুদ্র আদিপুস্তক (Genesis Apocryphon)।
  3. উর্ধ্বারোহণ পুস্তক (The Assumption of Moses)।
  4. রহস্য পুস্তক।
  5. প্রতিজ্ঞা বা নিয়ম পুস্তক (Testament)।
  6. স্বীকৃতি পুস্তক।

হর্ন বলেন: ‘‘ধারণা করা হয় যে, খৃস্টধর্মের শুরুর দিকে, অর্থাৎ খৃস্টীয় প্রথম শতাব্দীতে এ সকল জাল পুস্তকগুলি রচনা করা হয়েছে।’’

(গ)  ঐতিহাসিক মোশিম বলেন: প্রাচীন গ্রীক দার্শনিকদের মধ্যে একটি কথা প্রসিদ্ধ ছিল। কথাটি হলো: সত্যের বৃদ্ধির জন্য ও ঈশ্বরের উপাসনার জন্য মিথ্যা এবং প্রবঞ্চনা শুধু বৈধ-ই নয় উপরন্তু তা প্রশংসনীয় বলে গণ্য হওয়ার যোগ্য।খৃস্টের আগমনের পূর্বেই এই কথাটি তাঁদের থেকে প্রথমে মিসরের ইয়াহূদীরা শিক্ষালাভ করে। অনেক প্রাচীন পুস্তক থেকে এ কথা নিশ্চিতরূপে জানা যায়। এরপর এ ঘৃণিত মহামারী খৃস্টানগণের মধ্যে প্রভাব ফেলে। মহান ধর্মগুরুদের নামে জালিয়াতি করে প্রচারিত বিপুল সংখ্যক পুস্তক থেকে এ কথা স্পষ্টরূপে বুঝা যায়।’’

তাহলে আমরা জানতে পারছি যে, খৃস্টের পূর্বেই ইয়াহূদীদের নিকট মিথ্যা ও প্রবঞ্চনা ধর্মীয়ভাবে প্রসংশনীয় কর্মে পরিণত হয়। এরপর দ্বিতীয় খৃস্টীয় শতাব্দীতে খৃস্টানদের নিকটেও এভাবে মিথ্যা ও প্রবঞ্চনা প্রশংসনীয় ধর্মীয় কাজে পরিণত হয়। অতএব জালিয়াতি, বিকৃতি ও মিথ্যার কোনো সীমারেখা কোথাও ছিল না। তাঁরা যা করার সবই করেছেন।[63]

(ঘ)  লার্ডনার তাঁর ব্যাখ্যাগ্রন্থে বলেন: ‘‘(৬ষ্ঠ শতাব্দীতে) রোমান সম্রাট আনাসতেসিয়াস (Anastasius I:491-518)-এর যুগে, অজ্ঞাতপরিচয় লেখকের রচিত হওয়ার কারণে পবিত্র সুসমাচারগুলিকে অশুদ্ধ বলে সম্রাটের পক্ষ থেকে ঘোষণা দেওয়া হয়। তখন এগুলিকে পুনরায় সংশোধন করা হয়।’’

সুসমাচারগুলি যদি প্রকৃতই ঐশ্বরিক প্রেরণালব্ধ হতো এবং উক্ত সম্রাটের যুগে বিদ্যমান প্রাচীন খৃস্টান পণ্ডিতগণের নিকট বিশুদ্ধ সুত্রে প্রমাণিত হতো যে পুস্তকগুলি অমুক, অমুক প্রেরিত বা তাঁদের অমুক অনুগামীর রচিত, তবে অজ্ঞাত পরিচয় লেখকের রচনাবলে সেগুলিকে অশুদ্ধ ঘোষণা করার কোনো অর্থ থাকতো না। এ থেকে প্রমাণিত হলো যে, সে যুগের খৃস্টানগণের নিকট সেগুলির লেখকের বিষয়ে কোনো প্রমাণিত তথ্য ছিল না। এ ছাড়া তাঁরা পুস্তকগুলিকে ঐশ্বরিক প্রেরণালব্ধ বলেও মনে করতেন না। এজন্য তাঁরা যথাসাধ্য সেগুলির সংশোধন করেছেন এবং ভুলভ্রান্তি ও বৈপরীত্য দূর করেছেন। এভাবে বিকৃতির ষোলকলা পূর্ণ হয়েছে। এখানে বাইবেলের বিকৃতি যেমন প্রমাণিত হলো, তেমনি প্রমাণিত হলো যে, সেগুলির গ্রহণযোগ্যতার কোনো প্রমাণ বা সূত্র পরম্পরা নেই। সকল প্রশংসাই আল্লাহর নিমিত্ত।

(ঙ) চতুর্থ শতকের শ্রেষ্ঠ খৃস্টান পণ্ডিত ও ধর্মগুরু অগাস্টাইন (St. Augustine) এবং অন্যান্য প্রাচীন খৃস্টান ধর্মজ্ঞ পণ্ডিত বলেছেন যে, গ্রীক অনুবাদকে অগ্রহণযোগ্য করার উদ্দেশ্যে ইয়াহূদীরা হিব্রু বাইবেলকে বিকৃত করে। ১৩০ খৃস্টাব্দে ইয়াহূদীরা এ বিকৃতি সাধন করে। হেলয, কেনিকট ও অন্যান্য আধুনিক গবেষক প্রাচীণ ধর্মগুরুগণের সাথে একমত পোষণ করেছেন। কেনিকট অকাট্য প্রমাণাদি দিয়ে প্রতিষ্ঠিত করেছেন যে, ইয়াহূদীগণ শমরীয়দের সাথে শত্রুতার কারণে তাদের নিজেদের তাওরাতে বিকৃতি সাধন করে; যাতে শমরীয়দের নিকট সংরক্ষিত তাওরাত ভুল বলে প্রমাণিত হয়।

(চ)  হার্সলি তাঁর বাইবেল-ব্যাখ্যাগ্রন্থে বলেন, ‘বাইবেলের পাঠ বিকৃত হয়েছেএতে কোনো সন্দেহ নেই। বিভিন্ন সংস্করণ ও পাণ্ডুলিপির বৈপরীত্য থেকেও এ কথা স্পষ্টত জানা যায়। বাইবেলের বিভিন্ন স্থানে যে সকল অত্যন্ত আপত্তিকর ও খারাপ কথা বিদ্যমান সেগুলি থেকে বিকৃতির এ বিষয়টি সুদৃঢ় বিশ্বাসের কাছাকাছি চলে যায়। একথা নিঃসন্দেহে সত্য যে, নেবুকাদনেজারের ঘটনার পরে, বরং তার সামান্য কিছু আগে থেকেই মানুষদের নিকট হিব্রু বাইবেলের যে উদ্ধৃতি ও অংশগুলি ছিল তা ছিল বিকৃতির চূড়ান্ত পর্যায়ে।

(ছ)  ওয়াটসন বলেন, অনেক যুগ আগেই ওরিগন এ সকল বৈপরীত্যের বিষয়ে অভিযোগ- আপত্তি প্রকাশ করতেন। তাঁর মতে এ সকল বৈপরীত্যের বিভিন্ন কারণ ছিল। যেমন লেখকদের অবহেল ও অমনোযোগ, তাঁদের অসততা ও অসদেচ্ছা, তাদের বেপরোয়া ভাব ইত্যাদি। জিরোম (Jerome) বলেন, আমি যখন নতুন নিয়মের অনুবাদ করার ইচ্ছা করলাম, তখন আমি আমার নিকট সংরক্ষিত পাণ্ডুলিপিটি মিলিয়ে দেখলাম। এতে আমি ভয়ানক বৈপরীত্য দেখতে পেলাম। আদম ক্লার্ক বলেন, ‘‘জিরোমের (Jerome) যুগের (৫ম শতকের) পূর্ব থেকেই বাইবেলের অনেক ল্যাটিন অনুবাদ প্রচলিত ছিল। বিভিন্ন অনুবাদক এগুলি লিখেছিলেন। কোনো কোনো অনুবাদ ছিল বিকৃতির চূড়ান্ত পর্যায়ে। এগুলির একস্থানের বক্তব্য অন্য স্থানের বিপরীত ছিল। জিরোম এ সকল বিষয় উল্লেখ করেছেন।’’

(জ) খৃস্টান সন্যাসী (monk) ফিলিপস কোয়াডনলস খায়ালাত’ (খেয়ালগুলি) নামে একটি বই লিখেন। ১৬৪৯ খৃস্টাব্দে বইটি (রোমে) মুদ্রিত হয়েছে। এই পুস্তকে তিনি বলেন: ‘‘পুরাতন নিয়মের পুস্তকগুলির বিকৃতির সংখ্যা খুবই বেশি। ইয়াহূদীদের বিকৃতি প্রমাণ করার জন্যই আমরা খৃস্টানগণ এ সকল পুস্তকের সংরক্ষণ করেছি, আমরা তাঁদের জালিয়াতির স্বীকৃতি প্রদান করি না।’’

(ঝ)  প্রটেস্টান্ট সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে ইংল্যান্ডের রাজা প্রথম জেমস (James)[64]-এর নিকট এ মর্মে দরখাস্ত পেশ করা হয় যে, ‘‘আমাদের প্রার্থনা গ্রন্থের মধ্যে যাবূরের যে পংক্তিগুলি উদ্ধৃত করা রয়েছে সেগুলির সাথে হিব্রু যাবুরের অনেক পার্থক্য। সংযোজন, বিয়োজন ও পরিবর্তনের মাধ্যমে কমবেশি ২০০ স্থানে এই পার্থক্য করা হয়েছে।’’

(ঞ) ইংরেজ ঐতিহাসিক মি. টমাস কার্লাইল (১৭৯৫-১৮৮১) বলেন: ‘‘ইংরেজি অনুবাদকগণ বাইবেলের মূল বক্তব্য নষ্ট করেছেন, সত্য গোপন করেছেন, অজ্ঞদেরকে ধোঁকা দিয়েছেন এবং নতুন নিয়মের পুস্তকাবলির সহজ সরল অর্থকে বক্র করেছেন। তাঁদের কাছে আলোর চেয়ে অন্ধকার এবং সত্যের চেয়ে মিথ্যাই বেশি প্রিয়।’’

(ট)  নতুন অনুবাদ কাউন্সিলের অন্যতম সদস্য মি. প্রোটন বলেন: ইংল্যন্ডে বর্তমানে প্রচলিত অনুবাদটি ভুলভ্রান্তিতে ভরা। তিনি পাদরীদেরকে বলেন: ‘‘আপনাদের প্রসিদ্ধ ইংরেজি অনুবাদটিতে পুরাতন নিয়মের বক্তব্য ৮৪৮ স্থানে বিকৃত করা হয়েছে। এ বিকৃতিগুলিই ছিল অনেক মানুষের বাইবেল অস্বীকারের কারণ।

বাইবেলের মধ্যে বিদ্যমান বৈপরীত্য, ভুল, ও বিকৃতির আলোচনায় আমরা আরো অনেক প্রসিদ্ধ গোঁড়া খৃস্টান পণ্ডিতের এ বিষয়ক আরো অনেক মতামত দেখেছি। বস্তুত বাইবেলের বিকৃতির বিষয়টি সকল গবেষকই স্বীকার করেন। অনেকে গোঁড়ামি করে সাধারণ মূলনীতি হিসেবে বিকৃতির কথা অস্বীকার করলেও বাস্তবে যখন বাইবেলের এ সকল বৈপরীত্য ও ভুল তথ্যের সম্মুখিন হন তখন বিকৃতির বিষয়টি মেনে নেন।

উপরের আলোচনা থেকে আমরা বুঝতে পারছি যে, মুসলমানগণ ছাড়াও খৃস্টান ও অখৃস্টান  সকলেই বাইবেলের বিকৃতির কথা বলেছেন। এখন আমরা খৃস্টান পণ্ডিতগণ বিকৃতির যে সকল কারণ উল্লেখ করেছেন তা পর্যালোচনা করব।

১. ৩. ৪. ৩. বাইবেলে বিকৃতির কারণাদি

হর্ন তাঁর বাইবেল ব্যাখ্যাগ্রন্থে Various readings বা বাইবেলের মধ্যে বিদ্যমান পাঠের বিভিন্নতার চারটি কারণ উল্লেখ করেছেন:

প্রথম কারণ: ‘‘লিপিকারের[65] অসতর্কতা ও ভুল’’

বিভিন্ন ভাবে তা ঘটতে পারে।

প্রথমত, লিপিকারকে যিনি বলেছিলেন তিনি এভাবেই বলেছিলেন, অথবা লিপিকার তাঁর কথা ঠিকমত বুঝতে পারেন নি, ফলে ভুল লিখেছেন।

দ্বিতীয়ত, হিব্রু ও গ্রীক বর্ণগুলি অনেকটা একইরূপ ছিল। এজন্য লিপিকার একটির স্থানে আরেকটি লিখেছেন।

তৃতীয়ত, লিপিকার হয়ত ভেবেছেন যে, বিভক্তি-চিহ্ন বা স্বরচিহ্ন জ্ঞাপক আংশিক বর্ণ ব্যবহারে ভুল হয়েছে, অথবা তিনি মূল বক্তব্য বুঝতে পারেন নি, ফলে তিনি সংশোধন করার উদ্দেশ্যে ভুলের মধ্যে নিপতিত হয়েছেন।

চতুর্থত, লেখক লিখতে যেয়ে ভুলে একস্থান থেকে অন্য স্থানে চলে গিয়েছেন। যখন বিষয়টি লক্ষ্য করেছেন তখন আর লিখিত কথাগুলি মুছতে রাজি হন নি বরং যা লেখা হয়ে গিয়েছিল তা ঠিক সেভাবেই রেখে দিয়ে যে স্থান থেকে বাদ পড়ে গিয়েছিল সেই স্থান থেকে লিখতে শুরু করেছেন।

পঞ্চমত, লেখক লিখতে লিখতে কিছু কথা বাদ দিয়ে ফেলেন। এরপর অন্য কিছু লেখার পরে পূর্ববর্তী স্থানে বাদ দেওয়ার বিষয়টি তাঁর কাছে ধরা পড়ে। তখন তিনি পরবর্তী যে কথাগুলি লেখা হয়েছে তার পরে বাদ পড়া কথাগুলি লিখেন। এতে এক স্থানের কথা অন্য স্থানে চলে যায়।

ষষ্ঠত, লেখকের দৃষ্টি এক লাইন থেকে অন্য লাইনে সরে যায়, ফলে কিছু কথা বাদ পড়ে যায়।

সপ্তমত, লেখক সংক্ষেপিত শব্দগুলির অর্থ বুঝতে ভুল করেন, ফলে তিনি তাঁর নিজের বুঝ অনুসারে তা পুরোপুরি লিখেন। এভাবে ভুলের মধ্যে নিপতিত হন।

অষ্টমত, লেখক বা লিপিকারের অজ্ঞতা ও অবহেলা ছিল পাঠের বিভিন্নতা (Various readings) সৃষ্টির অন্যতম বড় কারণ। তাঁরা টীকার বক্তব্য বা ব্যাখ্যাকে মূল পুস্তকের অংশ মনে করে তার মধ্যে ঢুকিয়ে দিতেন।

দ্বিতীয় কারণ: ‘‘মূল কপির অসম্পূর্ণতা’’

যে কপি থেকে লিপিকার অনুলিপি করেছেন সেই কপির অসম্পূর্ণতার ফলে বিভিন্নভাবে পাঠের বিভিন্নতাঘটতে পারে বলে বুঝা যায়:

প্রথমত, অক্ষরের বিভক্তি-চিহ্ন বা স্বরচিহ্ন মুছে যাওয়া।

দ্বিতীয়ত, এক পৃষ্ঠার বিভক্তি-চিহ্ন বা স্বরচিহ্ন পৃষ্ঠার উল্টো পিঠে ফুটে উঠেছে এবং উল্টো পৃষ্ঠার অক্ষরের সাথে মিশ্রিত হয়ে গিয়েছে। ফলে এই চিহ্নগুলিকে এ পৃষ্ঠার অংশ মনে করা হয়েছে। লিপিকার একে এ পৃষ্ঠার চিহ্ন মনে করে তার বুঝ মত তা লিখেছেন।

তৃতীয়ত, পরিত্যক্ত অনুচ্ছেদটি কোনোরূপ চিহ্ন ছাড়াই টীকায় লেখা ছিল। লেখক বুঝতে পারেন নি যে, অনুচ্ছেদটি কোথায় লিখতে হবে। এতে তিনি ভুল করেছেন।

তৃতীয় কারণ: ‘‘কাল্পনিক সংশোধন ও পরিমার্জন’’

বিভিন্নভাবে এরূপ আন্দাজ-অনুমান ভিত্তিক সংশোধন ঘটেছে:

প্রথমত, একটি বিশুদ্ধ ও সঠিক বক্তব্যকে লিপিকার অসম্পূর্ণ বলে মনে করেছেন অথবা তার অর্থ হৃদয়ঙ্গমে ভুল করেছেন। অথবা তিনি মনে করেছেন যে, বাক্যটি ভুল, অথচ বাক্যটি মূলত ভুল নয়। এজন্য এই লিপিকারের সংশোধনই মূলত ভুলের সৃষ্টি করে।

দ্বিতীয়ত, কোনো কোনো গবেষক পাণ্ডুলিপি সংশোধনের ক্ষেত্রে প্রচলিত নিয়ম নীতির তোয়াক্কা করেন নি। তারা ভুল সংশোধনকেই যথেষ্ঠ মনে করেন নি। বরং তাঁরা মূল পাণ্ডুলিপির দুর্বল বাক্য মুছে ফেলে দিয়ে সেখানে সবল ও বিশুদ্ধ বাক্য লিখেছেন। অতিরিক্ত কথাগুলি ফেলে দিয়েছেন। একাধিক সমার্থক শব্দের মধ্যে কোনো পার্থক্য বুঝতে না পারলে অতিরিক্ত শব্দগুলি ফেলে দিয়েছেন।

তৃতীয়ত, পরস্পর সম্পর্কিত বক্তব্যসমূহের মধ্যে সমন্বয় সাধন। এক স্থানের বক্তব্যের সাথে অন্য স্থানের বক্তব্যের যেন অমিল না থাকে এজন্য তাঁরা বক্তব্যের কাটছাট করে উভয়ের মধ্যে অর্থগত সমন্বয় সাধন করতেন। পাঠের বিভিন্নতা ঘটার এটিই সবচেয়ে বড় কারণ। নতুন নিয়মের পুস্তকাবলিতে এইরূপ কার্য বেশি সাধিত হয়েছে। এজন্য পৌলের পত্রাবলির মধ্যে পরবর্তী সংযোজন বেশি ঘটেছে। গ্রীক অনুবাদের সাথে পৌলের বক্তব্যের অর্থগত সমন্বয় সৃষ্টির জন্য তাঁরা এইরূপ করেছেন।

চতুর্থত, কোনো কোনো গবেষক পণ্ডিত নতুন নিয়মকে ল্যাটিন অনুবাদের সাথে মিলিয়ে দিয়েছেন।

চতুর্থ কারণ: ‘‘ইচ্ছাকৃত বিকৃতি’’

পণ্ডিত হর্ন বলেন, নিজের ব্যক্তিগত উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার জন্য কেউ কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে বাইবেলের বিকৃতি করেছেন, ফলে পাঠের বিভিন্নতা দেখা দিয়েছে। এ সকল ইচ্ছাকৃত বিকৃতিকারীদের অনেকেই ছিলেন বিভ্রান্ত (heretic) সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত এবং কেউ ছিলেন মূলধারার ধর্মপ্রাণ গোঁড়া খৃস্টান। তাদের বিরুদ্ধে উত্থাপিত আপত্তিগুলি নিরসন করতে মূলধারার অনেক গোঁড়া ধর্মপ্রাণ ও সৎ খৃস্টান বাইবেলের মধ্যে কিছু স্থানে ইচ্ছাকৃত বিকৃতি সাধন করেছেন। পরবর্তীকালে অনেকেই এ সকল ধার্মিক খৃস্টানদের ইচ্ছাকৃত বিকৃতিগুলিকে সমর্থন করতেন ও অগ্রাধিকার প্রদান করতেন। কারণ এগুলি দিয়ে কোনো সঠিক বিষয়কে সমর্থন করা হতো অথবা সে বিষয়ক কোনো আপত্তিকে খণ্ডন করা হতো। পণ্ডিত হর্ন ধার্মিক গোঁড়া খৃস্টানদের বিকৃতির অনেক উদাহরণ উল্লেখ করেছেন।

হর্নের সংক্ষেপিত বক্তব্য এখানেই শেষ।

তাঁর কথা থেকে প্রমাণিত হলো যে, লিপিকারদের অজ্ঞতা ও অবহেলার কারণে টীকার বক্তব্য মূল পাঠে প্রবেশ করেছে, প্রমাণিত হলো যে, সংশোধনকারিগণ তাঁদের ধারণামত যে সকল কথা ভুল মনে করেছেন সেগুলি সংশোধন করেছেন, সেগুলি প্রকৃতপক্ষে ভুল হোক বা নাই হোক, প্রমাণিত হলো যে, তাঁরা দুর্বল বাক্যগুলি বাদ দিয়ে তদস্থলে বিশুদ্ধ বাক্য লিখেছেন এবং সমার্থক ও অতিরিক্ত কথা ফেলে দিয়েছেন, প্রমাণিত হলো যে, বিশেষত নতুন নিয়মের মধ্যে তাঁরা বিভিন্ন স্থানের বক্তব্যের মধ্যে সমন্বয় সাধনের জন্য পরিবর্তন করেছেন, আর এজন্যই পৌলের পত্রাবলিতে সংযোজন বৃদ্ধি পেয়েছে, প্রমাণিত হলো যে, কোনো কোনো গবেষক পণ্ডিত নতুন নিয়মকে ল্যাটিন অনুবাদের সাথে মেলানোর জন্য পরিবর্তন করেছেন, প্রমাণিত হলো যে, বিভ্রান্ত সম্প্রদায়গণ ইচ্ছাকৃতভাবে বিকৃতি সাধন করেছেন, প্রমাণিত হলো যে, ধার্মিক ও সৎ খৃস্টানগণ বিভিন্ন মত সমর্থন বা আপত্তি খণ্ডনের জন্য ইচ্ছাকৃতভাবে বিকৃতি সাধন করতেন এবং পরবর্তী যুগে তাঁদের এ সকল বিকৃতিকে সমর্থন করা হতো…. এ সব কিছু প্রমাণিত হওয়ার পরে বিকৃতির আর কোনো সুক্ষ্ম পদ্ধতি ও প্রক্রিয়া কি বাকি থাকল?

এখন একথা দাবি করা কি অন্যায় ও অযৌক্তিক হবে যে, ক্রুশের পূজারী খৃস্টানগণ যারা ক্রুশের উপাসনা এবং এর মাধ্যমে অর্জিত মর্যাদা ও ক্ষমতা পরিত্যাগ করতে মোটেও রাজি ছিলেন না, তাঁরা ইসলামের আবির্ভাবের পরে ইসলামী ধর্মবিশ্বাসের স্বপক্ষে যেতে পারে এরূপ আরো কিছু কথা বিকৃত করেছেন? এরপর তাঁদের পরবর্তী যুগে তাঁদের এ সকল বিকৃতি সমর্থন করা হয়েছে এবং অগ্রাধিকার প্রদান করা হয়েছে, যেমনভাবে বিভিন্ন খৃস্টান সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে তাঁদের বিকৃতিকে সমর্থন করা হয়েছে বরং বিভিন্ন খৃস্টান সম্প্রদায়ের প্রতিরোধের জন্য বিকৃতির চেয়ে ইসলামের প্রতিরোধের জন্য  বিকৃতির গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা ছিল অনেক বেশি। কাজেই এই বিকৃতির সমর্থনও অনেক বেশি হওয়াই ছিল স্বাভাবিক।

১. ৩. ৪. ৪. যীশু খৃস্টের সাক্ষ্য

বিকৃতি অপ্রমাণিত করতে ও বাইবেলের বিশুদ্ধতা প্রমাণ করতে পাদরিগণের দ্বিতীয় বিভ্রান্তিকর প্রচারণা এই যে, স্বয়ং যীশু খৃস্ট পুরাতন নিয়মের সত্যতার সাক্ষ্য দিয়েছেন।[66] সেগুলি যদি বিকৃত হতো তবে নিশ্চয় তিনি তা বলতেন বরং সেক্ষেত্রে তাঁর দায়িত্ব ছিল ইয়াহূদীদের সামনে বিকৃতি প্রমাণ করে তাদেরকে তা স্বীকারে বাধ্য করা।

নিম্নের বিষয়গুলি এই বিভ্রান্তির অপনোদন করবে:

১. ৩. ৪. ৫. যীশুর বক্তব্য বনাম বাইবেলের প্রামাণ্যতা

(ক) যীশুর সাক্ষ্য মোটেও প্রমাণিত নয়

প্রথম পর্যায়ে আমরা বলব যে, বাইবেলের পুরাতন নিয়ম ও নতুন নিয়মের কোনো পুস্তকের লেখকের যুগ থেকে সুপ্রসিদ্ধ ও সুপ্রচলিত হওয়ার কথা প্রমাণিত নয়। এগুলির মধ্যে এমন কোনো পুস্তক নেই যে পুস্তকটি লেখকের যুগ থেকে বহুল প্রচার লাভ করেছে, যাতে আমরা নিশ্চিত হতে পারি যে, সত্যিই উক্ত লেখকই এই প্রচলিত বইটি পুরোপুরি লিখেছেন। অনুরূপভাবে কোনো একটি বইয়েরও লেখক পর্যন্ত অবিচ্ছিন্ন সূত্র পরম্পরা সংরক্ষিত নেই। নতুন ও পুরাতন নিয়মের সকল পুস্তকে সকল প্রকারের বিকৃতি ঘটেছে বলে একটু আগে আমরা জেনেছি। আমরা আরো জেনেছি যে, ধার্মিক, গোঁড়া ও সৎ খৃস্টানগণ বিভিন্ন ধর্মীয় বিষয়কে  প্রমাণিত করার জন্য বা সে বিষয়ক আপত্তি দূরীকরণের জন্য বিকৃতির আশ্রয় নিয়েছেন এ সকল কারণে বাইবেলের পুস্তকগুলির গ্রহণযোগ্যতা ও বিশুদ্ধতার বিষয়ে আমাদের সন্দেহ রয়েছে। এ সকল পুস্তকের কোনো কথা আমাদের নিকট কোনো সুদৃঢ় প্রমাণ নয়। এগুলিকে প্রমাণ হিসেবে গ্রহণ করতে আমরা দ্বিধান্বিত। কারণ, এমনও তো হতে পারে যে, যীশু খৃস্ট পুরাতন নিয়মের পুস্তকাবলির বিশুদ্ধতার সাক্ষ্য দিয়েছেন মর্মে যে শ্লোকটিকে প্রমাণ হিসেবে পেশ করা হচ্ছে, সেই শ্লোকটি পরবর্তীকালে সংযোজন করা হয়েছে। ধার্মিক ও সৎ খৃস্টানগণ দ্বিতীয় শতকের শেষে বা তৃতীয় শতকে এবোনাইট (Ebionites) সম্প্রদায় বা মারসিওনীয় (Marcion) সম্প্রদায় বা মানিকীয (Manichees/ Manichaen/ Manichean) সম্প্রদায়ের বিরোধিতার মানসে শ্লোকটিকে বাইবেলের মধ্যে সংযোজন করেছিলেন। খৃস্টধর্মের একটি গ্রহণযোগ্য ও সঠিক বিষয়কে সমর্থন করার উদ্দেশ্যে তাঁদের এ বিকৃতি পরবর্তী যুগে সমর্থন করা হয়েছে ও মেনে নেওয়া হয়েছে। এবোনাইট, মারসিওনীয় ও মানিকীয সম্প্রদায় পুরাতন নিয়মের সকল পুস্তক বা অধিকাংশ পুস্তক অস্বীকার করত। এজন্য হয়ত তাদেরকে ঘায়েল করতে এ সকল শ্লোক বা বক্তব্য যীশুর নামে জালিয়াতি করে লেখা হয়েছে। যেরূপভাবে তাঁরা আরিয়ান সম্প্রদায় (Arians)[67] ও ইউটিকিয়ান (Eutychian) সম্প্রদায়ের[68] বিরোধিতার জন্য বাইবেলের মধ্যে বিকৃতি সাধন করেন এবং তাঁদের বিকৃতি পরবর্তীকালে সমর্থন করা হয়।

(খ) যীশুর সাক্ষ্য প্রচলিত পুস্তকগুলির জন্য প্রমাণিত নয়

দ্বিতীয় পর্যায়ে আমরা বলব যে, যীশু পুরাতন নিয়মের বিশুদ্ধতার সাক্ষ্য দিয়েছেন মর্মে যে সকল কথা উল্লেখ করা হয়, সেগুলি পরবর্তীকালে সংযোজিত হোক বা প্রকৃত পক্ষে যীশুর কথাই হোক, কোনো অবস্থাতেই তাঁর এই বক্তব্য দ্বারা পুরাতন নিয়মের প্রচলিত সকল পুস্তকের বিশুদ্ধতা প্রমাণিত হয় না। কারণ এসকল কথার মধ্যে পুরাতন নিয়মের পুস্তকগুলির নাম বা সংখ্যা উল্লেখ করা নেই। তাহলে আমরা কিভাবে বুঝতে পারব যে, যীশু যে পুরাতন নিয়মের বিশুদ্ধতার সাক্ষ্য দিয়েছেন সে পুরাতন নিয়মের মধ্যে ৩৯টি পুস্তক ছিল? (প্রটেস্টান্ট সম্প্রদায়ের মানুষেরা এ পুস্তকগুলি মানেন), না সেই পুরাতন নিয়মের মধ্যে ৪৬টি পুস্তক ছিল? (ক্যাথলিকগণ এ পুস্তকগুলিকে মানেন।)

ঐতিহাসিক জোসেফাস (Flavius Josephus) অত্যন্ত গোঁড়া ইয়াহূদী ছিলেন এবং খৃস্টানগণও তাঁকে নির্ভরযোগ্য বলে মান্য করেন। তিনি তাঁর ইতিহাসে শুধু নিম্নের কথাটুকু স্বীকার করেছেন: ‘‘আমাদের নিকট পরস্পর বিরোধী হাজার হাজার পুস্তক নেই বরং আমাদের নিকট মাত্র ২২টি পুস্তক রয়েছে। এগুলির মধ্যে পাঁচটি পুস্তক মোশির।’’

জোসেফাস তোরাহ ছাড়া পুরাতন নিয়মের মধ্যে আরও ১৭টি পুস্তক আছে বলে উল্লেখ করেছেন। অথচ বর্তমানে প্রচলিত বাইবেলেরমধ্যে প্রটেস্টান্টদের মতে তোরাহ ছাড়াও ৩৪টি পুস্তক ও ক্যাথলিকদের মতে ৪১টি পুস্তক রয়েছে। লক্ষ্যণীয় যে, জোসেফাস পুস্তকগুলির সংখ্যা বলেছেন, কিন্তু নাম উল্লেখ করেন নি।[69] কাজেই প্রচলিত ৩৪ বা ৪১টি পুস্তকের মধ্যে কোন্ কোন্ পুস্তক ১৭টি পুস্তকের পরে অতিরিক্ত সংযুক্ত তাও জানার উপায় নেই। একথা বলার কোনো উপায় নেই যে, অমুক ১৭টি পুস্তক জোসেফাস উল্লিখিত বিশুদ্ধ পুস্তক।

ইতোপূর্বে পাঠক দেখেছেন যে, পণ্ডিত ক্রীযস্টম (John  Chrysostom: 347-407) ও অন্যান্য ক্যাথলিক পণ্ডিত স্বীকার করেছেন যে, ইয়াহূদীগণ তাঁদের অবহেলার কারণে- বরং তাঁদের ধর্মহীনতা ও অসততার কারণে- অনেক ঐশ্বরিক পুস্তক বা ধর্মগ্রন্থ হারিয়ে ফেলেছে। কিছু পুস্তক তাঁরা ছিড়ে ফেলেছে এবং কিছু পুস্তক তারা পুড়িয়ে ফেলেছে। হয়ত জোসেফাস উল্লিখিত এই ১৭টি পুস্তকের মধ্য থেকে কিছু পুস্তকও এই হারানো, ছেড়া ও পুড়িয়ে ফেলা পুস্তকের মধ্যে চলে গিয়েছে। খৃস্টান পণ্ডিতগণ স্বীকার করেছেন যে, বাইবেলের বিভিন্ন পুস্তকের মধ্যে ২০টিরও অধিক ধর্মগ্রন্থের নাম উল্লেখ করা হয়েছে যেগুলির কোনো অস্তিত্ব এখন নেই। প্রসিদ্ধ ক্যাথলিক পণ্ডিত টমাস এঙ্গেলস বলেন: ‘‘পণ্ডিতগণ একমত যে, বাইবেলের মধ্য থেকে বিনষ্টকৃত বা হারিয়ে যাওয়া পবিত্র পুস্তকাদির সংখ্যা ২০ এর কম নয়।’’

জোসেফাসের বক্তব্য থেকে জানা যায় যে, মোশির পুস্তকের সংখ্যা পাঁচটি। কিন্তু তিনি এ পাঁচটি পুস্তকের নাম উল্লেখ করেন নি। আমরা জানি না যে, এ পাঁচটি পুস্তক বলতে বর্তমানে প্রচলিত ৫টি পুস্তক বুঝিয়েছেন, না অন্য কোনো পুস্তক বুঝিয়েছেন। বাহ্যত বুঝা যায় যে, তিনি এই পাঁচটি পুস্তকের কথা বলেন নি। কারণ তিনি বর্তমানে মোশির নামে প্রচলিত তোরাহ-এর পাঁচটি পুস্তকে প্রদত্ত তথ্যের বিপরীত অনেক কথা বলেছেন। ইতোপূর্বে বৈপরীত্য ও ভুলভ্রান্তির আলোচনায় পাঠক তা দেখেছেন।

(গ) যীশু অস্তিত্বের সাক্ষ্য দিয়েছেন, বিশুদ্ধতার নয়

তৃতীয় পর্যায়ে আমরা বলব যে, আমরা যদি অনুমানের উপর ধরে নিই যে, বর্তমানে প্রচলিত পুস্তকগুলিই যীশুখৃস্টের যুগে প্রচলিত ছিল এবং তিনি ও তাঁর প্রেরিতগণ এ পুস্তকগুলিই মেনে নিয়েছেন এবং এগুলির পক্ষে সাক্ষ্য প্রদান করেছেন, তবুও তাঁদের সাক্ষ্য দ্বারা প্রচলিত পুস্তকগুলির বিশুদ্ধতা প্রমাণিত হয় না, শুধু অস্তিত্ব প্রমাণিত হয়।

এক্ষেত্রে খৃস্ট ও তাঁর প্রেরিতগণের সাক্ষ্য দ্বারা শুধু প্রমাণিত হয় যে, এ পু্স্তকগুলি তাঁদের যুগে ইয়াহূদীদের মধ্যে প্রচলিত ছিল বলে তাঁরা স্বীকার করেছেন। এই পুস্তকগুলি যাদের নামে প্রচলিত সত্যই সেগুলি তাঁদের রচনা কি না, এগুলির মধ্যে উল্লিখিত সকল বিষয়ই সত্য, না সকল বিষয়ই মিথ্যা, না কিছু সত্য ও কিছু মিথ্যা সেগুলি কিছুই তাঁরা নিশ্চিত করেন নি।

খৃস্ট ও প্রেরিতগণ কর্তৃক এ সকল পুস্তকের অস্তিত্ব স্বীকার করার অর্থ এই নয় যে, তাঁরা সাক্ষ্য দিয়েছেন, এগুলি সত্যই কথিত ভাববাদিগণের রচিত অথবা এগুলির মধ্যে উল্লিখিত সকল বিবরণ সন্দেহাতীভাবে সত্য। উপরন্তু, খৃস্ট বা প্রেরিতগণ যদি এ সকল পুস্তক থেকে কিছু উদ্ধৃত করেন, তবে তাঁদের উদ্ধৃতি দ্বারা একথা প্রমাণিত হয় না যে, যে পুস্তক থেকে তিনি উদ্ধৃতি প্রদান করছেন সে পুস্তকটি বিশুদ্ধ বা তার সকল কথা বিশুদ্ধ বলে বিনা গবেষণায় মেনে নিতে হবে।

হ্যাঁ, যদি ঈসা আলাইহিস সালাম সুস্পষ্টভাবে বলেন যে, অমুক পুস্তকের সকল বিষয়, সকল বিধান বা সকল বক্তব্য আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রাপ্ত এবং তাঁর এ বক্তব্য সরাসরি তাঁর মুখ থেকে শুনে অগণিত মানুষ বর্ণনা করেন এবং সন্দেহাতীত অগণিত মানুষের বর্ণনার মাধ্যমে তা প্রমাণিত হয় তাহলেই নিশ্চিতরূপে আসমানী গ্রন্থ বলে প্রমাণিত হবে। অবশিষ্ট সকল বক্তব্য বা সকল পুস্তকই সন্দেহযুক্ত থাকবে। এগুলির বিশুদ্ধতা নির্ণয়ের জন্য গবেষণা ও অনুসন্ধান করতে হবে। পুরাতন নিয়মের কোনো পুস্তকের বিষয়ে ঈসা আলাইহিস সালাম থেকে এরূপ কোনো সাক্ষ্য প্রমাণিত হয় নি।

প্রটেস্টান্ট গবেষক পণ্ডিত বেলি তাঁর পুস্তকে উল্লেখ বলেন, যীশু বলেছেন যে, তোরাহ ঈশ্বরের পক্ষ থেকে প্রদত্ত। কিন্তু তার কথার অর্থ এ নয় যে, পুরাতন নিয়মের সব কিছু বা প্রতিটি শ্লোক বিশুদ্ধ, অথবা এর সকল পুস্তকই সঠিক অথবা প্রতিটি পুস্তকের লেখকের বিষয়ে গবেষণা ও অনুসন্ধান প্রয়োজনীয়। প্রেরিতগণ ও যীশুর সমসাময়িক ইয়াহূদীগণ এ সকল পুস্তকের উপর নির্ভর করতেন, এগুলি পাঠ করতেন এবং এগুলি সে যুগে প্রসিদ্ধ ও ধর্মগ্রন্থ হিসেবে স্বীকৃত ছিল। এগুলি থেকে কিছু কথা নতুন নিয়মে উদ্ধৃত করার অর্থ এ নয় যে, কথাটিকে গবেষণা ছাড়াই সত্য বা সঠিক বলে গ্রহণ করতে হবে।

(ঘ) খৃস্টের পরেও বিকৃতি ঘটেছে

চতুর্থ পর্যায়ে আমরা যদি তর্কের খাতিরে মেনে নিই যে, খৃস্ট ও তাঁর প্রেরিতগণ পুরাতন নিয়মের সকল পুস্তকের সকল অংশের সকল কথার বিশুদ্ধতার সাক্ষ্য দিয়েছেন, তবে এতে বাইবেলের বিকৃতি প্রমাণের ক্ষেত্রে আমাদের কোনো অসুবিধা হয় না। কারণ প্রায় সকল খৃস্টান পণ্ডিত স্বীকার ও দাবি করেছেন যে, খৃস্টের পরের যুগে ১৩০ খৃস্টাব্দে খৃস্টানদের সাথে বিরোধিতা ও শত্রুতার জের হিসেবে ইয়াহূদীগণ পুরাতন নিয়মের পুস্তকগুলিকে বিকৃত করে। কাজেই যীশু যদি সাক্ষ্য দিয়েও থাকেন তাতে তার পরের যুগে পুরাতন নিয়মগুলির বিকৃত হওয়ার সম্ভাবনা রহিত হয় না।

১. ৩. ৪. ৬. বাইবেলের বিকৃতি কি অসম্ভব ছিল?

বাইবেলের বিকৃতি অসম্ভব প্রমাণ করতে খৃস্টান প্রচারকগণ দাবি করেন যে, বাইবেলের অগণিত কপি পূর্ব থেকে পশ্চিম পর্যন্ত সর্বত্র ছড়িয়ে ছিল। কাজেই কারো জন্যই এতে কোনো বিৃকতি সাধন সম্ভব ছিল না।

এ দাবিটি যে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন প্রপাগান্ডা তা পূর্ববর্তী আলোচনা থেকেই সুস্পষ্ট। ইয়াহূদী-খৃস্টান ধর্মগুরু ও পণ্ডিতগণ সকলেই স্বীকার করছেন যে, বিকৃতি সংঘটিত হয়েছে। কাজেই বিকৃতি ঘটানো সম্ভব ছিল না বলে দাবি করা অর্থহীন প্রলাপ মাত্র। তদুপরি এখানে আমরা বাইবেলে বিকৃতির ঐতিহাসিক পটভূমি পর্যালোচনা করব, যেন, পাঠক বুঝতে পারেন যে, বাইবেলের বিকৃতি কিভাবে এত সহজ হয়েছিল।

১. ৩. ৪. ৭. বাইবেলের ইতিহাস ও বিকৃতির প্রেক্ষাপট

(ক) মূসা আলাইহিস সালাম থেকে নেবুকাদনেজার পর্যন্ত পুরাতন নিয়ম

মূসা আলাইহিস সালাম-এর সময়কাল সম্পর্কে বাইবেল ব্যাখ্যাকার ও ঐতিহাসিকদের মধ্যে কিছু মতভেদ রয়েছে। মোটামুটি বলা চলে যে, খৃস্টপূর্ব ১৩৫০ সালের দিকে মূসা আলাইহিস সালাম জন্মগ্রহণ করেন এবং খৃ. পূর্ব ১২৩০/৩১ সালের দিকে ইন্তেকাল করেন। তাঁর ইন্তেকাল থেকে খৃস্টপূর্ব ৫৮৭/৫৮৬ সালে নেবুকাদনেজারের হাতে ইয়াহূদী রাষ্ট্রের ধ্বংস পর্যন্ত প্রায় সড়ে ছয় শত বৎসরে ইয়াহূদী জাতির ইতিহাস পর্যালোচনা করলেই আমরা বাইবেলের বিকৃতির পেক্ষাপট অনুধাবন করতে পারব।

মূসা আলাইহিস সালাম তোরাহ লিখে সেই পাণ্ডুলিপিটি ইস্রায়েল সন্তানগণের যাজক ও গোত্রপতিগণের নিকট সমর্পণ করেছিলেন। তিনি তাঁদেরকে নির্দেশ প্রদান করেন যে, তাঁরা যেন সেই পাণ্ডুলিপিটিকে সংরক্ষণ করেন এবং সদাপ্রভুর নিয়ম-সিন্দুকেরমধ্যে তা রেখে দেন। তিনি তাঁদেরকে প্রতি সাত বৎসর পর পর সকল ইস্রায়েলের সামনে তা পাঠ করার নির্দেশ দিয়ে বলেন: ‘‘সাত সাত বৎসরের পরে, মোচন বৎসরের কালে, কুটীরোৎসব পর্বে, যখন সমস্ত ইস্রায়েল তোমার ঈশ্বর সদাপ্রভুর মনোনীত স্থানে তাঁহার সম্মুখে উপস্থিত হইবে, তৎকালে তুমি সমস্ত ইস্রায়েলের সাক্ষাতে তাহাদের কর্ণগোচরে এই ব্যবস্থা পাঠ করিবে।’’[70]

ইস্রায়েল সন্তানগণের প্রথম প্রজন্ম মোশির এই নির্দেশ মেনে চলেন। এই প্রজন্মের গত হওয়ার পরে ইস্রায়েল সন্তানদের অবস্থা পরিবর্তিত হয়ে যায়। তাঁদের মধ্যে পাপাচারিতা, অবাধ্যতা ও ধর্মদ্রোহিতা ব্যাপকহারে ছড়িয়ে পড়ে। কখনো তাঁরা ধর্মত্যাগ করতেন। আবার কখনো পুনরায় ধর্ম মানতে শুরু করতেন। দায়ূদ-এর রাজত্বের শুরু পর্যন্ত (প্রায় তিনশত বৎসর যাবৎ) তাঁদের অবস্থা এইরূপ ছিল।

দায়ূদের রাজত্বকালে ইস্রায়েল সন্তানগণের ধর্মীয় ও নৈতিক অবস্থার উন্নতি ঘটে। দায়ূদের রাজত্বকালে ও শলোমনের রাজত্বের প্রথমাংশে ইস্রায়েল সন্তানগণ ধর্মদ্রোহ পরিত্যাগ করে ধর্মীয় অনুশাসনাদি পালন করে চলেন। কিন্তু বিগত শতাব্দীগুলির ধর্মদ্রোহিতা, অস্থিরতা ও অরাজকতার মধ্যে মোশির প্রদত্ত সদাপ্রভুর নিয়ম-সিন্দুকে রক্ষিততোরাহটি হারিয়ে যায়। কখন তা হারিয়ে যায় তা সঠিকভাবে জানা যায় না। এতটুকুই জানা যায় যে, শলোমানের রাজত্বের পূর্বেই তা হারিয়ে যায়। কারণ শলোমনের রাজত্বকালে যখন তিনি সদাপ্রভুর নিয়ম-সিন্দুক’-টি উন্মোচন করেন তখন তার মধ্যে তোরাহের কোনো অস্তিত্ব পান নি। সিন্দুকটির মধ্যে শুধু দুইটি তোরাহ-বহির্ভূতপ্রাচীন প্রস্তরফলকই অবশিষ্ট ছিল। ১ রাজাবলির ৮ম অধ্যায়ের ৯ম শ্লোকে এ বিষয়ে বলা হয়েছে: ‘‘সিন্দুকের মধ্যে আর কিছু ছিল না, কেবল সেই দুইখানা প্রস্তরফলক ছিল, যাহা মোশি হোরেবে তাহার মধ্যে রাখিয়াছিলেন; সেই সময়ে, মিসর হইতে ইস্রায়েল-সন্তানগণের বাহির হইয়া আসিবার পর, সদাপ্রভু ইস্রায়েল-সন্তানগণের সহিত নিয়ম করিয়াছিলেন।’’

বাইবেলের বিবরণ অনুসারে শলোমনের রাজত্বের শেষভাগ থেকে ইস্রায়েলীয়গণের মধ্যে জঘন্য বিপর্যয় নেমে আসে। স্বয়ং শলোমন তাঁর শেষ জীবনে ধর্মত্যাগ করেন (নাঊযু বিল্লাহ!)। তিনি তাঁর স্ত্রীগণের পরামর্শে মুর্তিপূজা শুরু করেন মুর্তিপূজার নিমিত্ত মন্দিরাদি নির্মাণ করেন। এভাবে তিনি যখন ধর্মত্যাগী (মুর্তাদ) ও পৌত্তলিকে পরিণত হলেন (নাঊযু বিল্লাহ!!) তখন তোরাহ-এর প্রতি তাঁর আর কোনো আগ্রহ থাকে না।

তাঁর মৃত্যুর পরে আরো কঠিনতর বিপর্যয় শুরু হয়। খৃস্টপূর্ব ৯৩১ সালের দিকে ইস্রায়েল-সন্তানগণ অভ্যন্তরীন কোন্দল ও দলাদলির ফলে দু ভাগে বিভক্ত হয়ে যান। ইয়াহূদীগণের একটি রাজ্য দুইটি রাজ্যে বিভক্ত হয়ে যায়। ইস্রায়েল-সন্তানগণের ১২ গোত্রের মধ্যে ১০টি গোত্র এক পক্ষে এবং বাকি দুইটি বংশ এক পক্ষে থাকেন। নবাটের পুত্র যারবিয়ামের (Jeroboam I) নেতৃত্বে বিদ্রোহী ১০টি গোত্র প্যালেস্টাইনের উত্তর অংশে পৃথক রাজ্য ঘোষণা করেন। তাঁদের রাজ্যের নাম হয় ইস্রায়েল’ (the kingdom of Israel)। ইস্রায়েল রাজ্যকে অনেক সময়  শামেরা (Samaria) বা ইফ্রমিয় (Ephraimites) বলা হতো। এর রাজধানী ছিল নাবলুস। অবশিষ্ট দুইটি গোত্র: যিহূদা ও বিন্যামিন বংশের রাজা হন শলোমনের পুত্র রহবিয়াম (Rehoboam)। এই রাজ্যের নাম হয় জুডিয়া বা জুডাই রাজ্য (the Kingdom of Judea, also Judaea or Judah)। এর রাজধানী ছিল যিরূশালেম।

উভয় রাজ্যেই ধর্মদ্রোহিতা, মুর্তিপুজা ও অনাচার ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। উত্তরের ইস্রায়েল বা শমরীয় রাজ্যের রাজা যারবিয়াম রাজ্যভার গ্রহণ করার পরপরই মোশির ধর্ম ত্যাগ করেন। তাঁর সাথে ইস্রায়েলীয়দের ১০টি গোত্রের মানুষেরা মোশির ধর্ম ত্যাগ করেন। তাঁরা মুর্তিপুজা শুরু করেন। এদের মধ্যে যাঁরা তোরাহ-এর অনুসারী ছিলেন তাঁরা নিজেদের রাজ্য পরিত্যাগ করে যুডাহ (যিহূদা) রাজ্যে হিজরত করেন।

এভাবে এ রাজ্য বা ইস্রায়েল সন্তানদের মূল অংশ এ সময় থেকে মূসার আলাইহিস সালাম ধর্ম ত্যাগ করে মুরতাদ হয়ে যান এবং কুফর, মুর্তিপুজা ও অনাচারের মধ্যে অতিবাহিত করেন। পরবর্তী প্রায় ২০০ বৎসর এ রাজত্বের অস্তিত্ব ছিল। সন-তারিখের বিষয়ে বেশ মতভেদ রয়েছে। আধুনিক গবেষকগণের মতে ইস্রায়েল রাজ্যের অস্তিত্ব ছিল খৃ. পু. ৯২২ সাল থেকে ৭২২/৭২১ সাল পর্যন্ত কমবেশি ২০০ বৎসর। এ সময়ে ১৯ জন রাজা এই রাজ্যে রাজত্ব করেন। এরপর আল্লাহ তাঁদেরকে ধ্বংস করেন। অশুরীয়দের (the Neo-Assyrian Empire) আক্রমণে তারা পরাজিত হয়। খৃস্টপূর্ব ৭২৪ সালে অ্যসিরিয়ান (অশূরীয়) সম্রাট চতুর্থ শালমানেসার বা শল্মনেষর (Shalmaneser iv) ইস্রায়েল রাজ্য আক্রমন করেন। তার মৃত্যুর পর তার সেনাপতি দ্বিতীয় সার্গন (Sargon II: ruled 722-705 bc) উপাধি ধারণ করে রাজ্যভার গ্রহণ করেন। তার নেতৃত্বে আসিরিয়্যানগণ ইস্রায়েলীয়দেরকে শোচনীয়ভাবে পরাজিত করতে সক্ষম হয়। বিজয়ী অশুরীয়গণ পরাজিত ইস্রায়েলীয়গণকে বন্দি করে অশুরীয় রাজ্যের বিভিন্ন স্থানে নির্বাসিত করে। এ এলাকায় অল্পসংখ্যক ইস্রায়েলীয় অবশিষ্ট থাকে।

আশুরীয়গণ ইস্রায়েলীয়দেরকে এ সকল অঞ্চল থেকে নির্বাসিত করার পরে সেখানে অশুরীয় রাজ্যের বিভিন্ন স্থান থেকে পৌত্তলিকগণকে এনে বসতি স্থাপন করায়। সেখানে অবশিষ্ট অল্প সংখ্যক ইস্রায়েলীয় এ সকল পৌত্তলিকদের সাথে সামাজিক ও ধর্মীয়ভাবে ওতপ্রোতভাবে মিশে যায়। তাঁরা পৌত্তলিকগণের পুত্র কন্যাদেরকে বিবাহ করেন এবং তাদের সাথে একত্র পরিবার গঠন করেন। এ সকল ইস্রায়েলীয়ইয়াহূদীদেরকে শমরীয়’ (Samaritans) বলা হয়।[71]

এভাবে আমরা দেখছি যে, বাইবেলের বর্ণনা অনুসারেই ইয়াহূদীদের বৃহৎ অংশ বা ১২ বংশের দশ বংশ উত্তর রাজ্যের ইস্রায়েলীয় বা শমরীয় ইয়াহূদীগণ শলোমনের পর থেকেই ধর্মচ্যুত হন এবং শেষে পৌত্তলিকদের মধ্যে বিলীন হয়ে যান। মূসার আলাইহিস সালাম ধর্ম ও ধর্মগ্রন্থের সাথে তাঁদের সম্পর্ক শুধু নামেই অবশিষ্ট থাকে। ফলে এদের মধ্যে মূসা আলাইহিস সালাম-এর ধর্মগ্রন্থ তোরাহ’-এর কোনো পাণ্ডুলিপির অস্তিত্ব আনকা’ (গরুড়) পক্ষীর ন্যায় কাল্পনিক বিষয়ে পরিণত হয়।

অপরদিকে শলোমনের মৃত্যু পর থেকে পরবর্তী ৩৭২ বৎসর[72] যাবৎ শলোমনের বংশের ২০ জন রাজা যিহূদা রাজ্যে রাজত্ব করেন। এ সকল রাজার মধ্যে বিশ্বাসী ও ধর্মপরায়ণ রাজার সংখ্যা ছিল কম। অধিকাংশ রাজাই ছিলেন ধর্মত্যাগী ও মুর্তিপুজক। প্রথম রাজা রহবিয়ামের যুগ থেকেই মুর্তিপূজার ব্যাপক প্রচলন ঘটে। প্রতিটি বৃক্ষের নিচে মুর্তি স্থাপন করা হয় এবং পূজা করা হয়। রহবিয়ামের রাজত্বকালেই যুডিয়া রাজ্যের উপর গযব নেমে আসে। তার সময়েই খৃস্ট পূর্ব ৯২৫ অব্দে মিশরের ফিরাউন ১ম শেশাঙ্ক বা শীশক (Shashanq I) যুডাহ রাজ্য আক্রমন করে যিরূশালেম নগর ও ধর্মধাম লুন্ঠন করেন। তিনি ধর্মধামের সকল আসবাবপত্র ও রাজ প্রাসাদের সকল মালামাল লুণ্ঠন করে নিয়ে যান।।[73]

কিছুদিন পরে যিহূদা রাজ্যের তৃতীয় রাজা আসার (Asa) রাজত্বকালে ইস্রায়েল রাজ্যের ধর্মত্যাগী ও মুর্তিপূজক রাজা বাশা (Baasha) যিরূশালেম আক্রমন করে ধর্মধাম ও রাজ প্রাসাদ ব্যাপকভাবে লুণ্ঠন করেন।[74]

যিহূদা বা যুডিয়া রাজ্যের ষষ্ঠ রাজা অহসিয় (Ahaziah)-এর সময়ে বাল-প্রতিমার পূজা ও তার উদ্দেশ্যে পশু-উৎসর্গ করার জন্য যিরূশালেমের অলিতে গলিতে ও সকল স্থানে বেদি স্থাপন করা হয়। শলোমনের মন্দির বা ধর্মধামের দরজা বন্ধ করে দেওয়া হয়।

যিহূদা বা যুডিয়া রাজ্যে ধর্মদ্রোহ, মুর্তিপুজা ও অনাচারের ব্যাপকতম প্রসার ও প্রতিষ্ঠা ঘটে রাজা মনঃশি (Manasseh)-এর শাসনামলে (খৃ. পূ ৬৯৩-৬৩৯ অব্দ)। এ সময়ে এই রাজ্যে প্রায় সকল অধিবাসীই মোশির ধর্ম পরিত্যাগ করে মুর্তিপূজা ও পৌত্তলিক ধর্ম গ্রহণ করেন। শলোমনের ধর্মধাম বা সদাপ্রভুর মন্দিরের মধ্যেই মুর্তিপূজা ও প্রতিমার জন্য পশু-উৎসর্গ করার নিমিত্ত বেদি নির্মাণ করা হয়। রাজা মনঃশি যে প্রতিমার পূজা করতেন তিনি সদাপ্রভুর মন্দিরের মধ্যে সেই প্রতিমা স্থাপন করেন। তাঁর পুত্র আমোন (Amon)-এর শাসনামলেও (খৃ. পূ. ৬৩৯-৬৩৮ অব্দ) ধর্মত্যাগ ও পৌত্তলিকতার অবস্থা একইরূপ থাকে।

আমোনের মৃত্যুর পরে খৃ.পূ. ৬৩৮ সালে তাঁর পুত্র যোশিয় (Josiah) আট বৎসর বয়সে যিহূদা রাজ্যের সিংহাসনে বসেন। তিনি ধর্মদ্রোহিতা ও অনাচার থেকে বিশুদ্ধভাবে তাওবা করেন। তিনি ও তাঁর রাজ্যের কর্ণধারগণ ধর্মদ্রোহিতা, পৌত্তলিকতা ও অনাচারকে সমূলে বিনাশ করে মোশির ব্যবস্থা বা শরীয়ত পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা শুরু করেন। মহাযাজক হিল্কিয় (Hilki’ah the high priest) ছিলেন তার দীক্ষাগুরু। তিনি সুলাইমানের ধর্মধাম বা মসজিদ সংস্কার ও চালু করার  জন্য জনগণ থেকে কর সংগ্রহ করতে ধর্মীয় লিপিকার শাফনকে (Shaphan the scribe)-কে দায়িত্ব দেনে। এ সকল সংস্কার কাজের জন্য ‘‘তাওরাত’’-এর প্রয়োজনীয়তা তারা বিশেষ করে অনুভব করেন। তা সত্ত্বেও তাঁর রাজত্বের ১৭শ বৎসর পর্যন্ত বা খৃস্টপূর্ব ৬২১ সাল পর্যন্ত কেউ মোশির তোরাহ-এর কোনো পাণ্ডুলিপির চিহ্ন দেখেন নি বা এর কোনো কথাও কেউ শুনেন নি।

যোশিয় রাজার রাজত্বের ১৮শ বৎসরে (খৃ. পূ. ৬২০/৬২১ সালে) রাজা যোশিয়ের গুরু মহাযাজক হিল্কিয় (Hilki’ah) দাবি করেন যে, তিনি সদাপ্রভুর গৃহে’, অর্থাৎ যিরূশালেমের ধর্মধাম বা শলোমনের মন্দিরের মধ্যে রৌপ্যের হিসাব করতে যেয়ে মোশির তোরাহ বা সদাপ্রভুর ব্যবস্থাপুস্তকখানি (the book of the law) পেয়েছেন। তিনি পুস্তকটি শাফন লেখককে (Shaphan the scribe) প্রদান করেন। শাফন লেখক রাজা যোশিয়কে পুস্তকটি পাঠ করে শোনান। রাজা এই পুস্তকটির বাক্যাদি শুনে এত বেশি বিমোহিত ও উদ্বেলিত হন যে তিনি নিজের পরিধেয় বস্ত্র ছিড়ে ফেলেন। ইস্রায়েলীয়দের অবাধ্যতার কথা স্মরণ করে তিনি এভাবে দুঃখ প্রকাশ করেন। এ সকল বিষয় ২ রাজাবলির ২২ অধ্যায়ে এবং ২ বংশাবলির ৩৪ অধ্যায়ে বিস্তারিত বর্ণনা করা হয়েছে।[75]

তোরাহ বা ব্যবস্থা পুস্তকবলে কথিত এই পাণ্ডুলিপিটির নির্ভরযোগ্যতা ও বিশুদ্ধতা স্বীকৃত নয়। যাজক হিল্কিয়ের দাবিও গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ রাজা অহসিয়ের পূর্বেই সদাপ্রভুর গৃহবা ধর্মধামটি ইতোপূর্বে দুইবার বিজয়ী শত্রুদের দ্বারা লুণ্ঠিত হয়েছে। এরপর এই গৃহটিকে প্রতিমা পূজার কেন্দ্রে পরিণত করা হয়। প্রতিমাপুজারিগণ প্রতিদিন এই গৃহে প্রবেশ করতেন। এভাবে অহসিয় (Ahaziah) রাজার রাজত্বকাল থেকে যেশিয়ের রাজত্বকালের ১৭শ বৎসর পর্যন্ত খৃস্টপূর্ব ৮৪৩ থেকে ৬২১ সাল পর্যন্ত দু শতাব্দীরও অধিক সময় কেউ কোনোভাবে তোরাহ বা ব্যবস্থাপুস্তকের নামও শুনেন নি, চোখে দেখা তো দূরের কথা।

যোশিয়ের রাজত্বের প্রথম ১৭টি বৎসর অতিবাহিত হয়ে গেল। এ দীর্ঘ সময়ে রাজা স্বয়ং ও রাজ্যের নেতৃবর্গ ও সাধারণ প্রজাগণ সকলেই মোশির ব্যবস্থার পালন ও পুন-প্রতিষ্ঠায় প্রানান্ত প্রচেষ্টায় নিরত ছিলেন। এত কিছু সত্ত্বেও এ দীর্ঘ সময়ে কেউ ব্যবস্থাপুস্তকের নামটি পর্যন্ত শুনতে পেলেন না। এই দীর্ঘ সময়ে সদাপ্রভুর গৃহের রক্ষক ও যাজকগণ প্রতিদিন এই গৃহের মধ্যে যাতায়াত করতেন। বড় অবাক কথা যে, এ দীর্ঘ সময় পুস্তকটি সদাপ্রভুর গৃহে থাকবে, অথচ এত মানুষ কেউ তার দেখা পাবে না!

প্রকৃত কথা হলো, এই পুস্তকটি বা তোরাহ’-এর এই পাণ্ডুলিপিটি পুরোটিই হিল্কিয় মহাযাজকের উদ্ভাবনা ও রচনা ছাড়া কিছুই নয়। তিনি যখন দেখলেন যে, রাজা যোশিয় এবং তাঁর অমাত্যবর্গ সকলেই মোশির ব্যবস্থার প্রতিপালন ও পুনপ্রতিষ্ঠায় আগ্রহী, তখন তিনি তাঁর যুগে লোকমুখে প্রচলিত সত্য ও মিথ্যা সকল প্রকারের মৌখিক বর্ণনা একত্রিত করে এই পুস্তকটি রচনা করেন। এগুলি সংকলন ও লিপিবদ্ধ করতেই তাঁর এই দীর্ঘ সময় ব্যয় হয়। যখন তা সংকলনের কাজ তিনি সমাপ্ত করেন, তখন তিনি পুস্তকটিকে সরাসরি মোশির নামেই চালিয়ে দেন। পাঠক ইতোপূর্বে জেনেছেন যে, ধার্মিকতার প্রচার প্রসার ও সত্যের প্রতিষ্ঠার জন্য এই ধরনের মিথ্যাচার ও জালিয়াতি শেষ শতাব্দীগুলির ইয়াহূদীগণ এবং প্রথম যুগগুলির খৃস্টানগণের নিকট ধর্মীয় পুণ্যকর্ম বলে গণ্য ছিল।

এ প্রকৃত সত্যটিকে পাশ কাটিয়ে প্রচলিত কাহিনীর ভিত্তিতে আমরা ধরে নিচ্ছি যে, হিল্কিয় তোরাহ-এর পাণ্ডুলিপিটি পেয়েছিলেন। রাজা যোশিয়ের রাজত্বের ১৮শ বৎসরে পাণ্ডুলিপিটি পাওয়া যায়। পরবর্তী ১৩ বৎসর, যতদিন রাজা যোশিয় জীবিত ছিলেন, ততদিন যিহূদা বা জুডাহ রাজ্যের ইয়াহূদীগণ এ তোরাহ অনুসারে নিজেদের ধর্মকর্ম পরিচালনা করেন।

যোশিয়ের মৃত্যুর পরে (খৃ. পূ. ৬০৮/৬০৯ সালে) তদীয় পুত্র যিহোয়াহস (Jeho’ahaz) রাজত্ব লাভ করেন। তিনি রাজত্ব লাভ করে মোশির ধর্ম পরিত্যাগ করেন এবং রাজ্যে অবিশ্বাস, ধর্মদ্রোহিতা ও পৌত্তলিকতার প্রসার ঘটান। মিশরের সম্রাট ফরৌণ-নখো বা নেকু (Neku) যিহোয়াহসকে বন্দি করে নিয়ে যান এবং তার ভ্রাতা ইলিয়াকীমকে যিহোয়াকীম (Jehoiakim/Joakim) নাম প্রদান পূর্বক সিংহাসনে বসান। যিহোয়াকীমও তার ভাইয়ের মত ধর্মদ্রোহী ও পৌত্তলিক ছিলেন।

যিহোয়াকীমের মৃত্যুর পরে (খৃ. পূ. ৫৯৮/৫৯৭ অব্দে) তার পুত্র যিহোয়াখীন (Jehoiachin/Joachin) রাজত্ব লাভ করেন। তিনিও তাঁর পিতা ও চাচার মতই ধর্মত্যাগী ও পৌত্তলিক ছিলেন। এ সময়ে ব্যাবিলনের সম্রাট বখত নসর বা নেবুকাদনেজার (Nebuchadrezzar II) জুডাহ বা যিহূদা রাজ্য দখল করেন। তিনি যিরূশালেম শহর, রাজ প্রাসাদ, সদাপ্রভুর গৃহবা ধর্মধামের সমস্ত ধন-সম্পদ ও দ্রব্যাদি লুণ্ঠন করে নিয়ে যান। তিনি রাজা যিহোয়াখীনকে বন্দি করে ব্যাবিলনে নিয়ে যান এবং তাঁর পরিবর্তে তাঁর চাচা সিদকিয়কে (Zedekiah) রাজত্ব প্রদান করেন। নেবুকাদনেজার বিপুল সংখ্যক ইয়াহূদীকে বন্দি করে ব্যাবিলনে নিয়ে যান।[76]

কাফির পৌত্তলিক রাজা সিদকিয় (Zedekiah) প্রায় ১১ বৎসর নেবুকাদনেজারের অধীনে লাঞ্ছিত অবস্থায় যিহূদা রাজ্যের রাজত্ব করেন। এরপর তিনি বিদ্রোহ করেন। খৃ. পূ. ৫৮৭/৫৮৬ সালে নেবুকাদনেজার দ্বিতীয়বার যিরূশালেম আক্রমন ও দখল করেন। তিনি রাজা সিদকিয়কে বন্দি করে তাঁরই সামনে তাঁর পুত্রগণকে জবাই করেন। এরপর তিনি সিদকিয়ের চক্ষু উৎপাটন করেন এবং তাকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করে ব্যাবিলন প্রেরণ করেন। নেবুকাদনেজার-এর বাহিনী এবার যিরূশালেমকে সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করে। তারা যিরূশালেমের ধর্মধাম বা সদাপ্রভুর গৃহ’, রাজ-প্রাসাদসমূহ, যিরূশালেমের সকল বাড়িঘর ও অট্টালিকায় অগ্নিসংযোগ করে ভস্মিভুত করে, যিরূশালেম নগরীর চারিদিকের প্রাচীর ভেঙ্গে দেয় এবং যিহূদা (Judah) রাজ্যে অবস্থানকারী অবশিষ্ট ইস্রায়েল সন্তানকে বন্দি করে ব্যাবিলনে নিয়ে যায়। এভাবে তিনি যিহূদা রাজ্য সম্পূর্ণরূপে বিনষ্ট করেন।[77]

আমরা দেখেছি যে, ইয়াহূদীদের ১২ গোত্রের দশ গোত্রের নিয়ন্ত্রণাধীন উত্তরের ইস্রায়েল রাজ্য খৃস্টপূর্ব ৭২২ সালে রাজা দ্বিতীয় সার্গন (Sargon II) কর্তৃক চিরতরে বিনষ্ট হয়। এর মাত্র ১৩৫ বৎসর পরে খৃ. পূ. ৫৮৭ সালে ইয়াহূদীদের অবশিষ্ট দুই গোত্রের নিয়ন্ত্রণাধীন দক্ষিণের যুডাই রাজ্যও নেবুকাদনেজার কর্তৃক সম্পূর্ণরূপে বিনষ্ট হয়। বিশেষত যিরুশালেম ও ধর্মধাম (মসজিদে আকসা) সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করা হয়। স্বভাবতই এ ঘটনায় তোরাহ এবং পুরাতন নিয়মের অন্যান্য সকল পুস্তক যেগুলি এই ঘটনার পূর্বে লিখিত হয়েছিল সবই চিরতরে পৃথিবীর বুক থেকে বিলীন হয়ে যায়। ইয়াহূদী-খৃস্টান পণ্ডিতগণও একথা একবাক্যে স্বীকার করেন।[78]

এভাবে আমরা দেখছি যে, রাজা যোশিয়ের (রাজত্বকাল খৃস্টপূর্ব ৬৩৮-৬০৮) পূর্বেই তাওরাত-এর ধারাবাহিকতা নষ্ট হয়ে যায়। তার সময়ের পূর্বেই তোরাহ-এর প্রচলন ও ব্যবহার বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। এ সময়ে তোরাহ-এর কোনো প্রকারের অস্তিত্বের কথাই জানা যায় না। যোশিয়ের সময়ে যে পাণ্ডুলিপিটি পাওয়া যায় তা নির্ভরযোগ্য নয়। বিশেষত একটিমাত্র পাণ্ডুলিপির দ্বারা ধারাবাহিক বহুল প্রচলন প্রমাণিত হয় না। তোরাহ-এর এ পূনর্জন্মও ক্ষণস্থায়ী। মাত্র ১৩ বৎসরের (খৃ. পূ ৬২০-৬০৮ সাল) বেশি তা ব্যবহৃত হয় নি। এরপর আর তার কোনো খবর জানা যায় না। বাহ্যত বুঝা যায় যে, যোশিয়ের পুত্র-পৌত্রগণের মধ্যে ধর্মদ্রোহিতা ও পৌত্তলিকতার পুনরাবির্ভাবের কারণে যোশিয়ের মৃত্যুর পরে নেবুকাদনেজারের আক্রমনের পূর্বেই তা বিনষ্ট হয়ে যায়। আর যদি তাদের দ্বারা তা নষ্ট না-ও হয় তাহলে সুনিশ্চিতভাবেই তা নেবুকাদনেজারের আক্রমনের সময়ে বিনষ্ট হয়ে যায়। ইয়াহূদী-খৃস্টানগণ একবাক্যে স্বীকার করেন যে, এ আক্রমনের পূর্বে লেখা ও বিদ্যমান পুরাতন নিয়মের সকল পুস্তক এ সময়ে পৃথিবীর বুক থেকে চিরতরে বিলীন হয়ে যায়। এজন্য তারা দাবি করেন যে, ব্যাবিলন থেকে ফেরার পর ইয্রা সেগুলি নতুন করে লিখেন।

আরবী ভাষায় লিখিত বাইবেল ডিকশনারীতে তারা উল্লেখ করেছেন যে, ইয়াহূদীদের ধর্মত্যাগ, অবিশ্বাস, অনাচার, মূর্তিপূজা, হানাহানি ও জুলুম-অত্যাচারের সুদীর্ঘ সময়ে, বিশেষত রাজা মনঃশি (Manasseh)-এর শাসনামলের ৫৫ বৎসরে (খৃ. পূ ৬৯৩-৬৩৯ অব্দ) পুরাতন নিয়মের গ্রন্থগুলি নষ্ট করা হয় বা হারিয়ে যায়। রাজা যোশিয়ের সময়ে মহাযাজক হিল্কিয় ব্যবস্থাপুস্তকের যে পাণ্ডুলিপিটি পেয়েছিলেন ধর্মধামের অবমাননার সময়ে তার মধ্যে বিকৃতি ও জালিয়াতি হওয়ার মতটিকে তারা অধিকতর গ্রহণযোগ্য বলে গণ্য করেছেন।

(খ) ব্যাবিলন থেকে প্রথম শতাব্দী পর্যন্ত পুরাতন নিয়ম

নেবুকাদনেজারের এ ঘটনা (খৃ. পূ. ৫৮৭/৫৮৬) থেকে প্রথম খৃস্টীয় শতাব্দী পর্যন্ত পরবর্তী প্রায় ৬০০ বৎসরের ইতিহাস পূর্ববর্তী অধ্যায়ের চেয়ে মোটেও ভাল নয়। ইয়াহূদী-খৃস্টানগণের ধারণা ও দাবি অনুযায়ী নেবুকাদনেজারের এ ঘটনার প্রায় এক শতাব্দী পরে ইয্রা (Ezra) পুনরায় পুরাতন নিয়মের এ সকল গ্রন্থ নিজের পক্ষ থেকে লিখেন। এ পুনর্জন্ম ও পুনর্লিখনের প্রায় তিন শতাব্দী পরে আবার একটি ভয়ঙ্কর বিপর্যয় ও ধ্বংস গ্রাস করে হিব্রু জাতিকে। বাইবেলের সন্দেহজনক পুস্তক’ (Apocrypha) মাকাবিজের প্রথম পুস্তক (The First Book of Maccabees) ও খৃস্টীয় প্রথম শতাব্দীর প্রসিদ্ধ ইয়াহূদী ঐতিহাসিক জোসেফাস (Flavius Josephus)-এর পুস্তকে এ সকল ঘটনা বিস্তারিত লিপিবদ্ধ করা হয়েছে।

এ ঘটনার সার-সংক্ষেপ হলো, খৃ. পূ. ১৬১ সালের দিকে[79] সিরিয়ার গ্রীক শাসক চতুর্থ এন্টিয়ক (Antiochus IV Epiphanes c. 215-164 BC) যিরুশালেম অধিকার করেন এবং ইয়াহূদী ধর্ম চিরতরে নির্মূল করার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি পুরাতন নিয়মের পুস্তকাদির কপি-পাণ্ডুলিপি যেখানে যা পান তা সবই ছিড়ে টুকরো করার পরে অগ্নিসংযোগ করে পুড়িয়ে দেন। তিনি নির্দেশ প্রদান করেন যে, কোনো ব্যক্তির নিকট পুরাতন নিয়মের কোনো পুস্তকের পাণ্ডুলিপি বা কপি পাওয়া গেলে, অথবা কোনো ব্যক্তি মোশির ব্যবস্থার (শরীয়তের) কোনো বিধান পালন করলে তাকে হত্যা করতে হবে। প্রতি মাসে অনুসন্ধান করা হতো। কারো নিকট পুরাতন নিয়মের কোনো পুস্তকের পাণ্ডুলিপি বা কপি পাওয়া গেলে, অথবা কেউ মোশির ব্যবস্থার কোনো বিধান পালন করলে তাকে হত্যা করা হতো। আর সেই পাণ্ডুলিপি বা কপিটি বিনষ্ট করা হতো। সাড়ে তিন বৎসর পর্যন্ত এই নিধন ও বিনাশের কর্ম অব্যাহত থাকে।

এ ঘটনায় অগণিত ইয়াহূদী নিহত হন এবং ইয্রার লেখা তোরাহ বা পুরাতন নিয়ম এবং এর সকল কপি বিনষ্ট হয়।[80]

ক্যাথলিক পণ্ডিত জন মিলনার লিখেন: পণ্ডিতগণ একমত যে, তোরাহ-এর মূল কপি এবং পুরাতন নিয়মের অন্যান্য পুস্তকাবলির কপিগুলি নেবুকাদনেজারের সেনাবাহিনীর হাতে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। এরপর ইয্রার মাধ্যমে এ সকল পুস্তকের উদ্ধৃতি প্রকাশ পায়। এন্টিয়ক (Antiochus Epiphanes)-এর ঘটনায় (খৃস্টপূর্ব ১৬৮ অব্দের দিকে) সেগুলিও আবার নিশ্চিহ্ন ও বিলুপ্ত হয়ে যায়।

এর পর আবার ইয়াহূদীরা গ্রীক ও রোমান সাম্রাজ্যের অধীনে যুডাই রাজ্যে বসবাস করতে থাকেন। তবে তাদের অবাধ্যতা ও অনাচারের ফলে বারংবার তারা রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের মধ্যে পড়েন।  এভাবে তারা আরো অনেক কঠিন বিপদ ও রাষ্ট্রীয় হত্যাযজ্ঞের মধ্যে নিপতিত হয়েছেন, ইয্রা লিখিত তোরাহ-এর বিকৃত বা অবিকৃতি যা কিছু পাণ্ডুলিপি তাদের নিকট বিদ্যমান ছিল এ সকল ঘটনায় সেগুলি বিনষ্ট হয়ে যায়। এসকল হত্যাযজ্ঞের অন্যতম হলো রোমান যুবরাজ টিটাস (Titus) এর ঘটনা। রোমান সম্রা্ট ভেসপাসিয়ান (Vespasian) তাঁর পুত্র (পরবর্তী সম্রাট) টিটাসকে ইয়াহূদীদের দমনের জন্য প্রেরণ করেন। তিনি ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালান এবং সদাপ্রভুর গৃহবা ধর্মধাম সম্পূর্ণ গুড়িয়ে মাটিতে মিশিয়ে দেন। এই ঘটনাটি ঘটে খৃস্টের উর্ধ্বারোহণের ৩৭ বৎসর পরে (৭০ খৃস্টাব্দে)। জোসেফাসের ইতিহাসে ও অন্যান্য ইতিহাসে এই ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ লিপিবদ্ধ রয়েছে। এই ঘটনায় হত্যা, ক্রুশ, অগ্নিসংযোগ ও অনাহারে যিরূশালেম ও তার পার্শবর্তী অঞ্চলের ১১ লক্ষ ইয়াহূদী মৃত্যুবরণ করে। ৯৭ হাজার ইয়াহূদীকে বন্দি করে বিভিন্ন দেশে ক্রীতদাস হিসেবে বিক্রয় করে দেওয়া হয়। এছাড়া অন্যান্য এলাকাতেও অনেক ইয়াহূদী এই ঘটনার সময়ে নিহত হন বা মৃত্যু বরণ করেন। এ কথা নিশ্চিত যে, এন্টিয়কের ঘটনার পরেও যদি পুরাতন নিয়মের কোনো কিছু অবশিষ্ট থেকে থাকে তাহলে এ সকল ঘটনায় তাও হারিয়ে ও বিনষ্ট হয়ে গিয়েছে। (এ গ্রন্থের ২৪-২৫ পৃষ্ঠায় প্রথম বিষয়দেখুন।)

(গ) হিব্রু তাওরাত বনাম গ্রীক অনুবাদ

আমরা আগেই বলেছি যে, ইয়াহূদীদের ধর্মীয় ও জাগতিক ভাষা হিব্রু ভাষা। এ ভাষাতেই পুরাতন নিয়মের সকল পুস্তক রচিত। খৃস্টপূর্ব ৩৩২ সালে আলেকজান্ডার যুডাই রাজ্য দখল করেন এবং তা গ্রীক সাম্রাজ্যের অংশে পরিণত হয়। ইয়াহূদীদের মধ্যে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে গ্রীক ভাষার কিছু প্রচলন ক্রমান্বয়ে শুরু হয়। প্রায় এক শতাব্দী পরে, খৃস্টপূর্ব ২৮৫-২৪৫ সালের দিকে বাইবেলের পুরাতন নিয়মের গ্রীক অনুবাদ প্রকাশিত হয়। ক্রমান্বয়ে এ অনুবাদই মূল গ্রন্থের স্থান দখল করে।

প্রাচীন খৃস্টানগণ পুরাতন নিয়মের হিব্রু সংস্করণের প্রতি ভ্রুক্ষেপ করতেন না। বরং তাঁরা হিব্রু বাইবেলকে বিকৃত বলে বিশ্বাস করতেন। তাঁরা গ্রীক অনুবাদটিকেই নির্ভরযোগ্য বলে গণ্য করতেন। বিশেষত দ্বিতীয় খৃস্টীয় শতাব্দীর শেষ পর্যন্ত কোনো খৃস্টান হিব্রু বাইবেলের প্রতি ভ্রুক্ষেপও করেন নি। উপরন্তু ১ম খৃস্টীয় শতাব্দীর শেষ পর্যন্ত সকল ইয়াহূদী উপাসনালয়েও গ্রীক অনুবাদই ব্যবহৃত হতো। এ কারণে হিব্রু বাইবেলের পাণ্ডুলিপির সংখ্যা ছিল খুবই কম। এ সামান্য সংখ্যক পাণ্ডুলিপিও শুধু ইয়াহূদীদের নিকটেই ছিল। ইয়াহূদীরা ৭ম ও ৮ম খৃস্টীয় শতকে লিখিত সকল পাণ্ডুলিপি নষ্ট করে দেন। কারণ তাঁদের নিকট গ্রহণযোগ্য পাণ্ডুলিপির সাথে এগুলির অনেক অমিল ও বৈপরীত্য ছিল। এজন্য এ সময়ে লিখিত কোনো পাণ্ডুলিপি আধুনিক যুগের বাইবেল-গবেষকগণের নিকট পৌঁছায় নি। এ সকল পাণ্ডুলিপি বিনষ্ট করার পরে তাঁদের পছন্দনীয় পাণ্ডুলিপিগুলিই শুধু অবশিষ্ট থাকে। এভাবে বিকৃতির বিশেষ সুযোগ তাদের সামনে উপস্থিত হয়।

(ঘ) প্রথম তিন শতাব্দীতে খৃস্টানগণ ও নতুন নিয়ম

প্রথম প্রজন্মগুলিতে খৃস্টানদের অবস্থাও ছিল শোচনীয়। ফলে তাঁদের মধ্যে বাইবেলের পাণ্ডুলিপির সংখ্যা ছিল খুবই কম এবং বিকৃতি-ইচ্ছুকদের জন্য সেগুলির মধ্যে বিকৃতি করার সুযোগ ছিল অনেক। খৃস্টধর্মের ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, ৩০০ খৃস্টাব্দ পর্যন্ত খৃস্টানগণ কঠিন বিপদাপদ ও রাষ্ট্রীয় অত্যাচার-নিপীড়নের মধ্য দিয়ে অতিবাহিত করেছেন। তাঁরা দশটি রাষ্ট্রীয় হত্যাযজ্ঞের সম্মুখীন হন:

প্রথমবার: রোমান সম্রাট নিরো (Nero)-এর সময়ে ৬৪ খৃস্টাব্দে। এ সময়ে খৃস্টের প্রেরিত শিষ্য পিতর ও তাঁর স্ত্রী নিহত হন।[81] এ সময়ে রাজধানী রোমে ও অন্যান্য সকল প্রদেশে হত্যাযজ্ঞ চালানো হয়। ৬৮ খৃস্টাব্দে নিরোর মৃত্যু পর্যন্ত এই অবস্থা চলতে থাকে। খৃস্টধর্মের স্বীকৃতিই খৃস্টানগণের জন্য কঠিন অপরাধ বলে গণ্য ছিল।

দ্বিতীয়বার: রোমান সম্রাট ডোমিশিয়ান (Domitian)-এর রাজত্বকালে ৮১ সালে এ হত্যাযজ্ঞের শুরু।[82] এ সম্রাটও নিরোর ন্যায় খৃস্টধর্মের শত্রু ছিলেন। তিনি খৃস্টানদেরকে হত্যার নির্দেশ দেন। ফলে সর্বত্র খৃস্টানদেরকে পাইকারীভাবে হত্যা করা শুরু হয়। এমনকি পৃথিবী থেকে সর্বশেষ খৃস্টানকেও নিশ্চিহ্ন করার চেষ্টা করা হয়। এ সময়ে প্রেরিত যোহনকে নির্বাসিত করা হয় এবং ফ্লাবিয়াস ক্লিমেন্টকে হত্যা করা হয়। ৯৬ সালে এ সম্রাটের মৃত্যু পর্যন্ত এ অবস্থা চলতে থাকে।

তৃতীয়বার: রোমান সম্রাট ট্রাজান (Trajan)-এর রাজত্বকালে। ১০১ খৃস্টাব্দে এই হত্যাযজ্ঞ শুরু হয়। ১০৮ সালে তা ভয়ঙ্করতম রূপ গ্রহণ করে। এমনকি দায়ূদ বংশের সর্বশেষ ব্যক্তিকে পর্যন্ত হত্যা করার নির্দেশ দেন তিনি। তার নির্দেশে সৈনিকের এরূপ সকলকে পাইকারীভাবে হত্যা করতে থাকে। প্রহার করে, ক্রুশে বিদ্ধ করে, পানিতে ডুবিয়ে ও বিভিন্নভাবে অনেক খৃস্টান পাদরী, বিশপ ও ধর্মগুরুকে হত্যা করা হয়। ১১৭ সালে এ সম্রাটের মৃত্যু পর্যন্ত এভাবে চলতে থাকে।

চতুর্থবার: রোমান সম্রাট মারকাস এন্টোনিয়াস (Marcus Aurelius Antoninus)-এর রাজত্বকালে। তিনি ১৬১ খৃস্টাব্দে রাজত্ব গ্রহণ করেন। এ সম্রাট দার্শনিক হিসেবে প্রসিদ্ধ ছিলেন এবং পৌত্তলিক রোমান ধর্মের গোঁড়া অনুসারী ছিলেন। ১৬১ খৃস্টাব্দে তিনি সর্বাত্মক নিপীড়ন ও হত্যাযজ্ঞ শুরু করেন। ১০ বৎসরেরও বেশি সময় তা অব্যাহত থাকে। পূর্ব-পশ্চিম সর্বত্র একভাবে খৃস্টানদেরকে হত্যা করা হয়। তিনি খৃস্টান পাদরি ও বিশপদেরকে মূর্তিপূজা ও মন্দিরের পুরোহিত হতে বলতেন। যারা অস্বীকার করত তাদেরকে লোহার চেয়ারে বসিয়ে নিচে আগুন জ্বালানো হতো। এরপর লোহার আংটা দিয়ে তার প্রজ্বলিত দেহের মাংস ছিন্নভিন্ন করা হতো।

পঞ্চমবার: রোমান সম্রাট সিভেরাস (Septimius Severus)-এর শাসনামলে (১৯৩-২১১খৃ.)। ২০২ খৃস্টাব্দ থেকে এই হত্যাযজ্ঞ শুরু হয়। এ সময়ে মিসরে, ফ্রান্সে ও কার্থেজে হাজার হাজার খৃস্টানকে হত্যা করা হয়। এই পাইকারী হত্যাযজ্ঞের নির্মমতা ছিল এত ভয়ানক যে, তখনকার খৃস্টানগণ মনে করেন যে, খৃস্টারি (দাজ্জাল)  বা পাপ পুরুষ (Antichrist, Man of Sin)-এর যুগ এসে গেছে বা কিয়ামত সন্নিকটে।

ষষ্ঠবার: রোমান সম্রাট ম্যাক্সিমিনের (Maximin) এর সময়ে। ২৩৫ খৃস্টাব্দে তিনি রাজত্ব গ্রহণ করেন। ২৩৭ খৃস্টাব্দে এ হত্যাযজ্ঞ শুরু হয়। তিনি ধর্মগুরু ও পণ্ডিতদের গণহারে হত্যার নির্দেশ দেন। কারণ তাঁর ধারণা ছিল যে, ধর্মগুরু ও পণ্ডিতগণকে হত্যা করলে সাধারণ মানুষেরা অতি সহজেই তাঁর আনুগত্য করবে। এরপর তিনি নির্বিচারে সকল খৃস্টানকে হত্যার নির্দেশ দেন। তাঁর নির্দেশে গণহত্যা চলতে থাকে। অনেক সময় একটি গর্তে ৫০/৬০টি দেহ ফেলা হতো। এরপর তিনি রোমের সকল বাসিন্দাকে হত্যার সিদ্ধান্ত নেন। এ সময় ২৩৮ সালে তারই এক সৈনিক তাকে হত্যা করে।

সপ্তমবার: রোমান সম্রাট ডেসিয়াস (Decius)-এর সময়ে। ২৫৩ খৃস্টাব্দে এই পাইকারী হত্যাযজ্ঞ শুরু হয়। এ সম্রাট সিদ্ধান্ত নেন যে, সকল খৃস্টানকে হত্যা করে তিনি খৃস্টধর্মকে সমূলে বিনাশ করবেন। এ জন্য তিনি তাঁর রাজ্যের সকল আঞ্চলিক প্রশাসককে এই মর্মে নির্দেশ প্রদান করেন। এ সময়ে কিছু খৃস্টান ধর্মত্যাগ করেন। মিসর, আফ্রিকা, ইটালি, মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়া মাইনর ছিল তাঁর এই পাইকারী নিধনযজ্ঞের কেন্দ্রবিন্দু।

অষ্টমবার: রোমান সম্রাট ভ্যলেরিয়ান (Valerian/ Valerianus)-এর সময়ে ২৫৭ খৃস্টাব্দে। এ সময়ে হাজার হাজার খৃস্টানকে হত্যা করা হয়। এরপর তিনি অত্যন্ত কঠোরভাবে নির্দেশ প্রদান করেন যে, সকল বিশপ ও ধর্মযাজককে হত্যা করতে হবে। সকল সম্মানীয় খৃস্টানকে লাঞ্ছিত করতে হবে এবং তাঁদের ধন-সম্পদ বাজেয়াপ্ত করতে হবে। এরপরও তাঁরা খৃস্টধর্ম পরিত্যাগ না করলে তাঁদেরকে হত্যা করতে হবে। সম্মানীয় মহিলাদের ধন-সম্পদ বাজেয়াপ্ত করতে হবে এবং তাঁদেরকে দেশ থেকে তাড়িয়ে দিতে হবে। এরপর যারা খৃস্টান ছিল তাদের মধ্যে যারা রোমান দেবতা জুপিটারের পূজা করতে অস্বীকার করত তাদেরকে হত্যা করা হতো বা আগুনে পুড়িয়ে মারা হতো বা হিংস্র পশুর খাদ্য হিসেবে ছেড়ে দেওয়া হতো। অন্যান্যদের বন্দি করে ক্রীতদাস বানিয়ে পায়ে বেড়ি পরিয়ে রাষ্ট্রের কাজে ব্যবহার করা হতো।

নবমবার: রোমান সম্রাট আরেলিয়ান (Aurelian /Aurelianus)-এর সময়ে। ২৭৪ খৃস্টাব্দে এই নিধনযজ্ঞ শুরু হয়। সম্রাট এ মর্মে ফরমান জারি করেন। তবে এবারের নিধনযজ্ঞ বেশিদিন স্থায়ী হয় নি। কারণ বৎসরখানেক পরে সম্রাট নিজেই নিহত হন।

দশমবার: রোমান সম্রাট ডিওক্লেশিয়ান (Diocletian/ Diocleti-anus)-এর শাসনামলে। তিনি ২৮৪ খৃস্টাব্দে রাজত্ব গ্রহণ করেন। ২৮৬ সাল থেকে তিনি খৃস্টানদের নিপীড়ন শুরু করেন। ৩০২ খৃস্টাব্দে তা মহা-নিধনযজ্ঞে পরিণত হয় এব ৩১৩ সাল পর্যন্ত অব্যাহত থাকে। রোমান রাজ্যের পূর্ব থেকে পশ্চিম পর্যন্ত সর্বত্র পাইকারী হারে খৃস্টানদের হত্যা করা হয়। ৩০২ সালে ফ্রিজিয়া শহরকে একবারে এমনভাবে পুড়িয়ে দেওয়া হয় যে, সেখানে একজন খৃস্টানও অবশিষ্ট থাকেন নি।

সম্রাট ডিওক্লেশিয়ান সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন যে, পৃথিবীর বুক থেকে বাইবেলের অস্তিত্ব মুছে দিবেন। এ জন্য তিনি অত্যন্ত দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হয়ে চেষ্টা করেন। ৩০৩ খৃস্টাব্দে তিনি সকল চার্চ-গীর্জা ভেঙ্গে ফেলার ও সকল ধর্মগ্রন্থ পুড়িয়ে ফেলার নির্দেশ প্রদান করেন। তিনি খৃস্টানদের উপাসনার জন্য একত্রিত হওয়া নিষিদ্ধ করে দেন। তাঁর নির্দেশানুসারে সকল গীর্জা ভেঙ্গে ফেলা হয় এবং ব্যাপক অনুসন্ধানের মাধ্যমে যত প্রকারের ধর্মীয় পুস্তক পাওয়া যায় তা সবই পুড়িয়ে ফেলা হয়। যে ব্যক্তি এই নির্দেশ পালনে অস্বীকৃতি জানায় বা যে ব্যক্তি কোনো ধর্মীয় পুস্তক গোপন করে রেখেছে বলে সন্দেহ করা হয় তাকে নির্মমভাবে শাস্তি প্রদান করা হয়। খৃস্টানগণ উপাসনার জন্য সমবেত হওয়া বন্ধ করে দেন। ইউসেবিয়াস (Eusebius) লিখেছেন যে, তিনি নিজে স্বচক্ষে গীর্জাগুলি ভেঙ্গে ফেলতে এবং বাইবেল বা পবিত্র পুস্তকগুলিকে বাজারের মধ্যে পুড়িয়ে ফেলতে দেখেছেন।

এ সম্রাট মিসরের শাসককে নির্দেশ দেন মিসরের কপ্টিক খৃস্টানদেরকে রোমান প্রতিমা পূজা করতে বাধ্য করতে। যারা এ আদেশ মানবে না তাদেরকে হত্যা করার নির্দেশ দেন। এ নির্দেশে ৮,০০,০০০ (আট লক্ষ) কপ্টিক খৃস্টানকে হত্যা করা হয়। এজন্য তার যুগকে ‘‘শহীদদের যুগ’’ বলা হয়। তিনি প্রতিদিন ৩০ থেকে ৮০ জন খৃস্টান হত্যা করতেন। তার হত্যাযজ্ঞ ১০ বৎসর স্থায়ী হয় এবং পুরো রোমান রাজ্যের সর্বত্র হত্যাযজ্ঞ চলতে থাকে। এ হত্যাযজ্ঞ পূর্ববর্তী ঘটনাগুলির চেয়ে অধিক হিংস্র ও অধিক সময় স্থায়ী হয়।

খৃস্টানগণ ঘটনাগুলির যেরূপ বিবরণ দিয়েছেন তা যদি আংশিকও সত্য হয় তবে কখনোই কল্পনা করা যায় না যে, এ সময়ে খৃস্টানদের মধ্যে বাইবেলের অনেক কপি বিদ্যমান বা প্রচলিত ছিল। একথাও চিন্তা করা যায় না যে, তাঁরা তাঁদের ধর্মগ্রন্থকে যথাযথভাবে সংরক্ষণ করতে, বিশুদ্ধ রাখতে ও এ বিষয়ে গবেষণা পর্যালোচনা করতে পেরেছেন। বরং এ সময় ছিল বিকৃতিকারীদের জন্য বাইবেল বিকৃত করার সুবর্ণ সুযোগ। তারা ইচ্ছামত বিকৃতি ও জালিয়াতি করার অনেক সুযোগ পেয়েছিল। পাঠক জেনেছেন যে, খৃস্টীয় প্রথম শতকে খৃস্টানদের মধ্যে বিভ্রান্ত দল উপদলের সংখ্যা ছিল অনেক এবং তারা সকলেই বাইবেল বিকৃত করতেন।[83]

উপরের বিষয়গুলির আলোকে আমরা বুঝতে পারি যে, ইয়াহূদী-খৃস্টানগণের নিকট থেকে তাঁদের ধর্মগ্রন্থগুলির অবিচ্ছিন্ন সূত্র পরম্পরা বা বিশুদ্ধতার প্রমাণ বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছে। পুরাতন নিয়ম এবং নতুন নিয়মের কোনো একটি পুস্তকেরও লেখক থেকে কেনো অবিচ্ছিন্ন সূত্র পরম্পরা তাঁদের নিকট সংরক্ষিত নেই। ইয়াহূদীগণের নিকটেও নেই এবং খৃস্টানগণের নিকটেও নেই। ইযহারুল হক্কের প্রণেতা আল্লামা রাহমাতুল্লাহ তাঁর সাথে প্রকাশ্য বিতর্কের সময় (১৮৫৪ খৃস্টাব্দে) পাদ্রী মি. ফানডার ও মি. ফ্রেঞ্চ-এর নিকট এরূপ সূত্র দাবি করেন। তাঁরা একথা বলে ওজরখাহি পেশ করেন যে, এ সকল গ্রন্থের সূত্র আমরা হারিয়ে ফেলেছি। খৃস্টধর্মের শুরু থেকে ৩১৩ বৎসর পর্যন্ত আমাদের উপর যে জুলুম-অত্যাচার হয়েছিল তার ফলে এ গ্রন্থগুলির সূত্র পরম্পরার বিবরণ আমাদের নিকট থেকে হারিয়ে গিয়েছে।

এভাবে প্রমাণিত হয় যে, ধারণা ও অনুমান ছাড়া কোনো প্রকার সূত্র (chain of authorities) ইয়াহূদী-খৃস্টানগণের কাছে নেই। তাদের নিকট অতিপ্রাচীন কোনো পাণ্ডুলিপি নেই। যে সকল পাণ্ডুলিপি তারা ‘‘প্রাচীন’’ বলে দাবি করেন সেগুলি খৃস্টীয় ৪র্থ/৫ম শতকের বা তার পরের বলে তারাই দাবি করেন। আর  এসকল প্রাচীন বলে কথিত পাণ্ডুলিপিগুলি প্রকৃতপক্ষে কবে, কখন বা কোথায় লেখা হয়েছে তার কোনো সুস্পষ্ট প্রমাণ নেই।

মুসলিম লেখকগণ সাধারণত তাঁদের লেখা বই-পুস্তক বা পাণ্ডুলিপির শেষে লিখেন যে, অমুক সালের অমুক তারিখে পুস্তকটির রচনা বা অনুলিপি করা শেষ হলো। অনুলিপির ক্ষেত্রে অনুলিপিকারের নামও তাঁরা লিখেন। এধরনের কোনো কথা বাইবেলীয় পাণ্ডুলিপির কোথাও লেখা নেই। কে এই অনুলিপি করেছেন, কবে, কখন বা কোথায় তা করেছেন কিছুই তাতে উল্লেখ করা হয় নি। খৃস্টান পণ্ডিতগণ কিছু কিছু প্রাসঙ্গিক বিষয়ের ভিত্তিতে অন্ধকারে ঢিল ছুঁড়ে বলেন যে, সম্ভবত অমুক শতকে বা অমুক শতকে তা লেখা হয়েছিল। এই প্রকারের ধারণা ও অনুমান বিতর্কের ক্ষেত্রে বিপক্ষের বিরুদ্ধে প্রমাণ হিসেবে পেশ করা যায় না।

খৃস্টান প্রচারকগণ বিভ্রান্তিমূলকভাবে প্রচার করেন যে, কুরআনে যেহেতু ইয়াহূদী-খৃস্টানগণকে ‘‘আহল কিতাব’’ বলা হয়েছে এবং তাদের নিকট কিতাব আছে, কিতাবের মধ্যে আল্লাহর বিধান আছে ইত্যাদি কথা বলা হয়েছে, সেহেতু কুরআন থেকে বুঝা যায় যে, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পর্যন্ত বাইবেল বিশুদ্ধ ছিল।

তাদের এ সকল কথা জঘন্য মিথ্যাচার ছাড়া কিছুই নয়। কুরআনে সুস্পষ্ট বলা হয়েছে যে, ইয়াহূদী-খৃস্টানগণ তাদের কিতাব বিকৃত করেছে, নিজে হাতে পুস্তক রচনা করে তা ‘‘আল্লাহর কিতাব’’ বলে চালিয়েছে, তাদের উপর অবতীর্ণ অনেক কিতাব ও বিধান তারা ভুলে গিয়েছে বা হারিয়ে ফেলেছে। এজন্য আমরা মুসলিমগণ বিশ্বাস ও প্রমাণ করি যে, কুরআন অবতীর্ণ হওয়ার আগেই বাইবেলের পুস্তকগুলি বিকৃত হয়েছে।

আমরা কখনোই দাবি করি না যে, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর যুগ পর্যন্ত বাইবেল অবিকৃত ছিল এবং এরপর তা বিকৃত হয়েছে। বরং কুরআনের নির্দেশনার আলোকে মুসলিম উম্মাহ একমত যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পূর্বেই এ সকল পুস্তক বিকৃত হয়েছে এবং এগুলির সূত্র হারিয়ে গিয়েছে। এছাড়া তাঁর যুগের পরেও এরূপ বিকৃতির ধারা অব্যাহত থেকেছে।

খৃস্টানগণ দাবি করেন যে, তাদের নিকট ৪র্থ-৫ম শতকে লেখা বাইবেলের কিছু পাণ্ডুলিপি রয়েছে, যা প্রমাণ করে যে, বাইবেল বিকৃত নয়। প্রকৃতপক্ষে এ সকল পাণ্ডুলিপি প্রমাণ করে যে, বাইবেল বিকৃত। কারণ এ সকল পাণ্ডুলিপির একটির সাথে আরেকটির ব্যাপক অমিল ও বৈপরীত্য রয়েছে। এগুলির মধ্যে জাল ও ভিত্তিহীন পুস্তকাদি রয়েছে বলে তারাই স্বীকার করেন। এ সকল ‘‘প্রাচীন’’ পান্ডলিপি প্রমাণ করে, তাদের পূর্বসূরীরা তাদের ধর্মগ্রন্থগুলিকে কিভাবে বিকৃত করতেন এবং এগুলির মধ্যে জাল ও বানোয়াট পুস্তকাদি ঢুকাতেন।

উপরের আলোচনা থেকে সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে যে, বাইবেলের উভয় নিয়মের পুস্তকগুলিতে ব্যাপক বৈপরীত্য, ভুলভ্রান্তি ও সর্বপ্রকারের বিকৃতি বিদ্যমান। আর এসকল পুস্তকের কোনো সূত্র বা উৎস তাদের নিকট সংরক্ষিত নেই। তাঁরা যা কিছু বলেন সবই আন্দায-অনুমান মাত্র। আর আন্দায-অনুমান দিয়ে সত্যকে পাওয়া যায় না।

চতুর্থ পরিচ্ছেদ:

নতুন ও পুরাতন নিয়মে রহিত বিধান

মুসলিমদের সাথে ইয়াহূদী ও খৃস্টানগণের বিতর্কের অন্যতম বিষয় রহিতকরণ বিষয়। মুসলিমগণ বিশ্বাস করেন যে, মহান আল্লাহ তার কোনো বিধান ইচ্ছা করলে রহিত করতে পারেন। এ পরিচ্ছেদে বিষয়টি আলোচনা করা হবে। ইয়াহূদী-খৃস্টানগণ অত্যন্ত আপত্তিসহকারে এ বিশ্বাসের প্রতিবাদ করেন। তাঁরা বিশ্বাস করেন যে, মহান আল্লাহর কোনো বিধান কোনোভাবে রহিত হতে পারে না। এ পরিচ্ছেদে পুরাতন ও নতুন নিয়মের আলোকে আল্লাহর বিধানের রহিত হওয়ার বিষয়টি আলোচনা করা হবে।

১. ৪. ১. ইসলামী পরিভাষায় রহিতকরণ

১. ৪. ১. ১. নাসখ বা রহিতকরণের অর্থ

নাস্‌খ(نسخ) শব্দের সাধারণ অর্থ রহিত করা, সরিয়ে দেওয়া, বাতিল করা, স্থগিত করা, লোপ করা, পরিবর্তন করা (abrogate, abolish, invalidate, repeal, withdraw, annulment)।

আরবী ভাষায় নাসখ শব্দটি মূলত দুটি অর্থে ব্যবহৃত হয়:

১. বাতিল করা বা অপসারিত করা। বলা হয়: সূর্য ছায়া নাসখকরেছে এবং ঝড় পদচিহ্ন না্সখকরেছে, অর্থাৎ অপসারিত করেছে। এ অর্থে আল্লাহ বলেন: ‘‘আমি যদি কোনো আয়াত নাসখ (অপসারিত) করি বা ভুলিয়ে দিই তবে তা থেকে উত্তম অথবা তারই অনুরূপ আনয়ন করি।’’[84]

অন্যত্র তিনি বলেন: ‘‘শয়তান যা নিক্ষেপ করে আল্লাহ তা নাসখ (বাতিল বা অপসারিত) করেন, অতঃপর আল্লাহ তাঁর আয়াতসমূহ সুপ্রতিষ্ঠিত করেন।’’[85]

২. স্থানান্তর ও পরিবর্তন। এ অর্থে বলা হয়: কিতাবটি নাসখ করেছে, অর্থাৎ অনুলিপি তৈরির মাধ্যমে পুস্তকটির বিষয়বস্তু স্থানান্তর করেছে। বলা হয়: মৌমাছি মধু নাসখকরেছে, অর্থাৎ এক স্থান থেকে অন্যত্র স্থানান্তরিত করেছে। এ অর্থে কুরআন কারীমে বলা হয়েছে:

‘‘তোমরা যা কর্ম করতে আমি তা নাসখ (লিপিবদ্ধ) করতাম।’’[86]

ইসলামী পরিভাষায় নাসখবা রহিতকরণ’ (abrogation) অর্থ হলো সকল শর্ত পূরণ করেছে এমন কোনো কর্ম বিষয়ক বিধানের পালনীয়তার সময়সীমার সমাপ্তি ঘোষণা করা।

১. ৪. ১. ২. ইসলামী পরিভাষায় রহিতকরণের ক্ষেত্র

ইসলামী বিশ্বাস অনুসারে এই প্রকারের রহিতকরণ বা কার্যকারিতার সমাপ্তি ঘোষণাশুধু কর্ম বিষয়ক বিধানেরক্ষেত্রেই ঘটতে পারে, কোনো স্বতঃসিদ্ধ সত্য, জ্ঞানভিত্তিক তথ্য, গল্প-কাহিনী বা ঘটনার বর্ণনায় এই প্রকারের রহিত করণ ঘটতে পারে না। যেমন, ‘এই বিশ্বের একজন স্রষ্টা আছেনএই তথ্যটির সত্যতা ও পালনীয়তা চিরন্তন।

অনুরূপভাবে ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য কোনো বিষয়কে রহিতবা কার্যকরিতা সমাপ্তকরা যায় না। যেমন দিনের আলো এবং রাতের অাঁধার। অনুরূপভাবে প্রার্থনাবিষয়ক বাক্য রহিত হয় না এবং চিরন্তন সত্যও রহিতহয় না। যেমন ঈশ্বরের প্রতি বিশ্বাসী হও এবং ঈশ্বর ছাড়া অন্য কারো উপাসনা করিও না। এই প্রকারের চিরন্তন সত্য রহিত হয় না।

যে সকল বিধান প্রদানের সময়েই তা চিরস্থায়ী বলে উল্লেখ করা হয়েছে সে সকল বিধানও রহিত বা স্থগিত হয় না। যেমন নিরপরাধ নারীদেরকে মিথ্যা অপবাদ প্রদানকারী ব্যক্তিদের বিষয়ে পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে: ‘‘এবং কখনোই তোমরা তাদের সাক্ষ্য গ্রহণ করবে না।’’[87] আবার যে সকল বিধান প্রদান করার সময়েই তাকে অস্থায়ী বা সময়িক বলে উল্লেখ করা হয়েছে সেগুলির নির্ধারিত সময় শেষ হওয়ার পূর্বে রহিত করা যায় না। অনুরূপভাবে দুআ বা প্রার্থনা রহিত হয় না।

ইসলামী পরিভাষায় রহিতকরণ বা স্থগিতকরণ শুধু সে সকল বিধানের বিষয়ে ঘটতে পারে, যেগুলি কর্ম বিষয়ক, চিরস্থায়ী নয় এবং সাময়িকও নয় এবং যেগুলির বাস্তবায়ন থাকা ও না থাকা উভয়েরই সম্ভাবনা বিরাজমান। এই প্রকারের বিধানগুলিকে উন্মুক্ত বিধানবলা হয়।

১. ৪. ১. ৩. রহিতকরণ বনাম মত-পাল্টানো

ইয়াহূদী ধর্মে একটি বিশ্বাস আছে যাকে ‘‘আল-বাদা’’ বলা হয়। এর অর্থ কোনো অপ্রকাশিত বিষয় প্রকাশিত হওয়া। এর দ্বারা বুঝানো হয় যে, মহান আল্লাহ কোনো একটি বিষয়ের পরিণাম ও পরিণতি না জেনে বা না বুঝেই সে বিষয়ে আদেশ বা নিষেধ প্রদান করেন। এরপর নতুন একটি মত তার কাছে প্রকাশিত হয়। তখন তিনি পূর্বে বিধান রহিত করে নতুন বিধান প্রদান করেন। এরূপ বিশ্বাসের দ্বারা মহান আল্লাহকে অজ্ঞ বা অপরিণামদর্শী বলে দাবি করা হয়, নাউযূ বিল্লাহ! তিনি এরূপ বিভ্রান্তিকর বিশ্বাস থেকে অতি পবিত্র ও অনেক ঊর্ধ্বে।

ইসলামী পরিভাষায় রহিতকরণবা স্থগিতকরণএরূপ কিছুই নয়। ইসলামী পরিভাষায় এর অর্থ হলো, মহান আল্লাহ জানতেন যে, এ বিধানটি অমুক সময় পর্যন্ত তাঁর বান্দাদের মধ্যে প্রচলিত থাকবে এবং এরপর তা স্থগিত হবে। যখন তাঁর জানা সেই সময়টি এসে গেল তখন তিনি নতুন বিধান প্রেরণ করলেন। এ নতুন বিধানের মাধ্যমে সে পূর্বতন বিধানটির আংশিক বা সামগ্রিক পরিবর্তন সাধন করতেন। প্রকৃত পক্ষে এ হলো পূর্বতন বিধানের কার্যকরিতার সময়সীমা জানিয়ে দেওয়া। তবে যেহেতু পূর্বতন বিধানটি প্রদানের সময় এর সময়সীমা উল্লেখ করা হয় নি, সেহেতু, নতুন বিধানটির আগমনকে আমরা আমাদের জ্ঞানের সীমাবদ্ধতার কারণে বাহ্যত পরিবর্তনবলে মনে করি। এরূপ রহিতকরণযুক্তি বা বিবেকের দৃষ্টিতে অসম্ভব নয়। মহান আল্লাহর ক্ষেত্রেও তা তাঁর মহত্ব বা মর্যাদার পরিপন্থী নয়। এরূপ রহিতকরণের মধ্যে মানব জাতির জন্য কল্যাণ নিহিত রয়েছে। মানুষ অনেক সময় এরূপ পরিবর্তনের কল্যাণ বুঝতে পারে, অনেক সময় তা পারে না। তবে সর্বাবস্থায় মহান আল্লাহর সকল নির্দেশ ও বিধানই মানুষের মঙ্গল অর্জনের জন্য অথবা অমঙ্গল বর্জন বা নিয়ন্ত্রণ করার জন্য।

মহান আল্লাহই শুধু মানুষের কল্যাণ-অকল্যাণ ও মঙ্গল-অমঙ্গলের গোপন বিষয় অবগত আছেন। তিনিই জানেন কখন কোন বিধানের কার্যকরিতা শেষ হওয়া মানুষের জন্য কল্যাণকর। এজন্য একমাত্র তিনিই কোনো বিধান রহিত বা স্থগিত করতে পারেন। পক্ষান্তরে ‘‘প্রকাশ পাওয়া’’, ‘‘মত পাল্টানো’’ বা নতুন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা মহান আল্লাহর ক্ষেত্রে অসম্ভব। কারণ তিনি অনাদি, অনন্ত ও অসীম জ্ঞানের অধিকারী। কখন কি ঘটবে তা সবই তিনি জানেন। ফলাফল দেখে মতপাল্টনো, বা নতুন সিদ্ধান্ত গ্রহণ মানুষের ক্ষেত্রে সম্ভব, কারণ মানুষের জ্ঞান অতি সীমিত।

১. ৪. ১. ৪. কাহিনী ও ঐতিহাসিক বিবরণ রহিত হয় না

উপরের আলোচনার প্রেক্ষাপটে পাঠক বুঝতে পারছেন যে, কোনো গল্প, কাহিনী বা ঐতিহাসিক ঘটনার বিবরণ রহিতবা স্থগিতহয় না। কাজেই বাইবেলের পুরাতন ও নতুন নিয়মের কোনো গল্প-কাহিনী আমাদের মতে রহিত নয়। তবে সেগুলির মধ্যে অনেক মিথ্যা কাহিনী আছে। যেমন:

(১) লোট বা লূত আলাইহিস সালাম মদ খেয়ে মাতাল হন এবং তার দুই কন্যার সাথে ব্যভিচারে লিপ্ত হন। তাঁর কন্যাদ্বয় এই ব্যভিচারের মাধ্যমে পিতাকর্তৃক গর্ভধারণ করেন। আদিপুস্তকের ১৯ অধ্যায়ে এই কাহিনীটি উল্লেখ করা হয়েছে।[88]

(২) য্যাকোব (ইয়াকূব আ)-এর পুত্র যিহূদা তাঁর পুত্রবধু তামর-এর সাথে ব্যভিচারে লিপ্ত হন। ব্যভিচারের ফলে তামর গর্ভবতী হন এবং পেরস ও সেরহ নামে যমজ পুত্রদ্বয় প্রসব করেন। আদিপুস্তকের ৩৮ অধ্যায়ে এই কাহিনীউল্লেখ করা হয়েছে।[89] দায়ূদ, শলোমন ও যীশুখৃস্ট সকলেই পেরস নামের এ জারজ সন্তানের বংশধর। মথিলিখিত সুসমাচারের প্রথম অধ্যায়ে তা উল্লেখ করা হয়েছে।[90]

(৩) দায়ূদ আলাইহিস সালাম ঊরিয়র স্ত্রীর সাথে ব্যভিচারে লিপ্ত হন এবং এই ব্যভিচারের ফলে স্ত্রীলোকটি গর্ভবতী হন। তখন দায়ূদ সেনাপতিকে পরামর্শ দেন কৌশলে যুদ্ধের মাঠে ঊরিয়াকে বধ করার জন্য। এভাবে ঊরিয়া নিহত হয় এবং দায়ূদ তার স্ত্রীকে ভোগ করেন। ২ শমূয়েলের ১১শ অধ্যায়ে কাহিনীটিউল্লেখ করা হয়েছে।[91]

(৪) শলোমন (সুলাইমান আ.) শেষ বয়সে ধর্মত্যাগ করে মুরতাদ হয়ে যান। তিনি মূর্তিপূজা শুরু করেন এবং মূর্তির জন্য উপাসনালয় তৈরি করেন। ১ রাজাবলির ১১ অধ্যায়ে এই কাহিনীটিউল্লেখ করা হয়েছে।[92]

(৫) হারোণ আলাইহিস সালাম একটি গো-বৎসের মুর্তি তৈরি করেন এবং তার পূজা করেন। উপরন্তু তিনি ইস্রায়েল সন্তানগণকে তা পূজা করতে নির্দেশ দেন। যাত্রাপুস্তকের ৩২ অধ্যায়ে এই কাহিনীটিউল্লেখ করা হয়েছে।[93]

এসকল কাহিনীএবং অনুরূপ আরো অনেক কাহিনী আমাদের মতে মিথ্যা ও বাতিল। আমরা বলি না যে, এগুলি রহিত বা স্থগিত।

১. ৪. ১. ৫. যাবূর দ্বারা তাওরাত ও ইঞ্জিল দ্বারা যাবূর রহিত হয় নি

চিরন্তন ও স্বতঃসিদ্ধ চিরস্থায়ী সত্য, জ্ঞান ও ইন্দ্রিয় লব্ধ তথ্যাদি, সর্বজনীন বিধানাদি, চিরস্থায়ী বিধানাদি, সাময়িক বিধানাদির সময়কাল শেষ হওয়ার পূর্বে এবং সাধারণ বা উন্মুক্ত বিধানের স্থান কাল ও পাত্র একই হলে তা রহিত হতে পারে না। কারণ এইরূপ রহিতকরণ আপত্তিকর।

অনুরূপভাবে প্রার্থনার বাক্যাবলিও রহিত হয় না। এজন্য যাবূর বা গীতসংহিতাআমাদের দৃষ্টিতে পারভিাষিকভাবে রহিত বা স্থগিত নয়। আমরা কখনোই বলি না যে, গীতসংহিতা বা যাবূরের দ্বারা তোরাহ রহিত হয়েছে এবং ইঞ্জিল বা নতুন নিয়মের আগমনে যাবূররহিত হয়েছে। কারণ যাবূর মূলত প্রার্থনা বা দুআর সমষ্টি, যা রহিত করে না বা রহিত হয় না।

ইসলামে যাবূরসহ পুরাতন ও নতুন নিয়মের পুস্তকাবলি ব্যবহার করতে বা সেগুলির উপর নির্ভর করতে নিষেধ বা আপত্তি করার কারণ এ নয় যে, এগুলিতে বর্ণিত সকল প্রার্থনা, কাহিনী… ইত্যাদি সবকিছু রহিত হয়ে গিয়েছে। বাইবেলের নতুন ও পুরাতন নিয়মের পুস্তকাদি ব্যবহারে আপত্তির কারণ হলো, এগুলি সত্যই মোশি, দায়ূদ, যীশু প্রমুখ ভাববাদীর প্রদত্ত সঠিক পুস্তক কিনা সে বিষয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। এ সকল পুস্তকের কোনো অবিচ্ছিন্ন সূত্র পরম্পরা সংরক্ষিত নেই এবং এগুলিতে সকল প্রকারের বিকৃতি ঘটেছে বলে প্রমাণিত হয়েছে।

১. ৪. ২. বাইবেলের পরিবর্তিত ও অপরিবর্তিত বিধানাদি

উপর্যুক্ত বিষয়গুলি ছাড়া সাধারণ উন্মুক্ত কর্মবিষয়ক বিধানাবলি রহিত হতে পারে। আমরা স্বীকার করি যে, তোরাহ ও ইঞ্জিল বা পুরাতন ও নতুন নিয়মের কিছু কিছু উন্মুক্ত সাধারণ রহিত হওয়ার যোগ্য বিধান ইসলামী শরীয়তে বা ইসলামী ব্যবস্থায় রহিত ও স্থগিত করা হয়েছে। আমরা বলি না যে, পুরাতন ও নতুন নিয়মের সকল বিধানই রহিত হয়েছে। বরং আমরা বলি যে, তাওরাত ও ইঞ্জিলের অনেক বিধান নিশ্চিতরূপেই অপরিবর্তিত ও কার্যকর রয়েছে। যেমন একমাত্র আল্লাহর ইবাদত করা, শিরক, মূর্তিপূজা ইত্যাদি বর্জন করা, মিথ্যা শপথ, হত্যা, ব্যভিচার, সমকামিতা, চুরি, মিথ্যা সাক্ষ্য, প্রতিবেশির সম্পদ বা সম্মানের ক্ষতি করার বিষয়ে তোরাহ এর নিষেধাজ্ঞা এখনও অপরিবর্তিত ও কার্যকর রয়েছে। পিতামাতার সম্মান ও সেবার আবশ্যকতা, পিতা, পুত্র, মাতা, কন্যা, চাচা, ফুফু, মামা, খালাকে বিবাহ করার নিষেধাজ্ঞা, দুই বোনকে একত্রে বিবাহ করার নিষেধাজ্ঞা ও অনুরূপ আরো অনেক বিধান অপরিবর্তিত ও কার্যকর রয়েছে।

১. ৪. ৩. বাইবেলে বিদ্যমান রহিতকরণের প্রকারভেদ

রহিতকরণ শুধু ইসলামের বিষয় নয়। পূর্ববর্তী সকল ব্যবস্থায় ও সকল ধর্মেই রহিতকরণেরঅনেক ঘটনা ঘটেছে। রহিতকরণ দুই প্রকারের: প্রথমত, পরবর্তী ভাববাদীর ব্যবস্থায় পূর্ববর্তী ভাববাদীর কোনো ব্যবস্থা রহিত বা স্থগিত করা হবে। দ্বিতীয়ত, একই ভাববাদীর ব্যবস্থার মধ্যে একটি বিধান রহিত করে অন্য বিধান দেওয়া হবে। উভয় প্রকারের রহিতকরণই পূর্ববর্তী ভাববাদিগণের ব্যবস্থায় ঘটেছে বলে বাইবেলের পুরাতন ও নতুন নিয়মের মধ্যে আমরা দেখতে পাই। যেহেতু ইয়াহূদী-খৃস্টানগণ দাবি করেন যে, ঈশ্বরের বিধান কখনোই রহিত হতে পারে না, সেহেতু এখানে তাদের দাবির অসারতা প্রমাণের জন্য কিছু উদাহরণ পেশ করছি।

১. ৪. ৩. ১. পরবর্তী ব্যবস্থায় পূর্ববর্তী ব্যবস্থার রহিতকরণ

প্রথমে পরবর্তী নবীর শরীয়ত বা ব্যবস্থায় পূর্ববর্তী নবীর শরীয়ত বা ব্যবস্থার নাসখ বা রহিতকরণের কিছু উদাহরণ পেশ করছি:

১. ভাই-বোনের বিবাহের বৈধতা রহিত

আদম আলাইহিস সালাম-এর শরীয়তে বা ব্যবস্থায় ভাই-বোনের মধ্যে বিবাহ বৈধ ছিল। তাঁর সন্তানগণ এভাবে বিবাহ-শাদি করতেন।[94] পরে মোশির ব্যবস্থায় ভগ্নিকে বিবাহ করা কঠিনভাবে নিষিদ্ধ করা হয়। আপন ভগ্নি, বৈমাত্রেয় ভগ্নি ও বৈপিত্রেয় ভগ্নি সকল প্রকারের ভগ্নিকে বিবাহ করাই নিষিদ্ধ। এরূপ বিবাহ ব্যভিচার বলে গণ্য এবং এরূপ বিবাহকারী অভিশপ্ত। এরূপ বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ স্বামী-স্ত্রী উভয়কে হত্যা করা অত্যাবশ্যক। লেবীয় পুস্তকের ১৮ অধ্যায়ের ৯ শ্লোকে বলা হয়েছে: ‘‘তোমার ভগিনী, তোমার পিতৃকন্যা কিম্বা তোমার মাতৃকন্যা, গৃহজাতা হউক কিম্বা অন্যত্র জাতা হউক, তাহাদের আবরণীয় অনাবৃত করিও না।’’

লেবীয় ২০/১৭ শ্লোকটি নিম্নরূপ: ‘‘আর যদি কেহ আপন ভগিনীকে, পিতৃকন্যাকে কিম্বা মাতৃকন্যাকে গ্রহণ করে, ও উভয়ে উভয়ের্ আবরণীয় দেখে, তবে তাহা লজ্জাকর বিষয়; তাহারা আপন জাতির সন্তানদের সাক্ষাতে হত্যাকৃত[95] হইবে; আপন ভগিনীর আবরণীয় অনাবৃত করাতে সে আপন অপরাধ বহন করিবে।’’

দ্বিতীয় বিবরণ ২৭/২২: ‘‘যে কেহ আপন ভগিনীর সহিত, অর্থাৎ পিতৃকন্যার কিম্বা মাতৃকন্যার সহিত শয়ন করে, সে শাপগ্রস্থ।’’

এথেকে প্রমাণিত হলো যে, আদম আলাইহিস সালাম-এর ব্যবস্থায় (শরীয়তে) ভগিনীকে বিবাহ করা বৈধ ছিল। তা নাহলে প্রমাণিত হবে যে, সকল আদম-সন্তান ব্যভিচার-তুল্য বিবাহেরজারজ সন্তান এবং আদমের সন্তানগণ যারা এরূপ বিবাহ করেছিলেন তাঁরা সকলেই ব্যভিচারী ছিলেন, হত্যাযোগ্য অপরাধে অপরাধী ছিলেন এবং অভিশপ্ত ছিলেন। সঠিক কথা হলো, এরূপ বিবাহ পূর্বতন ভাববাদিগণের ব্যবস্থায় বৈধ ছিল, এরপর মোশির ব্যবস্থায় এই বৈধতা রহিতকরা হয়।

২. সকল প্রাণী ভক্ষণের জন্য বৈধ ছিল পরে তা রহিত করা হয়

আদিপুস্তকের ৯ম অধ্যায়ের ৩ শ্লোকে নোহের সন্তানদেরকে উদ্দেশ্য করে ঈশ্বর বলেন: ‘‘প্রত্যেক গমনশীল প্রাণী তোমাদের খাদ্য হইবে (Every moving thing that liveth shall be meat for you); আমি হরিৎ ওষধির (green herb) ন্যায় সে সকল তোমাদিগকে দিলাম।’’

এভাবে আমরা দেখছি যে, নোহ-এর ব্যবস্থায় সকল প্রাণীই সবুজ শাকশব্জি-ফলমুলের মত বৈধ বা হালাল ছিল। পরবর্তীকালে মোশির ব্যবস্থায় অনেক প্রাণীর বৈধতা ‘‘রহিত’’ করে সেগুলি ভক্ষণ করা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। লেবীয় পুস্তকের ১১/৪-৮ এবং দ্বিতীয় বিবরণের ১৪/৭-৮-এ  যে বিষয়ে বিস্তারিত বলা হয়েছে। এখানে দ্বিতীয় বিবরণের ১৪/৭-৮ উদ্ধৃত করছি: ‘‘(৭) কিন্তু যাহারা জাওর কাট, কিম্বা দ্বিখণ্ড খুরবিশিষ্ট, তাহাদের মধ্যে এইগুলি ভোজন করিবে না: উষ্ট্র, শশক (hare: খরগোশ) ও শাফন (coney: খরগোশ); কেননা তাহারা জাওর কাটে বটে, কিন্তু দ্বিখণ্ড খুরবিশিষ্ট নয়, তাহারা তোমাদের পক্ষে অশুচি; (৮) আর শূকর দ্বিখণ্ড খুরবিশিষ্ট বটে, কিন্তু জাওর কাটে না, সে তোমাদের পক্ষে অশুচি; তোমরা তাহাদের মাংস ভোজন করিবে না, তাহাদের শব স্পর্শও করিবে না।’’

৩. দুবোনকে একত্রে বিবাহ করা বৈধ ছিল পরে রহিত করা হয়

যাকোব (ইয়াকূব আ) লেয়া ও রাহেল নামক দু বোনকে বিবাহ করেন। এ দুইজনই ছিলেন তাঁর মামাতো বোন। আদিপুস্তকের ২৯ অধ্যায়ের ১৫-৩৫ শ্লোকে বিষয়টি স্পষ্ট বলা হয়েছে। মোশির ব্যবস্থায় দু বোনকে একত্রে বিবাহ করার বৈধতা ‘‘রহিত’’ করা হয়। লেবীয় পুস্তকের ১৮/১৮ শ্লোকে বলা হয়েছে: ‘‘আর স্ত্রীর সপত্নী হইবার জন্য তাহার জীবৎকালে আবরণীয় অনাবৃত করণার্থে তাহার ভগিনীকে বিবাহ করিও না।’’

যদি যাকোবের ব্যবস্থায় দুই বোনকে একত্রে বিবাহ করা বৈধ না হতো তা নাহলে প্রমাণিত হবে যে, যাকোবের এ বিবাহদুইটি অবৈধ ছিল এবং এ দুই স্ত্রীর সন্তানগণ সকলেই ব্যভিচার-জাত জারজ সন্তান, নাঊযু বিল্লাহ! অধিকাংশ ইস্রায়েলীয় ভাববাদীই যাকোবের এ দুই স্ত্রীর সন্তান।

৪. স্ত্রীকে তালাক দেওয়া ও অন্যত্র বিবাহ

মোশির ব্যবস্থায় বা শরীয়তে যে কোনো কারণে একজন স্বামী তার স্ত্রীকে তালাক দিতে পারেন বা বিবাহ বিচ্ছেদ করতে পারেন। তালাকপ্রাপ্তা বা পরিত্যক্তা স্ত্রী তালাকদাতা স্বামীর গৃহ থেকে বেরিয়ে গেলে অন্য যে কোনো পুরুষ তাকে বিবাহ করতে পারেন। দ্বিতীয় বিবরণের ২৪ অধ্যায়ের ১-২ শ্লোকে বলা হয়েছে: ‘‘(১) কোন পুরুষ কোন স্ত্রীকে গ্রহণকরিয়া বিবাহ করিবার পর যদি তাহাতে কোন প্রকার অনুপযুক্ত ব্যবহার দেখিতে পায়, আর সেই জন্য সে স্ত্রী তাহার দৃষ্টিতে প্রীতিপাত্র না হয়, তবে সেই পুরুষ তাহার জন্য এক ত্যাগপত্র লিখিয়া তাহার হস্তে দিয়া আপন বাটী হইতে তাহাকে বিদায় করিতে পারিবে। (২) আর সে স্ত্রী তাহার বাটী হইতে বাহির হইবার পর গিয়া অন্য পুরুষের ভার্যা হইতে পারে।’’

পক্ষান্তরে যীশুর ব্যবস্থায় একমাত্র ব্যভিচারের অপরাধ ছাড়া কোনো স্বামী তাঁর স্ত্রীকে তালাক দিতে পারে না বা পরিত্যাগ করতে পারে না। অনুরূপভাবে অন্য কোনো ব্যক্তি সে পরিত্যক্তা স্ত্রীকে বিবাহ করতে পারবে না। এইরূপ বিবাহ ব্যভিচার বলে গণ্য হবে। মথিলিখিত সুসমাচারের ৫ম অধ্যায়ের ৩১-৩২ শ্লোকে এবং  ১৯ অধ্যায়ের ৩-৯ শ্লোকে তা স্পষ্ট উল্লেখ করা হয়েছে। মোশির ব্যবস্থার গোঁড়া অনুসারী ফরীশীগণ যীশুর নিকট এ বিষয়ে আপত্তি উত্থাপন করে বলেন যে, মোশি যেখানে ত্যাগপত্র বা তালাকনামা দিয়ে স্ত্রী পরিত্যাগের বিধান দিয়েছেন, সেখানে আপনি তা নিষেধ করছেন কেন? উত্তরে যীশু বলেন: ‘‘তোমাদের অন্তঃকরণ কঠিন বলিয়া মোশি তোমাদিগকে আপন আপন স্ত্রীকে পরিত্যাগ করিবার অনুমতি দিয়াছিলেন, কিন্তু আদি হইতে এরূপ হয় নাই। আর আমি তোমাদিগকে কহিতেছি, ব্যভিচার দোষ ব্যতিরেকে যে কেহ আপন স্ত্রীকে পরিত্যাগ করিয়া অন্যাকে বিবাহ করে, সে ব্যভিচার করে; এবং যে ব্যক্তি সেই পরিত্যাক্তা স্ত্রীকে বিবাহ করে, সেও ব্যভিচার করে।’’ (মথি ১৯/৮-৯)

যীশুর এ উত্তর থেকে জানা গেল যে, এ বিধানের ক্ষেত্রে দুবার রহিতকরণঘটেছে। প্রথম যুগে এইরূপ স্ত্রী-পরিত্যাগ অবৈধ ছিল। মোশির ব্যবস্থায় সেই অবৈধতা রহিত করে তা বৈধ করা হয়। পুনরায় যীশুর ব্যবস্থায় মোশির দেওয়া বৈধতা রহিত করা হয়। মূসার আলাইহিস সালাম শরীয়তে বৈধ বিষয়টি ঈসার আলাইহিস সালাম শরীয়তে ব্যভিচারের মত পাপ বলে গণ্য হয়।

৫. মূসার আলাইহিস সালাম ব্যবস্থার সকল বিধান রহিতকরণ!

ইস্রায়েলীগণের সকল বিধিবিধান তাওরাতের মধ্যে বিদ্যমান। ইস্রায়েল-বংশের সকল নবী বা ভাববাদী এ সকল বিধান পালনের জন্য আদিষ্ট ছিলেন। এ সকল বিধানের মধ্যে রয়েছে বৈধ ও অবৈধ বা শুচি ও অশুচি প্রাণী, খাদ্য ও পানীয়ের বিধান। ঈসা আলাইহিস সালাম ইস্রায়েল বংশের একজন নবী বা ভাববাদী। তিনি মূসার আলাইহিস সালাম শরীয়ত রহিত করেন নি, বরং তিনি তার অনুসারী ছিলেন। মথিলিখিত সুসমাচারের ৫/১৭-১৮ শ্লোকের বর্ণনায় তিনি বলেন: ‘‘(১৭) মনে করিও না যে, আমি ব্যবস্থা কি ভাববাদিগ্রন্থ লোপ করিতে আসিয়াছি; আমি লোপ করিতে আস নাই, কিন্তু পূর্ণ করিতে আসিয়াছি। (১৮) আমি তোমাদিগকে সত্য কহিতেছি, যে পর্যনত আকাশ ও পৃথিবী লুপ্ত না হইবে, সেই পর্যনত ব্যবস্থার (তাওরাত বা পুরাতন নিয়মের বিধিবিধান) এক মাত্রা কি এক বিন্দুও লুপ্ত হইবে না, সমস্তই সফল হইবে।’’

ড. ফান্ডার (Carl Gottaleb Pfander) তার লেখা ‘‘মীযানুল হক্ক’’ (Scale of Truth) গ্রন্থে যীশুর এ বক্তব্যকে ভিত্তি করে বলেছেন যে, তাওরাতের কোনো বিধান নাসখ বা রহিত হতে পারে না। তিনি বলেন যে, যীশু তাওরাতের কোনো বিধান রহিত করেন নি; কারণ তিনি রহিত করতে বা লোপ করতে আগমন করেন নি, বরং পূর্ণ করতে এসেছিলেন।

কিন্তু প্রকৃত সত্য কথা এই যে, মূসা আলাইহিস সালাম-এর ব্যবস্থার সকল হারাম ও নিষিদ্ধ বিষয় সাধু পলের (Paul)-এর এক ফতোয়ায় বৈধ ও হালালে পরিণত হয়েছে। সাধু পলের ধর্মে কোনো হারাম বা অবৈধ কিছু নেই। শুধু যারা নিজেরা অপবিত্র তাদের জন্যই হালাল-হারাম বা শুচি-অশুচির ব্যবস্থা। অশুচি বা খারাপ মানুষদের জন্য হালাল বা শুচি ও পবিত্র খাদ্যও অপবিত্র। আর শুচি বা পবিত্র মানুষদের জন্য সকল প্রকার হারাম, অপবিত্র ও অশুচি বিষয়ই হালাল ও পবিত্র। সাধু পলের এ এক মহা-বিস্ময়কর ফতোয়া!

রোমীয়দের প্রতি প্রেরিত পৌলের পত্রের ১৪ অধ্যায়ের ১৪ শ্লোকটি নিম্নরূপ: ‘‘আমি জানি, এবং প্রভু যীশুতে নিশ্চয় বুঝিয়াছি, কোন বস্তুই স্বভাবত অপবিত্র নয়; কিন্তু যে যাহা অপবিত্র জ্ঞান করে, তাহারই পক্ষে তাহা অপবিত্র।’’ তীতের প্রতি প্রেরিত পত্রের ১ম অধ্যায়ের ১৫ শ্লোকে পৌল লিখেছেন: ‘‘শুচিগণের পক্ষে সকলই শুচি (Unto the pure all things are pure); কিন্তু কলুষিত ও অবিশ্বাসীদের পক্ষে কিছুই শুচি নয়; বরং তাহাদের মন ও সংবেদ (বিবেক) উভয়ই কলুষিত হইয়া পড়িয়াছে।’’

সাধু পলের এ ফতোয়া থেকে প্রমাণিত হয় যে, মূসা আলাইহিস সালাম থেকে ঈসা আলাইহিস সালাম পর্যন্ত ইস্রা্য়েল বংশের সকল নবী-ভাববাদী ও স্বয়ং যীশু কেউই পবিত্র ছিলেন না, একারণে তাঁদের ভাগ্যে এইরূপ ঢালাও বৈধতা জোটে নি। পক্ষান্তরে খৃস্টানগণ যেহেতু পবিত্রসেহেতু তাঁরা এইরূপ ঢালাও বৈধতা লাভ করলেন। তাঁদের জন্য সব কিছুই বৈধ ও পবিত্র হয়ে গেল। স্বয়ং যীশু খৃস্টও মূসা আলাইহিস সালাম-এর ব্যবস্থা রহিত করে সব কিছু হালাল করতে পারলেন না; কারণ তিনি ও তার শিষ্যরা তো পবিত্র বা শুচি হতে পারেন নি। যেহেতু সাধু পল ও তার অনুসারীরা শুচিতা অর্জন করেন সেহেতু তাদের জন্য সকল হারাম ও অপবিত্র খাদ্য ও পানীয় বৈধ ও পবিত্র হয়ে গেল। এভাবে মহামতি সাধু পল মোশির ব্যবস্থা পুরোপুরি রহিত করতে সক্ষম হলেন!

খৃস্টধর্মের প্রতিষ্ঠাতা সাধু পল এ ঢালাও বৈধতাপ্রচারের ক্ষেত্রে খুবই সচেষ্ট ছিলেন। তিনি সর্বদা প্রাণপনে তাঁর অনুসারীদের বুঝাতে চেষ্টা করতেন যে, মোশির ব্যবস্থা পুরোপুরি রহিত ও বাতিল হয়ে গিয়েছে। এজন্য তিনি তীমথিয়ের প্রতি প্রেরিত প্রথম পত্রের ৪র্থ অধ্যায়ের ১-৭ শ্লোকে লিখেছেন: ‘‘(১) … উত্তরকালে কতক লোক ভ্রান্তিজনক আত্মাদিগেতে ও শয়তানদের[96] শিক্ষামালায় মন দিয়া (giving heed to seducing spirits, and doctrines of devils) বিশ্বাস হইতে সরিয়া পড়িবে। … (৩) … এবং বিভিন্ন খাদ্যের ব্যবহার নিষেধ করে, যাহা ঈশ্বর এই অভিপ্রায়ে সৃষ্টি করিয়াছেন, যেন, যাহারা বিশ্বাসী ও সত্যের তত্ত্ব জানে, তাহারা ধন্যবাদ-পূর্ব ভোজন করে (and commanding to abstain from meats, which God hath created to be received with thanksgiving of them which believe and know the truth)। (৪) বাস্তবিক ঈশ্বরে সৃষ্ট সমস্ত বস্তুই ভাল; ধন্যবাদসহ গ্রহণ করিলে কিছুই অগ্রাহ্য নয়, (৫) কেননা ঈশ্বরের বাক্য ও প্রার্থনা দ্বারা তাহা পবিত্রীকৃত হয়। (৬) এই সকল কথা ভ্রাতৃগণকে মনে করাইয়া দিলে তুমি খৃস্ট যীশুর উত্তম পরিচারক হইবে; যে বিশ্বাসের ও উত্তম শিক্ষার অনুসরণ করিয়া আসিতেছ তাহার বাক্যে পোষিত থাকিবে। (৭) আর ধর্মবিরূপক ও জরাতুর স্ত্রীলোকের যোগ্য গল্পসকল অগ্রাহ্য কর (But refuse profane and old wives’ fables)।’’[97]

৬- মূসার আলাইহিস সালাম শরীয়তের সকল পর্ব ও দিবস রহিতকরণ

লেবীয় পুস্তকের ২৩ অধ্যায়ে যে সকল সাপ্তাহিক, মাসিক ও বাৎসরিক পর্ব পালনের বিধিবিধান প্রদান করা হয়েছে, মোশির ব্যবস্থা অনুসারে সেগুলি সবই চিরন্তন ও চিরস্থায়ী। এই অধ্যায়ের ১৪, ২১, ৩১ ও ৪১ শ্লোকে সুস্পষ্টতই উল্লেখ করা হয়েছে যে, এই পর্ববিষয়ক বিধানগুলি সর্বত্র ও সর্বদা পালনীয় চিরস্থায়ী বিধান।[98]

শনিবার (the sabbath of the LORD)-কে সম্মান করা এবং এ দিনে সকল প্রকার কাজকর্ম বন্ধ রাখা মোশির ব্যবস্থা অনুসারে একটি অলঙ্ঘনীয় চিরস্থায়ী বিধান। কেউ এ দিনে সামান্যতম কর্মও করতে পারবেন না। কেউ যদি এ দিনে কোনো প্রকারের কর্ম করেন তবে তাকে হত্যা করা অত্যাবশ্যক। পুরাতন নিয়মের পুস্তকাদির বিভিন্ন স্থানে বারংবার এই বিধান বর্ণনা করা হয়েছে এবং এর গুরুত্ব বর্ণনা করা হয়েছে। যেমন: আদিপুস্তক ২/৩; যাত্রাপুস্তক ২০/৮-১১, ২৩/১২ ও ৩৪/২১; লেবীয় ১৯/৩ ও ২৩/৩; দ্বিতীয় বিবরণ ৫/১২-১৫; যিরমিয় ১৭/১৯-২৭; যিশাইয় ৫৬/১-৮ ও ৫৮/১৩-১৪; নহিমিয় ৯/১৪; যিহিষ্কেল ২০/১২-২৪।

এ দিনে সামান্যতম কর্ম করলেই তাকে হত্যা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যাত্রাপুস্তকের ৩১/১২-১৭ ও ৩৫/১-৩ শ্লোকে। মূসার আলাইহিস সালাম সময়ে ইস্রায়েল-সন্তানগণ এক শনিবারে এক ব্যক্তিকে কাষ্ঠ সংগ্রহ করতে দেখেন। তখন তারা সেই কাষ্ঠসংগ্রহকারীকে আটক করে এবং সদাপ্রভুর নির্দেশে তাকে আবাসিক এলাকার বাইরে নিয়ে পাথর মেরে হত্যা করে। গণনা পুস্তকের ১৫ অধ্যায়ের ৩২-৩৬ শ্লোকে এ ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছে।

খৃস্টধর্মের প্রতিষ্ঠাতা মহাপুরুষ সাধু পল (পৌল) মহাশয় শনিবার-সহ তাওরাতের সকল পর্ব ও দিবস রহিত ও বাতিল করে দিয়েছেন। তিনি উল্লেখ করেছেন যে, এ সকল বিধান সবই ছিল এক প্রকারের ইঙ্গিত ও ছায়া মাত্র। কলসীয়দের প্রতি প্রেরিত পৌলের পত্রের দ্বিতীয় অধ্যায়ের ১৬ শ্লোকে তিনি লিখেছেন: ‘‘অতএব ভোজন কি পান, কি উৎসব, কি অমাবস্যা, কি বিশ্রামবার, এই সকলের সম্মন্ধে কেহ তোমাদের বিচার না করুক।’’

ডাওয়ালি ও রজারমেন্ট (G. D’Oyley and R. Mant)-এর ব্যাখ্যাগ্রন্থে (Notes, Practical and Explanatory to the Holy Bible) কতিপয় খৃস্টান পণ্ডিতের বক্তব্য উদ্ধৃত করা হয়েছে যে, ইয়াহূদীদের মধ্যে তিন প্রকারের পর্ব প্রচলিত ছিল: প্রতি বছর বছর পালিত পর্ব, প্রতি মাসে মাসে পালিত পর্ব ও প্রতি সপ্তাহে সপ্তাহে পালিত পর্ব। এ সকল পর্ব সবই রহিত হয়ে গিয়েছে। এমনকি শনিবার সাবাথ বা বিশ্রামদিন পালনও রহিত হয়ে যায়। তদস্থলে খৃস্টানদের সাবাথ (রবিবার) পালনের ব্যবস্থা করা হয়।’’

৭- খাতনা বা ত্বকচ্ছেদ বিধান রহিতকরণ

খতনা বা ত্বক্ছেদ করা (circumcision) ইবরাহীম আলাইহিস সালাম-এর শরীয়তের একটি অলঙ্ঘনীয় চিরস্থায়ী বিধান। আদিপুস্তকের ১৭ অধ্যায়ের ৯-১৪ শ্লোকে তা স্পষ্টরূপে বলা হয়েছে। কয়েকটি শ্লোক দেখুন: ‘‘(১২) পুরুষানুক্রমে তোমাদের প্রত্যেক পুত্রসন্তানের আট দিন বয়সে ত্বকচ্ছেদ হইবে। (১৩) … আর তোমাদের মাংসে-বিদ্যমান আমার নিয়ম চিরকালের নিয়ম হইবে (my covenant shall be in your flesh for an everlasting covenant)।’’

এজন্য ইবরাহীম আলাইহিস সালাম-এর দুই পুত্র ইসমাঈল আলাইহিস সালাম ও ইসহাক আলাইহিস সালাম-এর বংশধরদের মধ্যে এ বিধান প্রচলিত থাকে। মূসা আলাইহিস সালাম-এর শরীয়ত বা ব্যবস্থায়ও এ বিধান কার্যকর থাকে। লেবীয় পুস্তকের ১২ অধ্যায়ের ৩ শ্লোকটি নিম্নরূপ: ‘‘পরে অষ্টম দিনে বালকটির পুরুষাঙ্গের ত্বক্ছেদ হইবে।’’

যীশুরও ত্বক্ছেদ করা হয়েছিল। লূকলিখিত সুসমাচারের ২ অধ্যায়ের ২১ শ্লোকে তা উল্লেখ করে বলা হয়েছে: ‘‘আর যখন বালকটির ত্বকচ্ছেদনের জন্য আট দিন পূর্ণ হইল, তখন তাঁহার নাম যীশু রাখা গেল।’’ খৃস্টান সম্প্রদায়ের মধ্যে এখন পর্যন্ত যীশুর ত্বক্ছেদ দিবস উপলক্ষে নির্ধারিত প্রার্থনা রয়েছে, যা তাঁরা এই দিবসের স্মরণে পালন করেন।

যীশুর ঊর্ধ্বারোহণ পর্যন্ত তক্বচ্ছেদ বা খাতনার এ বিধান কার্যকর ছিল। যীশু এ বিধান রহিত করেন নি। কিন্তু পরবর্তীকালে প্রেরিতগণের যুগে তাঁরা এই চিরন্তনবিধানটি রহিত করেন।[99]

খৃস্টধর্মের প্রতিষ্ঠাতা সাধু পল এ বিধানটি রহিত করার বিষয়ে অত্যন্ত দৃঢ়তা ও কঠোরতা অবলম্বন করেছেন। গালাতীয় ২/৩-৫, ৫/১-৬, ৬/১১-১৬; ফিলীপিয় ৩/৩; কলসীয় ২/১১ ইত্যাদি স্থানে তিনি বারংবার খাতনা বা তক্বচ্ছেদ করতে কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন এবং খাতনা করলে আর যীশুর অনুগ্রহ পাওয়া যাবে না বলে উল্লেখ করেছেন। এখানে শুধু গালাতীয় ৫/২ ও ৬ শ্লোক উদ্ধৃত করছি। তিনি বলেন: ‘‘(২) দেখ, আমি পৌল তোমাদিগকে কহিতেছি, যদি তোমরা ত্বক্ছেদ প্রাপ্ত হও, তবে খৃস্ট হইতে তোমাদের কিছুই লাভ হইবে না। … (৬) কারণ খৃস্ট যীশুতে ত্বক্ছেদের কোন শক্তি নাই, অত্বকচ্ছেদেরও নাই; কিন্তু প্রেম দ্বারা কার্যসাধক বিশ্বাসই শক্তিযুক্ত।’’[100]

খৃস্টানগণ তাদের ধর্মগ্রন্থের এ চিরস্থায়ী বিধান, যা স্বয়ং যীশুও পালন করেছেন এবং নিষেধ বা রহিত করেন নি, সে বিধানকে সাধু পলের নির্দেশে বাতিল করে দেন এবং রহিত বলে গণ্য করেন।

৮- সাধু পলের দৃষ্টিতে তাওরাত বা পুরাতন নিয়মের মূল্য:

সাধু পল বারংবার বলেছেন যে, তাওরাত বা পুরাতন নিয়ম বাতিল, অচল, দুর্বল ও নিষ্ফল। ইব্রীয়দের প্রতি পত্রের ৭ম অধ্যায়েরই ১৮ শ্লোকটি নিম্নরূপ: ‘‘কারণ এক পক্ষে পূর্বকার বিধির দুর্বলতা ও নিষ্ফলতা প্রযুক্ত তাহার লোপ (রহিতকরণ) হইতেছে (For there is verily a disannulling of the commandment going before for the weakness and unprofitanleness thereof)।’’

বাইবেলের আরবী অনুবাদের বিভিন্ন সংস্করণের এখানে disannulling বা লোপ-এর অনুবাদে ‘‘নাসখ’’ শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। ১৮২৫, ১৮২৬ সালের আরবী বাইবেলে এ শ্লোকের অনুবাদে বলা হয়েছ: ‘‘পূর্ববতী বিধানের (পুরাতন নিয়মের) দুর্বলতা ও নিষ্ফলতার কারণে তা নাসখ বা রহিত করা হয়েছে।’’

১৬৭১, ১৮২৩ ও ১৮৪৪ সালের আরবী বাইবেলে শ্লোকটি নিম্নরূপ: ‘‘পূর্ববর্তী নিয়ম বাতিল ও অচল হয়েছে কারণ তার দুর্বল ও তার মধ্যে কোনো ফায়েদা বা উপকার নেই।’’ ১৮৮২ সালের আরবী সংস্করণে বলা হয়েছে: ‘‘পূর্ববর্তী নিয়ম আমরা প্রত্যাখ্যান করি কারণ তার দুর্বলতা ও তার মধ্যে কোনো ফায়দা বা কল্যাণ না থাকা।’’

ইব্রীয়দের প্রতি প্রেরিত পৌলের পত্রের ৮ম অধ্যায়ের ৭ ও ১৩ শ্লোক: ‘‘(৭) কারণ ঐ প্রথম নিয়ম যদি নির্দোষ হইত, তবে দ্বিতীয় এক নিয়মের জন্য স্থানের চেষ্টা করা যাইত না।… (১৩) নূতনবলাতে তিনি প্রথমটি পুরাতন করিয়াছেন; কিন্তু যাহা পুরাতন ও জীর্ণ হইতেছে, তাহা অন্তর্হিত হইতে উদ্যত (ready to vanish away)।’’

ইব্রীয়দের পত্রের ১০ অধ্যায়ের ৯ শ্লোকে সাধু পল বলেন: ‘‘তিনি প্রথম বিষয় লোপ (নাসখ) করিতেছেন, যেন দ্বিতীয় বিষয় স্থির করেন।’’

আরবী বাইবেলের কোনো কোনো সংস্করণে এখানে ‘‘নাসখ’’ (রহিত) শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে।

এ সকল বক্তব্যে সাধু পল বারংবার বলেছেন যে, তাওরাত দুর্বল, নিষ্ফল, কল্যাণবিহীন, অচল, ত্রুটিযুক্ত, পুরাতন, জরাজীর্ণ, প্রস্থান-উদ্যত, বিলুপ্ত-প্রায়, প্রায়-অচল, প্রত্যাখ্যাত এবং রহিত।

ডাওয়ালি ও রজারমেন্ট-এর ব্যাখ্যাগ্রন্থে পাবেল-এর নিম্নলিখিত বক্তব্যটি উদ্ধৃত করা হয়েছে: একথা অত্যন্ত স্পষ্ট যে, ঈশ্বর নতুন উত্তম বিধানের মাধ্যমে পুরাতন অসম্পূর্ণ বিধানকে রহিত করতে চান। এজন্যই ইয়াহূদীয় আচার-অনুষ্ঠানের বিধানাবলি বিলোপ করে সেখানে খৃস্টধর্মকে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। এগুলির মধ্যে ইঙ্গিত রয়েছে যে, ইয়াহূদীদের যজ্ঞ ও নৈবেদ্য মুক্তি ও ঈশ্বর প্রেমের জন্য যথেষ্ট ছিল না। এজন্য যীশু নিজে মৃত্যু গ্রহণ করে সেই অপূর্ণতা পূর্ণ করেছেন। তিনি একটি কর্মের মাধ্যমে অপরটি রহিত করেছেন।

উপরের আলোচনা থেকে আমরা নিম্নের বিষয়গুলি বুঝতে পেরেছি:

১-   পরবর্তী ব্যবস্থা বা ধর্মে পূর্ববর্তী ব্যবস্থা বা ধর্মের কিছু বিধিবিধান রহিত হওয়া শুধু মুসলমানদের দাবি নয় বা ইসলামের সাথে বিশেষভাবে সংশ্লিষ্ট কোনো বিষয় নয় বরং পূর্ববর্তী ধর্ম ও ব্যবস্থাগুলিতেও তা দেখতে পাওয়া যায়।

২-   তোরাহ বা পুরাতন নিয়মের সকল বিধানই খৃস্টধর্মে রহিত করা হয়েছে। পুরাতন নিয়মে যে সকল বিধান চিরস্থায়ীচিরন্তনবলে ঘোষণা করা হয়েছে সেগুলিসহ সকল ফরয দায়িত্ব, ইবাদত, শুচি-অশুচি বা হালাল-হারামের বিধান ইত্যাদি সবই সাধু পল রহিত করেছেন। তার অনুসারিগণের জন্য এ সকল বিধান পালনীয় নয় বলে তিনি ঘোষণা করেছেন।[101]

৩-   খৃস্টধর্মের প্রতিষ্ঠাতা সাধু পলের বক্তব্যের মধ্যে তাওরাতের বিধানাবলির ক্ষেত্রে নাসখবা  রহিত করাবা বিলোপ করাশব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। পরবর্তী খৃস্টান গবেষক ও ধর্মগুরুগণও এক্ষেত্রে এ সকল শব্দ ব্যবহার করেছেন।

৪-   সাধু পল দাবি করেছেন যে, পুরাতন ব্যবস্থা দুর্বল, নিষ্ফল, কল্যাণবিহীন, অচল, ত্রুটিযুক্ত, পুরাতন, জরাজীর্ণ, প্রস্থান-উদ্যত, বিলুপ্ত-প্রায়, প্রায়-অচল, প্রত্যাখ্যাত এবং রহিত। এ থেকে বুঝা যায় যে, ইসলামী শরীয়ত বা ইসলামের ব্যবস্থা দ্বারা ইয়াহূদী-খৃস্টানগণের ব্যবস্থা রহিত ও বিলুপ্ত হওয়া খুবই স্বাভাবিক বিষয়। বরং সাধু পলের বক্তব্য অনুসারে এরূপ বিলোপ সাধন জরুরী। কারণ যীশুর ব্যবস্থাটি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ব্যবস্থার ক্ষেত্রে প্রাচীন ও জীর্ণ। সর্বোপরি খৃস্টানদের প্রাণপুরুষ পল মহাশয় এবং খৃস্টান ব্যাখ্যাকার পণ্ডিতগণ তাওরাত সম্পর্কে অনেক অশালীন ও অশোভনীয় মন্তব্য করেছেন, যদিও তাঁরা তাকে ঈশ্বরের বাণী বলে বিশ্বাস করেন।

উপরের আলোচনা থেকে আমরা সুনিশ্চিতরূপে জানতে পারছি যে, কুরআনের বিধান ও ব্যবস্থা দ্বারা তাওরাত ও ইঞ্জিলের কিছু বিধান ও ব্যবস্থা রহিত হওয়া কোনো অস্বাভাবিক কিছু নয়। এরূপ রহিতকরণ, স্থগিতকরণ বা পরিবর্তন পূর্ববর্তী ভাববাদিগণের ব্যবস্থায় ঘটেছে বলে আমরা বাইবেলের আলোকে জানতে পারলাম। কুরআনের বিধান পালনের মাধ্যমে তাওরাত ও ইঞ্জিলের বিধান রহিতকরণ কার্যকর হয়।

১. ৪. ৩. ২. একই ভাববাদীর ব্যবস্থায় রহিতকরণ

রহিতকরণের দ্বিতীয় প্রকার হলো, একই নবীর ব্যবস্থার মধ্যে একটি বিধান রহিত করে অন্য বিধান দেওয়া। এর কতিপয় উদাহরণ দেখুন:

১. জবাই বা বলিদানের নির্দেশ রহিত করা

আদিপুস্তকের ২২/১-১৪ শ্লোকে বলা হয়েছে, ঈশ্বর অব্রাহামকে নির্দেশ দেন ইসহাককে[102] বলিদান করতে। তাঁরা উভয়ে যখন এ নির্দেশ পালন করতে প্রস্তুত হলেন তখন নির্দেশ কার্যকর করার আগেই তিনি তা রহিত করেন।

২. যিহিষ্কেল ভাববাদীকে দেওয়া বিধান রহিত করা:

যিহিষ্কেল ভাববাদীর পুস্তকের ৪র্থ অধ্যায়ের ১০, ১২, ১৪ ও ১৫ শ্লোক নিম্নরূপ: ‘‘(১০) তোমার খাদ্য পরিমাণপূর্বক, অর্থাৎ দিন দিন বিংশতি তোলা করিয়া ভোজন করিতে হইবে। তুমি বিশেষ বিশেষ সময়ে তাহা ভোজন করিবে। … (১২) আর ঐ খাদ্যদ্রব্য যবের পিষ্টকের ন্যায় করিয়া ভোজন করিবে, এবং তাহাদের দৃষ্টিতে মনুষ্যের বিষ্ঠা দিয়া তাহা পাক করিবে। … (১৪) তখন আমি কহিলাম, আহা, প্রভু সদাপ্রভু, দেখ, আমার প্রাণ অশুচি হয় নাই; আমি বাল্যকাল অবধি অদ্য পর্যন্ত স্বয়ং-মৃত কিম্বা পশু দ্বারা বিদীর্ণ কিছুই খাই নাই, ঘৃণার্হ মাংস কখনও আমার মুখে প্রবিষ্ট হয় নাই। (১৫) তখন তিনি আমাকে কহিলেন, দেখ, আমি মনুষ্যের বিষ্ঠার পরিবর্তে তোমাকে গোময় দিলাম, তুমি তাহা দিয়া আপন রুটি পাক করিবে।’’

এখানে ঈশ্বর প্রথমে মনুষ্যের বিষ্ঠা দিয়ে রুটি পাক করতে আজ্ঞা করেন। যিহিষ্কেল ভাববাদী অপারগতা প্রকাশ করলে পালন করার পূর্বেই তা রহিত করে মনুষ্যের বিষ্ঠার পরিবর্তে গরুর গোবর দিয়ে রুটি পাক করে খেতে নির্দেশ দিলেন।

৩. নির্ধারিত বেদিতে উৎসর্গের নির্দেশ রহিত করা:

লেবীয় পুস্তকের ১৭/১-৬ শ্লোকে মহান আল্লাহ মূসা আলাইহিস সালাম ও ইস্রায়েল-সন্তানদেরকে নির্দেশ দেন যে, সকল প্রকার জবাই-কুরবানী হবে ‘‘সমাগম-তাম্বুর দ্বারেনির্ধারিত স্থানে। যে ব্যক্তি অন্য কোনো স্থানে জবাই করবে তাকে উচ্ছিন্ন অর্থাৎ হত্যা করতে হবে।[103]

এরপর দ্বিতীয় বিবরণের এ নির্দেশ রহিত করা হয় এবং তাদেরকে যে কোনো স্থানে জবাই-কুরবানী করার অনুমতি প্রদান করা হয়।[104]

হর্ন তার ব্যাখ্যাগ্রন্থে উপর্যুক্ত শ্লোকগুলি উদ্ধৃত করার পর বলেন: এ দুই স্থানের মধ্যে বাহ্যত বৈপরীত্য রয়েছে। কিন্তু যদি এ কথা লক্ষ্য করা হয় যে, মোশির ব্যবস্থা অপরীবর্তনীয় ও স্থির ছিল না; বরং ইস্রায়েল সন্তানগণের অবস্থা অনুসারে তার মধ্যে সংযোজন ও বিয়োজন করা হতো, তবে এই বৈপরীত্যের সমাধান দেওয়া খুবই সহজ হবে। মিসর ত্যাগের ৪০তম বৎসরে প্যালেস্টাইনে প্রবেশের পূর্বে মোশি পূর্বোক্ত বিধানটি, অর্থাৎ লেবীয় পুস্তকের বিধানটি সুস্পষ্টরূপে রহিত করেন। তিনি তাঁদেরকে নির্দেশ দেন যে, তাঁরা যেখানে ইচ্ছা গোরু, মেষ ইত্যাদি বধ করতে পারবে এবং ভক্ষণ করতে পারবে।

এভাবে তিনি মূসার আলাইহিস সালাম ব্যবস্থায় নাসখ বা রহিত হওয়ার বিষয়টি বিদ্যমান থাকার কথা স্বীকার করলেন। তিনি আরো স্বীকার করলেন যে, মোশির ব্যবস্থার মধ্যে ইস্রায়েল সন্তানগণের অবস্থা অনুসারে সংযোজন ও বিয়োজন করা হতো। ইয়াহূদী-খৃস্টান পণ্ডিতগণের অবস্থা দেখলে বড় অবাক লাগে! এরূপ সংযোজন ও বিয়োজন যদি অন্য কোনো ব্যবস্থা বা ধর্মে ঘটে তবে তাঁরা তা খুব আপত্তিকর বলে মনে করেন এবং দাবি করেন যে, এইরূপ সংযোজন ও বিয়োজন দ্বারা ঈশ্বরের অজ্ঞতা প্রমাণিত হয়।[105] আর প্রকৃত সত্য হলো, মুসলিমগণ যে নাসখবা রহিতকরণে বিশ্বাস করেন তা মহান আল্লাহর একক অধিকার ও তাঁর মর্যাদার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ। পক্ষান্তরে ইয়াহূদী-খৃস্টানগণ যে ‘‘প্রকাশ পাওয়া’’ মতবাদে বিশ্বাস করেন তার দ্বারা ঈশ্বরের অজ্ঞতা প্রমাণিত হয়। ইয়াহূদী-খৃস্টান পণ্ডিতগণ এবং সাধু পল বাইবেলের বিভিন্ন স্থানে এরূপ আল্লাহর ক্ষেত্রে ‘‘প্রকাশ পাওয়া’’, অর্থাৎ প্রথম বিধানের ফলাফল জানার পরে মত পাল্টানোর কথা উল্লেখ করেছেন।

৪- লেবীয়দের সেবাদানের বয়সসীমার পরিবর্তন

গণনাপুস্তকের ৪র্থ অধ্যায়ের ৩, ২৩, ৩০, ৩৫, ৩৯, ৪৩, ও ৪৬ শ্লোকে উল্লেখ করা হয়েছে যে, সমাগম তাম্বুর (tabernacle of the congregation) কর্মচারীর বয়স কোনো মতেই ত্রিশের কম এবং পঞ্চাশের বেশি হবে না (ত্রিশ বৎসর বয়স্ক অবধি পঞ্চাশ বৎসর পর্যন্ত)।

পক্ষান্তরে এই পুস্তকেরই ৮ম অধ্যায়ের ২৪ ও ২৫ শ্লোকে বলা হয়েছে যে, তাদের বয়স ২৫ বৎসরের কম হবে না এবং ৫০ বৎসরের বেশি হবে না ( লেবীয়দের বিষয়ে এই ব্যবস্থা: পঁচিশ বৎসর ও ততোধিক বয়স্ক লেবীয়েরা সমাগম তাবুতে সেবাকর্ম করিবার জন্য শ্রেণীভুক্ত হইবে..)।

একই পুস্তকে দু প্রকারের বিধান। এখানে ইয়াহূদী-খৃস্টানগণকে দুটি বিষয়ের একটি স্বীকার করতেই হবে। হয় একে ভুল ও বৈপরীত্য মেনে নিয়ে স্বীকার করতে হবে যে, বাইবেলের মধ্যে বিকৃতি ঘটেছে। অথবা একে ‘‘নাসখ’’ বা রহিতকরণ বলে মেনে নিয়ে স্বীকার করতে হবে যে, একই ভাববাদীর ব্যবস্থায় বিবর্তন ও রহিতকরণ ঘটতে পারে।

৫- হিষ্কিয়ের বয়স বিষয়ক সিদ্ধান্ত পরিবর্তন ও রহিতকরণ

২ রাজাবলির ২০/১-৬ শ্লোকে বলা হয়েছে যে, মহান আল্লাহ যিশাইয় ভাববাদীকে নির্দেশ দেন যে, তিনি যিহূদা রাজ্যের রাজা হিষ্কিয়কে তার আয়ু শেষ হয়ে যাওয়ার বিষয়টি জানিয়ে দিবেন, যেন রাজা তার পরিবারকে মৃত্যুকালীন ওসীয়ত করতে পারেন। আয়ু শেষ হওয়ার খবর পেয়ে রাজা হিষ্কিয় অনেক কাঁদাকাটি ও প্রার্থনা করেন। এতে আল্লাহ তার আয়ুর বিষয়ে সিদ্ধান্ত পাল্টে তার আয়ু বৃদ্ধি করার সিদ্ধান্ত নেন এবং যিশাইয় ভাববাদী ফিরে নগরের মধ্যস্থানে পৌঁছানোর আগেই তাকে নির্দেশ দেন বিষয়টি রাজাকে জানিয়ে দিয়ে তিনি যেন রাজাকে বলেন, আল্লাহ বলেছেন: ‘‘আমি তোমার প্রার্থনা শুনিলাম, আমি তোমার নেত্রজল দেখিলাম; দেখ, আমি তোমাকে সুস্থ করিব; তৃতীয় দিবসে তুমি সদাপ্রভুর গৃহে উঠিবে। আর আমি তোমার আয়ূ পনের বৎসর বৃদ্ধি করিব…।’’

এখানে ঈশ্বর যিশাইয় ভাববাদীর মুখে হিষ্কিয় রাজাকে নির্দেশ দিলেন, তুমি আপন বাটীর ব্যবস্থা কর; কারণ তুমি মারা যাচ্ছ। এরপর যিশাইয় ভাববাদী এই আজ্ঞা যথাস্থানে পৌঁছে দিয়ে তাঁর নিজ বাড়ি পৌঁছানোর আগেই তিনি তাঁর এই আজ্ঞা রহিত করলেন এবং হিষ্কিয়ের আয়ু পনের বৎসর বৃদ্ধি করলেন। রহিত বিধান ও রহিতকারী নতুন বিধান উভয়ই একই ভাববাদীর দ্বারা প্রচার করা হলো।

৬- যীশুর ধর্ম শুধু ইস্রায়েলীদের জন্য না সকলের জন্য

মথিলিখিত সুসমাচারের দশম অধ্যায়ে বলা হয়েছে: ‘‘(৫) এই বারো জনকে যীশু প্রেরণ করিলেন, আর তাঁহাদিগকে এই আদেশ দিলেন- (৬) তোমরা পরজাতিগণের পথে যাইও না, এবং শমরীয়দের কোন নগরে প্রবেশ করিও না; বরং ইস্রায়েল-কুলের হারান মেষগণের কাছে যাও।’’

মথিলিখিত সুসমাচারের ১৫ অধ্যায়ের ২৪ শ্লোকে যীশু তাঁর নিজের বিষয়ে বলেছেন: ‘‘ইস্রায়েল-কুলের হারান মেষ ছাড়া আর কাহারও নিকটে আমি প্রেরিত হই নাই।’’

এ সকল শ্লোকের নির্দেশনা অনুসারে যীশু খৃস্টের মিশন ছিল শুধু ইস্রায়েল সন্তানদের জন্যই, আর কারো জন্য নয়। কিন্তু মার্কের সুসমাচারের ১৬ অধ্যায়ের ১৫ শ্লোকে যীশুর নিম্নোক্ত বক্তব্য উদ্ধৃত করা হয়েছে: ‘‘তোমরা সমুদয় জগতে যাও, সমস্ত সৃষ্টির নিকটে সুসমাচার প্রচার কর।’’

এখানে হয় বৈপরীত্য, নয় রহিতকরণ স্বীকার করতে হবে। খৃস্টান প্রচারকগণ দাবি করেন যে, দ্বিতীয় বক্তব্যটি যীশুর ধর্মের সার্বজনীনতা প্রমাণ করে। তাহলে মানতে হবে যে, প্রথম নির্দেশটি নাসখবা রহিত হয়ে গিয়েছে। প্রথমে যীশু তার ধর্মকে শুধু ইস্রায়েল-সন্তানদের জন্য নির্দিষ্ট করলেন এবং অন্য কাউকে দীক্ষা দিতে নিষেধ করলেন। এরপর এ নির্দেশ রহিত করে সবাইকে দীক্ষা দিতে নির্দেশ দিলেন।

এখন তাঁরা যদি আল্লাহর নির্দেশের পরিবর্তন ও রহিত হওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেন তাহলে আমাদের দাবি প্রমাণিত হলো। আমরা প্রমাণ করতে সক্ষম হলাম যে, তাদের ধর্মগ্রন্থগুলির অনেক বিধান রহিত হয়েছে এবং তাদের ধর্মের বিধান বা ধর্মগ্রন্থের বিধান রহিত হওয়া কোনো অবাস্তব বা অসম্ভব বিষয় নয়। আর তারা যদি ‘‘রহিতকরণ’’ বা পরিবর্তন মানতে রাজি না হন তাহলে তাদেরকে স্বীকার করতে হবে যে, তাদের ইঞ্জিল বা সুসামাচারগুলির মধ্যে বিকৃতি ঘটেছে এবং বিকৃতির কারণে বৈপরীত্য বা পরস্পর বিরোধী বক্তব্য এতে স্থান পেয়েছে। এখানে প্রকৃত সত্যকথা হলো, মার্কের সুসমাচারের এ বক্তব্যটি ঈসা আলাইহিস সালাম-এর নয়।

উপরের আলোচনা থেকে আমরা নিশ্চিতরূপে জানতে পেরেছি যে, উভয় প্রকারের রহিতকরণই পুরাতন ও নতুন নিয়মের মধ্যে বিদ্যমান। এ বিষয়ে আর কোনো সন্দেহের অবকাশ থাকতে পারে না। ঈশ্বরের ধর্মীয় বিধান বা ব্যবস্থায় কোনোরূপ পরিবর্তন, বিলোপ বা রহিতকরণ সম্ভব নয় বলে ইয়াহূদী-খৃস্টান পণ্ডিতগণ যে দাবি করেন তা যে একেবারে ভিত্তিহীন, বাতিল ও অসত্য দাবি তা উপরের আলোচনা থেকে প্রকাশ পেয়েছে।

আর পরিবর্তন বা রহিতকরণ-এর বিদ্যমানতাই তো বিবেক ও যুক্তির দাবি। পরিবর্তন ছাড়া কিভাবে সম্ভব? স্থান ও কাল ও পাত্রে পরিবর্তনের কারণে মানুষের প্রয়োজনের পরিবর্তন হয়। কোনো কোনো বিধান বা আজ্ঞা বিশেষ সময়ে বিশেষ মানুষদের পক্ষে পালন করা সম্ভব এবং অন্য সময়ে অন্য মানুষদের জন্য অসম্ভব হতে পারে। কোনো কোনো আজ্ঞা কিছু মানুষের জন্য পালনযোগ্য ও অন্যদের জন্য পালনের অযোগ্য হতে পারে। মানুষের প্রকৃত কল্যাণ কিসে তা মানুষ অনেক সময় পুরোপুরি অনুধাবন করতে পারে না, বরং মহান আল্লাহই তা ভাল জানেন।

ইয়াহূদী-খৃস্টানগণ আল্লাহর বিধানের নাসখ, রহিতকরণ বা পরিবর্তন অসম্ভব বলে যে দাবি করেন তা তাদের ধর্মগ্রন্থের আলোকেই ভিত্তিহীন ও সত্যের বিপরীত বলে আমরা সহজেই বুঝতে পারছি।

 

 

[1] গোড়া থেকেই খৃস্টানগণ বিভিন্ন দল-উপদলে বিভক্ত। মধ্যযুগে ইউরোপে ভ্যাটিকানের পোপের নিয়ন্ত্রিত রোমান ক্যথলিকমতবাদ প্রতিষ্ঠিত ছিল। বর্তমান যুগেও খৃস্টানদের মধ্যে এই মতই সর্বাধিক প্রচলিত। ষষ্ঠদশ শতকে মার্টিন লুথার: Martin Luther (১৪৮২-১৫২৯ খৃ) পোপের আধিপত্য, অত্যাচার ও ধর্মীয় অনাচারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেন। ক্রমান্বয়ে তাঁর অনুসারীর সংখ্যা বাড়তে থাকে। এরা প্রটেস্টান্ট নামে পরিচিত। ধর্মবিশ্বাস প্রায় একই, তবে এরা রাষ্ট্র, ব্যক্তি বা ধর্মের উপর পোপের কতৃত্ব মানেন না। রাজনৈতিক কারণেই ইংল্যান্ডের রাজারা প্রটেস্টান্ট মত গ্রহণ করেন। উনবিংশ শতকের শুরুতে মূলত ইংল্যান্ডের প্রটেস্টান্ট খৃস্টানদের মিশনারীরাই ভারতে কাজ করছিল। এজন্য গ্রন্থকার এদের বিভ্রান্তি প্রমাণের জন্য তাদের পন্ডিতদের গ্রন্থের উদ্ধৃতি দিয়েছেন। (অনুবাদক। এখানে উল্লেখ্য যে, এ গ্রন্থের সকল পাদটীকা অনুবাদকের পক্ষ থেকে সংযোজিত।)

[2] প্রথম খৃস্টীয় শতাব্দীর (৩৭-৯৫ খৃ) প্রসিদ্ধতম ইহূদী ঐতিহাসিক যোসেফাস (Flavius Josephus) বাইবেলের পুরাতন নিয়ম বা ইহূদী বাইবেলের গ্রন্থের বর্ণনায় বলেন: আমাদের পবিত্র ঐশ্বরিক গ্রন্থাবলীর সংখ্যা ২২টি। তন্মধ্যে ৫টি মোশির। পরবর্তী নবীগণের লেখা গ্রন্থ ১৩টি। বাকি চারটি গ্রন্থ ঈশ্বরের বন্দনায় গীত সঙ্গীত ও অনুরূপ বিষয়ের সংকলন। যোসেফাস-এর বক্তব্য দেখুন: Eusebius Pamphilus, The Ecclesiastical History, page 97, 244-245.

[3] তিনি সম্ভবত ইউশা‘ ইবন নূন। যার কথা হাদীসে বর্ণিত হয়েছে।

[4] (Job) বা ইয়োব আরবীতে আইঊব। এই গ্রন্থটি আইঊব (আর) এর নামে প্রচারিত।

[5] ইউনূস (আ)।

[6] আরবীতে যাকারিয়া।

[7] অর্থাৎ তাদের মতে। [সম্পাদক]

[8] এখানে উল্লেখ্য যে, খৃস্টানদের প্রধান দল রোমান ক্যাথলিক খৃস্টানদের নিকট এই সন্দেহযুক্ত গ্রন্থগুলিও বিশুদ্ধ বলে গৃহীত। এজন্য রোমান ক্যথলিক বাইবেলে (RCV: Roman Catholic Version/ Douay) পুরাতন নিয়মের গ্রন্থ সংখ্যা ৪৬। বাইবেলের প্রাচীন সংস্করণে এসকল গ্রন্থ বিদ্যমান ছিল। প্রোটেস্ট্যান্টরা ১৭শ শতাব্দীতের এগুলি মুছে দিয়ে তাদের বাইবেল মুদ্রণ করে। এজন্য প্রোটেস্ট্যান্টদের বাইবেলে (AV: Authorised Version/ KJV: King James Version) পুরাতন নিয়মের গ্রন্থাবলীর সংখ্যা ৩৯। রোমান ক্যাথলিকগণ যদিও মনে করেন যে, প্রোটেস্ট্যান্টগণ ইশ্বরের বাণীবাদ দিয়েছে, কিন্তু তারা বর্তমানে প্রটেস্টান্ট বাইবেলই প্রচার করেন। এখানে আরো উল্লেখ্য যে, বাইবেলের নতুন নিয়মের গ্রন্থাবলীর মধ্যে এসকল মুছে ফেলা গ্রন্থগুলির পরোক্ষ উদ্ধৃতি পাওয়া যায়। দেখুন: (The New Encyclopedia Britannica, 15th Edition, Vol-2, Biblical Literature, pp883, 932-935).

[9] এভাবে প্রটেস্টান্টদের প্রচারিত ইংরেজী অথরাইযড বাইবেলেএর নাম (The Gospel According To St. Matthew)। পক্ষান্তরে রোমান ক্যাথলিক বাইবেলে এর নাম (The Holy Gospel of Jesus Christ According to St. Matthew)। কিন্তু বাংলায় এর অনুবাদ করা হয়েছে মথিলিখিত সুসমাচার। আবার বাইবেল সোসাইটি প্রচারিত ইঞ্জিল শরীফ’-এ এর অনুবাদ করা হয়েছে প্রথম খন্ড: মথি। এ দুই অনুবাদই ধোঁকাপূর্ণ।  মূল নামের অনুবাদ হবে মথির মতানুসারে যীশু সুসমাচার। ঈসা (আ) একটি সুসমাচার বা ইঞ্জিল প্রচার করেছিলেন বলে সকলেই জানত। তবে কারো কাছেই এর কোনো কপি ছিল না। তাঁর তিরোধানের প্রায় শতবৎসর পরে অনেক মানুষ সুসমাচারলিখে প্রচার করেন যে, এটি ঈসা (আ) এর সুসমাচার। এজন্য এগুলির এইরূপ নামকরণ করা হয়। অর্থাৎ নাম করা হয় অমুকের মতানুসারে এ-ই হলো সুসমাচার’, সঠিক সুসমাচার কোনটি তা কেউ জানে না। এই বিষয়টি চাপা দেওয়ার জন্যই তারা সঠিক অনুবাদ না করে জালিয়াতি করেছেন।  বাকী সুসমাচারগুলিরও একই অবস্থা। আমরা অনুবাদে তাদের ব্যবহৃত পরিভাষাই ব্যবহার করেছি।

[10] নতুন নিয়মের সন্দেহজনক গ্রন্থাবলী সম্পর্কে দেখুন, (The New Encyclopedia Britannica, 15th Edition,Vol-2, Biblical Literature, New Testament Apocrypha, p 973).

[11] (Constantine the Great) ২৮৮ খৃস্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন। ৩১২ খৃস্টাব্দে রোমের একচ্ছত্র শাসকে পরিণত হন। খৃস্টধর্মের শুরু থেকে ৩১২ খৃস্টাব্দ পর্যন্ত রোমের সম্রাটগণ খৃস্টানধর্মকে রাষ্ট্র বিরোধী বলে গণ্য করতেন এবং খৃস্টানদের উপর অত্যাচার করতেন। ৩১৩ খৃস্টাব্দে কন্সটান্টাইন মিলান ঘোষণা’ (Edict of Milan) এর মাধ্যমে খৃস্টধর্মকে স্বীকৃতি প্রদান করেন। এতদিন খৃস্টধর্ম একটি গোপনধর্ম বলে গণ্য ছিল। এখন খৃস্টানগণ প্রকাশ্যে ধর্মমত প্রকাশ ও পালন করতে শুরু করেন। এখন তাদের মধ্যকার এতদিনের বিরোধিতাগুলি প্রকাশ পায়। বিশেষত, একত্ববাদ, ত্রিত্ববাদ, যীশুর ঈশ্বরত্ব, বাইবেলের গ্রন্থ বা যীশুর সুসমাচার হিসাবে প্রচারিত বিভিন্ন গ্রন্থের গ্রহণযোগ্যতা ইত্যাদি বিষয়ে তাদের মধ্যকার মতভেদ প্রকট হয়ে দেখা দেয়। তখন পৌত্তলিক সম্রাট কন্সটান্টাইনের নির্দেশে ও তার ব্যক্তিগত তত্ত্বাবধানে খৃস্টান ধর্মগুরুগণ ৩২৫ সালে নিসিয়া সম্মেলন সমবেত হন। ৩৩৭ খৃস্টাব্দে মৃত্যুর কিছু পূর্বে সম্রাট কন্সট্যান্টাইন খৃস্টধর্ম গ্রহণ করেন।

[12]  কেউ এগুলির একটি শব্দ বা বাক্য সম্পর্কে সন্দেহ করলে বা এর কোনো অর্থে বিপরীত কথা সাহিত্য, দর্শন, বিজ্ঞান বা ভূগোলের নামে বললে তাকে জীবন্ত আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করা হতো বা অনুরূপ কঠিন শাস্তি প্রদান করা হতো।

[13] অর্থাৎ ভাববাদী থেকে গ্রন্থটি কে বা কারা লিখিত পাণ্ডুলিপি ও মৌখিক শ্রুতির মাধ্যমে শিক্ষা গ্রহণ করেছেন, তাদের থেকে গ্রন্থটি কে বা কারা শিক্ষা গ্রহণ করেছেন তার স্পষ্ট বর্ণনা থাকবে এবং সূত্রে উল্লিখিত ব্যক্তিবর্গ সুপরিচিত ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব হিসাবে প্রসিদ্ধ হবেন, যাদের বুদ্ধি, বিশ্বস্ততা, সততা ও ধার্মিকতা হবে প্রশ্নাতীত।

[14] ২ রাজাবলি ২২/৩-১১; ২ বংশাবলি ৩৪/১৪-১৯।

[15] বিস্তারিত দেখুন, ঐতিহাসিক অভিধান, পৃষ্ঠা ১০-১১, James Hastings, Encyclopedia of Religion and Ethics, Volume 7, page 449.

[16] যিহোশূয়ের পুস্তক ৮/৩০-৩২।

[17] পীনহস ও ইলিয়াসরের পরিচয় দেখুন: ১ বংশাবলী ৬/৩-৪।

[18] যিরমিয় ভাববাদী খৃস্টপূর্ব ৬ষ্ঠ শতকের মানুষ। আর মোশির শিষ্য যিহোশূয়ের সময়কাল নিয়ে ইহূদী-খৃস্টান পন্ডিতদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। মোশির মৃত্যুর পরে খৃস্টপূর্ব ১৬শ, ১৫শ বা ১৩শ শতকে তিনি ইহূদীদের নেতৃত্ব প্রদান করেন। উভয়ের মধ্যে ৭, ৮ বা ৯ শতকের ব্যবধান।

[19] ১৯৫২ খৃস্টব্দে মুদ্রিত বাইবেলের (RSV) -এ মার্কলিখিত সুসমাচারের এই শেষ বা ১৬তম অধ্যায়টির ১-৮ শ্লোক রাখা হয়েছে এবং অবশিষ্ট ৯-২০ শ্লোক বাদ দেওয়া হয়েছিল পরবর্তীতে আবার সেগুলি সংযোজিত করা হয়েছে। বিস্তারিত দেখুন, Ahmed Deedat, The Choice, Vol-2 (Is The Bible God’s Word?) page 80-97.

[20] এর পরের শ্লোকটি (যোহন ২১/২৫) নিম্নরূপ: ‘‘যীশু আরও অনেক কর্ম করিয়াছেন। সে সকল যদি এক এক করিয়া লেখা যায়, তবে আমার বোধ হয়, লিখিতে লিখিতে এত গ্রন্থ হইয়া উঠে যে, জগতেও তাহা ধরে না।’’ এ দু শ্লোকের মাধ্যমে এ সুসমাচারের ইতি টানা হয়েছে। এখানে এ শ্লোকের আমার’ (I) ও উপরের শ্লোকের আমরা’ (We) এর সাথে সেই শিষ্য… তাহার.. ইত্যাদির তুলনা করলে আমরা বুঝতে পারি যে, সেই শিষ্য বলতে যোহনকে বুঝানো হয়েছে। যোহনের কথার ভিত্তিতে অন্য কেউ এ গসপেল বা সুসমাচারটি রচনা করেছেন এবং সুসমাচারের শেষে বিষয়টি বর্ণনা করে এর ইতি টেনেছেন।

[21] (Irenaeus) দ্বিতীয় খৃস্টীয় শতকের প্রখ্যাত খৃস্টান। তিনিই সর্বপ্রথম খৃস্টানধর্মকে একটি কেতাবী ধর্ম হিসাবে রূপ প্রদানের চেষ্টা করেন। এরপূর্বে খৃস্টান ধর্মপ্রচারক ও ধমগুরুগণ মূলত ইহূদীদের ধর্মগ্রন্থ বা পুরাতন নিয়মের গ্রন্থগুলিকেই নিজেদের ধর্মীয় গ্রন্থরূপে মেনে চলতেন। যীশুর শিক্ষা মৌখিক প্রচার করা হতো, যদিও কিছু কিছু শিক্ষা, গসপেল, চিঠি ইত্যাদি তাদের মধ্যে বিক্ষিপ্তভাবে প্রচলিত ছিল। তিনিই প্রথম ২০০ খৃস্টাব্দের দিকে প্রথম তিনটি গসপেলের (মথি, মার্ক ও লূক) কথা উল্লেখ করেন। সর্বপ্রথম তার কথা থেকেই এই তিনটি গসপেলের অস্তিত্বের কথা জানা যায়। এরপর ২১৬ খৃস্টাব্দে ক্লিমেন্ট ইসকাদ্রিয়ানূস (Clement of Alexandira) এই তিনটি গসপেলের কথা উল্লেখ করেছেন। দেখুন: Oxford Illustrated History of Christianity, New York, Oxford University Press, 1990, page 30-31. তারিখ কানীসাতিল মাসীহ, পৃষ্ঠা ৪৫।

[22] Philosopher Celsus, an influential 2nd-century Platonist of Alexandria and perhaps the first serious critic of Christianity. Microsoft ® Encarta ® 2008. © 1993-2007. Article Origen, Contra Celsum (Against Celsus)

[23] খৃস্টান গবেষকগণ প্রায় সকলেই একমত যে, মথি, মার্ক ও লূকের সুসমাচারের উৎস মূল একটি সংক্ষিপ্ত সুসমাচার। যাতে বিস্তারিত ঘটনাবলি কিছুই ছিল না। শুধু যীশুর বক্তব্যসমূহ তাতে সংকলিত ছিল। হারিয়ে যাওয়া এই মূল সুসমাচারটিকে খৃস্টান গবেষকগণ কিউ’ (Q) বলে অভিহিত করেন। জার্মান (Quelle) শব্দ থেকে এই কিউঅক্ষরটি নেওয়া হয়েছে। এর অর্থ (source) বা উৎস। এতে ইস্টার, প্যাশন ইত্যাদি কিছুই ছিল না। যেহেতু এতে শুধু যীশুর বচন সংকলন করা হয়েছিল এজন্য গবেষকগণ একে (Logia) বলে অভিহিত করেন। দেখুন: The New Encyclopedia Britannica, 15th Edition, Vol-10, Jesus Christ, p 146.

[24] খৃস্টান পন্ডিতগণ অনেক সময় সুসমচারগুলির বিশুদ্ধতার প্রমাণ হিসেবে বলেন যে, ১০৪ খৃস্টাব্দে মৃত রোমের বিশপ ক্লীমেন্ট (Clement) ও ১০৭ খৃস্টাব্দে নিহত এন্টিয়কের দ্বিতীয় বিশপ ইগনাটিয়াস (Ignatius)-এর চিঠিপত্রের মধ্যে দু-একটি বাক্য রয়েছে, যে বাক্যগুলি এ সকল সুসমাচারের মধ্যে বিদ্যমান। এতে প্রমাণিত হয় যে, এ সকল সুসমাচার তাদের মধ্যে বিদ্যমান ছিল। বড় উদ্ভট প্রমাণ! তারা কখনোই এ সকল সুসমাচারের নাম উল্লেখ করেন নি, এগুলি থেকে উদ্ধৃতি দিয়েছেন তাও বলেন নি। সর্বপ্রথম এ সকল সুসমাচারের ‘‘নাম’’ শুনা যায় দ্বিতীয় শতাব্দীর শেষে। আরিনূস (১৩০-২০০খৃ)-এর লিখনিতে সর্বপ্রথম প্রথম তিন সুসমাচারের উল্লেখ পাওয়া যায়। কিন্তু এ ‘‘উল্লেখ’’ বর্তমানে বিদ্যমান সুসমাচারের বিশুদ্ধতার প্রমাণ নয়। তার এবং পরবর্তীদের কথা থেকে বুঝা যায় যে, দ্বিতীয় শতকের শেষে এ নামে কয়েকটি পুস্তক প্রচারিত ছিল। এমন একজন ব্যক্তির অস্তিত্বও পাওয়া যায় না যিনি বলেছেন যে, মথি, মার্ক, লূক, যোহন, পিতর, যাকোব বা অমুক… এ সুসমাচারটি বা পত্রটি লিখেছেন, অমুক ব্যক্তি তার নিকট থেকে পূর্ণ সুসমাচারটি বা পত্রটি শুনেছিলেন বা পড়ে নিয়েছিলেন, তাঁর নিকট থেকে অমুক ব্যক্তি তা পড়েছিলেন, শুনেছিলেন বা অনুলিপি তৈরি করেছিলেন… তার নিকট থেকে আমি তা শুনেছি বা অনুলিপি তৈরি করেছি। প্রায় ২০০ বৎসর পর্যন্ত এরূপ কোনো সূত্র পরম্পরা নতুন নিয়মের কোনো একটি পুস্তক বা পত্রেরও নেই। প্রায় দুই শতাব্দী পরে এসে বলা হচ্ছে যে, এই সুসমাচারটি মথির লেখা, এই সুসমাচারটি মার্কের লেখা…. ইত্যাদি। তিনি আদৌ লিখেছেন কিনা, লিখলে কতটুকু লিখেছিলেন তা কিছুই জানা যাচ্ছে না। বড় অবাক লাগে যে, প্রথম যুগের খৃস্টানগণ সবচেয়ে অবহেলা করেছেন তাদের ধর্মগ্রন্থের প্রতি। প্রথম দুই শতাব্দীতে প্রথম দুই তিন প্রজন্মের খৃস্টানগণ অনেক কষ্ট ও ত্যাগ স্বীকার করে বিভিন্ন দেশে যীশুর বাণী ও বিশ্বাস প্রচার করেছেন, কিন্তু কেউই যীশুর শিক্ষা বা সুসমাচারের কোনো লিখিত রূপ সংরক্ষণ করেন নি বা সাথে রাখেন নি। সবাই যা শুনেছেন বা বুঝেছেন তাই নিজের মনমত প্রচার করেছেন। প্রথম শতাব্দীর মধ্যেই যিরুশালেম, রোম, আলেকজেন্দ্রিয়া, এন্টিয়ক ইত্যাদি এশিয়া, আফ্রিকা ও ইউরোপের বিভিন্ন স্থানে খৃস্টান চার্চ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, বিশপ নিযুক্ত হয়েছে। স্বভাবতই প্রত্যেক চার্চে অন্তত কয়েক কপি সুসমাচারথাকার কথা ছিল, প্রত্যেক খৃস্টানের নিকট না হলেও হাজার হাজার খৃস্টানের মধ্যে অনেকের কাছেই ধর্মগ্রন্থ থাকার কথা ছিল। কিন্তু প্রকৃত বিষয় ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। এ সকল বিশপের অনেকের অনেক চিঠি বা বই এখনো সংরক্ষিত আছে। তাতে অনেক উপদেশ রয়েছে। কিন্তু তাতে এ সকল সুসমাচারের কোনো উল্লেখ নেই। ২০০ বৎসর পর্যন্ত কোনো চার্চে কোনো সুসমাচার সংরক্ষিত রাখা বা পঠিত হওয়া তো দূরের কথা এগুলির কোনো উল্লেখই পাওয়া যায় না। এ সময়ের মধ্যে অনেকেই অনেক কথা বলেছেন, অনেক কথা লিখেছেন, সবই ব্যক্তিগত পর্যায়ে ছিল। কেউই তাকে ঐশ্বরিক প্রেরণা নির্ভর বলে মনে করেন নি। নইলে প্রথম শতকের শেষভাগে মথি, মার্ক, লূক বা যোহন তার সুসমাচার লিখে সকল বিশপের নিকট পাঠিয়ে দিতে পারতেন এই বলে যে, ইশ্বরের প্রেরণায় আমি এই সুসামাচর লিখলাম। একে মান্য করতে হবে।… কখনোই তারা তা করেন নি। ৩০০ বৎসর পরে এ সব অগণিত পুস্তকের মধ্য থেকে তৎকালীণ ধর্মগুরুগণ নিজেদের মর্জি মাফিক কিছু পুস্তক পছন্দ করে তাকে বিশুদ্ধ বা ক্যাননিক্যাল বলে মর্যাদা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন।

[25] বৈপরীত্য বলতে লেখক বুঝাচ্ছেন পরস্পর-বিরোধিতা। বাইবেলের এক গ্রন্থে বর্ণিত বিধান বা তথ্যের সাথে অন্য কোনো গ্রন্থে বর্ণিত বিধান বা তথ্যের মধ্যে অনেক বৈপরীত্য ও পরস্পরবিরোধিতা পাওয়া যায়। এমনকি একই গ্রন্থের বিভিন্ন অধ্যায়ের মধ্যে বা একই গ্রন্থের একই অধ্যায়ের মধ্যে লিখিত তথ্যও অনেক সময় পরস্পর বিরোধী। এছাড়া বাইবেলের বিভিন্ন সংস্করণ, অনুবাদ ইত্যাদির মধ্যেও বৈপরীত্য ও পরস্পর বিরোধিতা দেখতে পাওয়া যায়। মূল গ্রন্থে গ্রন্থকার উদাহরণ হিসাবে ১২৫টি বৈপরীত্য উল্লেখ করেছেন। প্রদত্ত তথ্যের বা বিধানের শুদ্ধতা বা বিশুদ্ধতা এখানে বিচার করা হয় নি। শুধু বাইবেলের একাধিক স্থানে, সংস্করণে বা অনুবাদে প্রদত্ত তথ্যের তুলনা করে পরস্পর-বিরোধিতা ও বৈপরীত্য প্রমাণ করা হয়েছে।

অপরদিকে ভুলভ্রান্তি বলতে লেখক বুঝাচ্ছেন যে বাইবেলে প্রদত্ত অগণিত তথ্য ইতিহাস, বাস্তবতা বা নিরীক্ষার মাধ্যমে ভুল বলে প্রমাণিত হয়েছে। মূল গন্থে গ্রন্থকার বাইবেলের মধ্যে প্রদত্ত এইরূপ ভুলভ্রান্তির ১১০টি উদাহরণ উল্লেখ করেছেন।

[26] দায়ূদের নির্দেশে তার সেনাপতি যোয়াব লোকসংখ্যা গণনা করেন। দায়ূদ ও শলোমনের পরে প্যালেস্টাইনে ইহূদীদের রাজ্য বিভক্ত হয়ে যায়। উত্তর প্যালেস্টাইনের রাজ্যকে শামেরা বা ইস্রাইল রাজ্য বলা হতো। এর রাজধানী ছিল নাবলুস। আর দক্ষিণ প্যালেস্টাইনের রাজ্যকে যিহূদা রাজ্যবলা হতো। এর রাজধানী ছিল যিরুশালেম। এখানে উভয় অংশের লোকগণনার কথা বলা হয়েছে।

[27] কেরির বাংলা বাইবেলে এ পঙক্তির অনুবাদ নিম্নরূপ: তিনি এককালে নিহত আটশত লোকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করিতেছিলেন।

[28]  কেরির বাংলা বাইবেলের অনুবাদ নিম্নরূপ: ‘‘তিনি তিন শত লোকের উপর আপন বড়শা চালাইয়া তাহাদিগকে এককালে বধ করিয়াছিলেন।’’

[29]  কেরির অনুবাদে প্রথম শ্লোকে অশ্বশালা ও দ্বিতীয় শ্লোকে ঘর লেখা হয়েছে, যদিও উভয় শ্লোকেই ইংরেজীতে (stalls of horses) বলা হয়েছে।

[30] যীশুর সুদীর্ঘ বংশতালিকার একটি সাথে আরেকটির কোনো মিল নেই। প্রথমে যোশেফ ও শেষে দায়ূদ এই দুইটি নামে মিল আছে। আর মধ্যস্থানে সরুববাবিল ও শল্টীয়েলের নাম উভয় তালিকাতেই আছে। তবে নামের অবস্থান সম্পূর্ণ ভিন্ন। মথির বর্ণনায় শল্টীয়েল যীশুর ১৩তম ঊর্ধ্বপুরুষ। আর লূকের বর্ণনায় শল্টীয়েল যীশুর ২২তম ঊর্ধ্বপুরুষ। ১ বংশাবলি ৩/১৫-১৯ থেকে জানা যায় যে, দায়ূদের বংশধর রাজা যোশিয়ের পুত্র যিহোয়াকীম, তার পুত্র যিকনিয়। যিকনিয়ের ৭ পুত্রের মধ্যে একপুত্র শল্টীয়েল এবং অন্য পুত্র পদায়। এই পদায়ের পুত্র সরুববাবিল, তার দুই পুত্র মশুল্লম ও হনানিয়, আর এক কন্যা শালোমীৎ। তাহলে শল্টীয়েল সরুববাবিলের চাচা। মথি থেকে জানা যায় যে, রাজা যিকনিয় ও তার ভাইগণ রাজা যোশিয়ের পুত্র। যিকনিয়-এর পুত্র শল্টীয়েল, তার পুত্র সরুববাবিল, তার পুত্র অবীহূদ। লূক থেকে জানা যায় যে, মল্কির পুত্র নেরি, তার পুত্র শল্টীয়েল, তার পুত্র সরুববাবিল, তার পুত্র রীষা। এখানে জানা গেল যে, শল্টীয়েলের যোশিয় বা যিহোয়াকীমের বংশধর নন। তিনি নেরির পুত্র, তিনি মল্কির পুত্র….।

[31] লূক ২৩/২৬।

[32] গণনাপুস্তক ১/৪৫-৪৭।

[33] অর্থাৎ বর্তমান তোরাহ এর ভাষ্যমতে। [সম্পাদক]

[34] ইংরেজি কিং জেমস ভার্সন (অথোরাইযড ভার্সন)-উভয় স্থানেই ‘‘হিয্রোনের পুত্র রাম’’ বলা হয়েছে। পক্ষান্তরে রিভাইযড স্টান্ডার্ড ভার্সনে মথির সুসমাচারে হিয্রোনের পুত্র রামএবং লূকের সুসমাচারে হিয্রোনের পুত্র অর্নি, অর্নির পুত্র রামলেখা হয়েছে।

[35] ‘‘ফলতঃ তিনি লোকেদের মধ্যে সত্তর জনকে এবং পঞ্চাশ সহস্র জনকে আঘাত করিলেন।’’

[36] এই শ্লোকটির ইংরেজী পাঠ নিম্নরূপ: (And the Lord said, My Spirit shall not always strive with man, for that he also is flesh; yet his days shall be a hundred and twenty years) এই ইংরেজী পাঠের ভিত্তিতে ও গ্রন্থকারের প্রদত্ত আরবী পাঠের ভিত্তিতে উপরের বাংলা অনুবাদটি করা হয়েছে। এখানে প্রচলিত বাংলা বাইবেলের ভাষা নিম্নরূপ: ‘‘তাহাতে সদাপ্রভু কহিলেন, আমার আত্মা মনুষ্যদের মধ্যে নিত্য অধিষ্ঠান করিবে না; তাহাদের বিপথগমনে তাহারা মাংসমাত্র। পরন্তু তাহাদের সময় এক শত বিংশতি বৎসর হইবে।’’

[37] আদিপুস্তক ৯/২৯।

[38] আদিপুস্তক ১১/১০-১১।

[39] আদিপুস্তক ৯/১২-১৩।

[40] এখানে আরো লক্ষণীয় যে, মথি লিখেছেন: ‘‘দায়ূদ অবধি বাবিলে নির্বাসন পর্যন্ত চৌদ্দ পুরুষ।’’ বাইবেলের বর্ণনা অনুসারে এ কথাটি মারাত্মক ভুল। ১ বংশাবলির ১ম অধ্যায় থেকে স্পষ্ট জানা যায় যে, এই পর্যায়ে ১৮ পুরুষ ছিল, ১৪ পুরুষ নয়। মথির বিবরণ অনুসারে শলোমন থেকে যিকনিয় পর্যন্ত বংশধারা নিম্নরূপ: ১. শলোমন, ২. রহবিয়াম, ৩. অবিয়, ৪. আসা, ৫. যিহোশাফট, ৬. যোরাম, ৭. উষিয়, ৮. যোথাম, ৯. আহস, ১০. হিষ্কিয়, ১১. মনঃশি, ১২. আমোন, ১৩. যোশিয় ও ১৪. যিকনিয়। অপরদিকে ১ বংশাবলির বিবরণ অনুসারে শলোমন থেকে যিকনিয় পর্যন্ত বংশধারা নিম্নরূপ: ১. শলোমন, ২. রহবিয়াম, ৩. অবিয়, ৪. আসা, ৫. যিহোশাফট, ৬. যোরাম, ৭. অহসিয়, ৮. যোয়াশ, ৯. অমৎসিয়, ১০. অসরিয় (৭. উষিয়,) ১১. (৮) যোথাম, ১২. (৯) আহস, ১৩. (১০) হিষ্কিয়, ১৪. (১১) মনঃশি, ১৫. (১২) আমোন, ১৬. (১৩) যোশিয়, ১৭. যিহোয়াকীম ও ১৮. (১৪) যিকনিয়। এখানে বাইবেলের দুই স্থানেই স্পষ্ট উল্লেখ করা হয়েছে যে, পূর্ববর্তী ব্যক্তি পরবর্তী ব্যক্তিকে জন্ম দিয়েছেন বা পরবর্তী ব্যক্তি পূর্ববর্তী ব্যক্তির পুত্র। মথি যোরাম ও উষিয় (অসরিয়) এর মধ্যে তিন পুরুষ ফেলে দিয়েছেন এবং যোশিয় ও যিকনিয়র মাঝে এক পুরুষ ফেলে দিয়েছেন। তিনি শুধু ফেলে দিয়েই ক্ষান্ত হন নি, উপরন্তু এখানে যে আর কেউ ছিল না নিশ্চিত করতে এই পর্যায়ে সর্বমোট ১৪ পুরুষ ছিল বলে উল্লেখ করেছেন। এজন্য প্রসিদ্ধ ব্রিটিশ কার্ডিনাল জন হেনরী নিউম্যান (১৮০১-১৮৯০) আফসোস করে বলেন, খৃস্টান ধর্মে একথা বিশ্বাস করা জরুরী যে, তিনে এক হয় বা তিন ও এক একই সংখ্যা। কিন্তু এখন একথাও বিশ্বাস করা জরুরী হয়ে গেল যে, ১৪ এবং ১৮ একই সংখ্যা; কারণ পবিত্র গ্রন্থে কোনো ভুল থাকার সম্ভাবনা নেই।

[41] লূক ৩/৩৬।

[42] ইহূদী-খৃস্টানগণের নিকট সংরক্ষিত পুরাতন নিয়মের পুস্তকাবলির তিনটি মূল সংস্করণ ও পাণ্ডুলিপি রয়েছে। (১) হিব্রু সংস্করণ বা হিব্রু পাণ্ডুলিপি (২) গ্রীক সংস্করণ বা গ্রীক পাণ্ডুলিপি ও (৩) শমরীয় (Samaritan) সংস্করণ বা শমরীয় পাণ্ডুলিপি।

ইহূদীগণের ধর্মীয় ও ব্যবহারিক ভাষা হিব্রু ভাষা। এ ভাষাতেই তাদের সকল ধর্মগ্রন্থ লিখিত হয়। স্বভাবতই পুরাতন নিয়মের সকল গ্রন্থই হিব্রু ভাষায় লিখিত ছিল। খৃস্টপূর্ব ৩৩২ সালে আলেকজান্ডার প্যালেস্টাইন দখল করেন এবং তা গ্রীক সাম্রাজ্যে অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়। ইহূদীগণ গ্রীক রাজ্যের নাগরিকে পরিণত হয় এবং তাদের মধ্যে গ্রীক ভাষার কিছু প্রচলন ক্রমান্বয়ে শুরু হয়। প্রায় এক শতাব্দী পরে, খৃস্টপূর্ব ২৮৫-২৪৫ সালের দিকে বাইবেলের পুরাতন নিয়ম নামে পরিচিত ইহূদী ধর্মগ্রন্থগুলি গ্রীক ভাষায় অনুবাদ করা হয়। কথিত আছে যে, মিসরের শাসক ২য় টলেমি: টলেমি ফিলাডেলফাস (Ptolemy Philadelphus)- এর রাজত্বকালে (খৃ. পূ. ২৮৫-২৪৬) তাঁর নিদের্শে নির্দেশে ৭০/৭২ জন পন্ডিত তা আলেকজেন্ড্রীয় গ্রীক ভাষায়অনুবাদ করেন। এই গ্রীক অনুবাদটিই the Septuagint (LXX) বা সত্তরেরঅনুবাদ বলে প্রসিদ্ধ। যীশুখৃস্টের সময়ে এ অনুবাদটি প্রচলিত ছিল বলে মনে করা হয়। ১৫শ শতাব্দী পর্যন্ত খৃস্টানগণ গ্রীক অনুবাদকেই পুরাতন নিয়মের বিশুদ্ধ সংস্করণ বলে দাবি করতেন। গ্রীক অনুবাদ থেকে তারা ল্যাটিন অনুবাদ করেন। তারা দাবি করেন যে, গ্রীক অনুবাদের অশুদ্ধতা প্রমাণ করার জন্য ১৩০ খৃস্টাব্দের দিকে ইহূদীগণ হিব্রু বাইবেলের মধ্যে ইচ্ছাপূর্বক বিকৃতি সাধন করে। প্রটেস্টান্ট সম্প্রদায়ের খৃস্টানগণ দাবি করেন যে, মূল হিব্রু বাইবেলেই বিশুদ্ধ এবং গ্রীক অনুবাদ অসংখ্য ভুলে ভরা।

সুলাইমান (আ)-এর পরেই ইহূদীগণ বিভক্ত হয়ে যায়। তাদের এক সম্প্রদায়কে শমরীয় (Samaritans) বলা হয়, যারা প্রাচীন ফিলিস্তিনের শামেরা বা শামারিয়া (Samaria) রাজ্যে বসবাস করত। এদের নিকট সংরক্ষিত তাওরাতের প্রাচীন সংস্করণকে শমরীয় তাওরাত বলা হয়।

[43] সুলাইমান (আ)-এর মৃত্যুর পরে তার পুত্র রুহবিয়ামের রাজত্বকালে (খৃ. পূ ৯২২ অব্দে) ইহূদীদের মধ্যে গৃহযুদ্ধ শুরু হয় এবং তাদের রাজ্য দুটি রাজ্যে বিভক্ত হয়ে যায়। উত্তর প্যালেস্টাইনের রাজ্যকে ইস্রাইল রাজ্য (the Kingdom of Israel) বলা হতো। এর রাজধানী ছিল নাবলুস। আর দক্ষিণ প্যালেস্টাইনের রাজ্যকে যিহূদা রাজ্য’ (the Kingdom of Judea, also Judaea or Judah) বলা হতো। এর রাজধানী ছিল যিরূশালেম। উত্তরের ইস্রায়েল রাজ্যকে অনেক সময়  শামেরা (Samaria) বা ইফ্রমিয় (Ephraimites) বলা হতো। বাইবেলের একটি বড় অংশ এ দুই রাজ্যের মধ্যকার হানাহানি, গণহত্যা, যুদ্ধবিগ্রহ, মুর্তিপূজা, অনাচার ইত্যাদির বর্ণনা।

[44] মোশির মৃত্যুর পরে দীর্ঘ প্রায় তিন শতাব্দী যাবৎ ইস্রায়েল সন্তানগণের মধ্যে কোনো রাজা বা রাজত্ব ছিল না। নবী (ভাববাদী) বা বিচারকর্তৃগণ তাদেরকে পরিচালনা করতেন। সর্বশেষ বিচারকর্তা শমূয়েল ভাববাদীর সময়ে ইস্রায়েলীয়গণ তাঁর নিকট একজন রাজা নিয়োগের জন্য আবেদন করেন। তখন কীশের পুত্র শৌল (তালুত) নামক এক ব্যক্তি রাজা মনোনিত হন। আনুমানিক খৃ. পূ. ১০১৫/১০০০ অব্দে অমালিকা সম্প্রদায়ের রাজা জালূত (Golieth)-কে পরাজিত করে তালুত প্রথম ইস্রায়েলীয় রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করেন ও প্রথম ইস্রায়েলীয় রাজা বলে গণ্য হন। তাহলে মূসার (আ) লিখিত বলে কথিত ‘‘তাওরাতের’’ পাঁচ পুস্তকের প্রথম পুস্তকে মূসার (আ) মৃত্যুর প্রায় সাড়ে তিন শত বৎসর পরের ঘটনাবলি লেখা হচ্ছে।

[45] ১ বংশাবলির ২য় ও ৬ষ্ঠ অধ্যায়ে প্রদত্ত তথ্য থেকে স্পষ্টত জানা যায় যে, যায়ীর নামক এ ব্যক্তি মোশির পূর্ববর্তী বা সমসাময়িক মানুষ ছিলেন না বরং তিনি মোশির পরের প্রজন্মের মানুষ ছিলেন। যাকোবের পুত্র লেবি, তার পুত্র কহাৎ, তাঁর পুত্র অম্রান, তাঁর পুত্র মোশি। আর যাকোবের অন্য পুত্র যিহূদা, তাঁর পুত্র পেরস, তাঁর পুত্র হিষ্রোণ, তাঁর পুত্র সগূব, তাঁর পুত্র যায়ীর। এভাবে আমরা দেখতে পাই যে, সগূব ছিলেন মোশির সমসাময়িক এবং তাঁর পুত্র যায়ীর মোশির পরের প্রজন্মের মানুষ। কাজেই একথা নিশ্চিতরূপে বলা যায় যে, এই বক্তব্যটির পুরোটিই অনেক পরের সংযোজন। সংযোজনকারী যায়ীরের নাম ও তাঁর মালিকানাধীন গ্রামগুলির নামের বিষয়ে জনশ্রুতির উপর নির্ভর করে কথাটি লিখেছেন। এজন্য তিনি যায়ীরের পিতার নামও ঠিকমত লিখতে পারেন নি। দেখুন ১ বংশাবলি ২/১-২৩ ও ৬/১-৩।

[46] এই অধ্যায়ে মোশির মৃত্যু, মৃত্যুর পরে ত্রিশ দিন যাবৎ ইহূদীদের শোকপালন, যুগের আবর্তনের মোশির কবর হারিয়ে যাওয়া ইত্যাদি বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে।

[47] মোশি ৭০ গোত্রপতির একটি কাউন্সিলগঠন করেন বিচারকর্তৃগণকে সাহায্য করার জন্য। পরবর্তী কালে সকল যুগে ইস্রায়েলীয়দের মধ্যে এইরূপ কাউন্সিলছিল।

[48] আদম ক্লার্ক, জনৈক ইহূদী পন্ডিত ও অন্যান্যদের এই দাবি একেবারেই ভিত্তিহীন। দ্বিতীয় বিবরণের ৩৪ অধ্যায়ের ৫-৬ শ্লোক প্রমাণ করে যে, এই অধ্যায়টি যিহোশূয়ের অনেক শতাব্দী পরে লেখা হয়েছে। এই শ্লোকদ্বয়ে বলা হয়েছে: ‘‘তখন সদাপ্রভুর দাস মোশি সদাপ্রভুর বাক্যানুসারে সেই স্থানে মোয়াব দেশে মরিলেন। আর তিনি মোয়াব দেশে বৈৎপিয়োরের সম্মুখস্থ উপত্যকাতে তাঁহাকে কবর দিলেন। কিন্তু তাঁহার কবরস্থান অদ্যাপি কেহ জানে না। (but no man knoweth of his sepulchre unto this day.)’’ মোশির মৃত্যুর মাত্র ১৫/১৬ বৎসর পরে যিহোশূয় মৃত্যুবরণ করেন। গণনা পুস্তকের শুরুতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ৭ লক্ষাধিক ইস্রায়েল সন্তান মোশির সাথে মিশর থেকে আগমন করেন। একথা কি কল্পনা করা সম্ভব যে, ১৫/১৬ বৎসরের মধ্যে এই ৭ লক্ষ ইস্রায়েল সন্তান তাঁদের প্রাণপ্রিয় নেতা, ভাববাদী ও মুক্তিদাতার কবরের স্থানটি ভুলে গেলেন? এমনকি মোশির নিকটতম পরিচারক যিহোশূয়ও কবরটির স্থান পর্যন্ত ভুলে গেলেন?! শুধু তাই নয়, উপরন্তু তিনি তাঁর পুস্তকে নির্বিকার চিত্তে কথাটি লিপিবদ্ধ করলেন!!!

[49] কত সহজ বিষয়! একটি ধর্মগ্রন্থের বিভিন্ন অধ্যায় ইচ্ছামত এক পুস্তক থেকে অন্য পুস্তকে ঢুকে পড়ে!!

[50] … অথবা কোনো লিপিকার, অথবা কোনো ধর্মত্যাগী মুর্তিপূজক রাজা, অথবা কোনো শয়তান ….। এ কথাগুলি থেকে মনে পড়ে মোল্লা দোপেয়াজীর ও বাদশাহ আকবরের মধ্যকার সংলাপ। বাদশাহ বললেন, এদেশে মোট কাকের সংখ্যা কত? মোল্লা দোপেয়াজী একটি কাল্পনিক সংখ্যা বললেন: এত লক্ষ… এত হাজার এত… । আপনার সন্দেহ হলে গুণে দেখুন। যদি বেশি হয় তাহলে বুঝতে হবে বাইরের কোনো কাক এদেশে বেড়াতে এসেছে। আর যদি কম হয় তাহলে বুঝতে হবে এদেশের কোনো কাক বাইরে বেড়াতে গিয়েছে। এ সকল পন্ডিতদের ভিত্তিহীন কাল্পনিক সম্ভাবনাগুলির সাথে মোল্লা দোপেয়াজীর কথার কি কোনো পার্থক্য খুঁজে পাওয়া যায়?

[51] সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো, তাঁরা যদি কোনো সংযোজন, বিয়োজন বা পরিবর্তনের কোনোরূপ ওজর বা ব্যাখ্যা পেশ করতে না পারেন, তবে তাকে বিকৃতি বলে স্বীকার করে ভুলটি অনুলিপিকারেরঘাড়ে চাপিয়ে দেন। আর যেখানে এরূপ সংযোজন, বিয়োজন বা বিকৃতির মধ্যে সুস্পষ্ট কোনো ভুল ধরা পড়ে না সেখানে তাঁরা এই সংযোজনের দায়িত্ব নির্দিষ্ট বা অনির্দিষ্ট ভাববাদী বা কোনো একজন ঐশ্বরিক প্রেরণাপ্রাপ্তব্যক্তির ঘাড়ে চাপিয়ে দেন। এর উল্টো কেন হলো না তা আমরা বুঝি না। কেউ যদি দাবি করেন যে, সবগুলিই লিপিকারদের বা সবগুলিই ভাববাদিগণের কর্ম, তবে তা ভুল প্রমাণ করা হবে কিভাবে? আর ভাববাদিগণের বা ঐশ্বরিক প্রেরণাপ্রাপ্ত ব্যক্তিগণেরনির্ভুলতারই বা প্রমাণ কোথায়? যে ইয্রার নাম তাঁরা বারংবার বলেন তিনি আরো দুইজন ভাববাদীর সহযোগিতায় যে বংশাবলিপুস্তক রচনা করেছেন তার মধ্যেও অনেক ভুল রয়েছে বলে আমরা দেখেছি। এছাড়া তোরাহ বা পবিত্র পুস্তকগুলি কি ভাববাদিগণ বা যাজকগণ ছাড়া কেউ লিখতেন বা অনুলিপি করতেন? আর কোনো অনুলিপিকার যদি ভুল করেই ফেলে তাহলে পরবর্তী ভাববাদিগণ ও যাজকগণ তা সংশোধন করলেন না কেন? ভাববাদিগণ পূর্ববর্তী ব্যবস্থাপুস্তকের মধ্যে এভাবে বিভিন্ন কথা সংযোজন করতে পারলেন, কিন্তু পবিত্র পুস্তকের মধ্যে অনুলিপিকারদের এত সব বিকৃতি সংশোধন করতে পারলেন না?

[52] বাংলা বাইবেলে ও ইঞ্জিল শরীফে এই বাক্যগুলি নেই। ইংরেজি ও আরবী বাইবেলের অনুসরণে অনুবাদ করা হয়েছে।

[53] বাংলা বাইবেলে এতটুকই উল্লেখ করা হয়েছে।

[54] বাইবেলের পঠন ও পাঠন সাধারণ খৃস্টানদের জন্য মূলত নিষিদ্ধ ছিল। এর পাণ্ডুলিপির সংখ্যাও ছিল খুবই কম।

[55] ইংরেজি ও আরবী বাইবেলে এই শ্লোকটি মূল পাঠের মধ্যে রয়েছে। বাংলা ইঞ্জিল শরীফেএ কথাগুলি একেবারে ফেলে দেওয়া হয়েছে। আর বাংলা বাইবেলে কথাগুলি পাদটীকায় লেখা হয়েছে এবং বলা হয়েছে: ‘‘কোনো কোনো প্রাচীন পাণ্ডুলিপিতে এখানে এই কথাগুলি পাওয়া যায়।’’

[56] এছাড়া গণনাপুস্তকের ২৬ অধ্যায়ের ৫৯ শ্লোকে বলা হয়েছে: ‘‘ঐ কহাতের পুত্র অম্রাম। অম্রামের স্ত্রীর নাম যোকাবেদ, তিনি লেবির কন্যা, মিসরে লেবির ঔরসে তাহার জন্ম।’’ এখানেও অতি স্পষ্টরূপে বলা হয়েছে যে, যোকেবদ লেবীর ঔরসজাত কন্যা। আর কহাৎ লেবির পুত্র। কাজেই তিনি অম্রামের আপন ফুফু।

[57] ১৫৬৮ সালে ইটালিতে জন্মগ্রহণ করেন। ১৬২৩ সালে পোপের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন এবং ১৬৪৩/১৬৪৪ সালে মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর সময়ে ইউরোপব্যাপী ক্যাথলিক ও প্রটেস্টান্টদের মধ্যে অনেক যুদ্ধবিগ্রহ হয়। ডেনমার্ক, ইংল্যান্ড, নেদারল্যান্ড, সুইডেন প্রভৃতি দেশের রাজাগণ প্রটেস্টান্টদের সাহায্যে বড় বড় সৈন্যবাহিনী প্রেরণ করেন। দেখুন, মতিওর রহমান, ঐতিহাসিক অভিধান, পৃ. ১৭২-১৭৫।

[58] বাহ্যত ইচ্ছাকৃতভাবেই এ শ্লোকটি লূকের সুসমাচার থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। কারণ এ শ্লোকটি দ্ব্যর্থহীনভাবে প্রমাণ করে যে, যীশুখৃস্ট ঈশ্বর ছিলেন না বা ঈশ্বরের সত্ত্বার অংশ ছিলেন না। আর এজন্যই একইরূপ জালিয়াতি করা হয়েছে মথির বর্ণনার ক্ষেত্রে। ‘‘পুত্রও জানেন না’’ কথাটুকু ফেলে দেওয়া হয়েছে; যেন যীশুর ঈশ্বরত্ব দাবি করার কোনো বাধা না থাকে। কিং জেমস ভার্সন বা অথরাইজড ভার্সন (KJV/AV)-এ এ শ্লোকটি নিম্নরূপ: (But of that day and hour knoweth no man, no, not the angels of heaven, but my Father only)। এখানে ‘‘পুত্রও না (neither the Son)’’ কথাটি ফেলে দেওয়া হয়েছে। রিভাইযড স্টান্ডার্ড ভার্সনে কথাটি সংযোজন করা হয়েচে।

[59] দ্বিতীয় খৃস্টীয় শতাব্দীর একজন প্রসিদ্ধ ধর্মগুরু ও দার্শনিক। ইহূদী ট্রিফোন খৃস্টান ধর্মবিশ্বাসের বিরুদ্ধে কঠোর ছিলেন। জাস্টিন তাকে পত্র লিখেন। দেখুন: Eusebius Pamphilus, The Ecclesiastical History, p 135, 150-155.

[60] এবোনাইট খৃস্টানগণ যীশুর ঈশ্বরত্ব অস্বীকার করতেন। তাঁরা যীশুকে অন্য দশজন মানুষের মতই একজন মানুষ ও ভাববাদী বলে বিশ্বাস করতেন। তাঁদের মতে যীশুর নির্দেশ অনুসারে খৃস্টানদের জন্যও মোশির ব্যবস্থাবা মূসার শরীয়ত পালন করা আবশ্যকীয়। পৌলই সর্বপ্রথম মোশির ব্যবস্থা রহিত করে দেন। তিনি দাবি করেন যে, শুধু বিশ্বাসেই মুক্তি; কাজেই ব্যবস্থা বা শরীয়ত পালন করা উচিত নয়। যে শরীয়ত বা ব্যবস্থা পালন করবে সে যীশুর প্রেম বা দয়া লাভ করতে পারবে না… ইত্যাদি। এজন্য এবোনাইট খৃস্টানগণ পৌলকে ধর্মত্যাগী বলে গণ্য করেন। কিন্তু সাধারণ মানুষের কাছে কর্মহীন ভক্তির মূল্য বেশী। এজন্য শেষ পর্যন্ত পৌলীয় ধর্মই প্রসার লাভ করে।

[61] আধ্যাত্মবাদি গুরু মারসিওনের (Marcion) অনুসারী।

[62] যোহনলিখিতি সুসমাচারের ১০ অধ্যায়ের ৮ম শ্লোকে যীশু বলেন: ‘‘যাহারা আমার পূর্বে আসিয়াছিল, তাহারা সকলে চোর ও দস্যু, কিন্তু মেষেরা তাহাদের রব শুনে নাই।’’ খৃস্টের এই কথার ভিত্তিতেই তাঁরা এভাবে পূর্ববর্তী ভাববাদিগণকে চোর ও দস্যুবা শয়তান কর্তৃক প্রতারিত ও প্রবঞ্চিত বলে বিশ্বাস করত।

[63] এখানে উল্লেখ্য যে, প্রচলিত ত্রিত্ববাদী খৃস্টধর্মের প্রতিষ্ঠাতা সাধু পল (Paul) এ মতের একনিষ্ঠ অনুসারী ও প্রচারক ছিলেন। তিনি সগৌরবে স্বীকার করেছেন যে, তিনি ঈশ্বরের গৌরবার্থে ও সত্যের বৃদ্ধির জন্য মিথ্যা বলেন এবং এরূপ মিথ্যা বলাতে কোনো পাপ হয় না। বাইবেলের নতুন নিয়মের অন্তর্ভুক্ত রোমীয়দের প্রতি প্রেরিত পত্রে তিনি লিখেছেন: “For if the truth of God hath more abounded through my lie unto his glory; why yet am I also judged as a sinner? কিন্তু আমার মিথ্যায় যদি ঈশ্বরের সত্য তাঁহার গৌরবার্থে উপচিয়া পড়ে, তবে আমিও বা এখন পাপী বলিয়া আর বিচারিত হইতেছি কেন?’’ (রোমান ৩/৭)। এ নীতির ভিত্তিতেই সত্য প্রতিষ্ঠার জন্যবা ঈশ্বরের গৌরব প্রকাশের জন্যপল নিজে মিথ্যাচারের মাধ্যমে খৃস্টধর্মকে বিকৃত করেছেন। এ নীতির অনুসরণেই বাইবেল বিকৃত করাকে ভাল কাজ বলে গণ্য করতেন পূর্ববর্তী খৃস্টান পন্ডিতগণ।

[64] ইংল্যান্ডের প্রটেস্ট্যন্ট রাজা। তাঁর মাতা মেরি ছিলেন স্কটল্যান্ডের রাণী। তাঁর মাতা সিংহাসন ত্যাগ করলে তিনি স্কটল্যান্ডের রাজা হন। এরপর তিনি ইংল্যান্ডের রাজা হন। তাঁর মাতা ক্যাথলিক ছিলেন। এজন্য তিনি তাঁর মাতাকে মৃত্যুদন্ড প্রদান করেন। তাঁরই সময়ে প্রটেস্টান্ট ধর্মমতের ভিত্তিতে বাইবেলের সংশোধিতইংরেজি অনুবাদ প্রকাশিত হয়, যা Authorised Version ((AV) বা King James Version (KJV) নামে পরিচিত। জেমস ১৬০৩ থেকে ১৬২৫ সালে মৃত্যু পর্যন্ত ইংল্যান্ডের রাজা ছিলেন।

[65] যে কোনো ব্যক্তির জন্য বাইবেল বা পবিত্র পুস্তক লেখার কোনো সুযোগ ছিল না। শুধুম বিশেষভাবে ধর্মশিক্ষাপ্রাপ্ত ধর্মগুরু পন্ডিতগণই এগুলি লিখতেন। তাঁদেরকে লিপিকারগণবা scribesহিব্রুতে সোফেরিম (soferim) বলা হতো।

[66] যীশু বলেন: ‘‘কেননা আমি তোমাদিগকে সত্য কহিতেছি, যে পর্যন্ত আকাশ ও পৃথিবী লুপ্ত না হইবে, সে পর্যন্ত ব্যবস্থার এক মাত্রা বা এক বিন্দুও লুপ্ত হইবে না, সমস্তই সফল হইবে।’’ (মথি ৫/১৮) এতে বুঝা যায় যে, পুরাতন নিয়ম মহাপ্রলয় পর্যন্ত অবিকৃত থাকবে। এছাড়া যীশু বারংবার পুরাতন নিয়মের ঘটনাবলির উল্লেখ করেছেন, বিভিন্ন উদ্ধৃতি দিয়েছেন, পুরাতন নিয়মের পুস্তকাদির বক্তব্য দ্বারা তাঁর নিজের মতামত সমর্থন করেছেন। প্রেরিতগণও এভাবে বারংবার পুরাতন নিয়মের পুস্তকাদির উদ্ধৃতি দিয়ে নিজেদের স্বপক্ষে প্রমাণ পেশ করেছেন।

[67] ৩য়-৪র্থ শতকের প্রসিদ্ধ খৃস্টান ধর্মগুরু আরিয়ূসে (Arius) অনুসারিগণ, যারা যীশু খৃস্টকে ইশ্বরের সত্তার অংশ নয়, বরং তার সৃষ্ট পুত্রবলে বিশ্বাস করতেন। সাধারণভাবে এরা একেশ্বরবাদী খৃস্টান বলে পরিচিত।

[68] ৪র্থ-৫ম শতাব্দীর খৃস্টান সাধু ইউটিশাস (Eutyches 375-454)-এর অনুসারিগণ। এরা একসত্তাবাদী’ (Monophysites)। তাঁরা বিশ্বাস করেন যে, খৃস্টের মধ্যে একটিমাত্র ঐশ্বরিক সত্তা বিরাজমান ছিল। তাঁর মধ্যে কোনো মানবীয় সত্তার অস্তিত্ব ছিল না। বিস্তারিত দেখুন Encyclopaedia Britannica, artciles: Eutychian; Eutyches; Monophysite.

[69] এখানে উল্লেখ্য যে, তৃতীয় খৃস্টীয় শতকের প্রসিদ্ধতম খৃস্টান ধর্মগুরু অরিগন (Origen)-ও পুরাতন নিয়মের মধ্যে ২২টি পুস্তক বিদ্যমান বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি পুস্তকগুলির নামও উল্লেখ করেছেন। নামের বর্ণনায় তিনি প্রচলিত কিছু পুস্তককে একত্রিত করে উল্লেখ করেছেন: তাঁর বর্ণনামতে মোশির পাঁচটি পুস্তক ছাড়া অবশিষ্ট ১৭টি পুস্তক নিম্নরূপ: (১) যিহোশূয়ের পুস্তক, (২) বিচারকর্ত্তৃগণের বিবরণ ও রূতের বিবরণ একত্রে, (৩) শমুয়েলের প্রথম ও দ্বিতীয় পুস্তক একত্রে, (৪) রাজাবলির প্রথম ও দ্বিতীয় খন্ড একত্রে, (৫) বংশাবলির প্রথম ও দ্বিতীয় খন্ড একত্রে, (৬) ইয্রার প্রথম ও দ্বিতীয় (নহিমিয়ের) পুস্তক একত্রে, (৭) গীতসংহিতা, (৮) হিতোপদেশ, (৯) উপদেশক, (১০) পরমগীত, (১১) যিশাইয় ভাববাদীর পুস্তক, (১২) যিরমিয় ভাববাদীর পুস্তক, যিরমিয়ের বিলাপ ও যিরমিয়ের পত্র একত্রে, (১৩) দানিয়েলের পুস্তক, (১৪) যিহিষ্কেল ভাববাদীর পুস্তক, (১৫) ইয়োবের বিবরণ, (১৬) ইস্টেরের বিবরণ ও (১৭) মাকাবিজের পুস্তক। ১ম খৃস্টীয় শতকের প্রসিদ্ধতম ইহূদী ধর্মগুরু ও ৩য় শতকের প্রসিদ্ধত খৃস্টান ধর্মগুরু উভয়ের বিবরণ অনুসারে নিম্নের পুস্তকগুলি জাল, বানোয়াট ও অতিরিক্ত সংযোজিত এবং কোনো অবস্থাতেই পুরাতন নিয়মের অংশ নয়।: (১)হোশেয় ভাববাদীর পুস্তক (Hosea), (২) যোয়েল ভাববাদীর পুস্তক (Joel), (৩) আমোষ ভাববাদীর পুস্তক (Amos), (৪) ওবদিয় ভাববাদীর পুস্তক (Obadiah), (৫) যোনা ভাববাদীর পুস্তক (Jonah), (৬) মীখা ভাববাদীর পুস্তক (Micah), (৭) নহূম ভাববাদীর পুস্তক (Nahum), (৮) হবক্কূক ভাববাদীর পুস্তক (Habakkuk), (৯) সফনিয় ভাববাদীর পুস্তক (Zephaniah), (১০) হগয় ভাববাদীর পুস্তক (Haggai), (১১) সখরিয় ভাববাদীর পুস্তক (Zechariah), (১২) মালাখি ভাববাদীর পুস্তক (Malachi)। এই ১২টি পুস্তককে প্রটেস্টান্ট ও ক্যাথলিক উভয় সম্প্রদায়ই পুরাতন নিয়মের পুস্তক বলে বিশ্বাস করেন। এছাড়া ক্যাথলিকদের অতিরিক্ত পুস্তকগুলির মধ্যে ম্যাকাবিজ ছাড়া বাকি ৫টি পুস্তকও জাল বলে জানা যায়। এখানে আরো লক্ষ্যণীয় যে, যিরমিয়ের পত্র (Epistle of Jeremiah) নামে একটি পুস্তকের কথা ওরিগন উল্লেখ করেছেন, যা বর্তমান প্রচলিত বাইবেলের মধ্যে নেই। দেখুন, Eusebius Pamphilus, The Ecclesiastical History, page 97, 244-245.

[70] দ্বিতীয় বিবরণ ৩১/১০-১১।

[71] ইহূদীরা এদেরকে প্রচন্ডভাবে ঘৃণা করত। যীশুখৃস্ট যখন তাঁর দ্বাদশ শিষ্যকে তাঁর সুসমাচার প্রচারের জন্য প্রেরণ করেন তখন বিশেষ করে শমরীয়দের কাছে না যাওয়ার ও তাদেরক তাঁর ধর্মে দীক্ষা না দেওয়ার নির্দেশ দেন। মথি বলেন: ‘‘These twelve Jesus sent forth, and commanded them, saying, Go not into the way of the Gentiles, and into any city of the Samaritans enter ye not: But go rather to the lost sheep of the house of Israel: এই বার জনকে যীশু প্রেরণ করিলেন, আর তাঁহাদিগকে এই আদেশ দিলেন- তোমরা পরজাতিগণের (অ-ইহূদী জাতিগণের) পথে যাইও না, এবং শমরীয়দের কোন নগরে প্রবেশ করিও না; বরং ইস্রায়েল-কুলের হারান মেষগণের কাছে যাও। (মথি ১০/৫-৬)

[72] আমরা ইতোপূর্বে বলেছি যে, মোশি, দায়ূদ, শলোমন প্রমুখ ভাববাদী ও রাজার সময়কালের বিষয়ে পাশ্চাত্য ধর্মবিদ ও ঐতিহাসিকদের প্রদত্ত তারিখগুলির মধ্যে বৈপরীত্য আছে। লেখক তৎকালে খৃস্টান পন্ডিতদের মধ্যে প্রচলিত সন তারিখ ব্যবহার করেছেন। মোটামুটি ঐতিহাসিকগণ একমত যে, খৃ. পূ. ৫৮৭ বা ৫৮৬ সালে যিহূদা রাজ্যের পতন হয়। লেখকের প্রদত্ত তারিখ অনুসারে ৫৮৭+৩৭২=খৃ.পূ. ৯৫৯ সালে শলোমনের মৃত্যু হয়। বর্তমানে প্রসিদ্ধ মত হলো, খৃ. পূ.  ৯৩১/৯৩০ সালে শলোমন মৃত্যু বরণ করেন।

[73] ১ রাজাবলি১৪/২৫-২৬; মতিওর রহমান, ঐতিহাসিক অভিধান, পৃ. ৬।

[74] ১ রাজাবালি ১৫/১৬-২২।

[75] ২ রাজাবলি ২২/১-১১; ২ বংশাবলি ৩৪/১-১৯।

[76] বাইবেলের ভাষায়: তিনি যিরূশালেমের সমস্ত লোক, সমস্ত প্রধান লোক ও সমস্ত বলবান বীর, অর্থাৎ দশ সহস্র বন্দি এবং সমস্ত শিল্পকার ও কর্মকারকে লইয়া গেলেন; দেশের দীন দরিদ্র লোক ব্যতিরেকে আর কেহ অবশিষ্ট থাকিল না। ২ রাজাবলি ২৪/১৪

[77] ২ রাজাবলি ২৪ অধ্যায়ে এ সকল ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে।

[78] তোরাহ বা ইহূদীদের ধর্মগ্রন্থ গণ পুস্তক ছিল না। একমাত্র ধর্মগুরুগণ ছাড়া কেউ তা পাঠ করত না। ধর্মধাম ছাড়া অন্যত্র তার কোনো কপিও থাকত না। কোনো ধর্মগুরু বা অন্য কেউ কখনো তা মুখস্ত করত না। ফলে বিনষ্ট হওয়ার পরে পুনরায় হুবহু তা লিখে ফেলার কোনো সুযোগ ছিল না।

[79] অনেকে ঘটনাটি খৃ. পূ. ১৬৮-১৬৪ সালে ঘটেছিল বলে উল্লেখ করেছেন।

[80] তাওরাত কখনই সকলের পাঠ বই ছিল না। শুর্ধ ধর্মধামে তা রক্ষিত থাকত ও বিশেষ অনুষ্ঠানে তার কিছু অংশ পাঠ করা হতো। এজন্য সে যুগে পূর্ণ তাওরাতের বা পুরাতন নিয়মের বেশি কপি ছিল না বলেই প্রতীয়মান হয়। সাধারণ ইহূদীরা হয়ত প্রয়োজনীয় কিছু বিষয় কপি করে রাখত। পূর্ণাজ্ঞ কপির সাথে এ সকল আংশিক অনুলিপিও এ সময় বিনষ্ট হয়ে যায়।

[81] আধুনিক খৃস্টধর্মের প্রবর্তক সাধু পৌলও এ সময়ে নিহত হন।

[82] ডোমিশিয়ান ছিলেন সম্রাট টিটোর ভাই, যিনি ৭০ খৃস্টাব্দে যিরুশালেম ও যুডিয়ায় ইহূদীদের মধ্যে গণ হত্যাযজ্ঞ চালান।

[83] এখানে আরো কয়েকটি বিষয় লক্ষণীয়:

(১) প্রথম কয়েক শতাব্দীর খৃস্টানগণ, বিশেষত যীশুর যুগ ও তার পরবর্তী প্রজন্মের খৃস্টানগণ কখনোই ধর্মগ্রন্থ সংরক্ষণের কথা চিন্তা করেন নি। উপরন্তু তারা ধর্মগ্রন্থ বা সুসমাচার লিখে রাখা বা সংরক্ষণ করার বিরোধিতা করতেন এবং একে পাগলামি বলে মনে করতেন। কারণ, তাঁরা সুনিশ্চিতরূপে বিশ্বাস করতেন যে, অচিরেই- তাদের জীবদ্দশাতেই- কিয়ামত বা মহাপ্রলয়, পুনরুত্থান ও মহাবিচার সংঘটিত হবে। জীবিতরা রূপান্তরিত হবে এবং মৃতরা উত্থিত হবে। যীশু স্বর্গ থেকে নেমে আসবেন এবং খৃস্টানদেরকে স্বর্গে নিয়ে যাবেন। তাদের মধ্যে প্রচলিত যীশু ও প্রেরিতদের বিভিন্ন বাণী ও বক্তব্য থেকেই তারা তা বিশ্বাস করতেন। যীশুর এ সকল বাণী ও বক্তব্য বিভিন্ন সুসমাচার ও পত্রে এখনো বিদ্যমান। এ অর্থে অনেক বক্তব্য নতুন নিয়মের পত্রাবলিতে বিদ্যমান।

থিষলনীকীয়দের প্রতি প্রেরিত পৌলের ১ম পত্রের চতুর্থ অধ্যায়ে রয়েছে: ‘‘১৫ কেননা আমরা প্রভুর বাক্য দ্বারা তোমাদিগকে ইহা বলিতেছি যে, আমরা যাহারা জীবিত আছি, যাহারা প্রভুর আগমন পর্যন্ত অবশিষ্ট থাকিব, আমরা কোন ক্রমেই সেই নিদ্রাগত লোকদের অগ্রগামী হইব না। ১৬ কারণ প্রভু স্বয়ং আনন্দধ্বনি সহ, প্রধান দূতের রব সহ, এবং ঈশ্বরের তূরীবাদ্য সহ স্বর্গ হইতে নামিয়া আসিবেন, আর যাহারা খ্রীষ্টে মরিয়াছে তাহারা প্রথমে উঠিবে। ১৭ পরে আমরা যাহারা জীবিত আছি, যাহারা অবশিষ্ট থাকিব, আমরা আকাশে প্রভুর সহিত সাক্ষাৎ করিবার নিমিত্ত একসঙ্গে তাহাদের সহিত মেঘযোগে নীত হইব; আর এইরূপে সতত প্রভুর সঙ্গে থাকিব।’’ করিন্থীয়দের প্রতি প্রেরিত পৌলের প্রথম পত্রের ১৫ অধ্যায়ে রয়েছে: ‘‘৫১ দেখ, আমি তোমাদিগকে এক নিগূঢ়তত্ত্ব বলি; আমরা সকলে নিদ্রাগত হইব না, কিন্তু সকলে রূপান্তরীকৃত হইব; ৫২ এক মুহূর্তের মধ্যে, চক্ষুর পলকে, শেষ তূরীধ্বনিতে হইবে; কেননা তূরী বাজিবে, তাহাতে মৃতেরা অক্ষয় হইয়া উত্থাপিত হইবে, এবং আমরা রূপান্তরীকৃত হইব।’’

এভাবে তাঁরা বিশ্বাস করতেন যে, তারা মরবেন না, বরং তাদের জীবদ্দশাতেই কিয়ামত শুরু হবে এবং তারা শুধু রূপান্তরিত হয়ে স্বর্গে যাবে।

যীশু যোহনের বিষয়ে পিতরকে বলেন: ‘‘আমি যদি ইচ্ছা করি, এ আমার আগমন পর্যন্ত থাকে, তাহাতে তোমার কি?’’ (যোহন ২১/২২) এ কথা থেকে শিষ্যরা বুঝেন যে, যীশুর পুনরাগমণের পূর্বে যোহন মরবেন না। আর ঘটনাক্রমে যোহন দীর্ঘ আয়ু লাভ করেন। (অথবা যোহনের দীর্ঘায়ুর কারণেই এ কথাটি যীশুর নামে জালিয়াতি করে প্রচার করা হয়েছিল।) যীশুর পরেও তিনি প্রায় শতবৎসর বেঁচে ছিলেন। ফলে তাঁদের বিশ্বাস আরো জোরালো হয়। প্রতিদিনই তাঁরা কিয়ামতের অপেক্ষা করতেন।

এ বিশ্বাসের ভিত্তিতে তাঁরা সুসমাচার বা ধর্মপু্স্তক লিখতে নিষেধ করতেন। প্রকাশিত বাক্যের ২২ অধ্যায়ে যীশুর কথাগুলি নিম্নরূপ: ‘‘৭ আর দেখ, আমি শীঘ্রই আসিতেছি।… ১০ তুমি এই গ্রন্থের ভাববাণীর বচন সকল মুদ্রাঙ্কিত করিও না; কেননা সময় সন্নিকট।… ২০ আমি শীঘ্র আসিতেছি।’’

(২) উপরের বিশ্বাসের সাথে দ্বিতীয় একটি প্রগাঢ় বিশ্বাস তাদের মধ্যে ছিল, তা হলো, যীশু মূসার শরীয়ত পূর্ণ করতে এসেছিলেন। কাজেই পুরাতন নিয়মকেই তারা তাদের ধর্মগ্রন্থ বলে বিশ্বাস করতেন এবং পাঠ করতেন, যীশুর সুসমাচার বা শিক্ষা সংকলন বা সংরক্ষরণের কোনোরূপ নিয়মতান্ত্রিক চেষ্টাই তাঁরা করেন নি। দ্বিতীয় শতাব্দীর শুরু থেকে যীশুর শিক্ষা, সুসমাচার, প্রেরিতদের পত্র ইত্যাদি নামে বিক্ষিপ্তভাবে অনেক কিছু মৌখিক বা লিখিতভাবে প্রচারিত হয়। কিন্তু এগুলির কোনো গুরুত্ব দেয় নি খৃস্টান চার্চ। সাধু আরিয়ানুস (Saint Irenaeus/Irenaeus) ২০০ খৃস্টাব্দের দিকে সর্বপ্রথম খৃস্টধর্মকে একটি কেতাবী ধর্ম হিসাবে রূপ প্রদানের চেষ্টা শুরু করেন। দেখুন: Oxford Illustrated History of Christianity, New York, Oxford University Press, 1990, page 30-31. তারিখ কানীসাতিল মাসীহ, পৃষ্ঠা ৪৫।

(৩) খৃস্টধর্মের প্রথম ২০০ বৎসরের ইতিহাসে গসপেল বা সুসমাচারের কোনো উল্লেখই পাওয়া যায় না। কোথাও পাওয়া যায় না যে, কোনো মন্ডলীতে বা চার্চে ‘‘গসপেল’’ পাঠ করা হতো, সংরক্ষণ করা হতো বা এগুলির প্রচার বা শিক্ষার কোনোরূপ চেষ্টা করা হতো। এত অত্যাচারের মধ্যেও বিভিন্ন ধর্মগুরুদের চিঠিপত্র যত্ন সহকারে বিভিন্ন চার্চে সংরক্ষণ করা হয়েছে, কিন্তু কোথাও ‘‘গসপেল’’ বা সুসমাচারের সংরক্ষণের সামান্যতম উল্লেখ নেই।

[84] সূরা (২) বাকারা: ১০৬ আয়াত।

[85] সূরা (২২) হজ্জ: ৫২ আয়াত।

[86] সূরা (৪৫) জাসিয়াহ: ২৯ আয়াত।

[87] সূরা নূর: ৪ আয়াত।

[88] আদিপুস্তক ১৯/৩০-৩৮।

[89] আদিপুস্তক ৩৮/১২-৩০।

[90] মথি ১/৩-১৬।

[91] ২ শমূয়েল ১১/১-২৭।

[92] ১ রাজাবলি ১১/১-১৩।

[93] যাত্রাপুস্তক ৩২/১-৩৫।

[94] বাইবেলের বর্ণনা অনুযায়ী অবরাহামের স্ত্রী সারা আবরাহামের বৈমাত্রেয় ভগ্নি ছিলেন। আদিপুস্তক ২০/১২।

[95] বাংলা বাইবেলে এখানে হত্যাকৃত’-এর পরিবর্তে ‘‘উচ্ছিন্ন’’ বলা হয়েছে। আরবীতে হত্যাকৃতবলা হয়েছে। ইংরেজি বাইবেলের পাঠ নিম্নরূপ: (and they shall be cut off in the sight of their people)।

[96] এখানে কেরির বঙ্গানুবাদে ‘‘ভুতগণের’’ লেখা হয়েছে। মূল ইংরেজী (devil)-এর সুপ্রসিদ্ধ অর্থ শয়তান।

[97] সাধু পলের এ বক্তব্য থেকে কয়েকটি বিষয় জানা যায়: (১) যীশুখৃস্ট ও অন্যান্য ভাববাদিগণ যারা বিভিন্ন খাদ্যের ব্যবহার নিষেধ করেছেন তারা ভ্রান্তিজনক আত্মাদিগের শয়তানদের শিক্ষামালা প্রচার করেছেন, (২) বিশ্বাস ও সত্যজ্ঞান থাকলে সকল হারাম খাদ্যই হালাল হয়ে যায়। (৩) সকল হারাম দ্রব্য ঈশ্বরের নাম নিয়ে খাওয়া যাবে এ কথা যত বেশি প্রচার করা যাবে ততবেশি যীশুর উত্তম শিষ্য হওয়া যাবে। (৪) অপবিত্র খাদ্য বর্জনের বিষয়ে যীশু ও অন্যান্য ভাববাদীর শিক্ষা ধর্মবিদ্বেষীয় কথা। আর যীশুখৃস্ট এরূপ ধর্মবিদ্বেষী কথাই বলেছেন, কারণ তিনি বলেছেন: ‘‘কেননা আমি তোমাদিগকে কহিতেছি, অধ্যাপক ও ফরীশীদের অপেক্ষা তোমাদের ধার্মিকতা যদি অধিক না হয় তবে তোমরা কোন মতে স্বর্গ-রাজ্যে প্রবেশ করিতে পারিবে না।’’ মথি ৫/১৭-২০।

[98] এ সকল শ্লোকে বারংবার বলা হয়েছে: ‘‘ইহা তোমাদের সকল নিবাসে পুরুষানুক্রমে পালনীয় চিরস্থায়ী বিধি।’’

[99] প্রেরিতগণের কার্যবিবরণ ১৫ অধ্যায় দেখুন।

[100] অর্থাৎ, অপবিত্র খাদ্যভক্ষণ, ব্যভিচার ইত্যাদির চেয়েও কঠিন অপরাধ হলো ত্বকছেদ করা। এ সকল অপরাধ করলে কেউ অনুগ্রহ থেকে পতিত হবে না। কিন্তু ত্বকছেদ করলে সে অনুগ্রহ থেকে পতিত হবে এবং খৃস্ট থেকে বিচ্ছিন্ন হবে।

[101] উপরন্তু এ সকল বিধান পালন করলে যীশুর দয়া থেকে বঞ্চিত হতে হবে বলে ভীতি প্রদর্শন করেছেন। মহাপাপের চেয়েও বড় মহাপাপ মূসা (আ)-এর ব্যবস্থা মেনে চলা।

[102] বাইবেলে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ঈশ্বর ইসহাককে বলিদান করার নির্দেশ দেন। তবে বাইবেলের বক্তব্য থেকে স্পষ্ট যে, এখানে ইসহাকশব্দটি পরিবর্তিত। কারণ এখানে বারংবার বলা হয়েছে যে, তোমার একমাত্র পুত্র, তোমার অদ্বিতীয় পুত্র। এই বিশেষণটি শুধু ইশ্মায়েলের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। কারণ ইশ্মায়েলের জন্মের ১৪ বৎসর পরে ইসহাকের জন্ম হয়। কাজেই ইসহাক কখনোই অবরাহামের অদ্বিতীয় পুত্র ছিলেন না, বরং তিনি জন্ম থেকেই তাঁর দ্বিতীয় পুত্র ছিলেন। আদিপুস্তক ২২/২-১২।

[103] ‘‘ইস্রায়েল-কুলজাত যে কেহ শিবিরের মধ্যে কিম্বা শিবিরের বাহিরে গোরু কিম্বা মেষ কিম্বা ছাগ হনন করে, কিন্তু সদাপ্রভুর আবাসের সম্মুখে সদাপ্রভুর উদ্দেশে উপহার উৎসর্গ করিতে সমাগম-তাম্বর দ্বারসমীপে তাহা না আনে, তাহার উপর রক্তপাতের পাপ গণিত হইবে; সে রক্তপাত করিয়াছে, সে ব্যক্তি আপন লোকদের মধ্য হইতে উচ্ছিন্ন হইবে।’’ লেবীয় ১৭/৩-৪।

[104] ‘‘১৫ তথাপি যখন তোমার প্রাণের অভিলাষ হইবে, তখন তুমি আপন ঈশ্বর সদাপ্রভুর দত্ত আশীর্বাদানুসারে আপনার সমস্ত নগর-দ্বারের ভিতরে পশু বধ করিয়া মাংস ভোজন করিতে পারিবে… ২০ তোমার ঈশ্বর সদাপ্রভু যেমন অঙ্গীকার করিয়াছেন, তদনুসারে যখন তোমার সীমা বিস্তার করিবেন, এবং মাংস ভক্ষণে তোমার প্রাণের অভিলাষ হইলে তুমি বলিবে, মাংস ভক্ষণ করিব, তখন তুমি প্রাণের অভিলাষানুসারে মাংস ভক্ষণ করিবে। ২১ আর তোমার ঈশ্বর সদাপ্রভু আপন নাম স্থাপনার্থে যে স্থান মনোনীত করিবেন, তাহা যদি তোমা হইতে বহু দূর হয়, তবে আমি যেমন বলিয়াছি, তদনুসারে তুমি সদাপ্রভুর দত্ত গোমেষাদি পাল হইতে পশু লইয়া বধ করিবে, ও আপন প্রাণের অভিলাষানুসারে নগর-দ্বারের ভিতরে ভোজন করিতে পারিবে। যেমন কৃষ্ণসার ও হরিণ ভক্ষণ করা যায়, তেমনি তাহা ভক্ষণ করিবে; অশুচি কি শুচি লোক, সকলেই তাহা ভক্ষণ করিবে।’’ দ্বিতীয় বিবরণের ১২/১৫-২১।

[105] ইহূদী-খৃস্টান ধর্মগুরুগণ এবং প্রাচ্যবিদগণ প্রায়শ মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর বিবর্তন ও বিভিন্ন বিধানের ক্রমান্বয় পরিবর্তনকে নিয়ে অনেক উপহাস করেন। তারা দাবি করেন যে, মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) নিজের সুবিধামত বিভিন্ন বিধান পরিবর্তন করতেন এবং একে নাসখবলে বুঝাতেন (নাউযূ বিল্লাহ)। অথচ আমরা দেখছি যে, মূসা, ঈসা ও অন্যান্য বাইবেলীয় ভাববাদিগণের শরীয়তেও একইরূপ বিবর্তন, পরিবর্তন বা নাসখ বিদ্যমান। তাহলে তাদেরকে স্বীকার করতে হবে যে, তাদের ভাববাদিগণ বা ‘‘প্রভু যীশু’’-ও সুবিধামত তাদের বিধান পরিবর্তন করতেন।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Back to top button
error: Content is protected !!